বাংলাদেশের গণযুদ্ধে শহীদ কমরেড ‘জয়দেব’

কমরেড জয়দেব

কমরেড জয়দেব

কালিগঞ্জ/খুলনা

কমরেড জয়দেব বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন। ’৭৩-’৭৪ সালে সিরাজ সিকদারের পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির নেতৃত্বে দেশব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রভাবে তিনি সর্বহারা পার্টিতে যুক্ত হন। যোগদানের পর থেকেই পার্টির নেতৃত্বাধীন সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভুমিকা রাখেন।

সিরাজ সিকদার শহীদ হওয়ার পর জয়দেব সর্বহারা পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।  কিন্তু বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ও তিনি পার্টির বিপ্লবী রাজনীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতেন এবং বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ছিলেন। এ সময়ে প্রকাশ্যভাবে তিনি ইউপিপি’র ব্যানারে কাজ করতেন। এই পর্যায়ে জয়দেব গ্রেফতার হন।

জেলখানার বন্দীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে জয়দেব আপোষহীন ভূমিকা রাখেন। ৮০ সালে রাজশাহী-খুলনা-ঢাকা সহ সারা দেশের জেলখানাগুলোতে দ্রুত বিচার নিস্পত্তি, খাবারের মান উন্নত, পরিবেশের উন্নয়ন, কুখ্যাত ব্রিটিশ জেল কোড বাতিল প্রভৃতি দাবীতে ব্যপক আন্দোলন গড়ে উঠে।

খুলনায় জেল আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে জয়দেব ছিলেন অন্যতম। দাবী আদায়ের জন্যে খুলনা জেলের সকল বন্দীরা অনশন ধর্মঘট করলেও গণতন্ত্রের গলাবাজীওয়ালা বিএনপি’র জিয়াউর রহমান সরকার বন্দিদের সাথে কোন আলোচনা না করে দমন-নির্যাতন চালাতে থাকে। এ অবস্থায় বন্দীরা সরকারকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার জন্য ২৪জন জেল কর্মচারীকে বন্দী হিসেবে আটক করেন।  বন্দীরা বিএনপি সরকারের প্রতিনিধিসহ বিরোধী দলের নেতাদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বিরোধী দলসহ সরকার এই আলোচনার প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান(খালেদা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী)- এর উপস্থিতিতে ২১শে অক্টোবর রাতে জেলখানায় হামলা করে নারকীয় গণহত্যা সংগঠিত করে। পরের দিন সরকারী প্রেস নোটে ৪০জন বন্দির হত্যার কথা বলা হলেও বেসরকারি মতে ২-৩শ বন্দীকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, খুলনা জেল সরকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর পুরো জেলখানা তল্লাশি করে বিপ্লবী জয়দেবকে ধরে এনে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়। এই জেল হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বন্দিদের প্রতিরোধের নেতা জয়দেব আগামী বিপ্লবীদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।


পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর উদ্দেশ্যে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি)’র খোলাচিঠি

Maoist-Flag

পূবাকপা (এম-এল)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মী-জনগণের উদ্দেশ্যে পূবাসপা (সিসি)’র খোলাচিঠি

কমরেডগণ,

লাল সালাম।

বিগত শতাব্দীর ’৬০-এর দশকের শেষ দিকে রুশ-চীন মহাবির্তক, চেয়ারম্যান মাওয়ের নেতৃত্বে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব (জিপিসিআর) এবং কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে ভারতের নকশালবাড়ীর সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থানের প্রভাবে আমাদের দেশে মাওবাদী (তখন “মাও চিন্তাধারা” বলা হতো) আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। সেই আন্দোলনের অংশ হচ্ছে আপনাদের পার্টি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এবং আমাদের পার্টি পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রুশ-ভারতের দালাল শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী-বাকশালী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ’৭১-’৭৪ সালে এই দুই পার্টিসহ অন্যান্য মাওবাদী পার্টি ও সংগঠনসমূহ গৌরবময় সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করেছিল। এই সংগ্রামেই আমাদের ও আপনাদের পার্টি-নেতা কমরেড সিরাজ সিকদার ও কমরেড মনিরুজ্জামান তারাসহ অনেক মাওবাদী শহীদ হন।

’৭৬ সালে চেয়ারম্যান মাওয়ের মৃত্যুর পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মহাসংকটকালে মাওবাদ অনুসারী কোন কোন সংগঠন ও বেশিরভাগ নেতা সংশোধনবাদে গড়িয়ে পড়ে। কোন কোন সংগঠন বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু আপনাদের ও আমাদের এই দুই পার্টিসহ কমরেড ননী দত্ত (ক. মোশতাক)-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মা-লে) মাওবাদী পতাকা, বিশেষত মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। এই প্রক্রিয়ায়

’৮০-র দশকে আমাদের পার্টি মাদারীপুর-শরীয়তপুর-নরসিংদী-ময়মনসিংহ-রাজবাড়ী-উত্তরাঞ্চলসহ ২৪টি জেলায় এবং ’৯০-এর দশকে আপনাদের পার্টি দেশের পশ্চিমাঞ্চলে দৃষ্টিকাড়া সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলে। যদিও শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-নির্যাতন এবং মাওবাদী আন্দোলনের মধ্যে বিরাজমান ভুল-ত্রুটির কারণে সেই সংগ্রাম পরাজিত হয়।

’৭৯ সাল থেকেই রাজনীতি ও মতাদর্শকে কেন্দ্রে রেখে আমাদের সংগঠন ধাপে ধাপে তত্ত্ব-অনুশীলন-তত্ত্ব- এই মালেমা প্রক্রিয়ায় অতীত সংগ্রামের সারসংকলন চালাতে থাকে। ইতিপূর্বে ’৮০-র দশকেই আমাদের পার্টি বিশ্ব মাওবাদীদের ঐক্য-কেন্দ্র আর.আই.এম. (রিম) এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাওবাদীদের সমন্বয় কমিটি কমপোসা’র সদস্য হয়েছিল। এই আন্তর্জাতিকতাবাদী নতুন ভূমিকাও আমাদের সারসংকলন কাজকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে।

 স্বাভাবিকভাবে এই সারসংকলনকে কেন্দ্র করে পার্টিতে দুই লাইনের সংগ্রামও চলে। একবার পার্টি বড় আকারে বিভক্তও হয়। এসবেরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পার্টির একটি জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে “মাওবাদী আন্দোলনের চার দশকের সারসংকলন” নামে একটি “নতুন থিসিস” আমাদের পার্টি গ্রহণ করেছে। যার ভিত্তিতে এখন দেশের সমগ্র মাওবাদী আন্দোলনকে পুনর্গঠন করে একটি নতুন ধরনের ঐক্যবদ্ধ মাওবাদী পার্টি গঠন এবং নতুন ধরনের গণযুদ্ধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আমাদের পার্টি চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে আপনাদের পার্টি পশ্চিম অঞ্চলের সংগ্রাম, বিপর্যয় ও পরাজয়ের পরবর্তীতে বিভিন্ন বিতর্কের প্রক্রিয়ায় তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ বিভক্তিতে লাইনগত সংগ্রাম খুব একটা স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, যদিও পরবর্তীতে রাজনৈতিক-মতাদর্শগত লাইনগত প্রশ্নাবলীর পার্থক্য কিছু কিছু স্পষ্ট হতে থাকে।

এই বিভক্ত অংশগুলোর মধ্যে ক. রাকেশ কামাল (ক. রাকা)-এর নেতৃত্বাধীন “লাল পতাকা” গ্রুপ নামের অংশটি কমপোসা’য় যোগদান করে এবং পূবাকপা’র বিগত সংগ্রামের সারসংকলন প্রক্রিয়া শুরু করে। সে প্রক্রিয়ায় ক. রাকা “সারসংকলন প্রতিবেদন (প্রাথমিক) খসড়া রূপরেখা” নামক একটি দলিল প্রণয়ন করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দলিলটি সিসি কর্তৃক অনুমোদন এবং পার্টি-ব্যাপী ব্যাপক কোন আলোচনার পূর্বেই তিনি র‌্যাবের ভুয়া ক্রসফায়ারে শহীদ হন। এর আগেই ক. মোফাখ্খার চেীধুরী এবং ক. তপন একইভাবে শহীদ হন। শুধু এই নেতৃত্বগণই নন, আপনাদের পার্টির তিনটি কেন্দ্রের অধিকাংশ নেতৃত্বই শত্রুর হাতে শহীদ হন অথবা গ্রেফতার হন। এভাবে, আমরা ধারণা করি যে, তিনটি কেন্দ্রই অকার্যকর হয়ে যায়।

এভাবে আপনাদের পার্টি গুরুতর সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। কর্মী-জনগণ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ও দিশাহীন হয়ে পড়েছেন। কোন কেন্দ্রই পার্টির নেতৃত্বাধীন সংগ্রামকে অব্যাহত রাখতে পারেনি বা সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা রাখতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সুসংগঠিত কোন সাংগঠনিক কাঠামো পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

 পার্টি-পুনর্গঠনের বিষয়ে আমাদের জানা কিছু পর্যবেক্ষণ এখানে তুলে ধরছি

– ক. চেীধুরী শহীদ হওয়ার পর সেই কেন্দ্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং এখনও তার লাইনের অনুসারী দাবিদার একটি ধারাকে ক্রিয়াশীল দেখা যায়। আমাদের জানামতে এই ধারাটি এখনো পর্যন্ত পার্টির কোন দলিলপত্র-পত্রিকা-লিফলেট কিছুই প্রকাশ করেনি। এরা সাংস্কৃতিক গণসংগঠনসহ বিভিন্ন ধরনের গণসংগঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম চালান। যা কমরেড চেীধুরীর লাইনের সাথে মেলে না। আবার তারা চেীধুরী-লাইনের কোন সারসংকলনের কথাও বলছেন না।

-ক. রাকেশ কামাল এবং তার পরবর্তী নেতৃত্ব ক. এনামুল শহীদ হওয়ার পর তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন কয়েকজন কমরেড শত্রুর দমন থেকে আত্মরক্ষার জন্য কৌশল হিসেবে পার্র্র্টির নাম পরিবর্তন করে “বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)” নামে সংগঠন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একটা বৈঠকের পর তাদের তৎপরতা অব্যাহত থাকেনি। এই ধারাতেই অন্য একটি অংশ ২০১১ সালে “২২ মে শহীদ দিবসে” (ক. তারার মৃত্যুবার্ষিকীতে) “পূর্ব বাংলার মাওবাদী” নাম দিয়ে সংগঠনের একটি পোস্টার প্রকাশ করেছিল। পরে আর এই নামে কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। এই ধারারই অন্য একটি অংশ ১৯/০৩/’১১ তারিখে সার্কুলার- ১ নামে একটি দলিল প্রকাশ করেছিল যাদের কেন্দ্র পূবাকপা (মা-লে) (লাল পতাকা) নামটি উল্লেখ করেছে। এতে ক. রাকা’র সারসংকলনের ভিত্তিতে পার্টি পুনর্গঠনের কথা বলা হলেও বাস্তব অনুশীলনে সেই লাইনের কোন প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না বলে আমাদের মনে হয়। এই সার্কুলার অনুসারীরা এখনো সক্রিয়। এরা এখনো খতম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন। তাদের কৌশল হচ্ছে, শত্রুর চাপ এড়ানোর জন্য কিছু অনিবার্য খতম করলেও তা প্রচার করেন না। পার্টির দায় স্বীকার করেন না।

-সম্প্রতি আরো একজন নেতৃত্ব যিনি অতীতে জনযুদ্ধের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি পার্টি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন বলে শোনা যায়। যতদূর জানা যায় তিনিও মতাদর্শগত-রাজনৈতিক লাইনকে কেন্দ্রবিন্দু করছেন না। বরং পূর্বের ধারাতেই সামরিক এ্যাকশন, তথা খতমকে কেন্দ্রবিন্দু করছেন। তার বা তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে এখনো কোন দলিলপত্র প্রকাশ হয়েছে বলে আমরা জানি না।

এইসব উদ্যোগে বিপ্লবের প্রতি গভীর আন্তরিকতা থাকলেও সেগুলো মাওবাদী রাজনীতি ও মতাদর্শকে চাবিকাঠি হিসেবে আঁকড়ে ধরছে না বলেই আমাদের ধারণা। পার্টি-গঠনের ৪০ বছর পর পার্টির আজকের বিপর্যস্ত ও ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার কারণ অনুসন্ধানের জন্য লাইনগত সারসংকলনের ভিত্তিতে পার্টি-পুনর্গঠনকে কেউই কেন্দ্রবিন্দু করছেন না।

মনে রাখতে হবে পূবাকপা একটা মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ছিল। যার রাজনীতিক লক্ষ্য ছিল নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রধান ধরনের সংগ্রাম ছিলো সশস্ত্র সংগ্রাম। তার মতবাদ ছিল মালেমা। সেই পার্টি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে শত্রু-দমনে। এ অবস্থায় প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে সেই পার্টিকে গঠন বা পুনর্গঠন করা। যেহেতু সশস্ত্র সংগ্রামের পার্টি তাই আজকের বাস্তব ও আত্মগত অবস্থা বিবেচনা করে পার্টি পুনর্গঠন করতে হবে। এখন লাইন বিনির্মাণ তথা লাইনগত সারসংকলন না করে এই পার্টির পক্ষে আর ইতিবাচকভাবে এগুনো সম্ভব নয় বলেই আমরা মনেকরি। ঠিক যে কাজটিতে হাত দিয়েছিলেন ক. রাকা ৫ বছর আগেই। এবং তার একটি বড় ও মৌলিক কাজ তিনি সম্পন্ন করে গিয়েছিলেন। অথচ বিগত ৫ বছরে সেকাজে আর কোন অগ্রগতি দূরের কথা, সে কাজটিকেই প্রায় বিস্মৃত করে দিয়ে পুরনো ধারায় বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত এ্যাকশনের প্রচেষ্টা এই পার্টিকে কোন অগ্রগতিই এনে দিতে পারে না।

আজকে সংগ্রামের/এ্যাকশনের নেতৃত্ব কে দিবে? নিশ্চয়ই পার্টি। সেই পার্টি কোথায়? চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ বলেছিলেন, “যদি বিপ্লব করতে হয়, তাহলে অবশ্যই একটা বিপ্লবী পার্টি থাকতে হবে। একটা বিপ্লবী পার্টি ছাড়া, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী তত্ত্ব এবং বিপ্লবী রীতিতে গড়ে ওঠা একটা বিপ্লবী পার্টি ছাড়া, শ্রমিক শ্রেণি ও ব্যাপক জনসাধারণকে সা¤্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুরদের পরাজিত করতে নেতৃত্বদান করা অসম্ভব।” (উদ্ধৃতি পৃঃ ২-৩)। কয়েকটি ব্যক্তি হলেই পার্টি হয় না। প্রথমত একটি সামগ্রিক লাইন তার থাকতে হবে, তার একটি কেন্দ্র ও গঠন কাঠামো থাকতে হবে। একটি পরিকল্পনা থাকতে হবে। সেগুলো সুদূর অতীতে আপনাদের ছিল। তার ভিত্তিতে সংগ্রামও হয়েছে। কিন্তু তার ভাল-মন্দ সবই প্রকাশিত হয়ে সেসব অতীতের বিষয় হয়ে গেছে। এখন পরিবর্তিত বাস্তব ও আত্মগত অবস্থার প্রেক্ষিতে সেসবকেই নতুন করে নির্মাণ না করলে পার্টির কার্যত কোন সঠিক লাইন থাকতে পারে না। আর এ অবস্থায় কোন পার্টিও গড়ে উঠতে পারে না। তাহলে কে করবে এ্যাকশনের নেতৃত্বদান?

কমরেডগণ,

এটা খুবই জটিল পরিস্থিতি। একটা বিকাশমান সংগ্রাম পরাজিত হয়েছে। পার্টি যখন সংগ্রামে ছিল তখনকার কৌশল-পরিকল্পনা আজকের বিপর্যয়ের বাস্তবতায় আর কার্যকর করা সম্ভব নয়। আজকের আত্মগত অবস্থা মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন করে কৌশল-পরিকল্পনাও করতে হবে।

পূবাকপা’র বিচ্ছিন্ন কমরেডদেরকে আমরা মনে করি এ দেশের মাওবাদী আন্দোলনেরই অংশ। আমরা ভিন্ন ভিন্ন পার্টি থেকে চল্লিশ বছরের বেশি এই ভূখণ্ডে সংগ্রাম করছি। পূবাকপা এখন শত্রুর দমনে বিপর্যস্ত। আমাদেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শত্রুপক্ষ এই দেশ থেকে মাওবাদী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে আন্দোলনকে রক্ষা ও বিকশিত করতে হবে। সেজন্য আমাদের অতীত সংগ্রামের পর্যালোচনা-সারসংকলনের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনার ভিত্তিতে আগাতে হবে। ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবে পূবাকপা’র বিচ্ছিন্ন-বিপর্যস্ত কমরেডদেরকে পরামর্শ দেয়া, সহযোগিতা করার দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা এই খোলাচিঠি প্রকাশ করছি, যাতে আমরা কিছু পরামর্শও উল্লেখ করতে চাই। আমরা এসব পরামর্শ আপনাদের উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। লাইন-নীতি-পরিকল্পনা নির্ধারণ করা প্রধানত আপনাদেরই দায়িত্ব। সেক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ যদি কোন সহায়তা করে সে আশাতেই আমরা এসব কথা বলছি।

কমরেডদেরকে মনে রাখতে হবে নানান জায়গা থেকে নানান ধরনের মতামত আসবে। সুবিধাবাদী-বিলোপবাদী মতও আসবে। মালেমা’র বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে তা গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না সেক্ষেত্রে আপনাদের বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গিই আপনাদেরকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে, অন্য কেউ নয়।

* সংকীর্ণতাবাদী চেতনা থেকে বিভক্ত কোন কেন্দ্র নয়- সমগ্র পূবাকপা-কে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে, যা কিনা হবে বাস্তবে এদেশের সামগ্রিক মাওবাদী আন্দোলনের পুনর্গঠনেরই অংশ।

* পুনর্গঠনের জন্য প্রথম আঁকড়ে ধরতে হবে লাইন বিনির্মাণকে, যার মতাদর্শগত ভিত্তি হবে মালেমা।

আরও নির্দিষ্টভাবে এজন্য-

– বিগত শতকে শেষাংশে আন্তর্জাতিক মাওবাদীদের ঐক্যকেন্দ্র “রিম” (যা এখন কার্যত বিলুপ্ত) ও তার সদস্য

   গুরুত্বপূর্ণ পার্টিগুলোর মূল্যায়ন ও সারসংকলনকে বিবেচনায় নেয়া;

– ক. সিএম প্রতিষ্ঠিত ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের সারসংকলনকে বিবেচনায় নেয়া;

– পূবাকপা’র সংগ্রাম সম্পর্কে পূবাসপা’র পর্যালোচনাকে বিবেচনায় নেয়া;

– ক. রাকেশ কামালের সারসংকলনকে বিবেচনায় নেয়া;

– অন্য যে কোন মত আসলে সেগুলোকেও বিবেচনায় নেয়া।

* এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নি¤œতমভাবে নি¤েœর মৌলিক বিষয়গুলোতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা-

– মতবাদগত;

– গণযুদ্ধ;

– আর্থ-সামাজিক;

– আন্তর্জাতিক লাইন।

* লাইন-বিনির্মাণ ও সারসংকলনকে কেন্দ্রবিন্দু করার জন্য ও তার স্বার্থে পুরনো ধারার সকল অনুশীলনকে স্থগিত করা উচিত বলে আমরা মনেকরি। যার মাধ্যমে শত্রুর দমনকে এড়িয়ে নিজেদের অবশিষ্ট শক্তিকে সংরক্ষণ করা যায় এবং তাকে সুসংগঠিত করা যায়।

যারা এভাবে পার্টিকে পুনর্গঠনে আগ্রহী তাদের মানোন্নয়ন প্রক্রিয়া শুরু করা। এজন্য নিম্নতম পাঠ্যসূচি ঠিক করা। পাঠ্যসূচির লক্ষ্য হবে- মৌলিক মালেমা-কে আত্মস্থ করা এবং তার ভিত্তিতে উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোতে অধ্যয়ন, আলোচনা, পর্যালোচনাকে বিকশিত করা এবং একটি একটি করে বিষয়গুলোতে মতাবস্থান গ্রহণ করা।

* লাইন-বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় বাস্তব সাংগঠনিক-সাংগ্রামিক অনুশীলন কী হবে তাও নির্ধারিত থাকতে হবে। এজন্য যা যা করা যেতে পারে বলে আমাদের ধারণা-

– অবিলম্বে একটি কেন্দ্রীয় পরিচালনা সেল গঠন করে সমগ্র কাজের সূচনা করা। পরবর্তীতে কোন প্রতিনিধি সভার মাধ্যমে তাকে কমিটিতে রূপ দেয়া যেতে পারে।

– একটি বা দু’টি অঞ্চলকে নির্দিষ্ট করে সেখানে শক্তি কেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে ঘাসমূলের সংগঠন গড়ার প্রক্রিয়া চালানো।

– উপরোক্ত কাজকে ভিত্তি করে দেশব্যাপী বিচ্ছিন্ন যোগাযোগগুলো রক্ষার ব্যবস্থা করা। যতটা সম্ভব সেটা করা। কিন্তু তাকে কেন্দ্রবিন্দু না করা।

– রাজনৈতিক প্রচারকে গুরুত্ব দিয়ে পার্টিজান ও গেরিলা ধরনের কর্মী গড়ে তোলা।

– আর্থিক সামর্থ্য ও যোগ্যতা বিচার করে একজন একজন করে সার্বক্ষণিক কর্মী গড়ে তোলা; সার্বক্ষণিক কর্মীদের নিয়োগদানে সংগঠন-সংগ্রামের রণনৈতিক পরিকল্পনাকে ভিত্তি করায় গুরুত্ব দান।

– শ্রেণি লাইনকে আঁকড়ে ধরে আর্থিক পলিসি নির্ধারণ করা। পেশা, চাঁদা ও ব্যক্তিগত সম্পদের উপর নির্ভর করা। জরিমানা, শত্রুর সম্পত্তি দখল- ইত্যাকার সামরিক যুগের পদ্ধতিকে এড়ানো।

– নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার উপর অত্যধিক জোর দেয়া। শত্রুর অনুপ্রবেশকে ঠেকানো, আবার বেহুদা কাউকে শত্রু মনে না করা।

* উপরোক্ত কাজগুলোকে ভিত্তি করে এগুলে সামরিক এ্যাকশনের স্থানটি কী হবে সেটা বাইরে থেকে আমাদের পক্ষে নির্ধারণ করা সম্ভব নয় ও উচিত নয়। একটি সশস্ত্র সংগ্রামের পার্টি হিসেবে কোন কোন অঞ্চল/এলাকায় নিরস্ত্র কাজ আত্মঘাতী হতে পারে। আবার বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত সামরিক এ্যাকশন আরো বড় বিপর্যয়কর হতে পারে।

তবে এটা সহজবোধ্য যে, লাইন-বিনির্মাণ ও পার্টি-পুনর্গঠনের কাজ একটা পর্যায় পর্যন্ত সম্পন্ন না করে সামরিক কাজ/এ্যাকশনকে কেন্দ্রবিন্দু করাটা সঠিক হবে না বলেই আমরা মনে করি। কারণ, একবার শুরু করলে তা থেকে পিছন ফেরা যাবে না। সর্বোপরি, সংগ্রাম ও এ্যাকশনের মতাদর্শগত-রাজনৈতিক লাইন ও রণনৈতিক পরিকল্পনা কী হবে, যুদ্ধের/সশস্ত্র সংগ্রামের সামরিক লাইনের রূপরেখাটি কী হবে তা খুবই সুবিবেচিতভাবে নির্ধারণ না করে এখন আর আপনাদের পক্ষে কোন ইতিবাচক সংগ্রাম গড়া সম্ভব হবে না বলেই আমরা মনেকরি। তাই, আজকের পরিস্থিতিতে কোন্ অঞ্চল/এলাকাকে আপনারা কেন্দ্রীভূত করার জন্য বেছে নেবেন, এবং সেখানে কী ধরনের কাজ করবেন সেটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে হবে।

উপরোক্ত অনেক বিষয়েই আমরা আরো সুনির্দিষ্ট কথা বলতে পারি, আলোচনা করতে পারি, যা এই খোলাচিঠিতে সম্ভব নয়। আমরা মনেকরি, শুধু আমাদের সাথেই নয়, অন্য সকল আন্তরিক মাওবাদী সংগঠন, ব্যক্তি ও শক্তির সাথেই এসব বিষয়েও আপনাদের প্রচুর আলোচনা ও মত বিনিময় করা উচিত। যাতে করে আপনারা সবচাইতে সঠিক নীতি-পরিকল্পনা ও পদ্ধতিগুলো অনুশীলনে নিয়ে আসতে পারেন।

** পরিশেষে বলতে চাই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রায় ৪২ বছর পার হয়েছে। এই সময়ে দেশ শাসন করেছে বাঙালি বড় ধনী শ্রেণির প্রতিনিধি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাত এবং সেনা-আমলারা। এরা ধনীক শ্রেণি এবং তাদের প্রভু মার্কিনের নেতৃত্বে সা¤্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের স্বার্থ রক্ষা ছাড়া শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণের জন্য কোন কিছুই করেনি। বরং সব সরকারই বিপ্লবীদের, প্রতিবাদকারীদের হত্যা করে বিপ্লবী আন্দোলন দমন করে চলেছে। তাই, বিপ্লবীদের বিগত সংগ্রামের সারসংকলনের ভিত্তিতে নতুনভাবে সংগঠিত হতে হবে। উচ্চতর একটি লাইন, ঐক্যবদ্ধ ও নতুন ধরনের একটি পার্টির নেতৃত্বে একটা সত্যিকার সফল গণযুদ্ধ গড়ে তুলতে হবে। তাছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।

পিবিএসপি/সিসি

তৃতীয় সপ্তাহ, নভেম্বর, ২০১৪

নোট– পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-[পূবাকপা (এম-এল)

           পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি) [পূবাসপা (সিসি)]

সূত্রঃ http://pbsp-cc.blogspot.com/2016/03/blog-post_6.html


বাংলাদেশঃ পাবনায় ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাকে খতম করেছে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির সদস্যরা

maoist1-655x360

পাবনা আটঘরিয়ার উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নে ওয়ার্কার্স পার্টি, পাবনা জেলা শাখার সদস্য ও ওয়ার্কার্স পার্টির সহযোগী সংগঠন জাতীয় কৃষক ক্ষেত মজুর সমিতির আটঘরিয়া উপজেলা শাখার সহ সভাপতি আব্দুর রশিদকে(৪০) গুলি করে খতম করেছে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির সদস্যরা। ২০শে জানুয়ারি বুধবার রাত ৯টার দিকে চাচকিয়ার দিয়ারপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

আটঘরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) জিএম মিজানুর রহমান জানান, সন্ধার দিকে রশিদ তার দুলাভাই রুহুল এর বাড়িতে বেড়াতে যায়। এরপর ফিরে আসার সময় দিয়ারপাড়া নামকস্থানে পৌছালে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন সর্বহারা গ্রুপের চিহিৃত সদস্যরা তার বুকে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেয় রশিদের মৃত্যু হয়। পুলিশ রাত ৯টায় ঘটনাস্থলে পৌছে লাশ উদ্ধার করে আটঘরিয়া থানায় নিয়ে আসেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে এক রাউন্ড তাজা গুলি ও একটি গুলির খোসা উদ্ধার করে।

আবদুর রশিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টি পাবনা জেলা শাখার সভাপতি জাকির হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের জানা মতে স্থানীয় চরমপন্থী সর্বহারারা তাঁকে বেশ কয়েকবার হত্যার হুমকি দিয়েছে।

এ ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমিরুল ইসলাম নামের একজনকে আটক করে। নিহত রশিদ আটরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের চাঁচকিয়া মধ্য পাড়া গ্রামের মৃত বাহাদুর প্রামানিতের ছেলে। নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরন করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমিরুল ইসলাম নামের একজনকে আটক করেছে।

সুত্রঃ  

http://www.bd-pratidin.com/country/2016/01/20/122120

http://desherbarta.com/article.php?home/8419

http://www.khabarpatrabd.com/details.php?nid=50060

http://amarbangladesh-online.com/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%9A%E0%A6%B0%E0%A6%AE%E0%A6%AA%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%80-%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%97/#.VqNMV5p97Mw

 


বাংলাদেশের গণযুদ্ধের সংবাদ

30

৫ জানুয়ারি ফ্যাসিবাদের কালো দিবস শিরোনামে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির নামে পোস্টার লাগানো হয়েছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর বাজারে। মার্কসবাদ-লেলিনবাদ-মাওবাদ জিন্দাবাদসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া লেখা পোস্টারটি প্রচার করা হয়। এলাকাবাসীসূত্রে জানা যায়, ৮ জানুয়ারি রাত ১১টায় ৪০-৫০জন পুরুষ ও নারী সর্বহারা সদস্যরা অস্ত্রসহ ভবানীপুর বাজারে আসে। এরপর তারা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বাজার এলাকায় পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির পোস্টার লাগায়, আরেক দল পার্টির গণ-রাজনৈতিক প্রচারপত্র (লিফলেট) দরজা ও শাটারের নিচ দিয়ে বাজারের প্রতিটি ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। অন্য একটি দল বাজারের লোকজনের ওপর সতর্ক প্রহরা দেয়। প্রায় ঘণ্টা ধরে বাজারে অবস্থান নিয়ে সশস্ত্র দলটি এ ধরনের কার্যক্রম চালায়। পরে পোস্টার লাগানো শেষ হলে ৩ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে বাজার থেকে পশ্চিম দিকে রানীরহাট সড়ক হয়ে তারা চলে যায়। বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ এবং নাটোরের সিংড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী মিলনস্থল ভবানীপুর ও রানীরহাট বাজার ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে সর্বহারাদের চলাচল শুরু হয়েছে। বিশেষ করে শেরপুর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রামগুলোতে সর্বহারাদের আনাগোনা ক্রমেই বাড়ছে। কোথাও কোথাও তাদের পদচারণ চলছে গভীর রাত পর্যন্ত। ২০০৫ সালের আগস্টের শেষ দিকে সন্ধ্যায় ভবানীপুর বাজার ঘেরাও করে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র সদস্যরা এক সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতকে নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছিল। সে সময় তাদের কাজে সহযোগিতা করার জন্য এলাকাবাসীকে আহবান জানিয়েছিল সর্বহারারা। বগুড়ার শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খান মো. এরফান জানান, চরমপন্থিদের উপস্থিতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। বগুড়ার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার গাজিউর রহমান জানান, সর্বহারা পার্টির কিছু পোস্টার উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার পর ভবানীপুর ও রানীরহাট বাজার এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এসময় সর্বহারার বলে, তারা সাধারণ মানুষের প্রতিপক্ষ নয়। অতএব তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই।

এ বিষয়ে ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মোস্তফা কামাল জানান, সর্বহারা সদস্যরা গত দুই বছর আগে বাজার এলাকায় এমন পোস্টারিং করেছিলো। এবারও তারা একই কাজ করলো। তবে আগের ঘটনায় তারা গুলি করেনি। এবার গুলি করার মাধ্যমে শক্ত উপস্থিতি জানান দিল।

সূত্রঃ

http://www.bd-pratidin.com/countryvillage/2016/01/17/121383


আন্তর্জাতিক লাইনগত-বিতর্কে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি(সিসি)-র মতাবস্থান

Maoist-Flag

আন্তর্জাতিক নতুন লাইন-বিতর্ক এবং আমাদের কিছু অবস্থান সম্পর্কে

[পূবাসপা’র কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক ব্যুরো (আনব্যু) কর্তৃক প্রকাশিত]

(ফেব্রুয়ারী, তৃতীয় সপ্তাহ, ২০০৯)

[নোটঃ

কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিসি-সম্পাদক কমরেড আনোয়ার কবীর এই দলিলটি ডিসেম্বর,’০৮-এ রচনা করেন এবং প্রাথমিক আলোচনার জন্য আনব্যু-তে পেশ করেন। আনব্যু সিদ্ধান্ত নেয় যে, সিসি-সদস্য সহ সমগ্র পার্টিতে এবং মাওবাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরে একযোগেই দলিলটি আলোচনা-পর্যালোচনা করার জন্য পেশ করা প্রয়োজন। সে অনুযায়ী দলিলটি প্রকাশ করা হয় ফেব্রুয়ারী,’০৯-এ। প্রকাশের পর দলিলটি মাওবাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরে প্রচার করা হয়। এবং পার্টির অভ্যন্তরে সর্বস্তরে এর ভিত্তিতে অধ্যয়ন, আলোচনা ও বিতর্ক শুরু করা হয়।

দলিলটি বর্তমান আন্তর্জাতিক লাইনগত-বিতর্কের বিষয়াবলীকে বুঝতে যেমন সহায়ক হবে, তেমনি মৌলিক কিছু বিষয়ে পূবাসপা’র কেন্দ্রীয় কমিটির মতাবস্থানকেও পরিস্কার করবে। দলিলটি বাংলাদেশের মাওবাদীদের লাইনগত সংগ্রামের মুখপত্র নয়া বিতর্ক, আগস্ট ২০০৯ এ প্রকাশিত হয়েছিল।

সম্পাদনা বোর্ড/লাল সংবাদ]

১৯৭৬-সালে চেয়ারম্যান মাও-এর মৃত্যুর পর, বিশেষতঃ চীনে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ও আলবেনিয়ার হোক্সাপন্থী অধঃপতনের প্রেক্ষিতে বিশ্বের মাওবাদীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ’৮৪-সালে রিম গঠিত হয়েছিল। আমাদের পার্টি শুরু থেকেই তার সদস্য হয় এবং রিমের অগ্রগতিতে বিভিন্ন ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রিম ’৯৩-সালে একটি বর্ধিত সভায় মালেমা সূত্রায়ণ গ্রহণ করে। মালেমা’র ভিত্তিতে গঠিত ও পরিচালিত রিম বিশ্বের প্রকৃত মাওবাদীদের প্রধানতম কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। রিম মালেমা’র উপলব্ধি ও প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটায়। এ অগ্রগতির পথে সর্বদাই বিভিন্ন মতের দ্বন্দ্ব ছিল, দুই লাইনের সংগ্রাম ছিল, যা একটি প্রাণবন্ত বিপ্লবী কমিউনিস্ট সংগঠনের বিকাশে চালিকাশক্তির কাজ করে। এবং রিম-কমিটির নেতৃত্বে রিম মূলত/প্রধানত ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলে। কিন্তু বিগত কয়েকবছর ধরে রিম-অভ্যন্তরস্থ মতপার্থক্য একটা গুণগত স্তরে উন্নীত হয়েছে। এর শুরু হয়েছিল ’৯৩-সালে পেরু-পার্টির অভ্যন্তরে দুই লাইনের সংগ্রামের উদ্ভব ও তার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে।  প্রথম দিকে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও সাময়িক-আংশিক ঐক্যের মধ্য দিয়ে কিছুদিন এগোলেও এ শতাব্দীর শুরু থেকে এ বিষয়ক দ্বন্দ্ব রিম কমিটিসহ রিমের প্রধানতম অংশের সাথে পেরু-পার্টির প্রতিনিধিত্বের দাবীদার এমপিপি’র গুরুতর ভাঙন সৃষ্টি করে।

এ সত্ত্বেও রিম-কমিটি মূলত ঐকবদ্ধভাবে রিম-কে গতিশীল নেতৃত্ব দিয়ে চলছিল। কিন্তু ২০০৩-সাল থেকে পেরু-প্রশ্নের বাইরে অন্য নতুন প্রশ্নে রিম-কমিটির অভ্যন্তরস্থ মতপার্থক্য ও বিতর্ক গুণগত রূপ নিতে থাকে। কমরেড প্রচন্ডের নেতৃত্বে নেপাল-পার্টি বেশ কিছু নতুন লাইন ও নীতি উত্থাপন করে যা ক্রমান্বয়ে রিম-অভ্যন্তরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’-নামে পরিচিত হয়ে ওঠা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট নতুন কিছু নীতি ও লাইন, যাকে নেপাল পার্টি মালেমা’র বিকাশ বলে উত্থাপন করছে।

* এই বিতর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে রিম-কমিটি তার অভ্যন্তরীণ বিতর্কের পত্রিকা “স্ট্রাগল”-এর মাধ্যমে বিভিন্ন পার্টির বিতর্কমূলক কিছু দলিলাদি প্রকাশ করে, যাতে আমাদের পার্টির একাধিক দলিলও প্রকাশ পেয়েছে। নতুন পর্বে ৯নং সংখ্যা পর্যন্ত ‘স্ট্রাগল’-এর কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ হয়।

* ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বিতর্কে নতুনতর বিকাশ ঘটে। নেপাল পার্টি রাজতন্ত্রের পতনের পর ’০৭-সালের শুরুতে প্রকাশ্যে চলে আসে এবং মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ব্যবস্থার অধীনে তাদের সাথে যৌথভাবে সরকারে অংশ নেয়। পরে তারা ’০৮-সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। এভাবে নেপাল পার্টির নতুন লাইনগুলো বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নতুন পর্বে প্রবেশ করে। যা রিম-ভুক্ত বিভিন্ন পার্টির মাঝে গুরুতর বিতর্ক ও অনাস্থার সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে রিম-কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য আরসিপি’র প্রধান নেতা কমরেড বব এ্যাভাকিয়ান এ সময়টাতেই তার বেশ কিছু মতাবস্থানকে সংশ্লেষিত করে গুণগতভাবে এগিয়ে নেন, যাকে তারা “নয়া সংশ্লেষণ”(নিউ সিনথেসিস) নামে মালেমা’র বিকাশ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এমনকি এর বিরোধিতা করে আরসিপি’র মধ্যে ভাঙনও ঘটে ’০৭-সালে। উল্লেখ্য যে, নেপাল পার্টির লাইনকে আরসিপি গুরুতরভাবে বিরোধিতা করে, এবং এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণের একটা দিক হলো এই বিরোধিতার মধ্য দিয়ে যে বিকাশ সেটা।

অর্থাৎ, রিম-কমিটির প্রধানতম দুই সদস্য-পার্টি আপাতভাবে দুই বিপরীতধর্মী অবস্থান থেকে মালেমা’র বিকাশ সাধনের দাবী করছে।

পাশাপাশি পেরু-পার্টির কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্বের দাবীদার এমপিপি এই পরিস্থিতিতে রিম-কমিটি, প্রচন্ড পথ ও এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বৈরী আক্রমণ বাড়িয়ে তোলে, যা তারা অনেক আগেই শুরু করেছিল।

এই সমগ্র পরিস্থিতিতে বাস্তবে রিম-কমিটি কার্যকরভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে কোন ভূমিকা বিগত দুই বছর ধরে রাখতে পারেনি। এটা সুস্পষ্ট যে, এই লাইন-বিতর্কের অন্ততঃ প্রাথমিক একটি মীমাংসা ব্যতীত রিম-কমিটি ও রিম পুনরায় গতিশীল ভূমিকায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না।

* আমাদের পার্টি রিম-গঠনের শুরু থেকেই আমাদের সাধ্যমত আন্তর্জাতিক বিতর্কে অংশ নিয়ে আসছে। কারণ, প্রকৃত আন্তর্জাতিকতাবাদী কমিউনিস্ট সংগঠন হিসেবে আমাদের পার্টি মনে করে যে, আমাদের লাইন হলো আন্তর্জাতিকতাবাদী ও প্রধানত আন্তর্জাতিক। সুতরাং আন্তর্জাতিক বিতর্কে সঠিক অবস্থান গ্রহণ না করে দেশীয় কর্মক্ষেত্রে সঠিক ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়।

সেজন্য আমাদের পার্টি রিম-পরিসরের এই নতুন বিতর্ক, লাইন-সংগ্রাম ও পর্যালোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আমরা প্রথমদিকে প্রচেষ্টা নিয়েছিলাম “স্ট্রাগল”-এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা, অন্ততপক্ষে তার প্রধান রচনাগুলো বাংলায় প্রকাশ করা। এটা আমাদের পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব ছিল না। তাই আমরা এদেশের বিভিন্ন মাওবাদী কেন্দ্র, শক্তি ও ব্যক্তির সাথে আলোচনা করি, যাতে যৌথ সামর্থে একাজোট করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে কিছু কিছু সাড়া পাওয়া গেলেও এ কাজে সক্ষম অনেক কমরেডই সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসেননি। আমাদের পার্টি একক উদ্যোগে অথবা অন্য কিছু শক্তির সাথে যৌথভাবে যতটা সম্ভব কাজটিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা চালায় যা এখনো চলমান।

কিন্তু পরবর্তীকালে লাইন-বিতর্ক এতবেশী ব্যাপকতা অর্জন করেছে যে, শুধুমাত্র মৌলিক গুরুত্বসম্পন্ন দলিলাদির একটা প্রাথমিক তালিকা করলেও সেগুলো আমাদের সামর্থ্যে অনুবাদ করা ও প্রকাশ করা জরুরীভাবে সম্ভব নয়।

অথচ এই বিতর্কে সমগ্র পার্টিকে, অন্তত পক্ষে পার্টির নেতৃত্ব ও কেডার শক্তিকে সমাবেশিত করা খুবই জরুরী। শুধু পার্টিরই নয়, এদেশের মাওবাদী আন্দোলনের প্রধান স্তরগুলোতে এই বিতর্ক আলোচনা করাটা অতি জরুরী। এটা আন্তর্জাতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশীয় আন্দোলন পুনর্গঠিত করার জন্য এক জরুরী করণীয়। একই সাথে আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্যও এটা অপরিহার্য।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের পার্টির প্রধান নেতৃত্ব-স্তরে যতটা অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা হয়েছে তার নির্যাস তুলে এনে সমগ্র পার্টি ও দেশীয় আন্দোলনের অভ্যন্তরে তা উত্থাপন করা প্রয়োজন বলে সিসি মনে করছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমরা মাও-মৃত্যুর পরবর্তী মহাবিতর্কেও পড়েছিলাম। যখন কিছু সার্কুলারের মাধ্যমে প্রধানতম বিষয়াবলী ও তার বিতর্ককে, একইসাথে আমাদের প্রাথমিক মতাবস্থানকে প্রকাশ করা হয়েছিল। যা আমাদের পার্টিকে তখনকার মত কিছুটা সচেতন হতে ও এদেশের আন্দোলনকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম করে তুলেছিল।

আমাদের পার্টির নেতৃত্ব-স্তরে যতটা অধ্যয়ন করা হয়েছে তার ভিত্তিতে আমরা মনে করি যে, এই বিতর্ক বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে অতীতের বিভিন্ন মহাবিতর্ক, যেমন, ’৬০-দশকে রুশ-চীন মহাবিতর্ক নামে পরিচিত মতাদর্শগত মহাবিতর্ক, অথবা মাও-মৃত্যুর পর রিম-গঠনের প্রক্রিয়ায় ও পরে মাওবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার যে মহাবিতর্কÑ সেসবের মতই, বা তার চেয়ে বেশী জটিল, গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাপক ও গভীর তাৎপর্যসম্পন্ন এক মতাদর্শগত মহাবিতর্ক।

তাই, এই লাইন-বিতর্কে মৌলিক কিছু অবস্থান গ্রহণ করাটা রিম-সদস্য হিসেবে আমাদের পার্টির জন্য জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিকতাবাদী দায়িত্ব হয়ে পড়েছে বিশেষতঃ মালেমাবিরোধী নীতি ও লাইনকে সংগ্রাম করা, তাকে পরাজিত করা এবং মালেমা’র পতাকা উড্ডীন রাখা। দায়িত্ব হয়ে পড়েছে এই সংগ্রামে দেশে ও দেশের বাইরে- সর্বত্র অন্যদের থেকে শিক্ষা নেয়া, অন্যদেরকে জয় করা, বিভ্রান্তদেরকে সংশোধনে ভূমিকা রাখা এবং একেবারে অসংশোধিতদেরকে বিচ্ছিন্ন করা।

পাশাপাশি দায়িত্ব এসে পড়েছে প্রকৃত মালেমা-বাদীদের অভ্যন্তরস্থ মতপার্থক্যের উপর, পর্যালোচনার উপর ভূমিকা রাখা। কারণ, নিজেদের অবস্থান ও উপলব্ধিকে উচ্চতর লেবেলে উন্নীত না করে মালেমা-বিরোধী নীতি ও লাইনকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা সম্ভব নয়।

আমাদের পার্টি বিগত কয়েক বছর ধরে এই ভূমিকাটি পালনের জন্য বিশেষ উদ্যোগী হয়েছে। পার্টি “স্ট্রাগল”-সহ বিভিন্ন মুখপত্রে লেখা দিয়েছে, চিঠিপত্র দিয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে কথা বলেছে, এবং দেশে এই বিতর্কগুলোকে পরিচিত করানো ও বিভিন্ন ভুল অভিমতগুলোকে সংগ্রাম করার মাধ্যমে ভূমিকা রাখছে। তবে এখন কিছু বিষয়ে বিভক্তি রেখা টানারও সময় এসেছে এবং নতুনতর বিষয়কে হাতে নেবার সময় এসেছে।

* তাই, এই বিতর্ককে পার্টিব্যাপী আরো সুনির্দিষ্টভাবে ও সার্বিকভাবে পরিচিত করানো এবং আমাদের কেন্দ্রের মৌলিক ও কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাথমিক মতাবস্থানগুলোকে উত্থাপনের মাধ্যমে পার্টিকে সচেতন ও সজ্জিত করা, দেশের মাওবাদীদের মাঝে সুস্থ, সচেতন ও সুব্যবস্থিত বিতর্ক ও পর্যালোচনাকে ছড়িয়ে দেয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে এই বিতর্কে সক্রিয় অংশ নেবার মাধ্যমে তার পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখার সামর্থ্যকে বাড়িয়ে তোলার প্রয়াশ থেকে এ দলিলটি রচনা করা হচ্ছে।

ইতিপূর্বেও আমরা বিভিন্ন দলিলে খন্ড খন্ড ভাবে বিভিন্ন বিতর্কিত প্রশ্নে আমাদের প্রাথমিক মতাবস্থান বা পর্যালোচনা উত্থাপন করেছি। বিশেষতঃ পেরু-পার্টির কিছু লাইন এবং পেরু-পার্টিতে উদ্ভূত দুই লাইনের সংগ্রামের বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট কিছু মতাবস্থান ছিল, যা মৌলিকভাবে রিম-কমিটির মতাবস্থানের সাথে প্রধানত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। অবশ্য সমস্যাকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু মতপার্থক্যও রিম-ভুক্ত বিভিন্ন পার্টির সাথে আমাদের ছিল। কিন্তু পেরু-পার্টির প্রতিনিধিত্বের দাবীদারদের কিছু নগ্ন ও সুস্পষ্ট রিম-বিরোধী, মার্কসবাদ বিরোধী অবস্থান ও কার্যকলাপকে বিরোধিতার ক্ষেত্রে রিম-এর ঐক্যে আমরা সামিল ছিলাম ও রয়েছি।

এই দলিলে আমরা প্রধানত উত্থাপন করবো নেপাল পার্টি উত্থাপিত নতুন নীতি, লাইন ও কৌশলগুলোর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন যাকে আমরা মনে করি, সেই ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ তত্ত্বটির উপর। অন্যদিকে আমরা উত্থাপন করবো আরসিপি-উত্থাপিত বব এ্যাভাকিয়ানের ‘নয়া সংশ্লেষণ’-এর উপর যাকে তারাও মালেমা’র বিকাশ বলে দাবী করছেন।

এছাড়া নেপাল পার্টি উত্থাপিত আরো কিছু বিষয়Ñ সাম্রাজ্যবাদ-তত্ত্বের বিকাশ, ফিউশন, কৌশলগত তত্ত্ব, প্রভৃতিকেও আমরা সম্ভবমত আলোচনা করবো।

পেরু-পার্টি বা এমপিপি এখন যাকে প্রতিনিধিত্ব করে সেসবের মৌলিক প্রশ্নাবলীতে আমরা মূলতঃ রিম-কমিটির ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিতে চাই। সেসবেরও সারসংকলনের প্রয়োজনীয়তা অবশ্য রয়েছে। তবে তা এখন কম গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক প্রশ্নাবলীতে ঐকমত্য অর্জন এখন জরুরী, যার ভিত্তিতে গৌণ প্রশ্নাবলী ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেয়া ব্যতীত অন্য উপায় খোলা নেই। তাই, এ বিষয়গুলোতে আমরা বড় কোন আলোচনা ও বিতর্ক এখন করবো না। তবে নতুনতর পরিস্থিতিতে তার কিছু উত্থাপন এখানে হতে পারে। পেরু-পার্টির মৌলিক লাইনের অংশরূপে থট/পথ প্রশ্ন, জেফেতুরা—-ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের মৌলিক অবস্থানকে এখানে পুনউত্থাপন ভাল হবে।

২১-শতকের গণতন্ত্র’ গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব প্রশ্ন

নেপাল পার্টি এ ধারণাটি প্রথম উত্থাপন করে ২০০৩-সালে। এ সময়টাতেই রিম-এর দক্ষিণ-এশীয় এক সম্মেলনে নেপাল-পার্টি তাদের এ ধারণাকে প্রাথমিকভাবে ও মৌখিকভাবে প্রকাশ করে ও কিছুটা আলোচনা করে। তখনো তারা এ বিষয়ে সামগ্রিক কোন অবস্থান-পত্র বা দলিলাদি পেশ করেনি।

সে সময়টাতে নেপাল-গণযুদ্ধ বিরাটাকারে বিকশিত হয়ে উঠেছিল এবং গ্রামাঞ্চলে বিশাল অঞ্চল মুক্ত হয়ে পার্টির নেতৃত্বে প্রশাসন চালু হয়েছিল। বাহিনীরও ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। পার্টি তখন দেশব্যাপী ক্ষমতাদখলের জন্য রণনৈতিক ভারসাম্যের স্তর ছাড়িয়ে আক্রমণে যাবার চিন্তা করছিল। এ অবস্থায় নেপাল পার্টি একটি বিপ্লবী ক্ষমতাসীন পার্টির জরুরী আগামী সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিল যা খুবই বাস্তব সম্মত, দুরদর্শী ও বিজ্ঞচিত ছিল।

তারা এ সময়ে যে বিষয়টিকে আকড়ে ধরেন তাহলো, চীনে জিপিসিআর সত্ত্বেও বিপ্লব কেন পরাজিত হলো, পার্টি কেন সংশোধনবাদী হলো। মাও-মৃত্যুর পর যে ব্যাখ্যা মাওবাদীরা দিয়েছেন তাতেই সীমিত না থেকে তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া এবং সর্বহারা রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার দ্বান্দ্বিক সারসংকলন করার এ প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছিল।

পার্টি ইতিমধ্যে নিজেদের ক্ষমতা, বাহিনী ও পার্টির মধ্যে উদ্ভূত আমলাতন্ত্রের সমস্যার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই অভিমতের দিকে চালিত হতে থাকে যে, সমাজতন্ত্রের অধীনে জনগণের গণতন্ত্রকে যথোপযুক্তভাবে প্রসারিত করতে না পারার মধ্যে আমাদের ব্যর্থতার কারণ নিহিত। এভাবে তারা বিংশ শতকের বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের অভিজ্ঞতার সারসংকলনের ভিত্তিতে নতুন ধারণা হিসেবে ‘২১-শতকের বিপ্লবের জন্য নতুন নীতি-পদ্ধতির বিকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

রিম-পরিসরে সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা ও উত্থাপিত প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নেপাল-পার্টি কিছু কিছু দলিলাদি হাজির করতে থাকে যার মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের অধীনে জনগণের গণতন্ত্রকে প্রসারিত করার জন্য স্থায়ী বাহিনী ও একনায়কত্বকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশিত  হতে থাকে। তারা গুরুত্ব দিয়ে যে কথাটি উত্থাপন করতে চান তাহলো, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র একদিকে পুরনো শাসকশ্রেণীর রাষ্ট্রের মতই একনায়কত্ব চালাবার হাতিয়ার, কিন্তু একইসাথে সেটা তার চেয়ে ভিন্নতর- কারণ, তা সব ধরণের রাষ্ট্র ও একনায়কত্ব বিলোপ করারও প্রক্রিয়া।

এজন্য তারা রাষ্ট্রীয় স্থায়ী সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের বিপরীতে সশস্ত্র জনগণের ধারণাকে গুরুত্ব দিতে থাকেন, জনগণের গণতন্ত্র/ক্ষমতাকে সামনে আনতে থাকেন, যাকিনা প্যারি কমিউনে ঘটেছিল, এবং তারা রুশ বিপ্লবের পূর্ব সেই অভিজ্ঞতাকে বরং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার চেয়ে বিশেষ মূল্য দিতে থাকেন। বলা যায়, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের (রুশ ও চীন) অভিজ্ঞতাকে তারা নেতিবাচকভাবে মূল্যায়নের দিকে চালিত হতে থাকেন।

এটা সত্য যে, সকল শ্রেণী বিভক্ত সমাজের সকল ধরণের রাষ্ট্রের থেকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রগত পার্থক্য সম্পর্কে তাদের উপরোক্ত চিন্তা ভুল নয়। কিন্তু তাসত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রথমত একটি রাষ্ট্র, যা একনায়কত্বের হাতিয়ার ব্যতিত অন্য কিছু নয়, হতে পারে না। বিশেষত যতদিন সাম্রাজ্যবাদ রয়েছে ততদিন একনায়কত্বের প্রশ্নকে কোন ভাবে দুর্বল করার অর্থ হলো সাম্রাজ্যবাদ-পুজিবাদকে শক্তি জোগানোÑ সেটা সচেতন বা অসচতন যেভাবেই ঘটুক না কেন। সেজন্যই মাও জিপিসিআর কালে সর্বহারা একনায়কত্বের তত্ত্ব অধ্যয়নের উপর এত বেশী জোর দিয়েছিলেন।

নেপাল-পার্টি যে প্রকৃত প্রশ্নটিকে উত্থাপন করেছে তার উপর গুরুত্বদান তাদেরকে রাষ্ট্র, বিপ্লব ও একনায়কত্ব সংক্রান্ত আরো মৌলিক প্রশ্নের উপর নতুন চিন্তাভাবনায় চালিত করে। এভাবে ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণাটি তার প্রথমাবস্থায় সমাজতান্ত্রিক সমাজের রং বদলানো ঠেকানোর বাস্তব ও জরুরী প্রয়োজন থেকে একটি সাধারণ ধারণার দিকে এগিয়ে যায়, যার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব প্রশ্নটির মত মার্কসবাদের একেবারে মৌলিক প্রশ্নটি।

নেপাল পার্টি দাবী করতে থাকে যে, মালেমা’র তত্ত্ব সমাজতন্ত্রের এই পরাজয়ের সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণ সক্ষম নয়। এমনকি চীনে জিপিসিআর কালে তার কিছু অগ্রগতি ঘটলেও সেটা মীমাংসিত হয়নি। তাই, তত্ত্বকে বিকশিত করতে হবে। এবং তারা এই ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ তত্ত্বটিকে তার বিকাশ বলেও ধারণা দিতে থাকেন।

তাদের এই শ্লোগান একনায়কত্ব সম্পর্কিত মার্কসীয় মৌলিক ধারণাকে দুর্বল করে বা বাতিল করে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে তারা তাদের শ্লোগানটিকে ‘২১-শতকের গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব’Ñ এভাবেও প্রকাশ করতে থাকেন।

* ইতিমধ্যে নেপাল-বিপ্লবের পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশ ঘটে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুক্ত আন্দোলনের কৌশল হিসেবে পার্টি ’০৫-সালের শেষদিকে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া পার্টিগুলোর সাথে ১২-দফা সমঝোতা স্থাপন করে। এরপর নেপাল পরিস্থিতি ও পার্টির নীতি ও পদক্ষেপগুলো দ্রুত এগিয়ে যায়। ’০৬-সালের এপ্রিলে রাজতন্ত্র পিছু হটে। পার্টি ক্রমান্বয়ে প্রকাশ্যে আসে; মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও বিদ্যমান রাষ্ট্রের মধ্যে তারা সরকারে অংশ নেয়; পরে নির্বাচনে অংশ নেয়, জয়লাভ করে ও সরকার গঠন করে।

এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় বহুদলীয় ব্যবস্থা, ‘প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় ব্যবস্থা’র ধারণাটিকে তারা নিয়ে আসেন, যা ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির এখনকার প্রয়োগকে প্রতিনিধিত্ব করে। দেশীয় ক্ষেত্রে এই লাইন কীভাবে কৌশলের নামে বিপ্লবী নীতিকে খেয়ে ফেলে সেটা আমরা বিভিন্ন দলিলপত্রে আলোচনা করেছি। সংক্ষেপে, এটা শুধুমাত্র রাজতন্ত্রকে সরিয়ে বিদ্যমান প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র, শাসকশ্রেণী ও সমাজব্যবস্থাকে মূলতঃ বজায় রাখে, কিছু কিছু সংস্কার চালিয়ে, এবং, তার অধীনে প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে। এটা বিদ্যমান ব্যবস্থার নির্বাচনকে একটি প্রতিযোগিতার পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। এটা কার্যতঃ সংসদীয়বাদকে লাইন হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও পার্টি বলছে এটা একটা কৌশলমাত্র। এক্ষেত্রে পার্টিকে আদি সর্বহারা বিপ্লবী লাইন, এবং এখনকার বুর্জোয়া সংসদীয়বাদের মধ্যে একটা মিলঝিল করার জন্য ব্যাপকভাবে সমন্বয়বাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে, নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের একটা উপস্তরের আবিস্কার করতে হয়েছে, কিন্তু এটা বরং তাদের স্ববিরোধিতাকেই প্রকাশ করছে আরো স্থূলভাবে। সবচাইতে মারাত্মক হলোÑ এটা রাষ্ট্র, বিপ্লব ও একনায়কত্ব সম্পর্কে মৌল মার্কসবাদী তত্ত্বকে ধোঁয়াশা করে দিয়েছে, তার থেকে সরে গেছে, মালেমা’র বিকাশের নাম করে।

এটা যদি হয় প্রচন্ড পথের প্রধানতম একটা স্তম্ভ, তাহলে এই প্রচন্ড পথ মালেমা’র বিকাশ নয়, বরং মালেমা থেকে সরে পড়া।

* পার্টি ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণাটি প্রথম যখন উত্থাপন করে তখনকার আগ্রহটি ভুল ছিল না। কেন সমাজতন্ত্র পরাজিত হলো- জিপিসিআর সত্ত্বেও।

     একে শুধু অনিবার্য্য পরাজয় বলাটা যথেষ্ট কিনা। জিপিসিআর-ই এর সমাধান কিনা- যে পর্যন্ত মাও করে দিয়ে গিয়েছেন? নাকি জিপিসিআর-এর তত্ত্ব-কে বিকশিত করতে হবে। এমনকি জিপিসিআর-কালেও কোন গুরুত্বপূর্ণ ভুল ছিল কিনা সে প্রশ্ন উঠানো যায় কিনা।

এ বিষয়গুলো আলোচনার দাবী রাখে, উড়িয়ে দেয়া যায় না। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান থেকে বব এ্যাভাকিয়ান ও আরসিপি এই বিষয়টিকে উত্থাপন করেছেন, যা আমরা পরে আলোচনা করবো। কিন্তু নেপাল-পার্টি শুরু থেকে এ সমস্যাটির উত্তর দিয়েছে মালেমা থেকে সরে গিয়ে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিভ্রান্তমূলক মধ্যবিত্ত ধারণা থেকে।

তারা বলেছেন, সমাজতন্ত্রের পরাজয়ের কারণ আমলাতন্ত্র- পার্টির একচ্ছত্র নেতৃত্ব ও স্থায়ী শক্তিশালী বাহিনী- যার ভেতর থেকে এই আমলাতন্ত্র আসে, এবং যা সংশোধনবাদ এনে পার্টির ও দেশের রং বদলে দেয়। সুতরাং তারা এই আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করার সমাধান হিসেবে শক্তিশালী স্থায়ী বাহিনীর বিপরীতে সশস্ত্র জনগণ, এবং পার্টির একচ্ছত্র নেতৃত্বের বিপরীতে প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় ব্যবস্থা হাজির করেন। এক্ষেত্রে তারা প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতায় ফেরত যাবার সমাধানের কথাও বলেছেন। যাকিনা জনগণের এক নতুন গণতন্ত্রের সৃষ্টি করবে। একেই তারা ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ বলছেন।

– তাদের উপরোক্ত ধারণাগুলো জিপিসিআর-এর অভিজ্ঞতাই শুধু নয়, প্যারী কমিউনের সারসংকলন এবং তার ভিত্তিতে পরবর্তীকালের রুশ ও চীন বিপ্লবের ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোকে সর্বহারা শ্রেণী লাইন ও দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা না বোঝাকে প্রকাশ করে। এবং উল্টোপথে হাটার মাধ্যমে ১৮-শতকের বুর্জোয়া গণতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে গিয়ে ঠেকে।

নিশ্চয়ই সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় স্ট্যালিনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক লাইনের ভুলের কারণে আমলাতন্ত্রের বড় বিকাশ ঘটেছিল। চীনেও আমলাতন্ত্র ছিল। কিন্তু আমলাতন্ত্র পুজিবাদ-সংশোধনবাদে অধপতনের প্রকৃত কারণ নয়। বরং বলা ভাল যে, আমলাতন্ত্র রোগের প্রকাশ, সেটা নিজেও রোগ বটে, কিন্তু মৌলিক রোগ এটা নয়। যতদিন রাষ্ট্র থাকবে, পার্টি থাকবে, একনায়কত্ব থাকবে- ততদিন আমলাতন্ত্রও থাকবে। সমস্যা হলো তার উৎপত্তিস্থলকে আঘাত করা। নইলে যতই আমলাতন্ত্র বিরোধী সংগ্রাম করা হোক না কেন, তার থেকে সৃষ্ট বিপদকে কাটানো যাবে না।

আমলাতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামের পৃথক তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। যার কথা লেনিন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু জিপিসিআর-এর যেটা বিকাশ তাহলো, বুর্জোয়া-অধিকারগুলোকে সীমিত করা- তার চূড়ান্ত বিলুপ্তির লক্ষ্যে; এবং; সেজন্য রাজনৈতিক সংগ্রামকে চাবিকাঠি হিসেবে আঁকড়ে ধরা। মার্কস বহু আগেই তার বিখ্যাত “৪-সকলসমূহ”-কে বিলুপ্ত করার কথায় এটাই এনেছিলেন। আমলাতন্ত্র বুর্জোয়া সম্পর্কের একটা দিকমাত্র, যা অর্থনৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক উপরিকাঠামোতে বিদ্যমান বুর্জোয়া সম্পর্কগুলোর থেকে সৃষ্ট ও তার থেকেই বেড়ে ওঠে। জিপিসিআর সেই জায়গাটাকেই তুলে ধরেছে। এবং দেখিয়েছে যে, এর একমাত্র সমাধান হলো বিপ্লবকে অব্যাহত রাখা, বিপ্লবকে তীক্ষ্ণ করা। এর অর্থ হলো, সর্বহারা একনায়কত্বকে শক্তিশালী করা, তাকে দুর্বল করা নয়; এর অর্থ হলো পার্টির নেতৃত্বকে সুনিশ্চিত করা, তাকে নড়বড়ে করা নয়। আর এসবই করা যেতে পারে ব্যাপক জনগণকে পার্টির নেতৃত্বে ব্যাপকভাবে জাগরিত করে, রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ ও অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তুলে- যা বুর্জোয়া গণতন্ত্রে, নির্বাচনে, সংসদে কখনই ঘটে না। নির্বাচন, সংসদ, বহুদলীয় অংশগ্রহণ এসবের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কিছু উপাদান হতে পারে বটে, কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো পার্টির নেতৃত্ব, পার্টির নেতৃত্বে জনগণের উত্থান, সর্বহারা রাষ্ট্রকে শক্তিশালীকরণ, একনায়কত্বকে শক্তিশালীকরণ ইত্যাদি। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এর কোন বিকল্প নেই। এথেকে বিচ্যুতিই বরং প্রথম ধাপেই রং বদলে ফেলা। এটা রং বদলানো ঠেকানোর কোন সমাধান নয়।

নেপাল-পার্টি আমলাতন্ত্র সম্পর্কে তাদের এই মধ্যবিত্ত/বুর্জোয়া উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা চালিত হয়ে অবধারিতভাবে নোঙর করেছে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বন্দরে, যা সর্বহারা একনায়কত্ব ও পার্টিনেতৃত্বকে দুর্বলই করে না, তাকে বর্জন করে। কার্যতঃ তা চর্চা করে বুর্জোয়া একনায়কত্ব। যা বহু আগে সমাজ-গণতন্ত্রীদের মাধ্যমে মার্কসবাদী আন্দোলনে দেখা গেছে। এরই অবশ্যম্ভাবী ফল হলো আজকের নেপালে বিপ্লব-বর্জিত সংসদীয়বাদের অনুশীলন। যা ১০বছরের বিপ্লবের ফলকে খেয়ে ফেলার দিকে এগিয়ে চলছে।

* এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব সম্পর্কে, তথা রাষ্ট্র ও বিপ্লব সংক্রান্ত মৌল মার্কসীয় তত্ত্বাবলীকে আমাদের সুগভীরভাবে পুনঃঅধ্যয়ন ও সঠিকভাবে আত্মস্থকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

অতিসংক্ষেপেÑ গণতন্ত্র কোন সার্বজনীন বিষয় নয়, যেমনটা পুজিবাদী গণতন্ত্র শিখিয়ে থাকে। সার্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণা হলো একটি বুর্জোয়া ধারণা। বুর্জোয়া শ্রেণী তার একনায়কত্বকে ধামাচাপা দেয় ‘গণতন্ত্র’ শ্লোগানের মাধ্যমে- যাতে জনগণকে বিভ্রান্ত করার শ্রেষ্ঠতম হাতিয়ার হলো তাদের সার্বজনীন ভোট। গণতন্ত্র একনায়কত্ব ছাড়া হয় না। কোন না কোন শ্রেণীর একনায়কত্বই সেই শ্রেণীর জন্য গণতন্ত্র সৃষ্টি করে। লেনিন শিখিয়েছেন, যখন একনায়কত্ব থাকবে না, তখন গণতন্ত্রেরও কোন অর্থ থাকবে না।

মার্কসবাদ শেখায় যে, রাষ্ট্র হলো একনায়কত্বের হাতিয়ার মাত্র। সুতরাং যতদিন রাষ্ট্র রয়েছে ততদিন তাহলো এক শ্রেণী কর্তৃক বিপরীত শ্রেণীকে দাবিয়ে রাখার যন্ত্র। আর বাহিনী হলো যেকোন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান উপাদান। তাই,  রাষ্ট্র থাকলে তার স্থায়ী বাহিনী থাকতে বাধ্য।

বিপ্লব হলো প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণীকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করা, সেজন্য তার বাহিনীকে ধ্বংস করা, এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ করা। এভাবে ক্ষমতাসীন শ্রেণীর একনায়কত্বকে ধ্বংস করা। এবং তার স্থলে জনগণের নতুন একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা। নতুন রাষ্ট্র, নতুন বাহিনী সৃষ্টি করা। এ ছাড়া বিপ্লবের আর কোন সংজ্ঞা নেই, আর কোন বিপ্লব হতে পারে না।

তাই, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করা, অর্থাৎ, বুর্জোয়া একনায়কত্বকে খোলাসা করা এবং জনগণের মাঝে এ সম্পর্কে যে বিভ্রান্তি ও মোহ রয়েছে তা কাটানোর কাজ হলো মার্কসবাদী রাজনীতির প্রাথমিক কর্তব্য। এটা হলো বিপ্লব করার প্রথম ধাপ।

নেপাল-পার্টি ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণা উত্থাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্র, বাহিনী, বিপ্লব, একনায়কত্ব ও গণতন্ত্র সম্পর্কে উপরোক্ত মার্কসবাদী মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে ঝাপসা করে তার থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়েছে। এটা বুর্জোয়া সংসদীয়বাদকে সামনে নিয়ে এসেছেÑ যা নেপালসহ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের বদলে বুর্জোয়া সংসদীয়বাদী সংস্কারকে সামনে আনে। সাম্রাজ্যবাদী-পুজিবাদী দেশে কর্মসূচী হিসেবে আনবে সমাজ-গণতান্ত্রিক সংস্কার। আর সমাজতান্ত্রিক সমাজে এটি সর্বহারা একনায়কত্বকে দুর্বল করা ও পুজিবাদী সম্পর্কগুলো শক্তিশালী করণের পুজিবাদের পথগামী কর্মসূচী আনবে।

আর সকল ক্ষেত্রেই এটা সর্বহারার পার্টি-নেতৃত্বকে সুনিশ্চিত করার বদলে তাকে দুর্বল করা, বুর্জোয়া নির্বাচনকে পরম করে ফেলা, নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়া, বুর্জোয়ার সাথে তাকে তথাকথিত প্রতিযোগিতায় ফেলা- ইত্যাদি নীতি সামনে আনে। যা বুর্জোয়া নেতৃত্ব বাধাহীনভাবে চলে আসবার পথ প্রশস্থ করতে বাধ্য। এবং যা সর্বহারা বিপ্লবকে সুদূর পরাহত করতে বাধ্য।

* নেপাল পার্টি সরলভাবে উপরের রাজনীতিগুলো অনুসরণ করবে, করতে বদ্ধপরিকর- বিষয়টা এরকম নয়। তাদের তত্ত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ/প্রয়োগ ও পরিণতিগুলো হলো এগুলো। কিন্তু যখন বুর্জোয়া ব্যবস্থা নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়, অথবা বুর্জোয়া প্রতিবিপ্লব আঘাত করে, তখন সদ্য বিপ্লব সাগর থেকে উঠে আসা এক বিশাল পার্টি ও জনগণের সম্বিতে আঘাত লাগে। এটা তাত্ত্বিক বিতর্কের পর্যায়ে ঘটেছে। এখন তাদের তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের সময়ও ঘটছে। এ কারণে নেপাল পার্টিকে বিপুলভাবে সমন্বয়বাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে ও হচ্ছে। এর শেষ পরিণতি দেখতে আমাদের আরো সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এর মানে এটা নয় যে, নেপাল-পার্টির ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কিত নয়া ধারণা বা তত্ত্বটিও, তাদের এ সংক্রান্ত লাইন ও নীতিগুলোও, দেখার বিষয়। এগুলো দেখার বিষয় নয়। এগুলো সুস্পষ্টভাবেই অমার্কসবাদী। তাই, এ মুহূর্তেই তা পরিতাজ্য। নেপাল পার্টি এই অমার্কসবাদী লাইন, যার নির্যাস হলো বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতান্ত্রিকতা- তাকে বর্জন না করে কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে পারবে না। এটা মালেমা’র বিকাশ নয়, মালেমা থেকে সরে পড়া।

ফ্রন্টগঠনের বিষয়টি মার্কসবাদে, বিশেষত মাওবাদে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফ্রন্টের কাজ ছাড়া বিপ্লবে ব্যাপক জনগণকে সমাবেশিত করা সম্ভব নয়, তাই, বিপ্লব করাও সম্ভব নয়। ফ্রন্ট রণনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে যেমন হয়, রণকৌশলগতভাবেও হতে পারে। কিন্তু ফ্রন্টের কাজ আদর্শগত/পার্টিগত কাজকে শক্তিশালীকরণেরই তাগাদা দেয়। যখন ফ্রন্ট ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়, তখন বেশী প্রয়োজন হয় পার্টি কাজ, মালেমা’র শিক্ষা, আদর্শগত কাজ, এবং সর্বহারা শ্রেণী লাইনের দৃঢ়তাকে এগিয়ে নেয়া। বুর্জোয়া স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের সময় যখন বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সাথে কৌশলগত সমঝোতা/ঐক্য হয়, তখন বেশী প্রয়োজন হয় সকল বুর্জোয়া ব্যবস্থার উন্মোচন, বিপ্লবের রণনৈতিক কর্মসূচীকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরার প্রশ্ন। নেপাল পার্টি রাজতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামে বুর্জোয়া সংসদীয় দলগুলোর সাথে যে ঐক্য/সমঝোতা গড়ে তুলেছিল, তখন সে ‘কৌশল’ তাদের নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনৈতিক কর্মসূচী, তথা তাদের নীতিকে খেয়ে ফেলতে থাকে। এটা বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে অতীতেও ঘটেছে- ২য় বিশ্বযুদ্ধকালে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সাথে সাধারণ ঐক্য-লাইন বুর্জোয়া গণতন্ত্রবাদ ও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে পুজিবাদের উচ্ছেদের বিপ্লবী কর্মসূচীকে খেয়ে ফেলেছিল এবং ইউরোপের একসারি দেশে কমিউনিস্ট আদর্শের কবর রচনা করেছিল। যা কিনা সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াতেও গুরুতরভাবে বেড়ে উঠেছিল। স্ট্যালিনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে রুশ পার্টি ও সমাজতন্ত্রের পুজিবাদে অধপতনের একটা বড় মৌলিক কারণ এখানে নিহিত ছিল।

এই খেয়ে ফেলাটা ‘কৌশলগত লাইন’-এর ভুল থেকে যতটা না আসে, তার চেয়ে বেশী আসে মৌলিক নীতি, বিপ্লব, তথা মালেমা’র মৌল আদর্শের প্রশ্নে দুর্বলতা ও তা থেকে বিচ্যুতি থেকে। নেপাল-পার্টির সমস্যাটিও কৌশলগত লাইনজাত নয়। হতে পারে তার শুরু হয়েছে এখান থেকে। কিন্তু তাদের মৌলিক সমস্যা ঘটেছে গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব প্রশ্নে মৌল মার্কসবাদী নীতিমালা থেকে সরে পড়া থেকে। আর এই সরে পড়াকে তারা উত্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন মালেমা’র বিকাশ সাধনের শ্লোগান তুলে।

মালেমা’র বিকাশ অপরিহার্য। কারণ, মার্কসবাদ বিজ্ঞান। বিজ্ঞান সতত বিকাশশীল। বিকাশশীল না হয়ে সে বিজ্ঞান হিসেবে নিজ সত্ত্বা বজায় রাখতে সক্ষম নয়। মার্কসবাদও এর অন্যথা নয়। মার্কসবাদের বিকাশের প্রশ্নটি আজকের বিশ্বে আরো গুরুত্ব দিয়ে সামনে এসেছে, কারণ, প্রথমতঃ সমাজতন্ত্র বিগত শতকে বহু বিজয় সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন। দ্বিতীয়তঃ বস্তুগত বাস্তবতা উপযোগী নীতি আবিস্কার ছাড়া বিপ্লব এগোতে পারবে না। বিগত কয়েক দশকে, বিশেষতঃ ‘বিশ্বায়ন’ পরবর্তী কালে বিশ্বের বস্তুগত বাস্তবতারও বিপুল পরিবর্তন হয়েছে। যাকে আমাদের তত্ত্ব ও লাইনে ধারণ করতে হবে। কিন্তু মালেমা’র এই বিকাশ মালেমা’র মৌল নীতিগুলোকে ভিত্তি করেই হতে হবে। মালেমা বলে পঠিত, গৃহীত সববাক্যই/সবকিছুই মালেমা নয়। তদুপরি গুণগত বিকাশ অতীত থেকে রাপচারও দাবী করে। কিন্তু সেটা তখনই মার্কসবাদী হবে, যদি তা মার্কসবাদী মৌল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। নইলে তা মার্কসবাদ থাকে না, মার্কসবাদ বিরোধী মতাদর্শ হয়ে পড়ে। নেপাল পার্টি এখানেই বিচ্যুত হয়েছে।

পাঠ্যঃ

         ১।   সিপিএন(মাওবাদী)’র তাত্ত্বিক মুখপত্র “ওয়ার্কার”-এর ৭নং সংখ্যায় এ বিষয়ে কমরেড বাবুরাম-এর নিবন্ধ এবং তার  উপর আরসিপি’র সমালোচনা (স্ট্রাগল/৯-এ প্রকাশিত);

২।   ওয়ার্কার/১০-এ প্রকাশিত কয়েকটি রচনা।

৩।  বব এ্যাভাকিয়ান- ডেমোক্র্যাসি এন্ড ডিকটেটরশীপ এবং এ বিষয়ক আরো রচনা।

৪।   গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা- মার্কস।

৫।   রাষ্ট্র, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, সর্বহারা বিপ্লব ও বিশ্বাসঘাতক কাউটস্কি- লেনিন।

৬।   জিপিসিআর-এর গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি। বিশেষতঃ বুর্জোয়ার উপর সর্বাত্মক একনায়কত্ব     পরিচালনা সম্পর্কে- চ্যাং চুন চিয়াও।

৭।  সমাজতন্ত্র ও সর্বহারা বিপ্লব অধ্যায়/মাও চিন্তাধারার সপক্ষে- আনোয়ার কবীর।

৮।  নেপাল পরিস্থিতি সম্পর্কে সিসি দলিল- এপ্রিল, ২০০৮ (নয়া বিতর্ক/২)।

২। এ্যাভাকিয়ানের “নয়া সংশ্লেষণ”

আরসিপি নেতা বব এ্যাভাকিয়ান মাও-মৃত্যুর পরবর্তীতে বিগত ৩০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিগত অভিজ্ঞতাগুলোর সারসংকলন কাজ করে চলেছেন। এ বিষয়ে ১৯৮১-সালে তার গুরুত্বপূর্ণ দলিল “কনকার দ্যা ওয়ার্ল্ড”(ঈড়হয়ঁবৎ ঃযব ড়িৎষফ) দিয়ে এর গুণগত সূচনা ঘটে বলা চলে। বিগত ৩০-বছর ধরে ধাপে ধাপে যে সারসংকলনগুলো তিনি করেছেন সেগুলো সংশ্লেষিত হতে থাকে বিগত কয়েক বছর ধরে। বিশেষতঃ পিসিপি’র প্রতিনিধিত্ব দাবীকারী এমপিপি’র লাইনকে ও সেইসাথে পিসিপি’র কিছু ঐতিহাসিক লাইনের ত্রুটি/দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ও পরে সিপিএন-এর ‘গণতন্ত্র’ লাইনকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগুলো সংশ্লেষিতভাবে আরো বিকশিত হয় ও নতুন স্তরে উন্নীত হয় বলে তারা মনে করেন। আরসিপি দাবী করছে যে, গত শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম যুগের অবসান ঘটেছে, মাও-মৃত্যুর পর তা সার্বিক বিপর্যয়ে প্রবেশ করেছে এবং আন্দোলন নতুন এক স্তরে প্রবেশ করেছে যখন বিগত স্তরের মৌলিক সারসংকলন করা, মতবাদকে উচ্চতর স্তরে উন্নীত করা এবং তার ভিত্তিতে নতুন স্তরের আন্দোলন গড়ে তোলা ব্যতীত কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।

* কমরেড এ্যাভাকিয়ান বহুবিধ বিষয়ে সারসংকলন- তথা নতুনতর অবস্থান, পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করলেও প্রধানতঃ দর্শন ও রাজনীতিগত কিছু বিষয়ে এই মৌলিক অগ্রগতির দাবী করছে আরসিপি। এর মৌলিক পয়েন্টগুলো শুধু উত্থাপন এখানে আমরা করতে পারি। কারণ, বিষয়গুলো এত বেশী মৌলিক, সেগুলোর উপর এ্যাভাকিয়ানের আলোচনা-পর্যালোচনা-বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন ও সংশ্লেষণ এত ব্যাপক যে, সেগুলোকে মোটামুটিভাবে আলোচনা করাটাও এখানে দুঃসাধ্য। বিশেষতঃ যা প্রায় অসম্ভব তা হলো, এ বিষয়গুলোতে এখনি সার্বিক কোন মূল্যায়ন টানা, যদিও বেশ কিছু বিষয়ে আমাদের নেতৃত্ব-স্তরে প্রাথমিক অবজার্ভেশন রয়েছে। কিন্তু এই অবজারভেশন পার্টিতে ও পার্টির বাইরে মাওবাদী মহলে, বিশেষতঃ আন্তর্জাতিক পরিসরে আরো অনেক আলোচনার দাবী রাখে বলে আমাদের ধারণা। তাই, এখানে আমরা মূলতঃ এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণকে খুবই প্রাথমিকভাবে শুধু পরিচিত করণের প্রচেষ্টা নেবো- যাতে সচেতন ও আগ্রহী কমরেডগণ ও ব্যক্তিগণ ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় অধ্যয়নকে এগিয়ে নিতে পারেন। একইসাথে আমাদের প্রাথমিক বিবেচনার কিছু কিছু পয়েন্টও আমরা উত্থাপন করতে চেষ্টা করবো, যা পর্যালোচনাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে, এবং কিছু মূল্যায়নধর্মী প্রবণতাকেও তা প্রকাশ করবে।

দর্শন

) অনিবার্যতাবাদ/নিয়তিবাদ (ইনএভিটেবল-ইজম/ডিটারমিনিজম)

মার্কসবাদের উদ্ভবের সময় থেকেই ‘নেতিকরণের নেতিকরণ’ নিয়ম দ্বারা মানব সমাজের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হয়। এ থেকে বলা হতো যে, আদিম সাম্যবাদী সমাজের নেতিকরণ হয় শ্রেণী বিভক্ত সমাজ দ্বারা, এবং শ্রেণী বিভক্ত সমাজ নেতিকরণ হবে পুনরায় উচ্চতর সাম্যবাদী সমাজ দ্বারা। যেহেতু ‘নেতিকরণের নেতিকরণ’ নিয়মটিকে বস্তুর বিকাশের একটি সাধারণ নিয়ম বলে ধরা হয়েছিল, তাই সমাজ-বিকাশের ইতিহাসেও এর ফলে উক্ত পরিণতিকে অনিবার্য বলে মনে করা হতো। কমিউনিজম-কে এভাবে অনিবার্য মনে করাটা হলো অনিবার্যতাবাদের একটা দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ, কমিউনিজম যে আসবে- এটা পূর্ব নির্ধারিত। এর কোন অন্যথা হতে পারে না। এটা নিয়তিবাদকেও প্রকাশ করে। এটা ইতিহাসকে পূর্ব-নির্ধারিত বলে মনে করার দিকে যায়।

মার্কসবাদের অভ্যন্তরে এই ধরণের চেতনা এক ধরণের ধর্মবাদী চেতনাকে নিয়ে আসে, যদিও এ ত্রুটি ছিল মার্কসবাদের গৌণ দিক।

এমনকি মাও-পূর্ব যুগ পর্যন্ত কমিউনিজম-কে একটা দ্বন্দ্বহীন, স্বর্গীয় যুগ ও সমাজের মত তুলে ধরা হয়েছে।

– মাও ‘নেতিকরণের নেতিকরণ’ নিয়মকে সারসংকলন করেন। কমিউনিস্ট সমাজেও দ্বন্দ্ব চালিকাশক্তি হবে তা তুলে ধরেন, এভাবে তিনি পূর্ববর্তী সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসায় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু অনিবার্যতাবাদ বা নিয়তিবাদ থেকে তিনিও মুক্ত হননি।

) যান্ত্রিক বস্তুবাদের প্রভাব/চেতনার ভূমিকার অবমূল্যায়ন

অর্থনৈতিক ভিত্তি ও তার উপর স্থাপিত উপরিকাঠামো, বিশেষতঃ চেতনার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরণের স্থূল ও যান্ত্রিক বস্তুবাদী প্রবণতা মার্কসবাদে ক্রিয়াশীল ছিল। এক্ষেত্রে চেতনার গুরুত্বকে, তার স্বতন্ত্র পরিমন্ডল ও নিয়মকে এবং বস্তুগত বাস্তবতাকে রূপান্তরিত করার শক্তিকে অবহেলা করা হয়েছে।

এটা এক ধরণের অবনমিতকরণবাদ/রিডাকশানিজম- যা কিনা অর্থনৈতিক ভিত্তিকে একতরফা ও সরলরৈখিকভাবে গুরুত্ব দেয় এবং সবকিছুকে তাতেই নামিয়ে(রিডিউস) আনে।

মাও এ প্রশ্নেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। চেতনার গুরুত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে নিয়ে আসেন। কিন্তু উপরোক্ত অনিবার্যতাবাদ/নিয়তিবাদ এবং অবনমিতকরণবাদ থেকে যাওয়ায় তা চেতনার এই গুরুত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরতে পারেনি।

) প্রয়োগবাদ

 কতকগুলো প্রবণতা আকারে এই সমস্যা মার্কসবাদী আন্দোলনে বিরাজ করছে।

যেমন-

ইনস্ট্রুমেন্টালিজম- প্রকৃত বস্তুগত সত্যকে না দেখে, বরং আশু ফলাফল দ্বারা তত্ত্বের সত্যতা নির্ধারণ করা।

অভিজ্ঞতাবাদ (এমপিরিসিজম)- শুধু আশু ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই সত্যকে জানা যায়- এই চেতনা।

এ্যাপ্রিওরিজম- বস্তুর থেকে চেতনাকে না এনে বস্তুর উপর চেতনা আরোপ করা।

পজিটিভিজম- বিজ্ঞানকে অনুশীলন/অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমিত করা। তত্ত্ব  যে এগিয়ে থাকে তাকে অস্বীকার করা।

* এসবই প্রয়োগবাদী সমস্যা আকারে বিরাজ করে যা তত্ত্ব ও অনুশীলনের সম্পর্কের বিষয়ে বিভিন্নমুখী ত্র“টিপূর্ণ প্রবণতা।

) জ্ঞানতত্ত্ব

সত্য বস্তুগত। বস্তু যেভাবে আছে সেটাই সত্য। এটা দর্শকের শ্রেণী অবস্থানের উপর নির্ভরশীল নয়।

কিন্তু মার্কসবাদী আন্দোলনে ‘শ্রেণী সত্য’(ক্লাস ট্রুথ) বা ‘রাজনৈতিক সত্য’(পলিটিক্যাল ট্রুথ) বলে যে ধারা চালু ছিল সেটা বস্তুগত সত্যকে আবিস্কার ও ধারণ করায় অন্য শ্রেণীর কোন ব্যক্তি/গোষ্ঠীর সামর্থ্যরে সম্ভাব্যতাকে বাতিল করেছে।

এভাবে অনেক সময় আশু ফলাফল দ্বারা ও শ্রেণীর নামে বস্তুগত সত্য চাপা পড়েছে।

এ্যাভাকিয়ান শ্লোগান তুলেছেন, সর্বহারা শ্রেণী বলেই আমরা সত্যকে ধারণ করি এটা সঠিক সূত্রায়ন নয়। এটা ‘শ্রেণী সত্য’-কে নিয়ে আসে। বরং সত্য বস্তুগতভাবে শ্রেণী-উর্ধভাবে বিরাজমান; আর সর্বহারা শ্রেণী তার ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে সেই সত্যকে সবচেয়ে বেশী ও সঠিকভাবে ধারণ করে বলেই আমরা সর্বহারা শ্রেণী লাইন অনুসরণ করি।

* উপরে উত্থাপিত দার্শনিক প্রশ্নাবলী এত সংক্ষিপ্ত, সরল, বিমূর্ত ও সহজ নয়। বরং খুবই জটিল, ব্যাপক, গভীর এবং সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিবিধ বাস্তব রাজনৈতিক ও অন্যান্য অভিজ্ঞতায় কিভাবে এই দার্শনিক অবস্থানগুলো নেতিবাচক বা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে ও রাখছে, এবং আগামী আন্দোলনকে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে কীভাবে এগুলো প্রভাব রাখবে তার বিস্তারিত বহুব্যাপ্ত আলোচনা এ্যাভাকিয়ান তার অসংখ্য রচনা ও আলোচনায় করেছেন।

তবে সংক্ষিপ্তভাবে উপরোক্ত পয়েন্টগুলো হলো মৌলিক প্রশ্ন ও উপাদান যাকে ধরে আমরা আমাদের উপলব্ধি, আলোচনা ও বিতর্ককে এগিয়ে নিতে পারি।

পাঠ্য:

১।   অন এপিসটোমলজী- এ্যাভাকিয়ান।

২।   হোয়াট ইজ নিউ সিনথেসিস- ঐ।

৩।  অনুশীলন সম্পর্কে- মাও।

৪।   সঠিক চিন্তাধারা কোথা থেকে আসে- মাও।

৫।   টকস্ অন ফিলোসফি- মাও।

৬।   দর্শন অধ্যায়/মাওচিন্তাধারার সপক্ষে- আনোয়ার কবীর।

রাজনীতিক প্রশ্নাবলী

এ্যাভাকিয়ানের “নয়া সংশ্লেষণ”-এ রাজনৈতিক প্রশ্নে দুটো প্রধান বিষয় রয়েছে- ১) আন্তর্জাতিকতাবাদ; ও ২) সমাজতান্ত্রিক সমাজে একনায়কত্ব ও গণতন্ত্র প্রশ্ন। এ দুটো বিষয়কে সংক্ষেপে নীচে উত্থাপন করা হচ্ছে।

। আন্তর্জাতিকতাবাদ

লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্বটিকে বিকশিত করে তার অধিকতর ব্যাখ্যা দিয়েছে আরসিপি, এবং বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতিকে আলোচনা করেছে। এ থেকে তারা দেখাচ্ছে যে, শ্রমিক শ্রেণীর যে আন্তর্জাতিকতাবাদ তার ভিত্তি এখন আরো অনেক বিকশিত ও প্রসারিত।

আইসিএম-এ, বিশেষতঃ স্ট্যালিন-আমল থেকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-চক্রান্তের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্নকে ঘিরে এক ধরণের জাতীয়তাবাদী প্রবণতা বিকশিত হয়ে ওঠে বলে এ্যাভাকিয়ান বহু পূর্বেই সারসংকলন করেছিলেন। যাকে আরো বিকশিত করে তিনি দেখাতে চাইছেন যে, আইসিএম-এ সাধারণ প্রবণতা হয়ে দেখা গেছে নিজ দেশের বিপ্লবকে প্রাধান্য দানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব-বিপ্লবের স্বার্থকে দুর্বল করে ফেলা। যা জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বিকশিত করে তোলে।

নয়া সংশ্লেষণ হলো এই যে, আমরা কাজ করছি বিশ্ব রণক্ষেত্রে, আমাদেরকে কাজ করতে হবে বিশ্ব-বিপ্লবের স্বার্থ থেকে, তাকে প্রাধান্য দিয়ে। জাতীয় বিপ্লবের স্বার্থের সাথে এটা অনেক সময় দ্বন্দ্বমূলক হয়। সেক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্বের মীমাংসা অবশ্যই জটিল, কিন্তু বিশ্ববিপ্লবের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে জাতীয় বিপ্লবের স্বার্থ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলে তা মেনে নিতে হবে, যাকিনা আইসিএম-এ ঘটেছে উল্টোভাবে।

তেমনি, আজকের যুগে এক দেশে বিপ্লব ঘটলেও তার পরিস্থিতি যতনা দেশীয়, তার চেয়ে বেশী করে বিশ্ব পরিস্থিতির থেকে জাত। একেও অনেক সময়ই বিপরীতভাবে দেখা হয়েছে।

সুতরাং, আরসিপি দাবী করছে যে, এ্যাভাকিয়ানের এই সংশ্লেষণ মার্কসবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদকে নতুন স্তরে উন্নীত করেছে এবং আইসিএম-এর এ যাবতকালের নেতিবাচক জাতীয়তাবাদী বিচ্যুতি ও প্রবণতার সারসংকলন করেছে।

পাঠ্যঃ

১।   অন ইন্টারন্যাশনালিজম- এ্যাভাকিয়ান।

২।   কনকার দ্যা ওয়ার্ল্ড- ঐ।

৩।   রিম-ঘোষণা থেকে ফ্যাসিবিরোধী লাইনের সারসংকলন অধ্যায়।

। সমাজতন্ত্র

এ্যাভাকিয়ানের সংশ্লেষণ অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেছে সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার উপর। তা স্ট্যালিন-সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার সারসংকলনভিত্তিক মাও-এর জিপিসিআর-কে তুলে ধরেছে; কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমগ্র অভিজ্ঞতার কিছু সাধারণ দুর্বলতা ও ত্র“টিকে তুলে ধরার কথা বলছে যা কিনা মাও-কে ছাড়িয়ে গেছে এবং সমাজতন্ত্রের নতুন মডেল স্থাপন করার দাবী তুলেছে।

সমাজতন্ত্রে একনায়কত্ব ও গণতন্ত্র প্রশ্নটিতে এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণের প্রধান বিষয়কে তিনটি পয়েন্টে তুলে ধরা যায়। তাহলো-

– মতপার্থক্যের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি;

– বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকার প্রসার; এবং

– শিল্প, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও সৃজনশীলতার বিকাশ।

‘সংশ্লেষণ’ দাবী করে যে, এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অগ্রগতি জিপিসিআর-এ হলেও তাতে দুর্বলতা ছিল।

প্রথমতঃ সরকারী/রাষ্ট্রীয় মতবাদ থাকার প্রশ্ন।

সংশ্লেষণ বলছে পার্টির নেতৃত্ব, পার্টির নেতৃত্বকারী মতাদর্শ আমরা স্পষ্ট করে তুলে ধরবো। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেকেই তার সাথে একমত হবেন না। তাদের নিজ মত/মতাদর্শ পোষণ করা, বলা, বিতর্ক করার সুযোগ দিতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ এইসব ভিন্ন মতাদর্শ-ভিত্তিক রাজনৈতিক গ্র“প, সংগঠন করার সুযোগ থাকতে হবে।

এগুলো বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিউদ্যোগকে বিকশিত করবে, ব্যক্তি-অধিকারকেও।

একে এ্যাভাকিয়ান প্রকাশ করেছেন ‘সলিড কোর, উইথ এ লট অব ইলাসটিসিটি’(ঝড়ষরফ পড়ৎব, রিঃয ধ ষড়ঃ ড়ভ বষধংঃরপরঃু)- এই সূত্র দ্বারা।

* এছাড়াও রাষ্ট্রের মৌলিক ইস্যুগুলো ব্যাপক বিতর্কিত হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাচনের ভূমিকা, সরকার বহির্ভূত বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন হিসেবে সুশীল সমাজের বিকাশ, শারীরিক শ্রম ও মানসিক শ্রমের দ্বন্দ্ব মোকাবিলার জন্য নতুন উপায়, যাতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ও ভিন্নমতের সুযোগ বিদ্যমান থাকবে- ইত্যাকার বহুবিধ সংস্কারকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র/সমাজে আনয়নের গুরুত্বকে সংশ্লেষণ পেশ করেছে।

** দর্শন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে উপরোক্ত মৌলিক বিকাশ বিপ্লব সংঘটনের রণনীতিগত ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখে সেক্ষেত্রেও ‘সংশ্লেষণ’ কিছু সাধারণ বিষয়কে তুলে ধরেছে যা এসেছে বিশেষভাবে আমেরিকার মত একটি সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির দেশে বিপ্লবের আলোচনায়।

সেক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোতে নয়া সংশ্লেষণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বা তার বিকাশকে গুরুত্ব দিচ্ছে সেগুলো হলো-

) সংকট ও বিপ্লবী পরিস্থিতি

এ যাবতকাল যান্ত্রিক ও সরলরৈখিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের ‘সাধারণ সংকট’ বলে যে ধারণা প্রচলিত ছিল তার সাথে ‘সংশ্লেষণ’ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।

সংশ্লেষণ বলছে যে, সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা নিজ চরিত্র ও কর্ম-ধারার কারণে সংকটে পড়ে, কিন্তু তা আবার কাটিয়ে নতুন স্পাইরাল-এ(ঘূর্ণন/আবর্ত) প্রবেশ করে। বিপ্লবী পরিস্থিতির জন্য এর সাথে প্রয়োজন একটি বড় বিপ্লবী জনগণের আবির্ভাব। এই দুয়ের সমন্বয়েই বিপ্লবী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

) অপেক্ষা করা, পাশাপাশি তরান্বিত করা

বস্তুগত ও আত্মগত’র দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে ‘সংশ্লেষণ’ গুরুত্ব দিচ্ছে।

পুরনো ধারা হলো যান্ত্রিকভাবে বস্তুগত পরিস্থিতির উপর নির্ভর করা। এর প্রতি নিস্ক্রিয় থাকা। যা ঐসব দেশে সংস্কারবাদী ধারাকে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে যদিও ইচ্ছার ভিত্তিতে বিপ্লব হয় না, কিন্তু আমেরিকার মত দেশে ডিটারমিনিস্ট ধারণা আত্মগত ভূমিকার গুরুত্বকে নতুন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়। স্বাধীনতা শুধু প্রয়োজনের স্বীকৃতি নয়, তার রূপান্তরও বটে- একে ‘সংশ্লেষণ’ বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

) “কী করিতে হইবে” মতবাদ

এই মতবাদ লেনিন এনেছিলেন, অর্থনীতিবাদকে সংগ্রাম করা, বাইরে থেকে বিপ্লবী রাজনীতি আরোপ করার প্রশ্নকে তুলে ধরে। ‘সংশ্লেষণ’ তাকে উদ্ধার, রক্ষা ও বিকাশের দাবী করে। আরো গুরুত্বের সাথে ও ব্যাপকতার সাথে অর্থনীতিবাদ- যা আশু সমস্যায় কেন্দ্রীভূত থাকে, এবং রণনীতিগত ও আদর্শগত কাজকে কার্যতঃ ভুলিয়ে দেয়, তাকে সংগ্রাম করার প্রয়োজনকে এটা তুলে ধরে। শুধু বিপ্লবী রাজনীতিই নয়, শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণকে সমাজের সমগ্র ক্ষেত্রে জড়িত করা, বিপ্লবকে সমগ্রভাবে জানা ও সর্বক্ষেত্রে সমাজের রূপান্তরের জন্য কমিউনিজমকে বলিষ্ঠভাবে আরোপ করার বিষয়টিকে নিয়ে আসে।

) ফ্রন্ট

ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্যের মাধ্যমে শুধু বিপ্লবের জন্যই নয়, কমিউনিজম পর্যন্ত যাবার জন্য ফ্রন্টের গুরুত্বকে তুলে ধরা।

) বিপ্লবের সম্ভাবনা

আমেরিকার মত দেশে বিপ্লব সম্ভব- একে বস্তুগত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে তুলে ধরা।

পাঠ্যঃ

।   নিউ সিনথেসিস- এ্যাভাকিয়ান।

।   এমানসিপেটিং হিউম্যানিটি- ঐ।

।   কমিউনিজম, নতুন মেনিফেস্টো- আরসিপি।

আমাদের অভিমত

প্রথমতঃ এ্যাভাকিয়ান মালেমা ও কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিগত ইতিহাসকে প্রধানতঃ ইতিবাচক বলে তুলে ধরেছেন এবং পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিপক্ষে দাড়িয়ে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, সমাজতন্ত্র, সর্বহারা একনায়কত্ব, বিশেষতঃ জিপিসিআর-কে তুলে ধরেছেন যা ইতিবাচক। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার যেকোন সারসংকলনে, বিশেষতঃ রাপচারের সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিশাস্ত্রের(গবঃযড়ফড়ষড়মু) অনুসরণ এক অপরিহার্য বিষয়। এটা আমাদের নিজেদের শিবির থেকে বিচ্যুত হবার ঝুঁকি দূর করে।

দ্বিতীয়তঃ বিগত শতকে সমাজতন্ত্রের পরাজয় শুধুমাত্রই অনিবার্য ছিল তা নয়। বরং সর্বোচ্চ যে অভিজ্ঞতা জিপিসিআর- তারও দুর্বলতা ও ত্রুটি ছিল কিনা সেই বিবেচনা ও মূল্যায়ন প্রচেষ্টা পরিত্যাজ্য নয়। বিশেষতঃ সমাজতন্ত্রগুলো অধপতিত হবার মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুতর দুর্বল হয়ে পড়ার বর্তমান অবস্থায়, যা সুদীর্ঘ ৩০বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। যদিও এই মূল্যায়নে ত্রুটি থাকতে পারে, অনেক মূল্যায়ন সঠিক না-ও হতে পারে, কিন্তু সেটা পৃথক আলোচনা। সামগ্রিক এক সারসংকলন, ও প্রয়োজনে রাপচার অপরিহার্য।

সুতরাং এ্যাভাকিয়ানের সংশ্লেষণকে আমাদের দেখতে হবে প্রথমতঃ মালেমা-বাদীদের নিজেদের মধ্যকার পর্যালোচনা-গবেষণা ও বিতর্ক হিসেবে। দ্বিতীয়ত সেই বিতর্কের অগ্রগতির মধ্য দিয়ে আমাদের পরিস্কার হতে হবে যে, এতে কতটুকু গ্রহণীয়, আর কোনটা গ্রহণীয় নয়। অথবা এটি সামগ্রিকভাবে সর্বহারা শ্রেণী লাইন ও কমিউনিজমের মিশন থেকে কার্যতঃ কোনভাবে সরে যায় কিনা।

– এই পর্যালোচনার জন্য মৌলিক মার্কসবাদী সাহিত্য অধ্যয়নের পাশাপাশি এ্যাভাকিয়ান/আরসিপি’র বেশ কিছু দলিলকে অধ্যয়ন না করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। সেজন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনায় প্রবেশ করতে হবে। কারণ, এর উপর আইসিএম-এর আশু ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। সেক্ষেত্রে আমাদের পার্টিকে যথাসাধ্য ভূমিকা রাখায় উদ্যোগী হতে হবে।

* তবে এ্যাভাকিয়ানকে আমরা এ পর্যন্ত যতটুকু অধ্যয়ন ও আলোচনা করতে পেরেছি তার ভিত্তিতে আমাদের কিছু প্রাথমিক ধারণা ও প্রবণতাকে এখানে উল্লেখ করা যায়, যাকিনা এই পর্যালোচনা ও বিতর্ককে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। আমাদের এই প্রাথমিক অভিমতগুলো চূড়ান্ত কোন মতাবস্থান নয়। সুতরাং এগুলোর উপর আরো বিস্তর পর্যালোচনা ও বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। বিশেষতঃ

আন্তর্জাতিক পরিসরে ভ্রাতৃপ্রতিম পার্টিগুলোর সাথে মত বিনিময়ের বিরাট গুরুত্ব রয়েছে, যার মাঝে আরসিপি’র সাথে আলোচনার প্রয়োজন প্রধান। এমনকি আমরা মনেকরি, যদিও এমপিপি বা সিপিএন-এর বর্তমান মৌলিক মতাবস্থান মালেমা থেকে সরে গেছে বলে মনেকরি, তাসত্ত্বেও এ প্রশ্নে তাদের মতামতকে আলোচনায় আনারও গুরুত্ব রয়েছে। গুরুত্ব রয়েছে আরসিপি থেকে বিভক্ত মাইক এলি(৯চিঠি-গ্রুপ)-গ্রুপের মতামতকে অধ্যয়ন করারও। আমরা সে জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো। আমরা মনেকরি, যেহেতু বিষয়গুলো অতি ব্যাপক, অনুবাদের অভাবে এদেশে ও আমাদের পার্টি-অভ্যন্তরে এগুলোর উপর পর্যাপ্ত পর্যালোচনার সুযোগ অনেক কম, তাই, এ বিষয়গুলোতে চটজলদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে দীর্ঘস্থায়ী পর্যালোচনায় আমাদের প্রবেশ করা উচিত।

এই মতামত গঠনের ক্ষেত্রে প্রথমত রাজনীতিক প্রশ্নে আলোচনা কেন্দ্রীভূত করাটা সঠিক হবে বলে আমাদের ধারণা। রাজনীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা চাবিকাঠি, যদিও এখানে মতবাদিক লাইনের পৃথক গুরুত্ব চলে এসেছে। কিন্তু সেটা দীর্ঘস্থায়ী পর্যালোচনাধীন রাখাটাই ভাল হবে।

* রাজনীতিক প্রশ্নের প্রধান দুটো বিষয় হলো আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সমাজতন্ত্র।

। আন্তর্জাতিকতাবাদঃ

মাও-পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে কমরেড এ্যাভাকিয়ানের যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোকে আমরা বিশেষ মূল্য দেই তার মাঝে অন্যতম হলো ২য় বিশ্বযুদ্ধ কালে ফ্যাসিবিরোধী যুক্ত ফ্রন্টের সাধারণ লাইন ও ৩য় আন্তর্জাতিক বিলুপ্তিকরণের সারসংকলন। এটা আন্তর্জাতিকতাবাদের সাথে সম্পর্কিত বিষয়, এবং সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

তবে এই সারসংকলনের সাথে মৌলিক ঐকমত সত্ত্বেও আমাদের কিছু পৃথক মত ছিল ও রয়েছে। তাহলো- বিশ্বের তিন বিভাজন সম্পর্কে এ্যাভাকিয়ান সারসংকলনে নেতিবাচক অবস্থান ছিল। আমরা তাকে সঠিক মনে করি না। আমরা তিন বিশ্ব তত্ত্বকে বিরোধিতা করেছি, একইসাথে কৌশলগতভাবে বিশ্বের তিন বিভাজনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এটা বর্তমান বিশ্বেও প্রযোজ্য, যদিও তৎকালীন প্রথম বিশ্বের

অন্তর্ভূক্ত একটি পরাশক্তি সোভিয়েতের পতন হয়েছে, কিন্তু প্রথম বিশ্বের একক পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন এখনও বজায় রয়েছে। অবশ্য এ্যাভাকিয়ান ও আরসিপি’র বিভিন্ন দলিলে পরবর্তীকালে “তৃতীয় বিশ্ব” শব্দগুচ্ছের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেটা নিছক পরিচিত/প্রতিষ্ঠিত শব্দের ব্যবহারের অতিরিক্ত কিছু ছিল বলে মনে হয় না।

* আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রশ্নে সারসংকলনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় যে উল্লম্ফনটির কথা এ্যাভাকিয়ান সংশ্লেষণে এসেছে তা হলো, বিশ্ব রণভূমি-কে, বিশ্ব পরিস্থিতিকে ও বিশ্ব-বিপ্লবের স্বার্থকে প্রাধান্য দান। এর অধীনে দেশীয় বিপ্লবকে রাখতে না পারা, এবং দেশীয় পরিস্থিতিকে দেখতে না পারা। যা জাতীয়তাবাদী প্রবণতা ও বিচ্যুতিকে বিকশিত করেছে।

এই বক্তব্যকে তাত্ত্বিকভাবে ও কয়েকটি মূর্ত বিষয়ের সারসংকলনের জায়গায় সাধারণভাবে সঠিক বলেই গ্রহণ করা যায়। ফ্যাসিবিরোধী ফ্রন্টের সাধারণ লাইন আসার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল।

– তবে বিশ্ব পরিস্থিতি ও জাতীয় পরিস্থিতি, এবং বিশ্ববিপ্লব ও দেশীয় বিপ্লব- এই দুয়ের সমন্বয়ের প্রশ্নটি আরো জটিল, এবং এক্ষেত্রে আরসিপি’র অবস্থানে একতরফা ঝোঁক রয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে।

বিশ্ব পরিস্থিতির আলোচনায় অবধারিতভাবে সাম্রাজ্যবাদের সাধারণ সংকটের কথা চলে আসে। এই সাধারণ সংকট অর্থ কী- তার ভাল আলোচনা প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদী দেশে সংকট হয়, আবার তা মীমাংসিত হয়ে নতুন ঘুর্ণন/চক্রাবর্ত শুরু হয়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থা। তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই সংকট কীভাবে চালান হয়, এবং তা কিভাবে প্রশমিত হয় বা হয় না।

আমাদের দেশে আমরা দেখি যে, সাধারণভাবে বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করে। শাসকশ্রেণী ও রাষ্ট্র সাধারণভাবে সংকটে থাকে। এখানেও এই অবস্থা চক্রাবর্তাকারে এগোয়। কিন্তু তাকে সাধারণ সংকটের মাঝেই আংশিক উদ্ধার/রিলিফ বলে মনে করা যায়।

আমাদের মত দেশের পরিস্থিতিও প্রধানত বিশ্ব পরিস্থিতিরই অংশ, তার বিশেষত্বগুলো বিশ্ব পরিস্থিতির বাইরে নয়। কিন্তু সে কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হলো, এইসব দেশের বিপ্লবী পরিস্থিতিগুলো আসে কোত্থেকে? ’৮০-দশকে বিশ্ব বিপ্লবী আন্দোলনের ভাটার সময়ে পেরুর গণযুদ্ধ শুরু হয়, এবং সফলভাবে এগিয়ে যায়। ’৯০-দশকে সামগ্রিক বিশ্ব পরিস্থিতিতে ‘বিশ্বায়ন’ কালে নেপাল গণযুদ্ধ শুরু হয়, এবং সফলভাবে এগিয়ে যায়। সুতরাং, শুধুমাত্র ৬০/৭০-দশকের বিশ্ব বিপ্লবী পরিস্থিতির এক পরিপক্ককালে বিপ্লবী সংগ্রাম বিকশিত হয়েছে বা হতে পারে, বিষয়টা সেরকম নয়। পেরু, নেপাল- এ জাতীয় বিপ্লবের সফলতা বিশ্ব পরিস্থিতিকেও বিরাটভাবে এগিয়ে দেয় সেরকম সামগ্রিক উত্থানমূলক অবস্থার দিকে। আরসিপি’র বক্তব্যে বিশ্ব পরিস্থিতির আলোচনায় অন্তত ৩য় বিশ্বের দেশে সার্বক্ষণিক সাধারণ বিপ্লবী পরিস্থিতি ও সে প্রেক্ষিতে অবিলম্বে গণযুদ্ধ সূচনা ও এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নটি নেতিকরণ হয় কিনা সেটা আমাদের একটি প্রশ্ন। যদিও এ্যাভাকিয়ান তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে সরাসরি এই আলোচনাটি করেননি, কিন্তু আমেরিকায় “অপেক্ষা কর ও ত্বরান্বিত কর”- এই সঠিক সূত্রটি আলোচনার সময় এবং বিশ্ব পরিস্থিতির অধীনে দেশীয় পরিস্থিতিকে বিচার করবার আলোচনাটিকে তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করলে এরকম একটি উপসংহার অনিবার্যভাবে চলে আসতে পারে বলে মনে হয়।

– একই রকম সমস্যা ধারণা করা যায় দেশীয় বিপ্লব ও বিশ্ব বিপ্লবের সমন্বয়ের প্রশ্নে। বিশ্ববিপ্লবের স্বার্থের প্রেক্ষাপটে দেশীয় বিপ্লবকে না দেখলে সেটা জাতীয়তাবাদকে বিকশিত করবে। ৩য় আন্তর্জাতিক বিলুপ্তি ঘটানোর পিছনে এ জাতীয় বিচ্যুতি কাজ করেছে। ফ্যাসিবিরোধী ফ্রন্টের সাধারণ লাইনের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা ছিল। এই অবস্থানগুলোর সাথে একমত হওয়া যায়।

সামগ্রিক স্বার্থ ও আংশিক স্বার্থের মধ্যে সহজভাবেই বোধগম্য যে, সামগ্রিক স্বার্থ প্রধান। বিশ্ব বিপ্লব প্রধান। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রধান। কিন্তু দেশীয় বিপ্লবের সমন্বয়ের প্রশ্নটি এরকম বিমূর্ত ও সহজ নয়, বরং অনেক জটিল।

বিপ্লবটা দেশে দেশেই ঘটে। এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো বিশ্ববিপ্লবের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। ঘাটি রক্ষার প্রশ্নটি যেমন একটি মৌলিক প্রশ্ন, তেমনি দেশীয় বিপ্লব না করে বিশ্ববিপ্লবের কাজ করার কথাও অর্থহীন।

বিশ্ববিপ্লবী প্রক্রিয়া ও দেশীয় বিপ্লবী প্রক্রিয়ার মাঝে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সাধারণভাবে বিশ্ব বিপ্লবী প্রক্রিয়ার বিকাশই দেশীয় বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবার গ্যারান্টি। কিন্তু কখনো কখনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখাটাই বিশ্ববিপ্লবী প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবার জন্য প্রধান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে কিনা। এর খুব নির্দিষ্ট মূল্যায়ন প্রয়োজন। এতে ভুল হতে পারে, ভুল হলে আমরা নিশ্চয়ই তার সারসংকলন করবো, কিন্তু উপরোক্ত দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে অস্বীকার করা যাবে না।

এটা আরো গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, বিশ্ব বিপ্লবটা হয়ে থাকে দেশে দেশে। অর্থাৎ, বিশ্ব বিপ্লবের মূর্ত রূপ হলো দেশীয় বিপ্লব, তার যথার্থ আন্তর্জাতিকতাবাদী আদর্শের ভিত্তিতে যদি তা স্থাপিত থাকে। সুতরাং, মূর্তভাবে নির্দিষ্ট কোন দেশীয় বিপ্লবই হলো সংশ্লিষ্ট পার্টির প্রধান কাজ। যদিও আবার সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিপ্লবের কাজে সে পার্টি কীভাবে ভূমিকা রাখছে, কীভাবে তাকে দেখছে, সেটা তার দেশীয় বিপ্লব প্রকৃতই আন্তর্জাতিকতাবাদকে শক্তিশালী করছে কিনা তাকে নির্ধারণ করে।

সুতরাং আমরা মনে করি, এ্যাভাকিয়ানের সারসংকলনের মৌলিক অবদান সত্ত্বেও সাধারণ তত্বের রাপচারের ক্ষেত্রে সেটা বাস্তব দেশীয় বিপ্লবকে দুর্বল করে দেবার দিকে চালিত করে কিনা, অথবা, দেশীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতিÑ এই দুয়ের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে একপেশেভাবে দেখে কিনা সেটা খুব গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

। সমাজতন্ত্রঃ-

বিগত শতকের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সর্বহারা একনায়কত্বের অভিজ্ঞতার সারসংকলনে সেই সমাজে মতপার্থক্য, বুদ্ধিজীবী ভূমিকা, দলগঠন- প্রভৃতি বিষয়ে যে প্রস্তাবনাগুলো পেশ করা হয়েছে তার মূল সুরের সাথে একমত হওয়া যায়।

পার্টি যেমন দুই লাইনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়, তেমনি সমাজতান্ত্রিক সমাজও বিভিন্ন মতের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। খুব সারমর্মে এটা বুর্জোয়া লাইনের সাথে সর্বহারা লাইনের দ্বন্দ্ব, যা মাও আবিস্কার করেছেন, এবং অনুশীলনও করেছেন। কিন্তু মতপার্থক্যের বৈচিত্র আরো বেশী। সর্বহারা একনায়কত্বের আওতায় একটা অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের স্বীকৃতি দেবার প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে এ্যাভাকিয়ানের কাজগুলোকে ইতিবাচকভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।

– তবে এক্ষেত্রে আরসিপি/এ্যাভাকিয়ানের কিছু মনোভঙ্গি আলোচনার দাবী রাখে বলে আমরা মনেকরি।

তারা প্রায়ই বলে থাকেন, আমরা বিগত শতকের সমাজতন্ত্রে আর যেতে চাইনা।

এটা কেউ চাইলেও পারবে না, কারণ, প্রতিটি নতুন যুগের বিপ্লব নতুনতর, উচ্চতর মান ও মাত্রা নিয়ে আসে। নতুবা সেটা এগোতে পারে না। কিন্তু এ্যাভাকিয়ানের আলোচনায় এ বিষয়টা যথেষ্ট নেতিবাচকভাবে উত্থাপিত হয়। যেন, সেই সমাজতন্ত্রও একটা প্রায় পরিত্যাজ্য বিষয়।

অনুরূপভাবে তারা আরেকটা শ্লোগান দিয়ে থাকেন যার সারমর্ম হলো, সমাজতন্ত্র অধিকতর ভাল সমাজ, পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে। ভাষাগতভাবে কথাটা সঠিক, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটা খুবই আত্মরক্ষাত্মক অবস্থান। মার্কিনের মত এক কট্টর সমাজতন্ত্রবিরোধী সমাজের বাস্তবতা তাদেরকে এরকম শ্লোগানে চালিত করেছে কিনা বলা মুশকিল, কিন্তু এই ধরণের আত্মরক্ষাত্মক শ্লোগান পুজিবাদের ও সমাজতন্ত্রের শ্রেণী চরিত্রকে সামনে না এনে বরং একটা তুলনায় নিয়ে যায়, যা শ্রেণী-লাইনকে দুর্বল করার একটা প্রকাশ হতে পারে।

এ জায়গাগুলো থেকে যদি আমরা পেছন ফিরে এ্যাভাকিয়ান উত্থাপিত সমাজতন্ত্রে মতপার্থক্য, বুদ্ধিজীবী, সৃজনশীলতা, ব্যক্তিঅধিকার- এই বিষয়গুলোকে পুনরালোচনা করি তাহলে এই প্রশ্নটি উঠতে পারে যে, কেন তারা এই সারসংকলনকে রাপচার হিসেবে আনতে চাচ্ছেন। এটা কতটা গুণগত নতুনত্ব নিয়ে আসে।

। দর্শনঃ-

* দর্শনের ক্ষেত্রে এ্যাভাকিয়ানের সমস্ত আলোচনায় কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিরাজিত প্রয়োগবাদ, অনুশীলনবাদ, তত্ত্বের গুরুত্বহীনতা, যান্ত্রিক বস্তুবাদ, রাজনৈতিক সত্যÑ ইত্যাদির ব্যাপক প্রভাব, এবং রাজনীতিক কার্যকলাপে তার প্রয়োগের যে সারসংকলন এসেেেছ তার সাথে একমত হওয়া যায়। বাস্তবেই কমিউনিস্ট আন্দোলনে এইসব গুরুতর সমস্যার প্রকাশ আমরা দেখি, বিশেষত, আমাদের যে যুগ, মাও-পরবর্তী যুগ, সে সময়ে পেরু পার্টির বিপর্যয়, নেপাল-পার্টির ডান লাইনে ঘুরে যাওয়াÑ এই সব বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সারসংকলনে এসব সমস্যা বেরিয়ে আসবে।

তবে এ্যাভাকিয়ানের সংশ্লেষণের যে প্রধানতম সুর, তার মাঝে ‘শ্রেণী’ ও ‘অনুশীলন’- এই মৌলিক দুটো প্রশ্নে মালেমা থেকে সরে যাবার প্রবণতা রয়েছে কিনা তা আরো পর্যালোচনার দাবী রাখে।

– মাও বলেছিলেন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দুটো প্রকৃতিÑ এক, শ্রেণী প্রকৃতি ও দুই, বৈজ্ঞানিক প্রকৃতি, যার মাঝে শ্রেণী প্রকৃতি হলো প্রধান। সরাসরি এই বক্তব্যকে এ্যাভাকিয়ান আলোচনা করেননি, তবে তার বক্তব্যে এর থেকে সরে যাবার ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি মূলতঃ বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিকে প্রধান গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রথমত এই অবস্থান সঠিক কিনা। যদি সঠিক হয় তাহলে এটা মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বের নতুন ধারাই বটে।

– এ্যাভাকিয়ান জোর দিয়েছেন বস্তুগত বাস্তবতা হলো সত্য, যার নিজের কোন শ্রেণী চরিত্র নেই। বিভিন্ন শ্রেণী নিজেদের শ্রেণী অবস্থান থেকে তাকে ব্যাখ্যা করে। সর্বহারা শ্রেণী অবস্থান বলেই সেটা সত্য- বিষয়টা তা নয়, বরং সর্বহারা শ্রেণী তার ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে সত্যকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ও ভালভাবে ধারণ করতে সক্ষম। তাই, কমিউনিস্ট আন্দোলনে “রাজনৈতিক সত্য” বা “শ্রেণী সত্য” বলে যে কথা আলোচিত ও গৃহীত, তা সঠিক নয়- ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রথমতঃ সত্য-যে বস্তুগত বাস্তবতা- সেটা পুরোপুরি সঠিক। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, সেটা সত্য- ধর্মগ্রন্থগুলো যাই বলুক না কেন। কেউ সেটা বলুক বা না বলুক, গ্যালিলিও’র কথা মতো- “তবু পৃথিবী ঘুরছে”, কারন, সেটাই সত্য। এবং সেটা বিজ্ঞান। আর সেটা নির্ভর করে না কোন ব্যক্তির অবস্থানের উপর।

প্রশ্ন হলো প্রকৃতি বিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান- এ দুয়ের মাঝে কোন পার্থক্য রয়েছে কিনা।

দুটোই বিজ্ঞান, তাই, দুই ক্ষেত্রেই সত্য একই- একে সঠিক বলেই গ্রহণ করা যায়।

কিন্তু সকল বাস্তবতাকেই বিভিন্ন শ্রেণী নিজ নিজ অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা করলেও সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তা গুণগতভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেটা সরাসরিভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর স্বার্থ ও অস্তিত্বের সাথে যুক্ত। প্রকৃতি বিজ্ঞানের অনেক সত্যও যখন প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীর স্বার্থের বিরোধী হয়, তখন সে তা প্রতিরোধ করে, এবং ভিন্ন ‘সত্য’ নিয়ে আসে। তা সত্ত্বেও প্রকৃতি বিজ্ঞানের অনেক সত্য সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী গ্রহণ করে নিতে পারে এবং তার সাথে অভিযোজন করে নিতে পারলেও সমাজ বিজ্ঞানের মৌলিক সত্যকে গ্রহণ করা তার সামগ্রিক অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই, তার পক্ষে সেটা গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

* অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, সত্য আবিস্কার করে মানুষ। এবং মানুষের এই সত্য আবিস্কারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রয়েছে। তার মূল কথা হলো বস্তুর নিয়মটা জানতে হলে সেই বস্তুর সংস্পর্শে ও পরিবর্তনে মানুষকে যেতে হয়। যাকে আমরা বলি অনুশীলন।

অনুশীলন ছাড়া জ্ঞান হয় না, সত্য জানা যায় নাÑ এটা নিজেও একটা সত্য।

– তাই, সত্য আবিস্কারের সাথে শ্রেণী ও অনুশীলনের একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত তা যদি হয় সমাজ বিজ্ঞান, সেক্ষেত্রে শ্রেণী খুব নির্ধারক ভূমিকা পালন করে থাকে। সর্বহারা শ্রেণী সেটা পারে এবং বিপরীত শ্রেণীগুলো সেটা পারে না।

এথেকে রাজনৈতিক সত্যের একটা বিষয় চলে আসতে বাধ্য। তা থেকে কেউ মুক্ত নয়, সর্বহারা শ্রেণীও নয়। তফাৎ হলো সর্বহারা শ্রেণী মৌলিক সত্য বা তার কাছাকাছি আসতে সক্ষম, বিপরীত শ্রেণী তাতে সক্ষম নয়।

– এ্যাভাকিয়ান স্ট্যালিন আমলের লিসেংকো-ঘটনাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয়। সেটা ছিল মূলতঃ প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিষয়। কোন সমাজতান্ত্রিক যুগে প্রকৃতি বিজ্ঞানে কোন ভুল ঘটবে না, তেমন মনে করলে গুরুতর ভুল হবে। এ্যাভাকিয়ান যে সমাজতন্ত্রের আগামী মডেল প্রস্তাব করছেন, তাতেও প্রকৃতি বিজ্ঞানে ভুল ঘটবে। তেমন ক্ষেত্রে হতে পারে কোন বুর্জোয়া বিজ্ঞানী সত্যকে ধারণ করছেন। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। স্ট্যালিন সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ভুল করেছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদী আন্দোলনের যুগে বিগত ১৬০বছরে স্ট্যালিনই তার সময়ে সামাজিক বিজ্ঞানে মৌলিকভাবে সঠিক ছিলেন। সামাজিক বিজ্ঞানের সত্য আবিস্কারগুলো মূলত মার্কসবাদী ও বিপ্লবীরাই করেছেন। এটা কোন আকস্মিক বিষয় নয়। কেন লেনিনবাদ অন্য কেউ আবিস্কার করতে পারেননি, সর্বহারা শ্রেণীর নেতা ও সর্বহারা বিপ্লবী আন্দোলনের নেতা লেনিনই আবিস্কার করলেন এটা জ্ঞানতত্ত্বের বিষয়। প্রশ্ন হলো তারাও ভুল করেছেন, যেমন, স্ট্যালিন অনেক গুরুতর ভুল করেছেন। কিন্তু তার সমাধান হবে এরই মধ্যে- যেমন মাও করেছেন।

এ্যাভাকিয়ান বুর্জোয়াদের সামাজিক বিজ্ঞানের সত্য আবিস্কারের ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে “সত্যের কোন কোন অংশ”- এভাবে শব্দ চয়ন করেছেন। সমস্যাটি মৌলিক সত্যের প্রশ্ন। সত্যের অনেক উপাদান খন্ড খন্ডভাবে সত্যের মৌলিক ধারার বাইরেও অনেক সময় থাকতে পারে, যা ক্রমান্বয়ে মৌলিক ধারাটি আত্মস্থ করণের মধ্য দিয়ে তার সীমাবদ্ধতা কাটাতে পারে। সামাজিক বিপ্লবের মৌলিক ধারার বাইরের সত্য উপাদানগুলোকে আত্মস্থ করণের প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলনে ত্র“টি ছিল, রয়েছে। কিন্তু তাই বলে শ্রেণী-প্রশ্নের বাইরে এই সত্যকে বিচার করে একটা শ্রেণী উর্ধ চরিত্র দান বাস্তবে সত্য থেকে সরে পড়ার শুরু হতে পারে। সমাজ-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একে অস্বীকার করা যাবে না।

* এ্যাভাকিয়ানের দর্শন-আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনিবার্যতাবাদ/নিয়তিবাদ সম্পর্কে। চাল সঠিকভাবে চুলায় বসালে একটা সময় পরে সেটা ভাত হবেÑ এটা অনিবার্য। এখন কেউ যদি বলেন যে এটা অনিবার্য নয়, কারণ, ভাত হবার আগেই ভূমিকম্প হয়ে পাকঘরটি বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে, তাকেও বাতিল করা যায় না। কারণ, আমাদের জানার বাইরে বেশ কিছু বিষয় থাকে বা থাকতে পারে। কিন্তু চাল বসালে ভাত হবেÑ একে অনিবার্য বলাটা ভুল নয়। বিশেষত যদি ঐ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার নিয়মটা আমাদের জানা থাকে। নতুবা অনিবার্যতাবাদকে বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা অজ্ঞেয়বাদের খপ্পরে পড়বো। কিছুই আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। কোন বিপ্লবই আমরা নিশ্চিত করে করতে পারবো না। এবং ফলত আমরা নিষ্ক্রিয়তায় চলে যাবো।

কমিউনিজম অনিবার্য কিনা- তা নির্ভর করে পুজিবাদের যে বিশ্লেষণ তা সঠিক রয়েছে কিনা। এ্যাভাকিয়ান তাকে সঠিক মানছেন। কিন্তু তিনি যার উপর জোর দিচ্ছেন তাহলো বস্তুগত বাস্তবতার সাথে আত্মগত শক্তির ভূমিকার উপর। আমরা না করলে, সঠিকভাবে না করলে কমিউনিজম আসবে না।

এটা সঠিক যে, আমরা না করলে, বা সঠিকভাবে না করলে কমিউনিজম আসবে না। যে কারণে বিগত শতাব্দীতে তা আসেনি, বরং পুনরায় সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা চেপে বসেছে। সুতরাং কমিউনিজম হবেই, একে ধর্মবাদীদের মত বিশ্বাসে পরিণত করা যে ভুল এর উদ্ঘাটন এ্যাভাকিয়ান করেছেন সঠিকভাবেই। বিপ্লব বিজয়ী হবেই, কিন্তু হচ্ছে না। কেন? তাহলে কি তা অনিবার্য নয়?

আমাদের ধারণা কমিউনিজম অনিবার্য- এটা বলায় ভুল নেই। আমাদের দেশে শ্রমিক শ্রেণী ও বুর্জোয়া শ্রেণী রয়েছে। এটা অনিবার্য যে এখানে দ্বন্দ্ব হবে, যেহেতু শোষণ রয়েছে। এটা অনিবার্যতাবাদ নয়, বরং বৈজ্ঞানিক সত্যের উচ্চারণ। পুজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দ্বন্দ্ব কমিউনিজমে পরিচালিত করতে বাধ্য। এটা সম্ভাব্যতা নয়, অনিবার্যতা। আমাদের জানার বাইরে কোন মৌলিক নিয়ম থাকতে পারে। সেকারণে মানব সমাজের ভিন্ন পরিণতি হতে পারে। তেমন হলে সম্ভাব্য পরিণতিগুলো আমরা নতুনভাবে জানবো এবং সেখানে অনিবার্যতা থাকবে। নতুবা আপনি বিজ্ঞানের কথা বলতে পারেন না। আপনি মহাকাশযান ছেড়ে বলতে পারবেন না যে সেটা চাঁদে যাবে, আপনি চিটাগাঙের ট্রেনে চড়ে বলতে পারবেন না যে, আপনি যাবেনই, কারণ পথে দুর্ঘটনায় ট্রেন নস্ট হতে পারে, আপনি মারা যেতে পারেন। আপনাকে সর্বদাই বলতে হবে যে, হতেও পারে, নাও হতে পারে। ধর্মবাদীরা এভাবেই বলে থাকে শুধু দুটো কথা সংযুক্ত করেÑ আল্লাহ যদি চান তাহলে হবে। এটা এক ধরণের অনিশ্চয়তাবাদ আনবে, যা সমাজ বিপ্লবের জন্য ক্ষতিকর।

। নয়া সংশ্লেষণের রণনৈতিক প্রয়োগযোগ্যতাঃ-

এক্ষেত্রে আরসিপি মূলত মার্কিন সমাজে বিপ্লবের ক্ষেত্রে এর রণনৈতিক তাৎপর্যকে তুলে ধরেছে। এর উপর সংক্ষেপে শুধু দুটো পয়েন্টে আমাদের অবজার্ভেশন তুলে ধরা হলোÑ

– আমেরিকার মত সমাজে “অপেক্ষা কর, একইসাথে ত্বরান্বিত কর”- এই সূত্রায়ন সঠিক, বিপ্লবের সম্ভব্যতার আলোচনা সঠিক। কিন্তু তারা সেখানেও গণযুদ্ধের উত্থাপন করছেন না। যদিও আগে সর্বদাই আরসিপি গণযুদ্ধের বিশ্বজনীনতাকে তুলে ধরেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণযুদ্ধ কীভাবে সূচিত হবে ও পরিচালিত হবে তার উপর তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজও রয়েছে। কিন্তু এখন যখন তারা নয়া সংশ্লেষণের রণনৈতিক প্রযোজ্যতা নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন গণযুদ্ধের বিষয়টি আসেনি। এর কারণ আমাদের কাছে অস্পষ্ট। কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে আসতে পারে।

– অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে আরসিপি সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম করেছে। সংশ্লেষনে তারা অর্থনীতিবাদের উদ্ধার, রক্ষা ও বিকাশের কথা বলেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে যেখানে সমস্যা রয়েছে বলে আমাদের মনে হয় তাহলো, কীভাবে চলমান শ্রেণীসংগ্রাম, অর্থনৈতিক ও আশু রাজনৈতিক সংগ্রাম- ইত্যাদির সাথে অর্থনীতিবাদবিরোধী সংগ্রাম তথা বিপ্লবী রাজনীতি ও কমিউনিজমের সামগ্রিক আদর্শের শিক্ষা ও সংগ্রামকে সমন্বিত করা হবে। সাম্প্রতিক আরসিপি’র বিভক্তির পর অন্য গ্রুপটির পক্ষ থেকে এ প্রশ্নে গুরুতর সংগ্রাম তোলা হয়েছে। হতে পারে সে সংগ্রামের ভিত্তিতে অর্থনীতিবাদ থাকতে পারে। আমরা ভাল জানি না। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণী ও সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন সংগ্রামে বিপ্লবী পার্টি কীভাবে হস্তক্ষেপ করছে তা মৌলিক গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়। সেটা না করলে বিপ্লবী রাজনীতি, রণনৈতিক কর্মসূচী ও কমিউনিজমের আদর্শ শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী আদর্শের বদলে অগ্রসর বুদ্ধিজীবীদের বৈজ্ঞানিক মতবাদে পরিণত হতে পারে। দার্শনিকভাবে শ্রেণী, অনুশীলনÑ প্রভৃতির যেসব প্রশ্ন আমরা উপরে উত্থাপন করেছি তার সাথে এ বিষয়টি মিলে যায়। সুতরাং আমরা পরিস্কার নই যে, আরসিপি’র অর্থনীতিবাদবিরোধী সংগ্রাম সঠিক খাতে প্রবাহিত হচ্ছে কিনা।

** আইসিএম-এর অন্য আরো কিছু মৌলিক বিষয়ের যে বিতর্ক বিগত বেশ কিছু বছর ধরে চলছে, যার থেকে আরসিপি আরো এগিয়ে নিজেদের সংশ্লেষণ পেশ করেছে, সেরকম সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় এখানে আমরা উত্থাপন করবো- যার অনেকগুলোতেই আমাদের পার্টি বিগত সময়ে নির্দিষ্ট কিছু অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেই বিষয়গুলো আমরা নীচে উল্লেখ ও আলোচনা করবো। আমরা মনেকরি, এইসব বিষয়ে আমাদের পার্টির মতাবস্থান ও পর্যালোচনা এ্যাভাকিয়ানের ‘নয়া সংশ্লেষণ’-কে মূল্যায়ন করতে অনেকখানি সহায়ক হবে। বাস্তবে সেক্ষেত্রে আমাদেরকে সেটা কয়েকধাপ এগিয়ে দেবে, যা আমাদের কিছু কিছু প্রবণতাকে ও প্রাথমিক অবস্থানকেও আশাকরি প্রকাশ করবে, যা একত্রে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে পৃথকভাবেও উল্লেখ করবো।

আমরা বিষয়গুলোতে এখানে খুব একটা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই আমাদের মতাবস্থানগুলোকে তুলে ধরবো। কারণ, এ বিষয়গুলোতে পার্টির বিভিন্ন দলিলপত্রে আমাদের বক্তব্য রয়েছে, অথবা রিম-কমিটি বা রিম-ভুক্ত বিভিন্ন পার্টির স্বীকৃত ও গৃহীত দলিলাদি রয়েছে যার সাথে মৌলিকভাবে আমরা একমত।

অন্যান্য লাইন-বিতর্কের বিষয়াবলী

মতবাদিক প্রশ্ন

। প্রধানতঃ মাওবাদ

  পেরু-পার্টি কমরেড গণজালোর নেতৃত্বে আমাদের মতাদর্শের তৃতীয় স্তরকে মালেমা, বা মাওবাদ হিসেবে সূত্রায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। এরই প্রক্রিয়ায় ’৯৩-সালে রিম সম্মিলিতভাবে মাওবাদ-সূত্রায়ন গ্রহণ করেছিল।

কিন্তু মালেমা গ্রহণ ও উপলব্ধির ক্ষেত্রে রিম-এর অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য প্রথম থেকেই বিরাজমান ছিল। প্রথমতঃ মাওবাদ-ই প্রথম আমাদের মতবাদের তৃতীয় স্তরকে সূত্রায়িত করে, এবং মাওচিন্তাধারার সাথে তার গুণগত ও স্তরগত পার্থক্য রয়েছে। নাকি মাও চিন্তাধারা-সূত্রায়ন প্রথমে এই তৃতীয় স্তরকে সংজ্ঞায়িত করে, যদিও মাও-মৃত্যুর পর মাওবাদ গ্রহণ করা এই তৃতীয় স্তরের উচ্চতর উপলব্ধিকে প্রকাশ করে, যা মাও চিন্তাধারা করতো না। আমরা মালেমা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই দ্বিতীয় মতটিকে তুলে ধরি। কিন্তু পেরু-পার্টি প্রথমটির ধরণে মত ধারন ও প্রকাশ করতো, এবং এর একটা ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল রিম-পার্টিগুলোর একাংশের মধ্যে।

এরই ভিন্ন প্রকাশ ছিল মতাদর্শকে ‘মালেমা, প্রধানতঃ মাওবাদ’- এই সূত্র দ্বারা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে। আমাদের পার্টি ‘প্রধানতঃ মাওবাদ’ সূত্রায়নকে প্রথম থেকেই বিরোধিতা করে, যা কিনা মালেমা’র “অখন্ড সমগ্রতা”-কে খন্ডিত করে দেয়। (দেখুন- নয়া বিতর্ক/১)। পেরু-পার্টির এই ভুল সূত্রায়নের প্রভাবও রিম-ভুক্ত অনেক পার্টির উপর ব্যাপকভাবে পড়ে। এরই একটা প্রকাশ হলো ‘প্রধানতঃ’-এর স্থলে ‘বিশেষতঃ’ শব্দটি ব্যবহার করে একই প্রবণতাকে প্রকাশ করা।

। থট/পথ

পেরু-পার্টির মতবাদিক লাইনে আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল মতবাদকে ‘মালেমা ও গণজালো থট’- এভাবে প্রকাশ করা, যেক্ষেত্রে গণজালো থটকে তারা দাবী করতো পেরুর নির্দিষ্ট অবস্থায় মালেমা’র প্রয়োগ হিসেবে। দেশীয় ক্ষেত্রে গণজালো থটকে মতবাদের প্রধান দিক বলেও তারা উল্লেখ করতো।

এই চেতনা/প্রবণতার ব্যাপক প্রভাব রিম-ভূক্ত অনেক পার্টিতে পড়ে, আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়ে। আমাদের পার্টি একে প্রথম থেকেই বিরোধিতা করে (দেখুন- ২০০১/রাজনৈতিক রিপোর্ট, রিম-কমিটির পজিশন পেপারের উত্তরে, সিসি’র ১৩, ১৪ ও ১৫-তম রিপোর্ট, মুক্তি সংসদের দলিলের উত্তর, স্ট্রাগল/৭-এ পার্টির নিবন্ধ, ওয়ার্কার/৯-এ প্রকাশিত পার্টির নিবন্ধ- ইত্যাদি)। আমরা মনেকরি, সর্বহারা শ্রেণী একটি আন্তর্জাতিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী শ্রেণী। তার মতাদর্শ ও স্বার্থও আন্তর্জাতিক। তাই, প্রতিটি দেশে তার মতাদর্শ পৃথক হতে পারে না। প্রতিটি দেশে নিজ নিজ থট থাকতে হবে, এই চিন্তা সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদী নয়। প্রতিটি দেশের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী লাইনে যে বিশেষত্বগুলো থাকে সেটা আন্তর্জাতিক অভিন্ন মতাদর্শের ভিত্তিতে, তার অধীনে আসে এবং তাকে এগিয়ে দেয়। সুতরাং, গণজালো বা পেরু-পার্টির বৈশ্বিক অবদানের স্বীকৃতি, আর থট সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। এটা জাতীয়তাবাদী বিচ্যুতি আনে যা বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর মাঝে মতবাদিক বিভক্তির দিকে চালিত করে।

অনেকের মত নেপাল-পার্টিও এই থট চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়, এ চেতনাকে মূলতঃ গ্রহণ করে এবং ‘প্রচন্ড থট’ হিসেবে মতবাদ গ্রহণ করতে উদ্যোগী হয়। এ সময় রিম-ভুক্ত কিছু পার্টির সংগ্রামের মুখে তারা ২০০১-এর জাতীয় সম্মেলনে ‘থট’-এর বদলে ‘পথ’ গ্রহণ করে। যদিও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নেপাল পার্টি কিছু ভিন্নতা আনে, কিন্তু আমাদের মতে সারবস্তুগতভাবে তারা পেরু পার্টির বিচ্যুতিকে একবার গ্রহণ করার পর তা থেকে সরতে সক্ষম হয়না, তাকে অব্যাহত রাখে, এবং সমন্বয়বাদী অবস্থান গ্রহণ করে।

বর্তমানে অবশ্য নেপালপার্টি ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’, ‘সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত তত্ত্ব’, ‘ফিউশন তত্ত্ব’, ‘কৌশলগত তত্ত্ব’- প্রভৃতি নামে মালেমা’র ক্ষেত্রে বিশ্বজনীন কিছু নতুন বিকাশের কথা দাবী করছে। এইসব ‘বিকাশ’ নিয়ে আলোচনা-মূল্যায়নের উপর নির্ভর করবে ‘প্রচন্ড পথ/থট’ কীভাবে গ্রহনীয় হয় বা হয় না। এ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে বিতর্ক ও মীমাংসার এখনো বাকী।

। জেফেতুরা বা মহান-নেতৃত্ব তত্ত্ব

পেরু-পার্টির পক্ষ থেকে এই লাইনটি উত্থাপিত হয়। বিশেষতঃ কমরেড গণজালো গ্রেফতার হবার পর পেরু-পার্টিতে উদ্ভূত টুএলএস-এর মূল্যায়ন, তাতে গণজালোর ভূমিকা কী তার মূল্যায়নÑ ইত্যাদিকে ঘিরে পরবর্তীতে পেরু-পার্টির প্রতিনিধিত্ব দাবীকারী প্রবাসী সংগঠন এমপিপি এই চিন্তাকে বিপুলভাবে বিকশিত করে তোলে।

এই মতবাদিক দৃষ্টিভঙ্গি দাবী করে যে, বিপ্লব ও পার্টির নেতৃত্ব মহান নেতার স্তরে উন্নীত হলে তিনি নীতিগত ভুল করতে পারেন না। গণজালো-ও এই স্তরের নেতা, তাই তিনি গুরুতর  বা নীতিগত কোন ভুল করতে পারেন না। সুতরাং পিসিপি-তে উদ্ভূত রোল(ডান সুবিধাবাদী লাইন), যাকিনা গণযুদ্ধকে স্থগিত করা ও রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য রাষ্ট্রের সাথে আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছে, তার সাথে কমরেড গণজালোর সম্পর্ক থাকার প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং তিনিই এই শান্তি প্রস্তাবটি দিয়েছেন- এই বক্তব্য শত্রুর ষড়যন্ত্র মাত্র। পিসিপি-তে টুএলএস উদ্ভূত হয়েছে তেমন কোন বক্তব্যও আসলে শত্র“র কথারই প্রতিধবনি করা। গণজালো এমন কোন প্রস্তাব দিয়েছেন কিনা, যাকিনা ব্যাপকভাবে প্রচারিত, এবং বহু ধরণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তার অনুসন্ধান করার চেষ্টা করাটা হলো শত্র“র বক্তব্যে পরিচালিত হওয়া।

আমরা জেফেতুরা লাইনকে মার্কসবাদী মনে করি না। এটা একদিকে ব্যক্তিতাবাদী, লাইন ও পার্টির উর্ধে ব্যক্তিকে স্থাপন করে, পীরবাদী, অন্যদিকে এটা প্রকৃত বাস্তব থেকে সিদ্ধান্ত না টেনে আত্মগত আকাংখা থেকে সিদ্ধান্ত টানে।

পাঠ্যঃ

।   লিন বিরোধী সংগ্রামের দলিলাদি।

। তথ্য ও বিশ্লেষণে সাংস্কৃতিক বিপ্লব-এর লিন সংক্রান্ত অধ্যায়সমূহ- সমীরণ মজুমদার।

রাজনৈতিক বিষয়াবলী

। সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ

নেপাল-পার্টি ২০০৪-সালে এটি যখন প্রথম উত্থাপন করে তখন তারা বলতে চেয়েছিলেন যে, এটাই মালেমা-বিকাশে প্রধানতম বিষয়। কিন্তু পরবর্তীতে এ প্রশ্নটি ততটা আলোচিত ও ব্যাখ্যাত হয়নি।

তবে ২০০৬-সালের ডিসেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে নেপাল-পার্টি যে অবস্থান-পত্র উত্থাপন করে তার বক্তব্য থেকে কিছু প্রবণতাকে আমাদের নিকট ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়েছে। (দেখুন, ডিসেম্বর, ০৬-এ সিপিএন আহুত আন্তর্জাতিক সেমিনারে নেপাল-পার্টির অবস্থান-পত্র এবং তার উপর আমাদের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য)

তারা ‘বিশ্বায়ন’ ফেনমেননকে আলোচনা করা, তার বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনুধাবন করা ও সে অনুযায়ী রণনীতি ও রণকৌশলকে আলোচনা করতে চেয়েছেন যুক্তিসঙ্গতভাবেই। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের ‘বিশ্বায়িত রাষ্ট্র’ বা ‘বিশ্বায়িত অবস্থা’ আলোচনা করার মধ্য দিয়ে আন্ত-সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-কে, তা থেকে উদ্ভূত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে গুরুতরভাবে কমিয়ে ফেলে দেখিয়েছেন বলে আমাদের ধারণা হয়।

২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে সুদীর্ঘ ৬০-বছরের বেশী সময়ে পুনরায় বিশ্বযুদ্ধ-যে হয়নি, একইসাথে ৭০-দশক পরবর্তীতে বিপ্লবও হয়নি, সেটা বিশ্লেষণ ও নতুন আলোচনার দাবী রাখে। এক্ষেত্রে লেনিনবাদকে বিকাশের প্রশ্ন ওঠানো সম্ভবতঃ অন্যায্য নয়- যা কিনা বাস্তব বিশ্ব পরিস্থিতির নতুন বিকাশগুলোকে, বিশেষতঃ বিশ্বায়নকে ধারণ করতে পারে।

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় আন্তসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-যে মৌলিক, এবং এটা কোন না কোন রূপে ও ধরণে বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধ সৃষ্টি করে রেখেছে, রেখে যাবে- লেনিনবাদের এই মৌলিক প্রতিপাদ্য মোটেই অকেজো হয়ে যায়নি।

নেপাল-পার্টির উপস্থাপনায় একে নেতিকরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

ফিউশন তত্ত্ব

দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ ও নগর-কেন্দ্রীক অভ্যূত্থান- এই দুই রণনীতির সংমিশ্রণে নতুন রণনীতি বিকাশ করার দাবী করেছে নেপাল-পার্টি। এটিই হলো ফিউশন তত্ত্ব।

পরবর্তীতে এই নয়া রণনীতির প্রয়োজনীয়তাকে তারা ‘বিশ্বায়ন’ ও সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ-এর সাথে সংযুক্তভাবে উত্থাপন করতে চেয়েছে।

প্রথমতঃ নেপাল বিপ্লবের দশ বছরে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের সাথে রাজনৈতিক আন্দোলন-গণসংগ্রাম-গণঅভ্যূত্থানের সংযুক্তকরণের প্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতাকে আমরা উচ্চ মূল্য দেই। সামরিক ও রাজনৈতিক অগ্রাভিযান পরপর চালানো, জাতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ, এবং কৌশলগত তত্ত্বের গুরুত্ব- এই তিনটি বিষয়ে নেপাল-বিপ্লবের অভিজ্ঞতা আমাদের মত দেশের পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে ও সামরিক নীতি-কৌশলের বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গিতে খুবই গুরুত্ব ধরে। আমরা এটাও মনেকরি যে, শুধুমাত্র ‘বিশ্বায়ন’-ই নয়, যদিও এ সময়কালে তার গুরুত্ব বহুল পরিমাণে বেড়েছে, বরং ৩য় বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের বর্ধিত অনুপ্রবেশের ফলে নগরায়ন, পুজিবাদের বিকাশ, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রশক্তির উদ্ভব ও চূড়ান্ত ক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং বিশেষতঃ সাম্প্রতিককালে ফোন, মোবাইল ও যাতায়াতের বিপুল বিকাশ এবং কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিকাশ(যেমন, কৃষিতে হাইব্রিড বীজ, সেচ ব্যবস্থা, যান্ত্রিক চাষ প্রভৃতি) উপরোক্ত দুই রণনীতির সমন্বয়ের বিপুল গুরুত্বকে নিয়ে এসেছে।

কিন্তু একইসাথে গণযুদ্ধ ও সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান- এইভাবে বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর রণনীতিকে দুই ধরণে বিভক্ত করার বদলে গণযুদ্ধের সার্বজনীনতাকে তুলে ধরার ধারণাও এ সময়ে বিকশিত হয়েছে। এক্ষেত্রে কমরেড গণজালোর নেতৃত্বে পিসিপি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, যদিও এক্ষেত্রে পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও ৩য় বিশ্বের দেশে গণযুদ্ধ-প্রশ্নে মৌলিকভাবে দুই রণনীতির পার্থক্য করণকে নেতিকরণের একটা প্রবণতাও তাদের মাঝে দৃশ্যমান- যাকে আমরা সঠিক মনে করিনা।

তাই, গণযুদ্ধের সাধারণ রণনীতি কীভাবে প্রযুক্ত হবে তার উপর আলোচনা ও বিকাশ কেন্দ্রীভূত করা প্রয়োজন বলে আমাদের ধারণা। সে অনুযায়ী ৩য় বিশ্বের দেশে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের রণনীতিকে বিকশিত করার প্রশ্ন হিসেবেই তাকে আনা যথার্থ হবে বলে আমাদের মনে হয়।

ফিউশন এবং নতুন রণনীতি হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটবে কিনা সেটা আরো গভীর বিবেচনার বিষয়। নেপাল-পার্টি চটজলদি কোন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌছানোর ভুল করতে পারে এবং তা গণযুদ্ধকে দুর্বল করতে পারে। নেপাল-পার্টির লাইনে ও নেপাল বিপ্লবে সর্বশেষ নেতিবাচক বিকাশগুলো ‘গণতন্ত্র’ সংক্রান্ত মূল সমস্যা থেকে উদ্ভূত হলেও এ সংক্রান্ত ডান-প্রবণতা বা বিচ্যুতি তাকে আরো প্রভাবিত করেছে কিনা তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনাযোগ্য।

। দক্ষিণ এশীয় সোভিয়েত

দক্ষিণ-এশীয় সোভিয়েতের ধারণা প্রথম নেপাল-পার্টি উত্থাপন করে।

‘কমপোসা’ গঠনে নেপাল-পার্টির দিক থেকে এই ধারণার পরিচালিকা ভূমিকা ছিল বলে অনুমান করা যায়।

পর্যালোচনার পর আমাদের পার্টি একে সমর্থন করে, আঞ্চলিক যুদ্ধের ধারণাকে এর সাথে উত্থাপন করে (দেখুনÑ সিসি’র ১২/১৩/১৪-তম রিপোর্ট)।

এর কিছু পর নেপাল পার্টি ‘বিশ্ব-সোভিয়েত ফেডারেশন’-এর ধারণাটি পেশ করে।

কিন্তু এর উপর কোন আলোচনায় ব্যাখ্যা তারা উত্থাপন করেনি। আমরাও এটার আলোচনায় তাদের সাথে প্রবেশ করতে পারিনি। তার আগেই অন্যান্য আরো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সমস্যা সামনে চলে আসে।

 নেপাল পার্টি ২০০৫-সালে মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া পার্টিগুলোর সাথে সমঝোতায় প্রবেশ করে, এবং তার পর থেকে নেপাল-পার্টির দিক থেকে ‘সোভিয়েত’ সংক্রান্ত আলোচনা দুর্বল হয়ে যায়। এমনকি ‘কমপোসা’ কার্যক্রমেও ভাটা পড়তে থাকে।

আমরা মনেকরি, দক্ষিণ এশীয় সোভিয়েত ধারণাটিকে আমাদের এগিয়ে নেয়া উচিত। এর আন্তর্জাতিক তাৎপর্য ও প্রয়োগযোগ্যতার আলোচনা হওয়া উচিত, যেমন, আরব অঞ্চলের সোভিয়েত, বা ল্যাটিন আমেরিকান সোভিয়েতÑ ইত্যাদি ইত্যাদি। এর সাথে সাথে ‘বিশ্ব সোভিয়েত ফেডারেশন’ প্রস্তাবণাটিকে ভালভাবে জানা ও পর্যালোচনা করা উচিত।

। পেরু-পার্টিতে উদ্ভূত টুএলএস-এর মূল্যায়ন

এ প্রশ্নে পেরু-পার্টির সাথে রিম-কমিটি ও রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোর গুরুতর মতভেদ বিকশিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে এমপিপি’র পক্ষ থেকে এ প্রশ্নকে ঘিরে রিম-কমিটি, বিশেষতঃ আরসিপি, কমরেড এ্যাভাকিয়ান এবং সাধারণভাবে রিম-কার্যক্রম ও তার ঐক্যের বিরুদ্ধে গুরুতর আক্রমণাত্মক ও বিভেদবাদী তৎপরতা চালানো হয়।

রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোর নিজেদের মাঝে পেরু-পার্টির টুএলএস-কে দেখা ও মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী প্রবণতা থাকলেও মৌলিক কিছু প্রশ্নে ঐকমত্য বিরাজিত ছিল যাকে আমাদের পার্টিও সমর্থন করে।

প্রথমতঃ পেরু-পার্টির ভেতরে উদ্ভূত কোন টুএলএস হিসেবে একে দেখা হবে, নাকি নিছক শত্র“র ষড়যন্ত্র (হোক্স) হিসেবে দেখা হবে। পিসিপি ও পরে স্থূলভাবে এমপিপি হোক্স-লাইনকে প্রচার করে, যার সাথে রিম-কমিটি, রিম-ভুক্ত অধিকাংশ পার্টি এবং আমাদের পার্টি একমত ছিল না।

দ্বিতীয়তঃ পেরুর গণযুদ্ধ ও বিপ্লবে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছে কিনা, যাতে এই টুএলএস, ভাঙন, ইত্যাদি গুরুতর বা প্রধান ভূমিকা রেখেছে। নাকি পেরুর গণযুদ্ধ অব্যাহতভাবে বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে, গণজালো থট যার গ্যারান্টি- যেমনটা প্রাথমিকভাবে পিসিপি, ও পরে এমপিপি বলেছে ও বলে থাকে। আমাদের পার্টি রিম-কমিটির দায়িত্বশীল পার্টিগুলোর এমন অবস্থানের সাথে একমত যে, এটা ঘটেছে, এবং এর কারণ নিহিত রয়েছে গণজালো পরবর্তী পিসিপি’র লাইনের মাঝে, টুএলএস-কে হ্যান্ডলিং করার মাঝে, গণজালো থটের মাঝেও, এমনকি কোন না কোন মাত্রায় পিসিপি’র ঐতিহাসিক লাইনের মাঝেও।

তৃতীয়তঃ এই টুএলএস-এ কমরেড গণজালোর ভূমিকা কী?

এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে রিম-কমিটি বলেছে যে, “লাইন-ই গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রণেতা নন।” আমরা এই শ্লোগানকে তুলে ধরাটা পেরু-পরিস্থিতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

বহু বিভিন্ন তথ্যাবলীতে যা প্রকাশিত তা থেকে আমাদের পার্টি মনে করে যে, এমপিপি কমরেড গণজালোর যে ভূমিকাকে তুলে ধরে তার সাথে একমত হওয়া যায় না। রোল বা এ জাতীয় লাইনের সাথে কমরেড গণজালোর কোন না কোন মাত্রায় ভূমিকা ছিল ও/বা রয়েছে বলে সন্দেহ করার ব্যাপক কারণ রয়েছে। (দেখুন- এ ওয়ার্ল্ড টু উইন-এর ৩২নং সংখ্যায় প্রকাশিত নিবন্ধ। অনুবাদ- নয়া বিতর্ক/১)

* এই সমগ্র পরিস্থিতিতে রিম-কমিটি সর্বদাই ঐক্যবদ্ধভাবে ও পূর্ণাঙ্গ সঠিকভাবে ভূমিকা রেখেছে তা নয়, এবং রিম-কমিটি ও রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোর মাঝে বিভিন্ন বিতর্ক ছিল ও রয়েছে। কিন্তু এমপিপি’র মৌলিক লাইনের বিরুদ্ধে রিম-কমিটির অবস্থান শেষ পর্যন্ত ছিল মৌলিকভাবে ইতিবাচক ও মূলতঃ সঠিক।

এটা সুস্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন বিশেষতঃ আজকের এমপিপি’র চলমান বিভেদাত্মক ও অনৈতিক রিম-বিরোধী আক্রমণকে সংগ্রাম করা ও পরাজিত করার প্রয়োজন থেকে।

এমপিপি এখন পিসিপি-কে প্রকৃতই প্রতিনিধিত্ব করছে কিনা, করে থাকলে তার কোন অংশকে, সেই অংশের দেশাভ্যন্তরে ভূমিকা কী ও প্রকৃত লাইনটা কী, পিসিপি’র বিভিন্ন অংশের পরিস্থিতি কী ও তাদের লাইনগুলো কী- এসবই খুব বিতর্কিত ও জানার বিষয়। এমপিপি-মাধ্যমে এসব সম্বন্ধে কোন সামগ্রিক ও সন্দেহমুক্ত চিত্র বিগত এক/দেড় দশকে কখনো পাওয়া যায়নি ও যাচ্ছে না। তারা একঘেয়েভাবে বলে চলেছে, পেরুর গণযুদ্ধ বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে, পার্টিতে কোন টুএলএস নেই, এবং গণজালো থট এই বিজয়ের গ্যারান্টি। এবং যারাই গণজালোর ভূমিকা নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছে তারাই শত্র“র কথাই বলছে, এমনকি শত্র“র হাতের হাতিয়ার।

সুতরাং এমপিপি-কে পিসিপি’র কোন বিপ্লবী লাইনের ও অংশের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক। হতে পারে তারা আন্তরিকভাবে বিপ্লব চান, কিন্তু তাদের লাইনগত অবস্থান গুরুতর বিপজ্জনক।

আমরা মনেকরি, আজ নেপাল-পার্টি ও আরসিপি কর্তৃক উত্থাপিত নতুনতর যে লাইন-প্রশ্নগুলোতে রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোতে লাইনগত পর্যালোচনা ও বিতর্ক বিকশিত হয়ে উঠেছে, কার্যতঃ কিছু বিভক্তি ঘটে গেছে, তখন এমপিপি’র মত সংকীর্ণতাবাদী ও বিভেদবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে উল্লসিত হওয়া ও প্রকৃত মাওবাদীদের মধ্যে ভাঙন-সৃষ্টির ইন্ধনকে সুস্পষ্টভাবে বিরোধিতা করতে হবে। এবং তাকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

একইসাথে রিম-অভ্যন্তরের বিতর্ককে যৌক্তিক পরিণতিতে নেয়ার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে উচ্চতর লেবেলে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কমিউনিস্টদের নতুনতর দৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। আমাদের পর্যালোচনা ও বিতর্ক সে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যেই পরিচালনা করতে হবে।

উপসংহার

উপরে আলোচিত ও উত্থাপিত লাইনগত প্রশ্নাবলী ছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে। এছাড়া অবধারিতভাবে এ বিষয়গুলো কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুদীর্ঘ দেড়শ’ বছরের আরো অনেক অভিজ্ঞতার আলোচনাকেও তুলে আনতে পারে।

তবে আমরা মনেকরি, সব প্রধান লাইনগত বিতর্ককালেই উঠে আসা অসংখ্য বিষয় ও মতপার্থক্যের মধ্যে প্রধানতম সূত্রগুলোকে বেছে বের করা ও সেগুলোকে আঁকড়ে ধরা প্রয়োজন। সেটা এই ধরনের বিতর্কে সঠিক অবস্থান নিতে পারার প্রধানতম এক সমস্যা। আমাদের পার্টি এবারো প্রথম থেকেই সেভাবেই এগুনোর চেষ্টা করেছে।

নতুন এই মতপার্থক্যগুলো আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক নতুন মহাবিতর্ককে প্রতিফলিত করে। নীতিকে বর্জনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনে বিভক্তির উদ্ভব এবং নীতিকে রক্ষা করার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে উচ্চতর লেবেলে উন্নীত করা এ ধরণের মহাবিতর্কের বৈশিষ্ট্যসূচক দিক। এর মধ্য দিয়ে সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দেলন নতুন পর্যায়ে বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ সংগ্রামে সফলতার উপর নির্ভর করে আগামী ভবিষ্যতে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বিশ্ববিপ্লব কোন পথে এগুবে। যার সাথে আবার আমাদের দেশীয় আন্দোলনের বিকাশও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

সেজন্য আমরা সমগ্র পার্টিকে খুবই গুরুত্ব সহকারে এই মহাবিতর্কে সচেতন অংশ নেয়া ও সেজন্য উপযুক্তভাবে নিজেদের গড়ে তোলা ও ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। এজন্য সংক্ষিপ্ত পাঠ্যগুলো মনোযোগ ও অধ্যবসায়ের সাথে অধ্যয়ন করার কাজকে আঁকড়ে ধরতে হবে। এবং সেগুলো সমাপ্তির পর তাকে ছাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যকে হাতে নিতে হবে। তদুপরি, নতুন নতুন যেসব উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আসবে সেগুলোকেও অধ্যয়ন করতে হবে।

এটা শুধু আমাদের পার্টির একান্ত সমস্যা নয়। সমগ্র মাওবাদী আন্দোলন, তথা সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে এ বিতর্কে যথা সম্ভব বেশী করে যুক্ত করতে হবে। আলোচনা করতে হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পরিসরে। এ বিতর্কের বেশ কিছু বিষয় দীর্ঘস্থায়ী আলোচনা-অধ্যয়ন-গবেষণার বিষয় বলেই আমরা ধারণা করি, যদিও কিছু মৌলিক বিষয়ে আশু সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আশা করি পার্টিব্যাপী ও মাওবাদী আন্দোলনে এই বিতর্ক ও আলোচনা ছড়িয়ে দিতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পার্টির সর্বস্তরের নেতৃত্বগণ এবং সচেতন মাওবাদী কেডারগণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।


পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি/১ নভেম্বর, ২০১৫

Maoist-Flag

প্রগতিশীল প্রকাশক হত্যার নিন্দা

(পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি/১ নভেম্বর, ২০১৫)

সাহসের সাথে সংগঠিত হোন! রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুনএকটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণে ব্রতী হোন!

গতকাল, ৩১ অক্টোবর ঢাকায় প্রায় একই সময়ে দু’জন প্রগতিশীল পুস্তক প্রকাশকের উপর সশস্ত্র সন্ত্রাসী আক্রমণ, জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক দীপনকে হত্যা ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর মালিক টুটুলসহ তিনজনকে গুরুতর আহত করার বর্বরোচিত ঘটনায় আমরা তীব্র ও নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। দৃশ্যত এটা ধর্মীয় মৌলবাদী তৎপরতা বলেই ধারণা করা যায়।
এ ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতার নিন্দা করাই যথেষ্ট নয়। এর সাথে বিশ্ব ও দেশিয় শাসকশ্রেণির সম্পর্ককেও অবশ্যই উন্মোচন করতে হবে, জনগণের প্রগতি ও মুক্তির বাধাকে সমগ্রভাবে বিরোধিতা করতে হবে এবং মুক্তির উপায় খুঁজতে হবে।
বিগত এক বছরের কম সময়ে অভিজিত রায়সহ বেশ কয়েকজন বিজ্ঞান-লেখক ও ব্লগার হত্যার মধ্য দিয়ে এখানে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতার বিকাশ লক্ষ করা যায়। যারা জনগণের মূল শত্রুদের উপর আক্রমণের বদলে জনগণকে হত্যা করার প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছে। গণবিরোধী রাষ্ট্রযন্ত্র ও শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার বুর্জোয়া রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামাতকে দমন করে নিজেদের কুক্ষিগত ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আর এ অভিপ্রায়ে এসবের জন্য বিএনপি-জামাতকে দায়ী করার মধ্য দিয়ে প্রকৃত মৌলবাদী সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে রক্ষা করে চলেছে। এভাবে তারা প্রগতিশীল জনগণকে এই ধর্মীয় ফ্যাসিস্টদের আক্রমণের সহজ টার্গেটে পরিণত হতে কার্যত সহায়তা করছে। এদের কাছে ফ্যাসিবাদী আক্রমণের বিচার ও প্রতিকার চাওয়া অর্থহীন। কারণ, এরাও গণশত্রু ও ফ্যাসিস্ট। এদের সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র ও দলীয় কেডার বাহিনী একইভাবে অসংখ্য মানুষকে বিনা বিচারে ও বর্বরভাবে হত্যা করেছে ও করে চলেছে।
দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির লালিত, পালিত ও বর্ধিত হওয়ার এক উর্বর ক্ষেত্র। যা গণশত্রু সাম্রাজ্যবাদের দালাল এখনকার শেখ হাসিনার আওয়ামী সরকারসহ প্রতিটি সরকার প্রতিপালন ও রক্ষা করে চলেছে।
বৈশ্বিক পরিসরে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদীরা, যারা হাসিনা সরকারসহ শাসকশ্রেণির প্রভু, তারাই ৮০-দশকে এই মৌলবাদীদেরকে সৃষ্টি করেছিল। তাই বিশ্বজুড়ে চাড়া দেয়া ধর্মীয় মৌলবাদী সশস্ত্র শক্তির সাথে বিশ্ব ও দেশিয় ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির রয়েছে প্রকাশ্য ও গোপন সম্পর্ক।
একইসাথে মধ্যযুগীয় সামন্তবাদী আদর্শের জেরে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও দালাল বুর্জোয়া শ্রেণির সাথে তাদের দ্বন্দ্বও রয়েছে। বৈশ্বিক পরিসরে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের তথাকথিত “সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ”-র নামে বিশ্বব্যাপী বিশেষত মুসলিম জনগণের উপর বর্বর যুদ্ধাভিযান এই অপশক্তিকে বিকশিত হতেই ভূমিকা রাখছে। একইভাবে দেশে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের মদদে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনও একে বিকশিত হবার শক্তি যোগাচ্ছে।
একদিকে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত বর্তমান হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের নির্লজ্জ দালাল শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ, এবং অন্যদিকে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল তৎপরতাকে সংগ্রাম করতে হলে বিপ্লবী গণস্বার্থ সম্পন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের নিজেদের সশস্ত্র হতেই হবে। কারণ, একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণ করতে হলে চলমান ব্যবস্থাকে ও তার প্রতিপালকদেরকে সমূলে ও সবলে উচ্ছেদ করা ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই।
চলমান রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ ও দালাল শাসকশ্রেণিকে বিরোধিতার নামে ধর্মীয় মৌলবাদে আশ্রয় নেয়া হলো এক বিভ্রান্ত ও পশ্চাদমুখী মধ্যযুগীয় ফ্যাসিবাদী পথ। তেমনি এইসব মৌলবাদকে বিরোধিতার নামে চলমান বিশ্ব ও দেশিয় ব্যবস্থার রক্ষকদের পক্ষাবলম্বন হলো আরো বড় মুর্খতা, গণবিরোধিতা ও প্রগতি বিরোধিতা।
সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের আদর্শ আজ সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে যাবার কারণেই দেশ ও বিশ্ব আজ এই দুর্যোগের সম্মুখীন। যারা আজ বুর্জোয়া গণতন্ত্রের নামে সাম্রাজ্যবাদ ও মুৎসুদ্দি ফ্যাসিবাদের পক্ষে দালালী করছে তাদের প্রতিক্রিয়াশীলতা, প্রতারণা, ভণ্ডামি ও ব্যর্থতা তুলে ধরাটাই এখনকার মূল কর্তব্য। সেজন্য জনগণকে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের আদর্শে এই ব্যবস্থা উচ্ছেদের বিপ্লবী রাজনীতি ও সংগ্রামে সামিল হতে হবে। তাহলেই ধর্মীয় মৌলবাদী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন থেকেও জনগণ মুক্ত হতে পারবেন। নতুবা দেশ ও জনগণকে আফগানিস্তান, সিরিয়ার ভাগ্য বরণ করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদ এবং মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মৌলবাদী ফ্যাসিবাদ – একই মুদ্রার দুই পিঠ

বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মোহ ত্যাগ করুন! সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণি ও তার ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রকে উচ্ছেদ করুন!

সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের বিশ্বব্যবস্থার লক্ষে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের আদর্শকে আঁকড়ে ধরুন!

বিপ্লবী রাজনীতির ভিত্তিতে জনগণকে সশস্ত্র করুন! মাওবাদী গণযুদ্ধ’র পথে এগিয়ে চলুন!

সূত্রঃ http://pbsp-cc.blogspot.com/


পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার কতিপয় সমস্যা

সিরাজ সিকদার রচনা

পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার কতিপয় সমস্যা

(৩০ এপ্রিল ১৯৭৪)

 

sikder

(৩০শে এপ্রিল বিবৃতি হিসেবে খ্যাত এই দলিলটি অন্যতম প্রধান একটি সিরাজ সিকদার রচনা যা পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনীর তৃতীয় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এর সর্বোচ্চ পরিচালক মণ্ডলীর বিবৃতি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল)

।। ভূমিকা

১৯৭১ সালের ৩০শে এপ্রিল বরিশালের পেয়ারা বাগানে (বরিশাল সদর, বানারীপাড়া, ঝালকাঠি, কাউখালি, স্বরূপকাঠি থানার সীমান্তবর্তী আটঘর, কুড়িয়ানা, ভীমরুলী, ডুমুরিয়া এবং অন্যান্য গ্রাম) পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি সংগঠন পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্বে একটি নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠে।
এভাবে পূর্ববাংলার ইতিহাসে সর্বপ্রথম সর্বহারা বিপ্লবীদের নেতৃত্বে একটি নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠে।
কমরেড সিরাজ সিকদারের সরাসরি পরিচালনায় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ বাহিনী গড়ে উঠে। এ সশস্ত্র বাহিনী এমন একটি সময় গড়ে উঠে যখন পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের প্রচণ্ড রণনৈতিক আক্রমণের মুখে আওয়ামী বিশ্বাসঘাতকদের সকল প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে, তারা পূর্ববাংলার জনগণকে অসহায় অবস্থায় রেখে গা বাঁচানোর জন্য ভারতে পলায়ন করে।
পূর্ববাংলায় পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের প্রতিরোধ করার মতো কোন শক্তিই তখন অবশিষ্ট ছিল না।
এ সময় পেয়ারা বাগানের মুক্তি বাহিনী বীরত্বের সাথে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এবং পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে বিরাট প্রতিরোধ গড়ে তোলে, বিশাল এলাকা মুক্ত করে ঘাঁটি এলাকা স্থাপন করে, সশস্ত্র সংগ্রাম, জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করে, জনগণের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
এ সশস্ত্র সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় ৩রা জুন, ১৯৭১ সালে গড়ে উঠে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির নেতৃত্বে পেয়ারা বাগানে সশস্ত্র তৎপরতার ঐতিহ্য অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী।
পূর্ববাংলার শত্রুদের পরাজিত ও ধ্বংস করে পূর্ববাংলার জনগণকে মুক্ত করার জন্য সর্বহারা পার্টির নেতৃত্বে সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
এ প্রক্রিয়ায় অর্জিত হয়েছে অতিশয় মূল্যবান অভিজ্ঞতা যা আমাদেরকে সশস্ত্র সংগ্রাম, পার্টি গড়ে তোলা ও জনগণকে পরিচালনা করতে সক্ষম করে তুলেছে।

।। জনগণের সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ, পূর্ববাংলার জনগণের উপর নির্মম শোষণ ও নিপীড়ন চালাচ্ছে। তারা পূর্ববাংলার উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক, পূর্ববাংলার রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতি তাদের দখলে ।
পূর্ববাংলার উৎপাদন ব্যবস্থার উপর থেকে এদের মালিকানা উৎখাত করে জনগণ নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
জনগণের এ প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থার মালিকরা। তারা উপরিকাঠামো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা জনগণকে দাবিয়ে রাখছে, নিজেদেরকে রক্ষা করছে।
কাজেই আমাদেরকে সংগ্রাম পরিচালনা করতে হচ্ছে উপরিকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রধারতঃ রাষ্ট্র ও তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে।
কাজেই সশস্ত্র বাহিনীকে পরাজিত করে পুরানো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করতে হবে। জনগণের স্বার্থরক্ষা এবং শত্রুদের দাবিয়ে রাখার জন্য নতুন রাষ্ট্রযন্ত্র, তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
এভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হবে।
এ নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে জনগণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদন সম্পর্ক কায়েম করতে হবে।
প্রতিক্রিয়াশীলদের স্বার্থরক্ষাকারী সশস্ত্র বাহিনীকে পরাজিত ও ধ্বংস করে পুরানো রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ বিচূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী।
যেহেতু আমাদের কোন সশস্ত্র বাহিনী নেই, তাই উদ্ভব হয় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার সমস্যা ।
জনগণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদনের সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের উৎখাত করতে হবে।
গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সামন্তবাদকে উৎখাত করতে হবে।
পূর্ববাংলার জাতীয় ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে জাতীয় বিপ্লব প্রধান। কারণ দল, মত, জাতি, ধর্ম ও শ্রেণী নির্বিশেষে পূর্ববাংলার সকল জনগণ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার আওয়ামী লীগ বিশ্বাসঘাতকদের উৎখাত চান।
এ কারণে পূর্ববাংলার বিপ্লবী যুদ্ধের বর্তমান রূপ হচ্ছে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ।
এ জাতীয় বিপ্লব এবং জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যসমূহ ধাপে ধাপে পূরণ করতে হবে।
সামন্তদের উৎখাত, তাদের ভূমি ক্ষেতমজুর-গরীব চাষীদের মাঝে বিতরণ, দেশপ্রেমিক সামন্তদের সুদ-বর্গা হ্রাস, নির্দিষ্ট সীমার অধিক ভূমি বিতরণ ইত্যাদি ভূমি সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এর ফলে গ্রামের কৃষক সাধারণকে বিপ্লবের পক্ষে টেনে আনা ও পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এভাবে জাতীয় বিপ্লব ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমন্বয় সাধন করতে হবে।
মনিসিং-মোজাফফর সংশোধনবাদীরা পার্লামেন্টারী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনার কথা বলছে। এভাবে তারা জনগণ ও সর্বহারা বিপ্লবীদের ধোকা দিচ্ছে, প্রতিক্রিয়াশীলদের টিকিয়ে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
নয়া সংশোধানবাদীরা সময় হয়নি, সংগঠন হয়নি ইত্যাদি অজুহাতে সশস্ত্র বাহিনী গঠনের বিরোধিতা করে এসেছে। তারা বামপন্থী হটকারী লাইন বা ডানপন্থী সুবিধাবাদী লাইন অনুসরণ করে সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করেছে।
পূর্র্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে পূর্ববাংলার সর্বহারা পাটির সাথে যুক্ত সর্বহারা বিপ্লবীরা বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম পরিচালনা করে। জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা ও সম্পন্ন করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রতি সর্বদাই যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করে।

।। পূর্ববাংলার বিপ্লবী যুদ্ধ ও বিভিন্ন শ্রেণীর ভূমিকা

পূর্ববাংলার বিপ্লবের শত্রু হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ এবং তাদের উপর নির্ভরশীল প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীরা।
পূর্ববাংলার বুর্জোয়া শ্রেণী ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের উপর নিভর করে ১৯৭১-এ সশস্ত্র প্রতিরোধ চালায়। সশস্ত্র প্রতিরোধ ভেঙ্গে গেলে তারা ভারতে পলায়ন করে । শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও গদির লোভে মীরজাফরের মত পূর্ববাংলাকে তারা ভারতের নিকট বন্ধক দেয়।
ভারতীয় বাহিনী পাক সামরিক দস্যুদের পরাজিত করে পূর্ববাংলা দখল করে এবং এখানে তার উপনিবেশ কায়েম করে। তারা আওয়ামী বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা পুতুল সরকার গঠন করে।
এ থেকে দেখা যায় কোন কোন ঐতিহাসিক মুহুর্তে বুর্জোয়া শ্রেণী জাতীয় প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের স্বার্থপরতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অভাবের কারণে বিপ্লবী যুদ্ধকে পূর্ণ বিজয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে অনিচ্ছুক ও অক্ষম।
কৃষক ও ক্ষুদে বুর্জোয়া জনগণ সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী যুদ্ধে যোগদান করতে এবং সে যুদ্ধকে পূর্ণ বিজয় পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক। তারাই হচ্ছে বিপ্লবী যুদ্ধের প্রধান শক্তি। কিন্তু ক্ষুদে উৎপাদনের বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টি গণ্ডিবদ্ধ (আবার কিছু সংখ্যক বেকার জনসাধারণের নৈরাজ্যবাদী ভাবধারা আছে)।
চিন্তা ও কাজের ক্ষেত্রে তারা একতরফাবাদ, ভাসাভাসা ভাব এবং আত্মগত ভাব দ্বারা পরিচালিত।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা হয় ডানে-বামে দোদূল্যমান। সামরিক ক্ষেত্রে তারা হয় রক্ষনশীল বা হঠকারী।
সাংগঠনিক ক্ষেত্রে তারা হয় বিভেদপন্থী ও উপদলবাদী।
কাজেই এদের নেতৃত্বে বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা ও তাকে জয়যুক্ত করা কখনোই সম্ভব নয়। তারা বিপ্লবী যুদ্ধের নির্ভুল পরিচালক হতে পারেনা।
এ কারণে যে যুগে সর্বহারা শ্রেণী রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে ইতিমধ্যেই আত্মপ্রকাশ করেছে, সে যুগে বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব অনিবার্যরূপেই এসে পড়ে সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টির কাঁধে। এ সময় কোন যুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বের অভাব ঘটলে অথবা সেই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গেলে সে যুদ্ধ অনিবার্যভাবেই ব্যর্থ হবে।
কারণ পূর্ববাংলার সমাজের সকল স্তর ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে শুধুমাত্র সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টিই হচ্ছে সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতা থেকে সবচেয়ে মুক্ত; রাজনীতিগতভাবে তারাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশী দূরদৃষ্টি সম্পন্ন; সবচেয়ে বেশী সংগঠিত আর দুনিয়ার অগ্রগামী সর্বহারা শ্রেণী ও রাজনৈতিক পার্টিগুলোর অভিজ্ঞতাকে তারাই সবচাইতে বিনয়ের সাথে গ্রহণ করতে এবং সেই অভিজ্ঞতাকে নিজেদের কার্যে প্রয়োগ করতে সক্ষম ।
তাই কেবলমাত্র সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টিই কৃষক, ক্ষুদে বুর্জোয়া ও বুর্জোয়া শ্রেণীর সংকীর্ণতা, বেকার জনসাধারণের ধ্বংসাত্মকতাকে আর বুর্জোয়া শ্রেণীর দোটানা মনোভাব ও শেষ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাবার মনোবলের অভাবকে অতিক্রম করতে পারে (অবশ্যই যদি পার্টির নীতিতে ভূল না হয়)। এবং বিপ্লব ও যুদ্ধকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিকে আভ্যন্তরীণ ক্ষুদে বুর্জোয়াদের মতাদর্শগত পুনর্গঠন চালানো এবং সংশোধনবাদী ও শত্রুচরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে, বাইরের ক্ষুদে বুর্জোয়া, বুর্জোয়া এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিকে নিজ নেতৃত্বে অন্যান্য শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গঠন করতে হবে, জাতিভিত্তিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসাথে অন্যান্য শ্রেণীর অক্ষমতা, অদৃঢ়তা, বিপ্লব পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে এরূপ অন্যান্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সর্বদা সংগ্রাম করতে হবে।
সঠিক রাজনৈতিক লাইন যার ভিত্তিতে ব্যাপক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগ্রামে পরিচালনা করা যায় তা হচ্ছে মৌলিক গুরুত্ব সম্পন্ন।
শুধু রাজনৈতিক লাইন নয়, সামরিক, সাংগঠনিক, মতদর্শগত ও অন্যান্য লাইনও সঠিক হতে হবে।
লাইন সঠিক হলে ক্ষুদ্র শক্তি বড় হয়, সশস্ত্র শক্তি না থাকলে তা গড়ে উঠে, রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলে তা অর্জিত হয়। লাইন ভুল হলে পূর্ব অর্জিত ফল খোয়া যায়।
কাজেই সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিকে সক্ষম হতে হবে রাজনৈতিক, সামরিক, সাংগঠনিক, মতাদর্শগত ও অন্যান্য লাইন সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে এবং তা বাস্তবায়নে কেডার, সৈনিক ও জনগণকে পরিচালনা করতে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি জনগণকে সমাবেশিত ও তাদের উপর নির্ভর করে জাতীয় বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা করছে।
এ কারণেই এ যুদ্ধ হচ্ছে গণযুদ্ধ।
একমাত্র পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি গণযুদ্ধ পরিচালনা করে শত্রুদের পরাজিত ও ধ্বংস করে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা ও সম্পন্ন করতে সক্ষম।

।। পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের বাহিনী

শ্রেণী সমাজে প্রতিটি সংগঠনই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর সেবা করে।
সশস্ত্র সংগঠনও একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর স্বার্থের সেবা করে।
সমাজের শ্রেণী বিভাগের পর রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনীর উদ্ভব হয় ক্ষমতাসীন শ্রেণীকে টিকিয়ে রাখার জন্য।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বি.ডি.আর, রক্ষী ও পুলিশ বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও তার প্রভুদের টিকিয়ে রাখা।
প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী নিজেদের রক্ষা করা এবং জনগণকে দাবিয়ে রাখার জন্য যে রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে তাকে পরাজিত ও ধ্বংস করা এবং সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা কায়েম ও রক্ষা করা এবং শত্রুদের দাবিয়ে রাখাই সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য।
কাজেই সশস্ত্র বাহিনী একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টির অধীনে থাকে, তাদের স্বার্থের সেবা করে।
শ্রেণীর ঊর্ধ্বে, রাজনীতির উর্ধ্বে কোন সশস্ত্রবাহিনী থাকতে পারেনা।
সশস্ত্রবাহিনী সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্ব ব্যতিরেকেই গড়ে তুললে তা কি জনগণের স্বার্থের সেবা করতে পারে?
সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে না তুললে অনিবার্যভাবেই সশস্ত্র বাহিনী তার সদস্যদের শ্রেণীভিত্তিকেই সেবা করবে।
সশস্ত্র বাহিনীতে সর্বহারা পার্টির নেতৃত্ব না থাকায় সেখানে ঢুকে পড়বে আমলা বুর্জোয়া, সামন্ত, ক্ষুদে বুর্জোয়া এবং তাদের শ্রেণী পরিবর্তনেরও কোন প্রয়োজন হবে না।
ফলে এ বাহিনী আমলা বুর্জোয়া, সামন্ত, ক্ষুদে বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষা করবে, সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের স্বার্থরক্ষা করবে না।
এ বাহিনী হবে প্রতিক্রিয়াশীল সমরবাদী বাহিনী।
পক্ষান্তরে আমাদের বাহিনী সর্বহারাশ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে, সদস্যরা সর্বহারায় রূপান্তরিত হচ্ছে; পার্টি সশস্ত্র বাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে ও পরিচালিত করছে।
বর্তমান যুগে কেবলমাত্র সর্বহারা শ্রেণীই জনগণের স্বার্থরক্ষা করতে সক্ষম, তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত ও মুক্ত করতে সক্ষম।
এ কারণে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বাধীন সশস্ত্রবাহিনী সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের স্বার্থরক্ষা করে।
সৈন্যবাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা, কোম্পানী পর্যায়ে পার্টি শাখা প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক কমিশার নিয়োগ, প্রতিটি সেনাবাহিনী স্থানীয় সংগঠনের অধীন ইত্যাদির মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে পার্টি-নেতৃত্ব প্রদান করা, বন্দুক পার্টির অধীন, পার্টি বন্দুকের অধীন নয়—এ নীতি কার্যকরী হচ্ছে।

।। পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা ও বিপ্লবী যুদ্ধের নীতি ও কৌশল

পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এরূপ সকল নীতি ও কৌশল ব্যর্থ হতে বাধ্য।
কোন বৈদেশিক অভিজ্ঞতা যা আমাদের বাস্তব অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় তা অন্ধভাবে হুবহু প্রয়োগ করলে ব্যর্থ হতে বাধ্য।
পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা কি?
পূর্ববাংলা একটি ক্ষুদ্র দেশ, জঙ্গলাকীর্ণ পার্বত্যভূমি খুবই কম, নদীমাতৃক সমভূমিই বেশী। ভৌগলিকভাবে পূর্ববাংলা ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত, সমুদ্রও ভারত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া আমাদের সাহায্য করতে পারে এরূপ দেশের সাথে পূর্ববাংলার কোন সীমান্ত নেই।
জনগণের রয়েছে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অভিন্নতা। অর্থনৈতিকভাবে পূর্ববাংলা সমবিকশিত। জনগণ বাংলাদেশ পুতুল সরকার ও তার প্রভুদের উৎখাত চান।
বিভিন্ন বেসামরিক বাহিনী ছাড়াও বাংলাদেশ পুতুল সরকারের রয়েছে পুলিশ, বি.ডি.আর, রক্ষী এবং সেনাবাহিনী। এদেরকে সহায়তা করার জন্য রয়েছে ভারতীয় বাহিনী, সোভিয়েত এবং সম্ভবতঃ মার্কিন বাহিনীও।
পক্ষান্তরে পূর্ববাংলার জনগণকে মুক্ত করার ও রক্ষা করার মত কোন শক্তিশালী বাহিনী আমাদের নেই।
শত্রুদের উৎখাতের জন্য জনগণের রয়েছে দৃঢ় মনোবল। এখানেই নিহিত আছে শূন্য থেকে জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ভিত্তি।
আমাদের গেরিলা বাহিনী শূন্য থেকে গড়ে উঠেছে, তারা অনভিজ্ঞ, নতুন। তাদের অস্ত্র-শস্ত্র স্বল্প, নিয়মিত সরবরাহ নেই, তাদের ট্রেনিং নেই।
পক্ষান্তরে শত্রুসেনা অভিজ্ঞ, ট্রেনিং প্রাপ্ত, সংখ্যায় বেশী, রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তা রয়েছে তাদের পিছনে। পূর্ববাংলার ভৌগলিক সুবিধা তাদের পক্ষে।
তাদের সাহায্য করার জন্য রয়েছে ভারতীয় বাহিনী, সোভিয়েত ও সম্ভবতঃ মার্কিন বাহিনী।
কাজেই শত্রু প্রবল, আমরা দুর্বল। এ কারণে শত্রুকে পরাজিত করতে সুদীর্ঘদিন যুদ্ধ চালাতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের দুর্বল শক্তি সবল শক্তিতে রূপান্তরিত হবে; পক্ষান্তরে শত্রুর সবল শক্তি দুর্বল শক্তিতে রূপান্তরিত হবে, তারা পরাজিত ও ধ্বংস হবে।
এ কারণে আমাদের যুদ্ধের রণনীতি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ।
কিন্তু বাস্তব যুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা যদি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নীতি গ্রহণ করি, ঘন্টার পর ঘন্টা শত্রুর সাথে লড়াই করি তবে শত্রু সহজেই শক্তি সমাবেশ করে আমাদের ধ্বংস করতে সক্ষম হবে।
কাজেই বাস্তব যুদ্ধ ও লড়াই হতে হবে দ্রুত নিষ্পত্তিকর যুদ্ধ, অর্থাৎ অতি অল্প সময়ের মাঝে আমাদের লড়াই শেষ করতে হবে যাতে শত্রু তার শক্তি সমাবেশ করার সময় না পায়।
এ দ্রুত নিষ্পত্তিকর যুদ্ধ সাধারণতঃ অতর্কিত হামলার রূপ গ্রহণ করবে। এর ফলে শত্রু তার শক্তি, উৎকৃষ্টতা ব্যবহার করতে পারবেনা। সে অপস্তুত অবস্থায় থাকবে, এমন কি সে অস্ত্র ব্যবহারও করতে সক্ষম হবে না।
উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৭৩-এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সময় আমাদের অতর্কিত আক্রমণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াইয়ের কৌশলের কারণে বহু থানা ও ফাঁড়ি দখল করা সম্ভব হয়। অনেক ক্ষেত্রে শত্রু অস্ত্র ব্যবহারেরও সুযোগ পায়নি।
আমাদের রণনীতি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাঝে দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াই করা।
আমাদের শক্তি দুর্বল, শত্রু শক্তি প্রবল, সে যেখানেই আমাদের খোঁজ পায় সেখানেই তার শক্তি সমাবেশ করে আমাদেরকে আক্রমণ করে।
অর্থাৎ শত্রু রণনৈতিক আক্রমণের স্তরে রয়েছে। আর আমরা রয়েছি রণনৈতিক আত্মরক্ষার স্তরে, নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখা ও বিকাশ সাধনের স্তরে।
কিন্তু আমাদের বাস্তব হামলার রূপ হচ্ছে আক্রমণাত্মক। অর্থাৎ শত্রুদের আমরাই আক্রমণ করি, শত্রু আত্মরক্ষায় থাকে।
নিছক আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করলে শক্তিশালী শত্রুর দ্বারা আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব।
অবশ্য শত্রুর কোন অংশকে ঠেকিয়ে রাখা, বিচ্ছিন্ন শত্রুকে ঘিরে রাখা ইত্যাদির জন্য আমরা কৌশলগত আত্মরক্ষাত্মক পদক্ষেপ নেই।
কাজেই আমাদের রণনীতি হচ্ছে রণনৈতিক আত্মরক্ষার মাঝে আক্রমণ চালানো।
শত্রু অধিকৃত দেশ হচ্ছে বাংলাশে। সে যে কোন স্থানে শক্তি সমাবেশ করে আমাদেরকে আক্রমণ করতে পারে।
অর্থাৎ শত্রু রণনৈতিক বহির্লাইনে রয়েছে।
পক্ষান্তরে আমরা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করছি। অর্থাৎ আমরা রণনৈতিক অন্তর্লাইনে লড়ছি। বাস্তব হামলায় আমরা করি আক্রমণ অর্থাৎ বহির্লাইনে তৎপরতা চালাই, যদিও আমাদের বহির্লাইনের ঘেরাও বলয় ছোট (একটি থানা, ফাঁড়ি বা ছোট চলমান ইউনিট)।
কাজেই আমরা অন্তর্লাইনের মাঝে বহির্লাইনে লড়াই করছি।
আমাদের যুদ্ধের নীতি হচ্ছেঃ
রণনৈতিক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাঝে দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াই করা, রণনৈতিক আত্মরক্ষার মাঝে আক্রমণাত্মক লড়াই করা, অন্তর্লাইনের মাঝে বহির্লাইনের লড়াই করা।
এ যুদ্ধ আমাদের ততদিন চালাতে হবে যতদিন শত্রু তার রণনৈতিক আক্রমণ চালাতে অক্ষম হয়ে পড়বে। শত্রু রণনৈতিক আত্মরক্ষার স্তরে পৌঁছাবে আর আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে রণনৈতিক আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে পরাজিত ও উৎখাত করতে সক্ষম হবো।
রণনৈতিক আত্মরক্ষার স্তর থেকে দেশব্যাপী রণনৈতিক আক্রমণ পরিচালার স্তরে পৌঁছাবার সময়টা হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধের সবচাইতে কঠিন, নির্মম ও দীর্ঘদিনের স্তর।

।। পেয়ারা বাগানের অভিজ্ঞতা

ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, বি.ডি.আর এবং পুলিশের বিদ্রোহ ও জনগণের গণআন্দোলনের ফলে ১৯৭১-এর মার্চে পাক সামরিক বাহিনী কিছু দিনের জন্য আত্মরক্ষামূলক অবস্থায় পতিত হয় (ঢাকা ব্যতীত)।
তারা বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে আটকে পড়ে। অচিরেই তারা প্রতিআক্রমণ চালিয়ে কান্টনমেন্টের ঘেরাও ভেঙ্গে ফেলে এবং সমগ্র পূর্ববাংলায় তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রণনৈতিক আক্রমণ চালায়।
আওয়ামী লীগ ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিদ্রোহী বাহিনী এ আক্রমণের মুখে কৌশলগত প্রতিরক্ষার লাইন না নিয়ে বাস্তব যুদ্ধে নিস্ক্রিয় আত্মরক্ষার লাইন নেয়। তারা অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়, শত্রুকে শহরে-বন্দরে ঠেকায়। অনভিজ্ঞ, সংখ্যা ও সরবরাহ স্বল্পতা এবং কৌশলগত নিম্নমানের জন্য তারা পরাজিত হয়, ছিন্নভিন্ন হয় এবং পলায়ন করে।
পাক বাহিনীর রণনৈতিক আক্রমণ তখন শহর সমূহ দখলের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যাপক গ্রামাঞ্চলে তার আক্রমণ পৌছেনি।
এ সময় পেয়ারা বাগানে আমাদের বাহিনী গঠন করা হয় এবং বাহিনীকে পুনর্গঠন, রিক্রুট, ট্রেনিং ,অস্ত্র উদ্ধার, জাতীয় শত্রু খতম, জনগণকে জাগরিত ও সংগঠিত করার কাজ চালানো হয়।
পাক সামরিক দস্যুরা গ্রাম পর্যন্ত তাদের আক্রমণ বিস্তৃত করে। কোথাও প্রতিরোধ না থাকায় ব্যাপক শক্তি সমাবেশ করে পেয়ারা বাগানের উপর প্রচণ্ড ঘেরাও দমন চালায়।
প্রচণ্ড ঘেরাও দমনের মুখে আমাদেরকে পেয়ারা বাগান থেকে সরে আসতে হয়।
জুন মাসের শেষ নাগাদ পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের রণনৈতিক আক্রমণ চলে। এর মাঝে বর্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় তারা রণনৈতিক আক্রমণ শেষ করে অর্জিত ফল ধরে রাখার জন্য রণনৈতিক সংরক্ষণের স্তরে পৌছে।
পেয়ারা বাগান থেকে প্রত্যাহার করা বাহিনীর এক অংশ গৌরনদী অঞ্চলে বর্ষাকালে বিরাটাকার গেরিলা যুদ্ধের সুচনা করে। অন্য অংশ পেয়ারা বাগানের আশেপাশেই গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
এ বর্ষাকালেই পেয়ারা বাগানের অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে বরিশাল, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, পাবনা, ঢাকা, টাঙ্গাইলে আমাদের গেরিলা যুদ্ধের বিকাশ ঘটে।
১৯৭১-এর অক্টোবরে ভারত প্রত্যাগত আওয়ামী বাহিনীর উপস্থিতির ফলে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকদের সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেয়।
বিশ্বাসঘাতক আওয়ামী বাহিনী জনগণের এক অংশের সমর্থনকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। তারা আমাদের সাথে অবস্থানকারী আওয়ামী সুবিধাবাদী, ভ্রষ্টদের হাত করে আমাদের কর্মী ও গেরিলাদের অসতর্কতার সুযোগে ব্যাপক অঞ্চলে গেরিলাদের বিপদগ্রস্ত করে।
এভাবে পাক বাহিনী যে বিপর্যয় ঘটাতে পারেনি আওয়ামী বিশ্বসঘাতকদের দ্বারা তাই ঘটে। আমাদের বহু কমরেড ও গেরিলা প্রাণ হারায়, ব্যাপক অঞ্চল হাতছাড়া হয়।
পেয়ারা বাগান ও পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—শত্রুর রণনৈতিক আত্মরক্ষার সময়, প্রাকৃতিক কারণে বর্ষাকালে শত্রু যে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেয় তখনই আমাদের রণনৈতিক আক্রমণ পরিচালনা করা উচিৎ। এ সময়ই আমাদের যুদ্ধের ও সংগঠনের বিকাশ হয়।
শত্রুর শুকনাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সময় আমাদের রণনৈতিক আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে হবে। প্রচন্ড চাপ আসবে। আমাদের বিকাশ কম হবে। আমাদের এলাকা সংকুচিত হবে।
শত্রুর ঘেরাও দমন অভিযান ভেঙ্গে ফেলা বা তা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য একনাগাড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কাজ হওয়ার প্রয়োজনঃ আক্রমণের এলাকা, আশ্রয় এলাকা প্রয়োজন, শহরে-গ্রামে ভাল কাজ প্রয়োজন।
অন্যথায় প্রচণ্ড ঘেরাও-দমন অভিযানের মুখে বিচ্ছিন্ন পকেটের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
শত্রুর ঘেরাও দমন স্থানীয় দালাল, খবর সরবরাহকারী না পেলে সফল করা কষ্টকর। এ কারণে জাতীয় শত্রু সরকারের চোখ ও কান উৎখাত করা দরকার।
জাতীয় শত্রু খতমের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন কর উচিৎ। ব্যাপক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে চরম ঘৃণ্য ও মৃত্যুদণ্ড পেতে পারে এরূপ অল্প সংখ্যক শত্রু খতম করা, তাও যথাযথ স্তর থেকে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া। ব্যাপক জাতীয় শত্রুদের আÍসমর্পণ করানো উচিৎ।
শত্রুর ঘেরাও দমনের মুখে কতখানি টিকে থাকা সম্ভব তা বিবেচনা করে সামরিক তৎপরতা চালানো উচিৎ।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমস্যা, আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতক, ভ্রষ্টদের সমস্যা সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও পদক্ষেপ নিয়ে রাখতে হবে।

।। বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ ও আমাদের অভিজ্ঞতা

পূর্ববাংলার প্রাকৃতিক অবস্থার সাথে শত্রুর রণনৈতিক আক্রমণ ও রণনৈতিক সংরক্ষণ অনেকখানি জড়িত।
সাধারণতঃ শীতকালেই তারা রণনৈতিক আক্রমণ শুরু করে এবং বর্ষার প্রারম্ভেই এ আক্রমণ শেষ করে। বর্ষাকালে সৈন্য সমাবেশ, চলাফেরার অসুবিধার কারণে শত্রু পূর্ববর্তী আক্রমণের ফল ধরে রাখার জন্য রণনৈতিক সংরক্ষণের স্তরে থাকে।
এ অবস্থা অপরিবর্তনীয় নয়।
শত্রু সামগ্রিকভাবে যেহেতু রণনৈতিক আক্রমণের পর্যায়ে রয়েছে সে কারণে বর্ষাকালেও কোন এলাকায় প্রয়োজন হলে ঘেরাও দমন চালাতে পারে। গত বর্ষায় সুন্দরবনের কম্বিং অপারেশন তার প্রমাণ।
পাকবাহিনী তার রণনৈতিক আক্রমণ বর্ষার পূর্বেই শেষ করে।
ভারতীয় বাহিনী তার রণনৈতিক আক্রমণ শুকনো কালেই শুরু করে এবং বর্ষার পূর্বেই শেষ করে।
এ অবস্থা বিবেচনা করে আমরা বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সময় আমাদের সশস্ত্র তৎপরতাকে জাতীয় শত্রু খতমের পর্যায় থেকে থানা, ফাঁড়ি দখলের পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
এ আক্রমণের সময় পূর্ব অভিজ্ঞতা ব্যাপকভাবে কাজ লাগানো হয়। আক্রমণের এলাকা, আশ্রয় এলাকা, একনাগাড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে কাজ, শহরে-গ্রামে ভাল কাজ ইত্যাদি।
শত্রুকে প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করা, সাহসকে প্র্রাধান্য দিয়ে শত্রুর অবস্থান দখল করা, ছোট ছোট গ্রুপ ব্যবহার করা প্রভৃতির মাধ্যমে আমরা বহু থানা ও ফাঁড়ি দখল করতে সক্ষম হই।
এভাবে বহু অস্ত্র সংগৃহীত হয়, অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়, আমাদের বিরাট বিকাশ হয়।

।। সাংগঠনিক সুসংবদ্ধকরণ ও সশস্ত্র সংগ্রাম

আমাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, যে সকল স্থানে সাংগঠনিক সুসংবদ্ধকরণ ভাল ছিল সেখানে সশস্ত্র সংগ্রাম ভাল বিকাশ লাভ করেছে এবং এ প্রক্রিয়ায় অর্জিত ফল সমূহও ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
পক্ষান্তরে যে সকল স্থানে সাংগঠনিক সুসংবদ্ধকরণ ভাল ছিলনা সেখানে সশস্ত্র সংগ্রাম ভাল বিকাশ লাভ করেনি বা অর্জিত ফলও ধরে রাখা যায়নি।
সুসংবদ্ধকরণের লক্ষ্য হচ্ছে কর্মী ও গেরিলাদের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক, সামরিক, মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক মানোন্নয়ন । এ প্রক্রিয়ায় কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাই করা, ভ্রষ্ট, সুবিধাবাদী, অধঃপতিত শত্রুচরদের খুঁজে বের করে অপসারিত করা, শৃংখলা ও নিরাপত্তা জোরদার করা।
১৯৭৩-এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের পূর্বে শীতকালীন সুসংবদ্ধকরণের সময় চক্রবিরোধী শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ভ্রষ্ট, খারাপ ও বাসি উপাদান অপসারিত হয়, ভাল ও তাজা উপাদান সংগৃহীত হয়, তাদের মান উন্নত হয়।
যে সকল অঞ্চলে এ সুসংবদ্ধকরণের কাজ ভাল চলে সে সকল স্থানে বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ ভাল বিকাশ লাভ করে।
১৯৭৩-এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের ফলে অর্জিত বিরাট বিকাশ ধরে রাখার জন্য শুকনোকালে মানোন্নয়ন ও সুসংবদ্ধকরণ পরিচালনা করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় কর্মীদের মানোন্নয়ন, কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাই এবং খারাপ উপাদান অপসারণের কাজ চলছে।
এ পদক্ষেপ দ্রত যেখানে গহণ করা হয়নি সেখানেই বিপর্যয় ঘটেছে, ভ্রষ্ট বা শত্রুদের হাতে অস্ত্র চলে গেছে; পার্টি-কর্মীরা প্রাণ হারিয়েছে, এলাকায় প্রচণ্ড চাপ ও বিপর্যয় হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, মুন্সিগঞ্জে বর্ষাকালীণ রণনৈতিক আক্রমণের সময় রিক্রুটের ক্ষেত্রে সতর্ক না হওয়ার ফলে কিছু ভ্রষ্ট ও অধঃপতিত ব্যক্তি ঢুকে পড়ে যারা পরে ডাকাতি, পত্র দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা, শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কর্মীদের হত্যা করে অস্ত্র দখলের ষড়যন্ত্র চালায়।
পার্টি এদের তৎপরতাকে ধ্বংস করে দেয়।
কুমিল্লার মতলব এলাকার কর্মীদের কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাই না করার ফলে ভ্রষ্ট, ডাকাতরা পার্টিতে অনুপ্রবেশ করে। তারা অস্ত্র আত্মসাৎ করার জন্য কয়েকজন কর্মী ও গেরিলাদের হত্যা করে।
ফরিদপুরের ভ্রষ্টরা অস্ত্র আত্মসাৎ করে। গোপনীয়তা-নিরাপত্তা বজায় না থাকার ফলে অস্ত্র খোয়া যায়, কাজে বিপর্যয় আসে।
বর্তমানে মানোন্নয়ন ও সুসংবদ্ধকরণের যে কাজ চলছে তা ভালভাবে সম্পন্ন করতে হবে; বাসী, খারাপ এবং শত্রুচরদের অপসারিত করতে হবে, আসন্ন বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ ভালভাবে পরিচালনা করার জন্য।

।। সাংগঠনিক কাজ ও সশস্ত্র সংগ্রামের সম্পর্ক এবং অসম বিকাশ

আমাদের সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলা ও বিকাশ সাধনের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে ভাল সাংগঠনিক কাজ।
সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে গেরিলা রিক্রুট হয়। শেল্টার গড়ে উঠে, লক্ষ্যবস্তুর অনুসন্ধান পাওয়া যায়। আক্রমণের পূর্বে সমাবেশ এবং পরে সরে পড়া সম্ভব হয়।
সুশৃংখল, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় আছে এরূপ সাংগঠনিক কাজ শূণ্য থেকে গেরিলা গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।
পার্টি-কাজের মাধ্যমে গেরিলা রিক্রুট করা, তাদের কেডার ইতিহাস যাচাই, এককভুক্ত করা, শৃঙ্খলা, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং পার্টি লাইনে শিক্ষিত করা, সশস্ত্র প্রচার ও জাতীয় শত্রু খতমের মাধ্যমে ট্রেইন করা, এভাবে উচ্চতর সামরিক তৎপরতার জন্য প্রস্তুত করা ইত্যাদি কাজ সাংগঠনিক কাজের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
সাংগঠনিক ক্ষেত্রে সকল অঞ্চলে, অঞ্চলের মধ্যে সকল উপ-অঞ্চলে আবার উপ-অঞ্চলের মধ্যে সকল এলাকায় ভাল কাজ থাকে না।
কাজের বিকাশ ও সুসংবদ্ধতার বিচারে অঞ্চলগুলোকে উন্নত, মাঝারী ও পশ্চাদপদতে ভাগ করা যায়।
উপ-অঞ্চল, এলাকার ক্ষেত্রে ও ইহা প্রযোজ্য।
একইভাবে সামরিক তৎপরতার দিক দিয়ে অগ্রসর, মাঝারি, পশ্চাদপদ এই তিনভাগে অঞ্চল, উপ-অঞ্চল এবং এলাকাসমূহকে ভাগ করা যায়।
সাংগঠনিক কাজের ক্ষেত্রে অগ্রসর অঞ্চল, উপ-অঞ্চল এবং এলাকগুলোকে আকঁড়ে ধরতে হবে। উন্নত অঞ্চল থেকে কর্মী বের করে মাঝারি, অনুন্নত স্থানে প্রেরণ; অনুন্নত, মাঝারি স্থান থেকে কর্মী এনে ট্রেইন করা, আশ্রয়স্থান ইত্যাদির কাজে ব্যবহার করতে হবে।
সামরিক তৎপরতা পরিচালনার সময় সামগ্রিক কাজের ক্ষেত্রে উক্ত স্থানের ভূমিকা, উক্তস্থানে সম্ভাব্য শত্রু চাপের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত অবস্থা ইত্যাদি বিবেচনা করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ একটি স্থান, সমগ্র অঞ্চল, উপ-অঞ্চল বা এলাকার কাজের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। স্বভাবতঃই সেখানে প্রচণ্ড সামরিক তৎপরতা চালালে শত্রুচাপে সেখান থেকে উৎখাত হতে হবে। ফলে সামগ্রিক কাজের ক্ষতি হবে।
কোন এলাকায় ভাল সাংগঠনিক ও সশস্ত্র তৎপরতা শত্রুর প্রবল চাপে বা আভ্যন্তরীণ শত্রুদের অন্তর্ঘাতী কাজে হ্রাস পেতে পারে বা তৎপরতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পূর্ববাংলা ক্ষুদ্রদেশ, শত্রু দ্রুত সমাবেশিত হতে পারে। সমতল ভূমি এবং শত্রুর পক্ষে বৈদেশিক সহায়তা লাভ সম্ভব ইত্যাদি কারণ থেকে দেখা যায়—বিচ্ছিন্ন পকেট হিসেবে সশস্ত্র তৎপরতা পরিচালনা করলে তাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
পূর্ববাংলার এক/একাধিক জেলায়ও ভাল সশস্ত্র তৎপরতা চালালে তাও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবেনা।
পূর্ববাংলার সকল জেলায় গেরিলা তৎপরতা চালাতে হবে। যোগাযোগ পথে শত্রুদের হয়রানি করতে হবে। সমভূমিতে, পাহাড়ে গেরিলা তৎপরতা চালাতে হবে, শহরে গ্রামে শত্রুকে ব্যস্ত রাখতে হবে।
এভাবে শত্রু সর্বত্রই আক্রান্ত হয়ে তার সৈন্যবাহিনীকে বিভক্ত করতে, পাহরামূলক তৎপরতায় নিয়োজিত করতে বাধ্য হবে। বিভিন্ন এলাকায় ঘেরাও দমনের জন্য তার সচল বাহিনীর স্বল্পতা দেখা দেবে।
এভাবে আভ্যন্তরীণ বহু গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি এলাকা গড়ে উঠবে।

১০।। গেরিলা বাহিনী বিকাশের প্রথম পর্যায় এবং উদ্যোগ-নমনীয়তা-পরিকল্পনা

আমাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে গেরিলা বাহিনীর বিকাশের প্রথম পর্যায় হচ্ছে—গেরিলা বাহিনী শূণ্য থেকে গড়ে উঠছে। তারা অনিয়মিত, তাদের রয়েছে অভিজ্ঞতার অভাব, সংখ্যাল্পতা, অস্ত্র স্বল্পতা। এ সকল কারণে চলমান শত্রুকে ঘিরে ফেলে খতম করতে তারা সক্ষম নয়।
গেরিলা বাহিনীর বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে—গেরিলা বাহিনীর অভিজ্ঞতা, সংখ্যা প্রাচুর্যতা, অস্ত্র প্রাচুর্যতা এবং নিয়মিত চরিত্রের হয়েছে। চলমান শত্রুকে ঘিরে ফেলে তারা খতম করতে সক্ষম।
কোথাও কোথাও আমাদের গেরিলা বাহিনীর বিকাশের প্রথম পর্যায় চলছে। আবার কোথাও কোথাও আমরা বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছি।
গেরিলা বাহিনীর বিকাশের প্রথম পর্যায়ে আমরা উদ্যোগ অর্থাৎ কার্যকলাপের স্বাধীনতা বজায় রাখছি গোপন কর্মপদ্ধতি ও সরে পড়ার মাধ্যমে।
একটি অপারেশন শেষে শত্রুর ঘেরাও দমন থেকে বাঁচার জন্য গেরিলারা নিজ নিজ শেল্টারে চলে যায় (গোপন কর্মপদ্ধতির কারণে সে অপ্রকাশিত), প্রকাশিত গেরিলারা ঘেরাও দমন হবে না এরূপ এলাকায় আশ্রয় নেয়।
অপ্রকাশিত গেরিলাদের পক্ষে ঘেরাও দমনের মুখে টিকে থাকা অসুবিধাজনক হলে তারাও নিরাপদ স্থানে সরে পড়ে।
এভাবে বর্তমানে উদ্যোগ বজায় রাখার মুখ্য পদ্ধতি হচ্ছে সরে পড়া।
এ কারণে আমাদের কাজ হওয়া প্রয়োজন একনাগাড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, শৃংঙ্খলা হওয়া উচিত কঠোর। শহরে, গ্রামে ভাল কাজ হওয়া উচিত।
এছাড়া আশ্রয় এলাকা, আক্রমণ এলাকা ভাগ করে সামরিক কাজ করা উচিত যাতে শত্রু বুঝতেই না পারে কোথায় আমাদের অবস্থান।
এ পদ্ধতিতে উদ্যোগ বজায় রাখা প্রয়োজন; গেরিলারা যখন নতুন, অনভিজ্ঞ, সংখ্যায় কম, অস্ত্র কম এবং শত্রুর ঘেরাও দমনকারী ইউনিটকে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করতে তারা অক্ষম।
উদ্যোগের মূর্ত প্রকাশ হচ্ছে নমনীয়তা।
নমনীয়তা প্রকাশ পায় গেরিলাদের একত্রিত করা, ছড়িয়ে দেওয়া ও স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে।
গোপন কর্মপদ্ধতির কারণে কোন অপারেশন পরিচালনার জন্য গেরিলারা গোপন শেল্টারে গোপনে একত্রিত হতে সক্ষম হয়।
একইভাবে আক্রমণ শেষে গেরিলারা সরে পড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
প্রচণ্ড চাপের মুখে গেরিলারা প্রয়োজনীয় স্থান পরিবর্তন করে অর্থাৎ অন্য এলাকায় আশ্রয় নেয় বা কাজ করে। পরে চাপ কমে গেলে তারা ফিরে আসে।
অন্য অঞ্চলে অভিজ্ঞ গেরিলা পাঠিয়ে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করার জন্য গেরিলাদের ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
গেরিলাদের ছড়িয়ে থাকার কারণ হচ্ছে শেল্টার, খাদ্য, অর্থ, অস্ত্রের স্বল্পতা, অনিয়মিত চরিত্র, শত্রুর খবর সংগ্রহের চ্যানেলের গ্রামে উপস্থিতি এবং শত্রুর ঘেরাও ভেঙ্গে ফেলার অক্ষমতা ইত্যাদি।
ব্যাপক চাপের মুখে স্থান পরিবর্তনের পূর্বে অস্ত্রশস্ত্র নিরাপদে রাখা, স্থানীয় কাজের সাথে সংযোগ রাখার ব্যবস্থা রাখা, নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে অস্ত্র আত্মসাৎ বা অপব্যবহার, খোয়া যাওয়ার সমস্যা যাতে উদ্ভব না হয় তার ব্যবস্থা রাখা।
প্রাথমিক বা অন্য যে কোন স্তরে পরিকল্পনা ব্যতীত গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনা, তা টিকিয়ে রাখা ও বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়।
ঘেরাও দমন ও আভ্যন্তরীণ শত্রুদের অন্তর্ঘাতী কাজ থেকে টিকে থাকা, অস্ত্র গেরিলা সংগ্রহ, ট্রেনিং-মানোন্নয়ন; অর্থ, খাদ্য, শেল্টারের ব্যবস্থা, গেরিলাদের নিয়মিতকরণ; বিস্তৃত অঞ্চলে কাজ ইত্যাদি সমস্যার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে অগ্রসর হতে হবে।
বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কাজ গড়ে তুলতে হবে যাতে বিকল্প আশ্রয়স্থল গড়ে উঠে। অস্ত্র সংগ্রহের জন্য শত্রুর দুর্বল অবস্থান আক্রমণ করে দখল করা বা দুর্বল চলমান শত্রুকে ঘিরে ফেলে খতম করা, জাতীয় শত্রু খতম ও আত্মসমর্পণ করানোর মাধ্যমে শত্রুর খবর সংগ্রহের ব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলা, সশস্ত্র প্রচার টিমের মাধ্যমে ব্যাপক জনমত গড়া, এ প্রক্রিয়ায় গেরিলাদের ট্রেইন করা। গ্রাম ভিত্তিক চাঁদা সংগ্রহ, শেল্টারের ব্যবস্থা করা, নিয়মিত গেরিলা গড়ে তোলা ইত্যাদি কাজ হচ্ছে গেরিলাবাহিনী বিকাশের প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য।

১১।। গেরিলা বাহিনী বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায় এবং উদ্যোগ-নমনীয়তা-পরিকল্পনা

সরে পড়ার মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখার পদ্ধতি চিরদিন অনুসরণ করলে শত্রুর ঘেরাও দমন কখনই ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব হবে না। জনগণের আস্থা নষ্ট হবে, সচল বাহিনী ও ঘাঁটি এলাকা গড়ে উঠবেনা, শেষ পর্যন্ত আমরা ধ্বংস হবো।
সরে পড়ার মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখাকে আক্রমণের মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখায় রূপান্তরিত করতে হবে।
এটা কিভাবে সম্ভব?
শত্রুর ঘেরাও দমনকানকারী ইউনিটের পুরোটাই (ছোট ও দুর্বল হলে) বা তার অংশকে অতর্কিতে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করা। এভাবে শত্রুকে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা, তার ঘেরাও দমন অভিযান ভেঙ্গে ফেলার মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ চলমান শত্রুকে অতর্কিতে ঘিরে ফেলে খতম করা।
এটা এ্যামবুশ যুদ্ধ বলেও পরিচিত।
এভাবে পাঁচ বা দশ জনের একটি ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেলে শত্রু আরো বড় ইউনিট পাঠাবে। শত্রুর পক্ষে সমগ্র পূর্ববাংলার গ্রামাঞ্চলে বড় বড় ইউনিট পাঠিয়ে ঘেরাও দমন চালানো সম্ভব নয়। তার সংখ্যাস্বল্পতা দেখা দেবে।
ফলে বহু গ্রাম যেখানে শত্রু যেতে পারেনা তা আমাদের ঘাঁটি এলাকায় রূপান্তরিত হবে।
চলমান শত্রু ইউনিটকে ঘিরে ফেলে খতম করার জন্য প্রয়োজন হবে দ্রুত একত্রিত হওয়া, ছড়িয়ে পড়া ও স্থান পরিবর্তনের।
এটা সম্ভব হবে নিয়মিত বাহিনীর পক্ষে যারা কাছাকাছি অবস্থান করে দ্রুত একত্রিত হতে পারে।
শত্রুর ঘেরাও দমন অভিযান আর আমাদের পাল্টা ঘেরাও দমন অভিযান চালিয়ে শত্রুর দুর্বল ইউনিটকে খতম করা, এ ‘করাত প্যাটার্নের’ যুদ্ধ গেরিলা যুদ্ধের রণনৈতিক আত্মরক্ষার সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত চলবে।
কাজেই আমাদের গেরিলাদের এ যুদ্ধে অতিমাত্রায় পারদশির্তা অর্জন করতে হবে, আর এটাই হবে আমাদের আক্রমণের প্রধান রূপ।
শত্রুর দুর্বল ইউনিট ঘিরে ফেলে খতম করা বা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র লাভের জন্য এসময় আমাদেরকে তরঙ্গমালার মত আক্রমণ করতে হবে এবং কিছু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে হবে।
এ কারণে ব্যাপক হারে গেরিলা সংগ্রহ করতে হবে যাতে ক্ষয়ক্ষতি হলেও আমাদের যুদ্ধের প্রয়াসে কোন বিঘ্ন না হয়।
তবে ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই সর্বনিম্ন করতে হবে।
এ স্তরেও শত্রুর দুর্বল অবস্থান অতর্কিতে আক্রমণ করে দখল করা, এভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করার পদ্ধতি চালিয়ে যেতে হবে।
এ স্তরে শত্রুর ঘেরাও দমন ভাঙ্গা সম্ভব না হলে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ অবস্থায় উদ্যোগ পুনরায় অর্জনের জন্য সরে পড়তে হবে।
সরে পড়ার সময় একসাথে বা বিভক্ত হয়ে বা শত্রুকে ঠেকানোর জন্য ছোট গ্রুপ রেখে সরে পড়তে হবে।
সরে পড়ার প্রাক্কালে পুনরায় একত্রিত হওয়া, বিভিন্ন ইউনিটের কাজ ঠিক করে দিতে হবে।
এছাড়া জনগণের মাঝে প্রচার ও তাদেরকে সংগঠিত করা, রসদপত্রের স্বল্পতা, বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গেরিলাযুদ্ধের বিস্তৃতির জন্য গেরিলা বাহিনীকে অংশে বিভক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন হয়।
তবে শত্রুর ঘেরাও দমন ভেঙ্গে ফেলার জন্য একত্রীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন যাতে আমাদের ব্যাপক শক্তি শত্রুর একটি দুর্বল ইউনিট ধ্বংসের জন্য প্রয়োগ করা যায়। অর্থাৎ প্রতিটি লড়াইয়ে আমরা যেন চূড়ান্ত উৎকৃষ্টতা অর্জন করতে পারি।
সচল গেরিলাবাহিনীকে একটি শত্রু ইউনিট ধ্বংস করে দ্রুত অপর একটি ইউনিট ধ্বংস করা এভাবে একনাগাড়ে শত্রর বহু ইউনিট ধ্বংসের দিকে ট্রেইন করতে হবে।
শত্রুর চলমান ইউনিটকে ঘিরে ফেলে খতমের ক্ষেত্রে যথাসম্বব পরিকল্পনা মাফিক কাজ করার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ শত্রুর দুর্বল ইউনিটকে খুঁজে বের করা ও তাকে নির্মূল করার জন্য ভৌগলিকভাবে ও জনসমর্থনের দিক দিয়ে সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে এসে তাকে খতম করতে হবে।। অর্থাৎ তাকে ফাঁদে ফেলতে হবে।
প্রতিটি লড়াই আমরাই নির্ধরণ করতে সক্ষম হই। এভাবে যুদ্ধ চালাবার চেষ্টা করতে হবে।
শত্রুর দুর্বল ইউনিট খুঁজে বের করা, তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য বিস্তৃত অঞ্চল প্রয়োজন যাতে গেরিলারা শত্রু সম্পর্কে তথ্য লাভের এবং তাকে প্রলুব্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে আনতে সক্ষম হয়।
এ স্তরে গেরিলা পরিচালকের পরিকল্পনা মাফিক গেরিলা তৎপরতা ছড়িয়ে দিয়ে অঞ্চলের বিস্তৃতি বাড়ানো, ফাঁকসমূহ পূরণ, অস্ত্র-খাদ্য-অর্থ ও অন্যান্য সরবরাহ সংগ্রহ, প্রাথমিক খবর প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্থানীয় গেরিলা বাহিনী গঠন, নিয়মিত বাহিনী বৃদ্ধি, জনগণকে সংগঠিত ও তাদেরকে গণসংগ্রামে পরিচালনা এবং সশস্ত্র তৎপরতায় অংশগ্রহণ করানো ইত্যাদি কাজ করতে হবে।
এগুলো পরিকল্পনার আওতায় পড়ে।

১২।। গেরিলা সংগ্রহ ও নিয়মিত বাহিনী গঠন

প্রাথমিক পর্যায়ে সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে সংগৃহীত কর্মীদের মধ্য থেকেই গেরিলা রিক্রুট হয়।
কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে শত্রুর চর, ভ্রষ্ট ও শত্রু শ্রেণীর লোকদের গেরিলা হিসেবে অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়।
গেরিলাদের প্রথমে সশস্ত্র প্রচার টিম ও জাতীয় শত্রু খতম অপারেশনে পাঠানো হয়।
সশস্ত্র প্রচার টিমের তৎপরতার মাধ্যমে রাত্রিকালীন চলাচল, অস্ত্র সংক্রান্ত ট্রেনিং, অনুসন্ধান, প্রচার, জননগণকে জাগরিত করা ইত্যাদি কাজে গেরিলাদের অভিজ্ঞ ও যাচাই করা হয়।
জাতীয় শত্রু খতম হচ্ছে ছোট আকারের গেরিলা অপারেশন। এর মাধ্যমে অনুসন্ধান, পরিকল্পনা, সমাবেশ, বাস্তব হামলা, সরে আসা, জটিল পরিস্থিতির মোকাবেলায় গেরিলাদের অভিজ্ঞ ও যাচাই করা হয়।
গেরিলাদের মান উন্নত ও মতাদর্শগত পুনর্গঠন করার জন্য ক্লাশ নেওয়া হয়।
এভাবে একটি জেলার বিভিন্ন মহকুমা, মহকুমাস্থ থানা এবং থানার আওতাধীন ইউনিয়ন ও গ্রামে সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে সামরিক লোকদের রিক্রুট করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে অনভিজ্ঞদের অভিজ্ঞ গেরিলাদের সাথে অপারেশনে দিয়ে বা অভিজ্ঞ গেরিলা পরিচালকদের সাথে দিয়ে অভিজ্ঞ করা হয়।
বর্তমানে গেরিলা যুদ্ধকে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য গেরিলাদের সেকসন, প্লাটুন ও কোম্পানীভুক্ত করা। এ সকল ইউনিট সচল হলে ব্যাটেলিয়ন ও ব্রিগেড গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
গেরিলারা প্রথমে অসার্বক্ষনিক হিসেবে কাজ করে, গেরিলা তৎপরতা ও স্থানীয় সাংগঠনিক কাজের বিকাশের প্রক্রিয়ায় তারা সার্বক্ষণিক হয়।
বর্তমানে কৃষকদের মাঝে কাজ ছড়িয়ে পড়ায় বহু কৃষক গেরিলা হিসেবে রিক্রুট হচ্ছে। নিয়মিতকরণ ও ভরণপোষণের সমস্যার সমাধান হলে গেরিলাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই হবে কৃষক।
পেয়ারা বাগানে ও অন্যান্য ফ্রন্ট এলাকায় আমাদের যে নিয়মিত বাহিনী গঠন করা হয়েছিল তাদের সদস্যদের অনেকেই ছিল কৃষক।
১৯৭৩ এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণে সচল বাহিনী গড়ে উঠে। অন্যান্য অঞ্চলে গেরিলা তৎপরতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এ বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজের সাথে যুক্ত করে পাঠান হয়।
সচল বাহিনী গঠনের সমস্যা হচ্ছে গেরিলা সংগ্রহ, অস্ত্র, অর্থ, খাদ্য ও শেল্টারের সমস্যা।
বর্তমানে পূর্ববাংলায় প্রচুর গেরিলা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে; শত্রুর দুর্বল অবস্থান দখল বা দুর্বল চলমান ইউনিট ঘিরে ফেলে অস্ত্র সংগ্রহ করা, জাতীয় শত্রু উৎখাত এবং প্রামভিত্তিক চাঁদা তোলা জনমত বিপ্লবের পক্ষে সংগঠিত করার মাধ্যমে অর্থ-খাদ্য ও শেল্টার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
এভাবে সকল সমস্যা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
সচল বাহিনীকে শত্রুর দুর্বল চলমান ইউনিটকে ঘিরে ফেলে খতম করার জন্য দ্রুত একত্রীকরণ প্রয়োজন।
একারণে তাদের ক্যাম্পিং করে অবস্থান করতে হবে। কাছাকাছি কয়েকটি বাড়ীতে তারা অবস্থান করতে পারে।
পেয়ারা বাগান ও অন্যান্য ফ্রন্টে এবং গত বর্ষায় সচলবাহিনী জনগণের বাড়ীতে ক্যাম্পিং করে অবস্থান করতো।
সচল বাহিনীর টিকে থাকা ও বিকাশের জন্য স্থানীয় সাংগঠনিক কাজ ভাল হতে হবে। শেল্টার, শত্রুর গতিবিধি, জনগণের সহযোগিতা লাভ, শত্রুদের উৎখাত করা ইত্যাদি কাজ স্থানীয় সংগঠনের সাহায্য ব্যতীত সম্ভব নয়।
সচল এবং নিয়মিত বাহিনী টিকে থাকা ও বিকাশ লাভের জন্য গ্রামের অসার্বক্ষনিক গেরিলাদের নিয়ে স্থানীয় গ্রাম্য আত্মরক্ষাবাহিনী, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে তৎপরতা চালানোর জন্য নিয়মিত আঞ্চলিক বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
আত্মরক্ষা বাহিনী আঞ্চলিক নিয়মিত বাহিনীতে থাকাকালীন ট্রেনিং, যাচাই ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে ভাল উপাদান বেরিয়ে আসবে।
এদেরকে নিয়মিত কেন্দ্রীয় বাহিনীতে নিতে হবে।
এভাবে নিয়মিত কেন্দ্রীয় বাহিনী অভিজ্ঞ ও ভাল গেরিলাদের দ্বারা গঠন করা সম্ভব হবে।
গ্রাম্য আত্মরক্ষা বাহিনী ও আঞ্চলিক বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী হচ্ছে ডান হাত বাম হাতের মত। একটাকে বাদ দিয়ে অপরটা চলতে পারেনা।
সচল বাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা, কোম্পানীতে পার্টি-শাখা গঠন, বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক কমিশার নিয়োগ ইত্যাদির মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ট্রেইন করা ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে।
গেরিলাবাহিনীর নিয়মিতকরণের সাথে কমান্ডার, কেডাদের ও সৈনিকদের রাজনৈতিক ও সামরিক ট্রেনিং প্রদানের জন্য বিভিন্ন স্তরের স্কুলের ব্যবস্থা করতে হবে।
কখনও কখনও বড় শত্রুকে ধ্বংস করা বা বড় ঘেরাও দমন ভেঙ্গে ফেলা অথবা প্রচণ্ড চাপের মুখে সরে পড়ার জন্য আন্তঃঅঞ্চল, আন্তঃউপঅঞ্চল সমন্বয় প্রয়োজন।
এ সমন্বয়ের ফলে একাধিক অঞ্চল বা উপ-অঞ্চলের গেরিলাদের সমাবেশ করা যাবে বা এক অঞ্চল, উপ-অঞ্চলের গেরিলারা অন্য অঞ্চল, উপ-অঞ্চলে সরে পড়তে পারবে।
এ কারণে বিভিন্ন অঞ্চল ও উপ-অঞ্চলের মধ্যকার ফাঁকসমূহ দূর করতে হবে এবং বিভিন্ন অঞ্চল ও উপ-অঞ্চলের মধ্যে ভাল সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

১৩।। ঘাঁটি এলাকার সমস্যা

একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন, তা টিকিয়ে রাখা ও শক্তিশালী করা এবং শেষ পর্যন্ত এর সহায়তায় শত্রুদের পরাজিত করার জন্য ঘাঁটি এলাকা অপরিহার্য। ঘাঁটি এলাকা হচ্ছে রণনৈতিক এলাকা যার উপর নির্ভর করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।
পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা বিবেচনা করে ঘাঁটি এলাকা গঠনের সমস্যার সমাধান করতে হবে।
খুলনার দক্ষিণাংশ, পার্বত্য চট্রগ্রাম ও সিলেটের কিয়দংশ ব্যতীত সমগ্র পূর্ববাংলাই সমভূমি, নদীমাতৃক; পর্বত ও গভীর অরণ্য বর্জিত। কাজেই এখানে ঘাঁটি এলাকা গঠনের সমস্যা হচ্ছে সমভূমিতে ঘাঁটি এলাকা গঠনের সমস্যা।
জঙ্গলাকীর্ণ ও পার্বত্য অঞ্চলে ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার দিকে আমরা প্রথম থেকেই গুরুত্ব প্রদান করেছি। এ সকল স্থানের দুর্গমতা এবং সরকারের সাথে সংযোগ কম থাকার কারণে এগুলো স্বাভাবিক ঘাঁটি হিসেবে বিরাজ করছে।
পার্বত্য চট্রগ্রাম ও সিলেটের পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে জনগণকে সংগঠিত করে ঘাঁটি এলাকা গড়ার প্রচেষ্টা চলছে।
পার্বত্য এলাকায় ঘাঁটি গঠনের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে নিকটবর্তী বাঙালী এলাকায় কাজ হওয়া যাতে পার্বত্য চট্রগ্রামের কাজকে শত্রু বিচ্ছিন্ন করে নির্মূল করতে না পারে।
এ দিকে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
জঙ্গলাকীর্ণ দক্ষিণাঞ্চলে কাজের বিস্তৃতি ঘটানো উচিত।
ঘাঁটি এলাকা গঠনের দিক দিয়ে উপরোক্ত স্থানগুলো খুবই সুবিধাজনক।
নদী মোহনা ও চরাঞ্চলও ঘাঁটি গঠনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর গুরুত্ব সম্পন্ন। স্থানীয় ডাকাত ও শত্রুদের উৎখাত করে ঘাঁটি এলাকা গঠন ও নৌ গেরিলা গড়ে তোলা উচিত।
ঘাঁটি এলাকার মৌলিক সমস্যা হচ্ছে একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গঠন, শত্রুর পরাজয় এবং জনগণকে সংগঠিত করা।
আমাদের ঘাঁটি এলাকা গেরিলা তৎপরতার প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠে।
প্রথমে গেরিলা অঞ্চল অর্থাৎ শত্রুর নিয়ন্ত্রণ আছে আবার আমাদের তৎপরতাও রয়েছে এরূপ অঞ্চল হিসেবে বিরাজ করে।
জনগণ ঘৃণীত চরম অত্যাচারী সরকারী চরদের খতম করা এবং অন্যান্যদের আত্মসমর্পণ করানোর মাধ্যমে গ্রামের জনগণকে প্রতিক্রিয়াশীলদের কব্জা থেকে মুক্ত করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জনগণকে জাগরিত করা, গেরিলা সংগ্রহ করা, অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়।
শত্রু ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে এলাকায় প্রবেশে ভয় পায়।
বর্তমানে ব্যাপক গেরিলা অঞ্চল গড়ে তোলা, তাকে বিস্তৃত করা, সশস্ত্র বাহিনী গঠনের বিরাট তৎপরতা চলছে।
শত্রুর দুর্বল অবস্থান দখল, চলমান শত্রুকে ঘেরাও করে খতম করার তৎপরতা ব্যাপকভাবে অচিরেই শুরু হবে।
শত্রুর চলমান ইউনিটকে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে চালু করা এবং আমাদের ইউনিটসমূহকে এ বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে।
এর সাথে যুক্ত করতে হবে অতর্কিতে দুর্বল শত্রু-অবস্থান দখল করা, গুরুত্বপূর্ণ শত্রু অবস্থান দখলের জন্য তরঙ্গমালার মত আক্রমণের পদ্ধতি।
ঘাঁটি এলাকা গঠনের জন্য সকল জেলায়, শহরে, গ্রামে, যোগাযোগ পথে, পাহাড়ে-সমভূমিতে গেরিলা তৎপরতা চালাতে হবে, শত্রু সৈন্যকে বিভক্ত করে ফেলতে হবে।
এভাবে শত্রু বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ঘেরাও দমন চালাতে অক্ষম হয়ে পড়বে এবং আমাদের ঘাঁটি এলাকা গড়ে উঠবে।
শত্রুর শক্তিশালী অবস্থানের নিকটস্থ (বড় শহর, যাতায়াত পথ, শিল্পনগর) অঞ্চলগুলো সুদীর্ঘদিন ধরে গেরিলা অঞ্চল হিসেবে বিরাজ করবে। এ সকল এলাকার শত্রুদেরকে আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করতে, আমাদের সাথে সহযোগিতা করতে বাধ্য করতে হবে।

১৪।। বিপ্লবী যুদ্ধ ও গণসংগ্রাম

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা বাঙালী দ্বারা বাঙালী দমনের নীতি গ্রহণ করেছে; রক্ষী, সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী সংগঠিত করেছে।
বাঙালীদের দ্বারা গঠিত পূর্ববাংলার এ সকল বাহিনীকে যুদ্ধ থেকে বিরত করা, তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়া, তাদের নিষ্ক্রিয় করা বা দলে টেনে আনার জন্য গণসংগ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
উপরন্তু গণসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জনগণকে জাগরিত করা, শত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত করা সম্ভব।
পূর্ববাংলার বিশেষত্ব-ক্ষুদ্র দেশ, ঘনবসতি, অর্থনৈতিকভাবে সমবিকশিত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অভিন্নতার কারণে গণসংগ্রাম অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
১৯৫২ সালের গণসংগ্রাম, ১৯৬৯ সালের গণসংগ্রাম, ১৯৭১ সালের গণসংগ্রাম এর প্রমাণ।
কাজেই উচ্চ পর্যায়ের গণসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় অভ্যুত্থান সংগঠিত করা। এভাবে শত্রুর এলাকা খর্ব করা, আমাদের এলাকা বাড়ানো, সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।
গণসংগ্রামের জন্য গ্রামের কৃষক, যুবক, নারী, বুদ্ধিজীবীদের মাঝে কাজ প্রয়োজন, বিশেষভাবে নারীদের মাঝে ভাল কাজ প্রয়োজন।
সশস্ত্র সংগ্রামের বিকাশের প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ যুবকই এ কাজে ব্যাস্ত থাকবে। কাজেই গ্রাম্য নারীরাই গ্রামে থাকবে গণসংগ্রাম পরিচালনার জন্য।
উপরন্তু নারীদের মিছিল, মিটিং, ঘেরাও অবস্থানের উপর শত্রুর দমনমূলক তৎপরতা সমগ্র এলাকার জনগণকে বিপ্লবের পক্ষে নিয়ে আসবে, শত্রুর বিরুদ্ধে ঘৃণা তীব্রতর করবে।
এছাড়া নারীদের সংগ্রাম ভাড়াটে বাহিনী এবং জনগণের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে।
উপরন্তু নারীরা সমাজের সবচাইতে পশ্চাদগামী অংশ। গণসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় তাদেরকে জাগরিত করা গেলে বিপ্লবের বিজয় নিশ্চিত হবে।
শহরে গরীব জনসাধারণ, শ্রমিক, ছাত্র-বুদ্ধিজীবী, নারী এবং বিভিন্ন পেশাধারীদের মাঝে কাজ করতে হবে। তাদের দ্বারা পরিচালিত স্বতঃস্ফূর্ত গণসংগ্রামকে দেশব্যাপী সমন্বিত গণসংগ্রামে রূপ দিতে হবে।
বিভিন্ন দাবীদাওয়া, অত্যাচার, নির্যাতনের প্রতিবাদে গণসংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে।
এ গণসংগ্রাম আমাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে তা গোপন থাকবে। গণসংগ্রামকারীরা হচ্ছে আইন অনুগত সাধারণ নাগরিক।

১৫।। পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা ও আত্মনির্ভরশীলতা

পূর্ববাংলা ভৌগলিকভাবে ভারত পরিবেষ্টিত, বঙ্গোপসাগরও ভারত নিয়ন্ত্রিত। বার্মার সাথে সীমান্ত রয়েছে, তাও ‘বাংলাদেশ’ সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ হচ্ছে পূর্ববাংলার বিপ্লবের অন্যতম শত্রু। উপরন্তু সেখানে বিপ্লবী তৎপরতা শক্তিশালী নয়। কাজেই পূর্ববাংলায় ভারত বিরোধী তৎপরতায় কোন সহায়তা লাভ করার সম্ভাবনা কম (জনগণের সমর্থন ব্যতীত)।
বার্মার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
উপরন্তু পূর্ববাংলার সাথে সাধারণ সীমান্ত রয়েছে এবং আমাদেরকে সহায়তা (ট্রেনিং, অস্ত্র ইত্যাদি দিয়ে) করতে পারে এরূপ কোন দেশের অস্তিত্ব নেই।
কাজেই পূর্ববাংলার বিপ্লবকে আত্মনির্ভরশীলতা ও জনগনের উপর নির্ভর করে বিজয় অর্জন করতে হবে।
অস্ত্র-ট্রেনিংসহ সকল বিষয়েই আত্মনির্ভরশীল হতে হবে, জনগণের উপর নির্ভর করতে হবে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণী ব্যতীত বুর্জোয়া বা অন্য কোন শ্রেণীর পক্ষে আত্মনির্ভরশীলতা ও জনগণের উপর নির্ভর করে বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
১৯৭১-এ বুর্জোয়ারা ভারতে আশ্রয় নেয় এবং ভারতীয় পুতুলে পরিণত হয়, দেশকে বিক্রি করে।
অতীতে সুভাষ বোসও পরনির্ভরশীলতার পথ অনুসরণ করে, জাপানের পুতুলে পরিনত হয়।
পূর্ববাংলার সীমান্তে এমন কোন দেশ নেই যেখানে বুর্জোয়ারা আশ্রয় নিতে পারে বা সেখানে থেকে ভারত বিরোধী সংগ্রাম চালাতে পারে বা সাহায্য পেতে পারে।
এ কারণে পূর্ববাংলায় বুর্জোয়াদের ভবিষ্যত অন্ধকার।
পূর্ববাংলার সর্বহারাদের পূর্ববাংলার বাস্তব অবস্থার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আত্মনির্ভরশীলতা ও জনগণের উপর নির্ভর করার লাইন গ্রহণ করতে হবে।
চীন বা অন্য কোন ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের অস্ত্র ছাড়া বা সমর্থন ছাড়া বিপ্লব করা যাবে না এ ধরণের পরনির্ভরশীলতার মানসিকতা দূর করতে হবে।
সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ সহ বিশ্বের সকল দেশ, জনগণ ও জাতির সমর্থন আমরা কামনা করি, আমরা তাদের সংগ্রামকে সমর্থন করি।
কিন্তু বিপ্লব করার জন্য আমাদেরকে নির্ভর করতে হবে নিজেদের শক্তি ও জনগণের উপর।

১৬।। বিভিন্ন গ্রুপের সশস্ত্র তৎপরতার ভবিষ্যত

পূর্ববাংলার ক্ষুদে উৎপাদন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রিকতা, এবং আওয়ামী বিশ্বাসঘাতক ও তার প্রভুদের উৎখাতের পক্ষে জনসমর্থের কারণে বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের জন্ম ও তৎপরতার সৃষ্টি হতে পারে।
এ ধরণের সশস্ত্র তৎপরতা সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত সর্বহারার রাজনৈতিক পার্টির পরিচালনাধীনে আনতে হবে। অন্যথায় এ সকল তৎপরতা ধ্বংস ও নির্মূল হতে বাধ্য।
মার্কসবাদী নেতৃত্ব গ্রহণ না করলে এ সকল গ্রুপ শত্রু-মিত্র নির্ণয়, শত্রু ও নিজেদের অবস্থা বিবেচনা করে যথাযথ সামরিক, সাংগঠনিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, শৃংখলা ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হবে। ফলে তারা পরাজিত ও ধ্বংস হবে।
এ সকল গ্রুপের সৎ ও দেশপ্রেমিকদের উচিত সর্বহারার রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, নিজেদের আÍত্যাগ ও দেশপ্রেমকে সার্থক করা।
নিজেদেরকে মার্কসবাদী দাবী করে এরূপ কতগুলো গ্রুপের সশস্ত্র তৎপরতা চলছে। তাদের রাজনৈতিক, সামরিক ও অন্যান্য লাইন দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং পূর্ববাংলার বাস্তব অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাদের রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ ঠিক না হওয়ায় শত্রু মিত্র নির্ণয়, প্রধান শত্রু ও গৌণ শত্রু নির্ধারণ, রিক্রুটমেন্ট, জনগণকে সমাবেশিত ও পরিচালিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভুল হচ্ছে।
শত্রু-মিত্র, প্রধান ও গৌণ শত্রু নির্ধারণে ভুল হওয়ায় সামরিক ক্ষেত্রে তারা এমন সব পদক্ষেপ নেয় যার ফলে মাঝারী চাষী, ধনী চাষী, সামন্তদের, দেশপ্রেমিক অংশের সাথে মিত্রতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বৈরিতা সৃষ্টি করেছে।
গেরিলা বাহিনীর বিকাশের পর্যায়, ঘেরাও, দমন ও তা থেকে আত্মরক্ষার উপায়, উদ্যোগ বজায় রাখার পদ্ধতি, একনাগাড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে কাজ, শহরে গ্রামে ভাল কাজ, বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ, শীতকালীন আত্মরক্ষা, মানোন্নয়ন ও সুসংবদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয় বা শুন্য থেকে গেরিলা গড়ে তোলা ও বিকাশ সাধনের জন্য গ্রামাঞ্চলে পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থার অপরিহার্যতা তারা বিবেচনা করেনি। বিচ্ছিন্ন পকেট গড়ে তোলে।
ফলে তাদের বিচ্ছিন্ন পকেটসমূহ শত্রু সহজেই ঘিরে ফেলে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
এ থেকে দেখা যায় সর্বহারা সঠিক বিপ্লবী রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্ব ব্যতীত গেরিলা যুদ্ধ টিকে থাকা, বিকাশ সাধন ও বিজয় অর্জন করতে পারে না।

১৭।। উপসংহার

পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নির্ভুল পরিচালনায় পার্টির নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা, বিকাশ সাধন এবং শেষ পর্যন্ত এর সাহায্যে শত্রুদের পরাজিত ও ধ্বংস করা সম্ভব।
একটি বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি’র নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ বাহিনী গঠনের সাথে যুক্ত বহু মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান হয়েছে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত হয়ে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও সামরিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সঠক লাইন নির্ধারণ করতে, সর্বহারা শ্রেণীর ও জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে, এর দ্বারা শত্রুকে পরাজিত ও ধ্বংস করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অবশ্যই সশক্ষম হবে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

সূত্রঃ http://sarbaharapath.com/?p=1386