‘দুর্ভাগ্য, এক বিচিত্র কারণেই তাঁকে নিয়ে এত কথা’ – বিনায়ক সেন

বিনায়ক সেন

বিনায়ক সেন

কয়েক দশক ধরে ছত্তিশগড়ের প্রান্তিক অঞ্চলে চিকিত্সা কর্মে নিরলস শৈবাল জানা৷ তাঁর গ্রেফতারি এবং দেশ জুড়ে স্বাধীন মতের কণ্ঠরোধ কি নিছকই সমাপতন ?

লিখছেন বিনায়ক সেন

ডঃ শৈবাল জানা

ডাঃ শৈবাল জানা

প্রায় তিরিশ বছর ধরে ডা . শৈবাল জানাকে চিনি আমি৷ তিনি আমার বন্ধু, সহকর্মী এবং সহযোদ্ধা৷ একটি হাস্যকর এবং বিভ্রান্ত বিচার প্রক্রিয়ার ফেরে তিনি দুর্গের জেল হাজতে ছিলেন৷ এবং সেই ঘটনার জেরে তাঁর নাম সংবাদ -শিরোনামেও বটে৷ শনিবার জামিনে মুক্তি পেলেন তিনি৷ গত তিরিশ বছর ধরে শৈবাল , তাঁর স্ত্রী আলপনা এবং দল্লির শহিদ হাসপাতালের এক দল দায়িত্ববান চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মী চেষ্টা করে যাচ্ছেন , কী ভাবে গরিব মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায়৷ পঞ্চাশ হাজার মানুষের বসতি যে দল্লি শহরে , সেখানেই যে তাঁরা শুধু কাজ করেছেন তা-ই নয় , দল্লি -রাজহরা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের দণ্ডকারণ্যের হতদরিদ্র বাঙালি উদ্বাস্ত্তরাও দীর্ঘ কাল ধরেই তাঁদের চিকিত্সা পরিষেবায় উপকৃত৷ বস্ত্তত বহুকালের চেষ্টা ও পরিশ্রমে ছত্তিশগড়ের একটা বড়ো অংশে প্রান্তিক মানুষের কাছে চিকিত্সার সুযোগ পৌঁছে দিতে পেরেছেন শৈবাল , আলপনা এবং এই হাসপাতালের চিকিত্সক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা৷ দল্লি -রাজহারা শহিদ হাসপাতালটি আজ ১৫০ শয্যার একটি আইকনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র৷ অথচ , শুরুতে ছিল ছোট্ট একটা ক্লিনিক৷ সেই ক্লিনিকও বসত এক চিলতে জায়গায় , একটি মোটর গ্যারাজের ভিতরে৷ আজ সেটি নিছক বড় একটা হাসপাতালই নয় , পড়ানোরও বন্দোবস্ত রয়েছে সেখানে৷ সেই ছোট্ট একটা ক্লিনিক যে আজ এমন একটা হাসপাতাল হয়ে উঠতে পেরেছে , সেই রূপান্তরের অন্তরালে রয়েছে শৈবাল জানার সুযোগ্য নেতৃত্ব৷ ছত্তিশগড়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ , যাঁদের বেশির ভাগই বসবাস দারিদ্রসীমার নীচে , তাঁদের একটা বড়ো ভরসার জায়গা এই হাসপাতাল৷ এর আগে পর্যন্ত তাঁদের অবলম্বন বলতে ছিল স্রেফ ওই রায়পুর মেডিক্যাল কলেজ৷ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করা মানুষদের জন্য যে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প রয়েছে , সেগুলি যথাযথ ভাবে ব্যবহার করে তাঁদের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এই হাসপাতালের চিকিত্সক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা৷ এবং শেষ পর্যন্ত সে কাজে যথেষ্ট সাফল্যও পেয়েছেন৷ শৈবালের নেতৃত্ব ছাড়া হয়তো এটা সম্ভব হত না৷ ১৯৯১ সালে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার নেতা শঙ্কর গুহনিয়োগীর গুন্তহত্যার পর -পরই নিজেদের ন্যায্য দাবি -দাওয়া নিয়ে ছত্তিশগড়ের আদিবাসী -শ্রমিকরা বড়ো আকারে শান্তিপূর্ণ ধর্না শুরু করেন৷ ১৯৯২ সালের জুলাইয়ে তা ‘রেল রোকো ’ কর্মসূচির রূপ পায়৷ আন্দোলন চলার গোটা পর্যায়টা জুড়েই শৈবাল আন্দোলনকারীদের জন্য অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন৷ উদ্দেশ্য , কোনও আন্দোলনকারী যদি হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন , যাতে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চিকিত্সার ব্যবস্থা করা যায়৷ ১ জুলাই পুলিশ নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ জমায়েতে গুলি চালায়৷ মারা যান ষোলো জন শ্রমিক৷ আহতদের চিকিত্সার বন্দোবস্ত করলেন শৈবাল৷ বেশ কয়েকটি ধারায় প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে৷ তার মধ্যে একটি ছিল ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৩৩ নম্বর ধারা — সরকারি কর্মীকে কাজে বাধাদান৷ কিন্ত্ত ১৯৯২ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত শৈবালকে এক বারের জন্যও কোনও সমন পাঠানো হয়নি৷ তত্সত্ত্বেও তাঁকে ‘ফেরার ’ ঘোষণা করা হল৷ যদিও দল্লির পুরনো বাজারচক এলাকা থেকে মাত্র ২০০ মিটার হেঁটে গেলেই যে কোনও পুলিশ অফিসার তাঁকে দেখতে পেতেন ! বস্ত্তত , দল্লিতে থেকে শৈবালকে চেনেন না বা তিনি কোথায় থাকেন জানেন না , এমন কোনও ওয়াকিবহাল মানুষ খুঁজে পাওয়াই শক্ত৷ যখন শৈবাল আরও কিছু কর্মীর সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ‘আত্মসমর্পণ ’ করলেন , তখনই ‘আবিষ্কৃত’ হল তিনি ‘ফেরার ’! সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জেলে পোরা হল৷ অন্য কর্মীদের অবশ্য গ্রেফতার করা হয়নি৷ শৈবালের একজন সহকর্মী হিসেবে আমি আর কী -ই বা বলতে পারি ! শৈবাল অত্যন্ত ভালো চিকিত্সক৷ নানা ধরনের রোগের চিকিত্সায় শৈবালের জুড়ি দেখিনি৷ যক্ষ্মা , প্রসূতির সমস্যা , ম্যালেরিয়া , সেপ্টিসেমিয়া , শিশুরোগ , হূদরোগ , হাড়ভাঙা , থায়ারোটক্সিকোসিস , মানসিক সমস্যা থেকে শুরু করে নিতান্ত মাথা ব্যাথা — সব কিছুরই চিকিত্সায় তিনি দড়৷ আর সব চেয়ে বড়ো কথা হল , দল্লি বা তার আশপাশের এলাকার প্রায় প্রতিটি পরিবারের কাছেই শৈবাল জানা যেন একজন অভিভাবক , অভিজ্ঞ ‘বুড়া ’৷ অথচ নিতান্ত নির্বোধ একটি গ্রেফতারির জন্য শৈবালের দিকে আজ সাধারণ মানুষের নজর পড়েছে৷ সেখান থেকেই আন্দাজ করা যায় , এই সময়ে জনগণের ভাবনা -চিন্তা , আলাপ আলোচনার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে৷ শৈবালের গ্রেফতারির ঘটনাটি এমন সময়েই ঘটল , যখন ছত্তিশগড়ের আদিবাসীদের অধিকারের পক্ষে যে কেউ কোনও স্বাধীন মত প্রকাশ করলেই — তা তিনি সাংবাদিক , আইনজীবী বা স্বাস্থ্যকর্মী যাই হোন না কেন , নেমে আসছে দমন -পীড়ন৷ আজকের পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই ২০০৫ -০৬ সালের সেই সালওয়া জুড়ুমের মতো৷

লেখক– বিশিষ্ট চিকিত্সক -সমাজকর্মী

Advertisements

ডাঃ শৈবাল জানা’র মুক্তির দাবীতে সোচ্চার হোন!

