আইলান ও আমাদের শাশ্বত শ্লোগান – শশাঙ্ক মিত্র

13177150_718544138287501_6781423273813106887_n

13164199_718544154954166_44929053746473001_n

 

প্রাচীন সভ্যতার পাদপীঠ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত চাঁদের ফালি আকৃতির একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল যা লেভান্ট, প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও প্রাচীন মিশর অঞ্চলের সমন্বয়ে গঠিত। সিরিয়াকে “Fertile Crescent”(উর্বর চন্দ্রকলা) হিসাবে প্রথম চিহ্নিত করেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক জেমস হেনরি ব্রেস্টেড। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের কামড়াকামড়িতে ক্ষতবিক্ষত সেই উর্বর চন্দ্রকলা সিরিয়ার অধিবাসী আবদুল্লাহ কুর্দি ও রেহান কুর্দির দুই ছেলে আইলান ও গালিব। অন্যান্য পিতা-মাতার মত তাদেরও স্বপ্ন ছিল যুদ্ববিধ্বস্ত দেশ ছেড়ে উন্নত জীবনের আশায় সাগর পথে ইউরোপে চলে যাওয়া। সেখান থেকে কানাডাতে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নেয়া। কিন্তু আব্দুল্লাহ ও রেহান কুর্দির সেই স্বপ্ন সাগরের ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আইলান ও তার ভাই গালিব ও মা সহ তিনজনের সাগরে সলিল সমাধি ঘটে। নাইন ইলেভেন শুরুর পর থেকে ইরাক, আফগানিস্থান, সিরিয়াতে কত হাজার শিশুর লাশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মাটির নিচে চলে গেছে তার হিসাব হয়তো কেউ রাখেনি। তিন বছরের আইলান সেই দিক থেকে ব্যতিক্রম। সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়াগুলো আফগানিস্থানের বামিয়ান প্রদেশের প্রত্নমূর্তি বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলে যতটা সরব থাকে ততটা কিন্তু সরব থাকে না আফগানিস্থানে ড্রোনের আঘাতে ছিন্নভিন্ন অসহায় মানুষ নিয়ে। আফগানিস্থানের শিশুদের আইলানের মতো সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ার হটকেকে পরিণত হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। মেডিটেরিয়ান সাগরের তীরবর্তী তুর্কির বোদ্রাম বীচে নিলুফার দেমিরের তোলা আইলানের চিরনিদ্রার ছবিটি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে তক্ষ-বিক্ষত নির্যাতিত মানুষের অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ। সেই অসহায়ত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়াগুলো শুরু করে দেয় ব্যবসা। আর ফেসবুক, টুইটার সহ সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর তো পোয়াবারো !! লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের বন্যা চলতে থাকে !! সস্তা আবেগের প্রকাশ যত বেশি হয় ডলারের আনাগোনা তত বেড়ে যায়। আইলান নিয়ে মুহুর্মুহু সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে সে কিভাবে খেলাধুলা করত! সে সব সময় কিভাবে হাসিমুখে থাকতো! তার মেধা নিয়ে পান্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা! আরও কত কথা!! সে বেঁচে থাকলে কি হতো !!! বেনিয়ারা সবকিছু নিয়েই ব্যবসা শুরু করে আইলানের ছবি নিয়েও তাই ব্যবসা শুরু করে দিল। সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়াগুলো সাম্রাজ্যবাদকে মানব দরদী ও মঙ্গলাকাঙ্খী হওয়ার পরামর্শ দিতে লাগল!! জনগণের ভোতা হয়ে যাওয়া অনুভূতিতে আঘাত দেয়া এই ছবিটি যাতে কোন প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করতে না পারে সেজন্য সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়াগুলো সিরিয়াসহ যুদ্ধ ডঙ্কায় বিপর্যস্ত জনগণকে প্রতিরোধের শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার বদলে লাইফ জ্যাকেট পরে কিভাবে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় সাগর পাড়ি দিতে হয় সেই কৌশল শেখানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে মনে হচ্ছে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিলেই সুখপাখি চলে আসবে! এই যুদ্ধের মাঝেই সাম্রাজ্যবাদীরা তথাকথিত শান্তির মুলা ঝুঁলিয়ে রেখেছে। আর এই মুলা স্পর্শ করার নেশায় লক্ষ লক্ষ লোক সাগড় পাড়ি দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ভাগ্যের অলিক পথ পাওয়ার আশায় গাদাগাদি করে ছোট ছোট নৌকায় সাগড় পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকে না। আর সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়াগুলো লাইফ জ্যাকেট পরিহিত সাগড় পাড়ি দিয়ে ইউরোপের মাটি স্পর্শ করা কোন এক তথাকথিত নাদুস-নুদুশ সফল পরিবারের! “ভি” চিহ্ন সম্বলিত ছবির প্রচার খুব জোরে শোরে করতে থাকে। এই প্রচারে সাগড় পাড়ি দেওয়ার লাইন আরো বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে লাইফ জ্যাকেটসহ আরো কত ব্যবসা !! মুক্তির আশায় মোহাচ্ছন্ন মানুষের এই বিভ্রান্তি প্রসঙ্গে কবি সুকান্তের কবিতার দু’টি লাইন খুবই প্রাসঙ্গিক…
মূর্খ তোমরা
লাইন দিলে :
কিন্তু মুক্তির বদলে কিনলে মৃত্যু,
রক্ত ক্ষয়ের বদলে পেলে প্রবঞ্চনা।

মৃত্যু আর রক্তক্ষয়ের এই স্রোতে শুধু ইরাক, আফগানিস্থান আর সিরিয়ার জনগণই শুধু নয় পুরো দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাসহ আমাদের মত নয়া ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ কর্মহীন ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত জনতা মুক্তির অলিক নেশায় সাগর পথে লাইন ধরেছে। সাগরে ভাসছে কত মহাদেশের মানুষের লাশ। আব্দুল্লাহ কুর্দি আর রেহান কুর্দি চেয়েছিলো মুক্তির সেই অলিক পথ। কিন্তু তারা পায়নি। আব্দুল্লাহ কুর্দি তার স্ত্রী ও দুই পুত্রকে হারিয়েছেন। আব্দুল্লাহ কুর্দি সেই লক্ষ জনতার একটি ক্ষুদে অংশ যারা “কোন মতে সংসার সিন্ধু” পার হতে ইচ্ছুক। সমাজ জাহান্নামে যাক। নিজে বাঁচলেই হলো। নীরবে সবকিছু সহ্য করা সেই শিথিল সুবিধাবাদী মানুষগুলোর জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা যে ফাঁদ পেতে রাখবে সেটাই তো স্বাভাবিক। সেই ফাঁদে মৃত্যু একটি স্বাভাবিক ঘটনা কিংবা একটি সংখ্যা। সাম্রাজ্যবাদীরা অন্যায় যুদ্ধ শুরু করার সাথে সাথেই জনগণের প্রতিরোধের হাতিয়ার যাতে শাণিত না হয় সেজন্য একতা ভাঙ্গনের ল্েয পলায়ন প্রবণতা সৃষ্টি করে সেই পলায়ন প্রবণতার পরিণতিই হচ্ছে শরণার্থী। শরণার্থী মানেই ধুকে ধুকে মৃত্যু। দাস খত দিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। সস্তা শ্রমের মজুত বাহিনী। স্কিল্ড মাইগ্রেশন, ষ্টুডেন্ট ভিসা ইত্যাদি চটকদার প্যাকেজের আওতায় সাম্রাজ্যবাদ চায় মেধা পাচার, সস্তা শ্রম আর আগামী দিনের যুদ্ধের সৈনিক। জমে ঊঠেছে টোফেল, আইএলটিএস, জিআরই এর রমরমা ব্যবসা!! যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও কর্মহীন জনগণের সামনে দেশে দেশে এভাবেই সাম্রাজ্যবাদীরা লাইফ জ্যাকেট আর আইএলটিএস এর ফাঁদে পেতে রেখেছে। আইলানের নিথর চিরনিদ্রার ছবি সাম্রাজ্যবাদের সেই ফাঁদের।

লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে মুমূর্ষু পুঁজিবাদ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। মুমূর্ষু পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদ অতি উৎপাদনজনিত সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য বাজার দখল ও পূনর্দখল ছাড়া তার আর কোন উপায় থাকে না। যুদ্ধ তাই অনিবার্য। এখানে জনগণের চাওয়া-পাওয়া ও আকাঙ্খার কোন মূল্য নাই। মার্কিন, ইউরোপ ও রাশিয়ার মারণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোর জন্য প্রয়োজন যুদ্ধ। অর্থাৎ ‘যত রক্ত তত ডলার’। কমরেড আবদুল হক অনেক আগেই এই শিরোনামে একটি লেখাটি লিখে তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতির মার্কসবাদী বিশ্লেষণ করেছেন। আইলান সাম্রাজ্যবাদের এই মূলনীতির শিকার। আইলানের মৃত্যু নিয়ে তাই মানব বন্ধন, গোলটেবিল আলোচনা আর মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে কোন লাভ হবে না। সাম্রাজ্যবাদের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট শ্রমিক-জনতাকে শরণার্থী আর স্কিল্ড মাইগ্রেশনের প্যাকেজের বেড়াজালে বন্দী না হয়ে মৃত্যু ভয়কে পায়ে ঠেলে প্রতিশোধের বহ্নিশিখা জ্বালাতে হবে।

আইলান আমাদের চেতনাকে উজ্জ্বীবিত করুক নিকোলাই অস্ত্রভস্কির শ্বাশত আহ্বানে সেই প্রত্যাশায় ……
মৃত্যু সেতো হেঁটেই চলেছে জীবনের পাশাপাশি
তাই মৃত্যু তেমন কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয় কোন
তার চেয়ে নির্মম নিষ্ঠুর অনেক কষ্টসাধ্য
দাসত্বের শৃঙ্খল পড়ে নতজানু হয়ে নীরবে
নিঃশব্দে বেঁচে থাকা…………………………………।

 

সূত্রঃ

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n

Advertisements

সালমান রুশদী বিতর্ক

Salmon_Rushdie_36844c

সালমান রুশদী বিতর্ক: গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বনাম মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত

(১৯৮৯)

বৃটেন প্রবাসী লেখক সালমান রুশদী ও তার সর্বশেষ উপন্যাস “স্যাটানিক ভার্সেস” সম্প্রতি সারা দুনিয়া জুড়ে এক বড় ধরনের আলোচনা ও বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উপন্যাসটি প্রকাশের পর কিছুদিনের মধ্যেই তৃতীয় বিশ্বের প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রগুলোর কয়েকটি উপন্যাসটিকে নিজ নিজ দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এবং একই সাথে ইসলামী মৌলবাদীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশে উপন্যাসটি ও তার লেখকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, নিন্দা, আন্দোলন গড়ে তোলা হয় ও তার চেষ্টা চলতে থাকে। অন্যদিকে লেখকের অধিকার এবং ধর্ম  প্রশ্নে নিজ মত, ভিন্নমত প্রদানের অধিকারকে তুলে ধরে রুশদীর পক্ষেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু প্রখ্যাত লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বক্তব্য বিবৃতি প্রকাশ করেন। কিন্তু এই আালোচনা-বিতর্ক ও আন্দোলন মৌলিক মোড় নেয় দু’টো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়। প্রথমত কিছুদিন আগে ধর্মীয় মৌলবাদী ইরানের ফ্যাসিষ্ট খোমেনী সরকার স্যাটানিক ভার্সেস-এর সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিদের- তার লেখক ও প্রকাশকসহ- মৃত্যদণ্ড ঘোষণা করে, এবং এ মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের জন্য বড় দরের পুরস্কার ঘোষণা করে। অন্যদিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত বৃটেন ও আমেরিকা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইরান সরকারের “বর্বর” ঘোষণাকে নিন্দা করে এবং নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক অধিকারের রক্ষাকর্তা হিসেবে জাহির করে উচ্চকন্ঠে বোলচাল শুরু করে। এই দু’টো ঘটনা এখন বিতর্কিত ইস্যুটিকে জটিল করে তুলেছে এবং স্পষ্টতঃই বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতির জটিলতা এখন কি পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং কি ভাবে একটি ইস্যুতে রাজনীতির সকল গুরুত্বপূর্ণ পক্ষই হস্তক্ষেপ করে নিজ স্বার্থের বলয়ে তাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এটা আরো প্রমাণিত হয় তখন, যখন বর্বর ফ্যাসিবাদী ইসরাইল “গণতান্ত্রিক অধিকার”-এর কথা ঘোষণা করছে, রুশদীর পক্ষ নেয়ার ভাব দেখাচ্ছে, পাল্টা খোমেনীর মৃত্যদণ্ড ঘোষণা করছে এবং ফিলিস্তিনী জনগণ তথা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান জনগণের বিরুদ্ধে তাদের ফ্যাসিষ্ট আক্রমণÑ সন্ত্রাস ও অপতৎপরতাকে উস্কিয়ে তোলার একটি অজুহাত ও অছিলা হিসেবে একে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

এ অবস্থায় সত্যিকার বিপ্লবীÑ যারা গণতন্ত্র চান এবং যারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, মধ্যযুগীয় ধর্মীয় স্বৈরাচার বিরোধী, যে কোন রূপের ফ্যাসিবাদ বিরোধী তাদের সঠিক অবস্থান গ্রহণটা অত্যন্ত সতর্কতা ও সুবিবেচনা দাবি করে এবং এই ইস্যুতে তাদের তৎপর হওয়াটা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে।

আমাদের দেশেও রুশদী প্রসঙ্গটি সম্প্রতি জোরদার করে তোলা হয়েছে। এ প্রশ্নে বিভিন্ন পক্ষীয় মতগুলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্লক ও গোষ্ঠীর প্রচারণাকেই যে অনুসরণ করছে, তাতে সন্দেহ নেই। বিভিন্ন গোষ্ঠীর ধর্মীয় মৌলবাদীরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছে। ইতিমধ্যে তারা একটা হরতালও করে ফেলেছে- সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্র ইত্তেফাক, ইনকিলাব, সংগ্রাম-এর সক্রিয় সহযোগিতা বলে। আগামীর মত মৌলবাদ বিরোধী দাবিদার বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক রুশদীকে ইহুদী-ইসরায়েলী এজেন্ট বানিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়েছে, অন্যদিকে ইসলামপন্থী মৌলবাদী গ্র“পের একাংশ তাদের পোষ্টারে রুশদীকে খৃষ্টধর্মী হিসেবে চিহ্নিত করে মুসলমান জনগণের সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করছে। ইত্তেফাকের সৌদি দালাল শয়তান লুব্ধক, যার নাকি মূল ব্যবসাই হচ্ছে সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম ও মার্কসবাদের কুৎসা গাওয়া ও মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অন্ধত্বের গুণগান গাওয়া, রুশদীকে বিকৃতভাবে বাঙালী-বিদ্বেষী হিসেবে দেখিয়ে জাতীয়তাবাদীদের- কেও রুশদীর বিরুদ্ধে উস্কিয়ে তুলতে চাচ্ছে, এবং ঘৃণ্য মিথ্যা প্রচারণা শুরু করেছে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল দাবিদার অনেক গোষ্ঠীই (‘সমাজতন্ত্রী’ আওয়ামী লীগ, বাকশাল, ‘মার্কসবাদী’ জাসদসহ) রুশদীকে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার” জন্য নিন্দা করে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সুরেই সুর মিলিয়েছে- যদিও তারা এই ইস্যুতে মৌলবাদীদের অপতৎপরতা বৃদ্ধিতে গোষ্ঠীগত স্বার্থে অস্বস্তিও বোধ করছে। প্রগতিশীল দাবিদার অসংখ্য দল-গোষ্ঠী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষক, আন্দোলক প্রভৃতি নীরব ভূমিকা গ্রহণ করে মৌলবাদী ও সাম্রাজ্যবাদের দালালদের জন্য মাঠ খালি করে দিয়েছে। এভাবেই প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে মধ্যযুগীয় মূল্যবোধ এবং প্রগতি ও গণতন্ত্রবিরোধী চিন্তাচেতনার প্রচার ও প্রসারেই সহায়তা করে চলেছে।

রুশদী ও স্যাটানিক ভার্সেস-এর প্রকৃত পরিচিতি ও চরিত্রটা কী এবং কীভাবেই-বা তাকে মূল্যায়ন করা হবে ? এ সম্পর্কে এখন শত মাথা কুটেও জনগণের জানার অবস্থা নেই। কারণ বইটি এখন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাধারণ জনগণ দূরের কথা, যারা এগুলোর প্রতিবাদে মাঠ গরম করে ফেলেছে তাদের মাঝেও শতকরা একজনও সত্যিকারে জানেন কিনা-যে ঐ উপন্যাসটিতে কি বলা হয়েছে- তাতে ঘোরতর সন্দেহ পোষণ করা যুক্তিহীন হবে না। (পত্রিকান্তরে প্রকাশ, একজন বিক্ষোভকারী বলেছে রুশদী নাকি পুরান ঢাকায় থাকেন।) বইটি এদেশে কেউ পড়েছে বলে জানা যায়নি। তাই আমাদের পক্ষে সার্বিক কোন মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় রুশদী ও স্যাটানিক ভার্সেসকে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা।

তবে বিতর্ক-আলোচনার মধ্য দিয়ে যতটুকু তথ্য ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এসেছে তা থেকে ধারণা করা যায় যে রুশদী অন্য কোন নির্দিষ্ট ধর্মের অবস্থান থেকে ইসলামকে দেখেননি, বরং তার অবস্থানটা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। ভারতের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও তিনি ভারতে থাকেননি, তরুণ বয়সে কিছুদিন পাকিস্তানে কাটিয়ে পরে ইংল্যান্ডে চলে যান। তার উপন্যাসগুলো মূলত ইংল্যান্ড প্রবাসী পাক-ভারতবর্ষীয় জনগণের জীবনযাত্রার উপর ভিত্তি করেই রচিত। এবং তিনি কঠোরভাবে বৃটেন সরকারের বর্ণবাদী নীতিরও বিরোধী (যে নীতিতে বৃটেন সরকার ও উগ্র বর্ণবাদীরা বৃটেন প্রবাসী উপমহাদেশীয় জনগণকে অহরহই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক নিপীড়ন করছে)। ব্যক্তি জীবনে রুশদী নাস্তিক এবং ইহুদী পরিবার উদ্ভূত এক উপন্যাসিককে তিনি বিয়ে করেন।

স্যাটানিক ভার্সেস হচ্ছে একটি উপন্যাস- যাতে ইসলাম ধর্ম ও তার প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদের জীবন সম্পর্কে রুশদীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমালোচনাধর্মী কিছু মূল্যায়ন প্রকাশ পেতে পারে বা পেয়েছে। কিন্তু রুশদী ইহুদী বা খৃষ্টান ধর্মীয় অবস্থান থেকে এমনটা করেছেন তা কোথাও জানা যায়নি। পশ্চিমা যে সাম্রাজ্যবাদীরা বা প্রতিক্রিয়াশীলরা প্রধানত খৃষ্টান বা ইহুদী ধর্মকে ভর করে গত শতাব্দীগুলোতে ও এই শতাব্দীতে তৃতীয় বিশ্বের ব্যাপক মুসলিম জনগণের উপর নির্যাতন চালিয়েছে তারা এই জনগণের ইসলাম ধর্মীয় অনুভূতিকেও অন্যায়ভাবে পদদলিত করেছে। তারা রুশদীর ইস্যুটাকে (তার ইসলাম বিরোধিতার কারণে) তাদের এই প্রতিক্রিয়াশীল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা নিতে পারে। পৃথিবীটা আজ এমন জটিলই বটে। কিন্তু তাই বলে রুশদী খৃষ্টান বা ইংরেজ ইহুদী ইসরায়েলের দালাল, তাদের টাকা খেয়ে এ বই লিখেছেনÑ এমন কুযুক্তি দিতে পারে শুধুমাত্র ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা, সচেতন ধর্মব্যবসায়ীরা অথবা এদের ক্রীড়নক বনে যাওয়া নিরেট মূর্খরাই।

তবুও রুশদী বিতর্কে পুংখানুপুংখ বক্তব্য রাখতে হলে উপন্যাসটিই জনগণের আগে জানা দরকার ছিল। অথবা এর উপর বিতর্ক-আলোচনার সুযোগ থাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় ও মৌলবাদীদের ‘গণতন্ত্রে’ সেই অধিকার জনগণের নেই। ধর্মব্যবসায়ী ফ্যাসিষ্ট সরকারগুলোও (তা সে ভারতের মত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ হোক বা এরশাদ সরকারের মত ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ওয়ালাই হোক- সৌদি আরব, ইরানের কথা-তো না বললেই চলে) সে অধিকার ও সুযোগ জনগণকে দেবে না। তাদের ভাবটা হচ্ছে জনগণকে অন্ধকারে থেকেই এই মধ্যযুগীয় মোল্লাদের কথামত চলতে হবে এবং মানুষকে খুন করতে হবে। কিন্তু এরপরও বিপ্লবীদের, প্রগতিশীলদের ও জনগণের একটি পক্ষ ও একটি অবস্থান নেয়ার প্রশ্ন থাকে এবং তা অপরিহার্য। স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসে রুশদী কীভাবে কি বক্তব্য এনেছেন তা পরিস্কার না হলেও এটা বোঝা যায় যে তিনি ইসলাম ধর্ম থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ কারণে মৌলবাদীরা তাকে হত্যা করার জন্য ভাড়াটিয়া খুনী লেলিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা বুর্জোয়া পুস্তক বিক্রেতা-প্রকাশকরা অনেকেই রুশদীকে বর্জন করেছে। তৃতীয় বিশ্বের অনেকগুলো রাষ্ট্র বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এগুলো কি গণতান্ত্রিক অনুশীলন ? মোটেই তা নয়। ধর্ম প্রশ্নে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা এবং ধর্ম প্রশ্নে যে কোন মত পোষণ করা ও তা প্রচার করার অধিকার নিশ্চিত করা। যদিও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা, মৌলবাদীরা ও তাদের দালালরা নাস্তিকতার দায় শুধু কমিউনিস্ট- দের উপর চাপিয়ে আজ বিশ্ব জুড়ে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে জোরালো করে চলেছে, কিন্তু ধর্ম প্রশ্নে উপরোক্ত কর্মসূচী কমিউনিস্টরাই প্রথম আনেননি। এগুলো ছিল বুর্জোয়াদেরই গণতান্ত্রিক কর্মসূচি। যখন ইউরোপে বুর্জোয়া বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তখন তারাই মধ্যযুগীয় স্বৈরাচারী ধ্যান-ধারণা ও অন্ধকারকে বিতাড়িত করার জন্য উপরোক্ত কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল।

কিন্তু এই শতাব্দীতে ঐ বুর্জোয়ারাই সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছে এবং সারা বিশ্ব জুড়ে সকল প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সকল প্রগতিচিন্তা, আধুনিকতা, গণতন্ত্র ও বিপ্লবের বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় মূল্যবোধকেই সাম্রাজ্যবাদ আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করছে ও তাকে মদদ দিচ্ছে। এ কারণেই আজ সারা বিশ্বে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ধর্মীয় মৌলবাদীরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সুতরাং আজ ধর্মীয় মৌলবাদ প্রধানত সাম্রাজ্যবাদেরই মদদে, প্রশ্রয়ে, তারই চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। তাই মৌলবাদ বিরোধিতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা আজ প্রধানত একাকার হয়ে গেছে। অবশ্য কোন কোন ক্ষেত্রে জনগণ সাম্রাজ্যবাদ বা ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াকে বিরোধিতার জন্য বিপরীত-ধর্মীয় মৌলবাদকে আশ্রয় করেছেন- সঠিক মতাদর্শের অভাবে। কিন্তু সেটাও আজ হোক কাল হোক, সাম্রাজ্যবাদের খপ্পরেই পড়েছে ও পড়বে। আদর্শগতভাবে ধর্মীয় মৌলবাদকে সংগ্রাম করা সর্বদাই অপরিহার্য।

আজ রুশদী বিতর্কে ধর্মীয় মৌলবাদীদের একাংশ খৃষ্টান বা ইহুদী বিরোধিতার মধ্য দিয়ে বাহ্যত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের কিছু কিছু বিরোধিতা দেখালেও তা সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদেরই অনুমোদিত এবং সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকেই তা পরিপুষ্ট করছে। সাম্রাজ্যবাদ আজ ভাবগত ক্ষেত্রে চায়-ই জনগণের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হয়ে মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিয়াশীল মূল্যবোধ জনগণের মাঝে জেঁকে বসুক।

কিন্তু রুশদী বিতর্কে ধর্মীয় মৌলবাদকে বিরোধিতা করা তখনই সার্থক যখন ধর্ম প্রশ্নে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিটাকে উর্ধ্বে তুলে ধরা হবে। ধর্মীয় প্রশ্নে বহু বিভিন্ন মতবাদ পৃথিবীতে রয়েছে। এমনকি একই ধর্মের অন্তর্ভূক্ত বহু মতবাদ পরস্পরকে বৈরভাবে সংগ্রাম করছে ও করেছে- এমন দৃষ্টান্তও বহু রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি মতবাদ অন্যটাকে কমপক্ষে অনুভূতিগত আঘাত না করেই পারে না। ইসলাম ধর্ম পৌত্তলিকতাকে বিরোধিতা করে মূর্তি ভেঙ্গে ফেলাকে ধর্ম মনে করে; অন্যদিকে মূর্তিপূজা হিন্দু বা অন্য অনেকের কাছেই পবিত্র ধর্ম। ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্মের বিরোধিতা করেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উপমহাদেশে মধ্যযুগে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্ম এবং আধুনিক ইতিহাসে ব্রাহ্ম ও হিন্দুদের পারস্পরিক বিরোধিতা অনেকেই জানেন। অন্যদিকে নাস্তিক্যবাদ সব ধর্মকেই বিরোধিতা করে। সুতরাং ধর্ম-প্রশ্নে একটি মতবাদ অন্যটিকে বিরোধিতা না করেই পারে না, এবং এতে অন্য মতবাদ অনুসারীরা অনুভূতিগত আঘাত না পেয়েই পারে না। (অবশ্য সমাজ-বিপ্লবীরা এ প্রশ্নে কীভাবে ভুল মতবাদগুলোকে সংগ্রাম করবেন সেটা ভিন্ন ব্যাপার। এক্ষেত্রে মার্কসবাদীরা অমার্কসীয়দের মত করে সংগ্রাম করেন না।) কিন্তু আজ যদি একটি ধর্মকে বিরোধিতা করলে বা তার আরাধ্য মানুষ নবী, অবতার ও বিষয়কে বিরোধিতা করলেই তাকে মেরে ফেলার নিয়ম আসে, তাহলে সেটা মধ্যযুগেই আমাদেরকে নিয়ে যাবে। মধ্যযুগ ছিল এ ধরনের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মাঝে হানাহানি, খুনোখুনিরই যুগ; তা ছিল ধর্মান্ধতার যুগ। খৃষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে শতবর্ষব্যাপী ধর্মযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোক জীবন দিয়েছে। পৌত্তলিকরা সারা বিশ্বে অসংখ্য নিরাকারবাদীদের হত্যা করেছে। আমাদের দেশে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের হানাহানি একদা এদেশের মাঠ-ঘাট-নদী-নালা রক্তে রঞ্জিত করে ফেলেছিল। সে যুগের শেষ দিকে নব উদ্ভূত বৈজ্ঞানিক চেতনাকে ধর্মান্ধ ক্ষমতাসীনরা বর্বরভাবে দমন করেছে। খৃষ্টধর্মের বিরোধী বলে দার্শনিক ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক গ্যালিলিওকে একই কারণে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। ঠিক সেই যুগটাই কি মৌলবাদীরা আমদানী করতে চাচ্ছে না? এটা মধ্যযুগীয় ফ্যাসিবাদী বর্বর দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া আর কী? আধুনিক যুগের বিকাশই পৃথিবীতে হয়েছে এই বর্বরতাকে সংগ্রাম করে, তাকে বিরোধিতা করে। মৌলবাদীরা কি আবার পুরনো যুগেই ফিরে যেতে চাচ্ছে না? আমাদের দেশে এখন কসাই খোমেনীর মত শুধু রুশদীকে হত্যা করার প্রচারণাই যে করা হচ্ছে তাই নয়, বরং “বাংলাদেশের রুশদী”দের হত্যার স্লোগানও তোলা হচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল জোয়ার এমন শক্তিশালী হয়েছে যে, মৌলবাদী না হয়েও বুড়া আতাউর রহমান সম্প্রতি এক সভায় প্রকাশ্যে বলেছে- রুশদী সমর্থকরা হচ্ছে ইসলামের শত্রু, আর ইসলামের শত্রুদের হত্যা করা হচ্ছে মুসলমানদের কর্তব্য। কী সাংঘাতিক প্ররোচণা! এটা যদি দেশকে সাম্প্রদায়িক খুনোখুনির দিকে ঠেলে দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্র না হয় তাহলে এটা কী? বহু মুসলমানের দৃষ্টিতে কাদিয়ানীরা ইসলামের শত্রু। তাদের সবাইকে তা হলে হত্যা করে ফেলতে হবে? পৌত্তলিকরা ইসলামের শত্রু। তাহলে কি সকল হিন্দুকে হত্যা করে ফেলতে হবে? ইরানে কসাই খোমেনী বাহাই সম্প্রদায়কে ইসলামের শত্রু ঘোষণা করে কচুকাটা করেছে ও হাজার হাজার বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী-জনগণকে ইসলামের শত্রু বলে নির্বিচারে ফাঁসি দিয়েছে। পাকিস্তানে মওদুদী কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উস্কানী দিয়েছিল। ঠিক এরকম রাজত্বই কি তারা চাচ্ছে ? এদেশে দুই কোটির মত হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রয়েছেন যারা নিশ্চয়ই ইসলামকে বিরোধিতা করেন। তারা যদি ইসলামকে সমর্থনই করতেন তাহলে তারা ভিন্ন ধর্মের হতেন না। অসংখ্য নাস্তিকতাবাদী রয়েছেন যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন না। এদের সবাইকে ইসলামের শত্রু বলে হত্যার বিভৎসতা শুরু করাই কি এদের উদ্দেশ্য? এরা কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্রেই নামেনি? এভাবে পৃথিবীতে কোন আধুনিক রাষ্ট্র কি থাকা সম্ভব? এদেশে মুসলমানরা নাস্তিক বা অন্য ধর্মীদের-কে হত্যা করবে, নাস্তিকদের দেশে তারা ধর্মবিশ্বাসীদের হত্যা করবে, ইহুদীরা ইসরাইলে মুসলমানদের হত্যা করবে, পাল্টা মুসলমানরা অন্যত্র ইহুদীদের কচুকাটা করবে, পাকিস্তানে কাদিয়ানীদের গণহত্যা করা হবে, পাল্টা ভারতে মুসলমানদের গণহত্যা করা হবে- এখানেই নিয়ে যাচ্ছে তাদের যুক্তি। কোন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন লোক এই মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতাকে বিরোধিতা না করে পারবে? রুশদী কি বলেছেন তা বিস্তারিত আমরা জানি না। তার মতবাদ বা বক্তব্যকে সমর্থন করতেই হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু ধর্ম প্রশ্নে তার একটি মতবাদ তিনি বলতে পারবেন না, সেটা তিনি বলেছেন বলে তাকে হত্যা করতে হবে, সারা দুনিয়ার ভাড়াটিয়া খুনীদের উস্কানো হবে টাকার লোভ দেখিয়ে, আর জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে তাদেরকে সাম্প্রদায়িকতায় নামানো হবে- এগুলোকে কোন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যক্তিই বিরোধিতা না করে পারেন না। আমাদের দেশে ও বিশ্বের মৌলবাদীরা যে তাদের প্রগতিবিরোধী চক্রান্ত থেকেই এত সোচ্চারে মাঠে নেমেছে- ধর্মপ্রাণ জনগণের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধার জন্য নয়, তা মোটেই অস্পষ্ট নয়। এদেশে বিভিন্ন পদের শত-সহস্র ইসলাম বিরোধী তৎপরতা সরকার, সমাজপতি ও রাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে প্রকাশ্যেই ঘটে চলেছে। শেরাটন-সোনারগাঁও-এর মদ উৎসব, বেশ্যাবৃত্তি, সারাদেশ জুড়ে প্রদর্শনীর নামে জুয়া, নগ্ন নৃত্য, দেশজুড়ে অসৎ সিনেমার জোয়ার, টেলিভিশনে পশ্চিমা অশালীনতা ও হাইজ্যাক মারদাঙ্গা খুনোখুনী প্রদর্শনী, নগ্ন পত্রপত্রিকা – এসব-তো কোনটাই রেখেঢেকে হচ্ছে না। এসবের জন্য কারা দায়ী তা-ও লুকানো নয়। জামাত থেকে শুরু করে গলাবেচা সাঈদী, আর পীর-ব্যবসায়ী কোন্ মৌলবাদীটি এসব কারণে কয়টা লোকের মৃত্যদণ্ড এ পর্যন্ত দিয়েছে? এগুলো না করে লন্ডন প্রবাসী এক নিরীহ ঔপন্যাসিকের হত্যার ঘোষণা দিয়ে এরা হরতাল করছে কোন উদ্দেশ্যে ?

আসলে তাদের শ্রেণী স্বার্থটি খুবই পরিস্কার। তাদের শ্রেণীস্বার্থ ও প্রভুস্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজগুলো ধর্মবিরোধী হলেও তাদের খুব একটা আপত্তি নাই; কিন্তু আপত্তি হচ্ছে প্রগতিচিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসারে। একেই তারা টুঁটি টিপে হত্যা করতে চায়। আর এ প্রয়োজনেই তারা আবার ধর্মকেও সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু এ প্রসঙ্গেই এ ইস্যুতে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা বিশ্লে¬ষণের বিষয়টিও চলে আসে। বৃটেন-মার্কিন দেখাতে চাচ্ছে তারা গণতন্ত্রের পীঠস্থান, তাই রুশদীকে হত্যার জন্য খোমেনীর হুমকিকে তারা নিন্দা করছে, বলছে এটা “বর্বর”, বলছে খোমেনীকে “ভদ্র” বানাতে হবে। বলছে তারা গণতন্ত্রের ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন। এসব বোলচাল বিশ্ব জনগণের দৃষ্টিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। রুশদীকে হত্যার হুমকি দেয়ার কারণে খোমেনীকে বর্বর বলছে যে মার্কিন সেই মার্কিনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট গুণ্ডা রিগ্যান মাত্র অল্প কিছুদিন আগে যখন লিবিয়ার গাদ্দাফীকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল তখন কোথায় ছিল তার ‘সভ্যতা’ ‘গণতন্ত্র’ আর বিশ্ব রাজনীতির নিয়ম-কানুন? শুধু ঘোষণা দিয়ে হত্যার হুমকিই নয়, ঘোষণা ছাড়াই কত লক্ষ জনগণ ও বিপ্লবী কর্মী-নেতাকে তারা প্রকৃতই হত্যা করে ফেলেছে “ভিন্নমত” প্রকাশের ও প্রচারের অপরাধে (এবং এখনও বিশ্ব জুড়ে করে চলেছে) তার কোন হিসাব কি তাদের ‘সভ্য’ দেশের ‘গণতন্ত্রের’ খাতায় লেখা আছে? প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যে রুশদীর খুব একটা পক্ষে নয় তা বোঝা যায় এতেই যে, রুশদীকে তার মত প্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আত্মগোপন করতে হয়েছে বা কার্যত বন্দীজীবন যাপন করতে হচ্ছে; মার্কিন-বৃটেন রুশদীর নাস্তিক্যবাদের পক্ষে ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি ও বড় বড় বুর্জোয়া প্রকাশক, পুস্তক-ব্যবসায়ীরা রুশদীকে বর্জন করেছে; সাম্রাজ্যবাদের দালাল তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো রুশদীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল মৌলবাদীরা তাদের প্রভুদের সমর্থন থেকে একটুও বঞ্চিত হচ্ছে না। সাম্রাজ্যবাদ ইরানের বিরুদ্ধে এখন রুশদী ইস্যুটাকে ব্যবহার করতে চাচ্ছে নিজ সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করার স্বার্থে। উপরন্তু তাদের উপর নিজ দেশের জনমতের চাপও রয়েছে যা পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে কঠিন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইরান আরো দ্রুত সাম্রাজ্যবাদী বলয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ছে। কিন্তু ইরানের শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে এ নিয়ে এখন তীব্র দ্বন্দ্ব চলছে (এ নিবন্ধ যখন লেখা হচ্ছে তখন খোমেনীর উত্তরসুরী বলে প্রচারিত মোন্তাজেরী পদত্যাগ করেছে বা তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে)। রুশ-ব্লক নাকি মার্কিন-ব্লককে চয়েস করা হবে এবং সাম্রাজ্যবাদের সাথে কতটুকু মাখামাখি করা হবে বা না হবে তা নিয়েই এ দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে। সুতরাং কসাই খোমেনী যে রুশদীর মৃত্যদণ্ড ঘোষণা করে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সাথে দর কষাকষি করতে চাচ্ছে অথবা শাসক শ্রেণীর রুশ ব্লকীয় গোষ্ঠীরা এ থেকে সুবিধা আদায় করতে চাচ্ছে- সেটা পরিস্কার। এটা আরো পরিস্কার হয় যখন রুশদী ইস্যুতে ‘নাস্তিক’ রাশিয়া মৌলবাদী খোমেনীর পক্ষে দাঁড়িয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনা করে এই ভাষায় যে, পশ্চিমারা এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলছে।

অন্যদিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদও এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, ইরানকে চাপ দিয়ে বাগে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এভাবে বিশ্ব রাজনীতির জটিল চক্রাবর্তে পড়ে রুশদী ইস্যুতে বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষের বিশ্বব্যাপী তৎপরতা চলছে। ধর্মীয় মৌলবাদী পাণ্ডারা এগুলো ঠিকই বোঝে ও জানে। কিন্তু তারা জনগণকে এগুলো জানায় না। জনগণকে তারা মধ্যযুগীয় মূল্যবোধে কলুষিত করার জন্যই একে ব্যবহার করতে চায় ও করে এবং এভাবে গণতন্ত্র ও প্রগতির বিরুদ্ধে তাদের চক্রান্তকে বিকশিত করতে চায়।

তবে এটাও সঠিক যে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বে নিপীড়িত মুসলিম জনগণের মাঝে ন্যায্য বিক্ষোভও রয়েছে, যা এই ইস্যুতে ধর্মীয় চেতনার রূপে প্রকাশ পাচ্ছে, এবং যাকে মৌলবাদী পাণ্ডারা ও প্রতিক্রিয়াশীলরা ব্যবহার করতে সচেষ্ট। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ খৃষ্টান ধর্মকে ব্যবহার করেছে বিশ্বজুড়ে জনগণের উপর নিপীড়ন করার জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদীদের তারা ব্যবহার করছে মুসলমান জনগণকে নিপীড়ন করার জন্য। এ কারণে “ইসলাম বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী ইসরায়েলী ষড়যন্ত্রে” মুসলিম জনগণের ক্ষুব্ধ হবার ন্যায্যতাও রয়েছে। একে আমাদের অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু তাই বলে যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা সাম্রাজ্যবাদেরই এজেন্ট তাদেরকে বিরোধিতা করা ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকে উন্মোচন ও বিরোধিতা করার করণীয়কে ভুলে গেলে চলবে না। উপরন্তু আদর্শগতভাবে সামগ্রিকভাবেই ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামটাকে দুর্বল করলে চলবে না। এগুলো দুর্বল করার অর্থ হচ্ছে গণতন্ত্রের সংগ্রামকে পরাজিত করা।

