অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (১ম পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

প্রথম পর্ব :

অবুঝমাদের গ্রামবাসী

(এ এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প।)

3

ক্যাম্পে পানি নিয়ে আসছেন এক মাওবাদী ক্যাডার। দলের ৪০ শতাংশ ক্যাডার নারী হওয়ায় বিপ্লবের মেরুদণ্ড ভাগে রয়েছেন নারীরা। নারী ও পুরুষদের মাঝে সকল দায়িত্ব সমান ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে। নারীরা বিশেষ খাদ্য অধিকার পেয়ে থাকেন।

উল্টো দিকে একটা ভূমি মাইন ও বিস্ফোরক পাতার আগে ওরা তিনজন দাঁতে টর্চ লাইট কামড়ে ধরে লম্বা প্যাঁচানো তার খুলে ঝোপের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এখন ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। এই রাতের বেলা ওদের তিনজনকে শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো ভূতের মত দেখাচ্ছিল। ওদের কমরেডরা কাছের একটা ঝরণায় থালাবাসন ধুচ্ছে, কেউ কেউ মাটিতে তেরপল বিছিয়ে বসে আছে আবার কেউ আগুন ঘিরে বসে আছে। ছত্তিসগড়ের নারায়ণপুর জেলার অবুঝমাদের গভীর অরণ্য ঘেরা এই স্থানে মাওবাদীদের এই স্কোয়াডটি রাতের জন্য যাত্রা বিরতি দিয়েছে।

স্কোয়াডের নেতা রজনু মান্দভী ভূমি মাইনটি শেষবারের মত একবার দেখশুনে নিলেন। ওদের সাথে আজ আমার তৃতীয় রাত, আমি বেশ অবাক হলাম। বললাম, “আপনি বলেছিলেন এই জায়গাটা নিরাপদ। আপনাদের গুপ্তচররা সতর্ক বার্তা পাঠাবে না আপনাদের?”

“ওদেরও গুপ্তচর আছে।”

“আপনি কি ভাবছেন আজ রাতে পুলিশ হামলা চালাবে?”

তেরপলের উপর শুয়ে মান্দভী বললেন, “আমাদের প্রহরীরা বাঁশি বাজাবে। আমি মাইন বিস্ফোরণ ঘটাব, ওদের কয়েকজন মরবে। আমরা গুলি ছুঁড়ব, আপনাকে কভার দেব। সব কিছু ফেলে রেখে দৌড় দিয়ে ঐ পাহাড়টার পিছনে চলে যাবেন।”

একটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে জীবনের নিরাপত্তার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে না। রাতের অন্ধকারে ধেয়ে আসা বুলেট এড়িয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলা, গ্রেনেড ছুঁড়ে মারা, পুলিশের ধাওয়া- এসব মিলিয়েই দণ্ডকারণ্য। যে কোন মুহূর্তই যদি জীবনের অন্তিম মুহূর্ত হয়, সেক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্তই অতুলনীয় শক্তি দিয়ে অনুভব করা যায় আর প্রতিটি পদক্ষেপের পিছনে কেবল একটাই আকাঙ্ক্ষা কাজ করে আর তা হল-টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষা। সেই রাতের পর থেকে আমি সবসময় পায়ে জুতা পরে, দুই হাতে আমার ল্যাপটপটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ঘুমাতাম।

2

দণ্ডকারণ্য অরণ্যে মাওবাদী স্কোয়াডের রাত্রী যাপনের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প। মাওবাদীরা অত্যন্ত কঠোর জীবন যাপন করে থাকে। খাদ্য ও তামাকের সরবরাহ অত্যন্ত হিসাব করে করা হয়। স্থানীয় আদিবাসীদের মদ সহ সব ধরনের সুরা জাতীয় পানিয় নিষিদ্ধ।

সারাক্ষণ শত্রুকে ফাঁকি দিতে হয় বলে একজন গেরিলা এক স্থানে পরপর কয়েক রাত কাটায় না। আমরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিই, পাহাড় ডিঙ্গাই; নদী, বন পার হই। রাতের বেলা অন্তত একজন ক্যাডারকে ঘন্টা হিসেবে পাহারায় মোতায়েন করা হয়।

এখন রাতে অনেক ঠান্ডা পড়ে কিন্তু মাওবাদীরা শুধু একটা পাতলা কম্বল গায়ে দিয়ে আদিগন্ত খোলা আকাশের নীচে ঘুমায়।

ভোর ছয়টার দিকে সকালের ড্রিল শুরু হয়, এসময় স্কোয়াডের নেতা ক্যাডারদেরকে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়; কেউ রান্নার জন্য লাকড়ি নিয়ে আসে, কেউ আবার গ্রামে যায় সভায় যোগ দিতে। মাঝে মাঝে ভোর পাঁচটায় বাঁশি বেজে উঠে। চারদিক এখনো অন্ধকার কিন্তু স্কোয়াডের নেতা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্থান বদল করার। হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ কেবল তিনিই জানেন।

মাওবাদীদেরকে আট মিনিটের মধ্যে সবকিছু গোছগাছ করে রওনা দিতে হবে।

(চলবে)

Advertisements