ভারতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের রিপোর্টে ‘নকশাল বিপ্লব’ নিয়ে সতর্ক বার্তা

naxalite-india

ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের “সন্ত্রাসবাদ” সম্পর্কে একটি গবেষণার রিপোর্টে নকশাল আন্দোলনকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক তৃতীয় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম দুটি হচ্ছে আইএসআইএস এবং তালিবান। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত বছর সিপিআই (মাওবাদী)’র ৩৩৬টি আক্রমণে ১৭৪ জন নিহত এবং ১৪১ জন আহত হয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতে অর্ধেকেরও বেশি সন্ত্রাসী হামলা চারটি রাজ্যে পরিচালিত হয়েছিলঃ জম্মু-কাশ্মীর, ছত্তিশগড়, মণিপুর এবং ঝাড়খন্ডে। ভৌগোলিক এলাকা দেখায় যে, মাওবাদীদের নেতৃত্বে বামপন্থী চরমপন্থীরা পূর্ব ভারতের অংশে সশস্ত্র সংঘাতেও অবদান রেখেছিল।” অনুরূপভাবে, এই প্রতিবেদনে জম্মু ও কাশ্মীরের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে ৯২% বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

Advertisements

নক্সালবাড়ীর শিক্ষা অমর হোক!

xNAXALBARI-EKAL-SEKAL-1-678x381.jpg.pagespeed.ic.W35FKhk1wi

নক্সালবাড়ী একটি ছোট এলাকার নাম। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার একটি প্রত্যন্ত থানা ছিল নক্সালবাড়ী। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু গত শতাব্দীর ’৬০-দশকের শেষদিকে সেই নামটি ছড়িয়ে পড়লো সারা ভারতে, সারা দক্ষিণ এশিয়ায়, শুধু তাই নয় সারা দুনিয়ায়। নক্সালবাড়ী হয়ে উঠলো এক অমিততেজ আন্দোলনের নাম। আর আজ ৫০ বছর পরে নক্সালবাড়ী হয়ে উঠেছে, বিশেষত ভারতের নিপীড়িত কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী, নারী, দলিত, প্রগতিশীল ছাত্র বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তসহ শত কোটি মানুষের বিপ্লবী সংগ্রাম ও মুক্তি আন্দোলনের প্রেরণার উৎস। তা হয়ে উঠেছে এক আলোকস্তম্ভ, যাকে দিশা ধরে আজ নিপীড়িত জনগণ তাদের মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

কী হয়েছিলো নক্সালবাড়ীতে সে সময়টাতে? বাহ্যিকভাবে সেটা ছিল একটি সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থান, যাতে কিনা সেই এলাকা ও আশপাশের আরো দু’একটি থানার (খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া) কৃষকেরা জাগরিত হয়েছিলেন। তারা জোতদারদের জোঁকসম শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা বিদ্রোহ করেছিলেন। কিন্তু এরকম স্থানীয় বিদ্রোহ, বিশেষত কৃষক বিদ্রোহ ভারতেবর্ষে বহু বহু ঘটেছে। ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির দিক থেকে বহু কৃষক অভ্যুত্থান ছিল এর চেয়ে অনেক উন্নত। ভারতবর্ষের প্রায় সকল কৃষক অভ্যুত্থান যেমনটা এক পর্যায়ে সশস্ত্র রূপ গ্রহণ করে, এটিও তেমনটাই হয়েছিল, যদিও ব্যাপকতা ও মাত্রার বিচারে অন্য অনেক আন্দোলনের চেয়ে তা ছিল অনেক দুর্বল। তাহলে নক্সালবাড়ী কেন এত বিশিষ্ট হয়ে উঠলো? কেন পরবর্তীকালে ভারতের গোটা বিপ্লবী আন্দোলনটিই ‘নক্সাল আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পেয়ে গেলো? আর কেনই বা সেই আন্দোলন আজ “মাওবাদী আন্দোলন” বা “মাওবাদী বিপ্লব” নামে ভারতের মতো এতবড় এক শক্তিশালী প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রের প্রধানতম বিপদ হিসেবে আবির্ভুত হলো? এখানেই নিহিত নক্সালবাড়ীর কৃষক অভুত্থানের বিশিষ্টতা। আর তার মহত্ত্ব।

নক্সালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল কৃষকদের নিছক কিছু জরুরি স্বার্থকে কেন্দ্র করে নয়। ঠিক-যে, সেখানে জোতদারদের শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদের বিষয় ছিল, ছিল জোতদারের গোলায় ধান না তুলে কৃষকের দখলে তা নিয়ে আসার কর্মসূচি, ছিল সুদি ব্যবসায়ীদের কাগজপত্র ধ্বংস করে দেবার কর্মকা-, কৃষকের হাতে জমির অধিকার ছিনিয়ে নেবার আন্দোলন। সেখানে শিলিগুড়ির চা-শ্রমিকদের সাথে কৃষকের আন্দোলনের এক দৃঢ় মৈত্রী ও মেলবন্ধনও সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সব কিছুর ঊর্ধ্বে এসবই হয়েছিল সমাজবিপ্লবের সর্বশেষ তাত্ত্বিক-মতাদর্শগত বিকাশ মাওবাদের আদর্শে; শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবকে অক্ষশক্তি হিসেবে আঁকড়ে ধরে; শ্রমিক-কৃষকের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে ধারণ করে। এবং ফলতঃ ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বের মাঝে জেঁকে বসা সংস্কারবাদী-নির্বাচনবাদী-সংশোধনবাদী মতাদর্শ, রাজনীতি, ঐতিহ্য ও কর্মপদ্ধতিকে স্পর্ধিত চূর্ণ করার মাধ্যমে তার সাথে পরিপূর্ণ বিচ্ছেদ সাধনের দ্বারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক নব উল্লম্ফনের সূচনা ক’রে।

তৎকালীন ভারতবর্ষের সবচেয়ে অগ্রসর কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা একটি সচেতন আদর্শগত ভিত্তিতে এবং একটি সচেতন বিপ্লবী কর্মসূচির অধীনে, সর্বোপরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের স্বপ্নকে ধারণ করে এই নক্সালবাড়ীকে সৃষ্টি করেছিলেন। যাকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম সচেতন মাওবাদী বিপ্লবী কমরেড চারু মজুমদার। যে কারণে নক্সালবাড়ীর অভ্যুত্থানের সাথে চারু মজুমদারের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। যদিও তাকে অস্বীকার করার বহু অপচেষ্টা হয়েছে, যদিও এই নেতৃত্ব ও এই আন্দোলনটির বিরুদ্ধে হাজারটা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যদিও এই আদর্শটিকে ধ্বংস করার জন্য তাবদ প্রতিক্রিয়াশীল এবং ভারতের চরম ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তি তার সর্বোচ্চ বর্বরতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের সে সকল অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নক্সালবাড়ী রয়ে গেছে জাজ্বল্যমান সত্য রূপে। তার বাণী ছড়িয়ে গেছে সারা ভারত জুড়ে, সারা দক্ষিণ এশিয়ায়। তার বার্তা পৌঁছে গেছে সারা বিশ্বে।

** নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯৬৭ সালের মে মাসে। মে মাসের ২৫ তারিখটিকে বিশেষভাবে আনা হয়, কারণ সেদিনটি ছিল সংগ্রামের একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা মনে হতে পারে যে, যখন শিলিগুড়ির কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এরকম এক কৃষক অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটান, তখন তারা অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে যে পার্টির সদস্য ছিলেন সেই পার্টিটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হুকুমেই ঐ দিনের নারকীয় হত্যালীলাটি সংঘটিত হয়েছিলো। কারণ, ওই সিপিএম পার্টিই তখন পশ্চিম বঙ্গের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল। আগে থেকেই ক্রমান্বয়ে তীব্র হতে থাকা কৃষক অভ্যুত্থানটির উপর ২৫ মে তারিখে যে কাপুরুষোচিত পুলিশী আক্রমণ পরিচালিত হয় তাতে  ৮ জন নারী ও ২ জন শিশুসহ মোট ১১ জন শহীদ হন। পরে অবশ্য সিপিএম নেতৃত্ব (জ্যোতি বসুরা) কালবিলম্ব না করে চারু মজুমদারসহ অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদেরকে তাদের সেই পচে যাওয়া পার্টি থেকে বহিস্কার করে। সেজন্য অবশ্য পার্টির বিপ্লবী অংশটির মানসিক প্রস্তুতি হয়েই ছিল।

এ পরিস্থিতিটিকে বুঝতে হলে সে সময়কার ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিস্থিতিটি খুব সংক্ষেপে হলেও তুলে ধরা যায়। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি মহান স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ৩য় আন্তর্জাতিকের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিলো ২০-এর দশকে। সেই পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের সবেচেয়ে সংগ্রামী, ত্যাগী ও মেধাবী বিপ্লবীরা। কিন্তু পার্টিটি সাংগঠনিকভাবে বিরাট বিস্তৃতি ঘটালেও বিপ্লবী রাজনীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী সংগ্রামকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। তবে কৃষক শ্রমিক জনতার বহু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে এ পার্টির আন্তরিক নেতা-কর্মীরা যুক্ত থাকেন ও তাতে নেতৃত্ব দেন। এর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও উত্থান ছিল ৪০-দশকের শেষ দিকে ও ৫০-দশকের শুরুতে তেলেঙ্গানার মহান কৃষক অভ্যুত্থান, যা কৃষক ও নিপীড়িত জনতার বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের সংগ্রামে পর্যবসিত হয়। কয়েক হাজার গ্রাম জুড়ে সামন্তবাদী কর্তৃত্ব ভেঙ্গে কৃষক-জনতার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার কৃষকের বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে। কিন্তু তৎকালীন পার্টি নেতৃত্ব এই মহান উত্থানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা একে বর্জন করে ও নিভিয়ে দেয়Ñ তৎকালীন রাষ্ট্রক্ষমতার কংগ্রেস পার্টির সাথে যোগসাজশে। সেই থেকে শুরু। কিছু পরেই এই নেতৃত্ব যৌক্তিকভাবেই প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র রাশিয়ায় বিপ্লব-বিরোধী ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদীদের উত্থান হলে তাদের সাথে সহজেই যোগ দেয়। এ অবস্থায় বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিপ্লবী নেতৃত্বদানে মাও সেতুঙের নেতৃত্বে চীনা পার্টি এগিয়ে আসে। তারই প্রভাব পড়ে ভারতীয় পার্টিতেও। চীনা পার্টির বিপ্লবী লাইনের প্রভাবে ভারতের আন্তরিক কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা সিপিআই নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এর ফলশ্রুতিতেই গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে সিপিএম। জ্যোতি বসু-নাম্বুদ্রিপদদের নেতৃত্বে। স্বভাবতই শিলিগুড়ির বিপ্লবীরা সিপিএম-এ যুক্ত হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই প্রমাণ হতে থাকে যে, সিপিএম নেতৃত্ব শুধু বাহ্যিকভাবেই চীনা পার্টির আদর্শের কথা বলছে, কিন্তু সারবস্তুগতভাবে তারা পুরনো সিপিআই সংশোধনবাদী-সুবিধাবাদীদের পথেই চলছে।

এদিকে কিন্তু মাও-এর শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে শিলিগুড়িসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার আন্তরিক বিপ্লবীরা সত্যিকার কৃষি বিপ্লব সাধনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন। চারু মুজুমদার তখন শিলিগুড়ি শাখার নেতৃত্বদের একজন। যদিও তিনি ছিলেন পূর্বাপর অসুস্থ, কার্ডিয়াক এ্যাজমার জটিল রোগী, ক্ষীণকায় এক মানুষ। কিন্তু তিনি তার অঞ্চলে পার্টিকে বিপ্লবী চেতনায় সজ্জিত এবং বাস্তব বিপ্লবী সংগ্রামে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ১৯৬৫ সালের মধ্যেই পর পর আটটি দলিল রচনা করেন। যা পরবর্তীতে ‘ঐতিহাসিক ৮ দলিল’ নামে খ্যাত হয়। এই ছিল মতাদর্শগত-রাজনৈতিক ভিত্তি,  সেইসাথে নতুন বিপ্লবী ধারার সাংগঠনিক কাজেরও গাইড লাইন, যার ভিত্তিতে শিলিগুড়িতে চা-শ্রমিক ও কৃষকদের মাঝে বিপ্লবী সংগঠন বিকশিত হয়ে ওঠে। এবং তারই যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে সংঘটিত হয় নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান।

নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান তিনটি মূল বিষয়কে সামনে নিয়ে এলো- ১. মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে মতাদর্শগত তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা; ২. কৃষি-বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরা; এবং ৩. সশস্ত্র বিপ্লবী পথে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা। এই ছিল সূচনা, এক নতুন ভোর, যা পরে বিকশিত হয়ে ওঠে এক রোদ্র করোজ্জল দিবসে। যা ছিল মহান মাওয়ের নেতৃত্বে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরই ভারতীয় সংস্করণ।

তখনও উপরোক্ত মতাদর্শ-রাজনীতির ভিত্তিতে কোন বিপ্লবী পার্টি গড়ে ওঠেনি। অভ্যুত্থানটি ছিল স্থানীয়। ফলে রাষ্ট্রীয় দমনে ও স্থানীয় শত্রুদের যোগসাজশে যে দমন-নির্যাতন নেমে আসে তাকে মোকাবেলা করে সে অভ্যুত্থান টিকতে পারেনি। কিন্তু তা এক নতুন বার্তা সমগ্র ভারতে সাচ্চা কমিউনিস্ট, সাচ্চা বিপ্লবী ও নিপীড়িত জনগণের সামনে তুলে ধরে। সারা ভারত জুড়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো- নক্সালবাড়ী লাল সেলাম! মুক্তির একই পথ নক্সালবাড়ী!! কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠতে থাকে বহু গ্রুপ ও গোষ্ঠী যারা এই নতুন মতাদর্শ ও রাজনীতির সমর্থনে এগিয়ে এলো। যারই ধারাবাহিকতায় দুই বছর পর ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল কলকাতায় ভারতের সত্যিকার বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিআই(এমএল) গঠিত হয়, যার প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন কমরেড চারু মজুমদার।

** পার্টি-গঠনের পর নক্সালবাড়ীর আদর্শে বিপ্লবী সংগ্রাম ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে, তা আরো এগিয়ে চলে। সারা ভারতকে তা কাঁপিয়ে দেয়। শ্রীকাকুলাম, দেবরা-গোপীবল্লভপুর, বীরভূমসহ বিভিন্ন বিপ্লবী এলাকা গড়ে ওঠে। অসংখ্য তরুণ ও কৃষক ঝাঁপিয়ে পড়েন এই মুক্তি সংগ্রামে। এক নতুন বিপ্লবী সংস্কৃতি পুরনো বুর্জোয়া মুৎসুদ্দি সামন্ত সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার দুর্গে সজোর আঘাত হেনে বেড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র ও কায়েমী স্বার্থবাদীরাও বসে থাকেনি। তারা বিভৎস দমনে ক্ষত-বিক্ষত করে বিপ্লবী কৃষক, তরুণ ও বিপ্লবীদেরকে। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে কমরেড চারু মজুমদারকে গ্রেফতারের পর পুলিশী হেফাজতে তাকে হত্যা করা হয়। মুক্তির এ সংগ্রাম সাময়িকভাবে হলেও মার খেয়ে যায়।

কিন্তু পূর্বেই যেমনটা বলা হয়েছে, নক্সালবাড়ী নিছক এক স্থানীয় কৃষক অভ্যুত্থান ছিল না। সেটা ছিল ভারতবর্ষে বিশ্বের অগ্রসরতম বিপ্লবী মতাদর্শ ও তাত্ত্বিক ভিত্তির আগমনবার্তা। যার কোন মৃত্যু নেই। তাই আমরা দেখি আজ ৫০-বছর পরে নক্সাল আন্দোলন ধ্বংস তো দূরের কথা, বরং ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় নক্সালবাড়ীর আদর্শ মাথা উঁচু করে ভিত্তি গেড়ে বসেছে। বিগত ৫০-বছরে এই আদর্শের বেদিতে স্বেচ্ছাবলী দিয়েছেন হাজারো তরুণ, হাজারো কৃষক ও শ্রমিক। কিন্তু এ মিছিলের শেষ নেই। এবং তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অমিত শক্তিধর চরম প্রতিক্রিয়াশীল ভারতীয় রাষ্ট্রশক্তিকে পরাজিত করে বিস্তীর্ণ মুক্ত এলাকা, কৃষক ও নিপীড়িত জনগণের, আদিবাসী কৃষক ও নারীদের বিশাল বাহিনী। যার সুবাতাস প্রতিনিয়তই ছড়াতে থাকে ছত্তিশগড়, ঝাড়খ-, বিহার, মহারাষ্ট্র, পশ্চিবঙ্গের জঙ্গলমহল থেকে।

** নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান, আর ‘নকশাল আন্দোলন’ একই বিষয় নয়। নক্সালবাড়ী দিয়ে সূচিত নকশাল আন্দোলনও অন্ততপক্ষে দুটো প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত- কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বকালীন সময়কাল; আর পরবর্তীকালে অন্ধ্র-বিহার থেকে উত্থিত সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। এগুলো একটি থেকে আরেকটি উচ্চতর। বিপ্লবী সারবস্তুকে আঁকড়ে ধরে কৃত ভুলকে কাটিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে যাবার অভিন্ন ধারা। এই ক্রমোন্নতির ধারাটিকে কেউ কেউ বুঝতে চান না, যদিও তারা নকশাল আন্দোলনের সমর্থক। এটা হয় এজন্য যে, তারা একথা অস্বীকার করেন যে, নক্সালবাড়ী বা চারু মজুমদারের জায়গাতেই এ বিপ্লবী আন্দোলন সীমাবদ্ধ নেই, থাকতেও পারে না, থাকলে তা এগুতেও পারতো না।

কিন্তু এগুলোকে এক থেকে আরেকটিকে বিচ্ছিন্ন করলেও চলবে না। নক্সালবাড়ীরই ধারাবাহিকতা আজ ছত্তিশগড়ের গণযুদ্ধ। যাকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে মাওবাদ, নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব- যার কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি বিপ্লব এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের গণযুদ্ধ- এই তিন মৌলিক মতাদর্শ ও রাজনীতি।

নক্সালবাড়ীর ৫০-তম বার্ষিকীতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আর স্মৃতিতর্পণের সাথে যদি উপরোক্ত মতাদর্শ-রাজনীতিকে সঠিকভাবে ধারণ ও প্রয়োগ করা না যায় তাহলে পথভ্রষ্ট হতে হবে। নক্সালবাড়ীর মূল বাণী বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ জনগণের বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিষ্ঠা, বিপ্লবী রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণ, যা কিনা সমাজতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ বেয়ে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে এগিয়ে চলবে। তাই, সংগ্রামটি বৈশ্বিক এবং সুদীর্ঘস্থায়ী। কয়েক প্রজন্ম ধরে এই সংগ্রামকে বহমান রাখতে হবে। ভারতে, বাংলাদেশে, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় এবং সারা বিশ্বে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা

 


সভা করার জন্য নকশালন্থীদের পার্ক না দেওয়ার অভিযোগ বামফ্রন্ট পরিচালিত শিলিগুড়ি পুরসভার বিরুদ্ধে

সিপিএমের তরফে হামেশাই অভিযোগ করা হয় যে শাসকদলের নির্দেশেই পুলিস তাদের সভা করার অনুমতি দেয় না। এবার একই অভিযোগ উঠল সিপিএমের বিরুদ্ধে। বামফ্রন্ট পরিচালিত শিলিগুড়ি পুরসভা নকশালপন্থীদের বাঘাযতীন পার্কে সভা করার অনুমতি দেয়নি বলে অভিযোগ। নকশালবাড়ি অভূত্থ্যানের ৫০ বছর পূর্তিতে ২৫শে মে ২০১৭ তে শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে এক সভা করার অনুমতি চেয়েছিল নকশালবাড়ি অভূত্থ্যানের ৫০ বছর উদযাপন কমিটি। সংগঠনের তরফে অভিযোগ গত বছর ডিসেম্বর মাসে তারা ২০১৭সালের ২৫মের জন্য বাঘাযতীন পার্কে অনুষ্ঠান করার অনুমতি চেয়ে আবেদনও করেছিল। সেই সময় নির্দিষ্ট দিনের জন্য পার্ক চেয়ে কেউ আবেদন করেনি বলে জানিয়েছিল পুরসভা। অন্তত এমনটাই দাবি কমিটির। হঠাত্ই নাকি পুরসভা তাদের জানায় অন্য একটি সংগঠনকে ওই দিন পার্ক দেওয়ায় তাদের দেওয়া যাচ্ছে না। স্পষ্টতই বামেদের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠছে। বাধ্য হয়ে তারা তাদের সভা  শিলিগুড়ি ইনডোর স্টেডিয়ামে স্থানান্তরিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিটি।

সূত্রঃ satdin.in


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৫ম পর্ব)

বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি বিপ্লব বিরোধী, চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা বিরোধী, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিরোধী শ্রেণী সহযোগিতার ও সংশোধনবাদী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটি তার মাদুরাই বৈঠকে শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতির পথ বেছে নিয়েছে। [ইতিমধ্যে তারা তাদের অষ্টম কংগ্রেসে তাদের ঐ মাদুরাই লাইন অনুমোদন করিয়ে নিয়েছে – প্রকাশক]।

আন্তর্জাতিক মত-বিরোধ সম্পর্কে অনেক বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও আসলে তারা মহান চীনের পার্টি ও চেয়ারম্যান মাও-এর সমস্ত সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ধনতন্ত্রের বিকাশ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নীরব থেকে তারা কমরেড স্তালিনের শেষ লেখা সোভিয়েত-এ সমাজবাদের আর্থিক সমস্যাবলী (Economic problems of socialism in USSR) – এর বক্তব্যও সোজাসুজি অস্বীকার করলো এবং মহান চীনের পার্টির সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করলো এই ঘোষণা করে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন এখনো সমাজতান্ত্রিক শিবিরেই আছে। এই কথা বলার তাৎপর্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম প্রশ্নে সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের প্রস্তাবকে সমর্থন জানানো এবং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সোভিয়েত অর্থনৈতিক সাহায্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রগতিশীল ভূমিকা দেখা এবং তাকে সমর্থন জানানো। কেন্দ্রীয় কমিটি কৃষক সংগ্রাম সম্বন্ধে সোজাসুজি মেনশেভিক রাজনৈতিক মত গ্রহণ করেছে। এবং কৃষক সংগ্রামের বিরোধীতা করেছে।

স্বভাবতঃই কেন্দ্রীয় কমিটির মাদুরাই বৈঠক পার্টিকে এক সংশোধনবাদী বুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত করেছে; তাই এই নীতির বিরোধীতা করা ছাড়া বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের অন্য কোন পথ নেই। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কমিটি মাদুরাই প্রস্তাব গ্রহণ করায় একথা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় কমিটি বিপ্লবী নয়।

কাজেই বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীকে এই কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। মাদুরাই প্রস্তাবের যে বাগাড়ম্বরতা কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির মধ্যকার বিপ্লবী অংশের চোখে ধুলো দেবার জন্যেই করেছে এবং গোপন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের দালালী করার জন্যই করেছে।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা আদর্শগত আলোচনা করে একটি মাত্র উদ্দেশ্যে, তা হল তাদের নিজের দেশের বাস্তব অবস্থায় সেই আদর্শের প্রয়োগ কি ভাবে হবে তার জন্যে। সাধারণভাবে কোন আদর্শগত আলোচনারই কোন বিপ্লবী তাৎপর্য নেই, কারণ সত্যের যাচাই হবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগের মারফৎ। কেন্দ্রীয় কমিটি আন্তর্জাতিক মত-বিরোধকে একটি বিমূর্ত চিন্তাধারা (abstract concept) হিসাবে আলোচনা করেছে, নির্দিষ্টভাবে (Concretely) যা করেছে তা হলো সোজাসুজি সোভিয়েত সংশোধনবাদকেই ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে একমাত্র পথ হিসাবে ঘোষণা করেছে। কাজেই তাদের মহান চীনের পার্টির বিরোধীতা করতে হয়েছে।

তাদের বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পারমাণবিক অস্ত্র মজুত সম্বন্ধে বক্তব্যে। তারা সোভিয়েত ও মার্কিন পারমাণবিক একচেটিয়া মালিকানার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেনি, কেবল সমালোচনা করেছে “সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনকে পারমাণবিক জ্ঞানের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সাহায্য করেনি কেন” বলে। পারমাণবিক বোমা আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে। সেক্ষেত্রে সোভিয়েত ও মার্কিন সহযোগিতা যে প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব প্রভূত্বের জন্য সহযোগিতা-এই স্পষ্ট কথাটি নানা কথার প্যাঁচে গোপন করা হয়েছে।

সোভিয়েত ও মার্কিন পারমাণবিক জ্ঞানের আদান প্রদানের মত ঘটনা কেন্দ্রীয় কমিটির চোখে পড়েনি এবং তা থেকে যে সিদ্ধান্তে আসা উচিত ছিল তাও তারা আসেনি । কারণ তারা আন্তর্জাতিক মত-বিরোধকে বুর্জোয়া জাতীয় স্বার্থের বিরোধ হিসাবে দেখছে বলেই আন্তর্জাতিক মত বিরোধের আসল তাৎপর্য অর্থাৎ এই বিরোধ যে প্রকৃতপক্ষে মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষার এবং বিপ্লবী মতের সাথে বিপ্লব বিরোধী মতের বিরোধ-সে হিসাবে দেখছে না।

ভারত প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র সম্বন্ধে কোন কথা না বলে তারা “কংগ্রেসের এখনও জনসমর্থন আছে” বলার মধ্যে দিয়ে এই প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে জনতার সামনে সুন্দর করে দেখাতে চেয়েছে। ভারতবর্ষব্যাপী গণ-বিক্ষোভ সম্বন্ধে নীরব থেকে তারা এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করেছে এবং যুক্তফ্রণ্ট মন্ত্রীসভা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরোক্ষভাবে গণ-বিক্ষোভ দমনের প্রতিটি কার্যকলাপকে সমর্থন জানিয়েছে এবং সেই জনবিরোধী কাজগুলির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে। যুক্তফ্রণ্টের শরিকদের শ্রেণী বিশ্লেষণের কোন চেষ্টা না করে নির্বিচারে তারা নির্দেশ দিয়ে বসলো এই সমস্ত পার্টিগুলোকে (যুক্তফ্রণ্টের শরিক) বুজিয়ে-সুঝিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রোগ্রামের পক্ষে টেনে আনতে হবে। এর নাম যদি নির্জলা গান্ধীবাদ না হয় তবে গান্ধীবাদ কাকে বলে আমাদের জানা নেই। শ্রেণী, শ্রেণীস্বার্থ এবং তার বিরোধের মত সব কথা কেন্দ্রীয় কমিটির বিচারের মধ্যে আসেনি অর্থাৎ মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী জলাঞ্জলি দিয়ে কতকগুলি মার্কসবাদী শব্দ যোজনা করে কেন্দ্রীয় কমিটি সমগ্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদকেই বাতিল করে দিয়েছে।

কংগ্রেস সরকারের এখনও গণ-ভিত্তির গল্প বলে কেন্দ্রীয় কমিটি দেখাতে চেয়েছে যে ভারতে প্রতিক্রিয়াশীলরাই খুব শক্তিশালী। গণবিক্ষোবের মধ্য দিয়ে এই সরকারের অর্থনৈতিক সঙ্কট যে রাজনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে এই সুস্পষ্ট ঘটনাকে আড়াল করে রেখে জনতার শক্তিকে ছোট করে দেখানো হচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস সরকারের দুর্বলতা যখন সাধারণ মানুষের কাছেও জীবন্ত হয়ে উঠেছে তখন কেন্দ্রীয় কমিটি তার শক্তিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়ে জনসাধারণকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পক্ষে এমন নির্লজ্জভাবে প্রচার করতে কংগ্রেসও বোধ হয় লজ্জা পেতো।

এই সরকারকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সংশোধনবাদ পুরো মদত দিয়েও যখন জনসাধারণের মনে এর শক্তি সম্বন্ধে বিশ্বাস সৃষ্টি করাতে পারছে না, তখন কেন্দ্রীয় কমিটি খাঁটি দালালের মত এগিয়ে এসেছে এই প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে রক্ষা করতে। এই কেন্দ্রীয় কমিটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের সহযোগী ও মিত্র।

কেন্দ্রীয় কমিটি দেখাবার চেষ্টা করেছে যে তারা কোন পার্টিরই নেতৃত্ব মানে না। ধনিকশ্রেণী চিরকাল বলে এসেছে যে কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত পার্টির নির্দেশ নিয়ে চলেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি সেই বুর্জোয়া প্রচারের বিরুদ্ধে দেখাবার চেষ্টা করেছে যে তারা কারও নির্দেশ বা বিশ্লেষণ মানে না। আমরা কমিউনিস্টরা একটা বিজ্ঞানে বিশ্বাস করি, যার নাম মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা। বিজ্ঞান মানলেই সেই বিজ্ঞানের যারা বিকাশ করছেন তাঁদের মানতে হবে। লেনিনকে না মেনে যারা মার্কসবাদী হতে চেয়েছিল তারা ইতিহাসের আবর্জনা স্তুপে আশ্রয় নিয়েছে। তেমনি আজও মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বোচ্চ রূপ মাও সেতুঙের চিন্তাধারা -এই আন্তর্জাতিক মার্কসবাদী কর্ত্তৃত্বের যারা বিরোধীতা করছে তাদের আশ্রয় নিতে হবে সাম্রাজ্যবাদের কোলে।

ভারতবর্ষ একটা আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশ। তাই এই দেশে ঔপনিবেশিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রধান ভিত্তি কৃষকশ্রেণী এবং সেই শ্রেণী সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম। কৃষি বিপ্লব ছাড়া এদেশের কোনও পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং কৃষি বিপ্লবই একমাত্র পথ, যে পথে এ দেশের মুক্তি আসতে পারে। সেই কৃষি বিপ্লব সম্বন্ধে কেন্দ্রীয় কমিটি শুধু যে নীরব তাই কেবল নয়, যেখানে সেখানে কৃষকেরা বিদ্রোহের পথ নিচ্ছে, সেখানেই তারা বিপ্লবী সংগ্রামের বিরোধীতা করতে বদ্ধপরিকর। কি অসীম ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্রের নকশালবাড়ীর বিপ্লবী কৃষক সংগ্রামীদের প্রতি, কি উল্লাস প্রকাশ পেয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল যুক্তফ্রণ্ট সরকারের দমননীতির সাময়িক সাফল্যে। খাঁটি বুর্জোয়ার প্রতিনিধির মত তারা পূর্বশর্ত করেছে, “জয়ের গ্যারাণ্টি দিতে হবে, তবেই তারা সেই সংগ্রামকে সমর্থন করবে।”

প্রত্যেকটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদীর আজ দায়িত্ব হচ্ছে সংগ্রামী ফ্রণ্ট থেকে এই কেন্দ্রীয় কমিটিকে বিতারিত করা, তবেই সংগ্রামে জোয়ার আসবে, সংগ্রাম জয়যুক্ত হওয়ার পথ নেবে। এই সংশোধনবাদী প্রতিক্রিয়াশীল কেন্দ্রীয় কমিটি কোন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সামন্তবাদ-বিরোধী সংগ্রামের শরিক তো নয়ই, তারা শত্রু। একমাত্র এই কেন্দ্রীয় কমিটি এবং তার পাপ রাজনীতির সংসর্গ ত্যাগ করেই বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠতে পারে। এই বুর্জোয়া রাজনীতিকে ধ্বংস করেই বিপ্লবী মতাদর্শ গড়ে উঠতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকে উৎখাত করতে না পারলে ভারতবর্ষের বিপ্লব এক পাও এগোতে পারে না, কাজেই পার্টির মধ্যে যারা বিপ্লবী আছেন তাঁদের এই রাজনীতির কেন্দ্রীকতা মানার একটাই অর্থ হয়, তা হল বুর্জোয়া কর্তৃত্ব মেনে চলা। তাই এই কেন্দ্রীয় কমিটির কেন্দ্রীকতা ভাঙা হচ্ছে প্রাথমিক পূর্বসর্ত যা ছাড়া বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠতে পারে না।

বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে প্রথম কাজ বিপ্লবী রাজনীতির প্রচার ও প্রসার। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবের পথে গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা এবং সেই বিপ্লবী সংগ্রামের এলাকাকে প্রসারিত করে শহরকে ঘিরে ফেলা। কৃষক গেরিলাবাহিনী থেকে গণমুক্তি সেনা গড়ে তোলা এবং শহর দখল করে বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা অর্থাৎ চেয়ারম্যান মাও-এর জনযুদ্ধের কৌশলকে পুরো কাজে লাগানো। এই হল ভারতবর্ষের মুক্তির একমাত্র সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পথ। এই পথের ব্যাপক প্রচার করতে হবে শুধু পার্টি সভ্য ও দরদীদের মধ্যেই নয়, ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যেও – তবেই বিপ্লবী সংগ্রাম ও তার সাথে বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে। পার্টির এই গণলাইন [mass line]  প্রচারের মারফতেই আমরা, কেন্দ্রীয় কমিটির বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল দলিলগুলির অসারতা জনসাধারণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো এবং সংগ্রামী জনতার ভিতর এই প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বের প্রভাব কাটাতে পারবো। চেয়ারম্যান মাও-এর শিক্ষা এই গণলাইন সর্বদা সমস্ত ফ্রণ্টে প্রচার করতে হবে।

এই শিক্ষার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে ভারতবর্ষে। পার্টির ভিতর বিপ্লবীকর্মী আছেন এটাও যেমন সত্য তেমনি সত্য হচ্ছে পার্টি দীর্ঘকাল সংশোধনবাদী রাজনীতি এবং বুর্জোয়া কাজের ধরণ মেনে চলেছে। ফলে বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যেও রয়েছে কাজের পুরোনো সংশোধনবাদী অভ্যাসগুলো যার প্রতিফলন ঘটে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে এবং অর্থনীতিবাদী ধরণ-ধারণের অভ্যাসে এবং জঙ্গী অর্থনীতিবাদের প্রকাশে। আমাদের এলাকার অভিজ্ঞায় আমরা দেখেছি যে পার্টির পুরাতন কৃষকসভা বা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মীরা বিপ্লবী রাজনীতি নিজেরা গ্রহণ করলেও জনসাধারণের মধ্যে তার প্রচারের কাজে নামতে ইতঃস্তত করেন এবং যখন বিপ্লবী সংগ্রাম ঘাড়ের উপর এসে পড়ে তখন আতঙ্কিত হন, জনতার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিরোধীতার পথ বেছে নেন। এই বিরোধীতা সব সময়েই প্রকাশ্য বিরোধীতার পথ বেছে নেন। এই বিরোধীতা সব সময়েই প্রকাশ্য বিরোধীতার রূপ নেয় না। রূপ নেয় জনতার শক্তি সম্বন্ধে অনাস্থা এবং শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখানোর মধ্য দিয়ে। এই ধরণের কর্মীদের এই ধরণের অনিষ্টকারিতাকে নষ্ট করে দেওয়া যায়, যদি তাদের ঘিরে যে ব্যাপক সংখ্যক সংগ্রামী মানুষ আছেন সেই সংগ্রামী মানুষদের কাছে পার্টির এই গণলাইনের প্রচার থাকে। এই ক্ষেত্রে উপরোক্ত কর্মীদের মধ্যে যদি কারও সত্যিকারের বিপ্লবী মনোভাব থাকে তবে তিনি বা তাঁরা দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন।

এই অবস্থার সম্মুখীন আমরা সব এলাকাতেই হবো, কারণ বহুদিন সংশোধনবাদী ক্রিযাকলাপের সাথে যুক্ত থাকায় পার্টি সভ্যদের মধ্যে বহু সংশোধনবাদী ধ্যান ধারণা আছে, যা একদিনে কাটবে না-অনেক দিনের বিপ্লবী প্রয়োগের মধ্য দিয়ে কাটবে। পার্টির বাইরে যে বিপুল সংখ্যক বিপ্লবী মানুষ আছেন তাঁদের কাছে আমাদের পার্টির গণলাইন প্রচারের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন বিপ্লবী কর্মী পার্টিতে আসবেন এবং তাঁরা তাঁদের সতেজ বিপ্লবী চেতনার দ্বারা পার্টির ভেতরকার জড়তা কাটাবেন এবং পার্টির বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্য বাড়িয়ে তুলবেন।

ভারতবর্ষে দীর্ঘস্থায়ী কঠিন সংগ্রাম চালিয়েই একমাত্র বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা যায়। কারণ পঞ্চাশ কোটী মানুষের এই বিরাট দেশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির শক্ত ঘাঁটি এবং সোভিয়েত সংশোধনবাদের প্রধান ভিত্তি। কাজেই ভারতবর্ষে বিপ্লব জয়যুক্ত হলে সা¤্রাজ্যবাদের ধ্বংসের দিন ঘনিয়ে আসবে এবং ঘনিয়ে আসবে সোভিয়েত সংশোধনবাদের মৃত্যু। কাজেই বিশ্ব প্রতিক্রিয়ার দুর্গ এই ভারতবর্ষে বিপ্লবকে রুখতে তারা এগিয়ে আসবে এবং এটাই স্বাভাবিক। অবস্থায় জয় সহজ ভাবা, অন্ধ ভাববিলাস ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তবুও জয় আমাদের হবেই, কারণ এদেশ পঞ্চাশ কোটি মানুষের এবং বিরাট এলাকা জুড়ে। কাজেই সাম্রাজ্যবাদীরা এবং সংশোধনবাদীরা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়েও এ দেশের বিপ্লবী অভিযানকে স্তব্ধ করতে পারে না।

কিন্তু বিপ্লব কখনো সফল হতে পারে না বিপ্লবী পার্টি ছাড়া। যে পার্টি দৃঢ় ভাবে চেয়ারম্যান মাও সেতু-এর চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্ত যুবকের দ্বারা গঠিত, যে পার্টির অভ্যন্তরে পুরো গণতান্ত্রিক অধিকার আছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার এবং যে পার্টির সভ্যরা স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে শৃঙ্খলা মেনে নিয়েছে, যে পার্টি শুধু উপরের হুকুম মেনে চলে না, স্বাধীনভাবে প্রত্যেকটি নির্দেশকে যাচাই করে এবং ভুল নির্দেশকে অমান্য করতেও দ্বিধা করে না, বিপ্লবের স্বার্থে যে পার্টির প্রত্যেকটি সভ্য নিজের ইচ্ছায় কাজ বেছে নেন এবং ছোট কাজ থেকে বড় কাজ সব কিছুকেই সমান গুরুত্ব দেন; যে পার্টির সভ্যরা নিজেদের জীবনে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শকে প্রয়োগ করেন, নিজেরা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন, আরও আত্মত্যাগ, আরও কর্মোদ্যম বাড়াতে যে পার্টির সভ্যরা কোন অবস্থাতেই হতাশ হন না, কোন কঠিন পরিস্থিতি দেখেই ভয় পান না, দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যান তার সমাধানে-এ রকম একটা পার্টিই পারে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও মতের মানুষের ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়ে তুলতে। এই রকম একটি বিপ্লবী পার্টিই পারে ভারতবর্ষের বিপ্লবকে সফল করে তুলতে। যে মহান আদর্শ চেয়ারম্যান মাও সেতুং তুলে ধরেছেন সমস্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের সামনে, সে আদর্শকে নিশ্চয়ই সফল করা যাবে এবং তবেই আমরা পারব নয়া-গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ সৃষ্টি করতে এবং সেই নয়া-গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে পারবে সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষ গড়ার কাজে।

দেশব্রর্তী, ২৬ শে অক্টোবর ’৬৭


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৪র্থ পর্ব)

নকশালবাড়ীর বীর কৃষক জিন্দাবাদ

 

ভারতবর্ষে আধা-সামস্ত ও আধা-উপনিবেশিক সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। কাজেই এদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব মানে কৃষি-বিপ্লব। ভারতবর্ষের সমস্ত সমস্যা জড়িত রয়েছে এই একটি মাত্র কাজের উপর। এই কৃষি-বিপ্লবের প্রশ্নে এই শতাব্দীর শুরু থেকেই মার্কসবাদী মহলে মতবিরোধ রয়েছে এবং মার্কসবাদীদের মধ্যে বিপ্লব ও বিপ্লব বিরোধী-এই দুটো নীতির সংগ্রাম চলেছে। মেনশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে মীমাংসা খুঁজেছিল প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা (municipalisation) এর মধ্যে। লেনিন তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন এবং বলেন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে এই সমস্যার কোন মীমাংসা সম্ভব নয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, যতো প্রগতিশীল আইনই রচিত হোক না কেন, বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামো সে আইনকে কার্যকর করতে পারে না। কৃষকের অবস্থা একই থেকে যাবে। তাই তিনি বলেছিলেন, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই একমাত্র এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই তো সেদিন, এমনকি রুশ পার্টির লেখক ইউদিন (Yudin) নেহেরুর মৌলিক বক্তব্য (basic approach) সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে নেহেরু আজও কৃষক সমস্যার সমাধান করতে পারেন নি এবং শান্তিপূর্ণ পথে কি করে এ সমস্যার সমাধান করা যায় তা তিনি করে দেখান; এবং নেহেরু তা পারবে না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে নেহেরু এই সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতেও পারেন নি।

সোভিয়েত পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর সংশোধনবাদের যে দরজা খুলে দেওয়া হল, যার ফলে আজকে সোভিয়েত রাষ্ট্র একটা সমাজবাদী রাষ্ট্র থেকে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে, সেই বিংশ কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের যে থিওরি দেওয়া হয়েছে, তাকেই মূলমন্ত্র করে আমাদের দেশের সংশোধনবাদীরা তারস্বরে চিৎকার করছে যে কৃষকের জমির সংগ্রাম একটা অর্থনৈতিক দাবীর সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কতা বলা হঠকারিতা। কী অদ্ভুত মিল ডাঙ্গে আর বাসব পুন্নায়ার কথায়। কী অদ্ভূত সহযোগিতা বিশ্বনাথ মুখার্জী এবং হরেকৃষ্ণ কোঙারের। এ ঘটনা আকস্মিক নয়, কারণ এর উৎস এক এবং সেটা হল মেনশেভিক বিপ্লব বিরোধী মহবাদ। তাই তো সোভিয়েত রাষ্ট্র ধূরন্ধরেরা বারবার ঘোষণা করছে যে ভারতবর্ষের খাদ্য সমস্যা সমাধান করা যায় কেবলমাত্র উন্নত বীজ আর চাষের উন্নত সাজ সরঞ্জাম দিয়েই। এই ভাবেই তারা ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে, জনতার চোখ থেকে ভারতবর্ষের খাদ্য, বেকারী, দারিদ্র প্রভৃতি সমস্যা সমাধানের মূল কার্যকরী পথ আড়াল করে রাখছে। কারণ ঐ সোভিয়েত রাষ্ট্র যে আজ বৃটিশ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের জনসাধারণের শোষক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারাও যে আমাদের দেশে পুঁজি খাটানোর চেষ্টা করছে দেশীয় ধনিকশ্রেণীর সহায়তায়! তারাও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাইতো তাদের মুখ দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীর যুক্তি বেরিয়ে আসছে অনর্গল স্রোতে, নির্দ্ধারিত বেগে। তাই তো বৃটিশ-মার্কিন সহযোগী হিসাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু এবং এদেরই পক্ষপূটে আশ্রয় নিয়ে ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার জনতার কাঁধে মৃতের বোঝা হয়ে টিকে আছে।

কিন্তু তবুও নকশালবাড়ী ঘটেছে এবং ভারতবর্ষে শত শত নকশালবাড়ী ধূমায়িত হচ্ছে। কারণ ভারতবর্ষের মাটিতে বিপ্লবী কৃষকশ্রেণী যে মহান তেলেঙ্গানার বীর বিপ্লবী কৃষকের উত্তরসূরী!  তেলেঙ্গানার বীর কৃষকদের সংগ্রামে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তদানীন্তন পার্টি নেতৃত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল মহান স্তালিনের নাম করে। আজকে যাঁরা পার্টির নেতা হয়ে বসে আছেন তাদের অনেকেই তো সেদিনকার বিশ্বাসঘাতকতার অংশীদার। তেলেঙ্গানার সেই বীরদের কাছে আমাদের নতজানু হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে শুধু বিদ্রোহের লাল পতাকা বহন করার শক্তির জন্যই নয়, তাঁদের কাছ থেকে শিখতে হবে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কর্ত্তৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার জন্যও। কী অসীম শ্রদ্ধা তাঁদের ছিল আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রতি, কমরেড স্তালিনের নানে তাঁরা নির্ভয়ে নিজেদের জীবন তুলে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের হাতে। এই বিপ্লবী বিশ্বস্ততা সব যুগে সব কালে প্রয়োজন বিপ্লব সংগঠিত করতে। তেলেঙ্গানার বীরদের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে-যারা স্তালিনের নাম নিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিরোধিতা করে তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে শত শত শ্রমিক ও কৃষকের রক্তে রঞ্চিত লাল পতাকা, তারা ঐ পতাকাকে কলঙ্কিত করেছে তাদের বিশ্বাসঘাতক হাতের স্পর্শে।

নকশালবাড়ী বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে। কারণ এ যে অজেয় মাকর্সবাদ লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ বিচারধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা জানি সামনে আছে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি, অনেক বিশ্বাসঘাতকতা, অনেক বিপর্য্যয়, কিন্তু তবু নকশালবাড়ী মরবে না, কারণ চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর উজ্জল সূর্যালোকের আর্শীবাদ এসে পড়েছে। যখন মালয়ের রবার বন থেকে ২০ বছর ধরে সংগ্রামরত বীররা অভিননন্দন জানান নকশালবাড়ীকে, যখন নিজেদের পার্টির সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জাপানী কমরেডরা অভিনন্দন জানান, যখন তা আসে অষ্ট্রেলিয়ার বিপ্লবীদের তরফ থেকে, যখন মহান চীনের সৈন্যবাহিনীর কমরেডরা অভিনন্দন জানান, তখন অনুভব করি: দুনিয়ার শ্রমিক এক হও-এই অমর বাণীর তাৎপর্যে, তখন একাত্মতা অনুভব করি, দেশে দেশে আমাদের পরম আত্মীয়দের জন্য বিশ্বাস দৃঢ় হয়। নকাশালবাড়ী মরে নি, আর নকশালবাড়ী কোনদিন মরবে না।

শারদীয়া দেশব্রতী১৯৬৭

 


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৩য় পর্ব)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

কোন এক সংগঠক কমরেডকে লেখা চিঠি

[ঘৃণা জাগিয়ে তোল পুলিশের বিরুদ্ধে]

প্রিয় কমরেড,

তোমার চিঠি পেলাম, ধনী-কৃষক ও মধ্য-কৃষকের মধ্যে এই কথাটা চালু হয়েছে যে আমরা আঘাত না করলে পুলিশও আঘাত করবে না; কাজেই জোতদারের বিরুদ্ধে লড়াই চালাও কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে আক্রমণ করো না:- এ চিন্তাটা মারাত্মক, কারণ সরকারী আক্রমণ হবেই। আমরা যত দেরী করব ওদের সাহস বাড়বে। কেন্দ্রীয় সরকার, সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতন্ত্র সবাই এটা বুঝছে যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। কাজেই ওরা এর জড় উপড়ে ফেলতে চেষ্টা করবে, এখন ওরা চুপচাপ আছে কারণ ওরাও এখন জনমত তৈরী করছে। কাগজওয়ালারা প্রতিদিন খবর দিচ্ছে। আজ প্রাদেশিক মন্ত্রীসভার বৈঠক হবে। পি. সি (প্রভিন্সিয়াল কমিটি-রাজ্য কমিটি) মিটিংয়ের জন্য রতনলাল ছাড়াও, ওরা বীরেন বোসকে নিয়ে গেছে, নতুন একটা ষড়যন্ত্র তৈরী হচ্ছে, আজকের “ষ্টেটসম্যানে” লিখেছে আক্রমণ চালালে ২৫০ জন নিহত হতে পারে; এ সমস্তই নতুন আক্রমণের সূচনা, আমরা আঘাত না করলেও ওরা আক্রমণ করবে। “পুলিশ মহল কাহিনী” বলে যেগুলি চলছে সেগুলি মধ্য-কৃষকের কথা। পুলিশ হুকুমের দাস কাজেই হুকুম এলেই ওরা আক্রমণ করবে। আমরা আঘাত হানলে একমাত্র ওরা ভয় পাবে এবং প্রতি-আক্রমণ করতে ইতঃস্তত করবে। এটা কৃষক সাধারণকে বুঝাও, ঘৃণা জাগিয়ে তোল পুলিশের বিরুদ্ধে। জোতদাররা এখনও গ্রামে আছে ওরা পুলিশকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে এবং নির্বিচারে কৃষক খুন করবে। কাজেই গ্রাম থেকে এই সব শ্রেণীশত্রুদের তাড়াতে হবে। ওরা সকলেই গোপনে থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ওদের সাহায্যে পুলিশ আক্রমণ চালাবে। তোমরা সঠিক পথেই প্রচার চালাচ্ছে, এর সাথে সাথে যেটা প্রচার করতে হবে তা হল সরকার দূর্বল, ওদের দেখতে যত ভীষণ, ওরা তত ভীষণ নয়। আমরা আঘাত করলেই ওরা আতংকিত হবে, কারণ আজও ওরা প্রতি-বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি। কাজেই আমাদের আক্রমণের সাথে সাথে সব জায়গায়ই কৃষক আঘাত করবে। এখনই খবর পাচ্ছি ডুয়ার্সের চা বাগানে জমি দখল শুরু হয়ে গেছে। দেব পাড়ায় ছোট খাট সংঘর্ষও (Clash) হয়েছে। এমনকি কোচবিহারে কৃষক কিছু জমি দখল করেছে।

সংগ্রামের নতুন ধরন দেখাতে পারলে সেটাও আগুনের মত ছড়িয়ে পড়বে, এখনই নকশাল বাড়ীর ঘটনা নিয়ে সারা বাংলাদেশে পোষ্টারিং শুরু হয়ে গেছে, কোলকাতা ও শহরতলীতে ব্যাপক পোষ্টারিং শুরু হচ্ছে, আমাদের লিফলেট ওরা ছাপিয়ে বিলি করছে। জলপাইগুড়িতেও এই লিফলেট ছাপিয়ে বিলি হয়েছে। আলিপুরদুয়ারের, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের খবর পাইনি। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায় কিছু কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশের বিপ্লবী শক্তি আমাদের উপলক্ষ্য করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। সুতরাং চেয়ারম্যানের কথা-একটি স্ফুলিঙ্গই দাবানলের সৃষ্টি করতে পারে (A single spark can start a prairie fire) বাস্তবে খাটছে। এখনও আমরা সংগ্রামের নতুন ধরন নিতে পারিনি, এখনও কৃষক বাহিনীর হাতে রাইফেল নেই। সেটা এলে কি বিপুল ঘটনা ঘটবে আজ বসে আন্দাজ করাই যাচ্ছে না। কাগজওয়ালারা এটাকে বিদ্রোহ (Rebellion) বলেই লিখছে।

এখন কাজ-আমাদের নিজেদের ভেতর থেকে সমস্ত দুর্বল ও অক্ষম চিন্তাধারা দূর করতে হবে। যে সমস্ত দৃষ্টিকোণ শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখে আর জনগণের শক্তিকে দেখে ছোট করে তা সবই ভুল সুতরাং কাগুজে বাঘের কথা কৃষকের সামনে বারে বারে রাখো। এই সাথে আর একটা শিক্ষা আমাদের নেওয়া উচিত, সেটা হোল এ যুগে ১০/১২ জনে পুলিশ পার্টিকে আক্রমণ (attack) করা যাবে না, কাজেই আমাদের জমায়েত করতে হবে কম করে ১০০ জন কমরেডের, তার জন্য যদি একটা গ্রুপকে নিয়েও চলতে হয় তাই চলা উচিত। তবেই তোমরা পুলিশ পার্টিকে আক্রমণ (attack) করতে পারবে। এ্যামবুশ করতে শিখতে হবে। এবং কাছাকাছি (close range এ) গিয়ে হামলা করতে হবে। হামলা করলে আমরা সকলকে খতম (annihilate) করতে পারব না। সে চেষ্টা করেও লাভ নেই। যদি ৫/১০ জনকেও খতম (annihilate) করতে পারি তা হলে ৫/১০ টা রাইফেল আমাদের হাতে আসবে। রাইফেল হাতে পেলেই সংগ্রামী মনোবল বেড়ে যাবে। এবং সেই রাইফেল নিয়ে আক্রমণ (attack) করতে পারলেই তরাইয়ের কৃষক ভিয়েতনামের পথে যাবে। কারণ ওরা যে একই শ্রেণীর। আমাদের এলাকার গণতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে এটা আজ ধনিকশ্রেণীও স্বীকার করেছে। কতখানি আমরা চেয়ারম্যানের চিন্তাকে কাজে লাগাতে পারব, তারই উপর আমাদের আঘাত হানার ক্ষমতা বাড়বে।

রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দাও (Put politica in command)। সব কিছুর উপরে সাহসকে স্থান দাও এবং সাহসের সঙ্গে জনগণকে জাগিয়ে তোল (Put daringness over every things and boldly arouse the masses)। জয় আমাদের হবেই।

লাল সেলাম

চারু মজুমদার

৯ই জুন, ’৬৭


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (২য় পর্ব)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

 

নির্বাচনের শিক্ষা ও প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের দায়িত্ব

১। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা: চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল পরিষ্কার দেখিয়ে দিলো যে ভারতে শাসকশ্রেণীর এক পার্টির একচেটিয়া শাসনের যুগ শেষ হয়ে গেলো। যে কংগ্রেস বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের মর্যাদায় গত বিশ বছর একচেটিয়া শাসন চালিয়েছে, যার হাতে ছিলো ভোটার লিষ্ট, নির্বাচন কেন্দ্রের সীমানা নির্দ্ধারণ ও নির্বাচনে চাপ সৃষ্টির সামগ্রিক ক্ষমতা, বৃটিশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্য-পুষ্ট হয়ে এবং সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় যে কংগ্রেস দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতাপ চালিয়েছে, চীন, পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ লাগিয়ে দুইবার উগ্র জাতীয়তাবাদের মুখোশ পুরোপুরি গ্রহণ করেছে, যে কংগ্রেস লাঠিগুলির দমন নীতির সাহায্যে সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে দেখিয়েছে যে তার শক্তিই সবচেয়ে বেশী-সেই কংগ্রেস শোচনীয় ভাবে পরাজিত হওয়ায় প্রমাণিত হলো যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আপাত দৃষ্টিতে শক্তিশালী মনে হলেও আসলে কাগুজে বাঘ। তাই মানুষের মনে ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্টের মতোই এক জয়ের চেতনা এসেছে।

২। কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণ: ২০ বছরের শাসনে কংগ্রেস জনগণের প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের শোষণ শেষ তো করতে পারেই নি বরঞ্চ তাকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে আমাদের দেশের সমস্ত জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের বিরোধ এতো তীব্র হয়েছে যে তা’ গত কয়েক বৎসর ধরেই ফেটে পড়তে শুরু করেছে। এই বিরোধ যত তীব্র হতে থেকেছে ততই শাসকশ্রেণীর সাথে জনগণ ও শ্রমিকশ্রেণীর বিরোধ, সংখ্যালঘু জাতিগুলির সাথে শাসকশ্রেণীর বিরোধ ফেটে পড়তে থেকেছে এবং তার চাপে সোভিয়েত-মার্কিন শক্তিজোটের সাথে বৃটিশ ও অন্যান্য শক্তি জোটের বিরোধ কার্যকরী হওয়ায় কংগ্রেসের এই শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।

৩। আমাদের সামনে সমস্যা: যে বিরোধগুলো তীব্র হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণীর সহযোগিতায় তার সমাধান করতে পারবে না, বিরোধ আরও বেড়ে চলবেই। তার অর্থ নিশ্চয়ই এই নয় যে আপনা আপনি জনগণতান্ত্রিক সরকার কায়েম হয়ে যাবে! কারণ শোষকশ্রেণীর রাষ্ট্রযন্ত্র থেকেই গেল। সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে খতম না করে জনগণতন্ত্রে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা সংশোধনবাদী ধারণা ছাড়া আর কিছুই না। এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে খতম করতে পারে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব। নেতৃত্বের দুর্বলতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-কারণ ভারতব্যপী স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভে শ্রমিকশ্রেণীর সচেতন নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এই বিক্ষোভগুলির ক্ষণস্থায়ী চরিত্রের থেকে বোঝা যায় যে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বের দুর্বলতার ফলে বিক্ষোভ উত্তাল হয়েই দপ করে থেমে গিয়েছে। কোন রাজ্যেই আন্দোলনে স্থায়ীত্ব আসেনি।

৪। আমাদের কাজ: জনগণের বিজয় উল্লাসের পিছনে রয়েছে এ দেশকে সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসাবে গড়ে তোলার আকাঙ্খা যা পূরণ করার ক্ষমতা অকংগ্রেসী বিকল্প সরকারগুলির নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে গণ্ডীবদ্ধ সরকারের তা থাকতেও পারে না। এই বিকল্প সরকার সম্বন্ধে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই যে মূল সমস্যার অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের সংগ্রামে এই সরকারকে ব্যবহার করা। শোষকশ্রেণী সারা ভারতে তাদের পক্ষে আজকের অনিশ্চিত অবস্থা থাকতে দিতে পারে না, তারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের পক্ষে অবস্থা গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করবেই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিজোটের মধ্যে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভারতে তাদের শাসন গোছাবার প্রয়োজনীয়তা বেশী করে অনুভব করছে এই জন্যে যে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রভাব ভারতে এসে পড়ায় সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ ঐক্যবদ্ধ হয়ে চীন বিরোধের ভিত্তিতে কেন্দ্র এবং রাজ্যে বিভিন্ন বুর্জোয়া পার্টিগুলির সাথে গোপন কমিউনিস্ট বিরোধী চুক্তি করে সাম্রাজ্যবাদী জোটের পক্ষে নিরাপদ অবস্থার সৃষ্টি করতে চাইবেই। তাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্রের মোহ সৃষ্টি করা। এর জন্যে বিভিন্ন শ্রেণীকে কিছু কিছু সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কিন্তু যাকে যত সুবিধাই দিক, দেশের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ কৃষকশ্রেণীকে কোন সুবিধে দেওয়ার ক্ষমতা আর তার নেই। এই কৃষকশ্রেণী আমাদের দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান শক্তি। কৃষক-অঞ্চলে মুক্ত এলাকা গড়ে তোলার কাজই আজ শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য বিপ্লবী শ্রেণীর প্রধান দায়িত্ব। শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য বিপ্লবী শ্রেণীর শ্রেণী-সংগ্রামকে তীব্রতর করেই গ্রামাঞ্চলে মুক্ত এলাকা গড়ে তোলার কাজ ত্বরান্বিত হতে পারে।

৫। পার্টি: কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্যে যে সংশোধনবাদী ঝোঁক রয়েছে তার প্রমাণ বারবার পাওয়া গিয়েছে। পার্টিতে নয়া সংশোধনবাদ চালু করার তারা যে চেষ্টা করেছেন সাম্প্রতিক কার্যকলাপে তা প্রমাণিত হচ্ছে।

(ক) মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বর্তমান যুগের সর্বোচ্চরূপ যে মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারা তা আজও নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করেন নি। সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে মিলে বিশ্ব প্রভৃত্বের পরিকল্পনাকে নিন্দা করেন নি। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করলে এবং মাও সেতুঙের চিন্তাধারাকে সমর্থন না করলে বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার তোলা যায় না, বিপ্লবী আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয় না।

(খ) ভারতবর্ষের বিপ্লবী পরিস্থিতিকে ক্রমাগত অস্বীকার করা হচ্ছে। যার ফলে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী দায়িত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না।

(গ) পার্টির মধ্যে আদর্শগত আলোচনাকে ক্রমাগত বন্ধ রাখা হচ্ছে যার ফলে বিপ্লবী চেতনায় পার্টি সভ্যদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ অবহেলিত হয়েছে।

(ঘ) পার্টির মধ্যে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার আবহাওয়া সৃষ্টি না করে বৈপ্লবিক পার্টি গড়ে তোলার দায়িত্ব কার্যতঃঅস্বীকার করা হচ্ছে।

(ঙ) বিকল্প সরকারের প্রশ্নেও পার্টি নেতৃত্বের বক্তব্যে শ্রেণী-সমন্বয়ের ঝোঁক প্রকাশ পাচ্ছে। কমিউনিস্টদের বিকল্প সরকারে যোগদানের একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে, তা হচ্ছে সরকারের মধ্যে থেকে সংগ্রামের আহ্বান দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করা-সংসদীয় মর্যাদা রক্ষা করা নয়। কিন্তু সে পথ না নিয়ে একদিকে আন্দোলন করতে হবে বলে আবার, মালিকশ্রেণীর ভয়ের কোন কারণ নেই বললে আন্দোলনের লক্ষ্যকেই অস্পষ্ট করা হয়। আন্দোলনকা’র বিরুদ্ধে তার নির্দ্দেশ থাকে না। এবং এ পথ অবশ্যম্ভাবীভাবে শ্রেণীসম্বন্বয়ের পথে নিয়ে যেতে বাধ্য।

কমরেডস, নির্বাচনের আগে ও পরের ঘটনাগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে ভারতবর্ষ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। এই সংকটকে গভীর করেছে ভারতের বৈপ্লবিক পরিস্থিতি। রাজনৈতিক সংকট বাড়তে থাকবেই এবং সেই সঙ্গে জনগণের রাজনৈতিক চেতনাও বাড়তে থাকবে। পরিস্থিতি কমিউনিস্ট পার্টির কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দাবী করবে, তাই পার্টিকে সাচ্চা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি হিসাবে গড়ে তোলার প্রশ্ন আরও জরুরী হয়ে পড়েছে। পার্টির আভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে যত জোরদার করা যাবে তত বেশী সংখ্যক কমরেড আভ্যন্তরীণ আদর্শগত সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করবেন, ভারতীয় বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব তত বেশী করে প্রতিষ্ঠিত হবে।

৩রা এপ্রিল, ’৬৭