মাওবাদী নেতা কমরেড ‘নিজামউদ্দিন মতিন’-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

মাওবাদী নেতা কমরেড ‘নিজামউদ্দিন মতিন’-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

মাওবাদী নেতা কমরেড নিজামউদ্দিন মতিন ১৯৫৫ সালে বরিশালের আলেকান্দায় এক মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র, তখন বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী লড়াই-সংগ্রামের তাত্ত্বিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সেতুঙ চিন্তাধারা ও মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৬৯ সালেই তিনি কমরেড সিরাজ সিকদার প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী পার্টি গঠনের প্রস্তুতি সংগঠন ‘পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন’-এ যোগ দেন এবং বরিশাল শহরে কাজ শুরু করেন। মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭০ সালে তিনি দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে বুর্জোয়া একাডেমিক শিক্ষা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে পেশাদার বিপ্লবীতে পরিণত হন।
সার্বক্ষণিক সংগঠক হিসেবে কমরেড মতিন চট্টগ্রামে নিয়োজিত হন এবং সেখানে গ্রামাঞ্চলে সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাবনায় কাজ করেন।
বিচ্ছিন্নতা ও যুদ্ধরত অবস্থায় কমরেড মতিন পার্টি গঠনের সংবাদ অবহিত হননি। পরে সংযোগ হলে তিনি কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি’তে যোগ দেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে কমরেড মতিন বিক্রমপুরে প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৩-৭৪ সালে বিক্রমপুরে পার্টির বিপ্লবী সংগ্রামের উত্থান ঘটে। এরপর শেখ মুজিবের ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে সারা দেশে বিপ্লবী লড়াইয়ের যে উত্থান সৃষ্টি হয় তাতে কমরেড মতিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৪ সালের ১৬ জুন ও ১৫-১৬ ডিসেম্বর পার্টির আহ্বানে যে হরতাল পালিত হয়, সেখানেও কমরেড মতিন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৭৪ সালে কমরেড মতিন ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পরিচালনা করেন এবং পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭৪ সালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংকট নিরসনে সেপ্টেম্বর মাসের বর্ধিত অধিবেশনে কমরেড সিরাজ সিকদার ৬ সদস্যের যে রাজনৈতিক ও সামরিক সাহায্যকারী দুটি গ্রুপ গঠিত করেন তাতে কমরেড মতিন ছিলেন ‘সামরিক সাহায্যকারী’ গ্রুপের ১ নম্বর সদস্য।
১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি শেখ মুজিবের ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র্র কর্তৃক কমরেড সিরাজ সিকদার গ্রেফতার ও নিহত হলে পার্টি গুরুতর বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। পার্টির নেতৃত্বদানের মারাত্মক সংকটকালে সাহায্যকারী গ্রুপদ্বয়ের কোনো সিনিয়র সদস্য দায়িত্ব নিয়ে সভা আহ্বান না করলে কমরেড মতিন উদ্যোগী হয়ে সভা আহ্বান করেন এবং আলোচনার ভিত্তিতে পার্টির অস্থায়ী কেন্দ্র ‘অস্থায়ী সর্বোচ্চ সংস্থা (অসস)’ গঠন করেন। কমরেড মতিনের ওপর প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব অর্পিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালের জুন মাসে পার্টির বর্ধিত অধিবেশনে তা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়। সে সময় তিনি পার্টিকে গুছিয়ে পুনরায় বিপ্লবী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সমর্থনপুষ্ট খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সামরিকবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর কমরেড সিরাজ সিকদারের আগাম বিশ্লেষণ অনুযায়ী কমরেড মতিনের নেতৃত্বাধীন ‘অসস’ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে জাতীয় দ্বন্দ্বকে প্রধান দ্বন্দ্ব নির্ধারণ করে বিপ্লবী লড়াই অব্যাহত রাখে।
১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পার্টির দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কমরেড মতিন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন। তাঁর গ্রেফতারের কিছুকাল পরে পার্টি তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জেলবন্দী অবস্থায় কমরেড মতিন আরেক জেলবন্দী নেতা কমরেড সুলতানকে নিয়ে গঠন করেন ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিপ্লবী সত্তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া’ যা সংক্ষেপে ‘সত্তা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরে জেলে অন্তরীণ থাকাকালে দুই লাইনের সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় তিনি কমরেড আনোয়ার কবীরের নেতৃত্বাধীন পার্টি-কেন্দ্র ‘সর্বোচ্চ বিপ্লবী’ পরিষদ (সবিপ)’র সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ১৯৭৮ সালে ঐক্যবদ্ধ হন।
১৯৮০ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় কমরেড মতিন নিপীড়নমূলক কারা-আইনের বিরুদ্ধে দুর্বার সংগ্রাম গড়ে তোলেন। সব জেলে পার্টির জেলবন্দী নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয় জেল আন্দোলন।
সুদীর্ঘ ১০ বছর কষ্টকর বন্দীজীবনে তিনি মাওবাদ ও বিপ্লবের প্রতি আনুগত্যকে কখনো শিথিল করেননি এবং ১৯৮৬ সালে বন্দীদশা থেকে মুক্তি লাভের পর পুনর্বার বিপ্লবী অনুশীলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
‘অভূতপূর্ব বিপ্লবী অনুশীলন, ত্যাগ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কমরেড মতিন ১৯৮৭ সালে পার্টির দ্বিতীয় ও ১৯৯২ সালে তৃতীয় কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনেরও সদস্য ছিলেন।
তৃতীয় কংগ্রেসের পর দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। তিনি তৃতীয় কংগ্রেসের গৃহীত লাইন অনুযায়ী বিপ্লবী লড়াই সূচনা করেন। পরে ’৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পার্টি অভ্যন্তরে বিবিধ লাইন প্রশ্নে দুই লাইনের সংগ্রাম সূচিত হয়, যার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে পার্টি তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কমরেড মতিন ১৯৯৯ সালের মে দিবসে গঠন করেন ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির মাওবাদী বলশেভিক পুনর্গঠন আন্দোলন (এমবিআরএম)’।
নতুন কেন্দ্র গঠন করেই তিনি বিপ্লবী লড়াইয়ের সূচনা করেন এবং বেশকিছু সাড়া জাগায় ও বিকাশ ঘটায়। বিপ্লবী অনুশীলনের একপর্যায়ে তিনি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় কমরেড নিজামউদ্দিন মতিন গত ১১ আগস্ট ২০১৯ দুপুর ১২টায় মৃত্যুবরণ করেন।
কমরেড নিজামউদ্দিন মতিনের ত্যাগীজীবন, অধ্যাবসায়, অবিরাম বিপ্লবী অনুশীলন ও বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস থেকে নতুন প্রজন্মের বিপ্লবীদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কমরেড মতিন আজীবন নয়াগণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের জন্য লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে জনগণের সেবা করেছেন। তাই তাঁর মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী। কমরেড মতিনের মৃত্যুতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো। কমরেড মতিনের স্মৃতির প্রতি আমরা জানাই লাল সালাম।

মাওবাদী নেতা কমরেড নিজামউদ্দিন মতিন স্মরণ কমিটি

কর্মসূচি
স্মরণসভা : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার, বিকেল ৪টা
স্থান : আরসি মজুমদার মিলনায়তন(কলা ভবনের পেছনে), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড নিজামুদ্দিন মতিন

 

বাংলাদেশের ফেসবুকে বামপন্থীদের বিভিন্ন পোস্ট ও দেশটির জাতীয় দৈনিক ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ জানাচ্ছে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতির অন্যতম ব্যক্তিত্ব, মাওবাদী ধারার কমিউনিস্ট পার্টি ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি(এমবিআরএম)’ এর সম্পাদক কমরেড নিজামুদ্দিন মতিন ওরফে কমরেড ‘ক’ ওরফে কমরেড শাহিন গত ১২ই আগস্ট সকাল ১১টায় মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫বছর। তিনি দীর্ঘদিন যাবত কিডনি রোগে ভুগছিলেন। ১৯৫৫ সালে বরিশালের আলেকান্দায় জন্ম নেয়া মাওবাদী ধারার এই কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ত্ব মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৬৯ সালে তিনি সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পুর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৭৫সালে কমরেড  সিরাজ শিকদারকে হত্যার সময়ে কমরেড নিজামুদ্দিন মতিন জেলে ছিলেন। সেখানেই বিভিন্ন কেন্দ্রের বিভ্রান্তি এড়াতে নিজেরা তৈরী করেন “সত্ত্বা” নামে একটি আলাদা গ্রুপ। পরে আবার মিশে যান মূলধারার সাথে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাবনা, টাংগাইল ফ্রন্টের দ্বায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতিতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর অসংখ্য লেখা থেকে “শামুরবাড়ির প্রতিরোধ” স্মৃতিচারণমুলক লেখাটা ‘লাল সংবাদ’ আজ প্রকাশ করেছে।