“লাল সংবাদ” এর বিশেষ প্রতিবেদনঃ জেল অভ্যন্তরে মাওবাদী নারীদের ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’

পেরুর কান্টো গ্র্যান্ড কারাগারের নারী বন্দীরা

পেরুর কান্টো গ্র্যান্ড কারাগারের নারী বন্দীরা আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করছেন

স্থানঃ ক্যান্টোগ্র্যান্ড

সময়ঃ মার্চ, ১৯৯২

পেরুর রাজধানী লিমার অন্যতম কারাগার।  কঠোরতম বেষ্টনীতে আবদ্ধ বিপ্লবী কারাবন্দি নারীরা এখানে সুশৃঙ্খল ও সংগঠিত।  ওরা নিজেরাই খাবার রান্না করে এবং নিজেরাই পরিবেশন করে ও রাজনৈতিক পড়াশুনা করে।  বন্দিদের বাসগৃহের দেয়ালে দেয়ালে হাতে আঁকা মার্কস-এঙ্গেলস, লেনিন ও মাওয়ের ছবি।  কারাগার অঙ্গনের প্রশস্ত দেয়ালে গনযুদ্ধ ও চেয়ারম্যান গনজালোর বিচিত্র রঙে অসংখ্য চিত্রে সজ্জিত।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে একটি তেজদীপ্ত ও বিস্তারিত কর্মসূচীর পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের জন্যে কঠোর পরিশ্রম করেছে।  বন্দিরা দীর্ঘ সারি বেঁধে নিজ নিজ হাতে তৈরি কালো প্যান্ট ও সবুজ খাকি শার্ট ও মাও টুপি লাগিয়ে উন্নত শিরে কুচকাওয়াজের তালে তালে কারাগার প্রদক্ষিণ করে।  হাতে ওদের বড় বড় লাল পতাকা আর কুচকাওয়াজের তালে তালে প্রত্যেকের হাতেই আন্দোলিত হচ্ছে লাল রুমাল।  ওরা বহন করছে চেয়ারম্যান গনজালোর বৃহদাকৃতি প্রতিকৃতি(ছবি)।

বাদ্যের তালে তালে বন্দিদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল বিপ্লবী গন সংগীত।  কারাগারের উঁচু দেয়াল ডিঙ্গিয়ে সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠের সংগীত ধনী-“বিপ্লবী যোদ্ধা ও অগ্রণী জনতা, ক্ষুধা ও শোষণের বিরুদ্ধে আমাদের এ সশস্ত্র সংগ্রাম আমরা মানব জাতির শত্রু  সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করবোই।  বিজয় আজ জনতার, বিজয় আজ অস্ত্রের, বিজয় আজ গণ নারী আন্দোলনের।  চেয়ারম্যান গনজালো আমাদের পথ প্রদর্শক।  তিনি বিশ্ব মানবতাকে বিজয়ের পথে নিয়ে চলেছেন।  আমরা আলোকোজ্জ্বল পথের অনুসারী, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাবো, নতি স্বীকার না করার প্রশ্নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ”

ওরা ব্যঙ্গ রচনা পঠন ও নারী মুক্তি সম্পর্কে মার্কস-লেনিন-মাওয়ের উক্তি প্রদর্শন করে।  হাতে তৈরি কাঠের বন্দুক উঁচিয়ে ধরে ওরা মাও সেতুং ও চীনের সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের সংগীত পরিবেশন করে।

কারাবন্দী নারীদের এক প্রতিনিধি বলেন, আমরা হলাম যুদ্ধ বন্দি।  গণ গেরিলা বাহিনীর যোদ্ধাদের মত আমরা তিনটি কাজ করি।

() সরকারের বন্দি গণহত্যার নীল নকশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম

() জেল বন্দিদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম এবং

() মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদী আদর্শিক রাজনীতিতে সজ্জিত হওয়ার জন্য সংগ্রাম।  আমরা সবসময়ই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করি।

ক্যান্টোগ্র্যান্ডের বীর সন্তানগণ

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ২ মাস পর ১৯৯২ সালের মে মাসের ৬ তারিখে পেরুর খুনি সরকারী বাহিনী ক্যান্টোগ্র্যান্ড জেলখানায় ৫০০ বিপ্লবী জেল বন্দিকে আক্রমণ করে। সারা দুনিয়ার মাওবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ঐক্যের কেন্দ্র আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলনের(আর.আই.এম- RIM) কমিটির এক বিবৃতি থেকে এ সম্পর্কে জানা যায়।

যে ২টি জেলখানায় নারী ও পুরুষ বিপ্লবীরা বসবাস করতো সরকারী বাহিনী তা অবরোধ করে রাখে। ফলে বন্দিরা খুবই সতর্ক হয়ে পড়ে এবং গোপনে সারা বিশ্বে প্রচার করে দিতে সক্ষম হয় যে, সরকারী বাহিনী জেলখানার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের জন্যে বন্দি হত্যার ফন্দি আঁটছে। আর বিপ্লবী বন্দিদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্যে বিভিন্ন জেলে বদলি করার চেষ্টা করছে।

এপ্রিল মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পেরুর প্রেসিডেন্ট কুখ্যাত ফুজিমোরি, সরকারের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজ হাতে গ্রহণ করে। এজন্য দেশি বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের কাছে ফুজিমোরি নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করা এবং তার বিরুদ্ধবাদীদের ছায়া দূর করার এমন একটা বিপ্লবী গণহত্যা যজ্ঞ প্রয়োজন ছিল।

ভারী অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী ও পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাগণ ৬ই মে নারীদের জেলখানা ঘেরাও করে। তারা আশা করেছিল প্রথমে নারীদের এবং পড়ে পুরুষদের আটক করবে।  কিন্তু তা পারেনি। যে কারাগার ওরা তৈরি করেছিল সেই কারাগারই ওদের রুখে দাঁড়াল।  ঘন সিমেন্টের প্রলেপ দেয়া দেয়াল ও উঁচু ছাদের উপর দাঁড়িয়ে নারীরা বন্দুক-গোলাগুলি-বিস্ফোরণ-ধোঁয়া, টিয়ার গ্যাস, জলকামানের বৃষ্টির মধ্যেও যাদের কিঞ্চিৎ দেখা যাচ্ছিল- হাতের কাছে যার যা ছিল তাই আক্রমণকারীদের ছুঁড়ে মারল। বাড়ীতে তৈরি গ্যাস মুখোশ পরে বন্দিরা প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে গেলেন।  এতে কমপক্ষে ২জন পুলিশ নিহত হয়। যে দালানে পুরুষ বন্দিদের আটকে রাখা হয়েছিল নারীরা সে দালান দখল করে ফেললো। তারপর নারী পুরুষ উভয়ই মিলে ৯ই মে পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে পুলিশদের তাড়িয়ে দিল। অবশেষে ৩০মিনিট ব্যাপী এক স্থায়ী যুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সম্ভাব্য সকল ভারী অস্ত্র কাজে লাগিয়ে বিপ্লবীদের পরাজিত করল।

১০ই মে এক কুৎসিত বিজয় উৎসব পালনের উদ্দেশ্যে স্বয়ং খুনি ফুজিমোরিকে জেল পরিদর্শনে আনা হলো। ঘাড়ের পিছনে হাত মোড়া ও অধঃমুখী অবস্থায় কারাবন্দীদের তার পেছনে দেখা গেলো। বেত ও মুগুর দিয়ে ওদের প্রহার করা হলো, উন্মুক্ত কুকুরগুলোকে বিপ্লবীদের দিকে লেলিয়ে দেয়া হ্য়। তবুও দেখা গেল বন্দিরা বিপ্লবী সংগীত গেয়ে চলেছে।

ক্যান্টোগ্র্যান্ডিতে ৪০জনেরও বেশী বন্দিকে হত্যা করা হয়। ১০০জনেরও বেশি বন্দিকে আহত করা হয়। যুদ্ধ থামার পর বিপ্লবী নেতাদের অনেককে ফাঁসির মঞ্চে চড়ানো হয়।

pol9

সূত্রঃ [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিপ্লবী পত্রিকা – রেভ্যুলেশনারী ওয়ার্কার, লন্ডন থেকে প্রকাশিত “বিশ্ব বিজয়”-(AWTW) এবং ব্রিটেনের টিভি Channel 4 কর্তৃক প্রচারিত পেরুর যুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা অবলম্বনে লিখিত।]