কুষ্টিয়ায় কথিত বন্দুক যুদ্ধে ‘লাল পতাকা’র সদস্য নিহত

স

পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি(এমএল-লাল পতাকা)’র সক্রিয় সদস্য আব্দুল কুদ্দস ওরফে সাগর(৪৫) গত ৫ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার ভোর রাতে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের গড়াই নদীর চরে র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত  হয়েছে।

নিহত আব্দুল কুদ্দস ওরফে সাগর রাজবাড়ী জেলার বরাট ইউনিয়নের উড়াকান্দা এলাকার তারক আলীর ছেলে। তিনি এলাকায় বালুর ব্যবসা করতেন।

সাগর চরমপন্থী সংগঠন `লাল পতাকার’ সদস্য বলে র‌্যাব কর্মকর্তা মুহাইমিনুল হক জানান ।

সাগরের স্ত্রী চম্পা খাতুন bdnews24.comকে বলেন, গত ২৯ মার্চ রাত ১০টার দিকে বাড়ি থেকে রেব হন সাগর। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

এদিকে র‌্যাব কর্মকর্তা মুহাইমিনুল বলেন, নাশকতা তৈরির উদ্দেশ্যে একদল সন্ত্রাসী ঘোড়াঘাট এলাকার গড়াই নদীর চরে গোপন বৈঠক করছে খবর পেয়ে র‌্যাব সদস্যরা সেখানে অভিযান চালায়।

“র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা গুলি ছোড়ে। জবাবে র‌্যাবও পাল্টা গুলি করে। গোলাগুলির এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পিছু হটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সাগরকে পাওয়া যায়।”

তাকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে মুহাইমিনুল জানান।

তিনি বলেন, গোলাগুলির ঘটনায় দুই র‌্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।  

ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুক ও গুলি উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে র‌্যাব।  

 

Advertisements

খুলনায় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ৩ সদস্য আটক

জেলার ফুলতলা উপজেলা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ ২ এপ্রিল ‘১৭ এর প্রথমভাগে বিশেষ অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা হাফিজ চৌধুরীকে তার দুই সঙ্গীসহ গ্রেপ্তার করেছে।
আটককৃত অন্য দু’জন হলো- জাহেরুল ইসলাম খান এবং হোসেন কবির রাসেল। তাদের উভয়ের বাড়িও একই উপজেলায়।
পুলিশ এ সময় দু’টি বিদেশে তৈরি বন্দুক, একটি শাটার গান, দুইটি কার্তুজ এবং আটটি হাতে তৈরি গ্রেনেড উদ্ধার করে।
এ ব্যাপারে খুলনায় গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শিকদার আক্কাস আলী বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রোববার দিবাগত রাত ২টার সময় গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ দল ফুলতলা উপজেলার দামোদর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ৯ থেকে ১০টি বোমা নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে চলে। এক পর্যায়ে পুলিশ অস্ত্র ও দুই সহযোগীসহ হাফিজকে আটক করে। খুলনা পুলিশের তালিকাভুক্ত আসামি হাফিজ এসময় গুলিবিদ্ধ হয়।
হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি হাফিজ বিভিন্ন সময় পলাতক ছিল।
এ ঘটনায় ফুলতলা থানায় দু’টি মামলা দায়ের করা হয়।

সূত্রঃ http://www.bssnews.net/bangla/newsDetails.php?cat=4&id=395669&date=2017-04-02


চুয়াডাঙ্গায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য গ্রেফতার

chuadanga_map

চুয়াডাঙ্গায় একটি বিদেশি পিস্তলসহ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ বাজার এলাকা থেকে বোরহান উদ্দিন নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তার বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার বরিশখালী গ্রামে।

র‌্যাব-৬ এর ঝিনাইদহ ক্যাম্প কমান্ডার মেজর মনির আহমেদ বলেন, বোরহান উদ্দিন কোনো অপরাধ ঘটানোর জন্য সরোজগঞ্জ বাজার এলকায় অবস্থান করছেন খবর পেয়ে র‌্যাবের একটি টহল দল সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক  করে।

“তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচটি গুলি ও একটি ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়।”

তিনি চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য। অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত বলে র‌্যাব কর্মকর্তা জানান।

সূত্রঃ http://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/article1250379.bdnews

 


পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর উদ্দেশ্যে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি)’র খোলাচিঠি

Maoist-Flag

পূবাকপা (এম-এল)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মী-জনগণের উদ্দেশ্যে পূবাসপা (সিসি)’র খোলাচিঠি

কমরেডগণ,

লাল সালাম।

বিগত শতাব্দীর ’৬০-এর দশকের শেষ দিকে রুশ-চীন মহাবির্তক, চেয়ারম্যান মাওয়ের নেতৃত্বে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব (জিপিসিআর) এবং কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে ভারতের নকশালবাড়ীর সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থানের প্রভাবে আমাদের দেশে মাওবাদী (তখন “মাও চিন্তাধারা” বলা হতো) আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। সেই আন্দোলনের অংশ হচ্ছে আপনাদের পার্টি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এবং আমাদের পার্টি পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রুশ-ভারতের দালাল শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী-বাকশালী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ’৭১-’৭৪ সালে এই দুই পার্টিসহ অন্যান্য মাওবাদী পার্টি ও সংগঠনসমূহ গৌরবময় সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করেছিল। এই সংগ্রামেই আমাদের ও আপনাদের পার্টি-নেতা কমরেড সিরাজ সিকদার ও কমরেড মনিরুজ্জামান তারাসহ অনেক মাওবাদী শহীদ হন।

’৭৬ সালে চেয়ারম্যান মাওয়ের মৃত্যুর পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মহাসংকটকালে মাওবাদ অনুসারী কোন কোন সংগঠন ও বেশিরভাগ নেতা সংশোধনবাদে গড়িয়ে পড়ে। কোন কোন সংগঠন বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু আপনাদের ও আমাদের এই দুই পার্টিসহ কমরেড ননী দত্ত (ক. মোশতাক)-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মা-লে) মাওবাদী পতাকা, বিশেষত মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। এই প্রক্রিয়ায়

’৮০-র দশকে আমাদের পার্টি মাদারীপুর-শরীয়তপুর-নরসিংদী-ময়মনসিংহ-রাজবাড়ী-উত্তরাঞ্চলসহ ২৪টি জেলায় এবং ’৯০-এর দশকে আপনাদের পার্টি দেশের পশ্চিমাঞ্চলে দৃষ্টিকাড়া সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলে। যদিও শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-নির্যাতন এবং মাওবাদী আন্দোলনের মধ্যে বিরাজমান ভুল-ত্রুটির কারণে সেই সংগ্রাম পরাজিত হয়।

’৭৯ সাল থেকেই রাজনীতি ও মতাদর্শকে কেন্দ্রে রেখে আমাদের সংগঠন ধাপে ধাপে তত্ত্ব-অনুশীলন-তত্ত্ব- এই মালেমা প্রক্রিয়ায় অতীত সংগ্রামের সারসংকলন চালাতে থাকে। ইতিপূর্বে ’৮০-র দশকেই আমাদের পার্টি বিশ্ব মাওবাদীদের ঐক্য-কেন্দ্র আর.আই.এম. (রিম) এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাওবাদীদের সমন্বয় কমিটি কমপোসা’র সদস্য হয়েছিল। এই আন্তর্জাতিকতাবাদী নতুন ভূমিকাও আমাদের সারসংকলন কাজকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে।

 স্বাভাবিকভাবে এই সারসংকলনকে কেন্দ্র করে পার্টিতে দুই লাইনের সংগ্রামও চলে। একবার পার্টি বড় আকারে বিভক্তও হয়। এসবেরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পার্টির একটি জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে “মাওবাদী আন্দোলনের চার দশকের সারসংকলন” নামে একটি “নতুন থিসিস” আমাদের পার্টি গ্রহণ করেছে। যার ভিত্তিতে এখন দেশের সমগ্র মাওবাদী আন্দোলনকে পুনর্গঠন করে একটি নতুন ধরনের ঐক্যবদ্ধ মাওবাদী পার্টি গঠন এবং নতুন ধরনের গণযুদ্ধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আমাদের পার্টি চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে আপনাদের পার্টি পশ্চিম অঞ্চলের সংগ্রাম, বিপর্যয় ও পরাজয়ের পরবর্তীতে বিভিন্ন বিতর্কের প্রক্রিয়ায় তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ বিভক্তিতে লাইনগত সংগ্রাম খুব একটা স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, যদিও পরবর্তীতে রাজনৈতিক-মতাদর্শগত লাইনগত প্রশ্নাবলীর পার্থক্য কিছু কিছু স্পষ্ট হতে থাকে।

এই বিভক্ত অংশগুলোর মধ্যে ক. রাকেশ কামাল (ক. রাকা)-এর নেতৃত্বাধীন “লাল পতাকা” গ্রুপ নামের অংশটি কমপোসা’য় যোগদান করে এবং পূবাকপা’র বিগত সংগ্রামের সারসংকলন প্রক্রিয়া শুরু করে। সে প্রক্রিয়ায় ক. রাকা “সারসংকলন প্রতিবেদন (প্রাথমিক) খসড়া রূপরেখা” নামক একটি দলিল প্রণয়ন করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দলিলটি সিসি কর্তৃক অনুমোদন এবং পার্টি-ব্যাপী ব্যাপক কোন আলোচনার পূর্বেই তিনি র‌্যাবের ভুয়া ক্রসফায়ারে শহীদ হন। এর আগেই ক. মোফাখ্খার চেীধুরী এবং ক. তপন একইভাবে শহীদ হন। শুধু এই নেতৃত্বগণই নন, আপনাদের পার্টির তিনটি কেন্দ্রের অধিকাংশ নেতৃত্বই শত্রুর হাতে শহীদ হন অথবা গ্রেফতার হন। এভাবে, আমরা ধারণা করি যে, তিনটি কেন্দ্রই অকার্যকর হয়ে যায়।

এভাবে আপনাদের পার্টি গুরুতর সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। কর্মী-জনগণ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ও দিশাহীন হয়ে পড়েছেন। কোন কেন্দ্রই পার্টির নেতৃত্বাধীন সংগ্রামকে অব্যাহত রাখতে পারেনি বা সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা রাখতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সুসংগঠিত কোন সাংগঠনিক কাঠামো পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

 পার্টি-পুনর্গঠনের বিষয়ে আমাদের জানা কিছু পর্যবেক্ষণ এখানে তুলে ধরছি

– ক. চেীধুরী শহীদ হওয়ার পর সেই কেন্দ্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং এখনও তার লাইনের অনুসারী দাবিদার একটি ধারাকে ক্রিয়াশীল দেখা যায়। আমাদের জানামতে এই ধারাটি এখনো পর্যন্ত পার্টির কোন দলিলপত্র-পত্রিকা-লিফলেট কিছুই প্রকাশ করেনি। এরা সাংস্কৃতিক গণসংগঠনসহ বিভিন্ন ধরনের গণসংগঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম চালান। যা কমরেড চেীধুরীর লাইনের সাথে মেলে না। আবার তারা চেীধুরী-লাইনের কোন সারসংকলনের কথাও বলছেন না।

-ক. রাকেশ কামাল এবং তার পরবর্তী নেতৃত্ব ক. এনামুল শহীদ হওয়ার পর তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন কয়েকজন কমরেড শত্রুর দমন থেকে আত্মরক্ষার জন্য কৌশল হিসেবে পার্র্র্টির নাম পরিবর্তন করে “বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)” নামে সংগঠন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একটা বৈঠকের পর তাদের তৎপরতা অব্যাহত থাকেনি। এই ধারাতেই অন্য একটি অংশ ২০১১ সালে “২২ মে শহীদ দিবসে” (ক. তারার মৃত্যুবার্ষিকীতে) “পূর্ব বাংলার মাওবাদী” নাম দিয়ে সংগঠনের একটি পোস্টার প্রকাশ করেছিল। পরে আর এই নামে কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। এই ধারারই অন্য একটি অংশ ১৯/০৩/’১১ তারিখে সার্কুলার- ১ নামে একটি দলিল প্রকাশ করেছিল যাদের কেন্দ্র পূবাকপা (মা-লে) (লাল পতাকা) নামটি উল্লেখ করেছে। এতে ক. রাকা’র সারসংকলনের ভিত্তিতে পার্টি পুনর্গঠনের কথা বলা হলেও বাস্তব অনুশীলনে সেই লাইনের কোন প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না বলে আমাদের মনে হয়। এই সার্কুলার অনুসারীরা এখনো সক্রিয়। এরা এখনো খতম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন। তাদের কৌশল হচ্ছে, শত্রুর চাপ এড়ানোর জন্য কিছু অনিবার্য খতম করলেও তা প্রচার করেন না। পার্টির দায় স্বীকার করেন না।

-সম্প্রতি আরো একজন নেতৃত্ব যিনি অতীতে জনযুদ্ধের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি পার্টি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন বলে শোনা যায়। যতদূর জানা যায় তিনিও মতাদর্শগত-রাজনৈতিক লাইনকে কেন্দ্রবিন্দু করছেন না। বরং পূর্বের ধারাতেই সামরিক এ্যাকশন, তথা খতমকে কেন্দ্রবিন্দু করছেন। তার বা তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে এখনো কোন দলিলপত্র প্রকাশ হয়েছে বলে আমরা জানি না।

এইসব উদ্যোগে বিপ্লবের প্রতি গভীর আন্তরিকতা থাকলেও সেগুলো মাওবাদী রাজনীতি ও মতাদর্শকে চাবিকাঠি হিসেবে আঁকড়ে ধরছে না বলেই আমাদের ধারণা। পার্টি-গঠনের ৪০ বছর পর পার্টির আজকের বিপর্যস্ত ও ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার কারণ অনুসন্ধানের জন্য লাইনগত সারসংকলনের ভিত্তিতে পার্টি-পুনর্গঠনকে কেউই কেন্দ্রবিন্দু করছেন না।

মনে রাখতে হবে পূবাকপা একটা মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ছিল। যার রাজনীতিক লক্ষ্য ছিল নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রধান ধরনের সংগ্রাম ছিলো সশস্ত্র সংগ্রাম। তার মতবাদ ছিল মালেমা। সেই পার্টি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে শত্রু-দমনে। এ অবস্থায় প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে সেই পার্টিকে গঠন বা পুনর্গঠন করা। যেহেতু সশস্ত্র সংগ্রামের পার্টি তাই আজকের বাস্তব ও আত্মগত অবস্থা বিবেচনা করে পার্টি পুনর্গঠন করতে হবে। এখন লাইন বিনির্মাণ তথা লাইনগত সারসংকলন না করে এই পার্টির পক্ষে আর ইতিবাচকভাবে এগুনো সম্ভব নয় বলেই আমরা মনেকরি। ঠিক যে কাজটিতে হাত দিয়েছিলেন ক. রাকা ৫ বছর আগেই। এবং তার একটি বড় ও মৌলিক কাজ তিনি সম্পন্ন করে গিয়েছিলেন। অথচ বিগত ৫ বছরে সেকাজে আর কোন অগ্রগতি দূরের কথা, সে কাজটিকেই প্রায় বিস্মৃত করে দিয়ে পুরনো ধারায় বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত এ্যাকশনের প্রচেষ্টা এই পার্টিকে কোন অগ্রগতিই এনে দিতে পারে না।

আজকে সংগ্রামের/এ্যাকশনের নেতৃত্ব কে দিবে? নিশ্চয়ই পার্টি। সেই পার্টি কোথায়? চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ বলেছিলেন, “যদি বিপ্লব করতে হয়, তাহলে অবশ্যই একটা বিপ্লবী পার্টি থাকতে হবে। একটা বিপ্লবী পার্টি ছাড়া, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী তত্ত্ব এবং বিপ্লবী রীতিতে গড়ে ওঠা একটা বিপ্লবী পার্টি ছাড়া, শ্রমিক শ্রেণি ও ব্যাপক জনসাধারণকে সা¤্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুরদের পরাজিত করতে নেতৃত্বদান করা অসম্ভব।” (উদ্ধৃতি পৃঃ ২-৩)। কয়েকটি ব্যক্তি হলেই পার্টি হয় না। প্রথমত একটি সামগ্রিক লাইন তার থাকতে হবে, তার একটি কেন্দ্র ও গঠন কাঠামো থাকতে হবে। একটি পরিকল্পনা থাকতে হবে। সেগুলো সুদূর অতীতে আপনাদের ছিল। তার ভিত্তিতে সংগ্রামও হয়েছে। কিন্তু তার ভাল-মন্দ সবই প্রকাশিত হয়ে সেসব অতীতের বিষয় হয়ে গেছে। এখন পরিবর্তিত বাস্তব ও আত্মগত অবস্থার প্রেক্ষিতে সেসবকেই নতুন করে নির্মাণ না করলে পার্টির কার্যত কোন সঠিক লাইন থাকতে পারে না। আর এ অবস্থায় কোন পার্টিও গড়ে উঠতে পারে না। তাহলে কে করবে এ্যাকশনের নেতৃত্বদান?

কমরেডগণ,

এটা খুবই জটিল পরিস্থিতি। একটা বিকাশমান সংগ্রাম পরাজিত হয়েছে। পার্টি যখন সংগ্রামে ছিল তখনকার কৌশল-পরিকল্পনা আজকের বিপর্যয়ের বাস্তবতায় আর কার্যকর করা সম্ভব নয়। আজকের আত্মগত অবস্থা মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন করে কৌশল-পরিকল্পনাও করতে হবে।

পূবাকপা’র বিচ্ছিন্ন কমরেডদেরকে আমরা মনে করি এ দেশের মাওবাদী আন্দোলনেরই অংশ। আমরা ভিন্ন ভিন্ন পার্টি থেকে চল্লিশ বছরের বেশি এই ভূখণ্ডে সংগ্রাম করছি। পূবাকপা এখন শত্রুর দমনে বিপর্যস্ত। আমাদেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শত্রুপক্ষ এই দেশ থেকে মাওবাদী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে আন্দোলনকে রক্ষা ও বিকশিত করতে হবে। সেজন্য আমাদের অতীত সংগ্রামের পর্যালোচনা-সারসংকলনের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনার ভিত্তিতে আগাতে হবে। ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবে পূবাকপা’র বিচ্ছিন্ন-বিপর্যস্ত কমরেডদেরকে পরামর্শ দেয়া, সহযোগিতা করার দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা এই খোলাচিঠি প্রকাশ করছি, যাতে আমরা কিছু পরামর্শও উল্লেখ করতে চাই। আমরা এসব পরামর্শ আপনাদের উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। লাইন-নীতি-পরিকল্পনা নির্ধারণ করা প্রধানত আপনাদেরই দায়িত্ব। সেক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ যদি কোন সহায়তা করে সে আশাতেই আমরা এসব কথা বলছি।

কমরেডদেরকে মনে রাখতে হবে নানান জায়গা থেকে নানান ধরনের মতামত আসবে। সুবিধাবাদী-বিলোপবাদী মতও আসবে। মালেমা’র বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে তা গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না সেক্ষেত্রে আপনাদের বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গিই আপনাদেরকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে, অন্য কেউ নয়।

* সংকীর্ণতাবাদী চেতনা থেকে বিভক্ত কোন কেন্দ্র নয়- সমগ্র পূবাকপা-কে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে, যা কিনা হবে বাস্তবে এদেশের সামগ্রিক মাওবাদী আন্দোলনের পুনর্গঠনেরই অংশ।

* পুনর্গঠনের জন্য প্রথম আঁকড়ে ধরতে হবে লাইন বিনির্মাণকে, যার মতাদর্শগত ভিত্তি হবে মালেমা।

আরও নির্দিষ্টভাবে এজন্য-

– বিগত শতকে শেষাংশে আন্তর্জাতিক মাওবাদীদের ঐক্যকেন্দ্র “রিম” (যা এখন কার্যত বিলুপ্ত) ও তার সদস্য

   গুরুত্বপূর্ণ পার্টিগুলোর মূল্যায়ন ও সারসংকলনকে বিবেচনায় নেয়া;

– ক. সিএম প্রতিষ্ঠিত ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের সারসংকলনকে বিবেচনায় নেয়া;

– পূবাকপা’র সংগ্রাম সম্পর্কে পূবাসপা’র পর্যালোচনাকে বিবেচনায় নেয়া;

– ক. রাকেশ কামালের সারসংকলনকে বিবেচনায় নেয়া;

– অন্য যে কোন মত আসলে সেগুলোকেও বিবেচনায় নেয়া।

* এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নি¤œতমভাবে নি¤েœর মৌলিক বিষয়গুলোতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা-

– মতবাদগত;

– গণযুদ্ধ;

– আর্থ-সামাজিক;

– আন্তর্জাতিক লাইন।

* লাইন-বিনির্মাণ ও সারসংকলনকে কেন্দ্রবিন্দু করার জন্য ও তার স্বার্থে পুরনো ধারার সকল অনুশীলনকে স্থগিত করা উচিত বলে আমরা মনেকরি। যার মাধ্যমে শত্রুর দমনকে এড়িয়ে নিজেদের অবশিষ্ট শক্তিকে সংরক্ষণ করা যায় এবং তাকে সুসংগঠিত করা যায়।

যারা এভাবে পার্টিকে পুনর্গঠনে আগ্রহী তাদের মানোন্নয়ন প্রক্রিয়া শুরু করা। এজন্য নিম্নতম পাঠ্যসূচি ঠিক করা। পাঠ্যসূচির লক্ষ্য হবে- মৌলিক মালেমা-কে আত্মস্থ করা এবং তার ভিত্তিতে উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোতে অধ্যয়ন, আলোচনা, পর্যালোচনাকে বিকশিত করা এবং একটি একটি করে বিষয়গুলোতে মতাবস্থান গ্রহণ করা।

* লাইন-বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় বাস্তব সাংগঠনিক-সাংগ্রামিক অনুশীলন কী হবে তাও নির্ধারিত থাকতে হবে। এজন্য যা যা করা যেতে পারে বলে আমাদের ধারণা-

– অবিলম্বে একটি কেন্দ্রীয় পরিচালনা সেল গঠন করে সমগ্র কাজের সূচনা করা। পরবর্তীতে কোন প্রতিনিধি সভার মাধ্যমে তাকে কমিটিতে রূপ দেয়া যেতে পারে।

– একটি বা দু’টি অঞ্চলকে নির্দিষ্ট করে সেখানে শক্তি কেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে ঘাসমূলের সংগঠন গড়ার প্রক্রিয়া চালানো।

– উপরোক্ত কাজকে ভিত্তি করে দেশব্যাপী বিচ্ছিন্ন যোগাযোগগুলো রক্ষার ব্যবস্থা করা। যতটা সম্ভব সেটা করা। কিন্তু তাকে কেন্দ্রবিন্দু না করা।

– রাজনৈতিক প্রচারকে গুরুত্ব দিয়ে পার্টিজান ও গেরিলা ধরনের কর্মী গড়ে তোলা।

– আর্থিক সামর্থ্য ও যোগ্যতা বিচার করে একজন একজন করে সার্বক্ষণিক কর্মী গড়ে তোলা; সার্বক্ষণিক কর্মীদের নিয়োগদানে সংগঠন-সংগ্রামের রণনৈতিক পরিকল্পনাকে ভিত্তি করায় গুরুত্ব দান।

– শ্রেণি লাইনকে আঁকড়ে ধরে আর্থিক পলিসি নির্ধারণ করা। পেশা, চাঁদা ও ব্যক্তিগত সম্পদের উপর নির্ভর করা। জরিমানা, শত্রুর সম্পত্তি দখল- ইত্যাকার সামরিক যুগের পদ্ধতিকে এড়ানো।

– নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার উপর অত্যধিক জোর দেয়া। শত্রুর অনুপ্রবেশকে ঠেকানো, আবার বেহুদা কাউকে শত্রু মনে না করা।

* উপরোক্ত কাজগুলোকে ভিত্তি করে এগুলে সামরিক এ্যাকশনের স্থানটি কী হবে সেটা বাইরে থেকে আমাদের পক্ষে নির্ধারণ করা সম্ভব নয় ও উচিত নয়। একটি সশস্ত্র সংগ্রামের পার্টি হিসেবে কোন কোন অঞ্চল/এলাকায় নিরস্ত্র কাজ আত্মঘাতী হতে পারে। আবার বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত সামরিক এ্যাকশন আরো বড় বিপর্যয়কর হতে পারে।

তবে এটা সহজবোধ্য যে, লাইন-বিনির্মাণ ও পার্টি-পুনর্গঠনের কাজ একটা পর্যায় পর্যন্ত সম্পন্ন না করে সামরিক কাজ/এ্যাকশনকে কেন্দ্রবিন্দু করাটা সঠিক হবে না বলেই আমরা মনে করি। কারণ, একবার শুরু করলে তা থেকে পিছন ফেরা যাবে না। সর্বোপরি, সংগ্রাম ও এ্যাকশনের মতাদর্শগত-রাজনৈতিক লাইন ও রণনৈতিক পরিকল্পনা কী হবে, যুদ্ধের/সশস্ত্র সংগ্রামের সামরিক লাইনের রূপরেখাটি কী হবে তা খুবই সুবিবেচিতভাবে নির্ধারণ না করে এখন আর আপনাদের পক্ষে কোন ইতিবাচক সংগ্রাম গড়া সম্ভব হবে না বলেই আমরা মনেকরি। তাই, আজকের পরিস্থিতিতে কোন্ অঞ্চল/এলাকাকে আপনারা কেন্দ্রীভূত করার জন্য বেছে নেবেন, এবং সেখানে কী ধরনের কাজ করবেন সেটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে হবে।

উপরোক্ত অনেক বিষয়েই আমরা আরো সুনির্দিষ্ট কথা বলতে পারি, আলোচনা করতে পারি, যা এই খোলাচিঠিতে সম্ভব নয়। আমরা মনেকরি, শুধু আমাদের সাথেই নয়, অন্য সকল আন্তরিক মাওবাদী সংগঠন, ব্যক্তি ও শক্তির সাথেই এসব বিষয়েও আপনাদের প্রচুর আলোচনা ও মত বিনিময় করা উচিত। যাতে করে আপনারা সবচাইতে সঠিক নীতি-পরিকল্পনা ও পদ্ধতিগুলো অনুশীলনে নিয়ে আসতে পারেন।

** পরিশেষে বলতে চাই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রায় ৪২ বছর পার হয়েছে। এই সময়ে দেশ শাসন করেছে বাঙালি বড় ধনী শ্রেণির প্রতিনিধি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাত এবং সেনা-আমলারা। এরা ধনীক শ্রেণি এবং তাদের প্রভু মার্কিনের নেতৃত্বে সা¤্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের স্বার্থ রক্ষা ছাড়া শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণের জন্য কোন কিছুই করেনি। বরং সব সরকারই বিপ্লবীদের, প্রতিবাদকারীদের হত্যা করে বিপ্লবী আন্দোলন দমন করে চলেছে। তাই, বিপ্লবীদের বিগত সংগ্রামের সারসংকলনের ভিত্তিতে নতুনভাবে সংগঠিত হতে হবে। উচ্চতর একটি লাইন, ঐক্যবদ্ধ ও নতুন ধরনের একটি পার্টির নেতৃত্বে একটা সত্যিকার সফল গণযুদ্ধ গড়ে তুলতে হবে। তাছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।

পিবিএসপি/সিসি

তৃতীয় সপ্তাহ, নভেম্বর, ২০১৪

নোট– পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-[পূবাকপা (এম-এল)

           পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি) [পূবাসপা (সিসি)]

সূত্রঃ http://pbsp-cc.blogspot.com/2016/03/blog-post_6.html


বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় — রাকেশ কামাল

ডাঃ মিজানুর রহমান টুটুল
ডাঃ মিজানুর রহমান টুটুল( রাকেশ কামাল )

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয়

— রাকেশ কামাল

[ নোট: ডিসেম্বর ২০০৪-এ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) (লাল পতাকা)’র মুখপত্র ৩নং সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংখ্যায় পার্টি সম্পাদক কমরেড রাকেশ কামাল(ডাঃ মিজানুর রহমান টুটুল) এ নিবন্ধটি লেখেন। এটা দুঃখজনক যে তিনি গ্রেফতার হন এবং ২৭ জুলাই,’০৮-এ শত্রু তাঁকে হত্যা করে। এই নিবন্ধে রা.কা. বাংলাদেশের মাওবাদী আন্দোলনকে পর্যালোচনা ও সারসংকলনের বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের মধ্যকার ঐক্যের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। এবং কিছু সমস্যাবলী নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। লেখাটি বড়। তাই তার লাইন ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কিত অংশ বিশেষ এখানে সংকলিত করছি। – লাল সংবাদ।]

…  …  ….      ……  ….   ….    ….     …..       …..      . . ……     …..    …..      … …           ….         …..

প্রগতিশীল পক্ষের অবস্থাঃ

আগেই উল্লেখ করেছি প্রগতিশীলদের মধ্যে আছেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা, ছাত্র-শিক্ষক-লেখক-বুদ্ধিজীবীরা; আর শ্রমিক-কৃষকসহ সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণী ও পেশার ব্যাপক মেহনতি জনগণ। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ ঐক্যবদ্ধ নন, সংগঠিত নন, সশস্ত্রও নন। তারই জন্য প্রতিক্রিয়াশীলরা এভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যেতে পারছে।

মূলত কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ঐক্যবদ্ধ নন বলেই, সমগ্র বিপ্লবী শক্তি খন্ড-বিখন্ড ও টুকরো-টুকরো হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবী বলতে আমরা মূলত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী দলগুলোর নেতৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত কর্মী বাহিনীকেই বুঝাচ্ছি। সেই সঙ্গে সংসদীয় নির্বাচনের সুবিধাবাদী পথে এবং প্রকাশ্য সংশোধনবাদী গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনের পথে ধাবিত কমিউনিস্ট দাবিদার দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত এখনো কিছু বিপ্লবী আকাংখা লালনকারী কর্মীদেরও (যাঁদের ভবিষ্যতে প্রকৃত কমিউনিস্ট কাতারে ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে) বুঝাচ্ছি।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী দলগুলো ক্রমেই টুকরো-টুকরো হয়ে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে চলেছে। এর প্রধান কারণ হল রাজনৈতিক-মতাদর্শিক-সাংগঠনিক ক্ষেত্রে প্রধান প্রধান কিছু প্রশ্নে গুরুতর মতপার্থক্য। আর সহায়ক কারণ হল নেতৃত্বের সামন্তসুলভ ও পাতি বুর্জোয়াসুলভ সংকীর্ণতা।

কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এখনো এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করে, কোনো পূর্ণাঙ্গ আত্ম-সমালোচনামূলক সারসংকলন হাজির করেননি; তার আলোকে নয়া-গণতান্ত্রিক সমগ্র পর্যায় জুড়ে ক্রিয়াশীল পূর্ণাঙ্গ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী রণনীতি-রণকৌশলও হাজির করেননি; উক্ত রণনীতি-রণকৌশল ব্যবহার করে সশস্ত্র সংগ্রাম ও পরিপূরক

গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেননি এবং তার ভিত্তিতে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেননি। কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এখনো এইসব গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যকর্ম সম্পদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ ক্ষমতা দেখাতে পারেননি। এই করণেই তাঁরা দেশের অন্যান্য দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক শক্তিকেও ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি।

আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, একই পার্টিতে কর্মরত কমিউনিস্ট কর্মিরাও রাজনৈতিক-মতাদর্শিকভাবে ঐক্যবদ্ধ নন। আমাদের পার্টিতেও এই অবস্থা বিদ্যমান। এর কারণ, মাওবাদের বুলি কপচালেও আমরা এখনো মাওবাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান, শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের ভিতর দিয়ে পার্টির ভ্রান্ত কর্মরীতি ও অধ্যয়নরীতি সংশোধন করার প্রক্রিয়াকে পার্টিতে ভালোভাবে প্রয়োগ করিনি।

এর সঙ্গে বর্তমানে যোগ হয়েছে পার্টিগুলোর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সশস্ত্র শ্রেণী সংগ্রামের এলাকাগুলোর গুরুতর বিপর্যয়। মূলত রণকৌশলগত বিচ্যুতি এবং অংশত সামরিক রণনৈতিক বিচ্যুতি এই বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অবশ্য এর পিছনে একাধিক মতাদর্শিক বিচ্যুতিও কাজ করেছে। বিপর্যয় সত্ত্বেও পার্টিগুলোর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সশস্ত্র গেরিলা বাহিনীর একটা ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো টিকে রয়েছে। উক্ত বাহিনীর সদস্যগণ প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী-ত্রয়ের (জেএমবি-পুলিশ-র‌্যাবের) আক্রমণাত্মক অভিযানকে প্রতিরক্ষাত্মক রণনীতির অধীনেই পাল্টা আঘাত করার প্রস্তুতিও চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মানবিকতা বিবর্জিত বর্বর হামলা দিয়ে প্রগতিশীল শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু ঘটনা তাদের আশানুরূপ ঘটেনি। প্রগতিশীল শক্তি বরং উজ্জীবিত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ছাত্র-শিক্ষক-লেখক-বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সচেতন অংশের পাশাপাশি মধ্যবর্তী অংশের মানুষও এই প্রতিক্রিয়াশীল বর্বরতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মানসিকভাবে উজ্জীবিত হচ্ছেন। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্ব ছাড়াই তাঁরা বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অকমিউনিস্ট দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধও হচ্ছেন।

প্রতিক্রিয়াশীলদের অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়াবহতা বরং কোনো কোনো কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতার মধ্যেই আত্মরক্ষার সুবিধাবাদী নীতির জন্ম দিয়েছে, যার ফলস্বরূপ খুবই প্রকটভাবে তাঁদের মধ্যে পলায়নবাদ ও নিষ্ক্রীয়তার লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। এটা তাদের উপর নির্ভরশীল কর্মিদের একটা অংশকে বেশ খানিকটা হতাশ করেছে। কিন্তু টিকে থাকা বাহিনীর পাল্টা আঘাত (যত ছোট আকারেই হোক) জনগণের একটা বিরাট অংশের মধ্যে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ নিজস্ব উদ্যোগে এগিয়ে এসে সাম্রাজ্যবাদী-সামন্তবাদী চক্রান্তের মুখোশ খুলে দেওয়ার বিপ্লবী নৈতিক কর্তব্য পালন করছেন অভূতপূর্ব স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে।

সুতরং আপাত দৃষ্টিতে পরিস্থিতিকে মারাত্মক বলে মনে হলেও সুদুরপ্রসারী দৃষ্টিতে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। আগুনঝরা বিপ্লবী কর্মতৎপরতার জন্ম দেওয়ার জন্য পরিস্থিতি চমৎকার বিপ্লবী উপাদানে ক্রমে ভরপুর হয়ে উঠছে।

বর্তমানে দেশীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য ভেঙ্গেচুরে টুকরো-টুকরো হয়ে গেলেও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী ধারার বিভিন্ন পার্টির অভ্যন্তরে ধীরে হলেও অন্য একটা ধারার অলক্ষ্য প্রস্তুতি চলছে। এই পার্টিগুলোর অভ্যন্তরে বারবার সশস্ত্র সংগ্রামের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানের একটা প্রক্রিয়া বেশ কিছুদিন যাবৎ শুরু হয়েছে। নিজেদের সীমাবদ্ধ গন্ডিতেই সেই আত্মানুসন্ধান শুরু হলেও অচিরেই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রশস্ত অঙ্গনের সঙ্গে সেই ধারার সাম্প্রতিক যোগাযোগ সেই আত্ম-অনুসন্ধানকে আরো বেগবান করে তুলেছে।

পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও ভারতের মাওবাদীদের উদ্যোগের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মাওবাদীদের সংযোগে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘কমপোসা’ দক্ষিণ-এশিয়ার মাওবাদী বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সাধারণ প্লাটফর্ম হিসেবে সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশের ৪টি মাওবাদী সংগঠন তার সদস্য হয়েছে। এছাড়াও এই সূত্র ধরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে। নেপালের ও ভারতের অভিজ্ঞতা, বিশেষত মাওবাদী বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদী, ধৈর্য্যশীল, কষ্টকর প্রক্রিয়া আমাদের দেশের এই নতুন ধরাকে নিঃসন্দেহে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে সাম্প্রতিক অতিতের সশস্ত্র সংগ্রামের সফল সূচনা ও বিকাশগুলোও হিসেবের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। মানুষের মন থেকে সহজেই এসব সাফল্যের স্মৃতি মুছে যায় না। অতীতের গর্ভে জন্ম নেওয়া সাফল্যগুলো বর্তমানে স্তিমিত হয়ে গেলেও তার রেশ রয়ে গেছে। রয়ে গেছে উদাহরণগুলোও। সশস্ত্র সংগ্রামের সফল উদাহরণগুলো জনসাধারণকে আংশিকভাবে হলেও মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীলরা ফ্যাসিবাদী কায়দায় সশস্ত্র সংগ্রামকে আংশিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়ে জনগণের মুক্তির পথটাকে জনগণের কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আড়াল করার শত চেষ্টা সত্ত্বেও, নিজেদের মুক্তির পথের চেহারা জনগণ ঠিকই মনে রেখেছেন। তাই তাঁরা এখন ঐ আড়াল করার প্রক্রিয়াশীল প্রচেষ্টাকেই প্রতিহত করতে চাইছেন।

কিন্তু সকলে মিলিতভাবে কাঁধ না-লাগালে যে এটা পুরোপুরি প্রতিহত করা যাবে না, সেই কথাটা আমরা এত দিন জনগণকে না-বললেও এখন আমাদের তা বলতে হবে এবং এরপর থেকে বলেই যেতে হবে। সমগ্র জনগণকে প্রতিক্রিয়াশীলদের বিপ্লব দমনের প্রচেষ্টা প্রতিহত করার কাজে হাত লাগাতে উদ্বুদ্ধ করার এখনই সময়। আজ সূচনা করলে, কাল সাফল্য আসবে। আর কাল সূচনা করলে, পরশু সাফল্য আসবে। তাই আজই শুরু করা দরকার। তবে কোনো কারণে দেরি হয়ে গেলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই, সাফল্য আসবেই তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

করণীয় কর্তব্যসমুহঃ

         উপরি-উক্ত সামগ্রিক পরিস্থিতিই আমাদের করণীয় কর্তব্যগুলো নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সেই করণীয়গুলোর মধ্যে কতিপয় হচ্ছে সাধারণ করণীয় আর কতিপয় হচ্ছে বিশেষ করণীয়।

সাধারণ করণীয়গুলো হলঃ

প্রথমত, শ্রেণী-লাইন, শ্রেণী-দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণীর উপর নির্ভরশীলতাকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরে, চলমান সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং তাকে উন্নত পর্যায়ে বিকশিত করা। দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা ও বিকাশের উপর ভিত্তি করে বর্তমান অবস্থার উপযোগী বিভিন্ন গণসংগঠন ও গণআন্দোলন গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, নির্ধারিত রণকৌশল অনুযায়ী এতদিন ধরে অবহেলিত সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বিপ্লবী শক্তিসমূহকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। চতুর্থত, পার্টি বহির্ভূত সমস্ত বিপ্লবী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা।

বিশেষ করণীয়গুলো হলঃ

এক, এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা ভিত্তিতে সমগ্র অতীত সংগ্রামের সারসংকলন করা। দুই, উক্ত সারসংকলনের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার বিপ্লবের রণনীতি-রণকৌশল প্রণয়ন করা। তিন, শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সূচনা করা ও চালিয়ে যাওয়ার ভিতর দিয়ে সমগ্র পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করা। চার, কেডার-স্কুল চালু করার ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত নেতা-কর্মী গড়ে তোলা। পাঁচ, সম্ভব হলে পেশাদার বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদেরও কোনো সামাজিক পেশার আড়াল গ্রহণ করা। ছয়, পার্টিতে আংশিক সময়ের কর্মীদের সদস্যপদ দেবার ব্যবস্থা করা। সাত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সংশ্লেষণ থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আত্মস্থ করে দেশীয় বিপ্লবী কর্মকান্ডে কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক আভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করা।

সাধারণ করণীয় কর্তব্যগুলো সম্পর্কেঃ

প্রথম কর্তব্যঃ শ্রেণী-লাইন, শ্রেণী-দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণীর উপর নির্ভরশীলতাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, চলমান সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং তাকে উন্নত পর্যায়ে বিকশিত করা।

আমরা যেসব এলাকায় পার্টিতে ও বাহিনীতে শ্রমিক ও দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষকের প্রাধান্য সৃষ্টি করিনি, সেসব এলাকাতে বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খেয়েছি। কারণ পার্টিতে বিদ্যমান অসর্বহারা শ্রেণীর প্রাধান্যের ফলে আমরা শ্রমিক ও দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষক শ্রেণীর উপর নির্ভর না-করে, অন্যান্য সুবিধাভোগী বা আধা-সুবিধাভোগী শ্রেণীর উপর নির্ভর করেছি। ফলে দমননীতির সময় মূল শ্রেণী আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করতে এগিয়ে আসেনি, যার দরুন বিপর্যয় এসেছে। তাই শ্রেণী-লাইনকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করে ও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেই এই মুহূর্তে আমাদের প্রাথমিক করণীয় (সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ও তাকে উন্নত পর্যায়ে বিকশিত করা) সম্পন্ন করতে হবে।

লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমরা প্রথম থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি রাখিনি। দু-একজন কমরেড রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর আঘাত হানার কথা বললেও সেই অনুযায়ী উপযুক্ত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক-সামরিক কোনো প্রস্তুতিই গ্রহণ করিনি। এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর আঘাত হানার আগে এই ধরনের প্রস্তুতি যে প্রয়োজন, সেটাই চিন্তা করিনি। ফলে আমাদের সৃষ্ট সশস্ত্র সংগ্রাম শুধু শ্রেণীশত্র“ খতমের আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে। তার ভিতর থেকে বের হতে পারেনি। তাই বর্তমানে আমাদের প্রধান মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে রাষ্ট্রিয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার যোগ্যতা অর্জন করা ও তা কার্যকরী করার দিকে।

অতীতে আমরা একপেশেমির প্রভাবে, সামরিক রণনৈতিক ও রণকৌশলগত পরিকল্পনাও করিনি। এই পরিকল্পনা থাকলে আমরা বিপর্যস্ত না হয়ে শত্র“র বর্তমান দমননীতিকে আরো বহুগুণ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারতাম। উপযুক্ত মুহূর্তে পিছিয়ে গিয়ে, কর্মী বাহিনীকে রক্ষা করে আরো কার্যকরভাবে পাল্টা আঘাত হানতে পারতাম। এর জন্য এখন থেকে আমাদের সামরিক রণনৈতিক ও রণকৌশলগত পরিকল্পনা করে কাজে হাত দিতে হবে এবং সচেতন প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। পিছিয়ে যাওয়ার জায়গা ও সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তুলতে হবে, গেরিলা বাহিনীর সামরিক শক্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, গণ-মিলিশিয়া গড়ে তুলতে হবে ইত্যদি কাজগুলো যথাযথ গুরুত্ব সহকারে করতে হবে।

সেই সঙ্গে খতমযোগ্য শ্রেণীশত্র“ নির্ধারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। নিতান্তই যে শ্রেণীশত্র“ খতম না করলেই নয়, কেবলমাত্র তাকেই খতম করতে হবে। মনে রাখতে হবে অধিক খতম নয়, সফল খতমই আমাদেরকে এগিয়ে দেবে।

দ্বিতীয় কর্তব্যঃ সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা ও বিকাশের উপর ভিত্তি করে বর্তমান অবস্থার উপযোগী বিভিন্ন গণ-সংগঠন ও গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা। বর্তমান সরকারি দমননীতি ও সশস্ত্র সংগ্রামের সাময়িক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের উচিত হবে সাধারণ গণতান্ত্রিক সংগঠন ও আড়াল সংগঠন গড়ে তোলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া।

তৃতীয় কর্তব্যঃ নির্ধারিত রণকৌশল অনুযায়ী এতদিন ধরে অবহেলিত সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বিপ্লবী শক্তিসমূহকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

রণকৌশল হলঃ আন্দোলনের জোয়ার-ভাটা, বিপ্লবের উত্থান-পতনের অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের পরিসরে সর্বহারা শ্রেণী যে লাইনে নিজেদের পরিচালিত করবে তা স্থির করা; এবং পুরনো ধরনের (রূপের) সংগ্রাম ও সংগঠনের বদলে নতুন ধরনের সংগ্রাম ও সংগঠন মারফত, পুরনো ধরনের শ্লোগানেরবদলে নতুন ধরনের শ্লোগানের মারফত এবং এই সমস্ত বিভিন্ন রূপের সমন্বয় সাধনের মারফত সেই লাইন অনুসরণ করা।

সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রামের ও সংগঠনের ধরন, তার রদবদল ও সমন্বয়সাধন নিয়েই রণকৌশলের কাজ কারবার। বিপ্লবের কোনো নির্দৃষ্ট স্তরে, বিপ্লবের জোয়ার-ভাটা ও উত্থান-পতনের উপর নির্ভর করে রণকৌশল অনেকবার পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে রণনীতির চাহিদা অনুসারে এবং সকল দেশের শ্রমিকদের বিপ্লবী সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে, প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে সংগ্রামের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংগ্রামের সবচেয়ে উপযুক্ত রূপ ও পদ্ধতিসমূহ স্থির করাই রণকৌশলের কর্তব্য।

সংগ্রামের রূপ বলতে যুদ্ধের রূপ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপ উভয়কেই বুঝায়। প্রাথমিকভাবে এটা এই দুই প্রকার।

যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি ও যুদ্ধের রূপ সবসময় একরকম থাকে না, বিকাশের অবস্থা অনুসারে, প্রাথমিকভাবে উৎপাদনের বিকাশ অনুসারে সেগুলো বদলে যায়। চেঙ্গিস খানের সময়কার যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি তৃতীয় নেপোলিয়নের সময়কার যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ছিল; বিংশ শতাব্দির যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি ঊনবিংশ শতাব্দির যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য।

রাজনৈতিক পরিমন্ডলের সংগ্রামের রূপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যুদ্ধের রূপসমূহের চেয়ে রাজনৈতিক পরিমন্ডলের সংগ্রামসমূহ আরো অধিক বৈচিত্রপূর্ণ। অর্থনৈতিক জীবন, সামাজিক সম্পর্কসমূহ ইত্যাদি অনুসারে, সেগুলো পরিবর্তিত হয়।

আমরা এতোদিন ধরে যুদ্ধের রূপের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র শ্রেণীশত্র“ খতমের রূপকেই অনুশীলন করে এসেছি, প্রয়োজনে অন্যান্য রূপের অনুশীলনকে গুরুত্ব দেইনি। যুদ্ধের বর্তমান স্তরের মধ্যেই পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উপযোগী যুদ্ধের রূপকে কাজে লাগানোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত। একই কথা রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ক্ষেত্রে আমরা এতদিন ধরে সংগ্রাম ও সংগঠনের গোপন রূপকেই অনুশীলন করে এসেছি। কিন্তু ব্যাপক জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল করতে হলে রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যান্য রূপগুলো অর্থাৎ আধা-গোপন ও প্রকাশ্য রূপগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে এর মধ্য থেকে সুনির্দিষ্ট অবস্থার উপযোগী রূপকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

সংগ্রামের উক্ত রূপগুলোকে কাজে লাগাতে হলে সেগুলোর উপযোগী সংগঠন গড়ে তোলা এবং সেই সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে সংগ্রামের উক্ত রূপগুলোতে জনগণকে সামিল করে সংগ্রামের সূচনা করলে সেই সংগ্রামের ভিতর দিয়ে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা গড়ে উঠবে। তার ভিতর দিয়ে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা জনগণ তাদের পরিপূর্ণ মুক্তির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন এবং ক্রমে সশস্ত্র সংগ্রামের সাঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হবেন।

চতুর্থ কর্তব্যঃ পার্টি বর্হিভূত সমস্ত বিপ্লবী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা।

উপরি-উক্ত তিনটি কর্তব্য সম্পাদন করতে পারলে এই কর্তব্য সম্পাদনের মূল কাজটা সম্পন্ন হয়ে যাবে। সমস্ত বিপ্লবী শক্তির ঐক্য কমিউনিস্ট  বিপ্লবীদের মধ্যকার ঐক্য ছাড়া অর্জিত হওয়া সম্ভব হবে না। কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে, অন্যান্য বিপ্লবী শক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজটা সহজ হয়ে যাবে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করা প্রসঙ্গে আমরা অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

বিশেষ করণীয়গুলো সম্পর্কে কিছু কথাঃ

এক, এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করা এবং তার ভিত্তিতে অতীত সংগ্রামের সার-সংকলন করা।

আমরা ইতিমধ্যে এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে ইতিহাসের উপাদান-উপকরণ সংগ্রহের কাজে হাত দিয়েছি, কিন্তু কাজটা এখনো শেষ হয়নি। কাজটা শেষ হলে তার ভিত্তিতে প্রথমে আমরা ইতিহাস পর্যালোচনা করব তারপর অতীত সংগ্রামের সারসংকলন করব। তবে এইসব কাজকর্মের ভিতর দিয়ে আমাদের সামনে যে চিত্রটা ফুটে উঠেছে তাতে আমাদের মতে অতীত সংগ্রামের সরসংকলন হলঃ এ-দেশের কউিনিস্ট আন্দোলন মূলত দুটো ভুল ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। একটা ধারাঃ ক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামকে পরিত্যাগ করে, সংশোধনবাদী গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে গিয়ে কমিউনিস্ট বৈশিষ্ট্যই হরিয়ে ফেলেছে এবং সংসদীয় সংশোধনবাদ চর্চার ভিতর দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের লেজুড় বা দোসরে পরিণত হয়েছে। আরেকটা ধারাঃ এমনকি বিপ্লবী গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনও পরিত্যাগ করে বাম-সংকীর্ণতাবাদী সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল হয়ে, বারবার একই ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে গিয়ে পড়েছে এবং আবারো পরিপূরক গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনবিহীন সশস্ত্র সংগ্রামই সংগঠিত করেছে। বাম-সংকীর্ণতা চর্চা করলেও এই ধারার মধ্যেই সঠিক ধারার কমিউনিস্ট বিপ্লবদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। কোনো একক পার্টির নেতৃত্বে পুরোপুরি সঠিক বিপ্লবী ধারা এখনো ভালোভাবে চর্চা হতে শুরু করেনি। সঠিক বিপ্লবী ধারার মূল কাজ হবে-শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে মূলত শ্রমিক-কৃষকের সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রাম ও তার পরিপুরক হিসেবে উপযুক্ত প্রচারমূলক ও শিক্ষামূলক কর্মকান্ডের ভিতর দিয়ে সমগ্র বিপ্লবী জনগণকে প্রকাশ্য ও গোপন বিভিন্ন ধরনের গণ-সংগঠনে সংগঠিত করে বিপ্লবী গণ-আন্দোলনের সূচনা করা ও চালিয়ে যাওয়া।

দুই, অতীত সংগ্রামের সারসংকলনের ভিত্তিতে রণনীতি-রণকৌশল প্রণয়ন করা।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের মূলনীতির আলোকে অতীত সংগ্রামের সারসংকলন করতে গেলেই আমরা দেখতে পচ্ছি একগুচ্ছ রণনীতিগত ও রণকৌশলগত ভুল আমরা করেছি। এর ভিত্তিতে রণনীতি-রণকৌশল প্রণয়নের কাজও আমরা হাত দিয়েছি। অচিরেই আমরা কাজটা শেষ করব। সেখানেই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

তিন, শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সূচনা করা ও চালিয়ে যাওয়ার ভিতর দিয়ে সমগ্র পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করা।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সংগ্রহশালায় মাওসেতুঙের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনগুলোর মধ্যে শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের নীতি-পদ্ধতি হচ্ছে অন্যতম। তার আলোকে আমাদেরকে প্রথমে এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে ক্রিয়াশীল প্রধান প্রধান ভুল ও অ-কমিউনিস্ট চিন্তাধারাগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। তার পর কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে, প্রয়োজনীয় দলিলপত্রাদি প্রস্তুত করে, পার্টির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী (কমপক্ষে ২-৫ বছর মেয়াদী) শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সূচনা করতে হবে। এর মাধ্যমেই পার্টির কর্মরীতি ও অধ্যয়ন রীতির সংস্কার সাধন করে, সমগ্র পার্টি কর্মীদের একই চিন্তা-পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করার ভিতর দিয়ে মতদাদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

এভাবে নিয়মিত রাজনৈতিক ধূলো-ময়লা ঝাড়– দেওয়ার অভ্যাস গড়ে না তোলার ফলে প্রতিদিনই আমাদের পার্টির ঘর-দোরে ভুল রাজনীতি ও মতাদর্শের যেসব ধূলো-ময়লা আর আবর্জনা জড়া হয়েছে তার ফলে চলাফেরা করাই সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। যদিও মাঝে-মধ্যে দায়সারা গোছের একটু-আধটু ঝাড়– দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তাতে ঘরের ময়লা ঘরেই থেকে গেছে, শুধু চলাচলের পথ থেকে একটু পাশে সরে গেছে মাত্র।

এ ক্ষেত্রে যেসব প্রধান প্রধান ভুল চিন্তাধারার বিরোধিতা করতে হবে সেগুলো হচ্ছেঃ

প্রথমত, আত্মমুখীবাদ। সমস্ত প্রকার ভুল চিন্তাধারার উৎসই হচ্ছে আত্মমুখীবাদ। আত্মমুখীবাদই বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে, বিভিন্ন সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে, বিভিন্ন প্রকার ভুল চিন্তাধারার জন্ম দেয়। আত্মমুখীবাদ হলো ঃ বাস্তব ঘটনা ও বস্তুকে বস্তুগত বাস্তবতার নিরিখে বাস্তবমুখীভাবে না-দেখে বাস্তব বিবর্জিত আত্মমুখী আকাঙ্খার নিরিখে দেখা বা অবাস্তবভাবে দেখা।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেঃ আত্মমুখীবাদ দেখা দেয় সুবিধাবাদ হিসেবে। এই সুবিধাবাদ দুই দিক থেকেই দেখা দিতে পারে। দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ ও বামপন্থী সুবিধাবাদ। যদিও সুবিধাবাদ বলতে মূলত দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদই বুঝায়। দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আত্মত্যাগের ঝুঁকি পরিহার করার সুবিধাবাদী আকাঙ্খায় সশস্ত্র সংগ্রামকেই পরিহার করা। আর বামপন্থি সুবিধাবাদ বলতে হঠকারিতাবাদ বা বাম-সংকীর্ণতাবাদকে বুঝানো হয়। এর বৈশিষ্ট্যৗ হলো, অল্পস্যংখক লোকের সশস্ত্র তৎপরতার ভিতর দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে তাড়াতাড়ি কাজ হাসিল করার সুবিধাবাদী আকাঙ্খায় ব্যাপক জনগণকে সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল করার দীর্ঘমেয়াদী ও ধৈর্যশীল প্রচারমূলক রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিহার করা।

সমগ্র সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনে বাম-সংকীর্ণতা বা বাম-হঠকারিতাই প্রধান ভুল চিন্তাধারা হিসেবে বারবার এসেছে এবং সংগ্রামের ফসলকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। কিন্তু বিপর্যয়ের সময় ঐ বাম-হঠকারীদের একটা অংশই আবার শত্র“র শক্তিকে আত্মমুখীভাবে অতিরঞ্জিত করে দেখে, কোনো পাল্টা আক্রমণই নয় বরং সর্ম্পূণ নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষার চরম দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদে নিমজ্জিত হয়েছে। সমগ্র ইতিহাস জুড়ে এভাবে বামপন্থী সুবিধাবাদীরা চাপে পড়ে নিজেদের দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদে পাল্টে নিয়েছে।

সশস্ত্র সংগ্রাম বিকাশ লাভ করতে থাকার সময় বাম-সংকীর্ণতাই প্রধান বিপদ হয়ে দেখা দেয়। আর বিপর্যয় চলাকালীন প্রধান বিপদ হয়ে দেখা দেয় দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ। যেহেতু সংগ্রামের বিকাশ ও বিপর্যয়ের বহুসংখ্যক আবর্তনের ভিতর দিয়েই আমাদের যেতে হবে, তাই এই দুই ভিন্ন প্রকৃতির ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রামের নীতি ও কৌশল আমাদের আয়ত্ব করতে হবে।

অন্যান্য ক্ষেত্রের ভুল দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিম্নরূপঃ

সামরিক ক্ষেত্রেঃ শত্র“র শক্তিকে অতিরঞ্জিত করে দেখার আত্মমুখীবাদী বিচ্যুতি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের জন্ম দেয়, সেটাই সামরিক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষার ভ্রান্ত পলায়নবাদী রণকৌশলের জন্ম দেয। আবার শত্র“র শক্তিকে প্রয়োজনের চেয়ে ছোট করে দেখার আত্মমুখী বিচ্যুতি রাজনীতির ক্ষেত্রে যে বাম-সংকীর্ণতার জন্ম দেয়, সেটা সামরিক ক্ষেত্রে বাম-হঠকারী আত্মঘাতি রণকৌশলের জন্ম দেয়।

আমাদের প্রয়োজন রণনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে শত্র“কে তুচ্ছ করে দেখা, তার প্রকৃত শক্তিহীনতা ও দুর্বলতাগুলোকে উপলব্ধি করা। কেবলমাত্র তা হলেই আমরা তার ভয়ে অহেতুক ভীত না হয়ে তাকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে পাল্টা আঘাত হানার রননীতিগ্রহণ করতে পারব। আর রণকৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের প্রয়োজন শত্র“কে শক্তিশালী হিসেবে দেখা, শত্র“র সবলতাগুলোকে এবং তার শক্তি-সামর্থ্যকে উপলব্ধি করা। কেবলমাত্র তাহলেই আমরা আত্মঘাতী আক্রমণের ভিতর দিয়ে অহেতুক শক্তি ক্ষয় না করে কৌশলী আঘাতের ভিতর দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে লাভের পরিমাণ বাড়াতে পারব।

সাংগঠনিক ক্ষেত্রেঃ আত্মমুখীবাদ প্রকাশ পায় সংকীর্ণতাবাদ হিসেবে। যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছেঃ প্রথমত, গণলাইন পরিত্যাগ করা। যার ফলে পার্টি ক্রমে ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সশস্ত্র সংগ্রামের পরিপূরক বিপ্লবী গণসংগঠন-গণআন্দোলনও পরিত্যাগ করে। দ্বিতীয়ত, নীতিহীন অভ্যন্তরীণ বিরোধের জন্ম দেওয়া। কতিপয় নেতার ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার আত্মমুখী আকাঙ্খা পার্টিতে নীতিহীন বিরোধের জন্ম দেয়, যার ফলে বাড়তে থাকে অভ্যন্তরীণ অনৈক্য। এই অনৈক্য যথাযথভাবে মীমাংসিত না হলে তা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রূপ নেয়, যা আত্মঘাতী সংঘর্ষের দিকেও গড়ায়। তৃতীয়ত, বিদ্যমান সংগঠনকে শূণ্য গোয়ালে পরিণত করা। সংগঠক নেতা নিজে কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই বাস্তব প্রয়োগে না গিয়ে, বাস্তব বিবর্জিত পন্থায় কর্মীদের নিজের মতো করে গড়তে চান। ফলে কর্মীরা পার্টি ছেড়ে চলে যান আর শেল্টারগুলো ব্যক্তিগত শেল্টারে পরিণত হয় আর নয়তো নষ্ট হয়ে যায়। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে আত্মমুখীবাদ নেতৃত্বের দিক  থেকে হুকুমবাদ আকারে প্রকাশিত হয়। এই হুকুমবাদ আবার কর্মীদের মধ্যে অন্ধক্রিয়াবাদের জন্ম দেয়। যার পরিণতি হচ্ছে শূণ্য গোয়াল।

রাজনৈতিক রণকৌশলের ক্ষেত্রেঃ পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে সংগ্রাম ও সংগঠনের বিভিন্ন রূপগুলো ও তার প্রয়োজনীয় রূপান্তর উপেক্ষিত হয়।

ঘটনা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেঃ আত্মমুখীতার প্রকাশ হয় একদেশদর্শিতা বা খোলস-সর্বস্তা হিসেবে, যা ঘটনাকে কেবল এক দিক থেকে এবং উপর-উপর বা হালকাভাবে দেখে, সার্বিকভাবে বা গভীরভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়। এই একদেশদর্শিতা বা খোলস-সর্বস্বতা আমাদেরকে অতীত সংগ্রামগুলোর যথাযথ সারসংকলন থেকে বিরত রেখে দেয়। ফলে বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।

চার, ক্যাডার-স্কুল চালু করার ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত নেতা-কর্মী গড়ে তোলা।

কার্যকর ধৈর্যের সঙ্গে তাড়াহুড়োবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং প্রয়োজনীয় বিপ্লবী সতর্কতা অবলম্বন করে, পার্টিতে ক্যাডার-স্কুল চালু করা, সমস্ত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে তাকে চালিয়ে যাওয়া এবং এর মাধ্যমে সামগ্রিক রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত একগুচ্ছ সুযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা ও তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এ-সম্পর্কে শিক্ষা নীতি ও ক্যাডার-স্কুল নামক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

পাঁচ, পেশাদার বিপ্লবীদেরও কোনো সামাজিক পেশার আড়াল গ্রহণ করা।

আমাদের পার্টির পেশাদার বিপ্লবীদের বিপ্লব করা ছাড়া কোনো সামাজিক পেশা না থাকায়, তাঁদের অধিকাংশই শত্র“ কর্তৃক দ্রুতই চিহ্নিত হয়ে গেছেন এবং এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে পার্টি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকেরই যদি আগে থেকেই কোনো-না-কোনো সামাজিক পেশা থাকত, তা হলে তাঁরা এলাকার মধ্যেই দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারতেন এবং সাংগঠনিক ও সামরিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারতেন। তাই আমরা বলছি, সম্ভব হলে পেশাদার বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদেরও রাজনৈতিক পেশাকে আড়াল করার জন্য কোনো-না কোনো সামাজিক পেশা বেছে নিতে হবে।

ছয়, পার্টিতে আংশিক সময়ের কর্মীদের সদস্যপদ দেবার ব্যবস্থা করা।

আংশিক সময়ের কর্মীদের সদস্যপদ দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় পার্টি-কর্মীদের সংখ্যা খুবই সীমিত হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থা থাকলে, আজ পেশাদার বিপ্লবীদের চেয়ে কমপক্ষে চারগুণ বেশি আংশিক সময়ের কর্মী পার্টিতে থাকত। যাঁরা তাঁদের সিকিভাগ সময়ও পার্টিকে দিলে, পার্টিতে বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ পেশাদার বিপ্লবী কর্মীশক্তি থাকত। সেই সঙ্গে পার্টি পেত সমাজের প্রায় সমস্ত পেশার মানুষের সঙ্গে এক আত্মিক যোগাযোগ, যা পার্টির গণভিত্তি বাড়িয়ে দিত প ্রায় দশগুণ। তাই আমরা বলছি আংশিক সময়ের কর্মীদেরও পার্টি-কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

সাত, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভিতর দিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভিতর দিয়ে ভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের অভিজ্ঞতার সংশ্লেষণ থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আত্মস্থ করে দেশীয় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানোর কর্তব্য সম্পাদন করা এবং নিজেদের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা।

পার্টিকে উপরি-উক্ত সমস্ত করণীয় সম্পাদনের উপযোগী করে গড়ে তোলাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয়।

সূত্রঃ  

রাকেশ কামাল(ডাঃ টুটু) রচনাসংগ্রহ

(দলিল সংকলন)

শ্রাবণ প্রকাশনী


পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)(লাল পতাকা)’র সারসংকলন -রাকেশ কামাল

images

পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)(লাল পতাকা)’র

সারসংকলন

রাকেশ কামাল

[নোট:

পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)(লাল পতাকা)’র প্রয়াত সম্পাদক শহীদ কমরেড রাকেশ কামাল তাঁদের পার্টির চার দশকের বিপ্লবী অভিজ্ঞতার একটি সামগ্রিক সারসংকলনের লক্ষ্য থেকে ২০০৮-সালের প্রথমার্ধে একটি সার্বিক দলিল রচনা করেন। দলিলটির শিরোনাম ছিল “সারসংকলনমূলক  প্রতিবেদন”। দলিলটি “(প্রাথমিক) খসড়া রূপরেখা” আকারে ছিল। যা তখনও তাদের সিসি কর্তৃক অনুমোদিত নয়, এবং তার প্রচার ছিল সীমাবদ্ধ। দলিলটির রচনাকাল ছিল মার্চ থেকে জুন,২০০৮।

কমরেড রাকা’র লক্ষ্য ছিল এই প্রাথমিক খসড়া দলিলটিকে শুধু তাঁর পার্টির মধ্যেই নয়, সমগ্র মাওবাদী আন্দোলনে আলোচনার জন্য পেশ করা। কারণ, চূড়ান্ত করবার আগে তিনি এর উপর নিজ পার্টির সিসি ছাড়াও সমগ্র মাওবাদী আন্দোলনের মতামত ও পরামর্শ শুনতে চেয়েছিলেন। যা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক উদ্যোগ। সেজন্যই তিনি দলিলটি প্রাথমিকভাবে রচনার পরই নিজ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের মাঝে পেশ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন মাওবাদী কেন্দ্র ও শক্তির কাছেও তার কপি প্রদান করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এর কিছু পরই তিনি গ্রেফতার হন এবং ২৭ জুলাই,’০৮-এ শত্রু তাঁকে হত্যা করে। ফলে তিনি দলিলটিকে চূড়ান্ত করে যেতে পারেননি। এমনকি তাঁর পার্টিতে এবং অন্য মাওবাদী শক্তিগুলোর সাথে এ দলিলের ভিত্তিতে পর্যাপ্ত আলোচনা ও মত-বিনিময়ের সুযোগও পাননি। ফলে দলিলটি “প্রাথমিক খসড়া” রূপেই থেকে যায়।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন দলিল। কারণ, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি সামগ্রিক লাইনগত সারসংকলনের উদ্যোগ নেয়া হয় যা কিনা সেই পার্টিই শুধু নয়, এদেশের সমগ্র মাওবাদী আন্দোলনের বিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কমরেড রাকা এই খসড়া দলিলটিকে অধিকতর সমৃদ্ধ করা ও পরিমার্জনা করবার এবং চূড়ান্ত করবার সুযোগ পাননি। তথাপি এ দলিলের প্রাথমিক পাঠ থেকে আমরা একে বাংলাদেশের মাওবাদী আন্দোলনের বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রপদক্ষেপ বলে মনে করি।

এখন আমরা দলিলটির সারসংকলন মূলক অধ্যায়টি এখানে প্রকাশ করছি। দলিলটি অনেক বড় বিধায় তা পূর্ণাঙ্গভাবে এখানে প্রকাশ করা গেল না। কিন্তু আমরা আশাকরি দলিলটির মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান এই অধ্যায়টি থেকেই পাঠকের কাছে পরিস্কার হবে। এবং আগ্রহী পাঠক পূর্ণাঙ্গ দলিলটি সংগ্রহের উদ্যোগ নেবেন।

এই অধ্যায়ে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সুদীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতার মৌলিক কিছু বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও আন্তর্জাতিকতাবাদ, নারী প্রশ্ন- এ জাতীয় আরো কিছু প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ সারসংকলন মূলক বক্তব্য দলিলটির অন্য অধ্যায়গুলোতে রয়েছে। সেজন্য এই দলিলটি বাংলাদেশের মাওবাদী আন্দোলনের সার্বিক পুনর্গঠনের বর্তমান পর্যায়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অবদান বলে আমরা মনে করি।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা দলিলের প্রধান সারসংকলনমূলক এই অধ্যায়টি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সম্পাদনা বোর্ড, লাল সংবাদ]

সারসংকলনমূলক প্রতিবেদন

(প্রাথমিক) খসড়া রূপরেখা

(সিসি কর্তৃক অনুমোদিত নয়, প্রচার সীমাবদ্ধ)

 

ভূমিকা

[সারসংকলনে অনুসৃত দৃষ্টিভঙ্গি, আমাদের সাফল্য ও ব্যর্থতা]

আমাদের বর্তমান বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে পার্টিতে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের অতীত কর্মকান্ডের সারসংকলনের দাবি উঠেছে। কিন্তু বিপর্যয় আমাদের নিজেদের অবস্থান ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের রক্ষণাবেক্ষণকেও এমন মাত্রায় প্রভাবিত করেছে যে প্রায় দুবছর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো লেখা নিম্নস্তরে প্রচার করা সম্ভব হয় নি। এটা মূলত এ-রকম পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের অযোগ্যতাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। তা ছাড়া কমরেড কেএম শহিদ হওয়ার ফলে আক্ষরিক অর্থেই অযোগ্য মানুষের হাতে এই কাজের ভার ন্যাস্ত করতে পার্টি বাধ্য হয়েছে। ফলে অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনে দুটো পূর্ব কর্তব্য সামনে এসে পড়ে। এক, ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন এবং দুই, পার্টি বহির্ভূত অন্যান্য যোগ্য ব্যক্তিদের সহায়তা গ্রহণ। এই অসংকোচ সহায়তা গ্রহণের এক পর্যায়ে আমাদের পুরনো সারসংকলনগুলোর দিকে, আমাদের পার্টি ইতিহাসের দিকে এবং এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর পর, আমাদের কাছে মনে হয়েছে আমাদের সামগ্রিক লাইন, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মরীতিরই সারসংকলন করা প্রয়োজন। আমাদের মতে নয়টা প্রসঙ্গে আমাদের উপলব্ধি, দৃষ্টিভঙ্গি, কর্মরীতি ও লাইনের পুনর্মূল্যায়ন করা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করা জরুরী। তার জন্য প্রয়োজন প্রতিটি প্রশ্নেই আমাদের বর্তমান অবস্থার উপযোগী বিস্তারিত বর্ণনাসহ আমাদের নিজস্ব রচনা। কিন্তু কাজটা সময় সাপেক্ষ। অথচ এখনই একটা সামগ্রিক দিশা সম্বলিত রচনা কমরেডদের জন্য প্রয়োজন। তাই আমরা উপরি-উক্ত বিষয়গুলোকে স্পর্শ করে একটা প্রাথমিক খসড়া রূপরেখা প্রণয়ন করছি। স্বভাবতই আমরা এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান থেকে বিরত থাকছি। এখানে শুধু মূল করণীয়গুলোকেই চিহ্নিত করছি। কেন বা কী জন্য এমনটাই করা দরকার সে সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সম্বলিত পুস্তক প্রণয়ন করব।

সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট 

১৯৬৭ তে নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান উপমহাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিল এবং মাওবাদ ও কমরেড চারু মজুমদারের শিক্ষা এ-দেশের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের কাছে আলোকবর্তিকায় পরিণত হল। ৬৯-এর দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের জোয়ার এবং ৭১-এর তথাকথিত স্বাধীনতা যুদ্ধের জটিল জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অন্ততপক্ষে চারটে ধারায় মাওবাদী পথে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের সূচনা হল। আব্দুল হকের নেতৃত্বে ইপিসিপি ধারা, মতিন-আলাউদ্দীন-আমজাদ হোসেনদের নেতৃত্বে সিপিইবি ধারা, নগেন সরকারের নেতৃত্বে বিএসডি ধারা এবং সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পিবিএসপি ধারা। তবে প্রত্যেকটা ধারাই নিজেদের ছাড়া অন্য সকলকেই সংশোধনবাদী আখ্যা দিল এবং একে অপরের ইতিবাচক দিক থেকে শিক্ষা নিতে অস্বীকার করল। তারপর থেকে প্রায় চার দশকব্যাপী প্রত্যেকের ইতিহাস আলাদা। আমরা এখানে কেবল আমাদের ধারার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকছি।

১৯৭১-এর ১৪ই জুন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) গঠিত হওয়ার পর থেকে ’৭৪ পর্যন্ত কোনো সামগ্রিক রণনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়াই পাবনা-রাজশাহী-দিনাজপুর, যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া ও সিলেট-চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে বহু ছোট-বড় উত্থান ও বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটতে থাকল। পার্টির নিয়মিত গেরিলা বাহিনী কোথাও কোথাও বিডিআর ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণ প্রতিহত করে দিল। রাজশাহী-যশোর-কুষ্টিয়া জেলার কয়েকটা থানা এবং পুলিশ, বিডিআর ও রক্ষিবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করে অস্ত্র দখল করা হল। শ্রেণীশত্রুদের বন্দুক দখল করা হল। বহু গ্রামে বিপ্লবী কৃষক কমিটি গঠন করে, জোতদারের জমি ও খাসজমি দখল করে, ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হল, গণআদালত বসানো হল, হাট-ঘাট-খাল-বিল ইত্যাদি থেকে তোলা-ধলতা-ইজারাদারি উচ্ছেদ করা হল। সারা দেশের নিপীড়িত জনগণের মধ্যে প্রবল আশার সঞ্চার হল। আর শোষক শ্রেণী হল আতঙ্কে দিশেহারা। সংশোধনবাদের ভিতও গেল টলে। শেষ পর্যন্ত সংশোধনবাদীদেরকে পক্ষে রেখে সামন্ত ও আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণীর প্রতিনিধি ফ্যাসিস্ট মুজিব সরকার সোভিয়েত-ভারতের মদদপুষ্ট হয়ে, রক্ষিবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর ও মিলিটারি নিয়ে বিপ্লবী কৃষক জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পার্টির মতাদর্শিক-রাজনৈতিক লাইনের দুর্বলতা, শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি-শ্রেণীলাইন-শ্রেণী নির্ভরতার অভাব এবং মাওবাদী গণযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ সঠিক লাইনের অভাবের ফলে সমস্ত সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকাগুলোকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব হল। শত শত কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও বিপ্লবী কৃষক জনতা জীবন দিলেন। সমস্ত কেন্দ্রীয় নেতা হয় শহিদ হলেন, নয় গ্রেপ্তার হয়ে জেলে চলে গেলেন।

১৯৭৬ সালে কেন্দ্রীয় নেতারা জেল থেকে বের হয়ে এলেন। সামান্য কিছু সারসংকলনের ভিতর দিয়ে পুনরায় প্রায় একই প্রক্রিয়ায় সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করা হল। গড়ে উঠল কেবল শ্রেণীশত্রু খতমের মাধ্যমে সৃষ্ট ‘এ্যাকশন এলাকা’। পাবনা-সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইল, যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া, রাজশাহী-নাটোর-নওগাঁ-চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ৯০-এর দশকের গোড়া থেকে ২০০৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলল এই প্রক্রিয়া। আবারো প্রায় একই প্রক্রিয়ায় এই বিপ্লবী উত্থানকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেওয়া হল। কয়েকজন নেতৃস্থানীয় কমরেডসহ শত শত পার্টি সংগঠক, বীর গেরিলা ও বিপ্লবী জনগণ শহিদ হলেন। বহু পার্টি সদস্য ও সমর্থক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন। এই সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবী সংগ্রামে আমরা যেমন অনেক গৌরবজনক বিজয় অর্জন করেছি তেমনি বহু ক্ষয়ক্ষতি, ব্যর্থতা ও নৈতিক বিচ্যুতিরও মুখোমুখি হয়েছি। ফলে আমরা আমাদের লড়াইতে সাময়িকভাবে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। এখন আমরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিয়ে আমাদের পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি।

৭১ থেকে ৭৪-য়ে পার্টি বয়স ও অভিজ্ঞতায় ছিল নবীন, তাই ভুল করাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ৯০-এর দশকে পার্টি বয়স ও অভিজ্ঞতায় খুব একটা নবীন ছিল না। তা ছাড়া সংশোধনবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও সংগ্রাম, বিপ্লবকে সফল করার দৃঢ় সংকল্প এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের প্রতি অবিচল আস্থা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ও মালেমা-কে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করার মধ্যে আগেকার এমন কিছু গুরুতর ঘাটতি থেকে গিয়েছিল যার জন্য আমরা একই ধরনের কিছু ভুল বারবার করে গিয়েছি। উক্ত ঘাটতিগুলো মতাদর্শগত বিচ্যুতি হিসাবে আমাদের রাজনৈতিক- রণনৈতিক ও কৌশলগত লাইনে কিছু কিছু মাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছিল। ফলে প্রতিবারই পার্টি অভ্যন্তরীণ কারণে শক্তি হারাতে থাকে, অর্থাৎ শক্তির মূল উৎস জনগণ থেকে একটু একটু করে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে। এর উপর প্রতিক্রিয়াশীলদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ফ্যাসিস্ট হামলা বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত ও প্রসারিত করে। সুতরাং এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে বিজয়ের পথে সাফল্যের সঙ্গে এগোতে হলে ঐ গুরুতর ঘাটতিগুলো বা মতাদর্শগত বিচ্যুতিগুলো আমাদেরকে চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। আমরা অবশ্যই মালেমা-র আলোয় আমাদের অতীত ভুলভ্রান্তির, উপলব্ধির ঘাটতির এবং সেগুলোর শ্রেণীভিত্তির বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করব। এভাবে আমরা আমাদের মতাদর্শগত বিভ্রান্তি শুধরে নিয়ে সমগ্র পার্টিকে একজন মানুষের মতো করে মতাদর্শিক রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত করে তুলতে পারব এবং বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে বৃহত্তর বিজয়ের পথে এগিয়ে যেতে পারব।

এই সংকটের সময় বিগত সশস্ত্র সংগ্রামের সারসংকলন করার ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যের কথা ভুলে যাওয়া চলবে না, বরং উজ্জল ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সাহস সঞ্চয় করতে হবে। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যেখানেই সংগ্রাম সেখানেই আত্মত্যাগ অনিবার্য, মৃত্যু সেখানে সাধারণ ঘটনা। অর্থাৎ আমরা যদি শুধু আমাদের ভুলত্রুটি আর ক্ষয়ক্ষতির দিকেই আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রেখে সাফল্যগুলোকে না-দেখি এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রগতি বুঝতে ব্যর্থ হই, তা হলে আমরা আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাকে যথাযথ দ্বান্দ্বিক নিয়মে বিশ্লেষণ করতে অপারগ হব এবং ভবিষ্যতে বিপ্লবের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালনে মারাত্মকভাবে বিচ্যুত হব।

আমাদের পার্টিতে প্রতিটা বিপর্যয়ের পর দুধরনের ক্ষতিকর ঝোঁক দেখা দিয়েছে। একটা ঝোঁক মনে করেছে, আমাদের গোটা লাইনটাই ছিল প্রধানত ভুল লাইন—এই ঝোঁক আমাদের সাফল্যগুলোকে খুব ছোট করে দেখিয়েছে। অন্য ঝোঁকটা মনে করেছে, আমাদের লাইনে কোনো ভুলই ছিল না, প্রয়োগে ভুল করেছি বলে বিপর্যয় এসেছে। প্রথম ঝোঁকটা মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ বিশ্বব্যাপী মতাদর্শগত ফ্রন্টে এখনো সংশোধনবাদই প্রধান বিপদ। এই ঝোঁক আমাদেরকে ঐ প্রধান বিপদের মধ্যে নিয়ে যাবে এবং সশস্ত্র কৃষি বিপ্লব অতিক্রমের অযোগ্য বাধার মুখে পড়বে। আর দ্বিতীয় ঝোঁকটা আমাদেরকে ‘বাম’ সংকীর্ণতাবাদী ও  হঠকারী বিচ্যুতির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখবে। এই দ্বিতীয় ঝোঁকটার বিরোধিতা করার সময় আমাদের যথেষ্ট মাত্রায় সতর্ক থাকতে হবে, না-হলে সেটাও আমাদের প্রথম বিচ্যুতির মধ্যে নিয়ে ফেলতে পারে। অর্থাৎ আমাদের সাফল্যকেও ব্যর্থতা হিসাবে চিহ্নিত করে সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামই পরিত্যাগ করার ঝোঁক দেখা দিতে পারে। কিংবা বর্তমান এই ব্যর্থতা নেতৃত্বের পরিকল্পিত চক্রান্ত এমন ধারণাও কারো কারো মধ্যে দেখা দিতে পারে, যা নেতৃত্ব ও কর্মী মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মারাত্মক আত্মমুখীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটিয়ে পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনতিক্রম্য বাধার সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণেই যেসব কমরেড এখনো কঠোর সংগ্রামের মধ্যে দৃঢ়তা ও বিপ্লবী জঙ্গিত্ব বজায় রেখে, পার্টির লাল পতাকার মর্যাদা রক্ষায় আদর্শ স্থাপন করে চলেছেন তাঁদের জন্য সমস্ত আকাঙ্খা, সন্দেহ ও অর্থহীন আত্মাভিমান ঝেড়ে ফেলে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের ভিত্তিতে আত্মসমালোচনা করা ও বিপ্লবী শিক্ষা গ্রহণ করা, বিপ্লবকে সফল করার জন্যই, মূল কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করার মাধ্যমেই আমরা পার্টিকে আজকের মতাদর্শগত ত্রুটি ও বিভ্রান্তি থেকে বের করে আনতে পারি, লেনিনীয় নীতিভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ ও সংহত শক্তিশালী পার্টি গড়ে তুলতে পারি এবং বিপ্লবের বিজয় অর্জনের জন্য সমগ্র জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করার হাতিয়ার হিসেবে বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট ও সশস্ত্র বাহিনীকে পার্টির দুই শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করতে পারি।

আত্মসমালোচনা একটা দীর্ঘ, জটিল ও বহুমুখী কর্মকান্ড। বিশেষত আমাদের দেশের বিপ্লবের ইতিহাস এটাকে সেই সঙ্গে যৌথ কর্মকান্ডে পরিণত করারও দাবি জানাচ্ছে। শুধু আমরা একাই এটা করলে চলবে না। আমাদের মতো আরো যাঁরা মাওবাদের আলোকে ঘটনাবলীর বিচার বিশ্লেষণ করেন এবং সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবকেই এ-দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সারবস্তু বলে মনে করেন তাঁদের সকলের মতামতের ভিত্তিতেই এ-দেশের বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসের যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ সারসংকলন সম্ভব। তবে অন্যদের মতামত আমরা তখনই পাব, যখন আমরা আমাদের নিজস্ব মতামত গড়ে তুলব। আমাদের নিজস্ব মতামতও একদিনে পূর্ণরূপ পরিগ্রহ করবে না। এই আত্মসমালোচনামূলক প্রাথমিক খসড়া পর্যালোচনাকে প্রথমত, কেন্দ্রীয় মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ভিতর দিয়ে চূড়ান্ত খসড়ায় রূপ দিয়ে পার্টির মধ্যে উচুতলা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, এটাকে বিরাট শিক্ষা অভিযানে পরিণত করতে হবে। যাতে এটা পার্টি সদস্যদের উপলব্ধি ও অনুশীলনের মধ্যে জমে থাকা ভুল চিন্তাগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে মালেমা-র আলোয় সঠিক নীতি ও উপলদ্ধি আয়ত্ব করতে সাহায্য করতে পারে। তা হলে এই আত্মসমালোচনা নিজেই একটা সংগ্রামে পরিণত হয়ে পার্টির মধ্যে পরিচ্ছন্নতা অর্জনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে। একদিন গোসল করলে যেমন চিরতরে পরিষ্কার হওয়া যায় না, আবার ময়লা জমে এবং প্রতিদিন গোসল করা অভ্যাসে পরিণত করতে হয়। তেমনি আত্মসমালোচনাও একদিনের কাজ নয়, একজন-দুজনের কাজও  নয়। এটা গোটা পার্টির প্রত্যেকের কাজ এবং প্রতিদিনের কাজ। ভালোভাবে গোসল করতে গেলে যেমন সাবান লাগে, ভালোভাবে আত্মসমালোচনা করতে গেলে তেমনি মালেমা-র নীতি ও উপলদ্ধি লাগে এবং তা যে অল্প কয়েক জনের লাগে তাই নয়, পার্টির প্রত্যেকেরই লাগে। তাই আমাদের আত্মসমালোচনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পার্টির প্রত্যেকটা সদস্যের কাছে মালেমা-র সঠিক নীতি ও উপলব্ধি পৌঁছে দেওয়া।

আর একটা মৌলিক বিষয় মনে রেখে আমাদেরকে এই পর্যালোচনায় হাত দিতে হবে তা হচ্ছে—আমাদের প্রকৃত শিক্ষক এ-দেশের জনগণ, তাঁদের কাছ থেকে শেখার জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য, বিনয় ও জ্ঞান আমাদের অর্জন করতে হবে। তা না-করে আমরা যদি আত্মগত চিন্তার খপ্পরে পড়ে আমাদের বইতে পড়া বিদ্যার কাঠামোর মধ্যে বাস্তবকে খাপ খাওয়াতে চাই আর নিজেদের সর্ব জ্ঞানের জ্ঞানী ধরে নিয়ে পার্টির উপর অবাস্তব সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, তা হলে পুরনো ভুল শুধরাতে গিয়ে আরো ক্ষতিকর ভুলের মধ্যে গিয়ে পড়ব। তা ছাড়া আমাদের পার্টির সদস্য, সমর্থক ও গেরিলা স্কোয়াডের সদস্যরা যাতে আমাদের অতীত ভুলের ব্যাপকতা ও গভীরতা এবং তার কারণগুলো বুঝতে পারেন তার জন্য আমাদের অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সংগ্রাম চালাতে হবে। সুসংবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া এটা সম্ভব হবে না। এই সংগ্রামকে অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে চালাবার জন্য সব রকমের যত্ন নিতে হবে।

আমাদের এই আত্মসমালোচনায় কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে?

প্রথমত, আমাদের সাফল্যগুলো অর্থাৎ আমাদের অতীত ধারণা ও প্রয়োগের সঠিক দিকগুলো। দ্বিতীয়ত, আমাদের ব্যর্থতা বা প্রয়োগের প্রধান ত্র“টি এবং তার পিছনের ভুুল ধারণাগুলো। তৃতীয়ত, এই সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে যে শিক্ষাগুলো আমাদের নেওয়া উচিত।

আমাদের সাফল্য

১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ এই চার বছর এবং ১৯৯০ থেকে ২০০৪ এই পনের বছরের বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম গড়ে উঠতে পারার পিছনে আমাদের ধারণা ও প্রয়োগের মধ্যে অনেকগুলো সঠিক দিক রয়েছে, যেগুলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে সঙ্গতিপূর্ণ। এই কারণেই আমরা বহু সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি এবং আমাদের দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।

মালেমা-র ভিত্তিতে আমাদের ধারণা ও উপলদ্ধির সঠিক দিকগুলো

১। আমরা নির্দিষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলাম যে, আমাদের পথনির্দেশক তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে—মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সে তুঙ চিন্তাধারা [সে সময় মাওবাদকে এভাবেই বলা হত]। সেই সঙ্গে আমরা আরো ঘোষণা করেছিলাম যে, কমরেড চারু মজুমদারের শিক্ষাকে না-মানলে পূর্ব বাংলার নির্দিষ্ট অবস্থায় মাও-চিন্তাধারাকে প্রয়োগ করা যায় না। আর চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শিক্ষাকে না-মানলে আজকের যুগে কমিউনিস্টই থাকা যায় না। এভাবে আমরা সবচেয়ে অগ্রসর মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সঠিক মতাদর্শিক-রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

২। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার আলোকে আমরা আমাদের সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের মূল সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করে মূলত একটা সঠিক বিপ্লবী রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ করেছিলাম। তার মূল অংশগুলো—

ক) পূর্ব বাংলার সমাজ ব্যবস্থা আধা-সামন্ততান্ত্রিক—আধা-ঔপনিবেশিক, আর রাষ্ট্রের চরিত্র নয়া-ঔপনিবেশিক।

খ) আমাদের সমাজের চারটে মৌলিক দ্বন্দ্ব হল—১. মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সঙ্গে সমগ্র জাতির দ্বন্দ্ব; ২. সামন্তবাদের সঙ্গে ব্যাপক কৃষক জনতার দ্বন্দ্ব; ৩. পুঁজিপতিদের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব; ৪. শাসক শ্রেণীগুলোর নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এই চারটে মৌলিক দ্বন্দ্বের মধ্যে সামন্তবাদের সঙ্গে ব্যাপক কৃষক জনতার দ্বন্দ্বই পূর্ব বাংলার সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের সমাধানই পূর্ববাংলার জনগণকে অন্যান্য মৌলিক দ্বন্দ্বগুলোর সমাধানের পথে নিয়ে যাবে।

গ) পূর্ব বাংলার বিপ্লবের লক্ষ্য বা মূল করণীয় কাজ—সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সামন্তবাদ, ও আমলা-মুৎসুদ্দি  পুঁজিবাদ—এই পাঁচ পাহাড়ের [৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের ফলে বর্তমানে এটা চার পাহাড়ে পরিণত হয়েছে] শাসন ও শোষণকে উচ্ছেদ করা অর্থাৎ বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নকে উচ্ছেদ করে জাতীয় বিপ্লব সম্পন্ন করা এবং দেশীয় সামন্তবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা। এই দুটো কাজ পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত আবার পৃথকও।

ঘ) এই বিপ্লবের চালিকাশক্তিগুলো কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। নেতৃত্বশক্তি হচ্ছেন শ্রমিক শ্রেণী। প্রধান শক্তি হচ্ছেন কৃষক শ্রেণী। [কৃষক শ্রেণী বলতে মূলত ভূমিহীন-, গরিব- ও মাঝারি- কৃষককেই বুঝান হয়।] এর মধ্যে ভূমিহীন ও গরিব কৃষক হচ্ছেন সবচেয়ে নির্ভর যোগ্য মিত্র ও বিপ্লবের প্রধান বাহিনী। মাঝারি কৃষক হচ্ছেন দৃঢ় মিত্র। ধনী কৃষকের এক অংশকে পক্ষে টানা যায়, এক অংশ নিরপেক্ষ থাকে এবং ক্ষুদ্র এক অংশ শত্রুর পক্ষ অবলম্বন করতে পারে। শহরের পাতি বুর্জোয়াশ্রেণী ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা হচ্ছেন বিপ্লবী শক্তি এবং এদের সুবিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হচ্ছেন বিপ্লবের নির্ভরযোগ্য মিত্র। মাঝারি বুর্জোয়া শ্রেণী, ব্যবসায়ী শ্রেণী ও বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দোদুল্যমান মিত্র। এরা কখনো বিপ্লবকে সমর্থন করে, কখনো বিরোধিতা করে, এমনকি বিশ্বাসঘাতকতাও করে। বিপ্লবের ক্ষেত্রে এদের এই ভূমিকার কারণ হচ্ছে বিপ্লবের শত্রুদের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব ও ঐক্য।

ঙ) এদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব পুরনো গণতান্ত্রিক বিপ্লব নয়—পুরনো গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিত বুর্জোয়া শ্রেণী, প্রতিষ্ঠা করত বুর্জোয়া একনায়কত্ব এবং সেই বিপ্লব ছিল বুর্জোয়া বিশ্ব বিপ্লবের অংশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও মহান অক্টোবর বিপ্লবের পর পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর বুর্জোয়া শ্রেণী ইতিহাসের ঐ মহান দায়িত্ব পালন থেকে সরে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের দালালে পরিণত হয় এবং শ্রমিক শ্রেণীর উপর এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। তাই এই গণতান্ত্রিক বিপ্লব নতুন গণতান্ত্রিক বিপ্লব, এর নেতৃত্ব দেবে শ্রমিক শ্রেণী, প্রতিষ্ঠা করবে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-পাতিবুর্জোয়া এমনকি মাঝারি বুর্জোয়াদের বিপ্লবী যুক্তফ্রন্টের যৌথ গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব, যা হচ্ছে জন-গণতন্ত্র। যখন সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কৃষক ঐক্য স্থাপিত হবে, স্বাধীনতা ও উদ্যোগ নিজেদের হাতে থাকবে এবং দেশের কিছু অংশে লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে কেবলমাত্র তখনই এই যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা যেতে পারে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ [মালেমা] আমাদের শিক্ষা দেয়, যে কোনো বিপ্লবের মূল প্রশ্ন হল—কোন শ্রেণী বা শ্রেণীগুলোর কাছ থেকে কোন শ্রেণী বা শ্রেণীগুলো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করছে। সেই কারণে বিপ্লবে কারা আমাদের প্রকৃত শত্রু এবং কারা প্রকৃত বন্ধু—এই প্রশ্নের সন্দেহাতীত সমাধান হওয়া প্রয়োজন। মালেমা দ্বারা পরিচালিত হয়ে আমাদের পার্টি এই প্রশ্নের সমাধান যথেষ্ট সঠিকভাবেই করেছে। একথা দাবি করা অন্যায় হবে না যে, এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এই প্রশ্নগুলো সন্দেহাতীতভাবে ও সুস্পষ্টভাবে সমাধান করা হয়েছে। [যদিও বিপ্লবী গণক্ষমতা ও যুক্তফ্রন্ট কোনটা কার পূর্বশর্ত এই প্রশ্নটা এখনো মীমাংসিত হয় নি।]

৩। বিপ্লবের লক্ষ্য ও চালিকাশক্তি সঠিকভাবে নির্ধারণ করার পর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল রাজনৈতিক ক্ষমতা কোন পথে দখল হবে তা স্থির করা। এই প্রশ্নেও আমাদের পার্টি মালেমা দ্বারা পরিচালিত হয়ে মূলত সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। সংসদীয় নির্বাচনের পথকে দৃঢ়ভাবে বর্জন করেছিল। জোর দিয়ে বলেছিল, “সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সশস্ত্র পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সর্বপ্রধান রূপ হচ্ছে অবশ্যই সশস্ত্র সংগ্রাম। সুতরাং সশস্ত্র সংগ্রাম, বিপ্লবী যুদ্ধ ও সেনাবাহিনী গঠনের কাজকে জোরদার করতে হবে। এর সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার প্রশ্নকে সম্মুখে রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে জয়যুক্ত করতে হলে অনগ্রসর গ্রাম এলাকাগুলোকে জনগণের সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিরাট বিপ্লবী দুর্গে পরিণত করতে হবে।” পরবর্তীতে বিএসডি(এমএল)-এর সঙ্গে আলোচনার সময় পার্টি বলেছিল, “রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে কমিউনিস্টদের সামনে দুটি উপায় আলোচিত হয়ে থাকে। এক, অভ্যুত্থানভিত্তিক ক্ষমতা দখল; দুই, এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখল। লক্ষণীয় যে, দুটো উপায়ের মধ্যেই অপরটির অস্তিত্ব বিদ্যমান। ‘ভিত্তিক’ শব্দটা তাই প্রমাণ করে। কিন্তু এটা ঠিক যে, প্রধান গতিধারা একটাই থাকে—হয় অভ্যুত্থানভিত্তিক, নয় এলাকাভিত্তিক। আমাদের সামনে দুটো পদ্ধতিরই উদাহরণ রয়েছে। লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টি মূলত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল। আবার মাও সে-তুঙের নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করেছিল মূলত এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে।

আমাদের দেশে আমরা ক্ষমতা দখলের পদ্ধতির যে রূপটি প্রযোজ্য বলে মনে করি তা হল মূলত এলাকাভিত্তিক। এখানে কি চীনে অনুসৃত এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের পথটি পুরোপুরি অনুসরণযোগ্য? না, তা নয়। চীনে অনুসৃত পথ মূলত অনুসরণ করলেও আমাদের দেশের বিশেষ অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে…। চীন একটা বিশাল দেশ, সে তুলনায় পূর্ব বাংলা একটা অতি ক্ষুদ্র দেশ। চীনের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে পূর্ব বাংলার প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের তেমন কোনো মিল নেই। এ-ছাড়াও সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলরা পূর্বের তুলনায় বিপ্লব বিরোধিতার ক্ষেত্রে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছে। এই সমস্ত বিষয়গুলোর দিকে নজর রেখেই আমাদের এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের পদ্ধতি গড়ে উঠেছে এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিশেষ সিদ্ধান্তাবলী গ্রহণ করতে হয়েছে। …এক, গ্রামাঞ্চলগুলোতে ঘাঁটি এলাকা গড়ে তুলতে হবে, একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে পার্টির কাজ-কর্মের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। দুই, আমাদের দেশে ‘স্থায়ী ঘাঁটি এলাকা’ গড়ে উঠার সম্ভাবনা খুবই অল্প। অধিকাংশ ঘাঁটি এলাকার চরিত্র হবে অস্থায়ী, যা বারবার হাত বদলের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হতে থাকবে। এর মধ্য দিয়েই গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার নীতিকে কার্যকরী করতে সচেষ্ট হতে হবে। একই সঙ্গে শহরে শত্রুকে আঘাত করার মধ্য দিয়ে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে ফেলতে হবে। এক পর্যায়ে গ্রামাঞ্চল ও শহরে যুগপৎ অভ্যুত্থানই ক্ষমতা দখল সম্ভব করে তুলবে। তিন, গ্রামাঞ্চলের ঘাঁটি এলাকাগুলোকে পরিণত করতে হবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দুর্গে। মুক্ত গ্রামাঞ্চলগুলোতে স্থাপন করতে হবে বিপ্লবী সরকার, যা গ্রাম পর্যায় থেকে শুরু হবে বিপ্লবী কমিটি গঠন মারফত। বিপ্লবী সরকার মারফত গ্রামাঞ্চলগুলোর শাসন ক্ষমতা দখল এবং ‘লাঙ্গল যার জমি তার’ ভিত্তিতে জমির বিলি বণ্টন ও অন্যান্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক কার্যকলাপ পরিচালনাই হবে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের রূপ। গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা ও জেলা -ভিত্তিক আঞ্চলিক ও দেশব্যাপী বিপ্লবী সরকার পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলতে হবে।” [আন্ডার লাইনগুলো এই লেখার সময় দেওয়া হয়েছে]

[যদিও সেই সময় এক পর্যায়ে বলতে কোন পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে সেটা স্পষ্ট করা হয় নি। আমাদের পরবর্তী উপলব্ধির বিকাশ দেখিয়ে দিয়েছে, পর্যায়টা হচ্ছে রণনৈতিক আক্রমণের পর্যায়ের শেষ পর্ব। অর্থাৎ রণনৈতিক প্রতিরক্ষা, রণনৈতিক ভারসাম্য, এমনকি রণনৈতিক প্রতিআক্রমণের পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি পর্বের পূর্ব পর্যন্ত এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের দীর্ঘমেয়াদী গণযুদ্ধের পথেই আমাদের কৃষি বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালিত হবে। চূড়ান্তভাবে ক্ষমতা দখলটাই কেবল গ্রাম-শহর যুগপৎ অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে হবে।

কেন এরকম ভাবা হয়েছে? সে সম্পর্কে পিবিএসপি(এমবিআরএম)-এর একটা পর্যবেক্ষণ উল্লেখযোগ্য, আমাদের দেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর উল্লেখ করতে গিয়ে তাঁরা বলেছেন, “আমাদের দেশটা ছোট, ঘনবসতি[পূর্ণ], জনসংখ্যার প্রধান অংশের প্রায় একই ভাষা, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল সাংস্কৃতিকভাবে প্রায় সমবিকশিত, অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক-পারিবারিক বন্ধন প্রভৃতি কারণে বিভিন্ন জেলার লোকদের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে-জড়িয়ে থাকা, জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার উন্নত মান, সমগ্র দেশের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রভৃতি বহুবিধ কারণে আমাদের দেশের বিপ্লবী যুদ্ধের যেকোনো স্ফুলিঙ্গ শত্রুপক্ষের হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দ্রুতই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দেশব্যাপী অভ্যুত্থানের পরিস্থিতির ভিত্তি যোগায়। ফলে গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী যুদ্ধের বিকাশের প্রক্রিয়ায় এই ভিত্তিগত অনুকূলতা বারবার কাজে লাগিয়ে শত্রুপক্ষকে অধিক থেকে অধিকতর দুর্বল এবং নিজেদেরকে অধিক থেকে অধিকতর সবল করা যায়। এবং তা রণনৈতিক আক্রমণের স্তরে আমাদের কর্তৃক দেশব্যাপী ক্ষমতা দখলকে সহজতর ও দ্রুততর করবে।” এর আগে তাঁরা আরো উল্লেখ করেছেন, “আমাদের দেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিত্তিতে আমাদের গেরিলা যুদ্ধের সংগ্রাম ও গেরিলা যুদ্ধের সংগঠন গড়ে উঠবে, টিকে থাকবে ও বিকশিত হবে। সেজন্য বিপ্লবী যুদ্ধের পক্ষে ইতিবাচক ও সহায়ক বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে এবং সেসবের উপর আমাদের নির্ভর করতে হবে। এ-ক্ষেত্রে আমাদের অব্যাহতভাবে অধ্যয়ন ও গবেষণা করতে হবে এবং জনগণের সৃজনশীল শক্তির উপর ভিত্তি গাড়তে হবে।” (পৃষ্ঠা—৭০, লালঝান্ডা—১) ]

উল্লিখিত পর্যবেক্ষণ ও গেরিলা যুদ্ধের রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণে উল্লিখিত মাওবাদী কর্মনীতিকে একসূত্রে গেঁথে চিন্তা করলেই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতা দখলের পর্বে দেশব্যাপী গ্রাম-শহর যুগপৎ অভ্যুত্থানের রণনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যায়।

৪। আমাদের পার্টি শুধু সাধারণভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ নির্ধারণ করেছিল তাই নয়, আরো সুনির্দিষ্টভাবে একটা সুস্পষ্ট সামরিক লাইনও হাজির করেছিল। পার্টি বলেছিল, “পূর্ব বাংলার মুক্তির পথ হল জনযুদ্ধের পথ। শ্রমিক শ্রেণী একটা সফল জনযুদ্ধ চালাতে পারে সমস্ত দেশজুড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের ছোট ছোট ঘাঁটি তৈরি কওে এবং একমাত্র গেরিলা যুদ্ধের বিকাশ সাধন করেই এই কাজ সম্ভব। আমাদের দেশের বিশেষ অবস্থায় শ্রেণী সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত শ্রেণীশত্রু খতম হল গেরিলা যুদ্ধের সূচনা এবং এই গেরিলা যুদ্ধ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের গোটা যুগ ধরে সংগ্রামের মূলরূপ হিসেবে রয়েছে এবং থাকবে। চেয়ারম্যান মাও দেখিয়েছেন যে, শত্রুর বিরুদ্ধে জনগণের সমগ্র শক্তিকে সমাবেশ ও প্রয়োগ করার জন্য গেরিলা যুদ্ধই হচ্ছে একমাত্র উপায়। একমাত্র গেরিলা যুদ্ধই পারে পূর্ব বাংলার জনগণের সৃজনী প্রতিভার দ্বার খুলে দিতে, যার ফলে তাঁরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারবেন, পারবেন বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে, কার্যকরীভাবে সেই সমস্ত কাজের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে, এইভাবে তাঁরা সংগ্রামের ছোট ছোট ঘাঁটিগুলোকে বিস্তৃত করে জনযুদ্ধের প্রচন্ড ঢেউ সৃষ্টি করতে পারবেন, গড়ে তুলবেন গণফৌজ, এর দ্বারা গ্রামাঞ্চলে পাঁচ পাহাড়ের প্রতিক্রিয়াশীল শাসনকে উচ্ছেদ করা হবে, শহরগুলোকে ঘিরে ফেলে দখল করে নেওয়া হবে এবং সমগ্র দেশে জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব কায়েম করে, দৃঢ়তার সঙ্গে তাকে সর্বহারা একনায়কত্ব ও সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অনিবার্য পরিণতি।’ ” এটাও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে সম্ভবত প্রথম ঘটনা যখন মালেমা প্রয়োগ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে সামরিক লাইনের প্রশ্নে এত স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। [যদিও এখানে গণযুদ্ধ ও গেরিলা যুদ্ধকে সমার্থক হিসেবে দেখা হয়েছিল অর্থাৎ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের গোটা যুগ ধরে কেবল গেরিলা যুদ্ধই নয় বরং বিকাশের প্রক্রিয়ায় যুদ্ধের স্তর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গণযুদ্ধের আরো দুটো রূপ—চলমান যুদ্ধ ও অবস্থানগত যুদ্ধও যে যুদ্ধের প্রধান রূপ হয়ে উঠবে তা উপলব্ধির বাইরে থেকে গিয়েছিল।]

৫। আমাদের পার্টি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল যে, মতাদর্শগত-রাজনৈতিক ফ্রন্টে বিশ্বব্যাপী সংশোধনবাদ হচ্ছে প্রধান বিপদ। তাই সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে সংগ্রাম না-করে পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এক পাও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তীব্র মতাদর্শিক-রাজনৈতিক সংগ্রামের ভিতর দিয়ে প্রকাশ্য পার্টি ও সংসদীয় নির্বাচনের পথ এবং প্রকাশ্য সংশোধনবাদী গণ-সংগঠন ও গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পথ পুরোপুরি বর্জন করে গোপন পার্টি ও সশস্ত্র সংগ্রামের পথ এবং বেআইনি জঙ্গি গণসংগঠন ও গণআন্দোলন গড়ে তোলার পথকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল।

৬। স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, একমাত্র তাঁদের রাজনৈতিক পার্টি পূবাকপা(এমএল) মারফত শ্রমিক শ্রেণী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের উপর তাঁদের নেতৃত্ব কায়েম করতে পারে এবং তাঁরা করবেনও তাই। এ-ছাড়া শ্রমিক শ্রেণী তাঁদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্নে সংগ্রাম করে, অন্যান্য শ্রেণীসমূহের সমর্থনে প্রধানত কৃষক শ্রেণীর বিপ্লবী সংগ্রামগুলোর সমর্থনে সংহতিমূলক সংগ্রাম গড়ে তুলে এবং গ্রামাঞ্চলে কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রাম সংগঠিত করে এবং সেই সংগ্রামে নেতৃত্ব করার জন্য নিজ শ্রেণীর শ্রেণীসচেতন ও অগ্রগামী কর্মীদের গ্রামে পাঠিয়ে।

৭। বহুজাতিসত্ত্বা-অধ্যুষিত একটা দেশে বিভিন্ন জাতিসত্ত্বাগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব গণতান্ত্রিকভাবে নিরসন করে তাঁদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা ছাড়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হতে পারে না। বর্তমান যুগে বিশ্বের সমস্ত পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর গণতান্ত্রিক বিপ্লব মহান বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হওয়ার ফলে আমাদের মতো বহুজাতিসত্ত্বা-অধ্যুষিত দেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের একমাত্র কর্তব্য হল সমস্ত জাতিসত্ত্বাসমূহের বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করে নেওয়া এবং সকল জাতিসত্ত্বার ভাষাকে সমমর্যাদা দান করা। যাতে তাঁদের প্রত্যেককে সাধারণ শত্রু সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করা যায় এবং পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য তাঁরা কোন পথে যাবেন তা নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করা যায়। আমাদের পার্টি ওই নীতিকে সমর্থন জানিয়েছে এবং লড়াইরত পাহাড়ী জাতিসত্ত্বাসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছে।

৮। সশস্ত্র সংগ্রামকে শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে আটকে না-রেখে আমরা তাকে বাস্তব প্রয়োগেও নিয়ে গিয়েছিলাম। নানান সীমবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েই বলা যায়, পার্টি দেশের বিভিন্ন অংশে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করেছিল, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সশস্ত্র সংগ্রামকে পার্টি সীমিত পরিসরে হলেও রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে পরিচালিত করেছিল—থানা ক্যাম্পের উপর আক্রমণ করে অস্ত্র দখল করেছিল, স্থানীয় শ্রেণীশত্রুদের অস্ত্র দখল করেছিল, বিপ্লবী কৃষক কমিটি গঠন করে—শ্রেণীশত্রুদের ফসল দখল করেছিল, ভূমি দখল করে ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করেছিল, ইজারাদারি প্রথা উচ্ছেদ করেছিল, গণআদালত করে বিভিন্ন অপরাধীদের বিচার করেছিল ইত্যাদি। এই ঘটনাগুলোর তাৎপর্যকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। অন্তত কিছু অঞ্চলের শোষিত মানুষ তাঁদের নিজস্ব ক্ষমতার প্রাথমিক রূপের স্বাদ গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাসে এ এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

৯। ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়ে যাওয়ার পর ছাত্র-যুবকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। পার্টি তাঁদেরকে ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম করার উদ্যেগ গ্রহণ করেছিল। তাঁরা আমাদের পার্টির পতাকাতলে এসে অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করে ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে লেগে পড়ে থেকে তাঁদেরকে সংগঠিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করে গিয়েছেন। আমরা সচেতনভাবে চেষ্টা করেছিলাম যত বেশি সম্ভব ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্য থেকে আসা জঙ্গি কর্মীদের আমাদের সশস্ত্র স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করার এবং তাঁদের মধ্য থেকেই স্কোয়াড কমান্ডার গড়ে তোলার; এবং মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী কমরেডদের করেছিলাম স্কোয়াডের পলিটিক্যাল কমিশার। এইভাবে ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের জন্য স্কোয়াডের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পথ খুলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাঁদের শ্রেণীঘৃণা একই রকম তীব্র থাকে এবং উদ্যোগ ও আত্মবিশ্বাসের উন্নতি ঘটে। সুতরাং আমরা এটা দাবি করতে পারি যে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথমবারের মতো আমাদের সমাজের মূল শ্রেণীগুলোর সঙ্গে একাত্ম হওয়া ও ব্যাপকভাবে তাঁদের মধ্যে যাওয়ার জন্য এই শ্রেণীগুলোর মধ্য থেকে পার্টি ও স্কোয়াডে সর্বহারা নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার সচেতন প্রয়াস করা হয়েছিল, তা সে প্রয়াস যতই ত্র“টিপূর্ণ হোক না কেন।

১০। আমাদের দেশের নির্দিষ্ট অবস্থায় আমরা পার্টি গঠনের লেনিনীয় সাংগঠনিক নীতি প্রয়োগ করে, শ্রেণী সংগ্রামে পোড় খাওয়া সংগ্রামীদের নিয়ে, গোপন পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার সচেতন প্রয়াস চালিয়েছিলাম, যে প্রয়াসে আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম ক্ষমতা দখলের রাজনীতিকে এবং জোর দিয়েছিলাম বিপ্লবী অনুশীলন, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং গ্রামাঞ্চলে গরিব ও ভূমিহীন কৃষকের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার উপর। এই বিপ্লবী কর্মপদ্ধতি প্রকাশ্য ও আইনী পার্টিগুলোর সংশোধনবাদী কর্মপদ্ধতির সঙ্গে আমাদের পার্টির সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখা টেনে দিয়েছিল।

প্রথমে চার বছর (৭১-৭৪), তারপর পনের বছরের বিরতি দিয়ে আবার পনের বছর (১৯৯০-২০০৪) এই মোট (প্রায়) দুই দশকের সংগ্রামে আমাদের উপলদ্ধি ও প্রয়োগের এগুলো হল ইতিবাচক দিক। এগুলো দেখিয়ে দেয় পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে আমরা যে সাধারণ দিশায় পরিচালিত করেছিলাম তা যথেষ্ট সঠিক এবং মালেমা-সম্মত ছিল। এই কারণে পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক বিপ্লবে এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। যার ফলে—

১)   সংশোধনাবাদী পথের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব হয়েছে এবং একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর ভিত কেঁপে উঠেছে।

২)   পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সশস্ত্র সংগ্রাম এমন এক প্রসঙ্গ হিসেবে এসেছে যাকে আর গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সংগ্রামের প্রতি আগ্রহী প্রত্যেকে এই বিপর্যয়ের মধ্যেও সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনাকারী পার্টি হিসেবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের মতামত জানানো এবং আমাদের মতামত জানার চেষ্টা করছেন।

৩)   যেসব অঞ্চলগুলোতে সংগ্রাম কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, সেখানে এখন আর জনগণের মুক্তির পথ হিসেবে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে না, হচ্ছে এই সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে আমরা যে রণনীতি ও রণকৌশল অনুসরণ করেছিলাম তা কতখানি বিজ্ঞানসম্মত ছিল বা কী করলে তা বিজ্ঞানসম্মত হয়ে উঠত তা নিয়ে। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আমাদের পরিচালিত এই সশস্ত্র সংগ্রাম শোষিত জনগণ ও সাধারণ যুবকদের চিন্তায় এক বিপ্লবী পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

৪)   সংগ্রামী অঞ্চলের জনগণ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পোড় খেয়েছেন। সংগ্রামের মধ্যে এবং পার্টির মধ্যে যে সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি ঢুকে পড়েছিল তা থেকে আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া দরকার সে ব্যাপারে আমাদেরকে উপদেশ ও পরামর্শ দিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় সমালোচনা করছেন। লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে জনগণের পরামর্শ মতো বিপ্লবী কর্মীরা আগের চেয়ে উচ্চস্তরে সংগ্রামকে উন্নীত করার ব্যাপারে  চিন্তাভাবনা করছেন, পরিকল্পনা করছেন এবং প্রস্তুত হচ্ছেন।

৫)   যে সমস্ত কার্যকলাপের ফলে পার্টি কর্মীদের মধ্যে নৈতিক অধঃপতন দেখা দিয়েছিল এবং যার ফলে একটা মাত্রায় সংগ্রামী জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা ঘটেছিল, বিপ্লবী কর্মীরা ইতোমধ্যে সে সমস্ত কার্যকলাপ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার দৃঢ় ও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উৎপাদনশীল শ্রমের কঠোর প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে জনগণের সঙ্গে আবারো একাত্ম হচ্ছেন। জনগণের উপদেশ, পরামর্শ ও সমালোচনাই এই একাত্মতার প্রতিফলন।

৬)   প্রচন্ড দমন-পীড়নের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বুর্জোয়া, পাতি বুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী নেতৃত্বের নির্দেশকে উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক দাবির আন্দোলনগুলো জঙ্গি রূপ ধারণ করছে। বিচ্ছিন্নভাবে ধরলে—বিদ্যুতের দাবিতে কানসাটের আন্দোলন, ফুলবাড়ির উম্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন, শনির আখড়ার আন্দোলন, খুলনার পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলন; আর নিয়মিতভাবে ধরলে—গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন এর উদাহরণ। এগুলোকে শুধুমাত্র দেশব্যাপী বিপ্লবী পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখলেই চলবে না বরং এগুলোকে বুর্জোয়া, পাতি-বুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বেঁধে দেওয়া গন্ডি ছাড়িয়ে এ-দেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক বিপ্লবী শক্তিগুলোর সংগ্রাম যে, সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনাকারী পার্টির মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর সচেতন নেতৃত্ব দাবি করছে এবং সংহতিমূলক আন্দোলনের ভিতর দিয়ে সমস্ত বিপ্লবী শ্রেণীগুলোর দেশব্যাপী বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার সম্ভাব্যতার বাস্তব ভিত্তি যোগাচ্ছে—সেভাবেও দেখতে হবে।

৭)   বিশেষ করে প্রতিক্রিয়াশীলদের নগ্ন ফ্যসিস্ট হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে সারা দেশে পূবাকপা(এমএল)(আরএফ)সহ সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনাকারী অন্যান্য মাওবাদী পার্টিগুলোর মর্যাদা ও প্রভাব বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণ এই সমস্ত পার্টিগুলোকে বীরত্বপূর্ণ পার্টি হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। ফলে বিপর্যয় যেমন পার্টিগুলোর সামনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে তেমনি নতুনভাবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে।

বিগত চার দশকের মধ্যে বিচ্ছিন্ন কয়েকটা প্রচেষ্টায় দুই দশকব্যাপী পূর্ব বাংলার সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামের যে ফলাফলগুলোর কথা এখানে তুলে ধরা হল সেগুলো কোনো সামান্য সাফল্য নয়। বরং সেগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এগুলো পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

আমাদের ব্যর্থতা

কোনো দেশের বিপ্লবের সাফল্য নির্ভর করে সেই দেশের বিপ্লবের অগ্রণী বিপ্লবী শ্রেণী বিপ্লবের লক্ষ্যে যে সাধারণ দিশা অনুসরণ করছে তার সঠিকতা বা বেঠিকতার উপর। সাধারণ দিশার সঠিকতার অর্থ—কোন শ্রেণী বা শ্রেণীগুলো কোন শ্রেণী বা শ্রেণীগুলোর কাছ থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছে, কারা সেই বিপ্লব পরিচালনা করছে, কারা বিপ্লবের প্রকৃত শত্রু আর কারা প্রকৃত মিত্র, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পথ কী—ইত্যাদি প্রশ্নকে মালেমা-র আলোকে সমাজ বিকাশের নিয়ম অনুযায়ী সমাধান করা। বিপ্লবের সাফল্য প্রধানত নির্ভর করে নেতৃত্বদানকারী শ্রেণীর এই প্রশ্নগুলো সঠিকভাবে উপলদ্ধি করার উপর।

সেই সঙ্গে এটাও ঠিক যে, বিপ্লবের সাফল্যের জন্য শুধুমাত্র সাধারণ দিশার সঠিকতাই যথেষ্ট নয়। বিপ্লবের সাফল্য মূলত নির্ভর করে নির্দিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সাধারণ দিশার সঠিক প্রয়োগের উপর। আর এই সঠিক প্রয়োগ নির্ভর করে বাস্তবে তার জন্য সঠিক নীতি ও কর্মপদ্ধতি রূপায়নের উপর। এই শর্ত পূরণ করতে না-পারলে বিপ্লবকে অবর্ণনীয় ক্ষতি স্বীকার করা লাগতে পারে, এমনকি বিপ্লব পুরোপুরি ব্যর্থও হতে পারে। বিগত তিন দশকে সমাজ বিপ্লবের চরিত্র ও সাধারণ দিশা সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা ও মূল্যায়ন গড়ে উঠেছে তা মূলত সঠিক এবং মালেমাসম্মত হলেও সেই সাধারণ দিশা বাস্তবে সঠিকভাবে প্রয়োগের জন্য যে সঠিক নীতি নির্ধারণ ও কর্মপদ্ধতি রূপায়ণের প্রয়োজন ছিল সেই ক্ষেত্রে আমরা বেশ কিছু মারাত্মক ভুল করেছি এবং তা শুধরাতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে ফেলেছি। ফলে বিপ্লবের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে।

স্তালিন বলেছিলেন, “মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব আয়ত্ব করার অর্থ হল—এই তত্ত্বের বিষয়বস্তুকে আহরণ করা এবং সর্বহারা শ্রেণী সংগ্রামের বিভিন্ন অবস্থায় বিপ্লবী আন্দোলনের বাস্তব সমস্যাগুলো  সমাধান করতে শেখা। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব আয়ত্ব করার অর্থ হল—বিপ্লবী আন্দোলনে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন ধারণা, নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করতে পারা বা অন্যভাবে বললে, দ্ব্যর্থহীনভাবে সেকেলে হয়ে পড়া ধারণা বা সিদ্ধান্তগুলোকে নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতি অনুযায়ী পাল্টে নিয়ে তাকে বিকশিত করতে ও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারা।”

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী তত্ত্বের বিষয়বস্তুর উপর সঠিকভাবে গুরুত্বারোপ করার পরও আমরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উপর এবং আজকের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশের উপর যথেষ্ট মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। আর এইভাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম। বস্তুতপক্ষে তত্ত্বের উপর জোর দেওয়ার প্রত্যেকটা প্রচেষ্টার উপর ‘তাত্ত্বিক কচ্কচির’ ছাপ মেরে তাত্ত্বিক কাজকেই হালকা করে দিয়েছিলাম। ফলে আমাদের দেশের সমৃদ্ধ বিপ্লবী অভিজ্ঞতাগুলোকে আমরা তত্ত্বের স্তরে উন্নীত করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। এই ব্যর্থতার মূল নিহিত রয়েছে বিপ্লবী মতাদর্শিক-রাজনৈতিক লাইনকে সঠিকভাবে উপলদ্ধি ও প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে।

যে সব গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো আমরা করেছিলাম তার কিছু এসেছিল সিএম-লাইনকে আত্মস্থ করে আমাদের দেশের নির্দিষ্ট অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে তাকে প্রয়োগ না-করে তাকে হুবহু প্রয়োগ করতে গিয়ে; আর কিছু এসেছিল আমাদের নিজস্ব প্রয়োগের বাস্তবতা থেকে। এই কারণে সিএম শহিদ হওয়ার পর বহুধা বিভক্ত সিপিআই(এমএল)-এর মধ্য থেকে যে সঠিক বিপ্লবী ধারাগুলো সশস্ত্র সংগ্রাম ও অন্যান্য গণসংগ্রামগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে তাঁদের আত্মসমালোচনামূলক রিপোর্টে যে সমস্ত ভুলত্রুটির উল্লেখ রয়েছে আমাদের বেশ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি আশ্চর্যজনকভাবে সেগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। তাই আমরা এখানে একই ধরনের ভুলত্রুটির আত্মসমালোচনায় তাঁদের মূল্যায়নের যতটুকু আমাদের ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য সেগুলোকে অসংকোচে আমাদের মূল্যায়ন হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছি।

এখন আমরা একে একে বিচ্যুতিগুলো ও তার পিছনের সম্ভাব্য কারণগুলো উল্লেখ করব।

১। রণকৌশলের দিক থেকে শত্রুকে দুর্বল হিসেবে দেখার ভুল

বিপ্লবের কোনো একটা পর্যায়ে রণকৌশল নির্ধারণের ভিত্তি স্থাপিত হওয়া উচিত বিপ্লবের সেই পর্যায়ে মুখোমুখি অবস্থানরত দুই পক্ষের তুলনামূলক শক্তি ও দুর্বলতার বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক পর্যালোচনার উপর। কিন্তু আমরা আমাদের ও শত্রুর অবস্থানের শক্তি ও দুর্বলতার   বাস্তবানুগ মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমাদের রণনীতি ও রণকৌশল অর্থাৎ সংগ্রামের রূপ, সংগঠনের রূপ ইত্যাদি নির্ধারণ না-করে, শত্রুর পরাজয়ের কাল্পনিক বিশ্বাসের উপর দৃঢ়ভাবে নির্ভর করেছিলাম। ভারতীয় পার্টির আত্মসমালোচনামূলক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, সিএম পরিচালিত ভারতীয় পার্টিও এই একই ভুল করেছিল। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন—“যুগের চরিত্র বুঝতে আমরা ভুল করেছিলাম, ১৯৬০ সালে অনুষ্ঠিত ৮১টি কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টির মস্কো সম্মেলন বলেছিল, ‘এটা হল সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত পতনের যুগ এবং সমাজতন্ত্রের বিশ্ব বিজয়ের যুগ।’ বিশ্বের সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিই এই মূল্যায়ন স্বীকার করে নিয়েছিল। আমরা একে ঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যুগের চরিত্রেরই একটা গুণগত পরিবর্তন হয়েছে এবং সেই কারণে লেনিনের যুগের কৌশল সেকেলে হয়ে গেছে; যদিও এটা সত্যি যে, রণনৈতিকভাবে শক্তির ভারসাম্য সমাজতন্ত্রের অনুকূলে পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম রণকৌশলের দিক থেকেও একই পরিবর্তন হয়েছে। … আমরা ভেবেছিলাম বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শেষ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং এই সময় বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদকে চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে। … এই কারণেই উক্ত ভুল করেছিলাম। … এই ভুল মূল্যায়নের যন্ত্রণাদায়ক ফলাফলগুলো সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বারবারই সামনে এসেছে। ‘… চীনের চিংকাং পাহাড়ে তিন লক্ষ সৈন্যবাহিনী ঘেরাও-দমননীতি চালাতে পেরেছিল। … আজকে শ্রীকাকুলামের সশস্ত্র লড়াই ব্যর্থ করার জন্য ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পক্ষে তিন লক্ষ কেন, পঞ্চাশ লক্ষ সৈন্যবাহিনী দিয়েও ঘেরাও দমন-চালানো সম্ভব নয়।’ ‘১৯৭৫ সালের মধ্যেই ভারত বর্ষের কোটি কোটি জনতা মুক্তির মহাকাব্য রচনা করবেন।’  আমাদের এই ধরনের সমস্ত মূল্যায়ন হল এই ভুল ধারণার ফসল। এই কারণে মুখে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের কথা বললেও বাস্তবে এগুলো দ্রুত বিজয়ের লক্ষ্যে ভুল নীতি ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতেই সাহায্য করেছে।

“আমরা এখনো লেনিনের যুগে বাস করছি এবং সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের লেনিন নির্দেশিত রণনীতি ও রণকৌশল এখনো কার্যকরী।”

এই ধরনের ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে ত্বরিত বিজয়ের লক্ষ্যে ‘বামপন্থি’ বিচ্যুতি চীনা পার্টিও করেছিল। ১৯৪৫ সালে পার্টি ইতিহাসের মূল্যায়নে চীনা পার্টিই লিখেছে তাঁদের পার্টিতে তিনবার ‘বামপন্থি’ লাইন প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। এই ‘বামপন্থি’ লাইন বহু ভুলভ্রান্তির মাধ্যমে চীন বিপ্লবে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ডেকে এনেছিল। কিভাবে এই ‘বামপন্থি’ লাইনগুলো উদ্ভব হয়েছিল, কী কী ভুলের পথে পার্টিকে নিয়ে গিয়েছিল, পরাজিত করার পরও কেন বারবার নতুন রূপে ফিরে এসেছিল—সে সব জানা আমাদের জন্য জরুরি। কিন্তু এই পরিসরে সেটা সম্ভব নয়। অন্যত্র সে চেষ্টা আমরা করব। তবে এই ভুলের সামাজিক উৎসটা অন্তত এখানে আমরা চিনে নেব।

চীনা পার্টি লিখেছে, “কমরেড মাও সেতুঙ যে সঠিক লাইনের প্রতিভূ তাতে যেমন ফুটে উঠেছে শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রসর অংশের ভাবাদর্শ, তেমনি ‘বামপন্থি’ লাইনে ফুটে উঠেছে চীনের পাতিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের ভাবাদর্শ। আধা-ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক চীন বিপুলসংখ্যক পাতিবুর্জোয়া অধ্যুষিত একটা দেশ। শুধু যে আমাদের পার্টি এই বিশাল সামাজিক স্তর দ্বারা চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ তাই নয়, পার্টির মধ্যেও অধিকাংশ সদস্যই হচ্ছেন পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী থেকে উদ্ভূত লোকজন। এর কারণ হচ্ছে বিপুল সংখ্যক পাতিবুর্জোয়া বিপ্লবী গণতন্ত্রীরা তাঁদের সংকট থেকে পরিত্রাণের আশায় শ্রমিক শ্রেণীর দিকে এগিয়ে এসেছেন, কেননা অক্টোবর বিপ্লবের পর মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশ্বব্যাপী মহান বিজয়ের মধ্য দিয়ে এবং চীনের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য এবং বিশেষভাবে কুওমিনতাঙ ও কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক বিকাশের ফলে চীনে পাতিবুর্জোয়াদের শক্তিশালী একটা রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া, চীনের অর্থনৈতিক অবস্থাতে এমনকি সাধারণ শ্রমিকগণ এবং শ্রমিক শ্রেণী থেকে আগত পার্টি সদস্যরাও পাতিবুর্জোয়া ভাবাপন্ন হতে পারেন। সুতরাং এটা বিস্ময়কর নয় বরং অনিবার্যই যে, পাতিবুর্জোয়া ভাবাদর্শ পার্টির মধ্যে প্রতিটি রূপ ও আকার নিয়ে বারেবারে প্রতিফলিত হয়ে উঠেছে। … আমাদের পার্টির ইতিহাসে সঠিক লাইন ও অন্যান্য ভ্রান্ত লাইনগুলোর মধ্যেকার সংগ্রাম মূলত হচ্ছে পার্টির মধ্যে বাহিরের শ্রেণী সংগ্রামেরই প্রকাশ এবং ‘বামপন্থি’ লাইনগুলোর … রাজনৈতিক, সামরিক, সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক ভুলগুলো পার্টিতে এই পাতিবুর্জোয়া ভাবাদর্শের একেবারে যথাযথ অভিব্যক্তি।”

আমাদের এখানকার অবস্থা এ থেকে ভিন্ন কিছু নয়।

২। রণনৈতিক পরিকল্পনা না-করার ভুল এবং  প্রথম থেকেই সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ না-নেওয়ার ভুল।

যেখানেই সম্ভব সেখানেই সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে পূর্ব বাংলার বিপ্লবের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা সত্ত্বেও, বিপুল সংখ্যক কৃষক জনতাকে সশস্ত্র সংগ্রামে শামিল করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাস দ্বারা নির্ধারিত জনগণের চেতনাগত পার্থক্যের স্তর অনুযায়ী সংগঠন ও সংগ্রামের বিভিন্ন রূপ তথা সঠিক রণকৌশল গ্রহণ করতে আমরা অস্বীকার করেছিলাম। দেশের প্রতিটি কোণই অগ্নিগর্ভ এবং যে কোনো অঞ্চলকেই মুক্ত করা সম্ভব—এই কথা বলে আমরা ঘাঁটি এলাকা স্থাপনের ক্ষেত্রে অঞ্চলের দুর্গমতা ও অন্যান্য অনুকূল শর্তকে বিবেচনা করা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলাম।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অতিরঞ্জিত মূল্যায়নই আমাদের এই দুটো ভুলের পিছনের কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।

সাম্রাজ্যবাদের যুগে পৃথিবীর কোনো দেশের জাতীয় পরিস্থিতিই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ভুল মূল্যায়ন জাতীয় পরিস্থিতির ভুল মূল্যায়নে উৎসাহ যোগায়। যুগের চরিত্র বুঝতে গিয়ে আমরা যে অতিরঞ্জিত মূল্যয়নের দিকে ঝুঁকেছিলাম অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের পতনের যুগকে দ্রুত পতনের যুগ ধরে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রণকৌশলের দিক থেকেও তার দুর্বলতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখার ঝোঁক এবং আমাদের রণনৈতিক শক্তি সামর্থ্যকে রণকৌশলের ক্ষেত্রেও বড় করে দেখার ঝোঁক দেখা দিয়েছিল। ফলে জাতীয় ক্ষেত্রে সামন্ত ও আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণী যে আন্তর্জাতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট হয়ে চূড়ান্ত ফ্যাসিস্ট দমননীতি নামিয়ে আনতে পারে এই সম্ভাবনাকে আমরা বিবেচনাই করলাম না এবং তাই তার জন্য কোনো প্রকার পূর্বপ্রস্তুতিও আমাদের থাকল না।

সামরিক রণনীতি ও সামরিক রণকৌশল কী?

 সামরিক ক্ষেত্রে রণনীতি বিজ্ঞানের কর্তব্য হল যুদ্ধের সামগ্রিক পরিস্থিতির ও প্রত্যেক পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণকারী নিয়মগুলো পর্যালোচনা করা; আর রণকৌশল বিজ্ঞানের কর্তব্য হল আংশিক পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণকারী নিয়মগুলো পর্যালোচনা করা। সামগ্রিক পরিস্থিতি ও প্রত্যেক পর্যায়ের বিচার বিবেচনায় গুরুতর ভুল- ত্রুটি থাকলে সেই যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় হয়।

নির্দিষ্টভাবে বললে সামরিক রণনীতির কর্তব্য হল—রাজনৈতিক রণনীতি কর্তৃক নির্ধারিত দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করে শত্রু বাহিনীকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে একটা নির্দিষ্ট দেশে একটা নির্দিষ্ট আমলের যুদ্ধের ক্ষেত্রে নির্ধারক আঘাতের দিক-নির্দেশ নির্ধারণ করা অর্থাৎ যুদ্ধের সমগ্র আমল ধরে পরিচালিত সামরিক ক্রিয়াকলাপের প্রকৃতি পূর্বাহ্নেই নির্ধারণ করা, অর্থাৎ গোটা যুদ্ধের ভাগ্য, দশভাগের নয় ভাগ পর্যন্ত পূর্বাহ্নেই নির্ধারণ করে নেওয়া।

সামরিক রণনীতি কেমন করে সূত্রায়িত হয়?

 একটা নির্দিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ইত্যাদি অবস্থা এবং সবদিক দিয়ে তার আন্তর্জাতিক অবস্থানের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো থেকেই সেই দেশের বিপ্লবী যুদ্ধের বৈশিষ্ট্যগুলো গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট দেশের বিপ্লবী যুদ্ধের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর ভিত্তি করেই সেই দেশের বিপ্লবের সামরিক রণনীতি সূত্রায়িত হয়। উক্ত বৈশিষ্টগুলোই নির্ধারণ করে দেয় সর্বহারা শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে কোন পথে—দীর্ঘমেয়াদী গেরিলাযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের পথে, না শহরমুখি অভ্যুত্থানের পথে, নাকি প্রথমে দীর্ঘমেয়াদী গণযুদ্ধ এবং শেষ পর্যায়ে গ্রাম-শহর যুগপৎ অভ্যুত্থানের পথে।

এই প্রশ্নে আমরা নির্ধারণ করেছিলাম—প্রথমে এলাকা ভিত্তিক ক্ষমতা দখলের দীর্ঘমেয়াদি গণযুদ্ধের প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট অস্থায়ি ঘাঁটি এলাকা স্থাপন করে দেশব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রামের বিস্তৃতি ঘটানো এবং রণনৈতিক আক্রমণের স্তরের শেষ পর্যায়ে গ্রাম-শহর যুগপৎ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করাই হবে আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য রণনীতি। এই সামরিক রণনীতি নির্ধারণ করতে পারাটা ছিল আমাদের একটা সাফল্য। কিন্তু যুদ্ধের প্রতিটি স্তরকে— রণনৈতিক প্রতিরক্ষা, রণনৈতিক ভারসাম্য ও রণনৈতিক আক্রমণের স্তরকে— আলাদাভাবে চিহ্নিত করে, যুদ্ধের তিনটি রূপের—গেরিলা যুদ্ধ, চলমান যুদ্ধ ও অবস্থানগত যুদ্ধ রূপের কোনটা কোন পর্যায়ে প্রধান্য পাবে এবং সেই পর্যায়ে অন্য রূপ দুটো কোন অবস্থানে থাকবে তার ভিত্তিতে এবং আমাদের দেশের বিপ্লবী যুদ্ধের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিত্তিতে সামগ্রিক যুদ্ধের কোনো রণনৈতিক পরিকল্পনা আমরা করলাম না। এটা ছিল আমাদের প্রধান প্রধান ব্যর্থতাগুলোর অন্যতম।

জাতীয় পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শত্রুদের শক্তিকে বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করতে না-পারার পাশাপাশি নিজেদের ও মিত্রদের বাস্তব অবস্থাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতেও ব্যর্থ হলাম। অসম অর্থনৈতিক বিকাশের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক চেতনার মান এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশও অসম হয় এটা মার্কসবাদের সাধারণ কথা। সংগ্রামের কৌশল নিধারণ করার সময় এই পরিস্থিতিকে মাথায় রাখতে হয়। কিন্তু আমরা সংগ্রামের একটামাত্র রূপকেই আঁকড়ে ধরে থেকে অন্য রূপগুলোকে বর্জন করলাম এবং ব্যাপক কৃষকসহ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী-সামন্তবাদবিরোধী অন্যান্য শ্রেণীগুলোকে গণসংগ্রামে শামিল করতে ব্যর্থ হলাম।

আবারো আমরা এই ভুলের সামাজিক-মতাদর্শিক উৎসটা দেখে নেব। “পাতিবুর্জোয়া চিন্তা পদ্ধতির প্রকাশ ঘটে মূলত সমস্যাগুলোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে আত্মমুখিতা ও একপেশেমি রূপে। অর্থাৎ তা বস্তুগত বাস্তবতায় শ্রেণীশক্তিসমূহের বস্তুনিষ্ঠ ও আনুপূর্বিক একটা চিত্র উপস্থিত করতে পারে না, বরং আত্মমুখিভাবে আত্মগত আকাঙ্খা ও ধারণা থেকে বাস্তবতার বদলে ফাঁকা কথাই এনে হাজির করে, সমস্ত দিকগুলোর একটাকেই ধরে বসে থাকে, অংশকেই সমগ্র মনে করে বসে, আলাদা আলাদা গাছপালাকেই [কিম্বা অরণ্যের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ গাছটাকেই] অরণ্য বলে ভুল করে। উৎপাদনের যথার্থ ও প্রকৃত প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে পাতিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের শুধুমাত্র পুঁথিগত জ্ঞান থাকে এবং প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অভাব থাকে। তাই তাঁদের চিন্তার পদ্ধতি উল্লিখিত নির্বিচার গোঁড়ামি হিসেবে সহজেই আত্মপ্রকাশ করে বসে। যদি তাঁদের কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও থাকে তা হলেও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত [গরিব কৃষক, মাঝারি কৃষক, কারিগর ইত্যাদি শ্রমজীবী] পাতিবুর্জোয়া লোকজনদের ক্ষুদে উৎপাদনের বৈশিষ্ট্যগুলোর সীমাবদ্ধতা, যেমন—সংকীর্ণতা, বিচ্ছিন্নতা, বিক্ষিপ্ততা ও রক্ষণশীলতা ইত্যাদি থেকেই যায় এবং তাই তাঁদের চিন্তাধারাতেও উল্লিখিত অভিজ্ঞতাবাদের প্রকাশ ঘটে।”

ফলে বিপ্লবে দ্বন্দ্বরত দুই পক্ষের শক্তি ও দুর্বলতাকে যথাযথ ও বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন না-করে ঐ দ্বন্দ্বের ফলাফল সম্পর্কে নেতৃত্বের কল্পনাপ্রসূত চিন্তার উপর নির্ভর করে সংগ্রামের রূপ নির্ধারণ করার অসর্বহারা পদ্ধতিতে আমরা ঝুঁকে পড়েছিলাম।

৩। পার্টির গঠন, বিকাশ, সংহতিসাধন ও বলশেভিকীকরণকে ভীষণভাবে অবহেলা করার ভুল

কোনো দেশে বিপ্লব করতে হলে বস্তুগত অবস্থার শর্ত ও আত্মগত অবস্থার শর্ত—দুটোই পরিপক্ক হওয়ার প্রয়োজন। জনগণ প্রচলিত শাসন ব্যবস্থাকে আর মেনে নিচ্ছেন না, তাকে উচ্ছেদের জন্য বারবার সংগ্রামে ফেটে পড়ছেন; এবং শাসক শ্রেণীও আর পুরনো কায়দায় তাদের শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখতে পারছে না, জনগণকে দমন করার জন্য বারবার নিজেরাই প্রচলিত আইন কানুন লঙ্ঘন করে ফ্যাসিবাদী নিপীড়নের পথ গ্রহণ করছে। দেশের অবস্থা যদি এরকম হয়, তা হলে বুঝতে হবে বিপ্লবের জন্য বস্তুগত অবস্থার শর্ত পরিপক্ক হয়েছে। আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরেই এই অবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু বিপ্লবের জন্য শুধু বস্তুগত অবস্থা পরিপক্ক হওয়াই যথেষ্ট নয়, আত্মগত অবস্থাও পরিপক্ক হওয়া প্রয়োজন। আত্মগত অবস্থা বলতে বুঝানো হয়—যাঁরা বিপ্লব করবেন সেই জনগণ ও বিপ্লবে নেতৃত্বদায়ী পার্টি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত কিনা—সেটাই।

কঠোরভাবে লেনিনীয় নীতি অনুসরণ করে একটা বিপ্লবী পার্টি গঠন করা, সেই পার্টির বিকাশ, সংহতি সাধন ও বলশেভিকীকরণের ভিতর দিয়ে বিপ্লবী পার্টি, জনগণ ও জনগণের সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। মাও সেতুঙ আমাদের শিখিয়েছেন—কিভাবে আমরা আমাদের পার্টিকে গড়ে তুলতে পারি; যে পার্টির ব্যাপ্তি থাকবে সারা দেশজুড়ে; যার থাকবে একটা ব্যাপক গণ-চরিত্র এবং যে পার্টি মতাদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে হবে পুরোপুরি সংহত—কিভাবে আমরা এমন একটা পার্টি গড়ে তুলতে পারি। তিনি বলেছেন, ‘পার্টির ইতিহাস অধ্যয়ন করে এবং যুক্তফ্রন্ট ও সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে; বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট করা ও তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা—এই উভয় সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে এবং …গেরিলা যুদ্ধে অটলভাবে লেগে থাকা এবং …ঘাঁটি এলাকা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করে পার্টি গঠন সম্পর্কে অধ্যয়ন করে এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে।’

যুক্তফ্রন্ট, সশস্ত্র সংগ্রাম ও পার্টি গঠন—এই তিনটা হল বিপ্লব সাধনের তেপায়া (tripod of revolution)। কেননা এই তিনটের উপর নির্ভর করেই দেশের রণকৌশলগতভাবে দুর্বল সমগ্র চালিকা শক্তি একটা শক্তিশালী অবস্থানে এসে দাঁড়াতে পারে। তাই এই তিনটের যে কোনো একটা দুর্বল হলে বিপ্লবের অগ্রগতি বা সাফল্য মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। তেপায়া যেমন তিন পায়ের উপর ভর করে দাঁড়ায়, দুই পা বা এক পায়ে দাঁড়াতে পারে না, বিপ্লবের সাফল্যও তেমনি এই তিন যাদু-অস্ত্রের সঠিক সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে, এর যে কোনো একটাও দুর্বল হলে বিপ্লব বিপর্যস্ত হয়। আমাদের পার্টির যুক্তফ্রন্ট সংক্রান্ত রাজনৈতিক লাইন এবং বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা সংক্রান্ত সামরিক লাইন পুরোপুরি সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ছিল না এবং পার্টি গঠন প্রশ্নেও মতাদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক লাইনও পুরোপুরি সঠিক ছিল না। ফলে সারাদেশ জুড়ে ব্যাপ্তিসম্পন্ন, ব্যাপক গণ-চরিত্রসম্পন্ন এবং মতাদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে পুরোপুরি সংহত একটা বলশেভিকীকৃত কমিউনিস্ট পার্টি আমরা গড়ে তুলতে পারি নি। আমাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামগুলো বারবার, বিপর্যস্ত হওয়ার প্রধান কারণ এটাই।

এই ভুলের কারণ ও উৎসগুলোও আমাদের চিনে নেওয়া প্রয়োজন। অন্যভাবে বললে এটা ছিল বিপ্লবের আত্মগত [বিষয়ীগত] অবস্থা [subjective condition]-কে সচেতনভাবে প্রস্তুত করে তোলার প্রতি মারাত্মক উদাসীনতা দেখানোর ভুল। এর পিছনের কারণ ছিল বিপ্লবী জোয়ারের স্বতঃস্ফূর্ততায় ভেসে গিয়ে নেতৃত্বের সর্বহারা দূরদৃষ্টি ও সচেতন প্রয়াসকে হারিয়ে ফেলা।

আমরা ভেবেছিলাম, আত্মগত অবস্থা যাই হোক না কেন তা কিছুতেই বিপ্লবের বিজয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। যেখানেই সম্ভব আমাদের শুধু সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে হবে; তা হলেই সেই সংগ্রাম নিজে থেকেই শক্তি সঞ্চয় করবে এবং নিশ্চিতভাবেই লক্ষ্য অর্জিত হওয়া পর্যন্ত এগিয়ে যাবে। এটা যেহেতু সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত ও দ্রুত পতনের যুগ তাই আমাদের পক্ষে একটা সংগ্রাম শুরু করাই যথেষ্ট, কারণ সংগ্রাম নিজেই তার সমস্যার সমাধান করবে আর বিজয় অর্জন না-করা পর্যন্ত এগিয়ে যাবে। এই চিন্তার ফলেই আমরা ভেবেছিলাম যে সশস্ত্র সংগ্রামই সব সমস্যার সমাধান করতে পারে; জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করা এবং পার্টি সংগঠনকে মতাদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে পুরোপুরি সংহত করার উপর বিশেষ জোর দেওয়ার তেমন একটা প্রয়োজন নেই। এই কাজের উপরই যে বিপ্লবের সাফল্য নির্ভর করছে সেটা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি নি। ফলে সশস্ত্র লড়াইয়ের ডাক দেওয়ার এবং হাতেকলমে শুরু করে দেওয়ার আগে আমরা পরিণতির কথা আদৌ চিন্তা করি নি। তবু ৯০-এর দশকের শুরুতে আমাদের দেওয়া ডাকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের উপর সামান্য কিছু পড়াশুনা আছে এমন কিছু যুবক ও ছাত্র সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় আঞ্চলিক ভিত্তিতে দু-এক জায়গায় শ্রেণীশত্রু খতমের ভিতর দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা হলে এগিয়ে এসেছিলেন আরো এক ঝাঁক ছাত্র-বুদ্ধিজীবী ও শ্রমজীবী তরুণ, যাঁদের মালেমা সম্পর্কে কোনো পূর্বধারণাই ছিল না এবং এরাই ছিলেন সংখ্যায় অনেক বেশি। অল্প কিছু জানা এবং একেবারেই কিছু না-জানা এই দুই ধরনের তরুণ কর্মীরাই ছিলেন পার্টির ভিত্তি। এই কর্মীরা শুধুমাত্র বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি গভীর ভালোবাসা নিয়েই নয়, সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেওয়ার অনমনীয় সংকল্প নিয়েও তাঁদের সবকিছু ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। এটা ছিল তাঁদের ইতিবাচক দিক। তাঁদের অন্য দিকও ছিল, যা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনি নি। আমাদের শতকরা ৯৫ জন কর্মীই ছিলেন একেবারে কাঁচা, যাঁদের প্রায় কোনো মার্কসবাদী পড়াশুনা ও বিপ্লবী অভিজ্ঞতাই ছিল না। তবুও তাঁদের বিপ্লবী উদ্দীপনা ও আত্মত্যাগের প্রস্তুতি মার্কসবাদ সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞানকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কিছু পরিমাণে রোমাঞ্চকর দুঃসাহসী কার্যকলাপের ঝোঁকও ছিল। একটা দেশের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হলে মালেমা-র তত্ত্বে সজ্জিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির যে ধরনের বলিষ্ঠ সংগঠনের প্রয়োজন সেই রকম সংহত সংগঠন গড়ে তোলার পথে এগুলো ছিল বাস্তব বাধা, এগুলোকে অতিক্রম করার কথা বারবার বলা হলেও এবং পার্টিস্কুল গড়ে তোলার নানান পরিকল্পনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত পার্টি ক্যাডারদের মতাদর্শিক-রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব হয় নি।

কমিউনিস্ট পার্টি হল সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শ, মালেমা-র তত্ত্বে সুসজ্জিত এবং লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী অংশের সংগঠন, যার রয়েছে ইতিহাসের জ্ঞান ও বাস্তব আন্দোলনের গভীর উপলব্ধি। কাজেই পার্টি তার সদস্য সংগ্রহ করবে তাঁদের মধ্য থেকেই—ক) যাঁরা জনগণের সঙ্গে শ্রেণী সংগ্রামে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদান করেছেন আর তার মধ্য দিয়ে পোড় খেয়েছেন এবং খ) যাঁরা সচেতনভাবে সর্বহারা শ্রেণীস্বার্থকে তুলে ধরেন এবং পার্টির চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে দৃঢ় থাকেন। তাই শুধুমাত্র সশস্ত্র কার্যকলাপে বীরত্ব দেখিয়েছেন বলেই কাউকে পার্টির সদস্যপদ দেওয়া যায় না। অথচ এমন কর্মীদেরকে আমরা এমনকি আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতৃত্বের স্তরে তুলে এনেছি যাঁদের সর্বহারা শ্রেণীস্বার্থকে তুলে ধরার সচেতনতায় মারাত্মক ঘাটতি ছিল। ফলে সংকটের মুহূর্তে তাঁরা নিজেদেরকে কালিমালিপ্ত তো করেছেনই, জনগণের মধ্যে পার্টির ভাবমূর্তিকেও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছেন। যেসব এলাকায় নেতৃত্বের এরকম অধঃপতন হয়েছে সেখানে পুনরায় সংগ্রাম ও সংগঠন গড়ে তুলতে মাত্রাতিরিক্ত সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তারচেয়ে বরং যেসব এলাকায় সর্বহারার শ্রেণীস্বার্থ তুলে ধরায় সচেতন একাধিক নেতা-কর্মী শহিদ হয়েছেন সেখানে পুনরায় সংগ্রাম ও সংগঠন গড়ে তুলতে জনগণের কাছ থেকে আশাতিরিক্ত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে।

আরো বিভিন্ন দিক দিয়ে কঠোরভাবে লেনিনীয় নীতি অনুসরণ করে পার্টি গঠনের দিকটা মারাত্মকভাবে অবহেলিত হয়েছিল। অধিকাংশ এলাকার পার্টি সদস্য ও বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের একটা বড় অংশকে পার্টির সংবিধান, কর্মসূচি, সাধারণ লাইন, কাজের পদ্ধতি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে শিক্ষাদানই করা হয় নি। নতুন কর্মীদের সদস্যপদ দেওয়ার পদ্ধতিও অবহেলিত হয়েছিল। ’৭৪ সালের বিপর্যয়ের যতটুকু সারসংকলন করা হয়েছিল তার ভিত্তিতে গেরিলা স্কোয়াডগুলো ও পার্টি ইউনিটগুলো যাতে একাকার হয়ে না-যায় সে ব্যবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হলেও সংগ্রামী এলাকাগুলোর পার্টি কমিটিতে রাজনীতির উপরে সশস্ত্র কার্যকলাপ আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছিল এবং পার্টির সাংগঠনিক গোপনীয়তা আর মতাদর্শগত মান চূড়ান্তভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।

এটা ঠিক যে সমাজের মূল শ্রেণীগুলোর উপর ভিত্তি করে এবং তাঁদের সঙ্গে একাত্মতার মধ্য দিয়ে পার্টি গড়ে তোলার সচেতন প্রয়াসটা ছিল আমাদের সাফল্য। মূল শ্রেণীগুলোর প্রতি পার্টির সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিই এতে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু শ্রেণী সচেতনতা সম্বন্ধে আমাদের উপলব্ধিতে ঘাটতি ছিল। ফলে মূল শ্রেণীগুলোর শ্রেণীঘৃণাকে আমরা সর্বহারার শ্রেণী সচেতনতা বলে ভুল করেছিলাম। এই  ভুল উপলব্ধির ফলে আমরা কোথাও কোথাও গরিব কৃষক, ভুমিহীন কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্য থেকে আসা কমরেডদের মতাদর্শগত মান বিবেচনা না-করেই শুধুমাত্র তাঁদের শ্রেণীগত উৎসের বিচারেই নেতৃত্বের পদে তুলে এনেছিলাম। এর ফলে পার্টির অভ্যন্তরীণ মতাদর্শগত সংগ্রাম একেবারেই ঝিমিয়ে গিয়েছিল।

এই সমস্ত ভুল চিন্তা ও প্রয়োগকে বর্জন ও সংশোধন করে পুনরায় পার্টি গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথমে পার্টির বর্তমান মতাদর্শিক-রাজনৈতিক লাইনে সম্ভাবনাময় কমরেডদের শিক্ষাদান করতে হবে, তার পর তার মধ্য থেকে যেসব কমরেডদের মূল রাজনৈতিক সচেতনতা আর মতাদর্শগত মানের উন্নতি ঘটছে কেবল তাঁদের মধ্যে থেকে নেতৃত্ব গড়ে তোলার ব্যাপারে সচেতন প্রয়াস নিতে হবে।

এই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠে কঠোরভাবে লেনিনীয় নীতিভিত্তিক কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তার পূর্ব পর্যন্ত সাংগঠনিক ক্ষেত্রে আমাদের কিছু অনিবার্য সমস্যার মুখে পড়তে হবে। কিন্তু ওই সমস্যাগুলো কাটিয়ে না-উঠে, দেশের সমস্ত নিপীড়িত জনতার উপর দৃঢ় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে না-তুলে বিপ্লব জয়যুক্ত হতে পারে না। তাই সমস্ত পাতিবুর্জোয়া অস্থিরতা মোকাবেলা করে, সচেতন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যয় হওয়া সময়টা যত দীর্ঘই মনে হোক না কেন, ধৈর্য ধরে কঠোর প্রচেষ্টার ভিতর দিয়ে সেই সময়টা আমাদের অতিক্রম করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

রুশ বিপ্লব ও চীন বিপ্লব আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, বিপ্লবের সাফল্যের জন্য পার্টির পাশাপাশি জনগণের বিভিন্ন অংশের শক্তিশালী সংগঠনও প্রয়োজন হয়। এই দুটো বিষয়ের উপর যথাযোগ্য গুরুত্ব দিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ফলে সংগ্রাম ও সংগঠন উভয় ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততা প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলেছে।

এই স্বতঃস্ফূর্ততার পিছনেও রয়েছে পাতি বুর্জোয়া ভাবাদর্শের প্রভাব। তাই নতুনভাবে পার্টি গড়ে তোলার সময় আমাদেরকে এই পাতিবুর্জোয়া ভাবাদর্শের প্রতিটি প্রকাশকে আলাদাভাবে চিনে নেওয়ার জন্য অত্যন্ত সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে এক দীর্ঘমেয়াদী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী শিক্ষা-অভিযান তথা শুদ্ধি-অভিযান চালাতে হবে।

৪। খতম লাইনের সাফল্য ও ব্যর্থতা

খতম লাইনের সাফল্য বা যথার্থতা এবং ব্যর্থতা বা অপ্রযোজ্যতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের অবশ্যই রণনীতি ও রণকৌশল সংক্রান্ত প্রাথমিক একটা ধারণা থাকতেই হবে। এটা বুঝতে হবে সামরিক- রণনীতি ও রণকৌশল এবং রাজনৈতিক- রণনীতি ও রণকৌশল এক বিষয় নয়, পরস্পর পৃথক; যদিও প্রথমগুলো পরেরগুলোর অধীনস্থ এবং রণকৌশল রণনীতির অধীনস্থ।

রাজনৈতিক রণনীতি কী?

বিপ্লবের নির্দিষ্ট স্তরে সর্বহারা শ্রেণীর প্রকৃত মিত্র ও প্রকৃত শত্র“র মধ্যে পৃথক্করণই রাজনৈতিক রণনীতির কাজ অর্থাৎ বিপ্লবকে সাফল্যের সঙ্গে সমাধা করতে বিপ্লবের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে যে যে শ্রেণীকে উচ্ছেদ করতে হবে এবং চালিকা শক্তি হিসেবে যে যে শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে তাদেরকে চিহ্নিত করাই রাজনৈতিক রণনীতির কাজ। পূর্ব বাংলার নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রাজনৈতিক রণনীতি পূর্ববাংলার সমাজের মূর্ত শ্রেণী বিশ্লেষণ থেকেই সূত্রায়িত হয়েছে।

সামরিক রণনীতি কী?—সেটা আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [পৃষ্ঠা—৮ দ্রষ্টব্য]

রণকৌশল কী?

আন্দোলনের জোয়ার-ভাটা, বিপ্লবের উত্থান-পতনের অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের পরিসরে সর্বহারা শ্রেণী কোন (পন্থায়) লাইনে নিজেদের পরিচালনা করবে তা স্থির করা, পুরনো (ধরনের) রূপের সংগ্রাম ও সংগঠনের বদলে নতুন ধরনের সংগ্রাম ও সংগঠন মারফত, পুরনো ধরনের শ্লোগানের বদলে নতুন ধরনের শ্লোগানের মারফত এবং এই সমস্ত বিভিন্ন রূপের সমন্বয় সাধনের মারফত সেই (পন্থা) লাইন অনুসরণ করাই হল রণকৌশল। অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রাম ও সংগঠনের ধরন, তার রদবদল ও সমন্বয় সাধন নিয়েই রণকৌশলের কাজ কারবার। বিপ্লবের কোনো নিদিষ্ট স্তরে, বিপ্লবের জোয়ার-ভাটা বা উত্থান-পতনের উপর নির্ভর করে রণকৌশল অনেকবার পরিবর্তিত হতে পারে।

রণকৌশলের কর্তব্য হল –

প্রাথমিকভাবে রণনীতির চাহিদা অনুসারে এবং সকল দেশের শ্রমিকদের বিপ্লবী সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে, প্রত্যেকটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে সংগ্রামের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংগ্রামের সবচেয়ে উপযুক্ত রূপ (ধরন) ও পদ্ধতি স্থির করা। সংগ্রামের রূপ (বা ধরন) বলতে যুদ্ধের রূপ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপ উভয়কেই বুঝানো হয়। যুদ্ধের বিভিন্ন রূপ, পদ্ধতি এবং সেগুলোর মধ্যকার সময়োপযোগী সমন্বয় সাধনই সামরিক রণকৌশলের কাজ। আর রাজনৈতিক সংগ্রামের বিভিন্ন রূপ ও পদ্ধতি এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠনের রূপগুলোর মধ্যকার সময়োপযোগী সমন্বয় সাধন রাজনৈতিক রণকৌশলের কাজ।

এ-নিয়ে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ তৈরি করে নিতে হবে। আপাতত খতম লাইনের সাফল্য ও ব্যর্থতা বুঝার জন্য এই চুম্বক কথাগুলোই যথেষ্ট।

খতম লাইন সম্পর্কে প্রশ্ন—খতম লাইন কি আমাদের রণনৈতিক লাইন, না রণকৌশলগত লাইন? আমরা বলতাম খতম আমাদের রণনীতি। ‘খতম অভিযান চালিয়েই আমরা আমাদের সমস্ত সমস্যার সমাধান করব।’ সিএম-এর অন্য একটা উদ্ধৃতি আমরা যথার্থভাবেই ব্যবহার করতাম—‘খতম একযোগে একই সঙ্গে শ্রেণীসংগ্রামের উচ্চতর রূপ ও গেরিলাযুদ্ধের সূচনা।’ দুটোই সিএম-এর কথা, কিন্তু কথা দুটোর মধ্যেকার মারাত্মক স্ববিরোধ আমরা লক্ষই করি নি।

রণকৌশলে যে সংগঠনের রূপের কথা বলা হয় তা দিয়ে রাজনৈতিক সংগ্রামের উপযোগী সংগঠনের রূপ এবং যুদ্ধের উপযোগী সংগঠনের রূপ দুটোই বুঝানো হয়। রাজনৈতিক সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের উপযোগী সংগঠনের বিভিন্ন রূপের আলোচনা অন্যত্র হবে। সেনাবাহিনীর সংগঠনের বিভিন্ন রূপ ও সেনা বিভাগের বিভিন্ন শাখা গড়েই তোলা হয় যুদ্ধের রূপ ও পদ্ধতির উপযোগী করে। যুদ্ধের রূপ ও পদ্ধতি যখন বদলে যায়, সেনাবাহিনীর সংগঠনের রূপও তখন বদলে যায়। গেরিলা যুদ্ধ, চলমান যুদ্ধ ও অবস্থানগত যুদ্ধ—যুদ্ধের এই তিন রূপের সঙ্গে সঙ্গতিশীল তিন প্রকার যুদ্ধ পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। এই তিন প্রকার যুদ্ধের রূপ ও পদ্ধতির উপযোগী তিন ধরনের বাহিনী সংগঠন ও তিন ধরনের ফর্মেশনও (সেনা বিভাগের বিভিন্ন শাখা) গড়ে উঠেছে।

নিয়মিত গেরিলা বাহিনী ও গণমিলিশিয়া দলগুলো তাদের স্কোয়াড ও সেকশন ফর্মেশনে গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনা করে। চলমান বাহিনী পরিচালনা করে চলমান যুদ্ধ আর নিয়মিত বাহিনী বা গণমুক্তিবাহিনী পরিচালনা করে অবস্থানগত যুদ্ধ। নিয়মিত বাহিনীর থাকে স্কোয়াড, সেকশন, প্লেটুন, কোম্পানী, ব্যাটেলিয়ন, রেজিমেন্ট ইত্যাদি ফর্মেশন বা শাখা। রণকৌশলের কর্তব্য হল সেনা বিভাগের সকল শাখার অবস্থিতি থাকা নিশ্চিত করা, তাদেরকে নিখুঁত করে তোলা এবং পারদর্শিতার সঙ্গে তাদের ক্রিয়াকলাপকে সমন্বিত করা।

রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের যোগফল হল শ্রেণী সংগ্রাম। কৃষকের এই শ্রেণী সংগ্রাম একটা পর্যায়ে বিকশিত হলে, শ্রেণীশত্র“ খতম অবশ্যই সংগ্রামের একটা অত্যন্ত কার্যকরী রূপে পরিণত হয়। শ্রেণী সংগ্রামের এই উচ্চতর রূপ একটা পর্যায় পর্যন্ত অর্থাৎ এই সূচনা বিন্দু থেকে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গেরিলাযুদ্ধে রূপান্তরের পূর্ব পর্যন্ত এটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে, বলতে গেলে, অন্যতম প্রধান রূপ হিসেবে থাকবে। [কিন্তু একমাত্র রূপ হিসেবে নয়।] তাই কারো পছন্দ-অপছন্দের তোয়াক্কা না-করে পূর্ব বাংলার কৃষি বিপ্লবের গোটা প্রাথমিক পর্যায় জুড়ে শ্রেণীশত্র“ খতম সংগ্রামের একটা গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে বজায় থাকবে, যা সঠিক রণনৈতিক পরিকল্পনার অধীনে পরিচালিত হলে অনিবার্যভাবে দেশব্যাপী গৃহযুদ্ধের রূপ নেবে এবং একটা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সামগ্রিক যুদ্ধের সবগুলো পর্যায় (বা স্তর) জুড়েই সংগ্রামের এই রূপটা সর্বজনীনভাবে বজায় থাকবে। সংগ্রামের যেকোনো রূপের মতো এরও সীমাবদ্ধতা আছে। সংগ্রামের কোনো রূপই সর্বজনীন নয়। সংগ্রাম তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক রূপই পরবর্তী উচ্চতর রূপে উত্তীর্ণ হয়। শ্রেণীশত্র“ খতমের ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য। গেরিলা যুদ্ধের বিকাশের ফলে গেরিলা বাহিনী ক্রমশ প্রথমে চলমান বাহিনী, পরে নিয়মিত বাহিনীতে উন্নীত হবে, যা শত্র“র স্থায়ি বাহিনীকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। এইভাবে জনগণের বাহিনী ও শত্র“ বাহিনীর মধ্যে শক্তির ভারসাম্য জনগণের অনুকূলে পরিবর্তিত হতে শুরু করলে, ক্রমে চলমান যুদ্ধ সংগ্রামের মুখ্য রূপে এবং গেরিলা যুদ্ধ গৌণ রূপে পরিবর্তিত হবে। গণমুক্তি বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও জনগণের বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংগ্রামের প্রধান রূপ হিসেবে সামনে চলে আসার প্রক্রিয়ায় শ্রেণীশত্র“ খতম সংগ্রামের গৌণ রূপে পরিবর্তিত হতে বাধ্য। গণযুদ্ধ তীব্রতর হয়ে উঠলে তার মধ্যে এইরূপ এমনকি হারিয়েও যেতে পারে; কিন্তু তার আগে পর্যন্ত পূর্ব বাংলার সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবে এটা হবে সংগ্রামের অন্যতম রূপ, যা কিছু ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তাই খতম আমাদের রণনীতি বা রণনৈতিক লাইন হতে পারে না। যুদ্ধের সবগুলো স্তরের সমস্ত সমস্যার সমাধান খতম লাইন দিয়ে সম্ভব নয়। তাই এটা কেবল কৌশলগত লাইনই হতে পারে।

আমাদের দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে তার সংশোধনবাদী অতীতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিড়ে বের হয়ে এসে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে শ্রেণীশত্র“ খতমের লাইন ধাত্রীমাতার কাজ করেছিল। মাওবাদী সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম অনুশীলনের ক্ষেত্রে তৎকালে [৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে] যে চার ধারার সৃষ্টি হয়েছিল তাঁদের প্রত্যেকেই বুঝেই হোক আর না-বুঝেই হোক, সচেতনভাবে হোক আর অসচেতনভাবেই হোক, চারু মজুমদারের অবদান স্বীকার করেই হোক আর অস্বীকার করেই হোক, সামগ্রিকভাবেই হোক আর আংশিক ভাবেই হোক এই খতম লাইনকে অনুশীলন করেছিলেন। সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের এই অনুশীলনই এদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল, যে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত সাফল্য অর্জনের পিছনে খতম লাইন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। একথা ভুলে গেলে চলবে না।

কিন্তু খতম লাইনকে আমরা যেভাবে উপলদ্ধি, ধারণ ও প্রয়োগ করেছিলাম তাতে তা একগুচ্ছ রাজনৈতিক, মতাদর্শিক, সামরিক ও সাংগঠনিক সমস্যা ও ব্যর্থতার জন্ম দিয়েছিল, যা বরাবর আমাদের বিপর্যয়কে পথ করে দিয়েছে।

খতম লাইনকে আমরা যেভাবে গ্রহণ করেছিলাম –

১) সংগ্রামের অন্যান্য সমস্ত রূপগুলোকে অর্থনীতিবাদ হিসেবে আর শ্রেণীসংগ্রামের প্রতিবন্ধক হিসেবে বাতিল করে দিয়ে কার্যত খতমকেই শ্রেণী সংগ্রামের একমাত্র রূপ হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।

২) গেরিলা যুদ্ধ সূচনার ক্ষেত্রে সশস্ত্র সংগ্রামের আরো যে সমস্ত রূপগুলো দেশে বিদেশে ব্যবহৃত হয় বা হয়েছে তার সবগুলোকেই বাতিল করে দিয়ে কার্যত খতমকেই সশস্ত্র সংগ্রামের একমাত্র রূপ হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।

৩) রাষ্ট্রযন্ত্র উচ্ছেদের প্রশ্ন অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নকে তুলনামূলকভাবে গুরুত্বহীন করে ফেলেছিলাম। অথচ প্রথম দিন থেকেই এই প্রশ্নটাকে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনা দরকার ছিল।

৪) যুদ্ধের সূচনা থেকেই সমগ্র যুদ্ধকে তার তিনটে স্তর এবং তিনটে রূপসহ নেতা-কর্মী-কমান্ডার-গেরিলা ও বিপ্লবী জনগণের সামনে না-এনে তাতে উত্তরণের একটা কাল্পনিক, অস্পষ্ট ও খুবই ভাসাভাসা ধারণা নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছিলাম।

৫) খতমের সংগ্রামকে রাষ্ট্রযন্ত্র ভাঙ্গার এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ভিতর দিয়ে নতুন রাষ্ট্রশক্তি প্রতিষ্ঠার কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত করি নি, ফলে খতম রাজনৈতিক-মতাদর্শিক লাইনের অধীনে ও তার দ্বারা পরিচালিত না-হয়ে প্রথমে সংস্কারবাদে, পরে নীতিহীন সংকীর্ণ অর্থনীতিবাদে অধঃপতিত হয়েছিল। অর্থাৎ ইজারাদারি ও চাঁদাবাজির ভাগবণ্টনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিল।

তাই এখন যখন সংগ্রাম বিপর্যস্ত হয়েছে এবং তার ফলে অনেকের মধ্যে হতাশা ও হতোদ্যমের আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে, তখন কেউ কেউ এই পরিস্থিতির সুযোগে বলছেন যে, শ্রেণীশত্র“ খতমকে সংগ্রামের একটা রূপ বলে স্বীকার করাটাই ভুল হয়েছিল। এরা সচেতনভাবেই হোক আর অসচেতনভাবেই হোক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন এবং অচিরেই দেখা যাবে এরা সশস্ত্র সংগ্রামকেই বর্জন করার পথ খুঁজছেন।

বাস্তবে শ্রেণীশত্রু খতমকে সংগ্রামের একটা রূপ হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে কোনো ভুল হয় নি। ভুলটা হয়েছিল রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগ্রামের অন্য সমস্ত রূপগুলোকে বাতিল করে দিয়ে শুধুমাত্র খতমের সংগ্রামকেই রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগ্রামের একমাত্র রূপ হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে। এর ফলে আমরা রাজনৈতিক লাইনের দুটো প্রধান উপাদানকে (সশস্ত্র সংগ্রামের লাইন ও যুক্তফ্রন্টের লাইনকে) মারাত্মকভাবে দুর্বল করে ফেলেছিলাম।

সুতরাং খতমের লাইনকে সমালোচনা করার সময় আমাদের অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং বিশ্লেষণাত্মক ও দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করতে হবে। শ্রেণীশত্রু খতমের সাফল্যের দিক বাদ দিয়ে শুধু ব্যর্থতার দিক নিয়ে সমালোচনা করলে সশস্ত্র শ্রেণী সংগ্রামকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে। তার অর্থ বিপ্লবকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা। কাজেই সংগ্রামের একটা রূপ হিসেবে খতমকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সংগ্রামের একমাত্র রূপ হিসেবে গ্রহণ করার বিরোধিতা করতে হবে।

৫। সংগ্রাম ও সংগঠনের অন্যান্য রূপগুলো বর্জন করার ভুল

আমাদের পার্টি সঠিকভাবেই সংসদীয় নির্বাচনের পথকে দৃঢ়ভাবে বর্জন করে জোর দিয়ে বলেছিল, আমাদের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সশস্ত্র পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সর্বপ্রধান রূপ হচ্ছে অবশ্যই সশস্ত্র সংগ্রাম। কিন্তু কাগজে কলমে এ-কথা থাকলেও কার্যত আমরা সশস্ত্র সংগ্রামকে একমাত্র রূপ হিসেবেই গণ্য করেছিলাম। সংগ্রাম ও সংগঠনের অন্য রূপগুলোকে আমরা সশস্ত্র সংগ্রামের পরিপন্থি বলে বর্জন করেছিলাম। মাওবাদ আমাদের শিখিয়েছে—আমাদের মতো দেশে সংগ্রামের প্রধান রূপ হচ্ছে যুদ্ধ, আর সংগঠনের প্রধান রূপ হচ্ছে সেনাবাহিনী কিন্তু গণসংগ্রাম ও গণসংগঠনের মতো সংগ্রাম ও সংগঠনের অন্যান্য রূপও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত অপরিহার্য, কোনো অবস্থাতেই এদের উপেক্ষা করা উচিত নয়। কিন্তু এগুলো সবই যুদ্ধের জন্য। যুদ্ধ বেধে ওঠার আগে সমস্ত গণসংগঠন ও গণসংগ্রামই হচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য; আর যুদ্ধ বাধার পর এই সমস্ত সংগঠন ও সংগ্রাম প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে যুদ্ধকে সাহায্য করে। কিন্তু ভারতের মতো আমাদের দেশেও প্রকাশ্য ও আইনি গণসংগঠন ও গণআন্দোলনগুলোকে সংগ্রামের একমাত্র রূপ হিসেবে গ্রহণ করার দীর্ঘ একপেশে ডানপন্থি সংশোধনবাদী ধারাকে বিরোধিতা করতে গিয়ে আমাদের পার্টি ‘বামপন্থি’ একপেশে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। বিগত তিন দশক ধরে সর্বপ্রধান রূপ বলে উল্লেখ করলেও ‘সর্বপ্রধান’ বলতে আমরা ‘একমাত্র’ই বুঝিয়ে এসেছি। আর এইভাবে আমরা সংগ্রাম ও সংগঠনের অন্যান্য যে রূপগুলো আসলে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের পরিপূরক, তাদের বর্জন করেছি। এর ফলে আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কৃষি কর্মসূচির ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নির্দিষ্ট অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বে-আইনি, আধা-আইনি ও আইনি গণআন্দোলন ও গণসংগঠন গড়ে তোলার এবং সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গে তার সংযোগ স্থাপন করার সচেতন প্রয়াস গ্রহণ করার বিরোধিতা করেছিলাম। একই সঙ্গে শহর এলাকায় ও শ্রমিক এলাকায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বিরোধী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তাকে ছোট করে দেখেছিলাম।

সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশে ও সহায়তায় আমাদের দেশের সামন্ত ও আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিক্রিয়াশীল সরকারগুলো যেসব নিপীড়নমূলক ও গণদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে, তার প্রভাবে সাধারণ মানুষ এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে সংগ্রামে নেমে পড়েন। সারা দেশ জুড়েই এ-জাতীয় বহু সংগ্রাম একটার পর একটা লেগেই আছে; কিন্তু কোথাও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী এই শক্তির উপর শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাই করা হয় নি। কোনো অঞ্চলকে গেরিলা অঞ্চল বা ঘাঁটি এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার আগে অবশ্যই এই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একমাত্র সমস্ত গণসংগ্রামগুলোতে অংশগ্রহণ করা এবং আপোষহীন নেতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করার মধ্য দিয়েই শ্রমিক শ্রেণীর এই নেতৃত্ব তথা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সশস্ত্র সংগ্রামকে সংগ্রামের প্রধান রূপ হিসেবে আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি, নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগ্রামে অংশগ্রহণের প্রস্তুতির স্তর অনুযায়ী সংগ্রামের বিভিন্ন রূপ নিশ্চিতভাবেই গড়ে উঠবে। পার্টিকে এই সমস্ত সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে যাতে জনগণ তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই তাঁদের মুক্তির জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামের অনিবার্যতা উপলদ্ধি করতে পারেন। কেবলমাত্র এই প্রক্রিয়াতেই আমরা বুর্জোয়া, পাতিবুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী নেতৃত্ব ও দলের প্রভাবে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীর উপর শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, যা সশস্ত্র সংগ্রামকে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত অপরিহার্য।

তবে মনে রাখতে হবে যে কোনো অর্থনৈতিক দাবি ও আংশিক দাবির সংগ্রামের উপর শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মূল শর্ত হল ক্ষমতা দখলের রাজনীতির অব্যাহত প্রচার ও প্রসার এবং সংগ্রামগুলো জঙ্গি হয়ে ওঠা ঠেকিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আইনি গন্ডির মধ্যে আটকে-রাখার সমস্ত প্রচেষ্টাকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিহত করে যাওয়া। এই কাজ না-করে এই জাতীয় যত সংগ্রামই আমরা পরিচালনা করি না কেন তা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিবাদের কানাগলিতে গিয়েই শেষ হবে, কখনো সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ-সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে না।

সশস্ত্র সংগ্রামের পরিপূরক সংগ্রামের অন্যান্য রূপগুলো গড়ে তোলার কথা যদি আমরা ভাবতাম তা হলে আমাদের নেতৃত্বে সংগঠনের অন্য রূপগুলোও পাশাপাশি গড়ে উঠত। যদিও আমরা বলেছি জনগণই হচ্ছেন দুর্ভেদ্য দুর্গ আর লোহার প্রাচীর, তা সত্ত্বেও আমরা জনগণকে সচেতনভাবে ঐক্যবদ্ধ করা এবং সংগ্রামে শামিল করার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুভবই করি নি। ফলে জনগণ তাঁদের প্রস্তুতি ও সচেতনতা অনুযায়ী সংগ্রাম ও সংগঠনের যে রূপগুলো গ্রহণ করতে পারতেন এবং যার মাধ্যমে তাঁদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে সংগ্রামে শামিল করানো সম্ভব ছিল সেগুলো আমরা করতে পারি নি। এইভাবে জনগণের মধ্যে যাওয়া, তাঁদেরকে বিভিন্ন বুর্জোয়া, পাতিবুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত করে তাঁদের উপর শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব পালনে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

৬। সংগ্রামের শুরু থেকেই যুক্তফ্রন্ট গড়ে না-তোলার ভুল

মাওবাদ আমাদের শিক্ষা দেয়—কোনো বিপ্লবী পার্টি যখন যুক্তফ্রন্ট প্রশ্নে বেঠিক রাজনৈতিক লাইন এবং বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রশ্নে বেঠিক সামরিক লাইন অনুসরণ করে তখন সেই পার্টির ব্যর্থতা, পশ্চাদপসরণ, সংকোচন, বিপর্যয় ও অনৈক্য দেখা দেয়। আর একটা বিপ্লবী পার্টি যখন যুক্তফ্রন্ট প্রশ্নে সঠিক রাজনৈতিক লাইন এবং বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রশ্নে সঠিক সামরিক লাইন গ্রহণ করে তখন সেই পার্টির সাফল্য, অগ্রগমন, প্রসারণ, বিকাশ ও সংহতি সাধন ঘটে।

আমরাও যুক্তফ্রন্ট গঠনের কথা স্বীকার করে নিয়েছিলাম। তবে সেটাকে লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পরের ব্যাপার বলে নির্ধারণ করেছিলাম। বলেছিলাম—যখন সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কৃষক ঐক্য স্থাপিত হবে, স্বাধীনতা ও উদ্যোগ নিজেদের হাতে থাকবে এবং দেশের কিছু অংশে লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে কেবলমাত্র তখনই এই যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা যেতে পারে। লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রসঙ্গে এও বলেছিলাম যে, ভবিষ্যতে যে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে এটা তার ভ্রূণ। আর সেই জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শ্রেণীসজ্জা (class composition) সম্পর্কে বলেছিলাম, (সেটা হবে) শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক, পাতিবুর্জোয়া এমনকি মাঝারি বুর্জোয়াদের বিপ্লবী যুক্তফ্রন্টের যৌথ গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব। অর্থাৎ লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা যে যুক্তফ্রন্টের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের ভ্রণ সেই যুক্তফ্রন্ট গঠনের কাজটা বাদ দিয়েই আমরা লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার কথা ভেবেছিলাম।

মাওবাদী শিক্ষাটা হল—লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্যই যুক্তফ্রন্ট প্রয়োজন। আমরা আগেই বলেছি: যুক্তফ্রন্ট, সশস্ত্র সংগ্রাম ও পার্টি গঠন—এই তিনটা হল বিপ্লব সাধনের তেপায়া; এর যে কোনো একটা দুর্বল হলেই বিপ্লবের অগ্রগতি বা সাফল্য মুখ থুবড়ে পড়বে। তেপায়া যেমন তিন পায়ার উপর ভর করে দাঁড়ায়, দুই পা বা এক পায়ে দাঁড়াতে পারে না, বিপ্লবের সাফল্যও তেমনি এই তিন যাদু অস্ত্রের সঠিক সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমেই আসতে পারে, এর যে কোনো একটাও দুর্বল হলে বিপ্লব বিপর্যস্ত হয়।

তা ছাড়া আমরা আগেই দেখেছি যে, মালেমা-র তত্ত্বের আলোকে পূর্ব বাংলার বিপ্লবের ক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বের রণনৈতিক কর্তব্য হল—সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করা এবং শ্রমিক, আধা-শ্রমিক, পাতিবুর্জোয়া ও জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করা।

এখন এই রণনৈতিক কর্তব্য সম্পাদনের জন্য শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের রণকৌশলগত কর্তব্য হল—সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রামের ও সংগঠনের সকল রূপের উপর দক্ষতা অর্জন করা, যাতে সেগুলোকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে, বিদ্যমান শক্তি-সম্পর্ক অনুসারে প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করা যায়। সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রাম ও সংগঠনের যথাযথ ব্যবহারের অর্থ হল—প্রথমত, সংগ্রাম ও সংগঠনের সেইসব রূপসমূহকে যথাযথভাবে সামনে তুলে ধরতে হবে, যেগুলো একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে আন্দোলনের জোয়ার কিম্বা ভাটার সময় বিদ্যমান অবস্থার পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী, আর সেই কারণে যেগুলো জনসাধারণকে বিপ্লবী অবস্থানে টেনে আনে, লক্ষ কোটি জনগণকে বিপ্লবী ফ্রন্টে নিয়ে আসে এবং বিপ্লবী ফ্রন্টে তাঁদের বিন্যাস সাধনকে সহজতর ও সুনিশ্চিত করে। বিষয়টা এ নয় যে, পুরনো শাসন ব্যবস্থা রক্ষা করা অসম্ভব এবং তাকে উচ্ছেদ করা অনিবার্য—এটা শুধু অগ্রগামী শ্রেণীকে বুঝলেই চলবে; বরং বিষয়টা হল এই যে, ব্যাপক জনসাধারণকে, লক্ষ কোটি লোককে এই অনিবার্যতা হৃদয়ঙ্গম করতে হবে এবং অগ্রগামী বাহিনীকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে তাঁদের সক্রিয় প্রস্তুতি প্রদর্শন করতে হবে। কিন্তু ব্যাপক জনসাধারণ কেবল তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেই এটা বুঝতে পারেন। বিপুল ব্যাপক জনগণ যাতে পুরাতন শাসন ব্যবস্থাকে উচ্ছেদের অনিবার্যতা তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে অনুধাবন করতে সক্ষম হন, এরূপ সংগ্রামের পদ্ধতি ও সংগঠনের রূপকে তুলে ধরা, যাতে ব্যাপক জনগণের পক্ষে তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে বিপ্লবী শ্লোগানের সঠিকতাকে অনুধাবন করা সহজ হয়—এই হল করণীয়। লেনিনীয় এই বক্তব্যকে নিতান্ত সরলীকরণ করলে যা দাঁড়ায় তা হল প্রথম রণনৈতিক কর্তব্য—বিপ্লবের লক্ষ্যবস্তুকে চূড়ান্তভাবে উচ্ছেদের জন্য সংগ্রামের প্রধান রূপ হল যুদ্ধ; আর তার উপযোগী সংগঠনের রূপ হল সেনাবাহিনী। আর দ্বিতীয় রণনৈতিক কর্তব্য—চালিকা শক্তির অন্তর্ভুক্ত লক্ষ কোটি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংগ্রামের রূপ হল গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচিতে সুত্রায়িত জনগণের প্রতিটি স্তরের দাবি দাওয়া ভিত্তিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী-সামন্তবাদবিরোধী বিভিন্ন আংশিক দাবির সংগ্রাম; আর তার উপযোগী সংগঠন হল জনগণের প্রতিটি স্তরের নিজস্ব গণসংগঠন এবং বিভিন্ন গণসংগ্রামের ভিত্তিতে ওই সমস্ত গণসংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট।

লেনিনের একটা কথা এখানে উল্লেখ করা যায়—‘কেবলমাত্র অগ্রগামী বাহিনীকে দিয়ে বিজয় অর্জন করা যায় না। সমগ্র শ্রেণী তথা ব্যাপক জনগণ যে পর্যন্ত না অগ্রগামী বাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থনের, কিম্বা কমপক্ষে তার প্রতি সহানুভূতিশীল নিরপেক্ষতার অবস্থান গ্রহণ করছেন, সে পর্যন্ত এককভাবে অগ্রগামী বাহিনীকেই চূড়ান্ত লড়াইয়ে ঠেলে দেওয়া … নিছক বোকামিই নয়, বরং মস্ত অপরাধ।’

‘বিপ্লব পরিচালনার জন্য খুব বেশি পড়াশুনা করার প্রয়োজন নেই’—এই তত্ত্ব আমদানি করে, আমরা আমাদের জ্ঞানকে ‘লোহার জুতা’ পরিয়ে চিরস্থায়ী সীমাবদ্ধকরণের ব্যবস্থা করে নিয়ে, বিপ্লব পরিচালনা করতে গিয়ে এই অপরাধই করে বসেছিলাম। কিন্তু বিপর্যয়ের ধাক্কা আজ সেই ‘লোহার জুতা’ খুলে ফেলতে বাধ্য করেছে। তাই তত্ত্ব অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি—সংগ্রামের একেবারে শুরু থেকেই যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা শ্রমিক শ্রেণীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু আমরা বলেছিলাম বিপ্লবী গণক্ষমতা বা লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার আগে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা যাবে না, এটা কেবল তার পরেই সম্ভব। এভাবে বিপ্লবের বিজয়ের জন্য যুক্তফ্রন্টের অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেছিলাম। ফলে আমাদের পার্টি কমরেডদের যুক্তফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তাই বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। এইভাবে জাতীয় বুর্জোয়া ও ধনী কৃষকদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের মধ্যে অস্বচ্ছতা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা ও করণীয় নিয়ে অন্য অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

৭। শহরাঞ্চলের সংগ্রাম বর্জন করার ভুল

আমরা সঠিকভাবেই বলেছিলাম, গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে জয়যুক্ত করতে হলে অনগ্রসর গ্রাম এলাকাগুলোকে জনগণের সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিরাট বিপ্লবী দুর্গে পরিণত করতে হবে। সুতরাং আমাদের কাজের ভারকেন্দ্র থাকবে গ্রামে।

চীনা পার্টিরও তাই ছিল। তা সত্ত্বেও মাও সেতুঙ বলেছিলেন, “গ্রামীণ ঘাঁটি এলাখার খাজখর্মে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মানে এই নয় যে শহরগুলোর এবং এখনো শত্রু দ্বারা শাসিত অন্যান্য বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলগুলোর খাজ পরিত্যাগ খরা; পক্ষান্তরে, শহরগুলোর ও অন্যান্য গ্রামাঞ্চলগুলোর খাজ ছাড়া গ্রামীণ ঘাঁটি এলাখা হয়ে পড়বে বিচ্ছিন্ন এবং বিপ্লবের ঘটবে পরাজয়। অধিখন্তু বিপ্লবের শেষ লক্ষ্য হচ্ছে শত্র“দের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে শহরগুলো দখল খরা; শহরাঞ্চলের পর্যাপ্ত খাজ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে না।”

আমরা চীন বিপ্লবের এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি নি। শহরাঞ্চল ও অন্যান্য বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলগুলোর কাজ পরিত্যাগ করেছিলাম। সেই সঙ্গে পরিত্যাগ করেছিলাম আমাদের রণনৈতিক কর্তব্য সম্পাদনের কাজও।

শহরাঞ্চলে রয়েছে শ্রমিক, আধা-শ্রমিক, পাতিবুর্জোয়া ও জাতীয় বুর্জোয়ারা, অর্থাৎ বিপ্লবের এক বিশাল মজুদ বাহিনী। এদের মধ্যে উপযুক্ত প্রচারমূলক ও মতাদর্শগত কাজ ছাড়া বিপ্লবের অগ্রবাহিনী তার কর্মী জোগান থেকে বঞ্চিত হয়। আর গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচিভিত্তিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ-বিরোধী আংশিক দাবির আন্দোলন ছাড়া অগ্রবাহিনী তার চারপাশে বিপ্লবের সহগামী হিসেবে কোটি কোটি জনগণকে এক বিপ্লবী ফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে গ্রামাঞ্চলের সশস্ত্র সংগ্রাম, গেরিলা অঞ্চল ও ঘাঁটি এলাকা হয়ে পড়ে মূল ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন।

তা ছাড়া ঢাকা শহরের চতুর্দিক দিয়ে যে শ্রমিক বেল্ট (বলয়) গড়ে উঠেছে সেখানে জড়ো হয়েছে প্রায় সারাদেশের তরুণ-তরুণীরা যাঁদের অধিকাংশই এখনো বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল ও সেখানকার কৃষকদের সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে বড় বড় বিভাগীয় শহরগুলো, এমনকি জেলাশহরগুলোও সারা দেশের গ্রামাঞ্চলের সংযোগসূত্র হিসেবে বিদ্যমান। তাই এইসব শহরগুলোতে উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিত কাজ অপেক্ষাকৃত দ্রুততার সঙ্গে আমাদেরকে সারা দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এবং সেখানেও আমাদের ফ্রন্ট লাইন প্রয়োগের এবং সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামের বিস্তার ঘটানোর সুযোগ এনে দেবে।

গণসংগঠন-গণসংগ্রাম বর্জন, যুক্তফ্রন্ট গঠনের কর্তব্য বর্জন এবং শহরগুলোতে উপযুক্ত কর্মকান্ড বর্জন এভাবে আমাদের সূচিত সশস্ত্র সংগ্রামকে ব্যাপক জনগণের সক্রিয় সমর্থন, সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে দেয়। আমাদের সূচিত সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবী উত্থানগুলো ব্যর্থ হওয়ার এটাও অন্যতম প্রধান কারণ।

এই বিচ্যুতির পিছনে যে রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছে তা ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। এই বিচ্যুতি শুধরানোর সময় এর পিছনের একটা মতাদর্শিক কারণও আমাদের মনে রাখতে হবে। সেটা হল আমরা যখন কোনো কর্তব্যকে ‘প্রধান বা সর্বপ্রধান কর্তব্য’ বলে উল্লেখ করি তখন আমাদের চিন্তাজগতে বিদ্যমান পাতিবুর্জোয়া মতাদর্শের একতরফাবাদ আমাদের ঐ কর্তব্যকে ‘একমাত্র’ কর্তব্য বলে ধরে নিতে প্ররোচিত করে। এবং অনেক ক্ষেত্রে এটা অবচেতনভাবেই ঘটে। ফলে প্রধান কাজকেও যে অনেকগুলো অপ্রধান কাজের সহায়তার উপর ভর করেই দাঁড়াতে হয় এটা আমরা ভুলে যাই। তাই সর্বহারা শ্রেণীর সচেতন নেতৃত্বের কর্তব্য হল—প্রথমত সব ক্ষেত্রেই প্রধান কর্তব্যের উল্লেখ করার সময় অপ্রধান কিন্তু অপরিহার্য কর্তব্যগুলোও স্মরণ করিয়ে দেওয়া বা সেগুলো অবহেলিত বা বর্জিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। দ্বিতীয়ত, একটা প্রধান আর একাধিক অপ্রধান কর্তব্যের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিষয়ে মতাদর্শগত শিক্ষাদান করা।

৮। আমাদের রাজনৈতিক-মতাদর্শিক-সামরিক-সাংগঠনিক এবং অর্থনৈতিক ও আর্থিক লাইনকে কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত না-করার ভুল

নয়াগণতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সারবস্তু হল কৃষি বিপ্লব। তাই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার জন্য মতাদর্শিক-রাজনৈতিক, সাংগঠনিক-সামরিক, অর্থনৈতিক-আর্থিক ও সাংস্কৃতিক লাইনসহ পার্টি কর্তৃক গৃহীত সমস্ত কর্মনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করে কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন। অন্যভাবে বললে এ-সমস্ত লাইন ও কর্মনীতিগুলোর প্রত্যেকটাই পরস্পর সংযুক্তভাবে কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচিকেই বাস্তবায়িত করার কাজে নিয়োজিত থাকে। কিন্তু আমরা এগুলোকে কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলাম। যেমন—

ক. ক্ষমতা চর্চার জায়গায় বিপ্লবী জনগণকে বসানো বাদ দিয়ে আমরা পার্টি কর্মীদের বসিয়ে দিয়েছিলাম, ফলে বিপ্লবী গণ-আদালত (বা বিপ্লবী গণ-ক্ষমতা) গড়ে তুলতে পারি নি, যা কৃষি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি।

খ. অধিকাংশ কর্মীকেই উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলাম। এই ভুল আর্থিক লাইন জনগণের উপর বোঝা হয়ে চেপে বসে আমাদেরকে বিপ্লবী জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।

গ. প্রকৃত কৃষক, প্রকৃত মৎস্যজীবী ও নারীদের বিপ্লবী গণসংগঠন গড়ার কর্তব্য সম্পাদন করি নি। ফলে ব্যাপক জনতা কৃষি কর্মসূচি বাস্তবায়নের সংগ্রামে সামিল হওয়ার মতো প্লাটফর্ম খুজে পান নি।

ঘ. বিপ্লবী কৃষক কমিটি বা বিপ্লবী গ্রাম কমিটি গঠন করি নি, যা বিপ্লবী রাজনৈতিক ক্ষমতার ভ্রণ এবং বিপ্লবী যুক্তফ্রন্টের বাস্তব প্রয়োগ।

. বিপ্লবী গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ হিসেবে বিকশিত না-করে খতমের সংগ্রামকে আমরা সংকীর্ণ অর্থনীতিবাদ ও সংস্কারবাদের পাঁকে আটকে ফেলেছিলাম—ফলে কর্মীরা মতাদর্শিকভাবে কৃষি বিপ্লব সফল করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার চেতনা অর্জনের দিকে না-গিয়ে অর্থ উপার্জনের নীতিহীন চেতনা লালনের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন, এবং এ-নিয়ে বিরোধের ফলে অভ্যন্তরীণ শত্রুও পয়দা হয়েছিল।

চ. দখলকৃত খাসজমিগুলো প্রকৃত কৃষকের মধ্যে বণ্টন করা হলেও সেগুলো তাঁদের হাতে যাতে থাকে তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। ফলে সেগুলো আবার অকৃষক মালিকদের হাতেই চলে গিয়েছে। দখলকৃত খাস জলাগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

ছ. ইজারাদারি-চাঁদাবাজি উচ্ছেদের সংগ্রামে জনগণকে শামিল না-করে হাট-ঘাট-বালু মহাল-বিল-বাগানের ইজারাদারদের কাছ থেকে পার্টি-ফান্ড কালেকশন করার নামে, ওগুলোর ইজারাদারি নিয়ন্ত্রণ করার কাজে লাগিয়ে দিয়ে কর্মীদের আমরা ইজারাদারি ও চাঁদাবাজির পথে ঠেলে দিয়েছিলাম এবং ঐপথে প্রাপ্ত অর্থে কর্মীদের প্রতিপালন করেছিলাম—এভাবে কর্মীদেরকে আমরা সামন্ত শোষণের অংশীদার করে ফেলেছিলাম, যা কর্মীদের নৈতিক অধঃপতনের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং পার্টিকে মূল জনগণ থেকে এবং কৃষি কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। বর্তমান বিপর্যয়ের পিছনে এটা ছিল অন্যতম প্রধান কারণ।

কেন এরকম হতে পেরেছিল? পাতিবুর্জোয়া ভাবাদর্শ ও সর্বহারা ভাবাদর্শের মধ্যকার পার্থক্যগুলো যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না-পারা এবং পাতিবুর্জোয়া ভাবাদর্শের সমস্ত প্রকার প্রকাশগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী ও নিয়মিত সংগ্রাম না-থাকার জন্য সেগুলো পার্টির মধ্যে শিকড় গেড়ে বসে। যার ফলে বিপ্লবের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাক্ত হয়ে গিয়ে আংশিক, একপেশে, একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল এক আপ্তবাক্য—‘বিপ্লবীরা কোনো শাশ্বত নীতিবোধে বিশ্বাসী নয়।’ কথাটা ঠিক হলেও আমরা এর ভিন্ন অর্থ করে আপ্তবাক্যের মতো আউড়ে গিয়েছিলাম এবং যথা ইচ্ছা ব্যবহার করেছিলাম।

‘বিপ্লবীরা কোনো শাশ্বত নীতিবোধে বিশ্বাসী নয়’—এই কথার অর্থ হল বিপ্লবীদের নীতিবোধ চিরস্থায়ী নয়। কোনো নীতিবোধই চিরস্থায়ী নয়, যুগের সাথে তাল রেখে সব নীতিবোধই পাল্টে যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বিপ্লবীদের কোনো নীতিবোধ নেই। বিপ্লবীদের নীতিবোধ বা নৈতিকতা কী? সামাজিক দায়বদ্ধতাই বিপ্লবীদের নৈতিকতা। এর অর্থ হল বর্তমান যে সমাজব্যবস্থা জনগণের উপর পাহাড় সমান ভারী বোঝা হয়ে চেপে বসে আছে সেই সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলে তার জায়গায় নতুন জনগণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অর্থাৎ বিপ্লব সাধন করাই আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু জনগণকে ঐক্যবদ্ধ না-করে (বিপ্লবের চালিকা শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ না-করে) বিপ্লব সাধন করা যায় না; আর বিপ্লবী কর্মসূচি বাস্তবায়নের সংগ্রামে জনগণকে শামিল করা ছাড়া জনগণকে ঐক্যবদ্ধও করা যায় না। তাই বিপ্লবীদের নৈতিকতা হল বিপ্লবের স্বার্থ আর জনগণের ঐক্য, যা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সংগ্রামের ভিতর দিয়ে মূর্তরূপ ধারণ করে।

এই নৈতিকতার উল্লেখ না-করে আমরা যখন বলি ‘বিপ্লবীদের কোনো শাশ্বত নীতিবোধ নেই’ তখন, পাতিবুর্জোয়া ভাবাদর্শের চিন্তা-পদ্ধতিতে অভ্যস্ত এবং প্রায় কোনো মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী রাজনৈতিক-মতাদর্শিক শিক্ষা না-থাকা কেডাররা ধরেই নেন যে, বিপ্লবীদের কোনো নীতিবোধ নেই। যে রকম ‘অন্যতম প্রধান কর্তব্য’কে আমরা ‘একমাত্র প্রধান কর্তব্য’ বলে ধরে নিয়েছিলাম, (যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে)। ফলে আমরা যখন শাশ্বত নীতিবোধ নেই বলে, কর্মীদের ইজারাদারি-চাঁদাবাজির অর্থের উপর কর আরোপ করা ও তা আদায় করার কাজে নিয়োজিত করি, তখন কার্যত তাঁদেরকে আমরা ওগুলো উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে নির্ধারিত গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি  বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে এবং ঐ লক্ষ্যে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিই অর্থাৎ বিপ্লবী নৈতিকতার বিরুদ্ধেই দাঁড় করিয়ে দিই।

এমনটা ঘটতে পারার আরো একটা কারণ হল—বিপ্লবের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তা কোথা থেকে আসবে—এই প্রশ্নে আমাদের কোনো স্বচ্ছ ধারণা না-থাকা। এ-বিষয়ে আমাদের ধারণা এখনো খুব একটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। তবে আমাদের একাধিক বিপর্যয় ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে যে শিক্ষা সামনে চলে এসেছে তার কিছু এখানে উল্লেখ করছি।

মূল বিষয়টা হল বিপ্লব পরিচালনার জন্য যে আর্থিক প্রয়োজন সেটা সংগ্রহ করতে হবে কৃষি কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্টি যে অর্থনৈতিক লাইন প্রয়োগ করবে তার মাধ্যমে। কৃষি কর্মসূচি বাস্তবায়নের মূল কাজ হল বিপ্লবী গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। আর এই বিপ্লবী গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য মূলকাজ দুটো—এক, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সফলভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করার ভিতর দিয়ে পরিকল্পিত অঞ্চলের কৃষি বেল্ট থেকে বিদ্যমান রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে উচ্ছেদ করা; দুই, বিভিন্ন ধরনের বিপ্লবী গণসংগঠন ও গণআন্দোলনের ভিতর দিয়ে বিদ্যমান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে উচ্ছেদ করা। প্রথম কাজটা একটা শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর জন্ম দেবে, আর দ্বিতীয় কাজটা একটা শক্তিশালী যুক্তফ্রন্টের জন্ম দেবে। এই দুই শক্তির সম্মিলনই বিপ্লবী গণক্ষমতার জন্ম দেবে। আর এই বিপ্লবী গণক্ষমতাই হাট-ঘাট-জলা থেকে সমস্ত ইজারাদারি শোষণের উচ্ছেদ করবে; জলা জমি দখল ও বণ্টনের ভিতর দিয়ে মূল উৎপাদক জনগণের যৌথ উৎপাদন শুরু করবে; এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে জনগণের অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলবে। আমাদের অর্থ সংগ্রহের লাইন এই কর্মসূচির বিরোধী যাতে না-হয় সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে। বরং এই কর্মসূচিতে বিধৃত আর্থিক লাইন প্রয়োগের ভিতর দিয়েই আমাদের প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। এ-ব্যাপারে অন্যান্যদের পরামর্শও আমাদের প্রয়োজন।

৯। বেঠিক আন্তঃপার্টি সংগ্রামের লাইন প্রয়োগ করার ভুল

মাও সেতুঙ আমাদের শিখিয়েছেন, বিপ্লব সাধনের প্রয়োজনে সর্বহারা মতাদর্শের আলোকে পরিচালিত হলে যেমন একটা সঠিক রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ করা যায়; ঠিক তেমনি সঠিক রাজনৈতিক লাইনের সহায়ক এবং পার্টির ভিতরকার ও বাহিরের উভয় জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক-বন্ধন গড়ে তোলা ও বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় একটা সাংগঠনিক লাইনও নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু বিপ্লব সাধনের ক্ষেত্রে সর্বহারা মতাদর্শের পাশাপাশি একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পাতিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের মতাদর্শের আলোকেও পরিচালিত হলে, যেমন রাজনৈতিক লাইন ও তা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটা নির্দিষ্টমাত্রায় ‘বামপন্থি’ বিচ্যুতি দেখা দেয়; ঠিক তেমনি উক্ত ‘বামপন্থি’ রাজনৈতিক লাইন ও তার প্রয়োগ পদ্ধতির সহায়ক এবং পার্টির ভিতরকার ও বাহিরের উভয় জনগণের সঙ্গে থাকা ঘনিষ্ট সম্পর্ক বন্ধনগুলো ক্রমে ক্রমে ভেঙ্গে দিয়ে তাঁদেরকে দূরে ঠেলে দেওয়ার উপযোগী একটা বেঠিক ‘বামপন্থি’ সাংগঠনিক লাইনও গড়ে উঠতে দেখা যায়।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে ১৯৩১ সালের শুরু থেকে ১৯৩৪ সালের শেষ অবধি পরপর তিনবার তিনটে ‘বামপন্থি’ রাজনৈতিক লাইন দেখা দিয়েছিল, পাশাপাশি উক্ত ‘বামপন্থি’ রাজনৈতিক লাইনগুলোর সহায়ক ‘বামপন্থি’ সাংগঠনিক লাইনও দেখা দিয়েছিল। ১৯৩৫ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মাও সেতুঙের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে চীনা পার্টি উক্ত ‘বামপন্থি’ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক লাইনগত বিচ্যুতিগুলো কেমন করে শুধরে নিয়েছিল তা থেকে আমাদেরও শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যত্র আমরা এ-নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। তবে এখানে আমরা আমাদের আগেই উল্লেখ করা ‘বামপন্থি’ রাজনৈতিক লাইনগত বিচ্যুতির সহায়ক ‘বামপন্থি’ সাংগঠনিক লাইনগত বিচ্যুতিগুলোকে চিহ্নিত করব, যেগুলো প্রকাশিত হয়েছে ভ্রান্ত অন্তঃপার্টি সংগ্রামের লাইন হিসেবে।

আমরা দেখেছি, সমাজ পরিবর্তনের মতবাদ বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলে পার্টিতে বিভিন্ন মতপার্থক্য দেখা দেয়। এই মতপার্থক্যগুলো হল সমাজে বিদ্যমান শ্রেণী সংগ্রামের প্রতিফলন। শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষেরা এসে যোগ দেন বলে এবং তাঁরা সকলেই প্রধানত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী কর্তৃক অবরুদ্ধ থাকেন বলে এমনটা ঘটা খুবই স্বাভাবিক। প্রাথমিকভাবে এটা ক্ষতি কারকও নয় বরং সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শগত অবস্থান থেকে দীর্ঘমেয়াদী ও ধৈর্যশীল প্রক্রিয়ায় নীতিনিষ্ঠভাবে অন্তঃপার্টি সংগ্রাম হিসেবে একে পরিচালিত করতে পারলে উক্ত মতপার্থক্যসমূহ নিরসন করে পার্টি মতাদর্শগতভাবে আরো সংহত হয়ে ওঠে। কিন্তু বেঠিক মতাদর্শিক অবস্থান থেকে বেঠিক পদ্ধতিতে এই অন্তঃপার্টি মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করলে, উক্ত মতপার্থক্যসমূহ পার্টির মধ্যে অনৈক্য, বিচ্ছেদ আর উপদলীয় ঝোঁক হিসেবে বেড়ে উঠতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পার্টিকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলে।

আমরা আমাদের দেশের সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবী সংগ্রামের পার্টিগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হতে দেখেছি। সেই সঙ্গে এও দেখেছি ভাঙনের সময় একে অপরকে দোষারোপ করছেন, আর সমর্থক জনগণ সকলকেই দোষারোপ করছেন, আর একেক জন একেক কারণকে সামনে টেনে আনছেন। কিন্তু ভাঙনের, বিশেষত বিপ্লবী পার্টিগুলোর ভাঙনের, প্রধান কারণটা নিহিত থাকে তার সাংগঠনিক লাইনের তথা অন্তঃপার্টি মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনার লাইনের মধ্যে, আর এসব ক্ষেত্রে দায়দায়িত্বটা থাকে প্রকৃত পক্ষে মূল নেতৃত্বের।

আমরা আমাদের পার্টিতে যে বেঠিক অন্তঃপার্টি সংগ্রামের লাইন অনুশীলন করেছিলাম তার প্রকাশগুলো—

১. যে কোনো ধরনের বিরোধিতাকেই শত্র“তা বলে গণ্য করা হত। এর ফলে বৈরী দ্বন্দ্ব ও অবৈরী দ্বন্দ্বের মধ্যকার পার্থক্য গুলিয়ে যেত এবং অবৈরী দ্বন্দ্ব নিরসনের ক্ষেত্রে বৈরী দ্বন্দ্ব নিরসনের পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে যেত। মতপার্থক্য নিরসনের প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার সময়ই ভুল মত বা ভিন্নমতকে সংশোধনবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রোশপূর্ণ ভঙ্গিতে আলোচনা-সমালোচনা করা হত। অর্থাৎ আলাপ-আলোচনার শুরুতেই সমালোচনার সময় একজন কমরেডকে বিপ্লবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মৌলিক নীতি থেকেই সরে যাওয়া হত।

২. ভিন্নমত বা বিরোধী মতের উপর, বিশ্লেষণাত্মক ও শিক্ষামূলক আলাপ-আলোচনার প্রসার ঘটানোর পরিবর্তে, উক্ত মতের প্রবক্তার উপর (দক্ষিণ পন্থি) সুবিধাবাদী, শ্রেণী-সমন্বয়বাদী, মধ্যপন্থি, সামন্তবাদী ইত্যাদি লেবেল সেটে দেওয়াকেই প্রাধান্য দেওয়া হত। এর ফলে বিভিন্ন মতবাদের শ্রেণী প্রকৃতি বা সামাজিক উৎস সম্পর্কে পার্টির মধ্যকার জনগণের মধ্যে গভীর উপলব্ধি গড়ে ওঠার পরিবর্তে লেবেল দেখে দেখে বিভিন্ন কমরেডকে হয় বিপ্লবী, নয় সুবিধাবাদী এভাবে চিহ্নিত করার অতি সরলীকৃত একতরফা মনোভাব গড়ে উঠত; যা অনৈক্য, বিভেদ উপদলীয় মনোভাবের ভিত্তিভূমি তৈরিতে সহায়তা করেছিল।

৩. বিভিন্ন সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করা হত। যেমন—

ক) ‘সত্য প্রায়শ অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে নিহিত থাকে’—এই বক্তব্যকে হাতিয়ার করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় মূল নেতৃত্ব সংখ্যালঘু হয়ে পড়লে, ‘আমরা যেহেতু সঠিক তাই বেঠিক মতকে অমান্য করার নৈতিক অধিকার আমাদের রয়েছে’—এই কথা বলে ‘সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরুর অধীন’—এই নীতি লঙ্ঘন করা হত।

খ) সম্পাদকের নির্দেশ কমিটির অন্য সকলকে মেনে চলতে হবে, কার্যকলাপ সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য প্রচলিত এই বিধানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে সম্পাদক কমিটির অধীন নয় বরং কমিটিই সম্পাদকের অধীন এই ধরনের এক মনোভাব সৃষ্টি করে ফেলা হয়েছিল। এভাবে ‘ব্যক্তি সংগঠনের অধীন’ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার এই মৌলিক নীতিকে অনেক ক্ষেত্রেই লঙ্ঘন করা হয়েছিল।

গ) কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চতর কমিটির প্রতিনিধি নিম্নস্তরে গিয়ে উচ্চস্তর কর্তৃক সার্বিক দায়িত্ব্প্রাপ্ত ব্যক্তিকে পাশ কাটিয়ে, নিম্নস্তরের অন্যান্য কমরেডদের অভিযোগের ভিত্তিতে, উচ্চতর কমিটির অনুমোদনের তোয়াক্কা না-করে, উচ্চতর কমিটির সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতেন। এভাবে ‘নিম্নস্তর উচ্চস্তরের অধীন’ এই মৌল নীতিকে লঙ্ঘন করা হয়েছিল।

ঘ) বিশেষ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির সুবিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তকে খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে বেঠিক বলে চিহ্নিত করে অমান্য করার উদাহরণও সৃষ্টি করা হয়েছিল। এভাবে ‘সমগ্র পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির অধীন’ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার এই মৌলিক নীতিকেও লঙ্ঘন করা হয়েছিল।

৪. সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার মধ্যে সমালোচনাই প্রধান—এই কথা বলে নেতৃত্বের দিক থেকে আত্মসমালোচনার মনোভাবকেই বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে কর্মীদের সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নেতাদের নিজেদেরকে শুধরে নেওয়ার মনোভাব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এভাবে ক্রমাগত রূপান্তরের ভিতর দিয়ে নেতৃত্বের বিকশিত হওয়ার রাস্তাটা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

৫. বিরোধী মতের বেঠিক কার্যকলাপকে রাজনৈতিক-মতাদর্শিকভাবে প্রতিহত না-করে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রমূলক পদ্ধতিতে অসাংবিধানিকভাবে প্রতিহত করার মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল। উচ্চতর কমিটির সম্পাদক সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কমরেডের অনুপস্থিতিতে নিম্নতর কমিটির অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে নিু কমিটির একজন সদস্যকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং উচ্চতর কমিটির অনুমোদন না-নিয়ে, সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কমরেডকে না-জানিয়ে, নিম্ন কমিটির উক্ত সদস্যকে বহিষ্কার না-করেই, বৈঠকের নাম করে ডেকে নিয়ে এসে হত্যা করে ফেলেন। কেবলমাত্র একটা ক্ষেত্রে ঘটলেও তীব্র সমালোচনার মুখেও উচ্চতর নেতৃত্ব যখন এর জন্য আত্মসমালোচনা করতেও অস্বীকার করেন, তখন অন্তঃপার্টি সংগ্রাম পরিচালনার যে নেতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি হয় তার একটাই হাজারটার শক্তি নিয়ে পার্টিকে ভিতর থেকে মারণ আঘাত হানতে শুরু করে।

এভাবে বিরোধিতাকে মারাত্মক শাস্তি দিয়ে এবং অন্ধ আনুগত্য ও বশীভূত হয়ে থাকার মনোভাবকে নানানভাবে পুরস্কৃত করে প্রাণবন্ত ও সৃজনশীল মার্কসবাদী কর্মরীতির বিকাশকে বাধাগ্রস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল। ফলে একটা ভ্রান্ত ধরনের অন্তঃপার্টি সংগ্রামের রীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কর্মীদের প্রতি একটা উপদলীয় নীতিও। সেই উপদলীয় মনোভাবগুলো প্রকাশ পেয়েছিল নিম্নরূপভাবে—

ক. প্রবীণ কমরেডদের পার্টির অমূল্য সম্পদ বলে গণ্য না-করে তাঁদেরকে আক্রমণ করা ও শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।

খ. কাজেকর্মে সুঅভিজ্ঞ ও জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কবিশিষ্ট যেসব প্রবীণ কমরেড উপদলীয় হতে বা জো-হুকুম বনতে অস্বীকার করেছিলেন তাঁদের কাউকে কাউকে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক সংগঠন থেকে পদচ্যুত করা হয়েছিল।

গ. নতুন কর্মীদের যাঁরা উপদলীয় নেতৃত্বের পক্ষে মনঃপুত ছিলেন এবং তাঁদের একেবারে অন্ধ অনুগামী ও জো-হুকুম ছিলেন, কিন্তু যাঁদের বাস্তব কাজকর্মের অভিজ্ঞতার অভাব এবং জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগের অভাব ছিল, তাঁদেরকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত না-করেই, অবিবেচকের মতো কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক সংগঠনে এনে ঢুকানো হয়েছিল।

এইভাবে প্রবীণ কমরেডদের আক্রমণ করা হয়েছিল, আর নবীন কর্মীদের ভালো বিপ্লবী হয়ে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকেও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল।

৬. কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক-মতাদর্শিক অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনার ভিতর দিয়ে মতপার্থক্য নিরসন সম্ভব না-হলে, ভোটাভুটিতে যখন ৩:২ বা ৪:৩ ভোটে সিদ্ধান্ত গৃৃহীত হত তখন ‘বামপন্থি’ রাজনৈতিক লাইনের প্রবক্তার মত সংখ্যালঘু হয়ে গেলে, তিনি গোটা কমিটিকে কনভিন্স করার উদ্দেশ্যে গুরুতর রাজনৈতিক-তাত্ত্বিক কাজকে প্রাধান্য না-দিয়ে সংখ্যাগুরু পক্ষের নেতাদের মধ্য থেকে দুর্বল বা দোদুল্যমান একজনকে কনভিন্স করার (বুঝিয়ে শুনিয়ে স্বমতে নিয়ে আসার) চেষ্টা করতেন; এবং পরবর্তী অধিবেশনে মতাদর্শিক আলাপ-আলোচনা ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে খুব একটা গুরুত্ব না-দিয়ে পুনরায় ভোটাভুটি করে ৩:২ ভোটকে ২:৩ ভোটে বা ৪:৩ ভোটকে ৩:৪ ভোটে পাল্টে দিয়ে স্বমতের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতেন।

স্বভাবতই এই পদ্ধতিতে কোনো মতপার্থক্য নিরসন হত না। তখন কেন্দ্রে অমীমাংসিত হওয়ার পর সংখালঘু পক্ষ দাবি করলে, তাঁদের মতামত কেন্দ্রীয় অভিমতসহ সারা পার্টিতে প্রচারের যে স্বীকৃত বিধান রয়েছে সেই অনুযায়ী প্রচারের সিদ্ধান্তে নেওয়া হত; কিন্তু কার্যত উক্ত বিরোধী মতামত প্রচার না-করে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হত। ফলে পার্টিতে বিদ্যমান মতপার্থক্যসমূহ নিরসন করে সমগ্র পার্টিকে মতাদর্শগতভাবে আরো সংহত করে তোলার কাজটা মারাত্মকভাবে অবহেলিত থেকে যেত।

৭. এ-ছাড়া অনেক সমস্যার সমাধান পার্টি কমিটির সভায় স্থির না-করে সম্পাদক কমিটির অন্য একজন বা দুইজন সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করেই স্থির করতেন এবং অন্যান্য সকলকে তা না-জানিয়ে কার্যকরীও করে ফেলতেন। অন্যান্য সদস্যরা জানতেন কার্যকরী হওয়ার পর। এভাবে ‘ব্যক্তি বিশেষের একচেটিয়া হয়ে পড়া’ এবং ‘পাটি কমিটির সদস্যপদ নামমাত্র হয়ে পড়া’র  ভিতর দিয়ে কমিটি সদস্যদের মধ্যকার মতানৈক্য মীমাংসিত না-হয়ে দীর্ঘকাল অমীমাংসিত হয়ে পড়ে থাকত। ফলে পার্টি কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কেবল আনুষ্ঠানিক ঐক্য বজায় রাখতেন, প্রকৃত মতাদর্শিক ঐক্য, যার ভিত্তিতে গোটা পার্টি ‘ঐক্যবদ্ধ সংকল্পের প্রতীক’ হয়ে ওঠে, তা অর্জন করা যেত না। এই রীতি দীর্ঘকালব্যাপী চলে একটা ধারায় পরিণত হয়েছিল। ফলে এই রীতি কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়িয়ে নিচের কমিটিগুলোতেও চালু হয়ে গিয়েছিল। নেতৃত্বের দাবি ছিল—সঠিক নীতি কার্যকরী করার জন্যই এগুলো করা হত। আদতে এর ভিতর দিয়ে বেঠিক মতাদর্শিক-সাংগঠনিক লাইন পার্টিতে আসন গেড়ে বসার সুযোগ পেয়েছিল।

যেকোনো ধরনের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রয়োজন হল পার্টির নেতা-কর্মীদের শিক্ষিত করে তোলা, সহনশীল ও শিক্ষাদানের মনোভাব নিয়ে ভিন্নমতের সমালোচনা করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে চলা, এমন কি ভুল সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও ভয় না-পাওয়া। গ্র“পিং-লবিং-এর পদ্ধতি, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রমূলক পদ্ধতি, নির্মম সংগ্রামের পদ্ধতি, কিম্বা যে কোনো অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি এই সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বরং পার্টিতে মতাদর্শিক ঐক্য ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে বেঠিক প্রবণতা সৃষ্টি করে এবং পার্টির মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ ও উপদলীয় ঝোঁককে জিইয়ে রাখে।

মতপার্থক্য নিরসনের জন্য অন্তঃপার্টি সংগ্রামের এইসব অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু থাকাকালীন নেতৃত্বের উপর আস্থা থাকা পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাক আছে বলে মনে হতে থাকলেও বাস্তবে কোনো জটিল পরিস্থিতি বা জটিল সমস্যা সৃষ্টি হলেই অবধারিতভাবে পার্টিতে অনৈক্য, বিভেদ ও উপদলীয় প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে মতাদর্শিক শিক্ষা না-দিয়ে গ্র“পিং-লবিং বা চক্রান্তমূলক পদ্ধতিতে যে ভুল ঝোঁকগুলো মোকাবেলা করতে চাওয়া হয়েছিল সেগুলো দূর তো হয়ই না, বরং ভুল ঝোঁকের প্রবক্তারাই নিজেদের আমলাতান্ত্রিকতা ও চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের শিকার বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে পার্টিতে বিস্তর বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে যান। পার্টি ভেঙ্গে তিন টুকরো হওয়া এবং পার্টিকে ‘ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছাশক্তির মূর্ত প্রতীক’ হিসেবে গড়ে তুলতে না-পারার কারণ এগুলোই।

এখানে আমরা আমাদের ১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ এই চার বছর এবং ৯০-এর দশক ও এই শতাব্দীর প্রথম দশকের গোড়ার পাঁচ বছর মিলে সর্বোমোট প্রায় দুই দশকের (মাঝের সময়গুলো ধরলে প্রায় চার দশকের) বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগ্রাম ও মতাদর্শগত সংগ্রামগুলোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেছি। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করতে হলে এই অভিজ্ঞতাগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা থেকে যে সমস্ত শিক্ষা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, নিচে সেগুলো সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হল। পরবর্তীতে পার্টি কর্মীদের ব্যাপকভাবে শিক্ষিত করে তোলার জন্য এগুলোর উপর বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক পুস্তিকা প্রকাশ করা হবে।

*****

সূত্রঃ  

রাকেশ কামাল(ডাঃ টুটু) রচনাসংগ্রহ

(দলিল সংকলন)

শ্রাবণ প্রকাশনী