চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে হাত দিন

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন বিপ্লব করতে হলে অবশ্যই একটি বিপ্লবী পার্টি প্রয়োজন। একটি বিপ্লবী পার্টি- যে পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী তত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী কর্মধারায় (style of work) অভ্যস্ত। এই রকম একটি পার্টি ছাড়া শ্রমিকশ্রেণী ও ব্যাপক জনতাকে সাম্রাজ্যবাদও তার অনুচরদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়।

আজকের যুগে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বোচ্চ রূপ চেয়ারম্যান মাও’ এর চিন্তাধারা। চেয়ারম্যান মাও মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সফল প্রয়োগ করেছেন। শুধু তাই নয়, মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সফল প্রয়োগ করেছেন। শুধু তাই নয়, মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং তাকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারাকে বলা যায় সাম্রাজ্যবাদের অবলুপ্তির যুগের এবং সমাজতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী বিজয়ের যুগের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ।

চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন যে একটা আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক দেশে জনতার ব্যাপক অংশ হচ্ছে কৃষক এবং এই কৃষকের উপর তিন পাহাড়ের শোষণ ও শাসন-যেমন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ততন্ত্র এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজি-চলে এবং তাই এই কৃষকশ্রেণী বিপ্লবের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী। তাই শ্রমিকশ্রেণীকে জনযুদ্ধের মারফৎ জয় হাসিল করতে হলে এই কৃষকশ্রেণীর উপর নির্ভর করতে হবে।

চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন যে এই কৃষকশ্রেণীই হচ্ছে বিপ্লবের প্রধান শক্তি এবং কৃষকশ্রেণীকে জাগ্রত এবং সশস্ত্র করার উপরই বিপ্লবের সাফল্য নির্বর করে। শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির দায়ীত্ব কৃষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থেকে গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা। এই কৃষক সমস্যার গুরুত্ব না বোঝার ফলেই পার্টির মধ্যে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি দেখা দেয়। এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লব মূলত: কৃষিবিপ্লব। তাই শ্রমিকশ্রেণীর দায়ীত্ব হচ্ছে এই কৃষিবিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কর্মধারা বলতে আমাদের চেয়ারম্যান শিখিয়েছেন, এই কর্মধারা হবে এমন যাতে বিপ্লবী তত্ব ও কর্মের মিল থাকে, জনতার সাথে গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আত্ম-সমালোচনায় অভ্যস্ত হতে হয়। এই কর্মধারা রপ্ত করতে হলে আমাদের পার্টি মূলত: গড়ে তুলতে হবে কৃষকদের মধ্যে। এবং শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে পার্টি গড়ে তুলতে হবে কৃষিবিপ্লবের রাজনীতিতে শ্রমিকশ্রেণীর কার্যক্রমের ভিত্তিতে।

এর আগেও আমরা পার্টিতে শ্রমিক ও কৃষককে পার্টি সভ্য করেছি। এমন বহু জেলা-কমিটি ছিল যেখানে শ্রমিক এবং কৃষক পার্টিসভ্য মধ্যবিত্ত পার্টিসভ্যের তুলনায় অনেক বেশী সংখ্যক ছিল। কিন্তু তবু আমাদের পার্টি বিপ্লবী পার্টি হল না কে? কারণ শ্রমিক পার্টি সভ্যদের সামনে কোন বিপ্লবী রাজনীতি ছিল না; কাজ ছিল না; তাদের মূলত: ট্রেড-ইউনিয়ন আন্দোলনেরই পরিপূরক শক্তি হিসাবে কাজ করানো হোত। ফলে তাদের স্বাধীন বিকাশের পথ রুদ্ধ হোত এবং তারা ট্রেড-ইউনিয়নে পার্টির মধ্যবিত্ত নেতার নির্দেশে পরিচালিত হোত। কৃষকদের মধ্যে যে পার্টি সভ্য ছিল সেখানেও শ্রেণী বিশ্লেষণ করা হোত না, বিপ্লবী রাজনীতির অভাবে কৃষকদের সুমহান দায়ীত্ব সম্পর্কে সজাগ করে তোলা হোত না, সংস্কারবাদী কৃষকসভা, যার নেতা প্রধানত: ধনীকৃষক ও মধ্যকৃষক এবং যাকে আইনানুগ আন্দোলনের পথে পরিচালনা করা হোত, ফলে পার্টিসভ্যদের বেশীর ভাগই হোত ধনী এবং মধ্যকৃষক, এবং আইননানুগ আন্দোলনের দরুণ সেখানেও মধ্যবিত্ত পার্টি নেতার নির্দেশ পালনই তাদের প্রধান কাজ হোত। ফলে শ্রমিক এবং কৃষক পার্টি নেতার নির্দেশ পালনই তাদের প্রধান কাজ হোত। ফলে শ্রমিক এবং কৃষক পার্টিসভ্য থাকা সত্বেও পার্টি মূলত: মধ্যবিত্তশ্রেণীর পার্টিতে পয্যবসিত হয়েছিল। তারই ফলে পার্টি একটি খাঁটি সংশোধনবাদী পার্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে। একটি সংশোধনবাদী পার্টির মতই আমাদের পার্টি ও একটি নির্বাচন থেকে আর একটি নির্বাচন পর্য্যন্ত যেসব আন্দোলন পরিচালনা করত তার লক্ষ্য থাকত পরবর্তী নির্বাচনে পর্য্যন্ত যেসব আন্দোলন পরিচালনা করত তার লক্ষ্য থাকত পরবর্তী নির্বাচনে বেশী আসন দখল। পার্টির প্রধান কেন্দ্রগুলি ছিল সমস্ত শহরে এবং শহরে আন্দোলন সৃষ্টি করাই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন কি গ্রামের কৃষককেও শহরে আনা হোত শহরের আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য। ১৯৫৯ সালের শোচনীয় অভিজ্ঞতা এই শহরকেন্দ্রিক আন্দোলনেরই কুফল। এবং সমস্ত গণ-আন্দোলনের লক্ষ্য হোত এসেমব্লি [assembly] ঘেরাও করা। পার্টিতে কোন কিছুই গোপন থাকত না, গোপনীয়তা রক্ষার প্রচেষ্টা ক্রমশ:ই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মতবিরোধও বুর্জোয়া কাগজে প্রকাশ পেত; পার্টিসভ্যদের সজাগ দৃষ্টি (vigilance) ভোঁতা করে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সমস্ত আন্দোলনকে আইনানুগ রাখার জন্য পার্টির নেতৃবৃন্দ সদাসর্বদা প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। তারা শুধু তেলেঙ্গানার সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাই নয়, যেখানেই কৃষক আন্দোলন পুলিশী দমননীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই পার্টি নেতৃত্ব এগিয়ে গিয়ে সংগ্রামের তুলে নিয়েছে- যেমন পাঞ্চাবের বেটারমেণ্ট লেভির আন্দোলন। পার্টি নেতারা পাঞ্চাবের পার্টি নেতাদের সাথে আলোচনা না করেই আন্দোলন তুলে নেন, বিহার, উত্তর প্রদেশের কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করেন; ১৯৫৯ সালের বেনামী জমির আন্দোলনের ক্ষেত্রেও দার্জিলিং জেলায় পার্টি নেতৃত্বকে উগ্রপন্থী আখ্যা দেওয়া হয়। এবং এ সমস্তই ঘটে একটি কারণে- কৃষকরা পুলিশী দমননীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চেয়েছিল বলে। প্রকাশ্য ও আইনানুগ আন্দোলনের মধ্যে প্রত্যেকটি সংগ্রামকে পার্টি নেতৃত্ব আটকে রেখেছিল। এবং পার্টি নেতাদের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল পার্টির পত্রিকা পরিচালনা। যে দেশের অধিকাংশ লোক অশিক্ষিত সে দেশে পার্টি পত্রিকা একমাত্র মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিদেরই কাজে লাগে। এই পত্রিকা মারফৎ শ্রমিক কৃষকদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা কোনমতেই সম্ভবপর নয়। তাই সপ্তম কংগ্রেস একটি বিপ্লবী পার্টির জন্ম দিল না, জন্ম দিল একটি সংশোধনবাদী পার্টির।

আজ যখন আমরা বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে হাত দিচ্ছি তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রত্যেকটি দেশে জনতার বিপ্লবী সংগ্রাম চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামী জনতার সংগ্রাম নিপীড়িত মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এমন কি আমাদের দেশেও নকশালবাড়ী, উত্তর-প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেপ ইত্যদি বিভিন্ন এলাকার কৃষকের বিপুল বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতবর্ষেও চেয়ারম্যান নির্দেশিত মুক্ত অঞ্চল গড়ার কাজে কৃষকশ্রেণী হাত লাগিয়েছে। এই যুগে বিপ্লবী পার্টি গড়ার পক্ষে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার এবং প্রসার করাই একমাত্র কাজ নয়, আজকের বিপ্লবী পার্টিকে চেয়ারম্যানের কর্মধারা আয়ত্ব করতে হবে। তবেই তাকে আমরা বিপ্লবী পার্টি বলতে পারবো।

আজকের ভারতবর্ষে বিপ্লবী তত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয় ঘটাতে হবে, পার্টিকে এখনই গ্রামাঞ্চল কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তুলতে হবে। তাই তত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয় সাধন করতে হলে কৃষকশ্রেণীর শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক, যারা কৃষিবিপ্লবের প্রধান শক্তি, তাদেরই মধ্যে পার্টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জনতার সাথে গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এই ভূমিহীন এবং দরিদ্র কৃষকের পার্টি ইউনিটগুলিকে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার ও প্রসার মারফৎ ব্যাপক কৃষক জনসাধারণের শ্রেণীসংগ্রাম সংগঠিত করতে হবে।

এই শ্রেণী সংগ্রাম সৃষ্টি করতে পারলেই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের এই পার্টি ইউনিটগুলি গেরিলা ইউনিটে রূপান্তরিত হবে। এইসব গেরিলা ইউনিটকে রাজনীতি প্রচার ও প্রসার ও এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মারফৎ পার্টির গণভিত্তিকে আরও ব্যাপক ও দৃঢ় করতে হবে। এইভাবেই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মারফৎ জনতার স্থীয় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠবে এবং সংগ্রাম জনযুদ্ধের রূপ নেবে। এই দুরূহ কাজ করা যায় একমাত্র সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার হাতিয়ারকে সঠিকভাবে প্রয়োগ মারফৎ। বিপ্লবের স্বার্থে আমরা একত্রিত হয়েছি। কাজেই সমালোচনা আমাদের ভয় করলে চলবে না এবং আত্মসমালোচনায় পরাংমুখ হলে আমরা আমাদের ভয় করলে চলবে না এবং আত্মসমালোচনায় পরাংমুখ হলে আমরা আমাদের গুণগত পরিবর্তন সাধন করতে পারবো না, বিপ্লবী কমিউনিস্ট হিসাবে আমাদের যে দায়িত্ব সে দায়িত্ব পালন করতেও অসমর্থ হবো। এই কর্মধারায় অভ্যস্ত হলে যে নতুন বিপ্লবী পার্টি জন্ম নেবে সেই পার্টি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের উপর নিশ্চয়ই নির্ভরশীল থাকবে না। শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে অবিরাম কৃষি বিপ্লবের রাজনীতি-চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। তার ফলে শ্রমিক শ্রেণীর যে অগ্রণী অংশ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা ও তাঁর কর্মধারায় অভ্যস্ত হবে তাকে সক্রিয়ভাবে কৃষি বিপ্লব সংগঠিত করবার জন্যে গ্রামাঞ্চলে পাঠাতে হবে এবং এভাবেই কৃষিবিপ্লবের উপর শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব কার্যকরী রূপ নেবে। তাই চেয়ারম্যান বলেছেন, বিপ্লবী পার্টি হবে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী এবং উদ্যোগী অংশকে নিয়ে।

এই বিপ্লবী পার্টি যেমন নির্বাচনী পার্টি হবে না, তেমনি শহরকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠবে না। বিপ্লবী পার্টি কখনই প্রকাশ্য পার্টি হতে পারে না এবং কাগজ বের করাটাই তার প্রধান কাজ হতে পারে না এবং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারে না। বিপ্লবী পার্টিকে হতে হবে শ্রমিক এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের উপর নির্ভরশীল; গ্রামকে কেন্দ্র করে কৃষক সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে, গোপন সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে প্রতিবিপ্লবী আক্রমণের সামনে পার্টি অসহায় হয়ে পড়বে। বিপ্লবী পার্টি আমরা তাকেই বলবো যে পার্টি গ্রামাঞ্চলে কৃষকের বিপ্লবী সংগ্রাম সংগঠিত করতে পারবে। এই রকম একটা পার্টি গড়ার জন্য আজ সমস্ত বিপ্লবীদের সক্রিয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এই বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবিরা নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারেন, কারণ তাঁদের পড়াশুনা আছে এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও তাঁরা শ্রমিক ও কৃষকদের জানাতে পারেন। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা তাঁরা যতখানি বুঝেছেন ততখানি তাঁরা কৃষক ও শ্রমিকদের দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা শ্রমিক এবং কৃষক পার্টি-ইউনিটগুলির স্বাধীন বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ান এবং তাদের উদ্যোগ বাড়াতে চেষ্টা করেন না। তাই বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে মনে রাখতে হবে চেয়ারম্যানের এই শিক্ষা- “জনগণই প্রকৃত বীর, -আমরা নিজেরা প্রায়ই ছেলে মানুষ ও অজ্ঞ, এবং একথা না বুঝলে একেবারে প্রাথমিক জ্ঞানটুকু পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব নয়।”

কমরেডস, চেকোশ্লোভাকিয়ার ঘটনা সোভিয়েত সংশোধনবাদের ফ্যাসিবাদী রূপ নগ্নভাবে তুলে ধরেছে। বিশ্বাসঘাতক ডাঙ্গেচক্র ও নয়া-সংশোধনবাদীচক্র যে সেই সোভিয়েতেরই হাতের পুতুল এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চেকোশ্লোভাকিয়ার ঘটনায়। তার ফলে সংশোধনবাদী প্রচার ভোঁতা হয়ে পড়তে বাধ্য। ভারতবর্ষ আজ সোভিয়েত-মার্কিন নয়া-উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের সাহায্যে ভারতবর্ষকে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবিপ্লবী কেন্দ্র করেছে। এই অবস্থায় সোভিয়েত সংশোধনবাদের মুখোশ যত তাড়াতাড়ি খুলবে ততই সারা ভারতবর্ষে বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রাম ও প্রতিরোধের জোয়ার আসবে এবং দেশের ভেতরে কৃষক বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠবে। এই সময় কত দ্রুত আমরা আমাদের শ্রেণীগুলির মধ্যে পার্টি সংগঠন গড়ে তুলতে পারছি তারই উপর বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তারই উপর নির্ভর করছে এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব আমরা দিতে পারি কি না। হয়তো আগামী ফসল দখলের আন্দোলনে এই বিপ্লবী জোয়ারের প্রকাশ হতে পারে। সুতরাং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা শ্রমিক ও কৃষকশ্রেণীর মধ্যে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা প্রচার ও প্রসারের মারফতে বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে আসবেন।

শারদীয়া দেশব্রতী, ১৯৬৮

Advertisements

চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: কমরেডদের প্রতি

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

ব্যাপক কৃষক সাধারণ থেকে বিচ্ছিন্নতা বিপ্লবীদের পক্ষে একটা মারাত্মক রাজনৈতিক দুর্বলতা; সংগ্রামের প্রতিটি স্তরে এই বিপদ থাকে, তাই গেরিলা যুদ্ধের কৌশল বলতে গিয়ে চেয়ারম্যান বলেছেন, “জনগণকে জাগিয়ে তোলার জন্য তোমাদের শক্তিকে তোমরা ভাগ করে দাও, শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য তোমাদের শক্তিকে একত্র জড়ো করো (Divide your forces to arouse the masses, concentrate your forces to deal with the enemy)- এটাই হোল প্রথম সূত্র। এই জনগণকে জাগিয়ে তোলা (arousing the masses) কোনদিন সম্পূর্ণ হয় না। দ্বিতীয় যে শিক্ষা তা হোল, গেরিলা যুদ্ধ মূলত: শ্রেণী সংগ্রামের উন্নত স্তর এবং শ্রেণী সংগ্রাম অর্থনীতিক ও রাজনীতিক দুটি সংগ্রামের যোগফল। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা যতই নির্দ্দিষ্টভাবে বুঝবার চেষ্টা করছি ততই নতুন নতুন শিক্ষা হচ্ছে। এ রকম শিক্ষা প্রত্যেক অঞ্চলেই হবে এবং তবেই আমাদের উপলব্ধি বাড়বে। আমরা আরও ভাল মার্কসবাদী হবো। সমস্ত কমরেডই যে এ কথা সঠিক বুঝেছেন এখনই সে কথা বলা যায় না, তবে সব কমরেডই এই পথে চিন্তা মুরু করেছেন এবং চেষ্টাও কিছু কিছু শুরু হয়েছে। জনগণের কাছ থেকে শেখা (Learn from the masses)- এটা খুবই কঠিন কাজ। মনগড়া ধারণা নিয়ে চলাও (Subjectivism) সংশোধনবাদের দান। সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমরা শুরু করেছি মাত্র, এখনও অনেক পথ বাকী।

কৃষক এলাকায় যে সব কমরেড কাজ করছেন তারা যেমন রাজনীতি প্রচার করবেন তেমনই অর্থনৈতিক দাবীর উপর একটা সাধারণ আওয়াজ রাখার প্রয়োজনীয়তাকে কোন সময়েই ছোট করে দেখলে চলবে না। কারণ ব্যাপক কৃষক সাধারণকে আন্দোলনের পথে না আনলে রাজনীতি প্রচার বোঝার অবস্থায়, পশ্চাদপদ কৃষককে টেনে আনা যাবে না এবং শ্রেণীশত্রুর বিরুদ্ধে ঘৃণাকে জাগিয়ে রাখা যাবে না। “আগামী ফসলের উপর দখল রাখতে হবে”- এখন থেকেই এই আওয়াজকে প্রচার করতে হবে। সারা বছরের অনাহারের জন্য জোতদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে ঘৃণাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। সামনের ফসল কৃষকের- এই আওয়াজ ব্যাপক কৃষককে আন্দোলনের আওতায় আনবে এবং আমাদের সচেতন রাজনৈতিক প্রচার এই কৃষক আন্দোলনের চরিত্রকে বদলে দেবে।

দেশব্রতী, ১লা আগষ্ট, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর এক বছর

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

নকশালবাড়ীর এক বছর

নকশালবাড়ী কৃষক সংগ্রামের এক বছর পূর্ণ হোল। অন্য কৃষক সংগ্রাম থেকে এই সংগ্রামের পার্থক্য কোথায়? নানা অবিচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক চিরকালই সংগ্রাম করে এসেছেন। এই প্রথম সেই কৃষক শুধু ভার ছোট দাদীর জন্য আন্দোলন করলেন না, তিনি আন্দোলন করলেন রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য। নকশালবাড়ীর কৃষক আন্দোলন থেকে যদি অভিজ্ঞতা নিতে হয় তবে সে অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই যে, জমি বা ফসল ইত্যাদির জন্য জঙ্গী সংগ্রাম নয়, জঙ্গী-সংগ্রাম করতে হবে রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য। নকশালবাড়ীর নতুনত্ব এখানেই। এলাকার এলাকায় কৃষককে তৈরী হতে হবে নিজ নিজ এলাকায় সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার জন্য। ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনে সর্বপ্রথম নকশালবাড়ীতেই এই পথ গৃহীত হোল। অর্থাৎ বিপ্লবী বর্ষ শুরু হোল। তাই নকশালবাড়ীর এই আন্দোলনকে প্রত্যেক দেশের সংগ্রামীরা অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

