লাশ নিয়ে জাতিবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক চক্রান্ত রুখে দাঁড়াও

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

লাশ নিয়ে জাতিবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক চক্রান্ত রুখে দাঁড়াও

(ডিসেম্বর/’৯১)

উত্তরবঙ্গে যখন না খেয়ে মরা মানুষের মৃত্যুর খবর সরকার গোপন করে চলছিল, তখনই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ছয়জন নির্যাতিত বাঙালীর লাশ এল ঢাকার প্রেস ক্লাবের সম্মুখে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী- এই ছয়জন শান্তিবাহিনীর হাতে নিহত।  প্রেস ক্লাবে এই ‘ছয় লাশ’ নিয়ে বাঙালী দালাল বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি-নেতা-আইনজীবী- এরা বক্তব্য রাখলো।  পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী জনগণের বিরুদ্ধে বাঙালী উগ্র জাতীয়তাবাদ উসকানোর অপচেষ্টা চলল। চলল ইসলামী মৌলবাদের সুরসুরি দেবার পাঁয়তারা। এসবের মধ্য দিয়ে ঢাকা পড়লো, এ মৃত্যুর জন্য আসলে দায়ী কারা?
পার্বত্য চট্টগ্রাম সূত্রে জানা যায়- যারা মারা গিয়েছেন, তারা সেই সব হতভাগ্য বাঙালীদেরই অংশ যাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যায়ভাবে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল।  এভাবে এসব গরিব বাঙালী জনগণকে একদিকে সমতল ভূমি থেকে সর্বস্বান্ত করে উচ্ছেদ করা হয়েছে।  অন্যদিকে তাদেরকে ঠেলে দেয়া হয়েছে পাহাড়ী জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের তোপের মুখে।  এরা হয়েছে পাহাড়ী জনগণের উপর নির্যাতনকারী বাঙালী দালাল বুর্জোয়া ও আমলাদের বলির পাঁঠা। আর তাই, এদের মৃত্যুর জন্য মূলত দায়ী পাহাড়ী জনতা নয়, দায়ী এই সরকার, তার আর্মী, সামরিক-বেসামরিক আমলা ও ধনী- যারা এদেরকে সমতলভূমি থেকে উচ্ছেদ করে পাহাড়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই ছয়জন নির্যাতিত বাঙালী, জীবিতকালে যাদের তাড়া করে ফিরেছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অচিকিৎসা, হতাশা- বেঁচে থেকে যারা কখনই বিনামূল্যে পাবলিক বাসে পর্যন্ত উঠতে পারেনি, প্রাইভেটকার তো দূরের কথা, আজ তাদের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তারাই তাদের লাশ আনছে বিশেষ ট্রেনে, হেলিকপ্টারে। এটা তাদেরকে নিয়ে এক নির্মম তামাশা! মরেও তারা দালাল বুর্জোয়াদের এ রাষ্ট্রের কূটচাল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
এটা ঠিক যে, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারাও পাহাড়ী জনগণকে তাদের বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করছে। পাহাড়ীদের মধ্যকার উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের একাংশ এই ভারতীয় চক্রান্তে সামিল হয়েছে। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার জাতীয় মুক্তিকে বিপথগামী করছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত চালাচ্ছে এবং এরই পরিণতি হিসেবে পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার নির্যাতকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেন্দ্রীভূত না করে হত্যা করা হচ্ছে পুনর্বাসিত বাঙালী গরিব জনগণকেও- যারা বিপরীত পক্ষে বাংলাদেশী সরকারের চক্রান্তে তাদের বলির পাঁঠা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের এ চক্রান্তকে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে পাহাড়ী জনগণের জাতীয় মুক্তি, তাদের উপর বাঙালী নিপীড়ক বুর্জোয়া আর্মীর নির্যাতন উৎখাত করা।
আজ তাই, পাহাড় থেকে সমস্ত পুনর্বাসিত বাঙালীদের ফেরত এনে, তাদের সমতল ভূমিতে পুনর্বাসিত করাই এ সমস্যার সমাধান। একই সাথে বাঙালী নির্যাতক আর্মীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরিয়ে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিসত্তা-সমূহকে সম্পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দিতে হবে।

প্রতিক্রিয়াশীল জাতিবিদ্বেষী পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী ছাত্র গণপরিষদ- নিপাত যাক!
জাতিবিদ্বেষী বাংলাদেশী সরকার- ধ্বংস হোক!
পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার- জিন্দাবাদ!

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

 

Advertisements

পার্বত্য চট্টগ্রামের লোগাংয়ে খালেদার গণহত্যা

1491615_252290818287665_2012887018412247240_n

পার্বত্য চট্টগ্রামের লোগাংয়ে খালেদার গণহত্যা

(মে/’৯২)

খাগড়াছড়ির লোগাং গুচ্ছগ্রামে গত ১০ এপ্রিল ’৯২ অন্যায়ভাবে বসতিস্থাপনকারী কিছু বাঙালী, কিছু আনসার ও ভি.ডি.পি. এবং রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর যৌথ অপারেশনে এক ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত হলো পাহাড়ী জনতার উপর। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও সে সময়ে পাহাড়ী জনগণের বাৎসরিক উৎসবে আমন্ত্রিত কিছু বাঙালী বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতাদের সূত্রে জানা গেছে বারশ’রও বেশি পাহাড়ী জনতাকে হত্যা করা হয়েছে।  সমস্ত গ্রামটিকে ঘিরে পাহাড়ী জনতার উপর সেনাবাহিনী করেছে ব্রাশ ফায়ার, হাজার হাজার ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে, পাহাড়ী শিশুদের সেই আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।  অনুপ্রবেশকারী বাঙালী, যাদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে বাঙালী সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনকারী ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনী, তারাও পাহাড়ী জনতার উপর রাম দা, কুড়াল, খন্তা, বর্শা প্রভৃতি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে।
এভাবে সংঘটিত গণহত্যা বাঙালী জাতীয় দৈনিকগুলো কেবল চেপেই গেছে তা-ই নয়, ১১ এপ্রিল প্রচার করেছে, শান্তিবাহিনীর আক্রমণে ১০ জন পাহাড়ী ও ১জন বাঙালী নিহত হয়েছে।  এই চরম বেহায়াপনা বুর্জোয়া পত্রিকাগুলোর গণবিরোধিতাই প্রমাণ করেছে।  পানছড়ি থেকে ফিরে এসে বামমনা বুদ্ধিজীবী বিপ্লব রহমান ও প্রিসিলা রাজ ‘প্রিয় প্রজন্ম’ পত্রিকায় একজন প্রত্যক্ষদর্শীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, বৈশিষ্টমুনি ………. গ্রামে ফিরে দেখতে পান ১৮টি লাশ পোড়ানো হচ্ছে।  ৫০০ ঘরের মধ্যে অধিকাংশ ঘরেই অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ……… স্থানীয় সূর্যতরুণ উদয় ক্লাবে আরো ১৪৭টি লাশ সরকারী হেফাজতে রাখা হয়েছে।  ‘বৈশিষ্টমুনি তার স্ত্রীর লাশ ফেরৎ চেয়েও পাননি।’ শত শত লাশ ট্রাকে করে আর্মীরা সরিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।  উপেন চাকমা (১৭)-এর ৯ সদস্যের পরিবারে ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে।  আহতদের চিকিৎসায় এলাকায় যাওয়া বাঙালী ডাঃ জামাল উদ্দিনের ভাষ্যমতে, তিনি ৩০০ শত লাশ গুণতে পেরেছিলেন, তারপর তাকে আর গুণতে দেয়া হয়নি।
এভাবে একের পর এক গণহত্যা চলছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।  মুজিব-জিয়া-এরশাদ আমলের মতই ‘গণতান্ত্রিক’ খালেদা সরকারও এ ধরনের বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়ে আসছে, যার অনেকগুলোই হয়েছে গোপনে, আমরা জানতেও পারিনি। এই ফ্যাসিবাদী হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে পাহাড়ী জনতা তাদের এবারের বাৎসরিক উৎসব (বৈ-সা-বি) বর্জন করেছে।  আঃ লীগ, ৫ দল- এরা কেউই এ বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার নয়, গোলাম আজমের প্রতিবাদী বিচারের আয়োজন করল যারা- তারা এ প্রশ্নে ‘গণআদালত’ ডাকবার কথা বলছে না, বলবে না। কারণ একটাই, এ প্রশ্নে, সরাসরি কাঠগড়ায় উঠতে হয় খুনী লুণ্ঠনকারী দেশের সকল জাতি জনতার প্রধান শত্রু পুরা আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী, তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ও বাহিনীকে।  তাই এ দেশে যে বুর্জোয়ারা ’৭১-এর চেতনা-মানবতা ইত্যাদির জিগির তোলে এরা সবাই আসলে উপরোক্ত উপাদানেরই দালাল- এরাও পাক-ফ্যাসিস্ট ও গোলাম আযমদের মতই সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদেরই দালাল নব্য রাজাকার, খুনী, নারী ধর্ষণকারী। তাই বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-জনতার কর্তব্য তাদেরও শত্রু বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী ও তাদের সরকারের পাহাড়ী জনতার উপর জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সামিল হওয়া। এই বীভৎস হত্যাকাণ্ড সংঘটনকারী খালেদা সরকার, সেনাবাহিনীসহ পুরা রাষ্ট্রযন্ত্র খুনী, লুণ্ঠনকারী ও সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল।

এদের উৎখাতের জন্য পাহাড়ী বাঙালী জনতা সোচ্চার হোন।

পাহাড়ী জনতার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সমর্থন করুন!
লোগাং হত্যাকারীদের উৎখাতে এগিয়ে আসুন!
হানাদার বাঙালী সেনাবাহিনী- পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে হাত গুটাও!
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী পুনর্বাসন বন্ধ কর-
পুনর্বাসিতদের সমতলে ফেরত আনো!

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


রাঙামাটিতে আবার জ্বালাও-পোড়াও নিশ্চিহ্নকরণ বর্বর নীতির বাস্তবায়ন চলছে

36_4

রাঙামাটিতে আবার জ্বালাও-পোড়াও নিশ্চিহ্নকরণ বর্বর নীতির বাস্তবায়ন চলছে

(জুলাই/’৯২)

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ বনভূমি কেন জ্বলছে? কেন পার্বত্য চট্টগ্রামকে ২০ বছর যাবত সেনাবাহিনীর বুটের তলায় রাখা হয়েছে? সেনাবাহিনীকে কেন হানাদারের ভূমিকায় সেখানে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে?
সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন একটি বধ্যভূমি।  এই বধ্যভূমির জল্লাদ কারা? যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা-জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে যাবার পরও সংসদের আসনে বসে ‘দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে’ বলে গালগল্প মারছে এবং এই তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’কে রক্ষার জন্য চিৎকার করছে তারা সবাই পার্বত্য চট্টগ্রামের গণহত্যার অপরাধে অপরাধী। এরা হচ্ছে খালেদার সরকার, সেনাবাহিনী ও বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীটি।
১০ এপ্রিল লোগাং গণহত্যা (১২ শত নিরস্ত্র পাহাড়ীকে এখানে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়) ও জ্বালাও-পোড়াও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্র ৪০ দিনের মাথায় ২০ মে রাঙামাটিতে আবার ২ শত বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহু লোককে জখম করা হয়েছে, পাহাড়ী মা-বোনদের কাপড় খুলে নিয়ে বাঙালীত্ব ফলিয়ে বর্বর উল্লাস করা হয়েছে। এসব মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত দেখানোর জন্য উল্টো পাহাড়ী জনগণকেই দায়ী করে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বিচার দাবি, শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়েছে।  রাঙামাটি, লোগাং-এর ফ্যাসিস্ট বর্বরতার মতো আরো কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। মাত্র অল্প কিছুদিন আগেই কাউখালী উপজেলার ছোটডলু পাড়ায় একইভাবে ৩৬টি বাড়ি, ১টি বৌদ্ধ মন্দির জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, ৭ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গুরুতর আহত একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে সেনাবাহিনী চিকিৎসার কথা বলে নিয়ে গিয়ে নিখোঁজ করেছে।  ’৯২-এর ২৩ মে পানছড়িতে ২৩টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।  এর পূর্বে ’৮০ সালে কাউখালিতে আরো বড় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল।  বাঙ্গিপাড়া, কচুখালি, বেতছড়ি, কাচখালি, শামুকিয়া, হারাঙ্গীপাড়াসহ ১৬/১৭টি গ্রামে ৪ হাজার বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।  এবং ১৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।  এই জ্বালাও-পোড়াও-এর সাথে সমানতালে চলছে গণধর্ষণ।  কিশোরী-যুবতীরা হচ্ছে ওখানে এখন হরিলুটের বস্তু। ধর্ষণের পরও রেহাই নেই তাদের। ধর্ষিত হওয়ার পর নিয়মিত সেনাক্যাম্পে হাজিরা দিতে হচ্ছে। [বিস্তারিত তথ্যের জন্য ‘রাডার’ পত্রিকা দেখুন। ]
এমন মধ্যযুগীয় বর্বতার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে উল্লেখ করার মতো।  এক কথায় পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যা-ধর্ষণ জ্বালাও-পোড়াও এখন প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।  যে কোন অজুহাতে তা ঘটছে।  রাঙামাটির ২ শত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার জন্য এই বাঙালী ফ্যাসিস্টদের একটি মাত্র অুজহাত খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্য ছিল।

একটি ছুতোয় নিষিদ্ধ করে দেওয়া 

খালেদার সরকার একটি ষড়যন্ত্র কার্যকরী করতে গিয়ে রাঙামাটিতে এই বর্বরতা চালিয়েছে।  পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন তথ্যেই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি প্রকাশিত হয়।  পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নামক সংগঠনটি পাহাড়ী ছাত্রদের একটি সংগঠন। এই সংগঠনটি পাহাড়ী জনগণের জাতীয় সংগ্রামের পক্ষে সংগ্রামরত।  তাদের উপর উগ্র বাঙালী জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠনটি প্রচার-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।  ২০ মে রাঙামাটিতে সংগঠনটির ৩য় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান ছিল। এই অনুষ্ঠানে আক্রমণের প্রক্রিয়াতেই ২ শত বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার পূর্ব থেকেই এই সংগঠনটিকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছিল এবং এজন্য বিভিন্ন অজুহাতও খুঁজছিল। এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই ২০ মে ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে টার্গেট করা হয়েছিল।  ২০ মে জ্বালাও-পোড়াওকারীদের দ্বারা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদকে নিষিদ্ধ করার দাবি উত্থাপনেও এই ষড়যন্ত্রটি আরো স্পষ্ট হয়েছে।

কারা নেতৃত্ব দিয়েছে?
২০ মে রাঙামাটিতে জ্বালাও-পোড়াও ধ্বংসযজ্ঞে কারা নেতৃত্ব দিয়েছে তা আর গোপন থাকেনি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নাম-পরিচয়সহ প্রকাশিত হয়েছে।
সেনাবাহিনীর কর্তা ব্যক্তিরা, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামাত-শিবির যৌথভাবে এতে নেতৃত্বদান করেছে। এদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন (সিপিবি), ইত্তেফাক পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি, দৈনিক গিরিদর্পণের মালিকসহ স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ও রাঙামাটি প্রশাসন।  স্থানীয় বিএনপি সভাপতি নাজিম উদ্দিনের বাসাতেই ঐ বর্বরতার নীল নক্সা তৈরি হয়।  ১৭, ১৮ ও ১৯ মে তারিখে উল্লিখিত দল ও ব্যক্তি প্রতিনিধিদের যৌথ মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হয় ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানকে বানচাল ও আক্রমণ করার। এই আক্রমণ পরিচালনার জন্য এই দলগুলোর নেতৃত্বে তথাকথিত সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যও গঠন করা হয়েছিল। এরাই পরে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ছাত্র পরিষদকে নিষিদ্ধ করার দাবি পেশ করেছে।  আক্রমণ পরিচালনার জন্য পূর্ব থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাড়া করা মাস্তান-দাঙ্গাবাজদের লঞ্চ ভর্তি করে বিএনপি নেতার বাড়িতে সমাবেশিত করা হয়েছিল। সেখানে তাদের গরু জবাই করে ভূরিভোজও দেওয়া হয়েছিল।  শুধু কি তাই, জ্বালাও-পোড়াও অভিযানটি পরিচালনার জন্য মাইকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।  এবং আক্রমণের সময় ও পরে মাইকে সাম্প্রদায়িক উসকানী দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও-এ অংশ নিতে আহ্বান করা হয়েছে- ‘বাঙালীদের যার যা আছে তাই নিয়ে আক্রমণ কর, যে তা করবে না সে পাহাড়ীদের রাজাকার হবে, ইত্যাদি।  এভাবেই সুপরিকল্পিতভাবে বিএনপি, আঃ লীগ, জামাত, সামরিক অফিসার, বাঙালী বড় ব্যবসায়ী, মহাজন ও বাঙালী শোষকদের নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন ‘বাংলাদেশী’ বা বাঙালী জাতীয়তাবাদের নামে পাহাড়ীদের উপর জাতিগত নিপীড়নকে নিষ্ঠুর কায়দায় কার্যকর করছে।  এবং এজন্য গরিব সাধারণ বাঙালীদেরকেও বিভ্রান্ত করে সাধারণ পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। যে কারণে সাধারণ গরিব বাঙালীরাও অনেক ক্ষেত্রে হত্যা-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

জাতিগতভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা ও নিশ্চিহ্ন করাই চূড়ান্ত লক্ষ্য
পাকিস্তানী বড় বুর্জোয়া শ্রেণী যেমন বাঙালীদের উপর জাতিগত নিপীড়ন চালিয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় ’৭২ সাল থেকে বাঙালী বড় বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী ক্ষুদ্র পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর উপর জাতিগত শোষণ-নিপীড়ন চালিয়ে আসছে।  যা আজ গণহত্যা-জ্বালাও-পোড়াও-এর সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই নিপীড়ন পরোক্ষ/অঘোষিত সামরিক শাসনরূপে চলছে। পাহাড়ীদের উচ্ছেদ করে বাঙালী পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় এখন পাহাড়ীরা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন।  ২০ বছর যাবত এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে।  আগামী ৫/১০ বছরের মধ্যে পাহাড়ী জনগণের আর জাতিগত অস্তিত্ব হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।  তারা জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারেন।  শাসক শ্রেণী বিগত ২০ বছর যাবত হত্যা করে, উচ্ছেদ করে, বিপরীতে বাঙালী পুনর্বাসন করে পাহাড়ীদের জাতিগতভাবে বিলুপ্তিকরণ করার এই প্রতিক্রিয়াশীল নীতিকেই বাস্তবায়ন করে চলছে। ইতিমধ্যেই বর্বর নীতির পরিণামে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ীরা মোট জনসংখ্যার ৪৯% ভাগে নেমে এসেছে। কাজেই পাহাড়ী জনগণের আজকের সমস্যা হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষার জীবন-মরণ সমস্যা। নিশ্চয়ই তারা নিজেদের এভাবে অস্তিত্বহীন হয়ে যেতে দিবেন না।  শেষ বিন্দু রক্ত দিয়েও তা প্রতিরোধের চেষ্টা তারা করবেনই।  এজন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি চরম রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও হানাহানি বেধে ওঠে (যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে) এবং ১২ শত পাহাড়ীকে হত্যার প্রতিশোধে ১২ শত বাঙালী পুনর্বাসনকারীকে হত্যা করা হয়, তাহলে তার জন্য এই ফ্যাসিস্ট বাঙালী শাসক শ্রেণীই সম্পূর্ণ দায়ী হবে এবং সেদিকেই আজ পাহাড়ী জনগণকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে এই নিপীড়িত পাহাড়ীদের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে হানাদার ফ্যাসিস্ট নির্যাতনকারী বাঙালী সেনাবহিনীকে আক্রমণ করার ও নিশ্চিহ্ন করার।

‘বাম’দের লোক দেখানো ভূমিকা ও ফাঁকা কথা
এই বড় বুর্জোয়াদের লেজ ধরে আমাদের দেশের ৫ দল ও বাম সংসদীয় নেতা রাশেদ খান মেনন, সুরঞ্জিত সেন গুপ্তরা লোগাং-এর গণহত্যার পর পাহাড়ীদের দরদে একটুখানি নিন্দা জানিয়ে কেমন তামাশাটাই না করলেন। এত বড় গণহত্যার পরও তারা সামান্য নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ ছাড়া খালেদার ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আর কিছু খুঁজে পাননি।  এই বাম নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা জাতিগত নিপীড়নের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে রাজনৈতিক সমাধানের ফাঁকা কথা বলছেন।  খালেদাও তাই বলছে।  খালেদার রাজনৈতিক সমাধানের কথা যে সম্পূর্ণই ভাঁওতা তা খুবই পরিষ্কার।
এই মুহূর্তের জ্বলন্ত সমস্যা হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, বাঙালী পুনর্বাসন বন্ধ, পুনর্বাসিতদের ফেরত আনা; গণহত্যা, জ্বালাও-পোড়াও-এর জন্য দায়ী চিহ্নিত সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবিগুলোকে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে পাহাড়ী জনগণের পক্ষে দেশব্যাপী জনগণকে সচেতন করা ও আন্দোলন গড়ে তোলার কথা কেন তারা বলছেন না? বলছেন না এই কারণেই যে, এই নিপীড়ক ফ্যাসিস্ট বাঙালী দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীটির শোষণ-নির্যাতনের ভাগ তারাও কিছুটা পাচ্ছেন।  তারাও এই শ্রেণীর সংসদ, ক্ষমতা, নির্বাচন ও শাসনকে ‘গণতন্ত্র’ আখ্যা দিয়েছেন।  তারা কীভাবে বলবেন পার্বত্য চট্টগ্রামে কার্যত সামরিক শাসন চলছে; গণহত্যা-গণনিপীড়ন চলছে এবং এটা গণতন্ত্র নয়? তারা কীভাবে বলবেন যে, এটা স্বৈরতন্ত্র, এটা গণবিরোধী, সর্বোপরি তারা কীভাবে বলবেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত পাহাড়ী জাতিসত্তার অধিকার রয়েছে স্বাধীনতার দাবি করার এবং বাঙালী সেনাবাহিনীই ওখানকার অশান্তির মূল কারণ? সুতরাং নিপীড়িত পাহাড়ী জনগণকে সরকারের সাথে সাথে আঃ লীগ, জামাত, জাতীয় পার্টিকেও শত্রু চিহ্নিত করতে হবে এবং সংশোধনবাদী ‘বাম’দের উপরও ভরসা ত্যাগ করতে হবে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বাঙালী শ্রমিক-কৃষকের সাথে যারা শাসক দালাল বুর্জোয়াদের দ্বারা চরমভাবে শোষিত এবং যারা নিশ্চয়ই এই ফ্যাসিস্ট শাসক শ্রেণীকে উৎখাতের জন্য বিপ্লবী সংগ্রাম চালাবে।  তাহলেই পাহাড়ী জনগণ মুক্তির পথে এগোতে সক্ষম হবেন।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


শান্তিবাহিনীর শান্তি আলোচনার প্রস্তাব বনাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার মুক্তির পথ

320910_516952118336295_1550975590_n

শান্তিবাহিনীর শান্তি আলোচনার প্রস্তাব বনাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার মুক্তির পথ

(সেপ্টেম্বর/’৯২)

শান্তি বাহিনীর নেতৃত্ব সম্প্রতি অস্ত্র বিরতির এক ঘোষণা দিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব রেখেছে। অর্থাৎ তারা আশা করছে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিসমূহের সমস্যার সামাধান হতে পারে।
কিন্তু তারা যে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে সেই পক্ষের তরফ থেকে পরিস্থিতিটা কি রকম? বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে শান্তিবাহিনীকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও অধীনতাকে মানতে হবে।  সাম্রাজ্যবাদের দালাল বাঙালী দালাল বুর্জোয়াদের এই ফ্যাসিস্ট সরকার এখনো হাজার হাজার সৈন্যকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের বিরুদ্ধে মোতায়েন করে রেখেছে।  পার্বত্য জনগণ অব্যাহতভাবে এই ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনীর হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-জ্বালাও-পোড়াও-উচ্ছেদ অভিযানের শিকার।  পার্বত্য ভূমিতে বাঙালীদের পুনর্বাসন এখনো বন্ধ হয়নি। এই সেদিনও লোগাং-হত্যাযজ্ঞের মতো এক বর্বর হত্যাযজ্ঞ ঘটানো হয়েছে।  রাঙামাটিতে পার্বত্য জনগণের উপর চলেছে বর্বর লুটতরাজ, নির্যাতন ও হত্যা।  বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সরকার যে বন্দুক ও বেয়নেটের নিচে পার্বত্য জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করে রাখতে চায় তার প্রমাণ, হিল লিটারেচার ফোরাম প্রচারিত ‘রাডার’ পত্রিকা নিষিদ্ধ করা। ‘রাডার’ মাত্র দুই/তিন সংখ্যা প্রকাশ হয়েছিল এবং তাতে পার্বত্য জাতিসমূহের বিরুদ্ধে বাঙালী শাসক শ্রেণী ও তাদের ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনীর নিমর্মতার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র প্রকাশ লাভ করেছিল।  কিন্তু শাসক চক্রের এতটুকুও সহ্য হয়নি।  তারা সেটাও নিষিদ্ধ করে দেয়।
এই অবস্থায় শান্তিবাহিনী নেতৃত্বের আলোচনা-প্রস্তাব পার্বত্য জনগণকে কিছু দিতে পারবে কি? ইতিহাসে এ ধরনের আত্মসমর্পণমূলক আলোচনার দৃষ্টান্ত বিরল নয়।  ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে বাঙালী জনগণকে পাকিস্তানী শাসক চক্রের বন্দুক ও কামানের মুখে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে রেখে ক্ষমতার জন্য শেখ মুজিব ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু এর ফলেই পাক-শাসক শ্রেণীর বর্বর বাহিনী ২৫ মার্চ অপ্রস্তুত জনগণের ওপর নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ও লক্ষ লক্ষ জনগণকে হত্যা করেছিল এবং শেখ মুজিব আত্মসমর্পণ করেছিল পাক-বাহিনীর হাতে।  সুতরাং শান্তিবাহিনীর প্রস্তাবিত আলোচনা যে পার্বত্য জনগণকে আরও নির্মম দুঃখজনক পরিণতি ছাড়া অন্য কিছু দিবে না তা স্পষ্ট।  কারণ এই আলোচনার অর্থই হচ্ছে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর দাসত্বের শর্তকে মেনে নিয়ে আলোচনা।
কেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জাতিসমূহের জনগণ সংগ্রাম করছেন? অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছেন, সম্ভ্রম ও ইজ্জত হারাচ্ছেন? তারা সংগ্রাম করছেন সাম্রাজ্যবাদের দালাল বাঙালী বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর জাতীয় নিপীড়ন, পরাধীনতা, দাসত্ব, লুণ্ঠন ও বর্বরতা থেকে মুক্তি অর্জনের জন্য তথা জাতীয় মুক্তি অর্জনের জন্য। এটাই পার্বত্য জাতিসমূহের জনগণের অন্তর্নিহিত আকাংখা।  এবং এটা আজ পরিষ্কার যে, একমাত্র বৈপ্লবিক সংগ্রামের মাধ্যমে এই আকাংখার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে।  এই সংগ্রামের পথে কোন সময় যে আলোচনা হতেই পারে না, এমন নয়।  কিন্তু সেই আলোচনা হতে পারে একমাত্র পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার জাতীয় মুক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য। অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়।  এ কারণেই আজকের বাস্তবতায় আলোচনার ন্যূনতম কিছু পূর্বশর্ত হতে পারে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনীসহ সব বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, সেখানে বাঙালী পুনর্বাসন সম্পূর্ণ বন্ধ, সব ধরনের নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞ সম্পূর্ণ বন্ধ, জমির অধিগ্রহণ পরিপূর্ণ বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দান ইত্যাদি। আলোচনায় বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও অধীনতা স্বীকার করা ইত্যাদি কোন পূর্বশর্ত চলবে না।  এসব ছাড়া যে কোন আলোচনা পাহাড়ী জনগণের জাতীয় মুক্তি অর্জনের আকাংখার বিপরীতে যেতে বাধ্য।
প্রকৃতপক্ষে শান্তিবাহিনীর অস্ত্র বিরতি ও আলোচনা সমগ্র কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত।  শান্তিবাহিনী প্রথম থেকে তাদের সংগ্রামের জন্য পাহাড়ী জনগণের উপর নির্ভর করছে না, বরং নির্ভর করছে ভারতীয় শাসক শ্রেণীর উপর, যে শাসক শ্রেণী খোদ ভারতে নাগা, মিজো, অসমী, পাঞ্জাবী, গুর্খা, কাশ্মিরীসহ অসংখ্য জাতিসমূহকে পরাধীন করে রেখেছে এবং বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন চালাচ্ছে।  এভাবে শান্তিবাহিনীর সংগ্রাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার জাতীয় মুক্তি অর্জনের বিপরীতে ভারতীয় শাসক চক্রের চক্রান্ত ও অপতৎপরতাকে সহায়তা করছে। তারা আমেরিকাসহ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাতের সঠিক বক্তব্যও আনছে না। পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ পাহাড়ী জনগণ ও জাতিসত্তাসমূহের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি সামগ্রিক কর্মসূচি তাদের নেই। এভাবে শান্তিবাহিনী একটি সঠিক বিপ্লবী রাজনীতিকে ধারণ করছে না। তাদের এই ভ্রান্ত রাজনীতি তাদেরকে সংগ্রাম পরিত্যাগকারী আপোষ-আলোচনার ভ্রান্ত পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সুতরাং এই ধরনের আপোষ-আলোচনাকে অবশ্যই বিরোধিতা করতে হবে।  এবং জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রামের আপোষহীন পতাকাকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।  এই সংগ্রাম একদিকে প্রধানভাবে যেমন জাতীয় নিপীড়ক বাঙালী দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর দাসত্বের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে চালিত হবে, তেমনি তাকে হতে হবে আমেরিকাসহ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বিরোধী। এই সংগ্রামে থাকতে হবে পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ সকল জনগণ ও পাহাড়ী সকল জাতির জাতীয় মুক্তি অর্জনের একটি যথার্থ বিপ্লবী কর্মসূচি।  এই সংগ্রামে একদিকে যেমন পাহাড়ী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নিজেদের শক্তির উপর নির্ভর করতে হবে, তেমনি বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের বিপ্লবী মুক্তি সংগ্রামও এতে নেতৃত্ব-প্রদানকারী বিপ্লবী শক্তি, যারা সত্যিকারভাবে পাহাড়ী জনগণের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তথা বিচ্ছিন্নতার অধিকারকে সমর্থন করে, তার সাথেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটাই হচ্ছে পাহাড়ী জাতিসমূহের জনগণের মুক্তির সঠিক পন্থা। আজ এ পথেই এগোতে হবে।

রাডার পত্রিকা প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ
পাহাড়ী জনগণের উপর উগ্র বাঙালী জাতিগত নিপীড়নের বিরোধিতাকারী হিল লিটারেচার ফোরামের অনিয়মিত পত্রিকা ‘রাডার’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে স্বৈরাচারী খালেদা সরকার। এটা বাঙালী দালাল-আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শ্রেণীর বর্তমান প্রতিভু খালেদা সরকারের পাহাড়ে হত্যা-সন্ত্রাস-জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে পাহাড়ী জাতিসত্তা- গুলোকে নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্তের অংশ।  একই সাথে স্বৈরাচারী এরশাদের মতোই একই কায়দায় ‘রাডার’ পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে খালেদা সরকার প্রমাণ করলো- তার গণতন্ত্রের ভুয়া বেলুন ফুটো হয়ে গেছে এবং সম্পূর্ণভাবে সে এরশাদের মতোই স্বৈরাচারী।
আমরা এই স্বৈরাচারী অন্যায় ঘোষণাকে প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতে পাহাড়ী-বাঙালী নির্বিশেষে সকল গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিকে আহ্বান জানাচ্ছি।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


পাহাড়ী জনগণ তাক করা বন্দুকের নলের মুখেই রয়ে গেছেন

Tribel-Women-Pic3

পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত শান্তি আলোচনা
পাহাড়ী জনগণ তাক করা বন্দুকের নলের মুখেই রয়ে গেছেন

(ফেব্রুয়ারি/’৯৩)

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী জনগণ বিশ বছর যাবত রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীর বুটের তলায় রয়েছেন।  পাহাড়ী জনগণের খাওয়া-পরা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন-যাপনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সামরিক কর্মকর্তাদের অনুমতিপত্র ছাড়া চলে না।  হাট-বাজার, কৃষি কাজের জন্য লাঙ্গল নিয়ে মঠে যাওয়া, স্কুল-কলেজে লেখাপড়ার জন্য ভর্তি হতে যাওয়া, আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া- যে কোন ক্ষেত্রেই এই অনুমতি অবশ্য অবশ্যই লাগবে।  নচেৎ জেল বা মারপিট খেয়ে ‘দুষ্কৃতকারী’ হতে হয়।  এই হচ্ছে গত বিশ বছর যাবৎ পাহাড়ী জনগণের জীবন ব্যবস্থা। সেখানে এই জনগণ প্রতি পদে পদে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী শাসনে পদদলিত।  এই রাষ্ট্রীয় সামরিক সন্ত্রাসী শাসনের আওতায়ই খালেদার সরকার এখন নতুন করে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলছে।  এই জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন করে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘শান্তিবাহিনী’র সাথে।  দু’দফা আলোচনা ইতিমধ্যে হয়েছেও। এই আলোচনা নাকি ওখানকার জনগণের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।  এ ব্যাপারে উভয় পক্ষ থেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রচার চালানোও হচ্ছে।  কথিত এই ‘শান্তি’ আলোচনা পাহাড়ী জনগণের জীবনে কেমন ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করবে তা সহজেই বলে দেওয়া যায়, শুধুমাত্র একটি বাস্তবতাকেই বিচার করে। আলোচনায় দুই পক্ষই পাহাড়ী জনগণের জীবনকে সামরিক শাসকের অনুমোদনপত্রের শৃঙ্খলে রেখেই আলোচনা চালাচ্ছে।  এটা হচ্ছে পাহাড়ী জাতি ও জনগণকে বন্দুকের নলের মুখে রেখে আলোচনা চালানো।  কীভাবে এই আলোচনা সৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হতে পারে?
পাহাড়ী জনগণের বুকে বন্দুকের নল তাক করে রেখে সরকারী পক্ষের এই আলোচনা তার বর্বর ফ্যাসিস্ট নিপীড়ক চরিত্রই পুনরায় প্রমাণ করছে।  অন্যদিকে শান্তিবাহিনীর নেতারা নির্লজ্জ আপোস ও জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার পথই অনুসরণ করছে।  এ আলোচনা যখন থেকে শুরু হয়েছে তারপর কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছে।  উভয় পক্ষের কিছু কিছু কূটনৈতিক কথাবার্তা ও ফাঁকা ‘আশাবাদ’ ছাড়া জনগণ কিছুই পায়নি।  অথচ এ ক’মাসেই আলোচনা চলাকালীনও এই জাতীয় নিপীড়ক সরকার রাডার, জুম্মকণ্ঠ ও স্যাটেলাইট নামে তিনটি পত্রিকা পরপর নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ পত্রিকাগুলো পাহাড়ী জনগণের উপর সেনাবাহিনী ও বাঙালী অত্যাচারীদের বর্বর নির্যাতনের অল্প কিছু সত্য চিত্র তুলে ধরেছিল মাত্র। এ সময়ই লোগাং গণহত্যার তথাকথিত তদন্ত রিপোর্ট এই ফ্যাসিস্ট সরকার প্রকাশ করে।  এতেও নিপীড়নকে আড়াল করা হয়েছে।  সুতরাং পাহাড়ী জনগণ কীভাবে এই সরকার ও শাসক শ্রেণীর সাথে এমন একটি আলোচনায় নিজেদের অধিকার পাবে আশা করতে পারেন?
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের যে কোন উদ্যোগের প্রাথমিক পূর্বশর্ত হতে পারে পাহাড় থেকে ফ্যাসিস্ট বাঙালী সেনাবাহিনীর অপসারণ এবং পাহাড়ে বাঙালী পুনর্বাসন বন্ধ।  এছাড়া সমস্ত আলোচনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। পাহাড়ী জনগণের স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কিছু বেঈমান নিজেদের ভাগ্য হয়তো গড়তে পারবে, কিন্তু পাহাড়ী জনগণের জীবনে এক বিন্দু শান্তি বর্ষিত হবে না।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

 


নানিয়ার চরে গণহত্যা ও খুনীদের সাথে জনসংহতি’র শান্তি আলোচনা

নানিয়ারচর উপজেলা

 নানিয়ার চরে গণহত্যা ও খুনীদের সাথে জনসংহতি’র শান্তি আলোচনা

(ডিসেম্বর/’৯৩)

উগ্র জাতীয়তাবাদী বাঙালী আমলা ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের সেনাবাহিনী ১৭ নভেম্বর, ’৯৩ আরেকবার রাঙামাটির নানিয়ার চরে পাহাড়ী জনগণের রক্তে ভাসিয়ে দিল পার্বত্য চট্টগ্রাম।  এটি হচ্ছে খালেদা সরকারের ‘গণতন্ত্র’ আমলের ২য় দফা পাহাড়ী গণহত্যা।  ’৯২ সালে রাঙামাটির লোগাং-এ আরেকটি গণহত্যা এই ‘গণতন্ত্রী’রা চালিয়েছিল।  তার আগে এরশাদ ও জিয়া আমলে ছোট-বড়, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত এরকম গণহত্যা অনেকবার চালিয়েছে এদেশের শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী।

নানিয়ারচর হত্যাকান্ডের বিবরণ
পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এদিন (১৭ নভেম্বর) পূর্ব ঘোষিত মিছিল, সমাবেশ শুরু করে নানিয়ারচরে অন্যায়ভাবে খবরদারি করা সেনাছাউনি প্রত্যাহারের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে।  এ সময় পার্বত্য গণপরিষদ নামধারী স্বৈরাচারী খালেদা সরকারের লেলিয়ে দেয়া উগ্র বাঙালী কুত্তারা বর্বরভাবে পাহাড়ী ছাত্র-জনতার সমাবেশে হামলা করে সমাবেশ ভণ্ডুল করে। নানিয়ারচরে উগ্র বাঙালী বন্দুকধারী ওসি এ সময় ‘ডিসি এসপি আসছে ………….. আপনারা অপেক্ষা করুন’ এ ধরনের আশ্বাস দিয়ে সুকৌশলে পাহাড়ীদেরকে প্রতিরোধহীন করে রাখে।  উগ্র বাঙালী সশস্ত্র খুনীদের নানিয়ারচর হাসপাতালের দিকে জড়ো করে আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত করতে থাকে।  ৪০ ইবি বাঙালী সেনাবাহিনীর ল্যান্স নায়েক নাজিম হুইসেল বাজানোর সাথে সাথে খুনীরা পাহাড়ীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।  পাহাড়ী জনগণ সংগঠিত হবার চেষ্টা মাত্রই সেনাবাহিনী তাদের উপর এলোপাতাড়ি ব্রাশ ফায়ার করে।  এখানে তাৎক্ষণিকভাবে শহীদ হন ফনি ভূষণ চাকমা, শোভাপূর্ণ চাকমা, বীরেন্দ্র চাকমাসহ ৮ জন পাহাড়ী। যারা প্রাণ রক্ষার্থে পানিতে ঝাঁপ দেন।  তাদের উপর জেটবোট ও নৌকার উপর থেকে বর্বর সেনাবাহিনী ও অনুপ্রবেশকারী উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বল্লম, বর্শা মেরে কুপিয়ে হত্যা করে।  ৪০ ইবি রেজিমেন্টের মেজর মোস্তাফিজের নেতৃত্বে ৩০/৩৫ জন আর্মী বেয়নেট দিয়ে কোপায়।  আর দাঙ্গায় মারা গেছে দেখানোর জন্য লেলিয়ে দেয়া পার্বত্য গণপরিষদের জল্লাদরা সেই আহতদেরকে আহত অবস্থায়ই কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
এরা অনেক লাশ গুম করে বাকি লাশগুলো আত্মীয়-স্বজনকে ফেরত বা সৎকারের সুযোগ না দিয়ে একত্রে পুড়িয়ে ফেলে পাহাড়ীদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রীতিকে অবমাননা করে। অথচ বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়াদের সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট পত্রিকা ইনকিলাব ১৮ তারিখে লিখলো- ‘২৫ জন আহত’।  সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়াদের পত্রিকা ইত্তেফাক একই তারিখে বলল- ‘১ জন নিহত’। ইত্তেফাক, ইনকিলাব যে উগ্র বাঙালী বড় বুর্জোয়া শাসক খুনীদের পত্রিকা, মিথ্যুকদের পত্রিকা- এটাই তার প্রমাণ।  ইতিপূর্বেও সর্বদাই এরা এভাবে গণহত্যাকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছে।

এরপর পাহাড়ী জনগণের রক্ত মাড়িয়ে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ’ আলোচনা
পাহাড়ী জনতার রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই আমরা শুনলাম আরেক তামাশার কথা।  খুনী সরকারের পাঠানো প্রতিনিধি দলের সাথেই ‘শান্তি বৈঠক’ করল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জে.এস.এস.) গণহত্যার মাত্র এক সপ্তাহ পরে। এমনকি আরেকবার ‘অস্ত্রবিরতি’ চুক্তির মেয়াদও তারা বাড়াল। কিসের অস্ত্রবিরতি ! যে দুষ্কৃতিকারীরা মাত্র সাতদিন আগে অস্ত্র দিয়ে ব্রাশ ফায়ার, বন্দুকের বাঁট-বর্শা দিয়ে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা করল ত্রিশজনের অধিক পাহাড়ীদের- তাদের সাথেই ‘অস্ত্র বিরতি’।  এটা কি নানিয়ারচরের ওসি’র মতোই ভূমিকা নয়? যদি ষষ্ঠ দফায় অস্ত্র বিরতিই হয়, তবে নানিয়ারচরে আর্মীদের গণহত্যার জবাব কি দেবেন জনসংহতি সমিতি নেতৃবৃন্দ? অস্ত্রবিরতি যদি হত্যা-নির্যাতন বন্ধের জন্য হয় তবে তার প্রথম শর্ত হতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এই সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, প্রতিবিপ্লবী উগ্র বাঙালী পার্বত্য গণপরিষদ নামধারী খুনী বাহিনীকে চট্টগ্রাম থেকে সরানো, তাদের নিষিদ্ধ করা।  সেটা হয়নি, বরং আমরা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নানিয়ারচর থানা শাখার “জরুরী বিবৃতি” থেকে জানতে পারছি “যে যাত্রী ছাউনি নিয়ে সেনাবাহিনী ৪০ ইবি রেজিমেন্ট এত বড় হত্যাকা- সম্পন্ন করল, এতো লোকের রক্ত ঝড়িয়ে এখনও বীরদর্পে যাত্রী ছাউনি দখল করে রেখে চেকপোষ্ট বানিয়ে রেখেছে- এটাই প্রমাণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনো সেনা অপশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট”।
এ অবস্থায় কথিত অস্ত্রবিরতির কেবল একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে তা হচ্ছে সশস্ত্র হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পাহাড়ী জনগণকে তাদের সংগ্রাম-লড়াই থেকে বিরত করা। তাই এই “শান্তি আলোচনা”- তা “সৌহার্দ্যপূর্ণ” হয়েছে বলে জে.এস.এস. নেতার সন্তুষ্টি- এ সব হচ্ছে উগ্র বাঙালী শাসকশ্রেণীর গণহত্যা-নির্যাতনের প্রতিনিয়ত শিকার পাহাড়ী জনগণের স্বার্থের বিপরীত।  এটা হচ্ছে নানিয়ারচরের বিদ্রোহী পাহাড়ী তরুণদের স্বার্থের বিরোধী।  সেটা আমরা দেখি “বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিটি ও জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ পার্বত্য এলাকায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যে কোন জনগোষ্ঠীর উসকানিমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন” (দৈনিক বাংলা ২৫-১১-’৯৩)- এই রিপোর্ট থেকে।  এখানে খুনী সরকার-সেনাবাহিনী ও পার্বত্য গণপরিষদের নরপিশাচদের কাতারেই ফেলা হয়েছে পাহাড়ী জনগণ ও তাদের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে।  আরেক দিকে বাঙালী মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর বলির পাঁঠা পুনর্বাসিত বাঙালীদের সম্পর্কেও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে।  এই বাঙালী গরিব জনগণকে শোষণ নির্যাতন, জমি থেকে উচ্ছেদ, বস্তি-পেশা থেকে উচ্ছেদ করে যে খুনী শাসক শ্রেণী পাহাড়ীদের অধিকার হরণের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহারের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে পাঠিয়েছে সেই জনগণকেই মূল অপরাধী প্রমাণ করতে বাঙালী বা পাহাড়ী কোন বুর্জোয়াদেরই আপত্তি নেই।

পাহাড়ীদের বন্ধু কারা, পাহাড়ীদের শত্রু কারা- 
কি হবে তাদের মুক্তির পথ (?)
পার্বত্য চট্টগ্রাম গণহত্যা কেবল খালেদার বিএনপি সরকারই করেনি খুনী ফ্যাসিস্ট ‘বাঙালী সমন্বয় পরিষদ’, ‘পার্বত্য গণপরিষদ’-এ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় আঃ লীগ নেতৃবৃন্দই নেতৃত্ব দিচ্ছে (দেখুন ‘সময়’ পত্রিকা, ৩-১২-’৯৩)।
আঃ লীগ এমনকি যেনতেন কারণেই হরতাল-ধর্মঘট ডাকে, সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে- কিন্তু নানিয়ারচর গণহত্যার জন্য তারা একটা ধর্মঘট তো দূরে থাকুক, জোরালো কোন প্রতিবাদও করেনি।  এর কারণ হচ্ছে কোনভাবেই সেনাবাহিনীকে অসন্তুষ্ট করা যাবে না, কারণ তাতে ক্ষমতায় যাবার আশা তাদের বানচাল হতে পারে।
এই আঃ লীগের মৃত নেতা শেখ মুজিব উগ্র বাঙালী বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হিসেবে পাহাড়ী সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহকে বাঙালী হতে বলেছিল এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী বাহিনীর সহযোগিতায় ’৭২/’৭৩-এ পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও শুরু করেছিল। ফ্যাসিস্ট বুর্জোয়া জিয়া সরকার আমলে পাহাড়ে চালানো হয়েছিল কুখ্যাত ‘লংগদু হত্যাকান্ড’। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে অব্যাহত গণহত্যা-নির্যাতন অন্যায়ভাবে বাঙালী পুনর্বাসনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক পাহাড়ীদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। জামাতের মুখপত্র ‘সংগ্রাম’ উপ-সম্পাদকীয় লিখে প্রমাণ করতে চায় পাহাড়ীরাই পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত; শত শত বছর আগে বাঙালীরাই নাকি সেখানে ছিল।  পাহাড়ীদের উৎখাত-নির্যাতন-শোষণ করার কতখানি ফ্যাসিবাদী যুক্তি! ফিলিস্তিনিদের আবাসভূমি দখল করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুলিশী রাষ্ট্র ইজরাইলী ইহুদীবাদীরা যুক্তি দেয়, তারাই এখানে আদি নাগরিক, লক্ষ লক্ষ বছর আগে ইহুদীরাই এখানে ছিল। বাংলাদেশী মুসলমান সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী আর ইজরাইলী ইহুদীবাদীদের ফ্যাসিবাদ, আগ্রাসন, পররাজ্য গ্রাস-এর যুক্তি এখানে সম্পূর্ণ একই।  আর এই যুক্তিই পার্বত্য চট্টগ্রামে ফেরী করছে পার্বত্য গণপরিষদ, আঃ লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি, বাঙালী সেনা আমলাসহ পুরা শাসক শ্রেণী।  এই পুরা বাঙালী বড়-বুর্জোয়া ধনী সামন্ত শ্রেণীটাই পাহাড়ীদের শত্রু, পাহাড়ী জনগণ এটা ভালভাবেই বোঝেন। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশেই নির্যাতিত জাতি-শ্রেণী-জনগণের সাধারণ শত্রু ভারত আছে ওঁৎ পেতে পাহাড়ীদের গ্রাস করতে।  পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা, পাহাড়ী জনগণের অধিকারের অর্থ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এই শত্রুগুলোকে উৎখাত করা।  এছাড়া ‘শান্তি আলোচনা’ যারা চালায় তারা পাহাড়ীদের স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী ব্যতীত আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে পাহাড়ী জনগণের বন্ধু হচ্ছে সারা দুনিয়ার নির্যাতিতরা।  আজ পাহাড় থেকে যে শত্রুদের পাহাড়ী জনগণকে উৎখাত করতে হবে, সমতল ভূমি থেকে বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তকে তার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যও উৎখাত করতে হবে সেই একই বাঙালী বড় বুর্জোয়া-বড় আমলা-জেনারেল ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদকে।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ’৭১-এর পর যেমন রক্ষীবাহিনী দিয়ে হাজার হাজার মুক্তিকামী সংগ্রামী-বিপ্লবীদের হত্যা করা হয়েছে, বাঙালী জনগণের মুক্তি হয়নি, তেমনি শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্যাতিত জাতিসত্তার প্রকৃত মুক্তি অসম্ভব।  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিটির সাথে শান্তি আলোচনায় বসে জনসংহতির নেতারা আজ পাহাড়ী যুবকদের ন্যায্য সংগ্রামকে ‘উসকানিমূলক কর্মকান্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে পাহাড়ীদের উপর গণহত্যাকে ন্যায্য ও পাহাড়ীদের বিদ্রোহকে অপরাধের কাতারে ফেলেছে।  সংশোধনবাদীরা আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের এই বুর্জোয়া সমাধানেরই লেজুড়বৃত্তি করছে।  ৫ দল নেতা মেনন সাহেব নির্যাতক, হত্যাকারী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী অলি আহম্মদের নেতৃত্বের সাথী হয়ে বাঙালী বুর্জোয়াদেরই উলঙ্গ লেজুড়বৃত্তি করতে গেছে নির্লজ্জভাবে।  আর সংশোধনবাদীদের অন্যতম মুখপত্র ‘সময়’ পত্রিকা প্রেসক্রিপশন করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রধান সমাধান নাকি ‘সরকার ও জনসংহতি সমিতি উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।’ এরা লুটেরা ও খুনীদের সাথে আপোষ, শত্রু শ্রেণীর ‘ভাল হয়ে যাওয়া’র ভুয়া আশার পেছনে জনগণকে ছুটাতে চায়।  পার্বত্য চট্টগ্রামের কথিত রাজনৈতিক সমাধান বলতে এরা এটাই বোঝায়।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমাধান একমাত্র বাঙালী সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, পুনর্বাসিত বাঙালীদের পাহাড় থেকে ফেরত আনা, বাঙালী বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উৎখাত এবং পাহাড়ীদের পরিপূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। আর সেটার পথ আর কেউ বাতলাতে পারে না- একমাত্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের বিপ্লবী আদর্শ ছাড়া।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

1448989607

পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

(ফেব্রুয়ারি/২০০৪)

১৯৯৮ সালের ২ ডিসেম্বর ‘শান্তিচুক্তি’র পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী জনগণের উপর বাঙালী শাসক শ্রেণীর হত্যা-দমন, জ্বালাও-পোড়াও নীতি অব্যাহত রয়েছে।  গত ২৬ আগষ্ট (২০০৩) খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ির ১০টি গ্রামে শাসক শ্রেণী ও সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে বাঙালী সেটলাররা পাহাড়ীদের সাড়ে তিনশত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পদ লুট করে। তাদের আক্রমণে নৃশংসভাবে খুন হয় বিনোদ বিহারী খিসা ও ৮ মাস বয়সী এক শিশু। হামলাকারীরা ৪টি বৌদ্ধ মন্দিরও পুড়িয়ে দেয়, মূর্তি ভেঙে ফেলে ও লুট করে।  ৯/১০ জন নারী এ সময় ধর্ষিতা হন।
‘শান্তিচুক্তি’র আগে ও পরে পাহাড়ী জাতিসত্তার উপর বহু দমন-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।  যার মধ্যে লংগদুর গণহত্যা, লোগাং গণহত্যা, নানিয়ারচর গণহত্যা, পানছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙার গণহত্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  এই হত্যা-দমন-নির্যাতন শুরু হয় ১৯৭১ সালে মুজিববাদীদের দ্বারা।  পরে শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান, এরশাদ এবং পরবর্তী বিএনপি, আওয়ামী লীগ আমলেও তা অব্যাহত থাকে।  বর্তমান খালেদা-নিজামীর সরকারও পাহাড়ীদের উপর নির্মম দমন-নির্যাতন চালাচ্ছে।  মহালছড়ির ঘটনা তারই নগ্ন প্রকাশ।
পাহাড়ী জনগণ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার-এর জন্য বাঙালী শাসক শ্রেণীর এই বর্বতার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সংগ্রাম করে আসছেন।  কিন্তু সঠিক বিপ্লবী লাইন ও নেতৃত্বের অভাবে পাহাড়ী জনগণের শ্রম-ঘাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ভেস্তে যাচ্ছে। ’৭১-এর পর পাহাড়ীদের সংগঠন জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনী এবং তাদের নেতা সন্তু লারমা পাহাড়ী নিপীড়িত জনগণের শত্রুমিত্র, বিপ্লবের স্তর নির্ধারণ করেনি।  শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে ও তাদের আদর্শকে ভিত্তি করে সংগ্রাম পরিচালনা করেনি।  ফলে এই সংগ্রাম শত্রু শ্রেণীর বেড়াজাল ডিঙাতে পারেনি, পারছে না।  ’৭১-এর পর ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ তার স্বার্থে শান্তিবাহিনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে।  পরবর্তীতে শেখ হাসিনার আমলে শাসক শ্রেণী- বিভক্ত কর, শাসন কর, শোষণ কর- এই বুর্জোয়া নীতি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।  শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টি করতে পেরেছে।  এবং বাঙালী সেটলার শ্রমিক-কৃষক ও সেনাবাহিনীকে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে সুযোগ পাচ্ছে।
সন্তু লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতির বিশ্বাসঘাতক ‘শান্তিচুক্তি’কে পাহাড়ী জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।  কিন্তু বিদ্রোহী পাহাড়ী জনগণের সংগঠন ইউপিডিএফও জনসংহতির মতই একই আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।  তারা নিপীড়িত পাহাড়ী জনগণের শত্রুমিত্র সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং পাহাড়ী জাতিসত্তাগুলোর জাতীয় মুক্তির সঠিক পথও প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।  তারা উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের শোষণ-লুণ্ঠন, দমন-নির্যাতনকে বিরোধিতা করলেও পাহাড়ী জাতিসত্তার মুক্তির কোন কর্মসূচি হাজির করতে পারেনি।  তারা শত্রুর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে এবং পাহাড়ী জনগণের মূল শত্রুকে বাদ দিয়ে কার্যত জনসংহতিকেই মূল শত্রু বানিয়ে ফেলছে। ইউপিডিএফ-এর ৫ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জনগণের উদ্দেশ্যে বিবৃতিটিও (২৬ ডিসেম্বর, ’০৩) তাই বলে।  বিবৃতিতে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ-আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্ততন্ত্র সম্পর্কে কোন বক্তব্য নেই।  যারা নাকি নিপীড়িত পাহাড়ী-বাঙালীদের মৌলিক শত্রু।  সুতরাং ইউপিডিএফ’র ভেতর থেকে নতুন করে সন্তু লারমার সৃষ্টি হবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই।  কারণ জনসংহতি ও ইউপিডিএফ’র মধ্যে রাজনীতি-মতাদর্শগত ও কর্মসূচিগত কোন মৌলিক পার্থক্য নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত বাঙালীসহ ১৪টি জাতিসত্তার বাস।  এই ১৪টি জাতিসত্তার যৌথ স্বার্থকে কেন্দ্র করে এবং সমতলে নিপীড়িত বাঙালী জনগণ ও তাদের মৌলিক শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেই এই আন্দোলন এগিয়ে যেতে পারে।  আর সেটা সম্ভব কেবলমাত্র মাওবাদকে গ্রহণ করেই।  তা না হলে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন কেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা রাষ্ট্র হলেও পাহাড়ী ১৪টি জাতিসত্তার শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ জনগণ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নিঃস্ব হওয়া ও দমন-নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবেন না।  যেমন পাননি পাকিস্তান থেকে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে বাংলাদেশের বাঙালী শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ জনগণ।  বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন পাহাড়ী জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে সমর্থন ও বাঙালী শাসক শ্রেণীর শোষণ-দমন-নির্যাতন এবং পাহাড়ে বাঙালীদের পুনর্বাসনকে বিরোধিতার পাশাপাশি পাহাড়ী জনগণের মুক্তির দিশাকে প্রতিনিয়ত তুলে ধরছে। পাহাড়ী জনগণের সংগ্রামকে এগিয়ে যেতে হবে সেই বিপ্লবী দিশাকে ভিত্তি করে।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা