মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা

29C1CD9A00000578-3130307-image-m-5_1434660552551

মস্কো শহরে আমদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক নিখিল রাশিয়া শ্রমিক নারী ও কিষাণদের কংগ্রেস আহ্বানের পর পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। দশ লক্ষ গতর খাটানো মেয়েদের এক হাজারেরও অধিক প্রতিনিধি এই কংগ্রেসে সমবেত হয়েছিল। মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে আমাদের পার্টির কর্ম তৎপরতায় এই কংগ্রেস নতুন যুগের সূচনা করে। আমাদের রিপাবলিকের শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করে কংগ্রেস অপরিমেয় কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। অনেকে মনে করতে পারেন, এ আর কি ব্যাপার? কারণ পার্টি নারীসহ জনসাধারণের মধ্যে সবসময়েই রাজনৈতিক শিক্ষা বিস্তার করে এসেছে। আবার অনেকে এমনও ভাবতে পারেন, মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার এমন কি গুরুত্ব থাকতে পারে; কারণ শীঘ্রই আমাদের মধ্যে শ্রমিক ও কিষাণদের সমবেত কর্মীদলসমূহ গড়ে উঠবে। এই ধরনের মতগুলি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত।

শ্রমিক ও কিষাণদের হাতে শাসন ক্ষমতা চলে আবার পর মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন উপস্থিত হয়েছে। আমি এর কারণটা দেখাতে চেষ্টা করছি। আমাদের দেশের লোকসংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি; তন্মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকই নারী। নারীদের মধ্যে অধিকাংশই অনগ্রসর, পদদলিত ও অতি অল্প রাজনৈতিক চেতনা যুক্ত শ্রমিক ও কিষাণ নারী।

আমাদের দেশ যদি রীতিমতো উৎসাহ দিয়ে নতুন সোভিয়েট জীবন গড়ে তোলার কাজ আরম্ভ করে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ইহা সুস্পষ্ট হবে যে, মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নিয়ে গঠিত এই দেশের নারীসমাজ যদি ভবিষ্যতেও অনগ্রসর, পদদলিত ও রাজনীতির দিক থেকে অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে তারা প্রগতিমূলক যে কোন কাজকে ব্যাহত করবে না কি?

নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাদের শিল্প সংগঠনের সার্বজনীন কাজে পুরুষদের সঙ্গে একযোগেই তারা কাজ করছে। তাদের যদি রাজনৈতিক চেতনা থাকে ও তারা রাজনৈতিক শিক্ষা পায়, তাহলে তারা এই সার্বজনীন কাজে বেশ সাহায্য করতে পারে। কিন্তু যদি তারা পদদলিত ও অনগ্রসর থেকে যায়, তাহলে নিজেদের দুষ্টবুদ্ধিবশত নয়, যেহেতু তারা অনগ্রসর সেইজন্য, এই সর্বসাধারণের কাজ পণ্ড করে ফেলতে পারে।

কিষাণ মেয়েরাও দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরুষ কৃষকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য। পুরুষদের সঙ্গেই তারা আমাদের কৃষির উন্নতি, সাফল্য ও সমৃদ্ধি সাধন করছে। তারা যদি অনগ্রসরতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হয়, তাহলে তারা এক্ষেত্রে প্রভূত কাজ করতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত অবস্থাও ঘটতে পারে। ভবিষ্যতেও যদি তারা অশিক্ষার গোলাম থেকে যায় তাহলে তারা কাজের বাধাস্বরূপ হয়ে পড়তে পারে।

পুরুষ শ্রমিক ও কিষাণ পুরুষদের মত নারী শ্রমিক ও কিষাণ নারীরা সমান অধিকারপ্রাপ্ত স্বাধীন নাগরিক। মেয়েরা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহ নির্বাচন করে এবং এইগুলোয় নিজেরা নির্বাচিত হতে পারে। নারী শ্রমিক ও কিষাণ মেয়েরা যদি রাজনৈতিক জ্ঞানযুক্ত হয় তাহলে তারা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহে সংস্কার সাধন এবং ঐগুলোর শক্তি ও আয়তন বাড়াতে পারে। কিন্তু তারা যদি অনগ্রসর ও অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, পণ্ড করে ফেলতে পারে।

চরম কথা হচ্ছে এই যে, শ্রমিক নারী ও কিষাণ নারীরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের জননী আর তাদেরকে মানুষ করার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। তারা হতাশার মনোবৃত্তি জুগিয়ে শিশুদের খর্বতা সাধনও করতে পারে, আবার তাদের মনকে সতেজ ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন করে তাদের দ্বারা আমাদের দেশের অগ্রগতির ব্যবস্থাও করতে পারে। সোভিয়েত ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদের নারী ও জননীদের সহানুভূতি আছে, না তারা পুরোহিত, ধনী চাষি ও বুর্জোয়াদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে, এই সমস্ত তারই ওপর নির্ভর করছে।

সেইজন্য শ্রমিক ও কিষাণরা যখন নতুন জীবন গড়ে তোলার দয়িত্ব গ্রহণ করেছে, সেই সময় আজ বুর্জোয়াদের ওপর প্রকৃত জয়লাভ সম্পর্কে শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। সেইজন্য মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক ও কিষাণ নারীদের প্রথম কংগ্রেসের মূল্য ও গুরুত্ব সত্য সত্যই অপরিমেয়।

পাঁচ বছর আগে এই কংগ্রেস নতুন সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলা সম্পর্কে লক্ষ লক্ষ মেহনতকারী মেয়েদের টেনে আনা পার্টির চলতি কর্তব্যরূপে গণ্য হয়েছিল। এই কর্তব্যের পুরোভাগে দাঁড়িয়েছিল কারখানা অঞ্চলসমূহ থেকে আগত শ্রমিক মেয়েরা; কারণ মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে তারাই ছিল সবচেয়ে জীবন্তু চেতনাযুক্ত। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ সম্বন্ধে যে অনেক কিছু করা হয়েছে তা বেশ বলা যেতে পারে, যদিও করণীয় অনেক কিছুই এখনও পড়ে আছে।

আজ পার্টির আশু করণীয় কর্তব্য হচ্ছে আমাদের সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলার কাজে নিযুত কিষাণ মেয়েদের টেনে আনা। 
পাঁচ বছরের কাজের ফলে কিষাণদের ভেতর থেকে বহুসংখ্যক অগ্রগামী কর্মী গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।

আশা করি নতুন নতুন রাজনৈতিক চেতনাযুক্ত কিষাণ মেয়েরা এসে অগ্রগামিনী কিষাণ নারীদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলবে। আশা করি, আমাদের পার্টি এই সমস্যারও সমাধান করতে পারবে।

– স্ট্যালিন, প্রথম শ্রমিক ও কিষাণ নারী কংগ্রেসের পঞ্চবার্ষিকী উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতা, ১৯২৩।


রোকেয়া দিবসে ‘বিপ্লবী নারী মুক্তি’র আহবান

Begum-Rokeya....

 

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ “রোকেয়া দিবস”-এর আহবান

বেগম রোকেয়া’র অগ্রসরতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরুন, তাঁর সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করুন!

এ সমাজ ধর্ষকদের সীমাহীন দৌরাত্মের সমাজ। এই রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি ধর্ষক ও নারী নিপীড়কদের স্রষ্টা, রক্ষক ও মদদকারী। নারীর প্রকৃত মুক্তির জন্য এ সমাজকে বদলে ফেলুন! সমাজতন্ত্রের লক্ষে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের নতুন গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করুন!

* পুরুষতন্ত্রের রক্ষক সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-সামন্তবাদের বিরোধিতা না করে নারীমুক্তির কথা বলা ভন্ডামি! শাসকশ্রেণি, সরকার ও বহু এনজিও সেটাই করে।

* রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ধর্ষণ, হত্যা ও জাতিগত নির্মূলীকরণের সত্যিকার বিরোধিতা জন্য তাদের জাতিগত স্বতন্ত্রতার স্বীকৃতি, রাখাইনে স্বায়ত্তশাসনসহ জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করুন! সুচি সরকার ও হাসিনা সরকারের মধ্যকার ভূয়া চুক্তির মুখোশ উন্মোচন করুন! চরম বিপদাপন্ন রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচারের মুখে ঠেলে দেয়াকে বিরোধিতা করুন!

* বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন,’১৭-এ মৌলবাদীদের চাপের মুখে অপ্রাপ্ত বয়স্কা কিশোরীদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে হাসিনা সরকার। এই নারী বিরোধী আইন বাতিলের দাবিতে এবং বাল্যবিবাহ রোধের নামে পুলিশ ও প্রভাবশালীদের হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

* নারীদেহকে পণ্য বানানোর সুন্দরী প্রতিযোগিতা, নারী-বিরোধী ব্লুফিল্ম, ফ্যাশন-শো, বিজ্ঞাপন, সিনেমা, নাটকের বিরোধিতা করুন ও প্রতিবাদ করুন!

* গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মূল বেতন ৫ মণ চালের মূল্যের সমান নির্ধারণ করতে হবে! বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব মালিক ও রাষ্ট্র পক্ষকে নিতে হবে।

* নারীমুক্তি আন্দোলনের মহান নেত্রী চিয়াং চিং, নাদেজদা ক্রুপস্কায়া, রোজা লুক্সেমবার্গ, ক্লারাসেৎকিন, কল্লোনতাই লাল সালাম!

নারীমুক্তির একই পথ সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ !

বিপ্লবী নারী মুক্তি

ডিসেম্বর, প্রথম সপ্তাহ, ’১৭


সিপিআই(মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটি সকল ফ্রন্টে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে

608271276-Maoist_6

নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট দল সিপিআই(মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির ১৭তম বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে সারা দেশ থেকে ব্যাপক সংখ্যায় নারী ক্যাডারদের দলে নিয়োজিত করার জন্যে পার্টির আঞ্চলিক কমিটির সদস্যগণকে নির্দেশ দিয়েছেন।

সংগঠনটি, মাওবাদী আধিপত্য রয়েছে এমন রাজ্যের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে বসবাসরত নারীদেরকে এই সংগঠনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানিয়ে ব্যাপক মাত্রায় পোস্টার এবং ব্যানার লাগিয়েছে।

এর মধ্যে একটি পোষ্টারে সিপিআই(মাওবাদী) বলেছে, ” পিতৃতন্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উত্থাপন করুন, সব মঞ্চে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে তুলুন।”

এ নিয়ে গোয়েন্দা বিভাগ সূত্র বলছে, ব্যাপক মাত্রায় পুরুষ ক্যাডার ও নেতৃত্ব হারানোর কারণে মাওবাদীরা এই ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।  

মাওবাদীরা ২-৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পিএলজিএ সপ্তাহ পালন করছে।

উল্লেখ্য যে, গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ৫ জন নারী ক্যাডার সহ কমপক্ষে ৮ জন মাওবাদী কর্মীকে ভুয়া এনকাউন্টারে হত্যা করেছে এবং সারা দেশে আটক হওয়া ৫ জন মাওবাদীর মধ্যে ৩ জন নারী কর্মী রয়েছে।

সূত্রঃ http://www.newsnation.in/india-news/cpi-maoist-central-committee-decides-to-involve-women-in-all-fronts-article-187743.html


সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর ‘নিরাপত্তা’য় পুরুষ পাঠানো

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ভুটান, নেপাল থেকে নারী গৃহকর্মী পাঠানো হচ্ছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। আমাদের দেশ থেকে যেসমস্ত নারীগণ মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যান তাদের অর্ধেকেরও বেশি যান সৌদি আরবে।

যারা যান তারা নিতান্তই দেশে দরিদ্র, যারা অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতেন বা কাটাচ্ছেন। দেশে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বিদেশে যান।

সৌদি আরবে এখন গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়টি একারণেই আলোচিত যে- সৌদি আরবে যেসমস্ত নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে শ্রম করতে যান তাদেরকে সৌদি রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক গৃহমালিকরা মানুষ হিসেবে গণ্য না করে তাদের সাথে পশুর মতো আচরণ করে। শ্রমিকের মর্যাদা তো আরো পরের বিষয়। বাংলাদেশ থেকে নেয়া গৃহকর্মী নারীদেরকে মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসী হিসেবে গণ্য করে। দালাল চক্র তাদের ইচ্ছামতো বেচাকেনা করে। এসমস্ত অসহায় নারীদের দিয়ে যৌন ব্যবসা করায়। গৃহের কর্তার দ্বারা ধর্ষণ, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, না খাইয়ে রাখা, ঠিকমতো খেতে না দেয়া, দেশে পরিবার-পরিজনের সাথে যোগাযোগ করতে না দেয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অপমানজনক, অমানবিক, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, নিপীড়নের শিকার হতে হয় নারীদেরকে। বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে পড়ে কোনো-কোনো নারী দেশে ফিরে আসেন। সৌদি আরবে এপর্যন্ত ৮০ হাজার নারী গৃহকর্মী পাঠানো হয়েছে। তারমধ্যে ৫০ ভাগই ফেরত এসেছেন। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকা এবং গণমাধ্যমেও এটা আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।

