পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

1448989607

পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

(ফেব্রুয়ারি/২০০৪)

১৯৯৮ সালের ২ ডিসেম্বর ‘শান্তিচুক্তি’র পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী জনগণের উপর বাঙালী শাসক শ্রেণীর হত্যা-দমন, জ্বালাও-পোড়াও নীতি অব্যাহত রয়েছে।  গত ২৬ আগষ্ট (২০০৩) খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ির ১০টি গ্রামে শাসক শ্রেণী ও সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে বাঙালী সেটলাররা পাহাড়ীদের সাড়ে তিনশত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পদ লুট করে। তাদের আক্রমণে নৃশংসভাবে খুন হয় বিনোদ বিহারী খিসা ও ৮ মাস বয়সী এক শিশু। হামলাকারীরা ৪টি বৌদ্ধ মন্দিরও পুড়িয়ে দেয়, মূর্তি ভেঙে ফেলে ও লুট করে।  ৯/১০ জন নারী এ সময় ধর্ষিতা হন।
‘শান্তিচুক্তি’র আগে ও পরে পাহাড়ী জাতিসত্তার উপর বহু দমন-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।  যার মধ্যে লংগদুর গণহত্যা, লোগাং গণহত্যা, নানিয়ারচর গণহত্যা, পানছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙার গণহত্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  এই হত্যা-দমন-নির্যাতন শুরু হয় ১৯৭১ সালে মুজিববাদীদের দ্বারা।  পরে শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান, এরশাদ এবং পরবর্তী বিএনপি, আওয়ামী লীগ আমলেও তা অব্যাহত থাকে।  বর্তমান খালেদা-নিজামীর সরকারও পাহাড়ীদের উপর নির্মম দমন-নির্যাতন চালাচ্ছে।  মহালছড়ির ঘটনা তারই নগ্ন প্রকাশ।
পাহাড়ী জনগণ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার-এর জন্য বাঙালী শাসক শ্রেণীর এই বর্বতার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সংগ্রাম করে আসছেন।  কিন্তু সঠিক বিপ্লবী লাইন ও নেতৃত্বের অভাবে পাহাড়ী জনগণের শ্রম-ঘাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ভেস্তে যাচ্ছে। ’৭১-এর পর পাহাড়ীদের সংগঠন জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনী এবং তাদের নেতা সন্তু লারমা পাহাড়ী নিপীড়িত জনগণের শত্রুমিত্র, বিপ্লবের স্তর নির্ধারণ করেনি।  শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে ও তাদের আদর্শকে ভিত্তি করে সংগ্রাম পরিচালনা করেনি।  ফলে এই সংগ্রাম শত্রু শ্রেণীর বেড়াজাল ডিঙাতে পারেনি, পারছে না।  ’৭১-এর পর ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ তার স্বার্থে শান্তিবাহিনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে।  পরবর্তীতে শেখ হাসিনার আমলে শাসক শ্রেণী- বিভক্ত কর, শাসন কর, শোষণ কর- এই বুর্জোয়া নীতি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।  শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টি করতে পেরেছে।  এবং বাঙালী সেটলার শ্রমিক-কৃষক ও সেনাবাহিনীকে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে সুযোগ পাচ্ছে।
সন্তু লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতির বিশ্বাসঘাতক ‘শান্তিচুক্তি’কে পাহাড়ী জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।  কিন্তু বিদ্রোহী পাহাড়ী জনগণের সংগঠন ইউপিডিএফও জনসংহতির মতই একই আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।  তারা নিপীড়িত পাহাড়ী জনগণের শত্রুমিত্র সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং পাহাড়ী জাতিসত্তাগুলোর জাতীয় মুক্তির সঠিক পথও প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।  তারা উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের শোষণ-লুণ্ঠন, দমন-নির্যাতনকে বিরোধিতা করলেও পাহাড়ী জাতিসত্তার মুক্তির কোন কর্মসূচি হাজির করতে পারেনি।  তারা শত্রুর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে এবং পাহাড়ী জনগণের মূল শত্রুকে বাদ দিয়ে কার্যত জনসংহতিকেই মূল শত্রু বানিয়ে ফেলছে। ইউপিডিএফ-এর ৫ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জনগণের উদ্দেশ্যে বিবৃতিটিও (২৬ ডিসেম্বর, ’০৩) তাই বলে।  বিবৃতিতে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ-আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্ততন্ত্র সম্পর্কে কোন বক্তব্য নেই।  যারা নাকি নিপীড়িত পাহাড়ী-বাঙালীদের মৌলিক শত্রু।  সুতরাং ইউপিডিএফ’র ভেতর থেকে নতুন করে সন্তু লারমার সৃষ্টি হবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই।  কারণ জনসংহতি ও ইউপিডিএফ’র মধ্যে রাজনীতি-মতাদর্শগত ও কর্মসূচিগত কোন মৌলিক পার্থক্য নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত বাঙালীসহ ১৪টি জাতিসত্তার বাস।  এই ১৪টি জাতিসত্তার যৌথ স্বার্থকে কেন্দ্র করে এবং সমতলে নিপীড়িত বাঙালী জনগণ ও তাদের মৌলিক শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেই এই আন্দোলন এগিয়ে যেতে পারে।  আর সেটা সম্ভব কেবলমাত্র মাওবাদকে গ্রহণ করেই।  তা না হলে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন কেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা রাষ্ট্র হলেও পাহাড়ী ১৪টি জাতিসত্তার শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ জনগণ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নিঃস্ব হওয়া ও দমন-নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবেন না।  যেমন পাননি পাকিস্তান থেকে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে বাংলাদেশের বাঙালী শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ জনগণ।  বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন পাহাড়ী জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে সমর্থন ও বাঙালী শাসক শ্রেণীর শোষণ-দমন-নির্যাতন এবং পাহাড়ে বাঙালীদের পুনর্বাসনকে বিরোধিতার পাশাপাশি পাহাড়ী জনগণের মুক্তির দিশাকে প্রতিনিয়ত তুলে ধরছে। পাহাড়ী জনগণের সংগ্রামকে এগিয়ে যেতে হবে সেই বিপ্লবী দিশাকে ভিত্তি করে।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা