চারু মজুমদারের রচনা সংকলন: যে সব কমরেড গ্রামে কাজ করছেন

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

যে সব কমরেড গ্রামে কাজ করছেন

তাঁদের প্রতি

চেয়ারম্যান আমাদের শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে বলেছেন। আমাদের কমরেডরা যাঁরা গ্রামে যাচ্ছেন তাঁরাও নিশ্চয়ই শ্রেণী বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু ত্রুটি যেটা হচ্ছে তা হল এই যে, শ্রেণী বিশ্লেষণ করছেন তাঁরা নিজেরা এবং মনে মনে। ফলে কৃষককর্মীরা শ্রেণী বিশ্লেষণ শিখছেন না এবং তার চেয়েও বড় কথা বিপ্লবী শ্রেণীগুলি তাদের নিজেদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হচ্ছে না। কাজেই কৃষক-কর্মীদের বৈঠকে প্রথমেই আমাদের কমরেডদের দায়িত্ব হচ্ছে এক একজন কর্মীর শ্রেণীবিচার করতে হবে চেয়ারম্যানের কৃষকদের শ্রেণী বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এবং কৃষক কর্মীদের মতামত নিয়ে। এ কাজটি করা হলে তবেই আমাদের সংগঠক গণলাইন (mass line) পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবেন এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে বোঝাবেন যে তাদের পক্ষে বিপ্লব যত জরুরী অন্যদের পক্ষে তত জরুরী নয় এবং সেই জন্যই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে বেশী করে দায়িত্ব নিতে হবে বিপ্লবকে সফল করার জন্য এবং তার পরই কাজের ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে হবে। এবং পরবর্তী মিটিং-এ কাজের হিসাব-নিকাশ প্রথমে নিতে হবে এবং বারবার সচেতন করে তুলতে হবে এই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে যাতে তারা কাজের বেশী বেশী দায়িত্ব নিতে পারেন। দুই তিন মাস পর পর কাজের ভিত্তিতে আবায় বিশ্লেষণ করতে হবে। সে শ্রেণী বিশ্লেষণ হবে তিনটি ভিত্তিতে: (১) শ্রেণীভিত্তি; (২) কাজের আগ্রহ; (৩) লড়াইয়ের আগ্রহ। এই চেক আপ (Check up) এর মধ্যে দিয়েই সঠিক শ্রেণী বিচার হবে। কারণ প্রথম শ্রেণী বিশ্লেষণের সময় কৃষককর্মীরা অনেক মধ্যকৃষককে দরিদ্র কৃষকের শ্রেণীতে ফেলবেন। এই তিন নীতির ভিত্তিতে পুন:বিবেচনার সময়ই সেই ভুল বিশ্লেষণ ধরা পরবে। এ ভাবে কৃষক সংগঠকরা কাজ শুরু করলে সাধারণ কৃষককর্মীরা শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে শিকবেন; শুধু তাই নয়, বিপ্লবী শ্রেণীগুলি তাঁদের দায়িত্ব সম্বন্ধেও সচেতন হবেন।

এভাবে কাজকে সংগঠিত করতে পারলে তবেই সমস্ত শ্রেণীকে সজাগ ও সচেতন করে তোলা যাবে এবং বিপ্লবী দায়িত্ব পালন করানো যাবে। এই তিন নীতির চেক-আপ (Check up) কৃষক জনতার মধ্যে প্রাথমিক শুদ্ধি অভিযানের (ractification campaign) কাজ করবে এবং সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম নির্দিষ্ট রূপ নেবে। এবং আমরা কৃষক নেতৃত্ব গড়ে ভুলতে পারবো। মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী কমরেডের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর কৃষক আন্দোলন নির্ভরশীল থাকবে না এবং বুদ্ধিজীবী কমরেডটির একাত্ম হওয়া (integration) অনেক ত্বরান্বিত হবে। এবং যাঁরা একাত্ম হতে পারবেন না, তাঁরা সংগ্রামের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না। এই যুগে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী কর্মীর আমাদের খুবই দরকার, কিন্তু এটাও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, সকলেই শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী থাকবে না, বরং এ সম্ভাবনাই বেশী যে বেশীর ভাগ বুদ্ধিজীবী ক্যাডর পরবর্তী জমানায় অবিপ্লবী, এমন কি প্রতিবিপ্লবী হয়ে যাবে। এই সম্ভাবনাকে কখনোই ভুলে গেলে চলবে না। কাজেই এইসব বুদ্ধিজীবী ক্যাডাররা যদি শ্রেণী বিশ্লেষণের এই কাজ এবং চেক-আপ (Check up) একবাও করে যান, তাহলে এলাকা ঐ বুদ্ধিজীবী ক্যাডারের উপর নির্ভরশীল থাকবে না। অতএব, প্রত্যেকটি বুদ্ধিজীবী ক্যাডার তিনি কৃষকের উপর নির্ভরশীল থাকবে না। অতএব, প্রত্যেকটি বুদ্ধিজীবী ক্যাডার তিনি কৃষকের সহায়তায় যে শ্রেণীবিশ্লেষণ করবেন তার নোট রাখুন এবং ঐ নোট পাঠান। এই রিপোর্ট গুলো তদন্ত রিপোর্ট (investigation) হিসাবে সতর্কতার সঙ্গে ‘দেশব্রতীতে ছাপানো চলবে এবং সেগুলো অন্যান্য অঞ্চলের কমরেডদের সাহায্য করবে।

সংগ্রাম বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হচ্ছে, এখন আমাদের সবচেয়ে জোর দিতে হবে বিপ্লবী ক্যাডার তৈরীর কাজে। এ কাজ এখন সবচেয়ে জরুরী এবং এই কাজে আমাদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। বিরাট সম্ভাবনা, বিরাট জয় ভারতবর্ষের মানুষের আয়ত্তের মধ্যে আসছে। কর্মীদের মন থেকে পরাজিতের (defeatist) চিন্তাধারা ঝেড়ে ফেলতে হবে। অর্থাৎ, চেয়ারম্যানের ভাষায়, “আমাদের কর্মীদের মন সর্বপ্রকারের নিস্ফল চিন্তা থেকে মুক্ত করতে হবে। শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখে এবং জনগণের শক্তিকে ছোট করে দেখেÑএমন সমস্ত মতই ভুল।”

আমাদের আজকের দিনের আওয়াজ, চেয়ারম্যানের ভাষায়: দৃঢ় থাক, কোনো ত্যাগকেই ভয় কোরো না এবং যুদ্ধে জেতার জন্য সমস্ত বাধা উত্তীর্ণ হও।

দেশব্রতী, ২৬ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের রচনা সংকলন: জনৈক কমরেডের গ্রেপ্তার প্রসংগে

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

জনৈক কমরেডের গ্রেপ্তার প্রসংগে

(দেশব্রতী’র সম্পাদক মন্ডলীর কাছে লেখা চিঠি)

প্রিয় কমরেড,

‘ষ্টেটসম্যান’-এর রিপোর্টে আমি নিজেই এত ব্যথিত (shocked) হয়েছিলাম যে আপনাদের কথা মনে করতে পারিনি। কোনো কমরেড কি আর একজন কমরেড সম্পর্কে এমন কথা বলতে পারে? দুটো কথা আমি বলেছিলাম দুটো প্রসঙ্গে (content এ) এবং সে দুটো মিলিয়ে এ রিপোর্ট তৈরী করা হয়েছে।

প্রথম কথা আমি বলেছিলাম, “ধরা পড়ায় আমি দুঃখিত।” আর একটা কথা বলেছিলাম, “…………..তো বেঁচে আছে, লড়াইয়ের মধ্যে সে তো মারা যেতেও পারতো। কাজেই সে যখন বেঁচে আছে, তখন আজ হোক কাল হোক সে আবার বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে পারবে এবং এই সরকারের পক্ষে ওকে চিরকাল বন্দী করে রাখা সম্ভব হবে না। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং সংকটের মুখে মুক্তি ওদের দিতেই হবে।” এ দুটো কথাকে কাগজে ওভাবে লিখেছে, সুতরাং কমরেডরা যে সমালোচনা আমার করেছেন তা অত্যন্ত ন্যায়সংগত। কোনো কমিউনিস্টের মুখে এরকম কথা বেরোলে সেটা নিন্দারই যোগ্য। ‘আনন্দবাজার’ ও ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র রিপোর্টারকে আমি বলেছিলাম, “কৃষকের আন্দোলন কোন একজন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। ব্যক্তির মূল্য আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটা নিয়ামক নয়।” ওরা প্রশ্ন করেন, “আন্দোলন কি পিছিয়ে যাবে?” এর উত্তরে আমি বলেছিলাম, “এই গ্রেপ্তারের ফলে কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে এবং সেটা একটা প্রক্রিয়া (Process)-র অঙ্গ। তার ফলে কৃষকের সংগ্রাম বড় জোর একমাস কি দুমাস পিছিয়ে যেতে পারে।” এটাকেই ওরা “নভেম্বরে না হয় ডিসেম্বরে হবে” বলে লিখেছে।

লাল সেলাম – চারু মজুমদার

দেশব্রতী, ২৮ শে নভেম্বর, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের রচনা সংকলন: কেরালার কৃষক বিপ্লবীদের লাল সেলাম

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

কেরালার ঘটনা আর একবার দেখিয়ে দিল ভারতবর্ষে আজ কি চমৎকার বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রত্যেক ভারতবাসীর প্রতিক্রিয়াশীল ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অবিচ্ছেদ্য অধিকার আছে-যে সরকার ভারতবর্ষকে আবার উপনিবেশে পরিণত করেছে বর্তমানকালে যা হোল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের নয়া উপনিবেশ। তাই এই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা শুধু অধিকারের প্রশ্নই নয়, প্রতিটি বিদ্রোহ হোল ন্যায় কাজ।

কেরালার দারিদ্রপীড়িত জনগণ যে বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে সারা ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতার মধ্যে নতুন উৎসাহ উদ্দীপনার ঢেউ উঠেছে এবং তারা কেরালার বীর জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

ভারতবর্ষে, বর্তমানে আগ্নেয়গিরির অবস্থা বিরাজ করছে, এবং এখানে কৃষক জনতার বিদ্রোহ একমাত্র চেয়ারম্যান মাওয়ের চিন্তাধারার সফল প্রয়োগের দ্বারা বিজয় অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ কৃষক জনতাকে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে শ্রমিক ও দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষকের নেতৃত্বে কৃষিবিপ্লবের কাজে তাদের সক্রিয় যোগদানে সক্ষম করে তুলতে হবে। গ্রামাঞ্চল থেকে গেরিলা লড়াইয়ের মারফৎ শ্রেণীশত্রুদেরকে বিতাড়িত করে ও এই ধরণের অঞ্চলের বিস্তার সাধন ঘটিয়ে মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সশস্ত্র গেরিলাদলগুলো থেকে গণফৌজ গড়ে গ্রামগুলো নিয়ে শহরকে ঘেরাও ও অবশেষে দখল করতে হবে। একমাত্র এই পথেই ভারতবর্ষকে মুক্ত করা যায়। সুতরাং প্রত্যেক এলাকার বিদ্রোহীরা জয়লাভের জন্য নিশ্চয়ই এই পথ অনুসরণ করবেন।

কেরালার বীর কৃষক বিপ্লবীরা পুরাপ্রা-ভায়লার কৃষক সংগ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে চলেছেন। তাঁরা আরো একবার সাহস ও বীরত্বের নজীর স্থাপন করেছেন এবং শত্রুর প্রচন্ড আক্রমণের মুখেও মাথা নত করতে অস্বীকার করেছেন। আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস তাঁরা সমস্ত রকম অসুবিধা কাটিয়ে উঠবেন ও ভারতের কোটি কোটি বিপ্লবী জনগণকে নেতৃত্ব দেবেন।

কেরালার মহান কৃষক বিপ্লবীরা জিন্দাবাদ!

২৭ শে নভেম্বর, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: “নির্বাচন বয়কট করো” স্লোগানের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

১৯৩৭ সাল। জার্মানী, ইটালী এবং জাপানী ফ্যাসীবাদ-বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের তিন অগ্রবাহিনী পৃথিবীকে নতুন করে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়ার ষড়যন্ত্রে অগ্রসর হচ্ছিল। স্পেনের রঙ্গমঞ্চে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর পেছনে এসে দাঁড়াল জার্মানী ও ইটালী ফ্যাসীবাদ। সংযুক্ত ফ্রণ্টের সরকারকে সমর্থন জানাল বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণী। দেশে দেশে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গড়ে উঠল। আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের প্রতিরোধ চূর্ণ করে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদ স্পেনে প্রতিষ্ঠিত হোল।

ঠিক তখনই চীনের এক এলাকা ইয়েনানকে মুক্ত করে চেয়ারম্যান মাও-এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি জাপানী অধিকৃত অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের জাগ্রত করে সৃষ্টি করে চলল নতুন নতুন মুক্ত এলাকা জাপানী সমরবাদের সমস্ত দম্ভকে চূর্ণ করে। এই মুক্ত এলাকা শুধু টিকে থেকেছে তাই নয়, আঘাত করেছে জাপানী সাম্রাজ্যবাদকে। চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সেদিন শুধু জাপানী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল তাই নয়, তাকে প্রতিরোধ করতে হয়েছিল চিয়াং-এর নেতৃত্বে কুয়োমিণ্টাঙ সরকারকেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হোল। পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির উপনিবেশগুলি তাসের ঘরের মত ভেঙে গেল। ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষ দেখল প্রবল প্রতাপান্বিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জাপানী আক্রমণের সামনে মার খাওয়া কুকুরের মত লেজ গুটিয়ে পালাল। জার্মান ফ্যাসীবাদ সারা ইউরোপ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে করল পদানত-কি সমর-কৌশলে, কি শক্তিমত্তায়। পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি ফ্যাসিবাদের মোকাবেলা করতে অসমর্থন হোল। সমস্ত ইউরোপের শিল্পোশ্চর্যের মালিকানা পেয়ে উদ্ধত ফ্যাসিবাদ আক্রমণ করল শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। মহান স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত দেশের সমস্ত মানুষকে, উদ্বুদ্ধ করলেন দেশরক্ষার পবিত্র সঙ্কল্পে, চূর্ণ করলেন ফ্যাসীবাদের সমস্ত ঔদ্ধত্যকে। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মান ফ্যাসীবাদের পরাজয় সুনিশ্চিত করে তুলল স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়। পৃথিবীর সর্বত্র ফ্যাসীবাদ দ্বারা নিপীড়িত মানুষ মহান চীন কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে ফ্যাসীবাদকে রুখে দাঁড়াল। তারই ফলে বিশ্ব ফ্যাসীবাদ ধ্বংস হোল। যুদ্ধ পরবর্তী যুগে যখন পুরাতন সাম্রাজ্যবাদীরা আবার তাদের শাসন ও শোষণকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করল তখন আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষ দাবানলের মত জ্বলে উঠল। সশস্ত্র সংগ্রামের আগুন ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ল। চেয়ারম্যান মাও এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে যখন এগিয়ে চলেছে ইয়াংসির দিকে সুনিশ্চিত জয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তখন ভারতবর্ষের বুকে ঘটেছে তেলেঙ্গানা; কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্বে গড়ে তুলেছে কৃষক গেরিলা বাহিনী, লক্ষ লক্ষ কৃষকের মনে জাগিয়ে তুলেছে বিপ্লবী প্রতিরোধের চেতনা, শত শত গ্রামকে করেছে মুক্ত।

১৯৪৯ সালে মহান চীন বিপ্লবের সাফল্য ও চীন প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করল জনযুদ্ধের অসীম ক্ষমতা। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সেতুঙ’ এর চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক কৃষক মেহনতী জনতার ঐক্য দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে চীনের বিজয়লাভ সমস্ত ঔপনিবেশিক দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রত্যেকটি উপনিবেশে সশস্ত্র সংগ্রাম দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলল। সফল চীন বিপ্লব ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষের সামনে সাফল্যের সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এনে দিল এবং তখনই শুরু হলো বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের পরিপূর্ণ ধ্বংসের যুগ। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস যতই আসন্ন হয়ে উঠল ততই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংশোধনবাদী কমিউনিস্ট নেতৃত্ব জনতার সংগ্রামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করল এবং স্তালিনের মৃত্যুর পর সংশোধনবাদী চক্র সোভিয়েত পার্টি-নেতৃত্ব দখল করে বসল এবং বিশ্বসাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিশ্বব্যাপী সংশোধনবাদী চক্রের মিলিত প্রচেষ্টা শুরু হলো। চীন বিপ্লবের সাফল্যে আতঙ্কিত হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট নামধারী বিশ্বাসঘাতকেরা তেলেঙ্গানার মহান সংগ্রামকে নিঃশর্তভাবে তুলে নিল এবং সংসদীয় পথে পা বাড়াল। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর প্রত্যেকটি ঔপনিবেশিক দেশের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে সোভিয়েত সংশোধনবাদী চক্র বিভেদ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতা করে। চেয়ারম্যান বলেছেন, বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ আজকের যুগে এমন একটা ইমারত-যে ইমারতটি একটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং সেই স্তম্ভটি হোল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস বিশ্বসাম্রাজ্যবাদকে চূর্ণ বিচূর্ণ করবে। বিশ্বাসঘাতক ক্রুশ্চেভচক্র তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়াল। তাই চেয়ারম্যান মাও ১৯৫৭ সালে সাবধান বাণী ঘোষণা করলেন যে, বিপ্লবী সংগ্রামের যুগে প্রধান বিপদ সংশোধনবাদ। ১৯৬২ সাল থেকে চেয়ারম্যান মাও যখন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংগ্রাম শুরু করলেন তখন পৃথিবীব্যাপী বিপ্লবী মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের মনে নতুন উৎসাহ সঞ্চারিত হোল। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠতে থাকল। বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকলেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম এক নতুন স্তরে উন্নীত হোল। ভিয়েতনামের বীর সংগ্রামীরা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের পুরোভাগে থেকে আঘাত হানতে শুরু করলেন সাম্রাজ্যবাদের একমাত্র স্তম্ভ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে। দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে উঠলো বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের আসন্ন ধ্বংস। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা যে আজকের দিনের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-এটা স্বীকার করতে আজকে দ্বিধা থাকলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম দুর্বল হতে বাধ্য। কারণ সংশোধনবাদকে আঘাত করার হাতিয়ারকেই করে দেওয়া হয় ভোঁতা। চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করতে হলে সংশোধনবাদকে আঘাত না করে এক পাও এগোন যায় না। আজকের যুগে অর্থাৎ যে যুগে সাম্রাজ্যবাদ পরিপূর্ণ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন বিপ্লবী সংগ্রাম দেশে দেশে সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নিয়েছে, যখন সোভিয়েত সংশোধনবাদ সমাজতন্ত্রের মুখোশ রাখতে না পেরে সাম্রাজ্যবাদের কৌশল পর্যন্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে, যখন বিশ্ববিপ্লব এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে এবং সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা দুর্বার বেগে এগিয়ে চলেছে-সেই যুগে সংসদীয় পথে পা বাড়ানোর অর্থ বিশ্ববিপ্লবের এই অগ্রগতিকে রোধ করার সামিল হয়ে দাঁড়ায়। সংসদীয় পথ আজ বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের পক্ষে গ্রহণীয় নয়। এটা ঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, ধনতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রেও তা’ একই রকম সত্য। বিশ্ববিপ্লবের এই নতুন যুগে যখন চীনের সর্বহারা শ্রমিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব জয়লাভ করছে তখন বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের একটি কাজই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হোল, গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে দৃঢ় ভিত্তিতে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতী মানুষের ঐক্য গড়ে তোলা। তাই সমগ্র যুগ ধরে বিপ্লবী মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের আওয়াজ হবে, ‘নির্বাচন বয়কট করো’ এবং গ্রামে চলো, ঘাঁটি গেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা বানাও। সংসদীয় পথে চলে বিশ্বব্যাপী বিপ্লবীরা বহু রক্তের ঋণ জমা করেছেন। আজ দিন এসেছে সেই ঋণ শোধ করার! শত শত শহীদ আজ বিপ্লবীদের আহ্বান জানাচ্ছেন ‘মুমূর্ষু সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করো’, ‘ধ্বংস করো’! পৃথিবীকে নতুন করে গড়বার দিন আজ এসেছে। জয় এবার সুনিশ্চিত।

দেশব্রতী, ২১শে নভেম্বর, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: শ্রেণীবিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও অনুশীলনের সাহায্যে কৃষকের শ্রেণী-সংগ্রাম গড়ে তুলুন

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে সংশোধনবাদী কৌশল ও বিপ্লবী কৌশল এক হতে পারে না। আমরা এতকাল যে কায়দায় কৃষক আন্দোলন করবার চেষ্টা করেছি তাকে সংশোধনবাদী কৌশল ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। সংশোধনবাদীরা কৃষক আন্দোলন করে পার্টির প্রকাশ্য কার্যকলাপ অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে এবং আন্দোলনের জন্য নির্ভর করে বুদ্ধিজীবী পার্টি নেতাদের উপর। কাজেই তাদের আন্দোলনের সূত্রপাত হয় বড় বড় নেতার বক্তৃতা সংগঠনের ভিতর দিয়ে এবং কৃষকদের স্কোয়াড ইত্যাদির মারফৎ, প্রকাশ্য প্রচার আন্দোলনের মারফৎ। এই আন্দোলন স্বভাবতই বড় বড় নেতাদের উপর নির্ভরশীল, কাজেই সেই বুদ্ধিজীবী নেতারা সংগ্রাম তুলে নিতে বললেই সংগ্রাম শেষ হয়। তাছাড়া সমস্ত প্রচার ও আন্দোলন প্রকাশ্য থাকায় দমননীতির সামনে সমস্ত সংগঠন অসহায় হয়ে পড়ে। বিপ্লবীদের কৃষক সংগ্রাম সংগঠিত করার কেশৗশ হবে সম্পূর্ণ আলাদা। বিপ্লবীদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসার করা এবং কৃষকের শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র করার চেষ্টা করা। কাজেই এই পার্টি সংগঠনের কাজ হব গোপন-বৈঠক মারফৎ প্রচারকে সংগঠিত করা। কৃষক তার পুরানো অভ্যাসবশে হয়তো মিটিং মিছিল চাইবে, সেক্ষেত্রে পার্টি সংগঠন এর পেছনে থেকে দুএকটা মিটিং মিছিল সংগঠিত করতে পারে।

কিন্তু মিটিং বা মিছিল আমাদের প্রধান হাতিয়ার কোন সময়েই হবে না। এই রীতি পদ্ধতি অভ্যাস করা খুবই কঠিন। একাজ করা যায় যদি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা প্রথম থেকেই আত্মগোপন করে চলেন। তবেই তাঁরা বাধ্য হবেন কৃষক বিপ্লবীদের উপর নির্ভরশীল হতে। যতদিন কৃষক বিপ্লবীরা নিজেরা উদ্যোগ না নিচ্ছেন ততদিন বুঝতে হবে জনতা প্রস্তুত নয়। এবং স্বভাবতই আমরা আমাদের বক্তব্য কৃষক সাধারণের উপর চাপিয়ে দেবো না। দ্বিতীয় বিচ্যুতি যেটা ঘটে তা হোল যখন কৃষক ক্যাডাররা কোন কিছু করতে চান তখন বুদ্ধিজীবী কমরেডটি অত্যন্ত পশ্চাদপদ ক্যাডারটির কথার উপর জোর দিয়ে সেটাকেই সাধারণ মত বলে চালান এবং তার ফলেই দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি ঘটে।

তাহলে প্রথম হোল, জনতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা কোন কিছু চাপিয়ে দেব না। এই নীতি ভুলে গেলে আমরা অনেকগুলো বিচ্যুতির মধ্যে পড়বো, সেগুলোকে সংকীর্ণতাবাদ, কাস্ত্রোবাদ ইত্যাদি অনেক নাম দেওয়া যেতে পারে। সুতরাং এই বিচ্যুতিগুলির হাত থেকে বাঁচতে গেলে আমাদের  অবিরাম কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। এই রাজনৈতিক প্রচারের মারফৎ আমরা রাজনৈতিক ক্যাডার পাবো যারা রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলনে অভ্যস্ত হবে। এই ক্যাডারদের গোপন সংগঠনই হবে ভবিষ্যতের পার্টি। এই সংগঠন গড়ার সময় আমাদের পার্টি কমিটির নীতি মেনে চলতে হবে। প্রত্যেকটি পার্টি কমিটির নির্দিষ্ট এলাকা থাকবে এবং সে এলাকায় শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে এবং অনুসন্ধান ও অনুশীলনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি অংশের মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছাকে যাচাই করতে শিখতে হবে। এই অনুসন্ধান ও অনুশীলন অনেক বিচ্যুতি করবে, কিন্তু তাতে শংকিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন-যুদ্ধের ভেতর দিয়েই আমাদের যুদ্ধ শিখতে হবে। যদি পার্টি কমিটিগুলি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে চলে তাহলে এই বিচ্যুতিগুলি থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শিখবে।

বিপ্লবী শ্রেণীগুলির মধ্যেও অগ্রণী অংশ ও পশ্চাদপদ অংশ থাকে। অগ্রণী অংশ তাড়াতাড়ি বিপ্লবী নীতি গ্রহণ করে এবং পশ্চাদপদ অংশের রাজনৈতিক প্রচার গ্রহণ করতে স্বভাবতই দেরী হয়। এবং এই জন্যেই সামন্তশ্রেণীর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই জন্যেই ফসল দখলের আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই সংগ্রাম কোথায় কি রূপ নেবে তা নির্ভর করছে এলাকার রাজনৈতিক চেতনা এবং সংগঠনের উপর। এই সংগ্রাম পরিচালিত হবে স্বভাবতই সামন্তশ্রেণীর বিরুদ্ধে অর্থাৎ অ-কৃষক জমির মালিক অর্থাৎ জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে এবং কোন মতেই মধ্যকৃষকের বিরুদ্ধে নয়।

কৃষকের ব্যাপক গণ-আন্দোলনের চেষ্টা না করলে এবং ব্যাপক জনতাকে আন্দোলনে সামিল করতে না পারলে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি কৃষক সাধারণের চেতনায় দৃঢ়মূল হতে স্বভাবতই দেরী হবে। তার ফলে সংগ্রামের উপর রাজনীতির প্রাধান্য কমে এসে অস্ত্রের প্রাধান্য বাড়াবার ঝোঁক দেখা দিতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বে কৃষকের শ্রেণীসংগ্রামের উচ্চতর রূপ হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধ। তাই শ্রেণীবিশ্লেষণ, শ্রেণীসংগ্রাম, অনুসন্ধান ও অনুশীলন-এই চারটি হাতিয়ারকে সফল প্রয়োগ করতে পারলে তবেই কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা যায়।

আমাদের দেশের ধনীকৃষক প্রধানত সামন্ত শোষণের উপরই প্রতিষ্ঠিত। তাই তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে প্রধানত সংগ্রামের সম্পর্ক। কিন্তু যেহেতু তাদের উপর সাম্রাজ্যবাদী বাজারের শোষণও আছে তার ফলে সংগ্রামের কোন কোন স্তরে তাদের সাথে ঐক্যের সম্ভাবনাও আছে। এই ধনীকৃষক বাদ দিলে অন্যান্য সমস্ত কৃষককেই সমর্থক শুধু নয়, সংগ্রামে সামিল করা যায়। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক ব্যাপক কৃষক জনতার সংগ্রামের ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে এবং এই ঐক্য যত দ্রুত হবে ততই সংগ্রামের চরিত্র বিপ্লবী রূপ নেবে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে চেয়ারম্যানের শিক্ষা, বিপ্লবী যুদ্ধ হচ্ছে জনগণের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ চালান যায় কেবলমাত্র জনগণকে সামিল করে এবং তাদের উপর নির্ভর করেই [Revolutionary war is a war of the masses. It can be waged only by mobilising the masses and relying on them].

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও সোভিয়েত সংশোধনবাদ ভারতবর্ষে তাদের শাসন ও শোষণকে তীব্র করে তুলছে এবং এই শোষণের বোযা গিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়ছে ব্যাপক কৃষকশ্রেণীর উপর। দারিদ্র্য ও অনাহার কৃষকের জীবনে এক চরম অবস্থা এনে দিয়েছে এবং স্বভাবত:ই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। তেমনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও সোভিয়েত সংশোধনবাদের শাসন অন্যান্য শ্রেণীগুলির মধ্যেও বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছে এবং সেই বিক্ষোভের প্রভাব কৃষকের উপরে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ভারতবর্ষের সমস্ত রাজনৈতিক পার্টি আজ শাসকশ্রেণীর পার্টিতে পরিণত হয়েছে এবং সকলেই চেষ্টা করছে বিভিন্ন কৌশল জনতাকে শান্ত করে রাখার। এই কাজে সবচেয়ে সুদক্ষ ডাঙ্গে বিশ্বাসঘাতকচক্র ও নয়া-সংশোধনবাদী চক্র। তারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মুখোশ এঁটে অনেক বিপ্লবী বুলি কপচিয়ে জনতাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু চেকোশ্লোভাকিয়ায় সোভিয়েতের ফ্যাসীবাদী আক্রমণ এদের বিপ্লবী মুখোশ খুলে দিয়েছে এবং যত দিন যাবে ততই জনতার কাছে এটা স্পষ্ট হবে যে নয়া-উপনিবেশবাদের ফেরিওয়ালা বিশ্বের আক্রমণকারী শক্তিগুলির অন্যতম, সোভিয়েত রাষ্ট্রের বশংবদ এরা। এদের মুখোশ খোলার সাথে সাথে জনতার প্রতিরোধ সংগ্রামের জোয়ার খুলে যাবে এবং কৃষকের ব্যাপক গণ-আন্দোলনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে। তাই আজ শ্রমিকশ্রেণী ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সামনে দায়িত্ব এসেছে কৃষকের শ্রেণী চেতনাকে জাগিয়ে তোল, ব্যাপক শ্রেণীসংগ্রাম সংগঠিত করা। সেদিন আর বেশী দূরে নেই যখন ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ কৃষক জনতার সৃজনীশক্তি গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তুলবে, বিশ্বের সমস্ত বিপ্লবী মুক্তি-সংগ্রামের পাশে ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতা তার আসন করে নেবে; মহান লেনিনের স্বপ্ন-মহান চীন এবং ভারতবর্ষের সংগ্রামী মানুষের ঐক্য-বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের কবর রচনা করবে। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সমস্ত বিপ্লবীকে এখনই কাজে নামতে হবে।

দেশব্রতী, ১৭ই অক্টোবর, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: তিনটি ঐতিহাসিক নির্দেশ ও খড়িবাড়ীর কৃষকদের এ্যাকশন সম্পর্কে

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

() তিনটি ঐতিহাসিক নির্দেশ

১। একমাত্র গেরিলা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের অগ্রগতি ঘটতে পারে, অন্য কোন উপায়ে নয়।

২। যাঁরা জেল থেকে খালাস হয়ে এসেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে কোন মামলা না থাকলেও তাদের গোপনেই থাকতে হবে কারণ আমাদের পার্টি হোল গোপন পার্টি এবং সর্বোপরি আমরা গৃহযুদ্ধের মধ্যে বাস করছি।

৩। যাঁরা জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন এবং এযাবৎকাল যাঁরা এলাকায় সংগ্রাম পরিচালনা করছিলেন তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে এবং এই দ্বন্দ্বে আমরা সব সময়েই নতুনকে সমর্থন করবো কারণ নুতনরা হলেন উদীয়মান শক্তি।

[নকশালবাড়ী এলাকায় একটি আলোচনা সভায়-১৯৬৮]

() খড়িবাড়ী কৃষকদের এ্যাকশন সম্পর্কে

এই এ্যাকশনের মধ্য দিয়ে কৃষকের শ্রেণীগত ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনই একে আমরা সঠিক গেরিলা এ্যাকশন বলতে পারি না, কারণ নিজস্ব উদ্যোগ নিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করে সরে যাওয়াই হচ্ছে সঠিক গেরিলা পদ্ধতি। এই আক্রমণে এই নীতি অনুসরণ করা হয়নি।

[১৯৬৮ সালে খড়িবাড়ীর কৃষকরা প্রকাশ্য দিবালোকে “চেয়ারম্যান মাও জিন্দাবাদ” বলে ধানক্ষেতেই জোতদারকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন।]


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে হাত দিন

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন বিপ্লব করতে হলে অবশ্যই একটি বিপ্লবী পার্টি প্রয়োজন। একটি বিপ্লবী পার্টি- যে পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী তত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী কর্মধারায় (style of work) অভ্যস্ত। এই রকম একটি পার্টি ছাড়া শ্রমিকশ্রেণী ও ব্যাপক জনতাকে সাম্রাজ্যবাদও তার অনুচরদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়।

আজকের যুগে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বোচ্চ রূপ চেয়ারম্যান মাও’ এর চিন্তাধারা। চেয়ারম্যান মাও মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সফল প্রয়োগ করেছেন। শুধু তাই নয়, মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সফল প্রয়োগ করেছেন। শুধু তাই নয়, মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং তাকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারাকে বলা যায় সাম্রাজ্যবাদের অবলুপ্তির যুগের এবং সমাজতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী বিজয়ের যুগের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ।

চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন যে একটা আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক দেশে জনতার ব্যাপক অংশ হচ্ছে কৃষক এবং এই কৃষকের উপর তিন পাহাড়ের শোষণ ও শাসন-যেমন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ততন্ত্র এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজি-চলে এবং তাই এই কৃষকশ্রেণী বিপ্লবের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী। তাই শ্রমিকশ্রেণীকে জনযুদ্ধের মারফৎ জয় হাসিল করতে হলে এই কৃষকশ্রেণীর উপর নির্ভর করতে হবে।

চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন যে এই কৃষকশ্রেণীই হচ্ছে বিপ্লবের প্রধান শক্তি এবং কৃষকশ্রেণীকে জাগ্রত এবং সশস্ত্র করার উপরই বিপ্লবের সাফল্য নির্বর করে। শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির দায়ীত্ব কৃষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থেকে গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা। এই কৃষক সমস্যার গুরুত্ব না বোঝার ফলেই পার্টির মধ্যে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি দেখা দেয়। এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লব মূলত: কৃষিবিপ্লব। তাই শ্রমিকশ্রেণীর দায়ীত্ব হচ্ছে এই কৃষিবিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কর্মধারা বলতে আমাদের চেয়ারম্যান শিখিয়েছেন, এই কর্মধারা হবে এমন যাতে বিপ্লবী তত্ব ও কর্মের মিল থাকে, জনতার সাথে গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আত্ম-সমালোচনায় অভ্যস্ত হতে হয়। এই কর্মধারা রপ্ত করতে হলে আমাদের পার্টি মূলত: গড়ে তুলতে হবে কৃষকদের মধ্যে। এবং শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে পার্টি গড়ে তুলতে হবে কৃষিবিপ্লবের রাজনীতিতে শ্রমিকশ্রেণীর কার্যক্রমের ভিত্তিতে।

এর আগেও আমরা পার্টিতে শ্রমিক ও কৃষককে পার্টি সভ্য করেছি। এমন বহু জেলা-কমিটি ছিল যেখানে শ্রমিক এবং কৃষক পার্টিসভ্য মধ্যবিত্ত পার্টিসভ্যের তুলনায় অনেক বেশী সংখ্যক ছিল। কিন্তু তবু আমাদের পার্টি বিপ্লবী পার্টি হল না কে? কারণ শ্রমিক পার্টি সভ্যদের সামনে কোন বিপ্লবী রাজনীতি ছিল না; কাজ ছিল না; তাদের মূলত: ট্রেড-ইউনিয়ন আন্দোলনেরই পরিপূরক শক্তি হিসাবে কাজ করানো হোত। ফলে তাদের স্বাধীন বিকাশের পথ রুদ্ধ হোত এবং তারা ট্রেড-ইউনিয়নে পার্টির মধ্যবিত্ত নেতার নির্দেশে পরিচালিত হোত। কৃষকদের মধ্যে যে পার্টি সভ্য ছিল সেখানেও শ্রেণী বিশ্লেষণ করা হোত না, বিপ্লবী রাজনীতির অভাবে কৃষকদের সুমহান দায়ীত্ব সম্পর্কে সজাগ করে তোলা হোত না, সংস্কারবাদী কৃষকসভা, যার নেতা প্রধানত: ধনীকৃষক ও মধ্যকৃষক এবং যাকে আইনানুগ আন্দোলনের পথে পরিচালনা করা হোত, ফলে পার্টিসভ্যদের বেশীর ভাগই হোত ধনী এবং মধ্যকৃষক, এবং আইননানুগ আন্দোলনের দরুণ সেখানেও মধ্যবিত্ত পার্টি নেতার নির্দেশ পালনই তাদের প্রধান কাজ হোত। ফলে শ্রমিক এবং কৃষক পার্টি নেতার নির্দেশ পালনই তাদের প্রধান কাজ হোত। ফলে শ্রমিক এবং কৃষক পার্টিসভ্য থাকা সত্বেও পার্টি মূলত: মধ্যবিত্তশ্রেণীর পার্টিতে পয্যবসিত হয়েছিল। তারই ফলে পার্টি একটি খাঁটি সংশোধনবাদী পার্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে। একটি সংশোধনবাদী পার্টির মতই আমাদের পার্টি ও একটি নির্বাচন থেকে আর একটি নির্বাচন পর্য্যন্ত যেসব আন্দোলন পরিচালনা করত তার লক্ষ্য থাকত পরবর্তী নির্বাচনে পর্য্যন্ত যেসব আন্দোলন পরিচালনা করত তার লক্ষ্য থাকত পরবর্তী নির্বাচনে বেশী আসন দখল। পার্টির প্রধান কেন্দ্রগুলি ছিল সমস্ত শহরে এবং শহরে আন্দোলন সৃষ্টি করাই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন কি গ্রামের কৃষককেও শহরে আনা হোত শহরের আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য। ১৯৫৯ সালের শোচনীয় অভিজ্ঞতা এই শহরকেন্দ্রিক আন্দোলনেরই কুফল। এবং সমস্ত গণ-আন্দোলনের লক্ষ্য হোত এসেমব্লি [assembly] ঘেরাও করা। পার্টিতে কোন কিছুই গোপন থাকত না, গোপনীয়তা রক্ষার প্রচেষ্টা ক্রমশ:ই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মতবিরোধও বুর্জোয়া কাগজে প্রকাশ পেত; পার্টিসভ্যদের সজাগ দৃষ্টি (vigilance) ভোঁতা করে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সমস্ত আন্দোলনকে আইনানুগ রাখার জন্য পার্টির নেতৃবৃন্দ সদাসর্বদা প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। তারা শুধু তেলেঙ্গানার সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাই নয়, যেখানেই কৃষক আন্দোলন পুলিশী দমননীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই পার্টি নেতৃত্ব এগিয়ে গিয়ে সংগ্রামের তুলে নিয়েছে- যেমন পাঞ্চাবের বেটারমেণ্ট লেভির আন্দোলন। পার্টি নেতারা পাঞ্চাবের পার্টি নেতাদের সাথে আলোচনা না করেই আন্দোলন তুলে নেন, বিহার, উত্তর প্রদেশের কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করেন; ১৯৫৯ সালের বেনামী জমির আন্দোলনের ক্ষেত্রেও দার্জিলিং জেলায় পার্টি নেতৃত্বকে উগ্রপন্থী আখ্যা দেওয়া হয়। এবং এ সমস্তই ঘটে একটি কারণে- কৃষকরা পুলিশী দমননীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চেয়েছিল বলে। প্রকাশ্য ও আইনানুগ আন্দোলনের মধ্যে প্রত্যেকটি সংগ্রামকে পার্টি নেতৃত্ব আটকে রেখেছিল। এবং পার্টি নেতাদের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল পার্টির পত্রিকা পরিচালনা। যে দেশের অধিকাংশ লোক অশিক্ষিত সে দেশে পার্টি পত্রিকা একমাত্র মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিদেরই কাজে লাগে। এই পত্রিকা মারফৎ শ্রমিক কৃষকদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা কোনমতেই সম্ভবপর নয়। তাই সপ্তম কংগ্রেস একটি বিপ্লবী পার্টির জন্ম দিল না, জন্ম দিল একটি সংশোধনবাদী পার্টির।

আজ যখন আমরা বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে হাত দিচ্ছি তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রত্যেকটি দেশে জনতার বিপ্লবী সংগ্রাম চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামী জনতার সংগ্রাম নিপীড়িত মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এমন কি আমাদের দেশেও নকশালবাড়ী, উত্তর-প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেপ ইত্যদি বিভিন্ন এলাকার কৃষকের বিপুল বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতবর্ষেও চেয়ারম্যান নির্দেশিত মুক্ত অঞ্চল গড়ার কাজে কৃষকশ্রেণী হাত লাগিয়েছে। এই যুগে বিপ্লবী পার্টি গড়ার পক্ষে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার এবং প্রসার করাই একমাত্র কাজ নয়, আজকের বিপ্লবী পার্টিকে চেয়ারম্যানের কর্মধারা আয়ত্ব করতে হবে। তবেই তাকে আমরা বিপ্লবী পার্টি বলতে পারবো।

আজকের ভারতবর্ষে বিপ্লবী তত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয় ঘটাতে হবে, পার্টিকে এখনই গ্রামাঞ্চল কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তুলতে হবে। তাই তত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয় সাধন করতে হলে কৃষকশ্রেণীর শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক, যারা কৃষিবিপ্লবের প্রধান শক্তি, তাদেরই মধ্যে পার্টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জনতার সাথে গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এই ভূমিহীন এবং দরিদ্র কৃষকের পার্টি ইউনিটগুলিকে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার ও প্রসার মারফৎ ব্যাপক কৃষক জনসাধারণের শ্রেণীসংগ্রাম সংগঠিত করতে হবে।

এই শ্রেণী সংগ্রাম সৃষ্টি করতে পারলেই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের এই পার্টি ইউনিটগুলি গেরিলা ইউনিটে রূপান্তরিত হবে। এইসব গেরিলা ইউনিটকে রাজনীতি প্রচার ও প্রসার ও এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মারফৎ পার্টির গণভিত্তিকে আরও ব্যাপক ও দৃঢ় করতে হবে। এইভাবেই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মারফৎ জনতার স্থীয় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠবে এবং সংগ্রাম জনযুদ্ধের রূপ নেবে। এই দুরূহ কাজ করা যায় একমাত্র সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার হাতিয়ারকে সঠিকভাবে প্রয়োগ মারফৎ। বিপ্লবের স্বার্থে আমরা একত্রিত হয়েছি। কাজেই সমালোচনা আমাদের ভয় করলে চলবে না এবং আত্মসমালোচনায় পরাংমুখ হলে আমরা আমাদের ভয় করলে চলবে না এবং আত্মসমালোচনায় পরাংমুখ হলে আমরা আমাদের গুণগত পরিবর্তন সাধন করতে পারবো না, বিপ্লবী কমিউনিস্ট হিসাবে আমাদের যে দায়িত্ব সে দায়িত্ব পালন করতেও অসমর্থ হবো। এই কর্মধারায় অভ্যস্ত হলে যে নতুন বিপ্লবী পার্টি জন্ম নেবে সেই পার্টি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের উপর নিশ্চয়ই নির্ভরশীল থাকবে না। শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে অবিরাম কৃষি বিপ্লবের রাজনীতি-চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। তার ফলে শ্রমিক শ্রেণীর যে অগ্রণী অংশ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা ও তাঁর কর্মধারায় অভ্যস্ত হবে তাকে সক্রিয়ভাবে কৃষি বিপ্লব সংগঠিত করবার জন্যে গ্রামাঞ্চলে পাঠাতে হবে এবং এভাবেই কৃষিবিপ্লবের উপর শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব কার্যকরী রূপ নেবে। তাই চেয়ারম্যান বলেছেন, বিপ্লবী পার্টি হবে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী এবং উদ্যোগী অংশকে নিয়ে।

এই বিপ্লবী পার্টি যেমন নির্বাচনী পার্টি হবে না, তেমনি শহরকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠবে না। বিপ্লবী পার্টি কখনই প্রকাশ্য পার্টি হতে পারে না এবং কাগজ বের করাটাই তার প্রধান কাজ হতে পারে না এবং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারে না। বিপ্লবী পার্টিকে হতে হবে শ্রমিক এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের উপর নির্ভরশীল; গ্রামকে কেন্দ্র করে কৃষক সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে, গোপন সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে প্রতিবিপ্লবী আক্রমণের সামনে পার্টি অসহায় হয়ে পড়বে। বিপ্লবী পার্টি আমরা তাকেই বলবো যে পার্টি গ্রামাঞ্চলে কৃষকের বিপ্লবী সংগ্রাম সংগঠিত করতে পারবে। এই রকম একটা পার্টি গড়ার জন্য আজ সমস্ত বিপ্লবীদের সক্রিয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এই বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবিরা নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারেন, কারণ তাঁদের পড়াশুনা আছে এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও তাঁরা শ্রমিক ও কৃষকদের জানাতে পারেন। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা তাঁরা যতখানি বুঝেছেন ততখানি তাঁরা কৃষক ও শ্রমিকদের দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা শ্রমিক এবং কৃষক পার্টি-ইউনিটগুলির স্বাধীন বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ান এবং তাদের উদ্যোগ বাড়াতে চেষ্টা করেন না। তাই বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে মনে রাখতে হবে চেয়ারম্যানের এই শিক্ষা- “জনগণই প্রকৃত বীর, -আমরা নিজেরা প্রায়ই ছেলে মানুষ ও অজ্ঞ, এবং একথা না বুঝলে একেবারে প্রাথমিক জ্ঞানটুকু পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব নয়।”

কমরেডস, চেকোশ্লোভাকিয়ার ঘটনা সোভিয়েত সংশোধনবাদের ফ্যাসিবাদী রূপ নগ্নভাবে তুলে ধরেছে। বিশ্বাসঘাতক ডাঙ্গেচক্র ও নয়া-সংশোধনবাদীচক্র যে সেই সোভিয়েতেরই হাতের পুতুল এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চেকোশ্লোভাকিয়ার ঘটনায়। তার ফলে সংশোধনবাদী প্রচার ভোঁতা হয়ে পড়তে বাধ্য। ভারতবর্ষ আজ সোভিয়েত-মার্কিন নয়া-উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের সাহায্যে ভারতবর্ষকে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবিপ্লবী কেন্দ্র করেছে। এই অবস্থায় সোভিয়েত সংশোধনবাদের মুখোশ যত তাড়াতাড়ি খুলবে ততই সারা ভারতবর্ষে বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রাম ও প্রতিরোধের জোয়ার আসবে এবং দেশের ভেতরে কৃষক বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠবে। এই সময় কত দ্রুত আমরা আমাদের শ্রেণীগুলির মধ্যে পার্টি সংগঠন গড়ে তুলতে পারছি তারই উপর বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তারই উপর নির্ভর করছে এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব আমরা দিতে পারি কি না। হয়তো আগামী ফসল দখলের আন্দোলনে এই বিপ্লবী জোয়ারের প্রকাশ হতে পারে। সুতরাং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা শ্রমিক ও কৃষকশ্রেণীর মধ্যে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা প্রচার ও প্রসারের মারফতে বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে আসবেন।

শারদীয়া দেশব্রতী, ১৯৬৮