মেক্সিকোর উদারতাবাদী সশস্ত্র মার্কসবাদী দল ‘জাপাতিস্তা আর্মি অব ন্যাশনাল লিবারেশন – EZLN’

 67925f086579ad1ff72c0c9204b1111b_xl

ম্যাক্সিকোর কাছে একটি ছোট রাজ্য চাইপাস। নিজেদের ৩২তম প্রদেশ বানাতে মেক্সিকো চাইপাসের ওপর চালায় দখলদারি ও ঔপনিবেশিকতার জাল। এই দখলদারির প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে চাইপাসের অগ্রগামী জনগণ। এই লক্ষ্যেই যাত্রা শুরু হয় জ্যাপাটিস্টা আর্মি অব ন্যাশনাল লিবারেশন নামের এই গেরিলা দলটির। সংক্ষেপে অবশ্য ইজেডএলএন নামে পরিচিত। ১৯৯৪ সালে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে দলটি। মেক্সিকো সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও যুদ্ধের মাধ্যমেই পথচলা শুরু ইজেডএলএনের।

সেই সময় তুরস্ক বা সিরিয়ার সীমান্ত থেকে হাজারো মাইল দূরে মেক্সিকোতে ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি ন্যাফটা নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসার মেক্সিকোর বাজার চাষিদের জমি উৎপাদিত দেশীয় শস্য সমস্ত কিছু আমেরিকা এবং বাকি স্বাক্ষরকারী দেশের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। চুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার দিনেই এক অজানা সংগঠন জ্যাপাটিসটা ন্যাশানাল আর্মির ইজেডএলএন হাজারো সশস্ত্র মায়া আদিবাসী গেরিলা মেক্সিকোর প্রধান শহর জেলা শহর আঞ্চলিক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে। নতুন ধরনের মুক্তির লড়াই মায়া আদিবাসী সমাজের স্বয়ংশাসন প্রতিষ্ঠা করার এই যুদ্ধ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মিশ্রণে এক নতুন ধরনের বামপন্থী চিন্তার ফসল। দ্রুত দক্ষিণ মেক্সিকোর জঙ্গলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের স্বয়ংশাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন সক্ষম হয়।

শুরুতে মেক্সিকো সরকারের মিলিটারি, প্যারামিলিটারি ও বহুজাতিক কম্পানির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল তারা। অনেকটা আত্মরক্ষাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। উদারতাবাদী মার্ক্সিজম ও উদার সোশ্যালিজমের আদর্শে যাত্রা শুরু করে দলটি। আত্মপ্রকাশের বছরই ইজেডএলএন প্রথম যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তারা প্রবৃত্ত রয়েছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। মাঝেমধ্যে হয়তো যুদ্ধপন্থায় কিছুটা পরিবর্তন করে, তবে মূল উদ্দেশ্য অটুট। কোনো একক নেতৃত্ব নেই দলটিতে। প্রশিক্ষক ও কর্মপরিকল্পনার জন্য কয়েকজন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাব কমান্ড্যাট মার্কোস, কমান্ড্যাট হুগো, সাব কমান্ড্যাট পেড্রো, সাব কমান্ড্যাট এলিসা ও সাব কমান্ড্যাট মোয়েসেস উল্লেখযোগ্য। প্রায় তিন হাজার সক্রিয় সদস্য ও নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনীর সঙ্গে রয়েছে চাইপাসের অগুনতি জনসাধারণ। ইজেডএলএন জনগণের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করে বিধায় নিজেদের রক্ষাকবচ হিসেবে জনগণই কাজ করে। অর্থ, খাদ্যসহ সব কিছু দিয়েই সাহায্য করে। ইজেডএলএনের সমর্থন ও অবস্থান অনেক শক্তিশালী। তাই দলটিকে মোকাবিলায় মেক্সিকো সরকারকে খেতে হচ্ছে অনেক নাকানিচুবানি। নিজের পুরো শক্তি দিয়েও খুব সহজে চাইপাসে আধিপত্য বিস্তারে পুরোপুরি সক্ষম হতে পারেনি মেক্সিকো। তাই মেক্সিকো সরকার দলটিকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইজেডএলএন নিজেদের সফলতা বয়ে আনতে সর্বদা নতুন কর্মপন্থা ও গেরিলা আক্রমণ পছন্দ করে, যাতে শত্রু খুব সহজে তাদের জব্দ করতে না পারে।

images

 


মেক্সিকোর আদিবাসী ‘জাপাতিস্তা’ আন্দোলন নিয়ে কবিতা

philip-michel-700x375-1

(ফিল গোল্ডবার্গ আদতে আমেরিকার মানুষ। সেখানকার ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৯৩৪ সালে তাঁর জন্ম। আর মৃত্যুবরণ করেছেন ২০০৪ সালে। জাপাতিস্তা আন্দোলনের পটভূমিকায় তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখেছেন। ছিলেন জাপাতিস্তা সলিডারিটি কনসলিডেশনের অন্যতম সংগঠক।)

We have nothing to lose, absolutely nothing

জাপাতিস্তা ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (EZLN)

লাকান্দোন অরণ্যের ঘোষণা, ১৯৯৩

ভাষান্তর : মৃন্ময় চক্রবর্তী

……………………………………………………

হারানোর কিছু নেই—সত্যিই কিছু নেই—সব চলে গেছে,

অদৃশ্য হয়েছে উত্তরের কোনো গোপন কক্ষে

লোভী চোখের পাহারায়—তাই ন্যায় বিচারের দেখা নেই

নিপীড়ন—তীব্র বঞ্চনা

এখানে কোনো বিদ্যালয় নেই—মৃত্যুর শ্রেণীকক্ষগুলো ছাড়া

যেখানে শিশুরা শেখে কেমন করে মরতে হয়

খিদের জ্বালায়—অথবা কোনো কমজোরি পোকার মতো,

কোনো জমি নেই এখানে—কেবল এবড়োখেবড়ো পাথর

এমন করে নিঙ্‌ড়ে নেওয়া যার আর দেওয়ার কিছুই নেই

আর আছে বন্ধ্যা প্রতিশ্রুতির—কাগুজে ভূচিত্রগুলো

এখানে কোনো ঘর নেই—শুধু পাতলা কাঠের আবরণ

বাতাসকে বোকা বানানোর জন্য,

যে জানে আমরা ধর্ষিত হয়েছি—আর পড়ে আছি ক্ষতবিক্ষত হয়ে,

আবরণহীন পা-জোড়া শীতের দিকে বাড়িয়ে,

কোনো পরিকল্পনা নেই—ধনীদের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য ছাড়া,

যখন এসবের বিরুদ্ধে আমাদের নাক কুঁচকে ওঠে

তখন শস্যরাঙানো জানালাগুলোয় আঠার মতো লেগে থাকে

আমাদের পুয়েবলোর শুকনো রক্ত—আমাদের পূর্বপুরুষের,

এখানে কোনো ন্যায়বিচার নেই—বন্ধ আদালত,

বিচারপতির হাতুড়ি গুঁড়ো করে দেয় আমাদের মাথা,

আমাদের হাড় আর্তনাদ করে—বাস্তা—বাস্তা—বাস্তা

তারা আর্তনাদ করে—আমাদের হারাবার কিছু নেই।


মেক্সিকোর বামপন্থী বিপ্লবী গেরিলা সংগঠন-জাপাতিস্তা’র মুখপাত্র মার্কোস’র সাক্ষাৎকার

সহপাঠীদের বেশীরভাগ আমাকে খুব কমই বলেছে যে আমি একটা লালমূলো ছিলাম, লালমূলো- বাইরে লাল ভেতরে সাদা।” –  মার্কোস


985388406_850215_0000000000_sumario_normal-290x180


জাপাতিস্তার পাঠ তালিকা

[এই কথোপকথনটি জাপাতিস্তা ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির নেতা সাবকমান্ডান্ট মার্কোসের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের অংশ (নেটওয়ার্ক সংস্করণ)। মেক্সিকোর ‘কামবিও’ পত্রিকার তরফে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন বিশ্ববিশ্রুত সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ
জাতিসত্তার সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে প্রচারের আলোয় আসা এই সংগঠনের অন্যতম নেতা মার্কোসের সঙ্গে এই আলাপচারিতায় গেরিলা জীবনের খন্ডচিত্র পাই আমরা। মার্কোস এখানে ধরা দিয়েছেন একজন বিপ্লবী কবি সাহিত্যিক এবং পাঠক হিসেবে। বিপ্লবী রোমান্টিসিজম লাতিন আমেরিকার অঙ্গ, এখনই তাই অনেকেই মার্কোসকে তুলনা করতে শুরু করেছেন চে গুয়েভারার সঙ্গে। মার্কসবাদের সাথে তাঁদের একাত্মতা আছে, আবার নিজেদের তাঁরা অ্যানার্কিস্ট জাতীয়তাবাদী বলে মনে করেন, সুতরাং বিরোধও আছে। সব জটিলতা নিয়েই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে জাপাতিস্তা একটি নাম। এই অনুবাদটি অর্ধ দশকেরও আগের, কিন্তু এখনও প্রয়োজনীয়। ]

images-2 copy

ছবি: Tova Snyder: Mexican Landscape


মুখপাত্র সাবকমান্ডান্ট মার্কোজ

মুখপাত্র সাবকমান্ডান্ট মার্কোজ

গার্সিয়া মার্কেজ ( কামবিও): এত বিশৃঙ্খলার ভেতর আপনি এখনও কি পড়ার সময় পান?

মার্কোস: হ্যাঁ, কারণ তা নাহলে… কি করতাম তবে আমরা? সেনাবাহিনীর যারা আমাদের মুখোমুখি হয়, সেই সৈন্যরা অস্ত্র পরিষ্কার রাখে প্যারেড করে। একইরকমভাবে আমাদের অস্ত্র হলো আমাদের শব্দ, তাই আমরা আমাদের অস্ত্রাগারের উপর নির্ভর করি।

গার্সিয়া: যা আপনি বললেন- আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তুর নিরিখে- সেটি তুলে ধরে যে এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যগত প্রেক্ষাপট রয়েছে আপনার। এটা কোথা থেকে আসে আর কেমন করেই বা আপনি এটা পান?

