মহান সর্বহারা সাহিত্যিক কমরেড ম্যাক্সিম গোর্কি (১৬ মার্চ জন্মবার্ষিকী স্মরণে)

ম্যাক্সিম গোর্কির প্রকৃত নাম আলেকসেই ম্যাকসিমোভিচ পেশকভ। গোর্কির জন্ম রাশিয়ার নিঝনি নভগোরদ শহরে ১৮৬৮ সালের ১৬ মার্চ তারিখে। গোর্কি একটি রুশ শব্দ। এর অর্থ হলো তিক্ত। এধরনের নামের পেছনে কারণ রয়েছে। গোর্কির বাস্তব জীবন সুখময় ছিল না। গোর্কির বাবার ডাকনাম ছিল ম্যাক্সিম। গোর্কির বাবা ছিলেন রুশ দেশের একজন সাধারণ গরিব শ্রমিক। গোর্কি তার বাবাকে হারান মাত্র সাত বছর বয়সে। এর অল্পকাল পরেই তিনি মাকে হারিয়ে এতিম বালক হিসাবে মাতামহের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এই পরিবারে তার দিদিমা ছিল তার প্রতি স্নেহময়ী। কিন্তু দাদা মশাইয়ের আচরণ ছিল চরম স্বেচ্ছাচারী। আবার এই পরিবারটি ছিল ক্ষয়িষ্ণু কারিগর। রুশ সমাজে যে ভাঙ্গন ও পরিবর্তন চলছিল এই পরিবারটি তারই প্রভাবে সমৃদ্ধ স্বচ্চল অবস্থা থেকে সহায় সম্বলহীন জীবন যাপনে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত তার স্নেহময়ী দিদিমাকে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে চলতে হয়। পরিস্থিতির চাপে এই অনাথ এতিম গোর্কিকে নয় বছর বয়সে শ্রমিকের কাজে নামতে হয়। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে ভালভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ তার জীবনে আসেনি। তিনি বার তের বছর বয়সে অক্ষর জ্ঞান লাভ করেন। গোর্কি লেখাপড়া শুরু করেন ১৪ বছর বয়সে। স্কুলে পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি কাজান শহরে যান। অর্থনৈতিক কারণেই তার আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করা সম্ভব হয়ে উঠে নাই। জীবিকার সন্ধানে তাকে পথে পথে ঘুরতে হয়।

বিদ্যা শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজান শহরে আসলেও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তাকে একটি রুটির কারখানায় শ্রমিকের কাজ নিতে হয়। এর আগে তাকে নিঝনি নভগোরদ শহরে বালক অবস্থাতেই জুতার দোকানে কাজ করতে হয়েছিল। কাজানে এসে তার পরিচয় ঘটে একদল বিপ্লবীর সঙ্গে। তখন রাশিয়াতে চলছিল পরিবর্তনের ঢেউ। ১৮৫৫ সালে রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদ হয়। এর ফলে কৃষক শর্ত সাপেক্ষে জমির মালিক হওয়ার সুযোগ পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবশ্য কৃষককে অর্থ দিয়ে জমি কিনে নিতে হয়। আবার কৃষক জমির মালিক হয়েও জমির মালিকানা নিজের হাতে ধরে রাখতে পারে না। রাশিয়ায় মুদ্রা ও বাজার ব্যবস্থা ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়। চাষের জন্য কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পুঁজি না থাকায় রাশিয়ার পুঁজিপতিদের কাছে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। কৃষক জমিতে চাষ করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারে না। কৃষক সমাজে ব্যাপক ভাঙ্গন শুরু হয়। কৃষক জমি বিক্রি করে শহরে কাজের সন্ধানে গিয়ে মজুরের কাজ জীবিকা হিসাবে বেছে নেয়। এইভাবে গ্রামের ভূমিহীন কৃষক শহরে এসে শ্রমিকে পরিণত হতে থাকে। রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশের কারণে বুর্জোয়া শ্রেণী শহরে শিল্পের বিকাশ ঘটায়। সেই সময়ে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার বুর্জোয়া শ্রেণী রুশ দেশে পুঁজি লগ্নি করে শিল্প কারখানা গড়ে তোলে। এইভাবে রুশ দেশে শহরের বিস্তার শিল্প কারখানা গড়ে উঠা ও মজুর শ্রেণীর বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।

এই সময়ে রুশ দেশ ক্ষমতায় ছিল স্বৈরতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক জার সরকার। জার সরকার কুলাক ও পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতো। দেশের শ্রমিক কৃষক জনগণের উপর নির্মম নিষ্ঠুর শোষণ নিপীড়ন চালাতো। ফলে শ্রমিক কৃষক জনগণের স্তরে বিক্ষোভের আগুন ধূমায়িত হচ্ছিল। এই সময়েই রাশিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠেছিল। রাশিয়াতে সন্ত্রাসবাদী নৈরাজ্যবাদী বাকুনিনপন্থী মতবাদের বিস্তার ঘটছিল। সেই সাথে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক, রেভ্যুলেশনারি ডেমোক্রাটিক, পপুলিস্ট ইত্যাদি নানা ধারায় সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন দ্রুত একটা পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। শ্রমিক শ্রেণীর চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যে প্রকৃত বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক সংগঠনও গড়ে উঠছিল। গোর্কি নিজের শ্রেণীগত অবস্থানের কারণেই প্রথমত মার্কসবাদী বিপ্লবী সংঘের সাথে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি মার্কস-এঙ্গেলসের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হন। অবশ্য তারও আগে গোর্কির পরিচয় ঘটে উনিশ শতকের রুশ সাহিত্যের সঙ্গে। বিশেষ করে রুশ কথা সাহিত্যের তখন সৃষ্টির জোয়ার চলছিল। পুশকিন, গোগল, দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনেভ, টলস্টয় প্রমুখের হাতে পৃথিবীর সেরা সাহিত্য রচিত হয়। সেই সময়ের রুশ কবি সাহিত্যিকদের অধিকাংশের মতো ম্যাক্সিম গোর্কির অভিজাত পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল না। একেবারে দীন হীন শ্রমিক পরিবারেই তার জন্ম হয়েছিল এবং তিনি নিজেও ছিলেন একজন শ্রমিক।

ব্যক্তিগত জীবনে ম্যাক্সিম গোর্কি একজন শ্রমিক হলেও দুনিয়া জোড়া খ্যাতির কারণ তার সৃষ্ট বিপ্লবী সাহিত্য কর্ম। লেখক হিসাবে ম্যাক্সিম গোর্কির আবির্ভাব উনিশ শতকে। তিনি রুশ সাহিত্যের মহান ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার অংশ। গল্প দিয়ে তার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। তবে এর পেছনে সাহিত্যিক হিসাবে তার খ্যাতি পাওয়ার কোন লোভ ছিল না। এই কারণেই প্রথম গল্পটি তিনি বেনামে একটি পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন। আর তিনি যা লিখেছিলেন তা শিল্পীর কল্পনাপ্রসূত কিছু ছিল না, ছিল নিজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা। ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্য জীবনের প্রথম পর্বে আছে তার গল্প। এরপর গোর্কি উপন্যাস ও নাটক রচনা করেছেন। সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা, সাংবাদিকতা ধর্মী অনেক লেখাও তিনি লিখেছেন। তবে তার রচিত ‘মা’ উপন্যাস তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে দিয়েছে। ম্যাক্সিম গোর্কির জীবন দুঃখময় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। জীবনের অধিকাংশ সময়ে তিনি নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যো দিয়ে অতিক্রম করেছেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি ক্ষয়রোগসহ শ্বাসযন্ত্রের নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন তারিখে তিনি চিকিংসারত অবস্থায় মারা যান। তার এই মৃত্যু নিয়ে সেই সময়েই প্রশ্ন ছিল। এই সময়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়াতে রাষ্ট্র ও পার্টিতে ঘাপটি মেরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদের চরেরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসী অন্তর্ঘাতি তৎপরতায় লিপ্ত ছিল। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে এর প্রভাব ছিল। এই প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসী চক্রের নেতা ছিল ট্রটস্কি। এই চক্র চিকিৎসকদের দলে ভিড়িয়ে ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করিয়ে পার্টি ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করতো। এই চক্র গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যাসহ নানাবিধ পদ্ধতি হত্যাকান্ড চালাতো। এছাড়াও এরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে যুক্ত থেকে সেখানে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালাতো। মস্কো ষড়যন্ত্র মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় এদের চক্রান্ত সম্পূর্ণরূপে উদ্ঘাটিত হয়। ম্যাক্সিম গোর্কি এই প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসী চক্রের শিকারে পরিণত হন। গোর্কিকে এই পদ্ধতিতে হত্যার কারণ হচ্ছে সাহিত্যিক হিসাবে বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য।

রুশ কথা সাহিত্যের অন্যতম উত্তরাধিকার ম্যাক্সিম গোর্কি। গণমানুষের লেখক হিসাবে তার খ্যাতি গোটা পৃথিবী জুড়ে। মেহনতি মানুষের জীবনকে গোর্কি তার সাহিত্যের অন্যতম উপকরণ হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে রাশিয়ার রাজনৈতিক বাতাবরণে ম্যাক্সিম গোর্কির রচিত গল্প-উপন্যাস মুক্তিকামী শ্রমজীবী মানুষের কাছে প্রেরণাদায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের সকল দেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, ঘৃণা-ভালোবাসা, স্বপ্ন-বাস্তবতা, যন্ত্রনা, সংগ্রাম সর্বোপরি জীবনের শাশ্বত কথা পাওয়া যায় ম্যাক্সিম গোর্কির লেখায়। বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে গোর্কির নাম এত বেশি পরিচিত যে তাকে রুশ ভাষার লেখক বলে মনে হয় না। গোর্কির মা উপন্যাসের কথা জানেন না এমন পাঠক পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। মা উপন্যাসের জন্য ম্যাক্সিম গোর্কি বাংলাভাষীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। ম্যাক্সিম গোর্কির কোন উপন্যাসটি শ্রেষ্ঠ- তার বিচার করা আপেক্ষিক ব্যাপার। তিনি অসংখ্য উপন্যাস ও ছোট গল্প লিখেছেন। যা সারা পৃথিবী ব্যাপী পাঠকদের কাছে আজও নন্দিত, সমাদৃত। মা উপন্যাসসহ তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস আমার ছেলেবেলা, পৃথিবীর পথে, পৃথিবীর পাঠশালায়, এদেশের জনগণের মুক্তির সংগ্রামে নিয়োজিত কর্মীদের অবশ্যই পাঠ করা উচিত। পৃথিবীর অসংখ্য ভাষায় তার সাহিত্যকর্ম অনুদিত হয়েছে। ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্য এখনো সারা বিশ্বে আগের মতোই জনপ্রিয়। গোর্কি সম্পর্কে সাহিত্য সমালোচক ও পাঠক সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্যায়ন এক জায়গায় আটকে নেই। তার সাহিত্য নিয়ে আজ নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা যুক্ত হচ্ছে।

শিল্প সাহিত্য শ্রেণীর উর্ধ্বে নয় এবং তা শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় কোন না কোন শ্রেণীর সেবা করে। ম্যাক্সিম গোর্কির সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। তার সৃষ্ট সাহিত্য প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় গতানুগতিক কোন সাহিত্য নয়। তার সাহিত্যকর্ম ছিল প্রচলিত শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। গতানুগতিক সাহিত্যে নিছক মানব মানবির প্রেম বিরহ ভালবাসা, প্রকৃতি নিয়ে কথামালার বিস্তার ঘটানো হয়ে থাকে। ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্যকর্মে শ্রেণী বিভক্ত সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর অবস্থান ও তাদের মধ্যেকার কঠিন কঠোর সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে। শ্রেণী বিভক্ত বর্তমান সমাজে শ্রমিক শ্রেণী শুধুমাত্র নিপীড়িত শ্রেণী নয়, এই শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত শ্রেণীও বটে। বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শ্রমিক শ্রেণীই হচ্ছে নেতা। অন্যান্য শ্রেণীকে মুক্ত না করে শ্রমিক শ্রেণী তার মুক্তির লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করতে পারে না। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, এই যুগে বুর্জোয়া শ্রেণীর ভূমিকা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল, পরজীবী শ্রেণী হিসাবে তারা শ্রমিক কৃষককে শোষণ নিপীড়ন করেই টিকে থাকে। যার প্রেক্ষিতে শ্রমিক কৃষকের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। এর থেকে মুক্তি পেতে শ্রমিক কৃষককে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠনে সংগঠিত হতে হবে। তীব্র শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীলদের উচ্ছেদ করে শ্রমিক কৃষকের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই তাদের মুক্তি আসতে পারে। আজীবন সংগ্রামী, শ্রমিক শ্রেণী, বিশ্বের নিপীড়িত জাতি ও জনগণের অকৃত্তিম বন্ধু ম্যাক্সিম গোর্কির জন্ম দিবসে তার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

Advertisements

ভারতঃ বিপ্লবী লেখক সমিতি(VIRASAM) এর ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

03hycnh01-viras_04_2919397f

13557712_1152332214837420_4234834536904148673_n

13557735_1152332094837432_5753762789167030671_n

13619817_1152332091504099_1750570713508396218_n

13620381_1152332081504100_7395124821219613392_n

ভারতের বিপ্লবী লেখকদের সংগঠন VIRASAM (Viplava Rachayitala Sangham)/ভিরাসাম এর ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিপ্লবী লেখকরা তাদের আলোচনা সভায় শ্রেণী সংগ্রামের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সামাজিক-রূপান্তরের সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।  দিনব্যাপী  এই অধিবেশনে বিশিষ্ট লেখকরা কিছু ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন যে, বিপ্লবী সাহিত্য তৃণমূল সমাজের দুর্দশার উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করে তোলে। এসময় পানি’র লিখিত ‘জনতানা রাজ্যম’ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

ভিরাসাম মহানগর ইউনিট সদস্য পি গীতাঞ্জলী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।  সেমিনারে ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র, উন্নয়ন মডেল এবং বিপ্লবী গণতন্ত্র’ শীর্ষক মূল বক্তব্য রাখেন প্রফেসর পি কাশিম।  বক্তব্যে কাশিম বলেন, অসম এবং অন্যায্যের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সাহিত্যের হস্তক্ষেপ জরুরী।  ভিরাসামের পদক্ষেপ তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে অধ্যয়নের ঐকান্তিকতা আনবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।  সামাজিক রূপান্তরের দিকে আলোকপাত করে ভিরাসামের সাধারণ সম্পাদক পি ভারালক্ষী বলেন, “শ্রেণী-সংগ্রামের জন্য সমর্থনের ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক সংগ্রাম, শ্রেণী ও জাতিগতসহ বিষয়গুলির উপাদান বিপ্লবী লেখায় তুলে ধরা হয়েছে বলে তিনি জানান।  শ্রেণীহীন সমাজের জন্য কমিউনিস্ট সংগ্রামে আগ্রহী তরুণ লেখকদের নিয়েই ভিরাসাম প্রতিষ্ঠিত হয়।  ভারাভারা রাও ও অন্যান্যরা মিলে শ্রী শ্রী সহ আরো অনেক পুরনো প্রজন্মের লেখকদের সমর্থনে নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভিরাসাম”।


বাংলাদেশের গণযুদ্ধের ৬ গেরিলার বিপ্লবী কবিতা

Mao_Zedong

আমাদের সাহিত্য ও শিল্পকলা হচ্ছে জনসাধারণের জন্যে, প্রথমতঃ শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের জন্যই এগুলো রচিত হয় এবং এগুলোকে শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যরাই ব্যবহার করে থাকেন কমরেড মাও সেতুং, [সাহিত্য ও শিল্পকলা সম্পর্কে ইয়েনানে প্রদত্ত ভাষণ- মে, ১৯৪২]

 

hh

বিদায় চিয়াং চিং

সাগর আলী

বিদায় চিয়াং চিং

কমরেড আমার

বিদায়, অকুতোভয়

বীর বিপ্লবী মাও প্রিয়া

বিদায় !

কারা প্রকোষ্ঠে পনের বছর

হার না মানা

ত্যাজি শির নিয়ে যে

মাও প্রদীপ জ্বালিয়ে

রেখেছিলে তুমি

তার আলো পৌঁছেছে

পেরু-ইরান-আমেরিকা

অন্ধ্র-বিহার

এই বাংলাদেশসহ

সারা দুনিয়ায়।

বুর্জোয়ারা পরম তৃপ্তিতে

তোমাকে ডেকেছে ‘কুচক্রি’

অভিধায় আমরা

তেমন কুচক্রি হতে

গর্ববোধ করি

মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবে

বিশ্ব প্রলেতারীয় পতাকা

হাতে ঝলসে ওঠা

আমরা আজন্ম তেমন

কুচক্রিই হতে চাই।

শেকল পরা হাতে

ধনীক শুয়োরদের আদালতে

দাঁড়ানো শ্রমিক শ্রেণী

ও তার বিপ্লব হয়ে

তীব্র কটাক্ষে ঘায়েল করো

বুর্জোয়া পৃথিবীকে

পেরু-ইরান-বিহার-অন্ধ্রে

এবং এই বাংলায়

আমরা তেমন কুচক্রী

হতে নিয়তঃ প্রয়াস পাই

যারা পরম অবজ্ঞায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়

ওদের ‘মৃত্যু পরোয়ানা’

বিজয়ের হাস্যে।

মার্কিন আর পশ্চিমার কাছে

কাইশেকের উত্তরাধিকার

বুড়ো শকুন তেং

ও তার সাঙ্গাৎরা

বিকিয়ে দিয়েছে সেই

– স্বাধীনতা

– প্রলেতারীয় ক্ষমতা

– সাম্যবাদের অভিযান

সেই শোধনবাদী শুয়োরদের

সব কিছুকে আমরা

অবিশ্বাস করি।

অবজ্ঞা করি ! ঘৃণা করি !

ওরা বলছে

তুমি আত্মহত্যা করেছ

আমরা তা অবিশ্বাস করি।

ওরা তিলে তিলে

হত্যা করেছে তোমাকে

বলি আমরা।

ওরা বলছে

তোমার মৃত্যু হয়েছে

কমরেড, আমরা তা-ও

অবিশ্বাস করি।

তুমি বেঁচে আছো

যুগ যুগ রবে বেঁচে

যদ্দিন না

দুনিয়ার একটি দেং-ও

বেঁচে রবে

সাম্যবাদের পতাকা

যদ্দিন না

পত পত করে উড়বে

মনুষ্য পৃথিবীর

প্রতিটি প্রান্তরে।

  জুলাই, ’৯১

hh

পেরুতে লাল আগুন

– আঃ ছাত্তার

[১৯৯১ সাল পেরুর গণযুদ্ধের সাথে আন্তর্জাতিক সংহতি বর্ষ উপলক্ষ্যে]

পেরুতে বিপ্লবের লাল আগুন

নিভিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা যখন চলছে,

আমাদের কাজ মার্কিন দূতাবাস উড়িয়ে দেওয়া

পেরুতে লাল আগুন

নেভানোর চেষ্টা যখন চলছে,

লিমা, আয়াকুচো, হুয়াল্লাগা ভ্যালীর

কোকো চাষীরা যখন রক্তাক্ত,

আন্দেজের স্বর্গীয় উদ্যান যখন তার সন্তানদের রক্তে প্লাবিত।

আমাদের কাজ মার্কিন দূতাবাস উড়িয়ে দেওয়া।

আমাদের মাথার উপর ডলারের খড়গ

এদেশের হৃৎপিণ্ড, ধমনি, শিরা-উপশিরাগুলি ফালি ফালি,

কুচি কুচি করে

চুষে নিচ্ছে যখন প্রতিফোঁটা তাজা রক্ত

তখনই আমাদের কাজ মার্কিন দূতাবাস উড়িয়ে দেওয়া।

প্রত্যেকটি দূতাবাসই যুদ্ধের কমান্ডিং পোষ্ট

আমাদের কাজ শত্রু’র কমান্ড পোষ্টগুলি উড়িয়ে দেওয়া

না হলে যতই মিটিং মিছিল করুন না কেন ………….

না না, মিটিং মিছিলের বিরোধিতা আমি করছি না,

মিটিং মিছিলকেই বরং বলছি

শত্রু’র কমান্ড পোষ্টগুলি উড়িয়ে দিন।

নাহলে আপনার সাম্যের রাজ্যের

বাস্তব ভিত্তিগুলো- ওরাই উড়িয়ে দেবে।

তাই যুদ্ধের কমান্ড পোষ্টগুলো উড়িয়ে দিন বন্ধুরা

শত্রু’র কমান্ড পোষ্টগুলো উড়িয়ে দিন।

নভেম্বর, ’৯১

hh

অপেক্ষা, আবার গরাদের ওপারে

তসলিম

সারাকার অগ্নিকাণ্ডে যখন

দগ্ধ হয়েছে আমার বোন

আমি আমার বোনের লাশের জন্য

গার্মেন্টস কয়েদখানার

গরাদের এপাশে

অপেক্ষা করছিলাম নিস্তব্ধ, নিথর।

আজ বছর না ফুরোতেই

আবার গরাদের বাইরে

অপেক্ষা করছি

আমার বোনের জন্য

কিন্তু আজ বোনকে আমার

লাশ করে নিতে আসিনি

এসেছি জীবন্ত বোনদের

মিছিলে নিতে

এসেছি তাদের যুদ্ধে নিতে।

বারবার আমরা কেবল

লাশ হতে আসিনি দুনিয়ায়

বারবার গরাদের এপারে

দাঁড়াতে আসিনি কেবল

গরাদ ভাংতেও এসেছি

জীবনের ডাকে এসেছি

লড়াই করতে এসেছি।

বারবার মালিকের কাছে

অধিকার ভিক্ষা করতে নয়

এসেছি মালিকানা আদায় করতে

এসেছি অধিকার ছিনিয়ে নিতে।

তাই, প্রিয় বিদ্রোহী

বোনেরা আমার –

মিছিলে আসুন, আসুন গণযুদ্ধে

এবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব

মালিক শ্রেণীর মৃত্যুতে।

আসুন, মাও-এর পথে

গণযুদ্ধে আসুন

বন্দুকের নলে ঝলসে উঠে

ভেঙ্গে যাক যত অধীনতার শেকল

কেবল আমরা লাশ হতে

আসিনি দুনিয়ায় ————-

  ডিসেম্বর, ’৯১

hh

নারী হতে লজ্জা কিসের !

শ্যামল

[ ৮ মার্চ, ’৯২ নারী দিবস উপলক্ষ্যে ]

প্রতিবাদী নারী পুরুষের শ্লোগানে মুখরিত

নারী দিবসের র‌্যালী

যখন নারী মুক্তির

প্রলেতারী পতাকায়

করছিল শহর প্রদক্ষিণ

কটাক্ষ হানল কোন পুরুষ

সমবেত পুরুষদের দেখিয়ে বলল,

ঐ দেখ সব নারীরা।

পুরুষ এক কমরেড

জবাব দিলেন,

ঠিক তাই, নারী আমরা সবাই

যদি আরো জানতে চাও, শোন

পতিতা নারী আমরা।

পতিতাদের মুক্তির মিছিলে

নেমে পড়েছি বলে

যদি বলো আমরা পতিতার ছেলে,

জারজ- পরিচয়হীন

তবে আমরা তাও।

আমরাই ধর্ষিতা- এসিডদগ্ধা

স্বামী পরিত্যক্তা বা পরিবারের জোয়ালে

বাঁধা বধু বা বিধবা কলংকিনী

ধর্ম আর সতীত্বের বলি

না মানার নীরব চোখের কটাক্ষে

মৃত্যুবরণ, রাজতন্ত্রের পাথর নিক্ষেপে,

সহমরণের চিতায় জ্বলে ওঠা বিদ্রোহ

আমরাই দিনরাত্রের নারীযোদ্ধা

গার্মেন্টস মেয়ে

যাদের তোমরা ‘নষ্ট’ বলো।

আরো জানতে চাও ?

ঘোষণা করছি,

আজকের পুরুষতন্ত্রের সব থেকে

বড় দৈত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত

গর্ভপাতের অধিকারের দাবীতে সোচ্চার

আমেরিকার গর্ভবতী নারীদের মিছিলে

আমরা গর্ভবতী নারী।

আমরাই রোজা- ক্লারাসেৎকিন

আমরাই কমরেড চিয়াং চিং

আমরা এডিথ লাগোস হত্যার

প্রতিশোধের প্রত্যয়ে অনড়

পেরুর নারী গেরিলা

আমরাই কমরেড মিচি।

নারী পুরুষ নই

আমরা সবাই মাও- লেনিন

আমরাই ষ্ট্যালিন ক্রুপস্কায়া

আমরা সর্বহারা

জাত নেই যার, দেশ নেই যার

জয়ের জন্য আছে সারা দুনিয়া।

মার্চ, ’৯২

hh

একজন বদলী শ্রমিক

              সবুজ

শ্রম চা – – – – – –– – – – – –

এই শব্দে একটু আগেই

ক্ষুধার্ত চিৎকার দিয়েছে

নিউজপ্রিন্ট

আরো অন্ধকার- ফাঁক করে

এই আঙ্গিনায় এসে দাঁড়িয়েছি

কতিপয় বেকার মানুষ

– কাজ চাই আমরা

মেশিন বার্কার থেকে হ্যান্ড বার্কার

প্রতিটি বার্কারে

কাজ চাই আমরা

-‘নিতে হবে বাকলের আটি ?’

ব্যর্থ বেকার বাকল বাহকেরা

ভৈরবীর পাড়ে এসে দাঁড়ায়

ওপাড়ে স্বল্প উজ্জ্বল সূর্য

তীর ঘেষে দাঁড়ানো প্রহরী ঘরবাড়ি

গাছ-গাছালী ভরা সবুজ প্রাচীর কিংবা

ঘনগ্রাম।

এ পাড়ে

দুর্বা ঘাসগুলো এখনো গোছল সারছে

হালকা কুয়াশায়

ডানপার্শ্বে

ঝরণার শব্দে ভাটার ভৈরবীতে নামছে

রাসায়নিক গন্ধে ভরা খয়েরী জল

বাঁ পাশে

ষ্টিমারের ডেক থেকে ফোস ফোস ফণা

তুলে উঠে নামে ক্রেন

আধুনিক সভ্যতার বাহক কাগজের

বেলগুলো

কি সুন্দরভাবেই না গুছিয়ে রাখা হচ্ছে

ষ্টিমারের বড় পেটে

গ্রাইন্ডার প্লান্টের গম্ভীর শব্দে আমার

দেহের নীচের মাটি তখন কাঁপছে

সামনে ক্ষুধার্ত পেটে শুয়ে আছে ভাটার

ভৈরবী নদী

তীরে দাঁড়িয়ে আছি

– এক ক্ষুধার্ত বেকার শ্রমিক

পেছনে ক্যান্টিন

প্লেট-চামচ-জগ ও গামলার শব্দ

শুনছি আমি

ভক্ষক নরদের কোলাহল আসছে ভেসে

হাওয়ায় ভাসছে চাপাতি, পরোটা,

হালুয়া ও ভাজির শব্দ

আর রাত থেকে

যদিও বেকার ও অনাহারী আমি

যদিও মোচড় দিয়ে উঠছে

পেটের ভিতরকার পাকানো দড়িগুলো

তবু

এই ক্যান্টিনে প্রবেশাধিকার নেই

আমার

এই যে ক্রেন উঠাচ্ছে- নামাচ্ছে টন টন

কাগজের বেল

তার জন্য সামান্যতম

শ্রম হলেও আমি দিয়েছি

এই যে বয়লার থেকে উঠছে সাদা

ধোঁয়া

এর সচলতার জন্য সামান্যতম শ্রম

হলেও আমি দিয়েছি

এই যে গ্রাইন্ডার প্লান্ট ঘর ঘর করে

ভাঙ্গছে কাঠের গুঁড়ি তার সচলতার

জন্য

সামান্যতম শ্রম হলেও আমি দিয়েছি।

কিন্তু সরকারী রেটের ডাল, ভাজি,

চাপাতি ও পরাটাগুলো

আমার জন্য অবৈধ

যদিও আমি ক্ষুধার্ত, খুবই ক্ষুধার্ত,

মোচড় দিয়ে উঠছে, রাক্ষুসে পেট

তবু পাঁচ গজ কাছে এই ক্যান্টিনে

প্রবেশাধিকার নেই আমার

যেখানে দাঁড়িয়ে আছি

এমনকি এই মাটিও আমার জন্য অবৈধ

ঘাড় ধাক্কাদের দয়ায় বা ফাঁকি দিয়ে

শকুন চোখ

যখনি দাঁড়াই এই ইয়ার্ডের

আত্মগর্বী শব্দ আর কেমিক্যাল দুর্গন্ধের

ভেতর

কেবলি ভাবি

এই ক্যান্টিন, এই ইয়ার্ড, এই শ্রমডাকু

নিউজপ্রিন্ট

কবে যে আমাদের হবে

এবং

সমুদ্র গর্জনের মতো দৃঢ় উচ্চারণ করে

কবে যে বলে উঠতে পারবো

এই ভূমি, কলকব্জা ও উৎপাদনগুলো

সব আমাদেরই !

সব আমাদেরই !!

মে, ’৯২

hh

মৃত্যু একটি গতিহীন শব্দ

রাজু

(কমরেড শিবলী কাইয়ুম স্মরণে)

সামরিক বা সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে

অগ্রসেনা সে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রে ভণ্ডামী অমানবিক

শ্রেণী শোষণ প্রণালীবদ্ধ ব্যাখ্যা করতো।

আহা

বলতো যখন সে,

জনগণের কী চমৎকার মনঃসংযোগ !

সামনে সংসদীয় গণতন্ত্রের সংবিধান

পেছনে জনজীবন বিপন্ন করা পুঁজির কালো

হাত,

কলকাঠি নাড়ায়, কলকাঠি নাড়ায়।

বলতো

সংসদ, যেন অনেকগুলো কুকুরের বৈঠক

হাউ হাউ কাউ কাউ ঘোঁৎ ঘোঁৎ।

জনসভার মঞ্চে গম গম আওয়াজে

তার কণ্ঠ যেন

হাজার বছর ধরে

শোষণের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক।

আজ সে প্রাণহীন

তার শেষকৃত্যে সে গতিহীন

আর সবাই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে

লাল পতাকায় গতিশীল।