চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৩য় পর্ব)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

কোন এক সংগঠক কমরেডকে লেখা চিঠি

[ঘৃণা জাগিয়ে তোল পুলিশের বিরুদ্ধে]

প্রিয় কমরেড,

তোমার চিঠি পেলাম, ধনী-কৃষক ও মধ্য-কৃষকের মধ্যে এই কথাটা চালু হয়েছে যে আমরা আঘাত না করলে পুলিশও আঘাত করবে না; কাজেই জোতদারের বিরুদ্ধে লড়াই চালাও কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে আক্রমণ করো না:- এ চিন্তাটা মারাত্মক, কারণ সরকারী আক্রমণ হবেই। আমরা যত দেরী করব ওদের সাহস বাড়বে। কেন্দ্রীয় সরকার, সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতন্ত্র সবাই এটা বুঝছে যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। কাজেই ওরা এর জড় উপড়ে ফেলতে চেষ্টা করবে, এখন ওরা চুপচাপ আছে কারণ ওরাও এখন জনমত তৈরী করছে। কাগজওয়ালারা প্রতিদিন খবর দিচ্ছে। আজ প্রাদেশিক মন্ত্রীসভার বৈঠক হবে। পি. সি (প্রভিন্সিয়াল কমিটি-রাজ্য কমিটি) মিটিংয়ের জন্য রতনলাল ছাড়াও, ওরা বীরেন বোসকে নিয়ে গেছে, নতুন একটা ষড়যন্ত্র তৈরী হচ্ছে, আজকের “ষ্টেটসম্যানে” লিখেছে আক্রমণ চালালে ২৫০ জন নিহত হতে পারে; এ সমস্তই নতুন আক্রমণের সূচনা, আমরা আঘাত না করলেও ওরা আক্রমণ করবে। “পুলিশ মহল কাহিনী” বলে যেগুলি চলছে সেগুলি মধ্য-কৃষকের কথা। পুলিশ হুকুমের দাস কাজেই হুকুম এলেই ওরা আক্রমণ করবে। আমরা আঘাত হানলে একমাত্র ওরা ভয় পাবে এবং প্রতি-আক্রমণ করতে ইতঃস্তত করবে। এটা কৃষক সাধারণকে বুঝাও, ঘৃণা জাগিয়ে তোল পুলিশের বিরুদ্ধে। জোতদাররা এখনও গ্রামে আছে ওরা পুলিশকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে এবং নির্বিচারে কৃষক খুন করবে। কাজেই গ্রাম থেকে এই সব শ্রেণীশত্রুদের তাড়াতে হবে। ওরা সকলেই গোপনে থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ওদের সাহায্যে পুলিশ আক্রমণ চালাবে। তোমরা সঠিক পথেই প্রচার চালাচ্ছে, এর সাথে সাথে যেটা প্রচার করতে হবে তা হল সরকার দূর্বল, ওদের দেখতে যত ভীষণ, ওরা তত ভীষণ নয়। আমরা আঘাত করলেই ওরা আতংকিত হবে, কারণ আজও ওরা প্রতি-বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি। কাজেই আমাদের আক্রমণের সাথে সাথে সব জায়গায়ই কৃষক আঘাত করবে। এখনই খবর পাচ্ছি ডুয়ার্সের চা বাগানে জমি দখল শুরু হয়ে গেছে। দেব পাড়ায় ছোট খাট সংঘর্ষও (Clash) হয়েছে। এমনকি কোচবিহারে কৃষক কিছু জমি দখল করেছে।

সংগ্রামের নতুন ধরন দেখাতে পারলে সেটাও আগুনের মত ছড়িয়ে পড়বে, এখনই নকশাল বাড়ীর ঘটনা নিয়ে সারা বাংলাদেশে পোষ্টারিং শুরু হয়ে গেছে, কোলকাতা ও শহরতলীতে ব্যাপক পোষ্টারিং শুরু হচ্ছে, আমাদের লিফলেট ওরা ছাপিয়ে বিলি করছে। জলপাইগুড়িতেও এই লিফলেট ছাপিয়ে বিলি হয়েছে। আলিপুরদুয়ারের, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের খবর পাইনি। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায় কিছু কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশের বিপ্লবী শক্তি আমাদের উপলক্ষ্য করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। সুতরাং চেয়ারম্যানের কথা-একটি স্ফুলিঙ্গই দাবানলের সৃষ্টি করতে পারে (A single spark can start a prairie fire) বাস্তবে খাটছে। এখনও আমরা সংগ্রামের নতুন ধরন নিতে পারিনি, এখনও কৃষক বাহিনীর হাতে রাইফেল নেই। সেটা এলে কি বিপুল ঘটনা ঘটবে আজ বসে আন্দাজ করাই যাচ্ছে না। কাগজওয়ালারা এটাকে বিদ্রোহ (Rebellion) বলেই লিখছে।

এখন কাজ-আমাদের নিজেদের ভেতর থেকে সমস্ত দুর্বল ও অক্ষম চিন্তাধারা দূর করতে হবে। যে সমস্ত দৃষ্টিকোণ শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখে আর জনগণের শক্তিকে দেখে ছোট করে তা সবই ভুল সুতরাং কাগুজে বাঘের কথা কৃষকের সামনে বারে বারে রাখো। এই সাথে আর একটা শিক্ষা আমাদের নেওয়া উচিত, সেটা হোল এ যুগে ১০/১২ জনে পুলিশ পার্টিকে আক্রমণ (attack) করা যাবে না, কাজেই আমাদের জমায়েত করতে হবে কম করে ১০০ জন কমরেডের, তার জন্য যদি একটা গ্রুপকে নিয়েও চলতে হয় তাই চলা উচিত। তবেই তোমরা পুলিশ পার্টিকে আক্রমণ (attack) করতে পারবে। এ্যামবুশ করতে শিখতে হবে। এবং কাছাকাছি (close range এ) গিয়ে হামলা করতে হবে। হামলা করলে আমরা সকলকে খতম (annihilate) করতে পারব না। সে চেষ্টা করেও লাভ নেই। যদি ৫/১০ জনকেও খতম (annihilate) করতে পারি তা হলে ৫/১০ টা রাইফেল আমাদের হাতে আসবে। রাইফেল হাতে পেলেই সংগ্রামী মনোবল বেড়ে যাবে। এবং সেই রাইফেল নিয়ে আক্রমণ (attack) করতে পারলেই তরাইয়ের কৃষক ভিয়েতনামের পথে যাবে। কারণ ওরা যে একই শ্রেণীর। আমাদের এলাকার গণতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে এটা আজ ধনিকশ্রেণীও স্বীকার করেছে। কতখানি আমরা চেয়ারম্যানের চিন্তাকে কাজে লাগাতে পারব, তারই উপর আমাদের আঘাত হানার ক্ষমতা বাড়বে।

রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দাও (Put politica in command)। সব কিছুর উপরে সাহসকে স্থান দাও এবং সাহসের সঙ্গে জনগণকে জাগিয়ে তোল (Put daringness over every things and boldly arouse the masses)। জয় আমাদের হবেই।

লাল সেলাম

চারু মজুমদার

৯ই জুন, ’৬৭

Advertisements

চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (২য় পর্ব)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

 

নির্বাচনের শিক্ষা ও প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের দায়িত্ব

১। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা: চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল পরিষ্কার দেখিয়ে দিলো যে ভারতে শাসকশ্রেণীর এক পার্টির একচেটিয়া শাসনের যুগ শেষ হয়ে গেলো। যে কংগ্রেস বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের মর্যাদায় গত বিশ বছর একচেটিয়া শাসন চালিয়েছে, যার হাতে ছিলো ভোটার লিষ্ট, নির্বাচন কেন্দ্রের সীমানা নির্দ্ধারণ ও নির্বাচনে চাপ সৃষ্টির সামগ্রিক ক্ষমতা, বৃটিশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্য-পুষ্ট হয়ে এবং সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় যে কংগ্রেস দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতাপ চালিয়েছে, চীন, পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ লাগিয়ে দুইবার উগ্র জাতীয়তাবাদের মুখোশ পুরোপুরি গ্রহণ করেছে, যে কংগ্রেস লাঠিগুলির দমন নীতির সাহায্যে সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে দেখিয়েছে যে তার শক্তিই সবচেয়ে বেশী-সেই কংগ্রেস শোচনীয় ভাবে পরাজিত হওয়ায় প্রমাণিত হলো যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আপাত দৃষ্টিতে শক্তিশালী মনে হলেও আসলে কাগুজে বাঘ। তাই মানুষের মনে ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্টের মতোই এক জয়ের চেতনা এসেছে।

২। কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণ: ২০ বছরের শাসনে কংগ্রেস জনগণের প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের শোষণ শেষ তো করতে পারেই নি বরঞ্চ তাকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে আমাদের দেশের সমস্ত জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের বিরোধ এতো তীব্র হয়েছে যে তা’ গত কয়েক বৎসর ধরেই ফেটে পড়তে শুরু করেছে। এই বিরোধ যত তীব্র হতে থেকেছে ততই শাসকশ্রেণীর সাথে জনগণ ও শ্রমিকশ্রেণীর বিরোধ, সংখ্যালঘু জাতিগুলির সাথে শাসকশ্রেণীর বিরোধ ফেটে পড়তে থেকেছে এবং তার চাপে সোভিয়েত-মার্কিন শক্তিজোটের সাথে বৃটিশ ও অন্যান্য শক্তি জোটের বিরোধ কার্যকরী হওয়ায় কংগ্রেসের এই শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।

৩। আমাদের সামনে সমস্যা: যে বিরোধগুলো তীব্র হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণীর সহযোগিতায় তার সমাধান করতে পারবে না, বিরোধ আরও বেড়ে চলবেই। তার অর্থ নিশ্চয়ই এই নয় যে আপনা আপনি জনগণতান্ত্রিক সরকার কায়েম হয়ে যাবে! কারণ শোষকশ্রেণীর রাষ্ট্রযন্ত্র থেকেই গেল। সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে খতম না করে জনগণতন্ত্রে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা সংশোধনবাদী ধারণা ছাড়া আর কিছুই না। এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে খতম করতে পারে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব। নেতৃত্বের দুর্বলতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-কারণ ভারতব্যপী স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভে শ্রমিকশ্রেণীর সচেতন নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এই বিক্ষোভগুলির ক্ষণস্থায়ী চরিত্রের থেকে বোঝা যায় যে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বের দুর্বলতার ফলে বিক্ষোভ উত্তাল হয়েই দপ করে থেমে গিয়েছে। কোন রাজ্যেই আন্দোলনে স্থায়ীত্ব আসেনি।

৪। আমাদের কাজ: জনগণের বিজয় উল্লাসের পিছনে রয়েছে এ দেশকে সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসাবে গড়ে তোলার আকাঙ্খা যা পূরণ করার ক্ষমতা অকংগ্রেসী বিকল্প সরকারগুলির নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে গণ্ডীবদ্ধ সরকারের তা থাকতেও পারে না। এই বিকল্প সরকার সম্বন্ধে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই যে মূল সমস্যার অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের সংগ্রামে এই সরকারকে ব্যবহার করা। শোষকশ্রেণী সারা ভারতে তাদের পক্ষে আজকের অনিশ্চিত অবস্থা থাকতে দিতে পারে না, তারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের পক্ষে অবস্থা গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করবেই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিজোটের মধ্যে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভারতে তাদের শাসন গোছাবার প্রয়োজনীয়তা বেশী করে অনুভব করছে এই জন্যে যে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রভাব ভারতে এসে পড়ায় সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ ঐক্যবদ্ধ হয়ে চীন বিরোধের ভিত্তিতে কেন্দ্র এবং রাজ্যে বিভিন্ন বুর্জোয়া পার্টিগুলির সাথে গোপন কমিউনিস্ট বিরোধী চুক্তি করে সাম্রাজ্যবাদী জোটের পক্ষে নিরাপদ অবস্থার সৃষ্টি করতে চাইবেই। তাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্রের মোহ সৃষ্টি করা। এর জন্যে বিভিন্ন শ্রেণীকে কিছু কিছু সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কিন্তু যাকে যত সুবিধাই দিক, দেশের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ কৃষকশ্রেণীকে কোন সুবিধে দেওয়ার ক্ষমতা আর তার নেই। এই কৃষকশ্রেণী আমাদের দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান শক্তি। কৃষক-অঞ্চলে মুক্ত এলাকা গড়ে তোলার কাজই আজ শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য বিপ্লবী শ্রেণীর প্রধান দায়িত্ব। শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য বিপ্লবী শ্রেণীর শ্রেণী-সংগ্রামকে তীব্রতর করেই গ্রামাঞ্চলে মুক্ত এলাকা গড়ে তোলার কাজ ত্বরান্বিত হতে পারে।

৫। পার্টি: কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্যে যে সংশোধনবাদী ঝোঁক রয়েছে তার প্রমাণ বারবার পাওয়া গিয়েছে। পার্টিতে নয়া সংশোধনবাদ চালু করার তারা যে চেষ্টা করেছেন সাম্প্রতিক কার্যকলাপে তা প্রমাণিত হচ্ছে।

(ক) মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বর্তমান যুগের সর্বোচ্চরূপ যে মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারা তা আজও নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করেন নি। সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে মিলে বিশ্ব প্রভৃত্বের পরিকল্পনাকে নিন্দা করেন নি। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করলে এবং মাও সেতুঙের চিন্তাধারাকে সমর্থন না করলে বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার তোলা যায় না, বিপ্লবী আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয় না।

(খ) ভারতবর্ষের বিপ্লবী পরিস্থিতিকে ক্রমাগত অস্বীকার করা হচ্ছে। যার ফলে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী দায়িত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না।

(গ) পার্টির মধ্যে আদর্শগত আলোচনাকে ক্রমাগত বন্ধ রাখা হচ্ছে যার ফলে বিপ্লবী চেতনায় পার্টি সভ্যদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ অবহেলিত হয়েছে।

(ঘ) পার্টির মধ্যে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার আবহাওয়া সৃষ্টি না করে বৈপ্লবিক পার্টি গড়ে তোলার দায়িত্ব কার্যতঃঅস্বীকার করা হচ্ছে।

(ঙ) বিকল্প সরকারের প্রশ্নেও পার্টি নেতৃত্বের বক্তব্যে শ্রেণী-সমন্বয়ের ঝোঁক প্রকাশ পাচ্ছে। কমিউনিস্টদের বিকল্প সরকারে যোগদানের একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে, তা হচ্ছে সরকারের মধ্যে থেকে সংগ্রামের আহ্বান দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করা-সংসদীয় মর্যাদা রক্ষা করা নয়। কিন্তু সে পথ না নিয়ে একদিকে আন্দোলন করতে হবে বলে আবার, মালিকশ্রেণীর ভয়ের কোন কারণ নেই বললে আন্দোলনের লক্ষ্যকেই অস্পষ্ট করা হয়। আন্দোলনকা’র বিরুদ্ধে তার নির্দ্দেশ থাকে না। এবং এ পথ অবশ্যম্ভাবীভাবে শ্রেণীসম্বন্বয়ের পথে নিয়ে যেতে বাধ্য।

কমরেডস, নির্বাচনের আগে ও পরের ঘটনাগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে ভারতবর্ষ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। এই সংকটকে গভীর করেছে ভারতের বৈপ্লবিক পরিস্থিতি। রাজনৈতিক সংকট বাড়তে থাকবেই এবং সেই সঙ্গে জনগণের রাজনৈতিক চেতনাও বাড়তে থাকবে। পরিস্থিতি কমিউনিস্ট পার্টির কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দাবী করবে, তাই পার্টিকে সাচ্চা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি হিসাবে গড়ে তোলার প্রশ্ন আরও জরুরী হয়ে পড়েছে। পার্টির আভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে যত জোরদার করা যাবে তত বেশী সংখ্যক কমরেড আভ্যন্তরীণ আদর্শগত সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করবেন, ভারতীয় বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব তত বেশী করে প্রতিষ্ঠিত হবে।

৩রা এপ্রিল, ’৬৭

 


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (১ম পর্ব)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

 

নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (মে, ১৯৬৭)

কোন এক সংগঠক কমরেডকে লেখা চিঠি

ত্যাগ ব্যাপারটা কোন নির্দিষ্ট ব্যপার নয়। সেটা দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা।

কমরেড,

……..মা………পরিবারে সাহায্য করতে বলছেন এবং…..চাকরির চেষ্টা করছে। তার বর্তমানের প্ল্যান ৬ মাসের জন্য চাকরি করবে এবং তারপরে ফিরে গ্রামে যাবে। যাই হোক, বর্তমানে তার কোনও সাহায্য তোমরা পাবে না। কাজেই ওর এলাকা সম্বন্ধে তোমাদের একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। …..নিয়ে বসে একটা সিদ্ধান্ত নিও। ওর কাছ থেকে ক্যাডার লিষ্ট পাঠিয়ে দিলাম। মধ্যবিত্ত ক্যাডারদের বিপদ এইখানেই। তারা দ্রুত জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে (National-International Perspective) হারিয়ে ফেলে এবং তখন তাদের সামনে স্থানীয় এমনকি পারিবারিক সমস্যাটাই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। এইখানেই পোর্টিবুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা (Petty Bourgeois Limitation)। শ্রমিক বা দরিদ্র কৃষকের সংগ্রামের কথা না ভাবলে চলে না। কাজেই তারা বিপ্লবে অবিচল (Consistant Revolutionary) থাকতে পারে। চেয়ারম্যান যখন বলেন-দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হও, কোন আত্মত্যাগে ভীত হয়োনা এবং সমস্ত বাধা অতিক্রম করে বিজয় অর্জনে সাহসী হও (Be resolute, Fear no sacrifice and surmount every difficulty to win victory) এর তাৎপর্য অনেক গভীর। ত্যাগ (Secrifice) ব্যাপারটা কোন নির্দিষ্ট (Particular) ব্যাপার নয়। সেটা দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা। সেই জন্যেই চেয়ারম্যান বলেছেন গ্রামে গেলেই মধ্যবিত্ত ক্যাডার বিকাশলাভ (develop) করবে এমন কোনও মন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করিনা। গ্রামে গিয়ে তোমাকে জনগণের সঙ্গে একাত্ম হতে হবে (Integreted with the masses) এবং জনগণের সঙ্গে বন্ধু ভাবাপর (Friendly with the people) হতে হবে এবং দ্বিতীয়ত: প্রতিনিয়ত: সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা নিজেকে পরিবর্তিত (Remould) করতে হবে। তবেই তুমি বিকাশলাভ (Develop) করতে পার। গ্রামাঞ্চলে রেডিও নেওয়ার ব্যাপারে জোর দাও। পিকিং রেডিও প্রতিদিন শোনা একটা অবশ্য করণীয় কাজ হিসেবে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব প্রায় প্রতিদিন নির্দ্দেশ দিচ্ছেন, সে নির্দ্দেশ আমাদের বুঝতে হবে এবং কাজে লাগাতে হবে। আমি এখানে যদি কোন নতুন ছেলে পাই তাহলে তাকে তোমাদের কাছে পাঠাবো। ……উদাহরণ থেকে আমাদের সকলকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অতীতের ভুল থেকে অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে (You must learn from the past mistakes)। কেন এ রকম হলো ভাব এবং তা থেকে শিক্ষা নাও, তা হলে ভবিষ্যতের বিচ্যুতি থেকে বাঁচবে। তোমাদের কৃষক সমিতির মিটিংয়ের রিপোর্ট ……….কাছ থেকে পেলাম। বন্দুক সংগ্রহ কর-এটাই আজকের রাজনীতি। এই রাজনীতি কতখানি কৃষকের মধ্যে আমরা দিতে পারলাম, তারই উপর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। আলাপ আলোচনা কর। নিজের চেতনার উন্নতি সাধন কর (discuss, improve yourself)। এটাই আজকের দিনে সবচেয়ে বড় দরকার।

চারু মজুমদার

১লা এপ্রিল, ’৬৭


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৮ নং দলিল)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৮ নং দলিল)

সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই কৃষক সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে

নির্বাচনের পরবর্তী যুগে আমাদের আকাঙ্খাকে সত্য প্রমাণিত করতে পার্টি নেতৃত্ব উঠে পড়ে লেগেছেন। পি. বি (পলিট ব্যুরো) আমাদের কাজ নির্দ্দেশিত করেছেন ‘অকংগ্রেসী মন্ত্রিসভাগুলিকে প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করার সংগ্রাম চালাতে, অর্থাৎ শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্র করে তোলা নয়, মন্ত্রিসভার পক্ষে ওকালতি করাই হবে মার্কসবাদীদের প্রধান কাজ। তাই শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে অর্থনীতিবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য পার্টি সভ্যদের কনভেনশন ডাকা হল। এবং তারপরই মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে শিল্পে শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হল। শ্রমিকদের ঘেরাও করতে মানা করা হল, শ্রেণী সহযোগীতার … চেয়ে নগ্ন চেহারা আর কি হতে পারে? মালিকপক্ষকে শোষণ করার পুরো অধিকার দিয়ে শ্রমিককে বলা হচ্ছে কোন সংগ্রাম না করতে। বিপুল গণ-আন্দোলনের ফলে যে সরকার কায়েম হল, সেই সরকারে কমিউনিস্ট পার্টি যোগ দেওয়ার সাথে সাথেই তারা শ্রেণী সহযোগিতার পথ বেছে নিলেন। চীনের নেতারা বহু আগেই ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন যে যারা আন্তর্জাতিক মতবিরোধ সম্পর্কে নিরপেক্ষ নীতি নিচ্ছেন, তারা অতি দ্রুত সুবিধাবাদের পথ নেবেন। এবং এখন চীনের নেতারা বলেছেন যে এই নিরপেক্ষ নীতিওয়ালারা আসলে হলেন সংশোধনবাদী এবং তারা দ্রুত প্রতিবিপ্লবী শিবিরে চলে যাবেন। আমাদের দেশে এই সত্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা আমরা চোখের উপর দেখেছি, এর সাথে যোগ করুন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙারের ঘোষণা। তিনি প্রথমে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে সমস্ত ভেষ্ট জমি ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে বিলি করবেন। তারপর তার পরিমাণটা কমে গেল। শেষে জানালো যে, এ বছর যেমন আছে তেমনই থাকবে। খাজনা মাফ ব্যাপারটা জে, এল, আর, ও’দের দয়াতে ছেড়ে দেওয়া হল। কৃষককে পথ বাৎলানো হল দরখাস্ত করার। এবং বলা হোল, কৃষকের জোর করে জমি দখল করা চলবে না। হরেকৃষ্ণবাবু শুধু কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য নন, তিনি বাংলাদেশের কৃষক সভারও সম্পাদক। তারই কৃষকসভার ডাকে গত ১৯৫৯ সালে ভেষ্ট জমি ও বেনামী জমি ধরার আন্দোলন চালিয়েছিল। সরকার জমির মালিকদের স্বার্থে দমননীতি চালিয়েছে, উচ্ছেদের রায় দিয়েছে। তবু কৃষক অনেক ক্ষেত্রে সে জমি ছাড়েনি-গ্রামে একতার জোরে দখল রেখেছে। কৃষকসভার নেতা মন্ত্রী হওয়ার পর কি তাদের আন্দোলনকে সমর্থন করলেন? না-তিনি যে কথা বললেন তার অর্থ হচ্ছে ভেষ্ট জমি পুনর্বণ্টন হবে। কে পাবে? সে বিষয়ে জে. এল. আর. ওরা কৃষকসভার মতামত নেবে। কিন্তু সেই মতামতই কি পালিত হবে? এমন কোন বক্তব্য হরেকৃষ্ণবাবু রাখেন নি। তবে যদি জে. এল. আর. ও. কৃষক সভার মতামতকে অগ্রাহ্য করে তাহলে কৃষকদের কোন মতেই সে জমি জোর করে দখল করা চলবে না। এ বিষয়ে হরেকৃষ্ণবাবু স্পষ্টভাবে বলতে দেরি করেন নি। একে কি বলবেন? সরকার ও জোতদারদের গোমস্তাগিরী নয় কি? শ্রেণীগুলির পক্ষে এ রকম নির্লজ্জ ওকালতি কংগ্রেসীরাও করতে সাহস পেত না। কাজেই পার্টি নেতাদের নির্দেশ মানার অর্থ হল সামন্তশ্রেণীগুলির শোষণ ও শাসন নির্বিচারে মেনে চলা। তাই কমিউনিস্টদের দায়িত্ব হবে এই নেতৃত্বের শ্রেণীবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা পার্টি সভ্য ও জনসাধারণের মধ্যে খুলে ধরা এবং শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্র করার নীতিতে এগিয়ে যাওয়া। তারপর, ধরুন হরেকৃষ্ণবাবুর প্রস্তাব মেনে যদি ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষক দরখাস্ত দেয় তাহলে কি হবে? ভেষ্ট জমির মধ্যে কিছু অনাবাদী আছে সত্য, কিন্তু আবাদী জমিই বেশী। সেই আবাদী জমিতে চাষী আছে-সে হয় আজ লাইসেন্সের জোরে ভোগ করছে না হলে জোতদারকে ভাগ দিচ্ছে। সেই জমি যখন পূনর্বন্টন হবে তখন অনিবার্যভাবে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হবে এবং তারই সুযোগে সমস্ত কৃষক আন্দোলনের উপর ধনী কৃষকের নেতৃত্ব কায়েম হবে, কারণ ধনী কৃষকের যেমন তদ্বির করার সুযোগ আছে তেমনি সামন্ত প্রভাবের অংশীদার ধনী কৃষক। কাজেই হরেকৃষ্ণবাবু শুধু আজই সংগ্রাম করতে চাচ্ছেন না তাই নয়, ভবিষ্যতেও যাতে কৃষক আন্দোলন জঙ্গী খাতে না যায়, তারও ব্যবস্থা করেছেন।

অথচ আমরা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রোগ্রাম নিয়েছি এবং সেই বিপ্লবের কাজই হচ্ছে কৃষকের স্বার্থে ভূমিসংস্কার করা। কৃষকের স্বার্থে ভূমিসংস্কার তখনই হতে পারে যখন আমরা গ্রামাঞ্চলে সামন্তশ্রেণীগুলির প্রভূত্ব খতম করতে পারবো। এ কাজ করতে হলে আমাদের সামন্তশ্রেণীগুলির হাত থেকে জমি কেড়ে নিতে হবে এবং বণ্টন করতে হবে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে। তা আমরা কখনই করতে পারবো না, যদি আমাদের আন্দোলন অর্থনীতিবাদের আওতার মধ্যে থাকে। ভেষ্ট জমির আন্দোলনের প্রত্যেকটি এলাকায়ই আমরা দেখেছি, যে কৃষক ভেষ্ট জমি দখল পেয়েছে এবং লাইসেন্স করতে পেরেছে, সে আর কৃষক-আন্দোলনে সক্রিয় থাকে না। তার কারণ কি? কারণ সেই দরিদ্র কৃষকের এক বৎসরের মধ্যে শ্রেণী বদলে গেছে-সে এখন মধ্য কৃষকে পরিণত হয়েছে। কাজেই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের অর্থনৈতিক দাবী আর তার দাবী নয়। তাই অর্থনীতিবাদ সংগ্রামী কৃষকের ঐক্য ফাটল ধরায় এবং ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষককে হতাশাগ্রস্ত করে। অর্থনীতিবাদীরা প্রত্যেকটি সংগ্রামকে বিচার করে কত মন ধান দখল হল বা কত বিঘা জমি কৃষক পেলো এই হিসাব থেকে। তারা কখনও বিচার করেনা কৃষকের সংগ্রামী চেতনা বাড়লো কিনা সেই নিরিখে। কাজেই কৃষকের শ্রেণী চেতনা বাড়ানোর কোন চেষ্টাই তারা করেনা। অথচ আমরা জানি যে কোন সংগ্রামই ত্যাগ স্বীকার না করে করা যায় না। চেয়ারম্যান মাও শিখিয়েছেন-যেখানে সংগ্রাম সেখানেই ত্যাগ স্বীকার আছে। সংগ্রামের প্রথম দিকে জনতার শক্তির চেয়ে প্রতিক্রিয়ার শক্তি বেশীই থাকবে। তাই সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী হবে। যেহেতু জনতা প্রগতিশীল শক্তি কাজেই তার শক্তি দিনের পর দিন বাড়বে আর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যেহেতু মরণোন্মুখ কাজেই তার শক্তি দিনের পর দিন কমবে। তাই জনসাধারণকে ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে কোন বিপ্লবী সংগ্রামই সফল হতে পারে না। অর্থনীতিবাদ এই মূল বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে টেনে নিয়ে যায় বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গীর চোরাগলিতে। পার্টির নেতারা ঠিক এই কাজটিই করছেন তাদের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের দ্বারা। আমাদের আগের সমস্ত কৃষক আন্দোলনের পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে পার্টির নেতারা উপর থেকে আপোষ চাপিয়ে দিয়েছেন কৃষকদের উপর। অথচ পার্টি নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিল কৃষক আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামী নেতৃত্ব কায়েম করা। সে কাজ আগেও তারা করেন নি, এখনও করছেন না। এখন তারা আইন ও আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভর করতে বলছেন। লেনিন যেখানে লিখেছেন যে কোন প্রগতিশীল আইন পাশ করলেও সে আইন যদি আমলাতন্ত্রের হাতে কার্যকরী করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে কৃষক কিছুই পাবে না। সুতরাং আমাদের নেতারা লেনিন ও বিপ্লবী পথ থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। কৃষিবিপ্লব আজকের এই মুহুর্তের কাজ, এ কাজ ফেলে রাখা যায় না এবং এ কাজ না করে কৃষকের কোন উপকারই করা যায় না। কিন্তু কৃষি বিপ্লব করার আগে চাই রাষ্ট্রশক্তির ধ্বংস সাধন। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস না করে কৃষি বিপ্লব করতে যাওয়া মানে সোজা সংশোধনবাদ। তাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করায় কাজ আজ কৃষক-আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান কাজ। সারা দেশব্যাপী, সারা রাজ্যব্যাপী যদি এ কাজ করা না যায় তাহলে কি কৃষক চুপ করে থাকবে? না, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ চিন্তাধারা আমাদের শিখিয়েছে যে, যদি কোন এলাকার কৃষককে রাজনৈতিক চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ করা যায় তা হলে সেই এলাকায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভাঙ্গার কাজে এগিয়ে যেতে হবে। একেই বলে কৃষকের মুক্ত অঞ্চল। এই মুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার সংগ্রামই আজকের দিনে কৃষক আন্দোলনের সবচেয়ে জরুরী আর এই মুহুর্তের কাজ। মুক্ত অঞ্চল আমরা কাকে বলবো? যে কৃষক অঞ্চল থেকে আমরা শ্রেণী শত্রুদের উচ্ছেদ করতে পেরেছি সেই এলাকাকেই আমরা মুক্ত অঞ্চল বলবো। এই মুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য চাই কৃষকের সশস্ত্র শক্তি। এই সশস্ত্র শক্তি বলতে আমরা কৃষকের হাতে গড়া অস্ত্রকেও যেমন ধরি, ঠিক তেমন বৃন্দুকও চাই। কৃষক রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে কিনা তা আমরা বুঝবো কৃষক বন্দুক সংগ্রহ করতে অগ্রসর হল কিনা এর ভিত্তিতে। বন্দুক কৃষক কোথায় পাবে? শ্রেণীশত্রুদের হাতে বন্দুক আছে এবং তারা গ্রামের মধ্যেই বাস করে। তাদের কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নিতে হবে। তারা স্বেচ্ছায় আমাদের বন্দুক দেবে না। কাজেই জোর করে আমাদের সেই বন্দুক দখল করতে হবে। এর জন্য কৃষক মিলিট্যাণ্টদের শ্রেণীশত্রুদের ঘরে আগুন দেওয়া থেকে সব রকম কৌশলই শেখাতে হবে। এছাড়া আমরা বন্দুক পাব সরকারী সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে হঠাৎ অতর্কিত আক্রমণ করে। এই বন্দুক সংগ্রহ অভিযান যে এলাকায় আমরা সংগঠিত করতে পারবো সেই এলাকা দ্রুত মুক্ত এলাকায় রূপান্তরিত হবে। তাই এই কাজ করার জন্য চাই কৃষকের মধ্যে ব্যাপকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার রাজনীতি প্রচার করা। আর চাই বন্দুক সংগ্রহ অভিযান চালানোর জন্য গোপন ছোট ছোট মিলিট্যাণ্ট গ্রুপ সংগঠিত করা। এই গ্রুপের সভ্যরা সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি যেমন প্রচার করবে সাথে সাথেই বন্দুক সংগ্রহের নির্দিষ্ট কার্যক্রমকে সফল করে তোলার চেষ্টা করবে। বন্দুক সংগ্রহ করলেই সংগ্রামের চেহারা বদলায় না-সংগৃহীত বন্দুক চালাতে হবে। তবেই কৃষকের সৃজনী শক্তির বিকাশ ঘটবে এবং সংগ্রামের গুণগত পরিবর্তন সাধিত হবে। একাজ করতে পারে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর দৃঢ় মিত্র দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক। মধ্যকৃষকও মিত্র কিন্তু সংগ্রামী চেতনা ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকের মত এত তীব্র নয়। কাজেই সে একই সাথে সংগ্রামে অংশীদার হতে পারে না-তার কিছু সময় লাগে। এই জন্যই কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে শ্রেণী-বিশ্লেষণ অবশ্য করণীয় কাজ। চীনের মহান নেতা চেয়ারম্যান মাও সেতুং তাই প্রথমেই এই কাজটি করেছিলেন এবং অভ্রান্তভাবে বিপ্লবী সংগ্রামের পথনির্দেশ করতে পেরেছেন। তাই আমাদের সাংগঠনিক কাজে প্রধান কথা হল কৃষক আন্দোলনে দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি নিয়ে কৃষক-আন্দোলন সংগঠিত করার মধ্য দিয়েই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের নেতৃত্ব কায়েম হবে। কারণ, তারাই কৃষক শ্রেণীগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিপ্লবী শক্তি। আলাদা ক্ষেত মজুর সংগঠন এ কাজকে সাহায্য করবে না। বরং আলাদা ক্ষেতমজুর সংগঠন অর্থনীতিবাদী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ঝোঁক বাড়ায় এবং কৃষকদের বিরোধ বাড়ায়। মিত্র শ্রেণীগুলির ঐক্য বাড়ায় না কারণ আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় সামন্তশ্রেণীর শোষণই প্রধান। এই প্রসঙ্গেই আর একটা প্রশ্ন আসে-সেটা হল ছোট মালিকদের সাথে আপোষের প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে? আপোষের ক্ষেত্রে আমাদের বিচার করতে হবে আমরা কার পক্ষে? সুতরাং তাদের বিপক্ষে অন্য কোনও শ্রেণীকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। কৃষক-আন্দোলনে বরাবর কমিউনিস্টরা মধ্যবিত্তশ্রেণীর স্বার্থে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের স্বার্থ ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। এতে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক সংগ্রামী মনোবল হারায়। মধ্যকৃষক ও ধনীকৃষক সম্বন্ধেও আমাদের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গী হবে। যদি আমরা ধনীকৃষককে মধ্য কৃষক হিসাবে বিচার করি তাহলে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক হতাশ হবে। আবার যদি মধ্য কৃষককে ধনী কৃষক হিসাবে বিচার করি তাহলে মধ্য কৃষকের সংগ্রামী উৎসাহ কমে যাবে। তাই কমিউনিস্টরা চেয়ারম্যান মাও-এর নির্দেশ মত প্রত্যেকটি এলাকায় কৃষকশ্রেণীর বিচার করতে শিখবে।

