‘অন্ধকারাচ্ছন্ন ছত্তিশগড়’ – ছত্তিশগড় নিয়ে APDR এর রিপোর্ট

nnn
apdr

ভারতবর্ষের প্রায় মাঝখানে অবস্থিত এই রাজ্যে বিগত ছয় মাস ধরে সংবাদ মাধ্যম এবং মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীদের ওপর বিভিন্নভাবে আক্রমণ শাণানো হচ্ছে। সাংবাদিক, আইনজীবী এবং অন্যান্য মানবাধিকার কর্মীদের অকারণ গ্রেফতার, প্রাণে মারার হুমকি, সংগঠিত প্রতিরোধের মাধ্যমে এমন অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যাতে ওখানকার কোনোরকম খবর বাইরের জগতের কাছে না পৌছায়।

সুরক্ষা সেনাদলের বাড়াবাড়ির খবর সংগ্রহকারী স্থানীয় সাংবাদিকদের নানারকম মনগড়া অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে, উপরন্তু তাদের পক্ষ অবলম্বনকারী আইনজীবীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। সুরক্ষা আইনের মোড়কে জনগণকে নিপীড়নের আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে ছত্তিশগড়কে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবার চিত্রনাট্য রচনা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় অনাচারের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশকে ব্যবহার করে তাদের দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে। সামাজিক একতা মঞ্চ (সোসাল ইউনিটি ফোরাম) এবং মহিলা একতা মঞ্চ (উওমেন’স ইউনিটি ফোরাম) নামক কিছু স্থানীয় ভুঁইফোঁড় সংস্থা, রাজ্য পুলিশের সহায়তায়, সাংবাদিক এবং বিরোধী বক্তাদের ভয় দেখাচ্ছে এবং নানাভাবে উত্তক্ত করছে। এই সমস্ত গোষ্টির সদস্য হিসাবে তাদেরকেই দেখা যাচ্ছে, যাঁরা নিষিদ্ধ সালোয়া জুড়ুম রক্ষীবাহিনীর সদস্য হিসাবে একসময় পরিচিত ছিল।

এই সমস্ত ঘটনা রাজ্যের বাস্তার অঞ্চল এবং তার আশ পাশে ঘটে চলেছে। বাস্তার দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রশক্তি এবং মাওবাদিদের শক্তি প্রদর্শনের কেন্দ্রস্থল। উভয়পক্ষের এই হিংসা এবং প্রতিহিংসার ফলে গুরুতর মানবিধাকার লঙ্ঘনের সাক্ষী এই বাস্তার। বিশেষ করে উভয়পক্ষের এই হামলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেখানকার স্থানীয় আদিবাসীরা। এই যেখানে পরিস্থিতি, সেখানে সংবাদ মাধ্যম এবং গণসংগঠনের মুখ বন্ধ করার অর্থ অধিকতর হিংসাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং তা দৃষ্টিগোচরে আনতে না দেওয়া।

এখানে কিছু তথ্য উল্লেখ করা আবশ্যক

১৬ই জুলাই ২০১৫ : সাংবাদিক সোমারু নাগ গ্রেফতার। অপরাধ – মাওবাদিদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ভারতীয় দণ্ডবিধির যে ধারাগুলি তার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে – ডাকাতি, অগ্নিসংযোগ, অপরাধ মূলক ষড়যন্ত্র এবং অস্ত্র আইন।

২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৫ : সাংবাদিক সন্তোষ যাদব গ্রেফতার। অপরাধ – সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সাহায্য করা। যে ধারায় অভিযুক্ত – বিশেষ জনসুরক্ষা আইন, ছত্তিশগড়। সেই সঙ্গে ভারতবর্ষের অন্যতম সন্ত্রাস দমন আইন – বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন।

সন্তোষ যাদব

নবভারত এবং দৈনিক ছত্তিশগড়ের পূর্বতন কর্মী। সশস্ত্র সংগঠন, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদি) নামক নিষিদ্ধ গোষ্ঠির সদস্য হিসাবে অভিযুক্ত। ইউ,এ,পি,এ এবং সি,এস,পি,এস,এ ধারাগুলিতে অভিযুক্ত। দোষী সাব্যস্ত হলে ১০বছরের সাজা।

বাস্তার জেলার দারবা নামক ছোট্ট একটি জনপদে সন্তোষ যাদবের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। স্কুলে পড়ার সময় তার ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে পুলিশ অফিসার হবার। কিন্তু হয়ে গেলেন সাংবাদিক। নিজের এলাকায় মাওবাদি সংগঠন এবং পুলিশি অত্যাচারের খবর বাইরের জগতের কাছে পৌছে দেওয়াই তার মুখ্য কাজ। নবভারত এবং দৈনিক ছত্তিশগড় নামক জাতীয় এবং স্থানীয় সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশক। কিন্তু রাষ্ট্রের সপক্ষে সংবাদ পরিবেশন করতে না চাওয়ার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দরবা জঙ্গলের ভেতর মাওবাদি দমনের নামে বদ্রিমাহু গ্রামের ৫জন আদিবাসীকে রাজ্য পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রামবাসীদের বক্তব্য তাদের মিথ্যা মামলায় ফাসানো হয়েছে। সন্তোষ যাদব বদ্রিমাহু থেকে শুধু এই ঘটনার বিবরণ পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, আদিবাসীদের জগদলপুরের আইনি সহায়তা কেন্দ্রের সাথেও যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে তারা আদালতে এই গ্রেফতারির বিরোধিতা করতে পারে।

রাজ্য পুলিশের হাতে আদিবাসীদের এই নিগ্রহ সন্তোষ যাদবের সংবাদের ফলে সকলের দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে এর কয়েকদিনের মধ্যেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের কারণ হিসাবে বলা হয়, ২৯শে সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র মাওবাদী নাশকতায় তিনি যুক্ত ছিলেন এবং সন্ত্রাস ও অপরাধ মূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে খুন এবং নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠন, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদি), এর সক্রিয় সদস্য হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ছত্তিশগড় জনসুরক্ষা আইন এবং ইউ এ পি এ ধারায় চার্জ গঠণ করা হয়েছে। এই দুটো আইনই আন্তর্জাতিক মানবিধিকার রক্ষা বিধি ও আরও অনেক আইনের পরিপন্থী। অভিযোগ প্রমাণে ১০ বছর জেল হওয়ার সম্ভাবনা।

তার পত্নী পুনম যাদব অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর ভারতীয় শাখাকে জানান,” ওর কাজের জন্য ওকে নানারকম ভাবে ভয় দেখানো হত। আমি ওকে অনেক সাবধান করেছি, এমনকি এই কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও কাজ খুজতেও বলেছি। কিন্তু ও বোলতো, আমি অন্যকে সাহায্য করছি, আমি কাউকে ভয় পাইনা। পুলিশ ওকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে।“

সন্তোষ যাদবের আইনজীবী, ঈষা খান্ডেলয়াল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে জানান যে, সন্তোষ যাদবকে পুলিশ মনগড়া কারণে গ্রেফতার করেছে। সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু বানানোর কারণ তার পাঠানো সংবাদে আদিবাসীদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়ছিল। তিনি এও বলেন, “ ২০১৩ সাল থেকে পুলিশ ওকে উত্তক্ত করছে। একবারতো পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে উলঙ্গ করে অপমানিত করে। ওকে পুলিশি চর বানানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে।“

“ তার একটাই অপরাধ, সে সাংবাদিকতার কাজকে ছাপিয়ে গ্রামবাসীদের আইনি সহায়তা পেতে সাহায্য করেছে। বাস্তারের পুলিশ চায়, সাংবাদিকরা কেবলমাত্র তাদের হয়েই কথা বোলবে। সন্তোষ যাদব দুদিকের কথাই তার লেখায় প্রকাশ কোরতো।“ ন্যাশনাল ডেলি পত্রিকার সাংবাদিক, রাজকুমার সোনি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে বলেন, “ পুলিশের বোঝা উচিৎ যে, উভয়পক্ষের কথাই বলা সাংবাদিকের কাজ। মাওবাদীদের সাথে কথা বলেছে বলেই একজন সাংবাদিক মাওবাদী হয়ে যায়না।“

তিনি আরও বলেন, “ আপনি কোনো ঘটনার বিষয় পুলিশের কাছে জানতে চাইলে, পুলিশ বোলবে, আপনি দেশদ্রোহী তাই আপনাকে কোনো তথ্য দেওয়া যাবেনা।বাস্তারে মাওবাদীদের সাথে আপনি সাংবাদিক হিসাবে কালেভদ্রে একবার কথা বোলতে পারবেন ঠিক যেমন মুম্বাইয়ের সাংবাদিকরা সেখানকার শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ বা পুলিশ আধিকারিকের সাথে কথা বলেন কোনো ঘটনার বিষয় তাদের মতামত জানার জন্য। এমন কোনো আইন আছে কি যে সাংবাদিকরা মাওবাদীদের বক্তব্য প্রকাশ করতে পারবে না !”

সোমারু নাগ

একজন আদিবাসী সাংবাদিক। যিনি বাস্তারের থেকে প্রকাশিত ‘রাজস্থান’ পত্রিকায়, আদিবাসী গ্রামে জল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি গ্রামীন সমস্যার বিষয় খবর করতেন। সেই সঙ্গে তার খবরের একটা অংশ জুড়ে থাকতো রাজ্য পুলিশের হাতে আদিবাসীদের অযথা গ্রেফতার এবং তাদের জোর করে পুলিশের চর বানাবার চেষ্টার বিস্তারিত বিবরণ।

২০১৫ সালের ১৬ই জুলাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। মাওবাদী যোগ এবং তাদের সাথে ষড়যন্ত্র করে রাস্তা সারাইয়ের যন্ত্রপাতিতে আগুন লাগানোর অভিযোগ আনা হয়। তার বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধির অস্ত্র আইন, ডাকাতি, ইছাকৃত অগ্নিসংযোগের দ্বারা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার ধারা প্রয়োগ করা হয়। তার গ্রেফতারির বিরুদ্ধে তিরথগড় গ্রামে বিশেষ গ্রামসভা ডাকা হয় এবং সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে, সে নির্দোষ।

‘পত্রিকা’ সংবাদপত্রের জিনেশ জৈন এর বক্তব্য, “ বাস্তারে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানকার সাধারণ মানুষ, পুলিশ এবং মাওবাদী দুদিক থেকেই আতঙ্কগ্রস্ত। জগদলপুরের স্থানীয় সাংবাদিকরা অসহায় কারণ পুলিশের কথামতো না চললে তাদের যখন তখন পুলিশি নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। তাই সত্য ঘটনার প্রকাশ তাদের জীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে।“

প্রভাত সিং

প্রভাত সিং ‘পত্রিকা’ নামক হিন্দি দৈনিকের স্থানীয় সংবাদদাতা ছিলেন, সেইসঙ্গে ইটিভি দান্তেওয়াড়ার হয়েও কাজ করতেন। পুলিশের দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিনাবিচারে হত্যাকান্ডের ঘটনা তার খবরে উঠে আসে। হোয়াট’স অ্যাপ গ্রুপে তার সম্মদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে, তিনি সামাজিক একতা মঞ্চের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৬ই মার্চ পুলিশে অভিযোগ জানান। ১৯মার্চ তার এক নিয়োগকর্তা তারসাথে চুক্তি খারিজ করে দেয়। তার দুদিন পরে, পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকের সম্বন্ধে ১লা মার্চ হোয়াট’স অ্যাপ গ্রুপে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের জন্য পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

ইনফরমেশন টেকনোলজি আইনের ৬৭ এবং ৬৭এ ধারায় (ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে অশ্লীল মন্তব্য প্রকাশ ও প্রচার) অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর আগেও তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, ভীতি প্রদর্শন এবং পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ইত্যদি ধারায়ও অভিযোগ আনা হয়েছিল।

প্রভাত সিং এর অভিযোগ, বন্দি অবস্থায় পুলিশ তার ওপর অত্যাচার করে। তার আইনজীবী জিটিজ দুবের বক্তব্য, “ প্রভাত সিং কে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় সোমবার এবং এফ আই আর ছাড়াই সম্পুর্ণ একদিন হেফাজতে রেখে দেওয়া হয়। অবশেষে মঙ্গলবার যখন তাকে আদালতে তোলা হয়, সেখানে সে বিচারককে তার প্রতি অত্যাচারের কথা বলে। তার বুকে এবং হাতে অত্যাচারের অনেক চিহ্ন তখনো বর্তমান।“

মালিনী সুব্রামানিয়াম

মালিনী সুব্রামানিয়াম অনলাইন সংবাদপত্র ‘স্ক্রল’ এ ধারাবাহিকভাবে ছত্তিশগড় পুলিশকৃত মানবাধিকার লঙ্ঘন, যৌন অত্যাচার, সাংবাদিকদের অকারণ হেনস্থা ও গ্রেফতার এবং মনগড়া মাওবাদী আত্মসমর্পণ বিষয় লিখতেন।

২০১৬র ১০ই জানুয়ারি সামাজিক একতা মঞ্চের কিছু সদস্য তার জগদলপুরের বাড়িতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে বাস্তার এবং পুলিশের পক্ষে মানহানিকর কার্যকলাপের অভিযোগ আনে।

৭ই ফেব্রুয়ারি জনাবিশেক লোক, যাদের মধ্যে সামাজিক একতা মঞ্চের সদস্যও ছিল বলে তিনি চিনতে পেরেছিলেন, তার বাড়িতে চড়াও হয়। তার প্রতিবেশীদের তার বাড়িতে ঢিল ছুঁড়তে বলা হয় এবং তার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেওয়া হয়, সে নাকি সশস্ত্র মাওবাদী দলের সদস্য এবং তাকে বাস্তার ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। সেদিন অধিক রাতে তার বাড়িতে ঢিল মারা হয় যার ফলশ্রুতিতে তার গাড়ির পিছনের কাঁচ ভেঙ্গে যায়। পরের দিন সামাজিক একতা মঞ্চ সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে একটা বক্তব্য প্রচার করে যাতে বাস্তারকে বিকৃতভাবে প্রদর্শিত করা এবং মাওবাদী দর্শনের প্রচারক হিসাবে তাকে তুলে ধরা হয়।

মালিনী সুব্রামানিয়াম অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে জানান যে, “ এই আক্রমণ কেবলমাত্র একজন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়, এটা একজন সাংবাদিককে বাস্তব সত্য প্রকাশ থেকে বিরত করার চেষ্টা, যা ওরা লুকোতে চায়।“ সাংবাদিকরা ইতিপূর্বে ছত্তিশগড় রেড ক্রশের আন্তর্জাতিক সংগঠণের কার্যালয়ে বসে কাজ করতেন, ২০১৩ সালে রাজ্য সরকার এক আদেশবলে এই কার্যালয় বন্ধ করে দেয়।

তার আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ৮ই ফেব্রুয়ারি তার বাড়ির ঘটনার এফ আই আর নিতে চায়নি, তাদের নাকি কোনো এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের থেকে এর জন্য অনুমতি নিতে হবে, যিনি সেই সময় বেড়াতে গেছেন। অবশেষে ৯ই ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকের অনুপস্থিতিতে পুলিশ এফ আই আর নথিভুক্ত করে, যাতে কিছু অজ্ঞত পরিচয় ব্যক্তির নামে অন্যের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ এবং পঞ্চাশ টাকার সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়। এফ আই আরে ৭ই ফেব্রুয়ারির ঘটনার কোন উল্লেখ নেই, এমনকি সুব্রামানিয়াম যাদের চিনতে পেরেছিলেন বলেছিলেন তারও কোনো উল্লেখ নেই।

১৭ই ফেব্রুয়ারি পুলিশ সাংবাদিকের বাড়িওলাকে জিঞ্জাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠায়। বাড়িওলা ফিরে এসে তাঁকে যতশীঘ্র সম্ভব বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে। সেইদিনই পুলিশ তাঁর গ্রহভৃত্যকে দীর্ঘক্ষন আটকে রেখে জিঞ্জাসাবাদ করে। তাঁর নিরাপত্তার কথা ভেবে স্ক্রল তাঁকে জগদলপুর ছেড়ে চলে যেতে বলে। সাংবাদিক এবং তাঁর পরিবার পরেরদিন জগদলপুর ত্যাগ করে চলে যায়।

বেলা ভাটিয়া

বেলা ভাটিয়া একজন স্বাধীন গবেষক এবং মানবাধিকার কর্মী। যিনি একবছরেরও বেশি সময় বাস্তারে থেকে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি জগদলপুর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পারপা নামে একটা গ্রামে থাকেন। বেলা ভাটিয়া একসময় সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটি নামক প্রখ্যাত গবেষনা সংস্থায় কাজ করতেন। সেখানেই তিনি তেলেঙ্গানার নকশাল আন্দোলন এবং বাস্তারের সালোয়া জুড়ুম আন্দোলনের বিষয় মনযোগী হন। ভারত সরকারের প্ল্যানিং কমিশন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত “ডেভেলপমেন্ট চ্যালেঞ্জেস ইন এক্সট্রিমিস্ট অ্যাফেক্টেড এরিয়া” সংগঠনে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।

এই গবেষক আরও কয়েকজনের সাথে মিলে, অক্টোবর ২০১৫ থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবাধ যৌন অত্যাচারের বিরুদ্ধে, আদিবাসী মেয়েদের এফ আই আর করতে সাহায্য করেছিলেন।

২০১৬ সালের ২১শে জানুয়ারি বেলা ভাটিয়া কিছু সক্রিয় কর্মীর সঙ্গে বিজাপুরে কয়েকজন আদিবাসী মহিলাকে এফ আই আর করতে সাহায্য করছিলেন। সেইসময় সেখানে ‘নকশাল পীড়িত সঙ্ঘর্ষ সমিতি’ নামে একটি দলের সদস্যরা জড়ো হয়ে তার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয় যে, সে নাকি প্রতিরক্ষা বাহিনীর নামে কুৎসা রটাচ্ছে। ২৯শে জানুয়ারি সেই একই দল বিজাপুরে বেলা ভাটিয়া এবং সোনি সুরির বিরিদ্ধে মিছিল করে এবং তাদের কুশপুত্তলিকা পোড়ায়। সেইসঙ্গে তাদের সতর্ক করা হয় বিজাপুরে না ফিরতে।

১৯শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ বেলার বাড়িতে গিয়ে তার বাড়িওয়ালা এবং বাড়িওয়ালার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। গ্রাম সংসদের প্রধানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ তার বাড়িওয়ালাকে পরের দিন থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসতে বলে। তিনদিন পরে পুলিশ আবার তার বাড়িতে আসে এবং ছবি তুলে নিয়ে যায়।

সুকমায় নাকি সশস্ত্র মাওবাদীদের পাতা ল্যান্ডমাইনে একটা আট বছরের বাচ্চার মৃত্যু ঘটেছে, তার নিন্দায় ১৮ই মার্চ মহিলা একতা মঞ্চ জগদলপুরে একটা প্রতিবাদ সভা ডেকে প্রস্তাব আনে যে, বেলা ভাটিয়া এবং মানবাধিকারের কথা বলা আইনজীবী শালিনী গেরা কে বাস্তার ছাড়তে হবে। শুধু তাই নয় তাদের আরও দাবি এদের বিরুদ্ধে ছত্তিসগড়ের বিশেষ জন নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করতে হবে।

২৬শে মার্চ বেলা ভাটিয়ার অনুপস্থিতিতে দলে দলে লোক তার বাড়ি গিয়ে তার বাড়িওয়ালাকে পরামর্শ দিয়ে আসে যে, তাকে যেন বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া হয় কারণ সে নাকি নকশাল সন্ত্রাসবাদী। প্রতিবাদিরা মিছিল বার করে প্রচারপত্র বিলি করে, যাতে বলা হয়, “ মাওবাদী বেলা ভাটিয়াকে চিনে রাখুন, সে আপনাদের মধ্যে ঘাঁটি গেড়েছে।……… বেলা ভাটিয়া দেশকে ধংস করা বন্ধ কর……..বেলা ভাটিয়া বাস্তার ছাড়ো।

২৪শে মার্চ একটা খোলা চিঠিতে বেলা ভাটিয়া বলেন যে বাস্তার ছেড়ে যাবার কোনো পরিকল্পনাই তার নেই। তিনি লেখেন, “ গণতন্ত্র সেই সমাজ গড়ার লক্ষে কাজ করে যেখানে কোনো অত্যচারি বা অত্যাচারিত নেই। অর্থাৎ, সেই সমাজে সকলের কথা বলার স্বাধীনতা আছে। আমি বিশ্বাস করি আমরা বাস্তারে সেই সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।“

ঈশা খান্ডেলয়াল এবং শালিনী গেরা

ঈশা খান্ডেলয়াল এবং শালিনী গেরা জগদলপুর আইনি সহায়তা কেন্দ্র, ‘জগলগ’ এর সদস্য। যারা ২০১৩ সাল থেকে ছত্তিসগড়ের পাঁচটি জেলার বন্দিদের বিনাপারিশ্রমিকে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে। তাদের বহু মক্কেল আদিবাসী সমাজের মানুষ, যাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মাওবাদীর তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছে। এই আইনজীবীদের নিজস্ব অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে যে, পুলিশ সামান্য কারণে আদিবাসীদের গ্রেফতার করে এবং আদালতে পেশ করার আগে দীর্ঘদিন তাদের জেলে বন্দি থাকতে হয়।

২০১৫ সালে পুলিশ জগলগের সদস্যদের জেরা করে, কারণ কোনো এক অজানা সূত্র থেকে তাদের কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, জগলগের সদস্যদের বাস্তারে আইনি কাজ করার যোগ্যতা নেই। জগলগের আইনজীবীদের যাতে কাজ করতে না পারে তার জন্য ২০১৫ অক্টোবরে বাস্তারের বার অ্যাসোসিয়েশন তাদের সাধারণ সভায় একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাতে বলা হয়, রাজ্য বার কাউন্সিলের সদস্য ছাড়া অন্য কেউ জগদলপুর বিচারালয় কাজ করতে পারবে না।

৭ই ফেব্রুয়ারি মালিনী সুব্রামনিয়মকে তাঁর বাড়ি আক্রমণের ঘটনায় তাকে এফ আই আর করতে সাহায্য করেন। দুদিন পরে সামাজিক একতা মঞ্চ বক্তব্য রাখে যে তারা জগলগের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘোষনা করছে কারণ জগলগ নাকি সমাজসেবার নাম করে নকশালদের সাহায্য করছে।

১৭ই ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ এসে আইনজীবীদের বাড়িওয়ালাকে স্থানীয় থানায় তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে ফিরে এসে বাড়িওয়ালা আইনজীবীদের জানান যে তিনি অনন্যোপায় হয়ে তাদের বলছেন, অফিস এবং বাসস্থান সরিয়ে তার বাড়ি যেন ফাঁকা করে দেওয়া হয়। শালিনী গেরার কথায়, “পুলিশ তাকে নির্দেশ দিয়েছিল যেন দু একদিনের মধ্যেই আমরা বাড়ি ফাঁকা করে দিই।“

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে একজন পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছিল যে, বাড়িওয়ালাকে পুলিশ সম্পুর্ণ ভিন্ন কারণে ডেকে পাঠিয়েছিল। সেইদিনই বেলার দিকে সামাজিক একতা মঞ্চ আবার জগলগের বিরুদ্ধে মাওবাদীদের রক্ষা করছে বলে জনসভায় দাবি করে। শালিনী গেরার ভাষ্যে, “ সাংবাদিক সম্মেলন করে তারা বলে, আমরা তাদের পরবর্তী লক্ষ্য কারণ আমরা রক্তপিপাসু মাওবাদীদের সমর্থন করছি। আরও অনেক অভিযোগের সাথে এও বলা হয় যে, আমরা বিদেশী মদ্যপান করি, বড়লোকি চালে চলি এবং অসামাজিক জীবনযাপন করি।“

১৯শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল বাস্তারে একটা সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন এবং জগলগের আইনজীবীদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কার কথা ঘোষণা করেন। সেই রাতেই ঈশা খান্ডেলয়াল এবং শালিনী গেরা জগদলপুর ত্যাগ করেন।

বন্দিরা ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত

জগদলপুর আইনি সহায়তা সংগঠনের অনুসন্ধানে ২০১৩ সালে জগদলপুরের বিভিন্ন জেলে বিনাবিচারে আটকে রাখা বন্দিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার অসংখ্য ঘটনা ধরা পরে। আইনজীবীদের অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে আসে যে, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ধান্তেওয়াড়ায় যতজন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিল তাদের ৯৬ শতাংশ বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। তা সত্ত্বেও বহু বিচারাধিন বন্দিকে দীর্ঘদিন জেলে কাটাতে হয়েছে। ২০১৩ সালে ধান্তেওয়াড়া জেলা সংশোধনাগারের প্রায় অর্ধেক বন্দি বিচার শুরুর আপেক্ষাতেই একবছরের বেশি জেলে কাটিয়ে ফেলেছে।

অনুসন্ধানে এও দেখা যাচ্ছে যে জগদলপুর, ধান্তেওয়াড়া এবং কাঁকের জেলার প্রধান সংশোধনাগারগুলি যথাক্রমে ২৬০ শতাংশ, ৩৭১ শতাংশ এবং ৪২৮ শতাংশ অতিরিক্ত বন্দিতে ভরতি। যেখানে বিচারাধীন বন্দির জাতীয় গড় ৬৭ শতাংশ সেখানে ধান্তেওয়াড়া এবং কাঁকের জেলার সংশোধনাগারগুলিতে বিচারাধীন বন্দি প্রায় ৯৭ শতাংশ যাদের অধিকাংশই নিরক্ষর আদিবাসী।

আইনজীবীরা এমন উদাহরণও পেয়েছেন যেখানে পুলিশ তথ্যপ্রমাণে কারচুপি করেছে, মাওবাদীদের সাথে গুলি বিনিময়ের সময় মাওবাদীরা তাদের সতীর্থদের নাম ধরে নাকি এতটাই উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করছিল যে ৫০জন মাওবাদীর নাম পুলিশ জানতে পেরেছে। বেলচা এবং লাঙ্গল ধারি গ্রামবাসীদের পুলিশ অস্ত্র আইনে গ্রেফতার করেছে। কিছু কিছু অভিযুক্তের ফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, তাদের বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত করে বছরের পর বছর জেলে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে অথচ কোনো অভিযোগই শেষপর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

সোনি সুরি

সোনি সুরি আন্তর্জাতিক অ্যামনেস্টির হয়ে রাজনৈতিক বন্দি এবং আদিবাসীদের জন্য কাজ করেছেন। সোনি সুরি ও তার ভাইপো লিঙ্গারাম কোডোপি দির্ঘদিন ধরেই প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং মাওবাদীদের হাতে ছত্তিসগড়ের মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় সরব।

সোনি সুরি একজন শিক্ষিকা এবং লিঙ্গারাম সাংবাদিক। এসার নামক একটি নথিভুক্ত সংস্থার হয়ে তথ্য সরবরাহের অজুহাতে ২০১১ সালের অক্টোবর এবং সেপ্টেম্বর মাসে তাদেরকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পুলিশের দাবী, মাওবাদীদের আক্রমণের হাত থেকে ব্যবসা বাঁচানোর ব্যবস্থা হিসাবে এরা এসারের থেকে টাকপয়সা সংগ্রহ করে মাওবাদীদের হাতে পৌছে দিত। ২০১৪ সাল থেকে ‘আম আদমি’ দলের সদস্য সোনি সুরি তার বিরুদ্ধে আনা ৫টা মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছন এবং লিঙ্গারাম এখনো পর্যন্ত দুটো মামলার একটায় খালাস পেয়েছেন।উভয়েই অভিযোগ করেছেন যে, বন্দিদশায় থাকাকালীন পুলিশ তাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। ২৯শে অক্টোবর আদালতের নির্দেশে সরকারি হাসপাতালে সোনি সুরির ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় তার যোনিপথে দুটি এবং পায়ুছিদ্রে একটি পাথর পাওয়া যায়, সেইসংগে তার মেরুদণ্ডে গভীর ক্ষত ধরা পড়ে।

২০১৬সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি রাতে সোনি সুরি এক সহকর্মীর সাথে জগদলপুর থেকে ছত্তিসগড়ের গিদামে তার বাড়ি ফেরার সময় তিনজন অজানা মোটরসাইকেল আরোহী তাদের রাস্তা আটকায় এবং সোনি সুরির মুখে কিছু রসায়নিক পদার্থ ছুঁড়ে মারে। ভয়ঙ্কর যন্ত্রণার সাথে কিছক্ষনের জন্য তার দৃষ্টি সম্পুর্ণরুপে চলে যায়। প্রথমে তাকে জগদলপুরের একটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে চিকিৎসার জন্য তাকে দিল্লীর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।

সোনি সুরি তার আগে ‘মরদুমে’র বেআইনি হত্যাকাণ্ডের জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে বাস্তার পুলিশের এক অত্যন্ত উচ্চপদস্থ আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফ আই আর করার চেষ্টা করছিলেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সোনি সুরি বলেন যে ২০শে ফেব্রুয়ারি আক্রমণকারীরা তাঁকে ওই চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হুমকি দিয়েছে।

এই ঘটনার পর ছত্তিশগড় প্রশাসন, রাজ্য পুলিশের একটা অনুসন্ধানকারী দল গঠণ করে। সোনি সুরির পরিবারের অভিযোগ এই বিশেষ অনুসন্ধানকারী দল লিঙ্গারাম এবং সোনি সুরির ভগ্নীপতি অজয় মার্কম কে জিজ্ঞাসাবাদের আছিলায় বারংবার থানায় ডেকে পাঠিয়ে চাপ দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে যে, এই আক্রমণে তাদের হাত ছিলো। ২০১৬ সালের ১০ই থেকে মার্চ থেকে তিনবার অজয় মার্কম কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে গিয়ে জগদলপুর পুলিশ স্টেশনে প্রায় ৩০ ঘণ্টা জেরা করা হয়। তার কথায় ওই সময় তার ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে তিনি জানান, “ আমাকে প্রচুর মারধর করা হয় এবং সোনি সুরির ওপর আক্রমণে আমার হাত আছে সেটা স্বীকার করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। আমাকে মাটিতে ফেলে সারা শরীরে পায়ের জুতো দিয়ে মারা হয়।“

দীপক জয়সোয়াল

দীপক জয়সোয়াল ‘দৈনিক দৈনন্দিনীর’ সাংবাদিক হিসাবে ২০১৫ সালে ওই অঞ্চলের বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ব্যপক দূর্ণীতি নিয়ে অসংখ্য খবর প্রকাশ করেছিলেন। দীপক জয়সোয়াল প্রভাত সিং এর অত্যন্ত কাছের বন্ধু ছিলেন। ২৬শে মার্চ ধান্তেওয়াড়ার স্থানীয় কোর্টে প্রভাত সিং এর জামিনের আবেদন করার সময়, পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারণ ৭মাস আগে একটা স্কুলের অধ্যক্ষ তার বিরুদ্ধে অনধিকার হস্তক্ষেপ এবং সরকারি আধিকারিকের কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ জানিয়েছিল। স্কুল অধ্যক্ষের অভিযোগ জয়সোয়াল স্কুলের নামে মিথ্যা রিপোর্ট লেখার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবী করে। জয়সোয়ালের আইনজীবী জিটিজ দুবের বক্তব্য, “ স্কুলের পরীক্ষায় দুর্ণীতির বিষয় তদন্ত না করে পুলিশের সেই দুর্ণীতির সংবাদদাতাকেই গ্রেফতার করছে। ঘটনার বিষয় অনুসন্ধান না করে যে খবর দিল তাকেই দোষী বলে ধরা হচ্ছে। এই যেখানে অবস্থা সেখানে সাংবাদিকরা কোন ভরসায় থাকবেন?”

আইন

ছত্তিশগড়ে সাংবাদিকদের গ্রেফতারে একটা বিষয় পরিষ্কার যে এই আইনে সরকার বিরোধি কথা বলা অপরাধ।

বেআইনি কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন (ইউ এ পি এ)

১৯৬৭ সালে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ রোধের উদ্দেশ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হয় যা ২০০৪, ২০০৮ এবং ২০১২ সালে পরিমার্জিত হয়। টাডা (টেররিস্ট এন্ড ডিসরাপ্টিভ অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট, ১৯৮৭) নামক ভয়ঙ্কর আইন, যকে পরর্তিকালে অপ্রায়োগিক করে দেওয়া হয় এবং পোটা (প্রিভেনশন অব টেররিজম অ্যাক্ট)আইন, যা পরবর্তিকালে ব্যপক সমালোচনার মুখে তুলে নেওয়া হয়, এই দুয়ের বিভিন্ন ধারা যোগ করে এই বেআইনি কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন বা আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট টি তৈরি করা হয়েছে।

ইউ এ পি এ আইনের অনেকগুলি ধারা ভারতবর্ষে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতার পরিপন্থী। বিশেষত ভারত যার মুখ্য প্রবক্তা সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদেরও বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এই আইন।

এই আইনে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সে সাধারণ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা অনেকাংশেই অতিরঞ্জিত ও অনির্দিষ্ট। যেমন সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে, ‘যে সকল কাজের দ্বারা কোনো সম্পত্তির ক্ষতি বা লোকসান বা ধংস সাধন হতে পারে বা হবে বলে মনে হয়।‘

এই আইনে কোনো সন্ত্রাসবাদী দলের সদস্য কে বা কারা তা কিভাবে নির্ধারিত হবে সে ব্যাপারে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলা নেই। বেআইনি কাজ বোঝাতে গিয়ে অত্যাধিক বড় ব্যাখ্যা প্রণয়ন করা হয়েছে, যেমন সেই সমস্ত কার্যকলাপ যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব বা দেশের ভুখন্ডের প্রতি যে কোনো রকমের দাবি, প্রশ্ন বা ব্যহত করার চেষ্টা অথবা যে সকল কাজের দ্বারা দেশের প্রতি অসম্মান প্রদর্শিত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

এই আইনি সংজ্ঞা ভারতবর্ষের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, একত্রিত বা সম্মিলিত হওয়ার অধিকারকে অত্যাধিক রকম সঙ্কুচিত করে।

