বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মার্কিন-ইউরোপ-রাশিয়া-চীন সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব নিয়ে কিছু আলোচনা

 heal_the_world___pedro_x__molina

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় ২০০৮ সাল থেকে সূচিত এ পর্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক মন্দা, আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পর্কে একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অধঃগতি, মন্দা থেকে পরিত্রাণ লাভে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি, শাসক-শোষক গাষ্ঠির মধ্যকার সংকট ও বিরোধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় সামনে আসে রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুঁজিবাদের অসম বিকাশের নিয়মানুযায়ি পুঁজি ও শক্তির অনুপাত পরিবর্তিত হওয়ায় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পর্কে বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে পরিস্থিতি এবং কাঠামোর উপর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতাকে সামনে রেখে তার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব, আধিপত্য যতদূর সম্ভব ধরে রাখতে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজি সচেষ্ট। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ রক্ষা ও অগ্রসর করতে মার্কিন সরকার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস ঘটিয়ে বিভিন্ন কৌশলে লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট। “যুক্তরাষ্ট্র প্রথম” (American first) শ্লোগান সামনে রেখে সংরক্ষণবাদ তথা বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্রতর করে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা আদায়ের তৎপরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রাধান্য ধরে রাখতে সামরিক শক্তি ও সামরিক ব্যয় বিৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশ আগ্রাসীযুদ্ধকে তীব্রতর করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করছে। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন বহুজাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা, সরে আসা ইত্যাদি বক্তব্য প্রদান করার সংরক্ষণবাদ মাথা চাড়া দিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র হয়ে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি করছে। মার্কিন নেতৃত্বে সামরিক জোট সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ন্যাটো সেকেলে হয়ে গেছে অথচ তা এখনো তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’, ন্যাটোর বাজেটে ইউরোপের দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদান না করা ইত্যাদি কথা বলার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মার্কিন নেতৃত্বে, কর্তৃত্বে ও স্বার্থে ন্যাটোকে আরো উপযোগি করে তোলা। অন্যদিকে জার্মান-ফ্রান্সের নেতৃত্বে ইউরোপীয় বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্তসহ ন্যাটোর মধ্যে বিভিন্ন টানাপোড়েন লক্ষ্যণীয়। মন্দা মোকাবেলায় আভ্যন্তরিণ ক্ষেত্রে ওবামা আমলের উদ্ধার ও উদ্দীপক কর্মসূচি, পরিমাণগত সহজীকরণ (QE) ইত্যাদি পদক্ষেপে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একচেটিয়া পুঁজিপতিদের কর হ্রাসসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে, জনকল্যাণ খাতে ব্যয় হ্রাস, সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প স্থাপন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, রেল, বিমানবন্দর, পাইপ লাইন ইত্যাদি তথা যোগাযোগ অবকাঠামো পুনর্নিমাণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চাঙ্গা করার কর্মসুচি সামনে আনছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ডিসেম্বরে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, পূর্ব ইউক্রেন, ইউক্রেনে থাকার নিশ্চয়তার ভিত্তিতে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ায় অন্তর্ভূক্তি মেনে নিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতামত প্রদান করেন। তিনি চীনের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেন। আবার আরেক সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিউনিগ বেজনভস্কি ২৩ ডিসেম্বর বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব নির্ভর করছে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার উপর। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র মৌলিকভাবে এখনো ১ নম্বর শক্তি, চীনারাও প্রায় ১ নম্বর। এখন চীনকে একটা পথ বেছে নিতে হবে। যদি তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে যাওয়ার পথ বেছে নেয় তা হলে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। শক্তিশালীর পক্ষে অবস্থান নেওয়াই তাদের পক্ষে বেশি উপযোগি। আবার চীনকে সরিয়ে দিলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা উল্টোভাবে প্রযোজ্য। বর্তমান বিশ্বে চীন একা নেতৃত্ব প্রদান করতে পারবে না, আবার যুক্তরাষ্ট্রও তা পারবে না।”

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা


সাম্রাজ্যবাদী ধনী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থে ধ্বংসের পথে বৈশ্বিক জলবায়ু

climate-change-frame-1000px

ক্রমশ তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এক ভয়ানক পরিণতির দিকে এগুচ্ছে পৃথিবী। হুমকির মুখে পড়ছে  স্বল্পোন্নত ও গরীব দেশগুলো। এই বিপজ্জনক পরিণতি বিবেচনা করেই ৩০ নভেম্বর’১৫ থেকে ১৩ ডিসেম্বর’১৫ পর্যন্ত ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত হল জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন। বিশ্বের ১৯৫টি দেশের উপস্থিতিতে এই জলবায়ু সম্মেলনের ফলাফল নিয়ে আশাহত বিশ্ববাসী। সম্মেলনে যোগ দেওয়া সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী দেশগুলোর হোমরা-চোমরা নেতৃবৃন্দ স্বীকার করেছে যে বিশ্বে ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন রোধে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা দরকার। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে বিশ্বের ধনী দেশগুলোই প্রধানভাবে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী হলেও বরাবরের মতই নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা কার্বন নিঃসরণ কমাতে মূলত অস্বীকার করেছে। যা বিশ্ব জনগণের জন্য একটি অশনি সংকেত।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বর্তমান মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের পর পৃথিবী আর মানুষের বসবাসের উপযোগী থাকবে না। বলা হচ্ছে যে, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রী  সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বাড়লে সমুদ্রের উচ্চতা ১ মিটারের বেশি বৃদ্ধি পাবে। আশংকা করা হচ্ছে ট্রভ্যালো, মার্শাল আইল্যান্ড, মালদ্বীপ সহ নিচু অঞ্চলগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাবে। বাংলাদেশের উপকূলে বসবাসরত ৪ কোটি জনগণ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে জমে থাকা বরফ গলে এক ভয়াবহ সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক শূন্য ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে একটি আইনি বাধ্যবাধকতার চুক্তি করতে চেয়েছিল। কিন্তু ধনী দেশগুলো তাতে নারাজ। বরং ধনী দেশগুলো বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নানা ষড়যন্ত্র করেছে। বারাক ওবামা তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে গোপন চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে যাতে এবারের সম্মেলনে কোনো আইনি চুক্তিতে না যাওয়া হয়। তারা হাই অ্যাম্বিশান গ্রুপ নামে একটি নতুন গ্রুপ করে আফ্রিকান দেশগুলোকে ৮৪০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার লোভ দেখিয়েছে এবং চীন-ভারতকে চাপ দিয়েছে এই গ্রুপে যুক্ত হওয়ার জন্য। প্রসঙ্গত চীন-ভারত বৈশ্বিক তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রিতে রাখতে চেয়েছে আর যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে ২ ডিগ্রিতে রাখতে।

 শেষ পর্যন্ত প্যারিস সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রই সফল হয়েছে। তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার বিষয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো একমত হয়েছে যা স্বল্পোন্নত এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র দেশগুলো মূলত মেনে নিয়েছে। আমাদের দেশের বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা এতে আত্মপ্রসাদ লাভ করছে এবং নিজেরাই বলছে চুক্তিতে অনেক বিষয় অস্পষ্টতা আছে। যে চুক্তি আগামী পাঁচ বছর পর বাস্তবায়িত হবে। আর জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে কোন চুক্তিই হয়নি। মূলত আশ্বাস দেয়া হয়েছে মাত্র। এই চুক্তির বিষয়ে আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের প্রধান ডায়না লিভারমেন বলেন “……এর ভেতর আশাব্যঞ্জক তেমন উপাদান নেই। কারণ এটি কার্যকর হতে হতে আমাদের আরও মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। বিশেষ করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে, ততদিনে পৃথিবীব্যাপী আরও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষতিকর কার্বন নির্গত হবে। তখন আজকের প্রেক্ষাপটের তুলনায় এই চুক্তির কার্যকারিতা অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়বে।”

উন্নত ধনী দেশগুলোই মূলত ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। তবুও তাদের এই গড়িমসি, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত হচ্ছে তাবৎ বিশ্বের জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর। আসলে মুনাফা লোভী সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ বিশ্ব জনগণের স্বার্থে যে কোন বিষয় মীমাংসা করতে অক্ষম। তারা নিশ্চিতভাবেই পৃথিবীকে নিয়ে যাবে ধ্বংসের দিকে। আর নিপীড়িত জাতি জনগণকে ঠেলে দেবে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে। বিশ্বের শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের এটা উপলব্ধি করা দরকার যে এই বিশ্বের জলবায়ু সহ সমগ্র সংকটই আসলে পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থারই সৃষ্টি। যা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। তাই এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা উচ্ছেদের মধ্য দিয়েই কেবলমাত্র এই সংকট নিরসন করা সম্ভব।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি ‘১৬ সংখ্যা