প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৩) ‘নবীনতারা’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

নবীনতারা

নবীনতারা

তোমার নাম!

মহাকাশের কোলে

জ্বলছো উজ্জ্বল ঝিকিমিকি করে।

কত তারা জ্বলে-

গেছে নিভে,

আরো কত তারা জ্বলছে

আরো কত তারা রয়েছে অপেক্ষায়।

নবীনতারা

স্বাগত তোমায়।

মহাকাশ-তারকামণ্ডল-

তার মাঝে নবীন তারা

জ্বলছো উজ্জ্বল।

কিন্তু তুমিও যাবে নিভে

জ্বলা আর নেভার

অন্তহীন আবর্তে

তুমিও যাবে হারিয়ে

সীমাহীন মহাকাশে।

নবীনতারা

স্বাগত তোমায়।

Advertisements

প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১২) ‘ট্রেনের বাইরে রাত’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

ট্রেনের বাইরে রাত

চাঁদনী রাত, হিমেল হাওয়া।

দ্রুতগামী ট্রেনে চলেছি আমরা।

আবছা আঁধারে

লাইনের ধারে

ঝোপ-ঝাড় গাছগুলো

দ্রুতবেগে চলে যায়।

ফালি ফালি আঁকাবাঁকা

পায়েচলা পথ-

আলেভরা ক্ষেতগুলো

মিশে গেছে গ্রামে।

ঝোপ-ঝাড়-গাছ-গাছালি;

ছনেঢাকা কুঁড়ের ছায়া;

মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাল-

জলের রেখা;

ক্ষেতগুলো জলে ভরা

তার মাঝে আকাশের ছায়া;

আবছা রহস্য ঘেরা।

মাঝে মাঝে চমকে উঠে আলোর মেলা

আধুনিক কারখানা।

তার পাশে, আবছা আঁধারে

ছনে ঢাকা কুঁড়ের ছায়া-

ক্লান্ত শ্রমিকেরা

ঘুমিয়েছে মাটির বিছানায়।

অতিরিক্ত বোঝাই কামরায়

ক্লান্ত কমরেড ঘুমে ভেঙ্গে পড়ে।

বাইরে আলোর মশাল হাতে স্টেশন

ঝোপ-ঝাড়-গাছ-গাছালি-

দ্রুতবেগে চলে যায়।

তারপর আলেভরা ক্ষেত

দূরে বনের দেয়াল;

মেঘহীন আকাশ

মিটমিটে তারা

আধখানা চাঁদ

চলছে আমাদের সাথে।

ঐ আলগুলো কবে উঠে যাবে!

রাতেও কর্মব্যস্ত ক্ষেতগুলো

কবে জনগণের সম্পদ যোগাবে!

আলোয় উজ্জ্বল কারখানা-

তার পাশে আবছা আঁধারে-

ছনেঢাকা কুঁড়ের শ্রমিকেরা

কবে মানুষের মত বাঁচবে?


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১১) ‘ডি.এন.এ’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

ডি.এন.এ

ডি.এন.এ’র সর্পিল সিঁড়ি-

এর মাঝে আঁকা জীবনের জটিল কোড।

ধাপে ধাপে কোড থেকে নির্দেশ যায়ঃ

ডি.এন.এ-

আর.এন.এ-

-প্রোটিন কোষ।

এমনি ভাবে গড়ে উঠে

মানব আর জীবন্ত জগত।

হাজার বছরের অজানা রহস্য

কত ভাববাদ- আর অধিবিদ্যার

দুর্ভেদ্য রাজত্ব,

কত শোষণ আর লুণ্ঠনের হাতিয়ার;

অবশেষে ভেঙ্গে যায়

বিজ্ঞানের দুর্বার যাত্রায়।

জীবন-রহস্য উদঘাটিত

সকল কুসংস্কার ভাববাদ-অধিবিদ্যা

উড়ে যায় ধোঁয়ার মত।

সমাজ আর প্রকৃতির বিকাশে

বিজ্ঞান রেখে যায় মহান অবদান।


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১০) ‘পেয়ারাবাগান, মহান পেয়ারাবাগান’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

পেয়ারাবাগান, মহান পেয়ারাবাগান

তোমরা কি দেখেছো পেয়ারাবাগান?