Untitled


ছত্তিসগড়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার ডাক্তার – আইনজীবী – সাংবাদিকরাও

ডাঃ শৈবাল জানা

ডাঃ শৈবাল জানা

চব্বিশ বছর আগেকার এক মামলায় গ্রেপ্তার করা হল ছত্তিসগড়ের এক চিকিত্সককে৷ নিহত শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর হাতে গড়া ‘ছত্তিসগড় মুক্তি মোর্চা’ পরিচালিত দল্লি রাজহারার শহিদ হাসপাতালের চিকিত্সক , এ দেশে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী সংগঠক শৈবাল জানাকে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার করে রমন সিং সরকারের পুলিশ৷ শনিবার বিকেলে ছত্তিসগড় থেকে ফোনে আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ জানিয়েছেন , আদালতে হাজির করা হলে বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ হয়৷ তবে মেডিক্যাল রিপোর্টের ভিত্তিতে আপাতত শৈবালবাবুকে দুর্গের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ শ্রমিকদের চাঁদায় গড়ে ওঠা এই হাসপাতালটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বহু মানুষের সহযোগিতায় ধারাবাহিক ভাবে চিকিত্সা পরিষেবা দিয়ে আসছে৷ চিকিত্সক শৈবাল জানা হাসপাতালটির সঙ্গে যুক্ত প্রায় গোড়া থেকেই৷ ১৯৯১ -এর ২৮ সেপ্টেম্বর খনি মালিক -মাফিয়াদের বাহিনী হত্যা করে শঙ্কর গুহ নিয়োগীকে৷ প্রতিবাদের ঢল নামে৷ ‘৯২ -এর ১ জুলাই ভিলাই শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের রেল রোকো আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়৷ ১৫ জন শ্রমিক নিহত হন৷ আহত শ্রমিকদের চিকিত্সার কাজে যুক্ত ছিলেন শৈবালবাবু৷ সেই ঘটনার সূত্রেই ২৪ বছর পরে তাঁকে গ্রেন্তার করা হল ‘সরকারি কাজে বাধাদানে ‘র অভিযোগে৷ মামলা যে ছিল , এতকাল জানতেই পারেননি শৈবালবাবু৷ শ্রমিক ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের স্বার্থে প্রতিবাদী বা প্রশ্নকারীদের কণ্ঠরোধে গ্রেন্তার -হয়রানি -অত্যাচারের যে নীতি নিয়ে চলেছে ছত্তিসগড়ের বিজেপি সরকার , শৈবালবাবুর গ্রেন্তারি তারই অন্যতম নজির৷ তাঁরা ওই চিকিত্সকের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন৷ এর আগে গত মাসেই বস্তারে আদিবাসী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেত্রী সোনি সোরির উপর অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটে৷ সোনির বোন অপহূত হয়েছেন৷ তাঁর বছর ষোলোর মেয়েকে ‘চরম শিক্ষা ‘ দেওয়ার হুমকি -চিঠি পাঠানো হয়েছে৷ পুলিশ -প্রশাসনের মদতেই এই হামলা -হয়রানির বলে অভিযোগ৷ উল্টে প্রশাসনিক মহল থেকে দায় চাপানো হয় নকশালপন্থীদের উপরে৷ ওই ঘটনার পরে ‘এই সময় ‘ থেকে বাস্তারের জেলাশাসক অমিত কাটারিয়াকে ফোন করা হলে সোনির উপর হামলাকে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে তিনি শুনিয়ে দেন , চলতি বছর প্রথম দেড় মাসেই ৫০ জন নকশালবাদীকে ‘খতম ‘ করেছে প্রশাসন৷ প্রজাতন্ত্র তার নাগরিককে হত্যা করতে পারে না —সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলেও বস্তারের ডিএম আমল দেননি৷ ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যার অভিযোগ উঠলেও কোনও রকম তদন্ত হবে না বলে জানিয়ে দেন৷ এর পর অবশ্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্তে যায় বস্তারে৷ যদিও কমিশনের রিপোর্টের কথা জানা যায়নি এখনও৷ সোনির উপর হামলার আগে জগদলপুরে কর্মরত দুই আইনজীবী শালিনী গেরা , ইশা খান্ডেলওয়ালকে হুমকির মুখে রাজ্য ছাড়া করা হয়৷ তাঁদের বাড়িওয়ালাকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে হঁশিয়ারি দিয়ে বাধ্য করা হয় শালিনীদের চলে যেতে বলার জন্য৷ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে অত্যাচারিত , মিথ্যা মামলার জড়িয়ে যাওয়া বস্তার -সহ ছত্তিসগড়ের অসংখ্য নাগরিককে আইনি সহায়তা দেওয়ার কাজ করছিলেন ইশা -রা৷ রাজ্য ছাড়া করার আগে কোর্টে তাঁদের প্র্যাকটিস বন্ধেও চেষ্টা হয়েছিল৷ রাজ্য বার কাউন্সিল তাঁদের প্র্যাকটিসের পক্ষে দাঁড়ালেও নানা ভাবে হুমকি দেওয়া চলছিল৷ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত বস্তারের আর এক সমাজকর্মী বেলা ভাটিয়াকেও রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সালাওয়া জুড়ুমের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে৷ বস্তারের আদিবাসী সমাজ , বিশেষত সেখানকার মহিলা ও শিশুদের উপর ধারাবাহিক সন্ত্রাসের তথ্য সংগ্রহে যুক্ত সাংবাদিক মালিনী সুব্রহ্মণ্যমকেও একই ভাবে হুমকির মুখে জেলা সদর জগদলপুর থেকে চলে আসতে হয়েছে৷ গত জানুয়ারিতে দেশের একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের যুক্ত-মঞ্চ সিডিআরও -র প্রতিনিধিরা ছত্তিসগড়ে যান তথ্যানুসন্ধানে৷ সেই তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে সুকমা -র জঙ্গলমহলে নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচারের রোমহর্ষক কাহিনি৷ তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্য এপিডিআর -এর অশোক দেবরায়ের কথায় , ‘নকশালবাদী মেয়েরা বিয়ে করেন না , এই ধারণা থেকে মেয়েদের মধ্যে নকশালবাদী খুঁজতে শুরু হয়েছে নতুন নির্মমতা –‘নকশালাইট টেস্ট ‘৷ পুরুষ জওয়ানের সামনে বুক উন্মুক্ত করে মেয়েদের স্তন টিপে দেখাতে হচ্ছে দুধ বেরোয় কি না ! অনেক সময় জওয়ানরাই সে কাজটা সারছে৷ যে নারীর স্তন থেকে দুধ নিঃসরণ হচ্ছে না , তাঁকেই অবিবাহিত নকশালবাদী সন্দেহে নিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী৷ চলছে যৌন নির্যাতন৷ ছত্তিসগড়ের এই নির্ভয়াদের কথা বাকি ভারত জানতেই পারছে না৷ বাহিনীর অত্যাচারে ছেলেরা গ্রাম ছাড়া৷ ভয়ঙ্কর ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করে খনি ও জঙ্গল মাফিয়াদের অবাধ লুঠের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে৷ ‘ আর মালিনীরা সেই অত্যাচারের প্রতিবেদন প্রকাশের খেসারত দিচ্ছেন এলাকা ছাড়া হয়ে৷ ডাক্তার শৈবাল জানাদের গ্রেন্তার হতে হচ্ছে অত্যাচারিত -আহত শ্রমিকের পরিচর্যার ‘অপরাধে ‘!

সূত্রঃ eisamay.indiatimes.com