নেপালের বিপ্লবী নারী: গোরখা জেল-পলাতক বাহিনী-প্রধান ‘ভূজেল (শীলু)’

নেপালের মাওবাদী নারী যোদ্ধা

নেপালের মাওবাদী নারী যোদ্ধা

নেপালের বিপ্লবী নারী

গোরখা জেল-পলাতক বাহিনী-প্রধান
উমা ভূজেল (শীলু)

নোট: উমা ভুজেল নেপাল গণযুদ্ধের এক বীর নারী। তিনি বিপ্লবী বাহিনীর একজন গেরিলা ছিলেন।  ’৯৯ সালে তিনি গ্রেফতার হন ও জেলে বন্দী ছিলেন।  কিন্তু আরো কিছু সহবন্দীসহ তিনি এক অসম সাহসী জেল-পালানো অভিযানের নেতৃত্ব দেন এবং পুনরায় বিপ্লবী বাহিনীতে যোগ দেন।  এই সাক্ষাতকারটি অনুবাদ করা হয়েছে ‘দিশাবোধ’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা থেকে।  পত্রিকাটি নেপালের রাজধানী কাঠমন্ডু থেকে প্রকাশিত হয়। এখানে যেসব তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে তা নেপালি ক্যালেন্ডারের।  অনুবাদের সময় নেপালি ও ইংরেজি ক্যালেন্ডার একত্রে পাওয়া যায়নি।  এ কারণে কাছাকাছি ইংরেজি তারিখ অনুমান করা হয়েছে।  যা ব্রাকেটে দেয়া আছে।

[প্রখ্যাত উমা ভূজেল ওরফে শিলু হলেন গোরখা জেলভাঙ্গা পলাতক দলের প্রধান।  ছয়জন নারী বিপ্লবীর জেল-পালানোর সাথে সাথেই উমা ভূজেলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।  তারা গোরখা জেল থেকে এক সুড়ঙ্গপথ খনন করে পালান এবং পার্টির লোকদের সাথে যোগাযোগ করেন। বিপ্লবীদলের সদস্য হিসেবে উমার নাম পূর্ব থেকেই সুপরিচিত।  তাছাড়া তিনি ছিলেন প্লাটুন কমান্ডার কমরেড ভীমসেন পোখরেলের স্ত্রী।  কমরেড ভীমসেন সিপিএন (মাওবাদী)-র পলিট ব্যুরোর সদস্য কমরেড সুরেশ ওয়াগালের সাথে শহীদ হন।  তাদের মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই তেইশ বছর বয়স্কা উমা গ্রেফতার হন। ]

১নং প্রশ্ন: কখন ও কোথায় আপনি গ্রেফতার হলেন?
উত্তর: ১০ কার্তিক (২৫ অক্টোবর, ১৯৯৯) আরুঘাটে পুলিশ আমাকে আটক করে। সে সময় গোরখা জেলার টেন্ড্রাঙ্ক অঞ্চলের এক কৃষক বাড়িতে অবস্থান করছিলাম।
২৫ অক্টোবর আমাকে আম্বুখারানীতে এনে ২৫ জানুয়ারি, ২০০০ অবধি একাকী নির্জন অবস্থায় রাখা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০০ সালে আমাকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার মিথ্যে অভিযোগে জেলে পাঠানো হয়।

২নং প্রশ্ন: জেল পালানোর ধারণা কখন থেকে আপনার মধ্যে কাজ করে?
উত্তরঃ গ্রেফতার হওয়ার মুহূর্ত থেকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমি একটা উপযোগী সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু পাইনি।  ১ মার্চ, ২০০০, সহযোদ্ধা কমরেড কমলা নাহাকারমিকেও জেলে আনা হয়।  আমরা (উভয়ে) একত্রে জেল-পালানোর সংকল্প করি।  কিন্তু সহায়ক ব্যক্তি-শক্তির অভাবে তা সম্ভব হয়নি। সমা, মীনা, রীতা এসে আমাদের সাথে একত্রিত হওয়ায় আমাদের প্রত্যেকের বুদ্ধি সমন্বিত হয়ে কিছু কৌশল নির্ধারিত হয়।  ওদের সকলকে ধন্যবাদ।
একটি সুড়ঙ্গ খনন করে তিন মাসের মধ্যে জেল-পালানোর একটি পরিকল্পনা করি।

