মিঠুন চাকমা হত্যাকাণ্ড সেনা মদদে, অভিযোগ বামপন্থিদের

 h

Advertisements

বাংলাদেশঃ মহান মে দিবসে বামপন্থী ৪ সংগঠনের যৌথ কর্মসূচী


রাজতন্ত্র ও ধর্মীয় রাষ্ট্র উচ্ছেদে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ।। বদরুদ্দীন উমর

untitled-12_182873

বর্তমান বিশ্বের জটিল পরিস্থিতিতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে সংকট নেই। অধিকাংশ দেশেই আছে বড় ধরনের সব সংঘর্ষ ও শাসন সংকট এবং বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ঘটিত সংকট। নেপালও এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম নয়। একুশ শতকে নেপাল অনেক রকম সংকট অতিক্রম করে এখন যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তাকে সংকটযুক্ত বলা যায় না। তবে সংকটের চরিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আছে। কিন্তু সংকট যতই থাক, বর্তমান পরিস্থিতির একটা ইতিবাচক দিক হচ্ছে, সেখানে এখন পূর্ববর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেশের জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এমন এক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ইতিপূর্বে কখনও দেখা যায়নি।
ভারত সরকার ১৯৪৭ সালের পর থেকেই নেপালের ওপর তার আধিপত্য বজায় রেখে এসেছে। সে আধিপত্য তারা বজায় রেখেছিল নেপালি কংগ্রেস ও নেপালি রাজতন্ত্রের মাধ্যমে। সে অবস্থায় নেপাল সরকারের সঙ্গে ভারতের কোনো দ্বন্দ্ব-বিরোধ বড় আকারে ছিল না। এটা প্রথম দেখা দেয় রাজা মহেন্দ্রের সময়। ভারতে তখন কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজীব গান্ধী। নেপাল বরাবরই ভারত থেকে তার জ্বালানি সংগ্রহ করত। কিন্তু রাজা মহেন্দ্র জ্বালানির জন্য একমাত্র ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থেকে চীন থেকেও তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিলে ভারত সরকার তার বিরোধিতা করে। সেই বিরোধিতার মুখে নেপাল চীন থেকে তেল আমদানি শুরু না করলেও ভারতের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় এবং চীন থেকে তেল আমদানি ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করায় রাজীব গান্ধী সরকার নেপালে জ্বালানি সরবরাহ একেবারে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে নেপাল এক গুরুতর জ্বালানি সংকটে নিক্ষিপ্ত হয়ে তেলের বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে জ্বালানির জন্য কাঠের ব্যবহার শুরু করে। এই প্রয়োজনীয় কাঠ সংগ্রহের জন্য তারা তখন হিমালয়ের পাদদেশে তাদের বিশাল বনভূমির গাছপালা এমনভাবে কাটতে থাকে, যাতে সে বনভূমির বিশাল অংশ বৃক্ষশূন্য হয়। দীর্ঘদিন এই ধ্বংসকাণ্ডের ফলে নেপালে সৃষ্টি হয় বড় ধরনের পরিবেশ সংকট। সেই সংকট থেকে তারা এখনও মুক্ত হয়নি।
নেপাল সম্প্রতি এক নতুন সংবিধান সর্বদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে তাদের পার্লামেন্টে পাস করার পর ভারত সরকার নেপালের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য এখন দ্বিতীয়বার সেখানে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এবার তাদের কৌশল ভিন্ন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত সরকার আগের মতো স্থূলভাবে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ না করে অন্য কৌশল অবলম্বন করেছে। নতুন সংবিধানে নেপালকে ৭টি অঞ্চলে বিভক্ত করে সেখানে প্রশাসন পরিচালনার ব্যবস্থা থাকায় দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী মাধেসিরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এর ফলে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগে তারা নতুন সংবিধান পরিবর্তনের দাবি জানায় এবং তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত তারা তাদের এলাকায় অবস্থিত ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলো অবরোধ করে ভারত থেকে জ্বালানিসহ সব ধরনের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দেয়। এই অবরোধ এখনও চলছে। এর ফলে নেপাল এখন এমন এক বড় সংকটে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, যা মাধেসিসহ সমগ্র নেপালি জনগণের জীবনকে বিপর্যস্ত করছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাধেসিরা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কারণ, তারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং তাদের এই সিদ্ধান্তের মূল হোতা হলো ভারত সরকার। তাদের মাধ্যমেই ভারত সরকার নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। নেপালের পার্লামেন্ট যে নতুন সংবিধান সর্বসম্মতিক্রমে পাস করেছে তাতে নেপালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে সেখানে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শতাধিক বছর ধরে নেপাল একটি হিন্দুরাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও এখন নেপালকে ঘোষণা করা হয়েছে একটি ধর্মবিযুক্ত রাষ্ট্র। ভারত এ দুইয়েরই বিরোধী। কিন্তু এই বিরোধিতা সত্ত্বেও নেপালের জনগণ এখন ব্যাপকভাবে রাজতন্ত্রের বিরোধী এবং নেপালকে একটি ধর্মবিযুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার পক্ষপাতী। জনগণের এই চিন্তাভাবনা ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবল প্রভাবের কারণেই শুধু সেখানকার ইউনাইটেড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি ও মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিই নয়, নেপালি কংগ্রেস পর্যন্ত নতুন সংবিধানে প্রজাতন্ত্র ও ধর্মবিযুক্ততার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এ পর্যন্ত নেপালি কংগ্রেস ভারতের স্বার্থ রক্ষার পক্ষে কাজ করে আসা সত্ত্বেও এখন যে তারা আর ভারতের নির্দেশ আগের মতো মেনে চলার মতো অবস্থায় নেই, এটা খুব স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ। নেপালের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনই নেপালি কংগ্রেসকে এই অবস্থান গ্রহণ করতে কার্যত বাধ্য করেছে।
নেপালে ভারতের প্ররোচনায় মাধেসিরা তাদের অবরোধ এখনও পর্যন্ত অর্থাৎ অনেকদিন ধরে অব্যাহত রাখার কারণে নেপাল সরকার এখন মাধেসিদের সঙ্গে সংবিধান নিয়ে আলোচনায় বসার ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে হয়তো দেশের ৭টি অঞ্চলের সীমানা এবং অন্যান্য বিষয়ে তারা একটা সমঝোতায় আসতে পারে। মাধেসিদের দাবির একটা যৌক্তিকতাও থাকতে পার। কিন্তু তারা অন্য একটি দেশের প্ররোচনায় যেভাবে কাজ করেছে তার থেকে বোঝা যায়, ভবিষ্যতেও ভারত নেপালে তাদের হস্তক্ষেপের একটা কৌশল হিসেবে মাধেসিদের ব্যবহার করবে। তবে ভারতের এই হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও নেপাল সরকার যে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ এবং ধর্মবিযুক্ততার নীতি আর কোনোভাবেই পরিবর্তন করবে না, এটা নিশ্চিত। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ভারতের চাপ সৃষ্টির আর কোনো কার্যকারিতা নেই। নেপালের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হবে। বর্তমানে নেপালের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দল সংবিধানের ক্ষেত্রে রাজতন্ত্র ও হিন্দুরাষ্ট্র বাতিল বিষয়ে ঐকমত্য হলেও প্রতিনিধিত্বের হিসেবে এ তিনটি দলের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে আছে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। সশস্ত্র যুদ্ধ বন্ধ করে সাংবিধানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর প্রথম যে নির্বাচন হয়েছিল, তাতে এই দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করছিল। কিন্তু এখন তাদের সে অবস্থা আর নেই। তাদের শক্তি এখন অনেক কমে এসেছে। তাদের দলের মধ্যেও অনেক সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে অনেকেই নেপালে বিপ্লবী রাজনীতি এবং সে দেশে আশু বিপ্লবের সম্ভাবনা না দেখে তাদেরকে দোষারোপ করছে বা তাদের সমালোচনা করছে। তারা যে আগের মতো শক্তিশালী নয়, সাংবিধানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করার পরিণতিতেই যে তাদের এই অবস্থা হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শুধু মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিকে দোষারোপ করলে সেটা কতখানি সঠিক হবে, সেটাও দেখার বিষয়। নেপালের সমাজ খুব পশ্চাৎপদ এবং সেখানে সামন্ততান্ত্রিক প্রভাব খুব প্রবল। তাছাড়া নেপাল একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। এদিক দিয়ে সামগ্রিক বিচারে নেপালে সশস্ত্র যুদ্ধ দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার মতো বাস্তব শর্ত নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। তবে এটুকু বলা চলে যে, যতদূর পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘাত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, তারা ততদিন তা চালিয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক পরিস্থিতির চাপে তাদের লাইন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েই সাংবিধানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। সাংবিধানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর এ রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব তাদের নেতৃত্বের ওপরও দেখা গেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এ দলটির ভূমিকার মূল্যায়ন শুধু এর দ্বারা করাই যথার্থ হবে না। ঐতিহাসিকভাবে নেপালের রাজনীতিতে তারা যে বিরাট বড় রকম অবদান রেখেছে এটা অস্বীকারের উপায় নেই। নেপালে এতদিন একটি রাজতন্ত্র থেকেছে এবং হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে সামন্তবাদের যে শক্ত ভিত্তি সেখানে ছিল, সেটা দুর্বল করে নেপালে যে এখন গণতান্ত্রিক রাজনীতির শর্ত তৈরি হয়েছে, রাজতন্ত্র ও হিন্দুরাষ্ট্র বাতিল হয়েছে, এটা এ ক্ষেত্রে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না। তারা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে যে শক্তি অর্জন করেছিল সে শক্তির জোরেই তারা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতাসীন হয়েছিল এবং রাজতন্ত্র ও হিন্দুরাষ্ট্রের উচ্ছেদ ছিল তাদের সংস্কারের শীর্ষ তালিকায়। এভাবে এ ধরনের সংস্কারের প্রচেষ্টা নেপালের ইতিহাসে আগে কোনোদিন দেখা যায়নি। তবে এ কাজ করতে গিয়ে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিকে সংকটের মধ্যে পড়তে হয়েছে। এই সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে গিয়ে পার্টিগতভাবে তারা বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারা যে বর্তমান নেপালি পার্লামেন্টে তৃতীয় ও ছোট দলে পরিণত হয়েছে এর মধ্যে তাদের ক্ষতির পরিমাণ বোঝা যায়। তারা একেবারে শক্তিহীন না হলেও তাদের শক্তি এখন অনেক কমেছে, ভবিষ্যতে হয়তো আরও কমবে। কিন্তু নেপালের রাজনীতিতে তারা যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে, যে পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তার ইতিবাচক মূল্যায়ন অবশ্যই দরকার।
তুলনা কোনো ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সন্তোষজনক হতে পারে না। তবু তুলনার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। নেপালে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রেও সেটা করা যেতে পারে। একাধিক প্রজাতির মাকড়সা আছে, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পরই যারা নিজেরা মারা যায়। নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রেও ঘটেছে অনেকটা তাই। এ পার্টির মৃত্যু না ঘটলেও অবস্থা এখন খারাপ। কিন্তু এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, এই পার্টি সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ না করলে নেপালে রাজতন্ত্র ও হিন্দুরাষ্ট্র উচ্ছেদ এখনও পর্যন্ত দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকত। এ দুই অর্জনের কৃতিত্ব মাওবাদী পার্টির। বাস্তবত যা দেখা যাচ্ছে তাতে মা মাকড়সা যেমন বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পর মৃত্যুবরণ করে, সেভাবে নেপালকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে দৃঢ়ভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এই পার্টি নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, যাতে একটি বিপ্লবী পার্টি হিসেবে তার কোনো ভবিষ্যৎ হয়তো আর না থাকতে পারে। তবে বর্তমানে এই অবস্থা প্রাপ্ত হলেও নেপালে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রবর্তন হিসেবে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকারের উপায় নেই।

বদরুদ্দীন উমর
২৮.১২.২০১৫
সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল


ভারতে শাসন ব্যবস্থার সংকট- বদরুদ্দীন উমর

3_139020

ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই দলীয় শাসন ব্যবস্থা ও তার কাঠামোর মধ্যে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা ভারতে ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৭ সাল থেকে একটানাভাবে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল কংগ্রেসের একদলীয় সরকার। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর সেখানে শুরু হয় বহুদলীয় বা কোয়ালিশন সরকার। কিন্তু শুরু হলেও কোয়ালিশন সরকার স্থায়ী হয়নি। পরে নির্বাচনে জয়লাভ করে ইন্দিরা গান্ধী আবার গঠন করেন কংগ্রেসের একদলীয় সরকার। ১৯৮৪ সালে তার মৃত্যুর পর তার পুত্র রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের সরকার ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ছিল। তার পরই আবার গঠিত হয় একাধিক কোয়ালিশন সরকার। ১৯৯২ সালে নরসিমা রাওয়ের নেতৃত্বে আবার গঠিত হয় কংগ্রেসের একদলীয় সরকার। তারপর আর কোনো কংগ্রেসী একদলীয় সরকার ক্ষমতায় বসেনি। নরসিমা রাওয়ের পর বিজেপির কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয় বাজপেয়ির নেতৃত্বে। তার আগে প্রথমবার বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল ভিপি সিংয়ের কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার হিসেবে। প্রথমবার কংগ্রেসের কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয় মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে। সেই সরকার পরবর্তী নির্বাচনেও ক্ষমতায় আসে। তারপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে গঠিত হয় বিজেপির সরকার। এই সরকারে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠা থাকলেও তারা হলো ঘধঃরড়হধষ উবসড়পৎধঃরপ অষষরধহপব (ঘউঅ) এর সরকার।

 বলা চলে, ভারতে ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের একদলীয় শাসনের অবসানের পর থেকেই সেখানে শুরু হয়েছে কোয়ালিশন সরকারের যুগ। ক’দিন পরপর কয়েক দফায় কংগ্রেস ও বিজেপির একদলীয় সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তবু ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত ৩০ বছর যেভাবে কংগ্রেসের একদলীয় সরকার ভারত শাসন করেছে, তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকেনি, ভারতে সেভাবে আর কোনো এক দলের একটানা শাসন সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, ১৯৭৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যেভাবে মাঝে মধ্যে একদলীয় সরকার দেখা গেছে, সেভাবে একদলীয় সরকারের সম্ভাবনা ভারতে আর নেই বললেই চলে। পরিস্থিতি যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তাতে আগামী নির্বাচনে বিজেপির পরাজয় প্রায় নিশ্চিত এবং কংগ্রেসের পক্ষে একক দল হিসেবে ফিরে আসার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে তার দিকে না তাকালে ভারতে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা কেন অবসানের পথে সেটা বোঝা যাবে না। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শুধু কেন্দ্রেই নয়, রাজ্যগুলোতেও কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকে। এর ব্যতিক্রম ঘটেছিল কেরালায়। সেখানে কংগ্রেসকে পরাজিত করে গঠিত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির সরকার। কমিউনিস্ট পার্টি কোনো স্থানীয় রাজ্য পার্টি ছিল না। তারা ছিল সর্বভারতীয় পার্টি। কিন্তু ষাটের দশক থেকে ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের অবস্থান দুর্বল হতে থাকে এবং স্থানীয় দলের বিকাশ শুরু হয়। শুধু তাই নয়, এই দলগুলো পাঞ্জাব, তামিলনাড়ূ, অন্ধ্র, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর ভারতের কোনো কোনো রাজ্যে সরকার গঠন করে। রাজ্যগুলোতে কংগ্রেস সরকারের বিলুপ্তি ঘটতে থাকার কারণে কেন্দ্রে তাদের অবস্থা খারাপ হয়। পরে দেখা যায় যে, রাজ্যগুলোতেও সব ক্ষেত্রে একক দলের সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে না। রাজ্যেও দেখা যাচ্ছে কোয়ালিশন সরকার। অর্থাৎ বিভিন্ন রাজ্যে যে স্থানীয় দলগুলো গঠিত ও শক্তিশালী হয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল, তারাও নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে অক্ষম হয়ে ভাঙনের মুখে পড়ছে।

ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় পুঁজি, যার মালিক প্রধানত ছিল বর্ণহিন্দু পুঁজিপতিরা, কংগ্রেসের মধ্যে তাদের শক্তি গঠন করেছিল। নিজেদের স্বার্থে তারা ছিল ফেডারেল সরকারের বিরোধী। এ কারণে কংগ্রেস বরাবরই শাসন ব্যবস্থা হিসেবে ছিল ইউনিটারি বা এককেন্দ্রিক সরকারের পক্ষপাতী। এ জন্য ভারতের সংবিধানে সারা ভারতে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিসত্তার কোনো যথাযথ স্বীকৃতি থাকেনি। এই নীতির বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম খুব জোরালো প্রতিরোধ দেখা যায় নাগাদের মধ্যে। ডাক্তার ফিজোর নেতৃত্বে সেখানে পৃথক ও স্বাধীন রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় এবং তা পরিণত হয় সশস্ত্র যুদ্ধে। তারপর থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জাতির মধ্যে স্বাধীনতার এই সংগ্রাম নানারূপে জারি আছে। কিন্তু শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতেই নয়, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও শুরু হয় ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের আন্দোলন। নেহরুর সময় প্রথমদিকে এই আন্দোলন বন্ধ করার জন্য সরকার তার বিরোধিতা করে। বর্তমান তামিলনাড়ূ, অন্ধ্র ইত্যাদি অঞ্চলে সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও নির্মম নির্যাতন করে। কিন্তু আন্দোলন বিভিন্ন অঞ্চলে জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একে একে নতুনভাবে গঠিত হয় হরিয়ানা, তামিলনাড়ূ, অন্ধ্র, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মেঘালয়, হিমাচল, উত্তরাখণ্ড, ঝাড়খণ্ড ইত্যাদি রাজ্য। ভারতীয় বড় পুঁজির স্বার্থের সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যের স্বার্থের দ্বন্দ্বই এককেন্দ্রিক শাসক ব্যবস্থার মধ্যে এই ভাঙন সৃষ্টি করে। রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বন্দ্বও অনেক ক্ষেত্রে বেশ জোরালো হয়।

ভারতে শাসন ব্যবস্থার মধ্যে যে সংকট এখন দেখা যাচ্ছে তার মূল কারণ বড় পুঁজির স্বার্থে প্রথম থেকেই কংগ্রেস ও কংগ্রেস সরকার কর্তৃক ফেডারেল নীতি প্রত্যাখ্যান এবং ভারতকে জাতিগতভাবে এক অখণ্ড সত্তা বিবেচনা করা। আসলে ভারত হলো বহুজাতির দেশ। ভারতের মূল জাতিগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে একই ভূমিতে বসবাস করে। এদিক থেকে তাদের একটা শারীরিক গঠন আছে। এর কোনো স্বীকৃতি ভারতের সংবিধানে না থাকার জন্যই ভারতের শাসন ব্যবস্থায় এমন এক সংকট দেখা দিয়েছে যা তাদের বাহ্য ঐক্য সত্ত্বেও শাসন ব্যবস্থা ভেতর থেকে ভাঙছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে কেন্দ্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে ও জোরালো হচ্ছে। এই দ্বন্দ্ব অদূর ভবিষ্যতে এমন পর্যায়ে যাবে, সেখানে সংবিধান ও শাসন ব্যবস্থার কাঠামো আমূলভাবে বা বড় আকারে পরিবর্তন করা সম্ভব না হলে ভারতের ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

ভারতের সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে ডক্টর বি আর আম্বেদকারের এক বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। কিন্তু স্বাধীনভাবে কাজ করার মতো অবস্থা তার ছিল না। এ জন্য ১৯৪৯ সালে পার্লামেন্টে সংবিধান পেশ করার সময় তিনি বলেছিলেন যে, সেই সংবিধানে রাজনৈতিক সমঅধিকার আছে কিন্তু সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার নেই। বড় পুঁজি, ভূমি মালিক, বর্ণহিন্দু ইত্যাদি স্বার্থ ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। কাজেই ভারতকে যতই সব থেকে বড় গণতান্ত্রিক দেশ বলা হোক, ভারতীয় গণতন্ত্রের যতই গুণকীর্তন করা হোক, ভারতে বড় পুঁজি, ভূমি মালিক ও বর্ণহিন্দুদের শাসন এমনভাবে বলবৎ আছে যার জাঁতাকলে সেখানকার জনগণ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পিষ্ট হচ্ছে।

২৬.১১.২০১৫

সভাপতি,

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

সূত্রঃ বাংলাদেশের দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ২৬.১১.২০১৫ তে প্রকাশিত।


বাংলাদেশঃ বামপন্থীদের মোদি বিরোধী বিক্ষোভ , আটক ৭

Bam-Morcha01_thereport24

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে বামপন্থী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ সমাবেশ করতে গেলে বাধা দিয়েছে পুলিশ। আগে থেকে ঘোষিত গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা এবং বামপন্থী চার সংগঠনের পৃথক এই বিক্ষোভ সমাবেশ দমনে শনিবার বিকেলে প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ প্রেস ক্লাব, সেগুনবাগিচা ও তোপখানা এলাকায় অবস্থান নেয়।

সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা প্রেস ক্লাবের সামনে জমায়েত হতে গেলে অন্তত ৭ নেতাকর্মীকে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ।

4

আটককৃতরা হলেনবাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম, ঢাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নেত্রী প্রগতি বর্মণ তমা ও ইডেন কলেজ নেত্রী সীমা আফরোজ, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা আহমদ মহিউদ্দীন ও ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা মহানগরের সহ সভাপতি দীপা মল্লিক এবং নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার আহ্বায়ক জাফর আহমেদ ও বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের নেতা জাকির সুমন।

তিস্তা নদীসহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, রামপালের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে শনিবার বিকেলে পৃথক বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় সাতটি বাম দলের জোট গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণফ্রন্ট ও জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমোর্চা।

2

দুটি জলকামান, একটি রায়ট ও বেশ কয়েকটি প্রিজন ভ্যান দুই শতাধিক পুলিশ প্রেস ক্লাব ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। বাম মোর্চার তোপখানা রোডের কার্যালয়ও ঘেরাও করে রেখেছে পুলিশ।

5

রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শিবলী নোমান বলেন, ‘বামদলগুলো ঝামেলা সৃষ্টি করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য সতর্ক অবস্থান নিয়েছি। মোদির সফর নিরাপদ করতে ও জানমালের নিরাপত্তায় আমরা সতর্ক আছি।’

শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক এসআই শাহাবুল বলেন, ‘এখান থেকে সাতজনকে আটক করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

3

বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘সরকারের পেটোয়াবাহিনী জনগণের কণ্ঠরোধ করতে চায়। আমরা প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছি। কিন্তু পেটোয়া পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।’

সুত্রঃ http://www.thereport24.com/article/108919/index.html


বাংলাদেশঃ “আমার ভোট আমি দেব, তোমার ভোটও আমি দেব”- কমরেড বদরুদ্দিন উমরের লেখা

11164827_879238205466664_425609393204080310_n