আজীবন মাওবাদী কমিউনিষ্ট বিপ্লবী কমরেড হামিদুজ্জামান বাঘা

োোো

২০১৪ সালের ২৯শে এপ্রিল রাত ৯টায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রাক্তন কৃষিবিদ মুক্তিযোদ্ধা প্রবীণ বিপ্লবী, মাওবাদী নেতা হামিদুজ্জামান বাঘা আকস্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে ২০০৯ সালে ব্রেন স্ট্রোক থেকে প্যারালাইজড হয়ে নিজ বাড়ীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকাকালীন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর পরই হামিদুজ্জামান বাঘার জীবন রক্ষা ও মুক্তি কমিটি গঠিত হয় এবং তার মুক্তির দাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই কমিটি সভা-সমাবেশ, লিফলেট, ব্যানারসহ বিভিন্ন উপায়ে প্রচারনা চালায়। দেশের বিশিষ্ট বাম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ- টিপু বিশ্বাস, ফয়জুল হাকিম লালা, সাইফুল হক, মোশরেফা মিশু, জোনায়েদ সাকী সহ অনেকেই কমরেড বাঘার নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে বিবৃতি দিয়েছিলেন। নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা পোষ্টার করেছিল। অন্যদিকে প্যরালাইজড রোগী হিসেবে বিশেষ বিবেচনায় জামিনের চেষ্টা করা হয়। এমনকি জেল কর্তৃপক্ষ গুরুতর অসুস্থতার কারণে হামিদুজ্জামানকে জেলে আনফিট হিসেবে একাধিকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও সরকার তাকে জামিন বা মুক্তি দেয়নি। সর্বোপরি রাজশাহী জেল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পিজি হাসপাতালে প্রেরণ করলেও তাকে পিজিতে চিকিৎসা না করেই পুনরায় রাজশাহীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। অথচ এই দেশে বড় বড় দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতা-আমলারা কোর্টে হাজির না থেকেও আগাম জামিন নিয়ে থাকে। এভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চাটমোহর থানা পুলিশের এস.আই মাইনুদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল লোক দেখানো “গার্ড অব অনার” প্রদান করেছিল। হামিদুজ্জামান বাঘা পাবনা জেলার চাটমোহর থানার লাউতিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট স্কুল শিক্ষক মজনু মাষ্টার তার পিতা। তিনি বড় ধনী শ্রেণীর রাজনৈতিক দল বা নেতাদের মত আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য কিছুই করেননি। বিগত ৪০ বছর এই শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তথা শ্রমিক-কৃষক মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাইতো তরুণ বয়সে রাজনীতি বুঝে ওঠার আগেই ছাত্র অবস্থায় জীবন বাজী রেখে ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি আবার পড়াশুনায় ফিরে যান। কিন্তু ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি দেখলেন তাদের স্বপ্নের শ্রমিক-কৃষকসহ সর্বস্তরের নিপীড়িত জনগণের মুক্তি আসেনি। পাকিস্তানি বড় ধনীদের জায়গায় কিছু বাঙালী বড় ধনী শ্রেণী তৈরী হচ্ছে। “অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত” মাওসেতুঙের এই বাণীকে আকড়ে ধরে বাঘা’৭২ সালে জাসদ ছাত্রলীগ এবং পরবর্তীতে ’৭৩ সালে মহান মাওবাদী নেতা কমরেড সিরাজ সিকদারের প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিতে যোগদান করেন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে তিনি উপজেলা কৃষি-কর্মকর্তা হিসেবে সরকারী চাকুরীর পাশাপাশি গোপনে পার্টির সংগঠক হিসেবে শ্রমিক-কৃষকসহ বিভিন্ন স্তরের জনগণকে পার্টিতে সংগঠিত করেছেন। অবশেষে ’৮৪ সালে লোভনীয় সরকারী চাকুরী ত্যাগ করে বিপ্লবকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সার্বক্ষণিকভাবে নিজেকে পার্টি কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সেই থেকে গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত আনোয়ার কবীরের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি)’র নেতৃস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। যতদূর জানা যায়, এই সুদীর্ঘ সময়ে পার্টির উত্থান-পতনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আশির দশকে এই পার্টির নেতৃত্বে যে সংগ্রাম গড়ে ওঠে সেই সংগ্রামে নরসিংদীর সংগ্রামের অন্যতম নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। সেই সংগ্রামে কুখ্যাত সামরিক ফ্যাসিষ্ট এরশাদের পার্টি বিরোধী “অপারেশন দুর্বার” এর দমন অভিযানে হামিদুজ্জামান কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন’৮৯ সালে এবং ’৯৮ সালে জামিনে মুক্তি পান। জেল থেকে মুক্তি পেয়েই বাঘা পার্টি পুনর্গঠন এবং অতীত সংগ্রামের সারসংকলন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। ’৭৩ সাল থেকে অনেকবার তিনি কারাবরণ করেছেন- সরকারী বাহিনীর অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু শত্রু তাকে কখনো পরাজিত করতে পারেনি। অসুস্থ হওয়ার পূর্বে পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের স্টাফ হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন ছাড়াও সামরিক বিভাগের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কমরেড হামিদুজ্জামান বাঘা আমাদের মাঝে আজীবন বেঁচে থাকবেন।আমরা তার বিপ্লবী কাজ সমাপ্ত করবো এই অঙ্গীকার করছি।

তথ্যসূত্র: চাটমোহর থেকে প্রকাশিত “দৈনিক চলনবিল” হামিদুজ্জামান বাঘার জীবন রক্ষা ও মুক্তি কমিটির প্রকাশিত কাগজপত্র থেকে

Advertisements

কমিউনিস্ট বিপ্লবী কমরেড আবদুল হক এর রচনা সমগ্র (১ম পর্ব)

কমরেড আবদুল হক

 

ক্ষুধা হইতে মুক্তি

আবদুল হক

সমগ্র পূর্ববাংলা জুড়ে চলছে এক চরম খাদ্যসংকট। সাধারণ মানুষ ভুমিহীন কৃষক, গরীব কৃষক, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের মনে প্রশ্ন উঠেছে “ক্ষুধার হাত হইতে কি মুক্তি নাই?” এই প্রশ্ন আরও সুতীব্র হয়ে উঠেছে এই জন্য যে, গত বাইশ বছরে খাদ্য-সংকটের তীব্রতা হ্রাস না পেয়ে এটা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। আর আমরা প্রতি বছর বিদেশ হতে বেশি বেশি করে খাদ্যশস্য আমদানী করে চলেছি। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২-৫৩ সালে আমরা বিদেশ হতে খাদ্য আমদানী শুরু করি। কিন্তু ১৯৫৫-৫৬ সাল পর্যন্ত আমরা বিদেশ হতে অতি সামান্য খাদ্যশস্য আমদানী করি। এই সময় পর্যন্ত আমরা বিদেশ হতে কোনরূপ চাল আমদানী করিনি।

          ১৯৫৫-৫৬ সাল হতে আমরা বিদেশ হতে অধিকতর পরিমাণ গম এবং প্রথমবারের মত চাল আমদানী করি। ১৯৫৪ সাল হতে আমরা আমেরিকার “পাবলিক ল-৪৮০ পরিকল্পনা” অনুযায়ী আমেরিকা হতে খাদ্যশস্য আমদানী করতে আরম্ভ করি। এই আমদানীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে ১৯৫৫-৫৬ সাল হতে। প্রেসিডেন্ট কেনেডী ক্ষমতায় বসবার পরে পি.এল-৪৮০ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদেশে আমেরিকার শস্য রপ্তানীর এক ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট কেনেডী এই পরিকল্পনার নাম দেন “শান্তির জন্য খাদ্য পরিকল্পনা”। “ব্রাজিলিয়ান অর্থনিতীবিদ ক্যারলের হিসেব অনুযায়ী জানা যায় যে, আমেরিকার বিরাট পরিমাণ বাড়তি খাদ্যশস্য গুদামে গুদামে প্রতি বছর জমা হচ্ছে। এর ফলে আমেরিকার খাদ্যশস্যের মূল্যের দ্রুত অবনতি ঘটছে। ক্যারল বলেন যে খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে এই  সংকটের নিরসনের জন্যই প্রেসিডেন্ট কেনেডী তথাকথিত শান্তির নামে বিদেশে আমেরিকার খাদ্যশস্য রপ্তানীর এক ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট যে সমস্ত “অভাবী” দেশের নাম উল্লেখ করেন তার মধ্যে প্রথম ছিল ভারত। আর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে পাকিস্তান। ১৯৫২-৫৩ সালে আমরা বিদেশ হতে ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য আমদানী করি। ১৯৫৯-৬০ সালে আমরা আমদানী করি ৯ লক্ষ ৬০ হাজার টন গম এবং ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টন চাল। ১৯৬৫-৬৬ সালে আমরা আমদানী করি ১১ লক্ষ ৭০ হাজার টন গম এবং ৪ লক্ষ ৮ হাজার টন চাল।

          প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চালু হয় ১৯৫৬ সালে। প্রাক-পরিকল্পনা কালে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল হতে ১৯৫৫ সালের মধ্যে আমাদের দেশের সমগ্র খাদ্যশস্যের মধ্যে বিদেশ হতে আমদানীকৃত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ছিল একশত ভাগের দুই ভাগ। ক্রমাগত এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। চৌধুরী মোহাম্মাদ আলীর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে প্রথম পরিকল্পনা চালু হয়। প্রথম পরিকল্পনার মেয়াদকালে প্রধানমন্ত্রীর গদি অলংকৃত করেন জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দী। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে এই দুইজনই ঘোষণা করেছিলেন যে, পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। কিন্তু প্রাক-পরিকল্পনার বছরগুলোর তুলনায় খাদ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আমরা বিদেশ হতে আরও বেশী পরিমাণ খাদ্য আমদানী করি। প্রথম পরিকল্পনাকালে আমাদের দেশের সমগ্র খাদ্যশস্যের মধ্যে বিদেশ হতে আমদানীকৃত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ছিল একশত ভাগের আট ভাগ।

          দ্বিতীয় পরিকল্পনা চালু করা হয় ১৯৬১ সালে। তখন দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আয়ুব খান। তিনি ঘোষণা করলেন যে, আগেরকার সরকারগুলোর ব্যর্থতার জন্যই আমার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি। দ্বিতীয় পরিকল্পনাকালে দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবেই। কিন্তু দ্বিতীয় পরিকল্পনাকালে বিদেশ হতে খাদ্য আমদানী বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের সমগ্র খাদ্যশস্যের মধ্যে বিদেশ হতে আমদানীকৃত খাদ্যশস্যের পরিমাণ হল একশত ভাগের নয় ভাগ। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি।

          আয়ুবের শাসনকাল খাদ্য সংকটকে আরও সুতীব্র করে তোলো। ১৯৪৮-৪৯ সাল হতে ১৯৫৭-৫৮ সাল এই কয় বছরে পূর্ব বাংলায় বিদেশ হতে ৩৬ লক্ষ ৩৯ হাজার ৫শত ৮৬ টন গম ও ১০ লক্ষ ৪০ হাজার ৪শত ১৬ টন চাল আমদানী করা হয়। আয়ুব খান ক্ষমতায় বসেন ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে। ১৯৫৭-৫৮ সাল এই দশ বছরে পূর্ব বাংলায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষ ৪২ হাজার ৭ শত ১০ টন গম এবং ১৯ লক্ষ ৬৫ হাজার ৬ শত ৩ টন চাল আমদানী করা হয়। অর্থাৎ এই বছরে পূর্বের দশ বছরের তুলনায় ২৬৯ ভাগ বেশি গম ও ৮৫ ভাগ বেশি চাল বিদেশ হতে আমদানী করা হয়।

          তৃতীয় পরিকল্পনা চালু হবার সাথে সাথে নতুন করে আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ইহা মরীচিকাই রয়ে গেছে। খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমান সরকার ঘোষনা করেছেন যে, পূর্ব বাংলায় খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ হবে ১৭ লক্ষ টন। এই বিশ বছরের ইতিহাস হল খাদ্য ঘাটতির ইতিহাস। এই ঘাটতি পূরণের জন্য আমরা বিদেশ হতে প্রধানতঃ আমেরিকা হতে খাদ্যশস্য আমদানী করছি। গত বিশ বছরে আমেরিকার পি,এল ৪৮০ পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ব বাংলায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টন গম ও ৪০ লক্ষ টন চাল আমদানী করা হয়েছে। এবার সরকার বর্ণিত ১৭ লক্ষ টন খাদ্যশস্যের ঘাটতি পূরনের জন্য ধর্ণা দিতে হচ্ছে আমেরিকার দুয়ারে । ধান দুর্বা দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পূজা করা হচ্ছে।

সরকারী ব্যাখ্যঃ-

          এই ক্রমবর্ধমান ঘাটতির জন্য সরকারীভাবে দায়ী করা হচ্ছে বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে। বন্যা পূর্ববঙ্গবাসীর জীবনে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি দুই বছর অন্তর আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ বন্যা। এই বন্যা আমাদের জীবনে বয়ে আনছে অবর্ণনীয় দুঃখ, দুর্দশা ও ক্ষয়-ক্ষতি। এক বেসরকারী হিসেব অনুযায়ী এই বিশ বছরে বন্যার দরুন পূর্ববাংলায় এক হাজার হতে দেড় হাজার কোট টাকার ধন সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। সরকারীভাবে বলা হচ্ছে যে, বন্যা ও প্রকৃতির দুর্যোগের পরে মানুষের হাত নেই। এর জন্য মানুষ দায়ী নয়। সুতারাং কন্যা আল্লার গজব।

দ্বিতীয়তঃ বলা হচ্ছে যে, উন্নয়নের জন্য যা কিছু করা হচ্ছে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য। জনসংখ্যার মতবাদের প্রচারকদের মুখপাত্র হিসাবে ইএস ম্যাসন ঘোষনা করেনে যে, যদি জন্মনিয়ন্ত্রণ সার্থকভাবে না করা হয় তবে ধ্বংস অনিবার্য। (প্রমোটিং ইকনোমিক ডেভেলপমেন্ট পৃঃ-১৫৩) এই “অনিবার্য ধ্বংসের” আর একজন উপাসক ভগট বলেছেন যে, জনসংখ্যা এবং জীবনধারনের উপজীব্য- এই দুই রেখার মধ্যকার ব্যবধান ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ইতিহাসে এরূপ আর কখনও ঘটেনি। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখী দাঁড়িয়েছে। ( উইলিয়াম ভগট- রোড টু সারভাইবাল- পৃঃ ২৮৭) জনসংখ্যা ত্বত্তের পতাকাবাহীদের অন্যতম আর.সি. কুকের বক্তব্য হল যে, ইতিমধ্যে যা অবশ্যম্ভাবী তাই ঘটবে। খাদ্য উৎপাদনের তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে অনেক অনেক গুণ। এর অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু ও ধ্বংস ( হিউম্যান ফ্যাটিলিটি পৃঃ ৩২২) জনসংখ্যার নীতি পৃথিবীতে সর্ব প্রথম তুলে ধরেন পাদ্রী ম্যালথাস। ম্যালথাস বলেছেন যে, খাদ্য উৎপাদনের তুলনায় জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটছে চক্রবৃদ্ধি হাবে। এভাবে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে “ অবাঞ্চিত জনসংখ্যা”। মহামারি, বন্যা, মৃত্যু ইত্যাদি জনসংখ্যার এই অবাঞ্চিত অংশের হাত হতে সমাজকে করবে মুক্ত। ম্যালথাসের অনুসারীরা অবাঞ্চিত জনসংখ্যা সম্পর্কে নতুন নতুন নীতি আবিষ্কার করে চলেছেন। আমাদের দেশেও সরকারীভাবে এই সমস্ত নীতি প্রচার করা হচ্ছে। সরকারীভাবে বলা হচ্ছে যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি সমস্ত রকমের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে আণবিক বোমার বিস্ফোরণের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। ধ্বনি তোলা হচ্ছে যে, যে কোন প্রকারে জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে বন্ধ রাখতে হবে আর তা না হলে জনসংখ্যার বৃদ্ধি যে বিস্ফোরণের সৃষ্টি করবে তাতে সব কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। ম্যাসন,ভগট, ও কুকের বক্তব্যকে অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত করা হচ্ছে যে আমাদের দেশের দুঃখ, দারিদ্র, অনাহার, খাদ্য-ঘাটতি ও অর্থনৈতিক অবনতির কারণ হল জনসংখ্যা বৃদ্ধিঃ-

          ইতিহাসের আলোকেঃ ইতিহাসরে দৃষ্টিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তত্ত্ববিদদের বক্তব্যকে বিচার করা যাক। জনসংখ্যার তত্ত্ববিদদের বক্তব্য অনুযায়ী বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকসমূহ অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চাদপদ হতে বাধ্য। এই সমস্ত এলাকায় জনসংখ্যার চাপ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাস্তব ঘটনার প্রতি দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি যে, বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাসমূহ হল অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে উন্নত। প্রফেসর গ্রান্ডফেস্ট এই বক্তব্যের সমর্থনে ধনী (উন্নত)  ও গরীব (অনুন্নত) দেশের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেনঃ

গরীব দেশ     প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যা     ধনী দেশ        প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যা

সুরিনাম (ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ)         ৪       বেলজিয়াম     ৮০০

বলিভিয়া        ১০     ইংল্যান্ড ও ওয়েলস  ৭৫০

বেলজিয়াম কঙ্গো      ১৩     হল্যান্ড         ৬১০

কলম্বিয়া        ২৬     ইতালী ৪৫০

ইরান-ইরাক   ৩০     ফ্রান্স   ২০০

ফিলিপাইন     ১৭৫   স্কটল্যান্ড       ১৭০

ভারত  ২৫০

উপরে বর্ণিত তালিকা হতে এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, জনসংখ্যা বৃদ্দির সাথে একটি দেশের অর্থনৈতিক অবনতির কোনরূপ সম্পর্কই নেই। মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ব্যারন জে,এফ, ডিউহার্ষ্ট ও তাঁর সহযোগীদের সংগৃহীত তথ্যের পরে নির্ভর করে ১৯৫০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাথাপ্রতি আয়ের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেন।

 তালিকাটি  নিম্নরূপঃ-

দেশ    ডলার হিসেবে মাথাপ্রতি বার্ষিক আয় (এক ডলা=প্রায় পাঁচ টাকা)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র         ১৮১০

কানাডা         ৯৭০

বৃটেন  ৯৫৪

বেলজিয়াম     ৫৮২

সুইডেন         ৭৮০

পশ্চিম জার্মানী ৬০৪

ফ্রান্স   ৭৬৪

সুইজার ল্যান্ড ৮৪৯

তুরস্ক  ১২৫

ভারত  ৫৭

বার্মা   ৩৬

( সূত্রঃ দি পলিটিক্যাল ইকোনমি অব গ্রোথ- পৃঃ ২৪০)

          বৃটেন ও বেলজিয়ামের মাথাপ্রতি বার্ষিক আয় যথাক্রমে ৪৭৭০ টাকা এবং ২৯৯০ টাকা। আর ভারতের আয় হল মাথাপ্রতি ২৮৫ টাকা। আমাদের দেশের অবস্থাও ভারতের অনুরূপ। উপরের হিসেব হল ১৯৫০ সালের। ১৯৬৮-৬৯ সালের মধ্যে মাথা প্রতি আয় প্রতি দেশেয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারী হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে পূর্ব বাংলার মাথাপ্রতি বার্ষিক আয় হল ৩০০ টাকা। প্রফেসর গ্রান্ডফেস্ট কর্তৃক পরিবেশিত তথ্যের সাথে ব্যারনের প্রদত্ত তথ্যের তুলনামুলক বিচার আমাদের সামনে আসলল সত্যকে তুলে ধরে।

           প্রফেসর গ্রান্ডফেষ্ট কর্তৃত পরিবেশিত তথ্যসমূহ হতে জানা যায় যে, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড এবং হল্যান্ডের জনসংখ্যা ভারত, ইরাক, ইরান প্রভূতি দেশ হতে অনেক বেশি। কিন্তু ভারত, ইরান, ইরাক প্রভূতি দেশের তুলনায় ইংল্যান্ড , হল্যান্ড ও বেলজিয়াম অনেক বেশি ধনী এবং উন্নত। পূর্ববাংলার প্রতি বর্গমাইলে ৭.৭৫ জন লোক বসবাস করে। আর পূর্ববাংলার চেয়ে জনসংখ্যা বেশি হল বেলজিয়ামের এবং পূবৃবাংলার প্রায় সম পরিমাণ জনসংখ্যা হল ইংল্যান্ডে। কিন্তু পূর্ববাংলা হল একটি অত্যন্ত গরীব দেশ এবং ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম হল খুবই ধনী দেশ। প্রফেসর গ্রান্ডফেষ্টের তালিকা এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, একটি দেশের জনসংখ্যার হারের সাথে অর্থনৈতিক অবনতি, দারিদ্র, অনাহার ও মহামারীর কোন সম্পর্ক নেই। জনসংখ্যার হারের সাথে অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা, অনাহার এবং মহামারীর যদি সংযোগ থাকত তা হলে পৃবিীর সবচেয়ে দারিদ্র ও অনাহার ক্লিষ্ট দেশ হত বর্তমান কালের ইউরোপের ধনী দেশসমুহ  ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভূতি, আর পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ হত পূর্ববাংলা, ভারত, ইরাক, ইরান প্রভূতি।

          অন্যদিকে পূর্ববাংলা গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্রের অববাহিক অঞ্চলে অবস্থিত “বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার” রিপোর্ট অনুযায়ী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা অঞ্চল বর্তমানের তুলনায় আরও ৫ হতে ৭ গুন বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদান করতে সক্ষম। এই অঞ্চল সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, সামন্যতম প্রচেষ্ট ও লক্ষ্য এই অঞ্চলকে বিশ্বের এক বিরাট ধনভান্ডারে পরিণত করতে পারে। জনসংখ্যা ও খাদ্য সমস্যা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কলিন ক্লার্ক বলেছেনঃ “বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতি বৎসর শতকরা এক ভাগ বৃদ্ধি পাইতে পারে। কিন্তু কৃষি উৎপাদনের কৌশলের উন্নতির ফলে কৃষি উৎপাদন প্রতি বৎসর শতকরা দেড় ভাগ অথবা কোন কোন দেশে শতকরা দুই ভাগ বৃদ্ধি পাইবে। ম্যালথাসবাদীরা যে সুগভীর হতাশার জাল বিস্তার করিয়াছে তাহা সম্পূর্ণভাবে বাতিল হইয়া গিয়াছে বিশ্ব জনসংখ্যার বৃদ্ধিজনিত সমস্যাকে মোকাবিলা করিবার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই যথেষ্ট। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রাক্তন প্রধান রয়েভ ওর বলেছেন আধুনিক বিজ্ঞান অপর্যাপ্ত সম্পদ সৃষ্টি করিতে সক্ষম। আর বৃটেন জনসংখ্যা ও সম্পদ সৃষ্টি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন এই পৃথিবী সীমাহীন নয়। কিন্তু ইহার সকল অধিবাসীই ভরণ-পোষন করিতে সক্ষম।আজ বোধহয় সব চইতে বড় জিনিষ হইল এই যে, বিজ্ঞান ও প্রয়োগবিদ্যার উন্নতি এমন এক পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে যখন ইহারা প্রচলিত সম্পদ হইতে কেবলমাত্র প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য-সমাগ্রী উৎপন্ন করিতে পারে না সৃষ্টি করিতে পারে প্রাচুর্য্য। ( লেট দেয়ার বি ব্রে- পৃ-২২৩) আমাদের দেশে যারা ম্যালথাসের পতাকা হাতে নিয়ে এ কথা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, পূর্ব বাংলার খাদ্য ঘাটতি, কৃষি সংকট ও অনাহারের জন্য দায়ী হল জনসংখ্যার বৃদ্ধি তাদের বক্তব্যের অসারতা উপরের আলোচনা হতে সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ববাংলার মূল প্রশ্ন জনসংখ্যার বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল এই জনসংখ্যার হাতে সমাজের উৎপাদন শক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞানকে তুলে দেয়া। এইক্ষেত্রে এঙ্গেসসের  বক্তব্য প্রণিদানযোগ্য, এঙ্গেলস বলেছেনঃ “ জনসংখ্যার চাপ পড়িবে আহার্য দ্রব্যাদির উপর নহে, চাপ পড়িবে আহার্য্য দ্রব্যাদির উৎপাদনের উপায়সমূহের উপর।”( ল্যাং এর নিকট এঙ্গেলসের চিঠি-২৯ শে মার্চ ১৮৬৫ সাল।) আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও জনসংখ্যার হাতে তুলে দিতে হবে আহার্য দ্রব্যাদি উৎপাদনের উপায়সমূহ। এই উপায়সমূহের অধিকারী হলেই তারা প্রয়োজন অনুরূপ নয় প্রয়োজন অতিরিক্ত আহার্য্য দ্রাব্যাদি উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। আমাদের দেশে উন্নয়নের হারের সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হাতেরর প্রতিযোগিতা চলেনি। প্রতিযোগিতা চলেছে জনসংখ্যার বৃদ্ধি আর এই বর্ধিত জনসংখ্যা উৎপাদনের উপায়সমূহের মালিক হবে কিনা- এই দুয়ের মধ্যে । আজ আমাদের দেশে জনসংখ্যার সুবিপুল অংশকে সমাজের সমস্ত রকমের উৎপাদন প্রচেষ্টার বাইতে থাকতে হচ্ছে। জনসংখ্যার এই সুবিপুল অংশ অর্থাং একশত জনের ৯৯ জন উৎপাদনের উপায়সমূহ জমি, লাঙ্গল, গরু,ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি হতে বঞ্চিত। এই বিরাট অংশ ক্ষেতে খামারে কলে কারখানায় শ্রম করে, কিন্তু শ্রমের ফসলের ওপর তাদের কোন অধিকারই নেই। এইদিক দিয়ে বিচার করলে আমাদের দেশের জনসংখ্যা “বাড়তি”। প্রকৃতির চিরন্তন নীতি “অবঞ্চিত জনসংখ্যা” সৃষ্টি করেনি। একটি সুনিদিষ্ট ঐতিহাসিক পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে “বাড়তি জনসংখ্যার” সমস্যা।

 অনুরূপভাবে বন্যা আল্লার গজব নয় এটাও হল ইতিহাসের এমন একটি সুনিদিষ্ট পরিণতি-যে পরিণতি বন্যা নিরোধের জন্য আধুনিক বিজ্ঞনের প্রয়াসকে করেছে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার। সমুদ্রের জলসীমার নীচে অবস্থিত হল্যান্ড। হল্যান্ডের আক্ষরিক অর্থ হলো নীচু ল্যান্ড অর্থাং জমি। সমুদ্রের বাঁধ বেঁধে হল্যান্ডকে গড়ে তোলা  হয়েছে। বিজ্ঞানের সাহায্যে চীনের দুঃখ হোয়াংহোকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। নাইয়াগ্র জলপ্রপাতকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। মানুষ আজ চাঁদে পৌঁচেছে। বিজ্ঞান প্রয়োগবিদ্যা আজ নতুন নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রয়োগবিদ্যার সাহায্যে মানুষ আকাশ-বাতাশ বিশ্বচরাচরে নতুন নতুন বিষ্ময় সৃষ্টি করে চলেছে। আজ আমাদের বন্যা নিযন্ত্রণের কাজে বিজ্ঞান ও মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে নিয়োগ করা হচ্ছে না । এটা কি আল্লার গজব ও প্রকৃতির খেয়াল? না- ইতিহাসের এমন একটি সুনির্দিষ্ট পরিণতিতে আমরা পৌঁছেছি যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বাধা উপস্থিত করা হচেছ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজে বিজ্ঞানকে প্রয়োগ করতে অস্বীকার করা হচ্ছে। আজ বাইশ বছর পাকিস্তান কায়েম হয়েছে। কিন্তু এই বাইশ বছর ধরে বন্যা নিরোধের জন্য কোনরূপ ব্যবস্থা গ্রহন না করে কেবলমাত্র আল্লার ও প্রকৃতির দোহাই দেয়া হচ্ছে। এটা কোন আকষ্মিক ঘটনা নয়। ইতিহাসের এক বিশেষ সুনিদিংষ্ট পণিতিই এর জন্য দায়ী।