শুনেছো ভিমরূলী, ডুমুরিয়া-

আটঘর-কুড়িয়ানার নাম?

এখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়েছে

আমাদের পার্টি,

গড়েছে গেরিলাযুদ্ধের ঘাঁটি।

সারি সারি পেয়ারা গাছ

মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাল-

জোয়ার-ভাটার খেলা;

ঝিঙে-শশার ঝাঁকা

ঢেঁড়স-আখক্ষেত

সবুজে ঢাকা।

রাতের অন্ধকারে

খাল বেয়ে

গেরিলাদের নৌকা

নিঃশব্দে চলে যায়।

দুই পারে আখক্ষেত

জোনাকিরা জ্বলে আর নেভে।

বিজয় উৎসবমুখর ঘাঁটি এলাকায়

আলোর দেয়ালী যেন।

সারাদিন শত্রুর গোলা

আগুন আর ধোঁয়া।

শত্রু অপেক্ষায়

আমরা এ্যামবুশ পাতি।

পেয়ারা গাছের ঝোপে ঢাকা

খালগুলো চমৎকার ট্রেঞ্চ।

এর মাঝে আমাদের গোপন আস্তানা।

যুদ্ধ ক্লান্ত গেরিলারা

সন্ধ্যায় হাজির হয় ক্যাডার স্কুলে।

যুদ্ধ আর সংগঠন, পার্টির ক্লাস।

মনে হয় বাংলার ইয়েনান-

এই পেয়ারাবাগান!

গ্রাম পরিচালনা কমিটি

গ্রামের কাজ চালায়।

স্থানীয় গেরিলা ইউনিট

গ্রামরক্ষী বাহিনী।

ঘরে ঘরে জনগণ

সংগঠিত হয়।

বহু গ্রাম-বিশাল এলাকা

লক্ষ লক্ষ জনগণ;

গেরিলারা এদেরই রক্ত-মাংস।

একটিও খবর বেরোয়না।

শত্রুচরেরা ঢুকতে সাহস পায় না।

প্রতি খালে পথে পাহারা

ঘরে ঘরে দুর্গ গড়া।

শত্রু কামানের শব্দ

গেরিলা আর জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ।

এর মাঝে গড়ে উঠে-

’৭১-এর ৩রা জুন-

‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি’।

সমাপ্ত হয় পূর্ববাংলার শ্রমিক আন্দোলনের

ঐতিহাসিক ভূমিকা।

আমাদের পার্টি-

পূর্ববাংলার সর্বহারা আর জনগণের

আশার আশা, প্রাণের প্রাণ-

তাদের নেতা, নতুন ভরসা-

অন্ধকার আকাশে ধ্রুবতারা।

পূর্ববাংলায় শুরু হয় এক নতুন ইতিহাস;

পেয়ারাবাগান জন্ম দেয়।

আরেক মহান ঘটনার।

আওয়ামী লীগ পালিয়েছে ভারতে

পূর্ববাংলায় আর প্রতিরোধ নেই।

পার্টির নেতৃত্বে

পেয়ারাবাগানের স্ফুলিঙ্গ

ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে দাবানলের মত।

কণ্ঠে-কণ্ঠে, ঘরে-ঘরে

প্রতিধ্বনিত হয় পার্টির বিজয়গান।

পেয়ারাবাগান শত্রু-প্রাণের শঙ্কা

তাদের ঘুম কেড়ে নেয়।

পাক-সামরিক দস্যুরা

পাগলা কুত্তার মত মরিয়া হয়ে উঠে।

কয়েক জেলা থেকে খুনীরা একত্রিত হয়।

পেয়ারাবাগানে চালায়

প্রচণ্ড ঘেরাও দমন।

বন্দুকের ডগায়

দূর দূরাঞ্চল থেকে

লোক ধরে আনে

পেয়ারা বাগান কাটে।

দেশব্যাপী গেরিলাযুদ্ধের

দাবানল জ্বালাবার আশায়-

গেরিলারা সরে আসে-

নিরাপদে।

পেয়ারাবাগান।

গণযুদ্ধের মহান উপাখ্যান।

আমাদের ড্রেস রিহার্সেল।

দেশব্যাপী গণযুদ্ধ

পরিচালনার মহান পীঠস্থান!


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (৯) ‘বিদ্রোহ-বিপ্লব’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

বিদ্রোহ-বিপ্লব

জনগণ আজ ডাক দিয়েছে

বিদ্রোহ-বিপ্লবের ডাক।

শোষণের ছয় পাহাড়

তারা উপড়ে ফেলবেই।

জনগণ আজ বারুদের স্তূপ

সলতের উষ্ণ আগুনের

আশায় উন্মুখ।

একটি স্ফুলিঙ্গ দাবানল জ্বালাবে।

শোষণের কালো বন

পুড়ে সাফ হয়ে যাবে।

অনেক আত্মত্যাগ

অনেক খুলি-রক্ত-হাড়

আর বেদনার নিষ্ফল ইতিহাস

চাপা পড়ে আছে

বাংলার মাটিতে।

ভারতের উপনিবেশ-

সোভিয়েট আর আমেরিকার লুণ্ঠন

আওয়ামী লীগ আর সংশোধনবাদীদের

বিশ্বাসঘাতকতা।

আরো কত কাহিনী।

দেশটাকে নিয়ে

শকুনে-কুকুরে কামড়া-কামড়ি।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়

কত জল বয়ে গেছে।

কত শীত বসন্ত হয়ে গেছে পার।

বৃটিশরা উৎখাত হলো-

এলো পাকিস্তান-

তারাও উৎখাত হলো;

এলো ভারত আর তার তাবেদার।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনার উদ্দাম স্রোত

তারা আটকে ফেলতে চায়।

স্রোত আরো উদ্দাম-উত্তাল।

বালির বাঁধ ভেঙ্গে যায়।

গণযুদ্ধের উত্তাল জোয়ারে

এরাও ভেসে যাবে।

ইঁদুরের মত ডুবে মরবে।

জনগণ চায় বিপ্লবী পার্টি

সঠিক নেতৃত্ব।

আমাদের পার্টি

ভিতরের আর বাইরের

শত্রুর শত বাধাবিঘ্ন

পরাজিত করে

বিজয়ের পথে চলেছে।

প্রতিদিনই শক্তিশালী হচ্ছে।

কিন্তু আরো জোরে চলতে হবে।

আরো দ্রুততর।

দিনকে আঁকড়ে ধরতে হবে কমরেড-

ঘন্টাকে আঁকড়ে ধরতে হবে

জনগণের বিদ্রোহ-বিপ্লবে

নেতৃত্ব দিতে হবে আমাদের।

জনগণ আজ ডাক দিয়েছে

বিদ্রোহ-বিপ্লবের ডাক।

 


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (৮) ‘কারার অন্তরালে’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

কারার অন্তরালে

পত্রিকায় দেখেছি

তোমাদের ছবি-

পড়েছি তোমাদের

বীরত্ব গাঁথা।

বিষণ্ণ বেদনায় ভরে গেছে প্রাণ-

মুহূর্তেই দৃঢ়তায় কঠিন হয়েছে

তোমাদের আরদ্ধ কাজ

সম্পন্ন করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায়।

নীল আকাশ

রোদে ভরা উজ্জ্বল দিন

বা-

চাঁদেভরা সুন্দর রাত

বা-

সবুজ শ্যামল ভূমি;

কমরেডদের সান্নিধ্য;

জনগণের ঘনিষ্ঠতা;

দেশ-বিদেশের বিজয় বার্তা থেকে

দূরে-অনেক দূরে-

কারার অন্তরালে;

জনাকীর্ণ ব্যারাকে;

বা-

নির্জন গরাদ মোড়া ক্ষুদ্র সেলে;

শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশে

বা-

নির্মম অত্যাচারে

ফ্যাসিস্টদের সম্মুখে

বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে

এখনো করছো সংগ্রাম

এখনো চালাচ্ছো লড়াই।

তোমাদের কষ্টকর জীবন-

কঠোর সংগ্রাম

জাগায় দৃঢ় সংকল্প

গভীর প্রেরণা।

চারিদিকে বিজয় বার্তা

অগ্রগতির খবর-

উৎসাহ-উদ্দীপনার জোয়ার।

দিনগুলো আমাদের

সময় আমাদের পক্ষে।

সেদিন আর দূর নয়

কারাগার থেকে

তোমরা মুক্ত হবে

বিজয়ীর বেশে।

আনন্দমুখর হাজার জনতা-

উজ্জ্বল নীল আকাশ

তোমাদের স্বাগত জানাবে।

আর-

অন্ধকার কারাগুলো-

ভরে যাবে

ফ্যাসিস্টদের অপবিত্র দেহগুলোতে।

আমরা কাজ করছি-

সেদিনের জন্যে।


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (৭) ‘সাভারের লাল মাটি’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

সাভারের লাল মাটি

বার বার ঘুরে ফিরে

মনে পড়ে তোমাদের কথা

এক সাথে বা একা।

সাভারের লাল মাটি

ছোট ছোট টিলা

শাল-কাঁঠালের বন

এখানে ছড়িয়েছিলে

প্রতিরোধের বহ্নিশিখা;

লাল হয়ে উঠেছিল দিগন্ত

সূর্যের প্রতীক্ষায়!

কিন্তু, কালো মেঘে

ঢেকে গেল আকাশ।

সাভারের লাল মাটি

আরো লাল হলো-

তোমাদের পবিত্র রক্তে।

কমরেড তাহের-

উত্তর প্রদেশ থেকে এসে

তুমি হলে বাংলার নরম্যান বেথুন।

তোমাদের পবিত্র রক্তের ঋণ তুলতেই হবে।

তোমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতেই হবে।

তোমাদের মহান ত্যাগ

কঠিন সংকল্প যোগায়।

চারিদিকে কত কাজ

কর্মীর কত স্বল্পতা।

তুমি থাকলে কত এলাকা

নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেওয়া যেতো।

চক্ররা সাহস পেতনা

মাথা তুলতে।

পলাশ, সাইদ চালাতো

এক একটি জেলা;

মনি’দা-পেয়ারাবাগান।

ছোট্ট ছেলে খোকন;

হয়ত লুকিয়েছিল

তার মাঝে বাংলার লেনিন।

আরো কত সম্ভাবনার প্রাণ।

তাহের,কতবার তোমারে বলেছি

সতর্ক হতে।

আওয়ামী লীগের চররা

হায়নার মত খুঁজে বেড়ায়

বন্ধুর বেশে আমাদের

খতম করে।

রাতের অন্ধকারে

ফ্যাসিস্টদের বুলেটের শব্দে

তোমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়।

তারপর…

লড়েছিলে।

আর কিছু জানিনে।

সাভারের লালমাটি

ছোট ছোট টিলা

শাল-কাঁঠালের বন

নতুন বছরে

আবার সবুজ হবে;

আবার আকাশ লাল হবে

সূর্যের প্রতীক্ষায়।*

[*সুদীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর সাভারে আবার যোগাযোগ হয় এবং কাজ গড়ে উঠে। এভাবে কবির শেষ লাইনগুলোর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবার মত অবস্থার সৃষ্টি হয়।

*কবিতাটিকে গানে রূপ দিয়েছিলেন কবি।]