বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবন- দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও শাসক শ্রেণি

Bangladeshi-female-migrant-workers

বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবন দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও শাসক শ্রেণি

 

মধ্যযুগে ইউরোপ থেকে সাদা চামড়ার বিত্তশালী মানুষরা আফ্রিকায় গিয়ে বন্দুকের ডগায় জোর কারে কালো নারী-পুরুষদের ধরে ধরে জাহাজে করে ইউরোপে নিয়ে দাস মালিকদের কাছে বিক্রি করত। আজকের বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সে বর্বরতার রূপের দিক থেকে কিছু পরিবর্তন হলেও সারবস্তুগত কোনই পরিবর্তন হয়নি। আধুনিক সভ্য সমাজে মানুষ পাচারের কাহিনী ভিন্ন। জনশক্তি রপ্তানির নামে বিদেশে দরিদ্র নারী-পুরুষদের বেশুমার পাচার করে দেশী-বিদেশী দালালচক্র কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুটছে। এই দালাল চক্র আর কেউ নয় দেশের এবং বিদেশের পুঁজিপতি শাসক শ্রেণিরই অংশ।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর এ দেশের শাসকশ্রেণি দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসংস্থান করতে ব্যর্থ হয়ে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানী করছে। এই সুবাদে দেশে এবং বিদেশে গড়ে উঠে বৈধ-অবৈধ হরেক রকমের রিক্রুটিং এজেন্সি। এরা আদম ব্যবসায়ী নামে পরিচিত। এই আদম ব্যবসায়ী দালাল চক্র উন্নত জীবন, ভালো চাকরী, মোটা অংকের বেতন ইত্যাদির  লোভ দেখিয়ে দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের বিদেশগামী করে। ’৮০’র দশক থেকে শুরু হওয়া এই মানব পাচার একবিংশ শতাব্দিতে জনস্রোতে রূপান্তরিত হয়। এই মানব পাচারে নারী পাচারও চলে সমান তালে। দরিদ্র নারীরা এই প্রলোভনে পড়ে ভিটে-মাটি বিক্রি বা ঋণ করে লক্ষ লক্ষ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়।

গৃহকর্মী, হাসপাতালের আয়া, নার্স, গার্মেন্ট শ্রমিক বা অন্যান্য শ্রমজীবী পেশার, এমনকি বিয়ের প্রলোভনে ফেলেও হাজার হাজার নারীকে  দেশ থেকে পাচার করা হচ্ছে। এই নারীদের পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করা হচ্ছে বা পতিতা হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আর যারা শ্রমিক হিসেবে পেশায় নিয়োজিত হতে পারছেন তারাও নানাভাবেই শোষণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, বিশেষত যৌন নির্যাতনের শিকার।

গৃহকর্মী বা অন্যান্য পেশার নামে দালাল চক্র হাজার হাজার দরিদ্র নারী ও শিশুদের ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে  পাচার করছে। মালয়েশিয়ায়ও যে পাচার করা হচ্ছে তা গত বছর সাগরে ভাসা মানুষের চিত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে।  ২৮ মে, ২০১৫-এর পত্রিকায় প্রকাশ, বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের ক্ষেত্রে ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ভারত। “সেভ দ্য চিল্ড্রেন” জরিপ সুত্রে জানা যায় বিগত পাঁচ বছরে শুধু ভারতেই পাঁচ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের বরাত দিয়ে ইউএনডিপি’র ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৩ লাখ নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানে পাচার হয়েছে ২ লাখ নারী ও শিশু। এই নারী ও শিশুর বয়স ১২-৩০ বছরের মধ্যে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও শিশু ভারত পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে থাকে। এই সব নারীর বেশীর ভাগ পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হন। ভারতীয় সমাজ কল্যাণ বোর্ডের এক তথ্য থেকে জানা যায় সেখানকার বিভিন্ন পতিতা পল্লীতে প্রায় ৫ লাখ পতিতা কর্মী রয়েছে। এর বেশীর ভাগ বাংলাদেশী। চাকুরী, বিয়ে এবং আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে এই নারীদের পাচার করা হয়েছে ও হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও একই পরিণতির শিকার নারী ও শিশুরা। হাসপাতালে চাকুরী দেয়ার কথা বলে কাতারে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছু নারীকে পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। সেখানে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের মনোরঞ্জন করাসহ দুর্বিসহ জীবনে আটকে পড়েছে কয়েকশ বাংলাদেশী নারী। শুধু কাতারেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কয়েকশ’ পতিতালয়ে বাংলাদেশী তরুণী-যুবতীরা পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন। দুবাইয়ের পতিতালয়, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পানশালা এবং ফ্লাটসমূহে নারীর রমরমা বাণিজ্য ব্যাপকভাবেই চলছে। দুবাইয়ের পত্রিকাসূত্রে জানা গেছে শুধু দুবাইতেই অন্ততঃ ৩০ হাজার বাংলাদেশী নারী ইচ্ছা-অনিচ্ছায় দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।

 এ সময় সিরিয়া থেকে তিনজন নারী দেশে ফিরে আসার পর তাদের সাক্ষাৎকার টিভিতেও প্রচার করা হয়। এরপর পরই পুলিশ-প্রশাসনের কার্যালয়ে ভুক্তভোগীদের পরিবার পরিজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। ১৭/৯/১৫ এ এমন ৩৫ জনের নাম ঠিকানা পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। যারা দেশে পরিবার-পরিজনের কাছে সংবাদ পাঠাতে পারছেন তারাই হয়ত উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। আর যারা পারছেন না, তারা হয়তো অন্ধকার জীবনেই পচে মরছেন। অনেকেই হয়তো এর সাথেই মানিয়ে চলছেন অসহায় হয়ে।

বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবনের কথা পত্র-পত্রিকায় প্রচার হওয়ার কারণেই গত বছর  মে-জুনে সরকার সৌদী আরবে (৩ পৃষ্ঠায় দেখুন) ২০ হাজার গৃহকর্মী এবং মাসে মাসে ১০ হাজার করে গৃহকর্মী পাঠানোর ঘোষণা দিলেও সে পরিমাণ সারা পায়নি। ২০০৮ সালে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রম বাজার বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি আরব এ সময় শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভিয়েতনাম, মৌরতানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন থেকে গৃহকর্মী নিচ্ছিল। গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া মেয়েরা শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় এই সব দেশ থেকে এখন নারী কর্মী পাঠনো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণেই সৌদি আরব এখন বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নেয়ার চুক্তি করেছে।

 যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ পেয়েছেন তারাও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। ভোর ৫টা থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। সৌদি আরবে পাঠানো গৃহকর্মীদের বেতন ধরেছে মাত্র ৮০০ রিয়াল যা বাংলাদেশের টাকায় ১৬/১৭ হাজার টাকা। লেবানন থেকে ফেরত আসা এক নারী শ্রমিক থেকে জানা যায় গৃহকর্মী হিসেবে তার বেতন ছিল মাত্র ১২ হাজার টাকা। অন্যান্য দেশের গৃহকর্মী এবং গার্মেন্ট শ্রমিকরাও এই পরিমাণ বেতনই পেয়ে থাকেন। বিদেশে নারী শ্রমিকরদেরও মজুরী কম এবং তারা মজুরী বৈষম্যের শিকার। অসুস্থ হলে চিকিৎসা না করে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

 গৃহকর্মীদের বন্দী জীবন-যাপন করতে হয়। ঘরের বাইরে একাকী যেতে দেয়া হয় না, বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে দেয়া হয় না। যদি তারা পালিয়ে গিয়ে অন্যত্র কাজ নেন। গৃহমালিকরা বাড়ীর বাইরে গেলে ঘরে তালা লাগিয়ে যায়। অমানুষিক ও অতিরিক্ত কাজ করানো হয়। অনেকেই শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন।  ইচ্ছা করলেও চাকরী পরিবর্তন করতে পারে না বা করলেও টাকা পয়সা আদায় করা যায় না। বা তা আদায় হলেও দালালরা নিয়ে নেয়। এই সব গৃহশ্রমিকগণ গৃহকর্তা এবং তাদের ছেলেদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হন হরহামেশাই। যৌন নির্যাতনের শিকার নারীরা অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাদেরকেই আবার অনৈতিক সম্পর্কের জন্য কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের আদালতগুলোতে। এই নারীদের শাস্তিস্বরূপ শারিরীক নির্যাতন করা হয়।

২৭ অক্টোবর ‘১৫ এ পত্রিকায় প্রকাশ গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময় ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্তা হয়ে পড়া শত শত নারীকে ব্যভিচারের দায়ে বিচার করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। -দ্য গার্ডিয়ান বিবিসির এক গোপন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শেকল দিয়ে বেঁধে আদালতে বিচারকের সামনে হাজির করা হচ্ছে। লন্ডনের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নারী অধিকার গবেষক রথনা বেগম বলেন ‘……… যৌক্তিকভাবে এই অপরাধের জন্য নারী ও পুরুষ উভয়কে দন্ডিত করা উচিত হলেও কেবল নারীরাই আসছেন বিচারের আওতায়। কেননা গর্ভধারণকেই দেখা হচ্ছে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে’। অথচ বিচার হওয়া উচিত শুধুই গৃহমালিকদের। কারণ প্রবাসী গৃহশ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে গৃহমালিকরা তাদের উপর যৌন নির্যাতন চালায়। গৃহমালিকদের এই পশু চরিত্রের কারণেই সুন্দরী গৃহকর্মী নিতে সৌদি নারীদের  আপত্তি দেখা যায়।

পাকিস্তানে পাচার হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা পতিতাবৃত্তি ছাড়াও কোন কোন পুরুষের তিন নম্বর চার নম্বর স্ত্রীর মর্যাদা পেয়ে থাকেন। বয়স্ক নারীদের ক্ষেতে-খামারে শ্রমমূলক কাজে নিয়োজিত করে। যাদের অমানুষিক পরিশ্রম করে জীবন ধারণ করতে হয়। এই নারীরা শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। বিদেশে নারী শ্রমিকগণ বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তেমন কোন সহযোগিতা পান না।

লক্ষ লক্ষ দরিদ্র নারীরা সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে মোটা বেতনের আশায় মা-বাবা, স্বামী-সন্তানের মায়া ত্যাগ করে ভিটে-মাটি বিক্রি করে বা ধার-দেনা করে সুদূর প্রবাসে ছুটে যান। কিন্তু  শ্রমিক পেশায় নিয়োগ প্রাপ্তরাও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন পূঁজিবাদী শ্রমশোষণের ব্যবস্থার নিয়মানুসারেই। তাই অকাট্য প্রমাণ দিয়েই বলা যায় প্রবাসী নারী শ্রমিকরা নারী এবং শ্রমিক এই দ্বৈত শোষণের শিকার।

সুতরাং পুরুষতান্ত্রিক এই পুঁজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় যত নারী অধিকারের কথা বলা হউক না কেন দেশে বিদেশে এবং পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই পুঁজিপতিরা নারীকে ভোগ্যপণ্য এবং ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি শুধু মুনাফা লুটার ধান্ধায় থাকে। নারীর শ্রম এবং যৌনতাকে মুনাফার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তারা গণ্য করে। তাই সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ  মুনাফার জন্য মদ-গাজা-হিরোইন, সোনা-দানা পাচারের সাথে নারীকেও পাচার করে। আর এই বিদেশী পাচারকারীদের সাথে যুক্ত এ দেশের শাসকশ্রেণি। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকা, টিভি-রেডিও প্রভৃতি প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও প্রতিবেদনের অসংখ্য তথ্য থেকে এ সত্য বেড়িয়ে আসছে যে এসব পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে তথাকথিত জনপ্রতিনিধি, বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতা, মোড়ল শ্রেণির লোকরা। মানব পাচারকারী দালালদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ইউপি চেয়াম্যান, মেম্বার এবং মাতাব্বরা মদদ দিয়ে থাকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সংসদস সদস্যরা পর্যন্ত এই মানব পাচারের সাথে যুক্ত। শুধু আওয়ামী শাসকগোষ্ঠিই নয়, শাসকশ্রেণির সকল গোষ্ঠিই এ পাচারের সাথে যুক্ত। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং অর্থনীতিই দেশী-বিদেশী শাসকশ্রেণিকে এই পথে চালিত করে।

তাই, শ্রমিক-কৃষক ও দরিদ্র শ্রেণির নারীদেরকে শোষণ-নির্যাতনের হাত থেকে তাদের মুক্তির জন্য পুঁজিবাদী এই বিশ্ব ব্যবস্থা উচ্ছেদের জন্য বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে হবে এবং নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে তাদের ভূমিকা রাখাতে হবে। একটি প্রগতিশীল বিশ্বব্যবস্থা তথা শোষণ মুক্ত সমাজ সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। তা হলেই বিশ্ব পুঁজিপতিদের মুনাফার হাতিয়ার হওয়া থেকে নারীরা মুক্ত হতে পারবেন। মানুষ হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার আসনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।