বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষির সমস্যা

FMS2-1427781954

বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষির সমস্যা

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ।  মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০% এখনো গ্রামে থাকেন।  যদিও জাতীয় আয়ের বড় অংশ এখন আর কৃষি নয়, কিন্তু কৃষির সাথে জড়িত দেশের নিরংকুশ প্রধান অংশের জনগণ।  কৃষির সাথেই তাদের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে। এমনকি যারা শহরে বিভিন্ন ধরনের পেশায় জড়িত, তারাও কৃষি ও কৃষকের সমস্যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন।
শহরাঞ্চলের ৩০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিক, ৪০ লক্ষ রিক্সা ভ্যান-শ্রমিক, লক্ষ লক্ষ অন্যান্য মজুর, ফেরিওয়ালা, এমনকি সাধারণ মধ্যবিত্তদেরও বিরাট অংশ এখনো গ্রাম কেন্দ্রীকই রয়ে গেছেন। সুতরাং, এটা অনস্বীকার্য যে, গ্রাম, কৃষি ও কৃষকের মুক্তি ও উন্নয়নের উপরই সমগ্র দেশ ও জনগণের মুক্তি নিহিত।
কিন্তু বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের পরিস্থিতিটা কী?
টেলিভিশনের পর্দায় কিছু সংখ্যক ভাগ্যবান কৃষক ও কৃষি-বুর্জোয়ার উন্নতির কাহিনী ছাড়া বাস্তবে ব্যাপক কৃষক জনগণের ভাগ্যের-যে কোন মৌলিক পরিবর্তন হয়নি তা প্রায় সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন।
বৃটিশ ও জমিদারী আমলে কৃষকের সমস্যা যে ধরনের ছিল এখন অবশ্য সেরকমটি নেই।  কিন্তু শোষণ-বঞ্চনা থেকে কৃষকের মুক্তি ঘটেনি।  খোদ কৃষকের একটা বড় অংশের হাতে তেমন একটা জমি নেই।  জোতদার, কৃষি বুর্জোয়া, ধনী কৃষক, অকৃষক শহুরে ভদ্রলোক, মাছ-মুরগী-ফল খামারের ধনী মালিক, এবং রাষ্ট্র- এদের হাতে ব্যাপক কৃষি-জমি জমা হয়ে রয়েছে।  জমির বড় অংশ চলে যাচ্ছে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, হাউজিং প্রজেক্ট, ইটখোলা, চিংড়ী চাষ এবং শিল্প-কারখানার নামে বড় বড় ধনী, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় কোম্পানী ও তাদের রাষ্ট্রের হাতে।  জলা-পুকুর-খাল-নদী-হাওর-বাওড় প্রভৃতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।  হাট-বাজার-নদী-ঘাট-জলাশয়-হাওর ইত্যাদির ইজারাদারী কৃষকের জীবন-জীবিকার উপর বড় বোঝা হয়ে রয়েছে।
কৃষকের উপর মহাজনী শোষণও অব্যাহত রয়েছে ভিন্ন রূপে।  আদি মহাজনের স্থান দখল করেছে এনজিওগুলো, যারা ক্ষুদ্র ঋণের নামে এক বিরাট সুদী কারবারের জাল বিছিয়ে রেখেছে সারা দেশ জুড়ে।  এভাবে কৃষকের শ্রমের ফলের একটা বড় অংশ তারা লুটে নিচ্ছে।  এর সাথে পুরনো ধরনের সুদের ব্যবসাও চলছে। ফলে কৃষক বিপদে পড়ে ঋণে জর্জরিত হচ্ছেন।  এক্ষেত্রে রাষ্ট্রও ভাগ বসাচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ আনতে কৃষককে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে।
কৃষকের নতুনতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে কৃষির উন্নয়নের নামে।  সেচ, সার, কীটনাশক, চাষ- সবকিছুতে ‘উন্নত’ প্রযুক্তি ঢুকে পড়েছে।  কিন্তু এর ফল যাচ্ছে বড় ব্যবসায়ী, এবং সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় কোম্পানীগুলোর হাতে। অন্যদিকে এর ফলে কৃষকের বেকারত্ব আরো বেড়ে গেছে।  তারা কাজের আশায় শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। পুরুষেরা রিক্সা-ভ্যান চালানো, ফেরিওয়ালার কাজ, ক্ষুদে ব্যবসা বা দোকানদারী, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক হচ্ছেন।  বৌ-ঝিদেরকে শহরের গার্মেন্টস, বাসা-বাড়ির কাজে পাঠাতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।  এমনকি সর্বস্বান্ত হয়ে অনেক গ্রামীণ নারী দেশে ও ভারত-পাকিস্তান-মধ্যপ্রাচ্যে পতিতাবৃত্তিতে নাম লিখাচ্ছেন; অনেক সর্বস্বান্ত কৃষক ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিচ্ছেন; অনেক তরুণ হাইজ্যাক, চাঁদাবাজি, মাস্তানী, চুরি-ডাকাতিতে নেমে পড়ছেন।  অনেকে জমি-জিরাত বিক্রি করে লাভের আশায় আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে কঠোর পরিশ্রম, অবমাননা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
কৃষকের আরো বড় সমস্যা হয়েছে কৃষি বাজার-নির্ভর হয়ে পড়াতে।  কৃষি পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বড় বড় ব্যবসায়ীরা, যারা আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র মত বুর্জোয়া পার্টি এবং পুলিশ-আমলাদের সহযোগিতায় ও তাদেরকে বখরা দিয়ে সিন্ডিকেট গঠন করে থাকে।  তারা কৃষকের উৎপাদিত ফসল পানির দামে কিনে নিচ্ছে এবং পরে বেশি দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে।  আবার কৃষি উপকরণের ব্যবসাও তারা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, কৃষকরা বিরাটভাবে শোষিত হন।
রাষ্ট্র ও বুর্জোয়ারা কৃষির উন্নতি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বড় বড় বুলি আওড়ালে কী হবে, বাস্তবে কৃষি আরো বেশি করে বিদেশ নির্ভর হয়ে গেছে।  কৃষির উপকরণাদি আজ কৃষকের হাতের বাইরে।  আজ কৃষককে ও জনগণকে তেল, ডাল, পেঁয়াজ, চিনি, মাছ সবই বাজার থেকে কিনতে হয়, যার প্রধান/বিরাট অংশ বিদেশ থেকে আসে।  কৃষির উন্নয়নের নামে পরিবেশ, প্রকৃতি ও কৃষির এমন বিকৃতি ঘটানো হয়েছে যে, প্রাকৃতিক মাছ আজ বিলুপ্ত প্রায়; মাছে-ভাতে বাঙালি আজ বহু বিচিত্র মাছের নামটিও ভুলতে বসেছে।  ভেজাল সার ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাইব্রিডের নামে ফসলের বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।  নদী-খাল-পুকুর-জলাশয় ভরে যাচ্ছে।  বৃষ্টির পানি আশির্বাদের বদলে কষ্টের বন্যা ডেকে আনছে।  পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। বনাঞ্চল ধবংস হয়ে গেছে।  পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। নদীভিত্তিক যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা বিলুপ্তির পথে। এ সবকিছুর সাথেই কৃষকের পেশা ও ভাগ্য জড়িত।
যে ভারত দেশের প্রায় সমস্ত বড় নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে নদী-পানি-প্রকৃতি ও কৃষির সর্বনাশ করেছে, তাকে শাসকরা বলছে বন্ধুরাষ্ট্র।  বড় ধনীদের পার্টি ও রাষ্ট্রের এই ‘বন্ধু’র দেয়া ফারাক্কা, তিস্তার পর এখন টিপাইমুখ বাঁধ বাংলার মানুষের গলায় ফাঁস হয়ে ঝুলছে, আর শাসকশ্রেণীর বর্তমান আওয়ামী সরকার ভারতের এ কাজে নিঃশর্ত সহযোগিতা করে বিদেশি-দালালীর এক অনন্য নজির স্থাপন করছে।
প্রকৃতপক্ষে কৃষকের সমস্যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।  তবে কৃষি ও কৃষকের সমস্যাই সারা দেশের সমস্যাবলীর কেন্দ্রে।  তাই, কৃষকের মুক্তির উপরই দেশের সামগ্রিক মুক্তি নির্ভর করে।
কিন্তু এটা দিবালোকের মতই স্পষ্ট যে, শাসক বড় ধনী শ্রেণি, যারা বিদেশি শোষক বুর্জোয়াদের দালালী করে, তাদের ক্ষমতা ও রাষ্ট্র কৃষকের প্রকৃত মুক্তি আনতে সক্ষম নয়।  বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিগত ৩৯ বছর ধরে এটা প্রমাণিত হয়েছে।  পাকিস্তান আমলে পাট-চাষে কৃষকের শোষিত হওয়ার কথা বলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল।  আর এখন এই বাঙালি শাসক ও তাদের বিদেশি প্রভুদের শোষণ-লুণ্ঠনে গোটা পাট-শিল্পটিই প্রায় সম্পূর্ণ ধবংস হয়ে পড়েছে।  এর কারণ হলো, কৃষক-বান্ধব কোন শ্রেণি, সরকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এগুলো হলো শহরকেন্দ্রীক বড় বড় ধনী ব্যবসায়ী, আমলা, বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের স্বার্থরক্ষাকারী। কৃষক যাতে একেবারে মরে না যায়, এবং বিদ্রোহে সামিল না হয়, সেজন্য তারা কৃষককে কিছু কিছু উপকার করার ভান দেখায়। কিন্তু এসব চুনকামে কৃষকের ও কৃষির কোন বিপ্লবী রূপান্তর ঘটবে না। কৃষকের প্রকৃত মুক্তির জন্য ব্যাপক সংখ্যাগুরু দরিদ্র কৃষককে সমাজতন্ত্রের পথে যেতে হবে; আর সেজন্য প্রথমে সকল প্রকৃত কৃষক ও দেশপ্রেমিক মানুষের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।  কৃষক রাষ্ট্রক্ষমতা পেলেই মাত্র তার নিজের মত করে কৃষিকে পুনর্গঠন করতে পারবে। যাতে কৃষক, কৃষি, ব্যাপক জনগণ ও দেশের মুক্তি আসবে। এজন্য কৃষকের ছদ্মবেশী শত্র“ বড় ধনী শ্রেণীর বুর্জোয়া পার্টিগুলোর খপ্পর থেকে তাদেরকে বেরিয়ে এসে শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মধ্যবিত্তের রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। কৃষককে আজ এ পথেই এগিয়ে আসতে হবে।  সচেতন হতে হবে। সংগঠিত হতে হবে। লড়াই-এর ময়দানে নামতে হবে।  

সূত্রঃ  কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, প্রকাশকঃ কৃষক মুক্তি সংগ্রাম