বিপ্লবী গল্পঃ ‘থানা হাজতে জিজ্ঞাসাবাদ’

ThumbHersiPromo-400x285

থানা হাজতে জিজ্ঞাসাবাদ
– আবু জাফর

(এটি ঠিক গল্প নয়। ৮০’র দশকে বাংলাদেশের মাদারীপুর সংগ্রামের বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে গল্পাকারে লিখিত স্মৃতিচারণমূলক লেখা এটি)

পুলিশী চাপের সাথে সাথে টাউট শ্রেণী শত্রুদের উৎফুল্লতা ও সক্রিয়তা মিলিয়ে প্রচণ্ড চাপের সম্মুখীন সবগুলো এলাকা। দিন নেই রাত নেই লাগাতার পুলিশী হামলা। পুলিশ-টাউট-শ্রেণীর শত্রুরা মিলে নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর চালাচ্ছে অকথ্য নির্যাতন। বাড়ি-ঘর লুট করছে, যাকে-তাকে ধরে পিটুনী দিচ্ছে, থানায় নিয়ে টাকা আদায় করছে, মহিলা ও শিশুদের উপর নির্যাতন চালাতেও ওরা পিছ-পা হচ্ছে না। উদ্দেশ্য বিপ্লবীদের ধরিয়ে দাও। কিন্তু এত অত্যাচার-নির্যাতনের মুখেও জনগণ বিপ্লবীদের রক্ষা করছে- পানি যেমন মাছকে রক্ষা করে। এমনই প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে জীবন বাজি রেখে এলাকায় টিকে আছে কামরুল অন্যান্য কমরেডদের নিয়ে।

একটি গ্রামের জরুরি সমস্যা সমাধানের জন্য বৈঠক ডেকেছে কামরুল। সন্ধ্যার পরপরই বৈঠক শেষ করে তাকে চলে যেতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ে। নিরাপত্তার কারণে সাথি এক কমরেডকে পাশের গ্রামে রেখে কামরুল নির্ধারিত সময়ে বৈঠকে উপস্থিত হয়। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন স্থানীয় কমরেড বৈঠকে এসে উপস্থিত হয়েছেন। অন্য দু’জন কমরেডের অপেক্ষায় বৈঠক শুরু হতে পারছে না। শত্রুর চাপের কারণে কামরুল সাথে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র রাখে না। কিন্তু বৈঠক শেষে অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে বেশকিছু কাগজপত্র নিয়ে যেতে হবে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে ব্যাগে রাখছিল। জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরমে নিবিড় পল্লীর ছনের ঘরেও সবার দম আটকে আসছিল। সবাই প্রায় খালি গায়ে বসে অপেক্ষা করছে। ঘাম ঝরছে গা থেকে। নিকটবর্তী বাজার থেকে কিনে আনা একটি সাপ্তাহিকের পাতায় চোখ রেখে কামরুল বসে আছে। গরমে টিকতে না পেরে দু’একজন বাইরে ঘোরাঘুরি করছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এলো কর্কশ কণ্ঠের ‘হ্যাণ্ডস আপ’, সাথে বাঁশির সন্ত্রস্ত হুইসেল। আত্মরক্ষার জন্য সবার ছুটোছুটি এবং দাপাদাপি মিলিয়ে এক কুরুক্ষেত্র। কামরুল কাগজপত্রগুলো বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দৌড় দেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বাইরে আসতেই দেখলো সামনে দাঁড়ানো রাইফেলধারী দুইজন পুলিশ। আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টায় কামরুল ঘুষি মারলো পুলিশকে। অতর্কিত আক্রমণে হতভম্ব হয়ে পুলিশ ছিটকে পড়লো। কামরুলও লাফ দিয়ে পাশের বাগানে পড়লো। কিন্তু সাথে সাথে অন্য দু’জন পুলিশ সামনে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো কামরুলের উপর। অগত্যা আর কোথায় যাওয়া। গামছা দিয়ে পিঠমোড়া বেঁধে প্রথমেই প্রচণ্ড বেগে কিছুক্ষণ ঘুষি দেয়ার প্রতিশোধ তুললো কিল-চড়, ঘুষি-লাথি, রাইফেলের কুঁদো দিয়ে। অতঃপর বাড়ির উঠোনে এনে বসালো। অপরিচিত গ্রামে পুলিশের কাছে নিজের কি পরিচয় দেবে, কোনোরকমে ছুটে পালানো যায় কিনা ইত্যাকার চিন্তায় পথ হাতড়াচ্ছে কামরুল।
আরো বেশ কয়েকজনকে এনে উঠোনে জড়ো করা হলো। দারোগা সাহেব এসে কিছু লাথি-থাপ্পড় মেরে অন্যদের মতো কামরুলকেও জিজ্ঞেস করলো, এই শালা, তোর নাম কি ? উত্তর একটা দিতে হয়, আত্মরক্ষার জন্য কামরুল নিজের পরিচয় দিলো তাজুল ইসলাম, পিতা- নূরুল ইসলাম, গ্রাম- হিজলা। অন্যান্য সবাই তাদের সঠিক পরিচয় দিলো। এরপরেই দারোগা সাহেব থানায় যাওয়ার তাড়া দিলো। সবাইকে বেঁধে রওনা দিতে কিছুটা দেরি হওয়ায় দারোগা সাহেব ভীত কুকুরের মতো চেঁচিয়ে বললো- শালারা তাড়াতাড়ি চল, তা না হলে পার্টির লোকেরা আক্রমণ করবে।

কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি। গ্রামের অসমান রাস্তা দিয়ে কিল-ঘুষি, থাপ্পড়, রাইফেলের গুঁতো, মাথায় রাইফেলের টক্কর এবং মাঝে মাঝে জ্বলন্ত সিগারেট-বিড়ি চেপে ধরার যন্ত্রণা বয়ে বয়ে থানার পথে চললো কামরুলরা। কামরুল লক্ষ্য করেছে পুলিশরা সংখ্যায় ২৫/৩০ জন। কেউ খাকি পোষাক, কেউ লুঙ্গি, কেউ হাফ প্যান্ট, কেউ খালি গায়ে, সবার হাতেই অস্ত্র। তখনও কামরুলের কোমরে মানিব্যাগ। মানিব্যাগে শ’খানেক টাকা ছাড়াও দু’টো গোপন গুরুত্বপূর্ণ কাগজ, যা ধরা পড়লে মারাত্মক ক্ষতি হবে। নদী পার হয়ে ওপারে যেতে হবে। একটা নৌকায় কিছু লোক ওপারে চলে গেলো; বাকি সবার সাথে কামরুল এপারে। অন্ধকারে কোমরে হাত দিয়ে কামরুল মানিব্যাগ হাতে নেয়। নৌকা এপারে আসে, নৌকায় উঠতে উঠতে কামরুল মানিব্যাগটি নদীতে ফেলে দেয়। নদীর স্বচ্ছ পানির মতো কামরুল অনেকটা হাল্কা হয়। এর মধ্যে কামরুল দু’একবার পালাবার চেষ্টা করেছে; কিন্তু ওদের সতর্কতার কারণে সম্ভব হয়নি।

এমনি টানা-হ্যাঁচড়া ক’রে যখন তাদেরকে থানায় নিয়ে আসা হলো তখন অবসন্ন, ক্লান্ত। সে অবস্থায়ই দারোগা সাহেবের হাতের বেতের লাঠি কামরুলকে জর্জরিত করে তুললো। দারোগা সাহেবের একটিই প্রশ্ন, বল্ শালা, তুই কামরুল কিনা ?
কামরুল জানে এ মুহূর্তে ওর পরিচয় পেলে ঘাতকরা তাকে গুম করে ফেলবে। তাই চরম অত্যাচারের মুখেও সে বলে, আমি কামরুল নই। আমি তাজুল। আপনারা প্রয়োজনে আগামীকাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে দিয়ে শনাক্ত করাবেন। কামরুলের তখন একটাই চিন্তা যদি আগামীকাল ওর আসল পরিচয় প্রকাশ পায়ও তবু মেরে ফেলতে পারবে না। ব্যাপক জনগণ তার গ্রেফতারের কথা জেনে যাবে। ইতিমধ্যে অন্যান্যদের নিকট কামরুলের পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তারা তাকে চিনে না বলেছে। দারোগা সাহেব তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে, একই গ্রাম, অথচ এরা তোমাকে চিনবে না কেন শালা! উপস্থিত বুদ্ধিতে কামরুল বলে, এরা আসলেই আমাকে চেনে না। আমি ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকি। আমার পিতা ঢাকায় রং-মিস্ত্রির কাজ করে। আমি ওখানে থেকে পড়াশুনা করতাম।

দারোগা সাহেব পরিশ্রান্ত হয়ে মারপিট বন্ধ করে, সকালে চেয়ারম্যানকে আনিয়ে প্রকৃত পরিচয় জানার জন্য অন্ধকার কক্ষে বন্ধ ক’রে রাখে। অন্যান্যদের কামরুলের সাথে কথা বলতে নিষেধ করে দেয়।
মলমূত্রের গন্ধ ও ধুুলোবালিতে ভরপুর, বিছানাপত্র বিহীন শ্বাসরুদ্ধকর হাজতকক্ষে ওরা মানুষ নামের কয়েকটি প্রাণী, একেক জনের একেক কণ্ঠের কাতরানি, বিচিত্র এক পরিবেশ। অন্ধকার না হলে হয়তো দেখা যেতো চোখেমুখে সবারই অজানা আশংকার বিনিদ্র ত্রাস। একপাশে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত একটা অলেষ্টারকে অতঃপর টেনে আনতে হয় কামরুলকে। দারোগার বদান্যতায় টুকরো টুকরো ব্যথায় শরীরে জ্বরের কাঁপুনি আসতে দেরি হয়নি। অতএব পরিত্যক্ত ছেঁড়া অলেষ্টারই ভরসা। কিছু অংশ গায়ে দিয়ে কিছু অংশ মাথায় চেপে জ্বরের সাথে আপাততঃ লড়াই চলছে। অন্যান্যদেরকে কামরুল চুপি চুপি কয়েকবার কাছে ডেকেছে আলাপ করবে বলে। কিন্তু ভয়ে জড়সড় কেউ তার কাছে এগুচ্ছে না। অগত্যা কামরুলকেই একসময় অনেক কষ্টে উঠতে হয়। হাজতঘরের পিছনের জানালায় চোখ পড়তেই আবছা আঁধারে প্রথমেই চোখে পড়ে আজন্ম ঘনিষ্ঠ রূপালী জলের কুমার নদী। তার পরেই অদূরে ছায়া ছায়া গ্রাম, গ্রামের একটি বাড়ির কেঁপে কেঁপে ওঠা কুপির শিখা। সারাদিনের কর্মক্লান্ত কৃষক নিরিবিলি ঘুমাতে পারছে না পুলিশী নির্যাতনে, স্বামী-পুত্রহীন খালি বাড়িতে হয়তো কোনো কৃষক বধূ কুপি জ্বেলে রাত জেগে বসে আছে। কামরুল অন্যান্য বন্দীদের কাছে এগিয়ে যায়। তারা আলাপ করতে ভয় পায়। কামরুল ওদেরকে ফিস্ফিসিয়ে বলে, আপনারা কেউ আমাকে চিনেন এ কথা স্বীকার করবেন না। স্বীকার করতে গেলে আপনাদের অসুবিধা হবে। আমার সাথে আপনাদের জড়াতে চাইবে। আমার সাথে পরিচয় আছে, সম্পর্ক আছে এসব বুঝতে পারলেই অসুবিধা। নইলে আপনাদেরকে হয়তো ছেড়ে দেবে অথবা বড়জোর সন্দেহজনকভাবে কোর্টে চালান দেবে। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমার ব্যাপার আমিই সমাধান করবো। আলাপ সেরে কামরুল নিজের জায়গায় এসে শুয়ে আগামীদিনের অত্যাচারের মুখে নিজের দৃঢতাকে আর এবার ঝালিয়ে নিতে নিতে একসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

প্রহরী পুলিশের ডাকে ঘুম ভাঙে সকালে। সবাই হাত-মুখ ধোয়, ব্যথায় নড়াচড়া করা যায় না। তবু উঠতে হয় কামরুলকে। সবাইকে একখানা ক’রে রুটি দেয়, রুটি খাওয়া হলে কামরুল ছাড়া অন্য সবাইকে বাইরে নিয়ে যায়। ওদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা নিয়ে বেশিক্ষণ চিন্তা করতে হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে থেকে ভেসে এলো বিচিত্র চিৎকার। এক একজনকে বেঁধে-ছেদে গরুপেটা করা হচ্ছে বোঝা গেল। কামরুল নিজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চোখে ভেসে উঠছে জনগণ-সংগঠন-সাথী কমরেড, শেষ বিন্দু রক্তদানকারী শহিদ কমরেড। আর কোনো ভীতি নেই, আসুক অত্যাচার-নির্যাতন-জীবন দান; তবু আমি স্থির-অনড়-অটল। এবং কিছুক্ষণ পরেই সেই মুহূর্ত এলো। সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো, কামরুলকে বের করে নিল। প্রথমতঃ দারোগা সাহেব জিজ্ঞেস করলো, তুই কামরুল কিনা বল ? না, আমি কামরুল নই, তাজুল। পিটুনি শুরু হলো- বল তুই কামরুল কিনা ? না। এলোপাতাড়ি মারপিটে পুলিশরাও যোগ দেয়- বল্ কামরুল কিনা ? বল্-বল্-বল্… …। না…না… …না…না। তারপর ওর আর কিছু মনে নেই।

প্রায় দু’ ঘণ্টা পরে যখন জ্ঞান ফিরলো তখন কামরুল সেই হাজতের অন্ধকার কুঠুরিতে একা। সাথীদের কি হলো জানতে পারলো না। আবার ওকে ধরে বাইরে বের করা হলো। থানার মেঝেতে, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসিয়ে দেয়া হলো। বাইরে দু’একটি পরিচিত সহানুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তির ঘুরাঘুরি কামরুলের মনে আশার আলো জ্বেলে দিচ্ছে। এখন আর মেরে গুম ক’রে ফেলতে পারবে না। দারোগা কথা বলছে- তুই তোর আসল পরিচয় দে, চেয়ারম্যানকে ডাকতে পাঠাচ্ছি। তুই পরিচয় না দিলেও তোর পরিচয় ঠিকই আমরা পেয়ে যাবো, কামরুলও ভাবছে পরিচয় গোপন করা যাবে না। এখন যেহেতু গুম হওয়ার ভয় কম তখন পরিচয় দিলে অবস্থাটা কি হয় দেখা যাক। এসব ভেবে এক সময় কামরুল নিজের পরিচয় স্বীকার করলো। দারোগা আঁতকে উঠে চিৎকার করলো- ইউ আর কামরুল ! অবশ্য বেশ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিস। রাতে তোর পরিচয় নিশ্চিত জানতে পারলে এখন কোথায় থাকতিস বলা যায় না। আমাদের প্রতি নির্দেশ ছিলো, থানায় না এনে তার আগেই শেষ ক’রে ফেলা। আমি অবশ্য আগেই তোর ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত ছিলাম, কিন্তু… …। যাকগে, তুই যেভাবে তোর পরিচয় স্বীকার করেছিস, তেমনি ভালোয় ভালোয় একটা অস্ত্র দিয়ে দে, তোকে কিছু বলা হবে না। হয়তো চলে যেতে পারবি। কামরুল অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে, আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই। তাই আমার পক্ষে কোনো অস্ত্র দেওয়া সম্ভব নয়। প্রথমে নানান প্রলোভন দেয়া শুরু হলো, তাতে কাজ না হওয়ায় হুমকি এবং তার পরেই আবার শুরু হলো অত্যাচার। বাঁশচেঙ্গি, বুট-পদদলন, সাথে সাথে লাঠিপেটা এবং গামছা বেঁধে নাকে-মুখে পানি ঢালা। কোথায় কোন্ অতলে যেন হারিয়ে যাচ্ছে, আবার জেগে উঠছে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে, আবার জেগে উঠছে। এমনি খেলার মধ্যে মুখে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে একটিমাত্র শব্দ- না… …। এরই মধ্যে একজন পুলিশ অফিসার বললো, এসবে কাজ হবে না। ওর মলদ্বার দিয়ে বাটা মরিচ আর বরফ ঢুকালেই ওর মুখটা “ক্যাসেট” হয়ে যাবে এবং গড় গড় ক’রে সবকিছু বলে দেবে। যেমন কথা তেমন কাজ। বরফ আর মরিচ বাটার প্রতীক্ষায় কামরুলকে আবার হাজতঘরে এনে রাখা হয়। চেতন-অচেতনে কামরুল নিজেকে প্রস্তুত ক’রে নেয় আরো কঠিন-কঠোর নির্যাতনের জন্য। অবশ্য বরফ ও মরিচ বাটার কথা শুনে কিছুটা ভীত হয়ে পড়েছে কামরুল। বিশেষ ক’রে ক্যাসেট হয়ে যাবার কথা শুনে। কিন্তু পর মুহূর্তেই আবার স্থিরবিন্দুতে আনে নিজেকে। যতক্ষণ চেতনা আছে, ততক্ষণ কিছুতেই বলা যাবে না, অচেতন অবস্থায় যা হয় হবে।

শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় থানার ঘেরাও চত্ত্বরে আবার কামরুলকে আনা হলো। কিছু উৎফুল্ল সেপাই, কিছু বিমর্ষ সেপাইয়ের ঘেরাওয়ের মধ্যে রেখে দারোগার নির্দেশে কামরুলের মলদ্বারে বরফ আর বাটা মরিচ ঢুকানো হলো। পেটের ব্যথায় দারুণ চিৎকার করছে কামরুল। দারোগা জিজ্ঞেস করছে, বল্ অস্ত্র কোথায় ? লাশ কোথায় ? কামরুলের একই জবাব, জানি না। এর মাঝেও থাপ্পড়, ঘুষি, জ্বলন্ত সিগারেটের আগুন গায়ে চেপে ধরা চলছে। কিন্তু ওদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ। দারোগা ক্লান্ত, ক্লান্ত পুলিশ। সন্ধ্যার আবছা আঁধারে আবার নির্যাতনের মুখে কামরুল কিছুটা ক্ষিপ্তভাবেই বলেছে, আমি সর্বহারা পার্টি করি, সশস্ত্র সংগ্রাম করি, অস্ত্র আমাদের কাছে আছে, কিন্তু আমার পক্ষে তা দেয়া সম্ভব নয়। দারোগা মাঝে মাঝে নমনীয়ভাবেও বুঝাচ্ছে, একটা অস্ত্র দাও, তোমার বিরুদ্ধে কেস দেবো না, তুমি যাতে ছাড়া পেয়ে যাও তার ব্যবস্থা করবো। কামরুল দারোগাকে বুঝানোর চেষ্টা করে, আমি এমন একটা গোপন ও সুশৃংখল কমিউনিস্ট সংগঠনে কাজ করি যেখানে নিয়ম অনুযায়ী কোনো কমরেড গ্রেফতার হওয়ার সাথে সাথে তার জানা থাকা অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকে। এমন অবস্থায় আপনার বোঝা সম্ভব যে, আমার পক্ষে অস্ত্র দেওয়া সম্ভব নয়।

থানা লক্আপে থাকা অবস্থায় কিছু কিছু পুলিশ মাঝে মাঝে ওর কাতরানি শুনে লকআপের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মুখে সহানুভূতির ছাপ, কিছু করতে পারার অক্ষমতার জন্য বিমর্ষতা। যেভাবে শ্রেণীমিত্ররা প্রতি মুহূর্তে পাশে দাঁড়ায়। স্থানীয় টাউট, শ্রেণী শত্র“রা একবার দারোগার সাথে ঘুষ দিয়ে যোগসাজশ করে কামরুলকে অত্যাচার করতে এনেছিল, তখনও পুলিশের মাঝে দু’টি ভাগ লক্ষ্য করেছে ও। একদল বলেছে, যেহেতু আসামি থানার নিয়ন্ত্রণে সেহেতু বাইরের কেউ এর গায়ে হাত দিতে পারে না, অপর দল বলেছে, কিছু মারপিট করতে দেয়া যায়। এই দোটানায় টাউট, শ্রেণী শত্রুদের চরম অত্যাচারের সামান্য অংশের পরই রক্ষা পেয়েছে। এসময় দারোগা উপস্থিত শ্রেণী শত্রুদেরকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এদের মধ্যে তোদের খতমের তালিকায় কে কে আছে, কার কার মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রেখেছিস! কামরুল ঘৃণামিশ্রিত কঠিন দৃষ্টিতে তাকায় উপস্থিত টাউট, গণশত্রুদের দিকে এবং তাদের মধ্য থেকে জনগণ ঘৃণিত হাজারো দুষ্কর্মের হোতা দু’জনকে দেখিয়ে বলে, জনতার ‘গণআদালত’ বহুবার সংশোধনের সুযোগ দিয়ে কোনো ফল না পেয়ে অতঃপর এদেরকে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার পূর্ব বাংলার মাটিতে নেই।

দারোগা শ্লেষ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে, বাইরের আলো-বাতাস আর তোর জীবনে দেখার সুযোগ হবে না। কামরুল আরও দৃঢ়তার সাথে বলে, আমি মরে গেলেও ওরা বাঁচতে পারবে না। হয়তো আজ না হয় কাল, অথবা এক বছর, দু’বছর, দশ বছর পরে হলেও ওদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী হবেই। কেউ ঠেকাতে পারবে না। গণশত্রুরা সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে, দেখলেন স্যার, শালার এখনও সাহস কত ? এরপর দারোগা তাকে কিছু কিল, ঘুষি, লাথি মেরে লকআপে পাঠিয়ে দেয়।
ব্যথা জরজর শরীর, নিজে ইচ্ছে ক’রে উঠতে-বসতে পারে না, হাঁটতে পারে না। আবছা অন্ধকার কুঠুরিতে সারাদিন গড়াগড়ি কাতরানি। শ্বাস টানতে গেলে দুর্গন্ধময় বাতাস পেটে গিয়ে মুচড়িয়ে নাড়িভুঁড়ি বের ক’রে আনতে চায়। দুশ্চিন্তার কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে ঘুম ঘুম ঝিমুনির মধ্য দিয়ে এ দিনটিও কেটে যায়। গাঢ় আঁধারের সংকেত জানিয়ে রাত নামছে বোঝা যায়। বাইরের বিদ্যুতের আলোর ক্ষীণ ধারা প্রবেশ করে কামরুলের অন্ধকার কুঠুরিতে। ভাবছে আবার কি ধরনের অত্যাচার হবে, কখন শুরু হবে, আরো কতটা সহ্য হবে। একটা সুবিধা আছে, প্রথম দিকে কিছুটা কষ্ট হয়, তারপর সহনীয় হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যে সব ভুলে যায়। অত্যাচারের যন্ত্রণা সেই মুহূর্তে আর কামরুলকে ছুঁয়ে থাকতে পারে না।
সন্ধ্যার পরপরই কামরুল বাইরে গাড়ির হর্ণ শুনতে পায়। অল্প সময়ের মধ্যেই একজন সিপাই এসে কামরুলকে লকআপ খুলে নিয়ে যায়। আবার কামরুল প্রস্তুতি নেয় আসন্ন নির্যাতনের মুখে নিজেকে নিঃশেষ ক’রে হলেও পার্টি, বিপ্লব ও জনগণের স্বার্থ উর্ধ্বে তুলে ধরে রাখার। পার্শ্ববর্তী একটি ছিমছাম সাজানো কামরায় কামরুলকে নেয়া হয়। উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলো-ঝলমল কক্ষে দু’জন ফিটফাট ভদ্রলোক দু’টো চেয়ারে বসে আছে। একজন একটু লম্বাকৃতি, সিগারেট টানছে; অন্যজন মধ্যমাকৃতি, সামনের টেবিলে রাখা ক্যামেরায় হাত রেখে কামরুলের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কক্ষে আর যিনি আছেন তিনি হলেন কামরুলের হাড়ে-হাড়ে, পেশীতে-পেশীতে পরিচিত দারোগা সাহেব। সিপাই কামরুলকে মেঝেতে বসিয়ে দিল। লম্বাকৃতি লোকটি ওকে চেয়ারে উঠে বসতে বললো। চেয়ারে বসতে কামরুল আপত্তি করলে ভদ্রলোক নিজে উঠে এসে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। লম্বাকৃতির লোকটিই কথা বলছেÑ আমি এস,ডি,পি,ও, আর ইনি সি,আই; তোমার সাথে কিছু আলাপ করবো। “তুমি” সম্বোধন করেই একটু ইতস্তত ক’রে বললো, আমি কিন্তু ছোট ভাই হিসেবে তোমাকে “তুমি” বলছি; কিছু মনে করবে না আশাকরি। কামরুল শান্তভাবে উত্তর দিল- আমি আপনাদের বন্দী, আমাকে ‘আপনি’, ‘তুমি’ যা ইচ্ছা সম্বোধন করতে পারেন। আমার আপত্তিতে কিছু যায়-আসে না। বন্দী হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আমি যেসব আচরণ পেয়েছি সে আলোকেই কথাগুলো বলছি। যদিও জানি আমার এ কথার জন্য আবার আমার উপরে নেমে আসবে আরো কঠিন নির্যাতন। তবু আমাকে বলতেই হবে যে, আপনারা বন্দীদেরকে মানুষ বলে গণ্য করেন না। বিশেষতঃ দারোগা সাহেব তো পশু মনে ক’রে থাকে। যদি মানুষই মনে করতো তাহলে যে ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন আমার উপর চালিয়েছে, তা চালাতে পারতো না। এ ধরনের অত্যাচার চালাতো সেই মধ্যযুগে, যখন মানুষের সভ্যতা-ভব্যতা বলে কিছু ছিল না। দারোগা সাহেবের নির্যাতন তাকেও হার মানিয়েছে। ভিন্নমত পোষণ করলে কিংবা ভিন্ন দর্শনে বিশ্বাস করলে পিটিয়ে তা নির্মূল করা যায় না।

তারপর কামরুল একে একে দারোগার সকল নির্যাতনের কাহিনী তুলে ধরলো। ভদ্রলোক সব শুনে দারোগার উপর একটু ক্ষিপ্ততার ভাব দেখালো। কামরুলকে বললো, তোমার গ্রেফতারের খবর শুনেই আমি টেলিফোনে দারোগা সাহেবকে বলে দিয়েছি যেন তোমার উপর কোনো অত্যাচার না করে। রাগত স্বরে দারোগাকে বললো, (সম্ভবতঃ লোক দেখানো) এ পর্যন্ত যতজন সর্বহারা পার্টির লোক ধরেছেন তাদের কারো কাছ থেকেই কি কোনো তথ্য বের করতে পেরেছেন ? এমনকি বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পেরেছেন ? শারীরিক নির্যাতন করেই সব কিছুর সমাধান হয় না বুঝলেন ! এ অবস্থায় কিছুটা অপ্রস্তুত ভাব দেখিয়ে সি,আই, সাহেবের ইঙ্গিতে দারোগা সাহেব কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এ সময় একজন সিপাই চা-বিস্কুট দিয়ে গেল। কামরুলকেও খেতে দেওয়া হলো। এস,ডি,পি,ও, সাহেব একটা দামি সিগারেট দিল কামরুলকে। কামরুল জানালো, সে সিগারেট খায় না, বিড়ি খায়। এ ক’দিনে সে কিছুই পান করেনি। তার আত্মীয়-স্বজনেরা মাঝে মাঝে বিড়ি দিয়ে গেলেও সিপাইরা কক্ষ তালাশি ক’রে বারবারই তা নিয়ে গেছে। কর্তাবাবু একজন পুলিশকে বাজারে বিড়ি আনতে পাঠালো।
কামরুলের দিকে তাকিয়ে এস,ডি,পি,ও, বললো, আমি জানি তোমরা সৎ ও আন্তরিকভাবে বহু কষ্ট ক’রে পার্টির কাজ ক’রে যাও। কিন্তু অস্ত্রের রাজনীতি করেই ভুল করেছ। তোমরা আকিজ বিড়ির পাছা টানবা, তাও দল ছাড়বা না।
যাহোক, তোমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করবো, আশা করি সঠিক উত্তর দিবে। কামরুল বললো, আমরা একটা গোপন সংগঠনের কর্মী, সংগঠনে কঠোর শৃংখলা পালন করা হয়, এ অবস্থায় আপনি যদি এমন কিছু জানতে চান যা গোপনীয়তা এবং শৃংখলার কারণে আমার জানা নাই। অথবা এমনও হতে পারে, আমি জানি, কিন্তু প্রকাশ করলে বিপ্লব-জনগণের ক্ষতি হবে- এ কারণে আমি কিছুতেই তা বলবো না। সুতরাং, এ ধরনের বক্তব্যের জন্য যদি আপনারা চাপ দেন, অত্যাচারের আশ্রয় নেন, তাহলে আমি আপনাদের সাথে আলাপ করতে রাজি নই। আপনাদের যা ইচ্ছে করতে পারেন। এস,ডি,পি,ও, আশ্বাস দিলো- তোমাকে আর কোনো নির্যাতন করা হবে না এবং তুমি জবাব দিতে রাজি না হলে সে প্রশ্নে তোমাকে চাপও দেয়া হবে না। সে জানালো যে, সে রাজনীতি-উদ্দেশ্য-লক্ষ্য বুঝতে চায়। এরই মধ্যে সিপাই বিড়ি নিয়ে এসেছে। এক প্যাকেট বিড়ি থেকে কামরুল তার প্রয়োজনীয় সাতটা বিড়ি রেখে বাকিটা ফেরত দিল।

এস,ডি,পি,ও’র সাথে আলাপে কামরুল বুঝতে পারলো ভদ্রলোকের মার্কসবাদের ওপর যথেষ্ঠ জানাশোনা আছে। তিনি বিভিন্ন প্রশ্নে পার্টির লাইন, সভাপতি সিরাজ সিকদারের হত্যাকাণ্ড, সশস্ত্র সংগ্রাম-গণসংগ্রাম, পার্টির বিভক্তি, বর্তমান নেতৃত্ব, জাসদের সাথে সংঘাত, বিপ্লবী সংস্কৃতি প্রচারসহ জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে পার্টির মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে জানতে চাইল। কামরুল মোটামুটি পরিস্কারভাবে প্রত্যেকটি প্রশ্নের যথাযথ জবাব দেয়ার প্রচেষ্টা চালায়।
আলাপের শেষে ভদ্রলোকের মন্তব্য, তোমাদের অনেক বিষয়ই আমি আন্তরিকভাবে সমর্থন করি, কিন্তু অস্ত্রের ঝনঝনানি আর হত্যাকে চরম ঘৃণা করি। তিনি আরও বললেন, যদি ’৭১-এর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখন হয়তো অস্ত্রের প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে এই ’৮০-তে সশস্ত্র সংগ্রামের কোনো প্রয়োজন নেই। কামরুল অত্যন্ত স্পষ্টভাবে যথাযথ যুক্তি সহকারে এ ব্যাপারে পার্টির লাইন তুলে ধরে। এ সময় আলোচনা কক্ষের চারপাশে বহু আগ্রহী-উৎসুক সিপাইদের ভিড় লক্ষ্য করছে কামরুল। প্রায় তিন/চার ঘণ্টা আলাপের পর এস,ডি,পি,ও, বললো- তুমি তোমার কপাল নিয়ে থাকো, আমাকে এসপি সাহেব তোমাকে দু’টো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে বলেছে। এর পরই আমি আলোচনা শেষ করবো। আশাকরি এজন্য আমাকে ভুল বুঝবে না।
প্রশ্ন দু’টি হলোঃ যদি তুমি বন্ড দিতে রাজি হও তাহলে তোমাকে আমরা শহরে চাকুরির ব্যবস্থা ক’রে দেবো। তোমার পার্টি যদি তোমাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ক্ষতি করবে মনে করো তাহলে সরকারি খরচে তোমাকে চাকুরি দিয়ে বিদেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নতুবা তোমাকে বহুকাল জেলে পচতে হবে। দ্বিতীয়তঃ, তুমি আবেদন করলে আমরা তোমাকে জেলখানায় ডিভিশন ক’রে দেবো। তুমি দেশের নাগরিক, তোমার পিতাও ট্যাক্স দেয় রাষ্ট্রে। এটা তোমার ন্যায়সঙ্গত অধিকার।

কামরুল অত্যন্ত গম্ভীর এবং স্থিরভাবে এস,ডি,পি,ও’র দিকে তাকিয়ে বললো- আপনি তো আমার সাথে বহুক্ষণ আলাপ করলেন, আপনার কি মনে হয় আমার সম্পর্কে ? তিনি বললেন, তুমিই বলো, কি করতে চাও। এতক্ষণের আলাপের পর আপনিই বলুন আমি কি জবাব দিতে পারি আপনার প্রশ্নের। কিছুক্ষণ থেমে থেকে এস,ডি,পি,ও, বললো, মনে হচ্ছে তুমি শর্তে রাজি হবে না, বন্ড দেবে না। কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই। দুঃখ হয় জীবনটা তোমার জেলেই নষ্ট হবে। কামরুল দৃঢ়তার সাথে জবাব দেয়, জীবনটাই হচ্ছে সংগ্রাম, আর এ সংগ্রামের একটা অংশ কারাগার। কারাগারে জীবন কাটালেই জীবন নষ্ট হয়ে যাবে এ বক্তব্য ভুল- আমরা বিপ্লবীরা তা বিশ্বাস করি না।
এরপরে হ্যাণ্ডশেক ক’রে এস,ডি,পি,ও-র বিদায় নেয়ার সময় কামরুল বললো, আপনি চলে যাওয়ার পরই আপনার দারোগা সাহেব আবার অত্যাচার শুরু করবে। এ কথা শুনে তিনি দারোগাকে ডেকে কামরুলের উপর আর কোনো প্রকার অত্যাচার করতে নিষেধ করলেন এবং পরদিন কোর্টে চালান দিতে বললেন। এরই ফাঁকে সিআই কামরুলের দু’টো ছবি তুলে নিল।
আবার লক্আপে নেয়া হলো কামরুলকে। ক্ষুধা, ব্যথা, দুশ্চিন্তা, শত্রুর প্রতি ঘৃণা ও প্রতিশোধের টানাপোড়েনের ভাবালুতায় কখন ঘুমিয়ে পড়লো টেরও পেল না। পরদিন যখন সিপাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো তখন অনেক বেলা হয়েছে। রুটি, নাস্তা খাইয়ে সকাল আট-নয়টার দিকে ওকে কোর্টে চালান দেয়ার জন্য গাড়িতে তোলা হলো। হাতে হ্যাণ্ডকাফ-রশি, রাইফেল কাঁধে সিপাই। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য চলেছে কামরুল। উৎসুক জনগণ কামরুলকে দেখছে।

১৩/০৫/’৮১


৭১ বছর আগে কেন আর্নেস্ট থালমানকে হত্যা করা হয়েছে

হিটলার ও হিমলারের সরাসরি নির্দেশে আর্নেস্ট থালমানকে ১৮ আগস্ট ১৯৪৪-এ এগার বছরেরে নির্জন কারাবাসের পর হত্যা করা হয়। এর আগে তাকে বুটজেন কাগাগার থেকে ওয়েইমারের কাছে বুচেনওয়াল্ড কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে সরিয়ে আনা হয়, যেখানে তাকে হত্যা করে তার দেহকে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

তাই তার কোন কবর হয়নি।thaelmann1 এই ঘটনাটি এতটাই গোপনে ঘটানো হয়েছে যে নাৎসি সংবাদপত্র “ভয়শের অবজারভার” রিপোর্ট করে যে থালমান ২৪ আগস্ট মিত্র বাহিনীর “সন্ত্রাসী বোমা”য় নিহত হয়েছেন।

নাৎসিরা সত্য প্রকাশে এতটা ভীত ছিল কেন? কেননা আর্নেস্ট থালমান ধারণ করতেন একটা দৃষ্টিভঙ্গী, একটা তৎপরতা, এক সংস্কৃতি আর এক মতাদর্শ। আর্নেস্ট থালমান মানে হচ্ছে জাতীয় সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি, যুদ্ধ থেকে মুক্তি, গণফ্রন্টের মাধ্যমে, আর জনগণতন্ত্রের লক্ষ্যে!

জাতীয় সমাজতন্ত্র সত্যিকার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি করেছিল, জার্মানীর জন্য সঠিক লাইন খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছিল। ফল হল যুদ্ধ, দারিদ্র, ধ্বংস, আর নৈতিক অবক্ষয়, আর এ সবই পুঁজিবাদবিরোধী রোমান্টিকতাবাদের ফসল, যার লক্ষ্য ছিল সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা, “পরজীবী”দের অপসারণ করতেঃ যার আসল অর্থ ছিল “লগ্নি পুঁজির সর্বাধিক সাম্রাজ্যবাদী উপাদানসমূহের সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে জাতিদম্ভী প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব”।

আর্নেস্ট থালমান আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। ১৯২৪ থেকে তিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন, যে পার্টি রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবনেখট কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ব্যাপক জনগণকে সমাবেশিত করার সর্ব প্রকার প্রচেষ্টা চালান, যে জনগণ সমাজ গণতন্ত্র কর্তৃক পঙ্গুত্ব বরণ করেছিল, কারণ জার্মান সমাজ গণতন্ত্রী পার্টি (এসপিডি) না ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে, না সত্যকার ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের পক্ষে।

কমিউনিস্ট পার্টি তার পক্ষে যা করা সম্ভব সবই করে যাতে পুঁজিবাদবিরোধী ও ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম এক গণ আন্দোলনে পরিণত thaelmann2হয়; তাই লাল ফ্রণ্ট যোদ্ধাদের মোর্চাঃ ফ্যাসিবিরোধী একশনও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই লড়াই সমাজ গণতন্ত্রের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নয় বরং এসপিডির আত্মসমর্পণ লাইনের বিরুদ্ধে চালানো হয়। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি যুক্তফ্রন্টের লাইনকে রক্ষা করে, আর স্পেন ও ফ্রান্সে যেমনটা হয়েছে, গণফ্রন্টের লাইনের জন্য এগিয়ে যায়।

নাৎসি ধারার মধ্যেকার যেসকল জনগণ বন্দী হয়েছিলেন তাদেরকেও কখনো ভোলা হয়নি। যেমনট আর্নেস্ট থালমান জানুয়ারি ১৯৩৩-এ ব্যাখ্যা করেনঃ

“কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের ব্যাপক জনগণের প্রতিও লক্ষ্য রাখে।

এসএ ও এসএস বাহিনীর মধ্যে এক ভয়ানক পার্থক্য ছিল, শ্রমিক এলাকায় দাঙ্গা বাঁধানোর মধ্যে, অথবা শ্রমিকদের ঘরবাড়ী ও ক্ষেত্রগুলিতে ঘেরাও আক্রমণ, ব্যাপক জনগণের মধ্যেওঃ সংকটাক্রান্ত শ্রমিক, কর্মচারী, নিম্ন মধ্যবিত্ত, হস্তশিল্পী ও ছোট ব্যবসাদারদের দুর্দশার মধ্যে পার্থক্য ছিল, যারা জাতীয় সমাজতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছে যেহেতু তারা হিটলার, গোয়েবলস ও স্ট্র্যাসার প্রভৃতির গলাবাজির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে।…

আমাদেরকে ধৈর্যশীল শিক্ষিতকরণের মাধ্যমে জনগণকে দেখাতে হবে যে হিটলার পার্টির সত্যিকার ভুমিকা হচ্ছে লগ্নি পুঁজির সেবা করা, ট্রাস্ট রাজ রাজরাদের, বৃহৎ ভুস্বামীদের, কর্মকর্তাদের ও প্রিন্সদের সেবায় কাজ করা।” [কার্ল লিবনেখটের বাড়ির সামনে নাৎসি উস্কানী এবং কিছু শিক্ষা, ২৬ জানুয়ারি ১৯৩৩]

আর এটাও জানা দরকার যে, নভেম্বর ১৯৩২-এর সাধারণ নির্বাচনে নাৎসি পার্টির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। যদিও নাৎসিদেরকে এককোটি দশ লাখ জনগণ ভোট দিয়েছিল, জুলাইয়ের থেকে ২০ লাখ ভোট কম পেয়েছে তারা। নাৎসি আন্দোলন ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করেছিল, তাই, হিটলারকে দ্রুত ক্ষমতায় বসানো হয়েছিলঃ যা কোন ক্ষমতা দখল ছিলনা, বরং ক্ষমতার বদল।

যেমনট আর্নেস্ট থালমান অক্টোবর ১৯৩২-এ নির্বাচনের আগেই উপলব্ধি করেনঃ

“জাতিদম্ভী ঢেউয়ের কারণে ফ্যাসিবাদী গণ আন্দোলনের বিপুল বৃদ্ধি ফ্যাসিবাদী শাসকদের ক্ষমতা দখলে অনুমোদন দেয়।

লগ্নি পুঁজির পলিসি, যা হিটলারের ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন কর্তৃক সরকারী ক্ষমতার অনুশীলনকে বর্জন করে, একদিকে আভ্যন্তরীণ ও বাইরের সংঘাতসমূহের অতিদ্রুত পোক্ত হওয়ার ভীতি থকে উদ্ভূত হয়, অন্যদিকে ফ্যসিবাদী গণ আন্দোলনের মজুদকে thaelmann3যতদূর সম্ভব সুদৃঢ়ভাবে বজায় রাখার বুর্জোয়াদের আকাঙ্খা থেকে, যাতে একই সাথে তাকে “সজ্জিত’ করা যায়, অর্থাৎ তাকে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের নিরাপদ যন্ত্র বানানো যায় বাঁধাদানকারী উপাদানসমূহকে অতিক্রম করে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এ পর্যন্ত অগ্রগমন এখন থমকে দাঁড়িয়েছে আর অবনতির জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে যে কারণে তা হল সর্বহারা শ্রেণীর বাড়ন্ত অগ্রগমন, পাপেন সরকারের রাজনীতির মাধ্যমে দারিদ্রকরণ ও হিটলারের সীমাহীন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় নিপীড়িত মধ্যবিত্তের জাগড়নরত রেডিকেলকরণ এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির ফ্যাসিবিরোধী গণসংগ্রামের প্রচণ্ড অগ্রগতি।

বাঁধাহীন শোষণের সমর্থন হিসেবে হিটলার পার্টির ভুমিকা, পুঁজিবাদী, জাঙ্কার ও জেনারেলদের সরকারের জন্য সাহায্য প্রদানে এর অবস্থান, লাউসান্নে স্বীকৃতি চুক্তি, বিপ্লবী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ফাসিবাদী খুনী সন্ত্রাসের ভুমিকা—এ সবই জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের অনুসারী নিপীড়িত জনগণের হতাশার সূচনা করে…

এনএসডিএপির সারি ভেঙ্গে পড়ার আর জাতীয় সমাজতন্ত্রী ঢেউয়ের অবনতির শুরুর কারণে হিটলারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে thaelmann4মতাদর্শিক আক্রমণাভিযানের বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের অনুসারীদের সারিতে প্রচণ্ড আঘাত হেনে ভাঙন ঘটানো গুরুত্বপূর্ণ করণীয়।

কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শ্রমিকদেরকে সর্বহারা ও জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের নিপীড়িত অনুসারীদের জয় করতে হবে মজুরী ও সহায়তা সংকোচন এবং পাপেন একনায়কত্বের বিরুদ্ধে, আর তাদের বোধগম্য করতে হবে যে হিটলারের পার্টি হচ্ছে লগ্নি পুঁজির সন্ত্রাসী ও প্রতিবন্ধকতা ভাঙার সংগঠন।

জনগণকে জাতিদম্ভী উস্কানী প্রদান, জার্মান বুর্জোয়ার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ পলিসি ও সমরবাদী সশস্ত্রকরণের মোকাবেলায় তাকে ভার্সাই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ বিকশিত করতে হবে ফরাসি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে ফরাসী কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শ্রমিকদের সংগ্রামের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ বজায় রেখে।

জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি পাপেন সরকারের সমরবাদী সশস্ত্রকরণ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ পলিসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, দাবি করে যুদ্ধের শিকার ও বেকার জনগণের জন্য শত শত কোটি টাকা, বুর্জোয়াদের ও সমগ্র প্রতিবিপ্লবের নিরস্ত্রকরণ, সর্বহারা শ্রেণীর নিকট ক্ষমতা ও ক্ষমতার যন্ত্রের পুর্ণ অর্পন এবং জার্মান শ্রমিক জনগণের সামাজিক ও জাতীয় মুক্তির।” [আর্নেস্ট থালমান, জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির thaelmann5সম্মেলন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটির দ্বাদশ প্লেনাম এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য, ১৭ অক্টোবর ১৯৩২]

জাতীয় সমাজতন্ত্র যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে ও ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে পুঁজিবাদের রক্ষাকবচ, আর্নেস্ট থালমান তার জীবন্ত প্রমান। তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে প্রকৃত সমাজতন্ত্রকে নির্দিষ্টভাবে সংগ্রাম করতেই জাতীয় সমাজতন্ত্র সেখানে ছিল।

তার জীবন ছিল জাতীয় সমাজতন্ত্রের এক পালটা প্রতিপাদ্য, আর নাৎসিরা জেনেছিল যে তাদের পরাজয় থালমানের বিজয় ডেকে thaelmann6আনবে। আর্নেস্ট থালমান এক বৈজ্ঞানিক অনুপ্রেরণা হতে পারতেন, তিনি একটা “পথনির্দেশক চিন্তাধারা” জন্ম দিতে পারতেন বাস্তবতার বৈজ্ঞানিক প্রতিফলন হিসেবে; থালমান মানে ছিল এক লাইন যা জার্মান সমাজকে বহু বছরের গণতন্ত্র বিরোধী দুর্দশার পর গণতন্ত্রের দিকে নির্দেশ করে।

উল্লেখ্য যে জুলিয়েন লাহাউটকে বেলজিয়ামে তার বাড়ীর সামনে হত্যা করা হয় ১৮ আগস্ট ১৯৫০ এ। রাজতন্তের বিরুদ্ধে প্রজাতন্তের সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব। তিনি ছিলেন বেলজিয়ামের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৪১ সালে ১০০,০০০ শ্রমিকের এক বিরাট ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন, তারপর নাৎসিরা তাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে 640px-Ernst_Thaelmann_Berlinপাঠায়, সেখানে তার উপর নির্যাতন চালায়, যা তিনি সর্বদাই প্রতিরোধ করেছেন।

জুলিয়েন লাহাউটও বিপ্লবী লাইন, বিপ্লবী প্রেক্ষিত ও নিজ দেশের এক উপলব্ধিকে ধারণ করেছেন। তাই, লাহাউট ও থালমান অমর।

সূত্রঃ http://sarbaharapath.com/?p=1082