পেরুর গণযুদ্ধের ৩৮তম বার্ষিকীতে লাল সালাম – চেয়ারম্যান গণসালো লাল সালাম

Advertisements

পেরুর গণযুদ্ধের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও চিত্র


পেরুর মাওবাদী গেরিলারা সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়েছে

sendero-luminoso-deja-herido-a-jpg_604x0

গত শনিবার, PCP-SL(পেরুর কমিউনিস্ট পার্টিশাইনিং পাথ) এর মাওবাদী গেরিলারা মাওবাদী প্রভাবিত জেলা সান ফ্রান্সিসকো আয়না (লা মার্চ প্রদেশ, ভারেম অঞ্চল) এর একটি সামরিক ঘাঁটিতে শক্তিশালী আক্রমণ চালায়। এসময় মাওবাদীরা সামরিক ঘাঁটিতে দীর্ঘসময় ধরে বোমা বর্ষণ ও গুলি চালিয়ে জনগণের উপর সামরিক বাহিনীর দুর্ব্যবহারের জবাব দেয়। এই গোলাগুলিতে সামরিক বাহিনীর এক সার্জেন্ট কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়ে জখম হয়। আহত ওই সার্জেন্টকে ফোর্ট ভ্যালি পিছকারি মেডিকেল সেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে এ অঞ্চলে মোতায়েন করা সামরিক বাহিনী মাওবাদী গেরিলাদের বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে সাঁড়াশি আক্রমণ চালাচ্ছে এবং অঞ্চলের সব সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতা  ঘোষণা করা হয়েছে।

অনুবাদ সূত্রঃ http://maoistroad.blogspot.com/2016/02/perou-la-guerilla-maoiste-attaque-une.html


পেরুর মাওবাদী গেরিলা দল ‘শাইনিং পাথ/Shining Path’

Communist-Party-of-Peru-Shining-Path

সত্তর বা আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ল্যাতিন আমেরিকার যে কয়টি গেরিলা সংগঠন অদ্যবধি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের মধ্য কমিউনিস্ট পার্টি অব পেরু অন্যতম। এই মাওবাদী গেরিলা সংগঠনটিই সারা বিশ্বে শাইনিং পাথ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে দক্ষিণ পেরুর স্যান ক্রিস্টোবাল হুমাংগা ন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি দর্শনের অধ্যাপক এবিমিয়েল গুজমানের হাত ধরেই এর যাত্রা শুরু। কার্ল মার্ক্সের ডিকটেটরশিপ অব দ্য প্রলিতারিয়েত বা শ্রমজীবী মানুষের ক্ষমতায় আরোহণ তত্ত্বের বাস্তবায়নই ছিল এ গেরিলা দলের মূল উদ্দেশ্য।

শাইনিং পাথ গেরিলা দলের ভাষ্য মতে, গণযুদ্ধের লাইন ছাড়া এখন বিশ্বে যেসব কমিউনিস্টপন্থি দল রয়েছে এরা সবাই সংশোধনবাদীতে পরিণত হয়েছে। বুর্জোয়া শ্রেণির ছত্রছায়ায় প্রত্যেকে ক্ষমতার ছায়াতলে থাকতে চায়। এ সব সুবিধাবাদী কমিউনিস্ট দলগুলোকে সরিয়ে সমগ্র বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বেগবান করাই ছিল এদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এদের কর্মপন্থা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভারতের মাওবাদী গেরিলা সংগঠন সিপিআই(মাওবাদী)’র মতো।