হাসিনা সরকারের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী যুক্তি দেয় যে, গৃহকর্মীদের মাঝে হোম সিকনেস (বাড়ি ফেরা রোগ) কাজ করে, এজন্য তারা এগুলো বানিয়ে বলে। সৌদি নাগরিকরা ভাত খায় না রুটি খায়- গৃহকর্মীরা বলে তাদেরকে ভাত দেয় না, না খাইয়ে রাখে। মন্ত্রীর এসমস্ত ভাষ্য মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছেন সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা নারীরা তাদের জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অপমান, লাঞ্ছনা, বঞ্চনার কথা বর্ণনা করে। যা পত্রপত্রিকাসহ নানা মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে।

হাসিনা সরকার আবারো সৌদি সরকারের সাথে ১ লক্ষ ২০ হাজার গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি করেছে। যেহেতু গৃহকর্মীদের উপর নিপীড়নকে সকল স্তরের প্রগতিশীল ও সুশীল সমাজ এবং নারী সমাজ প্রতিবাদ করেছেন, আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে, তাই একজন নারীকে ‘নিরাপত্তা’ দিতে সাথে ২ জন পুরুষ যেতে পারবে বলে সরকার ঘোষণা দিয়েছে। যে পুরুষরা গৃহকর্মী নারীকে পাহারা দিবে।

সরকারের এই আনাড়ি ও গোজামিলের ব্যবস্থা নারীজাতির জন্য অসম্মানজনক, অপমানজনকই শুধু নয়, লজ্জাজনকও। সরকার এবং রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আরো একবার প্রকাশ ঘটালো এই পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে। সরকারের এই পুরুষ পাহারাদারের ব্যবস্থা নারীজাতিকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নেয়ারই দৃষ্টিভঙ্গি।

বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির দল আওয়ামী লীগ সরকার সৌদি সরকারের সাথে যে চুক্তি করেছে সেখানে সৌদি সরকারের উপর কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি। যেসমস্ত দরিদ্র নারী গৃহকর্মীদের উপার্জিত বিদেশি অর্থে তাদের সরকারি বিলাস চলে সেসমস্ত নারীদের জন্য সম্মানজনক কোনো চুক্তি করেনি। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লংঘন করে সৌদি আরব গৃহকর্মীদের উপর অমানবিক বর্বরোচিত আচরণ করেছে এবং এখনো করছে। এগুলো বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। সৌদি আরব আমাদের নারীদের সাথে যা করেছে তার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে শর্তসাপেক্ষে চুক্তি না করে নতজানু হয়েছে। যেন সৌদি সরকার গৃহকর্মী নিয়ে কৃপা করছে।

অথচ সৌদি আরবে নারীর প্রতি এ জাতীয় অপমান ও বর্বরতার জন্য শ্রীলংকা এবং ফিলিপাইন সৌদি আরবে গৃহকর্মী না পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে  বছরে ১ লক্ষ ২০ হাজার গৃহকর্মী পাঠাতে পেরে সরকার নিজেই নিজেকে বাহবা দিচ্ছে। আমাদের নারীদের সম্মান সম্ভ্রম তার কাছে গুরুত্ব পায়নি। সরকার এবং তার মন্ত্রী এই চুক্তি করতে পেরেছে এ কারণেই যে এসমস্ত নারীগণ হচ্ছেন দরিদ্র কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী জনগণ ও তাদের সন্তান। একইসাথে তারা নারী। গৃহকর্মীদের সাথে ২ জন পুরুষ নিরাপত্তার জন্য পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, যা কার্যত অর্থহীন অসার এবং হাস্যকরও।

রাজতান্ত্রিক ধর্মান্ধ মৌলবাদী চরম প্রতিক্রিয়াশীল সৌদি আরবে নারীদের ‘পরপুরুষ’-এর সামনে যাওয়া নিষিদ্ধ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুরুষরা কি গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন? তা পারবেন না নিঃসন্দেহে। গৃহকর্মী গৃহকর্তার লালসার শিকার হলে (যা সাধারণভাবেই হয়ে থাকে) বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে উক্ত পুরুষরা রক্ষা করবেন কীভাবে? যদি তিনি রক্ষা করতে যান তাহলে তারই গর্দান যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরবে এমনই মধ্যযুগীয় বিধি-বিধান, আইন রয়েছে।

সরকার নাকি মোট ৬৮টি দেশে নারী শ্রমিক (গৃহকর্মীসহ) পাঠাচ্ছে। এই হার নাকি গত ১০ বছরে ৬ গুণ বেড়েছে। সারা বিশ্বের নারী শ্রমিকদের উপর একইভাবে শ্রম শোষণ নিপীড়ন নির্যাতন হয়ে আসছে। কারণ তারা মূল শ্রেণির জনগণ। ধনীক শ্রেণির নারী হলে এভাবে শর্তবিহীন চুক্তি তারা করতে পারতো না। তাই শ্রেণির প্রশ্নটি খুবই গুরুরুত্বপূর্ণ, তা শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র নারীদেরকে বুঝতে হবে। তাদের শ্রম, ঘাম, রক্ত এবং বাধ্যতামূলক দেহব্যবসার উপার্জিত রেমিটেন্সে শাসক শ্রেণির সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার পূর্ণ হচ্ছে; মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টাদের টাকা বাড়ছে, বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি হয়েছে- হচ্ছে।

গৃহকর্মীসহ শ্রমিক-কৃষক দরিদ্র জনগণকে বুঝতে হবে এই সরকার, রাষ্ট্র তাদের স্বার্থের নয়। এই সরকার, রাষ্ট্র হচ্ছে শোষণমূলক ব্যবস্থার। বড়ধনী শ্রেণির সরকার আপনাদের স্বার্থ সম্মান রক্ষা করার সরকার নয়। তা আপনারা নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে পারছেন।

সৌদি আরবেও একই শোষনমূলক সমাজ ব্যবস্থা। রাজতান্ত্রিক মৌলবাদের শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত রয়েছেন সেখানকার নারীরা। তারা মাত্র ২০১৫ সালে ভোটাধিকার পেয়েছেন। সৌদি নারীরা আরো একধাপ পিছিয়ে রয়েছেন। তাদেরকেও বিপ্লবী নারী মুক্তির আন্দোলনে নামতে হবে। সেদেশের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবে যোগ দিতে হবে। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া যেমন বাংলাদেশের নারীদের মুক্তি নেই। সৌদি নারীদেরও মুক্তি নেই।

– ডিসেম্বর/’১৬

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা

 


প্রগতিশীল কলমযোদ্ধা মহাশ্বেতা দেবীঃ আদিবাসী ও নিপীড়িতদের স্বপক্ষে ছিলেন আমৃত্যু অবিচল

 

বৃটিশ বিরোধী “কল্লোল সাহিত্য আন্দোলন” ও তৎকালীন “গণনাট্য সংঘে”র সামনের সারিতে থাকা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পন্ন এক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম। তিনি ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মনীষ ঘটক কল্লোল সাহিত্য আন্দোলন ও গণনাট্য সংঘে’র সুপরিচিত কবি ছিলেন। সেই সূত্রে মহাশ্বেতা দেবীও গণনাট্য সংঘের সাথে যুক্ত ছিলেন। ভারতের বাংলাভাষাভাষী এই প্রগতিশীল লেখক সম্প্রতি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যের প্রধানতম ক্ষেত্র ছিল আদিবাসী, দলিত ও নিপীড়িত জনগণ- যার এক বিরাট অংশ জুড়ে ছিল নারী। যারা নিজেদের অধিকারের জন্য বৃটিশের বিরুদ্ধে, ভারতের শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে ও উঁচুজাতের জোতদার, মহাজনদের বিরুদ্ধে নিরন্তর বীরত্বপূর্ণ লড়াই-সংগ্রামে জড়িত। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের গ্রামাঞ্চলে আদিবাসীদের মধ্যে বছরের পর বছর থেকেছেন, মিশেছেন। তাদের দুঃখ-কষ্ট-সংগ্রাম-আত্মবলিদান-সাহসী অধ্যবসায় প্রভৃতিকে গভীর উপলব্ধিতে ধারণ করেছেন। একে সাহিত্যে জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন- তার গল্পের কাহিনী তিনি তৈরি করেননি- এগুলো জনগণেরই জীবন এবং তাদেরই সৃষ্টি। আদিবাসীদের জীবন ও সংগ্রামকে ঘিরে তার এমনি এক অসাধারণ উপন্যাস “চোট্টিমুন্ডা ও তার তীর”।

