‘হাওরবাসীর সর্বনাশের দায় রাষ্ট্রের’- নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার সমাবেশ অনুষ্ঠিত

নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা

জাতীয় কমিটি

 

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

হাওরে লাখ লাখ কৃষকের সর্বস্বান্ত হওয়ার দায় রাষ্ট্র-সরকারকে নিতে হবে এবং হাওরের কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।”

আজ শুক্রবার, ২১-০৪-২০১৭, শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে উপরোক্ত দাবিতে নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিকেল চারটায় শুরু হওয়া সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণমোর্চার সভাপতি কমরেড জাফর হোসেন। সমাবেশে উপস্থিত থেকে সংহতি জানান জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সহ সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ দত্ত ও ল্যাম্পপোস্ট সম্পাদক নাহিদ সুলতানা লিসা।সমাবেশে গণমোর্চার নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন, শাহাজাহান কবীর- সভাপতি বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি।

সমাবেশে বক্তারা নিম্নোক্ত দাবি জানানঃ

১। হাওরে বাঁধ নির্মানে লুটপাটে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে গণ আন্দোলন গড়ে তুলুন।

২। হাওর অঞ্চলের কৃষকদের সকল মহাজনী সুদ, সরকারী কৃষি ও এঞ্জিও লোন মওকুফ করতে হবে।

৩। কৃযকদের কর্মসংস্থান এর লক্ষে সকল প্রকার ইজারাদারি প্রথা বন্ধ করার পক্ষে গণ আন্দোলন গড়ে তুলুন।

৪। “মাছ ধরবেন যিনি,জলার মালিক তিনি” নীতির ভিত্তিতে কৃষক সমাজ এক হোন।

৫। সকল প্রকার শোষণ-নিপীড়ন -অত্যাচারের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গ্রামে-গঞ্জে শ্রমিক -কৃষকের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করুন।

৬। ভারত-মার্কিন-চীন-রাশিয়ার দালাল শাসকশ্রেণীর গণবিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন।

বার্তা প্রেরক

বিপ্লব ভট্টাচার্য্য


মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে বন্দী কৃষকের জীবন

4408487670_dd7a022364_b

বাজারে সব ধরনের চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে কেজি প্রতি পাঁচ টাকা হারে। এই খবরটি দেশের অধিকাংশ পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসে আমন ধানের মৌসুম শেষ হয়েছে। সামনে আবার এপ্রিল-মে মাসে বোরো ধানের মৌসুম আসছে। এরই মধ্যে বাজারে কী প্রয়োজনে চালের মূল্য হঠাৎ করে কেজি প্রতি পাঁচ টাকা বৃদ্ধি পেল তার উত্তর রহস্যজনক। বাজারে ধান চালের কোন ঘাটতি নেই। ধান চালের ঘাটতিতে পড়ে দেশে কোন দুর্ভিক্ষাবস্থাও বিরাজ করছে না। তাহলে দাম বৃদ্ধি ঘটলো কোন যুক্তিতে? চালের এই মূল্য বৃদ্ধির জন্য চাতাল মালিকদের দায়ী করা হয়েছে। চাতাল মালিকদের পক্ষ থেকে আবার পাইকারদের দায়ী করা হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা একে অন্যের উপর দায় চাপিয়ে ইতিমধ্যে চালের মূল্য বৃদ্ধি করে নিয়েছে। আসলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রয়োজন ছিল দাম বাড়ানোর। সে যে যুক্তিতেই হোক না কেন, আর যাদের ওপর দায়ভার চাপানো হোক না কেন বাজারে দাম তো বৃদ্ধি পেল। চালের এই মূল্য বৃদ্ধিতে লাভবান হলো দেশের সকল মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি।
ডিসেম্বরে আমন ধানের মৌসুম শেষ হওয়ায় কৃষক তার উৎপাদিত ধান বাজারে বিক্রী করে দিয়েছে। এখন ধান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী গ্রামীণ ধনী কৃষক, জোতদার, মহাজন, আড়তদার ও চাতাল মালিকদের হাতে। ধনী কৃষক, জোতদার, মহাজন, আড়তদার ইত্যাদি মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি কৃষি উৎপাদনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়। কৃষি কাজের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত গ্রামীণ মধ্য কৃষক, গরিব কৃষক ও দিনমজুরেরা। ধান, চাল উৎপাদনের মৌসুমে এরা উৎপাদন চালাতে গিয়ে তারা দেনার দায়ে আবদ্ধ হয়। কৃষি উৎপাদন চালানোর মতো প্রয়োজনীয় পুঁজি এই শ্রেণির হাতে থাকে। উচ্চ ফলনশীল উন্নত জাতের ফসলের চাষ আবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, তবে প্রকৃত কৃষক সকল দিক থেকে সর্বস্বাস্ত হয়ে পড়েছে। সাবেকী প্রদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য বীজ কৃষক উৎপাদন করতো ও সংরক্ষণ করতো। উন্নত জাতের বীজ কৃষক নিজে উৎপাদন করতে পারে না। এখন তাকে উন্নত জাতের বীজ বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। উন্নত জাতের প্যাকেটজাত বীজ বাজারে পরিবেশন করে বহুজাতিক কোম্পানি ও বিপণন করে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। কৃষককে শোষণ করে লাভবান হচ্ছে তারাই।

উচ্চ ফলনশীল ফসলের চাষাবাদে জমিতে সেচ ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর জন্য দেশে বিভিন্ন ধরনের সেচ যন্ত্র চালু রয়েছে। এই সব সেচ যন্ত্রের মালিক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রামীণ জোতদার, মহাজন বা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। এই সেচ যন্ত্র চালাতে গেলে জ্বালানির প্রয়োজন। এই জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা হয় বিদেশ থেকে আমদানি করে। জমিতে চাষের ক্ষেত্রে পশুর ব্যবহার এখন নেই বললেই চলে। জমিতে চাষ হয় এখন পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর দিয়ে। এই পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের মালিক জোতদার মহাজন বা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসলের চাষাবাদে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অপরিহার্য। এই সার অধিকাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আর কীটনাশক দেশে একেবারেই উৎপাদন হয় না। সার ও কীটনাশক উৎপাদন করে সাম্রাজ্যবাদী দেশের বহুজাতিক কোম্পানি। এই বহুজাতিক কোম্পানি বহুমূল্যে দেশের বাজারে এই সার ও কীটনাশক সরবরাহ করে। আর ব্যবসায়ী নামক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি তা বিদেশ থেকে আমদানি করে এবং বিপণনের পর্যায়ে তা বহু হাত ঘুরে তা কৃষকের কাছে পৌঁছে থাকে। প্রতিবার হাত বদলের সাথে সাথে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফাও বৃদ্ধি পায় ও দাম বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটে।