এই আইন বলে বিচারাধীন বন্দিকে ন্যুনতম ৩০দিন এবং অধিকতম ১৮০ দিন আটকে রাখা যায়, যা আন্তর্জাতিক মানদন্ডের অনেক বেশি। এই অনুবিধির দ্বারা ভারতবর্ষ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, সমস্ত আটক বন্দিকে দ্রুত তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্বন্ধে অবহিত করতে হবে, যুক্তিসংগত সময়সীমার মধ্যে আদালতে পেশ করতে হবে অথবা ছেড়ে দিতে হবে।

এই আইনে বিচারাধীন বন্দিকে যাতে অমানবিক অত্যাচার এবং অন্যান্য হিংস্র নিষ্ঠুরতার শিকার না হতে হয় সে বিষয় স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এই আইনের কোনো ধারায় গুরুতর আইনভঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই অথচ আইনের পরিভাষায় আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকে নিরপরাধ হিসাবেই ধরতে হবে।

২০০৫ সাল থেকে মধ্য ভারতের বহু সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মী এবং অন্যান্য মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীদের মিথ্যা অভিযোগে জেলে পোরা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পিপলস্‌ ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবারটিস এর বিনায়ক সেন, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার আদিবাসী নেতা কারতাম জোগা।

ভারতবর্ষের মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলনকারীরা এমন অসংখ্য উদাহরণ তুলে এনেছেন যেখানে এই আইনকে অন্যায়ের হাতিয়ার করা হয়েছে। আদিবাসী এবং দলিত সমাজের মানুষকে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে, বাক্ স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হওয়ার সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে নস্যাৎ করে, তাদের জেলে বন্দি করার লক্ষে, মিথ্যা অভিযোগ এবং সাজানো তথ্যের ভিত্তিতে ইউ এ পি এ আইনকে যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বহু ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠন এবং মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠনের কর্মীদের প্রতিকূল পরিবেশের কথা ভেবে ইউনাইটেড নেশনস এর বিশেষ আধিবেশনেও এই আইন তুলে নেবার আবেদন জানানো হয়েছে।

ছত্তিশগড় স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট

২০০৫ সালে মাওবাদী সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্দেশ্যে ছত্তিশগড় স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর প্রবর্তন করা হয়। এই আইনের বিভিন্ন ধারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি ভারতবর্ষের দায়বদ্ধতার বিরোধী।

বেআইনি কার্যকলাপের সংজ্ঞা হিসেবে এই আইনে যা বলা হয়েছে তা অতিরঞ্জিত এবং অনেকাংশেই অবাস্তব। উদাহরণ স্বরূপ, এই আইনে বলা হয়েছে ‘জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হতে পারে বলে যদি মনে হয়’ বা ‘সরকারি আধিকারিককে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সাজানো হয়’ বা ‘চলতি আইন এবং প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাহ্য করা বা অগ্রাহ্য করতে যদি উৎসাহিত করা হয়’ তবে তা আইনভঙ্গের সামিল হিসাবে বিবেচিত হবে।

বেআইনি সংগঠন এর সংজ্ঞায় সেই সমস্ত সংগঠনকে ধরা হয়েছে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বেআইনি কার্যকলাপকে উৎসাহিত করে। যে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি যদি বেআইনি কার্যকলাপ করে বা করতে পারে বা করবার পরিকল্পনা করে তবে ৭ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। বেআইনি সংগঠনের সদস্য হলেও তার ৩ বছরের জেল হতে পারে।

এই ধরণের বিস্তারিত সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতিকূল এবং ভারতীয় সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হওয়ার বিরোধী। সন্ত্রাসবাদের খবর প্রকাশকেও ‘‘জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হতে পারে” বলে এই আইনে অভিযোগ আনা যেতে পারে।

সন্ত্রাসবাদ বা সেই সম্পর্কিত যে কোনো আইনকে সঠিক এবং নিশ্চিত হতে হয়। সন্ত্রাস দমন আইনকে উপযুক্ত এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগ করা উচিৎ। ইউনাইটেড নেশনস এর মানবাধিকার রক্ষা কমিটি আন্তর্জাতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর কারি মুখ্য দেশ ভারতবর্ষকে এই বার্তা দিয়েছে যে আহ্বায়ক দেশ হিসেবে ভারতবর্ষকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, সন্ত্রাসদমন আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনাতিরিক্ত এমন কিছু করা চলবে না যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যহত হতে পারে। মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠনের কর্মীদের প্রতিকূল পরিবেশের কথা ভেবে ইউনাইটেড নেশনস এর বিশেষ আধিবেশনেও সি এস পি এ আইন তুলে নেবার আবেদন জানানো হয়েছে।

দমন নীতির বাস্তব চিত্র

ছত্তিশগড়ের ইতিহাসে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর আক্রমণের এটাই প্রথম ঘটনা নয়। ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা একদিকে সালোয়া জুড়ুম নামক সশস্ত্র সংগঠণ এবং অন্যদিকে রক্ষীবাহিনীর দ্বারা শারীরিক নিগ্রহ, ভীতিপ্রদর্শন, হিংসা, আকারণ বন্দিদশা, অত্যচার এবং যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন।

২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট ছত্তিশগড় রাজ্য এবং ভারত সরকারকে আদেশ দেয় যে, রাষ্ট্রীয় সাহায্যপ্রাপ্ত বেসামরিক রক্ষীবাহিনীকে ভেঙ্গে দিতে হবে ও সমস্ত অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সেইসঙ্গে ওই সংগঠনের সদস্যদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

যদিও তারপরে সালোয়া জুডুমকে অন্যরূপে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছিল। ২০১৫ সালের মে মাসে, কংগ্রেসের যে নেতার হাতে সালোয়া জুডুম তৈরি হয়েছিল তার ছেলে মাওবাদীদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ‘বিকাশ সংঘর্ষ সমিতি’ (ডেভেলপমেন্ট স্ট্রাগল কমিটি) নামক সালোয়া জুডুমের মতো একটা সংগঠন তৈরি করে।

বিগত কয়েকমাস ধরে বিভিন্ন দলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা, আপাতদৃষ্টিতে পুলিশের সমর্থনে, কিছু সংগঠন তৈরি করেছে। সামাজিক একতা মঞ্চ সেই ধরণের একটা সংগঠন যারা খোলাখুলি সরকার বিরোধীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। এই ধরণের সংগঠনগুলি ক্রমশঃ সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরও বেশি আক্রমনাত্মক হয়ে উঠছে।


ছত্তিসগড়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার ডাক্তার – আইনজীবী – সাংবাদিকরাও

ডাঃ শৈবাল জানা

ডাঃ শৈবাল জানা

চব্বিশ বছর আগেকার এক মামলায় গ্রেপ্তার করা হল ছত্তিসগড়ের এক চিকিত্সককে৷ নিহত শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর হাতে গড়া ‘ছত্তিসগড় মুক্তি মোর্চা’ পরিচালিত দল্লি রাজহারার শহিদ হাসপাতালের চিকিত্সক , এ দেশে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী সংগঠক শৈবাল জানাকে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার করে রমন সিং সরকারের পুলিশ৷ শনিবার বিকেলে ছত্তিসগড় থেকে ফোনে আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ জানিয়েছেন , আদালতে হাজির করা হলে বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ হয়৷ তবে মেডিক্যাল রিপোর্টের ভিত্তিতে আপাতত শৈবালবাবুকে দুর্গের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ শ্রমিকদের চাঁদায় গড়ে ওঠা এই হাসপাতালটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বহু মানুষের সহযোগিতায় ধারাবাহিক ভাবে চিকিত্সা পরিষেবা দিয়ে আসছে৷ চিকিত্সক শৈবাল জানা হাসপাতালটির সঙ্গে যুক্ত প্রায় গোড়া থেকেই৷ ১৯৯১ -এর ২৮ সেপ্টেম্বর খনি মালিক -মাফিয়াদের বাহিনী হত্যা করে শঙ্কর গুহ নিয়োগীকে৷ প্রতিবাদের ঢল নামে৷ ‘৯২ -এর ১ জুলাই ভিলাই শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের রেল রোকো আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়৷ ১৫ জন শ্রমিক নিহত হন৷ আহত শ্রমিকদের চিকিত্সার কাজে যুক্ত ছিলেন শৈবালবাবু৷ সেই ঘটনার সূত্রেই ২৪ বছর পরে তাঁকে গ্রেন্তার করা হল ‘সরকারি কাজে বাধাদানে ‘র অভিযোগে৷ মামলা যে ছিল , এতকাল জানতেই পারেননি শৈবালবাবু৷ শ্রমিক ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের স্বার্থে প্রতিবাদী বা প্রশ্নকারীদের কণ্ঠরোধে গ্রেন্তার -হয়রানি -অত্যাচারের যে নীতি নিয়ে চলেছে ছত্তিসগড়ের বিজেপি সরকার , শৈবালবাবুর গ্রেন্তারি তারই অন্যতম নজির৷ তাঁরা ওই চিকিত্সকের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন৷ এর আগে গত মাসেই বস্তারে আদিবাসী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেত্রী সোনি সোরির উপর অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটে৷ সোনির বোন অপহূত হয়েছেন৷ তাঁর বছর ষোলোর মেয়েকে ‘চরম শিক্ষা ‘ দেওয়ার হুমকি -চিঠি পাঠানো হয়েছে৷ পুলিশ -প্রশাসনের মদতেই এই হামলা -হয়রানির বলে অভিযোগ৷ উল্টে প্রশাসনিক মহল থেকে দায় চাপানো হয় নকশালপন্থীদের উপরে৷ ওই ঘটনার পরে ‘এই সময় ‘ থেকে বাস্তারের জেলাশাসক অমিত কাটারিয়াকে ফোন করা হলে সোনির উপর হামলাকে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে তিনি শুনিয়ে দেন , চলতি বছর প্রথম দেড় মাসেই ৫০ জন নকশালবাদীকে ‘খতম ‘ করেছে প্রশাসন৷ প্রজাতন্ত্র তার নাগরিককে হত্যা করতে পারে না —সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলেও বস্তারের ডিএম আমল দেননি৷ ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যার অভিযোগ উঠলেও কোনও রকম তদন্ত হবে না বলে জানিয়ে দেন৷ এর পর অবশ্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্তে যায় বস্তারে৷ যদিও কমিশনের রিপোর্টের কথা জানা যায়নি এখনও৷ সোনির উপর হামলার আগে জগদলপুরে কর্মরত দুই আইনজীবী শালিনী গেরা , ইশা খান্ডেলওয়ালকে হুমকির মুখে রাজ্য ছাড়া করা হয়৷ তাঁদের বাড়িওয়ালাকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে হঁশিয়ারি দিয়ে বাধ্য করা হয় শালিনীদের চলে যেতে বলার জন্য৷ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে অত্যাচারিত , মিথ্যা মামলার জড়িয়ে যাওয়া বস্তার -সহ ছত্তিসগড়ের অসংখ্য নাগরিককে আইনি সহায়তা দেওয়ার কাজ করছিলেন ইশা -রা৷ রাজ্য ছাড়া করার আগে কোর্টে তাঁদের প্র্যাকটিস বন্ধেও চেষ্টা হয়েছিল৷ রাজ্য বার কাউন্সিল তাঁদের প্র্যাকটিসের পক্ষে দাঁড়ালেও নানা ভাবে হুমকি দেওয়া চলছিল৷ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত বস্তারের আর এক সমাজকর্মী বেলা ভাটিয়াকেও রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সালাওয়া জুড়ুমের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে৷ বস্তারের আদিবাসী সমাজ , বিশেষত সেখানকার মহিলা ও শিশুদের উপর ধারাবাহিক সন্ত্রাসের তথ্য সংগ্রহে যুক্ত সাংবাদিক মালিনী সুব্রহ্মণ্যমকেও একই ভাবে হুমকির মুখে জেলা সদর জগদলপুর থেকে চলে আসতে হয়েছে৷ গত জানুয়ারিতে দেশের একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের যুক্ত-মঞ্চ সিডিআরও -র প্রতিনিধিরা ছত্তিসগড়ে যান তথ্যানুসন্ধানে৷ সেই তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে সুকমা -র জঙ্গলমহলে নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচারের রোমহর্ষক কাহিনি৷ তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্য এপিডিআর -এর অশোক দেবরায়ের কথায় , ‘নকশালবাদী মেয়েরা বিয়ে করেন না , এই ধারণা থেকে মেয়েদের মধ্যে নকশালবাদী খুঁজতে শুরু হয়েছে নতুন নির্মমতা –‘নকশালাইট টেস্ট ‘৷ পুরুষ জওয়ানের সামনে বুক উন্মুক্ত করে মেয়েদের স্তন টিপে দেখাতে হচ্ছে দুধ বেরোয় কি না ! অনেক সময় জওয়ানরাই সে কাজটা সারছে৷ যে নারীর স্তন থেকে দুধ নিঃসরণ হচ্ছে না , তাঁকেই অবিবাহিত নকশালবাদী সন্দেহে নিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী৷ চলছে যৌন নির্যাতন৷ ছত্তিসগড়ের এই নির্ভয়াদের কথা বাকি ভারত জানতেই পারছে না৷ বাহিনীর অত্যাচারে ছেলেরা গ্রাম ছাড়া৷ ভয়ঙ্কর ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করে খনি ও জঙ্গল মাফিয়াদের অবাধ লুঠের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে৷ ‘ আর মালিনীরা সেই অত্যাচারের প্রতিবেদন প্রকাশের খেসারত দিচ্ছেন এলাকা ছাড়া হয়ে৷ ডাক্তার শৈবাল জানাদের গ্রেন্তার হতে হচ্ছে অত্যাচারিত -আহত শ্রমিকের পরিচর্যার ‘অপরাধে ‘!

সূত্রঃ eisamay.indiatimes.com


ভারতঃ দক্ষিণ ছত্তিসগড়ে রেডক্রসের সাবেক প্রধান কর্মকর্তাকে পুলিশের হুমকি

Flag_of_red_cross_pictures

দক্ষিন ছত্তিসগড়ের আদিবাসীদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে লেখালেখির কারণে আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা নেতৃত্বে থাকা, [International Committee of The Red Cross [ICRC] ] ছত্তিসগড়ে রেডক্রসের সাবেক প্রধান কর্মকর্তা, ফ্রিল্যান্স লেখক মালিনী সুব্রামানিয়ামকে স্থানীয় পুলিশ হুমকি দিয়েছে। দি হিন্দু পত্রিকার সুত্রে জানা যাচ্ছে, রবিবার রাতে পুলিশ তার জগদলপুরস্থ বাসভবনে গিয়ে জানতে চায়- কেন তিনি বনে যান এবং আদিবাসীদের ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করছেন? এ সময় মিসেস সুব্রামানিয়াম ঐ কর্মকর্তাদের অফিসের নিয়মিত সময়সূচিতে দেখা করতে বলেন। রেডক্রসের সাবেক এই প্রধান কর্মকর্তা তার মেয়েকে নিয়ে দক্ষিন ছত্তিসগড়ের প্রধান শহর জগদলপুরেই বাস করছেন। এর আগে দক্ষিন ছত্তিসগড়ে পুলিশ কর্তৃক সহায়তা পাওয়া একটি স্থানীয় সংগঠন ‘সামাজিক একতা মঞ্চ’ তাকে ঐ অঞ্চলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নিয়ে লেখালেখি থেকে বিরত থাকতে বলেছিল।  মিসেস সুব্রামানিয়াম ঘনিষ্ঠ সূত্রে দি হিন্দুকে বলেন, ২০ সদস্যের ‘সামাজিক একতা মঞ্চ’ এর একটি দল তার কাছে গিয়ে জানতে চায়- কেন তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে লিখছেন এবং মাওবাদীদের বিরুদ্ধে নয় কেন ?

 মিসেস সুব্রামানিয়াম, একটি ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল এ দক্ষিণ ছত্তিসগড়ের বস্তার অঞ্চলে সাংবাদিকদের গ্রেফতার, মিথ্যে আত্মসমর্পণ ও আদিবাসীদের দমন করতে ‘ধর্ষণ’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক নিবন্ধ লিখেছিলেন। তার এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের তদন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক [এনএইচআরসি] অনুসন্ধানে ভুমিকা রেখেছিল। এর আগে তিনি দক্ষিণ ছত্তিসগড়ে ICRC-র প্রধান কর্মকর্তা থাকাকালীন মাওবাদী-অধ্যুষিত বিজাপুর ও সুকমা জেলার গ্রামের ভিতরে ভালো মানের ২টি মেডিকেল ক্লিনিক স্থাপন করেছিলেন।

icrc

অনুবাদ সূত্রঃ http://www.thehindu.com/news/cities/kolkata/former-red-cross-boss-threatened-in-south-chattisgarh/article8092596.ece


ভারতঃ ছত্তিসগড়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ মাওবাদীদের, খতম এক পুলিশ

fx8ajbmz

রায়পুর: বুধবার ছত্তিশগড়ের কাঁকের জেলায় মাওবাদীদের ঘটানো ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে খতম হয়েছে পুলিশের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কনস্টেবল। গুরুতর আহত হয়েছে আরেকজন।

কাঁকেরের পুলিশ সুপার জিতেন্দ্র সিংহ মীনা জানান, কোয়ালিবেদা থানা এলাকায় এদিন সকালে মাওবাদী দমন অভিযানে যায় বিএসএফ ও জেলা পুলিশের যৌথ দল। রায়পুর থেকে প্রায় ৩০০ কিমি দূরে উত্তর বস্তারের মারকানার গ্রামের কাছে একটি জঙ্গল ঘিরে ফেলে তারা। তখনই বিস্ফোরণ ঘটায় মাওবাদীরা। এতে ২ পুলিশ জওয়ান জখম হয়। রায়পুরের হাসপাতালে চিকিৎসা চলাকালীন মারা যায় অ্যাসিস্ট্যান্ট কনস্টেবল বৈজুরাম পোতাই।

সূত্রঃ http://www.ibtimes.co.in/chhattisgarh-1-jawan-killed-another-seriously-injured-ied-blast-kanker-657647

 


ভারতঃ বস্তারে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ৩ মাওবাদী

 _79421885_maoistrebelschattiosapমঙ্গলবার ছত্তিসগড়ের বস্তার অঞ্চলে দুটি পৃথক সংঘর্ষে ৩ মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবী করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার ভোররাতে সুকমার পোলামপল্লী পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত এলাকায় ঘটে প্রথম সংঘর্ষটি। কাঁথিপাড়া গ্রামেও নিহত হন ২ মাওবাদী। পুলিশের সঙ্ঘে সংঘর্ষের জেরেই মাওবাদীরা নিহত হয়েছেন বলে প্রেস বিবৃতি দিয়ে দাবী করেছে পুলিশ।

সূত্রঃ http://satdin.in/?p=5690


ভারতঃ মাওবাদীদের ক্যাম্প জ্বালিয়ে দিল যৌথবাহিনী

26_04_59_35_Maoist_guerrillas

রায়পুর: শনিবার রাতে ছত্তিসগড় পুলিশের টাস্ক ফোর্স ও বিএসএফ জওয়ানরা মাওবাদীদের একটি ক্যাম্প জ্বালিয়ে দেয়।

কানকের পুলিশের সুপার জিতেন্দ্র সিং এর ভাষ্য অনুযায়ী, “শনিবার রাতে নিরাপত্তারক্ষী ও মাওবাদীদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। কোকরা পুলিশ স্টেশনের কাছে চালেচুর অঞ্চলে প্রথম মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়। তবে কাউকেই গ্রেফতার করা যায়নি।” জিতেন্দ্র আরো জানান, “আগাম খবরের ভিত্তিতেই আমরা ওই অঞ্চলে অভিযান চালাই। প্রথম মাওবাদী দলের সঙ্গে দেখা হয় রায়পুর থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরের কোরার অঞ্চলে।”

এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি, তবে ওই অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বেশ কিছু ম্যাগাজিন, রেডিও এবং মাওবাদীদের ব্যানারও মিলেছে বলে জানা গেছে।

সূত্রঃ http://www.bengali.kolkata24x7.com/naxal-camp-busted-in-chhattsigarhs-kanker.html


ছবির সংবাদ-

পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা ও স্থানাভাবের কারণে ছত্তিসগড়ের কারাবন্দীদের অমানবিক জীবনযাপনের চিত্র উঠে এসেছে ২০১২ সালে তৈরিকৃত জাতীয় নারী কমিশনের এক প্রতিবেদনে

Capture_2516953a