তিনি সারা জীবন আদিবাসীদের ন্যায্য দাবি ও সংগ্রামের পক্ষে থেকেছেন। সেজন্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লালগড় ও নন্দীগ্রামের আদিবাসীদের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। আদিবাসী ছাড়াও তিনি শাসকশ্রেণির রক্তচক্ষু ও হুমকিকে উপেক্ষা করে শ্রমিক-কৃষকসহ নিপীড়িত জাতিসত্তা ও জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের পক্ষেও বলিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়েছেন, সাহসী প্রতিবাদ করেছেন, কলম ধরেছেন। এরই অংশ হিসেবে ভারতে মাওবাদীদের নির্মূল করতে শাসকশ্রেণির নির্বিচার গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের সামরিক অভিযান “অপারেশন গ্রিনহান্টে”র বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। উল্লেখ্য, ৬০-এর দশকে ভারতে মাওবাদীদের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক নক্সালবাড়ি আন্দোলন তাকে প্রভাবিত ও আলোড়িত করেছিল। তখনও তিনি “নক্সালদের” উচ্ছেদে শাসকশ্রেণি ও তার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে উন্মোচন করে রচনা করেছিলেন উপন্যাস “হাজার চুরাশির মা”। তিনি তার প্রথম উপন্যাস “ঝাঁসির রাণী”তে বৃটিশের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে নারী নেতৃত্ব লক্ষ্মীবাঈসহ অনেকের বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও আত্মত্যাগকে অত্যন্ত নিপুণ হাতে তুলে ধরেছেন। সুদীর্ঘ ৬০ বছরের সাহিত্য সাধনার ফসল হিসেবে তিনি বাংলাভাষায় ১০০টিরও বেশি উপন্যাস এবং ২০টি গল্প সংকলন রচনা করেছেন এবং অসংখ্য সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। উল্লিখিত উপন্যাসগুলো ছাড়াও মহাশ্বেতা দেবীর উল্লেখযোগ্য আরো উপন্যাস হচ্ছে- তিতুমীর, অরণ্যের অধিকার, অগ্নিগর্ভ প্রভৃতি এবং গল্প- রোদালী, দ্রৌপদী, স্তন্যদায়িনী, ভাত ইত্যাদি। তার প্রগতিশীল রচনাসমূহ প্রগতিবাদীদের সাহিত্যকর্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এবং দৃষ্টান্ত। যা শ্রমিক-কৃষক সহ সকল নিপীড়িত জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের পক্ষে তাদের লেখালেখিতে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে, সাহস যোগাবে।

মহাশ্বেতা দেবীর উল্লিখিত অগ্রসর দিক সত্ত্বেও তার গুরুতর দুর্বল দিক সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়। তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবিতে আটকে থেকে বুর্জোয়া রাজনীতির বেড়াজালে বিভ্রান্ত হয়েছেন। যেমন, তার বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল পার্টি তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করা। একই কারণে শেখ মুজিব-হাসিনার আওয়ামী রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীলতাকে বুঝতে না পারা। সর্বোপরি নিপীড়িত জনগণের মুক্তির জন্য বিপ্লবী রাজনীতি-মতাদর্শ সম্পর্কে তার দুর্বলতা।

মহাশ্বেতা শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী থেকে ইংরেজিতে সম্মান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা করেন। তার যোগদানের পর থেকে তারই প্রচেষ্টায় এই কলেজটি শ্রমজীবী নারী ছাত্রীদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তিনি শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। আমৃত্যু লেখালেখিই ছিল পেশা। ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই তিনি মারা যান। 

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা


বৃটেনে অর্ধেক নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার

বৃটিশ ভিত্তিক ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস এবং নারীবাদী সংগঠন এভরিডে সেক্সিজমের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য বেরিয়ে আসে, বৃটেনে কর্মজীবী নারীদের অর্ধেকই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন। এসমস্ত কর্মজীবী নারীগণ এ বক্তব্যও দিয়েছেন যে এ সম্পর্কে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না। উপরন্তু অভিযোগকারীকেই অপমানিত হতে হয়।

বুর্জোয়া বিশ্বের ‘গণতন্ত্রের রোল মডেল’ বৃটেনেও নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন আমাদের দেশের নারীদের মতোই। এই সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া বিশ্বে কোথাও নারীরা নিরাপদ নন। তাই এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলুন। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হোন।

– ডিসেম্বর/’১৬

সূত্রঃ 

https://www.theguardian.com/lifeandstyle/2016/aug/10/half-of-women-uk-have-been-sexually-harassed-at-work-tuc-study-everyday-sexism 

 নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা


শিশু ধর্ষণ এই সমাজ ব্যবস্থার একটি ব্যাধি

পত্র-পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই দেখা যায় কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। শহর-গ্রাম ঘরে-বাইরে চলার পথে কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। এ এক ঘৃণ্য অপরাধ। নির্মম বিভৎসতা, অমানবিক পৈশাচিকতা। ধর্ষণের শিকার একটি শিশুকে চির জীবনের জন্যে আতঙ্কগ্রস্ত থাকতে হয়। অনেকেই হয়ে যায় প্রতিবন্ধী।

সাধারণভাবে শিশুরা হয় দুরন্ত চঞ্চল। সহজ-সরল। সর্বদাই থাকে চিন্তামুক্ত ঝামেলাহীন। এমনি এক শিশু যখন ধর্ষণের মতো জঘন্য নির্মম নিপীড়নে পতিত হয় তখন অবুঝ শিশু আলোক উজ্জ্বল পৃথিবীকে অন্ধকার হিসেবে দেখতে থাকে।

২০১৫ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে (২৯ নভেম্বর পর্যন্ত) শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এ সময় ১১৭ শিশুকে গণধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় ৩৩ শিশুকে। ২০১৫ সালে ৯৯ শিশু গণধর্ষণের শিকর হয় এবং ৩০ শিশুকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। (শিশু অধিকার ফোরাম)। গ্রামে-গঞ্জে বহু শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে- যা বিভিন্ন কারণে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না। থেকে যায় অগোচরে। এতে বোঝাই যায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা কতটা ভয়াবহ রকমের বেড়ে চলেছে।

এখানেই শেষ নয়। বিশেষত দরিদ্র শিশুরা ধর্ষণের কারণে এবং সামাজিক বিচারের নামে অপমানজনক নির্যাতনের কারণে অনেকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। ১০/১২/১৬ তারিখে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নে এমনি এক ঘটনা ঘটে। এই ইউনিয়নের চেয়্যারম্যান মনিরুল ইসলাম যিনি একইসাথে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদক, এক কিশোরীকে শালিসের নামে যে রায় দিয়েছে তার অপমান সইতে না পেরে সে আত্মহত্যা করেছে। বিবিসি সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এমনি ভয়াবহ পরস্থিতিতেও বর্তমান সরকার আইন করে কন্যাশিশু ধর্ষণের কার্যত বৈধতা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ১৮ বছর মেনে নিয়েও সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদেরও বিশেষ কারণে বিয়ে দেয়ার আইন করেছে যা কিনা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।

কন্যাশিশু ধর্ষণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী নিপীড়নের বিকৃত আরেক রূপ। পুরুষদের একাংশ বিভিন্ন উপায়ে নারীদের উপর জবরদস্তিমূলক নির্যাতন করেও সন্তুষ্ট হতে পারছে না। তাদের আরও বিকৃতির দিকে মনোযোগ। তাই তারা মেয়ে শিশু ছাড়াও ছেলে শিশুও ধর্ষণের বিকৃত পথ বেছে নিয়েছে। এখানেই শেষ নয়, ধর্ষণের পর শাস্তির ভয়ে এবং তথাকথিত মান-সম্মান রক্ষার জন্য কেউ কেউ কখনো কখনো ওই শিশুকে হত্যাও করছে। এটা ফ্যাসিবাদী হিংস্রতা। রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি ফ্যাসিবাদী কায়দায় জনগণকে, প্রগতিশীল ও বিপ্লবীদেরকে খুন-গুম-‘ক্রসফায়ার’-গ্রেফতার-নিখোঁজসহ বিভিন্ন নিপীড়ন চালাচ্ছে। তারা এই ফ্যাসিবাদ আজ জনগণের মাঝেও নিয়ে গেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই শিশু ধর্ষণ? কেনই বা তা অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে?

