সিপিআই(মাওবাদী) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক ‘আকাশ’ এর সাক্ষাৎকার

Maoist-Flag

হাওয়াই চপ্পল আর সাদা শাড়ি মমতা সরকারের আসল চেহারা নয়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীদের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে উঠেছে। শুধু অস্ত্রের জোরে তাদের এই অবস্থান গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সুবিধাবঞ্চিত নির্যাতিত নিপীড়িত জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন। তারা জনগণের জন্য বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সেবা দেবার জন্য স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা, ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য গণআদালত গড়ে তোলা, শিশুদের শিক্ষার জন্য স্কুল নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ এমন কি মুক্তাঞ্চলে শাসন পরিচালনা করার জন্য গণকমিটি গড়ে তোলা, যা কিনা একটি সমান্তরাল সরকার হিসেবে কাজ করে। মাওবাদীরা লালগড় ও সিঙ্গুড়ে সফল আন্দোলন পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে।
মমতা ব্যানার্জী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি মাওবাদীদের দমনের জন্য ১০ হাজার নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ দিয়েছে। সরকার স্বাভাবিকভাবেই মাওবাদীদের গৃহীত যে কোনো পদক্ষেপের বিরোধী। এ কারণেই দুই পক্ষের উন্নয়ন কার্যকলাপ পরস্পরের মধ্যে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। মাওবাদীদের অভিযোগ সরকারের উন্নয়ন তৎপরতা জনগণের জন্য কার্যকর নয়, কারণ সেগুলোতে জনগণের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়নি। এছাড়াও বরাদ্দের টাকা লুটপাট হয়ে যায়। অপরদিকে সরকারের অভিযোগ মাওবাদীরা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মাওবাদী)’র অন্যতম নেতা, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার সম্পাদকআকাশ এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তেহেলকা ডট কমের সঙ্গে

আপনাদের সামরিক ও রাজনৈতিক রণকৌশল সম্পর্কে বলুন। মমতা ব্যানার্জীর সরকার সম্পর্কে আপনাদের পার্টির মূল্যায়ন কি? আপনারা কি লক্ষ নিয়ে কাজ করছেন?
আকাশ : সারা ভারতের জন্য আমাদের কৌশল এক ও অভিন্ন। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় পরিস্থিতির বিবেচনায় আমাদের প্রতিনিয়তই নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গের সব স্থানে আমরা একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করছি না। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান এবং রাজ্যের আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য দরিদ্র মানুষের বসবাস। যেখানে ক্ষুধা একটি মারাত্মক সমস্যা সেখানে আমাদের যুদ্ধকৌশল ও কর্মপদ্ধতি ভিন্ন। আমরা তাদের জীবন মানের উন্নতির জন্য কাজ করছি। তাদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যক্যাম্প পরিচালনা করছি, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে রাস্তা ও ঘরবাড়ি নির্মাণ করছি। শিশুদের জন্য স্কুল খোলা হয়েছে। ন্যায় বিচারের জন্য বিচার কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়াও দারিদ্র্য, নির্যাতন, নিপীড়ন আর অবহেলা থেকে চিরতরে মুক্তির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে তাদের সংগঠিত করার কাজ চলছে। কিন্তু সরকার আমাদের উন্নয়ন কার্যকলাপগুলোয় বাধা দেয়। অথচ তারা উন্নয়নের নামে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করে সেগুলো জনগণের কোনো কাজে আসে না। বরাদ্দের টাকা সবই লুটপাট হয়ে যায়।
বাংলার মানুষের উন্নতির জন্য মমতা ব্যানার্জী যদি সত্যিই কাজ করেন তাহলে আমরা তাকে অভিনন্দিত করব। যদিও সে জনগণের জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তথাকথিত গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক অধিকারী মমতা ব্যানার্জী স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর উদাহরণ হলো তৃণমূল এমপি মুকুল রায় যখন রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল তখন তিনি মমতার সম্মানে তার ব্যবহারের জন্য নতুন ধরনের আসন বিন্যাস ব্যবহার করেছিল। এই ঘটনায় আমার মনে হলো, রামায়ণের কাহিনীতে রামের চপ্পল সিংহাসনে রেখে রাজ্য শাসন করার কথা। এই অবস্থা ২১ শতকে ঘটলে তা হবে হাস্যকর।
আশ্চর্যজনকভাবে মমতার এই সামন্তীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা কোনো কথা বলেননি। এই সংস্কৃতি কি একটি গণপ্রজাতন্ত্রের নাকি রাজা-মহারাজারদের শাসিত কোনো দেশের? আমাদের এই গণবিরোধী সংস্কৃতির মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা আশা করব মমতা তার এই অগণতান্ত্রিক আচরণের পুনর্মূল্যায়ন করবে। যতদিন একটি সরকারের গণবিরোধী অবস্থান থাকবে সেটা মমতা বা যে কেউ হোক না কেন আমরা তার প্রতিরোধ করব। যেমন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র আমেরিকান লবির একজন লোক। তিনি সবসময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সেবা করেন। আর এটা কখনই যথেষ্ট নয় যে, উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো এসি রুম থেকে বা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে ঘোষণা করা হয়নি। কোথা থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো উন্নয়ন হচ্ছে কিনা।
আমরা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছি। এই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য হলো কৃষি ও শিল্পখাতের বিকাশ। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রের কাঠামোতে এটা সম্ভব হবে না। বর্তমান শাসক শ্রেণী উন্নয়নের নামে এমন প্রকল্প গ্রহণ করেছে যেগুলোতে উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নীতিগুলো দেখুন। জঙ্গল মহলের পুলিশ ক্যাম্পগুলো থেকে আদিবাসী গ্রামগুলোতে ফুটবল, হকি খেলার সরঞ্জাম, চকোলেট এবং মশারি বিতরণ করা হচ্ছে। এটাকেই তারা বলছে উন্নয়ন। জনগণ ফুটবল নিয়ে কি করবে? ফুটবল খেলতে না পারা কি তাদের জীবনের প্রকৃত সমস্যা। জনগণের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে তারা আন্তরিক নয়? আমরা অবশ্যই রাষ্ট্রের এই প্রতারণামূলক নীতির বিরোধিতা করব।

ভবিষ্যতে আপনাদের কাজের পরিকল্পনা কি? যৌথ বাহিনীকে আপনারা কিভাবে মোকাবেলা করবেন বলে মনে করেন?
আকাশ : এটা রাষ্ট্রের আচরণের ওপর নির্ভর করে। আমাদের রণনীতি একই থাকবে। কিন্তু আমাদের রাজনীতি, সামরিক ও সংগঠনের কৌশল প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল। যখন লালগড়ের বিদ্রোহ সর্বোচ্চ অবস্থায় ছিল তখন আমরা আমাদের কৌশল প্রতিদিন পরিবর্তন করেছি। অতি সম্প্রতি আমরা আমাদের বেশ কিছু কৌশল পরিবর্তন করেছি। আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পরিবর্তন করি না বরং প্রতিদিনের কাজ ও সাপ্তাহিক পর্যালোচনা থেকে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
সামরিক ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা যৌথবাহিনীকে মোকাবেলা করতে সক্ষম। আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি যে রাষ্ট্রীয় নীতি আমাদের উন্নয়ন নীতিগুলোর জন্য, আমাদের জন্য ক্ষতিকর। মমতা সরকারের সামরিক পদক্ষেপগুলো আমরা লক্ষ্য করছি, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা যৌথবাহিনীকে প্রতিহত করতে পারি। নির্বাচন পরবর্তী মমতা সরকারের আচরণ এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী। একটি উদাহরণ দেই, ঝাড় গ্রামের দুর্গেশ গ্রামে অনেক রাজনৈতিক দল মিটিং করে থাকে। কিন্তু যখন জঙ্গলমহলের জনগণ তাদের নিজেদের সমস্যা নিয়ে মিটিং করতে গেল তখন দলগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাল। যদি রাজনৈতিক দলগুলো সভা সমাবেশ করতে পারে তাহলে জনগণ কেন পারবে না? এই ঘটনা মমতা সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে উন্মোচন করে।

পশ্চিমবঙ্গে আপনাদের সর্বোচ্চ অর্জন কি বলে মনে করেন? জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা আপনাদের উপস্থিতিতে কিভাবে উপকৃত হচ্ছে?
আকাশ : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের প্রথম সর্বোচ্চ অর্জন হলো বর্তমান সমাজের সামাজিক ফ্যাসিস্ট চরিত্রকে উন্মোচন করা। এটা শুধু এখানেই নয়, সারা দুনিয়াজুড়ে অবস্থিত। যেসব এলাকায় আমাদের শক্তিশালী সমর্থক রয়েছে সেসব এলাকাতে আমরা এটা ভালোভাবে করতে সক্ষম হয়েছি। পার্টির বিকাশ এ বিষয়টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এরপর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আমরা ছদ্মবেশী মার্কসবাদীদের উন্মোচন করেছি। আমাদের তৃতীয় অর্জন হলো আমাদের গণলাইন জনগণ গ্রহণ করেছে। চতুর্থত, সিপিএম এবং তাদের মিত্ররা বিপর্যস্ত হয়েছে। লালগড় আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা এটা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সারা পৃথিবীকে আমরা জানাতে পেরেছি যে, তারা সেখানে কি  করেছে। পঞ্চমত, আমরা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে সক্ষম হয়েছি। দুটোই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয়। আমরা খুবই সফলতার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষ সংগঠিত করতে পেরেছি, যারা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগ্রাম করতে শিখেছে। ষষ্ঠত, আত্মবিশ্বাসী মানুষজন তাদের নিজেদের উন্নয়নের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজে অংশগ্রহণ করেছে। তারা তাদের নিজেদের দাবি জানাতে এবং অধিকার অর্জন করতে শিখেছে। আরো একটি বড় অর্জন হলো যে, জঙ্গলমহলের আদিবাসী সাঁওতাল মহিলারা যারা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আত্মসম্মান এবং স্বাধীনতা অর্জন করতে শিখেছে।
মাওবাদী পার্টির হস্তক্ষেপের আগে এই অঞ্চলে রাষ্ট্রের কোনো উন্নয়নের কর্মসূচি ছিল না। জঙ্গলমহলে মানুষ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক সম্মান, আত্মমর্যাদা এবং ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। আদিবাসীরা জঙ্গলের অধিকার ফিরে পেয়েছে। এর আগে এখানে তাদের কোনো অধিকার ছিল না।
জঙ্গলমহলে বনভূমির উন্নয়নের জন্য জনগণের কমিটি গঠিত হয়েছে। বনের সমস্ত উৎপাদন এখন তাদের হাতে আসছে। এসব উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য তারা এখন পাচ্ছে। আরো একটি বড় অর্জন হলো মাওবাদী পার্টিতে আদিবাসী মহিলাদের একটি বড় অংশ যুক্ত রয়েছে। তারা নিজেরাই এখন তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে মদ্যপানের বিরুদ্ধে তারা বড় আকারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। মহিলারা নিজেরাই তাদের গণকমিটিগুলো পরিচালনা করছে। এছাড়া তারা নিজেরা গণআদালত পরিচালনা করছে এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আমাদের কাজের সফলতা। কৃষিতে আমরা ৩-৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি।

প্রাথমিকভাবে কোনটি আপনারা অর্জন করতে চাইছেন আদিবাসীদের উন্নয়ন নাকি তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন? আপনাদের প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা আছে কি?
আকাশ : আদিবাসীদের উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন এই দুটোই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। কিন্তু একটি দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে আদিবাসীদের কল্যাণ কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ছাড়া সম্ভব নয়। এটা সত্যি নয় যে, আমরা প্রকাশ্যে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চাই না বা করি না। আমরা রাজনীতির গোপন ও প্রকাশ্য উভয় ধারার মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
গণতান্ত্রিক কাজে অংশ নিতে আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি। এজন্য আমরা বর্তমান ও আগের সরকারকে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কোনো সাড়া দেয়নি। আমরা একটি তদন্ত কমিশনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। জঙ্গলমহাল এলাকায় উন্নয়নের জন্য যে কোটি কোটি টাকা দেয়া হয়েছিল সেগুলো কোথায় এটা খুঁজে বের করার জন্য। আমরা নতুন সরকারের কাছে এই দাবি জানিয়ে মোট চারবার আবেদন জানিয়েছি কিন্তু তারা কোনো সাড়া দেয়নি। এ হলো মমতার রাজনীতি। সে জনগণের প্রয়োজনে বা কোনো পার্টির আহ্বানে উত্তর দেবার মতো কোনো দায়িত্ব অনুভব করে না।

আপনি কি প্রত্যাশা করেন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে জঙ্গলমহলে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন?
আকাশ : আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো জঙ্গলমহলে জনগণের সরকার গঠন করা। এজন্য সেখানে আমাদের একটি মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেখানকার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে হবে। ২০০৭ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে, জঙ্গলমহলে আমরা স্বাধীন মুক্তাঞ্চল গঠন করতে চাই। যাকে আমরা বলি ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলা। প্রকৃতপক্ষে এটা হলো একটি নতুন রাষ্ট্রের বা নতুন সমাজের ভ্রুণ।
জঙ্গলমহলকে নিয়ে আমাদের একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাও আছে। তবে পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদি আর দীর্ঘমেয়াদি যাই হোক না কেন, এখানে আমরা একটি উন্নয়নের মডেল দাঁড় করাতে চাই। যার সব কিছু পরিচালিত হবে জনগণের নিজস্ব উদ্যোগ, পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে যাকে আমরা বলি গণকমিটি। জনগণ এই কমিটির মাধ্যমে তার প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা করবে। আমরা বিশ্বাস করি এ সবই অর্জিত হবে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে।
এর কারণ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রাম-পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট পর্যন্ত কোনোখানে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। ভারতের সংবিধান এ দেশের মাটি থেকে উৎসারিত হয়নি। এটা এসেছিল ব্রিটিশ, আমেরিকান ও আইরিশ সংবিধানের অন্ধ অনুকরণে। তাই এই সংবিধান প্রকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে সক্ষম নয়। আমরা এর বিকল্প পথ অনুসরণ করতে চাই। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো জনগণকে আমাদের সঙ্গে রাখা এবং তাদের প্রয়োজন ও পরামর্শে কাজ করা। কারণ জনগণ সবসময় সঠিক অবস্থানে থাকে।
তবে সরকারের ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে না সরিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সাদা শাড়ি আর হাওয়াই চপ্পল বর্তমান সরকারের প্রকৃত পরিচয় নয়। আমাদের সচেতনভাবে বুঝতে হবে জনপ্রিয় স্লোগান ব্যবহার করে কিভাবে মমতা ক্ষমতায় এসেছে। তারা প্রকৃত পক্ষে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। এটা বুঝতে হবে ভোটে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও সামাজিক ফ্যাসিবাদের অবসান হয়নি।

সিপিআই (মাওবাদী) পার্টি জঙ্গলমহালের বাইরেও বিস্তৃত। কিভাবে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলায় আপনারা কাজ গড়ে তুলেছেন বা টিকে আছেন? কলকাতায় আপনাদের শক্তিশালী ভিত্তি কবে গড়ে উঠবে বলে মনে করছেন?
আকাশ : আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহালেরই তৎপরতা সীমাবদ্ধতা না রেখে এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়া। বর্তমানে পশ্চিবঙ্গের প্রত্যেক জেলাতে আমাদের কমবেশি অবস্থান রয়েছে। এর মধ্যেই বিভিন্ন স্থান থেকে জনগণ আমাদের আহ্বান করছে। আমরাও সেই সব এলাকাতে পার্টির শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য কাজ করে চলেছি। প্রতিদিনই আমাদের কাজের নতুন নতুন এলাকা বাড়ছে এবং অসংখ্য জনগণ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এখনই আমাদের পার্টি নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাকুড়া, বর্ধমান জেলাতে শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। আমরা ২০০৪ সাল থেকে এইসব জেলাতে কাজ করছি। আমাদের উপস্থিতি সরকারকে এটা বিবেচনা করতে বাধ্য করছে যে, এসব এলাকাতে যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেনি।
আমরা জ্যোতির্বিদ নই যে এখনই বলতে পারব কবে কলকাতায় আমাদের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে উঠবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, একদিন কলকাতাতেও আমাদের একটা শক্তিশালী অবস্থান গড়ে উঠবে। এটা নির্ভর করবে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকট এবং সেই সঙ্গে আমাদের তৎপরতার ওপর। এই সংকটে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি হবে যার ফলে মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠতে বাধ্য হবে। সেই সময় কবে আসবে তা আমরা এখনই বলতে পারছি না। তবে সেটা যে খুব দূরেও নয় তো নিশ্চিত। সম্প্রতি আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একটি সার্কুলারে নিদের্শনা দেয়া হয়েছে যে, তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজ্যকমিটি পর্যন্ত পার্টির প্রতিটি কমরেডকে সেই অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য প্রাণপণে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আর তখনই আমরা জনগণের সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করতে পারব। এটাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

গত এক বছর ধরে আপনাদের রাজ্য কমিটির অনেক নেতা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে বন্দি আছে। তাহলে আপনি কি এটা স্বীকার করবেন যে, রাজ্যকমিটির শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আছে এবং আপনারা জনসমর্থন হারিয়েছেন?
আকাশ : প্রাক্তন রাজ্যকমিটির সম্পাদক কমরেড হিমাদ্রি, বর্তমান কমিটির সম্পাদক কমরেড সুদীপ বা কাঞ্চনসহ রাজ্য কমিটির অনেক নেতৃত্ব জেলে বন্দি আছে। এটা আমাদের জন্য একটি বিপর্যয়। আশা করছি এই বিপর্যয় আমরা কাটিয়ে উঠব। আমরা এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের নতুন নেতৃত্বদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। বিশেষ করে কমরেড কাঞ্চন গ্রেপ্তার হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে আমাদের পার্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা সত্যি যে, কলকাতায় আমাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছিল। আমাদের চলাচল অনেক সীমিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমরা খুব দ্রুতই এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। এজন্য আমাদের পার্টি পুনর্গঠন করতে হয়েছে। আর যে কোনো বিপ্লবী সংগ্রামের জন্য এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বিপ্লব কোনো কুসুমাকীর্ণ পথে আসে না। এখানে বিপর্যয় আসবে সেটা কাটিয়ে আবারো চলতে হবেÑ এটাই নিয়ম।
আমাদের এমন দিনও গেছে যখন যৌথবাহিনী পার্টির সদস্যদের ধরার জন্য গ্রামের প্রতিটি ইঞ্চিতে তল্লাশি চালিয়েছে। কিন্তু আমাদের বিপুল গণভিত্তি ছিল জনগণই আমাদের রক্ষা করেছে। আমরা জনগণের মধ্যে মিশেছিলাম, যৌথবাহিনীর পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় তাদের কাছ থেকে আমাদের পৃথক করা। জঙ্গলমহলের জনগণ তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য এক ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় রয়েছে। এখানে মাওবাদীদের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে।
গণসমর্থন হারানোর অভিযোগ সত্যি নয়। গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো ঘটেছে শহরে। গত ছয় বছরে রাজ্য সরকার তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে যথেষ্ট সক্ষম হয়েছে। কিন্তু মনে রাখবেন গণসমর্থন ও গণভিত্তি থাকলে রাষ্ট্রের কোনো নেটওয়ার্কই সম্পূর্ণভাবে শক্তিশালী  হতে পারে না। তারপরেও আমরা এসব গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছি যে, কোথায় আমাদের ঘাটতি ছিল। বেশ কিছু কারণ আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি সেগুলো এখন কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।
হ্যাঁ আমি আপনার একটি কথা স্বীকার করছি যে, পুলিশের গোয়েন্দা বাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী। মমতা ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে আমাদের পার্টিকে মোকাবেলার জন্য আরো ১০ হাজার জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও হোমগার্ড নিয়োগ দেবে। তিনি তার ইচ্ছোমতো যত খুশি নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ দিক, তাদের ইচ্ছোমতো ব্যবহার করুক না কেন। তার এই তৎপরতা ক্ষণস্থায়ী। জনগণের আন্দোলনের মুখে তার সব চেষ্টা ভেঙে পড়তে বাধ্য। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাওবাদীরা তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেবে।

Advertisements

ভারতঃ বিপ্লব তীব্রতর হবে, সতর্ক করে দিলেন মাওবাদী নেতা

vlcsnap-2015-11-13-16h58m23s618

খারিয়ার, ১৩ নভেম্বরঃ উড়িষ্যা-ছত্তিসগড় সীমান্তের কাছে উড়িষ্যার একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকদের কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশ জুড়ে তীব্র খরা দেখা দেয়ায় আশংকা প্রকাশ করে সিপিআই (মাওবাদী) এর নেতা বলেছেন কেন্দ্রের কৃষক বিরোধী স্বৈরাচারী নীতিমালার বিরুদ্ধে বিপ্লব তীব্রতর হবে।

সিপিআই (মাওবাদী) এর নুয়াপাড়া-সোনপুর বিভাগীয় কমিটির মুখপাত্র বুধুরাম পাহাড়িয়া বলেন, দেশে যখন ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছে, কৃষক সম্প্রদায় চরম দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তখন সরকার বিদেশী কোম্পানির কাছে খনি তুলে দিতে ব্যস্ত। এদেশে ১৯৪৩ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে ৪০ লাখের বেশী মানুষ খরায় মৃত্যুবরণ করেছে। পাহাড়িয়া বলেন, বিদেশী কোম্পানিদেরকে ধরে রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনই এর জন্য দায়ী।

কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে আক্রমণ করে মাওবাদী নেতা উল্লেখ করেন, উন্নয়নের কথা বলে দেশের কাছে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশী কোম্পানির হাতে দেশের খনি ও খনিজ সম্পদ তুলে দিচ্ছে কেন্দ্র। পাহাড়িয়া বলেন, “সেচ প্রকল্প নিয়ে সরকার নীতিমালা তৈরি করেছে কিন্তু বাস্তবে তারা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে পানি সরবরাহ করছে। এতে করে পানি দূষণ হচ্ছে ও ফলশ্রুতিতে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘Make in India’  প্রচারণা বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করে পাহাড়িয়া বলেন, “Make in India’ প্রচারণার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নকে তরান্বিত করার বাজনা বাজিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী, আবার সেইসাথে তিনি কৃষকদেরকে দেশের মেরুদণ্ড আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে ‘Make in India’  হয়ে গেছে ‘Take from India’। বর্তমানে উড়িষ্যা ও ছত্তিসগড়ের অধিকাংশ অঞ্চলে তীব্র খরা চলছে কিন্তু রাজ্য সরকার বা কেন্দ্র সরকার কেউই কৃষকদের জন্য কোন সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা দেয়নি। যা দেয়া হয়েছে তা সমুদ্রে এক ফোঁটা জলের মতই।

মাওবাদী নেতা আরো বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বিশ্বভ্রমণের আনন্দে মেতে আছেন। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করার কথা যেসব রাজনৈতিক দলের তারা তাদের নিজেদের রাজনৈতিক পুঁজি তুলতে ব্যস্ত।” তিনি বলেন, তীব্র খরার কারণে কৃষকেরা আত্মহত্যা করতে শুরু করেছে। পাহাড়িয়া এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের আত্মহত্যা না করে সরকারের কৃষক বিরোধী নীতিমালার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। প্রতি একর শস্যের ক্ষয়ক্ষতির জন্য মাওবাদীরা ৪০০০০ রুপি ক্ষতিপূরণের দাবী জানিয়েছে। এছাড়াও মৃত কৃষকদের পরিবারের জন্য ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ ও কাজের সুযোগ প্রদান, সকল দরিদ্র জনগণের জন্য সেচ সুবিধা, এক বছরের জন্য বিনা খরচে বীজ ও সার প্রদান এবং রেশন কার্ড প্রদানের দাবী জানিয়েছে মাওবাদীরা।

তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে তাদের দলীয় স্বার্থ নির্বিশেষে কৃষকদের স্বার্থে লড়াই করার আহ্বান জানান।

অনুবাদ সূত্রঃ http://www.orissapost.com/will-intensify-revolt-warns-maoist-leader/


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকার (সম্পূর্ণ)

c

comrades-kA7G-621x414@LiveMint

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি গত ০৮/০৮/২০১৫ থেকে ০৯/০৯/২০১৫ পর্যন্ত মোট ৮ টি পর্ব ধারাবাহিক ভাবে বাংলায় প্রকাশ করেছে ‘লাল সংবাদ‘। কিন্তু আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি ২ পর্ব প্রকাশ করতে পারিনি। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আমরা বাকি দুই পর্ব সহ সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি PDF আকারে প্রকাশ করছি।

পাঠক কমরেডগণ নীচে ক্লিক করেই সাক্ষাৎকারটি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন– 

কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকার


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৮ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি ধারাবাহিক ভাবে বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(অষ্টম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে “

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি যাচাই করে দেখেছে যে বিশ্ব পরিস্থিতির অবজেকটিভ বাস্তবতা বিপ্লবের অনুকূলে যাচ্ছে, এক্ষেত্রে International Communist Movement (ICM) আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবস্থান কী? আভাকিয়ানিজম ও প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোট কর্তৃক নেপাল বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কী ধরনের প্রভাব ICM এর উপর পড়তে পারে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ বিপ্লবের অগ্রগতির পক্ষে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি চমৎকার। আগেই উল্লেখ করেছি, মহা মন্দার (Great Depression) পর সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ভয়াবহতম সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। যার ফলে প্রচুর পরিমাণে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে এসেছে। একদিকে আছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ও অন্যদিকে শ্রমজীবী শ্রেণীর উপর শোষণ ও নিপীড়িত জনগণের দেশসমূহে নয়া ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন। রাষ্ট্র দখলের যুদ্ধ স্তিমিত হবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; ইরাক, আফগানিস্তান ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আটকে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাম্রাজ্যবাদ ও তার গৃহপালিত দোসরদের বিরোধী বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় স্বাধীনতাকামী বাহিনী শক্তিশালী হচ্ছে। শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী,কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী, মুসলিম ও অন্যান্য নির্যাতিত সম্প্রদায়,নারী,শিক্ষার্থী,তরুণ ও আরো অনেক নিপীড়িত শ্রেণী ও গোষ্ঠী পথে নেমে আসছে।

চাকুরী থেকে ছাঁটাই,বেকারত্ব ও আংশিক বেকা্রত্ব,প্রকৃত মজুরী কর্তন,সামাজিক নিরাপত্তা খরচ প্রত্যাহার এবং সরকারের অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা দেশে শ্রমিকদের বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ ও ধর্মঘট সংঘটিত হয়েছে যা দেশগুলোকে নাড়া দিয়েছে। ধনী ও গরীবের ব্যবধান যত বাড়ছে ও শ্রেণী দ্বন্দ্ব যত তীব্রতর হচ্ছে, পুঁজিবাদী দেশগুলোর জনগণ তত বেশি সংগ্রামে যোগদান করছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ, মুসলিম, অভিবাসী ও অন্যান্য নিপীড়িত জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বিক্ষোভ করছে। পশ্চাদপদ দেশগুলোতেও শ্রমজীবী জনগণের সম্পদের অসমতা,দারিদ্র্য, অভাব ও রাজনৈতিক নিপীড়ন গণ অভ্যুত্থানের জন্ম দিচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণহত্যা ও রক্তের বন্যার মধ্য দিয়েও ইরাকি, আফগান,কুর্দি ও অন্যান্য জনগণের সশস্ত্র জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতি ঘটছে।

স্কটিশ, ক্যাটালনিয় ও ইউরোপের অন্যান্য জাতীর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত আছে। ব্রাজিলের মত গণ বিরোধী নয়া উদারবাদী নীতিমালা গ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকায় জনগণ বৃহদাকারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।তবে বর্তমান বিশ্বের অনুকূল অবজেকটিভ পরিস্থিতি থেকে ICM এর সাবজেকটিভ শক্তিগুলো গুরুতরভাবে পিছিয়ে আছে। অবজেকটিভ পরিস্থিতির সম্ভাবনা ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য একে সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাওবাদী বাহিনীর সাবজেকটিভ ক্ষমতার মধ্যে একটি বৈপরীত্য রয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা জানি যে, প্রধানত প্রতিটি দেশের বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী বিপ্লব সংঘটনের মাধ্যমে এই সাবজেকটিভ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায়।

সংশোধনবাদী ও সংস্কারবাদীরা জনগণের সমস্যা সমাধানে অসমর্থ হওয়ায় মাওবাদী শক্তির সাথে তাদের পুনরায় একত্রিত হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। অনেক দেশে মাওবাদী পার্টি ও সংগঠন শক্তি অর্জন করছে এবং নতুন কিছু পার্টি গঠিত হবার প্রক্রিয়া চলছে। মাওবাদী পার্টি, সংগঠন ও বাহিনীর ভেতরে ঐক্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশ কিছু বিতর্কের মধ্য দিয়ে ফিলিপিন ও ভারতের দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চলমান রয়েছে। অন্যান্য বেশ কিছু দেশেও মাওবাদী পার্টিরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের গণযুদ্ধের সমর্থনে আন্তর্জাতিক মাওবাদী শক্তিগুলোর সংহতি কার্যক্রম, বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন গ্রিন হান্ট ও ওপলান বায়ানিহানের (ফিলিপিনের বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন)বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত, রাজবন্দীদের অধিকার নিশ্চিতকরণের সংগ্রাম ইত্যাদি চলমান রয়েছে। সুতরাং, ICM ও মাওবাদী শক্তিগুলোর গণ সংগ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারাটা সম্ভব এবং এই পথ ধরে ভবিষ্যতে একটি বিপ্লবী জোয়ারের সূচনা ঘটবে।

প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের সংশোধনবাদ ও নেপালি জনগণের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা অবশ্যই ICM কে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকেরা গৌরবময় গণযুদ্ধকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে এবং নিপীড়িত নেপালি জনগণের উপর কঠোর দমন পীড়ন অব্যাহত রাখতে শত্রুকে সাহায্য করেছে। শুধু নেপালি জনগণের জন্যই নয়, পুরো ICM এর জন্য এটি একটি উলট পালট ঘটিয়েছে। অবশ্য, প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের বিরুদ্ধে প্রকৃত মাওবাদী শক্তির তিক্ত লড়াই, সাম্রাজ্যবাদী ও তার দালালদের কাছে তাদের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ এবং সর্বোপরি, এই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে নেপালি জনগণের নিজেদের সংগ্রাম এই জোটের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রকে উন্মোচন করেছে এবং মার্কসবাদ- লেনিনবাদ- মাওবাদকে সমৃদ্ধ করার নামে এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার চিত্রকে উন্মোচন করেছে।

সাম্রাজ্যবাদ, গৃহপালিত সামন্তবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বেনিয়া ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সব থেকে বিশ্বাসী পা চাটা কুকুরে পরিণত হয়েছে এই আধুনিক সংশোধনবাদীরা। তাদের শ্রেণী সহযোগীদেরকে নেপালি জনসাধারণ ও ICM সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখান করেছে এবং এইসব বিশ্বাসঘাতকদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জনগণ নিশ্চিতভাবেই বিপ্লবের পথে অগ্রসর হবে। একইভাবে, আভাকিয়ানিজমের তথাকথিত নয়া সিনথেসিসও কিছু মাওবাদী পার্টিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ ছদ্মবেশী সংশোধনবাদ ও লিকুইডেশনিজম (liquidationism) ছাড়া আভাকিয়ানিজম আর কিছুই নয়। ICM এর উপর ক্ষণস্থায়ীভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও এটি অবশ্যই পরাজিত হবে। আভাকিয়ানিজম ও সব ধরনের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও দেশের ভেতরে কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিশ্ব প্রলেতারিয়েতের অংশ হিসেবে  আমাদের পার্টি সংগ্রাম করে যাবে।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৭ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবারের পরিবর্তে প্রতি রবিবারবৃহস্পতিবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(সপ্তম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে “

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ শত্রুরা প্রচার করছে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন সেকেলে। কেউ কেউ শাভেজের একুশ শতকের সমাজতন্ত্রকে সমর্থন করছে। প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোট নেতৃত্বাধীন ইউসিপিএন (মাওবাদী) UCPN (Maoist) দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন ত্যাগ করে সংসদীয় পথ বেছে নিয়েছে। ভারত ও বর্তমান বিশ্বায়নের পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। এইসব তর্ক বিতর্ক সম্পর্কে পার্টির বক্তব্য কী?

গণপতিঃ যখন থেকে মার্কস ও এঙ্গেলস প্রলেতারিয়েত মতাদর্শ প্রস্থাপন করেছেন এবং সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী শক্তি হিসেবে শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে তখন থেকে বিশেষ করে প্যারি কমিউনে প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের পর থেকে শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও শোষক ও প্রতিক্রিয়াশীলেরা সবসময় মার্কসবাদ ও বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। রাশিয়া আর চীন যখন সংশোধনবাদীতে পরিণত হল, তখন তারা প্রচার করতে আরম্ভ করল যে মার্কসবাদ সেকেলে। কারণটা বলাই বাহুল্য। বিপ্লব ও মার্কসবাদ তাদের ধ্বংস বয়ে আনবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন কী করে সেকেলে হতে পারে? মাও এর মৃত্যুর পর পৃথিবীতে যত নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব কিংবা জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলো সবই ছিল দীর্ঘস্থায়ী।

এসব যুদ্ধের কোন কোনটাতে বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা যুদ্ধ ত্যাগ করার ঘটনা ঘটলেও এই সবগুলো যুদ্ধই ছিল দীর্ঘস্থায়ী। যতদিন পর্যন্ত আধা সামন্তবাদী কাঠামো মৌলিকভাবে পরিবর্তিত না হবে এবং যতদিন আমাদের দেশের মত দেশগুলোকে সাম্রাজ্যবাদ এর মুঠোর মধ্যে রেখে স্বনির্ভর উন্নয়ন ঘটাতে বাধা দান করবে ততদিন পর্যন্ত এই দেশগুলোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই। সামন্তীয় কিছু রূপ বদলালেও সামন্তবাদ একইরকম থাকবে কারণ এটি সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া বেনিয়াদের স্বার্থকে রক্ষা করে। এ কারণে, একটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সামন্তবাদ বিরোধী নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের লক্ষ্যে পার্টির অধীনে জনগণ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে দেয় যে এটি হবে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যেটি আমাদের পার্টির নেতৃত্বে জনগণ চালাবে।

সুতরাং, আমি ইতোমধ্যে বলেছি ভারতের মত একটি দেশে একটি সফল বিপ্লব ঘটানোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনকে আমরা কেন অপরিহার্য বলে মনে করি। এখন শাভেজ এবং তার কথিত একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের মডেল প্রসঙ্গে আসি।

এখনো পর্যন্ত পৃথিবীতে বিপ্লবের দুইটি পথ তৈরি হয়েছে; একটি হল অভ্যুত্থান ও অপরটি হল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ। নিজ নিজ দেশের বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এই দুটি পথ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। নতুন ঐতিহাসিক অনুষঙ্গে এই দুটিতে পরিমার্জনও ঘটতে পারে। মার্কসবাদ এটাই বলে যে, যান্ত্রিকভাবে বা অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে নয় বরং সৃষ্টিশীলতার সাথে বিপ্লব ঘটাতে হয়। কিন্তু যে ধরনের পরিমার্জনই হোক না কেন, তা হতে হবে বিপ্লবের আওতার মধ্যে। এই কারণে বিপ্লব আবশ্যকীয়। অবশ্য, তা হতে হবে একটি নির্দিষ্ট দেশের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। একটি শ্রেণীহীন সমাজের দিকে যাওয়ার জন্য কোন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত অবক্ষয়প্রাপ্ত একটি সমাজ ব্যবস্থাকে সংশোধন করার প্রচেষ্টা বৃথা।

শাভেজের মডেল কোন বিপ্লবের মডেল নয়, এটি নিছক সংশোধনবাদী মডেল। কাঠামো বা উপাদান কোন দিক থেকেই এটি সমাজতন্ত্র নয়। রুশ ও চীনা বিপ্লবের পর পৃথিবীতে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে। পুঁজিবাদী ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষুদে বুর্জোয়া গোষ্ঠী অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের একটি অংশ উদার বুর্জোয়া আদর্শ ধারণ করে ও অপর অংশটি ইউটোপিয় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ধারণ করে। যেসব দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব কিংবা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়নি, যেখানে বিপ্লবী আন্দোলন সে দেশের জনগণকে এর আওতায় নিয়ে আসতে পারেনি, সেসব দেশের ক্ষুদে বুর্জোয়াদের অধিকাংশই বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থার ভেতরে কিছু পরিবর্তন বা সংশোধন প্রত্যাশা করে। ভেনেজুয়েলার শ্রমিক শ্রেণী ও কৃষকদের স্বার্থে শাভেজ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রধান পণ্য তেল। যদিও তেল ও অন্যান্য কিছু শিল্প জাতীয়করণ হয়েছে তারপরেও নিশ্চিতভাবেই সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বেনিয়াদের নিশ্চিহ্ন করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

 বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে তারাও আলাদা নয়, সুতরাং, ব্যবস্থায় কোন মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে তারা পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন নয়। ভেনেজুয়েলার সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী বেনিয়াদের একটি অংশ এত বেশীমাত্রায় গরীবদের বিরোধী যে তারা এই জাতীয় সংশোধনেরও প্রচণ্ড বিরোধী। আর এটি শাপে বর হয়ে দেখা দিচ্ছে কারণ জনগণের নানা অংশ থেকে শাভেজের মডেলের জন্য এটি বৃহৎ পরিসরে প্রচারণা পাচ্ছে। তিনি কখনো জনগণকে শ্রেণী সংগ্রামে সংগঠিত করেননি। শাভেজ বলিভার ও চে গুয়েভারার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন কিন্তু তার মডেল হল মাইনাস বলিভারিজম এবং মাইনাস চে গুয়েভারাইজম। এটি মূলতঃ সংশোধনবাদ এবং এই কারণে আমাদের দেশে দেউলিয়া হয়ে পড়া সিপিআই ও সিপিআই (এম) শাভেজের এই মডেলের উপর গুরুত্ব আরোপ করছে। ঐক্যবদ্ধ পার্টিতে থাকাকালীন তারা নেহেরুভিয়ান সমাজতন্ত্রকে উর্ধ্বে তুলে ধরে বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

নেপালে আধা সামন্তবাদের উপর ভিত্তি করে সাম্রাজ্যবাদের জোয়ালের নীচে সংসদীয় ব্যবস্থা টিকে আছে; নেপালের উপর এক দিকে রয়েছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আধিপত্য ও অন্যদিকে রয়েছে চীনের প্রভাব। যে কেউ এখানে যোগদান করবে তাকেই বিপ্লব ত্যাগ করতে হবে। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বেশ ভাল সাফল্য সত্ত্বেও ইউসিপিএন (মাওবাদী) UCPN(Maoist) এর প্রচণ্ড-ভট্টরায়ের আধুনিক সংশোধনবাদী জোট এই পথ বেছে নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ ও হাজার হাজার শহীদের সাথে তারা স্রেফ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। পূর্ববর্তী সব সংশোধনবাদীদের মতো শাসক শ্রেণীর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির উদ্দেশ্যে নিজেদের স্বার্থে তারা এই কাজ করেছে। আমরাও স্বীকার করি যে বিশ্বায়নের ফলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কাদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো ঘটানো হয়েছে? পুঁজিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বার্থ কায়েমের জন্য এই পরিবর্তনগুলো ঘটানো হয়েছে। গত ২৩ বছরে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এইসব পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

আর এটি পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শাসক শ্রেণীর একটি অংশকে শ্রমিক, মেহনতি জনসাধারণের উপর অপরিমেয় শোষণ চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে এবং তাদেরকে উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশের প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ নির্বিচারে লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে, ধনী ও গরীবের আয়ের তফাৎ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পুঁজির একত্রীকরণ ও কেন্দ্রীয়করণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সময়েই পশ্চিম এশিয়া ও পরবর্তীতে আফগানিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। প্রায় সব সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এর অনুগত রাষ্ট্রসমূহ নয়া ফ্যাসিবাদীতে রূপান্তরিত হয়। শাসক শ্রেণীরা নয়া উদারবাদী নীতিমালাকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তুলে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এই নীতিমালা জিডিপি বৃদ্ধি করবে; অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উন্নয়নকে তরান্বিত করবে আরো অনেক কিছু করবে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে এইসব দাবী তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ল। সুতরাং, এইসব নয়া উদারবাদী নীতিমালার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ জনগণের জীবনের উপর যে চরম সর্বনাশ ডেকে এনেছে সেদিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। কেবল অর্থনৈতিক মন্দাই নয়, বরং রাষ্ট্র দখলের যুদ্ধ, নয়া ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ, বলপ্রয়োগ ও অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের উপর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিও নয়া উদারবাদী নীতিমালার সৃষ্টি।

সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র সমাধান হিসেবে সাম্রাজ্যবাদীরা ‘বিশ্বায়ন’কে গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর মানুষের উপর বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের উপর যুদ্ধ চাপানো, আরো শোষণ, নির্যাতন ও দমন পীড়ন। কাজেই, সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের অনুচর ভৃত্যদের বিরুদ্ধে লড়াই না চালালে জনগণ স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারবে না। সুতরাং, আমাদেরকে আমাদের বৃহৎ কৌশলকে সমৃদ্ধ করতে হবে ও এই পরিবর্তনসমূহকে মাথায় রেখে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৌশলে পরিবর্তন সাধন করতে হবে এবং জনগণকে বিপ্লবী যুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে হবে। স্লোগান, রাজনৈতিক কৌশল, সামরিক কৌশল ও কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে আর তাহলেই কেবল আমরা অগ্রসর হতে পারব। রাজনৈতিক লাইন ও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে ত্যাগ করা কোন সমাধান নয় বরং এর প্রতি আরো দৃঢ়ভাবে অনুগত থাকাটাই সমাধান। আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, তার লক্ষ্য হতে হবে রাজনৈতিক লাইন ও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি পুনরায় বলছি যে, আমাদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার জন্য বর্তমান আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্তবাদী ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে হলে যা প্রয়োজন তা হল সঠিক মতাদর্শ, একটি সঠিক রাজনৈতিক লাইন, একটি সঠিক সামরিক লাইন, একটি শক্তিশালী ভ্যানগার্ড পার্টি, একটি শক্তিশালী জনগণের আর্মি এবং শক্তিশালী যুক্ত ফ্রন্ট। আর এটিই নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার একমাত্র সমাধান।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৬ষ্ঠ পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবারের পরিবর্তে প্রতি রবিবারবৃহস্পতিবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(ষষ্ঠ পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে 

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি বলশেভিকীকরণ প্রচারণার প্রয়োজন বোধ করল কেন? এটা থেকে আপনারা কী ধরনের ফলাফল আশা করছেন?

গণপতিঃ ২০১৩ সালে পার্টির ভেতরে বলশেভিকীকরণ প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানায় আমাদের পার্টি এবং বর্তমানে পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোতে এই প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়া সমাপ্ত হতে আরো সময় লাগবে আর কেবল তখনই যাচাই করা সম্ভব হবে বলশেভিকীকরণের মাধ্যমে পার্টিকে নতুনভাবে গঠন করার কাজ কতটুকু সফল হল। রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি নামে পরিচিত CPSU(B) বিশ্বে প্রথমবারের মতো বুর্জোয়া শ্রেণীকে উৎখাত করে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব কায়েম করে। যেসময় বিশ্বে কোন কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসেনি সেসময় এই পার্টি মেহনতি ও শ্রমজীবী জনতাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। মানব ইতিহাসে বলশেভিক পার্টি সর্বপ্রথম সমাজতন্ত্রের সূচনা ঘটায়। সুতরাং এই পার্টিকে আমরা মডেল হিসেবে গ্রহণ করছি এবং এর থেকে শিক্ষা নিয়ে এর বৈশিষ্ট্যসমূহকে আত্মস্থ করে আমাদের পার্টিকে এরকম একটি প্রলেতারিয়েত পার্টিতে রূপান্তরের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। এই কারণে আমরা এর নাম দিয়েছি বলশেভিকীকরণ প্রচারণা (Bolshevisation Campaign)।

অন্যদিকে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) মডেলটিও আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্তবাদী পশ্চাদপদ কৃষি প্রধান দেশে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনের উন্নতি ঘটিয়ে, একটি জনতার বাহিনী ও একটি সফল যুক্তফ্রন্ট গঠন করে মুক্তাঞ্চল স্থাপনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি একটি সফল বিপ্লব ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিল। সুতরাং CPC এর বৈশিষ্ট্যগুলো জানা ও সেগুলো আত্মস্থ করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ চীন ও ভারতের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। গঠিত হবার পর থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CPC) রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি CPSU(B) কে মডেল ধরে নিজেদের শক্তিশালী করে গড়ে তোলার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে গেছে। তাই এই পার্টির অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে বিশেষ করে মহা বিতর্ক (Great Debate ) ও মহান প্রলেতারিয়েত সাংস্কৃতিক বিপ্লব থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার আলোকে আমরা এই প্রচারণা চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমরা এই দুটি পার্টিকে আমাদের মডেল হিসেবে গ্রহণ করে পার্টির বলশেভিকীকরণের প্রচেষ্টা চালাব কিন্তু তা হবে আমাদের পার্টির দীর্ঘ বিপ্লবী ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে।

এই প্রচারণা চালানোর কারণগুলো হল-

(১) দেশব্যাপী শত্রুর হামলার ভেতরে পরিবর্তন ঘটেছে। আক্রমণ তীব্রতর হয়েছে;

(২) পার্টিতে বেশ কিছু বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে এবং বর্তমানে আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে।

(৩) পার্টিতে কৃষক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কমরেডদের সংখ্যা বেশী; এই কারণে পার্টিতে প্রলেতালিয়েত দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

(৪) সমাজে ও বিপ্লবী যুদ্ধে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, সে অনুযায়ী যথাযথ কৌশল পর্যালোচনা ও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি; এবং

(৫) পার্টির ভেতরে বড় ধরনের কিছু অপ্রলেতারিয়েত ধারার অস্তিত্ব রয়েছে।

এই বিষয়গুলোকে মনে রেখে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে ও সাংগঠনিকভাবে পার্টিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পার্টিতে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক মানের উত্তরণের জন্য আমরা বলশেভিকীকরণ প্রচারণা গ্রহণ করেছিলাম। এর মাধ্যমেই কেবল পার্টি PLGA কে একটি ক্ষমতাশালী অস্ত্রে পরিণত করতে পারবে এবং আন্দোলনের গণভিত্তিকে মজবুত করতে পারবে। আর এর মধ্য দিয়েই কেবল বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে আমরা সামনে এগোতে পারব। কিছু বাস্তব লক্ষ্য অর্জন করার জন্য আমরা এই প্রচারণাকে পরিকল্পতিভাবে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করার মাধ্যমে আমরা কিছু ফলাফল আশা করছি। এই প্রচারণা বিশ্ব প্রলেতারিয়েত দৃষ্টিভংগির মাধ্যমে পার্টিকে পুনরায় গঠন করবে এবং পার্টির অভ্যন্তরে বিশেষ করে নতুনদের ভেতরে একে প্রসারিত করবে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের অধ্যয়নকে বর্ধিত করে সমগ্র পার্টিকে এবিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এটি সম্ভব হবে। এর ফলে সমগ্র পার্টি, পার্টির প্রতিটি ইউনিট নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্য সম্পর্কে একটি পরিস্কার ধারণা পাবে এবং বর্তমান সংকট মুহূর্তে যেসমস্ত বাস্তব লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে হবে সেগুলো পরিস্কারভাবে বুঝতে সমর্থ হবে। এর মাধ্যমে মাও নির্দেশিত কাজ করার তিনটি কৌশল গভীরভাবে বোঝা সম্ভবপর হবে এবং এতে করে আমাদের কাজ করার ধরন উন্নত হবে। গোপন পার্টির গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কে এটি আমাদের ধারণা বৃদ্ধি করবে; যে সমস্যাগুলো দেখা দিচ্ছে সেগুলো দ্রুত সমাধান করতে সাহায্য করবে এবং গেরিলা যুদ্ধ সচল রাখার মূলনীতিগুলোর বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। পার্টির ভেতরে চলমান অপ্রলেতারিয়েত ধারাকে সংশোধন করে এরর বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর লক্ষ্যে পার্টির ভেতরে সচেতনতা ও সতর্কতা বৃদ্ধি করবে।

এর মাধ্যমে চিন্তা, কাজ ও শৃঙ্খলার ঐক্য মজবুত হবে ও বৃদ্ধি পাবে। ফলশ্রুতিতে, জনগণের সাথে দৃঢ়ভাবে সংহতি স্থাপন এবং তাদেরকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংগ্রামে সংগঠিত করার মাধ্যমে পার্টির গণভিত্তি শক্তিশালী হবে। কৃষি বিপ্লবে কৃষকদেরকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করে কৃষক ছাড়াও অন্যান্য জনগণ ও শহরের জনগণের মাঝে বিশেষ তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রেও এটি নেতৃত্ব দেবে। এর ফলে পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা বিষয়ে জানাবোঝা্র ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে ও সে অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করতে হবে; এভাবে সফলতার সাথে আন্দোলনের অগ্রগতি ঘটবে। আমরা আশা করছি এই প্রচারণা আমাদের কমরেডদেরকে দৃঢ় করে তুলবে যাতে করে বিপ্লবের পথ ধরে আসা কঠিনতম পরিস্থিতি ও ঝুঁকি মোকাবেলা করার মতো সচেতনতা তারা প্রদর্শন করতে পারে এবং প্রাণপণে শত্রুর সাথে লড়াই চালানোর লক্ষ্যে তাদের প্রস্তুতিকে তীব্রতর করতে পারে। আর সব শেষ যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তা হল, আমরা আশা করছি এর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বকে এবং আন্দোলনকে শত্রুর নিষ্ঠুরতম আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হব। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে এই প্রচারণার কেন্দ্রে রেখে এবং গভীরভাবে আঁকড়ে ধরার মধ্য দিয়ে এতক্ষণ যেসকল ফলাফলগুলোর কথা উল্লেখ করা হল সেগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৫ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(পঞ্চম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে “

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ সরকার দাবী করছে তাদের উন্নত আত্মসমর্পণ নীতিমালা মাওবাদীদের মাঝে সাড়া ফেলেছে এবং তারা আত্মসমর্পণ করছে। সত্যটা কী?

গণপতিঃ আত্মসমর্পণ নীতিমালা বলতে তারা কী বোঝায়? আপাতদৃষ্টিতে তারা বোঝায় আরো অর্থ, আরো পুনর্বাসন প্যাকেজ। এগুলো জনসাধারণকে বোঝানোর জন্য। বেশি অর্থ বা ভালো পুনর্বাসনের কারণে আত্মসমর্পণ বৃদ্ধি পায়নি। এর দুটো কারণ আছে। অধিকারের জন্য লড়াইরত আদিবাসীদের ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের নৃশংসতম সরকারগুলোর মধ্যে একটি আর তারা যদি সিপিআই (মাওবাদী) এর অধীনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তাদের উপর যে পরিমাণ নিষ্ঠুরতার বোঝা চাপানো হয় তা ভাষায় বলে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদপন্থী নীতিমালা বিরোধী প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দিতে রাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের দমনমূলক পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে আর আত্মসমর্পণ নীতিমালাও তার মধ্যে একটি।

কেউ বিপ্লবী কার্যক্রমে জড়িত হোক আর না হোক, যেসব এলাকায় আন্দোলন চলছে সেসব এলাকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী রক্তপায়ী নেকড়ের মতো জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তবে এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু তারা, যারা প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত; তাদের উপর ভয়ংকর নির্যাতন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি ধ্বংস, মনস্তাত্বিক যুদ্ধ, হুমকি (পঙ্গু বা হত্যা করার হুমকি এবং বাস্তবে তা করা) ইত্যাদি সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করে তাদের অনেককে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হচ্ছে। গণ আত্মসমর্পণের পিছনে এটাই দায়ী আর পুলিশ একে গণমাধ্যমের সামনে উন্মত্ততার সাথে ও উদ্ধতভাবে তুলে ধরছে। তিন চতুর্থাংশের বেশী আত্মসমর্পণ এই শ্রেণীর। আর অন্য ধরনের আত্মসমর্পণ যারা করে তারা হল পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনের কিছু ব্যক্তি যারা শত্রুর কাছে নতজানু হচ্ছে। হ্যাঁ, সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের আত্মসমর্পণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে যাদের ভেতর নেতৃত্ব পর্যায়েরও (রাজ্য কমিটি, জেলা কমিটি ও এলাকা কমিটি পর্যায়ের) কয়েকজন রয়েছে।

শত্রু যখন নতুন ভাবে আক্রমণ চালায় এবং নিষ্ঠুর দমন পীড়ন যখন নজীরবিহীন পর্যায়ে চলে যায়, তখনই নতুন ধরনের আত্মবলিদানের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই ধরনের সময় যখন যায় তখন সবসময় কিছু দুর্বল উপাদান থাকে যারা আন্দোলন ত্যাগ করে চলে যায় কিংবা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এখনও তাই ঘটছে। সরকারের কথিত উন্নত আত্মসমর্পণ নীতিমালার কিছু প্রভাব হয়তো পড়েছে। কিন্তু তা খুবই নগন্য এবং এটা কখনো কারণ হতে পারে না। এই ধরনের আত্মসমর্পণের প্রথম কারণও হল শত্রুর নৃশংস হামলা। শুধু তাই না, আত্মসমর্পণের পরেও শ্রেণী ও পারিবারিক পটভূমি অনুযায়ী রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্নভাবে দেখছে। কিন্তু তাদের সকলকে জনগণের কাছে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে হাজির করার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে কোন ভিন্নতা নেই। তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে রাষ্ট্র সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে, তাদেরকে ভাড়াটে কর্মী হিসেবে ব্যবহার করছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আরো ভয়ংকর হামলায় তাদেরকে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করছে। সুতরাং, যারা সরলভাবে মনে করছে যে ‘মূলধারায়’ ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে, একটা ‘সুন্দর জীবন’ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য রাষ্ট্র আত্মসমর্পণ নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তাদের বোঝা উচিৎ যে ‘জনগণের উপর যুদ্ধ চালানোর’ একটি  অংশ ছাড়া আত্মসমর্পণ আর কিছুই নয়। এর লক্ষ্য হল আন্দোলনকে দুর্বল করে দিয়ে তাদেরকে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত করে যুদ্ধকে তীব্রতর করা।

আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় কারণ হল কিছু ব্যক্তি শত্রুর দমননীতির গতি প্রকৃতি এবং আন্দোলনের কিছু ক্ষণস্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি বুঝতে সক্ষম হচ্ছেনা; ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। কারো কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতাও আরেকটি কারণ। এই সমস্যাগুলোর সমাধান হল- সকল পর্যায়ের ক্যাডারদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিশ্রুতি গড়ে তুলতে হবে, শত্রুর মনস্তাত্বিক যুদ্ধের বিপরীতে আরো দুরূহ লড়াই চালাতে হবে এবং ক্যাডারদের বোঝাতে হবে আত্মসমর্পণ করার অর্থ নিজেদের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা, কাজেই এটা কোন সমাধান নয়। পার্টির বর্তমান বলশেভিকীকরণ প্রচারণায় এই বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে। আর যে বিষয়টি আমি জোর দিয়ে বলতে চাই তা হল অপারেশন গ্রিন হান্টের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে বিপ্লবী ক্যাডার ও জনগণের অতুলনীয় আত্মবলিদানের ঘটনা ঘটেছে কারণ প্রথমত, জনগণ তাদের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করেছে ও দ্বিতীয়ত, তারা উঁচু মাপের সচেতনতার মধ্য দিয়ে এই আত্মবলিদানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে।

মনস্তাত্বিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে শত্রুরা নিশ্চিতভাবেই কেবল আত্মসমর্পণকে সামনে তুলে ধরবে এবং আত্মত্যাগকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করবে। বিপ্লবী প্রচারণা যুদ্ধে এই বিষয়টিকে কার্যকরীভাবে আমাদের তুলে ধরতে হবে। যতদিন বিপ্লবী যুদ্ধ চলবে, ততদিন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলবে। সুতরাং, যতদিন পর্যন্ত এই বর্বর শাসন ব্যবস্থা উৎখাত না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত কিছু আত্মসমর্পণ ঘটবে আর কিছু সময়কালে এর সংখ্যা কম বেশী হতে পারে। সমগ্র পার্টি ও আন্দোলন চলমানরত সব এলাকায় বিপ্লবের স্বার্থে স্বেচ্ছায় আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়েই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ সহ সকল পর্যায়ের আত্মত্যাগের ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং যে কোন বিপ্লবের জন্য এগুলো অপরিহার্য।

(চলবে)