বারবার ভারতবর্ষের কৃষক বিক্ষোভে ফেটে পরেছে। বারবার কমিউনিস্ট পার্টির কাছে তারা পথনির্দেশ চেয়েছে। আমরা বলিনি যে সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি আর বন্দুক সংগ্রহের অভিযানই একমাত্র পথ। এই পথ শ্রমিকশ্রেণীর পথ, মুক্তির পথ, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ। সারা ভারতবর্ষে প্রত্যেকটি রাজ্যে আজ কৃষক বিক্ষুদ্ধ, তাদের সামনে কমিউনিস্টদের পথ দেখাতে হবে। সে পথ সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি আর বন্দুক সংগ্রহের অভিযান। মুক্তির এই একমাত্র পথ, আমাদের দৃঢ়ভাবে দেখাতে হবে। চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সমস্ত রকম বুর্জোয়া মতাদর্শের স্তাবকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সেই বিপ্লবের জলন্ত প্রভাব ভারতবর্ষে এসে পৌঁচেছে। সেই বিপ্লবের আহ্বান-দৃঢ়চিত্তে সমস্ত রকম ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হও, পথের বাধাকে একটা একটা করে দূর কর। জয় আমাদের হবেই। সাম্রাজ্যবাদ যত ভয়ংকর ভাবেই আসুক না কেন আধুনিক সংশোধনবাদ তাদের সাহায্য করতে যত কুৎসিত জালই বিছাক না কেন, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির দিন ঘনিয়ে এসেছে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারার উজ্জল সূর্যালোক সব অন্ধকারকে ধুয়ে মুছে নিঃশেষ করে দেবে। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে তাহলে কি এই যুগে আংশিক দাবীর ভিত্তিতে কৃষকের কোন গণ-আন্দোলন করার দরকার নেই? নিশ্চয়ই আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ ভারতবর্ষ বিরাট দেশ এবং কৃষকও বহু শ্রেণীতে বিভক্ত। কাজেই রাজনৈতিক চেতনার মান সব এলাকার এবং সব শ্রেণীর মধ্যে একই স্তরে থাকতে পারে না, তাই আংশিক দাবীর ভিত্তিতে কৃষকের গণআন্দোলনের সুযোগ ও সম্ভাবনা সব সময়েই থাকবে এবং কমিউনিস্টদের সেই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার সব সময়েই করতে হবে। আংশিক দাবীর আন্দোলন আমরা কি কৌশলে পরিচালিত করবো এবং কিইবা তার লক্ষ্য? আমাদের কৌশলের মূল কথা হল ব্যাপক কৃষকশ্রেণীর জমায়েত হচ্ছে কিনা এবং আমাদের মূল লক্ষ্য হবে কৃষকের শ্রেণী-চেতনা বাড়লো কিনা-ব্যাপক কৃষক সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে এগিয়ে গেল কিনা। আংশিক দাবীর ভিত্তিতে আন্দোলন শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্র করে তুলবে। ব্যাপক জনতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াবে। ব্যাপক কৃষক জনতা ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ হবে, সংগ্রাম ছড়িয়ে পরবে নতুন নতুন এলাকায়। আংশিক দাবীর আন্দোলনের ধরণ যেকোন রূপ হতে পারে কিন্তু কমিউনিস্টরা সব সময়ে উন্নত ধরণের সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা কৃষক সাধারণের মধ্যে প্রচার করবে। কোন অবস্থাতেই যে ধরণ কৃষকদের দ্বারা গৃহীত হল তাকেই সেরা বলে চালাবার চেষ্টা করবেন না। আসলে কমিউনিস্টরা সব সময়েই কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতি অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি আর বন্দুক সংগ্রহ অভিযান চালানোর প্রচার চালাবে। এই প্রচার চালানো সত্ত্বেও কৃষক হয়তো গণ-ডেপুটেশনের সিদ্ধান্ত নেবে এবং আমাদের সেই আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। শ্বেত সন্ত্রাসের যুগে এই গণ-ডেপুটেশনের কার্যকারিতা কোন ক্রমেই ছোট করে দেখলে চলবে না, কারণ এই ডেপুটেশনগুলোই সংগ্রামে বেশী করে কৃষককে টেনে আনবে। অর্থনৈতিক দাবীর আন্দোলন কোন সময়েই অন্যায় নয় তবে অর্থনৈতিক কায়দায় এই আন্দোলনকে পরিচালনা করা অপরাধ। আর অপরাধ এই প্রচার চালানো যে অর্থনৈতিক দাবীর আন্দোলন নিজের থেকেই রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপ নেবে কারণ এটা হল স্বতঃস্ফূর্ততার পূজা করা। এর কোনটাই জনতাকে পথ দেখাতে পারে না, দৃষ্টিভঙ্গীর স্বচ্ছতা আসে না, সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করে না। সংগ্রামের একটি স্তরে একটি মাত্র কাজ থাকে। সেই কাজটি না করলে সংগ্রাম উন্নত স্তরে যাবে না। সেই বিশেষ কাজ আজকের যুগে সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি ও বন্দুক সংগ্রহ অভিযান। এ কাজটি বাদ দিয়ে অন্য যা কিছুই করিনা কেন সংগ্রাম উচ্চস্তরে যাবে না, সংগ্রাম ভেঙ্গে যাবে, সংগঠন গড়ে উঠবে না। ঠিক তেমনি ভারতবর্ষের বিপ্লবের একটি মাত্র পথই আছে যে পথ লেনিন দেখিয়েছিলেন-জনতার সশস্ত্র বাহিনী ও রিপাবলিক গঠন। ১৯০৫ সালে লেনিন বলেছিলেন যে সারা রুশদেশে সম্ভব না হলেও যেখানে সম্ভব সেখানেই এ’দুটি গড়ে তোল। চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ, লেনিন নির্দ্দেশিত এই পথকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন, জনযুদ্ধের কৌশল শিখিয়েছেন এবং এই পথে চীনের মুক্তি সাধিত হয়েছে। সেই পথ আজ ভিয়েৎনাম-এ, থাইল্যান্ড, মালয়ে, ফিলিপাইনে, বর্মায়, ইন্দোনেশিয়ায়, ইয়েমেনে, লিওপোল্ডভিলে, কঙ্গোতে, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। সেই পথ ভারতবর্ষেও নিয়েছে নাগা, মিজো, কাশ্মীর এলাকার জনতা-জনতার সশস্ত্র বাহিনী আর মুক্তিফ্রণ্টের শাসন ব্যবস্থার পথ। তাই শ্রমিক শ্রেণীকে আজ ডাক দিয়ে বলতে হবে যে, ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হবে শ্রমিকশ্রেণীকে এবং এ কাজ করতে হবে শ্রমিকশ্রেণীকে তার প্রধান মিত্র কৃষকশ্রেণীর সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে। তাই কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করার সংগ্রামকে সশস্ত্র সংগ্রামের স্তরে তোলার দায়িত্ব তার। শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী অংশকে যেতে হবে গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে। এই কাজ শ্রমিক শ্রেণীর প্রধান কাজ। অস্ত্র সংগ্রহ করা এবং গ্রামাঞ্চলে সংগ্রামের ঘাঁটি তৈয়ার করা-এরই নাম শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি, এই রাজনীতি দিয়ে আমাদের শ্রমিকশ্রেণীকে-উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়নে সমস্ত শ্রমিককে সংগঠিত কর-এ আওয়াজ শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক চেতনা বাড়ায় না। এর অর্থ অবশ্যই এ রকম নয় যে আমরা আর ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠিত করবো না। এর অর্থ পার্টির বিপ্লবী কর্মীদের আমরা নিশ্চিয়ই ট্রেড ইউনিয়নের কাজে আটকে রাখব না, -তাদের কাজ হবে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলন চালানো অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি ও বন্দুক সংগ্রহ অভিযান চালানোর রাজনীতি প্রচার করা ও পার্টি সংগঠন গড়ে তোলা। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও আমাদের রাজনৈতিক প্রচার চালানোর প্রথম কাজ কৃষক সংগ্রামের তাৎপর্য প্রচার করা। অর্থাৎ পার্টির সব ফ্রণ্টেই দায়িত্ব হচ্ছে কৃষক সংগ্রামের গুরুত্ব বোঝানো এবং সেই সংগ্রামের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানানো। এ কাজ যতখানি আমরা করতে পারবো ততখানি আমরা গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সচেতন নেতৃত্বের স্তরে গিয়ে পৌছাব। পার্টির এই মূল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পথের বিরোধীতা আসছে শুধু সংশোধনবাদীদের কাছ থেকেই নয়। সংশোধনবাদীরা সোজাসুজি শ্রেণী সহযোগিতার পথ নিচ্ছে সুতরাং তার মুখোশ খুলে ধরা সহজ। কিন্তু আর এক ধরণের বিরোধীতা আছে পার্টির মধ্যে, যাকে বলা হয় গোড়ামিবাদ (ফড়মসধঃরংস). এরা বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন, স্বীকার করেন যে, বিপ্লব একমাত্র সশস্ত্র সংগ্রামের মারফতই হতে পারে। তারা স্বপ্ন দেখেন যে সারা ভারতব্যাপী গণআন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটিয়েই কেবল সশস্ত্র বিপ্লবের পথে যাওয়া যায়। তার আগে ছোট্টখাট এম কি বড় রকমের সংঘর্ষ ঘটতে পারে, কিন্তু ক্ষমতা দখল সম্ভব নয়। ক্ষমতা দখল সম্বন্ধে তাঁরা অক্টোবর বিপ্লবের একটা সংস্করণ ভারতবর্ষে ঘটবে এ রকম আশা করেন। অক্টোবর বিপ্লব কি করে সফল হল, সে সম্বন্ধে তাঁদের পুঁথিগত বিদ্যা তাঁরা ঠিক একইভাবে ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। এরা ভুলে যান যে অক্টোবর বিপ্লবের আগে ফেব্রুয়ারী বিপ্লব ঘটেছিল এবং বুর্জোয়া পার্টিগুলি ক্ষমতায় গিয়েছিল এবং শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের সোভিয়েতের হাতেও ক্ষমতা ছিল। এই দ্বৈত ক্ষমতা থাকার ফলে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব সোভিয়েতগুলির মধ্যে কার্যকরী হয়েছিলো এবং এই সোভিয়েতগুলির মধ্যে যখন পোর্টি-বুর্জোয়া পার্টিগুলো ধনিকশ্রেণীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিল তখনই শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে অক্টোবর বিপ্লব করা সম্ভব হল।

এঁরা ভারতবর্ষের বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করেন না, ভারতবর্ষে যে সংগ্রামগুলো হচ্ছে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন না। রুশ-বিপ্লবের সাফল্যের প্রধান কারণ ছিল যুক্তফ্রণ্টের কৌশলকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করার মধ্যে। যুক্তফ্রণ্টের কৌশলের প্রশ্ন ভারতবর্ষেও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ভারতের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কৌশল এর থেকে অন্য রূপ হবে। ভারতবর্ষেও নাগা, মিজো, কাশ্মীর প্রভৃতি এলাকায় পোর্টি-বুর্জোয়া নেতৃত্বে সংগ্রাম হচ্ছে। কাজেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে এদের সাথে যুক্তফ্রণ্ট করেই শ্রমিকশ্রেণীকে এগোতে হবে। এবং আরও অনেক নতুন এলাকায় বুর্জোয়া বা পোর্টি-বুর্জোয়া পার্টিগুলোর নেতৃত্বে সংগ্রাম শুরু হবে। তাদের সাথেও শ্রমিকশ্রেণী অবশ্য মৈত্রী করবে এবং এই মৈত্রীর প্রধান ভিত্তি হবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। এই অধিকার অবশ্যই শ্রমিকশ্রেণী মেনে থাকে, বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার সহ।

অক্টোবর বিপ্লবের পথে ভারতে যাঁরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন তাঁরা বিপ্লবী হলেও পুঁথিগত (doctrinaire) দৃষ্টিভঙ্গী থাকায় এঁরা বলিষ্ঠভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেন না। কৃষক সংগ্রামের তাৎপর্য বোঝেন না ফলে শ্রমিকদের মধ্যে অজ্ঞাতসারেই অর্থনীতিবাদের প্রচারক হয়ে ওঠেন। তাঁরা চেয়ারম্যান মাও-এর শিক্ষাকে গ্রহণ করতে পারেন না। পারেন না এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনসাধারণের বিপ্লবী সংগ্রামের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে। তাদেরই একটা অংশ চে গুয়েভারার ভক্ত হয়ে পড়েন এবং ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান শক্তি কৃষকশ্রেণীকে সংগঠিত করার কাজে জোর দেন না। ফলে অনিবার্যভাবে বামপন্থী বিচ্যুতির শিকার হয়ে পড়েন। কাজেই আমাদের এদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে এবং ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা মারফৎ শিক্ষিত করে তুলতে হবে। এদের সম্বন্ধে কোনক্রমেই অসহিষ্ণু হলে চলবে না। এ ছাড়াও আরও একদল বিপ্লবী কমরেড আছেন আমাদের মধ্যে যারা চীনের পার্টি ও মহান নেতা মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারাকে মানেন এবং সেই পথেই একমাত্র পথ সেটাও স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁরা হবে ……….. এই বইটিকে আত্মোন্নতির একমাত্র সোপান হিসাবে দেখেন। তার ফলে এক গুরুতর বিচ্যুতির মধ্যে গিয়ে পড়েন। আত্মোন্নতির একমাত্র মার্কসবাদী পথ যা লেনিন এবং চেয়ারম্যান মাও শিখিয়েছেন সেটা হল শ্রেণী সংগ্রামের পথ। একমাত্র শ্রেণীসংগ্রামের আগুনে পুড়েই কমিউনিস্ট খাঁটি সোনা হতে পারে। শ্রেণী সংগ্রামই হচ্ছে কমিউনিস্টদের সত্যকার স্কুল এবং শ্রেণী-সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারার আলোকে যাচাই করতে হবে এবং শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তাই পার্টি শিক্ষার মূল কথা হল মার্কসবাদ-লেনিনবাদের শিক্ষাকে শ্রেণী-সংগ্রামের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে আবার জনসাধারণের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। একেই বলে জনসাধারণের কাছ থেকে শিখে আবার তা নিয়ে জনগণের মধ্যে যাওয়া (From the people of the people). পার্টি শিক্ষার মূল কথা হল এই। এইসব বিপ্লবী কমরেডরা পার্টি শিক্ষার এই মূল সত্যকে উপলব্ধি করতে পারেন না। ফলে পার্টি শিক্ষা সম্বন্ধে ভাববাদী বিচ্যুতি করেন। চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ আমাদের শিখিয়েছেন যে, প্রয়োগ ছাড়া কোন শিক্ষা হতে পারে না। তাঁর ভাষায় কাজ করাই শিক্ষা (doing is learning)। বিপ্লবী প্রয়োগের দ্বারা পরিস্থিতির পরিবর্তনের ভিতর দিয়েই একমাত্র আত্মোন্নতি ঘটতে পারে।

দুনিয়ার বিপ্লবীরা এক হও॥

শ্রমিক-কৃষকের বিপ্লবী ঐক্য জিন্দাবাদ॥

চেয়ারম্যান মাও সেতুং জিন্দাবাদ॥


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৭ নং দলিল)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৭ নং দলিল)

সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সশস্ত্র পার্টিজান সংগ্রাম গড়ে তুলুন

গত দুই বৎসর ধরে মধ্যবিত্তশ্রেণী যুব ছাত্রদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। শুরুতে যদিও খাদ্যের দাবীই প্রধান ছিল কিন্তু ক্রমশ:ই কংগ্রেস সরকারের উচ্ছেদের দাবীই প্রধান হয়ে উঠেছে। চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, “মধ্যবিত্ত ছাত্র এবং যুবকেরা জনতারই অংশ এবং তাদের সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতিতে শ্রমিক এবং কৃষকের সংগ্রাম উত্তাল হয়ে উঠবে।” তাই ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়ের সংগ্রাম শেষ হতে না হতেই বিহারে কৃষকের সংগ্রাম শুরু হয়েছে। শয়ে শয়ে কৃষক ক্ষেতের ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে, জমির মালিকদের সঞ্চিত ফসল দখল করে নিচ্ছে। এই সংগ্রাম দিনের পর দিন বাড়ছে বই কমছে না। এই সংগ্রাম আগামী দিনে পশ্চিম বাংলার এবং অন্যান্য প্রদেশে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। সরকার বিক্ষুদ্ধ কৃষককে দমন করার জন্য হিংস্র দমননীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, অত্যাচার হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হতে বাধ্য। তাই আমরা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ দেখেছি ছাত্র এবং যুব আন্দোলনের মধ্যে। প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে বিহারের কৃষকরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। সরকারী মুখপাত্ররা বার বার ঘোষণা করছে যে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় তারা আরও দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করবে। সুতরাং বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণী ও পার্টির সামনে আজ সচেতনভাবে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলার দায়িত্ব এসেছে।

এই যুগ সক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনের যুগ। সক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন বিপ্লবী জনতার বিপ্লবী প্রতিভার মুখ খুলে দেবে। সারা ভারতে বিপ্লবের জোয়ার ছড়িয়ে দেবে। কাজেই এই যুগে বিপ্লবী কর্মীদের আইনানুগ ট্রেড ইউনিয়ন বা কৃষক সভার আন্দোলন আজকের বিপ্লবী জোয়ারের যুগের প্রধান সহায়ক শক্তি হতে পারে না। এর থেকে এ রকম সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না যে ট্রেড ইউনিয়ন বা কৃষক সভা জনসাধারণের সাথে ঐক্য গড়ে তোলার সংগঠন। এই ঐক্য সুদৃঢ় হবে তখনই যখন মার্কসবাদী লেনিনবাদী কর্মীরা, বিপ্লবী প্রতিরোধ আন্দোলনের কৌশল দিয়ে শ্রমিক এবং কৃষক জনসাধারণের মধ্যে বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার কাজে এগিয়ে যাবে। কৃষক সংগ্রামের সামনে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণী ও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কর্মীদের কৃষক সংগ্রামের মাধ্যমে। ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার জনসাধারণকে হত্যা করার কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা হত্যা করছে অনাহার দিয়ে, বন্দুকের গুলি দিয়ে। চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, এটাই তাদের শ্রেণীচরিত্র, পরাজিত হওয়ার ঝুকি নিয়েও জনতার উপর আক্রমণ চালাবে।

এই নির্বিচারে হত্যার সামনে কিছু নেতা আছেন যারা ভয় পান, আড়াল খোঁজেন। তাদের সম্পর্কে চেয়ারমান মাও বলেছেন -তারা ভীরু এবং বিপ্লবী নেতৃত্বের অযোগ্য আর একদল আছেন যারা নির্ভয়ে মৃত্যুর মোকাবিলা করেন, প্রত্যেকটি হত্যার বদলা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরাই বিপ্লবী, এরাই জনতাকে পথ দেখাতে সক্ষম।

আপাদ দৃষ্টিতে সরকারকে শক্তিশালী বলে মনে হয় কারণ তার হাতে খাদ্য এবং তার হাতে অস্ত্র। জনতার হাতে খাদ্য নাই তারা নিরস্ত্র, কিন্তু এই নিরস্ত্র জনতার ঐক্য ও দৃঢ় মনোবলই প্রতিক্রিয়ার সমস্ত দম্ভকে চূর্ণ করে বিপ্লব জয়যুক্ত করে। তাই চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, প্রতিক্রিয়াশীল চক্র আসলে কাগুজে বাঘ। আজকের যুগে আমাদের কাজ প্রধান তিনটি আওয়াজের ভিত্তিতে হবে।

প্রথমত: শ্রমিক কৃষকের ঐক্য। এই ঐক্যের অর্থ এই নয় যে, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত জনসাধারণ কৃষক আন্দোলনকে কেবল নৈতিক সমর্থন জানাবেন। এই আওয়াজের অর্থ ভারতবর্ষের মত আধা উপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় কৃষক সমাজই বিপ্লবের প্রধান শক্তি, এই উপলব্ধিতে শ্রমিক কৃষকের ঐক্য গড়ে উঠতে পারে একমাত্র শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্নে তাই চেয়ারম্যান মাও বলেছেনÑগ্রামাঞ্চলের মুক্ত অঞ্চলই হচ্ছে এই শ্রমিক কৃষক ঐক্যের বাস্তব প্রয়োগ। তাই শ্রমিক এবং বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দায়িত্ব হচ্ছে এই মুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার কাজে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা। তাই মধ্যবিত্ত ছাত্র এবং যুব আন্দোলন সম্পর্কে চেয়ারম্যান মাও বলেছেন-তারা কতখানি এই আন্দোলনে সামিল হল তার দ্বারা তারা বিপ্লবী কিনা সেটা নির্দ্ধারিত হবে। যারা এই আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে না তারা বিপ্লবী নয়। যারা এই আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে না তাদের প্রতিবিপ্লবী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

দ্বিতীয়ত: বিপ্লবী প্রতিরোধ আন্দোলন। সশস্ত্র সংগ্রাম। ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার জনসাধারণের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক দাবীর সংগ্রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে। ভারতবর্ষে সা¤্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের শোষণের লীলাক্ষেত্র বসিয়েছে এবং বৈদেশিক নীতিতে সা¤্রাজ্যবাদ ও আধুনিক শোধনবাদীদের সহযোগিতায় ভারতবর্ষে প্রতিক্রিয়াশীল ঘাঁটি করেছে। এই অসহনীয় অবস্থার বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে ও শোধনবাদী পার্টির নিস্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী মার্কসবাদীদের সশস্ত্র পার্টিজান সংগ্রাম আজ পার্টির প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকটি পার্টি সভ্য এবং বিপ্লবী কর্মীকে এই রণকৌশল আয়ত্ব করতেই হবে, প্রয়োগ করতে শিখতেই হবে এবং জনসাধারণের মধ্যে প্রচার মারফৎ জনসাধারণের সংগ্রামী মনোবল দৃঢ় করে তুলতে হবে। সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতিকে জনসাধারণের মধ্যে প্রচারের মাধ্যমে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতিকে জনসাধারণের মধ্যে প্রচারের মাধ্যমে কতখানি জনপ্রিয় করে তুলতে পারা যায় তারই উপর সংগ্রামের সাফল্য নির্ভর করছে।

তৃতীয়ত: বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলা। বর্তমান ভারতবর্ষের এই বিপ্লবী অবস্থায় নেতৃত্ব দেওয়ার পক্ষে আমাদের পার্টি সংগঠন উপযুক্ত নয়। তত্ত্বগতভাবে দৃঢ়, রাজনীতিতে স্পষ্ট এবং সংগঠনের ক্ষেত্রে গণভিত্তি ছাড়া আজকের এই বৈপ্লবিক যুগে নেতৃত্ব দেওয়া অসম্ভব।

১। তত্বগত প্রশ্ন-মনে রাখতে হবে যে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি নেতৃত্ব এক শোধনবাদী নেতৃত্বের হাতে এসে পড়েছে। ফলে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টিতে শোধনবাদী প্রভাব এসে পড়েছে। আমাদের দেশেও এই শোধনবাদী প্রভাব অনুভূত হওয়ার ফলেই আলাদা পার্টি গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়ে পড়েছিল এবং তারই ফলে সপ্তম কংগ্রেসে আলাদা পার্টি গড়ে ওঠে। আলাদা পার্টি গড়ে ওঠার অর্থ এই নয় যে শোধনবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে। শোধনবাদ-সা¤্রাজ্যবাদ, সামন্ততন্ত্র এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা মুখে বলে কিন্তু কাজে এই শক্তিগুলির সহযোগিতার পথকেই প্রশস্ত করে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ দৃঢ়ভাবে এই শক্তিগুলোকে বিরোধিতা করে। এদের প্রত্যেকটি আক্রমণের বদলা নেয় এবং দীর্ঘস্থায়ী কঠিন সংগ্রামের কথা মুখে বলে কিন্তু কাজে এই শক্তিগুলির সহযোগিতার পথকেই প্রশস্ত করে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ দৃঢ়ভাবে এই শক্তিগুলোকে বিরোধিতা করে। এদের প্রত্যেকটি আক্রমণের বদলা নেয় এবং দীর্ঘস্থায়ী কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জনসাধারণকে জমায়েত করে এই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলিকে ধ্বংস করে। পুরাতন ধ্যান ধারণাগুলি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়: (ক) আন্তর্জাতিক শোধনবাদীদের বিরুদ্ধে মহান চীনা পার্টির নেতৃত্বকে স্বীকার না করা। (খ) নতুন বিকাশমান শক্তিকে স্বীকার না করা। (গ) শ্রমিকশ্রেণীকে এই নতুন উপলব্ধিতে সচেতন না করা। (ঘ) শ্রমিক শ্রেণীর যে প্রধান মিত্র কৃষক তার সংগ্রামে সাহায্য না করা।

২। রাজনীতি জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এই মুহুর্তের কাজ হিসাবে দেখতে হবে। চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, “কোন মুমূর্ষ শ্রেণী সহজে ক্ষমতা ছেড়ে দেয় না এবং মাপ্র বন্দুকের নলের ভেতর থেকেই স্বাধীনতা আসে।” তাই আমাদের রাজনীতিতে প্রধান অংশ হবে ক্ষমতা দখলের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম। এই সশস্ত্র সংগ্রাম সাধারণ মানুষ স্বত:স্ফূর্তভাবে শুরু করেছে। আমাদের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হবে এই সংগ্রামকে সচেতনভাবে গণভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা। মূল তিনটি কথা হল (ক) শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষকের ঐক্য। (খ) সশস্ত্র সংগ্রামকে সচেতনভাবে গণভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা এবং (গ) কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। এই কাজের কোন একটিকে বাদ দিয়ে দেওয়া চলবে না। এই রাজনীতি জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে।

সাংগঠনিক- সাংগঠনিকভাবে পার্টির গণভিত্তি বাড়াতে হবে। গত কয়েক বৎসর ধরে আমরা দেখেছি বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের সময় হাজার হাজার জঙ্গী কর্মী সংগঠনের কাজে নেমে আসে সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আন্দোলন থেমে যাওয়ার সাথে সাথে তারা আবার নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। আজকে অভ্যূত্থানের যুগে বহু পিছিয়ে পড়া এলাকার মানুষ সংগ্রামের পথে এগিয়ে আসছে এবং সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বহু যুবক [জঙ্গী] কর্মী সংগঠনের কাজে নামছে। আমাদের বিপ্লবী তত্ত্ব ও রাজনীতি দিয়ে এই কর্মীদের শিক্ষিত করে তুললেই পার্টি তার গণভিত্তি পাবে। বলিষ্ঠভাবে আমাদের এইসব কর্মী সংগ্রহ এবং তাদের গোপন সংগঠন [গ্রুপ] গঠন করার কাজে নামতে হবে। এই কর্মী গ্রুপ রাজনৈতিক প্রচারের ব্যাপারে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের ইউনিট হিসাবে কাজ করবে। এই গ্রুপ তৈরীর কাজ কত বেশী সংখ্যায় শ্রমিক এবং কৃষকের মধ্যে করতে পারছি তারই উপরে পার্টির আঘাত হানবার ক্ষমতা নির্ভর করছে। কাকে কাকে নিয়ে গ্রুপ করছি এই আঘাত হানবার ক্ষমতা নির্ভর করছে। কাকে কাকে নিয়ে গ্রুপ করছি এই সাংগঠনিক খুঁটিনাটি অর্থাৎ শেল্টার, ডাম্প ইত্যাদি গোপন রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের তত্ত্ব, রাজনীতি এবং পার্টি গঠনের আওয়াজ কোনক্রমেই গোপন রাখা চলবে না। সশস্ত্র সংগ্রামের যুগে প্রত্যেকটি পার্টি ইউনিটকেই সশস্ত্র সংগ্রামের অংশীদার এবং আত্মনির্ভরশীল নেতা হতে হবে।

সাধারণ নির্বাচন আসছে। নির্বাচনের সময় বিক্ষুদ্ধ মানুষ রাজনীতি শুনতে চায় এবং শুনবে। নির্বাচনের আগে প্রত্যেকটি দল তার রাজনীতি জনসাধারণের মধ্যে প্রচারের চেষ্টা করবে। আমাদের এই নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে রাজনীতি প্রচার করতে হবে। অকংগ্রেসী গণতান্ত্রিক সরকারের ভুয়া আওয়াজে যেন আমরা বিভ্রান্ত না হই। আমাদের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের রাজনীতি অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষক ঐক্য, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং পার্টি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনীতি জনসাধারণকে মধ্যে বলিষ্ঠভাবে নিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি এ সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করি তবে কোন বামপন্থী নেতার পক্ষে আমাদের বিরোধিতা করা সম্ভব হবে না। এই সুযোগ আমাদের পুরোপুরি গ্রহণ করতে হবে।


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৬ নং দলিল)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৬ নং দলিল)

সংশোদনবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাচ্চা বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার সংগ্রামই এখানকার প্রধান কাজ

পার্টির নেতারা দীর্ঘদিন জেল খাটার পর পার্টি কংগ্রেসের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক করলেন। শোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যে পার্টি গঠিত হল, সেই পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভাবাদর্শগত প্রস্তাব গ্রহণ করে সোজাসুজি ঘোষণা করলেন, মহান চীনা পার্টি ভারত সরকার সম্বন্ধে যে সব সমালোচনা করেছে সবগুলিই ভুল। সাথে সাথেই তারা প্রস্তাবে বলেছেন, সোভিয়েত শোধনবাদী নেতৃত্বের এখন সমালোচনা চলবে না, যাতে সমাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। অর্থাৎ সোভিয়েত শোধনবাদী নেতৃত্ব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহযোগীতায় বিশ্বে প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তার মুখোশ খুলে ধরা চলবে না।

মহান চীন বিপ্লবের নেতা, কমিউনিস্ট পার্টি এবং তার নেতা কমরেড মাও সেতুঙ আজ বিশ্বের শ্রমিক এবং বিপ্লবী সংগ্রামের নেতৃত্ব করছেন। লেনিনের পর কমরেড মাও সেতুঙ আজ লেনিনের স্থান অধিকার করেছেন। সুতরাং চীনা পার্টি এবং কমরেড মাও সেতুঙ-এর বিরোধিতা করে শোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা যায় না। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা যায় না। চীনের পার্টির বিরোধিতা করে ভারতে পার্টি নেতৃত্ব মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী পথ পরিত্যাগ করেছেন, শোধনবাদকে নতুন বোতলে ঢেলে চালাবার চেষ্টা করছেন। সুতরাং পার্টি সদস্যদের আজ একথা স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে শোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এই পার্টি নেতৃত্ব আমাদের সহকর্মী তো ননই, আমাদের সহযোগীও নন।

সোভিয়েত শোধনবাদী নেতৃত্ব আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহযোগীতায় বিশ্ব প্রভুত্বের চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা আজ প্রত্যেকটি জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতি শত্রুতা করছে। বিপ্লবী পার্টিগুলিকে ভেঙ্গে শোধনবাদী নেতৃত্ব কায়েম করার চেষ্টা করছে এবং নির্লজ্জভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালালী করছে। তারা আজ প্রত্যেকটি দেশের গণমুক্তি সংগ্রামের শত্রু, বিপ্লবী সংগ্রামের শত্রু, বিপ্লবী চীনের শত্রু, এমন কি সোভিয়েত জনগণেরও শত্রু। সুতরাং এই সোভিয়েত শোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সংগ্রাম না চালিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা যায় না।

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে সোভিয়েত সংশোধনবাদী নেতৃত্ব অংশীদার নয়, একথা না বুঝলে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম পরিচালনা করা অসম্ভব। পার্টি নেতৃত্ব তো এ পথে যাচ্ছেনই না বরং বিভিন্ন লেখার মারফতে জনসাধারণকে বোঝাবার চেষ্টা করছেন, কিছু কিছু ভুল করলেও মূলত: সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ ভারত সরকারের নীতির বিরোধীতা করছেন এবং সমাজতন্ত্রের পথেই আছেন অর্থাৎ সোভিয়েত নেতৃত্ব যে ধীরে ধীরে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে একটি ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করছে এবং তারই জন্য যে সোভিয়েত-মার্কিন সহযোগীতা এই কথা সুচতুরভাবে গোপন করার চেষ্টা করছেন।

তাই গত দুই বৎসরের ভারতের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়নি। যদিও জনসন থেকে শুরু করে হামফ্রে পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সরকারের প্রতিনিধিরা বার বার ঘোষণা করেছে, চীনের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষকে তারা ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করবে। এত বড় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেন্দ্রীয় কমিটির নজরেই পড়লো না। তাই রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রস্তাবে সাম্রাজ্যবাদীর প্রতি আক্রমণের বিরুদ্ধে পার্টি সদস্যদের প্রতি কোন হুঁশিয়ারী নেই, বরং সমস্ত প্রস্তাবটা পড়লে মনে হয় যে, অবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি, কোন কোন অংশে কড়াকড়ি বেড়েছে; সাধারণ আন্দোলন মারফতই তার মোকাবিলা করা যায়। পার্টি নেতৃত্ব গত দুই বছরের সংগ্রামে যে নতুন বৈশিষ্ট অর্থাৎ প্রতিবিপ্লবী হিংসার বিরুদ্ধে বিপ্লবী হিংসার প্রকাশ, গণআন্দোলনের এই বিকাশোম্মুখ দিক সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নীরব। গণআন্দোলনের প্রশ্নগুলিকে এমনভাবে তারা পেশ করলেন যা থেকে সহজ সিদ্ধান্ত বেরিয়ে এলো যে আগামী নির্বাচনে আমাদের অকংগ্রেসী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য হবে। তাদের প্রস্তাবে এক জায়গাতেও এ কথা বলা হলো না যে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ এবং পরোক্ষ শাসনকে গোপন করার জন্যই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনের মারফতে ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার নিয়মতান্ত্রিকতার মোহ বিস্তার করতে চায় আর তারই আড়ালে সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশে আমাদের দেশকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রতিবিপ্লবী ঘাঁটি হিসাবে গড়ে তুলতে চায় এবং জনসাধারণের বিপ্লবী অংশের উপর হিংস্র আক্রমণ করে জনগণের প্রতিরোধকে স্তব্ধ করে দিতে চায়। ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে এই মরণোম্মুখ সাম্রাজ্যবাদ আজ কত হিংস্র হতে পারে। পার্টি নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিল এই অবস্থার মোকাবিলার জন্যই পার্টি সদস্যদের প্রস্তুত করা এবং বিপ্লবী হিংসাই (Revolutionary violence) যে একমাত্র পথ তা স্পষ্ট তুলে ধরা এবং সমগ্র পার্টিকে সেই ভিত্তিতে সংগঠিত করা। ভারতের পার্টি নেতৃত্ব এ কাজ শুধু করেননি তাই নয়, বিপ্লবী প্রতিরোধের কথা বলাও পার্টির মধ্যে বে আইনী করে দিয়েছেন।

পার্টি নেতৃত্ব বিপ্লবী প্রতিরোধ বা সশস্ত্র সংগ্রামের কথা শুনলেই হঠকারিতা বলে চীৎকার করে উঠেছেন কিন্তু সাথে সাথেই তারা মজুত, উদ্ধার, ঘেরাও লাগাতার, ধর্মঘট প্রভৃতি কথাকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু এইসব সংগ্রাম-কৌশল যে অনিবার্যভাবে দমননীতি ডেকে আনবে সেই দমননীতি প্রতিরোধ করার কোন কথা বললেই তাকে হঠকারিতা বলে অভিহিত করছেন। প্রদেশব্যাপী লাগাতার ধর্মঘট, মধ্যবিত্ত সুলভ উগ্রবামপন্থী আওয়াজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। একদিকে এই উগ্রবামপন্থী আওয়াজ অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রশ্নে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঐক্য করার আকুল আকাংখা যার অর্থ হচ্ছে বুর্জোয়াশ্রেণীর লেজুড় হয়ে চলা।

সুতরাং এই পার্টির নেতৃত্ব ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করছেন এবং তারই ফলে তারা আধুনিক শোধনবাদের সুচতুর কৌশল অর্থাৎ মুখে বিপ্লব এবং কাজে বুর্জোয়ার লেজুড়বৃত্তির পথ নিচ্ছেন। তাই বর্তমান পার্টি ব্যবস্থা ও তার গঠনতান্ত্রিক কাঠামোর ধ্বংস সাধনের মধ্য দিয়েই একমাত্র বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠতে পারে। কাজেই এই পার্টির তথাকথিত ফর্ম বা গঠণতান্ত্রিক কাঠামো মেনে চলার অর্থ মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলা এবং শোধনবাদী নেতৃত্বের সাথে সহযোগিতা করা।

সুতরাং পার্টি নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ সদস্য পর্যন্ত যারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদে বিশ্বাসী তাদের আজ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী বক্তব্য নিয়ে পার্টি সদস্যদের সামনে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে আমরা হাত দিতে পারব।

ভারতব্যাপী গণ-বিস্ফোরণের সামনে ভারত সরকার পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছেন। তার ফলে নির্বাচন পূর্ব-যুগে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সুযোগ বেড়েছে। এই যুগে সরকার প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে সংগঠিত করছে, বিপ্লবী শক্তিকেও এই আপাত গণতান্ত্রিক আবহাওয়ার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে জনতা যে রণকৌশল গ্রহণ করেছিল, তা প্রাথমিক স্তরের পার্টিজান সংগ্রাম ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই বিপ্লবী শক্তিকে সংগঠিত ভাবে সেই পার্টিজান সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে এবং ব্যাপক প্রতিবিপ্লবী আক্রমণের আগেই এই সংগ্রাম কৌশলে পার্টি সদস্যদের তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মারফতে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে। বর্তমানে পার্টির অ্যাকটিভ গ্রুপের অর্থ হচ্ছে কমব্যাট ইউনিট [সংগ্রামকারী গ্রুপ], তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলন এবং প্রতিবিপ্লবী শক্তির বিরুদ্ধে আঘাত হানা। আঘাত হানার জন্যই আঘাত হানা নয়-খতম করার জন্যই আঘাত হানা-মাও-সেতুঙের এই শিক্ষা সব সময়ে মনে রাখতে হবে। আঘাত যাদের হানতে হবে তারা প্রধানত: হবে

১। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিভূ অর্থাৎ পুলিশ বা মিলিটারী অফিসার,

২। ঘৃণিত আমলাতন্ত্র,

৩। শ্রেণী শত্রু। অস্ত্র সংগ্রহও এই আক্রমণের লক্ষ্য হবে। বর্তমান যুগে এই আক্রমণ শহর এবং গ্রামাঞ্চল সর্বক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়। আমাদের বিশেষ লক্ষ্য থাকা উচিৎ কৃষক অঞ্চলে। নির্বাচন পরবর্তী যুগে যখন প্রতিবিপ্লবী আক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করবে, তখন কৃষক অঞ্চলের উপরেই আমাদের প্রধান ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কাজেই এই যুগে আমাদের সংগঠনের সামনে এই কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে। শ্রমিক এবং বিপ্লবী মধ্যবিত্ত ক্যাডারকে গ্রামাঞ্চলে যেতেই হবে। সুতরাং শ্রমিক এবং মধ্যবিত্ত ক্যাডারের দায়িত্ববোধ জাগার সাথে সাথে তাকে গ্রামাঞ্চলে পাঠাতে হবে। গ্রাম থেকে শহরকে ঘিরে ফেলার মহান চীনের সংগ্রামী কৌশল, প্রতিবিপ্লবী আক্রমণের যুগে আমাদেরও প্রধান কৌশল হবে। প্রতিবিপ্লবী আক্রমণকে আমরা কত তাড়াতাড়ি নিস্তবদ্ধ করতে পারবো তা নির্ভর করবে কত দ্রুত আমরা জনগণের সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে পারবো। প্রথম দিকে আমরা কিছু কিছু জয়লাভ করতে পারবো সত্য, কিন্তু ব্যাপক প্রতিবিপ্লবী আক্রমণের সামনে নিছক আত্মরক্ষার তাগিদেই আমাদের প্রতি-আক্রমণ করতে হবে। এই দীর্ঘস্থায়ী, কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জনতার বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী গড়ে উঠবে-যে সৈন্যবাহিনী রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ, রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলন এবং সংঘর্ষের মারফতে দৃঢ়। এই রকম সৈন্যবাহিনী ছাড়া বিপ্লব সফল হওয়া সম্ভবপর নয়, জনসাধারণের স্বার্থরক্ষা সম্ভব নয়।

কমরেডস, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পিছনে না ছুটে আজ সংগঠিতভাবে পার্টিজান সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। সময় ছয় মাসও নেই, এর ভিতরেই আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে না পারলে সা¤্রাজ্যবাদী আক্রমণের মুখে আমাদের সংগঠিত হওয়ার দুরূহ কাজের সম্মুখীন হতে হবে।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির

মাওপন্থী কেন্দ্র

৩০শে আগস্ট ’৬৬


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৫ নং দলিল)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

 

চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ঐতিহাসিক আটটি দলিল (৫ নং দলিল)

১৯৬৫ সালে কী সম্ভাবনার নির্দেশ দিচ্ছে?

কিছু কমরেড আছেন যারা সশস্ত্র সংগ্রামের কথা শুনলে আতংকিত হয়ে ওঠেন এবং হঠকারিতার ভূত দেখতে থাকেন। তারা পার্টির ৭ম কংগ্রেসের গৃহীত প্রোগ্রাম অর্থাৎ strategic document [রণনীতিগত দলিল] গৃহীত হওয়ার সাথে সাথেই বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজ শেষ হয়েছে বলে মনে করেন। তারা পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত আন্দোলন সম্পর্কে কয়েকটি প্রস্তাব নেওয়া থেকেই এই সিদ্ধান্তে এসে পোঁছান যেন ৭ম কংগ্রেসে বিপ্লবের বর্তমান স্তর ও শ্রেণী বিন্যাস ছাড়াও এই যুগের কৌশলও নির্দ্ধারিত হয়ে গিয়েছে। তাদের কথা থেকে মনে হয় যেন শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলনই হল এই যুগের প্রধান সংগ্রাম-কৌশল। ক্রুশ্চেভের শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর কৌশল তারা প্রকাশ্যে না বললেও যা বলতে চান তাহলো প্রায় সেই কথাই। তারা বলতে চান যে, ভারতে বিপ্লবের সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই-কাজেই বর্তমানে আমাদের শান্তিপূর্ণ পথেই চলতে হবে। বিশ্বব্যাপী শোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের যুগে প্রকাশ্যভাবে তারা শোধনবাদী সিদ্ধান্তগুলো বলতে পারছেন না, কিন্তু যারাই সশস্ত্র সংঘর্ষের কথা বলছে তাদের হঠকারী, পুলিশের লোক ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করছেন। অথচ সরকার কাশ্মীরের গণ-আন্দোলনকে বাদ দিলেও কম করে ৩০০ লোককে হত্যা করেছে গত আট মাসে। বন্দীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কয়েক সহ¯্র এবং দু’একটি রাজ্য গণ-বিক্ষোভে আলোড়িত হয়ে উঠেছে। এইসব বিক্ষোভকারীদের সামনে আমরা কি কার্য্যক্রম রাখছি? কিছুই না। আর অন্যদিকে স্বপ্ন দেখছি আমাদের নেতৃত্বে সঙ্ঘবদ্ধ শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলন গড়ে উঠবে। এটা হচ্ছে শোধনবাদের এক নির্লজ্জ নিদর্শন। একথা আজও আমাদের মাথায় ঢুকছে না যে, শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলন আমরা আজকের যুগে গড়ে তুলতে পারিনা, কারণ শাসকশ্রেণী সে রকম কোন সুযোগ আমাদের দেবেনা এবং দিচ্ছেও না। ট্রাম ভাড়া প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে আমাদের এই শিক্ষাই নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে শিক্ষা আমরা গ্রহণ করছি না, আমরা সত্যাগ্রহ আন্দোলন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। বুঝছি না যে এ যুগে এই সত্যাগ্রহ আন্দোলন ব্যর্থ হতে বাধ্য। তার মানে এই নয় যে সত্যাগ্রহ আন্দোলন এ যুগে একেবারেই অচল। সব যুগেই সব রকম আন্দোলন চালাতে হয় কিন্তু প্রধান আন্দোলনের ধরণ নির্ভর করে শাসকশ্রেণীর উপর। আমাদের যুগে বর্তমান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে সরকার প্রতিটি আন্দোলনের মোকাবিলা করছে হিংস্র আক্রমণ করে। কাজেই জনসাধারণের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের। তাই আজ গণ-আন্দোলনের স্বার্থে শ্রমিকশ্রেণী, সংগ্রামী কৃষকশ্রেণী ও প্রত্যেকটি সংগ্রামী জনসাধারণকে আহ্বান জানাতে- ১। হবে সশস্ত্র হও। ২। সংঘর্ষের জন্য সশস্ত্র ইউনিট তৈরী কর। ৩। প্রত্যেকটি সশস্ত্র ইউনিটকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত কর। এই আওয়াজ না দেওয়ার অর্থ নিরস্ত্র জনতাকে নির্বিচারে হত্যার মুখে ঠেলে দেওয়া।

শাসকশ্রেণী তাই চায়, কারণ এই ভাবেই তারা সংগ্রামী জনতার মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারবে। বিক্ষুদ্ধ জনতা আজ আক্রমণ করে রেলওয়ে, ষ্টেশন, থানা ইত্যাদি। অজস্র বিক্ষোভ ফেটে পড়ে সরকারী বাড়ীগুলির উপর, নয়তো বাস, ট্রাম বা ট্রেনের উপর। এ যেন সেই লুডাইটদের বিক্ষোভ, যন্ত্রের বিরুদ্ধে। বিপ্লবীদের সচেতন নেতৃত্ব দিতে হবে। আঘাত হান ঘৃণিত আমলাদের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মচারীর বিরুদ্ধে, মিলিটারী অফিসারদের বিরুদ্ধে। জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে- দমননীতি থানা করেনা করে থানার দারোগাবাবু, আক্রমণ পরিচালনা করে সরকারী বাড়ী বা যানবাহন নয়, সরকারী দমনযন্ত্রের মানুষ এবং সেই মানুষের বিরুদ্ধেই আমাদের আক্রমণ। শ্রমিকশ্রেণী ও বিপ্লবী জনতাকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে যে, শুধু আঘাত করার জন্য আঘাত করোনা, যাকে আঘাত করবে তাকে শেষ করবে। কারণ শুধু আঘাত করলে প্রতিক্রিয়া বিভাগ প্রতিশোধ নেবে, কিন্তু খতম করলে সরকারী দমনযন্ত্রের প্রত্যেকটি মানুষ আতংকিত হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে কমরেড মাও-সেতুঙ-এর শিক্ষা: শত্রুর অস্ত্রাগার আমাদের অস্ত্রাগার। সেই অস্ত্রাগার গড়ে তোলার জন্য শ্রমিকশ্রেণীকে অগ্রণী হতে হবে, নেতৃত্ব দিতে হবে গ্রামের কৃষককে। আর এই সশস্ত্র ইউনিটগুলিই ভবিষ্যৎ গেরিলা বাহিনীতে রূপান্তরিত হবে। এই সশস্ত্র ইউনিটগুলিকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলে তারাই গ্রামাঞ্চলে সংগ্রামের জন্য দৃঢ় জায়গা (Base area) গড়ে তুলতে পারবে। একমাত্র এই পদ্ধতিতেই আমরা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার কাজে নামতে পারব। শ্রমিকশ্রেণী ও বিপ্লবী শ্রেণীগুলির মধ্যে এই সংগ্রামী ইউনিট তৈরী করার মধ্য দিয়ে আমরা সেই বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলতে পারব যে পার্টি বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারবে এবং আগামী যুগের দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

সরকার জনসাধারণের খাদ্য সরবরাহ করতে পারছে না। কাজেই জনসাধারণ বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠছে, কাজেই ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল ধনিকশ্রেণীর স্বার্থেই ভারত সরকার পাকিস্তান আক্রমণ করছে। এই যুদ্ধের পিছনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বযুদ্ধের পরিকল্পনাও কাজ করছে। পাকিস্তান আক্রমণ করে শাসকশ্রেণী আবার বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের জোয়ার সৃষ্টি করতে চায়। কিন্তু এবার ভারতবর্ষ যে আক্রমণকারী সেটা দিবালোকের মত স্পষ্ট। কাজেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরাজয়ের ফলে দ্রুত জনসাধারণের মধ্যে সরকার বিরোধী সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠবে। কাজেই মার্কসবাদীরা আজ চায় যে ভারতীয় আক্রমণকারী সৈন্যবাহিনী পরাজিত হোক। এই পরাজয় নতুন গণবিক্ষোভ সৃষ্টি করবে। শুধু পরাজিত হোক এই কমনা করাই নয়, সাথে সাথে মার্কসবাদীদের সচেষ্ট হতে হবে যাতে এই কামনা করাই নয়, সাথে সাথে মার্কসবাদীদের সচেষ্ট হতে হবে যাতে এই পরাজয় আসন্ন হয়ে উঠে। কাশ্মীরের গণবিক্ষোভ যে পথে অগ্রসর হচ্ছে সেই পথে ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি প্রদেশে বিদ্রোহ সৃষ্টি করতে হবে।

ভারতবর্ষের শাসকশ্রেণী সাম্রাজ্যবাদী কৌশলে সংকট সমাধান করতে চাইছে। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সমাধান করার জন্য আমাদের লেনিন নির্দ্ধারিত পথে অগ্রসর হতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত কর, এ আওয়াজের তাৎপর্য আমাদের বুঝতে হবে। ভারতবর্ষে বিপ্লব অনিবার্যভাবে গৃহযুদ্ধের রূপ নেবে এই সত্য যদি আমরা বুঝতে পারি তাহলে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের কৌশলই একমাত্র কৌশল হতে পারে। চীনের মহান নেতা কমরেড মাও-সেতুঙ যে কৌশল গ্রহণ করেছিলেন সেই একই কৌশল ভারতবর্ষের মার্কসবাদীদের নিতে হবে। এই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে কৃষক দেখেছে যে সরকার দরিদ্র কৃষকদের খাদ্যের কোন দায়িত্ব নিল না বরং যখন কৃষক সাধারণ কোন আন্দোলনের পথ নিল তখনই নেমে আসল সরকারী দমনযন্ত্র, উপরন্তু পাকিস্তান আক্রমণ করে কৃষকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হলো আরো বোঝা। কাজেই দরিদ্র কৃষকদের প্রস্তুত হতে হবে আগামী বৎসরের জন্য। মাঠের ফসল হাতছাড়া হলে তাদের আগামী বছর অনাহারে মরতে হবে। কাজেই এখন প্রস্তুত হোন ফসল দখল রাখার সংগ্রাম কিভাবে করা যায়।

১। গ্রামে গ্রামে সশস্ত্র দল গঠন করুন।

২। এই দলগুলি যাতে অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারেন তার ব্যবস্থা করুন। এবং অস্ত্রশস্ত্র রাখার গোপন জায়গা ঠিক করুন।

৩। ফসল লুকিয়ে রাখার গোপন জায়গা তৈরী করুন। আমাদের গত যুগে ফসল লুকিয়ে রাখার কোন স্থায়ী বন্দোবস্ত আমরা করিনি। কাজেই বেশীর ভাগ ফসলই নষ্ট হয়েছে অথবা শত্রু কবলিত হয়েছে। কাজেই ফসল লুকিয়ে রাখার পাকা ব্যবস্থা করতে হবে- কোথায় লুকানো যায়? পৃথিবীর সব দেশেই যেখানে কৃষক লড়াই করে সেখানে ফসল লুকাতে হয়। কৃষকের পক্ষে ফসল লুকানোর জায়গা একমাত্র মাটির তলাতেই হতে পারে। প্রত্যেক এলাকায় প্রত্যেকটি কৃষককে ফসল মাটির তলায় লুকিয়ে রাখার জায়গা তৈরী করতে হবে, তা ছাড়া ফসল কোনমতেই শত্রুর হাত থেকে বাঁচানো যায় না।

৪। সশস্ত্র ইউনিট ছাড়াও কৃষকদের ছোট ছোট দল তৈরী করতে হবে, পাহারা দেওয়া ও যোগাযোগ রক্ষা প্রভৃতি কাজ করার জন্য।

৫। প্রত্যেকটি ইউনিটকে রাজনৈতিক শিক্ষা দিতে হবে এবং প্রত্যেকটি ইউনিটকে অবশ্যই রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে যে একমাত্র রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলনই এই সংগ্রামকে ব্যাপকতর করে তুলতে পারে এবং কৃষকের সংগ্রামী মনোবল বাড়াতে পারে। এখনও ফসল তোলার ২/৩ মাস দেরী আছে, এই সময়ের মধ্যে কৃষক অঞ্চলের পার্টি ইউনিটগুলোকে এই সব কাজ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি চালাতে হবে। এবং গোপন কাজ করার কৌশল আয়ত্বে আনতে হবে।

[এইটুকু লেখার পর কমরেড চারু মজুমদার ভারতরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার হন। এই লেখা যখন প্রায় শেষের মুখে তখন ভারতবর্ষের বামপন্থী রাজনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন দেখা দেয়। এই পরিবর্তনের জন্য দলিলটা একটু অন্যভাবে লিখবেন ভেবেছিলেন তবে তিনি সে সুযোগ পাননি, তবে মৌখিকভাবে তিনি যা বলেছিলেন তা হচ্ছে এই যে:] তথাকথিত যে সমস্ত মার্কসবাদী নেতা ও পত্রিকা [বামপন্থী] সরাসরিভাবে দেশরক্ষার জন্য গগণভেদী আওয়াজ তুলছেন তারা মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। এদের বিরুদ্ধে আমাদের তত্ত্বগত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে তো হবেই সাথে সাথে জঙ্গী কাজের মাধ্যমে [জঙ্গী কাজের বর্ণনা উপরে আছে] ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবীদের মধ্যে সংগ্রামের নতুন ভরসা জাগিয়ে তুলতে হবে। এবং এই একটি জায়গায় একটি অগ্নিস্ফূলিঙ্গই সমগ্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বিপ্লবের দাবানলের সৃষ্টি করবে, প্রশস্ত হবে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের পথ, আসন্ন হয়ে উঠবে ভারতের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব।

আসুন কমরেড, আগামী দিনের সশস্ত্র সংগ্রামের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমরা দৃঢ় পদক্ষেপে অগ্রসর হই।