৩নং প্রশ্নঃ তিন মাসের এ পরিকল্পনাটি কেমন ছিল?
উত্তরঃ খননের কাজ আরম্ভ করার পূর্বে যথাসাধ্য আলাপ-আলোচনার দ্বারা আমরা কিছু কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সিদ্ধান্তগুলো ছিল- সুড়ঙ্গ খনন আরম্ভ করার সময় নির্ধারণ, পরিকল্পিত কাজটিকে কয়েক অংশে ভাগ করা, আদর্শগত মানসিক ও দৈহিক প্রস্তুতি, শত্রুদের ব্যবহার করে তাদের কাজ-কর্মের মধ্যে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদি ইত্যাদি।  এ সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা তিন মাস পরে পালানোর পরিকল্পনা করি।  ২৬ ডিসেম্বর থেকে সুড়ঙ্গ খনন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই; উপলক্ষ ছিল কমরেড মাওয়ের মৃত্যুবার্ষিকী।  আর তখনই পরিকল্পনা করি, গণযুদ্ধ-সূচনার বার্ষিকী উদযাপনকালে জেল থেকে পালাবো।  তেমনি মানসিক শক্তি ও উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি ও প্রস্তুতির জন্য বিশ্বের ও নেপালের কিছু সাহসিক ও গভীর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপর পড়াশুনা ও আলোচনা করি।  শারীরিক প্রস্তুতির জন্য নিয়মিত কঠোর শরীরচর্চা করি।  খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে মনোযোগী হই।  শত্রুদের কাজে লাগানোর জন্য তাদের সাথে নমনীয় ও খাতির জমানোর কৌশল অবলম্বন করি- তাদের সন্দেহমুক্ত ও অনুগত করার জন্য পার্টির রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা করি।

৪নং প্রশ্নঃ জেল পালানোর বিষয়ে বাহির থেকে পার্টির কোন অনুপ্রেরণা ছিল কি?
উত্তরঃ মোটেই না; এ উদ্দীপনা ও পরিকল্পনা একান্তই আমাদের।

৫নং প্রশ্নঃ সুড়ঙ্গ খনন করে পালানোর মত জটিল কাজের প্রারম্ভে কি আপনার মৃত্যুর ভয় হয়নি?
উত্তরঃ মৃত্যুভয় পরিহার করেই আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমরা বাঁচি কিংবা মরি, আমরা মনে করি- এটা হবে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। বিফল হব, সে ভয়ে কিছু না করে কিছু করতে গিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া কি ভাল না?

৬নং প্রশ্নঃ পরিকল্পনা গ্রহণকালে কি সফলতার বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন?
উত্তরঃ সম্পূর্ণ সফল হবো- এ বিবেচনায়ই আমরা পরিকল্পনা করি। আমরা সকলে মিলে রাজি হই যে, যদি আমরা ব্যর্থ হই এবং ঘটনাক্রমে আমাদের মরতেও হয় তবুও শত্রুর কাছে মাথা নত করে মরবো না; নির্ভীক মৃত্যুই আমাদের জন্য সুখের মৃত্যু, এবং তা হবে গৌরবের।

৭নং প্রশ্নঃ খনন-কাজ কি করে, কিভাবে আরম্ভ হয়?
উত্তরঃ সীমানা দেয়ালের কাছাকাছি, জেলখানার খোলা মাঠে মাও-এর মৃত্যু-দিবস পালন করে বিকেল সাড়ে তিনটায় সুড়ঙ্গ খননের কাজ আরম্ভ করি।

৮নং প্রশ্নঃ কাজের দায়িত্ব কিভাবে ভাগ করা হয়?
উত্তরঃ কাজের দায়িত্ব ভাগ ছিল- সুড়ঙ্গ খনন, পাথর ও মাটি সরানো, প্রহরী সংরক্ষণ (প্রবেশ-দ্বারে), অন্যান্য কয়েদী ও নিরাপত্তা প্রহরীদের কাজে লাগানো, বাহিরের অবস্থা বিষয়ে সতর্ক নজর দেয়া, এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা করা।

৯নং প্রশ্নঃ সুড়ঙ্গ খননকালে যে-সব সমস্যা দেখা দেয় সে-সব সমস্যার সমাধান কিভাবে করা হয়?
উত্তরঃ দেড়ফুট লম্বা লোহার দন্ড দিয়ে প্রায় অধিকাংশ সুড়ঙ্গ খননের কাজ চলে।  আশপাশ পরিষ্কার করতে গিয়ে রডটা পাওয়া যায়।  তিন তিনটি সিমেন্টের দেয়াল ভাঙ্গতে অনেক সময় লেগে যায়।  এ ছাড়াও বহু সমস্যা দেখা দেয়।  বেশ কয়েকবার জেলের নিরাপত্তা প্রহরীরা সুড়ঙ্গের খুব কাছাকাছি চলে আসে।  তাদের মনোযোগ পরিবর্তনের জন্য আমরা নানা কৌশলের আশ্রয় নিই।  সুড়ঙ্গের কাজ এগিয়ে গেলে আমরা কাঠ ও মাটি দিয়ে তা ঢেকে দিই এবং তার ওপর কিছু শাক-সবজি, ফল, ফুলের গাছ লাগাই।  তারপর, আরও নিরাপত্তার জন্য, তার ওপর একটা ক্যারমবোর্ড স্থাপন করি। সুড়ঙ্গ খননের প্রথম থেকেই আমরা প্রতিদিন সমস্যার সম্মুখীন হই, কিন্তু আমরা ধৈর্যচ্যুত হইনি।  শান্ত স্বাভাবিক থেকে সকলে মিলে সমস্যার সমাধান করি।  পুলিশদের সাথে ভাই-বন্ধুর মতো ব্যবহার করি।  পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়ে আসে।  খননের কাজ একমাস অগ্রসর না হতেই জেল প্রশাসন একটি টয়লেট নির্মাণ শুরু করে যা আমাদের ফাল্গুন মাস নাগাদ পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে।

১০নং প্রশ্নঃ জেল পালানো দিনকার ঘটনাবলীর বিষয়ে কি কিছু বিষদ বিবরণ দেবেন?
উত্তরঃ সুড়ঙ্গ খননের কাজ শেষ হলে আমরা ২০০১ সালের মার্চ মাসের ৩০ তাং রাত ১২টা থেকে ২টার মধ্যে জেল-পালানোর সিদ্ধান্ত নিই।  সেদিন সন্ধ্যার দিকে খুব চড়া আওয়াজে টিভি চালাই এবং সন্ধ্যা ৬টার দিকে জানালার একটি রড কাটতে আরম্ভ করি।  একমাত্র একটি রড কাটতেই ৯টা বেজে গেল। পৌনে একটার দিকে সেই জানালার ফাঁকে মাথা গলিয়ে আমি বাইরে চলে আসি।  তারপর একে একে অন্যান্য কমরেডগণ বেরিয়ে আসেন। এ সফলতার জন্য আমরা পরস্পর করমর্দন করি এবং দু’দলে বিভক্ত হয়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করি।  সুড়ঙ্গের বাইরে এসে আবার সাফল্যের জন্য করমর্দন করি।  সুড়ঙ্গপথে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় পুলিশ দু’বার আমাদের দিকে গুলি ছোড়ে, আর দু’বার গুলি ছোঁড়ে উন্মুক্ত আকাশের দিকে।  আমি সকলকে সতর্ক করে দিলাম, “তোমরা ঘেরাও হয়ে পড়েছো, আশা ত্যাগ কর”! ওরা ইতস্তত করছিল, ঠিক সে মুহূর্তেই আমরা সফলভাবে পালিয়ে আসি।  সেদিন এক কৃষকের বাড়িতে আশ্রয় নিই।  দু’দিন পর পার্টির সংস্পর্শে চলে যাই।  

সূত্রঃ নারী মুক্তি/২নং সংখ্যায় প্রকাশিত ॥ ফেব্রুয়ারি, ’০৪

Advertisements