আমাদের দেশে এখন জামাত থেকে শুরু করে পীর গোষ্ঠীগুলো হয়ে বড় বড় মৌলানারা সবাই নিজেদের শ্রেণী স্বার্থেই মৌলবাদকে আঁকড়ে ধরে প্রচণ্ড প্রবলতায় তার প্রচারে নেমেছে। কিন্তু ঠিক এ কারণেই তারা ব্যাপক শ্রমিক, কৃষক, প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই রুশদী বিতর্কে এরা গলা ফাটালেও, আর পোস্টারে দেয়াল রাঙালেও জনগণ হচ্ছেন স্রেফ দর্শক। বরং জনগণ- যেমন হোটেল শ্রমিকরা এ মুহূর্তে চিন্তা করছেন এই মোল্লা-রাজাকাররা কিভাবে ধর্মের নামে তাদের রুজি রোজগার বন্ধ করে দেবে সেই সমস্যাটি। অথচ এমন অবস্থাতেও সংশোধনবাদী ও সুবিধাবাদী, প্রগতি-ব্যবসায়ী বুদ্ধিজীবীরা রুশদী ইস্যুতে মৌলবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদে মাঠে নামেনি। তারা মৌলবাদীদেরকে কেতাবী সমালোচনা করলেও বিতর্কিত ইস্যুটাতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব পালন করেননি। অতি সম্প্রতি সাঈদী বিরোধী সংগ্রামের ফলশ্র“তিতে মৌলবাদীরা কিছুটা যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল সে ক্ষতি তারা এবার সুদে-আসলে পুষিয়ে নিয়েছে। এ বড় ভয়াবহ ভবিষ্যতের পদধ্বনি। কিন্তু প্রতিক্রিয়ার সাথে কোন আপোষে প্রগতিশীলরা রেহাই পেতে পারে না। এই ধর্মান্ধ-ধর্মব্যবসায়ী ফ্যাসিষ্টরা ’৭১-সালে শুধু কমিউনিস্টদের গলাই কাটেনি, যে কোন প্রগতিশীল ব্যক্তিরই গলা তারা কেটেছে বা কাটার চেষ্টা করেছে। ইরান হচ্ছে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে রুশপন্থী তুদেহ পার্টি খোমেনীর সাথে আপোষ করেছিল মাওপন্থী ও জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদেরকে বিরোধিতার জন্য, আপোষ করে পার পেয়ে যাবার আশায়, সেই তুদেহ পার্টির সাধারণ সমর্থকটি পর্যন্ত খোমেনীর নিপীড়ন ও হত্যা থেকে পরে রেহাই পায়নি। অতি সম্প্রতি ১৫/২০ হাজার জেলবন্দীকে খোমেনী হত্যা করেছে শুধু প্রগতিশীল প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করার জন্যই। সুতরাং আজ ধর্মীয় মৌলবাদীরা যা করছে, সেটা রুশদীর কারণে নয়, রুশদী তাদের উদ্দেশ্যও নয়, রুশদী  উপলক্ষ মাত্র। সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালেরা, সকল মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা সকল প্রগতিচিন্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে টুঁটি চেপে হত্যা করার মতাদর্শগত প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে- এটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা জনগণের পশ্চাদপদ চিন্তা-চেতনাকে উস্কে দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির অপচেষ্টায় নিয়োজিত। তারা সাম্প্রদায়িক হানাহানি খুনোখুনির ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছে- যারপরনাই। একে বিরোধিতা না করে বিপ্লবী-তো দূরের কথা, কোন রকম গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ সম্ভবই নয়। যারা মনে করেছেন এখানে শরীর পুড়িয়ে লাভ কি, আমরা বরং গা বাঁচিয়ে রাজনীতি করে চলি, আমরা-তো একবারে বিপ্লবই করবো- তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। কারণ এটাই এখন বিপ্লব, রুশদী বিতর্কে সঠিক অবস্থান নেয়া ও তার জন্য সংগ্রাম করাটাই এখন বিপ্লব একে এড়িয়ে গিয়ে, একে বাদ দিয়ে, গণতন্ত্র, প্রগতি, বিপ্লব  অসম্ভব, অকল্পনীয় ।

সূত্রঃ আন্দোলন প্রকাশনা, সিরিজ ৩


আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারী ‘১৬ সংখ্যাঃ সিরিয়ায় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠছে

download

সম্প্রতি সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব তথা আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠছে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে। সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ-ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-প্রতারণা তা-ও সকলে পুনরায় প্রত্যক্ষ করছে। সিরিয়ায় রুশপন্থি আসাদ সরকারকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে আইএস তথা দায়েস উচ্ছেদের ছুতায় মার্কিন আগ্রাসনের পর এই বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। তার পর রাশিয়া আইএস উচ্ছেদে (মূলত আমেরিকার বিরুদ্ধে) সিরিয়ায় সামরিক হামলা করলে আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ফলে একবিশ্ব ব্যবস্থার মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পড়ে মহাসংকটে।

মধ্যপ্রাচ্যে তেলের উপর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইরাক-আফগানিস্তান-লিবিয়া দখলের পর আমেরিকা সিরিয়া আক্রমণের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করে। ইতিমধ্যে দজলা-ফোরাত নদী দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ইউক্রেনে রুশ বিরোধী শক্তিকে আমেরিকা মদদ দিতে থাকে। বহুবিধ সংকটের কারণে আমেরিকাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া নতুনভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশ্ব পরিসরে মার্কিনের সাথে দ্বন্দ্বমান চীন ইরানের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে। অতি সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর ইরান সফর সেটাই তুলে ধরছে। উল্লেখ্য এই সফরে দু দেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাঝে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক চুক্তিও রয়েছে। এ ছাড়া কৌশলগত সম্পর্কের ব্যপারে ২৫ বছরের একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টা খ্বুই গুরুত্বপূর্ণ।

এবারে জাতিসংঘে সিরিয়া আক্রমণে মার্কিন প্রস্তাবে রাশিয়া ভেটো প্রদান করে। ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে রুশ-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধ স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় মুখোমুখি হয় এই দুই পরাশক্তি। আমেরিকা পিছু হঠতে বাধ্য হলেও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত অব্যাহত রাখে। আমেরিকা আসাদ বিরোধী শক্তিকে সংগঠিত করে “ফ্রি সিরিয়ান আর্মি” গড়ে তোলে। অন্যদিকে ইরাক-সিরিয়ায় হতাশাগ্রস্ত সুন্নীদের মার্কিনীরা মদদ দিয়ে গড়ে তোলে আইএস। এ জন্য মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে মার্কিন ব্যবহার করে। আইএসও বিভিন্ন কারণে এক পর্যায়ে লাদেনের মতো আমেরিকার অবাধ্য হয় কখনো কখনো। তাই আইএস উচ্ছেদের উছিলায় আমেরিকা সিরিয়ায় সৈন্য পাঠায়। প্রচার আছে যে, মার্কিনীরা আইএসকে যত না আক্রমণ করে, তার চেয়ে বেশি আক্রমণ করে বাশারের সৈন্যদের উপর। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ৩৫টি দেশের জোট থাকা সত্ত্বেও নতুন করে মার্কিনের পা-চাটা সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৩৪টি মুসলিম দেশ নিয়ে আইএস বিরোধী জোট গঠন করেছে। মজার বিষয় হচ্ছে এই জোটে আইএস-এর কট্টর বিরোধী ইরান নেই। এসব হচ্ছে মার্কিনের আধিপত্য বজায় রাখা ও প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী যুদ্ধ-পরিকল্পনার অংশ। এই প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধের  মধ্য দিয়ে তারা তাদের অস্ত্র ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছে।

এই আমেরিকান জোট আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না তা পরিষ্কার। তুরস্ক হচ্ছে এই জোটের অংশীদার। অথচ আইএস-এ যোগদান করতে ইচ্ছুক বহির্বিশ্বের গেরিলারা অনেকেই তুরস্কের সীমান্ত দিয়েই আইএস-এর ঘাঁটিতে প্রবেশ করছে। শুধু তাই নয়, তুরস্কসহ অনেক জোট সদস্য দেশই আইএস অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে সস্তায় চোরাই পথে তেল কিনে নিচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিদার আইএস মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিমদের সাধারণ শত্রু ইসরাইলের বিরুদ্ধে টু-শব্দ করছে না।

সুতরাং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে যুদ্ধ আইএস উচ্ছেদের যুদ্ধ নয়। এর রয়েছে দ্বিমুখী তৎপরতা। আইএসকে রক্ষা করে কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরদ্ধে অদৃশ্য যুদ্ধকে জিইয়ে রাখা এবং যখন আইএস সীমা লংঘন করে তখন অবাধ্য সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কিছু যুদ্ধ করা। এই মার্কিনী ছকে বাধ সেধেছে রাশিয়া, আইএস উচ্ছেদে অংশ নিয়ে। সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব।

রাশিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রেখে মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব আধিপত্যের এ খুঁটিকে রক্ষা করা। অন্যদিকে আমেরিকা চাইছে বাশার সরকারকে উচ্ছেদ করে মধ্যপ্রাচ্যে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এখানকার আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব মার্কিনের সাথে জোটবদ্ধ থেকে রাজতন্ত্র রক্ষায় ব্যস্ত। ইরানের কর্মসূচি হচ্ছে একটা বৃহৎ শিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। আর তুরস্কের এরদোগান সরকার চাচ্ছে মার্কিনী জোটে থেকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত রেখে তা ছড়িয়ে দিতে। যেজন্য তারা আইএস-এর সাথে গোপন সম্পর্ক রক্ষা করে। এরা প্রকাশ্যে মার্কিন-রুশ জোটে থাকলেও যার যার সুবিধা অনুযায়ী ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-প্রতারণা-কামড়াকামড়ি করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দী জাতি ছিল বিখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদীরা এই বিশাল কুর্দী জাতিকে ইরান-ইরাক-তুরস্ক-সিরিয়ার মধ্যে মধ্যে ভাগ করে দেয়। সেই কুর্দী জাতি এখন আবার স্বাধীনতার জন্য ফুঁসে উঠেছে। পিকেকে নামক পেটি-বুর্জোয়া সংগঠন সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। তাদের সংগ্রামের প্রধান ক্ষেত্র তুরস্কের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল। এখানে ইব্রাহীম কায়াপাক্কায়া প্রতিষ্ঠিত মাওবাদী সংগঠনও সক্রিয়। এরাও আইএস নামের দায়েসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তুরস্ক সরকার পিকেকে এবং মাওবাদীদের উপর আক্রমণ করে আইএসকেই সহায়তা করছে। মাওবাদীদের লক্ষ্য হচ্ছে আইএস উচ্ছেদের পরও নয়া গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লব অব্যাহত রাখা।

সাম্রাজ্যবাদ ও সকল দেশের দালাল শাসকশ্রেণির কার্যক্রম হচ্ছে গণবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল। তারা তাদের শোষণ-নিয়ন্ত্রণ-আধিপত্য বজায় রাখার জন্য জনগণের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে। এই বহুবিধ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের জনগণকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ-এর ভিত্তিতে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এবং আজ আওয়াজ তুলতে হবে- সকল সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলরা সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাত গুটাও।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারী ‘১৬ সংখ্যা


আমেরিকানদের ৭ম শীর্ষ সম্মেলনের তাৎপর্য ও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব

expanding america

১০-১১ এপ্রিল পানামার রাজধানী পানামা সিটিতে আমেরিকানদের ৭ম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে কিউবার উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ও বিরোধিতার কারণে এতদিন কিউবা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা তাদের মধ্যকার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এ প্রেক্ষিতে কিউবার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান মার্কিন বিরোধিতার ফলে যুক্তরাষ্ট্র এতদঞ্চলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত এই সংস্থার ৬ষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে ‘আমেরিকার জনগণের বলিভারিয়ান বিকল্প’(ALBA) দেশগুলো কিউবাকে অংশগ্রহণ করতে না দিলে শীর্ষ সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দেয়। এখানে উল্লেখ্য ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জন্মগ্রহণকারী সাইমন বলিভার দক্ষিণ আমেরিকার স্বাধীনতার লড়াই-এ নেতৃত্ব প্রদান করেন। তার নাম অনুসারে বলিভারিয়ান শব্দটি সামনে আসে। ভেনিজুয়েলার সাবেক নেতা হুগো শ্যাভেজ ও কিউবার ফিদেল ক্যাষ্ট্রোর নেতৃত্বে ২০০৪ সালে ১৪ ডিসেম্বর ভেনিজুয়েলা-কিউবার চুক্তির মধ্যে দিয়ে মার্কিন নেতৃত্বে আমেরিকানদের জন্য মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল(FTAA)-এর বিকল্প হিসেবে এই সংস্থা গঠিত হয়। বর্তমানে এই সংস্থার সদস্য হচ্ছে ১১টি দেশ। এই সংস্থায় মার্কিন বিরোধিতা করে প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে অগ্রসর করে চলে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে বাদ দিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর গোষ্ঠী সিলাক (CELAC) গঠিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকায় তার অবস্থান, শক্তি বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কৌশল পরিবর্তন করে কিউবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৫৯ সালে মার্কিনের দালাল বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করে ফিদেল ক্যাষ্ট্রো ও চে গুয়েভরার নেতৃত্বে কিউবার ক্ষমতা দখল করে। ১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ১৯৬২ সালে কিউবায় রাশিয়ান মিসাইল স্থাপনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যুদ্ধের বিপদ দেখা দিলে সম্পর্কে আরও অবনতি ঘটে। কিউবার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি ও কিউবার সরকারকে উৎখাত করার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী কার্যক্রম সফল না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসে। এ প্রেক্ষাপটে সকল সদস্য তথা ৩৫টি দেশের উপস্থিতিতে এবারের সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও রাউল ক্যাষ্ট্রোর করমর্দনের বিষয়টা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এদিকে ভেনিজুয়েলার উপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি উল্লেখ করলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এ প্রেক্ষিতে ভেনিজুয়েলা বড় আকারে ১০ দিনের সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত করে। সঙ্কট প্রশমনে শীর্ষ সম্মেলনে আগত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সাথে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

চীনা প্রধানমন্ত্রীর ল্যাটিন আমেরিকার ৪টি দেশ সফর:
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়ান তার ল্যাটিন আমেরিকা সফরের প্রাক্কালে আয়ারল্যান্ড থেকে ১৮ মে ব্রাজিল পৌঁছান। ১৮ থেকে ২৬ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া, পেরু ও চিলি সফর করেন। ল্যাটিন আমেরিকা সফরের শুরুতে ব্রাজিল সফরকালে লি কেকিয়ান ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রসৈফের সাথে শীর্ষবৈঠক করেন। চীনের সাথে ব্রাজিলের ২৭ বিলিয়ন (২ হাজার ৭০০ কোটি) ডলার মূল্যের ৩টি চুক্তি ও যৌথ একসান প্লান স্বাক্ষরিত হয়। চীনের সাথে ব্রাজিলের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৮.৯৪ বিলিয়ন (১ হাজার ৮৯৪ কোটি) ডলার। আগামী ৬ বছরে চীন ব্রাজিলে ৫৩ বিলিয়ন (৫ হাজার ৩০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগ করবে। ব্রাজিল থেকে চীন ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের প্যাসেঞ্জার বিমান ক্রয় করবে।

২১ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়ান কলম্বিয়া সফর করে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জুয়ান ম্যানুয়াল স্যান্তোসের সাথে শীর্ষবৈঠকে মিলিত হন। চীনের সাথে কলম্বিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫.৬৪ বিলিয়ন (১ হাজার ৫৬৪ কোটি) ডলার। ২২ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়ান পেরু সফর করেন। তিনি পেরুর প্রেসিডেন্ট ওলান্টা হুমালার সাথে শীর্ষ বৈঠক করেন। ২৩ মে উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার উপর প্রথম রণনীতিগত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। চীনের সাথে পেরুর বাণিজ্যের পরিমাণ ১৪.৩২ বিলিয়ন (১ হাজার ৪৩২ কোটি) ডলার। পেরুতে চীনের বিনিয়োগ হচ্ছে ১৪.২৪ বিলিয়ন (১ হাজার ৪২৪ কোটি) ডলার।

২৪ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী চিলি সফর করেন। ২৫ মে চিলির প্রেসিডেন্ট মিসেলি ব্যাসিলেটের সাথে চীনের প্রথানমন্ত্রী লি কেকিয়ানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুদেশের ৩.৬ বিলিয়ন (৩৬০ কোটি) ডলার কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে শান্তিয়াগো দক্ষিণ আমেরিকায় চীনা মুদ্রা রেন মিনবি’র লেনদেনের ১ম স্থানে পরিণত হয়। চীন চিলিকে ৮.১ বিলিয়ন (৮১০ কোটি) ডলার অনুদান মঞ্জুর করে যা যোগ্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের চিলিতে বিনিয়োগ করার জন্য দেওয়া হবে। চিলির সাথে চীনের বাণিজ্য ৩৪.১ বিলিয়ন (৩ হাজার ১০০ কোটি) ডলার। চিলির বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হচ্ছে চীন। চিলির বাণিজ্যের ২৪% হয় চীনের সাথে।

ল্যাটিন আমেরিকার সাথে চীনের বাণিজ্যের ৫৭% হয় এই ৪টি দেশের সাথে। ব্রাজিল থেকে শুরু করে পেরু পর্যন্ত তথা আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সংযুক্ত করার জন্য ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেল লাইন স্থাপন করবে চীন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য চীন নিকারাগুয়ায় আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ৪০ বিলিয়ন (৪ হাজার কোটি) ডলার ব্যায়ে পানামা খালের বিকল্প খাল নির্মাণ কর্মসূচি গুরুত্ব বহন করে। ২০১৬ সালে অ্যাপেক শীর্ষ সম্মেলন পেরুতে অনুষ্ঠিত হবে। এই শীর্ষ সম্মেলন সফল করতে চীন ভূমিকা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। জানুয়ারি মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিন আগামী দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় ২৫০ বিলিয়ন (২৫ হাজার কোটি) ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালে শেষে ল্যাটিন আমেরিকায় চীনা বিনিয়োগ প্রায় ৯৯ বিলিয়ন (৯ হাজার ৯০০ কোটি) ডলার। ২০১৪ সালের শেষ সময়ে চীন ল্যাটিন আমেরিকার সাথে প্রকৃতিক গ্যাস, পাইপ লাইন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, হাইওয়ে, বন্দর, আবাসন, টেলি যোগাযোগ ও রেলওয়ে খাতে ১১০ বিলিয়ন (১০ হাজার ১০০ কোটি) ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে।

নয়া ঔপনিবেশিক-আধা সামন্তবাদী ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশের উপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার প্রাধান্য হারায় এবং প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন তাদের প্রভাব ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। মার্কিন বিরোধিতাকে সামনে রেখে ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ, বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভা মোরালেস-এর নেতৃত্বে আমেরিকা ও কানাডাকে বাদ দিয়ে সিলাক সংস্থা গড়ে তোলা হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কৌশল পরিবর্তন করে কিউবার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনস্থাপন করে পানামায় আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করে তার অবস্থান ও প্রভাব বৃদ্ধিতে তৎপর থাকে। অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক সম্পর্ক অগ্রসর করে তাদের বাজার ও প্রভাববলয় সম্প্রসারিত করে চলেছে।

সূত্র:  সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৯, রোববার।। ২০ ডিসেম্বর ২০১৫।।


বিশ্বব্যাপী শ্রমিক-কৃষক-জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে

turkey-anti-mining-protest-juoly-8-2015

সাম্রাজ্যবাদীরা মন্দা থেকে বের হওয়ার জন্য একদিকে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণের অর্থে উদ্ধার ও উদ্দীপক কর্মসূচি, কৃচ্ছতা সাধনের কর্মসূচির নামে সঙ্কটের বোঝা আরও বেশি বেশি করে জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মজুরি, বেতন, পেনশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনকল্যাণ খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে দিয়ে ছাঁটাই, বেকারত্ব, করের বোঝা বৃদ্ধি করে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণকে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট, আরও দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করছে। শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্ব সুতীব্র হওয়া এবং একচেটিয়া পুঁজির তীব্রতর আক্রমণ মোকাবেলায় আমেরিকা, ইউরোপসহ পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোসহ বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক, যুবক, জনতা বিভিন্ন রূপে আন্দোলন, বিক্ষোভ-সমাবেশ, ধর্মঘট-সাধারণ ধর্মঘট তীব্রতর করে চলেছে। দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাসমূহের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

২৩ মে বিশ্বের বৃহত্তম বীজ কোম্পানি মনসান্তোর বিরুদ্ধে ৪৮টি দেশের ৪৫২টি শহরে প্রচন্ড বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। মনসান্তো হচ্ছে জিএম ফুড, হাইব্রিড বীজ, পরিবেশ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের বৃহত্তম উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণকারী যুক্তরাষ্ট্রের একটি একচেটিয়া কোম্পানি। এ প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম কৃষিভিত্তিক বায়োটেক কোম্পানির জনগণ ও প্রকৃতি বিধ্বংসী ও দুষণকারী ক্ষতিকর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয় দেশে দেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক, শ্রমিক, জনগণ।

যুক্তরাষ্ট্রে তেল শোধনাগারের শ্রমিকরা ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালের পর বৃহত্তম ধর্মঘট ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত করে। ৯টি শোধনাগারের শ্রমিকরা ছাঁটাই ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ২ মার্চ থেকে সফল ধর্মঘট চালিয়ে যায়। ইস্পাত শ্রমিকরা মজুরি নিয়ে নতুন চুক্তির দাবিতে ধর্মঘট সংগঠিত করে। ম্যাগডোনালসহ ফাস্ট ফুডের কর্মচারীরা ঘণ্টায় ১৫ ডলারের দাবিতে ১৫ এপ্রিল সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী ধর্মঘট করে। হাজার হাজার শ্রমিক এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা, একচেটিয়া পুঁজির শোষণ-লুন্ঠন, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি, বর্ণবৈষম্যবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে গোটা আমেরিকাব্যাপী প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত হয়ে চলেছে। ফার্গুসন শহরে মাইকেল ব্রাউন পুলিশের গুলিতে এবং মেরিল্যান্ড স্টেটের বাল্টিমোর শহরে ফ্রেডি গ্রে পুলিশের কাস্টিডিউতে নিহত হলে পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। বিক্ষোভ ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষ এত তীব্র আকার ধারণ করে যে তা দমনে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে ফ্যাসিবাদী দমন পীড়ন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আরও প্রচন্ড বিক্ষোভের লক্ষণসমূহ সামনে আসায় তা দমনের জন্য পুলিশ, প্রশাসন, ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবসে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমাবেশ, র‌্যালি, বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে হতাহত ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। একই দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিন জু অ্যাবের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় লস এঞ্জেলসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপরাধের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

৮ মার্চ ব্রাজিলে সরকারের দুর্নীতি ও গণবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে রাজধানী ব্রাসিরিয়ায় ১০ লক্ষ লোকের বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। তাছাড়া ৭ এপ্রিল পুলিশের গুলিতে এক বালক নিহত হলে ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। মার্চ মাসে ইসরাইলে লে-অফের প্রতিবাদে ট্রেড ইউনিয়ন সাধারণ ধর্মঘট সংগঠিত করে। ইসরাইলের ডাক, বিমান বন্দর, বিদ্যুৎ, পানি শ্রমিকরা এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। ফ্রান্সের ফেরি শ্রমিকরা ধর্মঘট করলে বন্দর অচল হয়ে যায়। আফ্রিকায় নাইজেরিয়ার আবুজা স্টিল মিলের ৪ জন শ্রমিককে চাকুরীচ্যুত করলে শ্রমিকরা ধর্মঘট সংগঠিত করে। নাইজেরিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে ধর্মঘট পালন করে। আরব আমিরাতের দুবাই-এ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত অভিবাসী শ্রমিকরা দুবাইভিত্তিক এমার প্রপার্টিস-এর শ্রমিকরা অধিকতর মজুরির দাবিতে ধর্মঘট সংঘটিত করে। জার্মানিতে ২টা বিমান বন্দরের গ্রাউন্ড ক্রু’রা ৬ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করে। ১ এপ্রিল পূর্ব ইউরোপের ৬টি দেশ এস্তোনিয়া, লিথুনিয়া, ল্যাটভিয়া, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্রের উপর দিয়ে ১২০টি সামরিক যান নিয়ে ন্যাটো বাহিনী জার্মানির অভিমুখে মার্চ করার সময় কোন কোন জায়গায় জনগণ ‘ফিরে যাও’, ‘ট্যাংক নয়, শান্তি’ ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ৫ এপ্রিল জার্মানিতে ন্যাটোর যুদ্ধোন্মোদনার বিরুদ্ধে রাজধানী বার্লিনসহ বিভিন্ন শহরে ৮০টির বেশি র‌্যালী ও সমাবেশ সংঘটিত হয়। ২২ এপ্রিল ইউক্রেনের কয়লা শ্রমিকরা রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ১ ও ২ মে আয়ারল্যান্ডের বাস শ্রমিকরা বাস সার্ভিস ব্যাক্তি মালিকানাকরণের বিরুদ্ধে ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট করে এবং আরও ৫ দিনের ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। গ্রিস, স্পেনসহ ইউরোপের দেশে দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, সমাবেশ, ধর্মঘট সংঘটিত হয়। বিনা বেতনে শিক্ষার দাবিতে ২৯ মে চিলিতে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ সংঘঠিত হয়।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৯, রোববার।। ২০ ডিসেম্বর ২০১৫।।


একক পরাশক্তি মার্কিনের মোকাবেলায় সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার তৎপরতা

syria-the-good-old-cold-war-game

আন্তর্জাতিক ভাষ্যকার ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক কার্যক্রম মোকাবেলা করে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া নিজেকে রক্ষা করে এবং হারানো স্বর্গ ফিরে পেতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক তথা সামগ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। বৈশ্বিক মন্দা, পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা, তেলের দাম অর্ধেকেরও বেশি পড়ে যাওয়ায় সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার অর্থনীতি গভীর সঙ্কটে পড়ে ২০১৫ সালে মন্দা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। রুবলের দাম পড়তে পড়তে ১ ডলার ৮০ রুবলে গিয়ে পৌঁছায়। রুবলের দরপতন এবং রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে ২০১৪ সালে মোট ৬ বার সুদের হার বৃদ্ধি করলে এক পর্যায়ে তা ১৭%-এ দাঁড়ায়। এভাবে রাশিয়া বিদেশি পুঁজি প্রত্যাহার ঠেকাতে চেষ্টা করলেও পাশ্চাত্যের চক্রান্তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুঁজি প্রত্যাহার হয়। তেলের দাম বিগত সেপ্টেম্বর’১৪-এ ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার থেকে কমতে কমতে ৫০ ডলারেরও নিচে নেমে গেলে রাশিয়ার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কারণ রাশিয়ার অর্থনীতিতে রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগ আসে তেল-গ্যাস তথা জ্বালানি খাত থেকে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১২৪.১৩৫ বিলিয়ন (১২ হাজার ৪১৩ কোটি ৫০ লক্ষ) ডলার কমে দাঁড়ায় ৩৮৬.৪৬ বিলিয়ন (৩৮ হাজার ৬৪৬ কোটি) ডলার। ২০১৪ সালে ১০ম অবস্থান পিছিয়ে পড়া রাশিয়ার জিডিপি ১.৮৫৭৫ (১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৭৫০ কোটি) ডলার; জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ০.৬%; বেকারত্বের হার ৫.৯%। ২০১৫ সালে ১ম কোয়াটারে (কোয়াটার ভিত্তিতে) জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল -০.৭% যা (বার্ষিক ভিত্তিতে) দাঁড়ায় -১.৯%। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বাজেটে সামরিক খাত ছাড়া অন্যান্য খাতে ১০% ব্যয় হ্রাস করা হয়। সঙ্কট থেকে উত্তরণে রাশিয়া পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এ পরিকল্পনা কার্যকরী করার মধ্যদিয়ে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত রুবলের মূল্য ১৩% বৃদ্ধি পেয়ে ১ ডলার ৫০ রুবলে পৌঁছায়। ইউরোপের ভূমিকার কারণে রাশিয়ার তার সাউথ স্ট্রিম পরিকল্পনা বাতিল ঘোষণা করে নতুন রুটের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে তুরস্ককে বেছে নিয়ে তার সাথে পাইপ লাইন স্থাপন ও গ্যাস চুক্তি সম্পাদন করে। এটাকে ‘তার্কিস স্ট্রিম’ বলা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাশিয়া গ্রিসের সাথে গ্যাস পাইপ লাইন ও গ্যাস চুক্তি সম্পাদন করে। রাশিয়া বিকল্প বাজার হিসেবে চীন তথা পূর্ব এশিয়া মুখি জ্বালানি পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ জোরদার করে। তেলসহ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির জন্য রাশিয়া ওপেকভুক্ত ও ওপেক বহির্ভূত দেশসমুহকে নিয়ে বৈঠক করে। এ প্রেক্ষিতে ওপেক/সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলার সাথে বৈঠক করে। রাশিয়া তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন কৌশল গ্রহণ করে বর্তমানে রোসাটম ১ ডজন দেশে ২৯টি পারমাণবিক রিএক্টর স্থাপনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, জর্ডান, ইরান, হাঙ্গেরি, মিশর, আর্জেন্টিনা, তুরস্ক ইত্যাদি। রাশিয়ার আয়ের আরেকটি উৎস হচ্ছে অস্ত্র বিক্রি থেকে আয়। ২০১৪ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় অস্ত্র রফতানিকারী দেশ হিসাবে রফতানি করে ১৩.২ বিলিয়ন ( ১ হাজার ৩২০ কোটি) ডলার। মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকা- মোকাবেলায় রাশিয়া পুঁজিবাদী চীনের সাথে সমন্বিত হয়ে মেরুকরণ প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সিস-সিসটো, এসসিও-র‌্যাটস, রিক-ব্রিকস, সিকা, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন প্রক্রিয়া জোরদার করে চলেছে। ব্রিকস ও ব্রিকসের নতুন উন্নয়ন ব্যাংক (NDB), চীনের নেতৃত্বে এআইআইবি ব্যাংক আন্তর্জাতিকভাবে শক্তির পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রক্রিয়া জোরদার করে। এর মধ্যদিয়ে দ্বিমেরু ব্যবস্থা গড়ে উঠার ইঙ্গিত লক্ষণীয়। মিশর, তিউনেশিয়া, ভিয়েতনাম ইউরেশীয় ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (এফটিএ) স্বাক্ষরে সম্মত হয়। ইসরাইল ইউরেশীয় ইউনিয়নের সাথে ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ (FTA)-এর সম্পৃক্ত হওয়ার আলোচনা চলছে। ৮ এপ্রিল রাশিয়ার প্রধনমন্ত্রী মেদভেদেভ ব্যাংককে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রাউথ চানো চা’র সাথে বৈঠকে থাইল্যান্ডকে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে প্রস্তাব দেন।

ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ট্রং ট্যান স্যাং ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুদ্ধের ৭০তম বিজয় বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে রাশিয়া সফর করে। তিনি পুতিনের সাথে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। তারা উন্নয়নের নতুন পর্যায়ে দু’দেশের সামগ্রিক রণনীতিগত অংশীদারিত্ব জোরদার করার কথা বলেন। এ মাসের শেষে তারা ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন ও ভিয়েতনামের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য এলাকা চুক্তি স্বাক্ষরে ঘোষণা দেন। ২০২০ সালের মধ্যে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যাপারে তারা একমত হয়।

রাশিয়ার নতুন সামরিক মতবাদ:
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন নেতৃত্বে ইউরোপকে সমন্বিত করে ন্যাটোর সামরিক রণনীতি মোকাবেলায় রাশিয়া নতুন সামরিক মতবাদ সামনে আনে। এই মতবাদে রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর বৃহত্তম হুমকি হিসেবে ন্যাটোর সম্প্রসারণকে দায়ী করা হয়। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রুশ সেনা মোতায়ন করা, সমগ্র সমাজের বর্ধিত সামরিকীকরণ, ব্রিকস দেশসমূহ ও ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের সাথে সামরিক সহযোগিতাকে সামনে আনা হয়। নতুন প্রতিরক্ষা মতবাদে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে সামরিক হুমকির চরিত্রের পরিবর্তনের কথা বলা হয়। যা ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং উত্তর আফ্রিকা, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের ঘটনাবলীতে পরিলক্ষিত হয়। রিপোর্টে জাতিসংঘের গুরুত্ব এবং ওএসসি’র সাথে রাশিয়ার সহযোগিতা করার ইচ্ছার কথা বলা হয়। পারমাণবিক বা প্রচলিত অস্ত্রেই হোক রাশিয়া আক্রান্ত হয়ে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়লে রাশিয়ার প্রি-এম্পটিভ পারমাণবিক আঘাত হানার অধিকার বজায় রাখার কথা বলা হয়। চীন, বেলারুশ, কাজাখস্তানসহ রাশিয়ার মিত্রদের উপর সামরিক আক্রমণ হলে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপের অধিকার বজায় রাখে। রিপোর্টে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের উপর আলোকপাত করা হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামরিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারে পরিস্থিতি তুলে ধরে রাশিয়ার মূল সামরিক হুমকিগুলো বর্ণনা করা হয়। রিপোর্টে যুদ্ধকালীন অর্থনীতির প্রস্তাব করা হয়। ক্রিমিয়ার রণনীতিগত গুরুত্বের কারণে স্থলবাহিনী ও কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরকে আরও উন্নত ও আধুনিকীকরণ করা এবং আর্কটিকে রাশিয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রদত্ত সামরিক সংস্কার কর্মসূচি কার্যকরী করা এবং সামরিক অস্ত্র সজ্জিতকরণ বিষয়ে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের জন্য নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়। রাশিয়ার নাগরিকদের সামরিক দেশপ্রেমিক শিক্ষায় শিক্ষিতকরণ এবং প্রত্যেক নাগরিককে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা। সামরিক সংঘাত প্রশমন ও প্রতিরোধের প্রধান কর্তব্য হিসেবে দলিলে ব্রিকস, মধ্যএশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে বর্ধিত সামরিক সহযোগিতা করার কথা বলা হয়। রাশিয়ার সাথে দক্ষিণ ওসেটিয়া ও আবখাজিয়ার সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলা হয়। সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে এতদঞ্চলে অনেক নৃ-গোষ্ঠী ও জাতীয় সংঘাত রয়েছে যাকে যে কোন সময় প্ররোচিত করে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার সরাসরি সংঘর্ষের বিপদ সৃষ্টি করা যেতে পারে বলে বলা হয়। সিসটোর সদস্য ও পর্যবেক্ষক দেশগুলোকে শক্তিশালী এবং ওএসসিই (OSCE) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO)’র সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। এ সময়ে ইউক্রেন কোন পক্ষের সামরিক জোটে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টে বাতিল করে ভবিষ্যতে ন্যাটাভুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত করায় রাশিয়ার উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। ইউক্রেনকে আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রেরণ করে চলেছে। ১৬ মে ইউক্রেন পার্লামেন্ট বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করার মোরাটোরিয়াম ঘোষণা করায় রাশিয়া তা প্রত্যাখান করে।
১৬-১৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার উপরে ৪র্থ মস্কো কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৭৯টি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক প্রতিনিধি দল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কয়েকজন প্রধান উপস্থিত থাকেন। এই সম্মেলনে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সার্গেই সইগু এবং রাশিয়ার সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ বিশ্ব নিরাপত্তার প্রধান প্রধান হুমকি এবং তা মোকাবেলায় সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন। এই সম্মেলনে গতবারের মত এবারেও ন্যাটো ও ইউরোপের দেশগুলো অংশগ্রহণ করে না।

একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে ব্যাপক অস্ত্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে রাশিয়া ২০১৫ সালে মহাকাশ সেনাবাহিনী গঠনের ঘোষণা দেয়। বর্তমানে একটি মাত্র মহাকাশ স্টেশন আইএসএস-এ যাতায়াতে মার্কিন স্যাটেল যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে সামনে থাকে রাশিয়ার সুয়্যাজ রকেট। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অগ্রসর করে চললে রাশিয়া পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কালিনিনগ্রাদে ইস্কান্দার মিসাইল স্থাপন করা ছাড়াও আইসিবিএম বিধ্বংসী মিসাইল উদ্ভাবন করে। তাছাড়া মহাকাশে উপগ্রহ অস্ত্র বানানোর কথা শোনা যায়। রাশিয়া ও চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর ব্যাপক সামরিক মহড়ার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর, বাল্টিক সাগর, উত্তর সাগর, ভূমধ্যসাগরে পাল্টা মহড়া করা ছাড়াও যুক্তরাষ্টের নিকটবর্তী এলাকায় রণনীতিগত দূরপাল্লার বোমারু বিমান উড়ানো, মেক্সিকো উপসাগরে রাশিয়ার স্টিলথ্ সাবমেরিনের চলাচল লক্ষণীয়। রাশিয়া ল্যাটিন আমেরিকায় ভেনিজুয়েলাসহ সিলাকের কয়েকটি দেশের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া সংগঠিত করে। কিউবায় রাশিয়ার যুদ্ধ জাহাজ ভেড়া, রুশ ঘাঁটি নবায়ন করা; ইরানকে অত্যাধুনিক এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রদানের ঘোষণা; চীনের সাথে প্রশান্ত মহাসাগরে যৌথ মহড়ার ধারাবাহিকতায় ভূমধ্যসাগরে যৌথ নৌমহড়া; চীনকে অত্যাধুনিক এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং এস-৪০০ মিসাইল প্রদানের ঘোষণা; অত্যাধুনিক আর্মাটা ট্যাংক, আইসিবিএম প্রদর্শন; ভিয়েতনাম ‘কামরান বে’ সামরিক ঘাঁটি রাশিয়াকে ব্যবহার করতে দেওয়া উল্লেখযোগ্য।

কাস্পিয়ান থেকে তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত ১,৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণ কাজ ২০১৫ সালে মার্চ মাসে শুরু হয়ে ২০১৮ সালে সমাপ্ত হবে বলে বলা হচ্ছে। এটা হচ্ছে ইউরোপের তুলে ধরা সউদার্ণ করিডোর রুটের অংশ। এই পাইপ লাইন প্রকল্পে আজারবাইজান ৫৮%, তুরস্ক ৩০%-এর অংশীদার। বর্তমানে ইরান এর শেয়ার কিনতে চাইলে তুরস্ক সম্মত হয়। এই পাইপ লাইনের নির্মাণ ব্যয় ১০ থেকে ১১ বিলয়ন (১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ কোটি) ডলার।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কাজাখস্তান, রাশিয়া ও বেলারুশ সফরে এবং ৯ মে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ৭০তম বার্ষিকীতে যোগদান উপলক্ষ্যে ৭ মে কাজাখস্তানের উদ্যেশ্যে দেশত্যাগ করেন। সফরের শুরুতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিন কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট নূর সুলতান নাজারবায়েভের সাথে ৮ মে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। তারা উভয় দেশের সহযোগিতার নীলনক্সা প্রণয়ন করেন। এ প্রেক্ষিতে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সিল্ক রোড অর্থনৈতিক বেল্টের বাণিজ্য ও অবকাঠামো যৌথ নির্মাণ বিষয়ে আলোচনা করেন।

৯ মে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিন মস্কোর রেড স্কোয়ার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয় দিবস (V-Day)’র ৭০তম বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ব্যাপক সামরিক সম্ভার সজ্জিত কুচকাওয়াচ পরিদর্শন করেন। এই কুচকাওয়াজে ১৫০টির বেশি জঙ্গি বিমান, ২ হাজার সামরিক যান, ১৬,৫০০ সেনা অংশগ্রহণ করে। এতে চীনের কন্টিজেন্ট, ৭৫ সদস্যের ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১টি কন্টিজেন্ট অংশগ্রহণ করে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের রুশ সীমান্তে ব্যাপক সামরিক মহড়া ও তৎপরতার প্রেক্ষিতে এবং তাদের এই অনুষ্ঠান বর্জনের প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্টের রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের পাশে দাঁড়িয়ে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই অনুষ্ঠানে ভারত, ভিয়েতনাম, মিশর, ভেনিজুয়েলা, কিউবা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়েসহ মোট ২৭টি দেশের রাষ্ট ও সরকার প্রধান অংশগ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রকৃত ইতিহাস চেপে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা কমরেড ষ্টালিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং লাল ফৌজের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অস্বীকার করছে। আবার পুতিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়াও বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ মহান নেতা কমরেড স্টালিনের নেতৃত্ব এবং সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক নির্ধারক ভূমিকাকে নৎস্যাত করছে।

অনুষ্ঠান শেষে চীনা প্রেসিডেন্ট ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরকালে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠককালে তারা রুশ-চীন সম্পর্কের অগ্রাধিকার ও গতি নির্ধারণ করেন। এ সময় উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ৩০টিরও অধিক দলিল স্বাক্ষরিত হয়। তারা সিল্ক রুট পরিকল্পনার সাথে রাশিয়ার নেতৃত্বে ইউরেশীয় ইকনোমিক ইউনিয়ন তথা ইউরেশিয়াব্যাপী বাণিজ্য ও অবকাঠামো নেটওয়ার্ক সমন্বিত করা নিয়ে আলোচনা করেন। পূর্বাঞ্চলীয় রুট ছাড়াও পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটে গ্যাস সরবরাহে রাশিয়া চীনের সাথে চুক্তি করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য উভয় দেশের মধ্যে ইতিপূর্বে ৪০০ বিলিয়ন (৪০ হাজার কোটি) ডলারের গ্যাস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আর্থিক, বিমান পর্যবেক্ষণ ডাটা বিনিময়, দ্বৈত কর পরিহার, উৎপাদন সামর্থ, হাইস্পিড রেল ইত্যাদি নিয়ে দলিল স্বাক্ষরিত হয়।

এরপর শি জিনপিন দু’দিনব্যাপী বেলারুশ সফরকালে ১১ মে প্রেসিডেন্ট আলেক্সজান্ডার লুকাশেঙ্কোর সাথে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। উভয় নেতা সিল্ক রোড এবং বেলারুশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন নিয়ে আলোচনা করেন। ২০১৪ সালে উভয়পক্ষের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলার। বেলারুশে চীনা বিনিয়োগ ৪০০ মিলিয়ন (৪০ কোটি) ডলার। বেলারুশকে দেওয়া চীনা ঋণের পরিমাণ ৫.৫ বিলিয়ন (৫৫০ কোটি) ডলার।

৮ থেকে ১০ জুলাই রাশিয়ার উফায় অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ৭ম এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ১৫ম শীর্ষ সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ উত্তেজনাময় বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্যকে মোকাবেলায় রুশ-চীন পরিকল্পনা, রণনীতি-রণকৌশল নির্ধারণ এবং এ সংস্থার পূর্ণ সভ্যপদ সম্প্রসারণ করে ভারত, পাকিস্তানকে নেওয়ার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক মন্দাজনিত পরিস্থিতিতে মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যকে মোকাবেলায় রাশিয়া-চীনের বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা এই শীর্ষ সম্মেলনসমূহের মধ্যদিয়ে আরও অগ্রসর করা হয়।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৮, রোববার।। ২২ নভেম্বর ২০১৫।।


বাংলাদেশঃ আগামীকাল কমরেড আবদুল হকের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করবে জাতীয় কমিটি

12392012_655424137932835_5510994464305166450_n

12360194_654607701347812_8913511760735879758_n