আমাদের মতো নয়া ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশগুলোতে কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারিত থাকে, মধ্যস্বত্বভোগীদের স্বার্থে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে জোতদার, মহাজন, আড়তদার ইত্যাদি মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে ফসলের উৎপাদন মৌসুমে কৃষি পণ্যের মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়েও অনেক কমিয়ে দেয়, তেমনিভাবে আবার কৃষকের হাতে যখন আর কৃষি পণ্য থাকে না তখন কৃষি পণ্যের মূল্য অনেক বাড়িয়ে দেয়। এই কৌশলে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি কৃষককে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে কম দামে কিনে নিজেরা মুনাফা অর্জন করে। আবার শাক সবজি ইত্যাদি কাঁচামালের ক্ষেত্রে কৃষককে স্রেফ ফাঁকি দেওয়া হয়। কাঁচামালের আড়তদার, মহাজনরা যে মূল্যে ক্রয় করে বিক্রয়ের সময়ে ভোক্তাদের নিকট থেকে তার চেয়ে দশগুণ বেশি মূল্য আদায় করা হয়। এক কেজি বেগুণ যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা তিন টাকা মূলে ক্রয় করে বিক্রয়ের সময়ে তার মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় কেজি প্রতি ৫০ টাকায়। এইভাবে প্রতিটি কাঁচামালের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যের ব্যবধান ১০ গুণেরও বেশি হয়। শাক সবজি বিক্রি করে কৃষক মূল্য না পেলেও ভোক্তাকে কিন্তু অনেক বেশি মূল্য দিয়ে বাজার থেকে কিনে খেতে হয়।

এইভাবে আমন ধানের মৌসুম ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। জানুয়ারি মাসের কৃষকের হাতে বিক্রী করার মতো কিছু ধান অবশিষ্ট থেকে যায়। অবশিষ্ট ধান বিক্রী করে ফেলার ফলে কৃষকের হাতে আর কোন ফসল থাকে না। তখন ফেব্রেুয়ারি মাসে চালের মূল্য এক লাফে কেজি প্রতি পাঁচ টাকা বৃদ্ধি ঘটলো। লাভবান হলো সেই ব্যবসায়ী নামক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। কৃষক যে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, দিনে দিনে নিঃস্ব হচ্ছে তা আমাদের দেশের সরকার দেখেও দেখছে না। কারণ সরকার তো মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির প্রতিনিধি। প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে রূপের সরকার আসুক না কেন তারা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। আসলে গোটা দেশটার মালিক বা নিয়ন্ত্রের ক্ষমতা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির হাতে। দেশে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির বিনিয়োগ হয়। লগ্নি পুঁজির খাটিয়ে এদেশের মুৎসুদ্দি শ্রেণি যে লুটপাট চালায় তা সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর হাতে তুলে দেয়। সাম্রাজ্যবাদীরা সেখান থেকে উচ্ছিষ্ট অংশ এদেশের মুৎসুদ্দি শ্রেণির দিকে ছুড়ে দেয়। মুৎসুদ্দি শ্রেণি সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির মালিকদের ছুড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ভোগ করে নিজেরা তুষ্ট ও পরিপুষ্ট হয়। আর সরকার সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় মুৎসুদ্দি শ্রেণির মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে দু’পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৬।।সংখ্যা-০৬, রোববার।। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।।


ব্রাজিলে সর্বহারা কৃষক ও নারীদের আন্দোলন সংগ্রামের ভিডিও চিত্র


২০১৪ সালে ভারতে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা ১২০০০ এর বেশি

433712-rna-farmer-suicide

২০১৪ সালে ভারতের কৃষি ক্ষেত্রে ১২৩৬০জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ৫৬৫০জন কৃষক আর ৬৭১০ জন ক্ষেত মজুর। রাজ্যসভায় এই তথ্য পেশ করেছেন কৃষিমন্ত্রী রাধা মোহন সিং। মহারাষ্ট্রের পর পাঞ্জাবেই সব থেকে বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। বিরোধীরা দাবি করেছেন এই সরকারি তথ্য আংশিক। কম করে দেখান হয়েছে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা। অভিযোগটা ফেলে দেওয়ার মত নয়। কারণ এরাজ্যে যখনই কৃষক আত্মহত্যা করেন তখনই রাজ্য সরকার বলতে শুরু করে ওটা চাষের কারণে নয়, পারিবারিক বা অন্য কোন কারণেই নাকি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।


কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কতিপয় সমস্যা

কৃষক

কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কতিপয় সমস্যা

আমাদের দেশে বিপ্লবী ধারায় কৃষকদের কোন গণসংগঠন নেই।  বড় ধনীদের পার্টি আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রভৃতি তাদের ভোটের রাজনীতির স্বার্থে কৃষকদের নামকাওয়াস্তে সংগঠন রাখে, যেগুলো কৃষকদের কোনরকম স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করে না।  অন্যদিকে কিছু কিছু এনজিও কৃষকদেরকে সংগঠিত করে থাকে তাদেরকে কৃষকের স্বার্থে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লব থেকে দূরে রাখবার পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে।  এদের বাইরে বিভিন্ন বামপন্থী ধারার পার্টির নেতৃত্বে যেসব কৃষক সংগঠন রয়েছে সেগুলো হচ্ছে দাবি-দাওয়া ভিত্তিক সংস্কারবাদী কৃষক সংগঠন।  যে সংগঠনগুলো কৃষকদের সামগ্রিক মুক্তির কোন বিপ্লবী কর্মসূচি না এনে চলতি কিছু দাবিদাওয়াকে শুধু তুলে ধরে।
এই সব সংগঠন পরিচালিত হয় শহরকে কেন্দ্রে রেখে।  যে কারণে তেভাগা-হাজং বিদ্রোহের পর মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু কৃষক আন্দোলন ছাড়া আমাদের দেশে গ্রাম-ভিত্তিক বড় ধরনের কোন কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেনি।
“কৃষক মুক্তি সংগ্রাম” গঠন করা হয়েছে কৃষকদের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যকে কেন্দ্রে রেখে।  আমাদের লক্ষ্য গ্রামকেন্দ্রীক কৃষক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা।  যাকে শহরের সাথে অবশ্যই যুক্ত থাকতে হবে, কিন্তু যার ভিত্তি হবে গ্রাম, এবং গ্রামকেন্দ্রীক পরিচালনা।  যেজন্য এই সংগঠনের অফিস উপজেলা-জেলা সদরের চেয়ে গ্রামভিত্তিক গড়ে তুলতে হবে।  সংগঠকগণও প্রধানত গ্রামে কৃষকদের উপর নির্ভর করে পারস্পরিক যোগাযোগসহ কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে আমাদের সংগঠনের প্রাথমিক ধরনের চ্যানেল/সংযোগ/সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে।  কোথাও কোথাও তা একটি পর্যায়ে বিকশিত হয়ে কিভাবে তাকে আরো এগিয়ে নেয়া হবে তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ও হচ্ছে।  এখানে সেইসব সমস্যাকে মাথায় রেখে কিছু আলোচনা করা হচ্ছে।
আমাদের সংগঠকগণ কৃষকদের সংগঠিত করতে গিয়ে দেশে অনুশীলিত প্রচলিত ধারার আশু দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে আগানোর চেষ্টা করেন। সেটা কৃষকদেরকে বুঝানো সহজও বটে। তাতে সংগঠনের কিছুটা বিকাশও হয়। কিন্তু তারপর তা একই বৃত্তে ঘুরতে থাকে।  নতুন বিপ্লবী রাজনীতি, অর্থাৎ কৃষকদের সামগ্রিক মুক্তির কর্মসূচি নিয়ে আসা ছাড়া এই বৃত্ত থেকে বেরুনো সম্ভব নয়।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, তথা কৃষি অবস্থা সনাতনী স্থানীয়-ভিত্তিক সামন্তীয় ব্যবস্থায় নেই। অন্যদিকে তা স্বাধীন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হিসেবেও গড়ে ওঠেনি।  এখানে এখন সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।  ফলে কৃষকের শ্রমের ফল বিভিন্ন উপায়ে ও বিভিন্ন ধরনের হাত ঘুরে সাম্রাজ্যবাদ- সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দালাল বড় ধনীদের ঘরেই জমা হচ্ছে।  তার ভাগ পাচ্ছে মফস্বল-কেন্দ্রীক তাদের দালালেরা, যারা ব্যবস্থার স্থানীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর এই উৎপাদন ব্যবস্থা কিভাবে আমাদের কৃষকদের ও কৃষির প্রকৃত উন্নয়নের প্রতিবন্ধক তা কৃষকদের মাঝে কাজ করতে হলে তাদের কাছে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং তা থেকে মুক্তির কর্মসূচি আনতে হবে। কৃষকদেরকে বুঝাতে হবে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে আগের তুলনায় বেশি ফসল উৎপাদন হলেও কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না কেন।
এক্ষেত্রে আমাদের সংগঠকগণ সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে সামনে অনেন ঠিকই, কিন্তু একইসাথে এ থেকে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এবং সে প্রশ্নে যে পাল্টা বিপ্লবী অর্থনৈতিক কর্মসূচি আনতে হবে তা সঠিকভাবে তাদের আলোচনায় আসে না বা আসলেও জোর কম পড়ে।
বিশ্লেষণ করতে হবে কৃষকদের উন্নয়নের নামে কিভাবে সমগ্র কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। এই উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে কিভাবে বিপ্লবীকরণ করতে হবে সেই বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
যেসব অঞ্চলে আঁখ, তামাক, মৎস্য, চিংড়ী প্রভৃতি খামার পদ্ধতি গড়ে উঠেছে তাকে বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আনতে হবে।
খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টন, “খোদ কৃষকের হাতে জমি”- এই নীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী ভূমি-সংস্কার, জলাভূমি মৎস্যজীবীদের মালিকানায় বা অধিকারে আনা, সুদী শোষণ উচ্ছেদের লক্ষ্যে তার শোষণ কমানো, ইজারা প্রথার উচ্ছেদসহ সামন্তবাদ বিরোধী কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
জমির মালিকানার প্রশ্নে নারী-পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য তা দূর করে জমিতে সমঅধিকারের বিষয় আনতে হবে।
এছাড়া সমতল ও পাহাড়ে আদিবাসী কৃষক জনগণ যারা বছরের পর বছর জমি/ভিটেবাড়ী ভোগ করলেও তাদেরকে মালিকানা দেয়া হয়নি তা তুলে ধরতে হবে।

সংগঠন গড়ে উঠবে কি প্রক্রিয়ায়? তার কাঠামো কী হবে?
এ ক্ষেত্রেও প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামাকে অনুসরণের প্রবণতা দেখা যায়।  আমাদের সংগঠন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। তাই, এই সংগঠন গড়ার প্রক্রিয়া ও কাঠামোও নতুন।  প্রথমে ৩/৫/৭…….জনকে নিয়ে গ্রুপ গঠন করে এই নতুন রাজনীতির শিক্ষা নিতে হবে।  তারপর কমিটি গঠনের পদক্ষেপ নেয়া যায়। সে কমিটি হবে প্রশাসনিক কাঠামো এবং সংগঠনের লক্ষ্য ও আত্মগত অবস্থার ভিত্তিতে সৃজনশীল সমন্বয় সাধন করে।
শহর-বন্দরকেন্দ্রীক মিটিং করার পুরনো পদ্ধতির বদলে পাড়া বৈঠক/গ্রাম বৈঠক/উঠান বৈঠক/হাটসভা/বাজারসভা প্রভৃতি চালু করতে হবে।  এসব সভা করার ক্ষেত্রে কৃষকগণ কখন কাজ থেকে অবসর থাকেন তা বিবেচনায় আনতে হবে।
সংগঠন পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন।  এজন্য সদস্যদের চাঁদা ছাড়া মৌসুমী ফসল সাহায্য, হাট-বাজারে গণসাহায্যসহ বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।
দেশব্যাপী কৃষক সংগঠনের বহু সংখ্যক এলাকা গড়ার পাশাপাশি কিছু কিছু অঞ্চলে লাগাতার ও বিস্তৃত কৃষক এলাকা গড়ে তুলতে হবে।  এই ধরনের অঞ্চলে পারস্পরিক সংযোগ-সমন্বয়ের জন্য সার্বক্ষণিক সংগঠক গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংগঠন-সংগ্রাম বিকাশের প্রক্রিয়ায় গণশত্রুরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য তরুণ-যুব কৃষকদের নিয়ে কৃষক আত্মরক্ষী দল গঠনের লক্ষ রাখতে হবে।
এখানে কিছু বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে মাত্র। বাস্তব অনুশীলন থেকে উত্থাপিত সমস্যাবলী নিয়ে সংগঠকদের মধ্যে পারস্পরিক মত বিনিময় ও অব্যাহত আলোচনা-পর্যালোচনা চালাতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলন গড়ার মূর্ত সাংগঠনিক লাইন গড়ে উঠবে।

সূত্রঃ কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত


আদিবাসী কৃষকদের উদ্দেশে কিছু কথা

07339241681da5387f8c36f4ca258fc6-02

 

আদিবাসী কৃষকদের উদ্দেশে কিছু কথা

কৃষকদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে আদিবাসী কৃষকদের সমস্যা নিয়ে পৃথকভাবে বলার গুরুত্ব চলে আসে। কেননা আদিবাসীরা প্রধানত কৃষক হলেও ধনীক শ্রেণীর (আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া, জোতদার-মহাজন-ইজারাদার) দ্বারা শুধু শ্রেণীগতভাবেই শোষিত-নিপীড়িত নয়। তারা উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ দ্বারাও নিপীড়িত, যা বৃটিশ আমল থেকেই চলে এসেছে।
বাংলাদেশ জুড়ে ৪৯টি সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার ২৫ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীর বাস। ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে তারা বিকশিত হোক তা সাম্রাজ্যবাদ এবং দালাল শাসক শ্রেণি কখনও চায়নি। তাই আদিবাসী কৃষক জনগণ বৃটিশ আমল থেকেই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করে আসছেন। তার মধ্যে সাঁওতাল, হাজং বিদ্রোহ উল্লেখযোগ্য। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী কৃষকগণ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু শেখ মুজিব সরকার আদিবাসীদের আলাদা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে তাদেরকে বাঙালি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে শান্তি বাহিনী দমনের নামে পাহাড়ী আদিবাসী জনগণের উপর দমন-নির্যাতন চালায় যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব-জিয়া-এরশাদ-খালেদা-হাসিনার সব সরকারের আমলেই পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী কৃষক তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন। সমতলের শোষিত, নিঃস্ব ভূমিহীন গরীব বাঙালি কৃষকদের পাহাড়ে পুনর্বাসনের নামে বুর্জোয়া শাসকদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং দরিদ্র বাঙালি ও আদিবাসীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লাগিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটছে।
বিগত সময়ে শাসকশ্রেণী তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা পাহাড়ে বেশ কয়েকটি গণহত্যা চালিয়েছে। তার মাঝে লংগদু, লোগাং, নানিয়ারচর গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৮ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামের সাজেকে আদিবাসী কৃষকদের কয়েকশ’ বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। পাহাড়ে চলছে অঘোষিত সেনা-শাসন। হত্যা-ধর্ষণ-অপহরণ, গ্রেপ্তার-নির্যাতন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা।
সমতলেও আদিবাসী কৃষকদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে এখানেও তা নৃশংস রূপ নিচ্ছে। গত ১২ জুন ’০৯-এ নওগাঁ জেলার পোরশা থানার সোনাডাঙ্গা আদিবাসী পল্লীটি ভূমিদস্যু, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নুরুল ইসলাম মাস্টার তার লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ও লুটপাট করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। একই থানার ছাওর ইউনিয়নের খাতিরপুর গ্রামের ২২ বিঘা জমির উপর গড়ে ওঠা আদিবাসী দরিদ্র কৃষকদের ৬০/৭০টি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে এরা পুড়িয়ে দেয়। এইসব তাণ্ডবে দিনবদলের হাসিনা সরকারের পুলিশ বাহিনী সহায়তা করছে। এভাবেই নিরবে বা সরবে সমতলেও আদিবাসী কৃষকগণ ভিটেমাটি-জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন। ইকোপার্ক নির্মাণের নামে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও সিলেটে আদিবাসীরা জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন।
পাহাড়ীদের সাথে ’৯৮ সালে হাসিনা যে শান্তিচুক্তি করেছিল তা ছিল মূলত পাহাড়ী আদিবাসীদের মধ্যে বিভক্তি ও ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বসংঘাত সৃষ্টি করে বাঙালি বুর্জোয়াদের লুটপাট অব্যাহত রাখার এক নতুন ষড়যন্ত্র মাত্র। সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন এন.জি.ও, মিশনারী সংস্থা আদিবাসীদের মাঝে যে সংস্কারমূলক কাজ করছে তা মূলত মহাজনী সুদী ব্যবসা করা এবং আদিবাসী কৃষকদের খুদ-কুঁড়ো দিয়ে প্রকৃত শত্রুদের আড়াল করা ছাড়া কিছু না। সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে আদিবাসীদের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের যে স্বীকৃতি দিয়েছে তা কাগুজে। বিগত ২০ বছরে তা প্রমাণিত। কারণ আজও আদিবাসী জনগণ ভিটেমাটি-জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন, বনজঙ্গলে-অরণ্যে তাদের অধিকার হারাচ্ছেন, হুমকির মুখে রয়েছেন। এজন্য সঠিক রাজনীতি ও সঠিক সংগঠন বেছে নেয়া ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই।

