ভারতঃ মাওবাদীদের ‘মোবাইল হাসপাতাল’

মানুষের কাছাকাছি পৌঁছতে গান যদি একটা মাধ্যম হয় তবে অপর মাধ্যমটা সম্ভবত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। গ্রামে গ্রামে যে ‘জনাতন সরকার’ বা জনগণের সরকার মাওবাদীরা স্থাপন করেছেন তার বিভিন্ন শাখা রয়েছে। শিক্ষা, সুরক্ষা, মহিলা কল্যাণ প্রভৃতি সব মিলিয়ে মোট ন-টি শাখা রয়েছে জনাতন সরকারে। এর মধ্যে একটি হলো, স্বাস্থ্য। আর মাওবাদীদের জনসংযোগের জন্যে এটি যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা গেলো ইন্দ্রাবতী নদীর কাছে বেঢ়মা নামের একটি গ্রামে গিয়ে।

একটি বছর তিনেকের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর পিসি, জৈমু। বললেন শিশুটির নাম চন্দ্রপ্রকাশ। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, জ্বরে শিশুটির গা পুড়ে যাচ্ছে। জৈমু জানালেন, গত ১৫ দিন ধরে পেটের রোগে ভুগছে শিশুটি। বমিও করে চলেছে সমানে।

চন্দ্রপ্রকাশকে কিছু স্থানীয় টোটকা দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু তাতে কোনও কাজই হয়নি। কাছাকাছি কোনও ডাক্তার বা ওষুধপত্রেরও ব্যবস্থা নেই বলে আমায় জানালেন জৈমু।

সবচেয়ে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সাত কিলোমিটার দূরে। তাও অধিকাংশ সময়েই বন্ধ থাকে। জানিনা কি করবো? ———জৈমু

এই মাওবাদী চিকিৎসকরাই ভরসা সাধারণ মানুষের

এই মাওবাদী চিকিৎসকরাই ভরসা সাধারণ মানুষের

“সবচেয়ে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সাত কিলোমিটার দূরে। তাও অধিকাংশ সময়েই বন্ধ থাকে। জানিনা কি করবো,” বললেন জৈমু।

আমাদের কাছাকাছিই ছিলেন মাওবাদীদের আটটি ডিভিশনের অন্যতম মাড় ডিভিশনের সচিব রাজমন। তিনি বললেন, চন্দ্রপ্রকাশকে দেখার জন্যে স্থানীয় চিকিৎসককে তিনি আজই পাঠাবেন। এই যে চিকিৎসককে রাজমন পাঠানোর কথা বললেন, তিনি কিন্তু কোনও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক নন। তিনি হলেন, মাওবাদী পার্টির ডাক্তার।

অনেক রাতের দিকে আমার শিবিরে এলেন এক চিকিৎসক, ডা: প্রকাশ। বললেন, চন্দ্রপ্রকাশকে তিনি দেখে এসেছেন।

“বাচ্চাটির ম্যালেরিয়া হয়েছে বলে মনে হয়। কিছু ওষুধ দিলাম। দেখা যাক কি হয়,” বললেন প্রকাশ।

সব ডিভিশনেই ডা: প্রকাশের মতো পার্টির দুই বা তিনজন ডাক্তার থাকেন। এখানকার মানুষ এদেরই বলেন ‘মোবাইল হসপিটাল’। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র অনেকটা দূরে হওয়ার ফলে বা কেন্দ্রে চিকিৎসক না থাকার ফলে এই মাওবাদী চিকিৎসকরাই ভরসা সাধারণ মানুষের। আর এরা যে জনসংযোগের কাজটা পার্টির জন্যে করেন তার মূল্য কতোটা তা বোঝা যায় এখানকার জনজাতীর মানুষের সঙ্গে সামান্য কথাবার্তা বললেই।

যে কোনও গ্রামেই দেখেছি বহু মানুষ আসছেন মাওবাদীদের কাছে। নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা নিয়ে। এঁদের প্রত্যেকে আমায় জানিয়েছেন, মাওবাদীদের কাছ থেকে ওষুধপত্র না পেলে তাঁদের সমস্যা আরো বাড়তো।

ছত্তিশগড় সরকার ২০০৪ সালে একটি মানব উন্নয়ন রিপোর্ট তৈরি করেন। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবায় ছত্তিশগড় অন্যান্য রাজ্যের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

“জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে ছত্তিশগড়,” বলা হয়েছে রিপোর্টে।

সন্দেহ নেই এই খামতিই কাজে লাগিয়েছেন মাওবাদীরা

সূত্রঃ http://www.bbc.com/bengali/multimedia/2011/01/110102_mb_maoist_pt7