“আসুন গণযুদ্ধের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করি” – তুরস্কের জেলবন্দী গেরিলা যোদ্ধা

maxresdefault

[নোট : নিচের বক্তব্যটি তুরস্কের সাগমাছিলার জেলখানায় TKP(ML)-এর একজন আমরণ অনশনকারী যোদ্ধার একটা অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতা। জেলবন্দিরা অনশন ধর্মঘটকে আমরণ অনশনে রূপান্তরিত করে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত অনশন চালানোর ঘোষণার প্রতীক “মাথায় লালপট্টি  বাধার পর অনুষ্ঠানটি করা হয়েছিল। বক্তৃতাটি “রেভ্যুলুশনারী ডেমোক্রেসি, নং-২২, ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০০০ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। (নোট: ট্রেঞ্চ কমরেডগণ” বলতে রাজনৈতিক বন্দিদের যুদ্ধে যোগদানকারী অন্যান্য সংগঠনের কমরেডদের কথা বুঝানো হয়েছে) – এই নোটসহ সমগ্র লিটারেচারটি নেয়া হয়েছে ইংরেজিতে প্রকাশিত AWTW পত্রিকার ২০০১/২৭ সংখ্যা থেকে। যার বাংলা অনুবাদ করেছেন আমাদের একজন কমরেড। অনুবাদের বিষয়ে যে কোনো মতামত সাদরে গৃহীত হবে।]

         আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণি বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের কাছ থেকে আমাদের সংগৃহীত শক্তিতে আমি আপনাদের সালাম জানাই। আমি আপনাদের সকলকে আমাদের বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ থেকে অর্জিত শক্তিতে সালাম জানাই। আন্দিজ পর্বতমালা, হিমালয় পর্বতমালা, নক্সালবাড়ি এবং মুঞ্জরস-এ উড্ডীন আমাদের আন্তর্জাতিক লাল পতাকায় আমি আপনাদের সকলকে সালাম জানাই। কমরেডগণ এবং ট্রেঞ্চ কমরেডগণ ; বিপ¬বের তুলনা চলে মায়ের তীব্র প্রসব বেদনার মধ্য দিয়ে সুন্দর লাল গোলাপের মতো শিশুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে। আমরা দীর্ঘ এবং বেদনাদায়ক বিপ্লবী যুদ্ধের শেষে সুন্দর লাল গোলাপের মতো শিশুটির জন্মগ্রহণ দেখতে পাবো, আর একটার পর একটা বিপ্লব, সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সমূহের মধ্যে দিয়ে শিশুটিকে গড়ে তুলবো এবং এর বিকাশ নিশ্চিত করব… যতক্ষণ পর্যন্ত না শ্রেণিহীন, সীমান্তহীন, শোষণমুক্ত কমিউনিস্ট সমাজে আমরা পৌঁছতে না পারি ; সেটাই হচ্ছে সঠিক দুনিয়া, মানবজাতির স্বর্ণযুগ। আমরা বিপ্লবী যুদ্ধের একটা নতুন ও বেদনাদায়ক কাল অতিক্রম করছি ; এই কালে আমরা পুরোপুরি নিয়োজিত আছি এই স্বপ্নের বাস্তবায়নে। একই সাথে বর্তমান পর্যায়টি হচ্ছে এমনই একটা ক্রান্তিকাল যখন একজন নিজে প্রকৃত বিপ্লবী কিনা তা পুন:যাচাই-এর জন্য তাকে মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যে কোনো বিপ্লবী, সংগঠন বা পার্টি এই ক্রান্তিকালের প্রয়োজন মিটাতে ব্যর্থ হলে, বর্তমান বিশ্বে যে বিপ্লবের ঢেউ জেগে উঠছে তার সাথে সঠিক তালে এগিয়ে যেতে পারবে না, ফলে হোচট খাবে এবং ব্যর্থ হবে বা এর পশ্চাতে টেনে-হেঁচড়ে চলবে। আমরা যারা কারাবন্দি যোদ্ধা আর রাজনৈতিক বন্দি তাদের এ পর্যন্ত পালন করা দায়িত্বটা এখন আরো বেড়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী একনায়কের রণনীতিগত পলিসির নীল নকশার সেল আক্রমণ পরিচালনার কারণে। কারাবন্দি যোদ্ধারা তাদের দায়িত্ব পালনে কখনো দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেনি আর বর্তমানেও তাদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসছেন। গত বছরব্যাপী কয়েকটি ছোট-বড় লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এখন আমাদের লড়াইয়ের বিজয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছি আমৃত্যু অনশনের আক্রমণ পরিচালনার মাধ্যমে। এই চূড়ায় আরোহণের লক্ষ্যে আমাদের পার্টিগুলো থেকে আমাদের কয়েকজনকে অগ্রভাগে যুদ্ধ করার কাজে দেয়া হয়েছে…। কমরেডগণ এবং ট্রেঞ্চ কমরেডগণ ; এই মুহূর্তে আমি যখন আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি তখন আমি ঐ দিনের মতো আবেগ অনুভব করছি যেদিন প্রথম আমাকে এই কাজের ভার দেয়া হয়েছিল। আমি একজন গেরিলার উদ্দীপনা ও রোমাঞ্চ অনুভব করছি, একজন গণযোদ্ধা শত্রুর ওপর শত শত গুলি ছোড়ার পর তার রাইফেলের ব্যারেল কতটা উত্তপ্ত হয়েছে তা খেয়াল না করেই ব্যারেলটিতে লেহন করে জিভ পুড়িয়ে ফেলার রোমাঞ্চ আমি অনুভব করছি। যেখানে যে অবস্থাতেই আমরা থাকি না কেনো আমরা অনুভব করছি একজন গেরিলার উৎসাহ-উদ্দীপনার অনুভূতি ; যা হচ্ছে আমাদের সম্মিলিত আত্মিক গঠনের ফল। এই রোমাঞ্চ ও উদ্দীপনা হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিপ্লবী ঘাটি এলাকাগুলো শত্রুর দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় তোলা আমাদের রণধ্বনির: “আসুন গণযুদ্ধের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করি”, ফ্যাসিবাদের আক্রমণগুলোকে প্রতিরোধ করি, কারণ এগুলো আমাদের আকাঙ্খিত রাজনৈতিক ক্ষমতা ধ্বংস করতে চায়। গেরিলা আর আমাদের একই অনুভূতি কাজ করছে, কারণ আমরা জানি যে আমরা শত্রুর একই অবস্থানে আঘাত করছি। আলেকজান্ডার দি গ্রেট যুদ্ধে তার সেনাবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন : আমার সৈন্যরা মরার জন্য লড়ছে না বরং জয়লাভের জন্য লড়ছে। একজন যোদ্ধার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যা আত্মস্থ করা দরকার। জেরোনিমো আমাদের হৃদয়ে এবং নিপীড়িত জনগণের হৃদয়ের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন, যদিও তিনি যুদ্ধের কৌশল বা যুদ্ধের ইতিহাসের ওপর কোনো বই লিখেন নি, তিনি নিম্নের উক্তিটি করেছেন: “জীবন প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর দ্বার খোলা না থাকলে কোনো বিপ্লবও হতে পারে না।” এটাও একটা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যা একজন বিপ্লবী যোদ্ধার আয়ত্ব করা দরকার। অতএব বিপ্লবের জন্য মরার সাহস নিয়ে আত্মত্যাগ করতে হবে; মরার সাহস নিয়ে বিপ্লবী যুদ্ধ চালাতে জনগণকে পরিচালিত করতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায়, পেরুর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা নির্জন অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে আটক কমরেড গনজালো বলেছেন : “আঙ্গুলের মাথায় আমাদের জীবনকে বয়ে বেড়ানোর শিক্ষা আমাদেরকে অর্জন করতে হবে।” আর ঠিক এটাই আজ আমরা করছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে জয়লাভ করা, যুদ্ধ করে জয়লাভ করা…। আমরা বিপ্লবী, কমিউনিস্ট ; তাই আমরা বিপ্লব চাই, স্বাধীনতা চাই, নয়াগণতন্ত্র চাই, এবং সমাজতন্ত্র চাই। তাইতো আমরা সেলের বিরোধিতা করছি, আর দৃঢ়তার সাথে বিপ্লবী যুদ্ধ গড়ে তুলতে চাইছি। … চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন যে হাজার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে মৃত্যুকে বরণ করতেও যে ভয় পায় না সে-ই সম্রাটকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পাওে ; সেহেতু আমাদের নেতা ও পথপ্রদর্শক ইব্রাহিম কায়াপাক্কায়া শিখিয়েছেন, শ্রেণিসংগ্রামের মহাসমুদ্রে সকল বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে চলতে। এই সচেতনতা এবং সাহস নিয়ে আমি আমরণ অনশনের লড়াইয়ের পরীক্ষা অবতীর্ণ হচ্ছি।

আমার কমরেডসুলভ উষ্ণতায় এবং ট্রেঞ্চ কমরেডসুলভ অনুভূতির সাথে আমি আপনাদের সালাম জানাই। বিজয়পূর্ণ দিন অর্জনে আপনাদের সফলতা কামনা করছি।

আমাদের পার্টি দীর্ঘজীবী হোক!

আমাদের জয় হবে, জনগণের জয় হবে, গণযুদ্ধের জয় হবে!

TKP(ML)-এর আমরণ অনশন যোদ্ধা, সাগমাছিয়া জেল।

সূত্রঃ AWTW পত্রিকা, ২০০১/২৭ সংখ্যা