বিনিময় : ‘ড্যাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থ থেকে – কার্ল মার্কস

এটা পরিষ্কার যে পণ্যেরা নিজেরা বাজারে যেতে পারে না এবং নিজেরাই নিজেদের বিনিময় করতে পারে না। সুতরাং আমাদের যেতে হবে তাদের অভিভাবকবৃন্দের কাছে; এই অভিভাবকেরাই তাদের মালিক। পণ্যেরা হল দ্রব্যসামগ্রী; সুতরাং মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা নেই। যদি তাদের মধ্যে বিনিময়ের অভাব দেখা দেয়, তাহলে সে বলপ্রয়োগ করতে পারে অর্থাৎ সে তাদের দখল নিয়ে নিতে পারে। যাতে করে এই দ্রব্যসামগ্রীগুলি পণ্যরূপে পরস্পরের সঙ্গে বিনিময়ের সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারে, তার জন্য তাদের অভিভাবকদেরই তাদেরকে স্থাপন করতে হবে পরস্পরের সঙ্গে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে; তাদের অভিভাবকেরাই হচ্ছে সেই ব্যক্তিরা যাদের ইচ্ছায় তারা পরিচালিত হয়, অভিভাবকদের কাজ করতে হবে এমনভাবে যাতে একজনের পণ্য অন্য জন আত্মসাৎ না করে এবং পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত একটি প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ তার পণ্যকে ছেড়ে না দেয়। সুতরাং অভিভাবকদের পরস্পরকে স্বীকার করে নিতে হবে ব্যক্তিগত স্বত্বের অধিকারী বলে। এই আইনগত সম্পর্কই আত্মপ্রকাশ করে চুক্তি হিসাবে- তা সেই আইনগত সম্পর্কটি কোন বিকশিত আইন-প্রণালীর অঙ্গ হোক, না-ই হোক; এই আইনগত সম্পর্কটি দু’টি অভিপ্রায়ের মধ্যেকার বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন ছাড়া অন্য কিছুই নয়। এই অর্থনৈতিক সম্পর্কটি নির্ধারণ করে দেয় এই ধরনের প্রত্যেকটি আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়বস্তু। ব্যক্তিদের উপস্থিতি এখানে কেবল পণ্যসমূহের প্রতিনিধি তথা মালিক হিসাবে। আমাদের অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে আমরা সাধারণভাবে দেখতে পাব যে অর্থনৈতিক রঙ্গমঞ্চে যে সব চরিত্র আবির্ভূত হয়, সে সব চরিত্র তাদের নিজেদের মধ্যে যে অর্থনীতিগত সম্পর্কগুলি থাকে, সেই সম্পর্কগুলিই ব্যক্তিরূপ ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।

যে ঘটনাটি একটি পণ্যকে তার মালিক থেকে বিশেষিত করে তা প্রধানত এই যে, পণ্যটি বাকি প্রত্যেকটি পণ্যকে তাদের নিজের মূল্যের দৃশ্যরূপ বলে দেখে থাকে। সে হল আজন্ম সমতাবাদী ও সর্ব-বিরাগী, অন্য যে কোন পণ্যের সঙ্গে সে কেবল তার আত্মাটিকেই নয়, দেহটিকেও বিনিময় করতে সর্বদাই প্রস্তুত- সংশ্লিষ্ট পণ্যটি যদি এমনকি ম্যারিটর্নেস থেকেও কুরূপা হয়, তাহলেও কিছু এসে যায় না। পণ্যের মধ্যে বাস্তববোধ সংক্রান্ত ইন্দ্রিয়ের এই যে অভাব, তার মালিক সে অভাবের ক্ষতিপূরণ করে দেয় তার নিজের পাঁচটি বা পাঁচটিরও বেশি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা। তার কাছে তার পণ্যটির তাৎক্ষণিক কোন ব্যবহার মূল্য নেই। তা যদি থাকত তাহলে সে তাকে বাজারে নিয়ে আসত না। পণ্যটির ব্যবহার মূল্য আছে অন্যদের কাছে, কিন্তু তার মালিকেদের কাছে একমাত্র প্রত্যক্ষ ব্যবহারমূল্য আছে বিনিময় মূল্যের আধার হিসাবে এবং কাজে কাজেই বিনিময়ের উপায় হিসাবে। অতঃপর যে পণ্যের মূল্য উপযোগের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন (সেবায়) লাগতে পারে তাকে সে হাতছাড়া করতে মনস্থির করে। সমস্ত পণ্যই তার মালিকদের কাছে ব্যবহার মূল্য বিবর্জিত কিন্তু তাদের অ-মালিকদের কাছে ব্যবহার-মূল্য সমন্বিত। সুতরাং পণ্যগুলির হাত বদল হতেই হবে। আর এই যে হাত বদল তাকেই বলা হয় বিনিময়, বিনিময় তাদেরকে পরস্পরের সম্পর্কের স্থাপন করে মূল্য হিসাবে এবং তাদেরকে বাস্তবায়িতও করে মূল্য হিসাবে। সুতরাং ব্যবহার মূল্য হিসাবে বাস্তবায়িত হবার আগে পণ্যসমূহের অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে বিনিময়-মূল্য হিসাবে।

অন্যদিকে মূল্য হিসাবে বাস্তবায়িত হওয়ার আগে তাদের দেখাতে হবে, যে তারা ব্যবহার মূল্যের অধিকারী। কেননা যে শ্রম তাদের ওপর ব্যয় করা হয়েছে তাকে ততটাই ফলপ্রসূ বলে গণ্য করা হবে, যতটা তা ব্যয়িত হয়েছে এমন একটি রূপে যা অন্যান্যের কাছ্ উপযোগপূর্ণ। ঐ শ্রম অন্যান্যের কাছে উপযোগপূর্ণ কিনা এবং কাজে কাজেই, তা অন্যান্যের অভাব পূরণে সক্ষম কিনা, তা প্রমাণ করা যায় কেবলমাত্র বিনিময়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

পণ্যের মালিক মাত্রেই চায় তার পণ্যটিকে হাতছাড়া করতে কেবল এমন সব পণ্যের বিনিময়ে, যেসব পণ্য তার কোন- না- কোন অভাব মেটায়। এই দিক থেকে দেখলে, তার কাছে বিনিময় হল নিছক একটি ব্যক্তিগত লেনদেন। অন্যদিকে, সে চায় তার পণ্যটিকে বাস্তবায়িত করতে, সমান মূল্যের অন্য যে-কোন উপযুক্ত পণ্যের রূপান্তরিত করতে- তার নিজের পণ্যটিকে কোন ব্যবহারমূল্য অন্য পণ্যটির মালিকের কাছে আছে কি নেই, তা সে বিবেচনা করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার কাছে বিনিয়ম হল আর্থিক চরিত্রসম্পন্ন একটি সামাজিক লেনদেন। কিন্তু এক প্রস্থ এক ও অভিন্ন লেনদেন। একই সঙ্গে পণ্যের সমস্ত মালিকদের কাছে যুগপৎ একান্তভাবেই ব্যক্তিগত এবং একান্তভাবেই সামাজিক তথা সার্বিক ব্যাপার হতে পারে না।

ব্যাপরটাকে আরেকটু ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যাক। একটি পণ্যের মালিকের কাছে, তার নিজের পণ্যটির প্রেক্ষিতে, বাকি প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে এক-একটি সমার্ঘ সামগ্রী এবং কাজে কাজেই, তার নিজের পণ্যটি হল বাকি সমস্ত পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী। কিন্তু যেহেতু এটা প্রত্যেক মালিকের পক্ষেই প্রযোজ্য, সেহেতু কার্যত কোন সমার্ঘ সামগ্রী নেই, এবং পণ্যসমূহের আপেক্ষিক মূল্য এমন কোন সার্বিক রূপ ধারণ করে না, সে-রূপে মূল্য হিসাবে সেগুলির সমীকরণ হতে পারে এবং তাদের মূল্যের পরিমাপের তুলনা করা যেতে পারে। অতএব এই পর্যন্ত; তারা পণ্য হিসাবে পরস্পরের মুখোমুখি হয় না, মুখোমুখি হয় কেবল উৎপন্ন দ্রব্য বা ব্যবহার মূল্য হিসাবে। তাদের অসুবিধার সময়ে আমাদের পণ্য মালিকেরা ফাউস্টের মতই ভাবে, “Im An fang war die That”। সুতরাং ভাববার আগেই তারা কাজ করেছিল এবং লেনদেন করেছিল। পণ্যের স্বপ্রকৃতির দ্বারা আরোপিত নিয়মাবলীকে তারা সহজাত প্রবৃত্তি বলেই মেনে চলে। তারা তাদের পণ্যসমূহকে মূল্য-রূপে এবং সেই কারণেই পণ্যরূপে, সম্পর্কযুক্ত করতে পারে না। সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে অন্য কোন একটিমাত্র পণ্যের সঙ্গে তুলনা না করে। পণ্যের বিশ্লেষণ থেকে আমরা তা আগেই জেনেছি। কিন্তু কোন একটি বিশেষ পণ্য সামাজিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে স্বীকৃতি পেতে পারে না। সুতরাং নির্দিষ্ট সামাজিক প্রক্রিয়ার ফলে বাকি সমস্ত পণ্য থেকে এই বিশেষ দ্রব্যটি স্বাতন্ত্র্য লাভ করে এবং বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য এই বিশেষ পণ্যটির মাধ্যমে ব্যক্ত হয়। এইভাবে এই পণ্যটির দেহগত রূপটিই সমাজ-স্বীকৃত সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রীর রূপে পরিণত হয়। সর্বজনীন সমার্ঘ রূপে পরিণত হওয়াটাই এই সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে উঠে উক্ত সর্ব-ব্যতিরিক্ত পণ্যটির নির্দিষ্ট কাজ। এইভাবেই তা হয়ে ওঠে- ‘অর্থ’। অর্থ হচ্ছে একটি স্ফটিক; বিভিন্ন বিনিময়ের মাধ্যমে শ্রমের বিবিধ ফল কার্যক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সমীকৃত হয় এবং এইভাবে নানাবিধ পণ্যে পরিণত হয়; সেই সব বিনিময়ের ধারায় প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবহারের মধ্যদিয়ে এই স্ফটিক গড়ে ওঠে। বিনিময়ের ঐতিহাসিক অগ্রগমন ও সম্প্রসারণের ফলে পণ্যের অন্তঃস্থিত ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্যের মধ্যে তুলনাগত বৈশিষ্ট্যটি বিকাশ লাভ করে। বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে এই তুলনা-বৈশিষ্ট্যের একটি বাহ্যিক অভিব্যক্তি দেবার জন্য মূল্যের একটি স্বতন্ত্র রূপ প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা দেখা দেয় এবং যতকাল পর্যন্ত পণ্য এবং অর্থের মধ্যে পণ্যের এই পার্থক্যকরণের কাজ চিরকালের জন্য সুসম্পন্ন না হয়েছে ততকাল পর্যন্ত এই আবশ্যকতার অবসান ঘটে না। তখন যে-হারে উৎপন্ন দ্রব্যের পণ্যে রূপান্তর ঘটে থাকে, সেই হারেই একটি বিশেষ পণ্যের ‘অর্থ’-রূপে রূপান্তর সম্পন্ন হয়।

দ্রব্যের পরিবর্তে দ্রব্যের প্রত্যক্ষ (দ্রব্য বিনিময় প্রথা) একদিকে মূল্যের আপেক্ষিক অভিব্যক্তির প্রাথমিক রূপে উপনীত হয়, কিন্তু আরেক দিকে নয়। সেই রূপটি এই: ও পণ্য ক = ঔ পণ্য খ। প্রত্যক্ষ দ্রব্য বিনিময়ের রূপটি হচ্ছে এই ও ব্যবহার মূল্য ক = ঔ ব্যবহার মূল্য খ। এই ক্ষেত্রে ক এবং খ জিনিস দু’টি এখনো পণ্য নয়, কিন্তু কেবল দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যমেই তারা পণ্যে পরিণত হয়। যখন কোন উপযোগিতা সম্পন্ন সামগ্রী তার মালিকের অন্য একটি না-ব্যবহার মূল্য উৎপাদন করে তখনই বিনিময় মূল্য অর্জনের দিকে সেই সামগ্রীটি প্রথম পদক্ষেপ অর্পণ করে এবং এটা ঘটে কেবল তখনই যখন তা হয়ে পড়ে তার মালিকের আশু অভাব পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিসের অতিরিক্ত কোন অংশ। জিনিসগুলি নিজেরা তো মানুষের বাইরে অবস্থিত এবং সেই কারণে তার দ্বারা পরকীকরণীয়। যাতে করে এই পরকীকরণ পারস্পরিক হয়, সেই জন্যে যা প্রয়োজন তা হল পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পরস্পরকে ঐ পরকীকরণীয় জিনিসগুলির ব্যক্তিগত মালিক হিসাবে এবং তার মানেই স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসাবে গণ্য করা। কিন্তু সর্বজনিক সম্পত্তির ওপর ভিত্তিশীল আদিম সমাজে- তা প্রাচীন ভারতীয় গোষ্ঠী-সমাজের পিতৃ-তান্ত্রিক পরিবারই হোক বা পেরুভীয় ইনকা রাষ্ট্রই হোক- কোথাও এই ধরনের পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যমূলক অবস্থানের অস্তিত্ব ছিল না। সেই ধরনের সমাজে স্বভাবতই পণ্য বিনিময় প্রথম শুরু হয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, যেখানে যেখানে তারা অনুরূপ কোন সমাজের বা তার সদস্যদের সংস্পর্শে আসে। যাই হোক, যত দ্রুত কোন সমাজের বাইরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রব্য বিনিময় হয় পণ্যে ততই দ্রুতই তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে আভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রেও দ্রব্য পরিণত হয় পণ্যে। কখন কোন হারে বিনিময় ঘটবে, তা ছিল গোড়ার দিকে নেহাৎই আপতিক ব্যাপার তাদের মালিকদের পারস্পরিক ইচ্ছার পরকীকরণই বিনিময়যোগ্য করে তোলে। ইতিমধ্যে উপযোগিতা সম্পন্ন বিদেশীয় দ্রব্য সামগ্রীর অভাববোধও ক্রমে ক্রমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। বিনিময়ের নিত্য পুনরাবৃত্তির তা হয়ে ওঠে একটি মামুলি সামাজিক ক্রিয়া। কালক্রমে অবশ্যই এমন সময় আসে যে, শ্রমফলের অন্তত একটা অংশ উৎপন্ন করতে হয় বিনিময়ের বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। সেই মুহূর্ত থেকেই পরিভোগের জন্যে উপযোগিতা এবং বিনিময়ের জন্যে উপযোগিতার মধ্যকার পার্থক্যটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কোন সামগ্রীর ব্যবহার মূল্য এবং তার বিনিময় মূল্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। অন্যদিকে যে পরিমাণগত অনুপাতে বিভিন্ন জিনিসপত্রের বিনিময় ঘটবে, তা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাদের নিজের নিজের উৎপাদনের ওপর। প্রথাগতভাবে এক একটি জিনিসের ওপরে এক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের ছাপ পড়ে যায়।

প্রত্যক্ষ দ্রব্য বিনিময় ব্যবস্থায় প্রত্যেকটির জন্যেই তার মালিকের কাছে প্রত্যক্ষভাবে একটি বিনিময়ের উপায় এবং অন্য সকলের কাছে সমার্ঘ সামগ্রী কিন্তু সেটা ততখানি পর্যন্তই, যতখানি পর্যন্ত তাদের কাছে তার থাকে ব্যবহার মূল্য। সুতরাং এই পর্যায়ে বিনিমিত জিনিসগুলির নিজেদের ব্যবহার মূল্য থেকে বা বিনিময়কারীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন বোধ থেকে নিরপেক্ষ কোন মূল্য রূপ অর্জন করে না। বিনিমিত পণ্যের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে একটি মূল্যরূপের আবশ্যকতা অনুভূত হয়। সমস্যা আর তার সমাধানের উপায় দেখা দেয় একই সঙ্গে। বিভিন্ন মালিকের হাতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য এবং সেই সমস্ত পণ্য একটি মাত্র বিশেষ সঙ্গে বিনিমেয় এবং মূল্য হিসাবে সমীকৃত না হলে, পণ্য মালিকেরা কখনও তাদের নিজেদের পণ্যসমূহকে অন্যদের পণ্যসমূহের সঙ্গে সমীকরণ করে না এবং বৃহৎ আকারে বিনিময় করে না। এই শেষ উল্লেখিত পণ্যটি অন্যান্য বহুবিধ পণ্যের সমার্ঘ সামগ্রী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি সাধারণ সামাজিক সমার্ঘ সামগ্রীর চরিত্র অর্জন করে যদিও অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যেই। সেই সমস্ত তাৎক্ষণিক সামাজিক ক্রিয়াগুলির প্রয়োজনে এই বিশেষ চরিত্রটি জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, তা এই ক্রিয়াগুলির প্রয়োজনমাফিক কাজ করে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে অকেজো হয়ে যায়। ঘুরে ফিরে এবং সাময়িকভাবে এই চরিত্রটি কখনও এই পণ্যের সঙ্গে, কখনও ঐ পণ্যের সঙ্গে লগ্ন হয়। কিন্তু বিনিময়ের বিকাশের সঙ্গে তা দৃঢ়ভাবে এবং একান্তভাবে বিশেষ বিশেষ ধরনের পণ্যের সঙ্গে লগ্ন হয়ে যায় এবং ক্রমে ক্রমে অর্থ-রূপে সংহতি লাভ করে। এই বিশেষ প্রকৃতির পণ্যটি কোন পণ্যে লগ্ন হবে, তা গোড়ার দিকে থাকে আপতিক। যাই হোক না কেন এ ব্যাপারে দুটি ঘটনার প্রভাব চূড়ান্ত ভূমিকা নেয়। হয়, এই অর্থ-রূপ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাইরে থেকে বিনিময় মারফত পাওয়া জিনিসগুলির সঙ্গে নিজেকে লগ্ন করে- আর বাস্তবিক পক্ষেই দেশজ দ্রব্যগুলির মূল্য প্রকাশের এগুলিই হচ্ছে আদিম ও স্বাভাবিক রূপ; নয়তো তা নিজেকে লগ্ন করে গবাদি পশুজাতীয় উপযোগিতাপূর্ণ জিনিসের সঙ্গে- যেসব জিনিস দেশজ পরকীকরণীয় ধনসম্পদের প্রধান অংশ। যাযাবর গোষ্ঠীগুলিই অর্থ-রূপ প্রবর্তনের ব্যাপারে পথিকৃৎ, কেননা তাদের সমস্ত পার্থিব ধনসম্পদ কেবল অস্থাবর জিনিসপত্রেরই সমষ্টি, আর সে জন্যই সেগুলি সরাসরি পরকীকরণীয় এবং কেননা তাদের জীবনযাত্রার ধরনই এমন যে তারা নিরন্তর বিদেশি গোষ্ঠীসমূহের সংস্পর্শে আসে এবং দ্রবাদি বিনিময়ের প্রয়োজন অনুভব করে। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে মানুষকেও, ক্রীতদাসের আকারে, অর্থের আদিম সামগ্রী হিসাবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু কখনও জমিকে এ কাজে ব্যবহার করেনি। এমন ধরনের ধারণার উদ্ভব হতে পারে কেবল বুর্জোয়া সমাজে যা ইতিমধ্যেই অনেকটা বিকাশ প্রাপ্ত। সপ্তদশ শতকের শেষ তৃতীয়াংশ থেকে এই ধরনের ধারণা চালু হয় এবং এক শতাব্দী পরে, ফরাসি বুর্জোয়া বিপ্লবের কালে এই ধারণাটিকে জাতীয় আকারে কার্যকরী করার প্রথম প্রচেষ্টা হয়।

যে অনুপাতে বিনিময় স্থানীয় সীমানা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় এবং পণ্য মূল্য ক্রমেই সম্প্রসারিত হতে হতে অমূর্ত মনুষ্য-শ্রমে রূপ লাভ করে। সেই অনুপাতে অর্থের চরিত্র এমন, সব পণ্যে নিজেকে লগ্ন করে যে-পণ্যগুলি সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে কাজ করার জন্যে প্রকৃতির দ্বারাই নির্দিষ্ট হয়ে আছে। ঐ পণ্যগুলি হচ্ছে বিভিন্ন মহার্ঘ ধাতু।

‘যদিও সোনা রূপা প্রকৃতিগতভাবে অর্থ নয় কিন্তু অর্থ প্রকৃতিগতভাবেই সোনা এবং রূপা।’ এই যে বক্তব্য তার সত্যতা প্রতিপন্ন হয় এই ধাতুগুলির অর্থ হিসাবে কাজ করার জন্যে যোগ্যতাসম্পন্ন দেহগত গুণাবলীর দ্বারা। যাই হোক এই পর্যন্ত আমরা কেবল অর্থের একটিমাত্র কাজের সঙ্গেই পরিচিত হয়েছি; সে কাজটি হলো পণ্য-মূল্যের অভিব্যক্তি হিসাবে অথবা পণ্য মূল্যের বিভিন্ন পরিমাণ যে সামগ্রীর মাধ্যমে কাজ করে সেই সামগ্রীটি সামাজিক বর্ণনা হিসাবে কাজ করা। মূল্য প্রকাশের যথোপযুক্ত রূপ, অমূর্ত অবিশেষিত এবং সে কারণেই সমান মনুষ্য শ্রমের যথোপযুক্ত মূর্তরূপ- এমন একটি সামগ্রীই- যার নমুনামাত্র প্রদর্শনে তার বিভিন্ন গুণগুলি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে- এমন একটি সামগ্রীই কেবল হতে পারে অর্থ। অন্যদিকে যেহেতু মূল্যের বিভিন্ন পরিমাণের মধ্যে যে পার্থক্য, তা কেবল পরিমাণগত, সেহেতু অর্থ পণ্যটিকে কেবল পরিমাণগত পার্থক্যেরই সক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে, এবং সেই জন্য তাকে হতে হবে ইচ্ছেমতো বিভাজ্য এবং পুনর্মিলিত হবার ক্ষমতাসম্পন্ন। সোনা ও রূপা প্রকৃতিগতভাবেই এই গুণাবলীর অধিকারী।

অর্থ-পণ্যের ব্যবহার-মূল্য দ্বৈত। পণ্য হিসাবে বিশেষ ব্যবহার মূল্য (যেমন সোনা যা কাজে লাগে দাঁত বাঁধাবার উপাদান হিসাবে, বিলাস-দ্রব্যাদির কাঁচামাল হিসেবে ইত্যাদি) ছাড়াও তা অর্জন করে একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবহার-মূল্য- নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকা থেকে যার উদ্ভব। অর্থ হচ্ছে সমস্ত পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ বিশেষ বিশেষ সমার্ঘ সামগ্রী সেই হেতু অর্থের তথা সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রীটির সম্পর্কে বিশেষ বিশেষ সমার্ঘ সামগ্রীগুলি কাজ করে বিশেষ বিশেষ পণ্য হিসাবে।

আমরা দেখেছি যে বাকি সমস্ত পণ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যে মূল্য-সম্পর্কসমূহ বিদ্যমান, সেই সম্পর্কসমূহের প্রতিক্ষেপ হচ্ছে অর্থ-রূপ- যা উৎক্ষিপ্ত হয়েছে একটি মাত্র পণ্যের ওপর। সুতরাং ঐ অর্থও যে একটা পণ্য, তা কেবল তাদের কাছে একটা নতুন আবিষ্কার বলে প্রতীয়মান হবে যাঁরা তাঁদের বিশ্লেষণ শুরু করেন অর্থের পূর্ণ বিকশিত রূপটি থেকে। অর্থরূপে রূপান্তরিত পণ্যটি বিনিময়-ক্রিয়ার ফলে মূল্য-মন্ডিত হয় না, কেবল তার নিদিষ্ট মূল্যরূপ প্রাপ্ত হয়। এই দুটি সুস্পষ্টভাবে আলাদা আলাদা ব্যাপারকে একাকার করে ফেলে কিছু কিছু লেখক এই সিদ্ধান্তে গিয়ে পৌঁছেছেন যে সোনা বা রূপার মূল্য হচ্ছে কাল্পনিক। কতকগুলি ব্যাপারে অর্থের নিছক প্রতীকগুলিই যে অর্থের কাজ করে থাকে তা থেকে আরও একটা ভ্রান্ত ধারণা উদ্ভব হয় তা এই যে অর্থ নিজেই একটা প্রতীক মাত্র। যাই হোক এই ভ্রান্তির পেছনে একটা মানসিক সংস্কার উঁকি দেয় তা এই যে কোন সামগ্রীর অর্থরূপ সেই সামগ্রীটি থেকে বিচ্ছেদ্য কোন অংশ নয়, বরং সেটা হল এমন একটা রূপ যার মাধ্যমে কতকগুলি সামাজিক সম্পর্কের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই দিক থেকে প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে একটা প্রতীক, কেননা যেহেতু তা হচ্ছে মূল্য, সেহেতু সে হচ্ছে তার ওপর ব্যয়িত মনুস্য-শ্রমের বস্তুগত লেফাফা মাত্র। কিন্তু যদি ঘোষণা করা হয় যে একটা নির্দিষ্ট উৎপাদন পদ্ধতির অধীনে বিভিন্ন সামগ্রী কর্তৃক অর্জিত সামাজিক চরিত্রগুলি কিংবা শ্রমের সামাজিক গুণাবলী কর্তৃক অর্জিত বস্তুগত রূপগুলি নিছক প্রতীক মাত্র, তা হলে এই একই নিঃশ্বাসে এটাও ঘোষণা করা হয় যে, এই চরিত্র-বৈশিষ্ট্যগুলি মানবজাতির তথাকথিত সর্বজনীন সম্মতির দ্বারা অনুমোদিত খেয়ালখুশি মত দেওয়া অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। আঠারো শতকে এই ধরনের ব্যাখ্যা বেশ সমর্থন লাভ করেছিল। মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্কগুলি নানান ধাঁধা-লাগানো রূপ ধারণ করেছিল, সেগুলি ব্যাখ্যা করতে না পেরে, লোকে চেয়েছিল সেগুলির উৎপত্তি সম্বন্ধে একটা গৎবাঁধা বৃত্তান্ত হাজির করে সেগুলিকে তাদের অদ্ভূত দৃশ্যরূপ থেকে বিবস্ত্র করতে।

এর আগেই উপরে মন্তব্য করা হয়েছে যে পণ্যের সমার্ঘরূপ তার মূল্যের পরিমাণ বোঝায় না। সুতরাং যদিও আমরা এ বিষয়ে অবগত থাকতে পারি যে সোনা হচ্ছে অর্থ, এবং সেই কারণেই তা বাকি সব পণ্যের সঙ্গে সরাসরি বিনিমেয়, তবুও কিন্তু এই তথ্য থেকে আমরা এটা কোন ক্রমেই জানতে পারি না যে এতটা সোনার, ধরা যাক, ১০০ পাউন্ড সোনার মূল্য কতটা। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন, অর্থের ক্ষেত্রেও তেমন, অন্যান্য পণ্যের মাধ্যমে ছাড়া সে তার নিজের মূল্য প্রকাশ করতে পারে না। এই মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্রম সময়ের পরিমাপ দিয়ে এবং তা প্রকাশিত হয় একই পরিমাণ শ্রম সময়ে উৎপাদিত অন্য যে কোন পণ্যের মাধ্যমে। তার মূল্যের এবং পরিমাণগত নির্ধারণ তার উৎপাদনের উৎসক্ষেত্রেই দ্রব্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে হয়ে থাকে। যখন তা অর্থরূপে চলাচল করতে শুরু করে তার আগেই কিন্তু তার মূল্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। সতের শতকের শেষের দশকগুলিতে এটা প্রতিপন্ন হয়ে গিয়েছিল যে, অর্থ হচ্ছে একটা পণ্য; কিন্তু এই বক্তব্যে আমরা যা পাই তা হল এই বিশ্লেষণের শৈশবাবস্থা। অর্থ যে একটা পণ্য সেটা পরিষ্কার করা তেমন একটা সমস্যা নয়; সমস্যা দেখা দেয় তখন যখন আমরা চেষ্টা করি কেন, কিভাবে, কি উপায়ের মাধ্যমে পণ্য অর্থে পরিণত হয়।

মূল্যের সবচাইতে প্রাথমিক অভিব্যক্তি থেকে আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পেয়েছি যে ও পণ্য ক=ঔ পণ্য খ; দেখতে পেয়েছি যে যে সামগ্রীটি অন্য একটি সামগ্রীর মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে, সেই সামগ্রীটি প্রতীত হয় যেন তার এই, সম্পর্ক থেকে নিরপেক্ষভাবেই এক সমার্ঘ রূপ আছে- যে রূপটি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গুণ যা প্রকৃতি তাকে দান করেছে। আমরা এই মিথ্যা প্রতীতিকে বিশ্লেষণ করতে করতে শেষ পর্যন্ত তার চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা অবধি গিয়েছি; এই চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা তখনই পূর্ণ সম্পন্ন হয় যখন সর্বজনীন সমার্ঘ রূপটি একটি বিশেষ পণ্যের দৈহিক রূপের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করে এবং এইভাবে অর্থ-রূপে স্ফটিকায়িত ( কেলাসিত) হয়। যা ঘটে বলে দেখা যায় তা এই নয় যে সোনা পরিণত হয় অর্থে এবং তার ফলে বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয় সোনার মাধ্যমে, বরং উল্টো যে, বাকি সমস্ত পণ্য সর্বজনীনভাবে তাদের মূল্য প্রকাশ করে সোনার মাধ্যমে কেননা সোনা হচ্ছে অর্থ। আদ্যন্ত প্রক্রিয়াটির মধ্যবর্তী পর্যায়গুলি ফলত অদৃশ্য হয়ে যায় ; পেছনে কোন চিহ্নই রেখে যায় না; পণ্যরা দেখতে পায় যে তাদের নিজেদের কোন উদ্যোগ ছাড়াই তাদের মূল্য তাদের সঙ্গের আর একটি পণ্যের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। সোনা ও রূপা এই সামগ্রীগুলি যে মুহূর্তে পৃথিবীর জঠর থেকে বেরিয়ে আসে, সেই মুহূর্তেই তারা হয়ে ওঠে সমস্ত মনুষ্য শ্রমের প্রত্যক্ষ মূর্তরূপ। এখান থেকেই অর্থের যাদু। উপস্থিত যে সমাজ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সে সমাজে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষের আচরণ নিছক আণবিক (অণুর মতো)। এই কারণে উৎপাদন প্রণালীতে তাদের সম্পর্কগুলি ধারণ করে এমন একটি বস্তুগত চরিত্র, যা তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সচেতন থেকে ব্যক্তিগত ক্রিয়াকর্ম থেকে নিরপেক্ষ। এই ঘটনাগুলি প্রথমে আত্মপ্রকাশ করে সাধারণভাবে উৎপন্ন দ্রব্যসমূহের পণ্যের রূপ পরিগ্রহ করার মধ্যে। আমরা দেখেছি কেমন করে পণ্য উৎপাদনকারীদের এক সমাজের ক্রমিক অগ্রগতির ফলে একটি বিশেষ পণ্য অর্থ-রূপের মোহরাঙ্কিত হয়ে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হল। সুতরাং অর্থ যে কুহেলি সৃষ্টি করে তা আসলে পণ্যেরই সৃষ্ট কুহেলি; বৈশিষ্ট্য শুধু এই টুকু যে অর্থের কুহেলি তার সবচাইতে চোখ ধাঁধানো রূপ দিয়ে আমাদের ধাঁধিয়ে দেয়।

(সমাপ্ত)

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৮


কার্ল মার্কসের সমাধিস্থলে বক্তৃতা -ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

lead_960

১৪ই মার্চ, বেলা পৌনে তিনটেয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য তাঁকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল। আমরা ফিরে এসে দেখলাম যে তিনি তাঁর আরামকেদারায় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন- কিন্তু ঘুমিয়েছেন চিরকালের জন্য।

এই মানুষটির মৃত্যুতে ইউরোপ ও আমেরিকার জঙ্গি প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাস-বিজ্ঞান উভয়েরই অপূরণীয় ক্ষতি হল। এই মহান প্রাণের তিরোভাবে যে শূন্যতার সৃষ্টি হল তা অচিরেই অনুভূত হবে।

ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন তেমনি মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম, মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা এই সহজ সত্য যে, রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথম চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ, সুতরাং প্রাণধারণের আশু বাস্তব উপকরণের উৎপাদন এবং সেইহেতু কোনো নির্দিষ্ট জাতির বা নির্দিষ্ট যুগের অর্থনৈতিক বিকাশের মাত্রাই হলো সেই ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট জাতিটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের ধ্যান-ধারণা, শিল্পকলা, এমনকি তাদের ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত এবং সেই দিক থেকেই এগুলির ব্যাখ্যা করতে হবে, এতদিন যা করা হয়েছে সেভাবে উল্টো দিক থেকে নয়।

কিন্তু শুধু এই নয়। বর্তমান পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির এবং এই পদ্ধতি যে বুর্জোয়া সমাজ সৃষ্টি করেছে তার গতির বিশেষ নিয়মটিও মার্কস আবিষ্কার করেন। যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে এতদিন পর্যন্ত সব বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রী সমালোচক উভয়েরই অনুসন্ধান অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, তার ওপর সহসা আলোকপাত হল উদ্ধৃত্ত মূল্য আবিষ্কারের ফলে।

একজনের জীবদ্দশার পক্ষে এরকম দুটো আবিষ্কারই যথেষ্ট। এমনকি এরকম একটা আবিষ্কার করতে পারার সৌভাগ্য যাঁর হয়েছে তিনিও ধন্য। কিন্তু মার্কসের চর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে- এবং তিনি চর্চা করেছিলেন বহু বিষয় নিয়ে এবং কোনোটাই ওপর ওপর নয়- তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই, এমনকি গণিতশাস্ত্রও তিনি স্বাধীন আবিষ্কার করে গেছেন। 
এই হল বিজ্ঞানী মানুষটির রূপ। কিন্তু এটা তাঁর ব্যক্তিত্বের অর্ধেকও নয়। মার্কসের কাছে বিজ্ঞান ছিল এক ঐতিহাসিকভাবে গতিষ্ণু বিপ্লবী শক্তি। কোনো একটা তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের নতুন যে আবিষ্কার কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের কল্পনা করাও হয়তো তখনো পর্যন্ত অসম্ভব, তেমন আবিষ্কারকে মার্কস যতই স্বাগত জানান না কেন, তিনি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের আনন্দ পেতেন যখন কোনো আবিষ্কার শিল্পে এবং সাধারণভাবে ঐতিহাসিক বিকাশে একটা আশু বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যুৎশক্তির ক্ষেত্রে যেসব আবিষ্কার হয়েছে তার বিকাশ এবং সম্প্রতি মার্সেল দ্রেপ্রের আবিষ্কারগুলি তিনি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতেন।

কারণ মার্কস সবার আগে ছিলেন বিপ্লববাদী। তাঁর জীবনের আসল ব্রত ছিল পুঁজিবাদী সমাজ এবং এই সমাজ যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে তার উচ্ছেদে কোন না কোন উপায়ে অংশ নেওয়া, আধুনিক প্রলেতারিয়েতের মুক্তি সাধনের কাজে অংশ নেওয়া, একে তিনিই প্রথম তার নিজের অবস্থা ও প্রয়োজন সম্বন্ধে, তার মুক্তির শর্তাবলী সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছিলেন। তাঁর ধাতটাই ছিল সংগ্রামের। এবং যে আবেগ, যে অধ্যবসায় ও যতখানি সাফল্যের সঙ্গে তিনি সংগ্রাম করতেন তার তুলনা মেলা ভার। প্রথম Rheinische zeitung (1842), প্যারিসের vorwarts (1844) পত্রিকা, Deutsche Brusseler zeitung (1847), Neue Rheinische (1848-49), New york Tribune (1852-61) পত্রিকা এবং এছাড়া একরাশ সংগ্রামী পুস্তিকা, প্যারিস, ব্রাসেলস এবং লন্ডনের সংগঠনে তাঁর কাজ এবং শেষে, সর্বোপরি মহান শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন- এটা এমন একটা কীর্তি যে আর কোন কিছু না করলেও শুধু এইটুকুর জন্যই এর প্রতিষ্ঠাতা খুবই গর্ববোধ করতে পারতেন।

তাই, তাঁর কালের লোকেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রোশ ও কুৎসার পাত্র হয়েছেন মার্কস। স্বেচ্ছাতন্ত্রী এবং প্রজাতন্ত্রী দু’ধরনের সরকারই নিজ নিজ এলাকা থেকে তাঁকে নির্বাসিত করেছে। রক্ষণশীলই বা উগ্র-গণতান্ত্রিক সব বুর্জোয়ারাই পাল্লা দিয়ে তাঁর দুর্নাম রটনা করেছে। এসব কিছুই তিনি ঠিক মাকড়শার ঝুলের মতোই ঝেঁটিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন, উপেক্ষা করেছেন এবং যখন একান্ত প্রয়োজনবশে বাধ্য হয়েছেন একমাত্র তখনই এর জবাব দিয়েছেন। আর আজ সাইবেরিয়ার খনি থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত, ইউরোপ ও আমেরিকার সব অংশে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী সহকর্র্মীদের প্রীতির মধ্যে, শ্রদ্ধার মধ্যে, শোকের মধ্যে তাঁর মৃত্যু। আমি সাহস করে বলতে পারি যে মার্কসের বহু বিরোধী থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু তাঁর মেলা ভার।

যুুগে যুগে অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর নাম, অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর কাজ।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭

‘ভারতে অভ্যুত্থান’ -কার্ল মার্কস (লন্ডন ১৭ জুলাই ১৮৫৭)

maxresdefault

দিল্লি বিদ্রোহী সিপাহীদের হস্তগত ও মোগল বাদশাহ ঘোষিত হবার পর ৮ই জুন ঠিক এক মাস হলো। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে ভারতের এই প্রাচীন রাজধানী বিদ্রোহীরা দখলে রাখতে পারবে তেমন কোন ধারণা অবশ্যই অস্বাভাবিক। দিল্লি সুরক্ষিত কেবল একটি দেয়াল ও একটি সাধারণ পরিখা দিয়ে, আর দিল্লির চারিপাশে ও দিল্লিকে শাসনে রাখার মতো টিলা পাহাড়গুলি ইতিমধ্যেই ইংরেজদের দখলে, তারা দেয়াল না ভেঙেই জল সরবরাহ কেটে দেবার মতো সহজ পদ্ধতিতেই স্বল্প সময়ে দিল্লিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারে। তাছাড়া বিদ্রোহী সৈন্যদের যে একটা এলোমেলো দঙ্গল স্বীয় অফিসারদের খুন করে শৃঙ্খলার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ সেনাপত্য অর্পণ করার মতো কাউকে খুঁজে পায়নি, তারা নিশ্চয় এমন একটা দল, যাদের কাছ থেকে গুরুতর ও দীর্ঘায়ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আশা সবচেয়ে কম। বিভ্রান্তি আরও পাকিয়ে তোলার জন্য বাংলা প্রেসিডেন্সির সর্বাঞ্চল থেকে নতুন নতুন বিদ্রোহী বাহিনী এসে অবরুদ্ধ দিল্লি সৈন্যদের সংখ্যা দিন দিন বাড়াচ্ছে, যেন একটা স্থিরীকৃত পরিকল্পনা অনুসারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এই মৃত্যুদণ্ডিত নগরে। দেয়ালের বাইরে ৩০ ও ৩১ মে তারিখের যে দুটি অভিযানের ঝুঁকি নেয় বিদ্রোহীরা এবং গুরুতর ক্ষতিতে যা প্রতিহত করে, তার উদ্ভব যেন আত্মনির্ভরতা বা শক্তির মনোভাব থেকে নয়, বরং মরিয়াপনা থেকে। একমাত্র অবাক লাগে শুধু ব্রিটিশের আক্রমণগুলির ধীরতায়- কিছুটা পরিমাণে যদিও তা ব্যাখ্যা করা যায় ঋতুর ভয়াবহতা ও পরিবহন ব্যবস্থার অভাব দিয়ে। সর্বাধিনায়ক জেনারেল অ্যানসন ছাড়াও ফরাসি পত্রে বলা হয়েছে, মারাত্মক তাপের শিকার হয়েছে প্রায় ৪,০০০ ইউরোপীয় সৈন্য; এমনকী ইংরেজি পত্রিকাতেও স্বীকার করা হচ্ছে যে, দিল্লির সম্মুখভাগের যুদ্ধে দুর্ভোগ সইতে হয়েছে শত্রু সৈন্যের গুলি থেকে ততটা নয়, যতটা রোদ্দুরের জন্য। যানবাহনাদির স্বল্পতায় আম্বালাস্থিত প্রধান ব্রিটিশ সৈন্যদের দিল্লি চড়াও হতে লাগে প্রায় সাতাশ দিন, অর্থাৎ দিনে পথ হেঁটেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা হারে। আম্বালায় ভারি কামান না থাকায় এবং সেই কারণে নিকট অস্ত্রাগার যা শতদ্রুর অপর পারে ফিলাউরে অবস্থিত। সেখান থেকে দখলি কামান বাহিনী নিয়ে আসতে আরও দেরি হয়।

এসব সত্ত্বেও দিল্লির পতন সংবাদ যে কোন দিন আশা করা যায়; কিন্তু তারপর? ভারত সাম্রাজ্যের চিরাচরিত কেন্দ্রের ওপর বিদ্রোহীদের অবাধ দখলের এক মাসেই যদি বেঙ্গল আর্মির একেবারে ভেঙে পড়া, কলকাতা থেকে উত্তরে পাঞ্জাব ও পশ্চিমে রাজপুতানা পর্যন্ত বিদ্রোহ ও সৈন্যদল ত্যাগের ঘটনা ছড়ানো, ভারতের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত ব্রিটিশ কর্তৃত্বকে টলিয়ে দেওয়ার দিক থেকে বোধ করি প্রবলতম উত্তেজিতকর কাজ হয়ে থাকে, তাহলে দিল্লির পতনে সিপাহীদের মধ্যে নৈরাশ্য ছড়ালেও তাতেই বিদ্রোহ প্রশমিত, তার প্রসার রুদ্ধ কিংবা ব্রিটিশ শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে, একথা ভাবা সবচেয়ে বড়ো ভুল। ২৮,০০০ রাজপুত, ২৩,০০০ ব্রাহ্মণ, ১৩,০০০ মুসলমান, ৫,০০০ নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং বাকিটা ইউরোপীয় দিয়ে গড়া ৮০,০০০ সৈন্যের গোটা দেশীয় বেঙ্গল আর্মি থেকে বিদ্রোহ, দলত্যাগ ও বরখাস্তের দরুন ৩০,০০০ সৈন্যই অদৃশ্য হয়েছে, আর এ আর্মির বাকিটা থেকে কয়েকটা রেজিমেন্ট খোলাখুলিই ঘোষণা করেছে যে, তারা ব্রিটিশ কর্তৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ত ও সমর্থন থাকবে শুধু দেশীয় সৈন্যদের যে কাজে লাগানো হচ্ছে শুধু সেই কাজটি বাদে। দেশীয় রেজিমেন্টের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তারা কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করবে না, বরং সাহায্য করবে তাদের ‘ভাইয়া’দের। কলকাতা থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেকটা স্টেশনেই তার সত্যকার দৃষ্টান্ত মিলেছে। দেশীয় সিপাহীরা কিছুকাল নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে, কিন্তু সেই ধারণা হয় যে তাদের যথেষ্ট শক্তি আছে, অমনি বিদ্রোহ করে বসে। যে সব রেজিমেন্ট এখনো ঘোষণা করেনি এবং যে সব দেশীয় অধিবাসী এখনও বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মেলায়নি, তাদের বিশ্বস্ততা সম্বন্ধে কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখেননি The London Times-এর একজন ভারতস্থ সংবাদদাতা।

তিনি বলেন, সব শাস্ত এ কথা পড়লে বুঝবেন, এখনও পর্যন্ত দেশীয় সৈন্যরা বিদ্রোহ করেনি; অধিবাসীদের অসন্তুষ্ট অংশ এখনো খোলাখুলি বিদ্রোহ করেনি; তারা হয় অতি দুর্বল, অথবা ভাবছে যে তারা দুর্বল, নয়তো অপেক্ষা করছে আরও উপযুক্ত একটা মুহূর্তের জন্যে। ঘোড়সওয়ার বা পদাতিক কোনো দেশীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের এর বিশ্বস্ততার পরিচয়ের কথা যখন পড়বেন তখন বুঝবেন যে, তার অর্থ তথা-প্রশংসিত রেজিমেন্টগুলির শুধু অর্ধেকটাই সত্যিই বিশ্বস্ত, বাকি অর্ধেকটা শুধু অভিনয় করছে যাতে বরং ইউরোপীয়দের অসতর্ক অবস্থায় পায়, নয়তো তাদের ওপর সন্দেহ না থাকার বিদ্রোহ ভাবাপন্ন সাথীদের যাতে আরও সহজে সাহায্য করতে পারে।

পাঞ্জাবে প্রকাশ্য বিদ্রোহ নিরোধ করা গেছে শুধু দেশীয় সৈন্যবাহিনী ভেঙে দিয়ে। অযোধ্যায় ইংরেজরা কেবল রেসিডেন্সি লক্ষ্ণৌ দখলে রাখতে পেরেছে বলা যায়, তাছাড়া সর্বত্রই দেশীয় রেজিমেন্টগুলি বিদ্রোহ করেছে, গুলিগোলা নিয়ে পালিয়েছে, সমস্ত বাংলো পুড়িয়ে ছাই করেছে, এবং যোগ দিয়েছে হাতিয়ার তুলে ধরা অধিবাসীদের সঙ্গে। প্রসঙ্গত ইংরেজ আর্মির আসল অবস্থা সবচেয়ে ভালো প্রকাশ পাচ্ছে এই ঘটনায় যে, পাঞ্জাব ও রাজপুতানা উভয় ক্ষেত্রেই ভ্রাম্যমান কোর স্থাপন করা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। তার অর্থ, বিক্ষিপ্ত সৈন্যদলগুলির মধ্যে যোগাযোগ বহাল রাখতে ইংরেজরা তাদের সিপাহী সৈন্য বা দেশীয় অধিবাসীদের ওপর ভরসা করতে পারছে না। উপদ্বীপীয় যুদ্ধকালে ফরাসিদের মতো তারা শুধু স্বীয় সৈন্যাধিকৃত ভূমিটুকু এবং তদধীন পরিপার্শ্বটুকু শাসনে রাখছে। আর তাদের আর্মির বিচ্ছিন্ন অঙ্গগুলির মধ্যে যোগাযোগের জন্য তারা নির্ভর করছে ভ্রাম্যমান কোর-এর ওপর-এ দলের কাজ এমনিতে অতি সঙ্গীন, তাতে যত বেশি জায়গা জুড়ে তা ছড়াবে, স্বভাবতই তত কমে যাবে তার প্রবলতা। ব্রিটিশ সৈন্যের বাস্তব অপ্রতুলতা আরও প্রমাণ হয় এই ঘটনায় যে, বিক্ষুব্ধ স্টেশনগুলি থেকে ধনসম্পদ সরাবার জন্য তারা বহনে সিপাহীদেরই লাগাতে বাধ্য হয়- সিপাহীরা বিনা ব্যতিক্রমে যাত্রাপথে বিদ্রোহ করে এবং ভার পাওয়া ধনসম্পদ নিয়ে ফেরার হয়। ইংল্যান্ড থেকে পাঠানো সৈন্যরা যেহেতু সর্বোত্তম ক্ষেত্রেও নভেম্বরের আগে পৌঁছাবে না এবং মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সি থেকে ইউরোপীয় সৈন্য টেনে আনা যেহেতু আরও বিপজ্জনক হবে- মাদ্রাজ সিপাহীদের ১০ নম্বর রেজিমেন্ট ইতোমধ্যেই বিক্ষোভের লক্ষণ দেখিয়েছে।

তাই বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে নিয়মিত কর সংগ্রহের ধারণা ত্যাগ করতে হবে ও ভাঙনের প্রক্রিয়াকে চলতে দিতেই হবে। যদি ধরে নেই যে বর্মীরা এ উপলক্ষে ফায়দা ওঠাবে না, গোয়ালিয়রের মহারাজা ইংরেজদের সমর্থন করেই যাবে এবং সর্বোৎকৃষ্ট ভারতীয় সৈন্য যার হাতে আছে সেই নেপালের সেই অধিপতি শান্তই থাকবে, বিক্ষুব্ধ পেশোয়ার অশান্ত পার্বত্য উপজাতিদের সঙ্গে যোগ দেবে না এবং পারস্যের শাহ হেরাত ছেড়ে যাওয়ার মতো মূর্খতা দেখাবে না, এমন কী তাহলেও গোটা বাংলা প্রেসিডেন্সিকে ফের জয় করতে হবে এবং গোটা ইঙ্গ ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে ফের গড়তে হবে। এই বৃহৎ ব্যাপারের খরচাটা সবই পড়বে ব্রিটিশ জনগণের ওপর। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় ঋণ মারফত প্রয়োজনীয় অর্থ তুলতে পারবে বলে লর্ড গ্রেনভিল লর্ড সভায় যে ধারণা দিয়েছেন তা কতো পাকা, তার বিচার হবে উত্তর পশ্চিম প্রদেশগুলির বিক্ষুব্ধ অবস্থায় বোম্বাইয়ের টাকার বাজারের প্রতিক্রিয়া থেকে। তৎক্ষণাৎ দেশীয় পুঁজিপতিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়, ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেয়া হয়, সরকারি সিকিউরিটি বিক্রয়ের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং শুধু বোম্বাইয়ে নয়, তার চারপাশেও প্রচুর পরিমাণে মজুদের হিড়িক লাগে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭

 


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ The Young Karl Marx/কার্ল মার্কস

The_Young_Karl_Marx_film_poster

মহান দার্শনিক ‘কার্ল মার্কস’কে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘The Young Karl Marx’/ ‘Der junge Karl Marx’। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করছেন এই বছর অস্কার নমিনেশন পাওয়া হাইতিয়ান চলচ্চিত্রকার রাউল পেক/Raoul Peck। বার্লিনে চিত্রায়িত এই ছবিতে ১৯ শতকের মাঝামাঝিতে কমিউনিজমের সূচনা কাল, ১৮৪৪ সালের দিকে প্যারিসে শিল্প বিপ্লব, র‍্যাডিক্যাল ধারার রাজনীতি, ২৬ বছর বয়সে মার্কসের যৌবন কালে বন্ধু এঙ্গেলস, মার্কসের স্ত্রী জেনি, আর্থ-সামাজিক টানা পোড়েনে বিক্ষুব্ধ জনগণ সহ নানা চরিত্র, সম্পর্ক ও ঘটনা নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে।

সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রটি দেখতে নীচে ক্লিক করুন –


কার্ল মার্কস: শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির উদ্বোধনী ভাষণ

karl-marx-wikimedia-commons

 

কার্ল মার্কস
শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির উদ্বোধনী ভাষণ

১৮৬৪ সালের ২৮ অক্টোবর লন্ডনের লং একরস্থ সেন্ট মার্টিন হলে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রতিষ্ঠিত

শ্রমজীবী মানুষেরা

একটি বিরাট সত্য হলো এই যে, ১৮৪৮ থেকে ১৮৬৪ সালের মধ্যে শ্রমজীবী জনসমষ্টির দুর্দশার কোন লাঘব হয়নি, তবুও এই সময়টাই শিল্প-বিকাশ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির দিক থেকে অতুলনীয়।  ১৮৫০ সালে ব্রিটিশ মধ্য শ্রেণির একটি নরমপন্থী ওয়াকিবহাল মুখপত্র এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, ইংল্যান্ডের রপ্তানি ও আমদানি যদি শতকরা ৫০ ভাগ বৃদ্ধি পায় তাহলে ইংরেজদের দারিদ্র্য একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে।  কিন্তু হায়! ১৮৬৪ সালের ৭ এপ্রিল অর্থসচিব পার্লামেন্টে তাঁর শ্রোতাদের এই বিবৃতি দিয়ে আনন্দ দান করলেন যে, ইংল্যান্ডের মোট আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য ১৮৬৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৪,৩৯,৫৫,০০০ পাউন্ডে উঠেছে।  এই আশ্চর্য সংখ্যাটা ১৮৪৩ এর অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক যুগের বাণিজ্যের প্রায় তিনগুণ! এই সব বলেও তিনি দারিদ্র্য সম্বন্ধে মুখর হয়ে ওঠেন।  তিনি বলে ওঠেন, সেই সব লোকের কথা ভাবুন, যারা এই এলাকার সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে, ভাবুন সেই সব মজুরির কথা যা বৃদ্ধি পায় নি, সেই মানব জীবন যা প্রতি দশ জনের মধ্যে নয় জনের ক্ষেত্রেই শুধু বেঁচে থাকার জন্য একটি সংগ্রাম মাত্র! তিনি আয়ারল্যান্ডের লোকেদের কথা বলেননি, সেখানে উত্তরে ধীরে ধীরে মানুষের জায়গা দখল করছে যন্ত্র আর দক্ষিণে মেষ চারণ, যদিও ভাগ্যাহত সেই দেশটিতে এমন কি মেষের সংখ্যাও কমে আসছে, অবশ্য মানুষের মতো অত দ্রুত নয়। এর ঠিক আগেই একটা আকস্মিক আতঙ্কের ঝোঁকে ঊর্ধ্বতন দশ হাজারের উচ্চতম প্রতিনিধিরা যা ফাঁস করে বসেছিল, তার পুনরাবৃত্তি তিনি করেননি।  যখন লন্ডনে গ্যারোট আতঙ্ক খানিকটা জোরালো হয়ে ওঠে, তখন লর্ড সভা নির্বাসন দন্ড ও কয়েদ খাটুনি সম্বন্ধে একটা তদন্ত ও রিপোর্ট প্রকাশের ব্যবস্থা করে। বিরাট আকারের ব্লু বুকে এক ভয়াবহ সত্য ফাঁস হয়ে গেল, সরকারি তথ্য ও সংখ্যা দিয়ে প্রমাণিত হল যে দন্ডপ্রাপ্ত জঘন্যতম অপরাধীরা, ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের কয়েদী গোলামরাও ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের কৃষি শ্রমিকদের চেয়ে কম খাটে ও ভালভাবে থাকে।  কিন্তু এইখানেই শেষ নয়। যখন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলে ল্যাঙ্কাশায়ার ও চেশায়ারের শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পথে দাঁড়াল, তখন সেই একই লর্ড সভা থেকে শিল্পাঞ্চলে একজন চিকিৎসককে পাঠানো হলো এই দায়িত্ব দিয়ে যে, তিনি অনুসন্ধান করবেন, গড়পড়তা হিসাবে স্বল্পতম ব্যয়ে ও সহজতম রূপে কত কম পরিমাণ কার্বন ও নাইট্রোজেন ব্যবহার করেই ‘অনাহারজনিত রোগ এড়ান যায়’।  মেডিকেল ডেপুটি ডাঃ স্মিথ নির্ধারণ করলেন যে, অনাহারজনিত রোগের ঠিক উপরের স্তরে থাকতে হলে একজন সাধারণ প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির পক্ষে সাপ্তাহিক প্রয়োজন হলো ২৮,০০০ গ্রেন কার্বন ও ১,৩৩০ গ্রেন নাইট্রোজেন।  তিনি এটাও নির্ধারণ করলেন যে, প্রচন্ড দারিদ্র্যের চাপে সুতো কলের কর্মীদের পথ্য কমে গিয়ে সেখানে দাঁড়িয়েছে, এ পরিমাণটা প্রায় তার সমান। কিন্তু তারপর দেখুন! সেই একই বিজ্ঞ চিকিৎসককে প্রিভি কাউন্সিলের মেডিকেল অফিসার পরে আর একবার পাঠিয়েছিলেন দরিদ্রতর শ্রমজীবী শ্রেণিগুলির পুষ্টি সম্বন্ধে অনুসন্ধান করতে।  সেই অনুসন্ধানের ফল লিপিবদ্ধ আছে জনস্বাস্থ্য সম্বন্ধে ষষ্ঠ রিপোর্টে, যা এই বছরে পার্লামেন্টের আদেশানুসারে প্রকাশিত হয়েছে। কী আবিষ্কার করলেন ডাক্তার? যারা রেশম বোনে, যেসব মেয়েরা সুচের কাজ করে, যারা চামড়ার দস্তানা বানায়, মোজা তৈরি করে ইত্যাদি, তাদের গড়পড়তা যে আয় তা সুতাকল কর্মীদের দুর্দশাকালীন রুজিটুকুর চেয়েও কম, অনাহারজনিত রোগ এড়ানোর জন্য ঠিক যতটুকু কার্বন ও নাইট্রোজেনও দরকার সেটুকুও নয়।

এই রিপোর্ট থেকেই উদ্ধৃত করছি : ‘তাছাড়া কৃষক জনসাধারণের মধ্য থেকে যে সমস্ত পরিবারকে পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের সম্বন্ধে এটাই দেখা গেল যে, তাদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশির ক্ষেত্রে কার্বনঘটিত খাদ্য জুটছে প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে কম; নাইট্রোজেনঘটিত খাদ্য প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে কম জুটছে এক তৃতীয়াংশেরও বেশি ক্ষেত্রে এবং তিনটি জেলাতে (বার্কশায়ার, অকসফোর্ডশায়ার এবং সামারসেটশায়ার) লোকের গড়পড়তা স্থানীয় আহার্যেই নাইট্রোজেনঘটিত খাদ্য প্রয়োজনের চেয়ে কম। সরকারি রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে ‘এ কথা মনে রাখা উচিত যে, নিতান্ত নিরুপায় হলেই তবে লোকেরা খাদ্যের অনটন স্বীকার করে এবং তাই সাধারণত অন্যান্য ব্যাপারে চরম কৃচ্ছ্রতার পরই তবে খাদ্যের কৃচ্ছ্রতা আসে… এমন কি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকাটাও এদের কাছে ব্যয় সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য, এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার আত্মসম্মানী প্রচেষ্টা এখনও চোখে পড়লেও প্রতিক্ষেত্রেই সে চেষ্টা মানে অধিকতর ক্ষুধার জ্বালা।  এভাবনা বেদনাদায়ক বিশেষ করে যদি এ কথা মনে রাখি যে উপরোক্ত দারিদ্র্য অলসতার সঙ্গত দারিদ্র্য নয়, সে দারিদ্র্য সবক্ষেত্রেই শ্রমজীবী মানুষেরই দারিদ্র্য। বস্তুতপক্ষে যে কাজ করে এই সামান্য ভিক্ষান্ন মিলছে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যধিক দীর্ঘ।  রিপোর্টে এই অদ্ভুত ও অপ্রকাশিত সত্যও উদঘাটিত হয়েছে যে, ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড- ইউনাইটেড কিংডমের এই বিভাগগুলির মধ্যে যে বিভাগ সবচেয়ে অবস্থাপন্ন সেই ইংল্যান্ডের কৃষিজীবী জনসাধারণই সবচেয়ে কম খাদ্য খেয়ে থাকছে।  কিন্তু এমন কি বার্কশায়ার, অকসফোর্ডশায়ার ও সামারসেটশায়ারের কৃষি শ্রমিকরাও পূর্ব লন্ডনের দক্ষ গৃহ কারিগরদের অনেকের চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকে।

এই হচ্ছে সরকারি বিবৃতি যা ১৮৬৪ সালে পার্লামেন্টের আদেশেই প্রকাশিত হয়েছে অবাধ বাণিজ্যের স্বর্ণ যুগে যখন অর্থসচিব কমন্সসভার কাছে এই কথা জানান যে, ‘গড় হিসাবে ব্রিটিশ শ্রমিকের অবস্থার যে পরিমাণ উন্নতি হয়েছে তা যে কোনো দেশের বা যে কোন যুগের ইতিহাসে অসাধারণ ও অতুলনীয় বলে আমাদের বিশ্বাস’।  এই সরকারি অভিনন্দনের তাল কাটছে জনস্বাস্থ্য বিভাগের রিপোর্টের এই শুষ্ক মন্তব্যে; কোনো দেশের জনস্বাস্থ্য বলতে বোঝায় জনগণের স্বাস্থ্য, এবং জনগণও ততক্ষণ স্বাস্থ্যবান হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না একেবারে তলার দিকে তারা অন্তত কিছুটা সমৃদ্ধ হয়।

জাতির প্রগতি সূচক পরিসংখ্যানগুলির নৃত্যে অর্থসচিবের চোখ ধাঁধিয়ে ওঠে, তিনি উদ্যাম আনন্দে চীৎকার করে ওঠেন, ১৮৪২ থেকে ১৮৫২ এর মধ্যে দেশের ট্যাক্সযোগ্য আয় শতকরা ৬ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল; আর ১৮৫৩ থেকে ১৮৬১- এই আট বছরে আয় ১৮৫৩ সালের তুলনায় ২০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।  ব্যাপারটা এত আশ্চর্য যে অবিশ্বাস্য মনে হয় … মিঃ গ্লাডস্টোন যোগ করেন, ‘সম্পদ ও শক্তির এই চাঞ্চল্যকর বৃদ্ধি পুরোপুরি সম্পত্তিবান শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ!’

আপনারা যদি জানতে চান স্বাস্থ্যহানী, নৈতিক অধঃপাত ও মানসিক ধ্বংসের কোন অবস্থার মধ্যে শ্রমজীবী শ্রেণিগুলি পুরোপুরি সম্পত্তিবান শ্রেণিগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ সম্পদ ও শক্তির এই চাঞ্চল্যকর বৃদ্ধি ঘটিয়েছে এবং এখনও ঘটাচ্ছে, তাহলে ছাপাখানা ও দর্জিদের কর্মশালার ওপর বিগত জনস্বাস্থ্য রিপোর্টে প্রদত্ত ছবিটির দিকে তাকিয়ে দেখুন।  ১৮৬৩ সালের শিশু নিয়োগ কমিশনের রিপোর্টের সঙ্গে তুলনা করে দেখুন। সেখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা হয়েছে; শ্রেণি হিসাবে কুম্ভকাররা সকলেই, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে, শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই হল এক অতি অধঃপতিত জনসংখ্যা; বলা হয়েছে যে, স্বাস্থ্যহীন শিশুরাই আবার স্বাস্থ্যহীন পিতা-মাতা হয়ে দাঁড়ায়; ক্রমান্বয়ে জাতির অবনতি এগিয়েই চলবে; আবার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে অনবরত লোক সংগ্রহ করা যদি না হত এবং যদি অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যবান বংশে বিবাহাদি না চলতো, তাহলে স্ট্যাফোর্ডশায়ারের জনসংখ্যার অবনতি হত আরও অনেক বেশি। ঠিকা রুটি কারিগরদের অভাব অভিযোগ সংক্রান্ত মিঃ স্টেমেনহিবের ব্লু বুকের দিকে নজর দিন। তাছাড়া কারখানাসমূহের ইন্সপেক্টরা যে আপাত বিরোধী বিবৃতি দিয়েছিল এবং যা রেজিস্ট্রার জেনারেল কর্তৃক প্রমাণিত হয়েছে, সে বিবৃতি পড়ে কে না শিউরে উঠেছে? সে বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, তুলার দুর্ভিক্ষে সাময়িকভাবে সুতাকল থেকে ছাড়া পাবার ফলে বরাদ্দ দুঃস্থ খাদ্য মাত্রায় ল্যাঙ্কাশায়ারের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যোন্নতিই হচ্ছিল, আর তাদের শিশু সন্তানদের মৃত্যুহার কমছিল।  কারণ, শিশুদের মায়েরা এতদিনে গডফ্রের আরকের (Godfrey’s cordial) বদলে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াবার অবকাশ পাচ্ছিল।

আরেকবার উল্টো দিকটা দেখুন।  ১৮৬৪ সালের ২০ জুলাই কমন্স সভার সামনে যে আয় ও সম্পত্তিগত ট্যাক্সের বিবরণ দাখিল করা হয় তা থেকে আমরা এই কথাই জানতে পারি যে, তহসিলদারদের হিসাব অনুযায়ি যে সব লোকের বাৎসরিক আয় ৫০ হাজার পাউন্ড বা তদুর্ধ্ব তাদের দলে ১৮৬২ সালের ৫ই এপ্রিল থেকে ১৮৬৩-র ৫ই এপ্রিলের মধ্যে আরও তেরজন যোগ দিয়েছে।  অর্থাৎ এই এক বছরে তাদের সংখ্যা ৬৭ থেকে ৮০তে পৌঁছেছে। সেই একই বিবরণ থেকে এ কথাও প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, প্রায় দুই লক্ষ ৫০ হাজার পাউন্ড পরিমাণ বাৎসরিক আয় ভাগাভাগি হয়ে যায় তিন হাজার লোকের মধ্যে, অর্থাৎ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সমগ্র কৃষি শ্রমিকদের আয় হিসাবে যে মুষ্টিভিক্ষা লাভ করে তার মোট পরিমাণ থেকেও এ আয় কিছুটা বেশি।  ১৮৬১ সালের লোকগণনার হিসাবটি খুলে ধরলে জানতে পারবেন যে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ভূমি সম্পত্তির পুরুষ মালিকদের সংখ্যা ১৮৫১ তে যেখানে ছিল ১৬ হাজার ৯৩৪ জন, সেখানে তা ১৮৬১ তে কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৬ জন।  অর্থাৎ দশ বছরে ভূসম্পত্তির কেন্দ্রীভবন বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ১১ ভাগ।  এই হারে যদি অল্প কয়েকজনের হাতে দেশের জমির কেন্দ্রীভবন এগিয়ে যায়, তাহলে ভূমি সমস্যাটি অত্যন্ত সরল হয়ে যাবে, যেমন হয়েছিল রোম সাম্রাজ্যে, যখন অর্ধেক আফ্রিকা প্রদেশটির মালিক হয়েছে ছয়জন ভদ্রলোক এ কথা শুনে হেসেছিলেন নেরো।
এত আশ্চর্য যে প্রায় অবিশ্বাস্য তথ্য নিয়ে আমরা যে এত বেশি আলোচনা করলাম তার কারণ এই যে, শিল্প বাণিজ্যে ইউরোপের শীর্ষে রয়েছে ইংল্যান্ড। একথা স্মরণ করা যেতে পারে যে, কয়েকমাস পূর্বে লুই ফিলিপের এক উদ্বাস্তু পুত্র প্রকাশ্যে ইংরেজ কৃষি শ্রমিকদের এই বলে অভিনন্দিত করেন যে, চ্যানেলের অপর পারে এদের অল্পতর সঙ্গতিসম্পন্ন সাথীদের তুলনায় এদের ভাগ্য ভাল। বাস্তবিকই স্থানীয় রং বদলে ও কিছুটা সঙ্কুচিত আকারে ইংল্যান্ডের তথ্যগুলি ইউরোপের সমস্ত শিল্পোন্নত ও প্রগতিশীল দেশেই পুনরুদিত।  এই সমস্ত দেশেই ১৮৪৮ সাল থেকেই এক অশ্রুতপূর্ব শিল্প বিকাশ ও আমদানি রপ্তানির অকল্পনীয় প্রসার ঘটেছে।  এই সমস্ত দেশেই পুরোপুরি সম্পত্তিবান শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ সম্পদ ও শক্তির বৃদ্ধি সত্যই চাঞ্চল্যকর। ইংল্যান্ডের মতো এইসব দেশেই শ্রমিক শ্রেণির অল্প একাংশের আসল মজুরির কিছু পরিমাণ বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর্থিক মজুরির সামান্য কিছু বৃদ্ধি সুখ সুবিধার যেটুকু আসল লাভ বোঝায় তা দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রাথমিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির খরচ ১৮৫২ সালে সাত পাউন্ড সাত শিলিং চার পেন্সের জায়গায় ১৮৬১ তে নয় পাউন্ড ১৫ শিলিং আট পেন্সে উঠে যাওয়াতে শহরের দুঃস্থ আবাস বা অনাথালয়ের বাসিন্দাদের যে টুকু উপকার সম্ভব তার বেশি কিছু নয়। প্রত্যেক জায়গাতেই শ্রমজীবী জনগণের অধিকাংশ নিচে নেমে যাচ্ছে, অন্তত সেই হারেই যে হারে তাদের উপরতলার লোকদের সামাজিক জীবনে উন্নতি হচ্ছে। যন্ত্রের উন্নতি, উৎপাদনেরক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, নতুন উপনিবেশ সৃষ্টি, দেশান্তর গমন, নতুন বাজার প্রতিষ্ঠা, অবাধ বাণিজ্য- এসব কোন কিছুই এমন কি সব কিছু একত্র করে মেহনতি জনগণের দুর্দশা যে দূর হবে না, বরং বর্তমানের মিথ্যা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শ্রমের উৎপাদন শক্তির প্রতিটি নতুন বিকাশের প্রবণতাই যে সামাজিক বৈষম্য গভীরতর করার ও সামাজিক বৈরভাব তীক্ষ্ণতর করার দিকে- এই সত্যই আজ ইউরোপের সকল দেশের প্রত্যেকটি সংস্কারমুক্ত লোকের কাছেই প্রমাণিত হয়ে উঠেছে, এই সত্যকে অস্বীকার করে শুধু তারাই যারা অপরকে মুর্খের স্বর্গে ঠেলে দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানীতে আর্থিক প্রগতির এই চাঞ্চল্যকর যুগে অনাহারজনিত মৃত্যু প্রায় একটা প্রথার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই যুগ শিল্প ও বাণিজ্যের সঙ্কটরূপ সামাজিক মহামারীর আরও ঘন ঘন পুনরাগমন, অধিকতর বিস্তার এবং ক্রমবর্ধমান মারাত্মক ফলাফলের দ্বারা চিহ্নিত।

১৮৪৮ সালের বিপ্লবগুলো ব্যর্থ হবার পর ইউরোপীয় ভূখন্ডে শ্রমিক শ্রেণির যত পার্টি সংগঠন ও পার্টি পত্রিকা ছিল সব কিছুই শক্তির লৌহ হস্তে নিষ্পেষিত করা হলো, শ্রমিক শ্রেণির সবচেয়ে অগ্রণী সন্তানরা হতাশ হয়ে আশ্রয় নিলেন আটলান্টিকের পরপারের প্রজাতন্ত্রে, আর শিল্পোন্মদনা, নৈতিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার এক যুগের সামনে মিলিয়ে গেল মুক্তির স্বল্পস্থায়ী স্বপ্ন। ইউরোপ খন্ডের শ্রমিক শ্রেণির পরাজয়ের জন্য অংশত দায়ী ছিল ইংরেজ সরকারের কূটনীতি; এখনকার মতোই তখনও ইংরেজ সরকার সেন্ট পিটার্সবুর্গের মন্ত্রিসভার সঙ্গে ভ্রাতৃত্বসুলভ সৌহার্দ্য রেখে কাজ করছিল। এই পরাজয়ের সংক্রামক ফলাফল শীঘ্রই চ্যানেলের এপারেও পৌঁছালো। ইউরোপ খন্ডের ভাইদের বিপর্যয়ে একদিকে যেমন ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির মনোবল কমে গেল ও নিজ আদর্শের সম্বন্ধে তাদের বিশ্বাস ভেঙে পড়লো, তেমনি অপরদিকে এর ফলে ভূমিপতি ও ধনপতিদের কিছুটা বিচলিত আত্মপ্রত্যয় আবার ফিরে এল। যে সব সুবিধা দেবার কথা তারা আগেই বিজ্ঞাপিত করেছিল, ঔদ্ধত্যভরে সে সব তারা প্রত্যাহার করে নিল। নতুন নতুন স্বর্ণ অঞ্চল আবিষ্কৃত হওয়ায় দলে দলে লোক দেশত্যাগ করতে লাগলো এবং তার ফলে ব্রিটিশ প্রলেতারীয়দের মধ্যে সৃষ্টি হল এক অপূরণীয় ফাঁক। তাদের আগেকার দিনের সক্রিয় অন্যান্য কর্মীরা বেশি কাজ ও বেশি মজুরির সাময়িক ঘুষের মায়ায় রাজনৈতিক দালালে পরিণত হলো। চার্টিস্ট আন্দোলনকে জীবিত রাখার বা পুনর্গঠিত করার সমস্ত প্রচেষ্টা একেবারে ব্যর্থ হল, শ্রমিক শ্রেণির মুখপত্র কাগজগুলি জনসাধারণের উদাসীনতায় একে একে বিলুপ্ত হয়ে গেল; এবং সত্য কথা বলতে গেলে এমন এক রাজনৈতিক অবলুপ্তির অবস্থার সঙ্গে ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণি পরিপূর্ণ মাত্রায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে বলে মনে হল যা পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। সুতরাং, ব্রিটেন ও ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সংগ্রামের সাযুজ্য না থাকলেও অন্তত পরাজয়ের সাযুজ্য ঘটল।

তাসত্ত্বেও ১৮৪৮ এর পরবর্তি যুগটা ক্ষতিপূরণের চিহ্ন বর্জিত নয়। এখানে আমরা শুধু দুটি বিরাট ঘটনার উল্লেখ করবো।

ত্রিশ বৎসর ধরে প্রশংসনীয় ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই করার পর ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণি ভূমিপতি ও ধনপতিদের মধ্যে এক সাময়িক ভাঙন কাজে লাগিয়ে দশ ঘণ্টার আইনটি পাশ করাতে সক্ষম হয়। এর ফলে কারখানার শ্রমিকদের প্রভূত শারীরিক, নৈতিক ও মানসিক যে উপকারের কথা কারখানা পরিদর্শকদের অর্ধ বাৎসরিক রিপোর্টে লিপিবদ্ধ হয় তা এখন সর্বত্রই স্বীকৃত। ইউরোপে অধিকাংশ সরকারকেই ইংল্যান্ডের ফ্যাক্টরি আইন কম বেশি সংশোধিত রূপে গ্রহণ করতে হয়েছে এবং ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টকেও প্রতিবছর এর কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত করতে হচ্ছে। কিন্তু ব্যবহারিক সুবিধাটুকু ছাড়াও শ্রমজীবী মানুষের এই বিধানটির বিস্ময়কর সাফল্যকে গৌরবজনক মনে করার অন্য কারণও ছিল। ডাঃ ইউর, অধ্যাপক সিনিয়র ও এই জাতের অন্যান্য পন্ডিতদের মতো তাদের বিজ্ঞানের অতি কুখ্যাত মুখপাত্রদের মাধ্যমে মধ্য শ্রেণি এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল এবং প্রাণভরে প্রমাণ করেছিল যে, শ্রমের ঘণ্টা যদি আইনগতভাবে সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে তাতে ব্রিটিশ শিল্পের মৃত্যু পরোয়ানাই জারি করা হবে; এ শিল্প বাঁচতে পারে কেবল পিশাচের মতো রক্ত চুষে, তদুপরি শিশুর রক্ত চুষেই। পুরাকালে শিশু হত্যা ছিল মোলখ (Moloch) পূজার্চনার এক রহস্যময় অনুষ্ঠান। কিন্তু সে অনুষ্ঠান পালন করা হত শুধু অতি গাম্ভীর্যপূর্ণ উপলক্ষে, বৎসরের হয়তো বা একবার, এবং তা ছাড়া, শুধুমাত্র গরিব শিশুদের ওপরেই একমাত্র পক্ষপাত মোলখের ছিল না। শ্রমিকদের কাজের ঘণ্টা আইনত সীমাবদ্ধ রাখার এই সংগ্রাম আরও প্রচন্ড হয়ে ওঠে এই কারণে সে আতঙ্কিত লালসার কথা ছাড়াও এর প্রভাব পড়েছিল এক বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর, একদিকে মধ্য শ্রেণির অর্থশাস্ত্রের যা ভিত্তি সেই চাহিদা ও সরবরাহের নিয়মের অন্ধ প্রভুত্বের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির যা অর্থশাস্ত্র সেই সামাজিক দূরদৃষ্টি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত সামাজিক উৎপাদনের দ্বন্দ্ব। সুতরাং দশ ঘণ্টার আইনটি যে শুধু এক বৃহৎ ব্যবহারিক সাফল্য তাই নয়, এ হলো একটা নীতিরও জয়; এই সর্বপ্রথম প্রকাশ্য দিবালোকে শ্রমিক শ্রেণির অর্থশাস্ত্রের কাছে মধ্য শ্রেণির অর্থশাস্ত্র পরাজিত হলো।

কিন্তু সম্পত্তির অর্থশাস্ত্রের ওপর শ্রমের অর্থশাস্ত্রের আরও বড় একটি বিজয় বাকি ছিল। আমরা সমবায় আন্দোলনের কথা বলছি, বিশেষত কোনোরকম সহায়তা না পেয়েও কিছু সাহসী মজুরের (hands) চেষ্টায় যে সব সমবায়মূলক কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে তার কথা। এই ধরনের বিরাট সামাজিক পরীক্ষার মূল্য অসীম বিপুল। যুক্তিতর্কের বদলে কাজ দিয়েই এই সমবায় সমিতিগুলি দেখিয়ে দিয়েছে যে, শ্রমিক শ্রেণির নিয়োগকারী মালিক শ্রেণি না থাকলেও বৃহৎ আকারে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের নির্দেশনা অনুযায়ী উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া যায়; দেখিয়ে দিয়েছে যে, সার্থক হতে হলে শ্রমজীবীর ওপর আধিপত্য ও তাকে লুণ্ঠিত করার মাধ্যম রূপে শ্রমের উপায়কে একচেটিয়াধীন করার প্রয়োজন পড়ে না; দেখিয়ে দিয়েছে যে, ঠিকা শ্রম হচ্ছে দাসশ্রম ও ভূমিদাস শ্রমের মতোই শ্রমের এক নিকৃষ্ট ও স্বল্পস্থায়ী রূপমাত্র, উৎসুক হাতে প্রস্তুত, মনে প্রফুল্ল চিত্তে চালানো সংঘবদ্ধ শ্রমের সামনে যা অদৃশ্য হতে বাধ্য। ইংল্যান্ডে রবার্ট ওয়েন সমবায় পদ্ধতির বীজ বপন করেন, ইউরোপ খন্ডে শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে যে সব পরীক্ষা করা হয়, প্রকৃতপক্ষে তা উদ্ভাবিত নয়, ১৮৪৮ সালে সরবে ঘোষিত তত্ত্বাদির ব্যবহারিক পরিণতি।

সেই সঙ্গে ১৮৪৮ থেকে ১৮৬৪ পর্যন্ত সময়কালের অভিজ্ঞতা থেকে এটাও নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হল যে, নীতির দিক থেকে যতই উৎকৃষ্ট ও ব্যবহারের দিক থেকে যতই উপযোগী হোক না কেন, সমবায় শ্রমকে ব্যক্তিগত শ্রমিকদের অনিয়মিত প্রচেষ্টার সঙ্কীর্ণ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখলে, একচেটিয়া মালিকানার জ্যামিতিক হারের ক্রমবৃদ্ধিকে বাধা দেওয়া বা জনসাধারণকে মুক্ত করা অথবা তাদের দুর্দশার বোঝাটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লাঘব করাও কখনও সম্ভব হবে না। বোধহয় ঠিক এই কারণেই, মধুভাষী সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকেরা মধ্য শ্রেণীর মানব হিতৈষী বাক্যবাগীশরা এবং এমন কি উৎসাহী অর্থতাত্ত্বিকেরা পর্যন্ত সকলেই হঠাৎ এই সমবায় শ্রম পদ্ধতির ঘিনঘিনে প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠেছেন, যদিও ঠিক এই পদ্ধতিকেই তাঁরা স্বপ্নচারীর ইউটোপিয়া বলে উপহাস অথবা সমাজবাদীর অনাচার বলে নিন্দিত করে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন। মেহনতি জনসাধারণকে উদ্ধার করতে হলে সমবায় শ্রমকে দেশজোড়া আয়তনে সম্প্রসারিত করতে হবে এবং কাজেই তাকে সারা জাতির সম্পদ দিয়ে পরিপোষণ করতে হবে। কিন্তু ভূমিপতি ও পুঁজিপতিরা তাদের অর্থনৈতিক একচেটিয়া রক্ষা ও চিরস্থায়ী করার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা সর্বদাই ব্যবহার করবে। সুতরাং শ্রমের মুক্তির পথে সাহায্য করা দূরে থাক, সে পথে সর্বপ্রকার বাধা সৃষ্টির কাজই তারা করে যাবে। মনে করে দেখুন, গত অধিবেশনে লর্ড পামারস্টোন আইরিশ প্রজাস্বত্ব বিলের প্রবক্তাদের অপদস্থ করার জন্য কী রকম বিদ্রুপ করেছিলেন। তিনি বলে দিলেন, কমন্স সভা হচ্ছে ভূস্বামীদের সভা।

অতএব রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় করা শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে এক মহান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা তারা উপলব্ধি করেছে বলেই মনে হয়, কেননা ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি এবং ফ্রান্সে একই সঙ্গে নবজাগরণ শুরু হয়েছে এবং সর্বত্র একসঙ্গেই শ্রমিক শ্রেণির পার্টির রাজনৈতিক পুনর্গঠনের চেষ্টাও চলছে।

সাফল্যের একটা উপাদান শ্রমিক শ্রেণির আছে- সংখ্যা; কিন্তু সঙ্ঘের দ্বারা ঐক্যবদ্ধ এবং জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত হতে পারলে তবেই সংখ্যায় পাল্লা ভারি হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গিয়েছে, ভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের মধ্যে থাকা উচিত ও তাদের মুক্তি সংগ্রামে পরস্পরের জন্য একযোগে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করা উচিত সেই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রতি অবহেলা তাদের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাগুলিকে কী রকম সাধারণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে ফেলে। এই চিন্তাই ১৮৬৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সেন্ট মার্টিন হলে এক সভায় সমবেত বিভিন্ন দেশের শ্রমজীবী মানুষকে তাদের আন্তর্জাতিক সমিতি প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
আর একটি প্রত্যয়ও এই সভাকে প্রভাবান্বিত করেছে।

শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য যদি তাদের ভ্রাতৃত্বসুলভ ঐক্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে অপরাধমূলক মতলব হাসিল করার জন্য অনুসৃত যে পররাষ্ট্র নীতি জাতিগত কুসংস্কার ব্যবহার করছে, দস্যু-যুদ্ধে জনগণের রক্ত ও সম্পদ অপচয় করছে, সেই নীতি বজায় রাখলে এই মহান ব্রতটি কী করে পূর্ণ করা যাবে? আটলান্টিকের অপর পারে দাসত্বকে কায়েম রাখার ও প্রচারিত করার কলঙ্কময় জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে পশ্চিম ইউরোপকে বাঁচিয়েছিল শাসক শ্রেণির বিজ্ঞ মনোভাব নয়, বাঁচিয়েছিল সেই অপরাধমূলক মূর্খামির বিরুদ্ধে ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণিরই বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ। ককেশাসের পার্বত্য দুর্গটি যখন রাশিয়ার শিকারে পরিণত হচ্ছিল এবং বীর পোল্যান্ডকে রাশিয়া যখন হত্যা করছিল তখন ইউরোপের উচ্চ শ্রেণির লোকেরা যে নির্লজ্জ সমর্থন, ভন্ড সহানুভূতি বা আহাম্মকসুলভ উদাসীনতাই দেখিয়েছিল, যে বর্বর শক্তির মাথা রয়েছে সেন্ট পিটার্সবুর্গে এবং যার হাত রয়েছে ইউরোপের প্রত্যেকটি মন্ত্রিসভায়, সেই রাশিয়ার যে ব্যাপক ও অপ্রতিহত অনধিকার হস্তক্ষেপ ঘটছে; তা থেকে শ্রমিক শ্রেণি শিখেছে যে, তার কর্তব্য হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির রহস্য আয়ত্ত করা; নিজ নিজ সরকারের কূটনৈতিক কার্যকলাপের ওপর নজর রাখা; প্রয়োজন হলে তাদের সর্বশক্তি দিয়ে সে কার্যকলাপের প্রতিরোধ করা, তাকে ব্যর্থ করতে অক্ষম হলে অন্তত সকলে একসঙ্গে তার প্রকাশ্য নিন্দা করা এবং নীতি ও ন্যায়ের যে সব সহজ নিয়ম দিয়ে ব্যক্তিমানুষের সম্পর্ক শাসিত হওয়া উচিত, তাদেরই প্রতিষ্ঠা করা জাতিসমূহের মধ্যেকার যোগাযোগের সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ম হিসাবে। এই রকমের পররাষ্ট্র নীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হল শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য সাধারণ সংগ্রামের একাংশ।
দুনিয়ার মজুর এক হও!

 

সুত্রঃ 

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n


ভারতে নকশালরা ২০শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ রাজ্যে বন্ধ ডেকেছে …

বিশাখাপত্তনম : রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের জন বিরোধী কার্যক্রমের প্রতিবাদে সিপিআই (মাওবাদী) ফেব্রুয়ারীর ২০ তারিখ থেকে অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানা সহ পাঁচ রাজ্যে বন্ধ ডেকেছে। বৃহস্পতিবার টিওআই পাঠানো একটি প্রেস রিলিজে মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় আঞ্চলিক ব্যুরো (CRb) মুখপাত্র প্রতাপ- ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা এবং মহারাষ্ট্রে ধ্বংসাত্মক এবং গণবিরোধী নীতি বাস্তবায়নকারী হিসেবে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি , পি মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু, তেলেঙ্গানা মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও কে দায়ী করেন। 

Source – http://timesofindia.indiatimes.com/city/visakhapatnam/Naxals-call-for-5-state-bandh-on-Feb-20/articleshow/46224136.cms