৪ ও ৫ই মে, ২০১৬ঃ ৪৮ ঘণ্টার ‘দণ্ডকারণ্য বনধ’ সফল করার আহবান

547650_295256127274295_452284451_n

Call to make success the 48 hours DANDAKARANYA BANDH on 4th & 5th May, 2016, intensify a month long RESISTANCE CAMPAIGN against DISPLACEMENT!

In a bid to bring the attention of our country and the world towards the displacement problem of Dandakaranya; to protect jal – jungle – zameen, resourses and identity, the very existence and self respect of the Adivasis; to stop the environmental destruction DKSZC of CPI (Maoist) calls upon the people and democrats to make success the proposed 48 hour DANDAKARANYA BANDH on coming 4th and 5th May and intensify a month long RESISTANCE CAMPAIGN during May.

Our party appeals to organise public meetings, conferences, seminars, dharnas, demonstrations, rallies against destructive projects in Chhattisgarh and Maharastra viz.,big mining projects, big dams, pipe line projects, Air bases, Army training schools, national parks, railway lines during Bandh. Our party also appeals to luanch a resistance campaign during May to stop destructive projects of domestic and international big carporate houses. We also appeal to conduct sabotage actions too.

If these projects once started tens of thousands of people of dandakaranya belonging to ancient tribes of Maria, Muria, Dorla, Halba, Dhurva, Bhatra, Uraon, Gond, Rajgond and ancient non-tribes of Raut, Kalad, Mahara, Marar, Panka, Ganda, Telanga, Dhakad, Sundi, Kumhar, Luhar, Kudak, Banjara, Dhobi, Nau, Kenvat, Ghadva, Ghasia would be displaced, they will be cleansed, they will be massacred at a big scale. Tens of thousands of acres of agricultural land and Jungle will be destroyed. Rivers will be badly polluted. Air, water and sound pollution will reach at their heights.

On the whole it can be said that their will be heavy loss to the environment. Monsoon rains will badly be effected and serious draught situation will be created. The life style, culture, their very existence and every thing will be destroyed. Indiscriminate extraction of natural resources, just for the super profits of capitalists will go on and on. Future generations will be left with no resources. We strongly oppose the central and state governments’ neo colonial model of development which is actually the model of loot and exploitation. We are opposing the loot of natural wealth and resources in the name of development.

Our party calls upon all the people to come forward to oppose and fight against the Operation Green Hunt which is actually the unjust war being waged by central and state governments on their own people with the aim of crushing the revolutionary peoples war and the anti-displacement peoples struggles as soon as possible and handing over the resources of Dandakaranya to the big corporate houses. We also appeal the democrats, human rights organisations and pro people media to support the anti-displacement mass movements, to safeguard the real peoples development model being implemented by revolutionary peoples committees which are called the JANATANA SARKARS.

With revolutionary greetings,

(Vikalp)

Spokeperson

Dandakaranya Special Zonal Committee

Communist party of India (Maoist)

Advertisements

অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (শেষ পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

শেষ পর্ব:

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

naxal-45

পুলিশরা আদিবাসীদেরকে অত্যাচার করে বলে মাওবাদীরা অভিযোগ করে; পুলিশ এবং মাওবাদীদের মধ্যে তফাৎ কী জানতে চাইলে জয়লাল সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকাল, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলঃ “হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। এটা খারাপ”। তারপরই বলল, “এবিষয়ে হয়তো সিনিয়র নেতারা সিদ্ধান্ত নেবেন”।

বরাবর তর্কপ্রবণ হলেও তাদের মতাদর্শের ভিতরে যে ফাঁক আছে সেটা গেরিলারা অস্বীকার করে না। ওরা যখন বলে, “সব ধরনের সম্পত্তিই খারাপ, কাজের বিনিময়ে অর্থ মানুষকে খারাপ বানিয়ে ফেলে”, তখন আমি ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি বেতন পাই। আমি যদি আরো বেশি কাজ করি তাহলে বাড়তি অর্থ পাই। আপনাদের কি মনে হয় আমি খারাপ লোক? মাও যা বলেছেন তার সবকিছুই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে কেন?” ওরা বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে”।

চোখের সামনে যখন বিপ্লবের দেখা মিলছে না, এ অবস্থায় ওরা মৃত্যু ভয়কে কীভাবে জয় করে? নিজেদের ভূমি রক্ষা করা এবং ‘ইতিহাসে নাম লেখানোর’  আকাংক্ষাই তাদের মৃত্যুভয়কে জয় করতে সাহায্য করে।

নরেশ বলল, “গ্রামের কেউ যখন মারা যায়, তাকে শুধু স্থানীয় গ্রামবাসীরাই মনে রাখে। আমি যদি মারা যাই, পার্টি আমাকে নিয়ে পুস্তিকা লিখবে”।

ab2

মজার ব্যাপার হল সবার মৃত্যু সমান নয়। কয়েক বছর আগে বন্দুকযুদ্ধে কমরেড মঙ্গল নিহত হয়। মাওবাদীরা তার স্মরণে বালি বেরা গ্রামের বাইরে একটা স্মৃতিফলক নির্মাণ করে কিন্তু গ্রামবাসীরা ফলক থেকে তার নাম মুছে ফেলেছে।

মঙ্গলের বোন সিমরি কাছেই থাকেন; বললেন, “মঙ্গল যে এখানে থাকত পুলিশ সেটা জেনে যেতে পারে এই ভয়ে ওরা নামটা মুছে ফেলেছে”।

কোন এক দুর্বল মুহূর্তে ওরা প্রকাশ করল যে ওদের ভাগ্য মঙ্গলের থেকে কিছু আলাদা হবে না। পার্টির পুস্তিকাই যথেষ্ট না আর গ্রামবাসীরা ধীরে ধীরে শহরে চলে যাবে কিন্তু ওদের ফেরার কোন উপায় নেই। ওরা স্বীকার করে যে ওদের জীবদ্দশায় বিপ্লব সম্ভব না কিন্তু এই সংগ্রাম ছাড়া আর কোন বিকল্প দেখতে পায় না ওরা। একজন বলল, ” এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। আমি মারা যাব কিন্তু বিপ্লব ঘটবে”।

বাইরের পৃথিবী ওদের মতাদর্শ থেকে একেবারেই ভিন্ন ধারার মনে হয়। পার্টির সাথে এক দশক ধরে যে সব ক্যাডাররা আছে তারা ‘দীর্ঘকালীন লড়াইয়ের তাৎপর্য ও নয়া সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্বায়নের বিপদ’ সম্পর্কে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ চালাতে পারে; তারা এক রাতে বসে চিন্তা করছিল নয়া সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা কোথায়। ভাত আর পেঁপে দিয়ে রাতের খাবার সেরে আগুনের ধারে বসে এক মহিলা জানতে চাইলেন, “আমেরিকা কোথায়”?

যখন বলা হল ওরা এই গ্রহের যেখানে বসে আছে আমেরিকা ঠিক তার বিপরীতে, তখন মহিলাটি এবং তার সাথে অন্যান্যরাও ভীষণ অবাক হল।

গোন্ডি আদিবাসীদের একটা বড় অংশ পার্টিতে যোগদানের পর কখনো অরণ্য এলাকার বাইরে পা রাখেনি; ওরা কখনো বিদ্যুৎ দেখেনি, ফোনের সিগনাল কিংবা গাড়ি দেখেনি।

একজন ক্যাডার জানতে চাইল, “শহরে শুনেছি ফ্যান বলে একটা জিনিস আছে। এটা কিভাবে চলে”?

আরেকজন বিশ্বাসই করতে চায় না যে শহরে লোকেরা গ্যাসের চুলায় রান্না করে, লাকড়ির দরকার হয় না।

অন্য আরেকজন জানতে চায়, “Raipur kitna bada hai? Kitne ghar hain wahan? Gaadiyan? (রায়পুর কত বড়? কতগুলো ঘরবাড়ি ওখানে? কতগুলো গাড়ি?)”

ওরা জানে যে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই ওদের মৃত্যু হবে। অল্প বয়স্ক একজন বলল, “এখান থেকে বের হবার সাথে সাথেই আমাকে মেরে ফেলবে। বিপ্লবের পরেই শুধু আমরা বের হতে পারব”।

এক সন্ধ্যায়, একটা ছেলে ক্যাম্পে যোগ দিল, বয়স ১৫ বছরের বেশি হবে না।

সে নারায়ণপুর হোস্টেলে থেকে ক্লাস এইটে পড়ত; দিওয়ালি কাটাতে নিজ গ্রাম অবুঝমাদে এসেছে।

ওর বাবা ফসল কাটার জন্য ওকে থাকতে বলেছে, এরপর বড়দিনের ছুটি, তারপর আরো কয়েক মাস থেকে যেতে বলেছে। মাওবাদীরা ওর গ্রামে গিয়ে ওকে দলে ভেড়ানোর জন্য নিয়ে আসল।

এই এলাকার সবচেয়ে শিক্ষিত এই ছেলেটা; বাড়ি ফেরার জন্য সে অস্থির হয়ে উঠেছে কিন্তু ফিরতে পারছে না। ওকে বিপ্লবী রাজনীতি, মতাদর্শ ও কিছু কিছু যুদ্ধের অনুশীলনও শেখানো হচ্ছে। মনে হচ্ছে না যে সে আর কখনো তার পড়াশোনায় ফিরতে পারবে। আর যদি ফিরেও তাহলেও গেরিলা জীবনের দিনগুলো ওর অনুভূতিপ্রবণ মনকে সারা জীবন তাড়া করে ফিরবে।

ab

এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বস্তারের আদিবাসীর যা তার মৌলিক ডিএনএ কেই বদলে দিয়েছে। অরণ্যবাসী মুক্ত স্বাধীন আদিবাসী আজ সবকিছু নিয়েই সন্দিহান। পুলিশ, সাংবাদিক ও মাওবাদী- সবার জন্যই তথ্য সংগ্রহের প্রথম উৎস সে। এদের সবার মাঝখানে পড়ে তার জীবন একটা ছুরির ডগায় ঝুলছে। আর তাই সে শিখে নিয়েছে কী করে উভয় ক্যাম্পেই ছলচাতুরি করে চলতে হয়। পুলিশ ও মাওবাদী উভয়েই এটা জানে কিন্তু এটা মানতে তাদের দ্বিধা রয়েছে যে তাদের অধিকাংশ এ্যামবুশই এই আদিবাসীর বিশ্বাসঘাতকতার উপর নির্ভরশীল; হতে পারে এই আদিবাসী একজন পঞ্চায়েত প্রধান কিংবা কোন স্কুল শিক্ষক।

মাওবাদীরা আদিবাসীদেরকে বনরক্ষী ও পাটওয়ারীদের (ভূমি রাজস্ব আদায়কারী) জুলুম থেকে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানিয়েছে, ইতিহাস ও মতাদর্শের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। অরণ্যের ভিন্ন এক মহাবিশ্বে বিচরণকারী ব্যক্তিটির জীবনে ক্লাসিক্যাল মার্কসবাদী চেতনার প্রবেশ ঘটায় নিজের ভেতরে হঠাৎ ‘বিপ্লবের ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ অনুভব করল সে। নিজের পরিবার, ঈশ্বর ও ঘোটুল (গণ বাসস্থান) ত্যাগ করে ‘ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেতে’ সে যুক্ত হয়ে গেল এই সংগ্রামে।

শিল্প কারখানা ও সালওয়া জুডুম এর ফলে আদিবাসীদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ বিষয়ে দিস্তা দিস্তা লেখা হয়েছে কিন্তু মাওবাদীদের সাথে যোগদানের পর বস্তারের কী পরিমাণ আদিবাসীদের নির্মূল করা হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। মোটে দুইটা পাহাড় পরেই একজন ক্যাডারের পরিবার বাস করে কিন্তু সে দুই বছরে একবার মাত্র তাদের কাছে যেতে পারে খুব গোপনে।

আমি মাওবাদীদের জিজ্ঞাসা করলাম ছেলেটা চাইছে না তারপরেও কেন ওকে ওরা সাথে নিতে চাইছে। ওরা বলল, ও আমাদের সাথে থাকতে চায়। ছেলেটা বলল ভিন্ন কথা। সে যে এখানে আছে একথা যদি প্রকাশ হয় তাহলে তার স্কুলে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে; এটা ভেবে সে উদ্বিগ্ন। পুলিশ ওকে হয়রানি করবে। ওকে হয়তো গুপ্তচর হতে বাধ্য করা হবে আর সে বিশ্বাসঘাতকতার পথে পা বাড়াতে বাধ্য হবে। বস্তারের পুলিশ ব্যারাক আর গ্রামগুলোতে এই ধরনের গুপ্তচরের অভাব নেই। বিশ্বাসঘাতকতা এখন আদিবাসীদের টিকে থাকার পূর্বশর্ত। প্রতিটি স্থানে, একজন আদিবাসীর মৃত্যু হয় আর একজন গুপ্তচরের জন্ম হয়। রূপান্তর ঘটতে এখনো অনেক বাকি।

(সমাপ্ত)

প্রথম প্রকাশ– ৩ মে, ২০১৫

সূত্রঃ

http://indianexpress.com/article/india/india-others/days-and-nights-in-the-forest-23-days-with-the-maoists-in-chhattisgharh/


অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৬ষ্ঠ পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

ষষ্ঠ পর্ব:

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখেএবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেনমাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যানআশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশীবিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

মাওবাদীদের ঘাঁটি এলাকা

মাওবাদীদের ঘাঁটি এলাকা

ইতোমধ্যে, পাকিস্তান বেশ ভালই রান তাড়া করছে আর মান্দভীর অস্বস্তি বাড়ছে। রাত হয়ে গেছে, রাতের খাওয়া শেষ কিন্তু রেডিওতে এখনো অনেকে কান পেতে আছে। তারপর পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে গেল। ভুবনেশ্বর কুমার ৪৯তম ওভারে ২টি উইকেট নিলেন এবং ৫০তম ওভারের প্রথম বলে আর অশ্বিন পাকিস্তানের নবম উইকেটটি নিলেন। মান্দভী বললেন, “বলেছিলাম না, বিপ্লবের জন্য ভারতকে জিততেই হবে”। এরপর শহীদ আফ্রিদি পরপর কয়েকটি ছক্কা পেটালেন। পাকিস্তান ১ উইকেটে জিতে গেল। মান্দভী তেরপলের উপর চুপচাপ শুয়ে পড়লেন। জয়লালের মুখে স্নেহময় হাসি, চোখে ঝিলিক; তার বয়স ২২ কিন্তু তাকে আরো অল্প বয়স্ক দেখাচ্ছে। ওর বাম কাঁধের ইনসাস রাইফেলটা ওর ৫ ফিট ৩ ইঞ্চি শরীরটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে আর ডান কাঁধে ঝুলছে পিঠ ব্যাগ। একটা পেন গান আর একটা ধারালো ছুরি ধরে একটা হাত দিয়ে কোমরের থলিটাকে সে ক্রমাগত উপরের দিকে টানতে থাকে; তার সরু কোমর বেয়ে থলিটা শুধু নিচের দিকে নেমে যায়। সে পার্টিতে আছে সাত বছর হল এর মধ্যে কোন বন্দুকযুদ্ধে অংশ নেয়নি সে, নেয়ার ইচ্ছেও তার নেই। সে বলল, “নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে জনগণকে সংগঠিত করা আমার কাজ”। একটি স্থানীয় সংগঠন স্কোয়াডের প্রধান হিসেবে ১,০০০ বর্গ কিলোনিটারের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ১০টা গ্রামে জয়লাল পার্টির কার্যক্রম দেখাশোনা করে থাকে। সে প্রতিদিন গ্রামবাসীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে এবং তাদেরকে সতর্ক করে দেয় যে যদি বস্তারে সরকার ও শিল্প কারখানা ঢুকে তাহলে তারা তাদের ভূমি কেড়ে নেবে। সে অশিক্ষিত গোন্ডি আদিবাসীদেরকে ‘বিশ্বাসঘাতক পলাশীর যুদ্ধ’ ও ‘১৯৪৭ সালের ভুয়া স্বাধীনতা’ সম্পর্কে বলে। জয়লাল মাওবাদীদের এমন একটা দিকের প্রতিনিধিত্ব করে যে দিকটি সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানে। সাধারণত সবার কল্পনায় থাকে যে গেরিলারা শুধু হামলা চালায় আর হত্যা করে। কিন্তু সিপিআই (মাওবাদী) এর বিশালাকৃতির রাজনৈতিক শাখা দৃশ্যের পেছনে থেকে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে এবং গ্রামবাসীদের মাঝে মাওবাদীদের প্রতি সমর্থনকে ধরে রেখেছে।

আদিবাসী গ্রামীণ পরিবারে মাওবাদীরা

আদিবাসী গ্রামীণ পরিবারে মাওবাদীরা

স্থানীয় পর্যায়ে এই কাজগুলোর মাধ্যমে ক্যাডাররা বিশ্বাস করে যে তারা গ্রামগুলো দিয়ে পর্যায়ক্রমে শহরগুলোকে ঘেরাও করতে পারবে। রাজনৈতিক শাখার খুব কম সংখ্যক ক্যাডারদের পুলিশের খাতায় নাম আছে- তারা ছদ্মবেশে কাজ করা আর্মি। জয়লাল বলল, “আমরা একটা রাজনৈতিক দল যেখানে নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে”। রাজনৈতিক শাখা গ্রামগুলোতে জনতার আদালতগুলোকে (নির্বাচিত গ্রামবাসীদের নিয়ে গঠিত হয় জনতার আদালত) দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে এবং সরকারের কার্যক্রম গুলোকে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। বস্তারের অনেক গ্রামে পঞ্চায়েতের পরিবর্তে জনতার আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বস্তারে ১০,০০০ এর বেশী মাওবাদী সমর্থিত পঞ্চায়েত নির্বাচিত হয় বাধাহীনভাবে। প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি রূপির প্রকল্প দেখাশোনা করবে এই পঞ্চায়েতগুলো। এই অর্থের অতি সামান্য অংশ হলেই তা মাওবাদীদের খোরাকের জন্য যথেষ্ট। এ্যামবুশে অংশগ্রহণ না করলেও রাজনৈতিক শাখার সদস্যরা অস্ত্র বহন করে এবং গ্রামগুলোতে মৌলিক পর্যায়ের দুইটি বাহিনী গঠন করে থাকে- একটি জন মিলিশিয়া ও অপরটি গ্রাম রক্ষক দল। মিলিশিয়ারা মূলতঃ মাওবাদীদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে। গ্রাম রক্ষক দলের সদস্যরা হালকা অস্ত্র বহন করে এবং সশস্ত্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে। মাওবাদীদের প্লাটুন ক্যাডারদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই দলগুলো থেকে নেয়া হয়। ওদের প্রতি আদিবাদীদের সমর্থনের একটা প্রধান কারণ হল গ্রামবাসীদের কাছে তেমন কোন বিকল্প পথ নেই। গ্রামবাসীরা বলে, “আমরা যখনই বাইরে যাই, পুলিশ আমাদেরকে থামিয়ে হয়রানি করে, বলে আমরা গুপ্তচর”। ফলশ্রুতিতে, আদিবাসীদেরকে মাওবাদীদের সাথে আবদ্ধ থাকতে হয়; মাওবাদীরা ওদের অধিকার সম্পর্কে কথা বলে, ইতিহাস ও মতাদর্শ নিয়ে কথা বলে। একবার, জয়লাল একটা বিতর্কিত জন আদালতে (Peoples Court) সভাপতিত্ব করেছিল। ২০১৩ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত কোঙ্গের গ্রামের অধিবাসী কাওয়াসি চন্দ্রাকে তার স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তানদের সামনে পিটিয়ে হত্যা করে প্রায় ২০০ জন গ্রামবাসী। জয়লাল বলল, গ্রামবাসীরা এই শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মাঝেমাঝে এই ধরনের শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

(চলবে)


অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৫ম পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

পঞ্চম পর্ব:

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

আদিবাসীদের মন জয় করতে না পারলে রাষ্ট্র মাওবাদীদের পরাস্ত করতে পারবে না। এই যুদ্ধ যত বেশী দীর্ঘায়িত হবে রাষ্ট্র ও আদিবাসীদের ভেতরে ব্যবধান তত বেশী বৃদ্ধি পাবে। রাষ্ট্র প্রায়ই মাওবাদীদেরকে দোষারোপ করে যে তারা আদিবাসীদেরকে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে কিন্তু তারা এই বাস্তবতাটা দেখতে পায় না যে তাদের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে রাষ্ট্র যে মাওবাদীদের থেকে বেশী কার্যকরী এ বিষয়ে আদিবাসীদেরকে তারা আশ্বস্ত করতে পারেনি। অন্ধ্র প্রদেশ থেকে আশির দশকে দণ্ডকারণ্যতে প্রবেশের পর মাওবাদীরা এই অরণ্যকে তাদের ল্যাবরেটরী বানিয়েছে এবং মানবদেহের ধমনীর চাইতেও বেশী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা এখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। সরকার দশক প্রতি আদমশুমারিও চালাতে পারেনি এই এলাকায়। বস্তারের অনেক ভেতরের দিকের বিভিন্ন গ্রামের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। ভোটার তালিকা ভুলে ভরা, স্কুল আর বন বিভাগের রেস্টহাউস গুলো যেগুলোকে সরকার ভোটকেন্দ্র বলে জানে সেগুলো বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।

মাওবাদীদের বিশাল রাজনৈতিক শাখা দৃশ্যের অন্তরালে নীরবে কাজ করছে। তাদের খুব অল্প সংখ্যকেরই পুলিশের খাতায় নাম আছে-ওরা ছদ্মবেশে কাজ করে যাওয়া আর্মি।  "আমাদের পার্টির নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। এ্যামবুশ তার মধ্যে একটা মাত্র।"

মাওবাদীদের বিশাল রাজনৈতিক শাখা দৃশ্যের অন্তরালে নীরবে কাজ করছে। তাদের খুব অল্প সংখ্যকেরই পুলিশের খাতায় নাম আছে-ওরা ছদ্মবেশে কাজ করে যাওয়া আর্মি। “আমাদের পার্টির নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। এ্যামবুশ তার মধ্যে একটা মাত্র।”

অন্যদিকে মাওবাদীরা মাঝে মাঝেই তাদের গ্রামগুলোর তালিকা হালনাগাদ করে। এলাকার প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি পরিবারের  মুরগী, ছাগল এবং খাদ্য শস্যের তালিকা তাদের নোটবইতে লেখা থাকে। যদি একটা মোরগও খুঁজে পাওয়া না যায় কিংবা গ্রামের কোন ব্যক্তি যদি শহর থেকে না ফেরে কিংবা যদি ফিরতে দেরী করে সেটা মাওবাদীরা জেনে যায়। এক সন্ধ্যায় একটা গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় একজন ক্যাডার জানতে পারল গ্রামের দুইজন নিখোঁজ। ওরা কি পুলিশের গুপ্তচর হতে পারে? ওরা কি গ্রেফতার হয়েছে? মাওবাদীরা গ্রামে থামার সিদ্ধান্ত নিল, উত্তেজনা বাড়তে লাগল। পরদিন সকালে দুইজন ফিরল। খুব সাধারণ কোন কারণেই ফিরতে দেরী হয়েছিল কিন্তু মাওবাদীরা জানে কোন ঝুঁকি নেয়া তাদের উচিৎ হবে না। জিজ্ঞাসাবাদের পর দুইজনকে ছেড়ে দেয়া হল। এখানে অবকাশের সুযোগ নেই বললেই চলে। গ্রামের অধিকাংশই চলমান ছবি বলতে যা বুঝে তা হল পার্টির তৈরী করা কোন এ্যামবুশ বা প্রোপাগান্ডার ভিডিও চিত্র কিংবা কিং কং এর মতো কোন এ্যাকশন চিত্র। এগুলো সৌর চার্জার ও ব্যাটারী চালিত কম্পিউটারে দেখানো হয়। এক রাতে ওরা এই প্রতিবেদকের ল্যাপটপে থিও এঞ্জেলপোলাসের সিনেমা ইউলিসেস গেজ (Ulysses’ Gaze) দেখল আর বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে লেনিনের বিশালাকৃতির সাদা রং এর ভাস্কর্যকে টুকরো টুকরো করে আলাদা করার দৃশ্য দেখে ওরা চমৎকৃত। ওরা সিনেমার ভাষা কিংবা সাবটাইটেল কিছুই বুঝে না। ল্যাপটপটা শীঘ্রই ক্যাম্পের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুতে পরিণত হল; মাওবাদীরা প্রতি রাতে আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করে কখন এই যন্ত্রটা চালু করা হবে।

মার্চের ২ তারিখ রেডিওতে এশিয়া কাপে ভারত পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচের ধারাবিবরণী প্রচার শুরু হল; মাওবাদীরা মহেন্দ্র সিং ধোনি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল। সে দেখতে কেমন, সে কত রোজগার করে? “সে তো খেলোয়াড়, তার গায়ে নিশ্চয়ই অনেক জোর”। ওরা ধোনির কোন ছবি দেখেনি।

ম্যাচ শুরু হতে এখনো বাকি, রজনু মান্দভী তার বিপ্লবকে বাজি ধরলেন ভারতের জয়ের জন্য। বললেন, “ভারত জিতলে বিপ্লব সফল হবে।” স্কোয়াডের মাঝে উত্তেজনা বাড়তে লাগল। নেতা তার ক্যাডারদের পাশের গ্রামে পাঠালেন একটা বল নিয়ে আসার জন্য। আশেপাশে প্রচুর লাকড়ি আছে, একটা ব্যাট সহজেই বানিয়ে ফেলা যাবে। দল গঠন করা হল, ক্যাডারদের মধ্যে একটা ম্যাচ শুরু হবে কাছের একটা ঝরণার ধারে। কিন্তু বল খুঁজে পাওয়া গেল না।

(চলবে)


অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৪র্থ পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

চতুর্থ  পর্ব :

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

২৮শে ফেব্রুয়ারি সবার মানসিক অবস্থা বদলে গেল কারণ সেই একই রেডিওতে দান্তেওয়াদায় পাঁচজন পুলিশ নিহত হবার সংবাদ শোনানো হচ্ছে। কেউ একজন বলল,  “এত পুলিশ মরছে তারপরেও এরা থামছে না (Itne maare jate hain ye policewale, phir bhi nahi maante)”   

forest6২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মাওবাদী, সাধারণ নাগরিক ও পুলিশের গুপ্তচর সহ মোট ১৩৫ জন নিহত হয়েছে; এবছর ৫০ জন নিহত হয়েছে

রজনু মান্দভী এ প্রশ্নে দার্শনিকধর্মী। বললেন, “এটা একটা দীর্ঘ লড়াই। নিজেদের ক্যাডারদের মৃত্যুতে আমাদের হতাশ হলে চলবে না কিংবা পুলিশের লোকদের মৃত্যুতে আমাদের উল্লসিত হলে চলবে না। খুশিও না, দুঃখও না, আমাদেরকে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে হবে (Na hansi, na dukh, medium rehna hai)”।

একদিন সাহারা কোম্পানির প্রধান সুব্রত রায় এর গ্রেফতারে ওরা আনন্দ প্রকাশ করল। দণ্ডকারণ্যতে মাওবাদীদের দুটো মাত্র ব্যাটেলিয়ন আর তার প্রধান রামধের; নিরাপত্তা বাহিনীর উপর বেশ কয়েকটি বড় ধরনের হামলা পরিচালনা করেছেন তিনি। রামধের বললেন, “এই ধরনের পুঁজিবাদীরা যদি তাদের অন্যায় কাজের শাস্তি পায় তাহলে আমাদের বিপ্লবের কী প্রয়োজন?”

মাওবাদীদের বিপ্লব এমন একটা বাস্তবতা যেটা আত্মস্থ করার ইচ্ছা খুব কম লোকেরই আছে। মধ্য ভারতের অরণ্যে বসবাসরত হাজার হাজার সশস্ত্র নারী ও পুরুষ এই বিপ্লবী সংগ্রামের নেতৃত্বে রয়েছে যে সংগ্রামের শীঘ্রই ৫০তম বর্ষপূর্তি হতে যাচ্ছে। কিছু শিক্ষিত ক্যাডার দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। ২০১০ সালে এনকাউন্টারে নিহত হবার আগে পর্যন্ত সিপিআই (মাওবাদী) এর প্রাক্তন মুখপাত্র আজাদ তার কমরেড ও স্ত্রী পদ্মার সাথে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে বসবাস করতেন অনেক বছর ধরে। স্বামীর মৃত্যুর পর পদ্মা এখন হায়দ্রাবাদের একটা বাড়িতে বসবাস করেন; বাড়ির মালিকের ছেলে ঝাড়খণ্ডের কারাগারে আছেন আর তার পুত্রবধূ সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। পদ্মা বললেন, “ও (আজাদ) ছিল ওর ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারদের একজন কিন্তু আমরা গেরিলা জীবন বেছে নিয়েছিলাম কারণ আমরা একটা সম অধিকারের সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলাম।”

প্রায় প্রত্যেক ক্যাডার উপলব্ধি করে যে সে ‘ক্রান্তি’র (বিপ্লব) আগেই মারা যাবে। ওদের সাথে কথা বলে ‘বিপ্লবের’ লক্ষ্যটাকে অনেক বেশী দূরের, অনেক বেশী অস্পষ্ট বলে মনে হয়। একটা বড় অংশের কাছে এটা কেবলই ওদের ‘জল, জঙ্গল ও জমি’ রক্ষা করার যুদ্ধ।

কাঙ্কার জেলার নরেশ সিপিআই (মাওবাদী) এর রাওঘাট এরিয়া কমিটির সদস্য। রাওঘাট এলাকাতে সংরক্ষিত লোহার খনি আছে যে কারণে বড় বড় কোম্পানিগুলো এই এলাকার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

নরেশ বলেন, অন্য কোন এলাকা হলে সরকার স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে আলাপ আলোচনায় বসত কিন্তু এখানে সরকার বিএসএফ ব্যাটেলিয়ন মোতায়েন করেছে। নরেশের প্রশ্ন, “আপনি আমার ভূমি চান। আমি যখন তা দিতে অস্বীকার করলাম তখন আপনি আমার বাড়ির বাইরে ১০,০০০ সেনা পাঠালেন। কী করব আমি?”

(চলবে)   


অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৩য় পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

তৃতীয় পর্ব :

 এ এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প।)

মাওবাদীদের ক্যাম্পে নিজেদের ভেতরে বিয়ের অনুমতি রয়েছে; পার্টিতে যোগ দেয়ার দুই বছর পর একজন নারী বা পুরুষ তার সঙ্গীকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে এবং বিবাহিত জীবনেও ‘বিপ্লবের প্রয়োজনকে’ অবশ্যই মেনে চলতে হয়। এর অর্থ পুরুষ ক্যাডারদেরকে বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাত্বকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আত্মসমর্পণ করা মাওবাদীরা প্রায়ই যে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ তা হল পার্টিতে সন্তান নেয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু ক্যাডাররা একে বিপ্লবী পার্টির জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। একজন নারী যোদ্ধা বললেন, “আমার সাথে যদি একজন শিশু থাকে তাহলে তো আমার পক্ষে গেরিলা হওয়া সম্ভব না।”

প্রায়ই দেখা যায় তিনি চিঠি লিখছেন। মাঝে মাঝে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে হয়তো কোন একটা মাওবাদী বিপ্লবের বই পড়ছেন, তখনও দেখা যায় বই এর পৃষ্ঠার ভেতরে গোঁজা কাগজে তিনি কিছু লিখছেন। দণ্ডকারণ্যতে প্রতিদিন প্রায় ৭৫০টির মত চিঠি আদান প্রদান হয় মাওবাদীদের মধ্যে; হাতে হাতে আদান প্রদান হয় বলে এটি যোগাযোগের সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম বলে বিবেচিত। এর মধ্যে অল্প কয়েকটা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় আর তখন এ ঘটনাকে ‘রোমাঞ্চকর আবিষ্কার’ হিসেবে প্রচার করা হয়।

চিঠিগুলোর শুরুতে থাকে ‘প্রিয় কমরেড’ আর শেষে থাকে “তোমার কমরেড”। মাঝপথে কখনো চিঠিগুলো খোলা হয় না এবং পড়ে ফেলার সাথে সাথেই চিঠিগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়। চিঠিগুলো গেরিলা জীবনের গল্প বহন করে যে গল্পগুলো এই অরণ্যের মাঝে চিরদিনের মত চাপা পড়ে যায়। কেউ যদি চিঠিগুলো উদ্ধার করে লিপিবদ্ধ করতে পারত তাহলে এই ভয়ংকর নিয়মতান্ত্রিক পার্টির গুপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটা নকশা পেয়ে যেত।

বস্তারের গ্রামবাসীরা শিকারের জন্য ভর-মার নামে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। পুলিশ প্রায়ই এইসব বন্দুক বহনকারী স্থানীয় গ্রামবাসীদের আটক করে যদিও এই বিদঘুটে অস্ত্রটি মাওবাদীদের অস্ত্র ভান্ডারে নেই।

বস্তারের গ্রামবাসীরা শিকারের জন্য ভর-মার নামে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। পুলিশ প্রায়ই এইসব বন্দুক বহনকারী স্থানীয় গ্রামবাসীদের আটক করে যদিও এই বিদঘুটে অস্ত্রটি মাওবাদীদের অস্ত্র ভান্ডারে নেই।

এই প্রতিবেদক মাওবাদীদের সাথে বসবাসকালীন তাদেরকে মোট চারটি চিঠি লিখেছিল।

তার মধ্যে একটি ছিল ওদের শীর্ষ নেতা গণপতিকে লেখা; তার একটা সাক্ষাৎকার নেবার জন্য। চিঠির উত্তর এসেছিল অর্জুনের কাছ থেকে, অর্জুন তার ঘনিষ্ঠ সহচর। এবার সাক্ষাৎ করা সম্ভব হবে না জানিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন তবে আশা রাখেন যত দ্রুত সম্ভব দেখা করার। তিনি লিখেছেন, “Itna din rukne ke baad bhi aapka kaam safal nahi hua (এত দিন অপেক্ষা করার পরেও আপনার কাজটা অসমাপ্ত রয়ে গেল- এ জন্য আমরা দুঃখিত) ।” কয়েক মাস পর অর্জুন আত্মসমর্পণ করে। পুলিশের কাছে যাওয়া ও গোপনে অরণ্য ছেড়ে যাবার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন সেটা ভেবে আমাকে চিঠিতে ঐ নিশ্চয়তাটা দেবার সময়ই হয়তো আত্মসমর্পণ করার বিষয়টা তার মাথার ভেতর ছিল।

চিঠির পাশাপাশি বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগের আর একটা মাত্র মাধ্যম ওদের আছে আর তা হল রেডিও। প্রতিটি স্কোয়াডে একটা করে রেডিও থাকে, তাতে সারাদিন বিবিসি আর হিন্দিতে অল ইন্ডিয়া রেডিও বাজতে থাকে। ২০১৪ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি পাহাড়ের উপরে আশ্রয় নেয়া ক্যাম্পে নীরবতা নেমে এল কারণ রেডিওতে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, অন্ধ্র প্রদেশে ২২ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছে। পরদিন রাজনন্দগাঁওয়ে এক দম্পতি আত্মসমর্পণ করে। ক্যাম্পের একজন নারী লোকটিকে চিনত, লোকটির নাম ভগত। ভগতের সাথে সে একটি এ্যামবুশে অংশ নিয়েছিল। প্রায় প্রত্যেক মাওবাদী এমন একটা সময় স্মরণ করতে পারে যখন গাছের ডাল থেকে ঝুলন্ত রেডিওতে তার কোন না কোন কমরেড বা কোন দম্পতির এনকাউন্টারে মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করা হয়। একজন বললেন, “মনে হত সে যেন এই কালো বাক্সটার ভেতরেই মারা যাচ্ছে। আমার ইচ্ছে হত বাক্সটা ভেঙ্গে তাকে বের করে নিয়ে আসি।”

(চলবে)


ভারতঃ মাওবাদী দমনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

maoist1-655x360

নাগপুর: মাওবাদী দমনে এবার আরও কোমর বেঁধে নামছে সরকার। বুধবার সিআরপিএফের (সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) তরফে যৌথ সংস্থার বৈঠকের আয়োজন করা হয়। নাগপুরের সিআরপিএফের সদর দফতর হিঙ্গানায় বুধবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মহারাষ্ট্র ও ছত্তিসগড়ের প্যারা মিলিটারি ফোর্সের অফিসারেরা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, সিআরপিএফের ইন্সপেক্টর জেনারেল(আইজিপি) সঞ্জয় কৌশিক, নাগপুরের আইজিপি রেঞ্জার রবীন্দ্র কাদাম, রাজ্যের চরম বামপন্থি নিয়ন্ত্রণ ডিভিশনের আইজি রাজ্যবর্ধন। এছাড়াও এদিনের বৈঠকে বিশেষ রিপোর্ট পেশ করেন বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের অফিসারেরা ও ভারত-তিব্বত সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর অফিসারেরা।

উল্লেখ্য, গত পরশু বিহারে অপহরণ করা হয় চারজন পুলিশ অফিসারকে। বাসে করে যাওয়ার সময় তাদের অপহরণ করা হয় বলে খবর মেলে। এর পর বুধবার তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়াও বিহার ছত্তিশগড় জুড়ে মাওবাদী আগ্রাসন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বৈঠক সূত্রে খবর, অপারেশন মাওবাদী অল আউট শুরু করার কথা ভাবছেন কেন্দ্রীয় সরকার।

সূত্রঃ http://www.bengali.kolkata24x7.com/multi-agency-meeting-held-to-spruce.html