নকশালবাড়ি পরবর্তী ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন

82927270-575b-46db-8d0e-50fcd6145a93

১৯৬৭ সালের মে মাসে নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন মূলত: মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস। নকশালবাড়ি কৃষক সংগামের ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ বিশ্বাসঘাতক সংশোধনবাদী লাইনের মুখোশ টেনে-ছিঁড়ে খোলাসা করে দেয়। সিপিআই-সিপিএম অনুসৃত শ্রেণি সমন্বয়বাদী-শান্তিপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচনপন্থী-সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের (তখন মাও চিন্তাধারা বলা হতো) ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতিতে এগিয়ে নেয়। নকশালবাড়ি তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের উত্তরাধিকার লাভ করে। ভারতে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশ হিসেবে তৃতীয় স্তর মাওবাদ তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (মালেমা) প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

নকশালবাড়ির পর আর কোন কিছই আগের মতো রইলো না। পুরনো সব ধ্যান-ধারণা-চিন্তাধারা-দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা হয় নকশালবাড়ির কষ্টিপাথরে। যা ছিল চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারাবাহিকতা।

কৃষক অভ্যুত্থানের পরপরই ১৪ জুন ১৯৬৭, কলকাতায় “নকশালবাড়ি ও কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটি” গঠিত হয়। নকশালবাড়ির স্ফুলিঙ্গ থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ-বিহার-উড়িশ্যা-উত্তর প্রদেশ-পাঞ্জাব-কেরালা-তামিলনাড়–-ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃত এলাকায় সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। ’৬৭ সালেই গঠিত হয় “কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি”। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল মহামতি লেনিনের জন্মবার্ষিকীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে)-[সিপিআই(এমএল)] গঠিত হয়। পার্টির তাত্ত্বিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা। নবগঠিত এই পার্টির দশ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন মহান মাওবাদী নেতা কমরেড চারু মজুমদার। ঐ বছরেই মে দিবসে কলকাতায় শহীদ মিনারে এক জনসভায় কানু সান্যাল পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন।

১৯৭১-৭২ সালে খুনি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র ভারতে এই সশস্ত্র ও গণসংগ্রাম তথা গণযুদ্ধকে ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক দমন-নির্যাতন চালায়। তারা ক. চারু মজুমদার-সরোজ দত্তসহ হাজার হাজার মাওবাদী বিপ্লবীকে গ্রেফতার-হত্যা করে। বিখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর লেখা “হাজার চুরাশির মা” উপন্যাসে তার কিঞ্চিত স্বাক্ষর রয়েছে। পার্টির কিছু লাইনগত ভুল-ত্রুটি এবং রাষ্ট্রীয় শ্বেত সন্ত্রাসে নকশালপন্থী সংগ্রাম বিপর্যস্ত হয়। পার্টি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়।

‘৭২ থেকে ‘৭৭ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দমন-নির্যাতন-বিপর্যয়-দল-উপদল-ভাঙ্গন-অধ:পতন চলতে থাকে। ‘৭৭ সালে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার হলে নকশালবাড়ি অনুসারীরা পার্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেন। সারা ভারতে নকশালবাড়ি দাবিদার বহু দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। এইসব ধারা-উপধারায় মোটা দাগে তিন ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা প্রকাশিত হয়।

(১)     সিপিআই(এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি ভুল। এই ধারা অনুসারীরা পুরনো বস্তাপচা সংসদীয় নির্বাচনী পথ নেয়।

(২)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি সঠিক। এরা পুরনো কায়দায় যান্ত্রিকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম করার চেষ্টা করে।

(৩)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন মৌলিকভাবে সঠিক। কিন্তু গুরুতর কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল।

এই ধারার অনুসারীদের অন্যতম কমরেড কোন্ডাপল্লী সিতারামাইয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য কমিটি ’৭৪ সালে  ৬৭-৭২-এর সংগ্রামের একটি সারসংকলন করে। এই সংগঠন আত্মসমালোচনামূলক লাইনগত পর্যালোচনায় ৪টি গুরুতর ভুলকে চিহ্নিত করে।

      ক) দেশীয়-বিশ্ব বিপ্লব সংঘটনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিজয় আকাংখা;

       খ) খতমকে এ্যাকশনের একমাত্র রূপ হিসেবে নির্ধারণ;