সাম্রাজ্যবাদ সম্প্রসারণবাদ নিয়ন্ত্রিত দালাল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে রয়েছে ক্ষয় হতে থাকা পুরানো সামন্তবাদী ব্যবস্থা। এই প্রতিক্রিয়াশীল দুই ব্যবস্থার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে এক জগাখিচুড়ি মার্কা সংস্কৃতি। এখানে একদিকে বিরাজমান সামন্ততান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান দৃষ্টিভঙ্গি, অন্যদিকে আধুনিকতার নামে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ও বিকৃত পুঁজিবাদী শিল্প-সংস্কৃতির অবাধ চর্চা। প্রেম-বিয়ে যৌন জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে নানা ধরনের বিকৃতি হিসেবে। যেমন- এদেশে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সাথে চলছে তাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। যেজন্য বাংলাদেশী টিভি ভারতে প্রদর্শিত না হলেও ভারতীয় বাংলা-হিন্দি চ্যানেল স্টার জলসা, স্টার প্লাস, জি বাংলা প্রভৃতির মাধ্যমে সিনেমা-সিরিয়াল-নাটক-গান-নাচ, যৌন উত্তেজক অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপন প্রভৃতি প্রচার জনমনে তথা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিকৃত প্রভাব তৈরি করে চলেছে। একে ঘিরে খুনোখুনিও হয়েছে। এই গণবিরোধী অনুষ্ঠানগুলো আমাদের দেশে গ্রাম-গ্রামান্তরে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে, পড়ছে। যা নানা বয়সের পুরুষদের একাংশকে যৌনতার লাগামহীন উন্মাদনায়ও ঠেলে দিচ্ছে। যে সংস্কৃতি খোদ ভারতের রাজধানী দিল্লিকেও ইতিমধ্যে ধর্ষণের নগরে পরিণত করেছে। এছাড়া ডিজিটালের নামে আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে ইন্টারনেট মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যৌন ছবি দেখার অবাধ ব্যবস্থা করা হয়েছে বুর্জোয়াদের স্থূল মুনাফার স্বার্থে, প্রগতিশীল ও বিপ্লবী সংস্কৃতি রুখতে। এই সংস্কৃতির একটি বিকৃত রূপ হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। এই সংস্কৃতির আগ্রাসনে ব্যাধিগ্রস্ত ধর্ষকরা নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ যৌন চর্চার একটি ক্ষেত্র খুঁজে ফিরছে এখানে। এজন্য এরা বেছে নেয় কোমলমতি শিশুদেরকেও। যারা ভয়-ভীতি-লজ্জা-শরমের কারণে এ জাতীয় ঘটনা সহসা প্রকাশ করবে না। এই সমাজে স্বেচ্ছামূলক প্রেম-বিয়ে-ভালবাসা-যৌনতা-বিচ্ছেদের অধিকারহীনতাও এক্ষেত্রে অন্যতম এক শর্ত।

বেশি ধর্ষণের শিকার হয় দরিদ্র শিশুরা। এই শিশুরা সর্বদাই হীনমন্য থাকায় সাধারণভাবে চুপ থাকে। এটা এক ধরনের শ্রেণি নিপীড়নও বটে।

শুধুমাত্র মেয়ে শিশুরা নয়, ছেলে শিশুরাও যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। কয়েকমাস পূর্বে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ১০ বছরের শিশু সাগর বর্মণকে পায়ুপথ দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে পাশবিক কায়দায় খুন দেশবাসীকে শিহরিত করেছিল। এর কিছুদিন আগে খুলনায় এক শিশুকে একই কায়দায় বাতাস ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল।

এসব শিশু নির্যাতন বন্ধের জন্য বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই বলে থাকে বিচারহীনতার কথা। বাস্তবে বিচার করে শাস্তি দিলেই শিশু ধর্ষণ শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে না। বিগত কয়েক বছরে এ জাতীয় অপরাধে অনেককে শাস্তি দিলেও তা কমেনি।

এই বিকৃত সমাজ ব্যবস্থার সামাজিক ব্যাধি হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। এজন্য ব্যক্তি-মালিকানাধীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থায় নারীদেরকে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে মনে করা হয়। এই ব্যবস্থার পরিপূর্ণ উচ্ছেদ ব্যতীত শিশু ধর্ষণ বন্ধ হবে না। যেমনি এই শাসক শ্রেণি পতিতাবৃত্তি বন্ধ করতে পারে না। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই শিশু ধর্ষণ-নির্যাতন পতিতাবৃত্তি উচ্ছেদ করতে পারে। মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় এবং মাও সেতুঙের চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিশু ধর্ষণসহ সকল ধর্ষণের অবসান হয়েছিল। 

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা