কলকাতাঃ সংবাদপত্রে প্রকাশিত USDF সংক্রান্ত একটি ভুল খবরের জবাবে সংগঠনের তরফে বিবৃতি

usdf

“একটা ভূত ইউরোপকে তাড়া করছে, কম্যুনিজমের ভূত। … এমন কোন বিরোধী পক্ষ আছে যে ক্ষমতায় আসীন প্রতিপক্ষকে কম্যুনিস্ট মনোভাবাপন্ন বলে নিন্দা করেনি? এমন বিরোধী পার্টিই বা কোথায় যে নিজে আরও অগ্রসর বিরোধী দলগুলোর, তথা প্রতিক্রিয়াশীল বিপক্ষদের ছুঁড়ে দেয়নি কম্যুনিজমের অপবাদ সূচক গালি?” এই কথা গুলো বলেই  ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো লেখা শুরু করেছিলেন। আজকের সময়ে এই কথাগুলো হুবহু মিলে যায় যদি “কম্যুনিস্ট” শব্দটার বদলে আরও নির্দিষ্ট ভাবে “মাওবাদী” শব্দটি বসিয়ে দেওয়া যায়।

  যেমনভাবে এরাজ্যে সিপিএম সরকারের আমলে গোয়েন্দা বিভাগ মাওবাদীদের সাথে তৃণমূলের যোগসাজশের প্রমাণ পেশ করেছিল, সরকার পরিবর্তনের পরেই তৃণমূল সরকারের গোয়েন্দা বিভাগও ঠিক তেমনভাবেই “মাও-মাকু(CPIM)” আঁতাতের কথা বলতে শুরু করল! বিজেপি বহুবার ‘আম আদমি পার্টি’ কে আক্রমণ করেছে শহুরে মাওবাদী বলে। সব রাজ্যেই  এরকম উদাহরণ  পাওয়া যাবে ভূরি ভূরি। এদেশে যেকোনো সরকার বা মাফিয়া-পুঁজিপতি বিরোধী আন্দোলনকেই মাওবাদী বলে দেগে দেওয়া হয়। তা সে কামদুনি বা অন্য কোথাও ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন হোক, মারুতির শ্রমিক আন্দোলন হোক, জমি অধিগ্রহণ বিরোধী কৃষক আন্দোলন হোক বা খোদ সংবিধান স্বীকৃত কোন আইন লাগু করার আন্দোলন হোক। এমনকি মানবাধিকার সংগঠনগুলো পর্যন্ত মাওবাদী তকমা পায়।

      সংসদীয় পার্টিগুলোর লেজুড় নয় এরকম যেকোনো ছাত্রছাত্রী সংগঠনগুলোকেই মিডিয়া এবং সরকার মাওবাদী বলে চিহ্নিত করে। বাম সরকারের আমলে বিভিন্ন বাম গণতান্ত্রিক ছাত্রছাত্রী সংগঠনগুলোর যৌথ মঞ্চ ‘ছাত্র-ছাত্রী সংহতি’ কে মাওবাদী  পার্টির শাখা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মিডিয়ার একাংশ ‘হোক কলরব’ আন্দলনের পেছনে মাওবাদীদের হাত দেখেছিল। একটি ইংরেজি দৈনিক আমাকে এবং একটি বাংলা চিটফাণ্ড দৈনিক প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীন মঞ্চ IC’র এক কর্মীকে মাওবাদী বলে চিহ্নিত করে। বলা বাহুল্য, ছাত্রছাত্রী সংগঠনগুলোর মধ্যে সম্ভবত আমরাই সবচেয়ে বেশিবার ‘মাওবাদী’ তকমা পেয়েছি, কারণ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের সময় USDF  কর্মীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বক্তৃতা, গান, নাটকের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির চক্রান্তের কথা প্রচারে নিয়ে এসেছে। শুধুমাত্র শাসকদলকে নিশানা বানিয়ে আন্দোলনকে সংসদীয় বিরোধী দলের ভোট বাক্সে পরিণত করার নীতিকে বিরোধিতা করে আমরা  শ্রমিক কৃষকের আক্রমণের নিশানায় দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছি শাসকশ্রেণী বা গোটা সমাজ ব্যবস্থাটাকেই। ইউনিভার্সিটিতে আপোষহীনভাবে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, শিক্ষা ব্যবস্থার শ্রেণী চরিত্র কে উন্মোচিত  করেছে USDF কর্মীরা।

 গত ২৯ জুলাই প্রাক্তন কয়েকজন USDF কর্মীর ভুল চিন্তা সম্বলিত একটি বিভ্রান্তি লিফলেটের মতাদর্শগত সমালোচনা করে আমরা সংগঠনের ব্লগে একটি বিতর্কমূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করি। ওই প্রাক্তন USDF কর্মীদের নামে প্রকাশিত লিফলেটটি USDF এর লিফলেট কিনা, এই নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াতে আমাদের মতাদর্শগত অবস্থান স্পষ্ট করতেই প্রবন্ধটি লেখা হয়। এর পরে গত ৮ আগস্ট আমার লেখা এই প্রবন্ধটিকে

(https://usdfeimuhurte.wordpress.com/2015/07/29/%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%AC%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0-%E0%A6%87%E0%A6%89%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%B0/)

কেন্দ্র করে একটি  ইংরেজি দৈনিকে কলকাতা শহরে মাওবাদীদের মধ্যে বিভেদের খবর প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল কে কেন্দ্র করে মাওবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে সরকারের যুদ্ধের কারণেই সরকার ও  বুর্জোয়া মিডিয়া মাওবাদীদের মধ্যে ভাঙন প্রচার করতে তৎপর। মাওবাদী দমন অভিযানের নামে  বারবার করে গণআন্দোলন কর্মীদের রাষ্ট্রের দমনপীড়ন নীতির শিকার বানিয়ে ন্যুনতম গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করার ধারাবাহিক যে প্রয়াস দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের অন্যান্য বিবিধ রাজ্যে, আমরা তার বিরুদ্ধে তীব্র করছি।  না আমি ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি (মাওবাদীর) মুখপাত্র, না USDF  ওই পার্টির শাখা সংগঠন। ফলে নিতান্তই ছাত্র সংগঠনের একটি খোলা বিতর্কের  মধ্যে মাওবাদীদের বিভেদ খোঁজার কোনো অর্থ আছে বলে আমরা মনে করিনা।  আমরা মনে করি সংবাদপত্রে প্রকাশিত ওই খবরটি যে ভুল, সেটাকে সামনে আনা দরকার। আর এ জন্যই এই বিবৃতির অবতারণা। USDF এর অবস্থান হল এই ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন কোনো রাজনৈতিক পার্টির শাখা হিসেবে কাজ করবে না। তবে আমাদের সংগঠনের কোনো সদস্য ভারতের আধা সামন্ততান্ত্রিক – আধা উপনিবেশিক সমাজকে উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবী লড়াইয়ে সামিল এরকম যেকোনো বিপ্লবী পার্টির সাথে যুক্ত থাকবে কি থাকবেনা, সেটা সদস্যদের ব্যাক্তিগত ব্যাপার।

বিপ্লবী অভিনন্দন সহ

                                 সৌম্য মণ্ডল

আহ্বায়ক, ইউনাইটেড স্টুডেন্টস’ ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট

তারিখঃ ১৩ই আগস্ট, ২০১৫