কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কতিপয় সমস্যা

কৃষক

কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কতিপয় সমস্যা

আমাদের দেশে বিপ্লবী ধারায় কৃষকদের কোন গণসংগঠন নেই।  বড় ধনীদের পার্টি আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রভৃতি তাদের ভোটের রাজনীতির স্বার্থে কৃষকদের নামকাওয়াস্তে সংগঠন রাখে, যেগুলো কৃষকদের কোনরকম স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করে না।  অন্যদিকে কিছু কিছু এনজিও কৃষকদেরকে সংগঠিত করে থাকে তাদেরকে কৃষকের স্বার্থে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লব থেকে দূরে রাখবার পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে।  এদের বাইরে বিভিন্ন বামপন্থী ধারার পার্টির নেতৃত্বে যেসব কৃষক সংগঠন রয়েছে সেগুলো হচ্ছে দাবি-দাওয়া ভিত্তিক সংস্কারবাদী কৃষক সংগঠন।  যে সংগঠনগুলো কৃষকদের সামগ্রিক মুক্তির কোন বিপ্লবী কর্মসূচি না এনে চলতি কিছু দাবিদাওয়াকে শুধু তুলে ধরে।
এই সব সংগঠন পরিচালিত হয় শহরকে কেন্দ্রে রেখে।  যে কারণে তেভাগা-হাজং বিদ্রোহের পর মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু কৃষক আন্দোলন ছাড়া আমাদের দেশে গ্রাম-ভিত্তিক বড় ধরনের কোন কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেনি।
“কৃষক মুক্তি সংগ্রাম” গঠন করা হয়েছে কৃষকদের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যকে কেন্দ্রে রেখে।  আমাদের লক্ষ্য গ্রামকেন্দ্রীক কৃষক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা।  যাকে শহরের সাথে অবশ্যই যুক্ত থাকতে হবে, কিন্তু যার ভিত্তি হবে গ্রাম, এবং গ্রামকেন্দ্রীক পরিচালনা।  যেজন্য এই সংগঠনের অফিস উপজেলা-জেলা সদরের চেয়ে গ্রামভিত্তিক গড়ে তুলতে হবে।  সংগঠকগণও প্রধানত গ্রামে কৃষকদের উপর নির্ভর করে পারস্পরিক যোগাযোগসহ কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে আমাদের সংগঠনের প্রাথমিক ধরনের চ্যানেল/সংযোগ/সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে।  কোথাও কোথাও তা একটি পর্যায়ে বিকশিত হয়ে কিভাবে তাকে আরো এগিয়ে নেয়া হবে তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ও হচ্ছে।  এখানে সেইসব সমস্যাকে মাথায় রেখে কিছু আলোচনা করা হচ্ছে।
আমাদের সংগঠকগণ কৃষকদের সংগঠিত করতে গিয়ে দেশে অনুশীলিত প্রচলিত ধারার আশু দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে আগানোর চেষ্টা করেন। সেটা কৃষকদেরকে বুঝানো সহজও বটে। তাতে সংগঠনের কিছুটা বিকাশও হয়। কিন্তু তারপর তা একই বৃত্তে ঘুরতে থাকে।  নতুন বিপ্লবী রাজনীতি, অর্থাৎ কৃষকদের সামগ্রিক মুক্তির কর্মসূচি নিয়ে আসা ছাড়া এই বৃত্ত থেকে বেরুনো সম্ভব নয়।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, তথা কৃষি অবস্থা সনাতনী স্থানীয়-ভিত্তিক সামন্তীয় ব্যবস্থায় নেই। অন্যদিকে তা স্বাধীন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হিসেবেও গড়ে ওঠেনি।  এখানে এখন সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।  ফলে কৃষকের শ্রমের ফল বিভিন্ন উপায়ে ও বিভিন্ন ধরনের হাত ঘুরে সাম্রাজ্যবাদ- সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দালাল বড় ধনীদের ঘরেই জমা হচ্ছে।  তার ভাগ পাচ্ছে মফস্বল-কেন্দ্রীক তাদের দালালেরা, যারা ব্যবস্থার স্থানীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর এই উৎপাদন ব্যবস্থা কিভাবে আমাদের কৃষকদের ও কৃষির প্রকৃত উন্নয়নের প্রতিবন্ধক তা কৃষকদের মাঝে কাজ করতে হলে তাদের কাছে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং তা থেকে মুক্তির কর্মসূচি আনতে হবে। কৃষকদেরকে বুঝাতে হবে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে আগের তুলনায় বেশি ফসল উৎপাদন হলেও কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না কেন।
এক্ষেত্রে আমাদের সংগঠকগণ সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে সামনে অনেন ঠিকই, কিন্তু একইসাথে এ থেকে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এবং সে প্রশ্নে যে পাল্টা বিপ্লবী অর্থনৈতিক কর্মসূচি আনতে হবে তা সঠিকভাবে তাদের আলোচনায় আসে না বা আসলেও জোর কম পড়ে।
বিশ্লেষণ করতে হবে কৃষকদের উন্নয়নের নামে কিভাবে সমগ্র কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। এই উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে কিভাবে বিপ্লবীকরণ করতে হবে সেই বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
যেসব অঞ্চলে আঁখ, তামাক, মৎস্য, চিংড়ী প্রভৃতি খামার পদ্ধতি গড়ে উঠেছে তাকে বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আনতে হবে।
খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টন, “খোদ কৃষকের হাতে জমি”- এই নীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী ভূমি-সংস্কার, জলাভূমি মৎস্যজীবীদের মালিকানায় বা অধিকারে আনা, সুদী শোষণ উচ্ছেদের লক্ষ্যে তার শোষণ কমানো, ইজারা প্রথার উচ্ছেদসহ সামন্তবাদ বিরোধী কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
জমির মালিকানার প্রশ্নে নারী-পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য তা দূর করে জমিতে সমঅধিকারের বিষয় আনতে হবে।
এছাড়া সমতল ও পাহাড়ে আদিবাসী কৃষক জনগণ যারা বছরের পর বছর জমি/ভিটেবাড়ী ভোগ করলেও তাদেরকে মালিকানা দেয়া হয়নি তা তুলে ধরতে হবে।

সংগঠন গড়ে উঠবে কি প্রক্রিয়ায়? তার কাঠামো কী হবে?
এ ক্ষেত্রেও প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামাকে অনুসরণের প্রবণতা দেখা যায়।  আমাদের সংগঠন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। তাই, এই সংগঠন গড়ার প্রক্রিয়া ও কাঠামোও নতুন।  প্রথমে ৩/৫/৭…….জনকে নিয়ে গ্রুপ গঠন করে এই নতুন রাজনীতির শিক্ষা নিতে হবে।  তারপর কমিটি গঠনের পদক্ষেপ নেয়া যায়। সে কমিটি হবে প্রশাসনিক কাঠামো এবং সংগঠনের লক্ষ্য ও আত্মগত অবস্থার ভিত্তিতে সৃজনশীল সমন্বয় সাধন করে।
শহর-বন্দরকেন্দ্রীক মিটিং করার পুরনো পদ্ধতির বদলে পাড়া বৈঠক/গ্রাম বৈঠক/উঠান বৈঠক/হাটসভা/বাজারসভা প্রভৃতি চালু করতে হবে।  এসব সভা করার ক্ষেত্রে কৃষকগণ কখন কাজ থেকে অবসর থাকেন তা বিবেচনায় আনতে হবে।
সংগঠন পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন।  এজন্য সদস্যদের চাঁদা ছাড়া মৌসুমী ফসল সাহায্য, হাট-বাজারে গণসাহায্যসহ বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।
দেশব্যাপী কৃষক সংগঠনের বহু সংখ্যক এলাকা গড়ার পাশাপাশি কিছু কিছু অঞ্চলে লাগাতার ও বিস্তৃত কৃষক এলাকা গড়ে তুলতে হবে।  এই ধরনের অঞ্চলে পারস্পরিক সংযোগ-সমন্বয়ের জন্য সার্বক্ষণিক সংগঠক গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংগঠন-সংগ্রাম বিকাশের প্রক্রিয়ায় গণশত্রুরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য তরুণ-যুব কৃষকদের নিয়ে কৃষক আত্মরক্ষী দল গঠনের লক্ষ রাখতে হবে।
এখানে কিছু বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে মাত্র। বাস্তব অনুশীলন থেকে উত্থাপিত সমস্যাবলী নিয়ে সংগঠকদের মধ্যে পারস্পরিক মত বিনিময় ও অব্যাহত আলোচনা-পর্যালোচনা চালাতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলন গড়ার মূর্ত সাংগঠনিক লাইন গড়ে উঠবে।

সূত্রঃ কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত