পশ্চিমবঙ্গে নকশালপন্থী শ্রমিক সংগঠনসমূহের নেতৃত্বে গড়ে উঠছে হুগলী শিল্পাঞ্চ‌লের শ্রমিকদের লড়াই

24581399_1640583539390271_1974842525_n

পশ্চিমব‌ঙ্গের হুগলী শিল্পাঞ্চ‌লের রিষড়া অঞ্চ‌লে বিড়লা‌দের বস্ত্রবয়ন কারখানা জয়শ্রী টেক্সটাইলসে গত ৭ মাস ধ‌রে ৯ জন আন্দোলনকারী শ্রমিক‌কে “ব‌হিস্কার” ক‌রে রে‌খে‌ছে কারখানার মা‌লিকবা‌হিনী, আর মা‌লিকবা‌হিনীর ওই অগণতা‌ন্ত্রিক আক্রম‌ণের বিরু‌দ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই‌য়ে শ্রমিকরা। নকশালপন্থী সংগ্রামী বাম শ্রমিক সংগঠ‌নের নেতৃ‌ত্বে গ‌ড়ে উঠ‌ছে জয়শ্রী কারখানার শ্রমিকদের লড়াই, যে কারখানায় শিক্ষান‌বিশ শ্রমিকদের (‌কর্ম‌ক্ষে‌ত্রে যারা ‘‌টো‌টি’ না‌মে প‌রি‌চিত) মাত্র ৭৫ টাকায় পু‌রোটা কাজ ক‌রি‌য়ে নেয় মুনাফা‌খোর মা‌লিকবা‌হিনী আর শ্রমিকরা প্রতিবাদ কর‌লেই ম্যা‌নেজ‌মেন্ট প্রতিবাদী শ্রমিকের‌ হা‌তে ধ‌রি‌য়ে দেয় ‌শো-কজের নো‌টিশ, সেই বিড়লা‌দের জয়শ্রী কারখানার সংগ্রামী শ্রমিকরাই লড়াই চালা‌চ্ছেন লাল পতাকা‌কে আঁক‌ড়ে ধ‌রে । এই লড়াই-সংগ্রা‌মের অংশ হিসা‌বেই গত ২৬ ন‌ভেম্বর প্রায় হাজার খা‌নেক শ্রমিকের উপ‌স্থি‌তি‌তে হ‌য়ে‌ছে কন‌ভেনশন, আর সেই কন‌ভেনশ‌নের ধারাবা‌হিকতায় ৩রা ডি‌সেম্বর, ২০১৭ (র‌বিবার) বি‌কে‌লে কারখান‌ার গেট থে‌কে বে‌রো‌লো লাল পতাকা হা‌তে শ্রমিকদের মি‌ছিল, প্রায় ঘন্টা দে‌ড়েক ধ‌রে শ্রমিক মহল্লা আর রিষড়া শিল্পাঞ্চ‌লের বি‌ভিন্ন প্রান্ত ঘু‌রল ক‌য়েক‌শো শ্রমিকের এই দীপ্ত মি‌ছিল, শ্লোগান উঠল শ্রমিক ছাঁটাই‌য়ের বিরু‌দ্ধে, মালিক বিড়লা আর তা‌দের পে‌টোয়া ম্যা‌নেজ‌মে‌ন্টের বিরু‌দ্ধে, শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার রক্ষার প‌ক্ষে, শ্রমিক ঐক্যের প‌ক্ষে; আর সব‌শে‌ষে সংগ্রামী শ্রমিকদের ইউনিয়নের নেতৃত্ব জানা‌লেন আগামী দি‌নেও এই আন্দোলন‌কে চা‌লি‌য়ে নি‌য়ে যাওয়ার কথা।

24135310_1640582619390363_1224124910_n


গার্মেন্টস আন্দোলনঃ শ্রমিকদের বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরতে হবে

সাম্প্রতিককালে আবারও গার্মেন্টস শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে নেমেছিলেন। উল্লেখ্য, গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায় ৮০ ভাগই হচ্ছেন নারী শ্রমিক। সাভারের আশুলিয়ায় এ আন্দোলনের সূচনা হলেও দ্রুতই শ্রমিকদের এ প্রাণের দাবিতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গার্মেন্টস এলাকায়ও তারা এ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান দাবি ছিল মূল মজুরি ১০ হাজার টাকাসহ মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকা করতে হবে। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পরিস্থিতিতে তাদের এই ন্যায্য দাবিকে শুরু থেকেই গার্মেন্টস মালিকপক্ষ মেনে নিতে অস্বীকার করে। আন্দোলন দমনে একদিকে চক্রান্ত করতে থাকে, অন্যদিকে শ্রমিকদেরকে নানারকম ভয়ভীতি দেখাতে থাকে, হুমকি দিতে থাকে। কিন্তু শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য আন্দোলন আরো জোরদারভাবে এগিয়ে নিতে থাকেন। দেশের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী জনগোষ্ঠীও এ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। এদের কোনো কোনো সংগঠন সরাসরি মাঠে শ্রমিকদের আন্দোলনে শামিল হয়। মালিকরা ঘাবড়ে যায়। এমনি পরিস্থিতিতে মালিকরা এবং তাদের সংগঠন বিজিএমইএ হাসিনা সরকারের মদদে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী দমন নামিয়ে আনে। একইসাথে তারা এ আন্দোলনকে “ষড়যন্ত্র” বলে। একপর্যায়ে শ্রমিকদেরকে না খাইয়ে মারার ষড়যন্ত্রে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য গার্মেন্টস বন্ধ করে দেয়। বড় ধনীদের হাসিনা সরকারও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মালিকদের পক্ষ নিয়ে এ আন্দোলনকে গার্মেন্টস শিল্পের বিরুদ্ধে, উন্নয়নের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দমনে নামে। তারা বলে যে, এটা হলো বহিরাগতদের কাজ। একইসাথে তারা আন্দোলনের নেতৃত্বকারী গার্মেন্টস শ্রমিকসহ বেশকিছু শ্রমিককে ছাঁটাই করে। এমনকি তারা যাতে অন্য কোনো গার্মেন্টসে কাজ নিতে না পারেন সে চক্রান্তেও নামে। মালিক-সরকার ফ্যাসিবাদী ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলে যে কোনোরকম মজুরি বাড়ানো হবে না। এ ধরনের চরম শ্রমিকবিরোধী অপতৎপরতার ফলে আন্দোলন থিতিয়ে এলে এক পর্যায়ে গার্মেন্টস খুলে দেয়া হয়।

শ্রমিক তথা শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে মালিক ও শাসকশ্রেণির এই আচরণ নতুন নয়। যখনই শ্রমিকরা অস্তিত্বের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য আন্দোলন করেছেন তখনই এরা একজোট হয়ে রাষ্টযন্ত্রকে ব্যবহার করে দমনে নেমেছে। এমনকি একে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলেছে, বহিরাগতদের তৎপরতা বলে আখ্যায়িত করেছে। ইতিহাসে এটা দেশভেদে বারবারই দেখা গেছে, দেখা যায়। ইতিহাসের এই বাস্তবতা অত্যন্ত সঠিকভাবেই মূল্যায়ন করেছে যে, উভয়পক্ষের স্বার্থ সম্পূর্ণই হচ্ছে দুটি বিপরীত শ্রেণিস্বার্থ। শ্রমিক তার একমাত্র সম্পদ শ্রম বিক্রি করে বেঁচে থাকার জন্য। বিপরীতে মালিকপক্ষ এই শ্রমিকদের শোষণ করে সীমাহীন মুনাফা বাড়িয়ে চলার জন্য। এটা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থার নিয়ম। এখানে পারতপক্ষে মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে তথা মৌলিক অধিকার দিতে নারাজ। কিন্তু শ্রমিকদেরও এসবের জন্য আন্দোলন ছাড়া উপায় নেই। তাদের তা করতেই হবে, তারা তা করবেনও। কিন্তু শ্রমিকদের এই শোষণমূলক ব্যবস্থায় আন্দোলন করে দফায় দফায় মজুরি বাড়িয়েও মানবেতর জীবন কোনো সমাধান নয়। তাদেরকে এই শ্রম-দাসত্বের দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তির জন্য শোষণমূলক এই সমাজব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে ফেলতে হবে। এজন্য তাদেরকে শাসকশ্রেণির হাত থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে হবে। এ এক বিপ্লবী দায়িত্ব। একে প্রধান কাজ হিসেবে নিতে হবে। নিজেদেরকে বিপ্লবী রাজনীতিতে শিক্ষিত ও সজ্জিত করতে হবে। পাশাপাশি দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে, সংগঠিতভাবে ও জোরদারভাবে চালিয়ে যেতে হবে। 

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা

 


ভারতঃ ম্যানেজারকে পুড়িয়ে খতম করায় দোষী মারুতির ৩১ শ্রমিক

শ্রমিককে দোষী সাব্যস্ত করল গুরগাঁয়ের আদালত। যদিও ঘটনার জেরে গ্রেফতার করা হয় ১৫০জন শ্রমিককে। ২০১২ সালে ম্যানেজারের সঙ্গে বচশা হাঙ্গামায় রূপ নেয়। ম্যানেজারকে ঘরে বন্ধ করে পুড়িয়ে মারে শ্রমিকরা। ম্যানেজমেন্টের অভিযোগ রড, লাঠি নিয়ে হামলা শুরু করে শ্রমিকরা। ইউনিয়নের তরফে দাবি করা হয়েছে  কারখানার গেট বন্ধ করে বাউন্সার দিয়ে শ্রমিকদের উপর প্রথমে হামলা করে ম্যানেজমেন্ট। আর তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন শ্রমিকরা। মারুতি কারখানায় শ্রমিকদের বঞ্চনার দীর্ঘদিনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ঠিকা শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালানো মারুতির কৌশল। স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিকদের মধ্য বেতন বৈষম্য প্রায় ৩গুন। এর জেরেও অসন্তোষ ছিল শ্রমিকদের মধ্যে। তাছাড়া শ্রমিকদের ইউনিয়ন করাও নাকি ভাল চোখে দেখেনি মারুতি ম্যানেজমেন্ট। সবমিলিয়ে ম্যানেজমেন্ট ও মারুতি শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল সেই সময়।

সূত্রঃ satdin.in


পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি(মাওবাদী বলশেভিক পুনর্গঠন আন্দোলন) এর দলিল-

poster

মিল-কারখানার রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর বিতর্কে আমাদের অবস্থান

 

সম্প্রতি কয়েকটি মিলকে রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খুলনার খালিশপুর শিল্পঞ্চলের শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদী আন্দোলনও করেছেন। আমাদেরখুলনা শাখার বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা পার্টির পরিচিতি গোপন রেখে এই আন্দোলনে শরিক হয়েছেন।  এটা খুবই ভালো। চলমান বিভিন্ন ধরনের শ্রেণিসংগ্রামে সর্বদাই অংশগ্রহণ করতে হবে।  শ্রেণির লোকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। শ্রেণিসংগ্রামে সর্বদাই সামনের কাতারে থাকতে হবে। এবং শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে থেকেই শ্রেণিসংগ্রামের ভুলগুলোকে তুলে ধরতে হবে।  ভুলগুলো সম্পর্কে শ্রেণির লোকদেরকে সচেতন করতে হবে। ভুলগুলোকে শোধরানোর চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রামের কর্মসূচিকে তথা তার আশু ও চূড়ান্ত লক্ষ্যকে স্পষ্ট করা, সেক্ষেত্রে কোনো ভুল থাকলে তাকে উদ্ঘাটন ও সংশোধনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের শ্রেণিসংগ্রামকে বিপ্লবী শ্রেণিসংগ্রামে রূপান্তরিত করা যায় না। এবং তা দ্বারা বিপ্লবেরও সেবা করা যায় না। ফলে তা অর্থনীতিবাদী-সংস্কারবাদী কর্মসূচি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে অর্থনীতিবাদী-সংস্কারবাদী-ট্রেড ইউনিয়নবাদী আন্দোলনের স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এবং তা দ্বারা শেষাবধি শ্রেণীশত্রুরাই লাভবান হয়।  এসম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। অথচ এক্ষেত্রে আমাদের খুলনা শাখার নেতা-কর্মীদের মধ্যে বেশ পরিমাণে সমন্বয়বাদের ঝোক দেখা গিয়েছিল।  যা ভুল।  তারা বিষয়টি সম্পর্কে এমনভাবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন যাতে মনে হবার অবকাশ থেকে যায় যে, আমরা যেনো ব্যক্তি মালিকানার বিপক্ষে রাষ্ট্রীয় মালিকানার পক্ষে।  অথচ আমরা দুটোরই বিপক্ষে এবং জনগণের মালিকানার পক্ষে।  আর জনগণের মালিকানা তো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।  তাই আমরা গণযুদ্ধের পক্ষে।  একথা সত্যি যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয় শাসক বড় ধনীশ্রেণির স্বার্থেই।  এবং এ হস্তান্তরের অর্থ হচ্ছে তাদের বর্ধিত মুনাফা। যার অর্থ হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণি ও শ্রমজীবী জনগণের ওপর বর্ধিত লুন্ঠন ও নিপীড়ন।  তাই শ্রমিকশ্রেণির তার বিরুদ্ধে ও সংগ্রাম করেন। আমরা কমিউনিস্টরা যেহেতু মানব কর্তৃক মানব শোষণের বিরুদ্ধে সেহেতু যে কোনো বর্ধিত লুন্ঠনেরও বিরুদ্ধে।  তাই আমরা শ্রমিকশ্রেণির ট্রেড ইউনিয়নধর্মী এই ধরনের আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করি। কিন্তু নিছক অংশগ্রহণের জন্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করাটা আমাদের কর্তব্য নয়। আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তাকে বিপবের কর্মসূচিতে সজ্জিত করা ও তার ভিত্তিতে আন্দোলনকে পরিচালিত করার জোরালো চেষ্টা চালানো আমাদের দায়িত্ব।  এক্ষেত্রে খুলনা শাখার কমরেডদের মধ্যে যে ভুল প্রবণতা দেখা দিয়েছিল সেটা এসেছিল প্রাসঙ্গিক বিষয়টির রাজনৈতিক প্রকৃতি সম্পর্কে অস্পষ্টতা থেকে। তাই প্রাসঙ্গিক বিষয়টির রাজনৈতিক প্রকৃতির উন্মোচনের মধ্য দিয়েই একে কাটিয়ে তুলতে সহায়তা করা সম্ভব। এই নিবন্ধের মধ্য দিয়ে সংক্ষেপে তাই করার চেষ্টা হয়েছে।

মিল-কারখানার রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর নিয়ে বিতর্কটি আমাদের দেশে নতুন নয়, বরং বেশ পুরাতনই।  এই বিতর্কে দুটো পক্ষই বেশ সোচ্চার।  এক পক্ষ হস্তান্তরের পক্ষে।  এবং অন্য পক্ষ হস্তান্তরের বিপক্ষে।  হস্তান্তরের পক্ষে যারা তাদের যুক্তি হচ্ছে হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দেশ-জাতিজনগণ তথা রাষ্ট্র উপকৃত হবে। বিপরীত পক্ষের যুক্তি হচ্ছে, হস্তান্তর হলে তাতে দেশ-জাতি-জনগণ তথা রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে। অথচ কোনো পক্ষই প্রামাণ্যভাবে দেখাচ্ছেন না যে, ইতোপূর্বে যে সব হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে তাতে দেশজাতি-জনগণের কি সব উপকার হয়েছে? অথবা যে সব মিল-কারখানার হস্তান্তর প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি সেগুলো দ্বারাই বা দেশ-জাতি-জনগণ কিভাবে উপকৃত হচ্ছেন?

আসলে হস্তান্তরের পক্ষে-বিপক্ষে দেয়া বক্তব্যসমূহ হচ্ছে ফালতু প্যাঁচাল। এসব ফালতু প্যাঁচালের মধ্য দিয়ে আসল বিষয়টিকে আড়াল করে ফেলা হচ্ছে। এসব তুচ্ছ বিতর্ক ক্ষমতাসীন বড় ধনীশ্রেণি আর তাদের উচ্ছিষ্টভোগীদের স্বার্থেই করা হচ্ছে, জনগণের স্বার্থে নয়।

প্রকৃত বিষয় হচ্ছে এই যে, ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণির স্বার্থেই প্রয়োজন ভিত্তিক এক সময়ে মিল-কারখানাগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া হয়েছিল এবং এখন আবার তাদের শ্রেণিস্বার্থেই সেগুলোকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হচ্ছে।  এক্ষেত্রে কখনো জনগণের স্বার্থ বিবেচ্য বিষয় ছিল না এবং এখনো নেই।

আমাদের দেশের বর্তমান শাসকশ্রেণি হচ্ছে বাঙালি আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণি।  এরা হচ্ছে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল। এবং দেশীয় সামন্তবাদের রক্ষক।  ৭২ সালের পূর্ববর্তী সময়কালে এরা প্রধানত শাসন ক্ষমতায় ছিল না, বা থাকলেও তা ছোট শরিক হিসেবেই ছিল। তখন আমাদের পূর্ববাংলা নামক ভূখণ্ডটি ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের অংশ। এবং অখণ্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল প্রধানত পাকিস্তনপন্থী অবাঙালি আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণি।  তারাও ছিল মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের দালাল ও সামন্তবাদের রক্ষক।  পাকিস্তানি উপনেবেশিক শাসকগোষ্ঠীর জাতীয় নিপীড়নকে যখন আমাদের দেশের জনগণ বিরোধিতা করেছিলেন তখন তাতে বাঙালি জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণি এবং এমনকি বাঙালি আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণির একটা অংশও যোগ দিয়েছিল।  নিজেদের বিকাশের অপরিহার্য স্বার্থেই তারা তা করেছিল।  কেননা তারা ছোট পুঁজির মালিক ছিল এবং পুঁজিকে বড় করার জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন নিরাপদ বাজার তাদের জন্য অপরিহার্য ছিল।  ’৭১ সালে জনগণের মুক্তি সংগ্রামকে কাজে লাগিয়ে এবং তাকে বিপথগামী করে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের প্রত্যক্ষ মদদে এরা “বাংলাদেশ” নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে তার শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল।  এবং রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে পরিণত করেছিল নিজেদের স্বার্থরক্ষক রাষ্ট্রযন্ত্রে।  আর রাষ্ট্রব্যবস্থাটাকে পরিণত করেছিল নিজেদের স্বার্থরক্ষক রাষ্ট্রব্যবস্থায়।  ফলে তখন এই শাসকশ্রেণিটা নিজেদের বিকাশের স্বার্থে যা প্রয়োজন, ঠিক তাই করেছিল।  সে সময়ে পাকিস্তানি “বিগ-ব্রাদার”-দের ফেলে যাওয়া বড় বড় মিল-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালনা করার মতো পুঁজির জোর এবং ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমত কোনোটাই এদের ছিল না।  ফলে পুঁজির দ্রুত বিকাশ এবং ব্যবস্থাপনা গত সক্ষমতা অর্জন করাটাই তখন তাদের আশু লক্ষ্য ছিল।  এবং যেহেতু পুঁজিবাদের প্রাথমিক অবস্থায় পুঁজির দ্রুত বৃদ্ধির স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে লুটেরা অর্থনীতি, সেহেতু আমাদের দেশের শাসকশ্রেণি তাদের দ্রুত বিকাশের স্বার্থে সেই লুটেরা অর্থনীতিকেই গ্রহণ করেছিল। এই লুটেরা অর্থনীতিরই প্রকাশ ছিল শত্রু  সম্পত্তি আইন ও অর্পিত সম্পত্তি আইনের ব্যানারে মিল-কারখানাগুলোকে রাষ্ট্রীয় খাতে নেয়া।  এবং তার মধ্য দিয়ে সেগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রতারণাপূর্ণ সিল মারা।  বাস্তবে রাষ্ট্রের মালিকানা ছিল উঠতি বড় ধনীশ্রেণির এবং তাই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মিল-কারখানাগুলোরও প্রকৃত মালিক বনে ছিল তারাই। ফলে তথাকথিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মিল-কারখানাগুলো ছিল উঠতি ধনী শ্রেণির আর তাদের উচ্ছিষ্টভোগীদের সীমাহীন লুটপাটের দায় ভোগ করতে হয়েছে জনগণকে। ফলে জনগণ গরিব থেকে গরিবেতর হয়েছেন এবং মুষ্টিমেয় লুটেরা ধনী ফুলে কোলাব্যাঙ হয়েছে। এভাবে লুটেরা ধনীশ্রেণিটির বড় পুঁজি গড়ে উঠেছে।  তাদের পরিচালনাগত তথা চোট্টামীর বর্ধিত সামর্থ অর্জিত হয়েছে।  এদের দালালীর যোগ্যতা সম্পর্কে বিদেশী মুরুব্বীদের আস্থা সৃষ্টি হয়েছে।  এবং এদের মাধ্যমে তারা বর্ধিত মুনাফার জন্য বর্ধিত পুঁজি লগ্নি করাটাকে নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় মনে করেছে।  ফলে বিদেশী প্রভু এবং এদেশীয় শাসকশ্রেণি- উভয়ের স্বার্থেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মিল-কারখানাগুলোকে এখন ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। যাতে বর্ধিত মুনাফা লুটে এরা আরো স্ফীত হতে পারে এবং তার দায় যথারীতি জনগণকেই বহন করতে হয়।  শাসকশ্রেণির শ্রেণিহিসেবে সুসংহত ও শক্তিশালী হওয়ার জন্য এখন যা খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

ফলে এটা খুবই পরিষ্কার যে, জনগণের স্বার্থে নয় বরং শাসকশ্রেণির নিজস্ব শ্রেণিগত বিকাশের স্বার্থেই মিল-কারখানাগুলোকে এক সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া হয়েছিল এবং নিজ শ্রেণির উচ্চতর বিকাশের স্বার্থেই এখন আবার মিলকারখানাগুলোকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হচ্ছে।  অর্থাৎ, মিলকারখানাগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় খাতে লুটপাট চালিয়ে ধনীশ্রেণিকে আরো বড় ধনী হবার সুযোগ করে দেবার জন্য।  এবং বড় পুঁজি গড়ে ওঠার পর ও স্থূল লুটপাটের অর্থনীতির প্রতি জনগণের ঘৃণা সৃষ্টির কারণে ভিন্নরূপে বর্ধিত মুনাফার জন্যই এখন আবার মিল-কারখানাগুলোকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রেই বলী হয়েছেন ও হচ্ছেন সাধারণ জনগণ।

সুতরাং দাবি বা কর্মসূচি হতে পারে একটাই, এবং তা হচ্ছে, জনগণের সম্পদ জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনা। মিল-কারখানা যেহেতু জনগণের সম্পদ,  তাদের রক্ত নিংড়ে বের করা প্রতিটা পয়সা এক জায়গায় জড় করেই এসব সম্পদ গড়ে উঠেছে ও টিকে আছে, সেহেতু তার প্রকৃত মালিক হচ্ছেন জনগণের হাতে জনগণের সম্পদ ফিরিয়ে আনার উপায় হচ্ছে একটাই।  এবং তা হচ্ছে গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শাসকশ্রেণি আর তাদের বিদেশী প্রভু ও দেশীয় দোসরদেরকে উৎখাত করা। এদের স্বার্থরক্ষক রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করা। এবং শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত- জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণির নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা, রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

এই রাজনৈতিক কর্মসূচি ও লক্ষ্যকে স্পষ্ট না করে এবং তাকে বারংবার শ্রমিকদের সামনে না এনে, নিছক আন্দোলন কোনো বিপ্লবী আন্দোলনে পরিণত হতে পারে না।  এবং ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণকেও ট্রেড ইউনিয়নবাদী অভিজাত সুবিধাবাদী তথাকথিত শ্রমিক নেতাদের খপ্পর থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় মিল-কারখানাগুলোকে হস্তান্তরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলনের স্বাভাবিক অর্থ কী? তা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রাখার পক্ষে আন্দোলন। এর দ্বারা কারা লাভবান হয়? তা কোন শ্রেণির স্বার্থের পক্ষে যায়? ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর যেমনি মালিক বড় ধনীদের পক্ষে যায় তেমনি রাষ্ট্র যেহেতু তাদের, তাই রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রাখার দাবি ও আন্দোলনও তাদেরই স্বার্থের পক্ষে যায়।  এসব হচ্ছে জনগণের শত্রু  সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল ও সামন্তবাদের রক্ষক আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণির লেজুড় ও উচ্ছিষ্টভোগী ট্রেড ইউনিয়নবাদী অভিজাত সুবিধাবাদী তথাকথিত শ্রমিক নেতাদের চালবাজী।  রাষ্ট্রীয় মালিকানায় বড় ধনীদেরকে সীমাহীন লুটপাট চালানোর সুযোগ প্রদানের মধ্য দিয়ে এরা তার ভাগ পায়। ব্যক্তি মালিকানায় যা কমে যায়।  ফলে তারাই মিল-কারখানাকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরের বিপক্ষে থাকে সর্বদাই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। অন্যদিকে, হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় ইস্পিত ফললাভে বঞ্চিত বড় ধনীদের একটা অংশও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে বেকায়দায় ফেলার জন্য আপাতভাবে নির্দিষ্ট হস্তান্তরের বিরোধিতায় নামে। এক্ষেত্রে তারা কাজে লাগায় ট্রেড ইউনিয়নবাদী অভিজাত শ্রমিক নেতাদেরকে এবং তাদের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করে সাধারণ শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণকেও ব্যবহার করে।

এসবকে আমাদের বিরোধিতা করতে হবে। এসবের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।  এবং মিল-কারখানাসহ সকল সম্পদের ওপর, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর শ্রমিকশ্রেণির ও তার নেতৃত্বে অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণিগুলোর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার দাবি বা কর্মসূচিকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।  এটাই হচ্ছে আমাদের অবস্থান। এবং তার ভিত্তিতে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরের বিরুদ্ধে আমাদের ধ্বনি হচ্ছে –

মিল-কারখানাসহ জনগণের সকল সম্পদ নিয়ে শাসক প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণির ক্রমাগত ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকে বিরোধিতা করুন। জনগণের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য অপরাজেয় গণযুদ্ধ গড়ে তুলুন।  নয়াগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন।  সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের লক্ষ্যে এগিয়ে চলুন। মানব কর্তৃক মানব শোষণের চির অবসান ঘটান।

 দ্বিতীয় সপ্তাহ, এপ্রিল ২০০২

[ নোট: আমাদের খুলনা শাখার দায়িত্বে নিয়োজিত উচ্চতর প্রতিনিধি কমরেডের প্রেরিত একটি লিফলেটের খসড়ার জবাবে কমরেড মোহাম্মদ শাহীন গত জানুয়ারিতে যে সমালোচনামূলক পত্র পাঠিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে এই নিবন্ধটি রচিত হয়েছে।  নিবন্ধটি হচ্ছে মূলত পত্রে বর্ণিত দৃষ্টিভঙ্গিরই সারসংক্ষেপ।  -সম্পাদনা বোর্ড, স্ফুলিঙ্গ]

 

সূত্রঃ pbspmbrm


বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবন- দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও শাসক শ্রেণি

Bangladeshi-female-migrant-workers

বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবন দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও শাসক শ্রেণি

 

মধ্যযুগে ইউরোপ থেকে সাদা চামড়ার বিত্তশালী মানুষরা আফ্রিকায় গিয়ে বন্দুকের ডগায় জোর কারে কালো নারী-পুরুষদের ধরে ধরে জাহাজে করে ইউরোপে নিয়ে দাস মালিকদের কাছে বিক্রি করত। আজকের বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সে বর্বরতার রূপের দিক থেকে কিছু পরিবর্তন হলেও সারবস্তুগত কোনই পরিবর্তন হয়নি। আধুনিক সভ্য সমাজে মানুষ পাচারের কাহিনী ভিন্ন। জনশক্তি রপ্তানির নামে বিদেশে দরিদ্র নারী-পুরুষদের বেশুমার পাচার করে দেশী-বিদেশী দালালচক্র কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুটছে। এই দালাল চক্র আর কেউ নয় দেশের এবং বিদেশের পুঁজিপতি শাসক শ্রেণিরই অংশ।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর এ দেশের শাসকশ্রেণি দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসংস্থান করতে ব্যর্থ হয়ে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানী করছে। এই সুবাদে দেশে এবং বিদেশে গড়ে উঠে বৈধ-অবৈধ হরেক রকমের রিক্রুটিং এজেন্সি। এরা আদম ব্যবসায়ী নামে পরিচিত। এই আদম ব্যবসায়ী দালাল চক্র উন্নত জীবন, ভালো চাকরী, মোটা অংকের বেতন ইত্যাদির  লোভ দেখিয়ে দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের বিদেশগামী করে। ’৮০’র দশক থেকে শুরু হওয়া এই মানব পাচার একবিংশ শতাব্দিতে জনস্রোতে রূপান্তরিত হয়। এই মানব পাচারে নারী পাচারও চলে সমান তালে। দরিদ্র নারীরা এই প্রলোভনে পড়ে ভিটে-মাটি বিক্রি বা ঋণ করে লক্ষ লক্ষ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়।

গৃহকর্মী, হাসপাতালের আয়া, নার্স, গার্মেন্ট শ্রমিক বা অন্যান্য শ্রমজীবী পেশার, এমনকি বিয়ের প্রলোভনে ফেলেও হাজার হাজার নারীকে  দেশ থেকে পাচার করা হচ্ছে। এই নারীদের পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করা হচ্ছে বা পতিতা হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আর যারা শ্রমিক হিসেবে পেশায় নিয়োজিত হতে পারছেন তারাও নানাভাবেই শোষণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, বিশেষত যৌন নির্যাতনের শিকার।

গৃহকর্মী বা অন্যান্য পেশার নামে দালাল চক্র হাজার হাজার দরিদ্র নারী ও শিশুদের ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে  পাচার করছে। মালয়েশিয়ায়ও যে পাচার করা হচ্ছে তা গত বছর সাগরে ভাসা মানুষের চিত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে।  ২৮ মে, ২০১৫-এর পত্রিকায় প্রকাশ, বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের ক্ষেত্রে ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ভারত। “সেভ দ্য চিল্ড্রেন” জরিপ সুত্রে জানা যায় বিগত পাঁচ বছরে শুধু ভারতেই পাঁচ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের বরাত দিয়ে ইউএনডিপি’র ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৩ লাখ নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানে পাচার হয়েছে ২ লাখ নারী ও শিশু। এই নারী ও শিশুর বয়স ১২-৩০ বছরের মধ্যে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও শিশু ভারত পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে থাকে। এই সব নারীর বেশীর ভাগ পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হন। ভারতীয় সমাজ কল্যাণ বোর্ডের এক তথ্য থেকে জানা যায় সেখানকার বিভিন্ন পতিতা পল্লীতে প্রায় ৫ লাখ পতিতা কর্মী রয়েছে। এর বেশীর ভাগ বাংলাদেশী। চাকুরী, বিয়ে এবং আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে এই নারীদের পাচার করা হয়েছে ও হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও একই পরিণতির শিকার নারী ও শিশুরা। হাসপাতালে চাকুরী দেয়ার কথা বলে কাতারে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছু নারীকে পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। সেখানে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের মনোরঞ্জন করাসহ দুর্বিসহ জীবনে আটকে পড়েছে কয়েকশ বাংলাদেশী নারী। শুধু কাতারেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কয়েকশ’ পতিতালয়ে বাংলাদেশী তরুণী-যুবতীরা পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন। দুবাইয়ের পতিতালয়, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পানশালা এবং ফ্লাটসমূহে নারীর রমরমা বাণিজ্য ব্যাপকভাবেই চলছে। দুবাইয়ের পত্রিকাসূত্রে জানা গেছে শুধু দুবাইতেই অন্ততঃ ৩০ হাজার বাংলাদেশী নারী ইচ্ছা-অনিচ্ছায় দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।

 এ সময় সিরিয়া থেকে তিনজন নারী দেশে ফিরে আসার পর তাদের সাক্ষাৎকার টিভিতেও প্রচার করা হয়। এরপর পরই পুলিশ-প্রশাসনের কার্যালয়ে ভুক্তভোগীদের পরিবার পরিজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। ১৭/৯/১৫ এ এমন ৩৫ জনের নাম ঠিকানা পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। যারা দেশে পরিবার-পরিজনের কাছে সংবাদ পাঠাতে পারছেন তারাই হয়ত উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। আর যারা পারছেন না, তারা হয়তো অন্ধকার জীবনেই পচে মরছেন। অনেকেই হয়তো এর সাথেই মানিয়ে চলছেন অসহায় হয়ে।

বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবনের কথা পত্র-পত্রিকায় প্রচার হওয়ার কারণেই গত বছর  মে-জুনে সরকার সৌদী আরবে (৩ পৃষ্ঠায় দেখুন) ২০ হাজার গৃহকর্মী এবং মাসে মাসে ১০ হাজার করে গৃহকর্মী পাঠানোর ঘোষণা দিলেও সে পরিমাণ সারা পায়নি। ২০০৮ সালে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রম বাজার বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি আরব এ সময় শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভিয়েতনাম, মৌরতানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন থেকে গৃহকর্মী নিচ্ছিল। গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া মেয়েরা শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় এই সব দেশ থেকে এখন নারী কর্মী পাঠনো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণেই সৌদি আরব এখন বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নেয়ার চুক্তি করেছে।

 যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ পেয়েছেন তারাও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। ভোর ৫টা থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। সৌদি আরবে পাঠানো গৃহকর্মীদের বেতন ধরেছে মাত্র ৮০০ রিয়াল যা বাংলাদেশের টাকায় ১৬/১৭ হাজার টাকা। লেবানন থেকে ফেরত আসা এক নারী শ্রমিক থেকে জানা যায় গৃহকর্মী হিসেবে তার বেতন ছিল মাত্র ১২ হাজার টাকা। অন্যান্য দেশের গৃহকর্মী এবং গার্মেন্ট শ্রমিকরাও এই পরিমাণ বেতনই পেয়ে থাকেন। বিদেশে নারী শ্রমিকরদেরও মজুরী কম এবং তারা মজুরী বৈষম্যের শিকার। অসুস্থ হলে চিকিৎসা না করে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

 গৃহকর্মীদের বন্দী জীবন-যাপন করতে হয়। ঘরের বাইরে একাকী যেতে দেয়া হয় না, বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে দেয়া হয় না। যদি তারা পালিয়ে গিয়ে অন্যত্র কাজ নেন। গৃহমালিকরা বাড়ীর বাইরে গেলে ঘরে তালা লাগিয়ে যায়। অমানুষিক ও অতিরিক্ত কাজ করানো হয়। অনেকেই শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন।  ইচ্ছা করলেও চাকরী পরিবর্তন করতে পারে না বা করলেও টাকা পয়সা আদায় করা যায় না। বা তা আদায় হলেও দালালরা নিয়ে নেয়। এই সব গৃহশ্রমিকগণ গৃহকর্তা এবং তাদের ছেলেদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হন হরহামেশাই। যৌন নির্যাতনের শিকার নারীরা অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাদেরকেই আবার অনৈতিক সম্পর্কের জন্য কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের আদালতগুলোতে। এই নারীদের শাস্তিস্বরূপ শারিরীক নির্যাতন করা হয়।

২৭ অক্টোবর ‘১৫ এ পত্রিকায় প্রকাশ গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময় ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্তা হয়ে পড়া শত শত নারীকে ব্যভিচারের দায়ে বিচার করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। -দ্য গার্ডিয়ান বিবিসির এক গোপন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শেকল দিয়ে বেঁধে আদালতে বিচারকের সামনে হাজির করা হচ্ছে। লন্ডনের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নারী অধিকার গবেষক রথনা বেগম বলেন ‘……… যৌক্তিকভাবে এই অপরাধের জন্য নারী ও পুরুষ উভয়কে দন্ডিত করা উচিত হলেও কেবল নারীরাই আসছেন বিচারের আওতায়। কেননা গর্ভধারণকেই দেখা হচ্ছে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে’। অথচ বিচার হওয়া উচিত শুধুই গৃহমালিকদের। কারণ প্রবাসী গৃহশ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে গৃহমালিকরা তাদের উপর যৌন নির্যাতন চালায়। গৃহমালিকদের এই পশু চরিত্রের কারণেই সুন্দরী গৃহকর্মী নিতে সৌদি নারীদের  আপত্তি দেখা যায়।

পাকিস্তানে পাচার হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা পতিতাবৃত্তি ছাড়াও কোন কোন পুরুষের তিন নম্বর চার নম্বর স্ত্রীর মর্যাদা পেয়ে থাকেন। বয়স্ক নারীদের ক্ষেতে-খামারে শ্রমমূলক কাজে নিয়োজিত করে। যাদের অমানুষিক পরিশ্রম করে জীবন ধারণ করতে হয়। এই নারীরা শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। বিদেশে নারী শ্রমিকগণ বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তেমন কোন সহযোগিতা পান না।

লক্ষ লক্ষ দরিদ্র নারীরা সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে মোটা বেতনের আশায় মা-বাবা, স্বামী-সন্তানের মায়া ত্যাগ করে ভিটে-মাটি বিক্রি করে বা ধার-দেনা করে সুদূর প্রবাসে ছুটে যান। কিন্তু  শ্রমিক পেশায় নিয়োগ প্রাপ্তরাও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন পূঁজিবাদী শ্রমশোষণের ব্যবস্থার নিয়মানুসারেই। তাই অকাট্য প্রমাণ দিয়েই বলা যায় প্রবাসী নারী শ্রমিকরা নারী এবং শ্রমিক এই দ্বৈত শোষণের শিকার।

সুতরাং পুরুষতান্ত্রিক এই পুঁজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় যত নারী অধিকারের কথা বলা হউক না কেন দেশে বিদেশে এবং পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই পুঁজিপতিরা নারীকে ভোগ্যপণ্য এবং ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি শুধু মুনাফা লুটার ধান্ধায় থাকে। নারীর শ্রম এবং যৌনতাকে মুনাফার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তারা গণ্য করে। তাই সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ  মুনাফার জন্য মদ-গাজা-হিরোইন, সোনা-দানা পাচারের সাথে নারীকেও পাচার করে। আর এই বিদেশী পাচারকারীদের সাথে যুক্ত এ দেশের শাসকশ্রেণি। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকা, টিভি-রেডিও প্রভৃতি প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও প্রতিবেদনের অসংখ্য তথ্য থেকে এ সত্য বেড়িয়ে আসছে যে এসব পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে তথাকথিত জনপ্রতিনিধি, বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতা, মোড়ল শ্রেণির লোকরা। মানব পাচারকারী দালালদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ইউপি চেয়াম্যান, মেম্বার এবং মাতাব্বরা মদদ দিয়ে থাকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সংসদস সদস্যরা পর্যন্ত এই মানব পাচারের সাথে যুক্ত। শুধু আওয়ামী শাসকগোষ্ঠিই নয়, শাসকশ্রেণির সকল গোষ্ঠিই এ পাচারের সাথে যুক্ত। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং অর্থনীতিই দেশী-বিদেশী শাসকশ্রেণিকে এই পথে চালিত করে।

তাই, শ্রমিক-কৃষক ও দরিদ্র শ্রেণির নারীদেরকে শোষণ-নির্যাতনের হাত থেকে তাদের মুক্তির জন্য পুঁজিবাদী এই বিশ্ব ব্যবস্থা উচ্ছেদের জন্য বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে হবে এবং নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে তাদের ভূমিকা রাখাতে হবে। একটি প্রগতিশীল বিশ্বব্যবস্থা তথা শোষণ মুক্ত সমাজ সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। তা হলেই বিশ্ব পুঁজিপতিদের মুনাফার হাতিয়ার হওয়া থেকে নারীরা মুক্ত হতে পারবেন। মানুষ হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার আসনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।


বিশ্বব্যাপী শ্রমিক-কৃষক-জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে

turkey-anti-mining-protest-juoly-8-2015

সাম্রাজ্যবাদীরা মন্দা থেকে বের হওয়ার জন্য একদিকে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণের অর্থে উদ্ধার ও উদ্দীপক কর্মসূচি, কৃচ্ছতা সাধনের কর্মসূচির নামে সঙ্কটের বোঝা আরও বেশি বেশি করে জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মজুরি, বেতন, পেনশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনকল্যাণ খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে দিয়ে ছাঁটাই, বেকারত্ব, করের বোঝা বৃদ্ধি করে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণকে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট, আরও দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করছে। শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্ব সুতীব্র হওয়া এবং একচেটিয়া পুঁজির তীব্রতর আক্রমণ মোকাবেলায় আমেরিকা, ইউরোপসহ পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোসহ বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক, যুবক, জনতা বিভিন্ন রূপে আন্দোলন, বিক্ষোভ-সমাবেশ, ধর্মঘট-সাধারণ ধর্মঘট তীব্রতর করে চলেছে। দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাসমূহের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

২৩ মে বিশ্বের বৃহত্তম বীজ কোম্পানি মনসান্তোর বিরুদ্ধে ৪৮টি দেশের ৪৫২টি শহরে প্রচন্ড বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। মনসান্তো হচ্ছে জিএম ফুড, হাইব্রিড বীজ, পরিবেশ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের বৃহত্তম উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণকারী যুক্তরাষ্ট্রের একটি একচেটিয়া কোম্পানি। এ প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম কৃষিভিত্তিক বায়োটেক কোম্পানির জনগণ ও প্রকৃতি বিধ্বংসী ও দুষণকারী ক্ষতিকর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয় দেশে দেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক, শ্রমিক, জনগণ।

যুক্তরাষ্ট্রে তেল শোধনাগারের শ্রমিকরা ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালের পর বৃহত্তম ধর্মঘট ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত করে। ৯টি শোধনাগারের শ্রমিকরা ছাঁটাই ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ২ মার্চ থেকে সফল ধর্মঘট চালিয়ে যায়। ইস্পাত শ্রমিকরা মজুরি নিয়ে নতুন চুক্তির দাবিতে ধর্মঘট সংগঠিত করে। ম্যাগডোনালসহ ফাস্ট ফুডের কর্মচারীরা ঘণ্টায় ১৫ ডলারের দাবিতে ১৫ এপ্রিল সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী ধর্মঘট করে। হাজার হাজার শ্রমিক এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা, একচেটিয়া পুঁজির শোষণ-লুন্ঠন, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি, বর্ণবৈষম্যবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে গোটা আমেরিকাব্যাপী প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত হয়ে চলেছে। ফার্গুসন শহরে মাইকেল ব্রাউন পুলিশের গুলিতে এবং মেরিল্যান্ড স্টেটের বাল্টিমোর শহরে ফ্রেডি গ্রে পুলিশের কাস্টিডিউতে নিহত হলে পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। বিক্ষোভ ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষ এত তীব্র আকার ধারণ করে যে তা দমনে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে ফ্যাসিবাদী দমন পীড়ন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আরও প্রচন্ড বিক্ষোভের লক্ষণসমূহ সামনে আসায় তা দমনের জন্য পুলিশ, প্রশাসন, ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবসে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমাবেশ, র‌্যালি, বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে হতাহত ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। একই দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিন জু অ্যাবের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় লস এঞ্জেলসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপরাধের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

৮ মার্চ ব্রাজিলে সরকারের দুর্নীতি ও গণবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে রাজধানী ব্রাসিরিয়ায় ১০ লক্ষ লোকের বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। তাছাড়া ৭ এপ্রিল পুলিশের গুলিতে এক বালক নিহত হলে ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। মার্চ মাসে ইসরাইলে লে-অফের প্রতিবাদে ট্রেড ইউনিয়ন সাধারণ ধর্মঘট সংগঠিত করে। ইসরাইলের ডাক, বিমান বন্দর, বিদ্যুৎ, পানি শ্রমিকরা এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। ফ্রান্সের ফেরি শ্রমিকরা ধর্মঘট করলে বন্দর অচল হয়ে যায়। আফ্রিকায় নাইজেরিয়ার আবুজা স্টিল মিলের ৪ জন শ্রমিককে চাকুরীচ্যুত করলে শ্রমিকরা ধর্মঘট সংগঠিত করে। নাইজেরিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে ধর্মঘট পালন করে। আরব আমিরাতের দুবাই-এ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত অভিবাসী শ্রমিকরা দুবাইভিত্তিক এমার প্রপার্টিস-এর শ্রমিকরা অধিকতর মজুরির দাবিতে ধর্মঘট সংঘটিত করে। জার্মানিতে ২টা বিমান বন্দরের গ্রাউন্ড ক্রু’রা ৬ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করে। ১ এপ্রিল পূর্ব ইউরোপের ৬টি দেশ এস্তোনিয়া, লিথুনিয়া, ল্যাটভিয়া, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্রের উপর দিয়ে ১২০টি সামরিক যান নিয়ে ন্যাটো বাহিনী জার্মানির অভিমুখে মার্চ করার সময় কোন কোন জায়গায় জনগণ ‘ফিরে যাও’, ‘ট্যাংক নয়, শান্তি’ ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ৫ এপ্রিল জার্মানিতে ন্যাটোর যুদ্ধোন্মোদনার বিরুদ্ধে রাজধানী বার্লিনসহ বিভিন্ন শহরে ৮০টির বেশি র‌্যালী ও সমাবেশ সংঘটিত হয়। ২২ এপ্রিল ইউক্রেনের কয়লা শ্রমিকরা রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ১ ও ২ মে আয়ারল্যান্ডের বাস শ্রমিকরা বাস সার্ভিস ব্যাক্তি মালিকানাকরণের বিরুদ্ধে ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট করে এবং আরও ৫ দিনের ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। গ্রিস, স্পেনসহ ইউরোপের দেশে দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, সমাবেশ, ধর্মঘট সংঘটিত হয়। বিনা বেতনে শিক্ষার দাবিতে ২৯ মে চিলিতে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ সংঘঠিত হয়।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৯, রোববার।। ২০ ডিসেম্বর ২০১৫।।


ভারত/পশ্চিমবঙ্গ: জীবিকা এবং বিকল্প রাজনীতি অনুসন্ধানের জন্য রাজ্য ব্যাপী প্রচারণা, অক্টোবর ১-৯

Poster--663x1024