অতীতের দিকে তাকানো যাকঃ-

          ক্ষুধা,অনাহার, দারিদ্র, বন্যা ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থাকে বোঝার জন্য এই ঐতিহাসিক পরিণতিকে উপলব্ধি করতে হবে। সেজন্য একবার অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করা দরকার। ইংরেজ আসার আগে আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-ভিত্তিক সামন্তবাদী ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার গর্ভে পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তৃতি ঘটেছি। ইংরেজ এসে আমাদের দেশ দখল করে না নিলে কালে কালে পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থার গতিপথে আমাদের দেশেও ধনবাদ বিকাশ লাভ করত। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ এসে বিকাশের এই পথকে রুদ্ধ করে দিল। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আমাদের দেশের পরে চালালো উলঙ্গ লুষ্ঠন এবং নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য সৃষ্টি করল নতুন এক জমিদার শ্রেণী ও একদল মোসাহেব মুৎসুদ্দি দল।

           ইংরেজদের আসার পূর্বে সমাজদেহে নতুন পরিবর্তনের লক্ষণসমূহ প্রকাশ পাচ্ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটছিল। দেশীয় পণ্যে উৎপাদনের মাত্রা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। চৈনিক পরিব্রাজকের মতেঃ “ভারতীয় জনগণের একটি বিরাট অংশের শিল্প কুশলতা ছিল সুগভীল।” এই শিল্প কুশলতার পরে নির্ভর করে সুবিধাজনক পরিবেশে আমাদের দেশে সুনিশ্চিতভাবে ধনবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটত। ভেরা এ্যানসটে ইংরেজ বিরোধী ছিলেন না। তিনি পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন যে, পাক-ভারত উপমহাদেশ নিজস্ব পথে ও প্রচেষ্টায় উন্নত ধরনের অর্থনৈতিক পর্যায়ে উপনীত হতে পারত। তিনি আরও মন্তব্য করেছেন অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল। ভারতীয় উৎপা;ন পদ্ধতি এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিশ্বের যে কোন দেশের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারিত। ইংরেজদের পূর্বপুরুষরা যখন আদিম জীবন যাপন করিতেছিল তখন ভারত উৎপাদন করিতেছিল এবং বিদেশে চালান দিতেছিল অতি উন্নত ধরনের কাপড় ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী। আর সেই অসভ্য বর্বরদের সন্তান-সন্ততিরা যেদিন অর্থনৈতিক বিপ্লব সংগঠিত করিল সেইদিন ভারতীয়রা সেই বিপ্লবে অংশ গ্রহণ করিতে ব্যর্থ হইল”। (ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশ- পৃঃ-৫)।

 ভেরা “অসভ্য বর্বররা” পাক-ভারত উপমহাদেশকে বেপরোয়া লুণ্ঠন করে অর্থনৈতিক বিপ্লব সংগঠিত করেছি।। ব্র“কস আদমের ভাষায় ফুটে উঠেছে তারই চিত্র।“ ভারতকে লুণ্ঠনের ব্যাপারে মেকলে চাইতে আর কোন বড় বিশেষজ্ঞের কথা উল্লেখ করা চলে না। মেকলে উচ্চপদে আসীন ছিলেন। তিনি সরকারী মুখপাত্র হিসাবে কাজ করিয়াছেন। পলাশীর যুদ্বের পর কিভাবে ইংল্যান্ডে অর্থ ও সম্পদের বৃষ্টি আরম্ভ হইল তার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। ক্লাইভ সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন,“ আমরা ইহা সুস্পষ্টভাবে বলিতে পারি যে, যে ব্যাক্তির কিছুই ছিল না সেই ব্যাক্তি মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে এক বিরাট সম্পদের মালিক হইলেন। কিন্তু ক্লাইভের চলিয়া যাইবার পর যাহা ঘটিল ক্লাইভ নিজের অথবা তাহার সরকারের জন্য যাহা নিয়াছিলেন তাহার তুলনায় তাহা ছিল অতি নগন্য। তুলনামূলকভাবে বলিতে গেলে ক্লাইভ এর চলিয়া যাইবার পর দেখা দিল পাইকারী হারে লুণ্ঠন এবং বাংলাদেশকে ঘিরিয়া ধরিল একদল লোভী কর্মচারী রূপী শকুনীরা। এই কর্মচারীরা চিল হিংস্য, শয়তান ও বেহিসাবী। ইহারা যাহা হাতে পাইল তাহাই লুণ্ঠন করিল। ইহারা বাংলাদেশকে নিঃস্ব করিয়া ফেলিল। ইহাদের একমাত্র চিন্তা ছিল বাংলাদেশ হইতে যে কোন প্রকারে হাজার হাজার পাউন্ড লুট করিয়া বিলাতে ফিরিয়া গিয়া অর্থের মাহাত্ম্য দেখানো। এইভাবে তিন কোটি মানুষকে সর্ব্বশান্ত করিয়া ফেলা হইল। ইংরেজদের এই ধরনের অরাজকতাপূর্ণ শাসন কার্যের তুলনা সভ্য সমাজে নাই।” পলাশীর যুদ্ধের পর পরই লুণ্ঠিত ধনদৌলত লন্ডনে এসে পৌঁছাতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। বিশেষজ্ঞরা সকলেই একমত যে, “১৭৬০ সাল সূচনা করিল শিল্পবিপ্লবের। এই শিল্পবিপ্লবই নতুন যুগের সূচনা করে। ১৭৬০ সালের পূর্বে লাঙকাশায়ার কাপড় বুনবার জন্য যে সমস্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হইত তাহা ছিল ভারতে কাপড় বুনিবার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিরই অনুরূপ। ( দি ল অব সিভিলাইজেশন এ্যান্ড ডিকে-র্পঃ-২৯৪) পলাশীল যুদ্ধের পর সব কিছুই নতুন রূপ ধারণ করে এমনকি ১৭৫০ সালে বৃটিশ লৌহ শিল্পে যে মন্দা-দেখা দিয়েছিল তা দুর হয়ে তেজীভাব দেখা দেয়।

          পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলাদেশকে বেপরোয়া লুণ্ঠন করে ইংল্যান্ডের শিল্প বিকাশের আদি পুঁজি সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশের সব কিছুকেই ইংল্যান্ডের শিল্প বিকাশের কাজে লাগানো হয়। রমেশ দত্ত তার ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস নামক পুস্তকে তার বর্ণনা দেয়েছেন, “অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকগুলিতে ইংল্যান্ডের  একমাত্র কাজ ছিল ভারতকে গ্রেট বৃটেনের শিল্প আয়োজনের উদ্ধেশ্যে ব্যবহার করা । ভারতীয়রা গ্রেট বৃটেনের শিল্পের জন্য কাঁচামাল উৎপাদন করিবে এই উদ্দেশ্যে ভারতে উৎপাদিত রেশম ও সূতীবস্ত্রের উপর অতিরিক্ত করা ধার্য্য করা হইল। বৃটিশ পণ্য সম্ভারকে বিনা শুল্কে ভারতে প্রবেশ করিতে দেয়া হয়।। জীবিকা অর্জনের একমাত্র উপায় হইয়া দাঁড়াইল কৃষি। কৃষি যেটুকু সম্পদ সৃষ্টি করিতে সক্ষম বৃটিশ সরকার জমির খাজনা বাবদ তাহাও নিয়া নিল। ইহা কৃষিকে পঙ্গু করিয়া দিল এবং চাষীকে চিরকালের জন্য দারিদ্র ও ঋণের আবর্তে নিক্ষেপ করিল। জমি যেটুকু উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি করিতে পারে বৃটিশ সরকার তাহার সবটাই আত্মসাৎ করিল।”

বৃটিশ সরকার এভাবে আমাদের দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেয়। ইংজের আমাদের দেশে লুস্ঠন ও দস্যুতার যে অধ্যায় সৃষ্টি করে তাকে বহাল রাখার জন্য সৃষ্টি করে “ নুতন নতুন শ্রেণী যাহারা চিরকালের জন্য নির্ভর করিবে তাহাদের উপর”। এই নতুন শ্রেণীসমূহ হল জমিদার শ্রেণী এবং মাযোগানদার, কর আদায়কারী, লোকখাটানো, হিসেবরক্ষক ও দেশীয় কাজ-কর্ম দেখাশুনা করাবার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত মুৎসুদ্দি শ্রেণী।

          ইংরেজ  আসার আগেও আমাদের দেশে খাজনা প্রথা এবং সামন্তবাদী শোষণ বিদ্যামান ছিল। কিন্তু খাজনা নির্ভর করত ফসলের পরে। ফসলের এক চতুর্থাংশ খাজনা হিসেবে নেয়া হত। জমিতে ফসল ফললে কৃষক খাজনা দিত। যে বছর জমিতে ফসল ফলত না সে বছর কৃষককে খাজনাও দিতে হত না। ফসলের পরে যেহেতু খাজনা নির্ভরশীল ছিল সেহেতু ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সবসময় নজর দেয়া হত। সমগ্র দেশে গড়ে তোলা হয়েছিল জালের মত সেচ ব্যবস্থা এই খালবিল নদী-নালাগুলি বর্ষার অতিরিক্ত পানি বহন করে নিয়ে যেত। আর খরার সময় এসবের পানি কৃষকরা ব্যবহার করত। এই সেচ ব্যবস্থাই ছিল আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। সেদিন হয়ত কখনও কখনও অজন্মা খো দিত কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত আকষ্মিক ব্যাপার।

           ইংরেজ আসার পর চিরস্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারী প্রথা কায়েম করা হল। জমিতে ফসল হোক অথবা না হোক খাজনা দিতে হবে। খাজনা আর ফসলের উপর নির্ভরশীল নয়। সুতরাং ফসল ও সেচ ব্যবস্থার প্রতি আর নজর দেবার প্রয়োজন রইল না। নদীসমূহ সংস্কারের অভাবে পলি মাটিতে হাজিয়া মজিয়া গেল। নদীগুলির বর্ষার পানি বহন করবার আর ক্ষমতা রইল না। দেখা দিতে লাগল বন্যার পর বন্যা। ইংরেজ লেখক টমসন বলেছেনঃ “দুর্ভিক্ষ হয়ত পূর্বেও হইত। কিন্তু ইংরেজ আমলে প্রতি কয়েক বৎসর অন্তর অন্তর দেখা দিতে লাগিল দুর্ভিক্ষ।” ইংরেজরা আমাদের দেশে তাদের শিল্পের প্রয়োজনীয় কাচামাল সরবরাহের এবং শিল্পজাত দ্রব্যাদি দেশের অভ্যন্তরে সুষ্ঠভাবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কল্যাণকে সামনে রেখে এই রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। রেল লাইন গড়ে তুলবার জন্য নদীর উপর পুল তৈরী হল। কিন্তু এই পুলগুলো এমনভাবে করা হল যাতে নদীগুলোর স্বাভাবিক গতি রূদ্ধ হয়ে যায়। টমসন বলেছেন নদীগুলির উপর পুল তৈয়ারী করিতে বাণিজ্যিক স্বার্থ ভিন্ন আর কিছুই লক্ষ্য করা হয় নাই। ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি সে ব্যবস্থাকে ধ্বংস করল, বন্যা ও দুর্ভিক্ষকে স্থায়ী করাল এবং আমাদের দেশকে চির দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত করল। এইভাবে আমাদের দেশে সৃষ্টি হল চিরস্থায়ী কৃষি সংকট। জমিদারী শোষণের সাথে সাথে এসে জুটল মহাজনী শোষণ। জমিদারী শোষণ ও মহাজনী শোষণ এই দুই শোষণ একে অপরেরর সাথে হাত মিলিয়ে গ্রামাঞ্চলে এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করল। এই দিকেই লক্ষ্য করে রমেশ দত্ত লিখেছেনঃ “ভারতবর্ষে রাষ্ট্রই জমি হইতে যে উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি হয় তাহাতে বাধা সৃষ্টি করিয়াছে। ইহা একভাবে অথবা অন্যভাবে কৃষকের উদ্ধৃত্তকে আত্মসাৎ করিয়াছে।… একবাবে অথবা অন্যভাবে বাড়তি ট্রাক্সের মাধ্যেমে সমস্ত রকমের অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত শুষিয়া নিয়া ইংল্যান্ডে চালান দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবে ভারতবর্ষে যে আর্দ্রতা সৃষ্টি হয় তাহা দ্বারাই অন্যান্য দেশের জমিকে উর্বর করা হয়।”

          অন্যদিকে ইংরেজরা দেশীয় ব্যবসায়ী, কস্ট্রাক্টর, হিসাবরক্ষক, মালের যোগানদার হিসেবে একদল পরগাছা শ্রেণী সৃষ্টি করে। নিজেদের স্বার্থেই এরা চিরকাল ইংরেজদের অনুগত থাকে। এই সমস্ত ব্যবসাদার, মালের যোগানদার ও কন্ট্রাকটারই গড়ে তোলে মুৎসুদ্দী শ্রেণী। এই দুই শ্রেণী জমিদার-মহাজন এবং মুৎসুদ্দী শ্রেণীর পরে নির্ভর করেই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দেশে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখে। আমাদের সমাজে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি হয় তার সবটাই আত্মসাৎ কারে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ ও তার দেশীয় সহযোগী জমিদার মহাজন এবং মুৎসুদ্দীরা। ব্যারন অত্যন্ত সংগতভাবে বলেছেনঃ “ ইহাদের (ইংরেজরা)দ্বারা প্রচলিত জমি ও ট্রাক্স সংক্রান্ত নীতিসমূহ ভারতের গ্রাম্য অর্থনৈতিকে ধ্বংস করে এবং তাহার স্থানে বসায় পরজীবী জমিদার ও মহাজনদের। ইহাদের প্রচলিত বাণিজ্যিক নীতি ভারতীয় হস্তশিল্পকে ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে শহরের ঘৃণ্য বস্তিজীবনকে…। ইহাদের প্রচলিত অর্থনৈতিক নীতি দেশীয় শিল্প বিকাশের সমস্ত রকমের সূচনাকে ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে ফটকাবাজী  ও মুনাফাখোরদের, ছোটখাট, ব্যবসাদার, দালাল ও ফাঁকিবাজদের যাহারা পচনশীল সমাজের অতি মূল্যবান বাকী সম্পদটুকুও আত্মসাৎ করে।”

          এই ঐতিহাসিক পরিণতিতেই আমাদের দেখা দেয় উদ্ধৃত্ত জনসংখ্যা, খাদ্যঘাটতি, ব্যাপক অনাহার ও দূর্ভিক্ষ। আল্লার গজব হিসেবে আমাদের দেশে বন্যা, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি। এগুলো দেখা দিয়েছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের এবং তাদের সহযোগী জমিদার-মহাজন এবং মুৎসুদ্দিদের শোষণের ফলেই। সাম্রাজ্যবাদী ইরেজ, সামন্তবাদী জমিদার, মহাজন এবং ব্যবসায়ী, কন্ট্রাক্টর মুৎসুদ্দীরা আমাদের দেশের জনগণের বুকের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল শোষণের তিন পাহাড়। আর এর ফলেই দেখা দেয় উদ্ধৃত্ত জনসংখ্যা।

সাম্রাজ্যবাদীরা এবং তাদের আদর্শ প্রচারকেরা লোকচক্ষু হতে এই তিন শোষণকে আড়াল করে রাখবার জন্যই “ উদ্ধৃত্ত জনসংখ্যার” তত্ত্ব প্রচার করত। আমাদের অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা অনাহার ও বুভুক্ষার জন্য তারা দায়ী করত আমাদের দেশের মানুষের “অলসতা,” “উদ্রোগহীনতা” উদ্ধৃত্ত সৃষ্টিতে সমাজের ব্যর্থতা জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রভৃতিকে। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ পাক-ভারতের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে অতি সুক্ষ্মভাবে এ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। আর অর্থনীতিবিদ হিসেবে জারখার এবং বেরী সাহেব অর্থীনতিক তত্ত্ব হিসেবে এই সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী প্রচারকে ব্যাখ্যা করিছেন।

তিন পাহাড় ও জনতাঃ-

          সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্ণতি ও পশ্চাদপদতা অনাহার ও দারিদ্র, দুর্ভিক্ষ প্লাবনের জন্য দায়ী ছিল তিন পাহাড়-সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ,সামন্তবাদী জমিদার-জোতদার-মহাজন এবং মুৎসুদ্দী ব্যবসায়ী, কন্ট্রাক্টর ও সাম্রাজ্যবাদী ইয়রেজের পেটোয়া ধনীরা। নিজেদের কাঁধ হতে এই তিন পাহাড়কে সরাবার জন্যই আমাদের দেশের জনতা দীর্ঘ দুইশ বছর ধরে সংগ্রাম করে আসছে। পলাশীর যুদ্ধের পর যেদিন ইংরেজরা আমাদের দেশ দখল করেছে তার পরমূর্হুর্তে হতে এই সংগ্রাম শুরু হয়েছে। এই সংগ্রাম কোনদিন থামেনি। কখনও কখনও এই সংগ্রামের আগুন লেলিহান শিখার ন্যায় সমগ্র দেশকে ছেয়ে ফেলেছে। আবার কখনও এর বেগ প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু কখনই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সামন্তবাদ বিরোধী এই সংগ্রামের আগুন নিভে যায়নি।

          দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এই আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। এই আগুনে সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হবার উপক্রম হয় সাম্রাজ্যবাদী ও তার সহযোগী সামন্তবাদী ও মুৎসুদ্দীদের শোষণের আমানত। এমতাবস্থায় শঙ্কিত হয়ে উঠল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদও মুসলিম লীগের সামন্তবাদী-মুৎসুদী নেতৃত্ব। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত মেহনতী মানুষের সংগ্রাম একটি সশস্ত্র সাধারণ বিপ্লবে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে এই ভয়ে ভীত হয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা এবং সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত মুসলিম লীগের সামন্তবাদী মুৎসুদিবাদী নেতৃত্ব একটি আপোষ-মীমাংসায় পৌঁছানো। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের দুর্বলতার দরুন শ্রমিক শ্রেণী সেদিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর স্বীয় নেতৃত্ব কায়েম করতে সক্ষম হয়নি। ফলে আপোষ ও বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি জয়যুক্ত হল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট জন্মলাভ করল পাকিস্তান।

তিন পাহাড় বিদ্যামান রইলঃ-

          সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দি পুঁজির যে তিন পাহাড় আমাদের দেশের ওপর চেপে বসেছিল সেই তিন পাহাড় অপসারিত হল না। এরা বিদ্যামান রয়ে গেল। সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসনের ধরন কেবলমাত্র বদলালো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালের বিপ্লবী পরিস্থিতিতে নিজেদের শাসন ও শোষণকে অব্যাহত রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা নতুন কৌশল গ্রহণ করতে বাধ্য হল। এর নাম হল নয়া-উপনিবেশবাদ। এই নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণকে অব্যাহত রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা নির্ভর করছে তাদের দুই সহযোগীর ওপর সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দী আমলা পুঁজির ওপর। এই নয়া-উপনিবেশবাদ উপনিবেশবাদেরই আরও ধূর্ত মারাত্মক রূপ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট হতে সাম্রাজ্যবাদী প্রত্যক্ষ উপনিবেশিক পরিবর্তে দেখা দিয়েছে নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ।

 আমাদের দেশে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনৈতিক অবস্থানসমূহ অক্ষুন্ন রয়েছে। আমাদের দেশের পাটের রপ্তানী বাজারের নিয়ন্ত্রণকারী হল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ। আমাদের দেশের চা শিল্পের ওপরও বৃটিশ পুঁজির প্রাধান্য বিদ্যামান। আমাদের দেশের চা বাগানের সংখ্যা হল প্রায় ১৪৩টি। এর মধ্যে জেমস ফিনেল ও ডানকানদের পরিচালিত চা বাগানেই হল প্রধান। ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও বৃটিশ প্রভাব বিদ্যামান রয়েছে। লয়েডস, অস্ট্রেলিয়া প্রভূতি প্রতিষ্ঠান ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও বৃটিশ স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। বৃটিশ সিংহ আজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার স্থান অধিকার করেছে আমেরিকা। আমাদের দেশের আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যের প্রায় অধেকের জন্য দায়ী হল আমেরিকা। ব্যাঙ্ক ও বীমার জগতে আমেরিকার এক্সপ্রেস ও আমেরিকান ইন্সিওরেন্স কোম্পানীর প্রভাব প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

          আমেরিকার সাহায্য ও ঋণের পরিমাণও প্রতি বছর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ১৯৬৫ সালের ৩০ শে মার্চ পর্যন্ত আমেরিকার পুঁজির পরিমাণ ছিল ১৫০৪ কোটি টাকা। ১৯৬৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২২০০ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। আমেরিকার ঋণ ও সাহায্যসহ ঋণ ও সাহায্যের নামে আমাদের দেশে ২৯০০ কোটি টাকার বিদেশী বিনিয়োগ নিয়োজিত হয়েছে। আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষের মাথায় বিদেশী ঋণের বোঝার পরিমাণ হল ৪২ টাকা। ১৯৬৬-৬৭ সালে বিদেশী ঋণের সুদ হিসেবে আমাদের দিতে হয়েছে ৩৬০ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। ১৯৬৯-৭০ সালে ঋণের সুদ বাবদ দিতে হবে ৪৭৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। অর্থাং আমাদের অর্জিত সমগ্র বিদেশী মুদ্রার একশত ভাগের বিশ ভাগ খরচ করতে হবে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। ঋনের সুদ হিসাবে আমাদের যে অর্থ দিতে হচ্ছে পরিমাণগতভাবে তা হল পূর্ব বাংলার বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ। আমেরিকার সাহায্যের প্রধান রূপ হল পণ্য সাহায্য।

          আমাদের দেশের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নয়া ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কব্জা সুপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার হল পি,এল ৪৮০ পরিকল্পনা মোতাবেক আমেরিকার উদ্ধৃত্ত পণ্য সাহায্য পরিকল্পনা। ১৯৫৪ সালে বগুড়ার মোহাম্মাদ আলীর আমলে সর্বপ্রথম আমেরিকার সাথে পণ্য সাহায্য চুক্তি সম্পাদিত হয়। প্রেসিডেন্ট কেনেডীর আমলে এই চুক্তির পরিধি সম্প্রসারিত করা হয়। ১৯৬১সালের আগষ্ট মাসে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৫০ কোটি ৯০ লক্ষ টাকার পণ্যসামগ্রি, যথা গম, গুড়া দুধ, খাবার তেল, চর্বি, মাখন ইত্যাদি সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই পণ্য সামগ্রী বিক্রয় করে যে অর্থ পাওয়া যায় তা দ্বারাই গ্রাম্য ওয়ার্কস প্রোগ্রামের চালু করা হয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কুমিল্লায় গবেষণাগার খোল হয়। এইভাবে গ্রাম্য ওয়ার্কস প্রোগ্রামের জন্ম হয়েছে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের বদৌলতে এবং পরিকল্পনার সাহায্যে আমেরিকা আমাদের দেশের গ্রাম্যঞ্চলেও প্রবেশ করেছে এবং গ্রাম্য অর্থনীতিকে কাজ করেছে।  ১৯৬৯ সালে ৩রা অক্টোবর আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের নতুন করে ১১ কোটি টাকার পণ্য সাহায্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এড শিক্ষা কেন্দ্র, শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্র ও মিলনায়তন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে আমেরিকার টাকায়। নয়-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের হোতা আমেরিকা আমাদের দেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করেছে। ইপিআইডিসি, কৃষি উন্নয়ন সংস্থা প্রভূতি সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে জড়িত।

          এতভিন্ন আমেরিকার ব্যক্তিগত পুঁজির অনুপ্রবেশও ঘটছে আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন হল বিশ্বব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা। দাউদ করপোরেশনকে এই সংস্থা তিন কোটি টাকার উপর ঋণ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন পাকিস্তান ইনডাষ্ট্রিয়াল ক্রেডিট এ্যান্ড ইভেষ্টমেন্ট করপোরেশকে ১৯৪২৩০ টাকা ঋণ দিয়েছে।

 ঋণ ও সাহায্যের নামে আমেরিকার যে টাকাই আমাদের দেশে আসছে তার মূল লক্ষ্য হল মুনাফা আরও বেশী মুনাফা। খোদ আমেরিকাতে আমেরিকার পুঁজির মুণাফার হার দিনের পর দিন হ্রাস পেয়ে চলেছে। অন্যদিকে আমাদের মত দেশে আমেরিকার পুঁজি তুলনামূলকভাবে বেশী মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম। মিঃ ব্যারন খোদ আমেরিকা ও অনুন্নত দেশে আমেরিকার পুঁজি কর্তৃক মুনাফা অর্জনের একটি তুলনামুলক তালিকা উপস্থিত করেছেঃ নিম্নরূপঃ-

     বছর                           অনুন্নত দেশে                          আমেরিকায়

                                  (শতকরা হিসাবে)                      (শতকরা হিসাবে)

    ১৯৪৫                              ১১.৫                                     ৭.৭

     ১৯৪৬                              ১৪.৩                                     ৯.১

     ১৯৪৭                              ১৮.১                                     ১২.০

     ১৯৪৮                              ১৯.৮                                     ১৩.৮

এই তালিকার সাথে সাম্প্রতিককালের ঘটনাবলীকেও মিলিয়ে দেখতে হবে। বিদেশে মার্কিন পুঁজি বিনিয়োগ ও মুনাফা সম্পর্কে মার্কিন সরকারের পক্ষ হতে একটি সরকারী হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে।

বিদেশে বিনিয়োজিত মার্কিন পুঁজির পরিমাণ (এক মিলিয়ন ডলার হিসাবে এক মিলিয়ন= দশলক্ষ। এক ডলার= পাঁচ টাকা।

          বছর             পুঁজির            পরিমাণ মুনাফা

          ১৯৬০            ১৬৭৪                       ৩৫৬৬

          ১৯৬৫            ৩৪১৮                      ৫৪৬০

          ১৯৬৬            ৩৫৪৩                      ৫৬৮০

উপরের তথ্যসমূহ হতে জানা যায় যে, প্রতি বছর বিদেশে মার্কিন পুঁজি লগ্নীর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাথে সাথে বৃর্দ্ধি পাচ্ছে মুনাফার পরিমাণ। এই তথ্যসমূহ আরও প্রমাণ করে যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এক নম্বরের নয়া-উপনিবেশবাদী শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইচ.এন. ব্রেলসফোর্ড সঠিক ভাবেই বলেছেনঃ “পুরাতন সাম্রাজ্যবাদ কর আদায় করত। নতুন সাম্রাজ্যবাদ সুদে টাকা ধার দেয়।” (ইস্পাত ও সোনার যুদ্ধ-পৃ-৬৫)

          নতুন সাম্রাজ্যবাদ নয়া-উপনিবেশবাদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঋণের সুদ ও মুনাফা হিসেবে আমাদের দেশের সম্পদের সিংহভাগই নিজের দেশে চালান দিচ্ছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা কাটাবার জন্য সম্পদের প্রয়োজন। কিনতু এই সম্পদ দেশে থাকছে না বিদেশে চলে যাচ্ছে। এটা হল বাস্তব সত্য। সত্যকে চিরকালের জন্য ঢেকে রাখা যায় না। জাতিসংঘকেও বাধ্য হয়ে বাস্তব সত্যকে স্বীকার করতে হয়েছে। ১৯৫৩ সালের এশিয়া ও দুর প্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিক্রমাতে বলা হয়েছেঃ “ সমগ্র লাভের বিরাট অংশ চলিয়া যায় দেশের বাহিরে।”

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের তল্পীবাহকরা প্রচার করে বেড়ায় যে, আমাদের দেশ হল অনুন্নত দেশ। আমাদের দেশকে গড়ে তোলার জন্য মার্কিন সাহায্য প্রয়োজন। ওদের স্মরণ রাখা দরকার যে, আমাদের দেশ যতটুকু উদ্ধৃত্ত সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে আমেরিকা তা উচ্চহারে ঋণ ও মুণাফা আকারে নিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতিকালের ভারতের দুইটি উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৬৭ সালে আমেরিকা ভারতে ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা লগ্নী করে। ঐ পুঁজি হতে আমেরিকা সেই বছরই লাভ করে ২ কোটি টাকা। এর চেয়েও বিষ্ময়কর হল আর একটি ঘটনা। আমেরিকা ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকা খাটায়। আর সেই বছরই সে লাভ করে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য । আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু আমাদের দেশের সব কথা জানা যায় না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই চরিত্রকে লক্ষ্য করে এরিক সিকক বলেছেন যে, অনুন্নত দেশে আমেরিকা ঋণ ও সাহায্য বাবদ যা দেয় তার অনেক বেশী সে তুলে নেয় এবং এই বাড়তি টাকা আবার সে লগ্নী করে।

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দেশে রাস্তা, ঘাট, বাঁধ ইত্যাদি ব্যাপারে সাহায্য করছে কিন্তু এ সমস্ত পরিকল্পনার পিছনেও মার্কিন নয়া-উপনিবেশবাদী স্বার্থ নিহিত রয়েছে। একটি পরিকল্পনা করার জন্য প্রয়োজন সেই দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া প্রভূতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান। আমেরিকার পরিকল্পনা বিশারদদের এ সমস্ত বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন নেই। গঙ্গা-কপেতাক্ষ ও কাপ্তাই পরিকল্পনার কথাই ধরা যাক। এই দুইটি পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে এই দুই অঞ্চলের মানুষের জীবনে সীমাহীন দুঃখ ডেকে এনেছে। কাপ্তাই পরিকল্পনার ফলে চট্রগ্রামের এক বিরাট অংশে প্রতি বছর দেখা দিচ্ছে বন্যা। গঙ্গা-কপেতাক্ষ পরিকল্পনা কুষ্টিয়ার এক ব্যাপক অঞ্চলকে শস্যহীন করে ফেলেছে। প্রফেসর ফ্রানকেল এদিকে লক্ষ্য রেখেই মন্তব্য বরেছেনঃ “ অনেক উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে যেখানে রেলপথ, রাস্তা, বন্দর, সেচ পরিকল্পনা বেঠিক স্থানে বেঠিকভাবে কার্য্যকর করিবার ফলে সম্পদ সৃষ্টি না করিয়া তাহার বিপরীত ঘটিয়াছে।“ (অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ র্পঃ ১৪)।

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঋণ পন্য সাহায্য পরিকল্পনা সাহায্য প্রভুতি অস্ত্রের সাহায্যে পূর্ব বাংলার সমাজে যেটুকু অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি হচেছ তা আত্মসাৎ করছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশের কৃষির উন্নতি চায় না, শিল্পবিকাশ চায় না। আমাদের দেশের কৃষির উন্নতি হলে আমরা আর আমেরিকা হতে উদ্ধৃত পচা গম, তেল, গুড়া দুধ, খাবার তেল আনব না। আমেরিকার বিরাট বাজার নষ্ট হবে। আমাদের দেশে শিল্প বিকাশ ঘটলে আমেরিকার পুঁজির আর প্রয়োজন পড়বে না। আমেরিকার পুঁজির মুনাফা লুণ্ঠনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকা আমাদের দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ চায় না। প্রতি বছর বন্যা দেখা দেবে ফসল ধ্বংস হবে ও দুর্ভিক্ষ আসবে। আর আমাদের দেশে বেশি বেশি করে মার্কিন গম ও চাল আমদানী করা হবে এইভাবে আমাদের দেশের ওপর আমেরিকার কজ্বা আরও সুদুঢ় হবে।

 অন্যদিকে অসম বাণিজ্যে মাধ্যমে আমেরিকা দেশের সম্পদ ও অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত আত্মসাৎ করছে। আমারা বিদেশে প্রধানতঃ কাঁচামাল, কৃষিজাত পণ্যসামগ্রী রপ্তানী করি এবং বিদেশ হতে যন্ত্রপাতি, শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও শিল্পজাত দ্রব্যদি আমদানি করি। এটা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমাদের আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হল আমেরিকা। আমেরিকা প্রতি বৎসর যন্ত্রপাতি ও শিল্পজাত দ্রব্যাদির মূল্য বৃদ্ধি করছে ও কৃষিজাত পণ্য সামগ্রীর দাম হ্রাস করছে। আমেরিকা আমাদের দেশ এই বিশ্বের অন্যান্য অনুন্নত দেশকে এইভাবে লুণ্ঠন করে চলেছে। এই লুণ্ঠনের চিত্র জাতিসংঘ কর্তৃক পরিবেশিত তথ্য পর্যন্ত লুকাতে পারেছি। ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পরিবেশিত জাতিসংঘের মাসিক বুলেটিন হতে নিম্নোক্ত তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৫৩ সালের মূল্যকে ১০০ হিসাবে ধরেই প্রতি বছরের মূল্যের ওঠানামা বিচার করা হয়েছে।

          সাল    কাঁচামালের মূল্য                          শিল্পজাত পণ্যের মূল্য

          ১৯৫৮               ৯৬                                    ১০৬

         ১৯৫৯       ৯৪                                    ১০৬

         ১৯৬০       ৯৩                                     ১০৯

১৯৫২ সাস হতে শিল্পজাত পণ্যের মূল্যের তুলনায় কাঁচামালের মূল্য একশত ভাগের ১২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। এই ক্ষতিকে বহন করতে হয়েছে আমাদের দেশের মত অনুন্নত দেশসমূহকে। জাতিসংঘের  পরিবেশিত তথ্যাবলীর নিরিখে যদি হিসেব করা যায় তবে প্রতিবছর সাম্যাজ্যবাদী দেশগুলো এবং এর মধ্যে প্রধান হল আমেরিকা, অনুন্নত দেশসমূহ হতে প্রতি বছর ১০০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাং ৫০০ কোটি টাকা লুণ্ঠন করে। সাম্রাজ্যবাদীদের বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তের ফলে আমাদের দেশেও পাট পানির দামে বিক্রি হচ্ছে। পাটের মূল্য হ্রাস পূর্ববাংলার  সমগ্র অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিচ্ছে। এইভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা অসম বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টির পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

সামন্তবাদী ও মুৎসুদ্দি-আমলা পুঁজিঃ-

          মার্কিন সাম্যাজ্যবাদীদের দেশীয় সহযোগী হল সামন্তবাদী জোতদার মহাজন এবং মুৎসুদ্দি আমলা শ্রেণী। আমাদের দেশে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে যে ব্যবসায়ী পুঁজির জন্ম ঘটেছিল সেই ব্যাবসায়ী পুঁজিকেই মুৎসুদ্দি পুঁজি বলা হয়। কনট্রাকটর, মালের যোগানদার ও ব্যবসায়ী হিসেবে এই মুৎমুদ্দি শ্রেণী পুঁজি সঞ্চয় করে। কনট্রাকটর, মালের যোগানদার ও ব্যবসায়ী হিসেবে এই মুৎমুদ্দি শ্রেণী নির্ভর করত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপর। সাম্রাজ্যবাদের সহিত সহযোগিতা করেই এরা আমাদের দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের শত্রুতা করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগষ্টের পর সাম্রাজ্যবাদের সহিত সহযোগিতায় নিজেদের শ্রেণীস্বার্থে এরা আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে আমাদের দেশের অর্থনীতেতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। এইভাবে মুৎসুদ্দি পুঁজি মুৎসুদ্দি-আমলা পুঁজিতে পরিণত হয়।

          পাকিস্তানের বাইশ বছরের ইতিহাস হল সাম্রাজ্যবাদ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগী এই মুৎসুদ্দি আমলা পুঁজির লুণ্ঠনের ইতিহাস। আমাদের দেশে অন্তত সীমাবদ্ধ আকারে যে শিল্পবিকাশ ঘটেছে সে সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সার্ভেতে মন্তব্য করা হয়েছেঃ “ অবস্থার চাপে পড়িয়া ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক অংশের তুলনায় সাধারণ মালিকানা ভিত্তিক  অংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং কিছু কিছু সামাজিক ব্যবস্থা সহ সাধারণ মালিকানা ভিত্তিক অংশ যোগাযোগ, শক্তি, সেচ, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিমানবন্দর এবং বন্দরসমূহকে তদারক করে। শিল্পক্ষেত্রে উন্নয়ন সংস্থাসমূহ রহিয়াছে। ইহাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র সুনিদিষ্ট শিল্পসমূহ পরিচালনা করে যেমন পাট, কাগজ, ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং, জাহাজ, ভারী রাসায়নিক, সার,চিনি, সিমেন্ট ,কাপড়, ঔষধ ও প্রাকৃতিক গ্রাস। অবশ্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার বদলে নয় ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক শিল্প প্রচেষ্টাকে সাহায্য করিবার এবং এই প্রচেষ্টার পরিপূরক হিসাবে এই উন্নয়ন সংস্থাসমূহকে গড়িয়া তোলা হয়। রাষ্ট্র কর্তৃক কোন কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার পর ইহাদিগকে ব্যক্তিগত মালিকানার হাতে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে।”

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক পরিক্রমার বক্তব্য সম্পর্কে মনতব্য করা নি¯প্রয়োজন। বিদেশী বিশেষ ভাবে মার্কিন পুঁজির তত্ত্বাবধানে বাইশ বছর ধরে এদেশের মুৎসুদ্দী আমলা পুঁজি চালিয়ে যাচ্ছে উলঙ্গ শোষণ। লন্ডনের ফিনান্সিয়াল টাইমস পর্যন্ত মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছেঃ “ একদিকে কুখ্যাত বাইশটি পরিবারের হাতে জমা হইয়াছে অফুরন্ত অর্থ ও সম্পদ; আর অন্যদিকে বিরাজ করিতেছে শহরের শ্রমিক ও গ্রামের কৃষকদের ভিতর সীমাহীন দারিদ্র।”

“অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, একজন করাচীর ব্যবসায়ী আগামী দুই বছরের ভিতর একটি মার্কিন কোম্পপানীর সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ২৫ কোটি টাকা লগ্নী করিবেন। ইহার মধ্যে থাকিবে দুইট তৈল শোধনাগার, একটি সারকারখানা, কাগজ ও পাটকল এবং তেল উত্তোলন।” (ইকনমিক টাইমস – ১৯৬৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী।)

১৯৬৯ সালের ২৮  ফেব্র“য়ারী তারিখের দি ষ্টেসম্যান কাগজে মন্তব্য করা হয় মাত্র ২২টি পরিবার পাকিস্তানের সমগ্র শিল্পের তিন ভাগের দুইভাগ এবং ব্যাংকসমূহের পাঁচ ভাগের চার ভাগের মালিক।” সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী এই বিশটি পরিবার সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে বেপরোয়া শোষণের রাজম্ব।

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের আর এক সহযোগী হল সামন্তমক্তি। গুনার মীরডাল তার এশিয়ান ড্রামাতে বলেছেনঃ “ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পপর যে নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা আসিল তাহাদের শ্রেণী ভিত্তিই তাহাদের রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী।” পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে সমগ্র আবাদী জমির একশত ভাগের ৬০ ভাগের মালিক ছিল বড় বড় জমিদারেরা। সিন্দু ইহল শোষণমূলক সামন্তশক্তির দুর্গ। সমগ্র আবাদী জমির মালিক ছিল কয়েকশত জমিদার। আইয়ুব আমলে ভূমি সংস্কার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মীরডাল আরও বলেন বস্তুত ভূমি সংস্কারের আসল উদ্দেশ্য হইল বংশানুক্রমিক জমিদারদের শক্তিকে সুসংহত করা। পূর্ববাংলার সমগ্র আবাদী জমির বিরাট অংশের মালিক জোতদার মহাজন। ১৯৬৩-৬৪ সালের মাস্টার সার্ভে হতে জানা যায় যে, বর্গা চাষে নিয়োজিত কৃষি খামারের সংখ্যা হল ২৩ লক্ষ ১০ হাজার। এ সংখ্যা মোট কৃষি খামারের একশত ভাগের ৩৭ ভাগ। অর্থাং কৃষক জনতার অন্তত একশত ভাগের ৩৭ ভাগ হল বর্গাচাষী। এ ভাবে পূর্ববাংলার গ্রামাঞ্চলে সুবিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলেছে জোতদারী শোষণ।

 জোতদারী শোষণ আর মহাজনী শোষণ এরা হল দুই যমজ ভাই। এরা একে অপরকে শক্তিশালী ও সাহায্য করে। জোতদারী শোষণে উৎপীড়িত হয়ে দুটি অন্নের জন্য কৃষক মহাজনের দুয়ারে ধর্ণা দেয়। আর মহাজন সুদের জালে জড়িয়ে ফেলে কৃষকের জমি হস্তগত করে। ১৯৬০ সালের সরকারী রিপোর্ট অনুযায়ী ৬০ লক্ষ ১৪ হাজার কৃষক পরিবারের মধ্যে ৩০ লক্ষ ১ হাজার পরিবারের মাথায় ঋণের বোঝা রয়েছে। অর্থাং একশতটি কৃষক পরিবারের মধ্যে ৪৯ টি কৃষক পরিবার ঋণে আবদ্ধ। অবস্থা আর খারপ। গ্রামাঞ্চালে বিভিন্ন ধরণের ঋণ প্রচলন  রয়েছে। টাকার ঋণের সাথে সাথে শস্য ঋণেরও প্রচলন রয়েছে। শস্যঋণ হিসেবে ধান কড়ারী ব্যবস্থা ব্রাপক আকার ধারন করেছে। একমণ কর্জ নিলে কৃষককে পাঁচ মণ পর্যন্ত ধান দিতে হয়।

          সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দী আমলাপুঁজি এ শক্তি আমাদের দেশে গড়ে তুলেছে শাসন ও শোষেণের এক ইমারত। আর এ শোষণের এই ইমারতকে রক্ষা করবার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে পাহারাদার। এই পাহারাদার হল আমাদের সরকার। গত বাইশ বছর ধরে আমাদের দেশে যতগুলো সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমন্ত সরকারই শাসন ও শোষণের এই ইমারতকে রক্ষা করে চলেছে। সরকারের সমন্ত কাযকলাপ এই তিন শক্তির স্বার্থের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে। নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের হোতা হল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। সরকার অনুসৃত বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে আমাদের দেশের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের শৃঙ্খল সুদুঢ় হয়েছে। পাকমার্কিন সামরিক চুক্তি, পাক-মার্কিন পণ্য চুক্তি, পাক-মার্কিন সাংস্কৃতিক চুক্তি, পাক-মার্কিন বাণিজ্যিক চুক্তি, পাক-মার্কিন নৌ-চলাচল চুক্তি , পাক-মার্কিন লেন-দেন চুক্তি, অর্থনৈতিক চুক্তি, পাক-মার্কিন ছাত্র ও শিক্ষক বিনিময় চুক্তি প্রভূতি হল এরই প্রকাশ।

          অন্যদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশের ওপর তাদের নয়া-উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কজ্বা শক্ত করবার জন্য নির্ভর করছে সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজির  ওপর। সরকারের অনুসৃত নীতি সমূহ প্রতিক্ষেত্রে এই দুই শক্তির স্বার্থকেই সুসংহত করছে। ট্যাকস হলিডে অর্থাং কর মওকুফ, বেপরোয়া মুনাফা অর্জনের জন্য সংরক্ষিত ও প্রয়োজনীয় বাজার সৃষ্টি ,সরকার তত্ত্বাবধানে কল কারখানা নির্মানের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ও অন্যান্য জিনিসের ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ হতে এভাবে আমলা পুঁজিকে সাহায্য করা হচ্ছে, বোনাস ভাইচার পদ্ধতি অনুযায়ী আমাদের দেশের পুঁজিপতি বিদেশে আমাদের দেশের তৈরি পণ্য রপ্তানী করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে সেই মুদ্রা দ্বারা বিদেশ হতে পণ্য আমদানী করে অতিরিক্ত মূল্যে সেই সমস্ত পণ্যসামগ্রী দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে সক্ষম হয়। রপ্তানী বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্যই নাকি সরকার এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু আসল ঘটনা অন্যরূপ। সরকার বিদেশে রপ্তানীকারকদের রপ্তানীকৃত পন্যসামগ্রীর গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে। এর বদলে রপ্তানীকারকগণ সুবিধাজনক শর্তে বিদেশে মাল রপ্তানী করতে পারে। অন্যদিকে আমদানীকৃত মাল উচ্চহারে বিক্রির মধ্য দিয়ে বিরাট মুনাফা অর্জনের সুযোগও তাদের ঘটে। রপ্তানী বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য বোনাস ভাউচারের ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে  আমলা পুঁজির কল্যাণে।

সরকারের অনুসুত নীতিসমূহ সামন্তবাদী শক্তিসমূহের কজ্বাকেও সদূঢ় করে চলেছে। ১৯৫৯ সালের জমিদারী উচ্ছেদ আইন অনুযায়ী জমিদারী প্রথা ও মধ্যসত্বা বিলোপের নামে সামন্তবাদী শক্তিসমূহকে অব্যাহত রাখা  হয়েছে এবং শক্তিশালী করা হয়েছে। ১৯৫১ সালের ইই অনুযায়ী সামন্তবাদী জোতদারী ও মহাজনী পথাকে স্বীকার করা হয়এবং খাজনার শোষণের মাত্র আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয় । ২৯ টি জেলা নিয়ে গঠিত হয় অবিভক্ত বাংলাদেশ।সে সময় খাজনার পরিমাণ ছিল ৩ কোটি টাকা। ১৭ জেলা নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববাংলা, কিন্তু খাজনার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৬ কোটি টাকাতে। ১৯৫১ সালের আইনে জমির সিলিং বেঁধে দেওয়া হয় ১০০ বিঘাতে। আইয়ুব আমলে এই সিলিং ৩৭৫ বিঘা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় । আজও সে অবস্থা বিদ্যামান।

          আমাদের দেশের সমগ্র কৃষক জনতার একশত জনের প্রায় ৭০ জন হল ভূমিহীন ও গরীব কৃষক। সরকারী ১৯৬০ সালের কৃষি  সেন্সাসের রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায় যে, একশত জন কৃষকের মধ্যে ৩৬ জন কৃষকের গরু ও লাঙ্গর নেই । গরু-লাঙ্গল বিহীন এই ৩৬ জন কৃষক সাধারণভাবে ভূমিহীন কৃষক। এক বিঘা হতে তিন বিঘা-চার বিঘা জমির মালিকের সংখ্যা হল একশত জনের প্রায় ৩৭ জন। জোতদার-মহাজন ধনী কৃষক হল অবশিষ্ট একশত জনের প্রায় ১০জন। জোতদার-মহাজন পুরাপুরি সামন্তবাদী শক্তি। আমাদের দেশের ধনী কৃষকের সামন্তবাদী বৈশিস্ট্য হল প্রধান। ধনী কৃষক জমি বর্গা দেয় সুদে টাকা খাটায় ও ধান দাদন দেয়। এ সমস্ত হল সামন্তবাদী শোষণের প্রকাশ। আবার ধনী কৃষক অসম বাণিজ্যের ফলে সাম্রাজ্যবাদী বাজারের শোষণে শোষিত। সে তার পাটের, আখের তামাকের, হলুদের ন্যায্য দাম পায় না। অন্যদিকে তাকে উচ্চ মূল্যে কল-কারখানাজাত দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করতে হয়। এ দিক দিয়ে তারা আবার শোষিত। সরকার অনূসৃত কৃষিনীতি জোতদার-মহাজন ও ধনী কৃষকের হস্তকেই শক্তিশালী করছে। জমির গ্যারান্টির বিপরীতে সরকারী কৃষি ব্যাংকের ঋণ দেয়া হয়। ভূমিহীন ও গরীব কৃষকের হাতে যেহেতু জমি নেই অথবা গ্যারান্টি দেবার মত সে পরিমাণ জমিএনই সে জন্য তারা সরকারী ঋণের সুবিধা ভোগ করতে পারে না। সরকারী কৃষি ব্যাংকের ঋণ ভোগ করে জোতদার-মহাজন ও ধনী-কৃষক। তারা সে টাকা আবার বেশিসুদে লগ্নী করে। সরকারী গভীর নলকূপ ব্যবস্থা, উন্নত ধরনের সার ও বীজ পরিকল্পনা, ইরি ও বোরো পরিকল্পনাসমূহও জোতদার-মহাজন ও ধনী-কৃষকের হস্তকে শক্তিশালী করে। কেননা ভূমিহীন কৃষকের একেবারে জমিই নেই, আর গরীব কৃষকের জমির পরিমাণও অতি সামান্য। যাদের জমি নেই তারা উন্নত ধরণের সার ও বীজ ব্যবহার করবে কোথায়? যাদের জমি নেই অথবা সামান্য জমি আছে তারা বোরে পরিকল্পনা,ইরি পরিকল্পনা ও গভীর নলক’প ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করবে কেমন করে? এভাবে সরকারী ব্যবস্থাবলী গ্রাম্যঞ্চলে সামন্তবাদী শক্তিসমূহকে দিনের পর দিন শক্তিশালী করে চলেছে। গ্রামাঞ্চলে গত বাইশ বৎসর ধরে ক্রমাগত সামন্তবাদী শোষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। সামন্তবাদী শোষণের দোজখের আগুনের সমন্ত গ্রামাঞ্চল আজ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। অনাহার জর্জরিত কৃষকের বুক ফাটা কান্না আজ গ্রামাঞ্চলের আকাশ বাতাসকে মথিত করে তুলেছে। অন্ন বস্ত্র নেই, বাড়ি নেই –পূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল আজ শ্মশানে পরিণত হয়েছে। গোয়াল ভরা গরু, আর গোলা ভরা ধান গ্রামবাংলা সম্পর্কে যে প্রবাদের প্রচলন একদিন ছিল আজ তা কৌতুকের বিষয়বস্তুতে পরিনত হয়েছে। সীমাহীন লুণ্ঠন ও বেপরোয়া অত্যাচার ধ্বংসের বিভীষিকা আর মৃত্যুর তান্ডবের দৃশ্য যদি কোথাও বিরাজ করে থাকে তবে তা বিরাজ করছে পূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে।

          এ ভাবে সাম্রাজ্যবাদের দুই দেশীয় সহযোগী সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দী আমলা পুঁজি আমাদের সমাজে যেটুকু অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি করে তা আত্মসাৎ করে। আমাদের দেশের অতীত ও বর্তমান সুস্পভাবে এ ঘোষণাই করছে যে, আমাদের দেশের জনগণের উপর সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দি আমলা পুঁজি এ তিন শোষণের যে পাহাড় চেপে বসেছে সেই তিন শোষণেই আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, বণ্যা কৃষির অধঃপতন এবং জাতীয় জীবনের সমস্ত রকমের দুঃখ দারিদ্র বেকারী, অনাহার ও ক্ষুধার জন্য দায়ী। আমাদের দেশের উপর আজ যে নয়া-উপনিবেশবাদী শোষণ চেপে রয়েছে তার হোতা হল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ। আজ বিশ্বের অন্যান্য সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভিতর প্রধান হল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ। এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশে মূল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু সাহায্য, ঋণ মারফত আমাদের দেশে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং এটা বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

          ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পূর্ব-বাংলার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। রাজনীতিগত দিক দিয়ে বিচার করলে পূর্ব বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান অতি গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সুনিশ্চিত পরাজয় পূর্ব-বাংলার এই গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে। পূর্ববাংলা হতে গণচীনের অবস্থান বেশি দুরে নয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য হল গণচীনের বিরুদ্ধে জোট গড়ে তোলা। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যও একই। এদের দুইজনের দৃস্টিই পূর্ব-বাংলার প্রতি নিবন্ধ। এ দিকে লক্ষ্য রেখেই বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে, বিশ্বের বিপ্লবী জনতার বিরুদ্ধে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ওসোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ হাত মিলাচ্ছে। অবশ্য নয়া উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ চালিয়ে যাবার ক্ষেত্রে এদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ এবং দ্বন্দ বিরাজ করছে। আমাদের দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলনও ঘটছে। সাম্প্রতিকালে আমাদের দেশে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীরাও ঋণের সুদ, বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ব্যবস্থাদি বাবদ খরচ,সাহায্য ইত্যাদি মারফত আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ করছে।

শোষণের তিন পাহাড়

          কেবলমাত্র শোষণের এই তিন পাহাড়কে ধ্বংস করেই আমরা ক্ষুধার হাত হতে মুক্তি পেতে পারি। অনাহার ও ক্ষুধার জন্য দায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, দায়ী হল এই তিন পাহাড়। আমাদের দেশের বন্যা ও দুর্যোগের জন্য প্রকৃতি দায়ী হল এই তিন পাহাড়। এই তিন পাহাড়ই আমাদের দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাকে কার্যকরী হতে দেয় না। আধুনিক বিজ্ঞানকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে দেয় না। জনগণের এই তিন শত্রু আমাদের দেশের মানুষ যে সম্পদ সৃষ্টি করে তার সবটুকুই লুণ্ঠন করে নেয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনাকে কার্যকরী করবার অথবা আধুনিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগাবার জন্য কোনরূপ সম্পদই আর অবশিষ্ট থাকে না।

আমাদের দেশের জনতার জানী দুষমন এই তিন শক্তির শাসন ও শোষণকে আড়াল করবার জন্য এই তিন শক্তি এবং তাদের তল্পী বাহক ও আদর্শ প্রচারকেরা জনসংখ্যা ও আল্লার  গজবের তত্ত্ব জোর গলায় প্রচার করে বেড়ায়। আমাদের দেশের সরলমতি কিছু কিছু ব্যাক্তি তাদের এই বক্তব্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনও করে।

          সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দুই দেশীয় সহযোগী সামন্তবাদ এবং আমলা-পুঁজি আমাদের দেশের উপর নিজেদের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখার জন্যই আমাদের দেশের যা কিছু পচা ও গলিত, প্রতিক্রিয়াশীল ও জনস্বার্থ বিরোধী সেই সমস্ত ধ্যান-ধারণা ও আদর্শকে শক্তিশালী করে চলেছে। জনসাধারণ যাতে নিজেদের শক্তি  সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে না পারে এবং শত্রুদের চিনতে না পারে সেজন্য তারা প্রচার করে বেড়ায় যে, সব কিছু হল নসিবের দোষ। জনতার ভিতর নিহিত রয়েছে যে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস সেই শক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করবার জন্যই তারা অদৃষ্টবাদের তত্ত্বকে তুলে ধরে। আমাদের দেশের সরলপ্রাণ শ্রমিক, কৃষক বিশেষ করে কৃষক জনতাকে মোহাচ্চন্ন করে রাখার জন্য তারা ধর্মকেও ব্যবহার করে। ক্ষুধার হাত হতে মুক্তির লড়াই, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-পুঁজির শাসন ও শোষণের হাত হতে মুক্তির সংগ্রামকে তারা ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বলে প্রচার করে বেড়ায়। এ ভাবে জনগণের এই তিন জানী দুষমন ধর্মকে নিজেদের সংকীর্ণ শ্রেণীস্বার্থ রক্ষা করবার কাজে ব্যবহার করে। সাম্রাজ্যবাদী ডালেস সাহেব খুব খোলাখুলি ভাবেই নিজেদের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। তিনি তার শান্তি অথবা যুদ্ধ নামক পুস্তকে ঘোষণা করেছেন “ প্রাচ্যে ধর্মের শিকড় সমাজের অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করেছে। এ ভাবে প্রাচ্যের সাথে আমাদের যোগসূত্র  স্থাপিত হয়েছে এবং আমাদের কর্তব্য হল ইহাকে আবিষ্কার করা এবং এটার বিকাশ সাধন করা।” ডালাসের বক্তব্য সুস্পষ্ট। ডালেসের মত হচ্ছে অর্থাং আমাদের ন্যায় দেশে আমেরিকান নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ টিকিয়ে রাখবার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করতে হবে। ডালেসের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই জামাতের কার্যকলাপ বিচার করতে হবে। জামাত এবং অন্যান্যরা ধর্মের নামে আমাদের দেশে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ,সামন্তবাদ ও আমলা-পুঁজির শাসন ও শোষণকে অক্ষুন্ন রাখবার জন্য কাজ করে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এই সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলকে আশ্রয় দিচ্ছে, গড়ে তুলছে এবং সাহায্য করছে। এই ভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ডালেসের উপদেশ অনুযায়ী  বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিদক দলের মাধ্যমে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের অনুকুলে আমাদের দেশে ধর্মকে কি ভাবে ব্যবহার করা যায় তার পদ্ধতি আবিষ্কার করছে ও উহার বিকাশ সাধন করছে।

তিন পাহাড়কে উচ্ছেদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রামঃ-

          আমাদের দেশের জনতা প্রতিদিনকার অভিজ্ঞাতা হতে আজ এই শিক্ষাই লাভ করেছে যে, ক্ষুধা হতে মুক্তির একমাত্র পথ হল আমাদের দেশের মাটি হতে সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও আমলা পুঁজি এই তিন পাহাড়ের উচ্ছেদ সাধন। এই তিন পাহাড় আমাদের দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যব্ত্তি জনগণের কাঁধে যে শোষণভার চাপিয়ে দিয়েছে অনাহার ও মৃত্যু, ক্ষুধা ও বেকারত্ব, বন্যা ও দারিদ্রের জন্য তাঁরাই দায়ী। এই তিন পাহাড়কে উচ্ছেদের সংগ্রামই হল ক্ষুধার হাত হতে মুক্তির সংগ্রাম। এটা হল এক বিপ্লবী সংগ্রাম। জনতার তিন শত্র“ সর্বশক্তি দিয়ে জনতার এই সংগ্রামকে বাধা দিচ্ছে জনতার বিরুদ্ধে তারা প্রয়োগ করছে প্রতিবিপ্লবী শক্তি। জনতা তার বিপ্লবী শক্তি দ্বারাই এই প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে ধ্বংস করতে পারেন। ক্ষুধার হাত হতে মুক্তির সংগ্রাম হল প্রতিবিপ্লবী শক্তির বিরুদ্ধে জনতার বিপ্লবী শক্তির সংগ্রাম। এই বিপ্লবের রূপ হল কৃষিবিপ্লব। কারণ আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতি হল মূলতঃ সামন্তবাদী অর্থনীতি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মুলতঃ এই সামন্তবাদী অর্থনীতির উপর নির্ভর করেই আমাদের দেশে গড়ে তুলছে নয়াউপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ। এই সামন্তবাদ প্রধান অর্থনীতিই জাতীয় বিকাশের অগ্রগতির পথে অন্তরায়  হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই অর্থনীতি  শিল্প বিকাশকে প্রতিপদে ব্যাহত করছে। সামন্তবাদী ধান, ধারণা, সংস্কৃতি  ভাবাদর্শ সমগ্র সমাজ জীবনে আধুনিক বিজ্ঞান ভিত্তিক ধ্যান ধারণা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক শিক্ষা  সংস্কৃতি ও চেতনাবোধের বিকাশের ও অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে সাম্রাজ্যবাদী পরোক্ষ নয়া উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণকালে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আমাদের মত আধা উপ-নিবেশিক-আধা-সামন্তবাদী দেশের নিপীড়িত জাতির দ্বন্দ্ব মূলতঃ সামন্তবাদের সহিত কৃষকের দ্বন্দ্বের রূপান্তিরিত হয়ে উঠে সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রামের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় ব্যাপক গ্রামাঞ্চল। এই সংগ্রামের প্রকাশ ঘটে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষক জনতার বিপ্লবী সংগ্রামে। এই কৃষি বিপ্লবই হল আমাদের মত আধা ঔপনিবেশিক-আধা সামন্তবাদী দেশের বিপ্লবের মৌলিক বৈশিষ্ট্র। কৃষিবিপ্লবের সাফল্যের মধ্যে দিয়েই আমাদের দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যব্ত্তি সমগ্র জনতা সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাপুঁজি এই তিন শোষণ ও শাসনের পাহাড় হতে মুক্ত হবে। এই মুক্তি সংগ্রামে আমাদের দেশের শ্রমিক ও কৃষকরাই কেবলমাত্র আগ্রহী নয়, আগ্রহী হল আপামর জনসাধারন। কৃষি বিপ্লব শাসন ও শোষণের তিন পাহাড়কে উৎখাত করে সমগ্র দেশে এক অনুক’ল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এই অনুকুল পরিবেশের উপর নির্ভর করে বিকাশ লাভ করবার সুযোগ পাবে জনগণতান্ত্রিক অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতি। কৃষি বিপ্লব একমাত্র আঘাত হানবে জনগণের জানী দুষমন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাপুঁজির উপর। কৃষি বিপ্লব সমাজের অন্যান্য সমস্ত শ্রেণীর স্বার্থকে রক্ষ করবে।

মুক্তির পথঃ-

          কৃষি বিপ্লবের মূল কাজ হবেঃ আমাদের দেশের ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন- দেশের বুক হতে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও আমলা পুঁজির শোষন সম্পূর্ণ উচ্ছেদ সাদন, জাতিগত নিপীড়নের পরিপূর্ণ অবসান এবং শোষন ও নিপীড়নের স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করে ওনিপীড়নমূলক অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করে তার স্থানে জনগণের কৃষক, মজুর,মধ্যব্ত্তি সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষাকারী জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাকরণ।

সামন্তবাদী শোষণের পরিপূর্ণ উচেছদ সাধন করতে হবে। জোতদারী মহাজনী প্রথার বিলোপ সাধন করে বিনামূল্যে জোতদার মহাজনদের জমি ভুমিহীন ও গরীব কৃষকদের ভিতর বিলি করতে হবে। সামন্তবাদী শোষণের পরিপূর্ণ বিলোপ সাধনের ফলে কৃষক হবে জমির মালিক। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত সামন্তবাদী শোষণের অবসানের ফলে কৃষক যে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি করে তা আর সামন্তবাদী জোতদার মহাজনদের পকেটে যাবে না।তা  জাতীয় উন্নয়নের জন্য ব্যায়িত হবে। জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য যে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত তাকে আর সামন্তবাদীরা আত্মসাৎ করতে পারবে না। এটা কৃষি উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হবে।

          অন্যদিকে কৃষক জনতার সৃজনশীল কর্মক্ষমতার উৎস খুলে যাবে। কৃষক হবে নিজের উৎপাদনের মালিক। কোনরূপ সামন্তবাদী শক্তিই আর তার উৎপাদনের মালিকান দাবী করতে পারবে না। ফলে উৎপাদন এক লাফে অনেক দুর এগিয়ে যাবে। কৃষক জনতা নতুন শক্তি ও বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে উঠবে। কৃষি অর্থনীতির তথ্য জাতীয় অর্থনীতির সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা এক ধাপ এগিয়ে যাব। সামন্তবাদী পাহাড় অপসারিত করবার মধ্য দিয়ে কৃষক জনতা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে এবং সৃজনশীল কর্মক্ষমতায় জোয়ার দেখা দেবে। সামন্তবাদী শোষণের অবসান এবং জমি বিলি করবার পর আমাদের দেশে পধানতঃ স্বল্প পরিমাণ জমির মালিক ক্ষুদে কৃষকের দেশে পরিণত হবে। আমাদের দেশের আবাদী জমির পরিমাণ হল প্রায় দুই কোটি বিশ লক্ষ একর। কৃষক পরিবারের সংখ্যা হল ৬০ লক্ষ ১৪ হাজার। এই মোট কৃষক পরিবারের একশত ভাগের ৭০ ভাগ হল গরীব ও ভুমিহীন কৃষক। সামন্তবাদী জোতদার-মহাজনরা সমগ্র আবাদী জমির এক শত ভাগের ৬০ বাগেরও বেশি জমির মালিক। জোতদার মহাজনের জমি ভুমিহীন ও গরীব কৃষকের মধ্যে বিলি করবার পর তারা প্রত্যেকে বিরাট পরিমাণ জমির মালিক হবে,না মালিক হবে খুবই অল্প জমির। কোন কোন ক্ষেত্রে একজন ভূমিহীন ও গরীব কৃষক মাত্র দুই তিন কাঠা জমির মালিক হবে। কোন কোন বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞ এই ঘটনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করি আমুল ভূমি সংস্কারের নীতির ব্যর্থতা সম্পর্কে গুরুগশ্ভীর আলোচনার সূত্রপাত করেন। কিন্তু যেহেতু তারা একটি বিশেষ শ্রেণীর দৃস্টিকোণ হতে আমুল ভূমি সংস্কারের নীতিকে বিচার করেন, সেহেতু তারা আমুল ভূমি সংস্কারের নীতির বৈপ্লবিক তাৎপর্যকে উপলব্দি করতে ব্যর্থ হন। ভূমিহীন ও গরবৈ কৃষকের অন্তরে সদ্য জ্বলতে থাকে একটা ক্ষুধার আগুন সে ক্ষুধা হল জমির ক্ষুধা। আমলি কৃষি সংস্কার ভূমিহীন  ও গরীব কৃষকের চিরকালের এ জমির ক্ষধাকে মেটাবে। ভূমিহীন ও গরীব কৃষক কি পরিমাণ জমি পেল এটা বড় প্রশ্ন নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল ভূমিহীন ও গরীব কৃষক জমি পেল এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হল সামন্তবাদী শোষন। এটার ফলে ভূমিহনি ও গরীব কৃষকের জবিনে দেখা দেবে বৈপ্লবিক রূপান্তর। নতুন আত্মবিশ্বাসে তারা বলীয়ান হয়ে উঠবে। জীবনকে তারা নতুন দৃষ্টিতে দেখবে। তারা এটা উপলব্ধি করবে যে, সমস্ত দেশ জুড়ে চলেছে যে বৈপ্লবিক রূপান্তরের সংগ্রাম সেই সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নায়ক হল তারাই। এ উপলদ্ধির মূল্য বিরাট।

          এ উপলব্ধিকে সামনে রেখেই পরবর্তী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে।আমরা আগেই বলেছি যে আমুল কৃষি সংস্কারের ফলে আমাদের দেশ ক্ষুদে কৃষকের দেশে পরিণত হবে। স্বল্প জমির মালিকদের পক্ষে জমির উন্নতি বিধান করা, চাষের ব্যাপারে উন্নত ধরনের সার ও বীজ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্য গ্রহণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে লক্ষ্য রেখেই লেনিন বলেছেন যে, ছোট ছোট কৃষি খামার হল দারিদ্রের আবাসস্থল। কৃষকের হাতে জমি এই নীতি কার্যকরী করবার পর সমগ্র দেশে ব্যাক্তিগত মালিকান ভিত্তিক ছোট ছোট কৃষি খামার গড়ে উঠবে। কিন্তু এ ব্যবস্থা দারিদ্র ও কৃষি অর্থনীতির পশ্চাদপদতা দুর করতে সক্ষম হবে না। কৃষকের হাতে জমি বিলির সাথে সাথে কৃষক জনতার সামনে এ বাস্তব সত্যকে তুলে ধরতে হবে। অভিজ্ঞতা উপলব্ধির ভিত্তিতে কৃষক জনতাকে যৌথ কৃষিখামার গড়ে তুলবার পথে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে।কৃসক জনতাকে যৌথ কৃষি খামার গড়ে তুলবার পথে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে। ব্যক্তিগত মালিকানার স্থানে জন্ম নেবে যৌথ মারিকান। যৌথ-মালিকানা ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা আধুনিক বিজ্ঞান, উন্নত ধরনের সার বীজ ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদিকে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। এটার ফলে অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থা উন্নত ধরনের কৃষি ব্যবস্থায় উন্নীত হবে। কৃষি অর্থনীতির অনগ্রসরতা ও পশ্চাদপদতা দূর হবে। এভাবে সমাজে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের সৃষ্টি হবে। এ অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তকে কৃষি অর্থনীতিসহ সমগ্র জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যাবে।

          যৌথ মালিকানা ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা কৃষি অর্থনীতির অনেকগুলি সমস্য সমাধান করতে সক্ষম হলেও আরও অনেকগুলি সমস্য সমাধানের অপেক্ষায় থাকবে। আমাদের দেশ নদী-নালার দেশ। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, খাল-বিলের সংস্কার, বাঁধ ও সেচব্যবস্থার গুরুত্ব হল অপরিসীম। যৌ কৃষি ব্রবস্থাা এ সমস্ত সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান উপস্থিত করতে সক্ষম নয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, খালবিলের সংস্কার বৃহৎ সেচ ব্যবস্থা, পারিন সংরক্ষন প্রভূতি বৃহদাকারের পরিকল্পনাসমূহকে কার্যকরী করবার জন্য অধিক শ্রমশক্তি , সামগ্রিক পরিকল্পনা ও অর্থের প্রয়োজন। অধিকন্তু কৃষি অর্থনীতির মূল কথা গ্রামের সমস্ত শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো। যৌথ-কৃষি খামার ভিত্তিক ব্যবস্থা এ সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান উপস্তিত করতে পারে না। বর্তমান অবস্থায় প্রতিদিন আট ঘন্টা কাজে এ নিরিখে বিচার আমাদের দেশের কৃষক ৩৬৫ দিনের ভেতর ২৩০ দিন কাজ করে। ফেলিকস গ্রীন-কার্টেন অব ইগনোরেন্স ১৩৫ দিনের শ্রমশক্তি নষ্ট হয়। এ বিরাট পরিমাণ শ্রমশক্তির অপচয় কৃষি অর্থনীতি সহ জাতীয় অর্থনীতির সংকটকে চিরস্থায়ী করে তুলেছে। যৌথ কৃষি ব্রবস্তা এ সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা অগ্রগতি সাধন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু যৌথ কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। যৌথ কৃষি ব্যবস্থাকে আরো সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ রূপ দেবার মাধ্যমে এ সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান পাওয়া যায়। আমাদের মত ঘনবসতি সম্পন্ন আধা ঔপডনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশে এ পদ্ধতির মাধ্যমে সম্যার পরিপূর্ণ সমাধানের পথে অগ্রসর হবে হবে। কৃষকের হাতে যখন মাঠে কাজ থাকবে না তখন সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ যৌথ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের বিরাট শ্রমশক্তিকে বড় বড় বাঁধ নির্মাণ, সেচ পরিকল্পনা, পানি সংরক্ষন প্রভূতি বৃহৎ আকারের কাজে নিয়োগ করা সম্ভব হবে। এ ভাবে গ্রামাঞ্চলের সমগ্র শ্রমশক্তিকে সম্পদ সৃষ্টির কাজে নিয়োগ করা যাবে। সমাজে আরও বেশি বেশি করে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের সৃষ্টি হবে। এ অর্থনীতির বিকাশ হবে ত্বরান্বিত।

এ কথা সত্য যে, পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক যৌ-ব্যবস্থা যৌথ-মালিকানাকে নস্যাৎ করে নয় যৌথ-মারিকানাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে। কিন্তু যৌথ ব্যবস্থার অগ্রগতির পথে ক্রমান্বয়ে কৃষিতে সামাজেক মালিকানাবোধের কার্যকারিতাকেও তুলে ধরতে সক্ষম হবে। আমাদের মত আধা-সামন্তবাদী দেশে কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভর করেই সমগ্র জাতীয় অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। কৃষকের হাতে জমি সামন্তবাদী শোষণের অবসানের মধ্য দিয়ে যৌথ-কৃষি ব্যবস্থার পথ অনুসরণ করে আমরা আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতির চিরকালের বন্ধ্যাত্বকে দুর করতে সক্ষম হব। আমরা সক্ষম হব প্রকৃতির ধ্বংসকারী শক্তিসমূহ বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর বিজয় অর্জন করতে।

          সামন্তবাদী শোষন হতে কৃষি অর্থনীতির মুক্তির সাথে সাথে দেশের অর্থনীতিকে সাম্রাজ্যবাদী ও আমলা পুঁজির হাত হতে মুক্ত করতে হবে। সমস্ত রকমের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি ও ঋণ এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণরুপে বনধ করতে হবে। পূর্ব বাংরার সমস্ত বড় বড় শিল্প, ব্যাংক, বীমা, আমদানী-রপ্তানী বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, পানি, ডাক,তার পরিবহন এবং পাট ও খাদ্য ব্যবসাকে সামাজেক সম্পত্তিতে পরিণত করতে হবে। এই সমস্তের মালিক হবে সমগ্র সমাজ। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদীরা এবং আমলা পুঁজি আর অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত আত্মসাৎ করতে পারবে না। সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট সমগ্র অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের কাজে ব্যবহৃত হবে। মাঝারী ধনিকদের বিকাশের সুযোগ করে দেয়া হবে। কিন্তু সাথে সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে তারা শ্রমিক, কৃষকের জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট কর্তৃক অনুসৃত নীতিসমূহে এবং জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোন কিছু না করেন। তারা যাতে অবাধ লুণ্ঠনের ব্যবস্থা না করতে পারেন সেজন্য তাদের মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অভিজ্ঞাতা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে শিল্প ক্ষেত্রে অবশিষ্ট ব্যাক্তিগত মালিকানার বিলোপ সাধন করতে হবে। এবং ক্রমান্বয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা পরিণত হবে সমাজতান্ত্রিক পূর্ব-বাংলায় । এ এক নিরবচ্ছিন্ন বিপ্লব। চিরকালের জন্য উচ্ছেদ হবে মানুষের উপর মানুষের শোষন। কৃষির উন্নতি শিল্পকে সাহায্য করবে। কৃষি যোগান দেবে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং শ্রমিক শ্রেণীর আহার্য। তদুপরি কৃষক সমাজ হল শিল্পজাত দ্রব্যাদির সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী। অন্যদিকে শিল্প কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে ট্রাক্টর, হারভেষ্টার, রাসায়নিক সার, বিদ্যুৎও অন্যান্যভাবে সাহায্য করবে। শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রি সূদূঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজির উচ্ছেদ সাধন সমগ্র সমাজকে উন্নতির এক নতুন স্তরে উন্নীত করবে। এইভাবে জনগণের তিনশত্রুর ধ্বংস সাধন করে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের জনগণ সমগ্র অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের মালিক হবে। সমগ্র সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তকে আর সাম্রাজ্যবাদ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্রবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজি আত্মসাৎ করতে পারবে না। এই অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের উপর নির্ভর করেই আমরা এক নতুন দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব। সাম্রাজ্যবাদীদের আদর্শ প্রচারকেরা প্রচার করে বেড়ান যে, আমাদের দেশে যেহেতু সম্পদের অভাব সে জন্য বিদেশী সাহায্য বাতিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব। সাম্রজ্যবাদীদের স্বার্থেই ইহা প্রচার করা হয়। শোষণের তিন পাহাড়কে ধ্বংস করে আমাদের দেশে জনগণই হবে দেশের সমগ্র সম্পদের মালিক। আর এই সম্পদের উপর নির্ভর করেই শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে আমাদের দেশের জনগণ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে সমৃদ্ধশালী এক সমাজব্যবস্থা। এ সমাজে বন্য নিয়ন্ত্রিত হবে। সৃজনশীল কর্মশক্তির অধিকারী দেশের সমগ্র জনসংখ্যাকে নিয়োগ করা হবে নতুন নতুন সম্পদ সৃষ্টির কাজে। দেশ হতে চিরকালের জন্য নির্বাসিত হবে অনাহার ও ক্ষুধা। আমাদের দেশের সর্বব্যাপী ক্ষুধা ও অনাহারের জন্য দায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আল্লার গজব নহে। ক্ষুধা ও অনাহারের জন্য দায়ী হল শোষণের তিন পাহাড়-সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজি। শোষণের এ তিন পাহাড়কে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার ফলেই আমাদের দেশ হতে চিরকালের জন্য দুর হবে অনাহার ও ক্ষুধা, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকুতিক দুর্যোগ, খাদ্যঘাটতি ও বেকারত্ব। শ্রমিক শ্যেণীর নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবকে জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়েই আমরা ক্ষুধা হতে মুক্তি পাব। এই পথেই আমাদের দেশের জনতা অগ্রসর হচ্ছে। এই সংগ্রামের বিজয়ের ফলেই শস্য শ্যামল পূর্ববাংলা ধন-ধান্যে,ফলে-ফুলে, হাসি আর গানে মেতে উঠবে।

 


ফিলিপাইনে সরকার ও মাওবাদীদের মধ্যকার শান্তি আলোচনা থমকে গেছে

মাওবাদী কমিউনিস্ট গেরিলা

মাওবাদী কমিউনিস্ট গেরিলা

ফিলিপাইনের সরকারের সঙ্গে কমিউনিস্ট মাওবাদীদের অতি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনা ভেস্তে দিয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। আলোচনার শর্ত অনুযায়ী, কারাবন্দী ৪০০ মাওবাদী বিদ্রোহীকে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব ‘অগ্রহণযোগ্য’ বিবেচনা করে তিনি এ আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দেন। এর ফলে ছয় মাস ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান অস্ত্রবিরতি বাতিলের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নরওয়ের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী অসলোতে ফিলিপাইন সরকার ও কমিউনিস্ট মতাদর্শের মাওবাদী বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিউ পিপলস আর্মির (এনপিএ) মধ্যে ধারাবাহিক শান্তি আলোচনা চলছিল। এ আলোচনা এগিয়ে নিতে দু’পক্ষ অস্ত্রবিরতিও পালন করছে। চলতি মাসের শেষে দু’পক্ষের পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝেই আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দিলেন দুতের্তে।

স্থানীয় সময় শনিবার জন্মশহর দাভাওয়ে এক বক্তব্যে দুতের্তে বলেন, ‘৪০০ মাওবাদী বিদ্রোহীকে মুক্তি দেয়ার শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমি আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত নই। আলোচনা বাদ দিয়ে সরকারপক্ষের লোকজনদের দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছি।’  তিনি আরো বলেন, ‘আমি শান্তি আলোচনা সফল করতে অনেক ছাড় দিয়েছি। অসলোতে আলোচনায় অংশ নিতে বিদ্রোহী নেতাদের মুক্তি দিয়েছি। কিন্তু নতুন করে আর কোনো শর্ত মানা সম্ভব নয়।’ যেসব বিদ্রোহী নেতা অসলোতে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তাদের দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এরপর দুর্মুখ প্রেসিডেন্ট দুতার্তে কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র শাখা নিউ পিপলস আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেন। উভয় পক্ষের মধ্যে যে দুর্বল ঐকমত্য ছিল, সেখান থেকে উভয়েই সরে এসেছে। ফলে ফিলিপাইনের প্রান্তিক অঞ্চলে নতুন করে সশস্ত্র বিবাদ শুরু হতে পারে। এসব অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন এখনো টিকে আছে। আবার অনেক জায়গায় তা শুরুও হচ্ছে।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা ঘোষণা দিয়েছেন, এই মাওবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ শুরু হবে। আরেক জেনারেল সতর্ক করে দিয়েছেন, তাঁর সেনারা ‘তাদের ঘাঁটিতে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করবে’। ওদিকে মাওবাদীরাও কম যায় না। তারা ভাবলেশহীনভাবে বলেছে, সরকার সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করুক না। গর্ব করে তারা বলেছে, ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়’।
দুতার্তের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে একটি ছিল এ রকম যে, দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা হবে। কিন্তু কমিউনিস্টদের দাবী সরকার না মানায় মাওবাদীরা আবারও গেরিলা যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার কারণে দুতার্তের এই প্রতিজ্ঞা পূরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ফিলিপাইন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অসমতা ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ, সেখানে ভাগ চাষও পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি, যার জন্য দেশটি কুখ্যাত। সেখানে ব্যাপারটা এমন যে, নিপীড়ক ভূস্বামী, লোভী মধ্যস্বত্বভোগী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকেরা নিয়মিতভাবে লাখ লাখ সাধারণ কৃষককে নির্যাতন করেন। এই কৃষকেরা এখনো প্রকৃত অর্থে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি থেকে লাভবান হননি।

এই নিপীড়নের ফলে দেখা গেল, ফিলিপাইনের গ্রামীণ অঞ্চলে মানুষের মধ্যে প্রভূত ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের মধ্যে সামগ্রিকভাবে এই ক্ষোভ আছে বলে মানুষ বিদ্রোহ করছে, যাদের বেশির ভাগই মাওবাদীদের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে উজ্জীবিত। কমিউনিস্ট আন্দোলন ১৯৮০-এর দশকের ফিলিপাইনে একনায়ক মার্কোসের আমলে চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু এই আন্দোলন সম্প্রতি শক্তি হারিয়েছে বলে সরকার পক্ষ বলছে ।

আজ দেখা যাচ্ছে, বড় বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থানের কারণে এই আন্দোলন অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। বিশেষ করে, মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের কথা বলা যায়, যারা সরকারের সঙ্গে ২০১৫ সাল থেকে আলোচনা করে আসছে, যদিও মাঝে নানা ছেদ পড়েছে। তা সত্ত্বেও দুতার্তে কমিউনিস্টদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি করতে আগ্রহী ছিলেন, যিনি নিজ শহর দাভাওয়ে যুদ্ধরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা করেছিলেন। আবার তিনি একজন স্বঘোষিত ‘সমাজতন্ত্রী’, যার সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ভালো। অনেকেই মনে করেন, এই দীর্ঘদিনের মাওবাদী বিদ্রোহের রাশ টানতে তাঁর ওপরই বেশি ভরসা রাখা যায়।

এমনকি দুতার্তে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শ্রম, সমাজকল্যাণ, কৃষি সংস্কার ও দারিদ্র্য দমন কমিশনের মন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন। আর এখানেই তিনি অন্য ফিলিপিনো প্রেসিডেন্টদের চেয়ে ভিন্ন। বস্তুত দুতার্তে ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তাত্ত্বিক হোসে মারিয়া সিসনের ছাত্র। অনেক বছর তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন আগেও এমন আশা ছিল যে, ছাত্র-শিক্ষকের মিলন হবে। শিক্ষক তো নেদারল্যান্ডসে নির্বাসনে আছেন, সম্ভাবনা ছিল, তিনি ফিলিপাইনে ফিরে আসবেন। এটা করতে দুতার্তে প্রশাসনকে বহুদূর যেতে হতো। এর জন্য ওয়াশিংটনের সন্ত্রাসী তালিকা থেকে তাঁর শিক্ষককে বের করে আনতে হতো।

এর মধ্যে দুই দফা উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে, অসলো ও রোমে। ফলে এমন আশা সৃষ্টি হয়েছিল যে, দ্রুতই পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য চুক্তির মাধ্যমে এশিয়ার সবচেয়ে পুরোনো কমিউনিস্ট বিদ্রোহের অবসান হবে। সিসনও আনন্দিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আবার আমি দুতার্তের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।’ প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমানে ফিলিপাইনের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষটির প্রতি তিনি এভাবেই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

প্রাথমিকভাবে শান্তি আলোচনায় সফলতা আসার পর অনেক ভাষ্যকারই কিছুটা ঠাট্টার সুরে বলেছিলেন, দুতার্তে শিগগিরই নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদার হবেন। সর্বোপরি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস অনেক বছরের চেষ্টায় ফার্ক বিদ্রোহীদের আস্থা অর্জন করে তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছেন। ফলে তিনি গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু দুটি ব্যাপার দুতার্তের প্রচেষ্টা ব্যাহত করেছে।

প্রথমত ও সর্বাগ্রে দুতার্তে খেপে গিয়ে বলছে, মাওবাদীরা কাঠামোগত ঐকমত্য ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হওয়ার আগে নানা দাবি তুলেছে। সরকার শীর্ষ কমিউনিস্ট নেতাদের মুক্তি দেওয়ার পর তাঁরা আরেক দফা দাবি উত্থাপন করে। এতে সামরিক বাহিনীসহ যারা কমিউনিস্টদের সঙ্গে দীর্ঘদিন তিক্ত লড়াই করেছে, তারা বিরক্ত ও বিরোধিতা জানাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দুতার্তে বাহ্যত তাঁদের সতর্ক করে দেন, তাঁরা যেন বেশি দাবি না করেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।

এরই মাঝে কমিউনিস্টদের স্থানীয় ইউনিটগুলো যুদ্ধবিরতি ও চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যে কয়েকটি বিলাসবহুল রিসোর্ট ও সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনী বলছে, এই সময় শান্তি আলোচনার সুযোগ নিয়ে মাওবাদীরা প্রায় ১০০০ নতুন গেরিলা সদস্য রিক্রুট করে ফেলেছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দুতার্তে ভাবতে শুরু করেন, কমিউনিস্টদের সতর্ক করে স্বল্প মেয়াদে কৌশলগতভাবে জয়লাভ করতে চাচ্ছেন, যিনি এর বাইরে যাবেন না।

উল্লেখ্য, এনপিএ ফিলিপাইন কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র অংশ। প্রায় ৫০ বছর ধরে এ মাওবাদীদের সাথে দেশটির সরকারের সঙ্ঘাত চলছে। সঙ্ঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ১৯৮৯ সালে ফিলিপাইনে অবস্থিত মার্কিন সেনা কলোনিতে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে এ মাওবাদী বিদ্রোহীরা।

সূত্রঃ আল জাজিরা থেকে নেওয়া।

 


গনসালো চিন্তাধারা হচ্ছে আজকের দিনের কমিউনিস্টদের জন্য তাত্ত্বিক ভিত্তি

5-11-2004 juicio a abimael guzman en la base naval.callao. tambiem aparecen...margie calvo,elena iparraguirre,victor zavala,angelica salas,feliciano entre otros. OPSE 2004NOV06 PERU TERRORISMO PRIMER DIA DE NUEVO JUICIO A ABIMAEL GUZMAN   Y OTROS CABECILLAS DE SENDERO LUMINOSO EN LA IMAGEN GUZMAN LEVANTANDO EL PUNO GESTOS ARENGAS  CREDITO ENRIQUE CUNEO  EL COMERCIO PERU 2004NOV06 AFD

 কমরেড গনসালো, ০৫-১১-২০০৪

গনসালো চিন্তাধারা হচ্ছে আজকের দিনের কমিউনিস্টদের জন্য তাত্ত্বিক ভিত্তি

–    পেরুর গণ আন্দোলন(এমপিপি)

নভেম্বর ২০০৬

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ হচ্ছে সর্বহারাশ্রেণীর একমাত্র, অপরাজেয় ও চির অম্লান মতাদর্শ এবং ইতিহাসের সবচেয়ে অগ্রসর ও চূড়ান্ত শ্রেণী মতাদর্শ। এখানে চাবিকাঠি প্রশ্ন হচ্ছে চেয়ারম্যান গনসালো কিভাবে মাওবাদ-কে তৃতীয়, নতুন ও উচ্চতর স্তর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন; এটা এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, কেননা শুধুমাত্র এভাবেই আমাদের পার্টি মাওবাদকে উপলব্ধি করে, আমাদের পার্টি বোঝাতে চায়mpp3 যে মাওবাদের আছে তিনটি স্তরঃ লেনিনবাদ মার্কসবাদের উপর নিজেকে দাঁড় করায় এবং মাওবাদ নিজেকে পূর্ববর্তী দুটির উপর দাঁড় করায়, কিন্তু তাদের বিকাশ সাধন করে। সুতরাং মাওবাদ হচ্ছে নতুন ও তৃতীয় এবং যেহেতু এটা মার্কসবাদ-কে একটা উচ্চতর স্তরে বিকশিত করেছে, মাওবাদ হচ্ছে অধিকতর উচ্চতর (Superior)।

এই চাবিকাঠি প্রশ্ন থেকেই যাত্রা শুরু করে পার্টির প্রথম কংগ্রেসে প্রতিষ্ঠিত গনসালো চিন্তাধারা হচেছ্ পেরুর সমাজ ও আজকের দুনিয়ার মূর্ত নির্দিষ্ট বাস্তবতায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ, প্রধানত মাওবাদের সার্বজনীন সত্যের প্রয়োগ। সেই কারণে আমরা বলি যে গনসালো চিন্তাধারার সবচেয়ে পূর্ণতর ও সর্বাধিক বিকাশ পার্টির সাধারণ রাজনৈতিক লাইনে পাওয়া যায় এবং মার্কসবাদে গনসালো চিন্তাধারার অবদান ও বিকাশও সেখানে সুনির্দিষ্ট। এমনকি তদপেক্ষা, গনসালো চিন্তাধারা গণযুদ্ধের নয়া সমস্যাবলীর সমাধান দেয় এবং বিশ্ববিপ্লবের জন্য রণনীতি ও রণকৌশলের ভিত্তিসমূহের বিকাশ সাধন করেছে; এটা প্রতিষ্ঠা করেছে এর তিনটি স্তর বা পর্যায়কালকে, বিশ শতকের ১৯৮০র দিকে তৃতীয় পর্যায়কালে আমাদের অনুপ্রবেশকে এটা সঠিকভাবে নিরূপন করেছে; ১৯৯২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান গনসালো তাঁর কর্তৃত্বব্যঞ্জক বক্তব্যে দিক নির্দেশ দিয়েছিলেন যে বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবের এক নয়া মহাতরঙ্গে আমরা প্রবেশ করছি। পার্টির ভিতরকার বিরুদ্ধ ডানপন্থী মতাবস্থানসমূহ ও লাইনকে মোকাবেলা করে ও তাকে চূর্ণ করে, (এবং পরবর্তীতে রিম-এর হৃতপিন্ডের ভিতর গণযুদ্ধের শক্তিশালী অগ্রগতিসহ), চেয়ারম্যান গনসালো সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও আগ্রাসনকে সাহসের সাথে মোকাবেলা ও বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য  পেরুসহ দুনিয়ায় গণযুদ্ধের সূচনা ও বিকাশের আশু প্রয়োজন, সুযোগ ও সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-এই বাস্তবতা থেকে যাত্রা করে যে বর্তমান বিশ্বে বিপ্লব প্রধান ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে এবং পেরু ও সমগ্র বিশ্বে এক বিপ্লবী পরিস্থিতির অসমান বিকাশের অস্তিত্বমানতা, শোষিত দেশসমূহ হচ্ছে বিশ্ববিপ্লবের ভিত্তি কেননা সেখানেই বিশ্বজনগণের বৃহত্তর অংশ কেন্দ্রিভূত আর বিপ্লব অধিকতর শক্তি নিয়ে ফুটন্ত অবস্থায় বিরাজ করছে-সংশোধনবাদের ধূর্তামী চূর্ণ করেছেন কারণ তারা বিশ্বের বিপ্লবী পরিস্থিতির অস্তিত্বমানতা অস্বীকার করে, বিপ্লবী সংকটের সাথে বিপ্লবী পরিস্থিতিকে জড়িয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর পুনর্গঠন, এর সামরিকীকরণ ও সমকেন্দ্রিক বিনির্মাণের প্রয়োজনীয়তাকে চেয়ারম্যান গনসালো প্রতিষ্ঠা করেছেন, এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য নির্ধারক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির তিনি বিকাশ সাধন করেছেনঃ এর আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদকে, একে সাধারণীকরণ করে এবং এর বিকাশের নিয়ম ও স্তরসমুহের প্রতিষ্ঠা করেছেন, সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে বিপ্লবের জন্য পরিস্থিতিকে এটা পরিপক্ক করে। বিশ্ব বিপ্লবে চেযারম্যান গনসালো কিভাবে অবদান রেখেছেন এগুলো হচ্ছে তার অল্পকিছু উদাহারণ। আর এভাবেই মার্কসবাদ বিকশিত হচ্ছে। রিম গঠনকারী পার্টি ও সংগঠনসমূহ, RCP সহ, সেই কারণে এর চেয়ারম্যান কম. এভাকিয়ান, ১৯৯৩ সালের তাদের এই ঘোষণাঃ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ দীর্ঘজীবি হোক!, কে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যেখানে এই ঘোষণার সূচনাতে পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির পরিপূর্ণ ভূমিকা পালন এবং গণযুদ্ধে এর নেতৃত্ব উল্লেখ করা হয়েছে, যা মাওবাদের স্বীকৃতিদানের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে রিম-কে সহায়তা করেছিল, ১৯৮৪ সালে যাকে বাতিল করা হয়েছিল। এটাই এখানে বড় হরফে রয়েছে: তত্ত্ব ও অনুশীলনের ক্ষেত্রে এই অগ্রগতিসমূহ (পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন গণযুদ্ধ-আমাদের নোট) সর্বহারার মতাদর্শের আমাদের আত্মস্থকরণ অধিকতর গভীর করতে এবং এই ভিত্তির উপর মার্কসবাদের নতুন, তৃতীয় ও উচ্চতর স্তর হিসেবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের স্বীকৃতিদানে এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে আমাদেরকে সমর্থ করে তুলেছে।

চেয়ারম্যান গনসালো, গনসালো চিন্তাধারা জন্ম দিয়েছেন যা আজকের পেরু এবং বিশ্বের কমিউনিস্টদের অনুশীলনের জন্য, গণযুদ্ধের জন্য তত্ত্বগত ভিত্তি স্বরূপ, যখন আমরা বিশ্বসর্বহারা বিপ্লব বিকাশের এক মহাতরঙ্গে প্রবেশ করেছি তখন গনসালো চিন্তাধারাই হচ্ছে আজকের বিশ্ববিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তি। এভাবেই গনসালো চিন্তাধারা মার্কসবাদের বিকাশে অবদান রাখছে এবং না সাম্রাজ্যবাদ না প্রতিক্রিয়া এটা চায়-সংশোধনবাদীদের অবস্থা এর চেয়ে নিম্নমানের। তারা চায়না চেয়ারম্যান গনসালোর মতো একজন তাত্ত্বিক বা ‘নেতা’ কে যিনি চেয়ারম্যান মাওয়ের তুলে ধরা চাহিদাকে পূরণ করেনঃ তত্ত্বগত দৃঢ়তা, ইতিহাসের উপলব্ধি এবং রাজনীতির উত্তম ব্যবহারিক পরিচালনা, তাই তারা তাকে মেরে ফেলতে চায় যাতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ, প্রধানত মাওবাদের বিকাশ সাধনকারীর অনুপস্থিতিমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এটা স্বীকৃত যে, কম, এভাকিয়ান ও অন্যরা শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়ার সাথে পরিপূর্ণভাবে সমকেন্দ্রিকই হয় নি বরং তারা চেয়ারম্যান গনসালোর এই আবদ্ধাবস্থা কামনা করে এবং গোঁড়ামীবাদী-সংকীর্ণতাবাদী সংশোধনবাদী হিসেবে অভিয্ক্তু করে তারা তাকে আক্রমণ করে, অপমান করে, তারা ভুলে যায় তাদের দ্বারা লিখিত, স্বাক্ষরকৃত ও স্বীকৃত ১৯৯৩ সালের রিমের ঘোষণায় রয়েছে মার্কসবাদে চেয়ারম্যান গনসালোর সীমাতিক্রমকারী অবদানের স্বীকৃতি।

এভাবে দেখা যাচ্ছে, মতাদর্শিক সংগ্রাম আরো শক্তি অর্জন করে এবং তাই আমরা যখন সত্যগুলোকে ও বিষয়গুলোকে খোলাখুলিভাবে বলি তখন তা রিমভুক্ত কিছূ পার্টি ও সংগঠনের কিছু কমরেডদের আঘাত লাগে। নির্দিষ্টভাবে, কমরেড এভাকিয়ান একটা বিষয়ের জন্য, মাওবাদকে সংজ্ঞয়িত করার জন্য চেয়ারম্যান গনসালোকে ক্ষমা করতে পারেননা। রিমের জন্ম থেকেই চেয়ারম্যান গনসালো এভাকিয়ানের মতাবস্থানগুলোকে ; মাওবাদ ও গণযুদ্ধের বিরোধিতাকে তীব্র সমালোচনামূলকভাবে চিহ্নিত করেছেন এবং রিমের অভ্যন্তরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে উন্মোচন করেছেন। সেই কারণে আরসিপি চেয়ারম্যান সর্বদাই তার মতাবস্থানগুলোকে মধ্যবর্তী মাধ্যমের সাহায্যে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেন এবং মুখোমুখিভাবে দুই লাইনের সংগ্রাম পরিচালনায় অবতীর্ণ হননা।

আমরা জানি যে ডান ও তার মাথাকে চূর্ণ করাই প্রয়োজন এবং পরবর্তী সময়ে যারাই ডানপন্থী অবস্থানকে গ্রহণ করবে তাদেরকেই শেষে চূর্ণ করতে হবে; কারণ, দ্বান্দ্বিক গতিবিদ্যার নিয়মে সর্বদাই বিপরীতের সংগ্রাম চলবে। চেযারম্যান গনসালো সর্বদাই আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন; এটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের অভিজ্ঞতা। পেরুতেও এরকমটা ছিল, যেই একে (ডানপন্থী অবস্থান) ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল তার বিরুদ্ধেই এটা (চূর্ণ) করা হয়েছিল, যে মুখ খুলেছে তার বিরুদ্ধে নয়। অন্যেরা পদের জন্য তাদের প্রাণপন চেষ্টার কারণে অতিকথন করছেন, তারা রিমে একজন ‘নেতা’ খোজার চেষ্টা করছেন। আমরা ভুলি নাই ঘৃণ্য তেং এর কার্যকলাপকে, সেও অন্যদের ব্যবহার করত পরবর্তীকালে পর্দার অন্তরালের স্রষ্টা হিসেবে নিজেকে জাহির করার জন্য, যার জন্য ইয়াংকি সাম্রাজ্যবাদের কাছে সে নিজের আত্মাকে বিক্রি করেছে। আজকে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে আরো বেশী প্রয়োজন যা চেয়ারম্যান গনসালো বলেছেনঃ মৃত্যু অবধি সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। পার্টি অভিজ্ঞতা আমাদের অনুমতি দেয় এই সকল বিষয়কে বুঝতে যাতে এর (দক্ষিণপন্থী অবস্থান) ছদ্মবেশী আবরণকে খুলে দিতে পারি।

কেউ কেউ এক গণযুদ্ধের বিরুদ্ধে অন্য গণযুদ্ধকে স্থাপন করতে চেষ্টা করে, যেমন পেরুর গণযুদ্ধের বিরুদ্ধে নেপালের গণযুদ্ধকে এবং তারা বলে যে নেপালের গণযুদ্ধ যদি পেরুর গণযুদ্ধের চেয়ে “অধিকতর অগ্রসর” হয়, এবং দ্বিতীয়টি জটিল ও কঠিন পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, এটার কারণ হচ্ছে একটার ‘পথ’ অন্যটার ‘চিন্তাধারা’র চেয়ে উতকৃষ্টতর, এভাবে যুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরক অগ্রগতি নিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত করার পরিবর্তে যৌথ একনায়কত্বকে সংস্থাপন করা হচ্ছে; এভাবে তারা বিতর্ক এড়ানোর চেষ্টা করে এবং নিছক এটা বলে যেঃ আমাদের অনেক শক্তি আছে, আমাদের অনেক সম্পদ (Resource) আছে।

এই মতাদর্শিক সংগ্রামকে আমরা মহান দায়িত্বরূপে ধারণ করি; আমরা পরিষ্কার যে আমরা কি চাই, কারণ মুক্ত প্রতিজ্ঞাসহ দৃঢ় প্রত্যয় দ্বারা আমরা এটা ধারণ করি। আমাদের অবশ্যই সর্বদা দূরপানে তাকাতে হবে; আমরা এটাকে দৃঢ়ভাবে ধারন করি। যখন ২০০৪ইং এর নভেম্বরে আমাদের পার্টি আমাদের সতর্ক করেছিল যে আরো বিশোধিত মতাদর্শিক সংগ্রাম হবে, এবং আমাদের অতি অবশ্যই গনসালো চিন্তাধারাকে রক্ষা করতে হবে। অতঃপর আমরা প্রতিক্রিয়ার সকল চালাকির অসারতা প্রমাণ করি, যেমন ‘সাধারণ ক্ষমা’র নয়া প্রতিক্রিয়াশীল প্রতারণা যা চেয়ারম্যান গনসালোর বিরুদ্ধে ‘বিচার’-এর প্রতারণা (Hoax) সাথে অবিচ্ছেদ্য, কাজেই পুরনো রাষ্ট্র, প্রতিক্রিয়া, সি.আই.এসহ সংশোধনবাদী ও আত্মসমর্পণকারী ROL (ডান সুবিধাবাদী লাইন) এর চামচাদের দ্বারা সরবরাহকৃত প্রমাণ ছাড়া দুনিয়ার নতুন-পুরাতন সংশোধনবাদীদের হাতে আর কোন যুক্তি প্রমাণ নেই।

আমরা পেরুর গণআন্দোলন (এমপিপি), যেমন পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়েছে, চেয়ারম্যান গনসালো ও তাঁর সর্বশক্তিমান চিন্তাধারাকে রক্ষার আমাদের প্রতিশ্রুতিকে আমরা ধারন করি, বিশ্ববিপ্লব ও গণযুদ্ধকে সেবা করার মাধ্যমে, এটা আমরা নিরন্তরভাবে পালন করি, সর্বদাই এই নিশ্চয়তা সহকারে যে এমপিপি জীবনের মূল্যে হলেও এরকম উচ্চ ভূমিকা পালন করে। অপরপক্ষে, ঐসকল লোকদের পরিণতি কি হল? ইউরোপের ঐসকল সিএসআরপি ও ইউএসের লোকেদের অথবা ঐসব বাজে সাংবাদিকদের? যখন ‘পত্রগুলো’ আবির্ভূত হল, প্রথম তারা বলেছিলঃ হয় তিনি অথবা তিনি নন? সম্ভবতঃ হ্যাঁ অথবা সম্ভবতঃ না; কোরিম (রিম কমিটি) পর্যায়ে প্রকাশিত সংশোধনবাদী অবস্থানের সাথে হয় এভাবে নয় ওভাবে পরিশেষে তারা এক কাতারে মিলিত হতে এই অবস্থানকে তারা ব্যক্ত করল যে তারা সংগ্রামরত; স্ফটিকের মতো স্বচ্ছভাবে বিষয়গুলো যখন আমরা তাদের বললাম, ঐ মতাবস্থানের প্রতিনিধিদের তা আঘাত করলো। শুধুমাত্র আমরাই তাদের মনে করিয়ে দিলাম যে রিমের একেবারে প্রথম মুহুর্ত থেকে চেয়ারম্যান গনসালো তীব্র সমালোচনামুলকভাবে চিহ্নিত করেছেন কমরেড এভাকিয়ানকে।

দুই লাইনের সংগ্রামের বিকাশের প্রশ্নে নয়া প্রজাতন্ত্র, ঘাঁটি, নয়া ক্ষমতা-কে আমরা কিভাবে উপলব্ধি করি, আমরা অবিরামভাবে আমাদের সেই মতাবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করছি, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ, গনসালো চিন্তাধারার প্রয়োগে, কীভাবে এটা আমাদের সৃষ্টি ও ধ্বংসের অনুমতি দেয়, বিপ্লবের তিন হাতিয়ারের সমকেন্দ্রিক বিনির্মাণ, এক নয়া অর্থনীতি, নয়া সংস্কৃতির নির্মান, ইত্যাদি এবং সর্বহারা একনায়কত্বের একটা প্রকাশ হিসেবে যৌথ একনায়কত্বে পুরোনো রাষ্ট্র, এর পেটি-পার্টিসমূহ, চার্চ, এর ‘প্রতিবিধান’ ও এর এন.জি.ওসমূহের ধ্বংস সাধন। এসমস্ত সকল নয়া বিষয়সমূহ, নয়া ক্ষমতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা, রক্ষা করা এবং বিকাশ করা হয়েছে বাহিনী সহকারেঃ মিলিশিয়া, স্থানীয় বাহিনী, প্রধান বাহিনী; বিকশিত করা হয়েছে এক উচ্চতর চলমান গণযুদ্ধের মাধ্যমে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের প্রয়োগে আমাদের অভিজ্ঞতাকে আমরা পার্টি ও সংগঠনসমূহের কাছে ব্যাখ্যা করছি এবং যারা নিজেদের এর নীতিসমূহ থেকে দূরে রাখছে যেমন ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ ওয়ালারা, তারা পার্টি, নয়া ক্ষমতা, দখলীকৃত অর্জনগুলোকে বিলোপ করায় নেতৃত্ব দিচ্ছে, এখানে দুইটি পরিপ্রেক্ষিত, এক, দীপ্তিময় গণযুদ্ধে অটল থাকা, যা আমরা করছি এবং অন্যটি হচ্ছে কালো আঁধার, বিশ্বাসঘাতকতা, যদি কেউ গণযুদ্ধে অটল না থাকে, যদি কেউ এর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি, বিদেশে তার পার্টির কাজের অঙ্গ এমপিপি, সকল মাওবাদী এবং সকল মাওবাদী পার্টি ও সংগঠনসমুহের সাথে একত্রে এই সংগ্রামকে বহন করে যাচ্ছে। কারণ আমাদের প্রয়োজন মাওবাদের মূর্ত প্রকাশ, এবং এটাই বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবের নয়া মহাতরঙ্গ পরিচালনা, নেতৃত্ব দিতে কমিউনিস্ট পার্টিসমূহ সৃষ্টি করার কাজ চালিয়ে যায় এবং আপোষ ও দ্বন্দ্বে নেতৃত্ব দেয়া একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী পরাশক্তি হিসেবে ইয়াংকী সাম্রাজ্যবাদ-নেৃতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ, প্রতিক্রিয়া ও সংশোধনবাদী সাধারণ প্রতিবিপ্লবী আক্রমণ চূর্ণ করে।

মাওবাদ জিন্দাবাদ!

চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ জিন্দাবাদ!

বর্তমান দুনিয়ার মহানতম জীবিত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী চেয়ারম্যান গনসালা জিন্দাবাদ!                                     

দুনিয়ার সর্বহারা এক হও!


আন্তর্জাতিক যৌথ বিবৃতিঃ “তৃতীয় বিশ্ববাদ” ও “তিন বিশ্ব”-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে

poster_d3

নভেম্বর ২০১৫

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশ

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ফ্রান্স

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী কেন্দ্র বেলজিয়াম

এর যৌথ বিবৃতিঃ

“তৃতীয় বিশ্ববাদ” ও “তিন বিশ্ব”-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে

mao

আমরা আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক ভ্রান্ত লাইনঃ “তৃতীয় বিশ্ববাদ” সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করে দিতে চাই। এই ধারণা জাতীয় কাঠামোকে নেতিকরণ করে যা হচ্ছে বাস্তবতার দ্বান্দ্বিক গতি আর অতি বাম বিষয়বস্তু তৈরি করে যা কেবল বিভ্রান্তি আনে।

যেমন আমরা জানি যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৩তে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির জবাবে ২৫ পয়েন্টের চিঠি হিসেবে পরিচিত চিঠিতে বলেছিলঃ

“সমকালীন বিশ্বের বিবিধ দ্বন্দ্বসমূহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিস্তীর্ণ
এলাকায় ঘনীভূত; এগুলো হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শাসনাধীনে সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা যা হচ্ছে বিশ্ববিপ্লবের ঝটিকাকেন্দ্র যা সাম্রাজ্যবাদের উপর সরাসরি আঘাত আনে (…)।

আন্তর্জাতিক কমিউউনিস্ট আন্দোলনের কিছু ব্যক্তি এখন নিপীড়িত জাতির মুক্তি সংগ্রামগুলির প্রতি নিষ্ক্রিয় অথবা ঘৃণা অথবা নেতিবাচক অবস্থান নেয়। বস্তুত তারা একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থকে রক্ষা করে সর্বহারা শ্রেণির স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, সমাজ গণতন্ত্রীতে অধঃপতিত হয়।

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলির জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামগুলির প্রতি গৃহীত দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে পার্থক্য নির্নয়কারী মানদণ্ড একদিকে তারা যারা বিপ্লব চায় আর অন্যদিকে যারা তা চায়না, একদিকে যারা সত্যিকারভাবে বিশ্বশান্তিকে রক্ষা করছে অন্যদিকে যারা আগ্রাসন আর যুদ্ধের শক্তিগুলিকে সহায়তা করছে—এই দুইয়ের মধ্যে।” [১]

বিশ্বের সম্পর্কে এটাই হচ্ছে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মৌলিক উপলব্ধি। পুঁজিবাদী দেশসমূহ আধা উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশগুলির উপর ভয়ানক শোষণ সংগঠিত করতে সক্ষম হয়। এই প্রক্রিয়ায় তারা একটা শ্রম অভিজাততন্ত্র সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় যা পুঁজিবাদকেlenin1সেবা করে। লেনিন তার ধ্রুপদী “সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়”তে লেখেনঃ

“পুঁজিবাদ এখন সৃষ্টি করেছে মুষ্টিমেয় (দুনিয়ার বসবাসকারীদের এক দশমাংশের কম; সর্বাধিক “ভদ্র” ও উদার গণনায় বলা যায় এক-পঞ্চমাংশের কম) ব্যতিক্রমী ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র যারা সমগ্র বিশ্বকে লুন্ঠন করে স্রেফ “কুপন কেটে” (…)।

নিশ্চিতভাবেই এমন বিপুল অতিমুনাফা (যেহেতু সেগুলো পুঁজিপতিরা “নিজ” দেশের শ্রমিকদের নিঙড়ে নেয়া মুনাফার থেকে এটা অতিরিক্ত) দ্বারা শ্রমিক নেতাদের ও শ্রমিক অভিজাততন্ত্রের উপরি স্তরকে ঘুষ দিয়ে কেনা সম্ভব। আর এটাই “অগ্রসর” দেশগুলির পুঁজিপতিরা করছেঃ তারা তাদেরকে ঘুষ দিচ্ছে হাজারো উপায়ে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, প্রকাশ্য বা গোপনে (…)।

এরাই হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে বুর্জোয়াদের সত্যিকার এজেন্ট, পুঁজিপতি শ্রেণীর শ্রম লেফটেনেন্ট, সংস্কারবাদ ও শোভিনিজমের প্রকৃত চালিকাশক্তি।” [২]

একদিকে রয়েছে শক্তিশালী পুঁজিবাদী দেশগুলি যারা শ্রমিক শ্রেণির সারিতে এজেন্ট তৈরি করতে সক্ষম, শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী তৎপরতাকে আপেক্ষিকভাবে পঙ্গু করে দিয়ে, অন্যদিকে রয়েছে নিপীড়িত দেশগুলি যাতে শোষণ এত শক্তিশালী যে বিদ্রোহ গড়ে উঠতে পারে অনেক ভালভাবে।

তথাপি, এগুলো হল প্রবণতা। উদাহারণস্বরূপ, নিপীড়িত দেশগুলিতে, আধা-সামন্তবাদ অথবা আধা-উপনিবেশবাদ এত শক্তিশালি যে বিপ্লব আপেক্ষিকভাবে মন্থর হয়ে যেতে পারে। ধর্মীয় অন্ধত্ববাদ এক প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতা যা খুবই শক্তিশালি যেখানে নির্দিষ্টত সামন্তবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেসব দেশ আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিকাশের এক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে সেখানে জাতীয়তাবাদ খুবই শক্তিশালী হতে পারে।

একইভাবে নিঃস্বকরণ পুঁজিবাদের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা। বুর্জোয়া ও সর্বহারার মধ্য দ্বন্দ্ব হচ্ছে বৈর আর তাই জনগণ, পুঁজিবাদী দেশগুলিতে, দারিদ্রের পরিস্থিতিতে অধিক থেকে অধিকতর পতিত হয়। কার্ল মার্কস পুঁজিতে পুঁজি সঞ্চয়ের এই নিয়মটাই ব্যাখ্যা করেছেন, আর সমাজ-গণতন্ত্রী সংস্কারবাদীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছে যারা বলে যে পুঁজিবাদের মধ্যে জনগণের জীবনযাত্রার মান সর্বদাই অধিকতর ভাল হতে পারে।

“তৃতীয় বিশ্ববাদ” হচ্ছে একটা মতাদর্শ যা বাস্তবতার দ্বান্দ্বিকতাকে নেতিকরণ করতে পারে। এটা ভাণ করে যে পুঁজিবাদ পুঁজিবাদী দেশগুলিতে শান্তিপুর্ণ আর সর্বদাই উন্নতি করতে পারে। এটা প্রতিবিপ্লবী। কিন্তু সে এটা খোলাখুলিভাবে বলেনাঃ সে শান্তিপুর্ণ পুঁজিবাদের তার লক্ষ্যকে ঢেকে রাখে “তৃতীয় বিশ্ব”-এর “বিপ্লবী” ইতিকরণ করার মাধ্যমে।

সমাজ-গণতন্ত্রী সংস্কারবাদীদের মতই “তৃতীয় বিশ্ববাদ” একই লক্ষ্য ছড়ায়, কিন্তু “তৃতীয় বিশ্ব” এর নামে “বিপ্লবী” হওয়ার ভাণ করে এই তথাকথিত শান্তিপুর্ণ পুঁজিবাদের নেতিকরণ করার মধ্যে।

এটা হচ্ছে অতিবাম বিচ্যুতি যা কেবল “শান্তিপুর্ণ” পুঁজিবাদের জনপ্রিয়করণকারীদেরই সাহায্য করে, কারণ এর “বিরুদ্ধে” হওয়ার ভাণ করলেও, তারা একই কথা বলে।

এটা এক অতিবাম বিচ্যুতি যা পুঁজিবাদী দেশগুলিতে বুর্জোয়া ও সর্বহারারা মধ্যে শ্রেণীবৈরিতা নেতিকরণ করে, সাম্রাজ্যবাদের “শ্রেষ্ঠত্ব”র নামে বিশ্বাসঘাতকতাকে এগিয়ে নেয়।

এটা এক অতিবাম বিচ্যুতি যা বিপ্লবের “জাতীয়” ধারণাকে সমর্থন করে যখন বস্তুত প্রশ্নটি leninstalinসর্বদাই হচ্ছে একটা গণতান্ত্রিকঃ নিপীড়িত দেশগুলির সংগ্রাম এক জাতির আরেকটার বিরুদ্ধে নয়, বরং অন্য দেশের শাসকশ্রেণীর পরিচালিত শোষণ ও নিপীড়ণের বিরুদ্ধে জনগণের গণতন্ত্রের সংগ্রাম।

সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ সম্পর্কে সমাজগণতন্ত্রীদের মত একই ধারণা রয়েছে “তৃতীয় বিশ্ববাদী”দের, একে বৈরিতাহীন মনে করে; “তৃতীয় বিশ্ব”র আধিবিদ্যক ধারণা জন্ম দিয়ে এর রয়েছে এক দ্বান্দ্বিকতাবিরোধী দৃষ্টিকোণ ।

এটা লিন পিয়াওয়ের একই মতাদর্শ যে কিনা এক “তৃতীয় বিশ্ববাদী” লাইনের ছদ্মাবরণে লাল চীনে এক ফ্যাসিবাদী ক্যুর চেষ্টা করেছিল।

“তৃতীয় বিশ্ব” সম্পর্কে সত্যকারভাবে কী আমাদের বোঝা উচিত সেখানে জোর দেয়া দরকার। মাওসেতুঙই এই ধারণার জনপ্রিয়করন করেন; তিনি যখন বিশ্বের এক বর্ণনা দেন, আসুন সেখান থেকে উদ্ধৃত করিঃ

“মার্কিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচুর পারমাণবিক বোমা রয়েছে, আর তারা হচ্ছে অধিকতর ধনী। ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা দ্বিতীয় বিশ্বভুক্ত, যাদের প্রচুর পারমাণবিক বোমা নেই, তারা প্রথম বিশ্বের মত এতটা ধনীও নয়, তবে তারা তৃতীয় বিশ্ব থেকে অধিকতর ধনী।” (৩)

আমরা যেমনটা জানি, দেঙ শিয়াওপিঙের নেতৃত্বে লাল চীনে পুঁজিবাদের পথিকরা “তৃতীয় বিশ্ব” এর সাথে “দ্বিতীয় বিশ্ব” এর জোট গড়ে তোলার জন্য ইতিমধ্যেই একটা প্রচেষ্টা নিয়েছিল এই বর্ণনার অপব্যবহার করতে।

এটা প্রচুর বিভ্রান্তি ও অনেকসময় উপলব্ধির অভাব জন্ম দেয়। আসুন এখানে দেখা যাক গনসালো ও গনসালো চিন্তাধারার মাধ্যমে পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির সঠিক উপলব্ধিঃ

প্রথম বিশ্ব হচ্ছে দুই পরাশক্তি মার্কিন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যারা বিশ্বে একাধিপত্যের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতারত এবং যা একটা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ জন্ম দিতে পারে। তারা হচ্ছে পরাশক্তি কারণ তারা অন্য শক্তিসমূহের চাইতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অধিকতর শক্তিধর। মার্কিনের রয়েছে অ-রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া সম্পত্তিকেন্দ্রিক অর্থনীতি, অধিকারের ওপর বেড়ে চলা বিধি-নিষেধসহকারে রাজনৈতিকভাবে এটা এক gonzalloবুর্জোয়া গণতন্ত্র বিকশিত করে। এটা একটা প্রতিক্রিয়াশিল উদারতাবাদ; সামরিকভাবে পাশ্চাত্যে এটা সবচেয়ে শক্তিধর এবং এর বিকাশের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাজনৈতিকভাবে আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়ার ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বসমেত অর্থনৈতিকভাবে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়াভিত্তিক এবং এটা একটা উচ্চপর্যায়ের সামরিক শক্তি যদিও এর বিকাশের প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত। মার্কিন তার আধিপত্যকে বজায় রাখতে চায় এবং তা সম্প্রসারণও করতে চায়। সোভিয়েতের লক্ষ্য সম্প্রসারণের দিকে বেশি কারণ সে একটা নতুন পরাশক্তি এবং অর্থনৈতিকভাবে তার ইউরোপের ওপর আধিপত্যের স্বার্থ রয়েছে নিজ পরিস্থিতি উন্নত করার লক্ষ্যে। সংশ্লেষণে, তারা দুই পরাশক্তি যারা কোন ব্লক গঠণ করেনা কিন্তু দ্বন্দ্ব রয়েছে, পরিস্কার পারস্পরিক পার্থক্য রয়েছে এবং দুনিয়াকে পুনবিভাজনের জন্য তারা ঘোঁট পাঁকানো ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে আগায়।

দ্বিতীয় বিশ্ব হচ্ছে সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ যারা পরাশক্তি নয় কিন্তু ক্ষুদ্রতর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তি যথা-জাপান, জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালী প্রভৃতি যাদের পরাশক্তির সাথে দ্বন্দ্ব রয়েছে কারণ তারা ডলারের অবমূল্যায়ণ, সামরিক বিধি-নিষেধ এবং রাজনৈতিক আরোপ বজায় রাখে; এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ পরাশক্তিসমূহের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের নয়া পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত করতে চায় যেহেতু তারাও নিপীড়িত জাতিসূহের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ চালায় এবং অধিকন্তু তাদের নিজেদের মধ্যে তীক্ষ দ্বন্দ্ব বিরাজমান।

তৃতীয় বিশ্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত দেশগুলিকে নিয়ে গঠিত। Mao2তারা হচ্ছে উপনিবেশ অথবা আধাউপনিবেশ যেখানে সামন্তবাদ ধ্বংস হয়নি ও সেই ভিত্তিতে এক আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ গড়ে ওঠে। তারা এক পরাশক্তি অথবা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে বাঁধা। সাম্রাজ্যবাদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব রয়েছে, অধিকন্তু তারা তাদের নিজ বড় বুর্জোয়া ও সামন্তদের সাথে লড়ে যারা উভয়ই সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিশেষত পরাশক্তির সেবায় ও তাদের সাথে আাঁতাতে আবদ্ধ (…)

একদিকে পরাশক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ অপরদিকে এদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতিসমূহ— এই দুয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এখানে তিন বিশ্বের থিসিস মূর্ত হয় এবং আমরা একে সূত্রায়িত করি এইভাবে কারণ দ্বন্দ্বের শাঁস রয়েছে পরাশক্তির মধ্যে নিহিত কিন্তু এটা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের সাথেও দ্বন্দ্ব। এটাই হচ্ছে প্রধান দ্বন্দ্ব আর এর সমাধান হচ্ছে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিকাশ ও বিজয়।”

এই সঠিক মূল্যায়ন পৃথিবীর বহু পার্টি ও সংগঠনই করেনি। উদাহারণস্বরূপ, তুরস্কে টিকেপি/এমএল আর আলবেনিয়ার লেবার পার্টির ছিল “তিন বিশ্ব” তত্ত্বের একই একতরফা ধারণা।

টিকেপি/এমএল মাও সেতুঙকে রক্ষায় একে প্রত্যাখ্যান করে যারা মনে করে যে মাও একে সমর্থন করতে পারেননা আর আলবেনিয়ার লেবার পার্টি মাও সেতুঙকে দেঙ শিয়াওপিঙেরLenin2 সাথে মিশিয়ে ফেলে এর সমর্থনকারী হিসেবে তুলে ধরে তাকে আক্রমণ করে একে প্রত্যাখ্যান করে ।

বস্তুত, “তিন বিশ্ব” ধারণা ছিল কেবল এক বর্ণনা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্বকে অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও পরাশক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বকে ভালভাবে ধরতে যা অনুমোদন দেয়; এর অর্থ কখনোই এমন একটা ধারণা ছিলনা যা যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা যায়।

বৈজ্ঞানিক হতে আমাদের উচিত আধা উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশগুলির মধ্যে একই পার্থক্যকে ব্যবহার করা। তাদের মধ্য কেউ কেউ “সম্প্রসারণবাদী”, যেমন প্রথমে marxengels2পাকিস্তান ও পরে ভারতকে মোকাবেলায় সিরাজ সিকদার পূর্ববাংলার মূর্ত পরিস্থিতিতে লক্ষ্য করেছিলেন। উভয় দেশই আধা উপনিবেশিক আধা সামন্ততান্ত্রিক, কিন্তু সম্প্রসারণবাদী দেশগুলির মতই আগ্রাসী।

লক্ষ্যনীয় যে এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, তৃতীয় বিশ্ববাদীদের দ্বারা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিনিধিত্ব হয়ে চীনা রাষ্ট্র পূর্ববাংলার মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করেনি যেহেতু এটা তাদের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মিত্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাচ্ছিল বলে তারা মনে করেছিল।

একজন প্রকৃত কমিউনিস্ট হিসেবে সিরাজ সিকদার মাও সেতুঙ ও তার শিক্ষাকে উপলব্ধি করে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাই, তার পথনির্দেশক চিন্তাধারা সরাসরি এই তৃতীয় বিশ্ববাদী মতের বিরুদ্ধে যায় যা মনে করেছিলsikderএকটা নিপীড়িত দেশ হিসেবে পাকিস্তানের উপনিবেশ থাকতে পারেনা। তৃতীয় বিশ্ববাদীরা তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশের মধ্য কোন দ্বন্দ্ব খুঁজে পায়না।

তৃতীয় বিশ্ববাদের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যে এটা দ্বান্দ্বিকতাকে বর্জন করে, আর তাই নিপীড়িত দেশগুলির দ্বন্দ্বসমূহকে বর্জন করে, যেগুলো “জাতীয় রাষ্ট্র” নয় বরং আধা-উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশ।

৭০ দশকের প্রথম দিকগুলিতে, মস্কোপন্থী গ্রুপগুলো ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার দালালদের সমর্থন করে যেখানে চীনাপন্থী তৃতীয়বিশ্ববাদীরা পাকিস্তানী সম্প্রসারণবাদ ও তার দালালদের সমর্থন করে।

দুনিয়ার সর্বত্র আমরা দেখি নিপীড়িত দেশগুলিতে, সংশোধনবাদীরা আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদকে সমর্থন করে, এক জাতীয়বাদী ভুমিকায় একই সাথে সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদীদের জন্য কাজ করে যাদেরকে তারা “প্রগতিশীল” হিসেব বেছে নেয়।

সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতেও এই ধারা অস্তিত্বশীল, নির্দিষ্টত দ্বিতীয় বিশ্বে ও পরাশক্তিগুলির বিরুদ্ধে এর খেলায়।

সাম্রাজবাদী দেশে উদাহারণস্বরূপ, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সে, যেসব সংগঠন নিজেদের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাও সেতুঙ চিন্তাধারার দাবি করত আর ১৯৬০, ১৯৭০ ও ১৯৮০ দশকে সক্রিয় ছিল তারা সবাই তাদের সকল তাত্ত্বিক অবস্থান প্রকাশ করেছিল “তিন বিশ্ব” সংশ্লিষ্ট হিসেবে, কিন্তু কোনভাবেই সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বকে আরো ভালভাবে বোঝার “একটা হাতিয়ার” হিসেবে “তিন বিশ্ব”এর সঠিক উপলব্ধি তাদের ছিলনা।

এখানে “তিন বিশ্ব”কে কর্ম তৎপরতার রণনৈতিক দিশা হিসেবে যান্ত্রিকভাবে অপপ্রয়োগের সবচেয়ে নেতিবাচক উদাহারণ যার সেই বেলজীয় সংগঠন এমএডিএ-টিপিও যা কিনা ১৯৭৯ তে পিটিবি-পিভিবিএ—যারা সুবিধাবাদীভাবে ভুলে যায় যে শ্রেণীহীন এক তত্ত্ব কখনোই সর্বহারা শ্রেণীর তত্ত্ব হতে পারেনা।

তাই, ৮মে ১৯৭৬, তার “শান্তি, জাতীয় স্বাধীনতা, জনগণের গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কর্মসূচি”তে “উদীয়মান ও আগ্রাসী রুশ একাধিপত্যবাদ ও পতনশীল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যে কিনা আত্মরক্ষাত্মক অবস্থানে আছে—এই দুইয়ের মধ্য শক্তি সম্পর্কের বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে এএমএডিএ-টিপিও ব্যাখ্যা করে যে ন্যাটোকে এক প্রয়োজনীয় কাঠামো হিসেবে বুঝতে হবে যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে “সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ‘নিজ শক্তির উপর নির্ভর করা’, সমতা, আর পারস্পরিক আভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা” নীতির ভিত্তিতে আত্মরক্ষামূলক জোটে আসা যায়।

পূর্ণ আত্মগতভাবে নিমজ্জিত হয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও বেলজীয় বুর্জোয়ার সাথে ঐক্যবদ্ধ ব্লক গঠনের আকাঙ্খায়, এএমএডিএ-পিটিও ন্যাটোকে একটা “আশ্রয়” হিসেবে বিশ্লেষণ করে যেখানে উল্লেখিত জাতীয় দিকে ধাবিত সকল ধারাকে সমর্থন করা সম্ভব হবে।

যেহেতু এএমএডিএ-টিপিও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মুঠোর মধ্যে সমতা, পারস্পরিক হস্তক্ষেপ না করা, জাতীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদানকারীতে পরিণত হয়েছে, তাই এটা বোঝা দুষ্কর নয় যে এসব পরিকল্পনার সাথে মাও সেতুঙ ও গনসালো কর্তৃক জনপ্রিয়কৃত “তিন বিশ্ব” এর কোন সম্পর্ক নেই।

“আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ অবনতিশীল” এর উপর তাদের “বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি”কে সমর্থন ১৯৭৬ এর শেষের অর্থাৎ চীনের পার্টি বিরোধী সংশোধনবাদী চক্রের বিজয়ের পর “বেজিং রিভিউ” এর থেকে হুয়া কুয়া ফেঙ ও দেঙ শিয়াওপিঙ এর থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছিল।

এএমএডিএ-টিপিও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সংগঠন-মাও সেতুঙ চিন্তাধারার মুখোশ পরে ছিল; ব্যবহারিকভাবে সে ইতিমধ্যেই একটা গণবাদী সংগঠনে পরিণত হয় যে ছিল মূলত এক “সামাজিক” লাইন ও মাও সেতুঙ পরবর্তী কালের ফ্যাসিবাদী চীনকে উদযাপন করার করার প্রবক্তা।

ফরাসী সিপিএমএলএফও খুবই একই ধরণের বিবর্তন অনুসরণ করে।

এটা দেখায় যে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ভিত্তিতে বাস্তবতার বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে শ্রেণীসংগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এবং পথনির্দেশক চিন্তাধারার জন্মের মাধ্যমে; বিপ্লব আত্মগতভাব অথবা রাপচারবাদ এর উপর দাঁড়াতে পারেনা, না এমনকি তৃতীয় বিশ্বের নামে।

অতিবাম বিচ্যুতি সবসময় আত্মগতভাবকে ভিত্তি করে হয়। এটা নিপীড়ণের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্রভাবে “না” বলার ভাণ করে শোষণের কোন বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি ছাড়াই।

আজকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুটি প্রধান “তৃতীয় বিশ্ববাদী” কাঠামো রয়েছে, উদাহারণস্বরূপ, “রেভুল্যুশনারী এন্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট মুভমেন্ট” ও “লিডিং লাইট”। উভয়েই মাওবাদী হওয়ার ভাণ করে মাওবাদকে বর্জনের জন্যঃ বিগত মাসগুলিতে সর্বহারা চরিত্রের ভাণ করার পর তারা সর্বদা কেবল অধিক অধিক আত্মগতভাবে নুয়ে পড়ে। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ দশক জুড়ে এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই ঘটেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড আর পশ্চিম জার্মানিতে রেড আর্মি ফ্র্যাকশন সহকারে।

সেইসব প্রকৃত বিপ্লবীরা নিজ দেশে পথ খুঁজে পেতে এক পথনির্দেশক চিন্তাধারা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাই তারা বিপ্লবের চালিকাশক্তি অন্য কোথাও খুঁজে পায়। আসুন এখানে রেড আর্মি ফ্র্যাকশনকে উদ্ধৃত করিঃ

“যদি তৃতীয় বিশ্বের জনগণ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবের অগ্রপথিক হন, তাহলে এটা এই অর্থ করে যে তারা বস্তুগতভাবে মেট্রোপোলে জনগণের নিজ স্বাধীনতা অর্জনে সর্বাধিক আশার প্রতিনিধিত্ব করেন।

যদি এই হয় ঘটনা, তাহলে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের মুক্তি সংগ্রাম আর মেট্রোপোলে স্বাধীনতার জন্য আকাঙ্খা যেখানেই তা উদ্ভূত হোক না কেন—এর মধ্যে একটা যোগাযোগ স্থাপন করা। অর্থাৎ গ্রেড স্কুল, উচ্চ বিদ্যালয়, কারখানা, পরিবার, কারাগার, দপ্তর, হাসপাতাল, সদর দপ্তর, রাজনৈতিক দল, ইউনিয়ন যেখানেই হোক।

আমরা ভোগবাদ, মিডিয়া, ব্যবস্থাপনা, সুবিধাবাদ, গোঁড়ামিবাদ, কর্তৃত্ব, পিতৃতন্ত্র, পাশবিকতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদসহ সেসবকিছুর বিরুদ্ধে যা খোলাখুলিভাবে নেতিকরন করে, দমন করে আর ধ্বংস করে এই সংযোগকে।

‘এর অর্থ আমরা!’ আমরা হচ্ছি বিপ্লবী জিনিস।

যেই সংগ্রাম শুরু করে আর প্রতিরোধ করে সেই আমাদের একজন।”

এটা আত্মগতভাব। সাম্রাজ্যবাদী দেশে বিপ্লব তৃতীয় বিশ্বের সাথে “যোগাযোগ” এর উপর নির্ভর করে না, বরং এক পথনির্দেশক চিন্তাধারার উপর যা হচ্ছে বিশ্ববিপ্লবের কাঠামোর marxengels1মধ্যে। এছাড়া অন্য কিছু বলা মানে পুঁজিবাদী সমাজের অভ্যন্তরে বুর্জোয়া ও সর্বহারার মধ্যেকার বৈর দ্বন্দ্বকে নেতিকরণ করা।

প্রতিটি দেশে, দ্বন্দ্ব হচ্ছে আভ্যন্তরীণ; যেমনটা মাও “দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে”তে বলেছেনঃ

“কোন জিনিসের মধ্যেকার বিকাশের মৌলিকে কারন বাহ্যিক নয় বরং আভ্যন্তরীণ; এটা বস্তুটির মধ্যকার বৈপরীত্যের মধ্যে নিহিত। প্রতিটি বস্তুর মধ্যে রয়েছে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, তাই সে গতি ও বিকাশ প্রাপ্ত হয়।”

এই অর্থে, তৃতীয় বিশ্ববাদ হচ্ছে এক প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ যা কেবল বিভ্রান্তি আনে আর যে লক্ষ্য হচ্ছে আজকে যা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ সেই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দ্বারা বাস্তবতার অধ্যয়নকে রুদ্ধ করা।

আসুন মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে অধ্যয়ন করি! মাওবাদের পতাকার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হই!

আত্মগতভাবকে পরিহার করুন, এক পথনির্দেশক চিন্তাধারার বিপ্লবী পূর্বশর্তকে এগিয়ে নিন!

সাম্যবাদের পূর্ব পর্যন্ত গণযুদ্ধ!

১। প্রথম দলিল

১৪ জুলাই ১৯৬৩তে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির জবাব দিয়েছিল যে চিঠির তা ২৫ পয়েন্টের চিঠি হিসেবে বিখ্যাত হয়। এর অষ্টম পয়েন্ট এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করে যাদেরকে তুলে ধরা হয়েছে “বিশ্ববিপ্লবের ঝটিকাকেন্দ্র” হিসেবে।

৮। সমকালীন বিশ্বের বহুবিধ ধরণের দ্বন্দ্ব এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার বিশাল এলাকাসমূহে কেন্দ্রীভূত হয়েছে; এগুলো হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অধীন সর্বাধিক স্পর্শকাতর এলাকা আর বিশ্ববিপ্লবের ঝটিকাকেন্দ্র যা সাম্রাজ্যবাদের উপর সরাসরি আঘাত হানে।

এসকল এলাকার গণতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলন আর আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন হচ্ছে আমাদের কালের দুই বিরাট ঐতিহাসিক ধারা।

এসকল এলাকার জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছে সমকালীন সর্বহারা বিশ্ববিপ্লবের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধি বিপ্লবী সংগ্রামসমূহ সাম্রাজ্যবাদ আর পুরোনো ও নয়া উপনিবেশবাদের শাসনের ভিত্তির উপর আঘাত হানছে ও ভেঙে দিচ্ছে আর বর্তমানে তারা হচ্ছে বিশ্ব শান্তির এক প্রচণ্ড শক্তি।

এই অর্থে আন্তর্জাতিক বিপ্লবের সম্পূর্ন কর্মসূচি এসকল এলাকার জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের ফলের উপর উপর নির্ভর করছে যারা বিশ্ব জনগণের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ।

তাই, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী সংগ্রাম স্রেফ আঞ্চলিক গুরুত্বের নয় নিশ্চিতভাবে বরং সর্বহারা বিশ্ববিপ্লবের সমগ্র আদর্শের সামগ্রিক গুরুত্বসম্পন্ন।

কিছু লোক এমনকি এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকান জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী সংগ্রামের বিরাট আন্তর্জাতিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করা পর্যন্ত এগোয়, আর তারা জাতি, বর্ণ ও ভৌগোলিক আঞ্চলিকতার বাঁধা ভাঙার অজুহাতে চেষ্টা করছে নিপীড়িত ও নিপীড়ক জাতির মধ্যে পার্থক্যকে মুছে দিতে, মুছে দিতে নিপীড়িত দেশ ও নিপীড়ক দেশের মধ্যের পার্থক্য রেখা, তারা এলাকাসমূহের জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামকে দাবিয়ে দিতে চায়। বস্তুত এরা সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজনকে সেবা করে আর এসব অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদের শাসন ন্যায্য করতে এবং পুরোনো ও নয়া উপনিবেশবাদের এর পলিসিকে এগিয়ে নিতে নতুন “তত্ত্ব” সৃষ্টি করে। প্রকৃতপক্ষে এই “তত্ত্ব” ভাঙতে চায় জাতীয়তা, বর্ণ ও ভৌগলিক আঞ্চলিকতার বাঁধা নয় বরং বজায় রাখতে চায় নিপীড়িত জাতিসমূহের উপর “শ্রেষ্ঠতর জাতিসমূহের” শাসন। এই ভণ্ড “তত্ত্ব” খুবই স্বাভাবিকভাবে এতদঞ্চলের জনগণের দ্বারা বর্জিত হয়।

প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক দেশ ও পুঁজিবাদী দেশের শ্রমিকশ্রেণীকে লড়াকু শ্লোগান “সারা দুনিয়ার সর্বহারা এক হও!” আর “সারা দুনিয়ার সর্বহারা ও নিপীড়িত জাতিসমূহ এক হও! সত্যিকারভাবে কার্যকরী করতে হবে। তাকে এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী অভিজ্ঞতাকে অবশ্যই অধ্যয়ন করতে হবে, তাদের বিপ্লবী কর্মতৎপরতাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করতে হবে, তাদের মুক্তির আদর্শকে শ্রদ্ধা করতে হবে নিজের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমর্থন হিসবে আর নিজ স্বার্থের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে। জাতিয়তা, বর্ণ ও ভৌগলিক আঞ্চলিকতার বাঁধাকে ভাঙার এটাই একমাত্র কার্যকর পথ আর এটাই একমাত্র সত্যিকার সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ।

ইউরোপিয় ও আমেরিকান পুঁজিবাদী দেশগুলির শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে অসম্ভব হবে পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিজেকে মুক্ত করতে যদিনা তারা নিপীড়িত জাতিসমূহের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয় আর সেসকল জাতি মুক্ত হয়। লেনিন সঠিকভাবেই বলেছেন,

“অগ্রসর দেশগুলিতে বিপ্লবী আন্দোলন হতো আসলে পুরো ভণ্ডামি যদিনা পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ইউরোপ ও আমেরিয়ার শ্রমিকেরা পুঁজির দ্বারা নিপীড়িত কোটি কোটি “ঔপনিবেশিক” দাসদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে ও পূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়।“ (লেনিন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেস)।

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোনের কিছু লোক এখন নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তির সংগ্রামের প্রতি নিষ্ক্রিয় অথবা অবহেলার অথবা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছেন। বস্তুত তারা একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থকে রক্ষা করছেন সর্বহারা শ্রেণীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আর সমাজ গণতন্ত্রীতে অধঃপতিত হয়ে।

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকান দেশগুলির জনগনের বিপ্লবী সংগ্রামকে কোন দৃষ্টিতে দেখা হবে তা হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড যারা বিপ্লব চায় আর যারা চায়না তাদের মধ্যে আর যারা সতিকারভাবে বিশ্বশান্তিকে রক্ষা করছে আর যারা আগ্রাসন ও যুদ্ধের শক্তিকে সহযোগিতা করছে তাদের মধ্যে।”

(২) দ্বিতীয় দলিল

এখানে লেনিনের “সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর” থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হল যা শ্রমিক অভিজাত এর প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেছে।

“এটা নির্দিষ্টভাবে পুঁজিবাদের পরগাছাবৃত্তি ও পঁচন, যা এর বিকাশের সর্বোচ্চ ঐতিহাসিক পর্যায়ের, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট। এই পুস্তিকাতে যা দেখানো হয়েছে, পুঁজিবাদ আলাদা করে তুলে ধরেছে মুষ্টিমেয় (দুনিয়ার বসবাসকারীদের এক দশমাংশের কম; সর্বাধিক “ভদ্র” ও উদার গণনায় বলা যায় এক-পঞ্চমাংশের কম) ব্যতিক্রমী ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র যারা সমগ্র বিশ্বকে লুন্ঠন করে স্রেফ “কুপন কেটে”। প্রাক-যুদ্ধ মূল্যহারে এবং এবং এবং প্রাক-যুদ্ধ বুর্জোয়া পরিসংখ্যান অনুসারে পুঁজি রপ্তানি থেকে বছরে মিলত ৮০০ থেকে ১০০০ কোটি ফ্রাঙ্ক। এখন নিশ্চয় আরো অনেক বেশি।

নিশ্চিতভাবেই এমন বিপুল অতিমুনাফা (যেহেতু সেগুলো পুঁজিপতিরা “নিজ” দেশের শ্রমিকদের নিঙড়ে নেয়া মুনাফা থেকে এটা অতিরিক্ত) দ্বারা শ্রমিক নেতাদের ও শ্রমিক অভিজাততন্ত্রের উপরি স্তরকে ঘুষ দিয়ে কেনা সম্ভব। আর এটাই “অগ্রসর” দেশগুলির পুঁজিপতিরা করছেঃ তারা তাদেরকে ঘুষ দিচ্ছে হাজারো উপায়ে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, প্রকাশ্য বা গোপনে।

বুর্জোয়া বনে যাওয়া শ্রমিক অথবা ‘শ্রমিক আভিজাত্যের এই যে স্তরটি জীবনযাত্রার ধরনে, বেতনের পরিমানে এবং নিজেদের সমগ্র বিশ্ববীক্ষায় সম্পূর্ণ কূপমন্ডুক, এরাই হল দ্বিতীয় আন্তরজাতিকের প্রধান নির্ভরস্থল এবং আমাদের কালে বুর্জোয়াদের প্রধান সামাজিক (সামরিক নয়) নির্ভরস্থল। কারণ তারাই হল শ্রমিক আন্দোলনে বুর্জোয়াদের সত্যকার দালাল, পুঁজিপতি শ্রেণীর শ্রমিক লেফটেন্যান্ট, সংস্কারবাদ ও শোভিনিজমের প্রকৃত চালিকাশক্তি। সর্বহারা এবং বুর্জোয়াদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে অনিবার্যভাবেই তারা যায় বুর্জোয়াদের পক্ষে — ‘কমিউনারদের’ বিরুদ্ধে ‘ভার্সাইপন্থীদের’ পক্ষে এবং কম সংখ্যায় নয়।

এই ঘটনার অর্থনৈতিক মূলগুলি না বুঝলে এবং এর রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন না করলে আন্দোলনের এবং আসন্ন সামাজিক বিপ্লবের ব্যবহারিক কর্তব্য সাধনের ক্ষেত্রে এক পাও এগুনো যাবেনা।”

(৩) তৃতীয় দলিল

এই দলিলটি হচ্ছে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ মাও সেতুঙ ও কেনেথ ডেভিড কাউন্ডার মধ্যে একটি আলোচনার মৌখিক রেকর্ডের অংশ; এটা চীনে “তিন বিশ্ব” সম্পর্কে মাও সেতুঙের দৃষ্টিভঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিলঃ

“সভাপতি মাওসেতুঙ (এখানে মাও নামে পরে আসবে)ঃ আমরা আশা করি তৃতীয় বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হবে। তৃতীয় বিশ্বের রয়েছে এক বিরাট জনসংখ্যা!

সভাপতি কেনেথ কাউন্ডা (এখানে কাউন্ডা নামে পরে আসবে)ঃ ঠিক!

মাওঃ প্রথম বিশ্বে কারা পড়ে?

কাউন্ডাঃ আমার মনে হয় এটা দুনিয়ার শোষক ও সাম্রাজ্যবাদীরা হবে।

মাওঃ আর দ্বিতীয় বিশ্ব?

কাউন্ডাঃ যারা সংশোধনবাদীতে পরিণত হয়েছে।

মাওঃ আমার মতে মার্কিন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম বিশ্ব্। মধ্যবর্তী উপাদান যেমন জাপান, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা দ্বিতীয় বিশ্বে পড়ে। আমরা হচ্ছি তৃতীয় বিশ্ব।

কাউন্ডাঃ জনাব সভাপতি, আমি আপনার বিশ্লেষণের সাথে একমত।

মাওঃ মার্কিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের রয়েছে প্রচুর পারমাণবিক বোমা, আর তারা অধিকতর ধনী। দ্বিতীয় বিশ্বের ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর কানাডার অত বেশি পারমাণবিক বোমা নেই আর তারা প্রথম বিশ্বের মত অতটা ধনীও নয়, কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের চেয়ে ধনী। আপনি এই বর্ণনা সম্পর্কে কী মনে করেন?

কাউন্ডাঃ জনাব সভাপতি, আপনার বিশ্লেষণ খুবই প্রাসঙ্গিক ও সঠিক।

মাওঃ আমরা এটা আলোচনা করতে পারি।

কাউন্ডাঃ আমার মনে হয় আমরা আলোচনা ছাড়াই ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারি, কারণ আমি বিশ্বাস করি এই বিশ্লেষণ ইতিমধ্যেই খুবই প্রাসঙ্গিক।

মাওঃ তৃতীয় বিশ্ব খুব জনবহুল।

কাউন্ডাঃ যথাযথ।

মাওঃ জাপান ছাড়া সকল এশীয় দেশ তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্গত। সমগ্র আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকাও তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্গত।

(৪) চতুর্থ দলিল

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পুঁজিবাদপন্থী অংশের প্রধান দেঙ শিয়াওপিঙ ১০ এপ্রিল ১৯৭৪ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিনিধি হিসেবে প্রকাশ্যে “তিন বিশ্ব” এর ধারণা তুলে ধরেন। এখানে তা হতে উদ্ধৃত করা হলঃ

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে প্রথম বিশ্ব। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও অন্য অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে তৃতীয় বিশ্ব। এই দুইয়ের মাঝের উন্নত দেশগুলি দ্বিতীয় বিশ্ব (…)।

অজস্র তথ্য দেখায় যে সকল মত যা দুই একাধিপত্যবাদী শক্তিকে অতিমূল্যায়ন করে আর জনগণের শক্তিকে খাটো করে দেখে সেসবই ভিত্তিহীন। একটা দুইটা পরাশক্তি সত্যকার অর্থে শক্তিশালী নয়; সতিকার শক্তিশালী হল তৃতীয় বিশ্ব আর এই যে সকল দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, সাহসের সাথে লড়াই করতে সাহসী হচ্ছে আর বিজয় অর্জন করতে সাহসী হচ্ছে।

যেহেতু বহু তৃতীয় বিশ্বের দেশ ও জনগণ দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, নিশ্চিতভাবে তারা এই ভিত্তিতে সক্ষম হবেন টিকে থাকার সামর্থযুক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে সেই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন করতে যা অসমতা, নিয়ন্ত্রন ও শোষণের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে, এভাবে তাদের ঐক্যকে শক্তিশালী করে ও পরাশক্তির সাথে সংঘাতরত অন্যান্য দেশের সাথে মিত্রতাবদ্ধ হয়ে ও সেইসাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণসহ সারা দুনিয়ার জনগণের সাথে মিলে তাদের জাতীয় অর্থনীতির স্বাধীন বিকাশের আবশ্যকীয় শর্ত সৃষ্টি করবেন (…)।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি দাবি করে বর্তমান চরম অসম আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন আর তারা অনেক যৌক্তিক প্রস্তাব তুলে ধরেছেন সংস্কারের। চীনা সরকার ও জনগণ উষ্ণভাবে তার স্বীকৃতি দেয় আর সকল তৃতীয় বিশ্বের দেশের ন্যায্য প্রস্তাবনাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।”

(৫) পঞ্চম দলিল

মাও সেতুঙের লাল লাইন ও দেঙ শিয়াওপিঙ (অথবা লিন পিয়াও) এর কালো লাইনের পার্থক্য ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানীর মত দেশে উপলব্ধ হয়নি। তাই, এই দেশগুলিতে চীনা মতাবস্থানকে সামগ্রিকভাবে “সাম্রাজ্যবাদবিরোধী” হিসেবে দেখা হয়েছে, তৃতীয় বিশ্বকে বিশ্ব ইতিহাসের নয়া কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখে।

এই লাইন অনুসারে সাম্রাজ্যবাদী “মেট্রোপোল” বিপ্লবী দ্বন্দ্ব আর ধারণ করেনা; প্রকৃত বিপ্লবীদেরকে “তৃতীয় বিশ্ব”কে অনুসরণ করতে হবে। ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানীর ছাত্র আন্দোলনে এই মত খুবই শক্তিশালী ছিল; এই শেষটিতে এর উপর ভিত্তি কিরে এক সশস্ত্র সংগঠন পর্যন্ত গড়ে উঠে।

এখানে রেড আর্মি ফ্যাকশনের ধারণা পাওয়া যায়, ১ নভেম্বর ১৯৭২তে এক বিবৃতি থেকে, মিউনিখের গ্রীস্মকালীন অলিম্পিকের সময় ফিলিস্তিন সংগঠন “ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর” কর্তৃক এগার জন ইসরায়েলি দৌঁড়বিদ ও কর্মকর্তার অপহরণ ও হত্যার পরে যা প্রদত্ত।

“কাল সেপ্টেম্বর এর রণনীতি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী রণনীতি উভয়ত তৃতীয় বিশ্ব এবং মেট্রোপোলে বহুজতিক কর্পোরেশনগুলো কর্তৃক সৃষ্ট সাম্রাজ্যবাদী পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে (…)।

হামবুর্গে স্ট্রুভার কর্পোরেশনের উপর বোমা হামলা ছিল ইসরায়েলের সামরিক যোগানদাতাদের উপর আক্রমণ।

অলিম্পিক গ্রামে তাদের একশনসমেত তারা সাম্রাজ্যবাদী মেট্রোপোল ইসরায়েল আর পেরিফেরি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ে এসেছে এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে, তারা এফআরজি (পশ্চিম জার্মানী)র “সাংবিধানিক” মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে আর সাম্রাজ্যবাদের ছদ্মবেশের সত্যিকার বস্তুগত চরিত্র উন্মোচিত করেঃ এই যে তারা তৃতীয় বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে আর তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে রণনৈতিক গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদ (…)।

সুবিধাবাদের সমস্যা হচ্ছে এই যে এর ব্যবহার করে নেখট নিজের সম্পর্কে উন্মোচন করে, কিন্তু বিশ্ব সম্পর্কে কোন কিছুই না। ব্যবস্থার বিশ্লেষণ করে বিপ্লবীরা তার পরিচয় ন্যস্ত করে এই জ্ঞানের উপর যে তৃতীয় বিশ্বের জনগণ হচ্ছে অগ্রবাহিনী, আর এই গ্রহণযোগ্যতা যে মেট্রোপোলে জনগণের সম্পর্কে লেনিনের “শ্রম অভিজাত” তত্ত্বকে কাটছাট বা বাতিল করা যায় না। বিপরীতে সবকিছুই সেখান থেকে যাত্রা করে।

মেট্রোপোলে জনগণের উপর যে শোষণ চলে তার সাথে মার্কসের মুজুরি শ্রমিকদের উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণ সংক্রান্ত তত্ত্বের কোনই সম্পর্কে নেই।

অধিক থেকে অধিকতর শ্রমবিভাগের সাথে এটা সত্য যে উৎপাদনের ক্ষেত্রে শোষণের প্রচণ্ড প্রাবল্য ও বিস্তার হয়েছে, আর কাজ হয়েছে আরো বড় বোঝা, উভয়ত শারিরীক ও মানসিকভাবে।

এটাও সত্য যে ৮ ঘন্টা শ্রমদিবসের সূচনার সাথে—যা হচ্ছে কাজের প্রাবল্য বৃদ্ধির শর্ত—জনগণের যা মুক্ত সময় ছিল তা ব্যবস্থা কুক্ষিগত করে নিয়েছে। কারখানার শারিরীক শোষণের সাথে যুক্ত হয়েছে তাদের চিন্তাভাবনা, ইচ্ছা আকাঙ্খা ও ইউটোপীয় স্বপ্নকে শোষণ—কারখানার পুঁজিবাদী অত্যাচারের সাথে জীবনের সকল ক্ষেত্রের পুঁজিবাদী অত্যাচার যুক্ত হয়েছে, গণভোগ ও গণ মাধ্যমের মাধ্যমে।

৮ ঘন্টা কর্মদিবসের সূচনার সাথে, শ্রমিক শ্রেণীর উপর দিনের ২৪ ঘন্টা ব্যবস্থার আধিপত্য জয়যাত্রা শুরু করে—গণ ক্রয় ক্ষমতা আর “সর্বোচ্চ আয়” এর প্রতিষ্ঠার সাথে ব্যবস্থা তার জয়যাত্রা শুরু করে জনগণের পরিকল্পনা, আকাঙ্খা, বিকল্প, কল্পনা আর স্বতস্ফূর্ততার উপর; সংক্ষেপে, জনগণের নিজের উপর!

ব্যবস্থা মেট্রোপোলে জনগনকে টেনে আনতে সক্ষম অয়েছে নিজ ময়লার ভিতর এতটাই যে তারা নিজেদের পরিস্থিতির নিপীড়ক ও শোষণমূলক চরিত্র সম্পর্কে আর সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার শিকার হিসেবে তাদের পরিস্থিতি বোঝার শক্তি ব্যাপকভাবে হারিয়েছে মনে হয়। যাতে তারা একটা গাড়ি, একজোড়া জিন্স, জীবনবীমা আর একটা ঋণের জন্য সহজেই ব্যবস্থার পক্ষ হতে কোন চরম নিষ্ঠুরতা মেনে নিতে পারে। বস্তুত তারা একটা গাড়ি, একটা অবকাশ আর একটা টাইল বাথরুমের বাইরে কোনকিছু চিন্তা বা আকাঙ্খা করতে আর পারেনা।

এথেকে দেখা যায়, বিপ্লবী হচ্ছে সেই যে এই জোয়াল ভেঙে মুক্ত হতে চায় আর এই ব্যবস্থার অপরাধে অংশ গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করে। যারা তৃতীয় বিশ্বের জনগণের মুক্তিসংগ্রামে তাদের পরিচয় খুঁজে পায়, যারা প্রত্যাখ্যান করে, যারা কোনভাবেই অংশ গ্রহণ করেনা; তারা সবাই বিপ্লবী—কমরেডগণ (…)।

যদি তৃতীয় বিশ্বের জনগণ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবের অগ্রপথিক হন, তাহলে এটা এই অর্থ করে যে তারা বস্তুগতভাবে মেট্রোপোলে জনগণের নিজ স্বাধীনতা অর্জনে সর্বাধিক আশার প্রতিনিধিত্ব করেন। যদি এই হয় ঘটনা, তাহলে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের মুক্তি সংগ্রাম আর মেট্রোপোলে স্বাধীনতার জন্য আকাঙ্খা যেখানেই তা উদ্ভূত হোক না কেন—এর মধ্যে একটা যোগাযোগ স্থাপন করা। অর্থাৎ গ্রেড স্কুল, উচ্চ বিদ্যালয়, কারখানা, পরিবার, কারাগার, দপ্তর, হাসপাতাল, সদর দপ্তর, রাজনৈতিক দল, ইউনিয়ন যেখানেই হোক।

আমরা ভোগবাদ, মিডিয়া, পারস্পরিক ব্যবস্থাপনা, সুবিধাবাদ, গোঁড়ামিবাদ, কর্তৃত্ব, পিতৃতন্ত্র, পাশবিকতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদসহ সেসবকিছুর বিরুদ্ধে যা খোলাখুলিভাবে নেতিকরন করে, দমন করে আর ধ্বংস করে এই সংযোগকে।

‘এর অর্থ আমরা!’ আমরা হচ্ছি বিপ্লবী জিনিস।”

যেই সংগ্রাম শুরু করে আর প্রতিরোধ করে সেই আমাদের একজন।”

(৬) ষষ্ঠ দলিল

গুরদুন এন্সলিন, পশ্চিম জার্মান লাল সৈন্যদলের সদস্য হিসেবে ১৯ জানুয়ারি ১৯৭৬তে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে একটা বিবৃতি দেন তার বিচারের সময়। তিনি আরএএফ এর মতাবস্থান তুলে ধরেনঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন হচ্ছে পরোক্ষ মিত্র আর একমাত্র শত্রু হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই, মাওবাদী লাইনকে যেসব সংগঠন রক্ষা করে তারা ভ্রান্ত কারণ তারা মার্কিনকে সহায়তা করবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চাপে ফেলতে।

“আমরা পেরিফেরিতে মুক্তি ফ্রন্ট আর মেট্রোপোলে শ্রেণিসংগ্রামের বিকাশের মধ্যেকার ঐতিহাসিক বর্তমান দ্বান্দ্বিকতা পরিষ্কার করেছি যা হচ্ছে শ্রম ও পুঁজির মধ্যে পার্থক্যরেখা যা একটা ফ্রন্টে বিকশিত হয়েছে (…)।

রাজনৈতিক লাইনের জন্য ফেডারেল রিপাবলিকে মাওবাদী সম্প্রদায়গুলোকে ব্যবহার করা মানে হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রধান শত্রু বলা যা ন্যাটোকে শক্তিশালী করে, আর তা হচ্ছে বিষয়গতভাবে প্রতিক্রিয়াশীল।

তাদের হাস্যকর সাম্যবাদবিরোধিতা বিকাশমান আমেরিকাবাদবিরোধিতাকে নিষ্ক্রিয় করায় সম্প্রসারিত হয় আর তা বাঁধাগ্রস্ত করে বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে বিকাশমান শক্তিসম্পর্কের সচেতনতাকে, যে আন্তমহাদেশীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে মেট্রোপোলে গেরিলারা লড়াই করে।

যতক্ষণ তাদের ধোঁয়াশা লাইন পিতৃভুমি রক্ষার উপরে স্থাপিত, তারা গণ বিদ্রোহবাদের এক জাত্যাভিমানী রকমকে প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে ন্যাটোকে শক্তিশালী করা, আর জার্মান ডেমোক্রাটিক রিপাবলিকে বেআইনি সংগ্রামের জন্যও সংগ্রাম করা, সিপিসি কর্তৃক তাদেরকে লেজুড়ে পরিণত করা ১৯২৯-৩৩ এর সংকটের তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পার্টিসমূহের বিয়োগান্তক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় একটা প্রহসন হিসেবে।

অনেক আগে তারা ক্ষেত্রকে ত্যাগ করেছে যাতে একটা ফ্যাসিবিরোধী ফেডারেল রিপাবলিকের প্রকৃত শক্তিমত্তা নিহিত, আর তা হচ্ছে প্রতিরোধঃ যে ধরণের আত্মরক্ষা তারা সংগঠিত করতে চায় তা স্রেফ পরাজয় কামনা করেনা বরং সে পরাজয় গ্রহণ করে নেয় সংগ্রাম শুরুর আগেই।”

৭) সপ্তম দলিল

মাও সেতুঙ মারা যাওয়ার সাথে সাথেই আনোয়ার হোজা আর আলবেনিয়ার লেবার পার্টি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে আর তাকে প্রতিবিপ্লবী হিসেবে নিন্দা জানায়। একটা প্রধান যুক্তি ছিল “তিন বিশ্ব” এর প্রশ্ন, যেমন এখানে ১৯৭৮ এ চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সিসির প্রতি আলবেনিয়ার লেবার পার্টির সিসির চিঠির অংশবিশেষ।

“মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে মিলন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাথে ঐক্যবদ্ধতার পর, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব “তিন বিশ্ব” এর মার্কসবাদবিরোধী ও প্রতিবিপ্লবী তত্ত্ব ঘোষণা করে যা সে বিপ্লবের রণনীতি হিসেবে উপস্থাপন করে, মার্কসবাদী লেনিনবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলন আর সারা দুনিয়ার জনগণের উপর আরোপ করার প্রচেষ্টা চালায় তাদের সংগ্রামের একটা সাধারণ লাইন হিসেবে (…)।

বর্তমানে পরাশক্তি হওয়ার চীনা পরিকল্পনা তার কুখ্যাত “তিন বিশ্ব” তত্ত্বে আকৃতি লাভ করেছে। “তিন বিশ্ব” তত্ত্ব মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সুবিধাবাদী, সংশোধনবাদী ও নৈরাজ্যবাদী সিন্ডিক্যালিস্ট ভাবধারা ও থিসিসের দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে চায়, এটা সর্বহারার বিপ্লবী ভাবমানস ও তার শ্রেণীসংগ্রামকে নির্জীব করে দিতে চায় বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে একটা ঐক্যজোটের কথা বলে।

বিপ্লবের জন্য সময় পরিপক্ক হয়নি এই কথা বলে “তিন বিশ্ব” তত্ত্ব ক্ষমতাসীনদের টিকিয়ে রাখতে চায়, বর্তমান পুঁজিবাদী, উপনিবেশবাদী ও নয়া ঔপনিবেশিক নিপীড়ণ ও শোষণকে টিকিয়ে রাখতে চায়।

সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ থেকে জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার অসিলায়—যাকে তারা একমাত্র বিপদ ও হুমকি মনে করে, চীনের দরকার হচ্ছে জনগণ যেন জাতীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির তাদের সংগ্রাম পরিত্যাগ করে, যাতে তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ও সাবেক উপনিবেশবাদী পশ্চিমের পুঁজিবাদী শক্তির অধীনস্ত হয়।

সে সাধারণ বাজার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে শক্তিশালী করার উপর জোর দেয় যা হছে ইউরোপে সর্বহারা শ্রেনীকে পুঁজিবাদী জোয়ালে বেঁধে রাখা আর অন্যান্য দেশের জনগণকে নিপীড়ণ ও শোষণ করা। পরাশক্তিদের অস্ত্র প্রতিযোগিতার উন্মাদনা সৃষ্টি করে আর ন্যাটো হিসেবে মার্কিন আর অন্য সামরিক ব্লকগুলির যুদ্ধযন্ত্রের উপর নির্ভর করে “তৃতীয় বিশ্ব” তত্ত্ব সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধকে উস্কে দেয়।

“তিন বিশ্ব” তত্ত্ব হচ্ছে যাকে তারা “তৃতীয় বিশ্ব”(…) বলে তার উপর একাধিপত্য চালানোর চীনের আকাঙ্খার ধোঁয়া। “তিন বিশ্ব” তত্ত্বের প্রয়োগ চালিত করে চীনা নেতৃত্বকে এমনকি “শয়তান” এর সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইউরোপের একচেটিয়াবাদীদের সাথ ঐক্যবদ্ধ হতে, ফ্যাসিবাদী ও বর্নবাদীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে, রাজা ও জমিদারদের সাথে আর সর্বাধিক দুষ্ট সমরবাদী ও যুদ্ধবাজদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে।

পিনোচেট ও ফ্রাঙ্কো, ওয়েরমেখতের সাবেক নাৎসী জেনারেলদের সাথে, জাপানী সাম্রাজ্যবাদী বাহিনী, যেমন মবুতু ও রক্তপিপাসু রাজাদের মত ছদ্মবেশী অপরাধীরা, মার্কিন প্রভুরা ও বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের সভাপতিরা তার মিত্রে পরিণত হয়। এই মার্কসবাদবিরোধী লাইন চীনের নেতৃত্বকে টিটো, কারিয়ো ও অন্যান্য সংশোধনবাদীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিকে চালিত করে। একসময় সে টিটোর বিরোধী ছিল, আর এখন সে তার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এটা মার্কসবাদী লেনিনবাদী নীতিমালার উপর এর ঘাটতি আর তার লাইনের ভিন্নতা প্রমাণ করে।”

(৮) অষ্টম দলিল

তুরস্কে টিকেপি/এমএল মনে করেছিল যে, যেহেতু “তিন বিশ্ব” তত্ত্ব দেঙ শিয়াওপিঙ তুলে ধরেছে, মাও সেতুঙ কর্তৃক এর অন্য কোন বর্ণনা থাকতে পারেনা। মাও সেতুঙের মৃত্যুর তৃতীয় বার্ষিকীতে ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯তে প্রকাশিত এক দলিলের অংশবিশেষে এখানে টিকেপি/এমএল এর অবস্থান পাওয়া যায়।

“বর্তমানে, মাও সেতুঙের বিরুদ্ধে আক্রমণ কেবল শাসক শ্রেণীসমূহের দ্বারাই হচ্ছেনা। আন্তর্জাতিকভাবে আলোচ্যসুচিতে এটা নিয়ে আসা হয়েছে যে মাও সেতুঙ একজন প্রকৃত কমিউনিস্ট ছিলেন কিনা।

এটা আলবেনিয়ায় জাতীয় ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে নেতৃত্বকারী পিএলএ (আলবেনিয়ার লেবার পার্টি) কর্তৃক সূচিত হয়েছে যে কিনা সমাজতন্ত্র বিনির্মানে আলবেনিয়ার সর্বহারা শ্রেণীকে পথ দেখিয়েছে আর সিপিসির সাথে মিলে ক্রুশ্চভীয় আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে আর আমরা এখনো তাকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মনে করি।

পিএলএ দায়িত্বহীনভাবে মাও সেতুঙ ও তার নেতৃত্বে সিপিসির সংগ্রামকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদবিরোধী ও প্রতিবিপ্লবী ঘোষণা করেছে। সে দাবি করেছে যে প্রতিবিপ্লবী “তিন বিশ্ব” তত্ত্বের জন্য মাও দায়ী আর বিশ্বাসঘাতক তেঙ-হুয়া চক্র মাও সেতুঙের লাইনকে অব্যাহত রেখেছে।

পিএলএর এই ভয়ংকর ভুল সারা দুনিয়ার সকল রূপের সুবিধাবাদী ও সংশোধনবাদীদের আনন্দিত করেছে আর সর্বহারা নেতৃত্বের বিপ্লবের উপর ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর জন্য শক্তির এক উৎসে পরিণত হয়েছে।

(৯) নবম দলিল

পেরুতে পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি বিষয়গুলিকে খুবই ভিন্নভাবে উপলব্ধি করেঃ মাও সেতুঙ “তিন বিশ্ব” এর ধারণাকে ব্যবহার করেন, কিন্তু এমনভাবে যা দেঙ শিয়াওপিঙ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৮৮তে প্রকাশিত পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির “আন্তর্জাতিক লাইন”-এ যা বলা হয়েছে তা থেকে এখানে উদ্ধৃত হল।

বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশ্ববিপ্লবের রণনৈতিক আক্রমণে প্রবেশ করেছি, আমরা “৫০ থেকে ১০০ বছর”-এর মধ্যে যাতে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বপ্রতিক্রিয়াসমেত ডুবে যাবে আর আমরা সেই স্তরে প্রবেশ করবো যেখানে সর্বহারা শ্রেণী দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় স্থাপিত হয় ও তার সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

সেখান থেকে সামনের দিকে দ্বন্দ্ব হবে কমিউনিজমের পথের দিকে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে পুনপ্রতিষ্ঠা আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণীর বিকাশের শক্তিশালি ধারাকে নেতিকরণ করেনা, বরং দেখায় যে পুনপ্রতিষ্ঠা ও পাল্টাপুনপ্রতিষ্ঠার মধ্যে সংগ্রাম কত মারাত্মক যেখান থেকে কমিউনিস্টগণ শিক্ষা নেন পুঁজিবাদের পুনপ্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করতে এবং নিশ্চিতভাবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে।

আমরা সভাপতি মাও সেতুঙের এই থিসিসকে পুননিশ্চিত করি যে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে সংগ্রামের একটা পর্যায়কাল শুরু হয়েছে; তাই যারা গণতান্ত্রিক বিপ্লব অথবা সমাজাতান্ত্রিক বিপ্লব করেন সেইসাথে যারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করেন তাদের জন্য বিশ্ব পরিসরে দুই প্রধান শত্রু মূর্ত হয় এবং তাদের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ হচ্ছে যে প্রতিটি আন্দোলন তার প্রধান শত্রু নির্দিষ্ট করে এবং অন্য পরাশক্তিসমূহের অথবা অন্য শক্তিসমূহের আধিপত্যকে মোকাবেলা করতে চায়। পেরুতে, বড় বুর্জোয়া ও ভুস্বামীদের সাথে আঁতাত করে মার্কিন (ইয়াংকি) সাম্রাজ্যবাদ আমাদের উপর আধিপত্য করে।

তথাপি, বিশ্বপরিসরে বিশ্ব একাধিপত্যের জন্য দুই পরাশক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। আমরা আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করি, কিন্তু সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ অথবা অন্য কোন শক্তির আধিপত্য দ্বারা এর প্রতিস্থাপন অনুমোদন করতে পারিনা।

আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ আগ্রাসন রয়েছে যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, চীন ও সেইসাথে অন্য পাশ্চাত্য শক্তির সাথে একাধিপত্যের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতারত এবং সেখানে প্রধান শত্রু হিসেবে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সংগ্রাম চালাতে হবে আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অথবা অন্য কোন শক্তির আধিপত্যের অনুপ্রবেশ অনুমোদন করা যাবেনা। সমস্যা হচ্ছে সংগ্রাম সঠিকভাবে বিকশিত করা হয়নি রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা কমিউনিস্ট পার্টির অভাবে।

সংশ্লেষণে, দুই পরাশক্তি রয়েছে যারা হচ্ছে প্রধান শত্রু যার মধ্যে একটা হচ্ছে প্রতি ক্ষেত্রে প্রধান এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের তৎপরতাকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারিনা।

তিন বিশ্ব পৃথকীকৃত হয়ঃ সভাপতি মাওয়ের এঈ থিসিসকে আমরা ন্যায্য এবং সঠিক মনে করি এবং এই যে এটা শ্রেণী ও দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ ভিত্তিক লেনিনের বিশ্বে শক্তিসমূহের বন্টনসংক্রান্ত থিসিসের সাথে যুক্ত। আমরা তেঙ শিয়াও-পিং এর সুবিধাবাদী ও সংশোধনবাদী তিনবিশ্বের ভ্রান্ত প্রতিনিধিত্বকে প্রত্যাখ্যান করি যা বিপ্লবের সাথে বেঈমানী করার লক্ষ্যে মার্কিন অথবা সোভিয়েত ইউনিয়নের লেজুড়বৃত্তি করে। এথেকে যাত্রা করে, সভাপতি গনসালো বর্তমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেন যাতে তিনবিশ্ব পৃথকীকৃত হয় এবং আরো প্রদর্শন করে যে এটা একটা বাস্তবতা।

প্রথম বিশ্ব হচ্ছে দুই পরাশক্তি মার্কিন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যারা বিশ্বে একাধিপত্যের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতারত এবং যা একটা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ জন্ম দিতে পারে। তারা হচ্ছে পরাশক্তি কারণ তারা অন্য শক্তিসমূহের চাইতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অধিকতর শক্তিধর। মার্কিনের রয়েছে অ-রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া সম্পত্তিকেন্দ্রিক অর্থনীতি, অধিকারের ওপর বেড়ে চলা বিধি-নিষেধসহকারে রাজনৈতিকভাবে এটা এক বুর্জোয়া গণতন্ত্র বিকশিত করে। এটা একটা প্রতিক্রিয়াশীল উদারতাবাদ; সামরিকভাবে পাশ্চাত্যে এটা সবচেয়ে শক্তিধর এবং এর বিকাশের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন রাজনৈতিকভাবে আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়ার ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বসমেত অর্থনৈতিকভাবে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়াভিত্তিক এবং এটা একটা উচ্চপর্যায়ের সামরিক শক্তি যদিও এর বিকাশের প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত। মার্কিন তার আধিপত্যকে বজায় রাখতে চায় এবং তা সম্প্রসারণও করতে চায়। সোভিয়েতের লক্ষ্য সম্প্রসারণের দিকে বেশি কারণ সে একটা নতুন পরাশক্তি এবং অর্থনৈতিকভাবে তার ইউরোপের ওপর আধিপত্যের স্বার্থ রয়েছে নিজ পরিস্থিতি উন্নত করার লক্ষ্যে। সংশ্লেষণে, তারা দুই পরাশক্তি যারা কোন ব্লক গঠণ করেনা কিন্তু দ্বন্দ্ব রয়েছে, পরিস্কার পারস্পরিক পার্থক্য রয়েছে এবং দুনিয়াকে পুনবিভাজনের জন্য তারা ঘোঁট পাঁকানো ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে আগায়।

দ্বিতীয় বিশ্ব হচ্ছে সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ যারা পরাশক্তি নয় কিন্তু ক্ষুদ্রতর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তি যথা-জাপান, জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালী প্রভৃতি যাদের পরাশক্তির সাথে দ্বন্দ্ব রয়েছে কারণ তারা ডলারের অবমূল্যায়ণ, সামরিক বিধি-নিষেধ এবং রাজনৈতিক আরোপ বজায় রাখে; এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ পরাশক্তিসমূহের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিতে চায় নিজেদের নয়া পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত করতে যেহেতু তারাও নিপীড়িত জাতিসূহের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ চালায় এবং অধিকন্তু তাদের মধ্যে তীক্ষ্ণ দ্বন্দ্ব বিরাজমান।

তৃতীয় বিশ্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত দেশগুলিকে নিয়ে গঠিত। তারা হচ্ছে উপনিবেশ অথবা আধাউপনিবেশ যেখানে সামন্তবাদ ধ্বংস হয়নি ও সেই ভিত্তিতে এক আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ গড়ে ওঠে। তারা একটা পরাশক্তি অথবা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে বাঁধা। সাম্রাজ্যবাদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব রয়েছে, অধিকন্তু তারা তাদের নিজ বড় বুর্জোয়া ও সামন্তদের সাথে লড়ে যারা উভয়ই সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিশেষত পরাশক্তির সেবায় ও তাদের সাথে আাঁতাতে আবদ্ধ।

এসবই আমাদের ভিত্তি দেয় যার ওপর কমিউনিস্টরা বিশ্ববিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল প্রতিষ্ঠা করতে পারে। চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ বিশ্ববিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়েছিলেন, কিন্তু চীনা সংশোধনবাদীরা তা ধামাচাপা দিয়েছে। তাই, তার নিজ ধারণা থেকে বের করে আনার কাজ আমাদের ওপর বর্তায়, বিশেষত যদি নতুন পরিস্থিতি দৃশ্যমান হয়।

আমাদের পার্টি এই মত পোষন করে যে বর্তমান বিশ্বে তিনটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছেঃ

১। একদিকে পরাশক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ অপরদিকে এদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতিসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এখানে তিন বিশ্বের থিসিস মূর্ত হয় এবং আমরা একে সূত্রায়িত করি এইভাবে কারণ দ্বন্দ্বের শাঁস রয়েছে পরাশক্তির মধ্যে নিহিত কিন্তু এটা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের সাথেও দ্বন্দ্ব।

এটাই হচ্ছে প্রধান দ্বন্দ্ব এবং এর সমাধান হচ্ছে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিকাশ ও বিজয়।

২। সর্বহারাশ্রেণী ও বুর্জোয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব—যার সমাধান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব।

৩। পরাশক্তিসমূহের নিজেদের মধ্যে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব, পরাশক্তিসমূহ এবং ক্ষুদ্রতর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং চুড়ান্ততঃ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, যা বিশ্বে একাধিপত্যের জন্য যুদ্ধের দিকে চালিত করে এবং লুন্ঠনের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের দিকে, যাকে সর্বহারা শ্রেণী অবশ্যই গণযুদ্ধের দ্বারা এবং পরিণামে বিশ্ব গণযুদ্ধের দ্বারা অবশ্যই বিরোধিতা করবে।

আমরা সমাজতন্ত্র-পুঁজিবাদ দ্বন্দ্বকে তালিকাবদ্ধ করিনি কারন এটা কেবল মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক স্তরে বিরাজ করছে, যেহেতু সমাজতন্ত্র কোথাও রাষ্ট্র হিসেবে বিরাজ করছেনা; আজকে কোন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই। এটা অস্তিত্বমান ছিল এবং আজকে অস্তিত্বমান বলাটা হচ্ছে অন্তঃসারে এটা দাবী করা যে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক, যা হচ্ছে সংশোধনবাদী মতাবস্থান।। Š

1476372_577475858991503_1672069083_n

সূত্রঃ http://sarbaharapath.com/?p=1698


তুরস্কঃ তুরস্কের সেনাবাহিনীর হামলায় শহীদ হলেন ১৫ জন কমিউনিস্ট কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) গেরিলা

pkk

বুধবার তুরস্কের সেনাবাহিনী ও কমিউনিস্ট PKK গেরিলাদের মধ্য সংঘর্ষে ২ তুর্কি সেনা  খতম হয়েছে। এতে ১৫ জন কমিউনিস্ট গেরিলা শহীদ হয়েছেন। তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তের হাক্কারি প্রদেশের দাগলিকা জেলায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

 PKK গেরিলাদের অবস্থানে বোমা হামলা চালানোর পর সেনাবাহিনী গেরিলা-বিরোধী অভিযান শুরু করে। এ সময় দু পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

তুরস্কে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাত্র দু দিন পর এই অভিযান ও হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেল। এর আগে, মঙ্গলবার ইরাক সীমান্তের কাছাকাছি কমিউনিস্ট গেরিলাদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় তুর্কি সামরিক বাহিনী। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান নির্বাচনের পর ঘোষণা করেছে যে, একজন গেরিলা থাকতেও হামলা বন্ধ হবে না।

pkk flag

সূত্রঃ http://www.albawaba.com/news/two-days-clashes-between-turkish-army-pkk-leave-17-dead-763926?


কমিউনিস্টদের যৌথ ঘোষণা –

আন্তর্জাতিক ঐক্যের জন্য দরকার হচ্ছে এভাকিয়ানবাদী সংশোধনবাদ, মধ্যপন্থা ও সকল রূপের সংশোধনবাদকে পরাজিত করা!

poster_d3

যৌথ ঘোষণা

কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক ঐক্যের জন্য দরকার হচ্ছে এভাকিয়ানবাদী সংশোধনবাদ, মধ্যপন্থা ও সকল রূপের সংশোধনবাদকেপরাজিত করা!

এক বছর আগে কিছু দেশের নয়টি কমিউনিস্ট পার্টি ও সংগঠন এক যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা করেছিল t কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক ঐক্যের জন্য দরকার হচ্ছে সংশোধনবাদ ও মধ্যপন্থাকে পরাজিত করা! [১] আবারো তারা নিন্দা জানিয়েছেন নেপালে বিপ্লবের সংশোধনবাদী বিশ্বাসঘাতকতাকে, এক নেতৃত্বকারী কেন্দ্র হিসেবে বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলনের বিলোপ ঘটেছে – এই সত্য প্রকাশ করেছেন তারা নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)র ও সেইসাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি [আরসিপি ইউএসএ]র সংশোধনবাদী তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে-যা ঐ আন্দোলন (রিম)কে দেউলিয়া হওয়ার পথে চালিত করেছে। ভূয়া সংশোধনবাদী তত্ত্বমালা ও মধ্যপন্থার সমন্বয়বাদী মতাবস্থানসমূহকে চূর্ণ করে নয়া আন্তর্জাতিক ঐক্যের জন্য একটা দৃঢ় ভিত্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাধারণ লাইনের পথে মার্কসবাদ ও সুবিধাবাদের মধ্যে এক গভীর পার্থক্যরেখা সৃষ্টি করে কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক ঐক্যের জন্য সংগ্রাম করতে তাঁরা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদীদের আহ্বান জানান।

সেই সঠিক লাইন অনুসরণ করে আজকে, সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের শিক্ষক সভাপতি মাওয়ের নতুন জন্মবার্ষিকীতে আমরা নিন্দা জানাচ্ছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক যা ২০০৮ সালে গৃহিত হয়েচিল সেই তথাকথিত এভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণকে  যা হচ্ছে সংশোধনবাদের একটি রূপ হিসেবে আমাদের কালে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্যের জন্য প্রধান বিপদ।

এটা প্রচণ্ডবাদী সংশোধনবাদের চেয়ে এমনকি অধিকতর সংশোধনবাদী এক লাইন যতদূর পর্যন্ত এটা নিজেকে “সাম্যবাদের এক অধিকতর রেডিকেল দর্শন” হিসেবে প্রকাশ করে।  আরসিপি ইউএসএ-র অনুসারে t “দর্শন ও পদ্ধতিতে নয়া সংশ্লেষণ, এক গুরুত্বপূর্ণ বোধ থেকে তার বৈজ্ঞানিক শিকড়সমেত মার্কসবাদকে অধিকতর সার্বজনীন ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে”। এভাকিয়ানের নিজ ভাষায় সে এভাবে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমগ্র অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করছে t “ঐসকল ভুলভ্রান্তির দিকে যা চালিত করেছিল সেই ধারণা ও পদ্ধতির যতদূর ভুল ও দুর্বলতা ছিল সেগুলিও আমি সমগ্রভাবে বিশ্লেষণ করেছি।  সেই ভিত্তিতে আমি একটা সুসংবদ্ধ, সামগ্রিক ও সার্বজনীন তত্ত্বগত কাঠামো বিনির্মাণ করেছি যা হচ্ছে সংশ্লেষণ।  যদিও এই বিকাশ উদ্ভূত হয়েছে এর আগে পরে যা ছিল তার ধারাবাহিকতায়, যা কিনা এক নির্ধারক উপাদান হিসেবে পূর্বতন ধারণা ও অভিজ্ঞতার সাথে এক সত্যিকার বিভক্তি ঘটিয়েছে, আর এ কারণে আমরা একে এক নয়া সংশ্লেষণ বলি।”

মার্কসবাদী দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী পদ্ধতি বর্জনকারী এ এক বিপজ্জনক সংশোধনবাদী তত্ত্ব যা একইসাথে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের সংগ্রামে সর্বহারার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বর্জন করে আর মার্কসবাদ ও সুবিধাবাদের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয়ের চাবিকাঠি সর্বহারা একনায়কত্বকে প্রত্যাখ্যান করে।

এ এক বিপজ্জনক সংশোধনবাদী তত্ত্ব কারণ এটা মার্কসবাদের কথিত ভুল ত্রুটিসমূহকে অতিক্রম করে এর উত্তরাধিকার হিসেবে আবির্ভাবের ভাণ করে, আসলে যা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের সাথে বিভাজন ঘটানো এক উত্তর মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী তত্ত্ব – পুরোনো ও পঁচা সুবিধাবাদী সারবস্তুসমেত এক নয়া রূপের সংশোধনবাদ।

আত্মগত ভাববাদকে আলিঙ্গন করতে আরসিপি (ইউএসএ)-এর “নয়া সংশ্লেষণ” বিপ্লবী বস্তুর গতিধারায় নির্ধারকত্বকে পাশ কাটিয়ে মার্কসবাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে বর্জন করেছে যেখানে পুঁজিবাদের মুমূর্ষু পর্ব সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে এটা ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত। এটা বিভিন্ন দেশের সমাজ ও বিপ্লবী প্রক্রিয়ার আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের নির্ধারক প্রকৃতিকে বর্জন করে বিপ্লবের প্রকৃত শক্তিসমূহকে আড়াল করে বিপ্লবী রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণে অক্ষমতার দিকে চালিত করে।

“নয়া সংশ্লেষণ”-এর আত্মগত ভাববাদী পদ্ধতি তার অনুসারীদের কাছে এসেছে আজকের একমাত্র ধারাবাহিক বিপ্লবী শ্রেণী সর্বহারা শ্রেণীর বিষয়গত অস্তিত্বকে খাটো করার জন্য, একে স্রেফ একটা আদর্শ-তে নামিয়ে এনে–যা বড়জোর “নয়া সংশ্লেষণ”-এর স্বার্থের সামাজিক ভিত্তি ক্ষুদে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় কর্তৃক প্রতিনিধিত্ব হতে পারে, যার জন্য খোদ মার্কসের সময় হতে মার্কসবাদ বিশেষত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণীকে “প্রতিনিধিত্ব” করেছে। ফলতঃ “নয়া সংশ্লেষণ”-এর নির্দেশাবলীতে তরলীকৃত “বিপ্লবের জন্য একটা আন্দোলন” মতবাদ হয়ে সর্বহারা পার্টির প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ এক আনুষ্ঠানিকতায়।

আরসিপি ইউএসএ-র “নয়া সংশ্লেষণ” হচ্ছে একটা বিপজ্জনক সংশোধনবাদী তত্ত্ব যা “পূর্বতন সকল অভিজ্ঞতার আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট তত্ত্ব ও পদ্ধতিসমূহের প্রতি ধর্মীয়ভাবে দৃঢ়” না থাকার আবরণে বিশ্ব সর্বহারার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার ব্যাপারে দোদুল্যমান হয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এবং রাশিয়া ও চীনে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে বর্জন করে।  তাই মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী তত্ত্ব বর্জন করে যেহেতু “তত্ত্ব হচ্ছে সকল দেশের শ্রমিকদের অভিজ্ঞতার সার” [২] তাই, আরসিপি ইউএসএ বিভক্ত করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্ব যা মার্কস ও এঙ্গেলস কর্তৃক কমিউনিস্ট ইশতেহার দিয়ে শুরু হয়েছে এবং শেষ করে চীনে ১৯৭৬ সালে সর্বহারা শ্রেণীর পরাজয় দিয়ে; এবং আরসিপি ইউএসএ-র “নয়া সংশ্লেষণ” এবং “নয়া ইশতেহার”-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বিতীয় স্তরকে তুলে ধরা হয়েছে পুরোনো মার্কসবাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর হিসেবে, আর পুরোনো ইশতেহারকে বাতিল বিবেচনা করা হয়েছে।  [৩]

একুশ শতকে বিপ্লবের সমস্যাসমূহ সমাধানে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ অপর্যাপ্ত-এই ঘোষণা করার মধ্যে প্রচণ্ডবাদী সংশোধনবাদ ও এভাকিয়ানবাদী সংশোধনবাদ যে মিলে যায় তা কোন দুর্ঘটনা নয়, আর তাই তারা সাম্রাজ্যবাদ তথা পুঁজিবাদের ক্ষয় আর তার অনিবার্য পরিণতি বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লব ও সমাজতন্ত্র–এই লেনিনবাদী তত্ত্বকে ভিত্তিহীন ঘোষণা করে। সাম্রাজ্যবাদের যুগের মার্কসবাদের বিরুদ্ধে আরসিপি ইউএসএ-এর “নয়া সংশ্লেষণ” কাউrস্কিবাদী অতি-সাম্রাজ্যবাদ-এর সাথে যুক্ত পুরোনো সংশোধনবাদী তত্ত্বমালার পুনরুজ্জীবন ঘটায়; “ভূমণ্ডলীকরণ”-এর বুর্জোয়া বুলি গ্রহণ করে; মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতি নত হয় যার কথিত অপরাজেয়তাকে কেবল বিশ্ব সর্বহারা ও জনগণ প্রতিহত করতে পারে।

সর্বহারা একনায়কত্বের দিকে শ্রেণীসংগ্রামের অনিবার্য বিকাশ এবং চীনে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব যাতে সর্বহারা একনায়কত্বাধীনে বিপ্লব অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা মার্কসবাদের চাবিকাঠি হিসেবে নিশ্চিত করে তত্ত্বে ও অনুশীলনে শিক্ষিত হয়েছে–এসবের বিরুদ্ধে আরসিপি ইউএসএ-র “নয়া সংশ্লেষণ” প্রতিক্রিয়াশীল জন স্টুয়ার্ট মিলের কাছ থেকে ধার করা “ভিন্নমত করা অধিকার”-এর বুর্জোয়া তত্ত্ব প্রস্তাব করে যা “বহুদলীয় গণতন্ত্র”-এর প্রচণ্ডবাদী শোধিত সংস্করণে তুলে ধরা হয়েছে সমাজতন্ত্রের অধীনে বুর্জোয়াদের পুর্ণ স্বাধীনতা, মিডিয়া প্রচার ও স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠন প্রদান করতে।

আরসিপি ইউএসএ-র “নয়া সংশ্লেষণ”-এর কাছে সমাজতন্ত্রের অধীনে সর্বহারা একনায়কত্ব স্রেফ একটা “বাঁধা বুলি”, যেখানে কাউrস্কি যেমনটা বলেছে, কেবল “জনগণ” রয়েছে নেই কোন বৈরি শ্রেণীসংগ্রাম, আর বিপ্লবের অব্যাহত রাখাকে কল্পনা বিলাস ও ক্ষুদে বুর্জোয়াদের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনে নামিয়ে আনা হয়েছে যেখানে শ্রমিক ও কৃষকরা যন্ত্র ও মৃত্তিকার লেজুড় মজুরি দাস হয়ে থাকে।  [৪]

আরসিপি ইউএসএ কর্তৃক ভণ্ডামীপূর্ণভাবে উপস্থাপিত “সাম্যবাদের নয়া পর্ব” হিসেবে “নয়া সংশ্লেষণ” আসলে বিপ্লবী মার্কসবাদের বর্জন, খোদ রিমের ১৯৯৩ সালে ঘোষণা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ জিন্দাবাদ!-এর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা; এটা হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী সংগ্রামকে পরিচালনা করার পথে বাঁধা উত্তর মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ সংশোধনবাদ, আর সবচেয়ে বড় বিপদ প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদীদের  ঐক্যের পথে-যারা ওদের বক্তব্যসমূহ চূর্ণ করতে এর প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র প্রদর্শন করে পুরোনো বুর্জোয়া ধ্যান ধারণার সাথে এর ঘোঁট ও ক্ষয়িষ্ণু সুবিধাবাদী তত্ত্বমালার সাথে এর একত্ব আবিষ্কার করে  নির্মম সংগ্রাম চালাতে বাধ্য।

বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবের বিজ্ঞান হিসেবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের প্রযোজ্যতাকে আমরা পুননিশ্চিত করছি।  আমরা রক্ষা করি আমাদের মহান শিক্ষক মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন ও মাওয়ের ঐতিহ্যকে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলার, নয়া গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বিপ্লবের বিজয়ের দিক জনগণকে নেতৃত্বে দেয়ার এবং সর্বহারা একনায়কত্বের নয়া রাষ্ট্র বিনির্মাণের মহা যুদ্ধসমূহে তার বিজয় ও পরাজয়সমূহ থেকে শিক্ষা নিয়ে।  মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের ভিত্তিতে এক নয়া কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে ঐক্যের জন্য লড়াই করার আমাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আমরা পুননিশ্চিত করছি, যা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ওপর বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবকে বিজয়ের দিয়ে নিয়ে যেতে পরমভাবে প্রয়োজন।

আরসিপির সংশোধনবাদী “নয়া সংশ্লেষণ”-এর বিরুদ্ধে t মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ জিন্দাবাদ!

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের ভিত্তিতে এক নয়া কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দিকে এগিয়ে চল!

২৬ ডিসেম্বর, ২০১২

আফগানিস্তানের ওয়ার্কার্স অর্গানাইজেশন (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী, প্রধানতঃ মাওবাদী)

আরব মাওবাদী

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী কেন্দ্র–বেলজিয়াম

শ্রেণীঘৃণা কালেক্টিভ¬–স্পেন

কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী–বাংলাদেশ

পুনর্গঠন গ্রুপ–পেরু সিআরপিএম–স্পেন

লাল পতাকা কমিউনিস্ট সংগঠন–স্পেন

ইকুয়েডরের কমিউনিস্ট পার্টি–লাল সূর্য

পানামার কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)

পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি–মানতারো লাল ঘাঁটি

কমিউনিস্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী)–কলম্বিয়া

1476372_577475858991503_1672069083_n

নোটঃ ১। আরব মাওবাদী, শ্রেণী ঘৃণা কালেক্টিভ–স্পেন, কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী লেনিনবাদী মাওবাদী–ফ্রান্স, ইকুয়েডরের কমিউনিস্ট পার্টি–লাল সূর্য, পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি–মানতারো লাল ঘাঁটি, আর্জেন্টিনার পিপল্স কমিউনিস্ট পার্টি মাওবাদী, পানামার কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি মাওবাদী একতা গ্রুপ–বাংলাদেশ ও কলম্বিয়ার ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী) কর্তৃক স্বাক্ষরকৃত যৌথ ঘোষণা

২।, জে, স্তালিন, লেনিনবাদের ভিত্তি

৩। দেখুন “কমিউনিজমt এক নয়া স্তরের সূচনা”

৪। দেখুন বৈচারিক চিন্তা ও সত্যের সন্ধান t আজকে ও সমাজতান্ত্রিক সমাজে—রেমন্ড লোট্রা

সূত্রঃ http://sarbaharapath.com/?p=291