সূত্রঃ কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত


বাংলাদেশের কৃষক নারীদের সমস্যা

hh

বাংলাদেশের কৃষক নারীদের সমস্যা

[“নারীমুক্তি”, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ থেকে সংকলিত]

 

আমাদের দেশে নারী সমস্যার কথা বলতে গেলে প্রথমেই কৃষক নারীর সমস্যার বিষয় বলতে হয়। সমাজ-সভ্যতার বিকাশের ইতিহাসে প্রথম উৎপাদন হিসেবে কৃষি উৎপাদন এবং কৃষকের উদ্ভব হয়। শুরু হয় কৃষকের সমস্যা।  নারী তার সাথে জড়িয়ে আছে সেই আদিকাল থেকে।  আমাদের বাংলাদেশ আজও কৃষি প্রধান দেশ।  দেশের শতকরা ৭০ জনই হচ্ছেন কৃষক। তার অর্ধেক নারী যারা সমাজে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত।

আদিম সমাজে নারী নিপীড়নের ইতিহাস দেখা যায় না।  বরং ইতিহাসে যা রয়েছে তা ছিল মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা।  যে ব্যবস্থায় নারী পুরুষ কারো দ্বারা কেউ নিপীড়িত ছিলেন না।  কারণ মাতৃতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী বৈষম্য ছিল না।  পুরুষের শিকার এবং নারীদের খাদ্য সংগ্রহ, সন্তান পালন দুই-ই ছিল জীবন ধারণের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।  ফলে সামাজিক ও যৌন জীবনে নারী-পুরুষ সমানাধিকার ভোগ করতেন।  যখন থেকে সমাজে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন থেকেই  শ্রেণির উদ্ভব।  শুরু হয়েছে শ্রেণি শোষণ, দেখা দিয়েছে লিঙ্গ বৈষম্য।  এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গড়ে উঠে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ।  নারী সমস্যার প্রশ্নে এঙ্গেলস বলেছেন- “মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বিলুপ্তি নারী জাতির জন্য সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক পরাজয়।  পুরুষরা গৃহস্থালির দখলও ছিনিয়ে নেয়।  মেয়েদের মর্যাদার হানি হয়, তারা পুরুষের কামনার দাস ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়।” (পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি)।

মানুষের আদি উৎপাদন ব্যবস্থা কৃষিতে নারীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।  এমনকি কৃষি উৎপাদন নারীর আবিষ্কার বলেই ইতিহাসে স্বীকৃত।  নারীর গর্ভ ধারণ, শিশু পালন, শিশুকে দুগ্ধদান এই প্রাকৃতিক কারণেই নারীর পক্ষে পশু শিকারে যাওয়া ছিল অসুবিধাজনক।  একারণে নারী-পুরুষের মাঝে শ্রম বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আদিম সমাজ নারীর জন্য তুলনামূলক সহজলভ্য ফলমূল সংগ্রহের কাজটি বরাদ্দ করে।  ফল-মূলের বীজ বপন করেই নারী আবিষ্কার করে কৃষি কাজের।  পর্যায়ক্রমে কৃষি কাজের প্রসার এবং কৃষি কাজের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ সৃষ্টি হলে নারীর পাশে পুরুষও পশু শিকার বাদ দিয়ে কৃষি কাজে নিয়োজিত হয়।

কিন্তু সমাজের এই বিকাশ সরল রেখায় আগায়নি।  আদিম সাম্যবাদী সমাজের এক পর্যায়ে মানুষের বিভিন্ন গোষ্ঠির মধ্যে ভূ-খণ্ডগত স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।  স্বার্থকেন্দ্রীক শুরু হয় প্রতিপক্ষ দুই দলের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ। বিজয়ীরা সম্পদের মালিক বনে যায়, পরাজিতরা হয় বন্দী, পরিণত হয় দাসে।  এই দাসদের মালিকও হয় ভূ-সম্পদের মালিকরাই। সম্পদের মালিকরাই হয় সমাজপতি।  তারাই নারীদের কৃষি উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঘরে গৃহস্থি কাজে নিয়োগ করে, পুরুষের ভোগের সামগ্রী এবং সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করে।  কালক্রমে শ্রেণি শোষণ নারী শোষণকে ‘বৈধ’ করার জন্যই সম্পদের মালিক সমাজপতিরা বিভিন্ন আইন, নিয়ম প্রণয়ন করে, গড়ে তোলে তাদের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা।  তাদের প্রণীত আইন মানানোর ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলে সশস্ত্র বাহিনী।  সৃষ্টি হয় রাষ্ট্র। সীমানা নির্ধারণ হয় রাষ্ট্রীয় ভূ-খণ্ডের। যুগে যুগে পুরুষদের দ্বারা বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাব।  সব ধর্মই নারী ও শ্রেণি শোষণমূলক ব্যবস্থাকেই নীতিসম্মত করে তোলে এবং জনমনে গেঁথে দেয় ঈশ্বরের আদেশ বলে।

ফলে পুরুষতন্ত্র আধিপত্য বিস্তার করে সমাজের সর্বস্তরে।  পুরুষরা নারীদের  তাদের অধীনস্ত করে এবং ধীরে ধীরে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সর্বময় ক্ষমতা দখল করে।  এবং নারীদের তারা নিজেদের প্রয়োজন ও স্বার্থ অনুযায়ী ব্যবহার করার সুযোগ পায়।  নারী শ্রমিক ও নারী এই দ্বৈত শোষণের শিকার হয়।

সমাজের শ্রেণি দ্বন্দ্বের ফলে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে- দাস সমাজ থেকে সামন্ততান্ত্রিক সমাজে, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে পুঁজিবাদে, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ সাম্রাজ্যবাদে।  কিন্তু কোন সমাজেই কৃষক নারীর পরাজিত জীবনে নিপীড়নের হাতিয়ার পরুষতন্ত্র ও শ্রেণি শোষণ বিলুপ্ত হয়নি। ক্ষুদে বুর্জোয়া উচ্চমধ্যবিত্ত নারীদের কিছু উন্নয়ন (বৈষয়িক) হলেও কৃষক নারীর অবস্থা মধ্যযুগীয় পর্যায়েই রয়ে গেছে।  পুঁজিবাদী সমাজেও পুরুষতন্ত্র ও শ্রেণি শোষণ হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে সমানতালে।  সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীন নারীদের এই  দ্বৈত শোষণ থেকে মুক্ত করলেও পুঁজিবাদের পুনরুত্থান পুনরায় সেসব দেশের নারীদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে।

তাই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা আজ দেখছি সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বায়নের অধীন দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর উন্নয়নের ডামাডোলের মাঝে বাংলাদেশের কৃষক নারীর করুণ চিত্র।

সাম্রাজ্যবাদ আজ ঢাক-ঢোল পিটাচ্ছে নারীদের উৎপাদনে অংশগ্রহণের ও নারীর উন্নয়নের জন্য। কিন্তু আমরা দেখছি বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষক নারীরা পুঁজিবাদের ডামাঢোলে নয়, সংসারের আর্থিক অনটন ঘুচাতেই তারা বহুকাল আগ থেকেই বাড়ির বাইরে গিয়ে ধনী-জোতদারদের বাড়িতে কৃষি কাজ করে উপার্জন করেন।  ৬০-এর দশক থেকে দরিদ্র নারীরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনে যুক্ত হয়ে পড়েছেন।  বীজতলা থেকে বীছন তোলা, ক্ষেতের আগাছা পরিস্কার করা, ধানকাটা, বহন, মাড়াই করা, পানি সেচের যন্ত্র চালু করা, সব্জি ক্ষেত থেকে শাক-সব্জি তুলে আনা ইত্যাদি।  এগুলো তারা করে শ্রমিক হিসেবে ধনী-জোতদারদের ক্ষেত-খামারে মজুরির বিনিময়ে। ঘরে গৃহস্থি কাজের পাশাপাশি গৃহপালিত পশু-পাখি পালনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  পশু-পাখির খাদ্য দরিদ্র কৃষক নারীরাই সংগ্রহ করে থাকেন।  এমনকি মাঠে তারা গরু-ছাগলও চড়ান।

কিন্তু কৃষক মজুর নারীরা কৃষি কাজের মজুরি পান পুরুষ মজুরদের চেয়ে বহু কম।  কৃষি উৎপাদনে দরিদ্র নারীদের মঝে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।  কিন্তু বাঙালী হিন্দু-মুসলিম নারীও জীবনের প্রয়েজনে পুরুষতান্ত্রিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ অনেকটা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। ক্ষেতের কাজ ছাড়াও দরিদ্র নারীরা বিভিন্ন ধরনের উৎপাদনমূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন- যেমন কুটির শিল্পের কাজ, বিড়ি কারখানার কাজ, ধানকলের কাজ, মাটি কাটা, ছোট ছোট ব্যবসা ইত্যাদি করে সংসারে অর্থের যোগান দেন।

ঘরে বাইরে এতসব কাজ করা সত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর কাজকে উৎপাদনশীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না।  স্বামী তাদের ভরণ-পোষণ করছে এমন মূল্যবোধই সমাজে আজও প্রতিষ্ঠিত।  বরং নারীর উৎপাদনমূলক কাজকে অমর্যাদাকর কাজ হিসেবেই সমাজ দেখে।  এ কারণেই ধনী কৃষক পরিবারের মেয়েদের ঘর-গৃহস্থি কাজ ছাড়া ক্ষেতের কাজ করতে দেয়া হয় না। পুরুষতান্ত্রিক নিয়মগুলোকে ধনী কৃষক নারীদের আরো কঠোরভাবে পালন করতে হয় এবং তারা স্বামীদের উপর বেশি নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।  যদিও এই নারীরাও উদয়স্ত গৃহস্থি কাজের মধ্য দিয়ে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দরিদ্র নারীরা শ্রমের ন্যায্য মজুরি পান না।  ধনী কৃষক বা জোতদার নারীদের মজুরিও পুরুষ মজুরদের চেয়ে কম। ধনীরা সস্তা শ্রম শোষণের পাশাপাশি নারীদের নারী হিসেবেও শোষণ করে বিভিন্ন প্রলোভনে ফেলে।

সামন্ত সমাজে নারী সম্পর্কে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা গড়ে তুলেছিল যে নারীরা প্রকৃতিগতভাবে দুর্বল ও নিম্নমানের এবং মাতৃত্ব ও গৃহস্থালি কাজই তাদের উপযুক্ত ও স্বাভাবিক স্থান।  কৃষি কাজসহ সব ধরনের কাজেই নারী পারদর্শিতার পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও উপরোক্ত মূল্যবোধ সমাজ থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করছে না পুরুষতন্ত্রের রক্ষক শাসক পুঁজিপতিরা।

