একজন মাওবাদী বিপ্লবীর স্মৃতিচারণ –

Cops on Maoist

বিপ্লবী দৃঢ়তা

-অনীল

ছোট্ট একটি রেল ষ্টেশন। দু’দিকে বহুতল বিশিষ্ট মনোরম আধুনিক ভবন। ভবনের এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জরাজীর্ণ ব্রহ্মপুত্র। অন্যদিকে বিশাল সবুজ মাঠ। পড়ন্ত বিকেল। ট্রেনের অপেক্ষায় কয়েকজন যাত্রী ইতস্ততঃ ঘোরাফেরা করছে। আমরাও এসে দাঁড়ালাম টিকিট ঘরটির পাশে। আমি আর কামাল ভাই। অপেক্ষা করছি। একজন কমরেড আসার কথা। এখনো আসেনি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। পিছন থেকে একটি লোক এসে আমার হাত চেপে ধরলো। কি খবর অনীল ভাই? ভাল আছেন? এক রাশ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো আগন্তুক। কন্ঠস্বরেই চিনতে পারছি। একটা শীতল স্রোত বয়ে চললো আমার শিরা-উপশিরায়। নিজেকে অত্যন্ত স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করলাম। উত্তর দিলাম সংক্ষিপ্ত দু’টো বাক্যে। ভাল আছি। আপনার খবর কি?

বিপদটা আমার চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন কামাল ভাই। সরে যাচ্ছেন তিনি। তার চলে যাওয়ার ভাবটি দেখে মনে হচ্ছে আমাদের মাঝে কোন কালেও যেন পরিচয় ছিল না। নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছেন কামাল ভাই। কিছুটা আশ্বস্থ হলাম। নিজেকে বেশ হালকা মনে হচ্ছে। ঘুরে দাঁড়ালাম। তাকালাম সরাসরি। আমার নির্লিপ্ততা দেখে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করলো লোকটা। আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি মন্টু। চিনতে পারবো না কেন? মনে মনে বললাম আমি। সব কিছুই ছবির মতো ভেসে উঠছে আমার মস্তিষ্কে। এই মন্টুও একদিন আমার মতো সার্বক্ষণিক কর্মী ছিল। ব্যক্তিস্বার্থ ও সুবিধাবাদের কারণেই পার্টি আর বিপ্লব ত্যাগ করে পালিয়েছিল। এক বৎসর পূর্বে তার সাথে এই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে বসেই অনেক আলোচনা হয়েছিল। তার পর সে আর পার্টির সাথে সংযোগ রাখেনি। পরবর্তীতে তার সন্দেহজনক গতিবিধির জন্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্থানীয় পার্টি-শাখাও আর সংযোগের চেষ্টা চালায়নি। কত দিন হয়ে গেল। এত দিনে সে শত্রুচর, বিশ্বাসঘাতক — কত কিছুই তো হতে পারে। কামাল ভাই সরে পড়েছেন। আমারও সরে পড়া দরকার।। মামুলী দু’একটা কুশল বার্তা বিনিময় করে ব্যস্ততা দেখিয়ে দ্রুত বিদায় নিলাম।

পথেই পেলাম কামাল ভাইকে। এগিয়ে চলছি গ্রামের দিকে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রক্তিম আভার শেষ কণাটুকুও মিলিয়ে যাচ্ছে অসীম দিগন্তে। নেমে আসছে ছোপ ছোপ অন্ধকার। একটু দ্রুতই হাঁটছি। সংক্ষেপে বলে চলেছি ষ্টেশনের ঘটনাটা। কিন্তু মঞ্জু ভাই প্রোগ্রামে আসলেন না কেন? প্রশ্ন করলেন কামাল ভাই। আমিও তো তাই ভাবছি। জবাব  দিলাম আমি। তার সাথে পরবর্তী কোন প্রোগ্রামও নেই। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামে গাফেলতি লক্ষ্য করিনি কোন দিন।। ওদিককার যা অবস্থা — তাতে খোঁজ নিতে লোক পাঠানোও মুশকিল। আপনার কি মনে হয়? পুনরায় প্রশ্ন করলেন কামাল ভাই। হয়তো কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে তাই . . . . . . . । দাঁড়ান। আর এগুবেন না। অন্ধকার ভেদ করে ঘোষিত হলো একটি নির্দেশ। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়লাম দু’জনে। গাছ আর ঝোপটার আড়াল থেকে অস্ত্রসহ বেরিয়ে এলো দু’জন লোক। পরিচয় দিলাম। চিনতে পারলো। ছেড়ে দিল। প্রবেশ করলাম প্রায় মুক্ত এলাকায়। পথে পথে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পাহারা দিচ্ছেন সশস্ত্র গেরিলা কমরেডগণ। এই এলাকাটা উৎখাত করার জন্য কয়েকবারই চেষ্টা চালিয়েছিল রক্ষী বাহিনী। কিন্তু পারেনি। স্থানীয় নারী-পুরুষ-বালক-বৃদ্ধ সবাই পার্টির সাথে যুক্ত। গেরিলা আর কর্মীদের সাথে রয়েছে তাদের নাড়ীর যোগ। এলাকাটা প্রায় শত্রু মুক্ত। ফলে সকল আঘাতই ব্যর্থ হয় শত্রু পক্ষের।

নিস্তব্ধ রাতের জমাট বাঁধা অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে এসে পৌঁছলাম শেল্টারে। মেঝের ওপর পাতা খড়ের বিছানাটাতে এলিয়ে দিলাম ক্লান্ত শরীরটা। ভেবেছিলাম শুয়ে পড়বার সাথে সাথেই ঘুম আসবে। কিন্তু না। আসছেনা। এলোমেলো একরাশ চিন্তা এসে ভীড় করছে মাথার মধ্যে। মঞ্জু ভাই আসলেন না কেন? কি হয়েছে তার? কোন বিপদ নয় তো? আর এগুতে পারলাম না। চিন্তার গতিটা ব্যহত হলো আমার। ঘরে ঢুকছেন একজন কমরেড। প্রশ্ন করলাম। কি খবর কমরেড? নদীর ওপাড় থেকে কমরেড শফিক এসেছিলেন। জবাব দিলেন তিনি। দ্রুত উঠে বসলাম। সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করলাম। কোন খবর দিয়ে গেছে? হ্যাঁ। কি খবর? কমরেড মঞ্জু, স্বপনদা এবং আরো দু’জন নাকি রক্ষীর হাতে ধরা পড়েছে। চমকে উঠলাম আমি। নিজের অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো দু’টো প্রশ্ন। কোথায়? কিভাবে? চন্নপাড়ার কাছাকাছি ধরা পড়েছে। কিভাবে ধরা পড়েছে তা জানা যায়নি। বিষন্ন কণ্ঠে জবাব দিলেন কমরেড।

আঘাতটা খুব তীব্রই মনে হলো আমার কাছে। কথা  বলতে পারছি না। উত্তেজনার স্রোত বইছে মস্তিষ্কে। প্রচণ্ড ঝড়ের তান্ডবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে স্নায়ুগুলো। কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে বের করলাম সিগারেট। কুপির আগুনে ধরালাম সেটা। জোর দম দিচ্ছি সিগারেটটাতে। গলগল করে ধুঁয়া বের হচ্ছে আমার নাক-মুখ থেকে। ধীরে ধীরে ধাতস্থ  হয়ে উঠছি। এখন কিছুটা চিন্তা করতে পারছি। চারজন ধরা পড়েছে একসাথে। চারজনের মাঝে কি কেউ . . . . .। না। বিশ্বাসঘাতকতা করবে কে? আচ্ছা, এলাকাগুলোর সাথে সংযোগের  ব্যবস্থা করতে পারলেই সব কিছু জানা যাবে। কিছু কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। অস্ত্র, গুলি আর সম্পদও নিরাপদ করা প্রয়োজন। আগে কামাল ভাইকে সংবাদটা জানানো প্রয়োজন। কমরেড। না, নেই। কখন চলে গেছেন টেরও পাইনি। তা’হলে আমাকেই যেতে হবে। বেরিয়ে পড়লাম।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে মিট্ মিট্ করে জ্বলছে তারকাগুলো। মৃদু লয়ে বয়ে চলছে হিমেল বাতাস। বেশ কিছুটা মুক্ত বাতাস বুক ভরে নিলাম স্বার্থপরের মতো। ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছি। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে আলোটা। তা’হলে এখনো ঘুমাননি কামাল ভাই।

 এতো রাতে আসতে দেখে কিছুটা বিস্মিতই হলেন কামাল ভাই। জানালাম তাকে সব কিছু। একটু এগিয়ে এসে আমার হাতটা ধরলেন তিনি। কঠিন চাপ অনুভব করছি হাতে। অন্যান্য দিনের মতো মামুলী হাত মেলানো নয়।  আবেগে পূর্ণ উষ্ণ আর তীব্র চাপ। মুখমন্ডলের পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠছে তার। থমথমে মুখমন্ডলে দৃঢ় কণ্ঠে এক নিঃশ্বাসে বুঝিয়ে দিলেন —জরুরী ভিত্তিতে কি কি করতে হবে আমাকে।

দায়িত্ব বুঝে নিয়ে ফিরে এসেছি শেল্টারে। বসে আছি খড়ের বিছানায়। রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। ঘুম আসছে না। শুধু ভেবেই চলেছি। ভাবনার কোন কূল-কিনারা  নেই। তিন মাইল দূরে দূরে ক্যাম্প করে ঈশ্বরগঞ্জ-নান্দাইল আর ত্রিশাল থানাকে ঘিরে ফেলেছে রক্ষী বাহিনী। এখানে অবশ্য রাতে গ্রামে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না ওরা। ইশ্বরগঞ্জ আর নান্দাইলের বহু এলাকায় মুখে মুখে ঘুরতো মঞ্জু ভাইয়ের নাম। তাকে যমের মতো ভয় করতো রক্ষী আর পুলিশরা। বহু পুরানো অভিজ্ঞ আর পরিশ্রমী কমরেড স্বপনদা। তাদের অনুপস্থিতিতে কিভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে ইশ্বরগঞ্জ আর নান্দাইলে? কি মারাত্মক ক্ষতিই না হয়ে গেল! এখন কেমন আছে কমরেডরা? কি করছে তারা? দেখতে পাচ্ছি মানস চোখে। নরপশুদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চারজন। হাত-পা বাঁধা। রক্তাক্ত শরীর। নিরস্ত্র। অসহায়।

ভোর হয়ে আসছে, রাতের অন্ধকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে জেগে উঠছে সূর্য। তার আলোয় আলোকিত হয়ে যাচ্ছে চারিদিক। নিজস্ব নিয়মেই এগিয়ে চলছে সময়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আসছে খবর। নতুন, গরম, বীভৎস সব সংবাদ।

চন্নপাড়ার খবির মিয়ার বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিল চারজন। মঞ্জু ভাই, স্বপনদা, উজ্জ্বল ভাই এবং আরো একজন। দু’মাইল দূরের রক্ষী ক্যাম্পে রাতেই খবরটা পৌঁছে দিয়েছিল খবির মিয়া। মধ্য রাতেই সমগ্র গ্রামটা ঘেরাও করে ফেললো রক্ষী বাহিনী। নিরস্ত্র, ঘুমন্ত, অসহায় অবস্থায় গ্রেফতার হলেন চারজন। সকালে একটি উঁচু জমিতে গ্রামবাসীদেরকে জড়ো হতে বাধ্য করেছিল রক্ষীরা। সেখানে হাত বাঁধা অবস্থায় হাজির করা হয়েছিল মঞ্জু ভাই এবং তার সাথী কমরেডদেরকে। তাদেরকে ভুল স্বীকার করে বক্তব্য রাখার নির্দেশ দিয়েছিল রক্ষী লিডার। ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মঞ্জু ভাই। সাথে সাথে তার পিঠের ওপর পড়েছিল কয়েকটি রাইফেলের বাট। শেষ পর্যন্ত বক্তব্য রেখেছিলেন মঞ্জু ভাই। টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে রক্তমাখা শরীরে দীপ্ত কণ্ঠে বর্ণনা দিয়েছিলেন দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক মুজিব সরকারের কীর্তিকলাপের। আর জ্বালাময়ী ভাষায় তুলে ধরেছিলেন রক্ষী বাহিনীর বর্বরতার নারকীয় কাহিনী। জনগণের কাছে উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য। তার বক্তব্য শেষ না হতেই ঘেউ ঘেউ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জলপাই রং-এর অনেকগুলো কুকুর। তারা চেষ্টা করেছিল মঞ্জু ভাইয়ের জীবন্ত দেহটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতে। জ্ঞান না হারানো পর্যন্ত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মঞ্জু ভাই। রক্তের ঢল নেমেছিল তার মাথা, মুখ আর শরীর থেকে। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বার পরও তার ওপর পড়েছিল বুটের লাথি আর বেয়নেটের খোঁচা। সহ্য করতে না পেরে জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অনেক গ্রামবাসী। অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল অনেকের চোখ।

একের পর এক আসছে খবর। শুনছি। শিউরে উঠছি। ক্রোধে আর ঘৃণায় টগবগিয়ে উঠছে আমার রক্ত কণিকাগুলো। দাঁতে দাঁত পিষে শপথ নিলাম। বদলা আমরা নেবোই।

এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্প। এভাবে একটানা দশ দিন মঞ্জু ভাই’র অর্ধচেতন দেহটিকে টানা-হেঁচড়া করেছিল রক্ষী বাহিনী। চালিয়েছিল হাজারো  নির্যাতন। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা থেকে জানা যায় — শরীরের এক ইঞ্চি জায়গাও অক্ষত ছিল না মঞ্জু ভাইয়ের। ইঞ্চি ইঞ্চি করে শরীরের প্রতিটি অংশকে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল দস্যুরা। কিন্তু একটুও অবনত করাতে পারেনি মঞ্জু ভাইয়ের সুউচ্চ মনোবল আর বিপ্লবী দৃঢ়তাকে। শেষ পর্যন্ত তার স্পন্দনহীন দেহটাকেও টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল ক্ষিপ্ত জল্লাদেরা। দেহটাকে তারা ধ্বংস করতে পেরেছিল ঠিকই; কিন্তু তাদেরই অগোচরে মধুপুরের উর্বর মাটিতে বীজ হয়ে ঝরে পড়েছিল অজস্র লোহিত রক্ত কণিকা। আগামী দিনে অসংখ্য মঞ্জুর জন্ম নেবার প্রত্যাশায়।

[নোটঃ কমরেড মঞ্জু ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার সেনবাড়ী গ্রাম থেকে ’৭২-এ সার্বক্ষণিক হন। কর্মরত থাকাকালীন অবস্থায় ’৭৪-এর মার্চ মাসে ঈশ্বরগঞ্জ থানার মধুপুর বাজারের নিকট থেকে তিনজন সহকর্মীসহ তিনি রক্ষী বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হন। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বর্বরতম মধ্যযুগীয় নিপীড়ন চালিয়ে তাকে হত্যা করে রক্ষী বাহিনী। এবং জনগণের মাঝে শ্বেতসন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য তার ক্ষত-বিক্ষত লাশ ফেলে রাখে সেনবাড়ী রক্ষী ক্যাম্পের নিকটে — রেল লাইনের পাশে।

Advertisements