ভারতবর্ষ সাম্রাজ্যবাদের ও সংশোধনবাদের ঘাটি হচ্ছে; সে আজ মুক্তিকানী জনতার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়ার ঘাঁটি হিসাবে কাজ করছে। তাই নকশালবাড়ীর সংগ্রাম শুধু জাতীয় সংগ্রাম নয়, একটা আন্তর্জাতিক সংগ্রাম। এ সংগ্রাম কঠিন-সহজ এ পথ নয়। বিপ্লবের পথ কঠিন–সহজ সে পথ নয়। বাধা আছে, বিপত্তি আছে, এমন কি পশ্চাদপশরণও আছে। তবুও এই নতুন আন্তর্জাতিকতায় উদ্বুদ্ধ কৃষক মাথা হেট করেন নি, সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত এক বছরের আমাদের অভিজ্ঞতা, এই ছোট এলাকায় সংগ্রামের বগী সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেক রাজনৈতিক পার্টির বিরোধীতা সত্বেও মানুষ এই সংগ্রামের কথাই ভাবছে এবং সেই সংগ্রামের পথেই এগোচ্ছে। আজ নকশালবাড়ীর বীর নেতারা জীবিত, আজও তাঁদের ধ্বংস করতে প্রতিক্রিয়াশীল সরকার পারে নি। তাই তো চেয়ারম্যান বলেছেন, সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দেখতে যত ভয়ংকরই হোক না কেন, আসলে কাগুজে বাঘ।

চেয়ারম্যান বলেছেন, সেদিন আর দূরে নেই যেদিন মানুষের উপর মানুষের শোষণ বন্ধ হবে, সমস্ত মানুষ মুক্ত হবে।

আমরা সেই উজ্জ্বল সূর্যোলোকের জন্য অপেক্ষা করছি।

২৩ শে মে, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ‘ভারতবর্ষের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব’

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

ভারতবর্ষের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব

 

পঞ্চাশ কোটির এই দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার অর্থ সমগ্র বিশ্বের সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ তার নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়াবে।

এ দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে বিশ্বের সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরোধীতা করে বিশেষ করে মোকাবিলা করতে হবে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের নেতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের, যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যুদ্ধ-পূর্ব যুগের জার্মানী, জাপান ও ইটালীর সমস্ত আক্রমণমুখী রূপকে শুধু গ্রহণ করেনি তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূল। সারা বিশ্বে আজ তার আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ ছড়িয়ে আছে এবং ভারতবর্ষকে সে কুক্ষিগত করছে নয়া ঔপনিবেশিক জালে। ভিয়েতনামের মানুষ এই আক্রমণমুখী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের নেতৃত্ব করছেন। এই সংগ্রাম চলেছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। ভারতবর্ষের সফল বিপ্লব এই সাম্রাজ্যবাদ দানবকে একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করবে।

এই দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে মহান অক্টোবর বিপ্লবের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সক্রিয় বিরোধীতা করে। কারণ সোভিয়েত রাষ্ট্রের, পার্টির ও সৈন্যবাহিনীর বর্তমান নেতারা সংশোধনবাদী নীতি গ্রহণ করে বুর্জোয়া একনায়কত্ব কায়েম করেছে এবং এশিয়া, আফ্রিকা, লাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মার্কিন সহযোগিতায় শোষক ও শাসকের ভূমিকা নিয়েছে। ওরা এই ভারতবর্ষে মহান লেনিনের নামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রধান ফেরিওয়ালা। ওদের তৈরী দালালদের সাহায্যে [ডাঙ্গে চক্র ও নয়াসংশোধনবাদী চক্রের সাহায্যে] ভারতবর্ষকে নিরঙ্কুশ শোষণের ক্ষেত্র বানাচ্ছে এবং সংগ্রামী জনতাকে ধোঁকা দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের বিশ্বাসী কুকুরদের কাজ করছে। ভারতবর্ষের সফল বিপ্লব শুধু ভারতবর্ষের মাটিতেই সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও তাদের দেশী দালালদের মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে আনবে না, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যু ঘটবে নিশ্চিত।

আমাদের দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে মহান চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার উপর নির্ভর করে। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে কে কতখানি উপলব্ধি করল ও প্রয়োগ করল তারই উপর তিনি বিপ্লবী কিনা তার বিচার হবে। তাছাড়া চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা যতখানি কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার ও প্রসার করা হোল তারই উপর বিপ্লবী জোয়ার সৃষ্টি হবে। কারণ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা আজকের যুগের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, তাইই নয় চেয়ারম্যান মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে অনেক উচ্চ পর্যায়ে তুলছেন। তাই বর্তমান যুগ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার যুগে রূপান্তরিত হয়েছে।

আমাদের ভারতবর্ষে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে দেশের ভেতরে আমলাতান্ত্রিক ও মুৎসুদ্দি পুঁজির বিরুদ্ধে এবং ব্যাপক গ্রামাঞ্চলে সামস্ত শোষণের বিরুদ্ধে। পঞ্চাশ কোটি মানুষের এই দেশে যেহেতু গ্রামে বাস করেন ৪০ কোটি লোক এবং যেহেতু তাদের উপর সামন্ত শোষণই প্রধান, তাই আমাদের দেশের আজও প্রধান বিরোধ গ্রামের কৃষক শ্রেণীর ও জমিদার শ্রেণীর মধ্যে। এই বিরোধের মীমাংসা হতে পারে একমাত্র গ্রামাঞ্চলে, শ্রমিক নেতৃত্বে কৃষকের সশস্ত্র বাহিনীর সাহায্যে মুক্ত অঞ্চল গড়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের যুগে এ কাজ সর্ব বৃহৎ ও সর্ব প্রধান কাজ হিসাবে দেখা দিয়েছে কারণ ভারতবর্ষে আজ বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার এসেছে এবং চেয়ারম্যানের নির্দেশিত এই পথ কৃষক ও বিপ্লবী জনতার মধ্যে ক্রমেই বেশী বেশী করে প্রবেশ করছে।

আমাদের দেশে বিপ্লব করতে হবে আমলাতান্ত্রিক ও মুৎসুদ্দি পুঁজির প্রতিভূ কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধোত্তর যুগের গণ-অভুত্থান দেখে ভয় পায় এবং সমস্ত শ্রেণীর সহযোগিতায় সা¤্রাজ্যবাদীদের সাথে রফা করে। ভারতবর্ষের তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সক্রিয় সহযোগিতা করল এই সব প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সাথে, কখনও আপসের নামে, কখনও সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা মারফৎ। তারা কলঙ্কিত করেছে কায়র বীরদের পুনাপ্রাভায়ালার সংগ্রামীদের, তেলেঙ্গানার অসম সাহসীক বীর এবং বাংলা ও অন্যান্য দেশের শত শত শহীদদের রক্তে রঞ্জিত লাল পতাকা। আজ ভারতবর্ষের প্রতিটি রাজনৈতিক পার্টি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের সক্রিয় সহযোগী ও বিপ্লবের শত্রু। তাই ভারতবর্ষের নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হতে পারে একমাত্র শ্রমিক নেতৃত্বে এবং চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার সাহায্যে।

এই নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত ও সফল করতে হলে চাই শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি ও তার রাজনৈতিক মতাদর্শ হবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও তার সর্বোচ্চ রূপ মাও সেতুঙ এর চিন্তাধারা। কিন্তু এই পার্টি কিভাবে গড়ে উঠবে? বিভিন্ন তথাকথিত মার্ক্সিষ্ট সদস্যরা চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারা মানেন বলে তাদের পার্টির নেতৃত্বেও বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসলেই কি আমরা তাদের একত্রিত করে ঘোষণা করবে। যে একটি মাওবাদী পার্টি গঠিত হল? নিশ্চয়ই না। কারণ শুধু বিদ্রোহের পতাকা ওড়ালেই মাওবাদী পার্টি গড়ে ওঠে না। সেই বিদ্রোহী কমরেডদের চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে এবং সেই প্রয়োগের মারফৎ শ্রমিক ও কৃষক ক্যাডার তৈরী করতে হবে। তবেই আমরা বলবো একটি সঠিক মাওবাদী পার্টি গড়ার পথে এগোচ্ছি। পুরাতন রাজনৈতিক কর্মীরা অবশ্যই এই পার্টিতে থাকবেন কিন্তু মূলত এই পার্টি গড়ে উঠবে শ্রমিক কৃষক ও মেহনতী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যুবকদের দ্বারা, যাঁরা শুধু মুখে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে মানবেন না, জীবনে তার প্রয়োগ করবেন, ব্যাপক জনতার মধ্যে প্রচার ও প্রসার করবেন এবং গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের ঘাঁটি বানাবেন। সেই নতুন পার্টি শুধু বিপ্লবী পার্টিই হবে না; তারা হবে জনতার সশস্ত্র বাহিনী এবং জনতার রাষ্ট্রশক্তি। এই পার্টির প্রত্যেকটি সভ্যকে সংগ্রাম করতে হবে সামরিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। এই রকম একটি পার্টি গড়ার কাজে আমাদের এখনই হাত দিতে হবে। সারা ভারতবর্ষব্যাপী এরকম পার্টি গড়া আজকেই হয়ত সম্ভব নয় কিন্তু তাতে হতাশ হলে চলবে না। যতটুকু এলাকায় এরকম পার্টি গড়া যায় সেইটুকু এলাকা নিয়েই কাজ শুরু করতে হবে সংখ্যালঘু হওযার ভয় আমাদের ত্যাগ করতে হবে এবং চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার উপর দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আমাদের কাজ সহজ নয়, অত্যন্ত কঠিন। আমাদের সংগ্রাম বিশ্বের সমস্ত সংগ্রামী মানুষের মনে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করবে। এইভাবে আমরা সফলভাবে ভিয়েতনামের বীর যোদ্ধাদের সাহায্য করতে পারবো। এই রকম একটি বিপ্লবী পার্টি পারে সফলভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করতে এবং পারে ব্যাপকতম যুক্তফ্রণ্ট গড়ে তুলতে – যে দুটোর সাহায্যে বিপ্লব সাফল্যমণ্ডিত হবে।