দরিদ্র নারীদের উপার্জিত অর্থ পরিবারের অভাব মিটাতে ব্যয় হয়ে যায়; কিন্তু ধনী পরিবারে তা নয়। কিন্তু ধনী-গরীব নির্বিশেষে নারীরা স্বামীর সংসারে সম্পদের মালিক হতে পারেন না, যদি-না স্বামীরা স্বেচ্ছায় স্ত্রীদের সম্পত্তি প্রদান করে।  স্বামীর মৃত্যুর পর মুসলিম নারী স্বামীর সমস্ত সম্পদের এক-অষ্টমাংশের মালিকানা পান।  মুসলিম নারী বাবার সম্পত্তি পান ভাইয়ের অর্ধেক।  হিন্দু নারীরা তাও পান না।  বাবার সম্পত্তি মেয়েরা সাধারণত নিজের করে নেন না- কৃষক নারীদের বেড়াতে যাবার বা বিপদে আশ্রয় পাবার একটিমাত্র জায়গা বাবার বাড়িতে ভাইদের আপ্যায়ন থেকে বঞ্চিত হবার ভয়ে। কিন্তু কোন কোন স্বামী স্ত্রীকে বাবার সম্পদ আনতে বাধ্য করে।  কৃষক নারী এই সম্পদও নিজের প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছায় ব্যয় করতে পারেন না বরং স্বামীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকেন।  আজও কৃষক নারী সম্পদের মালিক হতে না পেরে শৈশবে পিতা, যৌবনে স্বামী এবং বৃদ্ধকালে ছেলের উপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হন।  দরিদ্র কৃষক নারীরা বৃদ্ধকালেও ছেলের উপর নির্ভর করতে পারেন না।  কারণ পুঁজিবাদের কঠোর শ্রম শোষণে বিবাহিত ছেলে স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালনে হিমশিম খান।  ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিতে পারেন না।  এ কারণে বৃদ্ধ বয়সেও মা-বাবাকে কোন না কোন শ্রম করে খেতে হয়।  শ্রমে অক্ষম হলে বা উপযুক্ত শ্রমের অভাবে ভিক্ষাবৃত্তি করেও জীবন-যাপন করেন।  সরকার যে বয়স্ক ভাতার প্রচার দিচ্ছে তা নামমাত্র এবং কেবল টিভি-ক্যামেরায়ই প্রদর্শিত।  যতটুকুবা বাস্তবায়িত হচ্ছে তা লক্ষ লক্ষ দরিদ্র বৃদ্ধার জন্য সাগরে বিন্দুমাত্র।  শাসক শ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ চরিত্র তাও যথার্থ প্রয়োগ করতে অক্ষম।

জমি-সম্পদের মালিকানা থেকে বঞ্চিত করে আজও মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক নিয়মে কৃষক নারীকে বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর পরিবারে পুনর্বাসন করা হচ্ছে।  দেনমোহরানা নামে স্ত্রী কেনার সামন্ততান্ত্রিক নীতি আজও সসম্মানে বিদ্যমান রেখেছে।  আধুনিক পুঁজিবাদী শোষণ আরেক ধাপ নারী শোষণের মাত্রা যুক্ত করে যৌতুক প্রথার প্রচলন করেছে।  শাসক শ্রেণি ঘুষ ছাড়া জনগণকে কোন চাকুরী দেয় না।  তেমনি যৌতুক নামের ঘুষ ছাড়া পুরুষের ঘরে নারীর গৃহদাসীর কর্মসংস্থান হয় না।  পুঁজিবাদ-পরুষতন্ত্র দরিদ্র কৃষক পিতাকে অবশিষ্ট একখণ্ড জমি, না হয় পালিত গরু-ছাগল বিক্রি করে কনের বিয়ের যৌতুক যোগাতে বাধ্য হন।  এমন কিছু না থাকলে বাড়ি-বাড়ি ভিক্ষা করে বা ধনী আত্মীয়-স্বজনের দ্বারস্থ হয়ে যৌতুকের টাকা যোগাড় করে মেয়ে বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন দরিদ্র পিতা। তারপরও স্বামীর সংসারে কৃষক নারীর দুরবস্থার কোন পরিবর্তন নেই।  স্বামীর এবং তার পরিবারের সবার আদেশ-নির্দেশ পালনই কৃষক নারীর কর্তব্য বলেই সমাজ স্বীকৃত।  স্বামীর নির্দেশ ছাড়া অন্য কাজ তো দূরের কথা বাবার বাড়ি যাওয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকে না।  স্বামীর সংসারে সব কাজ করে সবাইকে খুশি রাখাই নারীর দায়িত্ব- এ ধারণা সমাজে আজও বদ্ধমূল।  এর ব্যতিক্রম ঘটলে শুরু হয় লাঞ্ছনা-গঞ্জনা।  সামাজিক-রাজনৈতিক কাজে যোগদান তো দূরের কথা।  ১৯২৫ সালে অর্জিত নারীর ভোটাধিকার কৃষক নারী আজও স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম নন।  স্বামীর নির্ধারিত ব্যক্তিকেই ভোট দিতে হয়।

বিয়ের ক্ষেত্রেও কৃষক নারীদের পছন্দ করার অধিকার নেই।  অবিবাহিত নারী-পুরুষদের একত্রে চলাফেরা মেলামেশা সমাজে স্বীকৃত নয় বরং দৃষ্টিকটু। ফলে বর-কনে পছন্দ করার বিষয়টি অভিভাবকদের বিষয়, পুরুষতান্ত্রিক এই মূল্যবোধ আজও প্রচলিত।  ফলে কৃষক নারীকে অভিভাবকদের পছন্দ মতই বিয়ে করতে হয়। যৌন প্রশ্নেও কৃষক নারীর কোন স্বাধীনতা নেই।  স্বামীর  প্রয়োজনে স্ত্রী দেহদানে বাধ্য এমন ধারণাই সমাজে প্রচলিত।  নারীর যৌন ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না।  যৌন অধিকার প্রশ্নেও সচেতনতার অভাব রয়েছে।

সন্তান ধারণ বা জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে পুরুষরাই সাধারণত সিদ্ধান্ত নেয়।  জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে বহু কৃষক পরিবারে মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা আজও বদ্ধমূল।  যেমনঃ জন্মনিয়ন্ত্রণ পাপের কাজ। আল্লাহ মুখ দেবেন তো আহারও (খাদ্য) দেবেন ইত্যাদি।  ফলে এখনও অনেক কৃষক নারীকেই বছর বছর সন্তান জন্ম দিতে হচ্ছে। যারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের মাঝে স্ত্রীদেরই খাবার বড়ি খেতে হয়, ইনজেকশন বা লাইগেশন ব্যবস্থা নিতে হয়।  পুরুষরা সাধারণত ব্যবস্থা নিতে চান না বা প্রয়োজন মনে করেন না যেন বিষয়টি শুধুই নারীদের।

সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে অর্থাৎ বংশ পরম্পরায় মালিকানা হস্তান্তরের জন্য নারীকে এক স্বামীতে সন্তুষ্ট রাখার এবং পুরুষের জন্য যৌন স্বাধীনতার পুরুষতান্ত্রিক বিধান আজও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার পাশাপাশি নারীকে ধৈর্য-সহনশীল ও ত্যাগের শিক্ষায় শিক্ষিত করে।  ধর্মীয় ও সামাজিক মতে পুরুষের একাধিক স্ত্রী রাখার মধ্যযুগীয় বিধান আজও সমাজে প্রচলিত।  ফলে অনেক কৃষক স্বামী একত্রে একধিক স্ত্রী রাখে।  স্বামীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে গেলে বা যৌন বিষয়ে অবাধ্য হলে বা স্বামীর কাজে প্রতিবাদ করলে কৃষক নারীকে শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয় এবং গালাগাল শুনতে হয়।  বহুবিধ কারণেই তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বন্ধুত্বমূলক না হয়ে হয় প্রভু ও ভৃত্যের সম্পর্ক।

বিবাহ বিচ্ছেদ প্রশ্নেও তালাক দেয়াটা পুরুষের জন্য যত সহজ নারীর জন্য ততটা নয়।  নারী স্বামী তালাক দিলে তা হয় সমাজের চোখে অবমাননাকর।  ফলে দ্বিতীয় বিয়ে করা নারীর জন্য দুঃসাধ্য। স্বামীর সংসার ছাড়া সমাজে নারীর অবস্থান আরো অমর্যাদাকর ও নিপীড়নমূলক।  ফলে বিয়ে করাই নারীর জন্য অপরিহার্য কাজ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বর ভালো হবে তার অনিশ্চয়তা, সন্তানদের মঙ্গলার্থে কৃষক নারী স্বামীর শত অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে স্বামীর সংসারে অভিশপ্ত জীবনকে মেনে নেন অদৃষ্টের লিখন বলে।

উপরে আলোচিত হাজারো সমস্যা হচ্ছে সমাজে শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার পুরুষতন্ত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে। যা শাসক পুঁজিপতি শ্রেণি জিইয়ে রেখেছে তাদের শোষণমূলক ব্যবস্থার স্বার্থে। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ নারী উন্নয়নের নামে নতুন নতুন শোষণ ব্যবস্থা চালু করে ডজন ডজন এন.জি.ও. দরিদ্র কৃষক নারীদের ঋণের জালে আবদ্ধ করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুটছে।  এরা নারীদের সংগঠিত করে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর আত্মনির্ভরশীলতা তথা নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখায়।  এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ দরিদ্র জনগণের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নয়ন করে তাদের শোষণমূলক ব্যবস্থাকে সহনীয় করে তুলতে এবং বিপ্লবের বাধা হিসেবে সংস্কারমূলক কাজকে সামনে নিয়ে এসেছে।  সাম্রাজ্যবাদের ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প বাস্তবে নারীদের ভাগ্য যে পরিবর্তন করছে না তা পরিস্কার।

প্রতিবছর চৈত্র ও কার্তিক মাসে দরিদ্র নারীরা স্বামী-সন্তান নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে কাটান। অন্যদিকে দরিদ্র কৃষক পরিবারের তরুণী নারীরা কাজের সন্ধানে বড় বড় শহরগুলোতে ভিড় জমান এবং সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কলকারখানায় এবং বাসা-বাড়িতে কাজ, ইটভাঙা, রাজমিস্ত্রির যোগালির কাজ করে বা জিনিসপত্র ফেরি করে জীবন ধারণ করেন। সাম্রাজ্যবাদী ঋণ ব্যবস্থায় ২/৪ জনের অবস্থার যে পরিবর্তন হচ্ছে না তা নয়- কিন্তু এটা সাধারন চিত্র নয়, হবারও নয়। এন.জি.ও.দের ঋণ ব্যবস্থা হচ্ছে শোষণমূলক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় ব্যাপক জনগণের সম্পদ গড়ে উঠতে পারে না।  বরং শোষণের জালে দরিদ্র জনগণকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে শোষণমূলক ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করার দূরভিসন্ধি নিয়েই সাম্রাজ্যবাদ এন.জি,ও.গুলো পরিচালিত করছে। এদেশে ব্র্যাক, প্রশিকা, গ্রামীণ ব্যাংক, কারিতাস, আশা ইত্যাদি এন.জি.ও.গুলো হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা পরিচালিত।  যাদের পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী। এন.জি.ও.গুলো ক্ষদ্র ঋণের মধ্য দিয়ে উৎপাদনে নামিয়ে নারীদের সস্তা শ্রম লুট করে কোটি-কোটি টাকার পাহাড় গড়ছে। অন্যদিকে নারীমুক্তির শত্রু সাম্রাজ্যবাদ এবং তার দালাল আমলা-পুঁজিপতিকে আড়াল করছে।  যারা সামন্তবাদ তথা পুরুষতন্ত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে রক্ষা করছে তাদের শ্রেণীগত স্বার্থে।

এন.জি.ও. নারী সংগঠনগুলো পুরুষতন্ত্রের কিছু কিছু বিরোধিতা করলেও সামগ্রিকভাবে নারীর শত্র“দের চিহ্নিত ও বিরোধিতা করে না।  এই সব নারী সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছে নারীমুক্তির শত্রু-শ্রেণির নারীরা।  যারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দরিদ্র জনগণকে শোষণ করে দুর্নীতিপরায়ণ বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে।  তাদের নারীমুক্তির কথা প্রতারণা ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।

সুতরাং সত্যিকার নারীমুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিবে শ্রেণি শোষণে জর্জরিত শ্রমিক ও দরিদ্র কৃষক নারীরা।  যারা নিপীড়িত জনগণের বিপ্লবী রাজনীতিতে একাত্ম হয়ে শ্রেণিশত্রু  সাম্রাজ্যবাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলবে।  প্রতিষ্ঠিত করবে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।  যে ব্যবস্থায় নারী প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানাধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারবে। পারবে আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।  পারবে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে মানব সমাজের কল্যাণে সামাজিক-রাজনৈতিক কাজে যোগ দিতে। ভূমিকা রাখবে শোষণহীন সমাজ- সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ বিনির্মাণে।