ভারত প্রশ্নে মার্কস

karl-marx-on-india

লেখক – সৈয়দ আবুল কালাম

মার্কস ও এঙ্গেলসের আগ্রহের বিষয় ছিল নিছক পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদ বিকাশের ধারা ও পুঁজিবাদী সংকটকে বোঝা, এ ধরনের যে কোনো বক্তব্য ভুল। এতটুকু পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকলে তাঁরা হতেন বুর্জোয়া সংস্কারবাদী। তাঁদের মূল আগ্রহের বিষয় ছিল পুঁজিবাদের শাসন শোষণের জোয়াল থেকে বিশ্বমানবসমাজকে মুক্ত করা। তাঁরা বিশ্ব থেকে পুঁজিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এবং মানুষ কর্তৃক মানুষের উপর শোষণ-নিপীড়নের চিরন্তর অবসানে, শ্রমিক শ্রেণীর ইতিহাস-নির্ধারিত বিপ্লবী ও নেতৃত্বকারী ভূমিকাকে আবিষ্কার করেছিলেন, এটাই তাঁদের মূল অবদান। তাঁরা ঊনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকেই সমাজবিকাশের নিয়মবিধি এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর ঐতিহাসিক বিপ্লবী ভূমিকা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি পুঁজিবাদ মূলত বিকশিত হয়েছিল পশ্চিম ইউরোপের গুটিকয়েক দেশে। এ কারণে ইউরোপের পুঁজিবাদী অর্থনীতি, রাজনীতি ও দর্শনকেই তাঁরা প্রধানভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন কিভাবে বিশ্বকে পাল্টানোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে সর্বহারা শ্রেণীর উপর। এই চেতনা থেকেই তাঁরা কমিউনিস্ট ইশতেহার-এ স্লোগান তুলেছিলেন, ‘দুনিয়ার মজুর এক হও’। একথাও মনে রাখা উচিত, তাঁরা শ্রমিক শ্রেণীর বাস্তব বিপ্লবী সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তাঁরা নিজেরা বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমৃত্যু তাঁরা নানা উপায়ে ইউরোপের তৎকালীন সবচেয়ে অগ্রসর বিপ্লবী আন্দোলনসমূহের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
যাঁরা মার্কস ও এঙ্গেলসকে ইউরোপীয় বলে অভিহিতকরণের মাধ্যমে প্রকারান্তরে মার্কসবাদকে নিছক ইউরোপে প্রযোজ্য মতবাদ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পান, তাঁরা যে ভ্রান্ত তা প্রমাণের জন্য কোন তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না। মার্কস ও এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর গত একশ বছরের বেশী সময়ের বিশ্ব-ইতিহাসই তাঁদের ভুলকে প্রমাণ করে।
মার্কসবাদের পতাকাতলে ১৯১৭ সালে সংঘটিত হয় রুশ বিপ্লব, যে রুশকে লেনিন মূলত একটি এশীয় দেশ মনে করতেন। ১৯১৭-৩৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও বিনির্মাণের সাফল্য সারা দুনিয়ার দৃষ্টি কেড়ে নেয় এবং দেশটি হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের আশা ভরসা ও সহায়তার কেন্দ্রস্থল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্ট্যালিন এবং সোভিয়েত মার্কসবাদী পার্টির নেতৃত্বে জার্মান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের বীরোচিত সংগ্রাম ও চরম আত্মত্যাগ এবং একই সাথে চীনা মার্কসবাদীদের নেতৃত্বে জাপ-বিরোধী সংগ্রামই মূলত নাৎসীবাদ ও ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করে। এরপর পূর্ব ইউরোপের একগুচ্ছ দেশে মার্কসবাদীদের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। ১৯৪৯ সালে দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মাও সে তুং ও চীনা মার্কসবাদীদের নেতৃত্বে সফল হয় চীন বিপ্লব, যা আমেরিকার সমস্ত চক্রান্ত ও হস্তপেকে বানচাল করে দেয়। পরবর্তীতে চীনে গড়ে ওঠে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও পুনর্গঠন। কোরিয়া ভিয়েতনাম লাওস ও কম্বোডিয়ার বীর জনগণ মার্কসবাদের পতাকা তলে সমবেত হয়ে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। একই সাথে কিউবাসহ লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আমেরিকা ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে বিপ্লব ও সংগ্রাম গড়ে ওঠে। পুরো বিশ শতকেই বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ এবং মার্কসবাদ পরস্পরের মুখোমুখী অবস্থানে থেকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। দুনিয়া জুড়েই একপক্ষ ছিল অন্যপক্ষের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ঘৃণীত দুশমন। বিশ শতকের অধিকাংশ সময় জুড়ে মার্কসবাদের পতাকাতলে বিশ্ব জনগণের অসংখ্য বিপ্লবী সংগ্রাম ও দুনিয়া-কাঁপানো বিজয় প্রমাণ করেছে মার্কসবাদ হচ্ছে বিশ্বজনীন আদর্শ এবং পৃথিবীর প্রতিটি দেশের শ্রমিক শ্রেণী ও শোষিত-নিপীড়িত জনগণের মুক্তি ও বিপ্লবের মতবাদ। পৃথিবীতে আর কোন মতবাদের এমন আন্তর্জাতিকতাবাদী বৈশিষ্ট্য নেই।

দুই

ভারত প্রশ্নে মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের মূল প্রবন্ধগুলো লেখেন ১৮৫০এর দশকে। সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে ইঙ্গ-মার্কিন গণতান্ত্রিক দৈনিক নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন-এর জন্য তাঁরা প্রবন্ধগুলি লিখেছিলেন। ১৮৫৩ সালে মার্কস পর পর প্রায় দশটি প্রবন্ধ লেখেন যখন শেষবারের মত ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’র সনদ নবায়নের প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। দ্বিতীয় দফা, ১৯৫৭-৫৮ সালে, মার্কস ও এঙ্গেলস উভয়েই আর একগুচ্ছ প্রবন্ধ লেখেন, যখন ভারতে চলছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী মহাবিদ্রোহ। তাঁরা ১৮৫১ থেকে ১৮৬২ পর্যন্ত পত্রিকাটিতে লিখেছিলেন। এরপর পত্রিকাটির রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন ঘটলে তাঁরা লেখা ছেড়ে দেন। ঐ একই সময়ে মার্কস প্রধানত অর্থশাস্ত্র সংক্রান্ত অধ্যয়ন ও গবেষণায় গভীরভাবে নিমগ্ন ছিলেন। এর মধ্যে তাঁরা নিউ আমেরিকান সাইকোপেডিয়া’র জন্যও বহু প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। এসব কিছুর সাথে রুটি রুজির অপরিহার্য প্রয়োজনও জড়িত ছিল। অর্থশাস্ত্র গবেষণার সময়াভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে মার্কস নিজেই লিখেছেন, আমার হাতে যে সময় ছিল তা বিশেষ করে কমে গিয়েছিল রুটি-রুজি উপার্জনের অনিবার্য প্রয়োজনে। আজ আট বছর ধরে প্রথম ইঙ্গ-মার্কিন সংবাদপত্র ঞযব ঘব িণড়ৎশ ঞৎরনঁহব-এ আমি যে সব প্রবন্ধ লিখে আসছি তার জন্য আমার অধ্যয়ন অসম্ভব রকম বিপ্তি হতে বাধ্য হয়…ইংলেন্ড ও ইউরোপের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ঘটনাবলী ছিল আমার প্রেরিত লেখার বেশী অংশ…তাই প্রকৃত অর্থশাস্ত্রের পরিধির বাইরেও অনেক ব্যবহারিক খুঁটিনাটির সাথে পরিচিত হতে বাধ্য হয়েছিলাম।১

ঐ একই প্রবন্ধের শুরুতে মার্কস লিখেছেন,

বুর্জোয়া অর্থনীতির মতবাদকে আমি বিচার করেছি নিম্নলিখিত ক্রম অনুসারে: পুঁজি, ভূসম্পত্তি, মজুরী-শ্রম, রাষ্ট্র, বৈদেশিক বাণিজ্য, বিশ্ববাজার।২

সুতরাং নিছক ইউরোপীয় গণ্ডিতে নয়, বিশ্বপরিসরে পুঁজিবাদের প্রভাব ও প্রসারকে তিনি পর্যালোচনা করেছিলেন। এই প্রোপটে, সেই একই সময়ে লিখিত ভারত বা চীন প্রসংগ যে মার্কসের মূল তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে ছিল না, তা বলার অপো রাখে না। প্রকৃত পক্ষে নিছক ব্যক্তিগত বাদে, মার্কস ও এঙ্গেলসের প্রায় প্রতিটি প্রবন্ধ, গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র, এমনকি নোটও পরবর্তী গবেষকদের কাছে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিপন্ন এবং তাঁদের মূল তত্ত্বগত প্রতিপাদ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর কারণ, বিশ্ববিপ্লবের একটা মূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ছিল সবকিছূ উৎসারিত। এককথায় তাঁদের সমস্ত প্রবন্ধ, গুরুত্বপূর্ণ পত্রাদি ও নোটে প্রকাশিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-দার্শনিক বিষয়সমূহের সংশ্লেষণ (ঝুহঃযবংরং) হচ্ছে মার্কসবাদ।
১৮৫৩ সালে মার্কস ভারতবর্ষ সম্পর্কে যা কিছু লিখেছিলেন, তা নিয়ে পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা, পর্যালোচনা, সমালোচনা, সমর্থন ও বিরোধিতার ঝড় সৃষ্টি হয়েছে। আজও তা থেমে নেই। সামীর আমীন, এডওয়ার্ড সাঈদ, রজনী পাম দত্ত, এ্যাভিনেরী, কিরমান, উলিয়ানোভোস্কি, ভি আই পাভলভ, ব্যারাট ব্রাউন, ইরফান হাবিব, এজাজ আহমেদ, সুনীতিকুমার ঘোষ এর মত বহু বিশ্বখ্যাত বুদ্ধিজীবী এবং মার্কসবাদী রাজনীতিক এ প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ রচনা করেছেন ও মতামত দিয়েছেন। সুতরাং কেউ না চাইলেও মার্কস ও এঙ্গেলসের ভারত-সংক্রান্ত রচনাবলী তাঁদের তত্ত্বগত সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।
ইরফান হাবিব লিখেছেন, ‘ভারত সম্পর্কে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির মূল্যায়ন করতে হলে কার্যত তিন দশক ধরে এ সংক্রান্ত যা কিছু তিনি লিখেছেন অবশ্যই তার সমস্ত কিছুকেই বিবেচনায় আনতে হবে।’৩ রজনী পাম দত্ত লিখেছেন, ভারত সম্পর্কে মার্কসের ‘সুগভীর মনোযোগের দৃষ্টান্ত হচ্ছে ‘পুজি’ গ্রন্থে প্রায় পঞ্চাশটি স্থানে এবং আরো অধিকসংখ্যকবার চিঠিপত্রে ভারত-সংক্রান্ত আলোচনা।’৪ ১৮৭০এর দশকে ভারতের ইতিহাস অধ্যয়নের ভিত্তিতে মার্কস অনেক কিছু তাঁর নোটবুকে লিখে রেখেছিলেন, যা পরে ঘড়ঃবং ড়হ ওহফরধহ ঐরংঃড়ৎু বা ভারতবর্ষের ইতিহাসের কালপঞ্জি নামে প্রকাশিত হয়েছে। বলা যায়, জীবন-সায়াহ্ন পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি উপনিবেশ ও পরাধীন দেশগুলির সমস্যা এবং ইউরোপ ও এইসকল দেশের বিপ্লবের আন্তঃসম্পর্ক পর্যালোচনা করেছিলেন।
সুতরাং একথা ভাবা ভুল হবে যে, ১৮৫৩ সালে মার্কস ভারতবর্ষ সম্পর্কে যা কিছু লিখেছিলেন সেটাই তাঁর শেষ কথা। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৮৫৩ সালে মার্কস ভারত সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা অবশ্যই পৃথক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের দাবী রাখে।
১৮৫৩এর প্রবন্ধগুলোর মূল বিষয়বস্তু তিনটি। এক, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের উন্মোচন ও সমালোচনা, দুই, ব্রিটিশপূর্ব ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে মূল্যায়ন, তিন, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল আলোচনা। প্রথম দু’টি ছিল মার্কসের সময়ে অতীতের বাস্তবতা এবং শেষোক্তটি ছিল মূলত ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনা, যা তখনও বাস্তবে রূপায়িত হয়নি।

তিন

মার্কসের ১৮৫৩ এর প্রবন্ধগুলোর অপোকৃত বড় অংশ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের উন্মোচন। বিদ্রূপ, শব্দের কষাঘাত, রসবোধ ও তথ্যের সমৃদ্ধিতে এই উন্মোচনের সাহিত্য-মূল্য এবং সৌন্দর্যও অনন্যসাধারণ।
ভারত সম্পর্কে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কমন্স সভার প্রতিনিধি এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ স্যার চার্লস উড সম্পর্কে মার্কসের মন্তব্য ছিল, ‘একটা ঘোড়ার জন্য তৃতীয় চার্লস একটা রাজ্য দিতে চেয়েছিলেন; একটা রাজ্যের জন্য (অর্থাৎ ভারত) কোয়ালিশন দিল একটা গাধাকে।…আধুনিক মনুর ভূমিকা নিতে স্যার চার্লস উডের ভারী ইচ্ছা।’৫ ভারতীয় উপকথায় ভারতবর্ষের প্রথম রাজা মনু ছিলেন উভলিঙ্গ। মার্কস সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছেন, উড শিল্পমালিক ও বাণিজ্যিক পুঁজিপতি দু’পরে স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করতে চাইছেন। চার্লস উড বলেছিলেন, ‘ভারতে পাবেন এমন এক জাতের লোক যারা ধীরে বদলায়, যারা ধর্মীয় কুসংস্কার ও সেকেলে প্রথায় বাঁধা।’৬ মার্কস-এর প্রত্যুত্তরে বন্ধনীতে টিপ্পনী কেটেছেন, ‘হুইগ কোয়ালিশন পার্টি বোধ হয় আছে সেখানে।’৭ উল্লেখ্য শিল্পবুর্জোয়া ও ধনবান ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হুইগ কোয়ালিশন তখন ইংলন্ডের মতায়।
মার্কস তী্নভাবে যে প্রশ্নটা সামনে নিয়ে এসেছেন তা হল, কারা ভারতকে লুন্ঠন করছে? নিছক কি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী? মার্কস বলছেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাহনমাত্র। ব্রিটিশ শাসকশ্রেণীই এর প্রকৃত উৎস। তিনি দেখিয়েছেন ব্রিটিশ বুর্জোয়া পার্টিগুলোই ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের মদদদাতা। তাদের মানবতা ও জনকল্যাণের ভণ্ডামীর মুখোশটাকেও ছিঁড়ে ফেলেছেন তিনি। মার্কস বলছেন, ১৭৫৭ থেকে ১৮৪৯ সাল, প্রায় একশ বছর লেগেছিল ইংরেজদের সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ জয় করতে। বুর্জোয়া পার্টিগুলো প্রকৃতপ েতখন রক্তাক্ত পন্থায় ভারতবর্ষকে জবরদখল করার কাজে সমর্থন জুগিয়েছে বা নীরবতার ভান করেছে। দখল হওয়ার পরই এদের একাংশ মানবতার ‘অস্ত্র’ নিয়ে মাঠে নেমেছে। তিনি লিখেছেন,

একটি বৃহৎ ইঙ্গ ভারতীয় সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব কেবল ১৮৪৯ সাল থেকে। এইভাবে কোম্পানীর নামের আড়ালে ব্রিটিশ সরকার দুই শতক ধরে লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতের স্বাভাবিক সীমা পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে। এবার বুঝতে পারি, কেন এই সারাটা সময় ইংলন্ডের সব পার্টিই, এমনকি ভণ্ডামীপূর্ণ শান্তির নীতিকথায় সর্বোচ্চ পরিমাণে সোচ্চার হতে যারা স্থিরসংকল্প, তারাও একটি একক ভারতীয় সাম্রাজ্যের পরিসীমা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চোখ বুঁজে চুপ করে বসে ছিল। প্রথমত,অবশ্যই, আগে দখলে পাওয়া চাই সাম্রাজ্যটা, যেন এরপরে তারা একে অভিষিক্ত করতে পারে নিজেদের তীব্র মানবপ্রেমে।’৮

ইংরেজ বুর্জোয়া শ্রেণীর মানবপ্রেমের আসল প্রকৃতির এক চমৎকার বর্ণনা।
ইংলন্ডের শাসক বুর্জোয়া-অভিজাততন্ত্রকে বিপুল ঘুষ দিয়ে পরিতৃপ্ত করার মধ্য দিয়ে যাত্রার সূচনা করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। মার্কস উল্লেখ করেছেন, ‘এলিজাবেথের রাজত্বকালে ভারতের সাথে লাভজনক বাণিজ্য চালাবার জন্য কোম্পানী বছরে ৩০ হাজার পাউন্ড মূল্যের সোনা রূপা ও বৈদেশিক মুদ্রা রপ্তানী করার অনুমতি পায়। এ ঘটনা ছিল সে যুগের সবকিছু সংস্কারের বিরোধী। এই মহার্ঘ ধাতুই ছিল দেশের একমাত্র-সম্ভব সত্যিকারের সম্পদ।’৯ অর্থাৎ মার্কস দেখিয়েছেন, মুনাফা ও লুণ্ঠনই বুর্জোয়াদের জন্য নির্ধারক, নৈতিকতা, নিয়মকানুন ও সংস্কার সবকিছুই মুনাফা ও লুন্ঠনের অধীন।
ভারতবর্ষ বিজয়ের সূচনাকে অতিসংেেপ বর্ণনা করেছেন মার্কস,

১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দেই তারা ভারতে একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার এবং ভূমি রাজস্বকে তাদের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গ্রহণ করার চিন্তা করেছিল। তবু ১৭৪৪ সাল পর্যন্ত তারা বোম্বাই, মাদ্রাজ ও কলকাতার আশেপাশের কিছু গুরুত্বহীন জেলাই কেবল অধিকার করে। পরে কর্ণাটকে যুদ্ধ বেধে যায়…তারা কার্যত ভারতের ঐ অঞ্চলটার প্রভু হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা যুদ্ধ ও কাইভের বিজয়ের ফলেই অর্জিত হয় অনেক বেশী ব্যাপকতর ফলাফল।…বাঙলা বিহার উড়িষ্যাকে সত্যিকার অর্থে তারা দখল করে নেয়।১০

মার্কস তুলে ধরেছেন, ১৮ শতকে ভারত থেকে ইংলন্ডে ধনসম্পদ পাচারে বাণিজ্যের স্থান ছিল নগণ্য। প্রায় সবটাই ছিল সরাসরি লুট, দস্যুতা ও কেড়ে-নেওয়া।

গোটা ১৮ শতক ধরে ভারত থেকে ইংলন্ডে যে ধন প্রেরিত হয়েছে তা অর্জিত হয়েছিল অপোকৃত নগণ্য বাণিজ্যের দরুন ততটা নয়, যতটা সে দেশটাকে প্রত্য শোষণের দরুন এবং যে বিপুল ঐশ্বর্য জোর করে আদায় করে ইংলন্ডে পাচার করা হয়েছিল তার দরুন।১১

পুঁজি গ্রন্থে মার্কস তার এই তথ্য আরও কিছুটা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন;

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ছিল কোম্পানীর কর্মচারীদের একচেটিয়া। নুন আফিম ও অন্যান্য পণ্যের একচেটিয়া ছিল অফুরন্ত ধনের উৎস। কর্মচারীরা নিজেরাই দাম ঠিক করতো এবং অভাগা হিন্দুদেরকে লুট করত। এই ব্যক্তিগত বাণিজ্যে অংশ নিতেন স্বয়ং বড়লাট। তাঁর অনুগ্রহভাজনেরা…আলকেমিস্টদের চেয়েও বেশি কেরামতি দেখিয়ে সোনা বানাতো শূন্য থেকে। দিন যেতে না যেতেই ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠত মোটা মোটা সম্পদ। এক শিলিং খরচ না করেই চলল আদি সঞ্চয়।…কোম্পানী ও তার কর্মচারীরা ১৭৫৬-৬৬ সালের মধ্যে ভারতীয়দের কাছ থেকে উপঢৌকন হিসেবে পেয়েছিল ৬০,০০,০০০ (ষাট ল) পাউন্ড। ১৭৬৯ থেকে ১৭৭০ সালের মধ্যে সমস্ত চাল কিনে নিয়ে এবং প্রচুর দাম না পাওয়া পর্যন্ত তা বেচতে অস্বীকার করে একটি দুর্ভি বানিয়ে তোলে ইংরেজরা।১২

এই দুর্ভিই ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, যা বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। ১৮ শতকে ভারত থেকে লুন্ঠিত এই বিপুল সম্পদ ছিল ইংলন্ডের শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রাথমিক সঞ্চয়। ‘আমেরিকায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের আবিষ্কার, আদিবাসী জনসমষ্টির নির্মূলীকরণ, তাদেরকে দাসত্ব-শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলা ও খনিগুলোতে তাদের কবরস্থ করা, পূর্ব-ভারত (অর্থাৎ ভারতবর্ষ) জয় ও লুটপাট শুরু করা, বাণিজ্যিকভাবে কালো-মানুষ শিকারের সংরতি মৃগয়াত্রে হিসেবে আফ্রিকার রূপান্তর, এগুলিই ছিল উৎপাদনে পুঁজিবাদী যুগের সূর্যোদয়ের সংকেত।’১৩

চার

১৮৫৩ সালে মার্কস যখন ভারত সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলো লেখেন তখন ব্রিটেনের শিল্প-পুঁজিবাদ তার মধ্যাহ্ন আকাশে। মোটামুটি ১৮ শতকের শেষ পর্যন্ত ছিল ব্রিটেনে বাণিজ্যিক পুঁজিবাদের প্রাধান্য, যদিও ১৭ শতক থেকেই শিল্প-পুঁজিবাদও বিকশিত হতে থাকে। মার্কস দেখিয়েছেন, ১৭ ও ১৮ শতকে ইংলন্ডের বস্ত্রশিল্প কোনমতেই ভারতবর্ষের বস্ত্রশিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় সম ছিল না। ১৭ শতকের শেষদিক থেকেই ইংলন্ডে বস্ত্রশিল্পের মালিকেরা ভারতীয় বস্ত্রের অনুপ্রবেশের আতঙ্কে আর্তনাদ শুরু করে। তিনি লিখেছেন,

১৭ শতকের শেষ ও ১৮ শতকের বেশীর ভাগ কাল জুড়ে ভারতের সুতী ও পশমী বস্ত্র বেচারা ব্রিটিশ কারখানা মালিকদের ধ্বংস করছে বলে ঘোষণা করা হয়।…১৮ শতকে অধিকাংশ সময় জুড়ে ভারতীয় মাল ইংলন্ডে আমদানী করা হত ইউরোপীয় মহাদেশে বিক্রয়ের জন্য এবং খাস ইংলন্ডের বাজার থেকে তাদের বাদ দিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।১৪

মার্কস উল্লেখ করেছেন, ভারতের সাথে বাণিজ্য ইংলন্ডে বিবেচিত হত ‘একটি স্বর্ণখনি’১৫ হিসেবে। এতে ভাগ বসাতে চাইতো ব্রিটিশ শিল্পপতি শ্রেণী থেকে অপরাপর সমস্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। ১৯ শতকের প্রথম দিকেই ইংলন্ডে শিল্প-পুঁজিবাদ পরিণত হয় অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রকে। ফলে কোম্পানীর একচেটিয়া খর্বিত হতে থাকে। মার্কসের ভাষায় ‘একদিকে শিল্পস্বার্থ এবং অন্যদিকে টাকাওয়ালা ও চক্রতন্ত্রের দ্বন্দ্বে ভারত পরিণত হল রণেত্ের।’১৬ উনিশ শতকে এসে এই লড়াইয়ে জয়ের পাল্লা হেলে পড়ে শিল্পমালিকদের অনুকূলে। ফলে ১৮১৩ সালে ভারত-বাণিজ্যে কোম্পানীর একচেটিয়া বিলুপ্ত হয়, ১৮৩৩-এ এসে কোম্পানীর সমস্ত বাণিজ্যই বন্ধ হয়ে যায়। তাদের হাতে থাকে শুধু ভারত শাসনের ভার। ঘটনাটিকে মার্কসও চিহ্নিত করেছেন, ‘১৮১৩ সালে… ভারত বাণিজ্য কতকগুলি শর্তে উন্মুক্ত হল সাধারণ প্রতিযোগিতায়।…১৮৩৩ সালে… কোম্পানী কর্তৃক আদৌ কোনোরূপ বাণিজ্য চালানো নিষিদ্ধ হল, চূর্ণ হল তাদের বাণিজ্যিক সত্তা…।’১৭
নতুন এই পরিস্থিতির ফলে সংঘটিত পরিবর্তনকে বর্ণনা করেছেন তিনি,

১৮১৩ সালে উন্মুক্তকরণের পর কিছূকালের মধ্যে বাণিজ্য তিনগুণেরও বেশী বৃদ্ধি পায়।…বাণিজ্যের গোটা চরিত্রটা বদলে যায়। ১৮১৩ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ ছিল প্রধানত রপ্তানীকারক দেশ এবং এখন সে হয়ে দাঁড়াল আমদানীকারক ও… দ্রূতগতিতে…। অবিস্মরণীয় কাল থেকে দুনিয়ার সুতীবস্ত্রের বৃহৎ কারখানা ভারতবর্ষ এবার ভেসে গেল ইংরেজী টুইস্ট ও সুতাবস্ত্রে। ভারতের নিজস্ব উৎপন্নকে ইংলন্ড থেকে বহিষ্কৃত করা হল বা সর্বাধিক কঠোর শর্তে প্রবেশাধিকার দেওয়া হল। তারপর বৃটিশ কারখানাজাত মাল সামান্য বা নামমাত্র শুল্কে প্লাবিত করতে থাকলো ভারতকে, যার ফলে ঘটল একদা প্রসিদ্ধ দেশীয় সুতীবস্ত্রের ধ্বংসসাধন।১৮

মার্কস তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন; ‘১৮১৮ থেকে ১৮৩৬ পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেন থেকে ভারতে সুতা চালানের অনুপাত বৃদ্ধি পায় ১ থেকে ৫২০০ গুণ। ১৮২৪ সালে ভারতে ব্রিটিশ মসলিনের চালান ১০,০০,০০০ (দশল) গজও প্রায় নয়, অথচ ১৮৩৭ সালে তা ৬,৪০,০০,০০০ (ছয় কোটি চল্লিশ ল) গজও ছাড়িয়ে যায়। ঐ একই সময়ে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ১,৫০,০০০ (এক ল পঞ্চাশ হাজার) থেকে ২০,০০০ (বিশ হাজার) এ নেমে আসে। বস্ত্রের জন্য বিখ্যাত এই সব ভারতীয় শহরগুলির অবয়টুকুই কিন্তু চরম ফলাফল নয়। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে কৃষি ও হস্তশিল্পের যে বন্ধন ছিল ব্রিটিশ বাষ্প ও বিজ্ঞান তাকে নির্মূল করে দিয়েছে।’১৯ মার্কস লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ হামলাদাররা এসে ভারতীয় তাঁত ভেঙে ফেলে, ধ্বংস করে চরকা। ইংলন্ড শুরু করে ইউরোপের বাজার থেকে ভারতীয় তুলাবস্ত্রকে বিতাড়ন করতে। অতঃপর সে হিন্দুস্তানে সুতা পাঠাতে থাকে এবং পরিশেষে তুলার মাতৃভূমিকেই কার্পাস বস্ত্র চালান দিয়ে ভাসিয়ে দেয়।’২০ অর্থাৎ শুধু ইংলন্ডে নয়, সমগ্র ইউরোপে জোর করে ভারতীয় বস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুঁজি গ্রন্থে গভর্নর জেনারেলের ১৮৩৩-৩৪ সালের এক রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে মার্কস লিখেছেন, ভারতে সৃষ্ট ‘দুর্দশা বাণিজ্যের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সুতাবয়নকারীদের অস্থিতে ভারতবর্ষের মাটি সাদা হয়ে পড়ছে।’২১ পার্লামেন্টে ব্রিটিশ শিল্প-বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি জন ব্রাইট যখন ‘কোম্পানী ও সরকারের রাজস্ব আদায়ের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভারতের’ চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তখন মার্কস তাঁর অসম্পূর্ণ বক্তব্যের জবাবে লিখেছেন, ‘অবশ্যই ম্যানচেস্টার ও অবাধ বাণিজ্যের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত ভারতের ছবি তিনি দেন নি।’ অর্থাৎ মার্কস একদিকে কোম্পানীর নির্মম রাজস্ব লুন্ঠন এবং একই সাথে ইংরেজ শিল্প-পুঁজিবাদ দ্বারা ভারতীয় শিল্পের ধ্বংস সাধন, এই উভয় প্রক্রিয়াকেই উন্মোচিত করেছেন।

পাঁচ

ভারতে ব্রিটিশ-সৃষ্ট ভূমিব্যবস্থা ও রাজস্ব-শোষণকেও পর্যালোচনা করেছেন মার্কস। তিনি লিখেছেন,

ভারতে বৃটিশ তাদের পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে রাজস্ব ও যুদ্ধের বিভাগটি গ্রহণ করেছিল, কিন্তু পাবলিক ওয়ার্কসটা একেবারেই অবহেলা করেছে।২২

ব্রিটিশদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল যে লুন্ঠন, তা এখানে স্পষ্ট। মার্কস একের পর এক তথ্য দিয়ে কৃষক-শোষণের চিত্রটাকে তুলে ধরেছেন, ‘রায়তরা (কৃষকরা) জনসংখ্যার ১১/১২ ভাগ’২৩ অর্থাৎ প্রায় নব্বই শতাংশ; ‘যেমন মাদ্রাজ বোম্বাই তেমনি বাঙলায় রায়তরা অসহ্য দুঃস্থ হয়ে পড়েছে;’২৪ ‘মোট নীট রাজস্বের প্রায় তিন পঞ্চমাংশ আসে ভূমি থেকে, এক সপ্তমাংশ আফিম থেকে, এক নবমাংশের কিছু বেশী লবণ থেকে। এইগুলি থেকে একত্রে আসে মোট প্রাপ্তির শতকড়া ৮৫ ভাগ।… রাজস্বের মোট ভাগটা আসে জমি থেকে;’২৫ ‘ভারতের জন্য ব্যয়যোগ্য টাকাটার দুই তৃতীয়াংশ বা শতকরা ৬৬ ভাগ হল সামরিক খরচ আর পাবলিক ওয়ার্কস-এর খরচ মোট আয়ের শতকরা পৌনে তিন ভাগের বেশী নয়।’২৬
অর্থাৎ ইংরেজ শোষণের নিষ্ঠুরতম শিকার কৃষকদের কাছ থেকে লুন্ঠিত অর্থ ইংরেজ ব্যয় করত ঔপনিবেশিক যুদ্ধের জন্য। ভারতের জন্য থাকতো না বললেই চলে।
ভারতে ব্রিটিশ আয়ের প্রধান উৎস ছিল রাজস্ব-শোষণ। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা প্রতিষ্ঠা করেছিল নতুন ভূমিব্যবস্থা। মার্কসের লেখা থেকে এটা স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসে যে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সমস্যা ছিল মূলত কৃষকদের সমস্যা। হস্ত-শিল্প ধ্বংস ও রাজস্ব শোষণ দুটোর ভুক্তভোগী ছিল কৃষক। ইংরেজ-সৃষ্ট ভূমিব্যবস্থার সারবস্তু তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে, ‘জমিদারী, রায়তওয়ারী, ও গ্রামব্যবস্থা এই তিনটে ধরনই হলো কোম্পানীর হাতে রাজস্ব-শোষণের বিভিন্ন উপায় মাত্র’২৭ ‘জমিদারী ও রায়তওয়ারি-দুটোই ব্রিটিশ স্বেচ্ছাচারী হুকুমে কার্যকরী কৃষি বিপ্লব এবং পরস্পর বিরোধী…একটি ব্রিটিশ জমিদারী প্রথার প্রহসন, অন্যটি-ফরাসী চাষী-মালিকানার, কিন্তু দুটিই চরম তিকারক-দুটিতে অতি বিরোধী দিকের সমাবেশ। দুটির কোনটাই, যে জনগণ ভূমি চাষ করে তাদের জন্য অথবা জমির যারা মালিক তাদের জন্য নয়-বরং তা সরকারের জন্য যে কর আদায় করে তা থেকে।’২৮
ইংরেজরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে জমিদারগোষ্ঠীর সৃষ্টি করেছিল তারা ছিল সমাজের পরগাছা। বাংলায় কৃষকসম্প্রদায় এই জমিদার ও একসারি মধ্যস্বত্বভোগীর শোষণের জাঁতাকলে ছিল নিষ্পেষিত। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল মহাজনের শোষণ। এই মহাজনী শোষণ শুধু বাংলায় নয়, সারা ভারতে কৃষকদের রক্ত চুষে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলত। মার্কস এ প্রশ্নে তাঁর বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেণকে অতি প্রগাঢ়ভাবে বর্ণনা করেছেন। বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে যে ইংরেজের দালাল বণিক শ্রেণীই জমিদাররূপী জোঁকে পরিণত হয়েছিল, তাও তাঁর বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছে। তিনি লিখেছেন,

আদি জমিদার শ্রেণী কোম্পানীর চাপে অচিরেই অন্তর্হিত হয় এবং তার জায়গা নেয় ব্যবসায়ী ফাটকাবাজেরা। সরকারের খাস তত্ত্বাবধানে দেওয়া মহাল ছাড়া বাংলার সমস্ত জমি এখন এদের হাতে। এই সব ফাটকাবাজেরা…আবার পত্তনিদার নামক ‘বংশানুক্রমিক’ মধ্যস্বত্ব-ভোগী একটা শ্রেণীর সৃষ্টি করেছে… ফলে গড়ে উঠেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের একটা নিখুঁত বহু-ধাপ ব্যবস্থা, যা তার সমস্ত ভার চাপিয়ে দিচ্ছে হতভাগ্য কৃষকদের উপর।২৯

রায়তী কৃষকের চরম দুর্দশা ও অধিকারহীনতাকে প্রতিফলিত করে মার্কস লিখছেন,

ফরাসী চাষীর মত রায়তের উপর সুদখোর মহাজনের হামলা আছে অথচ ফরাসী চাষীর মতো জমিতে তার কোনো স্থায়ী মৌরসী পাট্টা নেই। ভূমিদাসের মত সে বাধ্য হয় চাষ করতে, অথচ ভূমিদাসের মত তাঁর অভাব মেটানোর কোন ব্যবস্থা নেই।৩০

ভূমিকরের মত লবণকরও ইংরেজ কর্তৃক শোষণের একটা উপায়। মার্কস বলছেন,

ভূমিকরের সাথে লবণকরও বিবেচ্য।… কোম্পানী এ বস্তুটায় নিজ একচেটিয়া বজায় রেখেছে। তা তারা বিক্রি করে তার বাণিজ্যমূল্যের তিনগুণ দরে এবং যে দেশে তা করে সেখানে এ লবণ মেলে তার সমুদ্র, হ্রদ, পাহাড়পর্বত এমনকি খাস জমি থেকে।৩১

ইংরেজের শোষণ নিপীড়নে বিুব্ধ মার্কস শেষে লিখছেন, ‘জমিদারী বন্দোবস্ত, রায়তওয়ারী ও লবণকর ভারতীয় আবহাওয়ার সাথে মিলে পরিণত হয়েছে কলেরার উর্বরা ভূমিতে-পশ্চিমা জগতের উপর ভারতের প্রতিশোধ।’৩২

ছয়

মার্কস ইংরেজদের ভারতে অনধিকারপ্রবেশকারী (ওহঃৎঁফবৎ), জবরদখলকারী বা হামলাদার হিসেবে অভিহিত করেছেন। এরা শক্তি প্রয়োগ বা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশীয় রাজাদের মতা চূর্ণ করেছিল। তিনি তাঁর বর্ণনায় লিখেছেন,

দেশীয় রাজাদের বাধ্য করা হয় ইংরেজদের কাছ থেকে অতি উচ্চ সুদে বিপুল ঋণ গ্রহণ করতে। যখন তাদের দায়গ্রস্ততা চরমে পৌঁছায় তখন ঋণদাতারা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য, ‘স্ক্রু ঘোরানো হয়’ এবং রাজন্যেরা বাধ্য হয় আপোসে কোম্পানীকে রাজ্যাংশ ছেড়ে দিতে বা যুদ্ধ করতে, বাধ্য করা হয় জবরদখলকারীদের পেনশনভোগীতে পরিণত হতে নতুবা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে উৎখাত হতে।৩৩

একটা হিসাবও হাজির করেছেন মার্কস,

দেশীয় রাজ্যগুলির আয়তন ৬,৯৯,৯৬১ (৬ ল ৯৯ হাজার ৯ শত ৬১) বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা ৫,২৯,৪১,২৬৩ … এখন তারা…বিবিধ শর্তে এবং অধীনতামূলক ও আশ্রয়মূলক নানা ধরনের ব্যবস্থায় বৃটিশ সরকারের ওপর নির্ভরশীল।৩৪

ব্রিটেনে তখন এ হেন রাজ্যগ্রাস নিয়ে বিতর্ক চলছিল, এটা অন্যায় না প্রয়োজন? মার্কস রাজ্যগ্রাস নিয়ে উভয়পরে তথাকথিত বিতর্কের ভণ্ডামীকে উন্মোচিত করে লিখেছেন, ‘এইসব দেশীয় রাজ্যের চূড়ান্ত… গ্রাস নিয়ে বর্তমানে জোর তর্ক চলছে… সংস্কারপন্থীরা একে ধিক্কার দিচ্ছে অপরাধ বলে আর ব্যবসায়ীরা কৈফিয়ত দিচ্ছে যে এটা প্রয়োজন। আমার মতে প্রশ্নটা একেবারেই অযথার্থভাবে উত্থাপন করা হচ্ছে।… দেশীয় রাজ্যগুলোর কথা তুললে… আসলে তাদের আর কোন সত্তা নেই।’৩৫ এটাই হচ্ছে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর চিরন্তন কর্মনীতি। পররাজ্য দখল না-হওয়া পর্যন্ত সকলে একাট্টা, ঘাপটি মেরে অনেকে আবার বসে থাকে। দখল হওয়ার পর এরা ন্যায়-অন্যায় নিয়ে মাঠে নামে। জনগণের বিরুদ্ধে সমস্ত ধরনের অপরাধে এদের ভূমিকা এমনই।
ইংরেজের অনুগ্রহপুষ্ট-তাঁবেদার দেশীয় রাজা-মহারাজারা ছিল ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার খুঁটি। ইংরেজরা এদেরকে নিম্নমানের অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত সেনাবাহিনী রাখার অনুমতি দিত। এই সেনাবাহিনীর প্রকৃত কর্তৃত্বে থাকতো ইংরেজরাই। এইসব বাহিনী ইংরেজদের চাকরীরও একটি ত্রে, যা উল্লেখ করেছেন মার্কস। এই সেনাবাহিনীর প্রধান কাজই ছিল ভারতীয় জনগণের ইংরেজবিরোধী ােভ এবং বিদ্রোহকে দমন করা। মার্কস এদের প্রতি তাঁর ঘৃণাকে এভাবেই প্রকাশ করেছেন,

‘আরব্যরজনীর’ এইসব শাহজামান ও শাহরীয়রদের চেয়ে বেশি হাস্যকর, বিদঘুটে ও শিশুসুলভ স্বৈরাচার গোটা দুনিয়ায় আর নেই…এই সব বংশগত রাজারা হল ইংরেজ স্বৈরাচারের পদলেহী হাতিয়ার।…এরা বর্তমানের ঘৃণ্য ইংরেজ ব্যবস্থার ঘাঁটি এবং ভারতের প্রগতির পথে সর্বোচ্চ প্রতিবন্ধক।৩৬

মার্কস আরো লিখেছেন, এই সব রাজন্যদের কাজ হল ইংরেজের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে দুঃসাহসী ব্যক্তিদের উত্থানকে বাধা দেওয়া। তাঁর মতে, এ ধরনের সামরিক দুঃসাহসী ব্যক্তি ভারতের ইতিহাসে অতীতেও প্রচুর সংখ্যায় ছিল এবং ভবিষ্যতেও একইভাবে সৃষ্টি হবে।৩৭ ইংরেজ সমরনায়ক ক্যামবেলকে উদ্ধৃত করে মার্কস বলছেন, ‘উচ্চতর পদ গ্রহণে দেশীয় অভিজাতবর্গের যোগ্যতা সবচেয়ে কম, নতুন চাহিদার জন্য দরকার নতুন শ্রেণী সৃষ্টি করা।’ এখানে তিনি ‘শিার জন্য ভারতের নিম্নতর শ্রেণীগুলোর বুদ্ধি ও দতা’ সম্পর্কে ক্যামবেলের স্বীকারোক্তিকেও উদ্ধৃত করেছেন। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনাধীনে একটি নতুন শিতি সম্প্রদায়ের সৃষ্টির বিষয়টাকেও চিহ্নিত করেছেন তিনি। অবশ্য মার্কস যেমন বলেছেন তেমনটা হয় নি। বৃটিশের সেই শিাব্যবস্থায় নিম্নতর শ্রেণীগুলোর প্রবেশাধিকার ও সুযোগ ছিল খুবই কম। বরং উচ্চতর শ্রেণীগুলোকেই তা সুযোগ করে দিয়েছিল।

সাত

ইতিহাস অতীতের বস্তুগত বাস্তবতা, যা ঘটে গেছে এবং যা চেতনা-অনির্ভর ও চেতনার বাইরে বিরাজ করছে। ইতিহাসের সেই বাস্তবতা বা সত্যকেই অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন মার্কস, যেন তা থেকে মানবমুক্তির বিপ্লবী দিশাকে উদ্ভাবন করা যায় এবং উদ্ভাবন তাঁরা করেছিলেন। ইতিহাস মার্কসের কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোন প্রকল্প ছিল না। ব্রিটিশের প্রতি মার্কস তাঁর পূর্ব পরিকল্পিত ঘৃণা আরোপ করেন নি, বরং ইতিহাসের নির্মোহ চিত্র ও বিবরণ বৃটিশ উপনিবেশবাদের প্রতি ঘৃণার ও ভারতের জনগণের প্রতি সমমর্মিতার সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসের বিশ্লেষণ থেকেই মার্কস সেই সময়কার ভারতীয় সমাজের মুক্তির চুড়ান্ত দিশাকে তুলে ধরতে সম হয়েছিলেন। তারপরও ইতিহাস কখনোই পরিপূর্ণরূপে উদঘাটিত হয় না। শাসকশ্রেণী ইতিহাসকে বিকৃত করে। মার্কস ইউরোপীয় পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদদের এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের দলিল ও কাগজপত্রের উপর নির্ভর করেছিলেন। ফলে ইতিহাসের প্রকৃত সত্যকে প্রতিফলিত করার প্রশ্নে ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থেকে মার্কসও মুক্ত ছিলেন না। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুল উপসংহারে তিনি উপনীত হয়েছিলেন। তথ্যগত সীমাবদ্ধতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত ত্রুটি দুটিই এখানে কাজ করেছে। এ প্রসঙ্গটিও অচিরেই এই আলোচনায় আসবে।
১৮৫৩ সালে জুন মাসে কমন্স সভার বিতর্কে বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভারতের উন্নতি হচ্ছে।’৩৮ তার জবাবে মার্কস লিখেছিলেন,

এতে কোন সন্দেহ নাই যে বৃটিশেরা হিন্দুস্থানের উপর যে দুর্দশা চাপিয়েছে তা হিন্দুস্থানের আগের সমস্ত দুর্দশার চাইতে মূলগতভাবে পৃথক, সীমাহীনভাবে বেশী তীব্র। বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এশীয় স্বৈরাচারের উপর ইউরোপীয় স্বৈরাচার উপস্থাপন করে এক দানবীয় জট সৃষ্টি করেছে।৩৯

আগেই উল্লেখিত হয়েছে, এই দুর্দশার প্রধানতম অংশীদার ছিল কৃষক। মার্কস কৃষির পীড়ন ও অবহেলাকে উল্লেখ করে বলছেন, ‘ভারতীয় সমাজের উপর সেইটাই ব্রিটিশ জবরদখলকারীদের চূড়ান্ত আঘাত,’৪০ এবং এটা এ কারণে যে কৃষির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ভারতীয় ‘সমাজ কাঠামোর খুঁটি হস্তচালিত তাঁত ও চরকা,’৪১ তাকে ব্রিটিশ ধ্বংস করেছে। মার্কসের লেখা থেকে বৃটিশ উপনিবেশবাদীদের দ্বারা ভারতকে সর্বস্বান্ত করার যে চিত্রটা আমরা পাই, তা মূলগতভাবে সঠিক। এর মূলগত যথার্থতাকে আজও অস্বীকারের কোন উপায় নেই। আমরা তাঁর লেখা থেকে যেমন ব্রিটিশ উপনিবেশ-বাদীদের একটা শ্রেণীবিশ্লেষণ পাই, তেমনি পাই ভারতীয় সমাজেরও মোটামুটি, কিছুটা অসম্পূর্ণ হলেও, একটা শ্রেণীবিশ্লেষণ। বৃটিশ শিল্প-বুর্জোয়া, টাকাওয়ালা চক্র এবং ুদে শাসকচক্র-এরা মিলেই গঠন করেছিল ঔপনিবেশিক শক্তি। একদিকে এই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ, তাদের পদলেহী ভারতীয় রাজন্যবর্গ, জমিদার ও সুদখোর মহাজন, অন্যদিকে ভারতীয় জনসাধারণ তথা কৃষক, এই মৌলিক বিভক্তি মার্কসের বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারা শত্রু এবং কারা বন্ধু তা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের শোষণ-লুন্ঠন-দস্যুতার রাজনৈতিক অর্থনীতির উন্মোচনে মার্কসের ১৮৫৩-এর প্রবন্ধগুলো আজও তাই অমূল্য সম্পদ। কিছু গুরুতর ভ্রান্তি সত্ত্বেও, ১৮ ও ১৯ শতকের ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস আলোচনা মার্কস এবং এঙ্গেলসকে বাদ দিয়ে প্রায় অসম্ভব।

আট

মার্কস লিখছেন, ‘এইসব ছোট ছোট একঘেঁয়ে ধরনের সামাজিক সংগঠনগুলি বহুলাংশে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অদৃশ্য হয়ে চলেছে, সেটা ব্রিটিশ ট্যাঙ-সংগ্রাহকদের ও ব্রিটিশ সৈন্যের বর্বর হস্তক্ষেপের ফলে তত নয়, যতটা ইংরেজ বাষ্প ও ইংরেজের অবাধ বাণিজ্যের ফলেই।’৪২ ব্রিটিশ ট্যাঙ-সংগ্রাহকদের ও সৈন্যদের বর্বরতাকে একমুহূর্তের জন্য আড়াল করছেন না মার্কস। কিন্তু তিনি বলছেন, ইংলন্ডের যন্ত্রশিল্প ও অবাধ বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি কৃষি ও হস্তশিল্পের সমন্বয়ভিত্তিক ভারতের অর্থনীতি। অথচ অন্যত্র তিনিই লিখেছেন, ‘ভারতের উৎপন্নকে ইংলন্ড থেকে বহিষ্কার করা হল…তারপর বৃটিশ কারখানাজাত মাল সামান্য বা নামমাত্র শুল্কে প্লাবিত করতে থাকলো ভারতকে, যার ফলে ঘটল একদা প্রসিদ্ধ সুতীবস্ত্রের ধ্বংসসাধন।’ ‘ব্রিটিশ হামলাদাররা এসে ভারতীয় তাঁত ভেঙে ফেলে, ধ্বংস করে চরকা। ইংলন্ড ইউরোপের বাজার থেকে ভারতীয় সুতাবস্ত্রকে বিতাড়ন করতে শুরু করে…।’
ইংরেজ যে ব্রিটিশ পণ্যের জন্য ‘সামান্য বা নামমাত্র শুল্ক’ চাপিয়ে দিল অথবা ইংলন্ড ও ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করে দিল, তা কি অবাধ বাণিজ্য, না ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রমতা ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ? পরবর্তীতে পুঁজির তৃতীয় খণ্ডে মার্কস লিখেছেন,

ভারতবর্ষে ইংরেজ, শাসক ও ভূস্বামী হিসেবে, তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতা প্রয়োগ করে এইসব ছোট ছোট অর্থনৈতিক সম্প্রদায়গুলোকে ধ্বংস করতে কোন কালপেন করেনি।…তা সত্ত্বেও ভাঙনের এই প্রক্রিয়া চলে অতি ধীরে। চীনে চলে আরো ধীরে, যেখানে প্রত্য রাজনৈতিক মতার জোর ছিল না।… কৃষি ও হস্তশিল্পের মিলনের ফলে যে দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি সৃষ্টি হয় ও সময় বাঁচে তা বৃহদায়তন শিল্পের উৎপাদনের বিরুদ্ধে একরোখা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।৪৩

ইতিহাসের প্রকৃত সত্য এটাই। ভারতবর্ষ উন্নত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বা অবাধ বাণিজ্যের কাছে প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয়েছিল তা ঠিক নয়, বরং পরাজিত হয়েছিল পুঁজিবাদী ইংলন্ডের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বৈরাচার ও দমননীতির কাছে। বলপূর্বক ধ্বংস করা হয়েছিল ভারতবর্ষের অর্থনীতি। এখানে, যুগ যুগ ধরে চলে-আসা জনগণের নিজস্ব অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তির একটা দিকও উন্মোচিত হয়েছে, যাকে বুর্জোয়ারা মোটেই মূল্য না দিয়ে ধ্বংস করে।
মার্কস লিখছেন,

ইংরেজের হস্তপে…এই সব ছোট ছোট অর্ধবর্বর, অর্ধসভ্য সম্প্রদায়গুলোকে ভেঙে দিয়েছে তার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে উড়িয়ে দিয়ে এবং এইভাবে যে সামাজিক বিপ্লব সৃষ্টি করেছে সেটা এশিয়ায় যা শোনা গেছে তার মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং সত্যি কথা বললে একমাত্র বিপ্লব।৪৪

‘অর্ধবর্বর, অর্ধসভ্য সম্প্রদায়’ অভিহিতকরণ নিঃসন্দেহে ভারতীয় সভ্যতার নেতিকরণ। এখানে মার্কসের লেখায় ইউরো-কেন্দ্রিক ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতদের প্রভাব লণীয়। তিনি যাকে সামাজিক বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করেছেন তা হল, তিনি যেমনটি মনে করেন সেই পুরোনো অচলায়তন ভারতীয় গ্রাম সমাজ ভেঙ্গে পড়া। কিন্তু তিনি মোটেই বলছেন না যে, ইংরেজ সচেতনভাবে একটা সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত করেছে। কারণ তিনি এর পর লিখেছেন,

এ কথা সত্যি যে ইংলন্ড হিন্দুস্তানে একটি সামাজিক বিপ্লবের কারণ হতে গিয়ে কর্মপ্রেরণা পেয়েছে তার হীনতম স্বার্থপরতা থেকে এবং তা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার পন্থায় সে ছিল স্থূল। কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, মানবসমাজ কি তার ল্য বাস্তবায়িত করতে পারে এশিয়ার সামাজিক অবস্থার এক মূলগত বিপ্লব ছাড়া? যদি না পারে, তাহলে ইংলন্ডের অপরাধ যাই হোক না কেন, সে এই বিপ্লব সংঘটনে ইতিহাসের অসচেতন অস্ত্র।৪৫

মার্কসের বক্তব্য সর্বদাই ইংরেজের অপরাধকে ধিক্কার দিচ্ছে। ‘হীনতম স্বার্থপরতা’ ‘জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া’, এগুলো ইংরেজের ঔপনিবেশিক লুন্ঠন ও বর্বরতাকেই প্রকাশ করেছে। মার্কস সারমর্মে যা বলেছেন তা হল, ব্রিটিশ ভারতে সীমাহীন অপরাধ ও ধ্বংসযজ্ঞ করেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে এক সামাজিক বিপ্লব, যা মোটেই ব্রিটিশের উদ্দেশ্য ছিল না। এটি সামাজিক বিপ্লব কিনা তা অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষে।
ব্রিটিশপূর্ব ভারতের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে মার্কস লিখেছেন, এইসব শান্তসরল গ্রামগোষ্ঠীগুলো চিরদিন মানুষের চেতনাকে সম্ভাব্য ক্ষুদ্রতম গণ্ডীর মধ্যে আটকে রেখেছে, তাকে করেছে কুসংস্কারের অবাধ ক্রীড়নক, ঐতিহ্যগত নিয়মের ক্রীতদাস এবং সমস্ত উৎকর্ষ ও ঐতিহাসিক কর্মচাঞ্চল্য থেকে বঞ্চিত।… এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বর্ণবিভেদ ও দাসত্ব দ্বারা কলুষিত, মানুষকে তা পারিপার্শ্বিকতার নিয়ন্তা হিসেবে উন্নীত না করে পরিণত করেছে বাহ্যিক পারিপার্শ্বিকতার অধীন,…এবং আমদানী করেছে প্রকৃতির পাশবিক পূজা, প্রকৃতির প্রভু যে মানুষ তাকে হনুমানদেবরূপী বানর ও…গরুর অর্চনায় ভূলুন্ঠিত করেছে…৪৬

মার্কস আরো লিখেছেন, এই অচলায়তন পরস্পর বিচ্ছিন্ন গ্রামসমাজ যুগ যুগ ধরে একখণ্ড জমির ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে নিষ্ক্রিয়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছে সাম্রাজ্যের পতন, অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতার দুষ্কর্ম, বড় বড় শহরের অধিবাসীদের হত্যাযজ্ঞ, এগুলোকে নিছক স্বাভাবিক ঘটনা ব্যতীত একতিল বেশী বিবেচনা করেনি এবং দৈবাৎ আক্রমণকারীর ল্যপথে পড়লে তারা নিজেরাও হয়ে উঠেছে আক্রমণকারীর অসহায় শিকার।৪৭

এ কারণেই তাঁদের মাথার উপর চেপে বসতে পেরেছে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র তথা প্রাচ্যের স্বৈরাচার, যাকে কর যোগাত এই জনগণই। ‘প্রাচ্যের স্বৈরাচারের তারাই ভিত্তি হয়ে এসেছে চিরকাল।’৪৮ মার্কস এই অচলায়তনের অবসান চান। কারণ তার মতে, মানবসমাজের মুক্তির জন্য ‘এশিয়ার সামাজিক অবস্থার এক মূলগত বিপ্লব’ প্রয়োজন। তাই ব্রিটিশের চরম ধ্বংসযজ্ঞের ফল হিসেবে যখন এই অচলায়তন ভেঙে পড়েছে, তখন মার্কস একে মন্দ জিনিষের বিপরীত ফল হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এঙ্গেলসের কাছে পত্রে মার্কস লিখছেন, ‘এই গোপন লড়াইটা আমি চালিয়েছি ভারতের ওপর প্রথম একটি প্রবন্ধে যাতে ইংরেজ কর্তৃক দেশীয় শিল্প ধ্বংসকে বর্ণনা করেছি বিপ্লবী বলে। আর অন্যসব ব্যপারে ভারতে ব্রিটেনের গোটা শাসনটা ছিল শুকরোচিত এবং আজও তাই আছে।’৪৯ ইংলন্ডের সহিংস তৎপরতা সত্ত্বেও ইংলন্ড কর্তৃক চীনের বিচ্ছিন্নতা ভেঙে দেওয়াকেও মার্কস বলেছেন বিপ্লব।৫০ পুঁজি তৃতীয় খণ্ডেও তিনি ভারতের গ্রামসমাজ ভেঙে যাওয়াকে বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করেছেন।৫১ অর্থাৎ এটি মার্কসের তাৎণিক চিন্তা নয়, বরং দৃঢ় বিশ্বাস।
‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এ আমরা পাই, ‘ইতিহাসের দিক থেকে বুর্জোয়া শ্রেণী খুবই বিপ্লবী ভূমিকা নিয়েছে। বুর্জোয়া শ্রেণী যেখানেই প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানেই সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক ও সরল সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। যেসব বিচিত্র সামন্তবন্ধনে মানুষ বাঁধা ছিল তার ‘স্বাভাবিক ঊর্ধ্বতনদের’ কাছে, তা এরা ছিঁড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে। মানুষের সাথে মানুষের অনাবৃত স্বার্থের বন্ধন, নির্বিচার ‘নগদ টাকার’ বন্ধন ছাড়া আর কিছুই এরা বাকী রাখে নি। ধর্মউন্মাদনার স্বর্গীয় ভাবোচ্ছ্বাস, মধ্যযুগীয় বীরধর্মের প্রেরণা, কূপমণ্ডূক ভাবাবেগকে এরা নিমজ্জিত করেছে আত্মসর্বস্ব হিসাবনিকাশের বরফজলে।’

বুর্জোয়া শ্রেণী কর্তৃক পুরাতনের ধ্বংসাধনের এক বিবরণ আমরা এখানেও পাচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন হল ইউরোপের েত্ের বুর্জোয়া শ্রেণী যা করেছে, উপনিবেশ অথবা পরাধীন দেশ কিংবা বাকী বিশ্বের েত্েরও কি তা প্রযোজ্য? ইউরোপে সামন্ততন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করেছিল বুর্জোয়াতন্ত্র, কিন্তু ভারতবর্ষের মত দেশে পুরোনোকে ধ্বংস করে তা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল কিসের দ্বারা?

নয়

উপরোক্ত প্রশ্নে যাওয়ার আগে ভারতের ব্রিটিশপূর্ব ইতিহাস সংক্রান্ত মার্কসের ধারণা ও প্রকৃত বাস্তবতা তুলনামূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। মার্কস-বর্ণিত ব্রিটিশপূর্ব ভারতবর্ষে ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না, মূলত বাজারের জন্য উৎপাদন ছিল না, এবং নগরগুলি ছিল সামরিক শিবিরমাত্র। ‘খাল ও জলাশয় থেকে কৃত্রিম সেচ ছিল প্রাচ্য কৃষির ভিত্তি…তার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তপে;’ কৃষি ও হস্তশিল্পের সমন্বয়ে গঠিত ছোট ছোট পারিবারিক গোষ্ঠী, এর মাধ্যমে গড়ে-ওঠা পরস্পর বিচ্ছিন্ন গ্রাম, যা যে কোন পরিবর্তন ও অগ্রগতিতে অনিচ্ছুক, ছিল ভারতীয় সমাজের ভিত্তিমূল। ব্রিটিশ কমন্স সভায় উত্থাপিত পুরোনো দলিলকে উদ্ধৃত করেছেন মার্কস;

গ্রামের সীমানা বদল হয়েছে কদাচিত। যুদ্ধ, দুর্ভি বা মারীমড়কে গ্রামগুলি তিগ্রস্ত হলে এমনকি বিধ্বস্ত হলেও সেই একই নাম, একই সীমানা, একই স্বার্থ, এমনকি একই পরিবরারসমূহ চলে এসেছে যুগের পর যুগ। রাজ্যের ভাগাভাগি নিয়ে অধিবাসীরা মাথা ঘামায় না। গ্রামটি অখণ্ড থাকলেই হল। কোন সম্রাটের করায়ত্ত হল এ নিয়ে তারা ভাবে না। গ্রামের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি অপরিবর্তিত থাকে।৫২

মার্কস রাজনৈতিকভাবে এইসব বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে কর্পোরেশন বা পৌরসভার সাথে তুলনা করেছেন। বিভিন্ন দায়িত্ব বণ্টনের বর্ণনা দিতে গিয়ে মার্কস লিখেছেন গ্রামের জনগণ নির্দিষ্ট কর্মচারীর মারফত রাষ্ট্রকে কর প্রদান করে। মার্কস এই সমাজব্যবস্থাকে কোনক্রমেই সামন্ততান্ত্রিক সমাজ হিসেবে বিবেচনা করেন নি। তিনি একে এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি নামকরণ করেছিলেন।
ইরফান হাবিব লিখেছেন, ভারতবর্ষের সমাজের এই বিশ্লেষণে মার্কসকে নির্ভর করতে হয়েছিল ইউরোপের বুর্জোয়া পণ্ডিতদের লেখনীর ওপর, যেমন হেগেল, জন ক্যাম্পবেল, জেমস মিল, বার্নিয়ার প্রমুখ সহ ব্রিটিশ সরকারী দলিল পত্রের ওপর। তিনি এও লিখেছেন, মার্কস এসব প্রশ্নে অত্যন্ত সতর্ক ও বারংবার যাচাই বাছাইয়ের উপর নির্ভর করতেন। তবুও ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের লিখিত উপাদানসমূহের বাইরে যাওয়া তাঁর প েতখন সম্ভব ছিল না।
মার্কসের পর অদ্যাবধি ভারতবর্ষের প্রাক-ব্রিটিশ সমাজকে নিয়ে গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, মার্কস যেভাবে তুলে ধরেছিলেন ঠিক সেভাবে ভারতীয় সমাজ বিরাজ করছিল না। ভারতীয় সমাজ ছিল গতিশীল, জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার অস্তিত্ব ছিল, সমাজ শ্রেণী বিভক্ত ছিল, গ্রামীণ সমাজে শ্রেণী পার্থক্যসমূহ যথেষ্ট পরিমাণে বিকাশ পেয়েছিল, সমাজে শ্রেণীসংগ্রাম ও কৃষকবিদ্রোহের ঘটনা ছিল এবং সমাজ ছিল বর্ণবিভেদ প্রথাভিত্তিক সামন্ততান্ত্রিক সমাজ যার বয়স ছিল কয়েক হাজার বছর। প্রাক-ব্রিটিশ ভারতবর্ষের এই সামন্ততান্ত্রিক সমাজে পণ্য অর্থনীতি বিকাশ পাচ্ছিল, বাজারের জন্য উৎপাদনের সূচনা হয়েছিল, টাকার ব্যাপকতর প্রচলন ঘটেছিল, বাণিজ্যিক বুর্জোয়া ও ব্যাংকমালিকের সৃষ্টি হয়েছিল এবং বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন বিপ্তিভাবে হলেও পুঁজিবাদী কারখানাশিল্প, যেমন জাহাজ নির্মাণ, খনি, লোহা ও ইস্পাত শিল্প, রেশম নিষ্কাশন, রেশম ও কাপড় রঙ করা, কার্পেট বুনন, বস্ত্রশিল্প, চিনি ও রংশিল্প, ইত্যাদির সূচনা হয়েছিল। ব্রিটিশ দখলের পূর্বে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন শক্তির যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল। এজন্য ভারতীয় পুঁজির সঞ্চয়নও ঘটেছিল। পলাশীর যুদ্ধের সময়কালে ব্রিটিশ অর্থনীতি ভারতের তুলনায় অধিক বিকশিত ছিল না।
মার্কস সঠিকভাবেই ভারতীয় সমাজে বর্ণপ্রথার বাধার প্রাচীরকে চিহ্নিত করেছেন। ‘প্রাচীন কাল থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত ভারতবর্ষে গ্রাম ও শহরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্ণপ্রথা টিকে থাকার যথেষ্ট সা্য প্রমাণ রয়েছে।’৫৩ ‘গ্রাম থেকে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আদায় করা এবং শহরে মজুরী ব্যয় কমিয়ে রাখার েত্ের বর্ণপ্রথা ছিল সহায়ক। হিন্দু ও মুসলমান উভয় শাসকদেরই এই বর্ণপ্রথাকে রা করার যথেষ্ট যুক্তি ছিল।’৫৪ সুতরাং কৃষক ও কারিগরদের শোষণের স্বার্থেই মুসলমান ও হিন্দু উভয় সামন্ত শাসকশ্রেণী এই বর্ণপ্রথাকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিল। মার্কস অবশ্য এভাবে শ্রেণীশোষণের সাথে সম্পৃক্ত করে বর্ণপ্রথার মূল্যায়ন করেন নি, কারণ তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাতে ভারতীয় সমাজ তথা এশীয় সমাজ হয়ে পড়ে শ্রেণীপূর্ব সমাজ। বর্ণপ্রথাও অপরিবর্তনীয়ভাবে বিরাজ করে নি, কারণ ভারতীয় সমাজ, মার্কস যেমন বলেছেন, তেমন গতিহীন ছিল না। ‘বর্ণপ্রথাকেও…নতুন অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, যা গুরুত্বপূর্ণ।’৫৫ মধ্যযুগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছূ সংস্কারমূলক আদর্শগত আন্দোলন গড়ে উঠেছিল বর্ণপ্রথা, মুসলমান ও হিন্দু উভয় ধর্মের গোঁড়ামী এবং শাসকশ্রেণীর ধর্মীয় মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করে। এ সকল আন্দোলনে হিন্দু মুসলমান নিম্নশ্রেণী ও বর্ণের মানুষ ব্যাপকভাবে যোগ দিয়েছে। এইসব আন্দোলনের মহান পুরোধাদের অধিকাংশই ছিলেন নিম্ন জাতির অন্তর্ভুক্ত। যেমন সুতীবস্ত্র ছাপাকারক নামদেব, চামারের ছেলে রবিদাস, মুসলমান তাঁতী কবীর, হিন্দু দর্জির ছেলে নানক এবং ব্রাহ্মণ সন্তান চৈতন্য, তুলোধুনোকারী দাদু, জাঠ কৃষক ধন্ন প্রমুখ। এই আন্দোলনগুলো ছিল সংস্কারপন্থী, বিপ্লবী নয়। ‘কিন্তু তা সত্ত্বেও এই নতুন বিশ্বাস মোগল শাসনের বিরুদ্ধে সৎনামী ও শিখ, দুটি শক্তিশালী কৃষক সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে তোলায় প্রেরণা যুগিয়েছিল। অর্থনৈতিক েত্ের বিভিন্ন পরিবর্তন এবং ধর্মীয় ও অন্যান্য মতাদর্শগত সংগ্রামের ফলে, সামাজিক সম্পর্কে কিছু পরিবর্তন সাধিত হচ্ছিল। কিছু কিছু স্থানে বর্ণপ্রথা তার পুরোনো শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল এবং সমাজে কিছু গতিশীলতা সঞ্চারিত হয়েছিল।’৫৬
এটা ঠিক যে ভারতে গ্রামগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ও হস্তশিল্পের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একধরনের স্বাভাবিক অর্থনীতি বিরাজ করে আসছিল। ইরফান হাবিব যদিও লিখেছেন, ‘কৃষি ও হস্তশিল্পের একত্ব এবং অপরিবর্তনীয় শ্রমবিভক্তি ভারতের গ্রাম সমাজের দুটি স্তম্ভ, মার্কসের এই বিশ্লেষণ স্থায়ী মূল্য বহন করে’৫৭ তথাপি এ অবস্থা অপরিবর্তনীয় বা নিশ্চল ছিল না। কৃষি ও হস্তশিল্পের মধ্যে বিচ্ছেদের সূত্রপাত হয়েছিল এবং পৃথক কারিগর সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছিল। প্রতি গ্রামেই শুধুমাত্র হস্তশিল্প নির্ভর একদল কারিগর শ্রেণীর অস্তিত্বও ছিল, যারা ভোক্তার নির্দেশ ও চাহিদা মতোই উৎপাদন করতো। এই সকল উৎপন্ন দ্রব্য মূলত পণ্যে পরিণত হতো না বরং কৃষিজাত দ্রব্যের সাথে এদের বিনিময় ঘটত। একই সাথে বিভিন্ন শহরে এবং গ্রামের শিল্পপ্রধান এলাকায়, বড় আকারে না হলেও, বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা অগ্রিম নগদ টাকা প্রদানের বিনিময়ে অথবা অগ্রিম কাঁচামাল প্রদান করে কারিগরদের দিয়ে পণ্য উৎপাদন করাতো। ব্রিটিশ সুতীবস্ত্রে ভারতবর্ষ সয়লাব করার নেতিবাচক ফল হিসেবে মার্কস নিজেই উল্লেখ করেছেন, ‘একই সময়ে ঢাকা শহরে জনসংখ্যা ১৫০,০০০ থেকে ২০,০০০-নেমে আসে। বস্ত্রের জন্য বিখ্যাত ভারতীয় শহরগুলির অবয় কিন্তু চরম ফলাফল নয়।’৫৮ সুতরাং মার্কস নিজেও ভারতের শিল্প শহরসমূহের অস্তিত্বের কথা বলেছেন এবং বোঝা যায় এসব শহরের অধিকাংশ অধিবাসী ছিল শুধুমাত্র শিল্পে নিয়োজিত। সুতরাং মার্কস যে অপরিবর্তনশীলতা ও অচলায়তনের চিত্র এঁকেছেন তা ব্রিটিশপূর্ব ভারতীয় বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না।
ব্রিটিশপূর্ব ভারতবর্ষে বিশাল কৃষক সম্প্রদায়, হস্তশিল্পী ও কারিগরশ্রেণী ছিল সমস্ত সম্পদের নির্মাতা এবং তাদের কাছ থেকেই নিষ্কাশিত হতো সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র তথা শাসকশ্রেণীর জন্য বিশাল উদ্বৃত্ত। মোগল যুগে সারা দেশে ছড়িয়ে-থাকা সুবিশাল সামরিক আমলাতান্ত্রিক অভিজাততন্ত্র গঠন করেছিল এই শাসকগোষ্ঠী, যারা জনগণের মাথায় চেপে-বসা সুবিশাল পর্বতরাজি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এদের সর্বোচ্চ প্রতিনিধি ছিল মোগল সম্রাট।
১৭ শতকের শেষ দিকেই ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের বিদ্রোহ দমন ও নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের জন্য বিশাল সেনাবাহিনী লালনপালনের অবিশ্বাস্য ব্যয়ভার, রাজা-বাদশাহ-সামন্ত-অভিজাতদের সীমাহীন অমিতব্যয়ী বিলাসী ও পাশবিক জীবন জমির উপর রাজস্বের বোঝাকে বিপুলভাবে বাড়িয়ে দেয়। ‘উৎপন্নের এক তৃতীয়াংশ থেকে তিন চতুর্থাংশ পর্যন্ত রাজস্ব হিসেবে’৫৯ কেড়ে নেওয়া হত। ‘তাঁতিদের নিজেদের পরিধানের বস্ত্র ছিল না, তারা অন্যের বস্ত্রের জোগান দেওয়ার জন্য শ্রম করতো, কৃষকরা নিজেরা ছিল ুধার্ত-বুভুু, কিন্তু তাঁরা খাদ্য উৎপাদন করতো শহরগুলোর জন্য। সামগ্রিকভাবে ভারতকে বিবেচনা করলে, এখানকার প্রয়োজনীয় পণ্য বিনিময় হতো স্বর্ণ ও রৌপ্যের সাথে, অন্যকথায় খাদ্যের বিনিময়ে আসতো প্রস্তর।’৬০ ১৬৬০ দশকে ফরাসী পর্যটক বার্নিয়ার লিখেছিলেন, অতিরিক্ত রাজস্বের বোঝা বহন করতে না পেরে অগণিত কৃষক হতাশ হয়ে গ্রাম ত্যাগ করতো বা শহরে পালিয়ে গিয়ে অদ শ্রমিক বা চাকরের কাজ করতো। ‘পুরো গ্রামের জনগোষ্ঠীও এলাকা ছেড়ে পলায়ন করতো অথবা…কৃষকদের অধিকাংশ।’৬১
সমস্ত দেশের কৃষি ব্যবস্থার চিত্রই ছিল করুণ। ‘খুব বাজেভাবে সারা দেশে জমি চাষ করা হতো এবং সেচকর্মের অভাবে দেশের বড় একটা অংশ ছিল অনুৎপাদনশীল।’৬২ কারিগর এবং ছোট ও মাঝারী ব্যবসায়ীদের ওপরও নিপীড়ক শাসকদের নিষ্ঠুর নিপীড়ন চলত।৬৩ ‘১৭ শতকের একেবারে শেষভাগে অবস্থার আরো অবনতি ঘটে এবং উৎপাদিকা শক্তির ভাঙন বিপুল আকার ধারণ করে।’৬৪ ফলে আওরঙ্গজেবের সময় থেকেই মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কৃষক ও কারিগরদের বিদ্রোহ তীব্রতর ও ব্যাপকতর হয়ে ওঠে। গৌতম ভদ্র আওরঙ্গজেব ও তৎপরবর্তী কালের কিছূসংখ্যক কৃষক বিদ্রোহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, গুজরাটের মাতিয়া বিদ্রোহ (১৬৮৫) যে বিদ্রোহে ১২ থেকে ১৫ হাজার বিদ্রোহী নিম্নমাণের অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অংশগ্রহণ করেছিল, কোলি কৃষক বিদ্রোহ, যারা ছিল গুজরাটের জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং সমস্ত মোগল শাসনকাল জুড়েই বিদ্রোহ চালিয়ে গিয়েছিল, আমেথি অঞ্চলে কুর্মি কৃষক বিদ্রোহ (১৬৭০-৮০), মেওয়াট ও নারনুলে সৎনামী কৃষক বিদ্রোহ ((১৬৭২) যা ছিল এক অতি বীরত্বপূর্ণ বিদ্রোহ, আগ্রা মথুরা এলাকায় পৌনঃপুনিক জাঠ বিদ্রোহ, কোচ বিদ্রোহ (১৬৬২), দণি পশ্চিম বাংলায় শোভা সিং-এর নেতৃত্বে বিদ্রোহ (১৬৯৫), আফগান উপজাতি বিদ্রোহ (১৬৭০-৮০), মঙ্গাচা উপজাতি বিদ্রোহ, শিখ বিদ্রোহ ইত্যাদি।৬৫ ‘নিপীড়িত কৃষক এবং গ্রাম্য কারিগরদের এ সব বিদ্রোহ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এবং একই সাথে হিন্দু ও মুসলমান উচ্চ শ্রেণী, যেমন বড় জমিদার ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল।’৬৬ বর্ণ ও ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এসব বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ‘মোগল শাসনে মূল দ্বন্দ্ব আবর্তিত হত ভূমি রাজস্বকে কেন্দ্র করে; এর ফলেই সৃষ্টি হয় কৃষক সম্প্রদায় ও রাজস্ব-আত্মসাতকারী শাসক শ্রেণীর মধ্যে ব্যাপকতম সংঘাত।’৬৭
তবে দীর্ঘস্থায়ী মারাঠা আন্দোলনকে কৃষক-বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। গৌতম ভদ্র লিখেছেন, ‘শিবাজীর অভ্যুত্থানের সঙ্গে জাতে ওঠা এবং স্থানীয় জমিদার শক্তির মতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন জড়িত ছিল।…মারাঠা সর্দাররা যে শোষিত কৃষকদের খুব বন্ধু ছিল, একথা মনে করার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই। রাজস্ব আদায়ে মারাঠা রাষ্ট্রমতা নির্দয়তায় মুঘলদের চেয়ে কিছু কম ছিল না।…শিবাজীও তাঁর অভিযানে কৃষকদের রেহাই দেন নি।’৬৮ ইরফান হাবিবও এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন। যদিও ‘মারাঠাদের বাহিনীতে নেতারা ছিল জমিদার এবং সাধারণ সৈন্যরা ছিল কৃষক’ ‘শিবাজী কৃষকদের মুক্তিদাতা ছিলেন না। তাঁর প্রশাসন মুঘলদের চেয়ে কম নিপীড়নমূলক ছিল না।’৬৯ নিজেদের এলাকার বাইরে তথা ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকায় মারাঠারা ছিল নিষ্ঠুর বর্গী দস্যু।
যাইহোক একদিকে কৃষক ও কারিগরদের বিদ্রোহ ও বিােভ, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মতার সাথে প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক মতাসমূহের দ্বন্দ্ব, সিংহাসন নিয়ে বিভিন্ন দাবীদারদের মধ্যে যুদ্ধ ও সংঘাত ইত্যাকার কারণে ১৮ শতকের সূচনাকালেই মোঘল সাম্রাজ্যের ভাঙনের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কার্যত মোঘল কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন ছোট ছোট রাজ্যসমূহের উদ্ভব ঘটতে থাকে। এদের মধ্যেও ছিল অব্যাহত সংঘাত ও বিস্তৃতির চেষ্টা । বাঙলা ও হায়দারাবাদ কার্যত স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। শিখ ও মারাঠা শক্তির উদ্ভব ঘটে। একাধিক উপদলে বিভক্ত হলেও মারাঠা শক্তির লুণ্ঠন ও দস্যুতার তাণ্ডবে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকায় দুর্দশা নেমে আসে। দিল্লীর মোগল সম্রাটরা ছিল অপদার্থ এবং ভারতের জনগণের জন্য সামান্য দায়িত্ববোধও তাদের ছিল না। মারাঠা শক্তি দিল্লী দখল করতে গিয়ে ভীষণভাবে পর্যদুস্ত হয়। প্রথমে পারস্য সমরনায়ক নাদির শাহ ও পরবর্তীতে আফগান নায়ক আবদালী দিল্লী দখল, লুট ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। রাজস্ব ও লুন্ঠনের ব্যাপক বর্ধিত চাপে কৃষক ও কারিগরদের জীবনে ওঠে চরম নাভিশ্বাস। অসংখ্য মানুষ জমি ও পেশা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। এ ছিল বিশাল সামন্ততান্ত্রিক ভারতবর্ষের ভিতর থেকে ভেঙে-পড়ার ঘটনা। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ ভেঙে-পড়াটা ছিল ইতিবাচক, বলা যেতে পারে বিপ্লবী। কারণ ভেঙে-পড়া সামন্ততন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করার জীবনীশক্তি ভারতবর্ষের মধ্যে সঞ্চিত ও সঞ্চারিত হচ্ছিল। প্রধানত ভারতের অভ্যন্তরেই ছিল ভারতের সম্পদ এবং কৃষক ও কারিগর বিদ্রোহ নতুন মাত্রা অর্জন করেছিল। সে সময়ে কৃষক ও কারিগর বিদ্রোহ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিকাশের সহায়ক না হয়ে অন্যকিছুই হতে পারতো না। আবদালী বা মারাঠাদের ব্যর্থ চেষ্টা এটাই প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, তরবারীর জোরে আবার একটি মোগল ধরনের সামন্ততান্ত্রিক ভারতবর্ষ সৃষ্টি ছিল অসম্ভব।
সুনীতিকুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার প্রক্রিয়ার সাথে সাথে বাণিজ্য ও পুঁজিবাদী উপাদানসমূহের জন্ম হতে থাকে, মতাদর্শগত বিদ্রোহসমূহ দেশকে আলোড়িত করে, উপমহাদেশে জাতিসমূহ ও জাতীয় ভাষাসমূহ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।…প্রাক-ঔপনিবেশিক সময়কালে বাণিজ্য প্রসারিত হচ্ছিল, বাধার প্রাচীরগুলো ভেঙে পড়ছিল এবং সৃষ্টি হচ্ছিল আঞ্চলিক বাজারসমূহ।…এ ধরনের একটা সময়ে ভক্তি আন্দোলন বিভিন্ন মাতৃভাষায় জাতীয় সাহিত্য ও বিভিন্ন জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে প্ররোচক হিসেবে কাজ করছিল।’৭০
এর অর্থ এই নয় যে, ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্র অতিদ্রুত ভেঙে পড়ত এবং অচিরেই পুঁজিবাদ বিকশিত হত। তাছাড়া ভারতবর্ষের সর্বত্র বিকাশের স্তর একই রকম ছিল না। এক বিরাটাকার বিশৃঙ্খলা, ভাঙাভাঙি এবং দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিল না। তবুও তা হত চূড়ান্তভাবে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী। ভারতবর্ষের এই অধ্যায়টিকে মার্কস চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভারতবর্ষে দ্রুত শিল্প বিপ্লব হত কি না সেটা অমূলক প্রশ্ন। কারণ ইউরোপেও শিল্প বিপ্লব হয়েছে বুর্জোয়া শ্রেণী রাজনৈতিক মতা দখলের পরে। একটি নতুন ব্যবস্থার অর্থনৈতিক বিকাশ সাধারণভাবে ব্যাপকতর হয়, সেই ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী শ্রেণীর মতা দখলের পর। তাছাড়া ভারতবর্ষ দখল ও তাঁর সম্পদের মাধ্যমেই মূলত ইংলন্ডে শিল্প বিপ্লব হয়েছিল। ভারতবর্ষ করতলগত না হলে খোদ ইংলন্ডে শিল্প বিপ্লবের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ছিল কি না তা প্রশ্নসাপে। কিন্তু এটা নিশ্চিত, ভারত তার নিজ গতিতে ও নিজ অন্তর্নিহিত সামর্থ্যে পুঁজিবাদে উত্তীর্ণ হতে সম ছিল। সে-ভারতের রূপটা ঐক্যবদ্ধ না হয়ে অংশবিশেষ বা খণ্ডিতও হতে পারতো।

দশ

কিন্তু ব্রিটিশ আগ্রাসন ও ঔপনিবেশিকতার সূচনা সমগ্র ভারতবর্ষের গতিপথকে পাল্টে দেয়। ব্রিটিশ ‘ঔপনিবেশিক শাসন সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণের সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে দেয়, পুরোনো সমাজের মধ্যে জেগে-ওঠা প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে ধ্বংস করে, সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল ও অন্ধকারাচ্ছন্ন শক্তিগুলোর সাথে মিত্রতা গড়ে তোলে এবং এভাবে মন্থর, বিকৃত, ভারসাম্যহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জন্ম দেয়।’৭১
একথা উল্লেখ করা উচিত যে, ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয়দের ভারতবর্ষে অনধিকার প্রবেশ এবং এবং শেষ পর্যন্ত পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ হওয়ার জন্য প্রাথমিক ও প্রধানভাবে দায়ী ও সহায়তাকারী ছিল মোঘল স্বৈরতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী; জাহাঙ্গীর, শাজাহান, আওরঙ্গজেবের মত বড় মোঘল থেকে শুরু করে ফররুখশিয়ারের মত তাঁদের পরবর্তী অনুসারীরা সবাই। নিজেদের স্বার্থের বিনিময়ে এদেরই প্রশ্রয়ে ও অনুগ্রহে ইংরেজ সহ ইউরোপীয় বাণিজ্যিক নামধারী দস্যুরা ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষে নিজেদের ভিত্তি গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। ফররুখশিয়ার বিনা শুল্কে ইংরেজদের বাণিজ্যের অধিকার দিয়েছিল। মোগলদের পর পরই দায়ী ছিল মোগল ধ্বংসাবশেষের উপর সৃষ্টি হওয়া মারাঠা, নিজাম এমনকি পরবর্তীতে রনজিত সিংহের মত স্বৈরতান্ত্রিক রাজশক্তিগুলো, যারা সর্বদাই দেশ ও জনসাধারণের বিরুদ্ধে নিজেদের মতা ও লুন্ঠনের স্বার্থে ইংরেজদের নোংরা হাতের সাথে হাত মিলিয়েছিল। এরা ছিল মোঘল স্বৈরতন্ত্রেরই ছোট সংস্করণ।
সুতরাং ব্রিটিশ কর্র্তৃক ভারতের শিল্প এবং অর্থনীতি ধ্বংসসাধনকে মার্কস যেভাবে ‘বিপ্লব’ এবং ইংরেজকে এই তথাকথিত বিপ্লবের ‘অচেতন অস্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা মোটেই সঠিক নয়। ইংরেজ ভারতের বিরাজমান উৎপাদন শক্তিকেই শুধু ধ্বংস করে নি, ভারতীয় সম্পদ ও জনগণের-সৃষ্ট উদ্বৃত্তকে লুণ্ঠন করে ইংলন্ডে পাচারের মাধ্যমে ভারতের বিপ্লবী অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তিকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। নতুনতর ও উন্নততর বিকাশের সমস্ত পথকেই রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বিপ্লব ইংরেজ করেনি এমন নয়। তবে সে-বিপ্লব ঘটেছিল ইংলন্ডে। ভারতের লুন্ঠিত সম্পদেই গড়ে উঠেছিল ইংলন্ডের শিল্প বিপ্লব। ভারতের ধ্বংসযজ্ঞ ও ইংলন্ডের শিল্প-বিপ্লব, এ দুটি ছিল পরস্পরের পরিপূরক। শুধু শিল্প বিপ্লবই নয়, প্রধানত ভারত-লুন্ঠনের মাধ্যমেই ইংরেজ উনিশ শতকেই তাদের শিল্প পুঁজিবাদকে একচেটিয়া লগ্নী পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের স্তরে উন্নীত করতে পেরেছিল।
বিশ্বপুঁজিবাদের বিকাশ ও বিপ্লবের ইতিহাসটাই এমন। মার্কস যে বলেছেন, ‘ইতিহাসের দিক থেকে বুর্জোয়া শ্রেণী খুবই বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে’, তা ছিল তখনকার ইউরোপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মার্কস নিজেও বলেছিলেন, ‘১৬৪৮ ও ১৭৮৯ এর বিপ্লব ইংরেজদের অথবা ফরাসীদের বিপ্লব নয়। এগুলি হল ইউরোপীয় ছকে বিপ্লব।…এগুলি হল নতুন ইউরোপীয় সমাজের রাষ্ট্রব্যবস্থার ঘোষণা।…বুর্জোয়াদের এই বিজয় ছিল একটি নতুন সমাজব্যবস্থার বিজয়, সামন্ত সম্পত্তির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া সম্পত্তির বিজয়।’৭২ কিন্তু সারা পৃথিবীকে লুন্ঠন ও ধ্বংসের বিনিময়েই ইউরোপের বুর্জোয়া শ্রেণী নিজের বিকাশ ঘটিয়েছিল। ইউরোপের বুর্জোয়া উত্থান তাই বাকী পৃথিবীর উৎপাদন শক্তির গতিকে মন্থর বা কোন কোন ক্ষেত্রে (আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মূল অধিবাসীদের ক্ষেত্রে) ধ্বংস করে দিয়েছিল। সারা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের বুর্জোয়া শ্রেণীর ভূমিকা তাই তখনো ছিল প্রতিক্রিয়াশীল। বুজোয়া উৎপাদন ব্যবস্থার শোষণ-লুন্ঠনমূলক চরিত্র, প্রতিযোগিতা ও অসম বিকাশের কারণে পৃথিবীর বৃহদংশের দুর্দশা ও ধ্বংসের বিনিময়েই ক্ষুদ্রতর অপর অংশে বুর্জোয়া বিকাশ ও বিপ্লব ঘটেছে। তাই বুর্জোয়া শ্রেণী কখনোই বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারেনি।
১৮ শতকের শেষভাগে ও ১৯ শতকে ইউরোপের বুর্জোয়াদের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ভাবধারা অবশ্যই বিশ্ব জনগণের সামনে ইতিবাচক বিপ্লবী দৃষ্টান্ত হয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপের বুর্জোয়ারাই বিশ্বব্যাপী সেই ভাবধারার উন্মেষকে গলা টিপে হত্যা করতে সর্বোচ্চ পরিমাণে তৎপর ছিল। খোদ ইউরোপেও তারা তাদের নিজেদের ঘোষিত আদর্শের সাথে বেইমানী করেছে। পুরোনো প্রতিক্রিয়াশীলতার সাথে তারা হাত মিলিয়েছিল। সুতরাং ১৮ ও ১৯ শতকে যখন ইউরোপে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশ ও বিপ্লবের যুগ, ঠিক তখন এশিয়া আফ্রিকা বা আমেরিকায় ইউরোপের এই বুর্জোয়াদের দাসত্বের শৃংখল চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাটা সেখানকার জনগণের আশু বিপ্লবী কর্তব্য হিসেবে উপস্থিত হয়ে পড়েছিল। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও ঘটনা ছিল অভিন্ন প্রকৃতির।

এগার

মার্কস লিখেছেন, ‘মহা মোগলদের একচ্ছত্র মতা ভেঙে ফেলেছিল মোগল শাসনকর্তারা। শাসনকর্তাদের মতা চূর্ণ করলো মারাঠারা। মারাঠাদের মতা ভাঙল আফগানরা; আর সবাই যখন সবার সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত তখন প্রবেশ করল ব্রিটেন এবং সকলকে অধীন করতে সম হল।’৭৩ মার্কস শাসকগোষ্ঠীর বর্ণনাই শুধু দিয়েছেন। জনগণ বা জনগণের সক্রিয়তা এখানে অনুপস্থিত। এটি ১৮৫৩ সালে মার্কস-লিখিত ভারত-সংক্রান্ত লেখনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা। এর কারণ, মার্কস ব্রিটিশপূর্ব ভারতের যে চিত্র এঁকেছেন তাতে জনগণ ইতিহাসের নিষ্প্রাণ-নিষ্ক্রিয় দর্শক মাত্র। অথচ মার্কস-বর্ণিত ভারতবর্ষে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র আছে, সে-রাষ্ট্র জনগণের উদ্বৃত্তও আত্মসাত করে। কিন্তু সে-সমাজে শ্রেণী ও শ্রেণীসংগ্রাম নেই, শ্রেণী সংগ্রাম চালিকা শক্তি নয়, জনগণ শিলীভূত পাথরের মত, সমাজ পরিবর্তনশীল নয়। মার্কসের নিজের তত্ত্বের সাথেই এ বিশ্লেষণ অসংগতিপূর্ণ। ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহারে মার্কস ও এঙ্গেলস লিখেছিলেন, ‘রাজনৈতিক মতা হল এক শ্রেণীর উপর অত্যাচার চালাবার জন্য অপর শ্রেণীর সংগঠিত শক্তি মাত্র।’৭৪ ভারতের স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি তাহলে এই শ্রেণী নিপীড়নের হাতিয়ার ছিল না? মার্কস লিখছেন, “দেশটা শুধু হিন্দু-মুসলমানেই বিভক্ত নয়, বিভক্ত উপজাতিতে, বর্ণাশ্রমে, জাতিভেদে।”৭৫ মার্কস জনগণের মধ্যকার বিভক্তিকে শুধু চিহ্নিত করছেন, কিন্তু শাসক ও শাসিতের কিংবা উদ্বৃত্ত-শোষণকারী ও শোষিতের, এভাবে শ্রেণীবিভেদের সম্ভাবনাও দেখছেন না। শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্য-এই ইতিবাচক দিকটাকে উত্থাপনও করছেন না।
মার্কস বলছেন, ‘ভারত সমাজের কোনো ইতিহাস নেই-অন্তত জানা কোন ইতিহাস। ভারতের ইতিহাস বলে যা বলি, সে শুধু একের পর এক বহিরাক্রমণকারীর ইতিহাস, যারা ঐ অপ্রতিরোধী ও অপরিবর্তমান সমাজের নিষ্ক্রিয় ভিত্তিতে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে গেছে।’৭৬ কোসাম্বি লিখেছেন, ‘মার্কসের এই উক্তিকে আমরা তর্কাতীতভাবে মেনে নিতে পারি না।…বাস্তবে ভারত ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় যুগগুলি-যেমন মৌর্য, শাতবাহন বা গুপ্ত যুগের সাথে বহিরাক্রমণের কোন সম্পর্ক ছিল না…এই যুগগুলিতে প্রকৃত গ্রাম সমাজের গঠন ও বিস্তৃতি বা নতুন বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির বিকাশ ঘটেছিল।’ ‘আদিবাসী ভারতের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে লাঙল-এর প্রচলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অগ্রগতি।’৭৭ ইরফান হাবিব উল্লেখ করেছেন হরপ্পা সভ্যতার কথা এবং বৌদ্ধধর্ম উত্থানের মুহূর্তে ‘নতুন যন্ত্রপাতি ও শ্রমসাশ্রয়ী কলাকৌশল, যেমন হাঁসকল লাগানো কাঁচি, কুড়াল, কাস্তে, ঘুরুন চাকি’ উদ্ভাবনের দৃষ্টান্ত। তিনি লিখেছেন, ১৩ এবং ১৪ শতকে প্রবর্তিত হয়, সমকোনী গিয়ার, ঘূর্ণায়মান চাকা, কাগজ শিল্প, ভূগর্ভস্থ কোষাগার নির্মাণ, বিটুমিন ও চুন সিমেন্টের ব্যবহার, লৌহনির্মিত ঘোড়ার খুর ইত্যাদি।৭৮ উৎপাদন শক্তির বিকাশে এগুলি ছিল বৈপ্লবিক অগ্রগতি। সুতরাং মার্কসের মতের বিপরীতে ভারতীয় সমাজের একটি বহমান ইতিহাস ছিল।
মার্কস লিখেছেন, ‘এমন একটা দেশ এমন একটা সমাজ কি বিজয়ের জন্য পূর্বনির্দিষ্ট শিকার হয়ে ছিল না।…ভারত বিজয়ের অধিকার ইংরেজদের ছিল কি না এটা তাই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন এই, আমরা কি চাই তুর্কী, পারশিক কি রুশদের দ্বারা ভারত বিজয়, নাকি ব্রিটনদের দ্বারা ভারত বিজয়?’৭৯ এটা ঠিক, মোগল সাম্রাজ্যের ভেঙে পড়ার প্রক্রিয়ায় ভারতবর্ষ এক চরম নৈরাজ্য ও ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। এ ছিল ইতিহাসের ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু একারণে ভারত ‘বিজয়ের জন্য পূর্বনির্দিষ্ট শিকার হয়ে ছিল’, এমন বলাটা সরলীকরণ। পলাশীর যুদ্ধের পরও একশ বছর লেগেছিল ইংরেজদের ভারত জয় করতে এবং সে জয় ছিল কষ্টার্জিত ও রক্তাক্ত। সেই জয়ের পরপরই তাদের ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের মুখোমুখী হতে হয়। মহাবিদ্রোহের একপর্যায়ে স্বয়ং মার্কস এর বিজয়ের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। সুতরাং ভারতবিজয় ও তা ধরে রাখাটা ইংরেজের জন্য তত সরল হয় নি, যাতে করে মার্কস যেভাবে বলেছেন সেভাবে বলা যায়। পলাশীর যুদ্ধেও ইংরেজদের পরাজয়ের সম্ভাবনা ছিল। ভারতবর্ষে ফরাসীদের সাথে ইংরেজদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ইউরোপে তখন উভয় শক্তির মধ্যে ‘সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ’ (১৮৫৬-৬৩) চলছিল। যে কোন একটি কারণে ইংরেজদের অবস্থা বিপর্যয়কর হতে পারতো। টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক মারাঠা-শক্তি ও নিজামের সহযোগিতা না পেলে ইংরেজদের কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হত। এছাড়াও ছিল আন্তর্জাতিক জটিলতাসমূহ। মার্কস যেভাবে বলেছেন, তাতে কারণ ও ফলাফলের সরলীকৃত নিমিত্তবাদ (ফবঃবৎসরহরংস) প্রতিফলিত হয়, ইতিহাস যে সর্বদাই আকস্মিকতা, অনিশ্চয়তা এবং একাধিক সম্ভাব্যতা ধারণ করে তা সামনে আসে না। এটাও অনস্বীকার্য যে, ইংরেজদের ভারত দখলের কোন অধিকার অবশ্যই ছিল না, এটা ঔপনিবেশিক দস্যুতা, ইতিহাসের নিকৃষ্টতম এক ঘটনা এবং ইংরেজদের দ্বারা ভারত দখলই সম্ভবত ভারতবর্ষের জন্য হয়েছে সবচেয়ে তিকারক ও ধ্বংসাত্মক।
একইভাবে, মার্কস যে লিখেছেন, ‘বৃটিশরাই প্রথম বিজয়ী যারা হিন্দু সভ্যতার চেয়ে উন্নত এবং সেহেতু অপ্রবেশ্য’৮০ তাও গ্রহণযোগ্য নয়। সভ্যতার বিভিন্ন ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে থাকে এবং সমস্ত সভ্যতাই পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ্য ও ক্রিয়াশীল। একই প্রবন্ধে ভারতে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মার্কস লিখেছেন, ‘স্বদেশে যা ভদ্ররূপ নেয় এবং উপনিবেশে গেলে যা নগ্ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে সেই বুর্জোয়া সভ্যতার প্রগাঢ় কপটতা এবং অঙ্গাঙ্গী বর্বরতা আমাদের সামনে অনাবৃত।’৮১ সুতরাং বুর্জোয়া সভ্যতার অসভ্যতা মার্কসের বক্তব্যেই ফুটে উঠছে।
ইংরেজের সাথে পূর্ববর্তী বহিরাক্রমণকারীদের পার্থক্য ছিল এই যে পূর্ববর্তীরা ছিল সামন্ততন্ত্রের প্রতিভূ এবং ইংরেজ ছিল বুর্জোয়া ব্যবস্থার প্রতিভূ; পূর্ববর্তীদের অধিকাংশ ভারতীয় বনে গিয়ে ভারতেই সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল, ভারতীয় সম্পদ নিজ দেশে পাচার করেনি, ইংরেজ ভারতীয় হয় নি এবং সমস্ত সম্পদ নিজ দেশে পাচার করেছে। ১৮৫৩ সালে মার্কস যখন এই প্রবন্ধ লিখছেন তখন ইংলন্ড আধুনিক উৎপাদনের দিক থেকে ও নিজস্ব সমাজব্যবস্থায় ভারত থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছিল, এটা ঠিক। কিন্তু ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের সময়, অর্থনীতি ও উৎপাদনের দিক থেকে ইংলন্ড তেমন এগিয়ে ছিল বলা যাবে না, যদিও ইতিপূর্বেই ইংলন্ডে বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্র কিছুটা বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ ইংলন্ডের অর্থনীতিকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বিশাল দেশ, বিশাল জনগোষ্ঠী, বিশাল নিজস্ব বাজার, জনসাধারণের উদ্যোগ সবমিলিয়ে ভারতের বুর্জোয়া বিকাশের প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনা যথেষ্টই ছিল।

বারো

মার্কসের গুরুত্বপূর্ণ উক্তি, “ইংলন্ড ভারতবর্ষে দ্বৈত কার্য সম্পাদন করবে; একটি ধ্বংসাত্মক, অন্যটি পুনর্জীবনমূলক-পুরাতন এশীয় সমাজের ধ্বংস এবং এশিয়ায় পাশ্চাত্য সমাজের বৈষয়িক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা’’৮২, অবশ্যই বিচার্য। এখানেও মার্কস এটা বলছেন না যে ব্রিটিশ সচেতনভাবে পুনরুর্জ্জীবনমূলক ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলতে চাইছেন, ব্রিটিশ পুঁজিবাদ না চাইলেও এমনটি করতে বাধ্য এবং এই বাধ্যবাধকতা পুঁজিবাদের সহজাত নিয়ম।
মার্কস যখন পুনর্জীবনের কথা বলছেন তখনও কিন্তু এর বাস্তব রূপায়ন তাঁর নিজের কাছেও সত্যিকার অর্থে দৃশ্যমান হয় নি। তখনও তা প্রধানত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। বলা যায় ভ্রূণাকারে তা তিনি দেখছেন। কারণ উপরোক্ত উক্তির পরপরই মার্কস লিখছেন,

দেশীয় গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে দিয়ে, দেশীয় শিল্পকে নির্মূল করে এবং দেশীয় সমাজে যা কিছু মহৎ ও সমুন্নত ছিল তা সমতল করে দিয়ে ব্রিটিশরা সে সভ্যতাকে চূর্ণ করেছে। তাদের ভারত শাসনের ইতিহাসের পাতাগুলো থেকে এই ধ্বংসের অতিরিক্ত কিছু পাওয়া যায় না বললেই চলে। স্তূপীকৃত ধ্বংসের মধ্য থেকে পুনর্জীবনের ক্রিয়া ল্যেই প্রায় পড়ে না।’ এরপর মার্কস যুক্ত করেছেন, “তবুও তা শুরু হয়ে গেছে।”৮৩ এর মাত্র দেড় মাস পূর্বে ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসন’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “ইংলন্ড ভারতীয় সমাজের সমগ্র কাঠামোটাই ভেঙে দিয়েছে। পুনর্গঠনের কোনো লণ এখনো অনুপস্থিত। পুরোনো জগতের অপহৃতি অথচ নতুন কোনো জগতের এই অপ্রাপ্তির ফলে হিন্দুদের বর্তমান দুর্দশার ওপর এক অদ্ভূত রকমের শোকের আবির্ভাব ঘটেছে।”৮৪

সুতরাং মার্কস দেখছেন পুনর্জীবনের কিছু শর্তমাত্র।

এই পুনর্জীবনের শর্ত হিসেবে মার্কস তুলে ধরেছেন, ‘ব্রিটিশ তরবারি দ্বারা আরোপিত’ ‘ভারতবষের্র, রাজনৈতিক ঐক্য’ যা ‘বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ দ্বারা দৃঢ় ও স্থায়ী হবে’; ‘ব্রিটিশ ড্রিল সার্জেন্টদের দ্বারা সংগঠিত ও প্রশিতি দেশীয় সৈন্যবাহিনী, যা ভারতের আত্মমুক্তির অপরিহার্য শর্ত’; ‘প্রধানত হিন্দু ও ইউরোপীয় সাধারণ সন্তানদের দ্বারা পরিচালিত এশীয় সমাজে প্রথম প্রবর্তিত স্বাধীন সংবাদপত্র’; ‘জমিদারী ও রায়তওয়ারী, জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার দুটি বিশেষ রূপ’; ‘কলকাতায় ইংরেজদের তত্ত্বাবধানে শিতি দেশীয় নতুন শ্রেণী, যারা সরকার পরিচালনায় যোগ্যতাসম্পন্ন ও ইউরোপীয় বিজ্ঞানে সুশিতি’; বাষ্পের মাধ্যমে ‘ইউরোপ ও ভারতের দ্রুত যোগাযোগ’ ইত্যাদি।৮৫ মার্কস আশা করেছিলেন, ‘রেলপথ হবে ভারতে সত্যিকার আধুনিক শিল্পের অগ্রদূত।’৮৬
ভারতে ব্রিটিশ যে এক স্বৈরতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, এই বোধ এখানে অনুপস্থিত। ব্রিটিশ যেন এখানে ইংলন্ডসদৃশ এক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করেছে, যেখানে থাকবে স্বাধীন সংবাদপত্র, আধুনিক বুর্জোয়া শিক্ষা, দেশরায় নিয়োজিত এক সেনাবাহিনী ইত্যাদি। মার্কস অবশ্য কোথাও বলেন নি ব্রিটিশ ভারতবর্ষে বুর্জোয়া গণতন্ত্র কায়েম করেছে। বরং তিনি বলেছেন, ইংরেজ ভারতে ‘ইউরোপীয় স্বৈরাচার’ পত্তন করেছে। কিন্তু এখানে তিনি সেই বিদেশী স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী বিপরীত ইতিবাচক সম্ভাবনাসমূহ তুলে ধরছেন।
মার্কস যেসব শর্তের কথা বলেছেন, তার কোনটিই বাস্তব রূপ লাভ করে নি। ‘ব্রিটিশ শাসনের সূচনা জাতীয় সংস্কৃতিসমূহকে পদদলিত করেছিল এবং তাদের তৈরী প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলোর জনগণকে জাতীয় বৈশিষ্ট্য অনুসারে ঐক্যবদ্ধ না করে বরং বিভক্ত করেছিল’৮৭ এবং ধর্ম-বর্ণ-ভাষা সর্বপ্রশ্নে জনসাধারণের মধ্যে বিভেদকে সম্প্রসারিত করেছিল। ‘জাতিসমূহ গড়ে ওঠার প শ্েবাসরোধকারী এই নীতির তিকারক ফল ছিল ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি।’৮৮ ব্রিটিশ শিাব্যবস্থা প্রধানত ঔপনিবেশিক দাসত্ববোধের চেতনা সম্পন্ন বা ঔপনিবেশিকতার অধীনে সংস্কারকামী এক শিতি সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিল। ব্রিটিশ স্বৈরাচার কখনোই ভারতে স্বাধীন সংবাদপত্রের বিকাশ হতে দেয়নি। ইউরোপীয় বা এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মালিকানাধীন সংবাদপত্র মূলত ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের স্বার্থেই সদাসর্বদা কাজ করেছে। জমিদারী ও রায়তওয়ারী ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি এবং সামন্তবাদের ঔপনিবেশিক সংস্করণ। ব্রিটিশসৃষ্ট দেশীয় যে সেনাবাহিনীকে মার্কস ‘ভারতীয় আত্মমুক্তির’ উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, অল্পকিছু ব্যতিক্রম বাদে তা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের স্বার্থেই সর্বদা ভারতীয় জনগণকে দমন করে রেখেছে এবং বিদেশের মাটিতে ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে লড়াই করেছে।
মার্কস লিখেছেন,

‘ইংরেজ মিলতন্ত্রীরা ভারতকে রেলপথ দিয়ে বিভূষিত করতে ইচ্ছুক…। কিন্তু যে দেশটায় লোহা আর কয়লা পাওয়া যায়, সে দেশের চলাচলে যদি একবার যন্ত্রের প্রবর্তন করা হয় তাহলে সে যন্ত্র তৈরীর ব্যবস্থা থেকে তাকে সরিয়ে রাখা অসম্ভব।… এই রেলপথই হবে ভারতে সত্যকার আধুনিক শিল্পের অগ্রদূত’৮৯ । তিনি লিখেছেন, ‘রেলব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত আধুনিক শিল্পের ফলে শ্রমের বংশানুক্রমিক যে ভাগাভাগির ওপর ভারতের বর্ণপ্রথার ভিত্তি, ভারতীয় প্রগতির ও ভারতীয় মতার সে চূড়ান্ত প্রতিবন্ধক ভেঙে পড়বে।’৯০

সুতরাং মার্কস ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার অধীনেই ভারতে একটা স্বাধীন পুঁজিবাদের বিকাশ আশা করেছিলেন।
মার্কসের এই বক্তব্যে রাজনৈতিক মতার প্রশ্নটি উপেতি হচ্ছে। ভারতীয় জনগণ যেখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার রাজনৈতিক শৃঙ্খলে বন্দী, সেখানে ঔপনিবেশিকতার অবসানের মধ্য দিয়েই কেবলমাত্র উৎপাদন শক্তিকে মুক্ত করা এবং নতুন জগতের বৈষয়িক ভিত্তি অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। দ্বিতীয়ত উৎপাদন শক্তির বিকাশ বলতে মার্কস বোঝাচ্ছেন শুধু শিল্পের বিকাশকে। কিন্তু উৎপাদন শক্তির প্রধান উপাদান মানুষ। সেই মানুষ যখন রাজনৈতিক শৃংখলে বন্দী, তখন রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটিই হয়ে দাঁড়ায় উৎপাদন শক্তি বিকাশের প্রথম শর্ত। শেষত, প্রশ্ন হল, কার স্বার্থে উৎপাদন শক্তির বিকাশ?
এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে, ব্রিটিশ শাসকেরাও ভারতে উৎপাদন শক্তির বিকাশ ঘটিয়েছিল এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন গড়ে তুলেছিল । তবে সে পুঁজিবাদ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের পরিপূরক পুঁজিবাদ। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের স্বার্থে যেমনটি প্রয়োজন তেমনি পুঁজিবাদ। একে ‘পুনর্জীবন’ নামে মোটেই অভিহিত করা যায় না। তাদের এই পুঁজিবাদ শুধু ভারতের স্বাভাবিক বুর্জোয়া বিকাশকে বাধাগ্রস্তই করেনি, একে বিকৃত পথে চালনা করেছিল। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে ভারতে যে পুঁজিবাদ বিকশিত হয়েছিল তাঁর সিংহভাগের মালিক ছিল ইংরেজ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যে ভারতীয় মালিকানাধীন বস্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল সেই পুঁজিবাদ ছিল ব্রিটিশ অনুগত মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠিত দালাল দেশীয় রাজন্যবর্গ, জমিদার শ্রেণী ও মুৎসুদ্দি বেনিয়া গোষ্ঠীর উত্তরাধিকার ছিল এই মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ এবং তাদের সাথেই ছিল গাঁটছড়ায় বাঁধা। এই পুঁজিবাদ বরং ভারতে স্বাধীন ও সত্যিকারের আধুনিক শিল্পব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে ছিল প্রতিবন্ধক। সাম্রাজ্যবাদের দালাল এই পুঁজিতন্ত্রের নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ। ব্রিটিশের যোগসাজসে এরা ভারতবর্ষকে খণ্ডিত করা সহ কি ধরনের সর্বনাশা পথে নিয়ে গিয়েছে তা আর আজ অজানা নয়। সুতরাং ব্রিটিশ শাসনে ভারতে পুনর্জীবন ঘটেনি। ভারতে ধ্বংসের বিনিময়ে পুনর্জীবন ঘটেছে গ্রেট ব্রিটেনে।

তের

প্রশ্ন হচ্ছে, চিন্তার কোন অবস্থান থেকে মার্কস তাঁর ‘পুনর্জীবন’-এর ধারণাকে তুলে ধরেছিলেন। তিনি কি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের উপর কোন ইতিবাচক বিশ্বাস থেকে শুরু করেছিলেন? তা যে নয়, সেটা মার্কসের লেখনী থেকেই স্পষ্ট। সামান্য অসতর্কতা বশতঃও তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প েএকটি অরও লেখেন নি। বরং ছত্রে ছত্রে ব্রিটিশ অপরাধসমূহের বিরুদ্ধে ধিক্কারের অভিব্যক্তি মূর্ত হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী এবং তাদের গণতন্ত্র বা পার্লামেন্টের প্রতি কোন মোহ তাঁর ছিল না।
‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন,

‘ইতিহাসে বুর্জোয়া যুগটার দায়িত্ব হল নতুন জগতের বৈষয়িক ভিত্তি সৃষ্টি করা।’৯১ ‘বৈষয়িক পূর্বশর্ত স্থাপনের কাজ ইংরেজ বুর্জোয়ারা না করেই পারবে না।’৯২ ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এ তিনি লিখেছিলেন, ‘সকল উৎপাদন যন্ত্রের দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে যোগাযোগের অতি সুবিধাজনক উপায় মারফত বুর্জোয়ারা সভ্যতায় টেনে আনছে সমস্ত এমনকি অসভ্যতম জাতিকেও।…সকল জাতিকে সে বাধ্য করে বুর্জোয়া উৎপাদন-পদ্ধতি গ্রহণে…বুর্জোয়া শ্রেণী নিজের ছাঁচে জগৎ গড়ে তোলে।’৯৩

তিনি ভেবেছিলেন, ব্রিটিশ পুঁজিবাদ ভারতবর্ষে উপরোক্ত ভূমিকা পালন করবে। আমরা দেখেছি, ঔপনিবেশিকতার বিশেষত্বকে এখানে বিবেচনায় আনা হয়নি। তবে এখানেও মার্কসের বক্তব্যে ব্রিটিশ ইতিহাসের সচেতন নয় বরং অচেতন হাতিয়ার। কারণ রেলপথ ভারতের সত্যিকার ‘আধুনিক শিল্পের অগ্রদূত’ হলেও তিনি সচেতন যে, ‘ইংরেজ মিলতন্ত্রীরা ভারতকে রেলপথে বিভূষিত করতে ইচ্ছুক শুধু এই ল্য নিয়ে যাতে তাদের কলকারখানার জন্যে কম দামে তুলা ও কাঁচামাল নিষ্কাশিত করা যায়।’৯৪ মার্কস পুঁজিবাদের আসল চরিত্রকেও ভোলেন নি। তিনি লিখেছেন, “তার বেশী কি বুর্জোয়ারা কখনো কিছু করেছে? রক্ত আর কাদা দুর্দশা ও দীনতার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিবর্গ ও জাতিকে টেনে না নিয়ে বুর্জোয়ারা কি কখনো কোনো অগ্রগতি ঘটিয়েছে?”৯৫
এটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, মার্কস যখন এসকল কথা বলছেন তখন বুর্জোয়া বিপ্লবের যুগ। সুতরাং যদি সে সময় ভারতবর্ষে বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেদের স্বাধীন বিকাশ ঘটাতে সম হতো, সেটা তারা করতো কৃষক ও হস্তশিল্পীদের উৎপাদনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে এবং তাদেরকে দুঃখ-দুর্দশার চরমে নিপ্তি করে। অথবা ভারতের এক বা একাধিক অংশে বুর্জোয়া বিকাশ মাথা তুলে দাঁড়াত অন্যান্য অংশকে লুন্ঠন, ধ্বংসলীলা ও দুর্দশার সমুদ্রে নিমজ্জিত করে। এরপরও তা হত প্রকৃত বিপ্লব তথা বুর্জোয়া বিপ্লব। ইংরেজ পুরোনো উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল ঠিকই, কিন্তু নতুন কোনো বিপ্লবী উপাদান দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপিত করেনি, বরং প্রগতির পথে বাধার প্রাচীর খাড়া করেছিল। এজন্য ইংরেজদের ধ্বংস বিপ্লব নয়।
সুতরাং তখনকার বাস্তবতায় জনগণের পুরোনো উৎপাদন শক্তির নির্মম ধ্বংস ও দুঃখ-দুর্দশার সীমাহীন সমাহার না ঘটিয়ে কোন বুর্জোয়া বিপ্লব ভারতবর্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ বুর্জোয়ারাই হত নেতৃত্বের শক্তি। মার্কস যখন পুরোনো সমাজের ধ্বংসযজ্ঞের অনিবার্যতাকে তুলে ধরছেন, এজন্য ‘ব্যক্তিগত অনুভূতির’৯৬ কাছে আত্মসমর্পণ না করে ‘ইতিহাসের দৃষ্টিভঙ্গি’৯৭ থেকে এই ধ্বংসের ঘটনাবলীকে দেখতে চাইছেন তখন তিনি ভুল করছেন না মোটেই। মার্কসের ভুল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের ধ্বংসের প্রকৃতিটাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত না-করা, এতটুকুই।
আজ একবিংশ শতাব্দীর চেতনার আলোকে নিজের আকাঙার সাথে মিলিয়ে কেউ যদি ১৮৫০ দশকের মার্কসের সম্ভাব্য অবস্থান খোঁজা শুরু করেন তা হবে সর্বাধুনিক এক কুসংস্কার এবং বাস্তববিচ্ছিন্ন যুক্তিবাদ। মার্কসকে বুঝতে হবে তখনকার বিশ্বপরিস্থিতির আলোকে। মার্কস ভুল করেছিলেন, এ প্রশ্নে সংশয় নেই। এ ভুল নিয়ে আরো বহু বহুগুণ কঠোর সমালোচনাতেও আপত্তি থাকার কথা নয়। আরো হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেখা যেতে পারে। অসংখ্য লেখা হয়েছে, হয়ত আরো লেখা হবে। কিন্তু এ বিষয়টাকে মনে রাখতে হবে যে, মার্কস চেষ্টা করেছিলেন ভারতের বিপ্লবের একটি দিশা তুলে ধরতে। এটা করতে গিয়েই তিনি ভুলটা করেছিলেন। কিন্তু মূল বিপ্লবী দিশা তিনি ঠিকই চিহ্নিত করেছিলেন।
তিনি উপসংহার টেনেছিলেন, বৈষয়িক শর্তের বিকাশ ঘটলেই ভারতের মুক্তি অর্জিত হবে না, তা অর্জিত হতে পারে একমাত্র ইংরেজ শাসনের বৈপ্লবিক উচ্ছেদে। তিনি লিখেছেন,

ইংরেজ বুর্জোয়ারা হয়ত বা বাধ্য হয়ে যা কিছু করুক তাতে ব্যাপক জনগণের মুক্তি অথবা সামাজিক অবস্থার বাস্তব সংশোধন ঘটবে না-এগুলি শুধু উৎপাদনী শক্তির বিকাশের ওপরেই নয়, জনগণ কর্তৃক তাদের স্বত্ব গ্রহণের ওপরেও নির্ভরশীল।…খাস গ্রেট ব্রিটেনেই যতদিন শিল্পকারখানার প্রলেতারিয়েত কর্তৃক বর্তমান শাসকশ্রেণী স্থানচ্যুত না হচ্ছে অথবা হিন্দুরা নিজেরাই ইংরেজের জোয়াল একেবারে ঝেড়ে ফেলার মত যথেষ্ট শক্তিশালী যতদিন না হচ্ছে, ততদিন ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ বুর্জোয়া কর্তৃক ছড়িয়ে দেওয়া এই সব নতুন উপাদানের ফল ভারতীয়রা পাবে না।৯৮

সুতরাং মার্কস বলছেন সত্যিকার মুক্তির জন্য ভারত থেকে ইংরেজের জোয়াল একেবারে ঝেড়ে ফেলতে হবে। কারা একেবারে ঝেড়ে ফেলবে? এখানে মার্কস সুস্পষ্টভাবে বলছেন, ভারতীয় জনগণের নিজেদেরকেই ঝেড়ে ফেলতে হবে ব্রিটিশ দাসত্বের জোয়াল। মার্কস-বর্ণিত এই ইংরেজের জোয়াল ঝেড়ে ফেলার সারবস্তু বিপ্লবী, কেননা এর সাথে তিনি যুক্ত করছেন এই বক্তব্য যে, ভারতের জনগণকে উৎপাদন শক্তির স্বত্ব তথা কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে, গ্রেট ব্রিটেনে শ্রমিক শ্রেণী মতা দখল করলে ভারত ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবে, কারণ শ্রমিক শ্রেণী পরদেশ দখলে রাখতে পারে না। এই হচ্ছে মার্কসের আন্তর্জাতিকতাবাদ।
এটা মার্কস বলছেন ১৮৫৩ সালে। ভারতবর্ষের তিলক, গান্ধী, নেহেরু, জিন্নাহ বা ভারতকে প্রতিনিধিত্বকারী অন্যধরনের ব্যক্তিত্ব বিবেকানন্দ কিংবা রবীন্দ্রনাথ কেউই ব্রিটিশ শাসনের জোয়ালটাকে এঁকেবারে ছুঁড়ে ফেলার মত সিদ্ধান্তে কখনো আসতে পারেন নি। সে সময় ইংলন্ডই মার্কসের আশ্রয়। জার্মান ও ফ্রান্স থেকে তিনি বহিষ্কৃত। ডেনমার্ক বা বেলজিয়ামের দরজা তাঁর জন্য বন্ধ। মার্কস পরবর্তীতে ইংলন্ডের শাসনের জোয়াল থেকে আয়ার্ল্যান্ডের মুক্তির অপরিহার্যতাকেও সামনে নিয়ে এসেছিলেন। এ বিষয়ে লেনিনের একটি উক্তি খুবই চমৎকার; ‘সর্বদাই আমাদের আদর্শ হলেন মার্কস, যিনি বহু বছর ইংলন্ডে বাস করে আধা-ইংরেজ হয়েও, ইংরেজ শ্রমিকদের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বার্থেই দাবি করেছিলেন আয়ার্ল্যান্ডের মুক্তি ও জাতীয় স্বাধীনতা।’৯৯ তাই মার্কস ‘প্রাচ্যবাদী’, ‘ইউরোপীয়’ বা ‘প্রাচ্যের ভাষা জানতেন না’-এইসব অভিযোগ অসার প্রতিপন্ন হতে বাধ্য।

চৌদ্দ

পরবর্তীকালে মার্কস বাস্তব পরিস্থিতির বিকাশের সাথে সাথে নিজ মতামতকে অনেক প্রশ্নে বিকশিত ও পরিবর্তিত করেন। ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত পুঁজি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে তিনি লিখেছেন,

অন্যান্য দেশের হস্তশিল্পের উৎপাদনকে ধ্বংস করার মাধ্যমে যন্ত্রশিল্প ঐসব দেশগুলোকে বলপূর্বক তার কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিণত করে। এইভাবে ভারতকে গ্রেটব্রিটেনের জন্য তুলো, পশম, শন, পাট ও নীল উৎপাদন করতে বাধ্য করা হয়েছিল।১০০

মার্কসের শব্দচয়ন লণীয়। তিনি লিখেছেন, ‘বলপূর্বক’ এবং ‘বাধ্য করা হয়েছিল’। অর্থাৎ পুঁজিবাদী দেশের রাষ্ট্রমতার প্রয়োগকে এখানে স্পষ্ট করেছেন মার্কস। মার্কস পরিসংখ্যানের সাহায্যে দেখিয়েছেন, ভারত থেকে গ্রেট ব্রিটেনে তুলা রপ্তানী ১৮৪৬ সালে ছিল প্রায় সাড়ে তিন কোটি পাউন্ড, ১৮৬০ সালে প্রায় সাড়ে বিশ কোটি পাউন্ড এবং ১৮৬৫ সালে সাড়ে চুয়াল্লিশ কোটি পাউন্ডেরও বেশী। তিনি ভারত থেকে পশম রপ্তানীর বিপুল বৃদ্ধি সম্পর্কেও হিসাব উপস্থিত করেছেন।১০১ এরপরই তিনি টেনেছেন গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার;

আধুনিক শিল্পের প্রধান প্রধান কেন্দ্রের প্রয়োজনের উপযোগী একটি নতুন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজন উদ্ভূত হয়, এবং তা প্রধানত শিল্প ত্রেরূপে বিরাজমান অংশটিকে সরবরাহের জন্য পৃথিবীর আর একটি অংশকে প্রধানত কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিণত করে।১০২

সুতরাং ভারতে আধুনিক শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে মার্কস আর তুলে ধরছেন না। বরং তিনি বলছেন, পৃথিবীকে পুঁজিবাদ দুটি অংশে ভাগ করে ফেলছে, একাংশ শিল্পোন্নত দেশ এবং অপর অংশ তাদের সরবরাহের জন্য কৃষিপ্রধান দেশ। পুঁজিবাদ যে বিশ্বকে অল্পসংখ্যক উন্নত ও বিপুলসংখ্যক অনুন্নত দেশে ভাগ করে ফেলে, তাই বলছেন মার্কস।
পুঁজি গ্রন্থেই মার্কস প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, “অবাধ প্রতিযোগিতা থেকে জন্ম নেয় উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন, বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এই কেন্দ্রীভবন পৌঁছায় একচেটিয়ায়।”১০৩ স্বাভাবিকভাবেই এই পুঁজিবাদ একচেটিয়া রূপ পরিগ্রহ করেছিল ইংলন্ডসহ পাশ্চাত্যের কয়েকটি উন্নত পুঁজিবাদী দেশে। ফলে মার্কস সহজেই ভারতের মত ঔপনিবেশিক দেশে ব্রিটিশ শাসনাধীনে পুঁজিবাদের স্বাধীন বিকাশের ধারণা আর তুলে ধরেন নি। বরং যে রেলওয়ের বিস্তারকে তিনি ভারতের ভবিষ্যৎ শিল্প বিকাশের কারণ হিসেবে চিন্তা করেছিলেন, বাস্তব ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ পরবর্তীতে তাঁকে ভিন্নধর্মী উপসংহারে উপনীত করেছিল। ১৮৭৯ সালে দানিয়েলসনের কাছে এক পত্রে মার্কস লিখেছিলেন,

সাধারণভাবে রেলওয়ে বিদেশী বাণিজ্যে বিপুল গতিবেগ সঞ্চার করেছে, কিন্তু এই বাণিজ্য যেসব দেশ প্রধানভাবে ‘কাঁচামাল’ রপ্তানী করে সেখানকার জনগণের দুর্দশাকে বাড়িয়ে তুলেছে।১০৪

ঐ একই ব্যক্তির কাছে লিখিত ১৮৮১ সালের এক পত্রে মার্কস লিখেছিলেন,

‘প্রতি বছর খাজনা আকারে, হিন্দুদের জন্য নিষ্ফল যে রেলওয়ে তার লভ্যাংশ হিসেবে, সামরিক ও সিভিল সার্ভিসে কর্মরতদের পেনসন, আফগানিস্থান ও অন্যান্য যুদ্ধ, ইত্যাদি ইত্যাদি বাবদ তারা যা বিনা প্রতিদানে ফি বছর নিয়ে যায় এবং ভারতের অভ্যন্তরে তারা নিজেরা যা প্রতি বছর আত্মসাত করে, এসবকিছু বাদ দিয়ে, ভারতীয়দের প্রত্যেক বছর যে পরিমাণ মূল্যের পণ্য বিনামূল্যে ইংলন্ডে পাঠাতে হয়, তা ভারতের ছয় কোটি কৃষি ও শিল্পে নিয়োজিত শ্রমজীবীদের মোট আয়ের চেয়ে বেশী। এ হল প্রতিহিংসাপ্রসূত এক রক্তরণের প্রক্রিয়া। দুর্ভিরে বছরগুলো গাদাগাদি করে রয়েছে এবং তার যা ব্যপ্তি তা ইউরোপে এখন পর্যন্ত অবিশ্বাস্য।’১০৫

সুতরাং যে রেলওয়েকে মার্কস ১৮৫৩ সালে ‘ভারতবর্ষে আধুনিক শিল্পের অগ্রদূত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, প্রায় ত্রিশ বছর পর তিনিই বলছেন রেলওয়ে হিন্দুদের জন্য নিষ্ফল প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের অধীনে ভারতবর্ষের কোন ‘পুনর্জীবন’ ঘটে নি। বরং চলছে রক্তরণের প্রক্রিয়া। ব্রিটেন, অন্যান্য অসংখ্য লুন্ঠন বাদেও, ভারতবর্ষের এক চতুর্থাংশ লোকের আয়ের সমমানের সম্পদ বিনা পয়সায় লুটে নিয়ে যাচ্ছে।
১৮৮২ সালে এঙ্গেলস কাউটস্কির কাছে যে পত্রটি লিখেছিলেন এবং যাকে লেনিন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তাও এ  ক্ষেত্রে উল্লেখ্য,

স্থানীয় অধিবাসীরাই বসবাস করে এমন সব দখলকৃত দেশ-ভারতবর্ষ, আলজেরিয়া, ওলন্দাজ, পর্তুগীজ ও স্পেনীয় অধিকৃত দেশগুলো-এদের ভার সাময়িকভাবে প্রলেতারিয়েতকে নিতে হবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। এ প্রক্রিয়া ঠিক কিভাবে বিকাশ পাবে তা বলাটা কঠিন। ভারতবর্ষ হয়ত, প্রকৃতপইে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, বিপ্লব করবে এবং নিজের মুক্তির প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত শ্রেণী হিসেবে প্রলেতারিয়েত শ্রেণী যেহেতু কোন ঔপনিবেশিক যুদ্ধ করতে পারে না, তাই সেই বিপ্লবকে তার নিজ পথে চলতে দিতে হবে। সব ধরনের ধ্বংস ছাড়া তা এগোবে না।…একই ঘটনা ঘটতে পারে যেমন আলজিরিয়া ও মিসরে। সেটাই হবে নিশ্চিতভাবে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভাল জিনিষ।১০৬

মার্কস ও এঙ্গেলস তখন ইউরোপে সর্বহারা বিপ্লব আশা করছিলেন। সুতরাং ইউরোপে যদি প্রলেতারীয় বিপ্লব জয়লাভ করে তবে তার আশু কর্তব্য হবে পরাধীন দেশসমূহের মুক্তি। এটাই মার্কস-এঙ্গেলস প্রদর্শিত শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদ। এঙ্গেলস ভারতে আশু বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখছেন। ভারতীয় জনগণ যদি সেই বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে ইউরোপীয় প্রলেতারিয়েতের দায়িত্ব হবে সেই বিপ্লবকে নিজ পথে চলতে দেওয়া, কারণ প্রলেতারিয়েত উপনিবেশ রার যুদ্ধ করতে পারে না। সুতরাং উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামকে এঙ্গেলস বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করছেন এবং ইউরোপীয় প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদী কর্তব্যকে তুলে ধরছেন। এঙ্গেলস আলজেরিয়া ও মিসরেও একই ধরনের ঔপনিবেশিকতা বিরোধী জাতীয় মুক্তির বিপ্লব প্রত্যাশা করছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে এর প েদাঁড়াচ্ছেন এবং বলছেন যে, নিপীড়িত দেশের এই জাতীয় মুক্তির বিপ্লব হবে ইউরোপের প্রলেতারীয় বিপ্লবের সহায়ক। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিপ্লবকে অভিন্ন সূত্রে গ্রথিত করছেন এঙ্গেলস।
এভাবেই মার্কস ও এঙ্গেলস আন্তর্জাতিকতাবাদী অবস্থান থেকে ঔপনিবেশিকতার সমস্যাকে হাতে তুলে নিয়েছিলেন। ‘কোনো জাতি মুক্ত হতে পারে না, যদি সে অন্য জাতিকে উৎপীড়ন করে, বলেছেন উনিশ শতকের সুসঙ্গত গণতন্ত্রের প্রতিনিধি মার্কস ও এঙ্গেলস।’১০৭ এই মূল শিাই পরবর্তীতে রুশ ও চীনসহ অন্যান্য দেশের বিপ্লবের অভিজ্ঞতায় তাঁদের উত্তরসূরীদের মাধ্যমে আরো পূর্ণতা পেয়েছে।
১৮৫৩ সালে ভারত সংক্রান্ত তাঁর সর্বশেষ প্রবন্ধে মার্কস লিখেছিলেন,

বুর্জোয়া যুগের ফলাফল, বিশ্বের বাজার এবং আধুনিক উৎপাদনী শক্তিকে যখন এক মহান সামাজিক বিপ্লব আত্মস্থ করে নেবে…তখনই মানব-প্রগতিকে সেই বিকটাকৃতি আদিম দেবমূর্তির মত দেখাবে না, যে নিহতের মাথার খুলিতে ছাড়া সুধা পান করে না।১০৮

মার্কসের এই কথার সত্যতা আজও অম্লান। বিশ শতক ছিল মার্কস-প্রত্যাশিত সামাজিক বিপ্লবের প্রথম সূত্রপাত। পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ মানুষ সেই আলোকে উদ্ভাসিত হয়েছিল। তবে তা ছিল প্রথম প্রহরের অভিজ্ঞতা। একুশ শতকে নিশ্চিতভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিপ্লব আরো তাৎপর্যতাপূর্ণ ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করবে।

পনের

সবশেষে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ সম্পর্কে দু’একটা কথা বলা যেতে পারে। এই বিদ্রোহ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন ঘটনা। পুঁজিবাদী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এ ছিল এক সশস্ত্র গণ-বিদ্রোহ, যদিও তা সিপাহী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। মার্কস ও এঙ্গেলসের জন্যও তা ছিল নতুনতর ঘটনা। তখনকার অনুন্নত যোগাযোগের দুনিয়াতেও কয়েকহাজার মাইল দূর থেকে মার্কস ও এঙ্গেলস যে নিষ্ঠা, প্রয়াস ও একাগ্রতার সাথে এই বিদ্রোহকে বিশ্লেষণ ও পর্যবেণ করেছিলেন, তাতে আশ্চর্যই হতে হয়। বিদ্রোহের বহু খুঁটিনাটি ঘটনাই শুধু নয়, তখনকার দুর্গম ভারতবর্ষের পথঘাট, নদনদী, বিভিন্ন স্থানের দূরত্ব, ভারতের বিভিন্ন শ্রেণী, জনগণ ও ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা সম্পর্কে এত পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তাঁরা জেনেছিলেন, যা বিস্ময়কর। বাস্তব তথ্যাবলীকে তুলে ধরে পাশ্চাত্য বিশ্বে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, এই বিদ্রোহটি নিছক সিপাহী বিদ্রোহ নয়, যেমনটা তখন ইউরোপে বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী প্রচার করতো। তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন এটি এক ‘জাতীয় বিদ্রোহ’, তথা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের কারণ যে ব্রিটিশ নিপীড়ন ও লুন্ঠন এবং এই বিদ্রোহ যে ন্যায়সঙ্গত, তাও তাঁরা তুলে ধরেছিলেন। সামরিক ত্রেসহ বিভিন্ন প্রশ্নে তাঁরা ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর মিথ্যা প্রচারের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। বিদ্রোহের একপর্যায়ে তাঁরা বিদ্রোহীদের বিজয়ের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। মনে রাখতে হবে, তখন তাঁরা লন্ডনে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের শোষণ-লুন্ঠন-নিপীড়ন যা বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছিল তা উন্মোচন করাটা ছিল জরুরী। জরুরী ছিল ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর মিথ্যার মুখোশকে ছিঁড়ে ফেলা। জরুরী ছিল বিদ্রোহের ন্যায্যতাকে তুলে ধরা। এই কাজগুলিই তাঁরা করেছিলেন। বিদ্রোহকে তাঁরা বিপ্লবী সংগ্রাম হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতের ইতিহাসের কালপঞ্জীতে মার্কস মীরজাফরকে বিশ্বাসঘাতক এবং ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহে ইংরেজদের পাবলম্বনকারী মারাঠা-নায়ক সিন্ধিয়া এবং নেপালের রাজাকে ইংরেজের কুকুর হিসেবে অভিহিত করে তাদের প্রতি ঘৃণা ও ধিক্কার প্রকাশ করেছিলেন। মার্কসের অবস্থান ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এবং ভারতের জনগণের পে।
এেত্ের উল্লেখ্য, মার্কস ১৮৫৭এর মহাবিদ্রোহের অভিজ্ঞতায় তাঁর ভারতসংক্রান্ত ১৮৫৩-এর ধারণাকে বিকশিত করেছিলেন, ১৮৫৩-এর ধারণার ভিত্তিতে ১৮৫৭কে বিশ্লেষণ করেন নি। আর একারণেই ১৮৫৭-৫৮-এর প্রবন্ধগুলিতে আমরা ব্রিটিশের ‘পুনর্জীবনকারী’ ভূমিকার কোন উল্লেখ আর পাই না।
তবে ১৮৫৭-৫৮ সালের মহাবিদ্রোহ প্রসঙ্গে মার্কস ও এঙ্গেলসের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান আলোচনার জন্য একটি পৃথক আলোচনা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের হাতেই আপাতত তাকে সঁপে দিতে হবে।

তথ্যসূত্র ঃ

১. মার্কস এঙ্গেলস, রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড দ্বিতীয় অংশ, অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে গ্রন্থের ভূমিকা, পৃ ২৭-২৮
২. ঐ, পৃ ২৩
৩. ওৎভধহ ঐধনরন, ঊংংধুং রহ ওহফরধহ ঐরংঃড়ৎু, ঘব িউবষযর, ২০০২, ঢ় ১৫
৪. জ. চ. উঁঃঃ. ওহফরধ ঞড়ফধু, ঈধষপঁঃঃধ ১৯৭৯, ঢ় ৮৩
৫. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, মস্কো, ১৯৭১ পৃ ২৯
৬-৭. ঐ, পৃ ৩২
৮. গধৎী ঊহমষবং : ঞযব ঋরৎংঃ ডধৎ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব ১৮৫৭-১৮৫৯, ্তুঞযব ঊধংঃ ওহফরধ ঈড়সঢ়ধহু ু ওঃং ঐরংঃড়ৎু ধহফ জবংঁষঃ,্থ গড়ংপড়,ি ১৯৮৮, ঢ় ২১
৯. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৫৩
১০. গধৎী ঊহমষবং : ঞযব ঋরৎংঃ ডধৎ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব ১৮৫৭-১৮৫৯, ঢ় ২১
১১. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৫৫
১২. ঐ, পৃ ৩১২-১৩
১৩. কধৎষ গধৎী, ঈধঢ়রঃধষ, াড়ষ ১, গড়ংপড়,ি ১৯৮৪, ঢ় ৭০৩
১৪-১৫. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৫৪
১৬. ঐ, পৃ ৫৭
১৭-১৮. ঐ, পৃ ৫৫
১৯-২০. ঐ, পৃ ৪০
২১. জ. চ. উঁঃঃ. প্রাগুক্ত, ঢ় ৯০
২২. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৩৯
২৩-২৪. ঐ, পৃ ৮৩
২৫. ঐ, পৃ ৮১-৮২
২৬. ঐ, পৃ ৮১
২৭. ঐ, পৃ ৩২
২৮. ঐ, পৃ ৮২
২৯. ঐ, পৃ ৮২-৮৩
৩০. ঐ, পৃ ৮৩
৩১-৩২. ঐ, পৃ ৮৪
৩৩-৩৪. ঐ, পৃ ৭৫
৩৫. ঐ, পৃ ৭৫-৭৬
৩৬. ঐ, ৭৬-৭৭
৩৭. ঐ, পৃ ৭৬
৩৮. গধৎী ঊহমষবং, ঞযব ঋরৎংঃ ওহফরধহ ডধৎ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব, ১৮৫৭-৫৯, ঢ় ১৬৯
৩৯. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৩৭
৪০-৪১. ঐ, পৃ ৩৯
৪২. ঐ, পৃ ৪১
৪৩. গধৎী, ঈধঢ়রঃধষ াড়ষ. ওওও, গড়ংপড়,ি ১৯৬৬, ঢ় ৩৩৩-৪
৪৪. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৪১-৪২
৪৫. ঐ, পৃ ৪৩
৪৬-৪৮. ঐ, পৃ ৪২
৪৯. ঐ, পৃ ৩৩৩
৫০. ঐ, পৃ ২২
৫১. গধৎী, ঈধঢ়রঃধষ, াড়ষ. ওওও, ঢ় ৩৩৩
৫২. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৪১
৫৩. ওৎভধহ ঐধনরন, ঊংংধুং রহ ওহফরধহ ঐরংঃড়ৎু, ঘব িউবষযর, ২০০২, ঢ় ১৭২
৫৪-৫৫. ঐ, ঢ় ১৭৩
৫৬. ঝঁহরঃু কঁসধৎ এযড়ংয, ঞযব ওহফরধহ ইরম ইড়ঁৎমবড়রংরব, ঈধষপঁঃঃধ, ২০০০, ঢ় ৮০
৫৭. ওৎভধহ ঐধনরন, প্রাগুক্ত, ঢ় ৩৪
৫৮. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৪০
৫৯. ওৎভধহ ঐধনরন, ঢ় ২৩৭
৬০. ঝঁহরঃু কঁসধৎ এযড়ংয, প্রাগুক্ত, ঢ় ৭৭; গড়ৎবষধহফ, ঋৎড়স অশনধৎ ঃড় অঁৎড়হমড়লবন থেকে উদ্ধৃত
৬১. ওৎভধহ ঐধনরন, প্রাগুক্ত, ঢ় ২৪১
৬২. ঝঁহরঃু কঁসধৎ এযড়ংয, প্রাগুক্ত, ঢ় ৭৭
৬৩-৬৪. ঐ, ঢ় ৭৮
৬৫. গৌতম ভদ্র, মুঘল যুগে কৃষি-অর্থনীতি ও কৃষক বিদ্রোহ, কলকাতা, ১৯৯১
৬৬. ঝঁহরঃু কঁসধৎ এযড়ংয, প্রাগুক্ত, ঢ় ৭৯
৬৭. ওৎভধহ ঐধনরন, প্রাগুক্ত, ঢ় ২৩৯
৬৮. গৌতম ভদ্র, প্রাগুক্ত, পৃ ১৬৭ ও ১৭১
৬৯. ওৎভধহ ঐধনরন, প্রাগুক্ত, ঢ় ২৫৪
৭০. ঝঁহরঃু কঁসধৎ এযড়ংয, প্রাগুক্ত, ঢ় ৮১
৭১. ঐ, ঢ় ৮৩
৭২. মার্কস এঙ্গেলস রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড, প্রথম অংশ, মস্কো, পৃ ৬০
৭৩. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৮৫
৭৪. মার্কস এঙ্গেলস, রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড প্রথম অংশ, মস্কো, পৃ ৪৬
৭৫-৭৬. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৮৫
৭৭. দমোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি, ভারত-ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, কলকাতা ২০০২, পৃ ৯
৭৮. ওৎভধহ ঐধনরন, ঢ় ১৬৬, ১৭৩
৭৯-৮০. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৮৬
৮১. ঐ, পৃ ৯১
৮২-৮৩. ঐ, পৃ ৮৬
৮৪. ঐ, পৃ ৩৮
৮৫. ঐ, পৃ ৮৬-৮৭
৮৬. ঐ, পৃ ৮৯
৮৭. ঝঁহরঃু কঁসধৎ এযড়ংয, ঢ় ৮১
৮৮. ঐ, ঢ় ৮২
৮৯. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৮৯
৯০. ঐ, পৃ ৯০
৯১. ঐ, পৃ ৯১
৯২. ঐ, পৃ ৯০
৯৩. মার্কস এঙ্গেলস, রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড প্রথম অংশ, মস্কো, পৃ ৩০
৯৪. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৮৯
৯৫. ঐ, পৃ ৯০
৯৬-৯৭. ঐ, পৃ ৪৩
৯৮. ঐ, পৃ ৯০
৯৯. লেনিন, নির্বাচিত রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, মস্কো ১৯৭৯, পৃ ২০
১০০-০২. গধৎী, ঈধঢ়রঃধষ, াড়ষ ১, গড়ংপড় ি১৯৮৪, ঢ় ৪২৪
১০৩. লেনিন, নির্বাচিত রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, মস্কো ১৯৭৯, পৃ ৪১
১০৪. দানিয়েলসনকে লেখা মার্কস-এর পত্র, ১৮৭৯
১০৫. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৩৬১ দানিয়েলসনকে লেখা মার্কস-এর পত্র, ১৮৮১
১০৬. খবহরহ, গধৎী ঊহমষবং গধৎীরংস, গড়ংপড়,ি ১৯৭৯, ঢ় ২৯৫
১০৭. মার্কস এঙ্গেলসের বক্তব্য লেনিন কর্তৃক উদ্ধৃত, খবহরহ, ঈড়ষষবপঃবফ ডড়ৎশং, াড়ষ. ২১, ্তুঙহ ঃযব ঘধঃরড়হধষ চৎরফব ড়ভ ঃযব এৎবধঃ জঁংংরধহং্থ প্রবন্ধে
১০৮. মার্কস এঙ্গেলস, উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃ ৯২

Advertisements

২০১৪ সালে ভারতে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা ১২০০০ এর বেশি

433712-rna-farmer-suicide

২০১৪ সালে ভারতের কৃষি ক্ষেত্রে ১২৩৬০জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ৫৬৫০জন কৃষক আর ৬৭১০ জন ক্ষেত মজুর। রাজ্যসভায় এই তথ্য পেশ করেছেন কৃষিমন্ত্রী রাধা মোহন সিং। মহারাষ্ট্রের পর পাঞ্জাবেই সব থেকে বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। বিরোধীরা দাবি করেছেন এই সরকারি তথ্য আংশিক। কম করে দেখান হয়েছে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা। অভিযোগটা ফেলে দেওয়ার মত নয়। কারণ এরাজ্যে যখনই কৃষক আত্মহত্যা করেন তখনই রাজ্য সরকার বলতে শুরু করে ওটা চাষের কারণে নয়, পারিবারিক বা অন্য কোন কারণেই নাকি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।


ভারতের গণযুদ্ধের সংবাদ- ০৮/০৪/২০১৬ তারিখের

ভারতের গণযুদ্ধের সংবাদ- ০৮/০৪/২০১৬ তারিখের

nax080420161460100814_storyimage

  • লাখীশারাইয়ে পুলিশী হেফাজতে রাজবন্দীকে হত্যা করা হয়েছে।

  • ছত্তিসগড়ে মাওবাদী অধ্যুষিত বিজাপুর জেলার পামেড থানার ঘন জঙ্গলে একটি হেলিপ্যাডের উপর মোতায়েন করা জওয়ানদের লক্ষ্য করে মাওবাদীদের একটি দলের অতর্কিত হামলায় একজন জওয়ান নিহত ও অন্য একজন আহত হয়েছে।

naxal01

  • মধ্যপ্রদেশের বালাঘাটে আদিবাসীদের টেণ্ডূ পাতা তোলার বিষয়ে মাওবাদীরা আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে চাইছে। গত বৃহস্পতিবার বালাঘাটে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ হওয়া এই এলাকায় মাওবাদীদের নতুন নিয়োগ পাওয়া দলটি টেণ্ডূ পাতা তোলার কাজ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এই এলাকায় এসেছিল বলে পুলিশ ধারণা করছে। ২০১২ সালের ২৪শে মে এই এলাকায় ২ মাওবাদীকে হত্যা করেছিল পুলিশ, ৪ বছর পর ঠিক একই এলাকায় মাওবাদীরা আবার তাদের কার্যক্রম প্রসার করছে।

  • বৃহস্পতিবার স্থানীয় এক আদালত, গত বছর কোয়েম্বাটুর জেলার কাড়ূমাথামপাত্তি’র একটি বেকারি থেকে গ্রেফতার হওয়া সন্দেহভাজন মাওবাদী নেতা রূপেশ, তার স্ত্রী সাইনা,  তাদের তিন সহযোগী ভিরামনি, কাণ্ণান এবং অনুপ ম্যাথিউ জর্জ এর বিচারিক হেফাজত ২৭শে এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

অনুবাদ সূত্রঃ 

http://timesofindia.indiatimes.com/city/coimbatore/Judicial-custody-of-5-Maoists-extended/articleshow/51736117.cms

http://www.hindustantimes.com/bhopal/mp-maoists-in-balaghat-wanted-to-influence-tendu-leaf-plucking/story-coNc9C5lKZuCQJP3EUSxsJ.html

http://www.thehindu.com/news/national/other-states/jawan-killed-another-hurt-in-naxal-attack-in-bijapur/article8451976.ece

http://www.livehindustan.com/news/bihar/article1-naxal-killed-in-police-custody-524859.html


ব্রাজিলঃ ভারতের গণযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি

ব্রাজিলঃ অপারেশন গ্রীন হান্টর বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের গণযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি সপ্তাহ

1451939_806182666193066_3261861565161061422_n


‘নেপালকে ভাঙার চেষ্টা করছে ভারত’

প্রচণ্ড

প্রচণ্ড

নেপালের উপ প্রধানমন্ত্রী চন্দ্র প্রকাশ মাইনালি অভিযোগ করেছেন, ভারত তার দেশকে ভাঙার চেষ্টা করছে। তিনি দাবি করেন, তেরাই অঞ্চলকে নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের সঙ্গে একীভূত করতে চাইছে নয়াদিল্লি। রাজধানী কাঠমান্ডুতে আজ (শনিবার) এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তিনি।

চন্দ্র প্রকাশ দাবি করেন,  ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাদেশি জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে অবরোধ সৃষ্টি ভারতের এ ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ভারতের এ ধরনের তৎপরতা দু দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অনুকূল হবে না।

এদিকে, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা ইউসিপিএন (মাওবাদী) চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছেন, অঘোষিত অবরোধ দিয়ে ভারত যে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে তা মোকাবেলা করবে নেপালের জনগণ। তিনিও এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেছেন।

প্রচন্ড নামে পরিচিত নেপালের সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমঝোতার মধ্য দিয়ে ভারত-নেপাল সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় দেশটির মানুষ। কিন্তু ভারত যদি আধিপত্য বিস্তার করতে চায় তবে নেপালের মানুষ সে নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, নিজেদের সংবিধান গ্রহণ করে নেপালের মানুষ কোনো অপরাধ করে নি।

সূত্রঃ http://bangla.irib.ir/2010-04-21-08-29-09/2010-04-21-08-29-54/item/78983-%E2%80%98%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E2%80%99


ভারতঃ আত্মহত্যায় কৃষকদের থেকে এগিয়ে গৃহবধূদের লাশের মিছিল

image_232969.deth-1

নয়াদিল্লি: আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কৃষকদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে গৃহবধূদের লাশের মিছিল৷ কৃষকদের তুলনায় প্রায় চারগুণ আত্মহত্যা করতে দেখা গিয়েছে গৃহবধূদের৷ ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর সমীক্ষা এমনটাই জানাচ্ছে৷

 এই সমীক্ষা রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, গত বছর ২০হাজার ১৪৮ জন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে৷ সেখানে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যাটি হল ৫৬৫০৷ কৃষক আত্মহত্যার কারণে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে ৷ অন্যদিকে গৃহবধূদের আত্মহত্যার পিছনে রয়েছে পণ, মানসিক অবসাদ, দাম্পত্য কলহ, বিবাহবহির্ভূত জীবনসহ নানা ধরনের সামাজিক বিশৃঙ্খলতার কারণ ৷

সূত্রঃ http://www.bengali.kolkata24x7.com/farmers-wife-suicide.html


ভারতে গত বছর ১২৩৬০জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন

farmer-suicide

কৃষকদের আত্মহত্যার মিছিল অব্যাহত। মধ্যবিত্তের মনে এখন আর তেমন একটা প্রভাব পড়ে বলে মনে হয় না। তবে কৃষকদের আত্মহত্যার পরিসংখ্যানটা যথেষ্ট উদ্বেগের। ২০১৪ সালে দেশে ১২৩৬০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছিলেন। আগের বছর সংখ্যাটা ছিল ১১৭৩২। দেশে কৃষক আত্মহত্যার তালিকায় প্রথম নাম রয়েছে আর্থিক রাজধানী মুম্বই যে রাজ্যে অবস্থিত সেই মহারাষ্ট্রের। গত বছর ৪০০০ কৃষক এখানে আত্মহত্যা করেছিলেন। যদিও এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের কোন আলু চাষী বা ধান চাষীর নাম নেই! ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে ২০০৫ থেকে  ২০১৪ সালে দেশে ৩ লক্ষ ৮ হাজার ৮২৬জন কৃষক আত্মহত্যার বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও অনেক কৃষকই যে আত্মহত্যা করেছেন পশ্চিমবঙ্গ তার প্রমাণ। কারণ ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গত বছর এ রাজ্যে কোন কৃষকই আত্মহত্যা করেননি!

সূত্রঃ  http://satdin.in/?p=3392