মার্কোস: এটা আমার শৈশবের হৈচৈ ভরা সময় থেকেই রয়েছে। আমার পরিবারে শব্দের খুবই বিশেষ মূল্য ছিল। আর এই পথেই আমরা ভাষাকে মাধ্যম করে পৃথিবী পর্যটনে বেড়িয়ে পড়তাম। আমরা স্কুলে পড়তে শিখিনি, সংবাদপত্র পড়তে পড়তেই পড়তে শিখেছি ।

আমাদের বাবা মা আমাদের বই পড়তে শিখিয়েছিলেন, যা খুব দ্রুতই আমাদের নতুন জিনিসের দিকে এগিয়ে যাওয়া সুগম করেছিল। অভ্যস্ত এই পথে বা অন্যভাবে আমরা অর্জন করেছিলাম ভাষা সচেতনতা, কেবল একে অপরের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয় বরং কিছু নির্মাণের মাধ্যম হিসেবেও। যেন এটা ছিল কোনো কাজ অথবা সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল প্রাপ্তির চেয়েও আনন্দদায়ক কিছু। যখন ভান্ডারের মতো বয়স এসে দাঁড়াল, শব্দরা বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের জন্য উচ্চমূল্যের রইলনা। এটাকে নিচুপদে অপসারিত করা হলো। এটা হলো তখন যখন স্বদেশী সম্প্রদায়ের আমরা যাদের ভাষা হয়ে দাঁড়াল পাথর ছোঁড়া গুলতির মত। আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন শব্দরা আপনাকে কোনো ব্যাপার ব্যাখ্যা করতে পারছেনা, আপনাকে বাধ্য করছে ভাষা দক্ষতা বাড়ানোর কাজ করতে, অনুশীলন করতে এবং শব্দগুলোকে সশস্ত্র আর নিরস্ত্র করতে।

মার্কেজ: এটা আর অন্য কোনো উপায়ে হতে পারতনা?  ভাষার উপর এই নিয়ন্ত্রণ এই নব্যযুগে কি মঞ্জুর হতে পারতনা?

মার্কোস: এটা একটা মিশ্রণের মত, আপনি জানেননা কোনটিকে আপনি প্রথমে ছুড়ে ফেলেন, আর শেষ করেন কোনটি দিয়ে, যা শেষমেশ হয়ে দাঁড়ায় একটা ককটেল।

মার্কেজ: আমরা কি সেই পরিবারটির ব্যাপারে কথা বলতে পারি?

মার্কোস: সেটি ছিল একটি মধ্যবিত্ত পরিবার। আমার বাবা ছিলেন পরিবারের প্রধান, একজন স্কুল শিক্ষক ( লাজারো) কার্দেনাসের আমলের, তাঁর কথা অনুযায়ী যে সময়ে কমিউনিস্ট হবার কারণে শিক্ষকদের কান কেটে নিত ওরা। আমার মা’ও একজন গ্রামীণ শিক্ষক, অবশেষে বদলাল, আর আমরা পরিণত হলাম একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে, আমি বলতে চাইছি যে একটি পরিবার যার সত্যিকারের কোনো অভাব নেই। সেই প্রাদেশিক অঞ্চলে সবকিছুই, যেখানে সাংস্কৃতিক দিগন্তের দেখা মেলে স্থানীয় সংবাদপত্রের ‘ সমাজ’ পাতায়।

এর বাইরের দুনিয়া, অথবা বিরাট শহর মেক্সিকো সিটি ছিল বড় আকর্ষণ, বইদোকানগুলো ছিল আসল কারণ। আসলে সেখানে ছিল প্রদেশগুলির বাইরের বইমেলাগুলো, আর সেখানে আমরা কিছু বই পেতে পারতাম। গার্সিয়া মার্কেজ, ফুয়েন্তেস, মনসিভায়েজ, ভার্গাস য়োসা –স্বাধীনভাবে যেভাবে তাঁরা ভেবেছেন এ তার সামান্য উল্লেখ, তাঁদের সবাইকে পেয়েছি আমার বাবা মা’র মাধ্যমে। তাঁদের পড়ার জন্য তাঁরা আমাদের তৈরি করেছিলেন। ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’ মানে ছিল সে সময় সেই প্রদেশটি কেমন ছিল তার ব্যাখ্যা, আর ‘দ্য ডেথ অব আরতিমেও ক্রুজ’ ব্যাখ্যা করত বিপ্লবের দিনগুলোতে কী ঘটেছিল। ( কার্লোস মনসিভায়েজ) ‘ দিয়াস দে গুয়ারদার ‘ হলো মধ্যবিত্ত পরিবারে কী ঘটত তার ব্যাখ্যা।  আরো একধাপ এগিয়ে যদিও নগ্ন, আমাদের ছবি ছিল ‘ দ্য সিটি এন্ড দ্য ডগস’ এ। সমস্ত কিছুই ছিল সেখানে। আমরা এভাবেই বাইরের দুনিয়ায় এলাম, এলাম সাহিত্যকে জানার ফলে। আর আমার বিশ্বাস এটাই আমাদের সাকার করেছে। আমরা দুনিয়াকে সংবাদ নিবন্ধের মাধ্যমে জানতে পারিনি, কিন্তু জেনেছি একটি উপন্যাস, একটি প্রবন্ধ, অথবা একটি কবিতার মাধ্যমে। আর এসবই আমাদের খুবই স্বতন্ত্র করেছে। এগুলো একটা যা আমাদের বাবা মা দিয়েছিলেন, অন্যদের মত মাসমিডিয়া হলেও হতে পারত একটি লুকিং গ্লাস অথবা একটি অসচ্ছ কাঁচ, যা দিয়ে কি ঘটে চলেছে তা কেউ দেখতে পায়না।

মার্কেজ: এসব পাঠ্যের মাঝে ‘ডন কুইকজোটে’র জায়গা কোথায়?

মার্কোস: তাঁরা আমাকে একটি সুন্দর বই উপহার দিয়েছিলেন, যখন আমার ১২ বছর বয়স–একটি হার্ডকভারের বই। সেটি ছিল ‘ডন কুইকজোট দে লা মাঞ্চা’। সেটি আমার আগে পড়া ছিল কিন্তু সেটা ছিল কিশোর সংস্করণ। এটা ছিল দামী বই, খুবই দারুণ উপহার আমি যার অপেক্ষায় ছিলাম। এরপরে এলেন শেক্সপিয়র। কিন্তু আমি যদি বলতে পারতাম যে ক্রমপর্যায়ে বইগুলি এসেছিল, সেটি ছিল প্রথম ” বিস্ফোরণ ” লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে সার্ভেন্তিসের চেয়েও, গার্সিয়া লোরকার চেয়েও,সেই সময়ের সমস্ত কবিতার চেয়েও, এই আপনি ( গার্সিয়া মার্কেজকে উদ্দেশ্য করে)  অংশত দায়ী তার জন্য।”

মার্কেজ: এসবের মধ্যে অস্তিত্ববাদীরা আর সার্ত্রেও কি ছিলেন?

মার্কোস: না। আমরা ওগুলোয় পৌঁছেছি দেরীতে। স্পষ্টত অস্তিত্ববাদী আর তার আগে বিপ্লবী সাহিত্য যাতে আমরা পৌঁছেছিলাম তা ছিল খুব “ছাঁচে ঢালা”- বলা যেত গোঁড়া। তাই সেইসময় আমরা পেয়েছিলাম মার্কস এবং এঙ্গেলসকে, আমরা ছিলাম সাহিত্যের রসিকতা আর বক্রোক্তির প্রভাবে দূষিত।

মার্কেজ: রাজনৈতিক তত্ত্বের কোনো পড়াশুনো ছিলনা সেখানে?

মার্কোস: প্রথম স্তরে ছিলনা। ABC পড়ার সময় থেকেই আমরা সাহিত্যের পাঠে প্রবেশ করেছি এবং তারপর তাত্ত্বিক আর রাজনৈতিক পাঠে, যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলাম।

মার্কেজ: আপনার সহপাঠীরা কি আপনার মত ভাবত বা কমিউনিস্ট হতে পারত?

মার্কোস: না আমি তা ভাবিনা। তবে তাদের মধ্যে বেশীরভাগই আমাকে খুব কমই বলেছে যে আমি একটা লালমূলো ছিলাম, লালমূলো- বাইরে লাল ভেতরে সাদা।

মার্কেজ: এখন আপনি কী পড়ছেন?

মার্কোস: আমার শয্যার পাশে থাকে ‘ডন কুইকজোট’, আর আমি সবসময় কাছে রাখি গার্সিয়া লোরকার ‘রোমান্সেরো গিতানো’।  ‘ডন কুইকজোট’ রাজনৈতিক তত্ত্বের বাইরে সবচেয়ে সেরা বই তারপর ‘ হ্যামলেট’ আর ‘ ম্যাকবেথ’। মেক্সিকোর রাজনৈতিক ব্যাবস্থার ট্র‍্যাজেডি আর কমেডি বোঝার জন্য আর কোনো ভাল পথ নেই ‘ হ্যামলেট’,’ম্যাকবেথ’,আর ‘ডন কুইকজোট’ ছাড়া। এগুলো অনেক বেশী ভালো যেকোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কলামের তুলনায়।

মার্কেজ: আপনি হাতে লেখেন না কম্পিউটারের সাহায্যে লেখেন ?

মার্কোস: কম্পিউটারে। যখন চলমান থাকি তখন হাতেই লিখতে হয় কারণ আমার কাজ করবার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। আমি একটার পর একটা খসড়া লিখি। আপনি ভাবছেন আমি মজা করছি, কিন্তু এটা হল সপ্তম খসড়া যা সেইসময় আমি লিখেছি।

মার্কেজ: কোন বইয়ের উপর আপনি কাজ করছেন?

মার্কোস: আমি যা লিখতে চাইছি তা এবসার্ড বিষয়ক, এটা হলো আমরা নিজেরা নিজেদের প্রতি কেমন তা ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা, যা প্রায় অসম্ভব। আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা আত্মবিরোধী হলেও সত্যবিরোধী নই, কারন একটা বিপ্লবী বাহিনী ক্ষমতা দখলের জন্য বিবেচনার প্রস্তাব দিতে পারেনা..

সমস্ত প্যারাডক্সদের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ রয়েছে  যে, আমরা বেড়ে উঠেছি শক্তি অর্জন করেছি একটি সংগঠন হিসেবে সম্পূর্ণই সারিবদ্ধ সাংস্কৃতিক সূত্রের সৌজন্যে।

মার্কেজ: এই মুখোসের আড়াল কেন, যদি সবাই জেনে যায় আপনি কে তাই?

মার্কোস: চূড়ান্ত বিজয়ের উপরে থেকে যাওয়া এটা একটা টুকরো কাপড়। তারা জানেনা আমি কে আর তারা তা পরোয়াও করেনা। কি ঘটেছে এখানে সাবকমান্ডান্ট মার্কোসটা কে কিংবা কে ছিল এসবও না ।

(সংক্ষেপিত)

images

ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর : মৃন্ময় চক্রবর্তী


‘EZLN (জাপাতিস্তা জাতীয় মুক্তি ফৌজ) অ্যানার্কিস্ট নয়’ — জাপাতিস্তাদের একটি জবাব

1

(২০০২ সালে গ্রিন অ্যানার্কিনামক আমেরিকার এক ত্রৈমাসিক পত্রিকায় ফেরাল ফন EZLN অ্যানার্কিস্ট নয় শীর্ষক এক প্রবন্ধ লেখেন। এর জবাবে জাপাতিস্তাদের নামে ওই বছর ডিসেম্বরে এই চিঠিটি প্রকাশিত হয়। এর অনুবাদ করেছেন শমীক সরকার। ১৯৯৪ সাল থেকে মেক্সিকোর দক্ষিণতম রাজ্য চিয়াপাস-এর EZLN গোষ্ঠী (জাপাতিস্তা জাতীয় মুক্তি ফৌজ) যুদ্ধ ঘোষণা করে। এঁদের প্রধান মুখপাত্র সাবকমান্ডান্ট মার্কোজ। কৃষি সংস্কারক তথা মেক্সিকান বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক এমিলিয়ানো জাপাতা (১৮৭৯-১৯১৯)-র নামে এই গোষ্ঠীর নামকরণ হয়েছিল এবং এদের আদর্শকে বলা হয় জাপাতিসমো। জাপাতিস্তাদের বাস্তব আন্দোলন ও কর্মকাণ্ডকে উত্তর আমেরিকার বামপন্থী আদর্শ ও রাজনীতির ঘরানা অ্যানার্কিজম-এ ছকবন্দি করার চেষ্টার এক জীবন্ত সমালোচনা এই লেখাটি। )        

মুখপাত্র সাবকমান্ডান্ট মার্কোজ

মুখপাত্র সাব কমান্ডান্ট মার্কোজ

                                                                                                         শুরুতেই সবচেয়ে দরকারি কথাটা বলে ফেলা যাক — জাপাতিস্তা ফ্রন্টের খুব অল্প অংশই গুরুত্বহীন কিছু মানুষের সঙ্গে আদর্শের সংকীর্ণ সীমানা ধরে বিতর্কে জড়াতে চায়এইসব লোক, যাদের সবচেয়ে বড়ো গুণ হল খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনে নিজেদের অজ্ঞানতা আর মুর্খতাকে ছড়িয়ে দেওয়া, তাদের সঙ্গে মনগড়া বুলিসর্বস্ব যুদ্ধে যাওয়ার লোক জাপাতিস্তা যোদ্ধাদের মধ্যে তো আরও কম পাওয়া যাবেকিন্তু EZLN (জাপাতিস্তা জাতীয় মুক্তি ফৌজ) অ্যানার্কিস্ট নয়’ নামক প্রবন্ধে এমন এক উপনিবেশকারী সুলভ উদ্ধত মুর্খতার প্রকাশ ঘটেছে যে, আমাদের অনেকেই ঠিক করি  — এর একটা উত্তর আপনাকে দেব 

   আপনি সঠিকজাপাতিস্তা জাতীয় মুক্তি ফৌজ এবং এর বৃহত্তর জনপ্রিয় মঞ্চ জাপাতিস্তা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট অ্যানার্কিস্ট নয়। না আমরা তা হতে চাই, না আমাদের তা হওয়া উচিতআমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামগুলিতে বাস্তব কিছু পরিবর্তন যদি আনতে চাই, তাহলে আমরা এক ধরনের কোনও আদর্শের সাথে লেপ্টে থেকে নিজেদের সীমাবদ্ধ করতে পারি নাআমাদের রাজনৈতিক এবং সামরিক বাহিনীতে এমন বিচিত্র সংস্কৃতির বিবিধ বিশ্বাসের লোকসমাগম হয়েছে, কোনো একটি সংকীর্ণ আদর্শনৈতিক অনুবীক্ষণে যাদের ধরা যায় নাআমাদের মধ্যে অ্যানার্কিস্ট আছে, যেমন আছে ক্যাথলিক আর কমিউনিস্ট আর সান্তেরিয়ার অনুগামীরাআমরা গ্রামে আদিবাসী (ইন্ডিয়ান) আর শহরে শ্রমিকআমরা অফিসে রাজনীতিক আর রাস্তায় গৃহহীন শিশুআমরা সমকামী আর বিপরীতকামী, ছেলে আর মেয়ে, ধনী আর গরিবআমাদের মধ্যে মিলের জায়গা হল, আমরা সবাই আমাদের পরিবার-পরিজন আর আমাদের আবাসভূমিকে ভালোবাসিআমরা সবাই আমাদের এবং স্বদেশের অবস্থা আর একটু ভালো করতে চাই

        গত ৫০০ বছর ধরে আমাদের ওপর নিষ্ঠুর শোষণ আর অবনমন চলেছে, উত্তর আমেরিকায় এ অভিজ্ঞতা খুব বেশি লোকের নেইতোমাদের দেশের জন্মের আগে থেকে আমাদের ভূমি থেকে, স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছেতাই আমাদের দেখার ধরন তোমাদের দেখার ধরনের চেয়ে অনেক আলাদাপ্রথমে স্পেনীয়, তারপর ফরাসী এবং জার্মান ও শেষে উত্তর আমেরিকানদের ঔপনিবেশিক শাসনে থেকেছি আমরাশতাব্দীর পর শতাব্দী মেক্সিকানরা চাকর-বাকর আর মুনিশের মতোএ দাগ আজও আমাদের গায়ে লেগে আছেআমরা তা ভুলতে পারি না, ভোলা উচিতও নয়এই অতীতই আজকের আমাদের গড়ে দিয়েছেএবং এই ঐতিহাসিক শোষণের ধারাকে ভেঙে আমাদের মনুষ্যত্বকে পুনর্গঠিত করতে ও ভালোভাবে বেঁচে থাকতে বহুবার উঠে দাঁড়িয়েছি আমরাপ্রথমে আমরা হুয়ারেজ আর হিদালগোর সাথে মিলে লড়াই করেছি স্পেনীয় রাজার বিরুদ্ধেতারপর জাপাতা আর ভিয়ার সাথে মিলে পরফিরিয়াতোর বিরুদ্ধেএখন আমরা লড়াই করছি সেই একই মাথার বিভিন্ন মুখের বিরুদ্ধে, যারা আমাদের পুঁজির মনুষ্যেতর দাস হিসেবে রেখে দিতে চায়এটা কোনো বই বা সিনেমার থেকে পাওয়া লড়াই নয়এ লড়াই আমাদের জন্মের সঙ্গে পাওয়াএই সংগ্রাম আমাদের সারা জীবনের, এমনকী শিরায় ধমনীতে বইছেএই লড়াইয়ে আমাদের বাপ ঠাকুর্দাদের অনেকে মারা গেছে, আমাদের অনেকেই মরার জন্য প্রস্তুতএই লড়াই আমাদের মানুষজনের জন্য আর আমাদের দেশের জন্য জরুরিতোমার হেলাফেলার ভাষা আর উদ্ধত নিচুনজরে দেখা থেকে মনে হয়, তুমি মেক্সিকান ইতিহাস বা সাধারণভাবে মেক্সিকানদের সম্পর্কে খুব কম জানোআমরা ণ্ণমৌলিকভাবে সংস্কারবাদী’ হতে পারি, বা আমাদের হয়ত ণ্ণপুঁজিবাদের আওতার বাইরের কোনো নির্দিষ্ট চাহিদা নেই’, কিন্তু খাদ্য, ভূমি, গণতন্ত্র, ন্যায় এবং শান্তি আমাদের কাছে মহামূল্যবান যেহেতু তা আমাদের নেইএত দামি যে আমরা তার জন্য যে কোনো মূল্য দিতে পারি, এমনকী চটিয়ে ফেলতেও পারি দূরের কোনো দেশের স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা কিছু মানুষকে, যারা মনে করে তাদের বিশ্বাস অনেক বেশি প্রয়োজনীয় মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলোর তুলনায়এত দামি যে তার জন্য আমরা হাতের কাছে যা অস্ত্র পাব তাকেই কাজে লাগাব, তা যদি সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি হয় তবে তাই, চলতি সংস্কৃতির সঙ্গে জোড় বাঁধা হয় তো তাইঅ্যানার্কিজম আদর্শ বা তার কাগজপত্র আর চ্যালাচামুণ্ডা তো কোন ছাড়, ওই শব্দের উৎপত্তির আগে থেকে আমাদের লড়াই চলছেবাকুনিন বা ক্রোপোতকিনের চেয়ে আমাদের লড়াই পুরনোঅ্যানার্কিস্ট ও সিন্ডিকেটরা আমাদের সঙ্গে মিলে সাহসের সাথে লড়াই করলেও আমরা আমাদের ইতিহাসকে ওইসব সংকীর্ণ আদর্শের সঙ্গে মানানসই করে নিতে পারব না, যেগুলো আমাদের দেশে রপ্তানি হয়েছে সেইসব দেশ থেকে যাদের বিরুদ্ধে আমরা স্বাধীনতার লড়াই লড়েছিমেক্সিকোর লড়াই, তা সে জাপাতিস্তা হোক বা অন্য কিছু, তা আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের সংস্কৃতির ফসলতাকে অন্য কারোর ফর্মুলার মতো করে গড়েপিটে নিতে পারব নাযেসব ফর্মুলা আমাদের ইতিহাস, মানুষজন বা দেশের কথা জানতই না, তাদের সঙ্গে তো আরও নয়আপনি সঠিক, আমরা আন্দোলন হিসেবে অ্যানার্কিস্ট নইআমরা সেসব মানুষ যারা নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে চাই, ফিরে পেতে চাই আমাদের মর্যাদাকে যা চুরি হয়েছিল যে মুহূর্তে কোর্তেস ক্ষমতায় এসেছিল

এসব পাওয়ার জন্য আমাদের লড়াইআমাদের তা-ই করতে হবে যা আমাদের জন্য, আমাদের সবার জন্য ফলপ্রসুএবং তা করতে হবে সেইসব উসকানি এড়িয়ে যা আমাদের ছোটো ছোটো গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলেআর আমাদের যারা দাস বানিয়ে রাখতে চায় তাদের কাছে সহজে বিকিয়ে যেতে দেয়আমরা লা মালিঞ্চের থেকে শিক্ষা নিয়েছি, যে ৩ কোটি মেক্সিকানকে ছোটো ছোটো দাঙ্গারত গোষ্ঠীতে ভাগ করে দিয়ে কোর্তেসকে সাহায্য করেছিল সহজে জিতে নিতেআমরা স্বাধীনতা উত্তর পোরফিরিয়াতোর রাজত্ব থেকে শিক্ষা নিয়েছি, শিখেছি বিপ্লব-উত্তর ধনীদের বেইমানি থেকেআমরা দেখেছি সংকীর্ণমনা অ্যানার্কিজম ও কমিউনিজমের আদর্শ কীভাবে মেক্সিকানদের আরও সহজে শোষিত হতে পারা গোষ্ঠীতে পরিণত করার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলতাই পরস্পর বিরোধী গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার বদলে আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে একটা সাধারণ লক্ষ্যের জন্য লড়তে চাই

   তোমার প্রবন্ধে ণ্ণসমঝোতা’ শব্দটা এমনভাবে ব্যবহার করেছো যেন তা একটা গালাগালআমাদের কাছে সমঝোতা হল একটা আঠা যা সাধারণ সংগ্রামে আমাদের সবার মধ্যে জোড়ের কাজ করেএইসব জুড়ে থাকার সমঝোতা বাদ দিয়ে আমরা কোথাও পৌঁছতে পারব নাএকাকী দাসের মতো শোষিত হব, যেমনটি আমরা আগে হয়েছিএবার আর আমাদের কিনে নেওয়া যাবে নাআমাদেরকে বিশেষ ধরনের মানুষ বলে ক্ষমতাধরেরা কিছু সুবিধা দিয়ে দেবে, তা আমরা আর হতে দেব নাওইসব ক্ষমতা তো আমাদের দুর্ভোগ থেকেই নিজেদের সম্পদ বানায়

   আর আমরা এখন যেভাবে কাজ করছি, তা কাজে দিচ্ছেচিয়াপাসের যুদ্ধ বন্ধ করতে ছ’ কোটি লোক সই করেছে। জাপাতিসমো আবার বেঁচে উঠেছেদেশের প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি শহরে সমস্ত ধরনের মানুষ নিয়ে আমাদের সংগঠন আছেআমরা সংগঠিতআমরা শক্তিশালীআমরা জিতব তার সহজ কারণ হল আমরা খুব বড়ো এবং খুবই সংগঠিত, তাবৎ ক্ষমতা আমাদের পাত্তা না দিয়ে পারবে নাআমাদের যা আছে তা হয়ত একদম ঠিকঠাক নয়ঠিক আদর্শনিষ্ঠও না হতে পারেকিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, এটা বেশ কাজেরএবং আমরা নিঃসন্দেহ, তুমি আমাদের জায়গায় থাকলেও এটাই করতেকিন্তু যাতে আমরা রেগে গেছি তা হল তোমার প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে তোমার সু-উদ্দেশ্যর মধ্যে লুকিয়ে আছে ওই পরিচিত পুরনো ঔপনিবেশিক মুখপ্রচুর উত্তর আমেরিকান আমাদের এখানে এসে উঁকি দিয়ে দেখে আমরা কী খাচ্ছি কী পরছি, আর দাবি করে, তা তাদের দেশের মতো ভালো নয়তোমাদের প্রবন্ধের লেখকও জাপাতিসমোর ণ্ণসমালোচনা’য় এই কাজটিই করেছেযদি এইসব সমালোচনা’য় আমাদের ইতিহাস এবং অধুনা পৃথিবীতে তার স্থানের প্রেক্ষিতে আমাদের রণনীতির বিস্তারিত আলোচনা হত, তাহলে তা কোনও ব্যাপার ছিল নাআমরা আমাদের সংগঠনে তা নিরন্তর করে থাকিকিন্তু প্রবন্ধের লেখক জাপাতিসমোকে সংস্কারবাদী জাতীয়তাবাদীদের অগ্রদূত বলে একেবারে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছেন, কেন, তার বিশ্লেষণ বাদ দিয়েইএতে ফের ফুটে বেরোয়, আমরা মূর্খ মেক্সিকানরা সবজান্তা উত্তর আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের মতো সচেতন নই, বুদ্ধিমান নই, রাজনৈতিকভাবে সুচারু নইএটাই বাস্তবতা, এমন কথা বলে এই মনোভাবকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছেকিন্তু এই একই মনোভাবের সঙ্গে আমরা যুঝছি আজ ৫০০ বছর ধরে — যেখানে অন্য কেউ, অন্য দেশের, অন্য সংস্কৃতির কেউ মনে করে   — সে আমাদের কীসে ভালো তা আমাদের থেকে ভালো জানে

   আরও বিরক্তিকর এই লাইনটা, ণ্ণএইসব লড়াইয়ে বিপ্লবী সংহতির প্রশ্নটি হল, কীভাবে হস্তক্ষেপ করব আমাদের লক্ষ্যের সঙ্গে মানানসই করে, যাতে আমাদের বিপ্লবী অ্যানার্কিস্ট প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়‘ এত ঔপনিবেশিক শব্দ একটা বাক্যে! ণ্ণহস্তক্ষেপ’? ণ্ণকারোর ণ্ণপ্রকল্প’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া’? মেক্সিকানরা ভালো করেই জানে ণ্ণহস্তক্ষেপ’ মানে কী? কোনো একটা ইতিহাস বই খুলে দেখুন না কঙ্কিস্তা, ভিয়াহেরমোসা, তেহাস, ম্যাক্সিমিলিয়ান কথাগুলি, তাহলেই বুঝবেন উত্তর আমেরিকানরা যখন হস্তক্ষেপ’-এর কথা বলতে শুরু করে তখন তা আমরা কী চোখে দেখিউত্তর আমেরিকান অ্যানার্কিস্টরা বেশি জানে কীভাবে লড়তে হয়, যে লড়াই আমরা তাদের দেশের জন্মের তিনশ’ বছর আগে থেকে করে আসছি! এবং তার ফলে তারা ভাবতে পারে, ণ্ণতাদের প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে যেতে’ আমাদেরকে কীভাবে ব্যবহার করা যায়! এটা সেই একই মনোভাব যা নিয়েই পুঁজি এবং সাম্রাজ্য মেক্সিকো এবং বাকি তৃতীয় দুনিয়ায় শোষণ ও অবনমন ঘটিয়ে চলেছে গত ৫০০ বছর ধরেযদিও এই প্রবন্ধ বিপ্লব নিয়ে অনেক কথা বলেছে, কিন্তু লেখকের চিন্তাভাবনা ও মনোভাব কোর্তেস, মনরো এবং অন্যান্য কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী বেজন্মাদের মতোইআপনাদের ণ্ণহস্তক্ষেপ’ আমাদের লাগবে নাবিজ্ঞ উত্তর আমেরিকানদের পক্ষে লাভজনক কোনো প্রকল্প’ও আমরা নই

   লেখক অনেক কথা বলেছেন বিপ্লবী সংহতি নিয়ে, কথাটার মানে কী তা না বলেইতাঁর কাছে বিপ্লবী সংহতি মানে কী? যেভাবে তিনি প্রবন্ধটা লিখেছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে, তাঁর কাছে বিপ্লবী সংহতির যা মানে, তার সঙ্গে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীর কাছে ণ্ণমুনাফার মাত্রা’, ণ্ণব্যয় ও লাভের তুলনামূলক বিচার’ প্রভৃতি শব্দের মানের খুব ফারাক নেইদুটোর একই কাজ, নিজের লাভের জন্য অন্যকে ব্যবহার করাযতদিন উত্তর আমেরিকান অ্যানার্কিস্টরা এই ধরনের ঔপনিবেশিক চিন্তাকাঠামো ধরে চলবে, তারা তৃতীয় দুনিয়ায় কোনো বন্ধু পাবে নাএমনকী আপনাদের আদর্শের দৃঢ় কাঠামোর সঙ্গে মানানসই বলিভিয়া বা কুয়েডরের কৃষকরাও ততটাই পাত্তা দেবে এই মনোভাবকে যতটা পাপুয়া নিউ গিনি বা অন্য জায়গার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেয়

        আমাদের লড়াই এ জগতে যাদের বিরুদ্ধে তার একটি হল ঔপনিবেশিকতাযতদিন উত্তর আমেরিকানরা তাদের ণ্ণবিপ্লবী’ সংগ্রামে এইসব ঔপনিবেশিক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না পারবে, ততদিন দুনিয়ার কোনও ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে তারা থাকতে পারবে নাআমরা জাপাতিস্তা লড়াইয়ের লোকেরা কখনও কারোর কাছে অন্ধ, সমালোচনাহীন সমর্থন দাবি করিনি।    

আমরা শুধু চেয়েছি, আমাদের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতকে সম্মান করা হোক, এবং শোষণের পদপেষণ থেকে মুক্তির পদক্ষেপ আমরা যা নিচ্ছি তা নিয়ে চিন্তা করা হোকএকই সাথে, আপনাদের উচিত নিজেদের দেশের নিজেদের লড়াইগুলোর দিকেও তাকানো, এবং সে লড়াই ও আমাদের লড়াইয়ের সাধারণ দিকটিকে নজরে আনাএইভাবেই কেবল আমরা বিশ্ব বিপ্লবের দিকে যেতে পারি

2

3

4

5

marcos-3

6

7

images