যাঁরা ভাবছেন যে তথাকথিত মার্কসবাদী পার্টিগুলো থেকে ব্যাপকতম অংশকে আমাদের পক্ষে টেনে আনাই প্রধান কাজ এবং এ কাজ করতে পারলেই বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে তারা আসলে আর একটা নির্বাচনের পার্টি গড়ার কথাই ভাবছেন সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে। কারণ তারা ভুলে যাচ্ছেন যে এইসব তথাকথিত মার্কসবাদী পার্টিগুলোর সভ্যদের হয়তো বিপ্লবী হওয়ার মতো গুণ আছে এখনও, কিন্তু যে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে তারা গেছেন তা হল খাঁটি সংশোধনবাদ এবং সেই প্রয়োগের ফলে তারা তাদের বিপ্লবী গুণগুলি অনেকাংশেই হারিয়েছেন এবং তাদের নতুন প্রয়োগ শিক্ষার ভিতর দিয়ে নতুন করে বিপ্লবী হতে হবে। তাই পুরাতন পার্টি সভ্যদের উপর ভরসা করে বিপ্লবী পার্টি গড়া যায় না। নতুন পার্টি তৈরী হবে সম্পূর্ণ নতুন বিপ্লবী শ্রমিক-কৃষক ও মধ্যবিত্ত যুবকদের চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় শিক্ষিত করে বিপ্লবী প্রয়োগ মারফৎ।

বিপ্লবী পার্টি গড়ার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলা। এ কাজে হাত না দেওয়া পর্যন্ত বিপ্লব শুধু মুখে স্বীকার করা হোল। সুতরাং চেয়ারম্যানের ভাষায় তাঁরা হলেন কথায় বিপ্লবী (revolutionary in words)। আমাদের বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে কাজে বিপ্লবীদের (revolutionary in deeds) দ্বারা। এভাবে না দেখলে পার্টি হবে একটি কচকচির আড্ডাখানা (debating society)। যেমন বর্ধমান প্লেনাম হলো একটি কচকচির আড্ডাখানা।

বর্ধমানে কি হয়েছে? যে সোভিয়েত শাসকচক্র আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণমুক্তি সংগ্রামের এক নম্বর শত্রু হয়ে গেছে এবং প্রকাশ্যভাবে জাতীয় বিপ্লবগুলি ধ্বংস সাধনের চেষ্টা করছে সেই সোভিয়েত রাষ্ট্রে ধনতন্ত্রের কতখানি বিকাশ হয়েছে তাই নিয়ে জোর বিতর্ক চালান হোল। শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব ধ্বংস করে যেখানে বুর্জোয়া একনায়কত্ব কায়েম হয়ে গেছে সেখানে ধনতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে জোরতর্ক করা হচ্ছে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা এবং প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ভোঁতা করে দেওয়া। তাই বর্ধমানে যা ঘটেছে তাতে, দুনিয়াব্যাপী সংশোধনবাদীরা খুশী হয়েছে এবং তাদের চক্রান্ত সফল হয়েছে। বর্ধমানে একজনও এই সংশোধনবাদী বিশ্বাসঘাতকদের সম্পর্ক ত্যাগ করেনি।

তাই পার্টির ভেতরে যে বিপ্লবী শক্তি আছে তার উপর ভরসা করলে আমরা বিপ্লবী পার্টির বাইরে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী নওজোয়ানদের প্রতি। তবেই সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের বিপ্লবের ঘাঁটি আমরা তৈরী করতে পারবো।

কমরেডস, আমাদের দায়িত্ব অনেক। বিশ্বের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আমাদের দেশকে ঘাঁটি করেছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুক্তি সংগ্রামকে ধ্বংস করার কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করছে। ভারতবর্ষকে তারা কামানের খোরাক সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র করতে চাচ্ছে মহান চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণের। সেই ষড়যন্ত্রই করে গেলো দলত্যাগী কোসিগিন-ট্রিটো আর চেষ্টার বোলজ নয়া-দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বসে। তাই তো আমাদের দেশে বিপ্লব করা একটা বিরাট আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। তাই নকশালবাড়ীর ছোট্ট স্ফূলিঙ্গ সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ণ এশিয়ার সংগ্রামী জনগণকে উৎসাহিত করে, উৎসাহিত করে বিশ্ব বিপ্লবের নেতা মহান চীন পার্টির নেতাদের, উৎসাহিত করে পৃথিবীর সমস্ত দেশের বিপ্লবী জনতাকে। এক পবিত্রতম আন্তর্জাতিক দায়ীত্ব আমাদের মাথায় এবং আমরা এই দায়ীত্ব পালন করবোই। মূল্য দিতে হবে অনেক, কিন্তু মূল্য দিতে ভয় পায় না বিপ্লবীরা চেয়ারম্যানের শিক্ষা: আমাদের লড়বার হিম্মত রাখতে হবে-জেতবার হিম্মত রাখতে হবে (We must dare to fight and dare to win)। চেয়ারম্যান এখনও বেঁচে আছেন। জয় আমাদের হবেই।

চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-জিন্দাবাদ।

দীর্ঘ-দীর্ঘদিন ধরে তিনি বেঁচে থাকুন!

ভারতবর্ষের নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব-জিন্দাবাদ!

দেশব্রতী”, ১৬ই মে, ১৯৬৮

 


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: চেয়ারম্যানের তিনটি লেখা/ যুব ও ছাত্র সমাজের প্রতি/ ঐতিহাসিক ১৬ই এপ্রিল

কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন

(নভেম্বর, ১৯৬৭)

চেয়ারম্যানের তিনটি লেখা

চেয়ারম্যানের তিনটি লেখা – জনগণের সেবা করো, ডা: নর্ম্মান বেথুন স্মরণে যে বোকা বুড়ো লোকটা পাহাড় সরিয়েছিল; খুব অল্প কথায় কমিউনিস্টদের আদর্শ, কর্মপ্রণালী ও লক্ষ্য-সম্পর্কে বলা আছে। এই তিনটি লেখা অমূল্য। কাজেই এ তিনটি লেখাকে অধ্যয়ন করা প্রত্যেক কমিউনিস্টদের অবশ্য কর্তব্য। প্রথম কথা, কমিউনিষ্টের সমস্ত কার্যকলাপ হবে একটি লক্ষ্য সাধন এবং তা হোল জনসাধারণের কল্যাণ সাধন করা। কমিউনিস্ট বিপ্লবী, কারণ বিপ্লব ছাড়া জনসাধারণের কল্যাণ করা যায় না। যেহেতু জনতার কল্যাণ করার জন্য বিপ্লব দরকার, তাই বিপ্লবের প্রয়োজনে সে আন্তর্জাতিকতাবাদী। এই আন্তর্জাতিকতা নিঃস্বার্থে এবং কমিউনিস্ট জানে তার কাজ সহজ নয়, কাজেই তাকে দাঁত কামড়ে একটা কাজে লেগে থাকতে হয়। এই বারবার চেষ্টা করার দায়ীত্ব কমিউনিস্টের আছে। এই সবকয়টা গুণ কমিউনিস্টদের না থাকলে সে কমিউনিস্ট নয়। কাজেই এ কয়টা গুণ কমিউনিস্টকে অতি অবশ্যই অর্জন করতে হবে। এছাড়াও এ কয়টা লেখাতে আছে আরও অনেক তত্ত্ব। আমার যেগুলো মনে হচ্ছে সেগুলো জানাচ্ছি। যেমন জনগণের সেবা করো লেখাটায় জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। এই লেখাটা অধ্যয়ন করলেই যে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে আসে এবং যেটা মধ্যবিত্ত জীবন যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তা হল এই-সংগ্রামে আমার কি হবে? আমি কি চাই? আমি কি এই মুহূর্তে জনতার স্বার্থে মরতে রাজী আছি? জনতার স্বার্থে মরাটাই একটা মানুষের পক্ষে সবচেয়ে মহৎ দায়িত্ব, সে মৃত্যু বিপ্লবের যে কোন কাজেই হোক না কেন। চেয়ারম্যান বলেছেন সংগ্রাম করলেই মৃত্যু আছে, কাজেই মৃত্যুকে ভয় করলে চলবে না। চেয়ারম্যান বলেছেন, জনতার স্বার্থে যখন কাজ করছো তখন অন্যের সমালোচনায় অস্থির হয়ে উঠছো কেন? যে কোন লোকই হোক না কেন, তার কাছ থেকে উপদেশ নিতে বাধা কি? সত্যিই সে যদি কোন সদুপদেশ দেয় যা করলে জনতার উপকার হবে, বিপ্লবের পক্ষে যাবে, তাহলে সেই উপদেশ নেব না কেন? এই তো তিনি বলেছেন, সদুপদেশ, এমন কি পার্টির বাইরে থেকেও এলে তাকে নিতে হবে। তিনি বলেছেন, যে কেউ পার্টির বা জনতার কোন ভাল কাজ করেছে তার মৃত্যুতে শোক জানাতে হবে, মিটিং করতে হবে।

ডা: নর্ম্মান বেথুন স্মরণে-লেখায় তিনি আন্তর্জাতিকবাদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে দেশ পদানত, আর যে দেশ পদানত করেছে, তার শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কোন বিরোধ নেই, এবং পদানত দেশের মুক্তি ছাড়া উন্নত দেশের মুক্তি নেই। একথা ডা: বেথুন বুঝেছিলেন বলেই সমুদ্র পার হয়ে তিনি এসেছিলেন চীনের মুক্ত অঞ্চলে। কী প্রত্যাশা তাঁর ছিল নিজের সম্বন্ধে? একজন বড় সার্জন-কী না পেতে পারতেন তিনি ধনতান্ত্রিক দুনিয়ায়! সব ছেড়েছুড়ে তিনি এলেন কেন? এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ তাঁর এসেছিল এই রাজনৈতিক চেতনা থেকে। কাজেই রাজনৈতিক চেতনার তাৎপর্য হচ্ছে এইখানে। দ্বিতীয়ত: এই লেখায় চেয়ারম্যান দেখিয়েছেন. কমিউনিস্ট কি ধরনের কাজ করে। স্বভাবতই সবচেয়ে কঠিন কাজ, সবচেয়ে নিঃস্বার্থভাবে। শুধু তাই নয়, তথাকথিত টেকনিক্যাল কাজ, যাকে মধ্যবিত্তরা অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে, সেই রকম টেকনিক্যাল কাজ করতে গিয়ে ডা: নর্ম্মান বেথুনের মত বিখ্যাত সার্জন জীবন দিলেন। কাজেই নর্ম্মান বেথুন থেকে শিক্ষা কোন কাজ ছোট নয়-জনতার কল্যাণে সব রকম কাজই সমান মূল্যবান। এই লেখায় চেয়ারম্যান কমিউনিস্টের মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর লেখায় তিনি বলেছেন-ভাল কমিউনিস্ট সেই যে সবচেয়ে কঠিন কাজের দায়ীত্ব নেয় এবং পূর্ণ করে। যে কমিউনিস্টরা মুখে বড় বড় কথা বলে এবং কাজের সময় সবচেয়ে সহজ কাজের দায়ীত্ব নেয় তারা ভাল কমিউনিস্ট নয়।

যে বোকা বুড়ো লোকটা পাহাড় সরিয়েছিল-এই লেখায় চেয়ারম্যান মধ্যবিত্ত চালাকি ও বুদ্ধিমত্তার পরিহাস করেছেন। ও বুদ্ধিমত্তার কোন দাম নেই। বরঞ্চ একটা ‘মুর্খ কৃষকের’ যুগ যুগ সঞ্চিত অভিজ্ঞতা সঠিক পথ বাতলার। বারবার একটা কাজ করা মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং সে কাজ সে ঘৃণা করে। একজন কৃষক তার জীবনের অভিজ্ঞতায় শিখেছে একটা কাজ বারবার করতে হয় দৃঢ়তার সাথে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া যায় না। কিন্তু এভাবে কাজ করেই একদিন সফল হওয়া যায়।

এ কথাগুলো মনে হোল এই তিনটি লেখা থেকে। সব কমরেডরা যখন বারবার পড়েন তখন হয়তো আরও অনেক মূল্যবান তত্ত্ব বের করতে পারবেন। এই অনুশীলন করা আমাদের পার্টিতে নেই। কাজেই এ সবগুলো আমাদের শুরু করতে হবে। আশা করি যুব কমরেডরা এটি পড়ে নূতন উৎসাহ পাবেন অনুশীলন করার।

৭ই জানুয়ারী, ১৯৬৮

যুব ও ছাত্র সমাজের প্রতি

অক্টোবর সমাজবাদী বিপ্লবের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নে, মহান মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নেতা কমরেড স্তালিনের পর, সংশোধনবাদী চক্রের হাতে রাষ্ট্র, পার্টি ও সেনা বিভাগের নেতৃত্বে চলে যায় এবং তারই সুযোগ নিয়ে এই সংশোধনবাদী চক্র বুর্জোয়া একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এই সংশোধনবাদী চক্র আজ সারা দুনিয়ার সংশোধনবাদীদের নেতা ও কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। বুর্জোয়া একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর স্বভাবতই এরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রধান মিত্র হয়েছে এবং সহযোগিতা বিশেষভাবে ঘনীভূত হয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে; কারণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের নেতা এবং জার্মানী, ইটালী ও জাপানের আক্রমণাত্মক ভূমিকা আরও তীব্র ও ব্যাপকভাবে সারা বিশ্বে চালাচ্ছে। সোভিয়েত রাষ্ট্রের নেতারা এইসব আক্রমণাত্মক কাজকে সমর্থন করছে এবং লেনিনের নামে এই সব আক্রমণকে ছোট করে দেখাচ্ছে। এবং বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগিতার ঔপনিবেশিক শোষণ ও পরোক্ষ শাসন চালাচ্ছে। এই সব কার্যকলাপের ফলে সোভিয়েত রাষ্ট্র ও পার্টির নেতারা আজ পৃথিবীর সমস্ত মুক্তি সংগ্রামের শত্রু, মহান চীনের শত্রু, কমিউনিজমের শত্রু, এমনকি সোভিয়েত জনগণেরও শত্রু। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও এরা মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের সহযোগী হিসাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরিচালনা করে, ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষকে শোষণ করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার মতো তারা ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের মিত্র ও তাকে সাহায্য করছে। কাজেই ভারত বর্ষের মুক্তি সংগ্রাম সোভিয়েত বুলেটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং সোভিয়েত রাষ্ট্র শক্তিকে আঘাত করেই একমাত্র সফল হতে পারে। এই ঘটনা ঘটেছে বলেই ডাঙ্গে চক্র ও নয়া সংশোধনবাদী নেতৃত্ব তাদের কার্যকলাপের দ্বারা ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সাথে হাত মিলিয়েছে এবং সব রকম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শত্রু হয়ে গেছে।

বুর্জোয়া প্রচার ও সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচারে এরা বড় সচেতন ও সক্রিয় সমর্থক। পৃথিবীতে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে বলেই দুনিয়াতে চেয়ারম্যান মাওয়ের চিন্তাধারাই একমাত্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হয়েছে এবং এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মারফৎ তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং সমৃদ্ধ করেছেন। তারই ফলে পৃথিবী আজ চেয়ারম্যান মাও-সেতুঙ এর চিন্তাধারার যুগ। তাই চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে বলা যায় সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংসের যুগের মার্কসবাদ। ছাত্র ও যুব কর্মীর তাই রাজনৈতিক দায়িত্ব হয়েছে মার্কসবাদের এই নতুন ও বিকশিত রূপ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে অনুশীলন করা এবং কাজে লাগান। এ কাজ যে করবে না সে মার্কসবাদের নীতিগত শিক্ষা অর্জন করতে পারবে না। কাজেই তাঁদের কোটেশনস অফ চেয়ারম্যান মাও-সেতুঙ এর অনুশীলন করতে হবে। চেয়ারম্যান বলেছেন: ছাত্র ও যুবক-তাকেই বিপ্লবী বলা যায় যদি তারা শ্রমিক ও কৃষক জনতার সাথে মিশে যেতে পারে এবং জনতার মধ্যে কাজ (Mass work) করে। আমাদের হাতে মহান চীনের কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত “গণযুদ্ধ সম্পর্কে উদ্ধৃতি” আছে। এই বইটির বাংলা অনুবাদও ‘দেশব্রতী’ করেছেন। এই পুস্তকটি করা হয়েছে বিপ্লবী শ্রমিক-কৃষকদের জন্যে। ওটাই আমাদের প্রচারের ও আন্দোলনের হাতিয়ার (propaganda & agitation material)। এই বইটি নিয়ে কত সংখ্যক শ্রমিক ও কৃষক জনসাধারণকে শোনান হল এবং বোঝান হল তারই উপর নির্ধারিত হবে কর্মীটি বিপ্লবী কিনা। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি ছাত্র আন্দোলনের ভাল বক্তা এবং ছাত্রদের দাবী বা কোনও রাজনৈতিক ব্যারিকেড করা ছেলেও পরে আই. এ. এস পরীক্ষা দিয়ে হাকিম হয়েছে অর্থাৎ সোজাসুজি প্রতিবিপ্লবী ক্যাম্পে যোগ দিয়েছে। তাই চেয়ারম্যান বলেছেন: যে ছাত্র-যুবক, কৃষক ও শ্রমিক জনতার সাথে মিশে যেতে পারে তাঁরাই বিপ্লবী এবং যারা পারবে না তারা প্রথমে অবিপ্লবী এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিবিপ্লবী ক্যাম্পে যোগ দেবে। এ শিক্ষা শুধু চীনের নয়, এ শিক্ষা পৃথিবীর সমস্ত দেশের। এ কাজ না করলে শহরে বিপ্লবী কর্মীরা হতাশাগ্রস্ত ও অধঃপতিত (degene rated and demoralised) হয়ে যাবে, এটাই আমার অভিজ্ঞতা।

ছাত্র ও যুবকদের রাজনৈতিক সংগঠন অনিবার্য ভাবেই রেডগার্ড সংগঠন। এবং এদের কাজ হবে চেয়ারম্যানের কোটেশনগুলো যতো ব্যাপক অঞ্চলে সম্ভব প্রচার করা।

দেশব্রতী, ২রা মে, ১৯৬৮

 

ঐতিহাসিক ১৬ই এপ্রিল

[নিগ্রো জাতির উপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের হিংস্র দমননীতির বিরুদ্ধে আমেরিকার নিগ্রো জনগণ যে ব্যাপক ও সশস্ত্র প্রতিরোধ চালাচ্ছেন তাকে অভিনন্দন ও সমর্থন জানিয়ে চেয়ারম্যান মাও ১৯৬৮ সালের ১৬ই এপ্রিল যে ঐতিহাসিক বিবৃতি (পরিশিষ্ট-খ (১) দ্রষ্টব্য) দেন, সেই বিবৃতি উপলক্ষে এই রচনাটি – লাল সংবাদ]

১৬ই এপ্রিল পৃথিবী এক নতুন যুগে এসে দাঁড়িয়েছে। সে যুগকে বলা চলে বিশ্ববিপ্লবের যুগ। চেয়ারম্যান পৃথিবীর বৃহত্তম ও হিংস্রতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংসের ডাকই শুধু দেননি, তিনি সাথে সাথে ডাক দিয়েছেন দেশে দেশে জাতীয় বিপ্লব সংগঠিত করা এবং বিপ্লবী সংগ্রাম শুরু করা, যার বিরাট দাবদাহে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে না, সাথে সাথে ধ্বংস হবে প্রতিক্রিয়াশীল সোভিয়েত সংশোধনবাদ, আর তার দেশী-বিদেশী অনুচরেরা, ধ্বংস হবে দেশে দেশে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি জোট এবং গড়ে উঠবে এক শোষণহীন বিশ্বব্যবস্থা। যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছিত পরাধীন শোষিত মানুষের স্বপ্ন আজ সফল হওয়ার দিন এসেছে। কর্ণধার চেয়ারম্যান মাও বিশ্ব মানবের একমাত্র পরিত্রাতা। বিশ্ববিপ্লবের রক্ত পতাকা তিনি তুলে ধরেছেন। তিনি নেতৃত্ব নিয়েছেন। জয় এবার আমাদের হবেই। দীর্ঘজীবী হোন চেয়ারম্যান মাও, বহুদিন ধরে বাঁচুন তিনি। আমরা দেখে যাব স্বাধীন মুক্ত ভারতবর্ষের উজ্জল সূর্যালোক। পূর্ব দিগন্তের সূর্যরশ্মি পশ্চিম দিগন্তকে উদ্ভাসিত করবে। সমস্ত গ্লানি আর অপচয়, ধ্বংস ও মৃত্যুর বিভীষিকা থেকে পৃথিবী হবে মুক্ত। আমরা সেই মহান যুগে এসে পৌঁচেছি। দায়ীত্ব আমাদের অনেক। সেই দায়ীত্ব আমরা পালন করতে পারবো, কারণ, অসীম শক্তির আধার চেয়ারম্যান যে আজও বেঁচে আছেন। তিনি আমাদের মনে আনবেন সূর্যের উত্তাপ। আমরা ভাঙবো জীর্ণ পুরাতন কলঙ্কিত এই ব্যবস্থাকে। আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে সারা পৃথিবীর লোক, কারণ আমরা যে পঞ্চাশ কোটি। এই পঞ্চাশ কোটির দেশ জাগলে কি অসাধারণ শক্তি জন্ম দেবে, কি অসাধ্য সাধন তারা করবে! জনতার উপর বিশ্বাস রেখে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলুন। জয় আমাদের হবেই।

চেয়ারম্যান মাও জিন্দাবাদ!

জিন্দাবাদ ভারতবর্ষের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব!

দেশব্রতী, ২রা মে ১৯৬৮


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৫ম পর্ব)

বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি বিপ্লব বিরোধী, চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা বিরোধী, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিরোধী শ্রেণী সহযোগিতার ও সংশোধনবাদী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটি তার মাদুরাই বৈঠকে শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতির পথ বেছে নিয়েছে। [ইতিমধ্যে তারা তাদের অষ্টম কংগ্রেসে তাদের ঐ মাদুরাই লাইন অনুমোদন করিয়ে নিয়েছে – প্রকাশক]।

আন্তর্জাতিক মত-বিরোধ সম্পর্কে অনেক বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও আসলে তারা মহান চীনের পার্টি ও চেয়ারম্যান মাও-এর সমস্ত সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ধনতন্ত্রের বিকাশ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নীরব থেকে তারা কমরেড স্তালিনের শেষ লেখা সোভিয়েত-এ সমাজবাদের আর্থিক সমস্যাবলী (Economic problems of socialism in USSR) – এর বক্তব্যও সোজাসুজি অস্বীকার করলো এবং মহান চীনের পার্টির সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করলো এই ঘোষণা করে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন এখনো সমাজতান্ত্রিক শিবিরেই আছে। এই কথা বলার তাৎপর্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম প্রশ্নে সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের প্রস্তাবকে সমর্থন জানানো এবং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সোভিয়েত অর্থনৈতিক সাহায্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রগতিশীল ভূমিকা দেখা এবং তাকে সমর্থন জানানো। কেন্দ্রীয় কমিটি কৃষক সংগ্রাম সম্বন্ধে সোজাসুজি মেনশেভিক রাজনৈতিক মত গ্রহণ করেছে। এবং কৃষক সংগ্রামের বিরোধীতা করেছে।

স্বভাবতঃই কেন্দ্রীয় কমিটির মাদুরাই বৈঠক পার্টিকে এক সংশোধনবাদী বুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত করেছে; তাই এই নীতির বিরোধীতা করা ছাড়া বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের অন্য কোন পথ নেই। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কমিটি মাদুরাই প্রস্তাব গ্রহণ করায় একথা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় কমিটি বিপ্লবী নয়।

কাজেই বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীকে এই কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। মাদুরাই প্রস্তাবের যে বাগাড়ম্বরতা কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির মধ্যকার বিপ্লবী অংশের চোখে ধুলো দেবার জন্যেই করেছে এবং গোপন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের দালালী করার জন্যই করেছে।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা আদর্শগত আলোচনা করে একটি মাত্র উদ্দেশ্যে, তা হল তাদের নিজের দেশের বাস্তব অবস্থায় সেই আদর্শের প্রয়োগ কি ভাবে হবে তার জন্যে। সাধারণভাবে কোন আদর্শগত আলোচনারই কোন বিপ্লবী তাৎপর্য নেই, কারণ সত্যের যাচাই হবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগের মারফৎ। কেন্দ্রীয় কমিটি আন্তর্জাতিক মত-বিরোধকে একটি বিমূর্ত চিন্তাধারা (abstract concept) হিসাবে আলোচনা করেছে, নির্দিষ্টভাবে (Concretely) যা করেছে তা হলো সোজাসুজি সোভিয়েত সংশোধনবাদকেই ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে একমাত্র পথ হিসাবে ঘোষণা করেছে। কাজেই তাদের মহান চীনের পার্টির বিরোধীতা করতে হয়েছে।

তাদের বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পারমাণবিক অস্ত্র মজুত সম্বন্ধে বক্তব্যে। তারা সোভিয়েত ও মার্কিন পারমাণবিক একচেটিয়া মালিকানার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেনি, কেবল সমালোচনা করেছে “সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনকে পারমাণবিক জ্ঞানের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সাহায্য করেনি কেন” বলে। পারমাণবিক বোমা আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে। সেক্ষেত্রে সোভিয়েত ও মার্কিন সহযোগিতা যে প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব প্রভূত্বের জন্য সহযোগিতা-এই স্পষ্ট কথাটি নানা কথার প্যাঁচে গোপন করা হয়েছে।

সোভিয়েত ও মার্কিন পারমাণবিক জ্ঞানের আদান প্রদানের মত ঘটনা কেন্দ্রীয় কমিটির চোখে পড়েনি এবং তা থেকে যে সিদ্ধান্তে আসা উচিত ছিল তাও তারা আসেনি । কারণ তারা আন্তর্জাতিক মত-বিরোধকে বুর্জোয়া জাতীয় স্বার্থের বিরোধ হিসাবে দেখছে বলেই আন্তর্জাতিক মত বিরোধের আসল তাৎপর্য অর্থাৎ এই বিরোধ যে প্রকৃতপক্ষে মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষার এবং বিপ্লবী মতের সাথে বিপ্লব বিরোধী মতের বিরোধ-সে হিসাবে দেখছে না।

ভারত প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র সম্বন্ধে কোন কথা না বলে তারা “কংগ্রেসের এখনও জনসমর্থন আছে” বলার মধ্যে দিয়ে এই প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে জনতার সামনে সুন্দর করে দেখাতে চেয়েছে। ভারতবর্ষব্যাপী গণ-বিক্ষোভ সম্বন্ধে নীরব থেকে তারা এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করেছে এবং যুক্তফ্রণ্ট মন্ত্রীসভা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরোক্ষভাবে গণ-বিক্ষোভ দমনের প্রতিটি কার্যকলাপকে সমর্থন জানিয়েছে এবং সেই জনবিরোধী কাজগুলির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে। যুক্তফ্রণ্টের শরিকদের শ্রেণী বিশ্লেষণের কোন চেষ্টা না করে নির্বিচারে তারা নির্দেশ দিয়ে বসলো এই সমস্ত পার্টিগুলোকে (যুক্তফ্রণ্টের শরিক) বুজিয়ে-সুঝিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রোগ্রামের পক্ষে টেনে আনতে হবে। এর নাম যদি নির্জলা গান্ধীবাদ না হয় তবে গান্ধীবাদ কাকে বলে আমাদের জানা নেই। শ্রেণী, শ্রেণীস্বার্থ এবং তার বিরোধের মত সব কথা কেন্দ্রীয় কমিটির বিচারের মধ্যে আসেনি অর্থাৎ মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী জলাঞ্জলি দিয়ে কতকগুলি মার্কসবাদী শব্দ যোজনা করে কেন্দ্রীয় কমিটি সমগ্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদকেই বাতিল করে দিয়েছে।

কংগ্রেস সরকারের এখনও গণ-ভিত্তির গল্প বলে কেন্দ্রীয় কমিটি দেখাতে চেয়েছে যে ভারতে প্রতিক্রিয়াশীলরাই খুব শক্তিশালী। গণবিক্ষোবের মধ্য দিয়ে এই সরকারের অর্থনৈতিক সঙ্কট যে রাজনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে এই সুস্পষ্ট ঘটনাকে আড়াল করে রেখে জনতার শক্তিকে ছোট করে দেখানো হচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস সরকারের দুর্বলতা যখন সাধারণ মানুষের কাছেও জীবন্ত হয়ে উঠেছে তখন কেন্দ্রীয় কমিটি তার শক্তিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়ে জনসাধারণকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পক্ষে এমন নির্লজ্জভাবে প্রচার করতে কংগ্রেসও বোধ হয় লজ্জা পেতো।

এই সরকারকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সংশোধনবাদ পুরো মদত দিয়েও যখন জনসাধারণের মনে এর শক্তি সম্বন্ধে বিশ্বাস সৃষ্টি করাতে পারছে না, তখন কেন্দ্রীয় কমিটি খাঁটি দালালের মত এগিয়ে এসেছে এই প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে রক্ষা করতে। এই কেন্দ্রীয় কমিটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের সহযোগী ও মিত্র।

কেন্দ্রীয় কমিটি দেখাবার চেষ্টা করেছে যে তারা কোন পার্টিরই নেতৃত্ব মানে না। ধনিকশ্রেণী চিরকাল বলে এসেছে যে কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত পার্টির নির্দেশ নিয়ে চলেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি সেই বুর্জোয়া প্রচারের বিরুদ্ধে দেখাবার চেষ্টা করেছে যে তারা কারও নির্দেশ বা বিশ্লেষণ মানে না। আমরা কমিউনিস্টরা একটা বিজ্ঞানে বিশ্বাস করি, যার নাম মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা। বিজ্ঞান মানলেই সেই বিজ্ঞানের যারা বিকাশ করছেন তাঁদের মানতে হবে। লেনিনকে না মেনে যারা মার্কসবাদী হতে চেয়েছিল তারা ইতিহাসের আবর্জনা স্তুপে আশ্রয় নিয়েছে। তেমনি আজও মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বোচ্চ রূপ মাও সেতুঙের চিন্তাধারা -এই আন্তর্জাতিক মার্কসবাদী কর্ত্তৃত্বের যারা বিরোধীতা করছে তাদের আশ্রয় নিতে হবে সাম্রাজ্যবাদের কোলে।

ভারতবর্ষ একটা আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশ। তাই এই দেশে ঔপনিবেশিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রধান ভিত্তি কৃষকশ্রেণী এবং সেই শ্রেণী সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম। কৃষি বিপ্লব ছাড়া এদেশের কোনও পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং কৃষি বিপ্লবই একমাত্র পথ, যে পথে এ দেশের মুক্তি আসতে পারে। সেই কৃষি বিপ্লব সম্বন্ধে কেন্দ্রীয় কমিটি শুধু যে নীরব তাই কেবল নয়, যেখানে সেখানে কৃষকেরা বিদ্রোহের পথ নিচ্ছে, সেখানেই তারা বিপ্লবী সংগ্রামের বিরোধীতা করতে বদ্ধপরিকর। কি অসীম ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্রের নকশালবাড়ীর বিপ্লবী কৃষক সংগ্রামীদের প্রতি, কি উল্লাস প্রকাশ পেয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল যুক্তফ্রণ্ট সরকারের দমননীতির সাময়িক সাফল্যে। খাঁটি বুর্জোয়ার প্রতিনিধির মত তারা পূর্বশর্ত করেছে, “জয়ের গ্যারাণ্টি দিতে হবে, তবেই তারা সেই সংগ্রামকে সমর্থন করবে।”

প্রত্যেকটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদীর আজ দায়িত্ব হচ্ছে সংগ্রামী ফ্রণ্ট থেকে এই কেন্দ্রীয় কমিটিকে বিতারিত করা, তবেই সংগ্রামে জোয়ার আসবে, সংগ্রাম জয়যুক্ত হওয়ার পথ নেবে। এই সংশোধনবাদী প্রতিক্রিয়াশীল কেন্দ্রীয় কমিটি কোন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সামন্তবাদ-বিরোধী সংগ্রামের শরিক তো নয়ই, তারা শত্রু। একমাত্র এই কেন্দ্রীয় কমিটি এবং তার পাপ রাজনীতির সংসর্গ ত্যাগ করেই বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠতে পারে। এই বুর্জোয়া রাজনীতিকে ধ্বংস করেই বিপ্লবী মতাদর্শ গড়ে উঠতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকে উৎখাত করতে না পারলে ভারতবর্ষের বিপ্লব এক পাও এগোতে পারে না, কাজেই পার্টির মধ্যে যারা বিপ্লবী আছেন তাঁদের এই রাজনীতির কেন্দ্রীকতা মানার একটাই অর্থ হয়, তা হল বুর্জোয়া কর্তৃত্ব মেনে চলা। তাই এই কেন্দ্রীয় কমিটির কেন্দ্রীকতা ভাঙা হচ্ছে প্রাথমিক পূর্বসর্ত যা ছাড়া বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠতে পারে না।

বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে প্রথম কাজ বিপ্লবী রাজনীতির প্রচার ও প্রসার। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবের পথে গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা এবং সেই বিপ্লবী সংগ্রামের এলাকাকে প্রসারিত করে শহরকে ঘিরে ফেলা। কৃষক গেরিলাবাহিনী থেকে গণমুক্তি সেনা গড়ে তোলা এবং শহর দখল করে বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা অর্থাৎ চেয়ারম্যান মাও-এর জনযুদ্ধের কৌশলকে পুরো কাজে লাগানো। এই হল ভারতবর্ষের মুক্তির একমাত্র সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পথ। এই পথের ব্যাপক প্রচার করতে হবে শুধু পার্টি সভ্য ও দরদীদের মধ্যেই নয়, ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যেও – তবেই বিপ্লবী সংগ্রাম ও তার সাথে বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে। পার্টির এই গণলাইন [mass line]  প্রচারের মারফতেই আমরা, কেন্দ্রীয় কমিটির বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল দলিলগুলির অসারতা জনসাধারণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো এবং সংগ্রামী জনতার ভিতর এই প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বের প্রভাব কাটাতে পারবো। চেয়ারম্যান মাও-এর শিক্ষা এই গণলাইন সর্বদা সমস্ত ফ্রণ্টে প্রচার করতে হবে।

এই শিক্ষার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে ভারতবর্ষে। পার্টির ভিতর বিপ্লবীকর্মী আছেন এটাও যেমন সত্য তেমনি সত্য হচ্ছে পার্টি দীর্ঘকাল সংশোধনবাদী রাজনীতি এবং বুর্জোয়া কাজের ধরণ মেনে চলেছে। ফলে বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যেও রয়েছে কাজের পুরোনো সংশোধনবাদী অভ্যাসগুলো যার প্রতিফলন ঘটে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে এবং অর্থনীতিবাদী ধরণ-ধারণের অভ্যাসে এবং জঙ্গী অর্থনীতিবাদের প্রকাশে। আমাদের এলাকার অভিজ্ঞায় আমরা দেখেছি যে পার্টির পুরাতন কৃষকসভা বা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মীরা বিপ্লবী রাজনীতি নিজেরা গ্রহণ করলেও জনসাধারণের মধ্যে তার প্রচারের কাজে নামতে ইতঃস্তত করেন এবং যখন বিপ্লবী সংগ্রাম ঘাড়ের উপর এসে পড়ে তখন আতঙ্কিত হন, জনতার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিরোধীতার পথ বেছে নেন। এই বিরোধীতা সব সময়েই প্রকাশ্য বিরোধীতার পথ বেছে নেন। এই বিরোধীতা সব সময়েই প্রকাশ্য বিরোধীতার রূপ নেয় না। রূপ নেয় জনতার শক্তি সম্বন্ধে অনাস্থা এবং শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখানোর মধ্য দিয়ে। এই ধরণের কর্মীদের এই ধরণের অনিষ্টকারিতাকে নষ্ট করে দেওয়া যায়, যদি তাদের ঘিরে যে ব্যাপক সংখ্যক সংগ্রামী মানুষ আছেন সেই সংগ্রামী মানুষদের কাছে পার্টির এই গণলাইনের প্রচার থাকে। এই ক্ষেত্রে উপরোক্ত কর্মীদের মধ্যে যদি কারও সত্যিকারের বিপ্লবী মনোভাব থাকে তবে তিনি বা তাঁরা দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন।

এই অবস্থার সম্মুখীন আমরা সব এলাকাতেই হবো, কারণ বহুদিন সংশোধনবাদী ক্রিযাকলাপের সাথে যুক্ত থাকায় পার্টি সভ্যদের মধ্যে বহু সংশোধনবাদী ধ্যান ধারণা আছে, যা একদিনে কাটবে না-অনেক দিনের বিপ্লবী প্রয়োগের মধ্য দিয়ে কাটবে। পার্টির বাইরে যে বিপুল সংখ্যক বিপ্লবী মানুষ আছেন তাঁদের কাছে আমাদের পার্টির গণলাইন প্রচারের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন বিপ্লবী কর্মী পার্টিতে আসবেন এবং তাঁরা তাঁদের সতেজ বিপ্লবী চেতনার দ্বারা পার্টির ভেতরকার জড়তা কাটাবেন এবং পার্টির বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্য বাড়িয়ে তুলবেন।

ভারতবর্ষে দীর্ঘস্থায়ী কঠিন সংগ্রাম চালিয়েই একমাত্র বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা যায়। কারণ পঞ্চাশ কোটী মানুষের এই বিরাট দেশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির শক্ত ঘাঁটি এবং সোভিয়েত সংশোধনবাদের প্রধান ভিত্তি। কাজেই ভারতবর্ষে বিপ্লব জয়যুক্ত হলে সা¤্রাজ্যবাদের ধ্বংসের দিন ঘনিয়ে আসবে এবং ঘনিয়ে আসবে সোভিয়েত সংশোধনবাদের মৃত্যু। কাজেই বিশ্ব প্রতিক্রিয়ার দুর্গ এই ভারতবর্ষে বিপ্লবকে রুখতে তারা এগিয়ে আসবে এবং এটাই স্বাভাবিক। অবস্থায় জয় সহজ ভাবা, অন্ধ ভাববিলাস ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তবুও জয় আমাদের হবেই, কারণ এদেশ পঞ্চাশ কোটি মানুষের এবং বিরাট এলাকা জুড়ে। কাজেই সাম্রাজ্যবাদীরা এবং সংশোধনবাদীরা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়েও এ দেশের বিপ্লবী অভিযানকে স্তব্ধ করতে পারে না।

কিন্তু বিপ্লব কখনো সফল হতে পারে না বিপ্লবী পার্টি ছাড়া। যে পার্টি দৃঢ় ভাবে চেয়ারম্যান মাও সেতু-এর চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্ত যুবকের দ্বারা গঠিত, যে পার্টির অভ্যন্তরে পুরো গণতান্ত্রিক অধিকার আছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার এবং যে পার্টির সভ্যরা স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে শৃঙ্খলা মেনে নিয়েছে, যে পার্টি শুধু উপরের হুকুম মেনে চলে না, স্বাধীনভাবে প্রত্যেকটি নির্দেশকে যাচাই করে এবং ভুল নির্দেশকে অমান্য করতেও দ্বিধা করে না, বিপ্লবের স্বার্থে যে পার্টির প্রত্যেকটি সভ্য নিজের ইচ্ছায় কাজ বেছে নেন এবং ছোট কাজ থেকে বড় কাজ সব কিছুকেই সমান গুরুত্ব দেন; যে পার্টির সভ্যরা নিজেদের জীবনে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শকে প্রয়োগ করেন, নিজেরা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন, আরও আত্মত্যাগ, আরও কর্মোদ্যম বাড়াতে যে পার্টির সভ্যরা কোন অবস্থাতেই হতাশ হন না, কোন কঠিন পরিস্থিতি দেখেই ভয় পান না, দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যান তার সমাধানে-এ রকম একটা পার্টিই পারে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও মতের মানুষের ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়ে তুলতে। এই রকম একটি বিপ্লবী পার্টিই পারে ভারতবর্ষের বিপ্লবকে সফল করে তুলতে। যে মহান আদর্শ চেয়ারম্যান মাও সেতুং তুলে ধরেছেন সমস্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের সামনে, সে আদর্শকে নিশ্চয়ই সফল করা যাবে এবং তবেই আমরা পারব নয়া-গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ সৃষ্টি করতে এবং সেই নয়া-গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে পারবে সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষ গড়ার কাজে।

দেশব্রর্তী, ২৬ শে অক্টোবর ’৬৭


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৪র্থ পর্ব)

নকশালবাড়ীর বীর কৃষক জিন্দাবাদ

 

ভারতবর্ষে আধা-সামস্ত ও আধা-উপনিবেশিক সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। কাজেই এদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব মানে কৃষি-বিপ্লব। ভারতবর্ষের সমস্ত সমস্যা জড়িত রয়েছে এই একটি মাত্র কাজের উপর। এই কৃষি-বিপ্লবের প্রশ্নে এই শতাব্দীর শুরু থেকেই মার্কসবাদী মহলে মতবিরোধ রয়েছে এবং মার্কসবাদীদের মধ্যে বিপ্লব ও বিপ্লব বিরোধী-এই দুটো নীতির সংগ্রাম চলেছে। মেনশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে মীমাংসা খুঁজেছিল প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা (municipalisation) এর মধ্যে। লেনিন তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন এবং বলেন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে এই সমস্যার কোন মীমাংসা সম্ভব নয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, যতো প্রগতিশীল আইনই রচিত হোক না কেন, বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামো সে আইনকে কার্যকর করতে পারে না। কৃষকের অবস্থা একই থেকে যাবে। তাই তিনি বলেছিলেন, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই একমাত্র এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই তো সেদিন, এমনকি রুশ পার্টির লেখক ইউদিন (Yudin) নেহেরুর মৌলিক বক্তব্য (basic approach) সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে নেহেরু আজও কৃষক সমস্যার সমাধান করতে পারেন নি এবং শান্তিপূর্ণ পথে কি করে এ সমস্যার সমাধান করা যায় তা তিনি করে দেখান; এবং নেহেরু তা পারবে না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে নেহেরু এই সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতেও পারেন নি।

সোভিয়েত পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর সংশোধনবাদের যে দরজা খুলে দেওয়া হল, যার ফলে আজকে সোভিয়েত রাষ্ট্র একটা সমাজবাদী রাষ্ট্র থেকে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে, সেই বিংশ কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের যে থিওরি দেওয়া হয়েছে, তাকেই মূলমন্ত্র করে আমাদের দেশের সংশোধনবাদীরা তারস্বরে চিৎকার করছে যে কৃষকের জমির সংগ্রাম একটা অর্থনৈতিক দাবীর সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কতা বলা হঠকারিতা। কী অদ্ভুত মিল ডাঙ্গে আর বাসব পুন্নায়ার কথায়। কী অদ্ভূত সহযোগিতা বিশ্বনাথ মুখার্জী এবং হরেকৃষ্ণ কোঙারের। এ ঘটনা আকস্মিক নয়, কারণ এর উৎস এক এবং সেটা হল মেনশেভিক বিপ্লব বিরোধী মহবাদ। তাই তো সোভিয়েত রাষ্ট্র ধূরন্ধরেরা বারবার ঘোষণা করছে যে ভারতবর্ষের খাদ্য সমস্যা সমাধান করা যায় কেবলমাত্র উন্নত বীজ আর চাষের উন্নত সাজ সরঞ্জাম দিয়েই। এই ভাবেই তারা ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে, জনতার চোখ থেকে ভারতবর্ষের খাদ্য, বেকারী, দারিদ্র প্রভৃতি সমস্যা সমাধানের মূল কার্যকরী পথ আড়াল করে রাখছে। কারণ ঐ সোভিয়েত রাষ্ট্র যে আজ বৃটিশ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের জনসাধারণের শোষক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারাও যে আমাদের দেশে পুঁজি খাটানোর চেষ্টা করছে দেশীয় ধনিকশ্রেণীর সহায়তায়! তারাও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাইতো তাদের মুখ দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীর যুক্তি বেরিয়ে আসছে অনর্গল স্রোতে, নির্দ্ধারিত বেগে। তাই তো বৃটিশ-মার্কিন সহযোগী হিসাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু এবং এদেরই পক্ষপূটে আশ্রয় নিয়ে ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার জনতার কাঁধে মৃতের বোঝা হয়ে টিকে আছে।

কিন্তু তবুও নকশালবাড়ী ঘটেছে এবং ভারতবর্ষে শত শত নকশালবাড়ী ধূমায়িত হচ্ছে। কারণ ভারতবর্ষের মাটিতে বিপ্লবী কৃষকশ্রেণী যে মহান তেলেঙ্গানার বীর বিপ্লবী কৃষকের উত্তরসূরী!  তেলেঙ্গানার বীর কৃষকদের সংগ্রামে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তদানীন্তন পার্টি নেতৃত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল মহান স্তালিনের নাম করে। আজকে যাঁরা পার্টির নেতা হয়ে বসে আছেন তাদের অনেকেই তো সেদিনকার বিশ্বাসঘাতকতার অংশীদার। তেলেঙ্গানার সেই বীরদের কাছে আমাদের নতজানু হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে শুধু বিদ্রোহের লাল পতাকা বহন করার শক্তির জন্যই নয়, তাঁদের কাছ থেকে শিখতে হবে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কর্ত্তৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার জন্যও। কী অসীম শ্রদ্ধা তাঁদের ছিল আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রতি, কমরেড স্তালিনের নানে তাঁরা নির্ভয়ে নিজেদের জীবন তুলে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের হাতে। এই বিপ্লবী বিশ্বস্ততা সব যুগে সব কালে প্রয়োজন বিপ্লব সংগঠিত করতে। তেলেঙ্গানার বীরদের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে-যারা স্তালিনের নাম নিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিরোধিতা করে তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে শত শত শ্রমিক ও কৃষকের রক্তে রঞ্চিত লাল পতাকা, তারা ঐ পতাকাকে কলঙ্কিত করেছে তাদের বিশ্বাসঘাতক হাতের স্পর্শে।

নকশালবাড়ী বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে। কারণ এ যে অজেয় মাকর্সবাদ লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ বিচারধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা জানি সামনে আছে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি, অনেক বিশ্বাসঘাতকতা, অনেক বিপর্য্যয়, কিন্তু তবু নকশালবাড়ী মরবে না, কারণ চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর উজ্জল সূর্যালোকের আর্শীবাদ এসে পড়েছে। যখন মালয়ের রবার বন থেকে ২০ বছর ধরে সংগ্রামরত বীররা অভিননন্দন জানান নকশালবাড়ীকে, যখন নিজেদের পার্টির সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জাপানী কমরেডরা অভিনন্দন জানান, যখন তা আসে অষ্ট্রেলিয়ার বিপ্লবীদের তরফ থেকে, যখন মহান চীনের সৈন্যবাহিনীর কমরেডরা অভিনন্দন জানান, তখন অনুভব করি: দুনিয়ার শ্রমিক এক হও-এই অমর বাণীর তাৎপর্যে, তখন একাত্মতা অনুভব করি, দেশে দেশে আমাদের পরম আত্মীয়দের জন্য বিশ্বাস দৃঢ় হয়। নকাশালবাড়ী মরে নি, আর নকশালবাড়ী কোনদিন মরবে না।

শারদীয়া দেশব্রতী১৯৬৭