সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৩য় পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবারবুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(তৃতীয় পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি ও PLGA এর একত্রীকরণের পর PLGA এর উন্নয়ন ও গেরিলা যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমরা একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গতি হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গণপতিঃ আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক। এই কারণে গত দশকে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এবং এখানে গতি হ্রাস পাওয়ার যে পর্যবেক্ষণ করেছেন সেটিও সঠিক যেহেতু ২০১১ সাল থেকে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি পরিস্থিতির একটি সার সংক্ষেপ করে এবং যাচাই করে দেখা যায় যে আমাদের আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে। গত দশ বছরে অগ্রগতির পথটা বন্ধুর ছিল এবং আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোন পরবর্তীতে দুবল হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে ঠিক তেমনি কেবল বিভিন্ন গেরিলা জোনগুলোই নয় বরং সারা দেশের বিপ্লবী আন্দোলন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি আইন। নিঃসন্দেহে, আমাদের মানসিক শক্তি গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটায়, এবিষয়ে কোন মতবিরোধ থাকার কথা নয়।

অবশ্য, ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন গেরিলা জোনে গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটেছে। একইভাবে, গেরিলা যুদ্ধের উত্থান পতনের ক্ষেত্রেও এই অবস্থাগুলো একটি ভিত্তি গঠন করে। এই বিষয়টা উপেক্ষা করলে আমাদের চলবে না। ২০১১ সাল থেকে বেশ কিছু রাজ্যের/গেরিলা জোনের মিলিটারি ফ্রন্টে গণ সংগ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে ও আন্দোলন প্রসারের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। এই সময়কালে বিপ্লবী গণ কমিটিগুলোকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে পার্টিকে সংহত করার মাধ্যমে কিছু গেরিলা জোনে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটেছিল। তারপরেও আমরা মন্দার মুখোমুখি হয়েছি। পার্টি এই মন্দার কারণগুলো চিহ্নিত করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমগ্র পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে তুলেছে এবং এটিকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা উচিৎ।

অপারেশন গ্রিন হান্টের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে এবং মোদি নেতৃত্বাধীন NDA সরকার ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ সব কিছুই প্রচণ্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে এবং পাল্টা লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে করতে হয়েছিল। জল, জঙ্গল, ভূমি, ইজ্জত ও অধিকারের জন্য সংগ্রামরত মানুষের সমর্থনে ও অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে সমাজের যে সকল গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ তীব্রভাবে সোচ্চার হয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে পার্টি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানায়। জনগণের লড়াকু শক্তিকে টেকসই করতে এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৯ সালের মধ্যভাগ থেকে এই বিপ্লব বিরোধী যুদ্ধের পাল্টা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বিপ্লবী বাহিনী ও বিপ্লব বিরোধী বাহিনীর শক্তির ফারাকটা ছিল বিশাল। শত্রুর প্লাটুন পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কোম্পানি পর্যায়ে গেরিলা বাহিনীকে মোতায়েন করা হত। ব্যাটেলিয়ন পর্যায়ে গেরিলা বাহিনী শত্রুর কোম্পানি পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে, শত্রুরা প্রতিটি গেরিলা জোনে হাজার হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ বাহিনী মোতায়েন করল। সুতরাং, বিপক্ষ বাহিনীর সাথে শক্তির ফারাকের দরুণ আমাদের গেরিলা যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে নতুন কিছু প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হল। আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্যই যে কেবল শত্রুরা এত বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করল তা নয়, বরং একই সাথে এই দশকে ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় এবং প্রায় সব গেরিলা জোনেই যে গুরুত্বপূর্ণ গণ আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলোকে দমন করার জন্যেও এই বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এভাবে, এই অধঃপতিত ব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে মাওবাদী আন্দোলন প্রকাশিত হল। আমাদের গতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে তাকে কেবল শত্রুর দমন নিধনের ফলাফল হিসেবে দেখলে হবে না পাশাপাশি একে আমাদের নিজেদের দুর্বলতার বিপর্যয় হিসেবেও দেখতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমরা আমাদের ভুলগুলো ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছি এবং পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোর বলশেভিকীকরণের কাজ হাতে নিয়েছি।

একই সাথে, এই পরিস্থিতির পিছনে যে বাহ্যিক শর্তগুলো কাজ করেছে সেগুলোও আমাদেরকে দেখতে হবে। আগের ধাপে শত্রুর আক্রমণের পাল্টা মোকাবেলা হিসেবে আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলাম যেগুলো কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় শত্রুরা এই কৌশলগুলোর পাল্টা কিছু কৌশল গ্রহণ করে। ফলে নতুন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সুতরাং, আমাদেরকে আবারো কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হবে যেগুলো গেরিলা যুদ্ধে শত্রুর সর্বোচ্চ বাহিনীকে মোকাবেলা করতে আমাদেরকে সাহায্য করবে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। গেরিলা যুদ্ধ গড়ে তোলা ও অগ্রগতি ঘটানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল আমাদের গণভিত্তিকে মজবুত করা। আন্দোলনের উত্থান ও পতনের যে প্রক্রিয়া সেটি নতুন নতুন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটি বোঝার ক্ষেত্রে এবং পার্টি, PLGA ও জনগণকে এর জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পার্টির দিক থেকে কিছু গুরুতর ভুল হয়েছে। নতুন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে পার্টির ত্রুটির কারণে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে একটি শক্তিশালী শত্রুর সাথে লড়াইয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থার অবনতি ঘটেই থাকে।

এই কারণে মাও বলেছিলেন জয়-পরাজয়-জয়-পরাজয় ও সবশেষে জয় এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এগিয়ে যাবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ সবসময় একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও আংশিক সাফল্য ও কিছু বড় ধরনের সাফল্য ও অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে কিছু ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ও আংশিক ক্ষতি, পরাজয় ও কিছু বড় ধরনের ক্ষতি ও পশ্চাদপসরণ থাকে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি নিয়ম যে এটি আঁকাবাঁকা ভাবে চলে। কাজেই গেরিলা যুদ্ধের গতি হ্রাস হবার ঘটনাকে আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণ করার অর্থ এটাই দাঁড়ায়। আমাদের দেশের বিভিন্ন অংশে আন্দোলন যে বন্ধুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে সেটিকে মাথায় রেখে আমাদের কাজের স্থানগুলোর বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন অনুযায়ী আমাদেরকে হয় আত্মরক্ষার কৌশল অথবা আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুদ্ধের সামগ্রিক পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একে বিবেচনা করতে হবে।

শুধু বিভিন্ন অংশেই নয়, একটি গেরিলা জোনের ভিতরেও সেই নির্দিষ্ট গেরিলা জোনটির বিশেষত্ব অনুযায়ী আমাদেরকে আক্রমণাত্মক কিংবা আত্মরক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কিছু এলাকায় যদি অবস্থা একটু ভালও হয়, তাহলেও সামগ্রিকভাবে যে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদের করতে হচ্ছে তাকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। এবং আমরা সকলে জানি যে আত্মরক্ষার মধ্যে সবসময় আক্রমণ নিহিত থাকে এবং আক্রমণাত্মক না হয়ে কোন আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, সকল পর্যায়ের নেতৃত্বকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের পার্টিতে যে দুইটি বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে তা হল-

১। শত্রুর আপাত শক্তিমত্তা ও তীব্রতার প্রতি দৃষ্টি আরোপ করা এবং তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত না করা; নিজেদের শক্তিমত্তা, সুবিধা ও বিপ্লবী যুদ্ধে জনগণের প্রভাবশালী ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আরোপ না করা; শত্রুর বৃহৎ কৌশলকে না বুঝে কেবল শত্রুর ক্ষুদ্র কৌশলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা। এর ফলে কমরেডগণ আত্মরক্ষার নামে কাজ করার উদ্যম হারিয়ে ফেলে অক্রিয় হয়ে পড়বে এবং শেষে লড়াকু শক্তি হারিয়ে ফেলবে। এটি হল ডান বিচ্যুতি।

২। গেরিলা যুদ্ধে লড়াইয়ের দিকগুলোতে যে পরিবর্তন ঘটেছে তাকে না বোঝা এবং আত্মরক্ষা তথা নেতৃত্বকে রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার দুর্বলতা, জনগণের অক্রিয়তাকে বিবেচনায় না রেখে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করা। তারা শত্রুকে ক্ষুদ্র কৌশলগত দিক থেকে দেখে না, তারা শত্রুকে কেবল বৃহৎ কৌশল দ্বারা যাচাই করে। এটি একটি বাম বিচ্যুতি।

কাজেই, আমাদের গেরিলা যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি করতে হলে দেশের সামগ্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে সেগুলো জানার পাশাপাশি বিপ্লবী যুদ্ধে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো জানতে হবে এবং শত্রুর ও নিজেদের শক্তিমত্তার ও দুর্বলতার জায়গাগুলো জানতে হবে। এটি একটি অন্যতম প্রধান বিষয় যেটি আমরা বলশেভিকীকরণের মধ্য দিয়ে অর্জন করার চেষ্টা করছি। জয়লাভ করতে হলে গণভিত্তি বৃদ্ধি করা, জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা চালানো, গেরিলা যুদ্ধ ও গণযুদ্ধের সমস্ত কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় ভূমিকা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরী। কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিটি ও সকল পরিচালনা কমিটি বর্তমানে এই বিষয়টিকে বুঝে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে।

(চলবে)  

Advertisements

সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (২য় পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-kA7G-621x414@LiveMint

(দ্বিতীয় পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ বর্তমান সময়ে পার্টি কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে? সেগুলো অতিক্রম করার কী কী সুযোগ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ বর্তমান সময়ে আমাদের আন্দোলন যে সব প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো উল্লেখ করছি। প্রথমত, আমাদের নেতৃত্বকে বিশেষ করে পার্টির কৌশলগত নেতৃত্বকে রক্ষা করা। নতুন পার্টি গঠনের পর কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ের পার্টি কমিটি পর্যন্ত সকল স্তরের অনেক নেতাকে আমরা হারিয়েছি। নেতৃত্বকে রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমাদেরকে কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই গোপন ও যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, ভুলগুলো সংশোধন করতে হবে, অনুশীলন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে, নতুন নেতৃত্বকে প্রস্তুত করতে হবে এবং বিপ্লবের সাফল্যের শর্ত হিসেবে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় একটি শক্তিশালী পার্টির প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সমগ্র পার্টির ভেতরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে ও শহর এলাকায় বিপ্লবী আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পার্টি যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এটি তার একটি কারণ। যে সমস্ত এলাকায় আমাদের পার্টি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করেছে কিন্তু পর্যায়ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে সে সমস্ত এলাকায় আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করা ও বিস্তৃত করা আমাদের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ। একইভাবে, নতুন এলাকাতেও আন্দোলন সম্প্রসারিত করতে হবে এবং গণযুদ্ধের ক্ষেত্রকে বর্ধিত করার লক্ষ্যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। এই আন্দোলনের অভিজ্ঞতার আলোকে অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করে বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য ক্রমবর্ধমান অনুকূল অবস্থাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। এভাবে আমরা অবশ্যই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

তৃতীয়ত, কেউ কেউ বলছেন ভারতের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে ভারত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এগুলো বলে বিপ্লবী ক্যাম্পে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে এধরনের ভুল দৃষ্টিভঙ্গিও তারা সামনে নিয়ে আসছেন। কিন্তু ভারতের মতো একটি আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্রে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধই একমাত্র সঠিক বিপ্লবী উপায় হিসেবে অনুশীলনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং, এ জাতীয় ভ্রান্ত ধারণার বিপক্ষে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং এগুলো প্রকাশ করতে হবে। একই সাথে আমাদেরকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলো গভীর ভাবে জানতে হবে ও সে অনুযায়ী আমাদের যুদ্ধ কৌশলে যথোচিত পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে।

চতুর্থত, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিবাদী শক্তি এখন কেন্দ্রের ক্ষমতায় এসেছে যারা সামন্তবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির দৃঢ় প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া দালালদের মদদপুষ্ট মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে আর তার সাথে বিভিন্ন স্থানে যুক্ত হয়েছে সঙ্ঘ পরিবার (The Sangh Parivar) উদ্ভাবিত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ।

ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি বিদেশী ও দেশীয় বড় বড় পুঁজিবাদী ভূস্বামীদের লোভ মেটাতে বিপজ্জনক গতিতে সাম্রাজ্যবাদপন্থী, দেশ বিক্রির নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে আরম্ভ করেছে এবং সেই সাথে হিন্দু ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বিভিন্ন রূপে এগিয়ে নিতে চাইছে। সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক শক্তিকে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন পথ দেখাবে। সংগ্রামের এই যুদ্ধক্ষেত্রে সমাজের আরো অনেক নতুন শ্রেণী, সামাজিক গোষ্ঠী থেকে জনগণ আসবে এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন নতুন সুযোগ তৈরী হবে।

পঞ্চমত, বিশ্বের বাস্তব পরিস্থিতি বিপ্লবের পক্ষে আরো বেশী অনুকূল হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব অর্থনীতি এখনো তীব্র সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং বিশ্বের সমস্ত মৌলিক অসঙ্গতিগুলো শাণিত হচ্ছে। ফলে, সাম্রাজ্যবাদ ও এর গৃহপালিত সমর্থকদের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবী জুড়ে বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় মুক্তি বাহিনীগুলো শক্তি লাভ করছে। মাওবাদী বাহিনীগুলোও শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিগুলোর আর কোন অস্তিত্ব নেই এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মানসিক শক্তি খুবই দুর্বল। এটিও আমাদের সামনে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

(চলবে)

 


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (১ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছেলাল সংবাদ‘।

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার  বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে

c

comrades-kA7G-621x414@LiveMint

(প্রথম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

 

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন- 

মাওবাদী তথ্য বুলেটিন: পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে MIB এর পক্ষ থেকে আপনাকে ও আমাদের সকল কমরেডদের জানাচ্ছি বিপ্লবী শুভেচ্ছা।

গণপতিঃ ধন্যবাদ। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে MIB এর সকল কমরেডদের প্রতি বিপ্লবী শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

মাওবাদী তথ্য বুলেটিন: গত দশ বছরে পার্টির কী কী উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ ১৯২৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Communist Party of India) গঠিত হবার পর থেকে আমাদের দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় পার করেছে। এর মধ্যে গত দশকটি অনন্য সাধারণ, কারণ এ দশকে নকশালবাড়ির পর থেকে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে পরিচালিত দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু অভিনব ও নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী গত দশক। এই দশকের তাৎপর্য্যপূর্ণ ঘটনাগুলো হল-

-ভারতে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য একটি একক গাইডিং সেন্টারের সূচনা করা। পার্টি, আর্মি ও যুক্তফ্রন্ট(United Front) বিপ্লবের এই তিনটি ম্যাজিক অস্ত্র আগের থেকে আরো বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠছে; রাজনৈতিক ও সামরিক লাইন, যুক্তফ্রন্টের নীতিমালা ও অন্যান্য নীতিমালাকে ঐক্যবদ্ধ পার্টির দলিলপত্র হিসেবে সমৃদ্ধকরণ।

-কংগ্রেসের দলিলপত্র, নীতিমালার কাগজপত্র, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সার-সংক্ষেপ, আর্টিকেল ইত্যাদির সমন্বয় সাধন করা; মিলিটারি লাইনের আরো উন্নয়ন সাধন, গেরিলা যুদ্ধকৌশলের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে জনগণের বিশাল অংশগ্রহণ ঘটেছে যা এই লড়াইতে সত্যিকারের গণযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছে ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে যার ফলে শত্রুর নৃশংসতম বিপ্লব বিরোধী দমন অভিযান পরাভূত হয়েছে। জল, জঙ্গল, ভূমি, সম্মান ও অধিকার বিষয়গুলোতে জনগণের বড় অংশ বিশেষ করে কৃষকদের অংশগ্রহণে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিপ্লবী গণ কমিটি (Revolutionary People’’s Committees- RPCs) আকারে কৌশলগত যুক্ত ফ্রন্ট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধি ও সুপরিকল্পিত যুক্তফ্রন্ট গঠনে নতুন ও অধিকতর ভালো অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। শাসক শ্রেণীর গণ বিরোধী, দেশ বিক্রিকারী উন্নয়ন মডেলের বিপরীতে বিপ্লবী গণ কমিটি (RPCs) কর্তৃক উন্নয়নের বিকল্প মডেল স্বীকৃতি পেয়েছে যেটি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।

বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগিতায় গোটা দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদী ভারতীয় সরকার পরিচালিত নজিরবিহীন বর্বর দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় বিপ্লব টিকে আছে এবং ভারত তথা গোটা বিশ্বের মানুষের মাঝে বিপ্লবের আশাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে ও গণযুদ্ধের স্বপক্ষে লড়াইরত বিপ্লবী গণমানুষের জন্য ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অর্জিত হয়েছে।

সিপিআই (মাওবাদী) ও সিপিআই (এম-এল) নকশালবাড়ির একটি একক পার্টিতে একীভূত হবার ঘটনা আমাদের দেশে প্রকৃত বিপ্লবীদের মাঝে ঐক্যবদ্ধকরণের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। ভারতের গণযুদ্ধ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে যাকে ঘিরে মাওবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ঐক্য, আন্তর্জাতিক সংহতি ও সমর্থন আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। মহান নকশালবাড়ির সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের ফলে সূচিত এবং আমাদের পার্টির মহান প্রতিষ্ঠাতা নেতা কমরেড চারু মজুমদার ও কানহাই চট্টোপাধ্যায় প্রণীত নতুন মতাদর্শ, নতুন রাজনীতি, নতুন লাইন, নতুন পার্টি, নতুন আর্মি ও নতুন গণ ফ্রন্টের উপর ভিত্তি করে গত দশকের এই নতুন ও তাৎপর্য্যপূর্ণ উন্নয়নগুলো সাধিত হয়েছে।

এক দিকে শত্রুর নিরন্তর বর্বরোচিত দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে পাল্টা লড়াই চালিয়ে ও অন্যদিকে আন্দোলনের বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে পার্টির ভেতরে গজিয়ে উঠা ডান ও ‘বাম’ সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে তিক্ত সংগ্রাম চালিয়ে গত দশকের সকল উন্নয়নগুলো অর্জিত হয়েছে। ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য কমিউনিস্ট ও সাধারণ মানুষ উভয়ের গৌরবময় আত্মদান। তাদের আত্মদান ছাড়া গত দশকের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কোনটাই অর্জিত হত না। এই আত্মদানগুলোর মধ্য দিয়ে পার্টি একটি বিকল্প ধারার চিন্তা ও সংস্কৃতিকে সামনে তুলে এনেছে যেটি সর্বোচ্চ মানবীয় মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এ ধারা, শাসক শ্রেণী কর্তৃক জনসাধারণের মাঝে ধীরে ধীরে নষ্ট, অধঃপতিত ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ও সংস্কৃতির ধারা প্রবেশ করানোর যে প্রক্রিয়া, তার বিরোধী। এভাবে, এই আত্মদানগুলো সমাজের নির্যাতিত শ্রেণীকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য লড়াই করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

(চলবে)


৭১ বছর আগে কেন আর্নেস্ট থালমানকে হত্যা করা হয়েছে

হিটলার ও হিমলারের সরাসরি নির্দেশে আর্নেস্ট থালমানকে ১৮ আগস্ট ১৯৪৪-এ এগার বছরেরে নির্জন কারাবাসের পর হত্যা করা হয়। এর আগে তাকে বুটজেন কাগাগার থেকে ওয়েইমারের কাছে বুচেনওয়াল্ড কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে সরিয়ে আনা হয়, যেখানে তাকে হত্যা করে তার দেহকে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

তাই তার কোন কবর হয়নি।thaelmann1 এই ঘটনাটি এতটাই গোপনে ঘটানো হয়েছে যে নাৎসি সংবাদপত্র “ভয়শের অবজারভার” রিপোর্ট করে যে থালমান ২৪ আগস্ট মিত্র বাহিনীর “সন্ত্রাসী বোমা”য় নিহত হয়েছেন।

নাৎসিরা সত্য প্রকাশে এতটা ভীত ছিল কেন? কেননা আর্নেস্ট থালমান ধারণ করতেন একটা দৃষ্টিভঙ্গী, একটা তৎপরতা, এক সংস্কৃতি আর এক মতাদর্শ। আর্নেস্ট থালমান মানে হচ্ছে জাতীয় সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি, যুদ্ধ থেকে মুক্তি, গণফ্রন্টের মাধ্যমে, আর জনগণতন্ত্রের লক্ষ্যে!

জাতীয় সমাজতন্ত্র সত্যিকার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি করেছিল, জার্মানীর জন্য সঠিক লাইন খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছিল। ফল হল যুদ্ধ, দারিদ্র, ধ্বংস, আর নৈতিক অবক্ষয়, আর এ সবই পুঁজিবাদবিরোধী রোমান্টিকতাবাদের ফসল, যার লক্ষ্য ছিল সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা, “পরজীবী”দের অপসারণ করতেঃ যার আসল অর্থ ছিল “লগ্নি পুঁজির সর্বাধিক সাম্রাজ্যবাদী উপাদানসমূহের সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে জাতিদম্ভী প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব”।

আর্নেস্ট থালমান আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। ১৯২৪ থেকে তিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন, যে পার্টি রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবনেখট কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ব্যাপক জনগণকে সমাবেশিত করার সর্ব প্রকার প্রচেষ্টা চালান, যে জনগণ সমাজ গণতন্ত্র কর্তৃক পঙ্গুত্ব বরণ করেছিল, কারণ জার্মান সমাজ গণতন্ত্রী পার্টি (এসপিডি) না ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে, না সত্যকার ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের পক্ষে।

কমিউনিস্ট পার্টি তার পক্ষে যা করা সম্ভব সবই করে যাতে পুঁজিবাদবিরোধী ও ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম এক গণ আন্দোলনে পরিণত thaelmann2হয়; তাই লাল ফ্রণ্ট যোদ্ধাদের মোর্চাঃ ফ্যাসিবিরোধী একশনও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই লড়াই সমাজ গণতন্ত্রের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নয় বরং এসপিডির আত্মসমর্পণ লাইনের বিরুদ্ধে চালানো হয়। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি যুক্তফ্রন্টের লাইনকে রক্ষা করে, আর স্পেন ও ফ্রান্সে যেমনটা হয়েছে, গণফ্রন্টের লাইনের জন্য এগিয়ে যায়।

নাৎসি ধারার মধ্যেকার যেসকল জনগণ বন্দী হয়েছিলেন তাদেরকেও কখনো ভোলা হয়নি। যেমনট আর্নেস্ট থালমান জানুয়ারি ১৯৩৩-এ ব্যাখ্যা করেনঃ

“কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের ব্যাপক জনগণের প্রতিও লক্ষ্য রাখে।

এসএ ও এসএস বাহিনীর মধ্যে এক ভয়ানক পার্থক্য ছিল, শ্রমিক এলাকায় দাঙ্গা বাঁধানোর মধ্যে, অথবা শ্রমিকদের ঘরবাড়ী ও ক্ষেত্রগুলিতে ঘেরাও আক্রমণ, ব্যাপক জনগণের মধ্যেওঃ সংকটাক্রান্ত শ্রমিক, কর্মচারী, নিম্ন মধ্যবিত্ত, হস্তশিল্পী ও ছোট ব্যবসাদারদের দুর্দশার মধ্যে পার্থক্য ছিল, যারা জাতীয় সমাজতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছে যেহেতু তারা হিটলার, গোয়েবলস ও স্ট্র্যাসার প্রভৃতির গলাবাজির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে।…

আমাদেরকে ধৈর্যশীল শিক্ষিতকরণের মাধ্যমে জনগণকে দেখাতে হবে যে হিটলার পার্টির সত্যিকার ভুমিকা হচ্ছে লগ্নি পুঁজির সেবা করা, ট্রাস্ট রাজ রাজরাদের, বৃহৎ ভুস্বামীদের, কর্মকর্তাদের ও প্রিন্সদের সেবায় কাজ করা।” [কার্ল লিবনেখটের বাড়ির সামনে নাৎসি উস্কানী এবং কিছু শিক্ষা, ২৬ জানুয়ারি ১৯৩৩]

আর এটাও জানা দরকার যে, নভেম্বর ১৯৩২-এর সাধারণ নির্বাচনে নাৎসি পার্টির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। যদিও নাৎসিদেরকে এককোটি দশ লাখ জনগণ ভোট দিয়েছিল, জুলাইয়ের থেকে ২০ লাখ ভোট কম পেয়েছে তারা। নাৎসি আন্দোলন ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করেছিল, তাই, হিটলারকে দ্রুত ক্ষমতায় বসানো হয়েছিলঃ যা কোন ক্ষমতা দখল ছিলনা, বরং ক্ষমতার বদল।

যেমনট আর্নেস্ট থালমান অক্টোবর ১৯৩২-এ নির্বাচনের আগেই উপলব্ধি করেনঃ

“জাতিদম্ভী ঢেউয়ের কারণে ফ্যাসিবাদী গণ আন্দোলনের বিপুল বৃদ্ধি ফ্যাসিবাদী শাসকদের ক্ষমতা দখলে অনুমোদন দেয়।

লগ্নি পুঁজির পলিসি, যা হিটলারের ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন কর্তৃক সরকারী ক্ষমতার অনুশীলনকে বর্জন করে, একদিকে আভ্যন্তরীণ ও বাইরের সংঘাতসমূহের অতিদ্রুত পোক্ত হওয়ার ভীতি থকে উদ্ভূত হয়, অন্যদিকে ফ্যসিবাদী গণ আন্দোলনের মজুদকে thaelmann3যতদূর সম্ভব সুদৃঢ়ভাবে বজায় রাখার বুর্জোয়াদের আকাঙ্খা থেকে, যাতে একই সাথে তাকে “সজ্জিত’ করা যায়, অর্থাৎ তাকে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের নিরাপদ যন্ত্র বানানো যায় বাঁধাদানকারী উপাদানসমূহকে অতিক্রম করে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এ পর্যন্ত অগ্রগমন এখন থমকে দাঁড়িয়েছে আর অবনতির জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে যে কারণে তা হল সর্বহারা শ্রেণীর বাড়ন্ত অগ্রগমন, পাপেন সরকারের রাজনীতির মাধ্যমে দারিদ্রকরণ ও হিটলারের সীমাহীন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় নিপীড়িত মধ্যবিত্তের জাগড়নরত রেডিকেলকরণ এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির ফ্যাসিবিরোধী গণসংগ্রামের প্রচণ্ড অগ্রগতি।

বাঁধাহীন শোষণের সমর্থন হিসেবে হিটলার পার্টির ভুমিকা, পুঁজিবাদী, জাঙ্কার ও জেনারেলদের সরকারের জন্য সাহায্য প্রদানে এর অবস্থান, লাউসান্নে স্বীকৃতি চুক্তি, বিপ্লবী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ফাসিবাদী খুনী সন্ত্রাসের ভুমিকা—এ সবই জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের অনুসারী নিপীড়িত জনগণের হতাশার সূচনা করে…

এনএসডিএপির সারি ভেঙ্গে পড়ার আর জাতীয় সমাজতন্ত্রী ঢেউয়ের অবনতির শুরুর কারণে হিটলারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে thaelmann4মতাদর্শিক আক্রমণাভিযানের বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের অনুসারীদের সারিতে প্রচণ্ড আঘাত হেনে ভাঙন ঘটানো গুরুত্বপূর্ণ করণীয়।

কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শ্রমিকদেরকে সর্বহারা ও জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের নিপীড়িত অনুসারীদের জয় করতে হবে মজুরী ও সহায়তা সংকোচন এবং পাপেন একনায়কত্বের বিরুদ্ধে, আর তাদের বোধগম্য করতে হবে যে হিটলারের পার্টি হচ্ছে লগ্নি পুঁজির সন্ত্রাসী ও প্রতিবন্ধকতা ভাঙার সংগঠন।

জনগণকে জাতিদম্ভী উস্কানী প্রদান, জার্মান বুর্জোয়ার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ পলিসি ও সমরবাদী সশস্ত্রকরণের মোকাবেলায় তাকে ভার্সাই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ বিকশিত করতে হবে ফরাসি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে ফরাসী কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শ্রমিকদের সংগ্রামের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ বজায় রেখে।

জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি পাপেন সরকারের সমরবাদী সশস্ত্রকরণ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ পলিসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, দাবি করে যুদ্ধের শিকার ও বেকার জনগণের জন্য শত শত কোটি টাকা, বুর্জোয়াদের ও সমগ্র প্রতিবিপ্লবের নিরস্ত্রকরণ, সর্বহারা শ্রেণীর নিকট ক্ষমতা ও ক্ষমতার যন্ত্রের পুর্ণ অর্পন এবং জার্মান শ্রমিক জনগণের সামাজিক ও জাতীয় মুক্তির।” [আর্নেস্ট থালমান, জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির thaelmann5সম্মেলন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটির দ্বাদশ প্লেনাম এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য, ১৭ অক্টোবর ১৯৩২]

জাতীয় সমাজতন্ত্র যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে ও ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে পুঁজিবাদের রক্ষাকবচ, আর্নেস্ট থালমান তার জীবন্ত প্রমান। তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে প্রকৃত সমাজতন্ত্রকে নির্দিষ্টভাবে সংগ্রাম করতেই জাতীয় সমাজতন্ত্র সেখানে ছিল।

তার জীবন ছিল জাতীয় সমাজতন্ত্রের এক পালটা প্রতিপাদ্য, আর নাৎসিরা জেনেছিল যে তাদের পরাজয় থালমানের বিজয় ডেকে thaelmann6আনবে। আর্নেস্ট থালমান এক বৈজ্ঞানিক অনুপ্রেরণা হতে পারতেন, তিনি একটা “পথনির্দেশক চিন্তাধারা” জন্ম দিতে পারতেন বাস্তবতার বৈজ্ঞানিক প্রতিফলন হিসেবে; থালমান মানে ছিল এক লাইন যা জার্মান সমাজকে বহু বছরের গণতন্ত্র বিরোধী দুর্দশার পর গণতন্ত্রের দিকে নির্দেশ করে।

উল্লেখ্য যে জুলিয়েন লাহাউটকে বেলজিয়ামে তার বাড়ীর সামনে হত্যা করা হয় ১৮ আগস্ট ১৯৫০ এ। রাজতন্তের বিরুদ্ধে প্রজাতন্তের সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব। তিনি ছিলেন বেলজিয়ামের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৪১ সালে ১০০,০০০ শ্রমিকের এক বিরাট ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন, তারপর নাৎসিরা তাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে 640px-Ernst_Thaelmann_Berlinপাঠায়, সেখানে তার উপর নির্যাতন চালায়, যা তিনি সর্বদাই প্রতিরোধ করেছেন।

জুলিয়েন লাহাউটও বিপ্লবী লাইন, বিপ্লবী প্রেক্ষিত ও নিজ দেশের এক উপলব্ধিকে ধারণ করেছেন। তাই, লাহাউট ও থালমান অমর।

সূত্রঃ http://sarbaharapath.com/?p=1082


৫০ বছর পরঃ কঙ্গোতে কমরেড চে গুয়েভারার ব্যর্থ বিপ্লবের গল্প

৫০ বছর আগে কঙ্গোতে ‘বিপ্লবী যুদ্ধের’ ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তার দিনলিপিতে মার্কসবাদী গেরিলা নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারা “এটি একটি ব্যর্থতার গল্প” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

১৯৬৫ সালের ২৪শে এপ্রিল এখনকার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর বিদ্রোহীদের সাথে যোগদান করতে চে আফ্রিকার কিউবার একদল যোদ্ধার সাথে গোপনে উপস্থিত হন।

তাদের লক্ষ্য ছিল আফ্রিকার কেন্দ্রবিন্দুকে নয়াঔপনিবেশিকতা ও ‘ইয়াংকি সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে প্রাচীর হিসেবে দাঁড় করানো।

কিউবার কমিউনিস্ট নেতা ওয়াশিংটনের চিরশত্রু ফিদেল কাস্ত্রো তাদেরকে সেখানে পাঠান। তারা তানজানিয়ার টাঙ্গানিকা হ্রদ পার হয়ে কপমগোর পূর্বাঞ্চলে নেমে হ্রদ তীরবর্তী বারাকা শহরেরর দিকে অগ্রসর হন।

1

কিউবান-আর্জেন্টাইন গেরিলা নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারাকে চিনতে পেরে কঙ্গোর আন্দ্রে শিন্দানোর মুখে হাসি । চে গুয়েভারার সাথে তার যখন দেখা হয় তখন তিনি ছিলেন ছোট বালক।

পূর্বাঞ্চলীয় পর্বতের বিদ্রোহীদের প্রাক্তন প্রধানের ছেলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার প্রধান পার্টির স্থানীয় শাখার নেতা আন্দ্রে শিবুন্দা চে কে স্মরণ করে বলেন “তিনি একজন বন্ধু হয়ে ও বিপ্লবকে ভালোবেসে এখানে এসেছিলেন”।

দক্ষিণ কিভু প্রদেশে সিম্বা (সোয়াহিলি ভাষায় ‘সিংহ’) বিদ্রোহীদের সাথে চে এর সাত মাস ব্যাপী এডভেঞ্চারের কথা বলতে গিয়ে শিবুন্দা বলেন আর্জেন্টিনায় জন্মগ্রহণকারী গেরিলা “আমাদের সাথে কিছুদিন জঙ্গলে কাটান কিন্তু তিনি দেখলেন যে আমাদের নেতাদের মধ্যে পরিপক্কতার অভাব রয়েছে আর তাই তিনি চলে যেতে মনস্থির করেন।”

2

গেরিলা নেতা চে গুয়েভারার ডায়েরি হাতে মেজর জেনারেল লুএনদেমা দুনিয়া

চে তার ‘আফ্রিকার স্বপ্নঃ কঙ্গোর বিপ্লবী যুদ্ধের ডায়েরি‘তে (The African Dream: The Diaries of the Revolutionary War in the Congo) লিখেছেন, “বারাকা শহরে এর অতীতের সমৃদ্ধশালী অবস্থার চিহ্ন চোখে পড়ে। সেখানে তুলা থেকে সুতা তৈরীর একটি কারখানাও ছিল, কিন্তু যুদ্ধ সবাইকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই সাথে ছোট কারখানাটিও বোমায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে”।

১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের কাছ থেকে দ্রুত স্বাধীনতা লাভের পাঁচ বছরের মধ্যে কঙ্গো পরপর কয়েকটি বিরোধে জড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে রয়েছে খনিজ সম্পদে পূর্ণ দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ কতঙ্গোর বিচ্ছিন্ন হবার ঘোষণা।

কঙ্গোর প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন কিন্তু ওয়াশিংটনে এক দুর্ভাগ্যজনক সফরের সময় তিনি নিজের ভাবমূর্তিকে ওয়াশিংটনের কাছে নিষ্প্রভ করে তোলেন।

এরপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সাহায্য চান যার ফলশ্রুতিতে তিনি শীতল যুদ্ধের এক প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন – যদিও এরপরেও তার বিভক্ত হয়ে যাওয়া দেশের অনেকের কাছেই তিনি শ্রদ্ধার আসনে ছিলেন–১৯৬১ সালের জানুয়ারী মাসে তিনি নিহত হন। তার হত্যাকাণ্ডের পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়টি এখনো বিতর্কিত।

3

গেরিলা নেতা চে গুয়েভারার সাথে সাক্ষাৎ করা কঙ্গোর নারী আন্না বিন্তি শাবানি

-‘সুসংগঠিত বিশৃংখলা‘-

কঙ্গোকে ওয়াশিংটনের প্রয়োজন ছিল। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যে এটম বোমাটি হিরোশিমায় ফেলেছিল সেটির ইউরেনিয়াম এসেছিল কঙ্গোর খনি থেকে।

এছাড়া কঙ্গো ছিল অস্ত্র শিল্পে ব্যবহৃত কোবাল্টের একটি অপরিহার্য উৎস্য যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য খনিজ সম্পদ ছিল সোভিয়েতের মাটিতে।

চে যখন এসে পৌঁছান, কঙ্গোর অপরিণত প্রজাতন্ত্র তখনো বিপর্যয়ের মধ্যে ছিল। কতঙ্গো প্রদেশ আবার ফিরে এসেছিল কিন্তু সিম্বারা যে বিদ্রোহ শুরু করেছিল তা আগের বছরে ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ বিদ্রোহে সিম্বারা লুমুম্বিস্টদের সাথে মাওবাদীদের যুক্ত করেছিল।

বিদ্রোহীরা দেশটির প্রায় এক তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছিল তবে কঙ্গোর মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের দুটি পকেটে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে তারা হেরে যায়- এমাসেই চে কঙ্গোতে এসে পৌঁছান।

চে বিদ্রোহী নেতা লরেন্ট-ডেজায়ার কাবিলা সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কাবিলা দেশের বাইরে সফরে ছিলেন। প্রাক্তন ফ্রেঞ্চ কঙ্গোর রাজধানী ব্রাজাভিলিতে কাবিলার সাথে কয়েক মাস আগে তার দেখা হয়েছিল।

কাবিলা যখন ৭ই জুলাই দেশে ফিরে আসেন তিনি মাত্র চারদিন থাকেন আর সেসময় দেশে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল যাকে চে বলেছেন ‘সুসংগঠিত বিশৃংখলা’।

4

টাঙ্গানুকা হ্রদ পেরোনোর সময় গেরিলা নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারা

চে লিখেছেন, “কঙ্গোর মানুষদের প্রধান সমস্যা হল তারা জানে না কীভাবে গুলি করতে হয়।”

চে সিম্বা বাহিনীতে বিপ্লবী উদ্দীপনার অভাব দেখতে পেয়েছিলেন এবং দেখলেন তারা বিভিন্ন যাদু বিদ্যার আচার অনুষ্ঠান পালন করে এই ভেবে যে এতে করে তারা অজেয় উঠবে। এসব দেখে ধীরে ধীরে তার ঘোর কেটে যাচ্ছিল।

বড় ধরনের যুদ্ধ দেখলে পালিয়ে যাওয়ারও একটা ঝোঁক ছিল তাদের মধ্যে। ওদের ক্যাম্পগুলো ছিল জঙ্গলের মধ্যে, ওখানে নারী, শিশু সবাই থাকত; ভীষণ জোরে বেখাপ্পা গান বাজত, ওখানে ওরা মদ পান করত, নাচত আর খাওয়া দাওয়া করত।

পরিস্থিতি কঠিন ছিল। প্রাক্তন বিদ্রোহী সদস্য টাবু আজিজু বলেন, “ক্যাম্পে আমরা একটা ভুট্টা দশজনের মধ্যে ভাগ করে খেতাম”।

প্রাক্তন বিদ্রোহী ও খৃস্টেয় যাজক ফ্লরিবার্ট মিলিম্বা বলেন, “তারা আমাদেরকে বলেছিল যে সাদা লোকটি (চে) আমাদেরকে সাহায্য করবে ও আমাদের জন্য আরো অস্ত্র নিয়ে আসবে”। মিলিম্বা বলেন চে এর আগমন ‘অনেক আশা’ বয়ে এনেছিল।

শিবুন্দা স্মরণ করেন, যে বিশাল এলাকা জুড়ে কাবিলা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন   রাজনীতি ও সামরিক কৌশল শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে চে সেই পুরো এলাকা ভ্রমণ করেন।

5

চে গুয়েভারার নেতৃত্বাধীন গেরিলা দলের জন্য নৃত্য পরিবেশন করেছেন কঙ্গোর নারী টাবু আজিজা

বিপ্লবী আদর্শ‘-

৮০ বছর বয়সী জেনারেল লোয়েনদেমা দুনিয়া দক্ষিণ কিভুর রাজধানী বুকাভুর একটি কুঁড়েঘরে বসে স্মৃতিচারণ করছিলেন “আমি তখন ছিলাম একজন সাধারণ সৈনিক। চে আমাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন কীভাবে বিপ্লব করতে হয়। তিনি আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ও রাজনীতি শিক্ষা দিয়েছিলেন।”

তিনি বলেন, কিন্তু “যেদিন থেকে আমরা বিপ্লবী আদর্শকে পায়ে মাড়াতে শুরু করলাম…তারা চলে গেল”।

আরো ১০০ জন লোক বাড়িয়ে কিউবার সেনাবাহিনীতে বাড়তি শক্তি যুগিয়ে ফিদেল কাস্ত্রো কয়েকটি সংঘর্ষে জয়লাভ করেন, কিন্তু শিবুন্দা বলেন, সরকারের সেনাবাহিনী তখন অগ্রসর হচ্ছিল।

১৯৬৫ সালের অক্টোবরের দিকে চে কাস্ত্রোকে লেখেন, “এখানে আসলে অস্ত্রের অভাব নেই…এখানে প্রচুর সশস্ত্র লোক আছে, এখানে আসলে যেটির অভাব রয়েছে সেটি হল সৈনিক”।

শিবুন্দা আরো বলেন, “চে গুয়েভারা যখন চলে গেলেন, সেসময় ব্যাপক যুদ্ধ চলছিল, আমরা পরাজিত হয়ে প্রায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলাম।”

সেনা বাহিনীর আক্রমণ ও পশ্চিমা ভাড়াটে সৈনিকদের পরিচালিত বিমান হামলার মুখে বিদ্রোহী শক্তি একের পর এক পরাজিত হতে লাগল।

চে ও তার সঙ্গীরা ২১শে নভেম্বর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল ত্যাগ করে।

তিন দিন পর জেনারেল জোসেফ মবুতু ক্ষমতা দখল করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট জোসেফ মবুতু দেশে স্বজনপ্রীতি ও স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হন। তিনি প্রায় ৩২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

১৯৬৭ সালে চে বলিভিয়ায় নিহত হন। ১৯৯৭ সালের মে মাসে প্রতিবেশী রুয়ান্ডার সহায়তায় বিদ্রোহ ঘটিয়ে কাবিলা মবুতুকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন। অবশ্য তারাও পরাজিত হন এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়।

এখনো পর্যন্ত দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এ অঞ্চলের পিছু ছাড়েনি।

প্রাক্তন বিদ্রোহী আন্না বিন্তি শাবানি বলেন, “চে গুয়েভারাকে ফিরিয়ে আনুন। কঙ্গো আবার নিজের পায়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা তার আদর্শ অনুসরণ করে যাব”।

সুত্র

আফ্রিকার স্বপ্নঃ কঙ্গোর বিপ্লবী যুদ্ধের ডায়েরী‘/(The African Dream: The Diaries of the Revolutionary War in the Congo)


ভারতে নকশালরা ২০শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ রাজ্যে বন্ধ ডেকেছে …

বিশাখাপত্তনম : রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের জন বিরোধী কার্যক্রমের প্রতিবাদে সিপিআই (মাওবাদী) ফেব্রুয়ারীর ২০ তারিখ থেকে অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানা সহ পাঁচ রাজ্যে বন্ধ ডেকেছে। বৃহস্পতিবার টিওআই পাঠানো একটি প্রেস রিলিজে মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় আঞ্চলিক ব্যুরো (CRb) মুখপাত্র প্রতাপ- ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা এবং মহারাষ্ট্রে ধ্বংসাত্মক এবং গণবিরোধী নীতি বাস্তবায়নকারী হিসেবে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি , পি মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু, তেলেঙ্গানা মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও কে দায়ী করেন। 

Source – http://timesofindia.indiatimes.com/city/visakhapatnam/Naxals-call-for-5-state-bandh-on-Feb-20/articleshow/46224136.cms