       গ) গণসংগঠন-গণসংগ্রামের লাইন বর্জন; এবং

       ঘ) পার্টি গঠনের কাজকে অবহেলা করা।

এই সারসংকলনের ভিত্তিতে ’৮০ সালের ২২ এপ্রিল সিপিআই(এম-এল) [পিপলস ওয়ার-জনযুদ্ধ] গঠন করে। এই গ্রুপ প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পরে দন্ডকারণ্যসহ সন্নিহিত রাজ্যগুলিতে গণযুদ্ধ বিকশিত করে।

পরবর্তীতে আরো কিছু নকশালবাড়ি লাইনের অনুসারী সংগঠন প্রায় একই ধরনের সারসংকলন করে। যার মধ্যে পড়ে সিপিআই(এম-এল) পার্টি ইউনিটি, করম সিং-এর নেতৃত্বাধীন পাঞ্জাব কেন্দ্রীক মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র (যে সংগঠন পরে এমসিসির সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়), কেরালা কেন্দ্রীক সিপিআই (এম-এল) নকশালবাড়িসহ আরো কিছু সংগঠন। অন্যদিকে সিপিআই(এম-এল)-এ সংগঠিত হয়নি এমন সংগঠন “দক্ষিণ দেশ” এমসিসি নামে সংগঠিত হয়ে বিহার-ঝাড়খন্ডে গণযুদ্ধ গড়ে তোলে।

একই সাথে এইসব সংগঠন একটা সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ার প্রক্রিয়াও চালাতে থাকে। প্রথমে ১৯৯৮ সালে সিপিআই(এম-এল)-এর “পিপলস ওয়ার” গ্রুপ এবং ক. নারায়ণ সান্যাল (বিজয়দা)’র নেতৃত্বাধীন “পার্টি ইউনিটি” গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হয়। এবং পরে ২০০৪ সালে ২১ সেপ্টেম্বর ক. গণপতির নেতৃত্বাধীন সিপিআই(এম-এল) এবং ক. কানাই চ্যাটার্জী প্রতিষ্ঠিত ক. সুশীল রায়-ক. কৃষাণের নেতৃত্বাধীন এমসিসি  ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) গঠন করেন। এই নবগঠিত পার্টির সম্পাদক হন ক. গণপতি। ঐক্য প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ২০১৪ মে দিবসে ক. গণপতি এবং নকশালবাড়ি গ্রুপের সম্পাদক ক.অজিত এক যৌথ বিবৃতিতে সিপিআই(এম-এল) নকশালবাড়ি, সিপিআই (মাওবাদী)তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। মালেমা ও নকশালবাড়ি অনুসারী গণযুদ্ধের লাইনের অন্যান্য সংগঠনের সাথেও ঐক্য প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, এইসব সংগঠনের কোন কোনটি আরআইএম-কমপোসার সদস্য ছিল।

আর সংসদীয় নির্বাচনপন্থী সংশোধনবাদী এবং গোড়ামীবাদী-যান্ত্রিক ধারাগুলো শাসক সাম্রাজ্যবাদের দালাল আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া-সামন্ত শ্রেণির সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।

নকশালবাড়ি একটা চলমান বিপ্লব। যার লক্ষ্য নয়া গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ। পথটা আঁকাবাঁকা, কিন্তু একে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই একটি থানা নকশালবাড়ির উত্থান মাত্র পঞ্চাশ বছরে আজ সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সেই পার্টির নেতৃত্বে অন্ধ্র-বিহার-দন্ডকারণ্য-ছত্তিশগড়ের পর দক্ষিণ ভারতের কেরালা-কর্ণাটক সীমান্তে পশ্চিম ঘাট এলাকায় গেরিলা অঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের আসাম-মনিপুর রাজ্যে গণযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় শাসক শ্রেণি এখন বলতে বাধ্য হচ্ছে মাওবাদ ভারত রাষ্ট্রের জন্য প্রধান বিপদ। সে জন্যই চলমান গণযুদ্ধকে ধ্বংস করতে ২০০৯ সালে এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করা “অপারেশন গ্রিনহান্ট” বর্বরোচিভাবে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

গণযুদ্ধ হলো জনগণের যুদ্ধ। যেখানেই অন্যায়-অত্যাচার সেখানেই জনগণ প্রতিরোধ-যুদ্ধ করবে। এর আগানো-পিছানো থাকে, কিন্তু ধ্বংস করা যায় না। নকশালবাড়ি আবারো প্রমাণ করেছে ঝরে যাওয়া রক্তে বিপ্লব তলিয়ে যায়না, বরং ছড়িয়ে পড়ে।

নকশালবাড়ি লাল সালাম!।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা