মাওয়ের অবদানই প্রধান, মনে করেন চীনের মানুষ

Mao-NYPL

মাও জে দঙের ভুলভ্রান্তির তুলনায় তাঁর অবদান অনেক বেশি। মাওয়ের ১২০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গ্লোবাল টাইমস পত্রিকার ওই সমীক্ষায় ৮৫শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন মাওয়ের অবদানই প্রধান, ভুলগুলি নয়। সমীক্ষায় প্রশ্ন ছিলো, ‘আপনি কি মনে করেন মাও জে দঙের অবদান তাঁর ভুলগুলিকে অতিক্রম করে যায়?’ ৭৮.৩শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, হ্যাঁ, তাঁরা তাই মনে করেন। ৬.৮শতাংশ বলেছেন, তাঁরা জোরের সঙ্গে এ কথা মনে করেন। ১১শতাংশ বলেছেন, তাঁরা এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। উত্তরদাতাদের ৯০শতাংশই বলেছেন মাওয়ের বৃহত্তম অবদান ‘বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে এক স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করা’।

Advertisements

কমরেড মাও সে তুঙের মূর্তিটি ভেঙ্গে দিল পুঁজিবাদী চীন সরকার

1

পুঁজিবাদী চীনের সরকারই ভেঙে দিল কমরেড মাও সে তুঙ–এর মূর্তি। পুঁজিবাদী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হল, প্রস্তুতকারকরা অনুমতি না নিয়ে মূর্তি গড়েছেন বলেই তা ভাঙতে হয়েছে। কয়েকদিন আগে হেনানের কাইফেঙ্গ এলাকায় মোট ৪.৬ লক্ষ ডলার ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ৩৭ মিটার লম্বা এই সোনালী মূর্তিটি। নির্মাণের খরচ জুগিয়েছিলেন উদ্বৃত্ত মূল্যভোজী ব্যবসায়ীরা। উন্মোচনের পরে সারা পৃথিবীর নানা সংবাদপত্রে ছবিও প্রকাশিত হয় মূর্তিটির। তবে সরকারকে জিজ্ঞাসা না করে মূর্তি বসানোতেই ভেঙ্গে দেয়া হল ? নাকি জেনে শুনে পরোক্ষ ভাবে মূর্তিটি বানিয়ে আবার তা প্রত্যক্ষ ভাবে ভেঙ্গে দিয়ে মাওকে খেলনা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে পুঁজিবাদী চীন সরকার !


চিনে মাওয়ের বিশাল মূর্তি বানাল উদ্বৃত্ত মূল্যভোজীরা

মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের কাইফেং শহরের কাছে টংজু কাউন্টির এক ক্ষেতের মধ্যে কিংবদন্তি এই কমিউনিস্ট নেতার মূর্তিটি বসানো হচ্ছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।

‘বিশ্ববিপ্লবের কর্ণধার’ মাও সে তুং মৃত্যুর প্রায় ৪০ বছর পর তাঁর বিশালাকার মূর্তি তৈরি করছে কমিউনিস্ট নাম সর্বস্ব পুঁজিবাদী চিন। এই মূর্তিটি তৈরি হয়েছে স্টিল এবং কংক্রিট দিয়ে৷ মূর্তির গায়ে রয়েছে সোনালি রংয়ের প্রলেপ৷ জানা গিয়েছে, এই মূর্তি নির্মাণের খরচ জুগিয়েছেন চিনের শিল্পপতিরা তথা উদ্বৃত্ত মূল্যভোজীরা৷

উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গণচিনের প্রধান ছিলেন কমরেড মাও সে তুং৷

উল্লেখ্য যে, বিবিসি বলেছে, মূর্তিটি যে প্রদেশে বসানো হচ্ছে, সেখানে বিপ্লব পরবর্তী ১৯৫০ এর দশকে দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

পুঁজিবাদে যেখানে সব কিছুই পণ্য, সেখানে মাওয়ের মূর্তি বানিয়ে চীনের উদ্বৃত্ত মূল্যভোজীরা কি ব্যবসা করবেন তাই দেখার অপেক্ষায় থাকবে বিশ্ব !


৭১ বছর আগে কেন আর্নেস্ট থালমানকে হত্যা করা হয়েছে

হিটলার ও হিমলারের সরাসরি নির্দেশে আর্নেস্ট থালমানকে ১৮ আগস্ট ১৯৪৪-এ এগার বছরেরে নির্জন কারাবাসের পর হত্যা করা হয়। এর আগে তাকে বুটজেন কাগাগার থেকে ওয়েইমারের কাছে বুচেনওয়াল্ড কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে সরিয়ে আনা হয়, যেখানে তাকে হত্যা করে তার দেহকে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

তাই তার কোন কবর হয়নি।thaelmann1 এই ঘটনাটি এতটাই গোপনে ঘটানো হয়েছে যে নাৎসি সংবাদপত্র “ভয়শের অবজারভার” রিপোর্ট করে যে থালমান ২৪ আগস্ট মিত্র বাহিনীর “সন্ত্রাসী বোমা”য় নিহত হয়েছেন।

নাৎসিরা সত্য প্রকাশে এতটা ভীত ছিল কেন? কেননা আর্নেস্ট থালমান ধারণ করতেন একটা দৃষ্টিভঙ্গী, একটা তৎপরতা, এক সংস্কৃতি আর এক মতাদর্শ। আর্নেস্ট থালমান মানে হচ্ছে জাতীয় সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি, যুদ্ধ থেকে মুক্তি, গণফ্রন্টের মাধ্যমে, আর জনগণতন্ত্রের লক্ষ্যে!

জাতীয় সমাজতন্ত্র সত্যিকার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি করেছিল, জার্মানীর জন্য সঠিক লাইন খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছিল। ফল হল যুদ্ধ, দারিদ্র, ধ্বংস, আর নৈতিক অবক্ষয়, আর এ সবই পুঁজিবাদবিরোধী রোমান্টিকতাবাদের ফসল, যার লক্ষ্য ছিল সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা, “পরজীবী”দের অপসারণ করতেঃ যার আসল অর্থ ছিল “লগ্নি পুঁজির সর্বাধিক সাম্রাজ্যবাদী উপাদানসমূহের সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে জাতিদম্ভী প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব”।

আর্নেস্ট থালমান আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। ১৯২৪ থেকে তিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন, যে পার্টি রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবনেখট কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ব্যাপক জনগণকে সমাবেশিত করার সর্ব প্রকার প্রচেষ্টা চালান, যে জনগণ সমাজ গণতন্ত্র কর্তৃক পঙ্গুত্ব বরণ করেছিল, কারণ জার্মান সমাজ গণতন্ত্রী পার্টি (এসপিডি) না ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে, না সত্যকার ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের পক্ষে।

কমিউনিস্ট পার্টি তার পক্ষে যা করা সম্ভব সবই করে যাতে পুঁজিবাদবিরোধী ও ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম এক গণ আন্দোলনে পরিণত thaelmann2হয়; তাই লাল ফ্রণ্ট যোদ্ধাদের মোর্চাঃ ফ্যাসিবিরোধী একশনও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই লড়াই সমাজ গণতন্ত্রের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নয় বরং এসপিডির আত্মসমর্পণ লাইনের বিরুদ্ধে চালানো হয়। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি যুক্তফ্রন্টের লাইনকে রক্ষা করে, আর স্পেন ও ফ্রান্সে যেমনটা হয়েছে, গণফ্রন্টের লাইনের জন্য এগিয়ে যায়।

নাৎসি ধারার মধ্যেকার যেসকল জনগণ বন্দী হয়েছিলেন তাদেরকেও কখনো ভোলা হয়নি। যেমনট আর্নেস্ট থালমান জানুয়ারি ১৯৩৩-এ ব্যাখ্যা করেনঃ

“কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের ব্যাপক জনগণের প্রতিও লক্ষ্য রাখে।

এসএ ও এসএস বাহিনীর মধ্যে এক ভয়ানক পার্থক্য ছিল, শ্রমিক এলাকায় দাঙ্গা বাঁধানোর মধ্যে, অথবা শ্রমিকদের ঘরবাড়ী ও ক্ষেত্রগুলিতে ঘেরাও আক্রমণ, ব্যাপক জনগণের মধ্যেওঃ সংকটাক্রান্ত শ্রমিক, কর্মচারী, নিম্ন মধ্যবিত্ত, হস্তশিল্পী ও ছোট ব্যবসাদারদের দুর্দশার মধ্যে পার্থক্য ছিল, যারা জাতীয় সমাজতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছে যেহেতু তারা হিটলার, গোয়েবলস ও স্ট্র্যাসার প্রভৃতির গলাবাজির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে।…

আমাদেরকে ধৈর্যশীল শিক্ষিতকরণের মাধ্যমে জনগণকে দেখাতে হবে যে হিটলার পার্টির সত্যিকার ভুমিকা হচ্ছে লগ্নি পুঁজির সেবা করা, ট্রাস্ট রাজ রাজরাদের, বৃহৎ ভুস্বামীদের, কর্মকর্তাদের ও প্রিন্সদের সেবায় কাজ করা।” [কার্ল লিবনেখটের বাড়ির সামনে নাৎসি উস্কানী এবং কিছু শিক্ষা, ২৬ জানুয়ারি ১৯৩৩]

আর এটাও জানা দরকার যে, নভেম্বর ১৯৩২-এর সাধারণ নির্বাচনে নাৎসি পার্টির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। যদিও নাৎসিদেরকে এককোটি দশ লাখ জনগণ ভোট দিয়েছিল, জুলাইয়ের থেকে ২০ লাখ ভোট কম পেয়েছে তারা। নাৎসি আন্দোলন ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করেছিল, তাই, হিটলারকে দ্রুত ক্ষমতায় বসানো হয়েছিলঃ যা কোন ক্ষমতা দখল ছিলনা, বরং ক্ষমতার বদল।

যেমনট আর্নেস্ট থালমান অক্টোবর ১৯৩২-এ নির্বাচনের আগেই উপলব্ধি করেনঃ

“জাতিদম্ভী ঢেউয়ের কারণে ফ্যাসিবাদী গণ আন্দোলনের বিপুল বৃদ্ধি ফ্যাসিবাদী শাসকদের ক্ষমতা দখলে অনুমোদন দেয়।

লগ্নি পুঁজির পলিসি, যা হিটলারের ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন কর্তৃক সরকারী ক্ষমতার অনুশীলনকে বর্জন করে, একদিকে আভ্যন্তরীণ ও বাইরের সংঘাতসমূহের অতিদ্রুত পোক্ত হওয়ার ভীতি থকে উদ্ভূত হয়, অন্যদিকে ফ্যসিবাদী গণ আন্দোলনের মজুদকে thaelmann3যতদূর সম্ভব সুদৃঢ়ভাবে বজায় রাখার বুর্জোয়াদের আকাঙ্খা থেকে, যাতে একই সাথে তাকে “সজ্জিত’ করা যায়, অর্থাৎ তাকে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের নিরাপদ যন্ত্র বানানো যায় বাঁধাদানকারী উপাদানসমূহকে অতিক্রম করে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এ পর্যন্ত অগ্রগমন এখন থমকে দাঁড়িয়েছে আর অবনতির জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে যে কারণে তা হল সর্বহারা শ্রেণীর বাড়ন্ত অগ্রগমন, পাপেন সরকারের রাজনীতির মাধ্যমে দারিদ্রকরণ ও হিটলারের সীমাহীন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় নিপীড়িত মধ্যবিত্তের জাগড়নরত রেডিকেলকরণ এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির ফ্যাসিবিরোধী গণসংগ্রামের প্রচণ্ড অগ্রগতি।

বাঁধাহীন শোষণের সমর্থন হিসেবে হিটলার পার্টির ভুমিকা, পুঁজিবাদী, জাঙ্কার ও জেনারেলদের সরকারের জন্য সাহায্য প্রদানে এর অবস্থান, লাউসান্নে স্বীকৃতি চুক্তি, বিপ্লবী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ফাসিবাদী খুনী সন্ত্রাসের ভুমিকা—এ সবই জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের অনুসারী নিপীড়িত জনগণের হতাশার সূচনা করে…

এনএসডিএপির সারি ভেঙ্গে পড়ার আর জাতীয় সমাজতন্ত্রী ঢেউয়ের অবনতির শুরুর কারণে হিটলারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে thaelmann4মতাদর্শিক আক্রমণাভিযানের বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের অনুসারীদের সারিতে প্রচণ্ড আঘাত হেনে ভাঙন ঘটানো গুরুত্বপূর্ণ করণীয়।

কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শ্রমিকদেরকে সর্বহারা ও জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের নিপীড়িত অনুসারীদের জয় করতে হবে মজুরী ও সহায়তা সংকোচন এবং পাপেন একনায়কত্বের বিরুদ্ধে, আর তাদের বোধগম্য করতে হবে যে হিটলারের পার্টি হচ্ছে লগ্নি পুঁজির সন্ত্রাসী ও প্রতিবন্ধকতা ভাঙার সংগঠন।

জনগণকে জাতিদম্ভী উস্কানী প্রদান, জার্মান বুর্জোয়ার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ পলিসি ও সমরবাদী সশস্ত্রকরণের মোকাবেলায় তাকে ভার্সাই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ বিকশিত করতে হবে ফরাসি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে ফরাসী কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শ্রমিকদের সংগ্রামের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ বজায় রেখে।

জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি পাপেন সরকারের সমরবাদী সশস্ত্রকরণ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ পলিসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, দাবি করে যুদ্ধের শিকার ও বেকার জনগণের জন্য শত শত কোটি টাকা, বুর্জোয়াদের ও সমগ্র প্রতিবিপ্লবের নিরস্ত্রকরণ, সর্বহারা শ্রেণীর নিকট ক্ষমতা ও ক্ষমতার যন্ত্রের পুর্ণ অর্পন এবং জার্মান শ্রমিক জনগণের সামাজিক ও জাতীয় মুক্তির।” [আর্নেস্ট থালমান, জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির thaelmann5সম্মেলন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটির দ্বাদশ প্লেনাম এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য, ১৭ অক্টোবর ১৯৩২]

জাতীয় সমাজতন্ত্র যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে ও ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে পুঁজিবাদের রক্ষাকবচ, আর্নেস্ট থালমান তার জীবন্ত প্রমান। তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে প্রকৃত সমাজতন্ত্রকে নির্দিষ্টভাবে সংগ্রাম করতেই জাতীয় সমাজতন্ত্র সেখানে ছিল।

তার জীবন ছিল জাতীয় সমাজতন্ত্রের এক পালটা প্রতিপাদ্য, আর নাৎসিরা জেনেছিল যে তাদের পরাজয় থালমানের বিজয় ডেকে thaelmann6আনবে। আর্নেস্ট থালমান এক বৈজ্ঞানিক অনুপ্রেরণা হতে পারতেন, তিনি একটা “পথনির্দেশক চিন্তাধারা” জন্ম দিতে পারতেন বাস্তবতার বৈজ্ঞানিক প্রতিফলন হিসেবে; থালমান মানে ছিল এক লাইন যা জার্মান সমাজকে বহু বছরের গণতন্ত্র বিরোধী দুর্দশার পর গণতন্ত্রের দিকে নির্দেশ করে।

উল্লেখ্য যে জুলিয়েন লাহাউটকে বেলজিয়ামে তার বাড়ীর সামনে হত্যা করা হয় ১৮ আগস্ট ১৯৫০ এ। রাজতন্তের বিরুদ্ধে প্রজাতন্তের সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব। তিনি ছিলেন বেলজিয়ামের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৪১ সালে ১০০,০০০ শ্রমিকের এক বিরাট ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন, তারপর নাৎসিরা তাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে 640px-Ernst_Thaelmann_Berlinপাঠায়, সেখানে তার উপর নির্যাতন চালায়, যা তিনি সর্বদাই প্রতিরোধ করেছেন।

জুলিয়েন লাহাউটও বিপ্লবী লাইন, বিপ্লবী প্রেক্ষিত ও নিজ দেশের এক উপলব্ধিকে ধারণ করেছেন। তাই, লাহাউট ও থালমান অমর।

সূত্রঃ http://sarbaharapath.com/?p=1082


শিক্ষা ও প্রলেতারিও একনায়কত্বঃ রাসেল কে মাও এর জবাব

wpid-mao-big

চাংশায় রাখা তাঁর অভিভাষণে রাসেল কমিউনিজমের সপক্ষে অবস্থান নিলেও, শ্রমিক কৃষকের একনায়কত্বের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ না করে বা কারোর স্বাধীনতার অধিকারকে খর্ব না করে, বরং বিত্তশালী শ্রেনিকে শিক্ষিত করে তোলার মধ্য দিয়ে তাদের চেতনার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। রাসেলের এই বক্তব্য সম্পর্কে আমার মতামত কয়েকটি মাত্র শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করব। এবং তা হল এই যে, ‘তত্ত্বগতভাবে এই যুক্তি শুনতে খুব ভালো লাগলেও এটা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়।’ কারণ, প্রথমত, শিক্ষার জন্য অর্থ সহ অন্যান্য নানান আনুষাঙ্গিক জিনিস প্রয়োজন। আর বর্তমান সময়ে অর্থের মালিকানা সম্পূর্ণভাবে পুঁজিপতিদের হাতে। বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার দুটি অন্যতম গুরুপ্তপূর্ণ অঙ্গ, বিদ্যালয় এবং ছাপাখানা, এই দুইয়েরই নিয়ন্ত্রন রয়েছে পুঁজিপতিদের হাতে। এক কথায় বলতে গেলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা হল পুঁজিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা। যারা এই পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়, পরবর্তীকালে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করার সময় তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে খুব স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিবাদী শিক্ষাতেই শিক্ষিত করে তোলে। আর এইভাবেই শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে থাকে পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রনে। পুজিবাদীরা তাদের পার্লামেন্টে নিজেদের সুবিধার্থে আইন তৈরি করে, সর্বহারার শ্রেনীস্বার্থকে খর্ব করে; এবং এই আইনকে প্রয়োগে নিয়ে যাওয়ার জন্য ও জবদরদস্তি সমাজের অন্য সমস্ত অংশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে পুঁজিপতিদেরই ‘সরকার’; নিজেদের সুরক্ষার জন্য এবং সর্বহারার উপর শোষণ চালানোর জন্য পুঁজিপতিদের রয়েছে ‘পুলিশ’ ও ‘সৈন্যবাহিনী’; অর্থের চলাচল যাতে নির্বিঘ্নে হতে পারে, তার জন্য পুঁজিপতিদের রয়েছে নিজেদের ব্যাংক তাদের হাতে রয়েছে সামাজিক উৎপাদনের উপকরণগুলির মালিকানা, যার মাধ্যমে তারা উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই পুঁজিপতিরাই এই শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং যাতে সর্বহারার মতাদর্শ বিকাশ লাভ করতে না পারে, তার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থা্র সপক্ষে যতরকমভাবে সম্ভব, তারা প্রচার চালাবে। এরকম পরিস্থিতিতে কি আদৌ কারুর পক্ষে শিক্ষাব্যবস্থাকে সর্বহারা শ্রেনীর স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব? সম্ভব নয়। তাই কমিউনিস্টদের কাছে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোলা নেই।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মাধ্যমে পুঁজিপতিদের চেতনার পরিবর্তন করাটা অসম্ভব। মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত জানা বোঝা এবং মানব সভ্যতার ইতিহাস অন্তত সেটাই বলে। শিক্ষার মাধ্যমে পুঁজিপতিদের শ্রেণীচেতনার পরিবর্তন ঘটানো যাবে ভাবলে ভুল করা হবে। শিক্ষাব্যবস্থার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ-বিদ্যালয় আর ছাপাখানা, এই দুটোই সম্পূর্ণভাবে পুঁজিপতিদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। আর কারুর কাছে কয়েকটি বিদ্যালয় ও আনুষাংঙ্গিক কিছু বিষয়ের ও সংবাদপত্রের মালিকানা থাকলেও, তা দিয়ে কোনোভাবেই পুঁজিপতিদের মানসিকতা এতটুকুও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এটা যেমন সত্য, তেমনই ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা দেখব যে অতীতে কোনো সাম্রাজ্জ্যলোভী শাসক, সামরিক নেতা, কেউই স্বেচ্ছায় ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে দেয়নি। বরং জনগণই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতার তখ্ত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বারবার। প্রথম নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করে ব্যর্থ হন এবং পরে তাঁর স্হলাভিষিক্ত হন তৃতীয় নেপোলিয়ন। একইভাবে ইয়ুয়ান শিহ্-কাই এর পতনের পর ক্ষমতাসীন হন হুয়ান শি-হুই….তাহলে দেখা যাচ্ছে যে মনোবিজ্ঞান বা ঐতিহাসিক দৃস্টিভঙ্গি-দুটো থেকেই এই সিদ্ধান্তে পৌছানো যায় যে, শুধুমাত্র কিছু শিক্ষাগত উদ্যোগ নিয়ে পুঁজিবাদকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

এছাড়া তৃতীয় আরেকটা কারন রয়েছে, এবং সেটাই সবথেকে বাস্তব কারন। যদি সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য আমরা শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নিই, তাহলে সেটা অর্জন করতে অনেক সময় লেগে যাবে। ধরে নেওয়া যাক এক শতাব্দী লাগবে। তার মানে, এক শতাব্দী ধরে সর্বহারাশ্রেণী চরমভাবে শোষিত ও নিস্পেষিত হবে। তাহলে এরকম পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কি? সমাজে সর্বহারারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বুর্জোয়াদের তুলনায় সংখ্যায় তারা অনেক অনেকগুন বেশি। যদি হরে নিই যে মানবজাতির দুই-তৃতীয়াংশ হল সর্বহারা শ্রেনীর মানুষ, তাহলে পৃথিবীর দেড়শো কোটি জনসংখ্যার মধ্যে একশো কোটি (যদিও প্রকৃত সংখ্যাটা আদতে এর অনেক বেশি) হল সর্বহারা, শোষিত মানুষ। এবং এই একশো কোটি মানুষ এক শতাব্দী ধরে চরমভাবে শোষিত হবে বাকি এই এক তৃতীয়াংশ পুঁজিপতিদের দ্বারা। এটা কি করে মেনে নেওয়া যায়? সরবহারাশ্রেনী আজ এটা উপলব্ধি করছে যে তাদেরও সম্পদের মালিকানা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তারা এই শোষনের শৃঙ্খল চাইলেই ভেঙে ফেলতে পারে। বর্তমান শোষণমূলক সমাজব্যবস্থাকে তারা আর মেনে নিতে পারছে না এবং তারা সমাজতন্ত্রের দাবীতে ক্রমশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠেছে। এটাই বাস্তব পরিস্থিতি এবং কোনোভাবেই এটাকে অস্বীকার করা যায় না। আর যখনই আমরা এই বাস্তব পরিস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠি, তখনই আমরা সেটাকে বদলানোর জন্য উদ্যোগ নিই। আর তাই আমার মনে হয়, যত সময় যাবে, রাশিয়া, তথা সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাডিকাল কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলি আরো বেশি শক্তিশালী ও সংগঠিত হয়ে উঠবে। এটাই স্বাভাবিক পরিণতি।

নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে আমরা আরো একটা বক্তব্য রয়েছে। এবং সেটা শুধুমাত্র এই নয় যে, ক্ষমতার প্রয়োগ ও সংগঠনবিহীন কোনো সমাজের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব। আমি কেবলমাত্র এই ধরনের কোন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি….এতক্ষণ যা কিছু বললাম, তা থেকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হওয়া যায় যে নৈরাজ্যবাদ, সম্পূর্ণ উদারনীতির অনুশীলন, বা সর্বব্যাপী গনতন্ত্র, প্রভৃতি বিষয়গুলো তত্তগতভাবে শুনতে খুব ভালো লাগলেও, কোনোভাবেই এগুলো বাস্তবসম্মত নয়।
                                                         
   [প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯২০-জানুয়ারি ১৯২১। marxists.org থেকে  সংগৃহীত, অনুবাদক- সন্মিত]

সুত্রঃ  https://usdfeimuhurte.wordpress.com/2015/06/12/%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%93-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%A8%E0%A6%BE/