মাওবাদী গেরিলা দল শাইনিং পাথের কার্যক্রমকে সময়ের তিন অংশে ভাগ করা হয়। এর প্রথম পর্যায় হচ্ছে বিশ শতকের ১৯৬০ থেকে ১৯৯২ সাল। দ্বিতীয় পর্যায় ১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ সাল এবং তারপর একবিংশ শতকের ২০০৩ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। যদিও ধরে নেওয়া হয় শাইনিং পাথের উত্থান নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, তবে এর প্রতিষ্ঠা কিন্তু আরো আগে ১৯৬০ সালে। শাইনিং পাথের প্রতিষ্ঠাতা এবিমিয়েল গুজমান, স্যান ক্রিস্টোবাল অব হুমাংগা ইউনির্ভাসিটিতে দর্শন শাস্ত্র পড়াতেন। ১৬৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়কে শাইনিং পাথের আতুরঘর বলা হয়। ধারণা করা হয়, দর্শনশাস্ত্রে বোদ্ধা গুজম্যান তার লেকচারের মাধ্যমে ছাত্রদের শাইনিং পাথে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। তবে শাইনিং পাথ প্রথম দৃশ্যপটে আসে ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে। প্রায় এক যুগের অচলাবস্থার পর একই বছর পেরুর সামরিক শাসক শ্রেণি নির্বাচনের আয়োজন করে। তবে শুরু থেকেই যে কয়টি দল নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছিল তাদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি অব পেরু বা শাইনিং পাথ অন্যতম। কিন্তু কোনোভাবেই কোনো প্রচেষ্টায় যখন নির্বাচন প্রতিহত করা যাচ্ছিল না, তখন শাইনিং পাথ সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। ১৯৮০ সালে এপ্রিল মাসের ১৭ তারিখে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে তারা দক্ষিণ আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত সুসাই শহরের ভোটকেন্দ্রের ব্যালট বাক্স ও পেপার পুড়িয়ে দেয়। এটাই ছিল তাদের প্রথম প্রতিবাদ। তবে অগ্নিসংযোগকারীদের খুব দ্রুত ধরা হয়। এতে করে ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে জনসম্মুখে প্রকাশ পায়। এরপর  ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালের পুরোটা সময় শাইনিং পাথ তাদের সদস্য সংগ্রহ ও বিভিন্ন এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করতে থাকে। এভাবে তারা দক্ষিণ পেরুর অনেকখানি অংশে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। দক্ষিণ অঞ্চলে শাইনিং পাথ এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে ১৯৮১ সালের ২৯ ডিসেম্বর সরকার আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশীয় আয়েকচো হুয়ানক্যাভেলিকা ও অপুরিম্যাক অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করে তাদের দমনে সামরিক বাহিনী প্রেরণ করে। সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং রোন্ডাসের (স্থানীয় কৃষক সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গঠিত ও সামরিক বাহিনী কতৃক প্রশিক্ষিত এন্টি রেবেল মিলিশিয়া) ত্রিমুখী লড়াই চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত।

শুরুতে কৃষকরা এর বিপক্ষে থাকলেও পরে তারা এর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। শাইনিং পাথ গোটা দেশে বিদ্যুত বিপর্যয় ঘটানোর জন্য বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোতে হামলা, কারখানায় বোমা বিস্ফোরণ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর হামলা করত।

এভাবেই হামলা, পাল্টা হামলার মধ্যে দিয়েই কাটে প্রায় একযুগের ও বেশি সময়। আসে ১৯৯২ সাল। এ বছরটাই শাইনিং পাথ গেরিলাদের সবচেয়ে বিপর্যয়কর বছর হিসেবে বিবেচিত। এ বছরই পুলিশের হাতে গুজমানসহ শাইনিং পাথের প্রথম সারির অনেক নেতাই ধরা পড়ে। গুজমান ধরা পড়ার পর শাইনিং পাথ অনেকটাই নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। কারণ তার বিকল্প কোনো নেতাই ছিল না যিনি গেরিলাদের নেতৃত্ব দেবে। তা ছাড়া গুজমান জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় সরকার কর্তৃক সাজানো অতঃপর প্রচারিত যে গুজমানের সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ঘোষণা দেওয়া নিয়ে শাইনিং পাথ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি অংশ আত্মসমর্পণ করে। অপর একটি অংশ গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় এবং এই অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন অস্কার রামিরেজ। রামিরেজ কিছু দিন নেতৃত্ব দেওয়ার পর ১৯৯৯ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং শাইনিং পাথ আবার নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।

অধ্যাপক এবিমিয়েল গুজমান

অধ্যাপক এবিমিয়েল গুজমান

তবে শাইনিং পাথ যেন ফিনিক্স পাখি। বারবার ধ্বংসের মধ্যে থেকে জেগে ওঠে। একবিংশ শতকের গোড়ার দিকে এই বাহিনীর সদস্যরা আবার একত্রিত হতে থাকে। এ সময় কমরেড আর্টিমিও এর হাল ধরে। আর্টিমিও নেতৃত্বে আসার পর শাইনিং পাথ বেশ কয়েকটি বড়বড় অপরেশন পরিচালনা করে। এরমধ্যে ২০০২ সালে পেরুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল লিমায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বাইরে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ, ২০০৩ সালে আর্জেন্টাইন কোম্পানি টেকইনটের ৬৮ জনের মতো কর্মীকে ও তিনজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ, ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৯ সালে সরকারি বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০১২ সালে কমরেড আর্টিমিও গুরুতর জখম অবস্থায় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। ২০১৩ সালের ৭ জুন আর্টিমিওর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, মাদকপাচারের অভিযোগ এনে পেরুর সরকার তাকে আজীবন জেল ও প্রায় ১৮৩ মিলিয়ন ইএস ডলার জরিমানা করে। তবে এত কিছুর পরও পেরু থেকে শাইনিং পাথ যে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়। ২০১৫ সালে এ গেরিলা গোষ্ঠী আবার আলোচনায় এসেছে।

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই আজো জারি রেখেছে শাইনিং পাথ।

1