সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকার (সম্পূর্ণ)

c

comrades-kA7G-621x414@LiveMint

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি গত ০৮/০৮/২০১৫ থেকে ০৯/০৯/২০১৫ পর্যন্ত মোট ৮ টি পর্ব ধারাবাহিক ভাবে বাংলায় প্রকাশ করেছে ‘লাল সংবাদ‘। কিন্তু আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি ২ পর্ব প্রকাশ করতে পারিনি। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আমরা বাকি দুই পর্ব সহ সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি PDF আকারে প্রকাশ করছি।

পাঠক কমরেডগণ নীচে ক্লিক করেই সাক্ষাৎকারটি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন– 

কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকার

Advertisements

সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৮ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি ধারাবাহিক ভাবে বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(অষ্টম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে “

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি যাচাই করে দেখেছে যে বিশ্ব পরিস্থিতির অবজেকটিভ বাস্তবতা বিপ্লবের অনুকূলে যাচ্ছে, এক্ষেত্রে International Communist Movement (ICM) আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবস্থান কী? আভাকিয়ানিজম ও প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোট কর্তৃক নেপাল বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কী ধরনের প্রভাব ICM এর উপর পড়তে পারে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ বিপ্লবের অগ্রগতির পক্ষে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি চমৎকার। আগেই উল্লেখ করেছি, মহা মন্দার (Great Depression) পর সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ভয়াবহতম সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। যার ফলে প্রচুর পরিমাণে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে এসেছে। একদিকে আছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ও অন্যদিকে শ্রমজীবী শ্রেণীর উপর শোষণ ও নিপীড়িত জনগণের দেশসমূহে নয়া ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন। রাষ্ট্র দখলের যুদ্ধ স্তিমিত হবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; ইরাক, আফগানিস্তান ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আটকে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাম্রাজ্যবাদ ও তার গৃহপালিত দোসরদের বিরোধী বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় স্বাধীনতাকামী বাহিনী শক্তিশালী হচ্ছে। শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী,কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী, মুসলিম ও অন্যান্য নির্যাতিত সম্প্রদায়,নারী,শিক্ষার্থী,তরুণ ও আরো অনেক নিপীড়িত শ্রেণী ও গোষ্ঠী পথে নেমে আসছে।

চাকুরী থেকে ছাঁটাই,বেকারত্ব ও আংশিক বেকা্রত্ব,প্রকৃত মজুরী কর্তন,সামাজিক নিরাপত্তা খরচ প্রত্যাহার এবং সরকারের অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা দেশে শ্রমিকদের বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ ও ধর্মঘট সংঘটিত হয়েছে যা দেশগুলোকে নাড়া দিয়েছে। ধনী ও গরীবের ব্যবধান যত বাড়ছে ও শ্রেণী দ্বন্দ্ব যত তীব্রতর হচ্ছে, পুঁজিবাদী দেশগুলোর জনগণ তত বেশি সংগ্রামে যোগদান করছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ, মুসলিম, অভিবাসী ও অন্যান্য নিপীড়িত জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বিক্ষোভ করছে। পশ্চাদপদ দেশগুলোতেও শ্রমজীবী জনগণের সম্পদের অসমতা,দারিদ্র্য, অভাব ও রাজনৈতিক নিপীড়ন গণ অভ্যুত্থানের জন্ম দিচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণহত্যা ও রক্তের বন্যার মধ্য দিয়েও ইরাকি, আফগান,কুর্দি ও অন্যান্য জনগণের সশস্ত্র জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতি ঘটছে।

স্কটিশ, ক্যাটালনিয় ও ইউরোপের অন্যান্য জাতীর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত আছে। ব্রাজিলের মত গণ বিরোধী নয়া উদারবাদী নীতিমালা গ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকায় জনগণ বৃহদাকারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।তবে বর্তমান বিশ্বের অনুকূল অবজেকটিভ পরিস্থিতি থেকে ICM এর সাবজেকটিভ শক্তিগুলো গুরুতরভাবে পিছিয়ে আছে। অবজেকটিভ পরিস্থিতির সম্ভাবনা ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য একে সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাওবাদী বাহিনীর সাবজেকটিভ ক্ষমতার মধ্যে একটি বৈপরীত্য রয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা জানি যে, প্রধানত প্রতিটি দেশের বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী বিপ্লব সংঘটনের মাধ্যমে এই সাবজেকটিভ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায়।

সংশোধনবাদী ও সংস্কারবাদীরা জনগণের সমস্যা সমাধানে অসমর্থ হওয়ায় মাওবাদী শক্তির সাথে তাদের পুনরায় একত্রিত হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। অনেক দেশে মাওবাদী পার্টি ও সংগঠন শক্তি অর্জন করছে এবং নতুন কিছু পার্টি গঠিত হবার প্রক্রিয়া চলছে। মাওবাদী পার্টি, সংগঠন ও বাহিনীর ভেতরে ঐক্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশ কিছু বিতর্কের মধ্য দিয়ে ফিলিপিন ও ভারতের দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চলমান রয়েছে। অন্যান্য বেশ কিছু দেশেও মাওবাদী পার্টিরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের গণযুদ্ধের সমর্থনে আন্তর্জাতিক মাওবাদী শক্তিগুলোর সংহতি কার্যক্রম, বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন গ্রিন হান্ট ও ওপলান বায়ানিহানের (ফিলিপিনের বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন)বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত, রাজবন্দীদের অধিকার নিশ্চিতকরণের সংগ্রাম ইত্যাদি চলমান রয়েছে। সুতরাং, ICM ও মাওবাদী শক্তিগুলোর গণ সংগ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারাটা সম্ভব এবং এই পথ ধরে ভবিষ্যতে একটি বিপ্লবী জোয়ারের সূচনা ঘটবে।

প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের সংশোধনবাদ ও নেপালি জনগণের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা অবশ্যই ICM কে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকেরা গৌরবময় গণযুদ্ধকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে এবং নিপীড়িত নেপালি জনগণের উপর কঠোর দমন পীড়ন অব্যাহত রাখতে শত্রুকে সাহায্য করেছে। শুধু নেপালি জনগণের জন্যই নয়, পুরো ICM এর জন্য এটি একটি উলট পালট ঘটিয়েছে। অবশ্য, প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের বিরুদ্ধে প্রকৃত মাওবাদী শক্তির তিক্ত লড়াই, সাম্রাজ্যবাদী ও তার দালালদের কাছে তাদের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ এবং সর্বোপরি, এই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে নেপালি জনগণের নিজেদের সংগ্রাম এই জোটের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রকে উন্মোচন করেছে এবং মার্কসবাদ- লেনিনবাদ- মাওবাদকে সমৃদ্ধ করার নামে এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার চিত্রকে উন্মোচন করেছে।

সাম্রাজ্যবাদ, গৃহপালিত সামন্তবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বেনিয়া ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সব থেকে বিশ্বাসী পা চাটা কুকুরে পরিণত হয়েছে এই আধুনিক সংশোধনবাদীরা। তাদের শ্রেণী সহযোগীদেরকে নেপালি জনসাধারণ ও ICM সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখান করেছে এবং এইসব বিশ্বাসঘাতকদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জনগণ নিশ্চিতভাবেই বিপ্লবের পথে অগ্রসর হবে। একইভাবে, আভাকিয়ানিজমের তথাকথিত নয়া সিনথেসিসও কিছু মাওবাদী পার্টিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ ছদ্মবেশী সংশোধনবাদ ও লিকুইডেশনিজম (liquidationism) ছাড়া আভাকিয়ানিজম আর কিছুই নয়। ICM এর উপর ক্ষণস্থায়ীভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও এটি অবশ্যই পরাজিত হবে। আভাকিয়ানিজম ও সব ধরনের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও দেশের ভেতরে কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিশ্ব প্রলেতারিয়েতের অংশ হিসেবে  আমাদের পার্টি সংগ্রাম করে যাবে।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৭ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবারের পরিবর্তে প্রতি রবিবারবৃহস্পতিবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(সপ্তম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে “

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ শত্রুরা প্রচার করছে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন সেকেলে। কেউ কেউ শাভেজের একুশ শতকের সমাজতন্ত্রকে সমর্থন করছে। প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোট নেতৃত্বাধীন ইউসিপিএন (মাওবাদী) UCPN (Maoist) দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন ত্যাগ করে সংসদীয় পথ বেছে নিয়েছে। ভারত ও বর্তমান বিশ্বায়নের পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। এইসব তর্ক বিতর্ক সম্পর্কে পার্টির বক্তব্য কী?

গণপতিঃ যখন থেকে মার্কস ও এঙ্গেলস প্রলেতারিয়েত মতাদর্শ প্রস্থাপন করেছেন এবং সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী শক্তি হিসেবে শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে তখন থেকে বিশেষ করে প্যারি কমিউনে প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের পর থেকে শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও শোষক ও প্রতিক্রিয়াশীলেরা সবসময় মার্কসবাদ ও বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। রাশিয়া আর চীন যখন সংশোধনবাদীতে পরিণত হল, তখন তারা প্রচার করতে আরম্ভ করল যে মার্কসবাদ সেকেলে। কারণটা বলাই বাহুল্য। বিপ্লব ও মার্কসবাদ তাদের ধ্বংস বয়ে আনবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন কী করে সেকেলে হতে পারে? মাও এর মৃত্যুর পর পৃথিবীতে যত নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব কিংবা জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলো সবই ছিল দীর্ঘস্থায়ী।

এসব যুদ্ধের কোন কোনটাতে বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা যুদ্ধ ত্যাগ করার ঘটনা ঘটলেও এই সবগুলো যুদ্ধই ছিল দীর্ঘস্থায়ী। যতদিন পর্যন্ত আধা সামন্তবাদী কাঠামো মৌলিকভাবে পরিবর্তিত না হবে এবং যতদিন আমাদের দেশের মত দেশগুলোকে সাম্রাজ্যবাদ এর মুঠোর মধ্যে রেখে স্বনির্ভর উন্নয়ন ঘটাতে বাধা দান করবে ততদিন পর্যন্ত এই দেশগুলোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই। সামন্তীয় কিছু রূপ বদলালেও সামন্তবাদ একইরকম থাকবে কারণ এটি সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া বেনিয়াদের স্বার্থকে রক্ষা করে। এ কারণে, একটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সামন্তবাদ বিরোধী নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের লক্ষ্যে পার্টির অধীনে জনগণ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে দেয় যে এটি হবে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যেটি আমাদের পার্টির নেতৃত্বে জনগণ চালাবে।

সুতরাং, আমি ইতোমধ্যে বলেছি ভারতের মত একটি দেশে একটি সফল বিপ্লব ঘটানোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনকে আমরা কেন অপরিহার্য বলে মনে করি। এখন শাভেজ এবং তার কথিত একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের মডেল প্রসঙ্গে আসি।

এখনো পর্যন্ত পৃথিবীতে বিপ্লবের দুইটি পথ তৈরি হয়েছে; একটি হল অভ্যুত্থান ও অপরটি হল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ। নিজ নিজ দেশের বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এই দুটি পথ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। নতুন ঐতিহাসিক অনুষঙ্গে এই দুটিতে পরিমার্জনও ঘটতে পারে। মার্কসবাদ এটাই বলে যে, যান্ত্রিকভাবে বা অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে নয় বরং সৃষ্টিশীলতার সাথে বিপ্লব ঘটাতে হয়। কিন্তু যে ধরনের পরিমার্জনই হোক না কেন, তা হতে হবে বিপ্লবের আওতার মধ্যে। এই কারণে বিপ্লব আবশ্যকীয়। অবশ্য, তা হতে হবে একটি নির্দিষ্ট দেশের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। একটি শ্রেণীহীন সমাজের দিকে যাওয়ার জন্য কোন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত অবক্ষয়প্রাপ্ত একটি সমাজ ব্যবস্থাকে সংশোধন করার প্রচেষ্টা বৃথা।

শাভেজের মডেল কোন বিপ্লবের মডেল নয়, এটি নিছক সংশোধনবাদী মডেল। কাঠামো বা উপাদান কোন দিক থেকেই এটি সমাজতন্ত্র নয়। রুশ ও চীনা বিপ্লবের পর পৃথিবীতে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে। পুঁজিবাদী ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষুদে বুর্জোয়া গোষ্ঠী অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের একটি অংশ উদার বুর্জোয়া আদর্শ ধারণ করে ও অপর অংশটি ইউটোপিয় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ধারণ করে। যেসব দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব কিংবা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়নি, যেখানে বিপ্লবী আন্দোলন সে দেশের জনগণকে এর আওতায় নিয়ে আসতে পারেনি, সেসব দেশের ক্ষুদে বুর্জোয়াদের অধিকাংশই বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থার ভেতরে কিছু পরিবর্তন বা সংশোধন প্রত্যাশা করে। ভেনেজুয়েলার শ্রমিক শ্রেণী ও কৃষকদের স্বার্থে শাভেজ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রধান পণ্য তেল। যদিও তেল ও অন্যান্য কিছু শিল্প জাতীয়করণ হয়েছে তারপরেও নিশ্চিতভাবেই সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বেনিয়াদের নিশ্চিহ্ন করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

 বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে তারাও আলাদা নয়, সুতরাং, ব্যবস্থায় কোন মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে তারা পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন নয়। ভেনেজুয়েলার সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী বেনিয়াদের একটি অংশ এত বেশীমাত্রায় গরীবদের বিরোধী যে তারা এই জাতীয় সংশোধনেরও প্রচণ্ড বিরোধী। আর এটি শাপে বর হয়ে দেখা দিচ্ছে কারণ জনগণের নানা অংশ থেকে শাভেজের মডেলের জন্য এটি বৃহৎ পরিসরে প্রচারণা পাচ্ছে। তিনি কখনো জনগণকে শ্রেণী সংগ্রামে সংগঠিত করেননি। শাভেজ বলিভার ও চে গুয়েভারার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন কিন্তু তার মডেল হল মাইনাস বলিভারিজম এবং মাইনাস চে গুয়েভারাইজম। এটি মূলতঃ সংশোধনবাদ এবং এই কারণে আমাদের দেশে দেউলিয়া হয়ে পড়া সিপিআই ও সিপিআই (এম) শাভেজের এই মডেলের উপর গুরুত্ব আরোপ করছে। ঐক্যবদ্ধ পার্টিতে থাকাকালীন তারা নেহেরুভিয়ান সমাজতন্ত্রকে উর্ধ্বে তুলে ধরে বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

নেপালে আধা সামন্তবাদের উপর ভিত্তি করে সাম্রাজ্যবাদের জোয়ালের নীচে সংসদীয় ব্যবস্থা টিকে আছে; নেপালের উপর এক দিকে রয়েছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আধিপত্য ও অন্যদিকে রয়েছে চীনের প্রভাব। যে কেউ এখানে যোগদান করবে তাকেই বিপ্লব ত্যাগ করতে হবে। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বেশ ভাল সাফল্য সত্ত্বেও ইউসিপিএন (মাওবাদী) UCPN(Maoist) এর প্রচণ্ড-ভট্টরায়ের আধুনিক সংশোধনবাদী জোট এই পথ বেছে নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ ও হাজার হাজার শহীদের সাথে তারা স্রেফ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। পূর্ববর্তী সব সংশোধনবাদীদের মতো শাসক শ্রেণীর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির উদ্দেশ্যে নিজেদের স্বার্থে তারা এই কাজ করেছে। আমরাও স্বীকার করি যে বিশ্বায়নের ফলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কাদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো ঘটানো হয়েছে? পুঁজিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বার্থ কায়েমের জন্য এই পরিবর্তনগুলো ঘটানো হয়েছে। গত ২৩ বছরে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এইসব পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

আর এটি পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শাসক শ্রেণীর একটি অংশকে শ্রমিক, মেহনতি জনসাধারণের উপর অপরিমেয় শোষণ চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে এবং তাদেরকে উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশের প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ নির্বিচারে লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে, ধনী ও গরীবের আয়ের তফাৎ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পুঁজির একত্রীকরণ ও কেন্দ্রীয়করণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সময়েই পশ্চিম এশিয়া ও পরবর্তীতে আফগানিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। প্রায় সব সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এর অনুগত রাষ্ট্রসমূহ নয়া ফ্যাসিবাদীতে রূপান্তরিত হয়। শাসক শ্রেণীরা নয়া উদারবাদী নীতিমালাকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তুলে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এই নীতিমালা জিডিপি বৃদ্ধি করবে; অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উন্নয়নকে তরান্বিত করবে আরো অনেক কিছু করবে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে এইসব দাবী তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ল। সুতরাং, এইসব নয়া উদারবাদী নীতিমালার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ জনগণের জীবনের উপর যে চরম সর্বনাশ ডেকে এনেছে সেদিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। কেবল অর্থনৈতিক মন্দাই নয়, বরং রাষ্ট্র দখলের যুদ্ধ, নয়া ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ, বলপ্রয়োগ ও অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের উপর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিও নয়া উদারবাদী নীতিমালার সৃষ্টি।

সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র সমাধান হিসেবে সাম্রাজ্যবাদীরা ‘বিশ্বায়ন’কে গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর মানুষের উপর বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের উপর যুদ্ধ চাপানো, আরো শোষণ, নির্যাতন ও দমন পীড়ন। কাজেই, সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের অনুচর ভৃত্যদের বিরুদ্ধে লড়াই না চালালে জনগণ স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারবে না। সুতরাং, আমাদেরকে আমাদের বৃহৎ কৌশলকে সমৃদ্ধ করতে হবে ও এই পরিবর্তনসমূহকে মাথায় রেখে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৌশলে পরিবর্তন সাধন করতে হবে এবং জনগণকে বিপ্লবী যুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে হবে। স্লোগান, রাজনৈতিক কৌশল, সামরিক কৌশল ও কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে আর তাহলেই কেবল আমরা অগ্রসর হতে পারব। রাজনৈতিক লাইন ও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে ত্যাগ করা কোন সমাধান নয় বরং এর প্রতি আরো দৃঢ়ভাবে অনুগত থাকাটাই সমাধান। আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, তার লক্ষ্য হতে হবে রাজনৈতিক লাইন ও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি পুনরায় বলছি যে, আমাদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার জন্য বর্তমান আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্তবাদী ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে হলে যা প্রয়োজন তা হল সঠিক মতাদর্শ, একটি সঠিক রাজনৈতিক লাইন, একটি সঠিক সামরিক লাইন, একটি শক্তিশালী ভ্যানগার্ড পার্টি, একটি শক্তিশালী জনগণের আর্মি এবং শক্তিশালী যুক্ত ফ্রন্ট। আর এটিই নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার একমাত্র সমাধান।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৬ষ্ঠ পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবারের পরিবর্তে প্রতি রবিবারবৃহস্পতিবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(ষষ্ঠ পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে 

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি বলশেভিকীকরণ প্রচারণার প্রয়োজন বোধ করল কেন? এটা থেকে আপনারা কী ধরনের ফলাফল আশা করছেন?

গণপতিঃ ২০১৩ সালে পার্টির ভেতরে বলশেভিকীকরণ প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানায় আমাদের পার্টি এবং বর্তমানে পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোতে এই প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়া সমাপ্ত হতে আরো সময় লাগবে আর কেবল তখনই যাচাই করা সম্ভব হবে বলশেভিকীকরণের মাধ্যমে পার্টিকে নতুনভাবে গঠন করার কাজ কতটুকু সফল হল। রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি নামে পরিচিত CPSU(B) বিশ্বে প্রথমবারের মতো বুর্জোয়া শ্রেণীকে উৎখাত করে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব কায়েম করে। যেসময় বিশ্বে কোন কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসেনি সেসময় এই পার্টি মেহনতি ও শ্রমজীবী জনতাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। মানব ইতিহাসে বলশেভিক পার্টি সর্বপ্রথম সমাজতন্ত্রের সূচনা ঘটায়। সুতরাং এই পার্টিকে আমরা মডেল হিসেবে গ্রহণ করছি এবং এর থেকে শিক্ষা নিয়ে এর বৈশিষ্ট্যসমূহকে আত্মস্থ করে আমাদের পার্টিকে এরকম একটি প্রলেতারিয়েত পার্টিতে রূপান্তরের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। এই কারণে আমরা এর নাম দিয়েছি বলশেভিকীকরণ প্রচারণা (Bolshevisation Campaign)।

অন্যদিকে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) মডেলটিও আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্তবাদী পশ্চাদপদ কৃষি প্রধান দেশে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনের উন্নতি ঘটিয়ে, একটি জনতার বাহিনী ও একটি সফল যুক্তফ্রন্ট গঠন করে মুক্তাঞ্চল স্থাপনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি একটি সফল বিপ্লব ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিল। সুতরাং CPC এর বৈশিষ্ট্যগুলো জানা ও সেগুলো আত্মস্থ করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ চীন ও ভারতের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। গঠিত হবার পর থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CPC) রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি CPSU(B) কে মডেল ধরে নিজেদের শক্তিশালী করে গড়ে তোলার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে গেছে। তাই এই পার্টির অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে বিশেষ করে মহা বিতর্ক (Great Debate ) ও মহান প্রলেতারিয়েত সাংস্কৃতিক বিপ্লব থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার আলোকে আমরা এই প্রচারণা চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমরা এই দুটি পার্টিকে আমাদের মডেল হিসেবে গ্রহণ করে পার্টির বলশেভিকীকরণের প্রচেষ্টা চালাব কিন্তু তা হবে আমাদের পার্টির দীর্ঘ বিপ্লবী ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে।

এই প্রচারণা চালানোর কারণগুলো হল-

(১) দেশব্যাপী শত্রুর হামলার ভেতরে পরিবর্তন ঘটেছে। আক্রমণ তীব্রতর হয়েছে;

(২) পার্টিতে বেশ কিছু বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে এবং বর্তমানে আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে।

(৩) পার্টিতে কৃষক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কমরেডদের সংখ্যা বেশী; এই কারণে পার্টিতে প্রলেতালিয়েত দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

(৪) সমাজে ও বিপ্লবী যুদ্ধে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, সে অনুযায়ী যথাযথ কৌশল পর্যালোচনা ও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি; এবং

(৫) পার্টির ভেতরে বড় ধরনের কিছু অপ্রলেতারিয়েত ধারার অস্তিত্ব রয়েছে।

এই বিষয়গুলোকে মনে রেখে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে ও সাংগঠনিকভাবে পার্টিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পার্টিতে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক মানের উত্তরণের জন্য আমরা বলশেভিকীকরণ প্রচারণা গ্রহণ করেছিলাম। এর মাধ্যমেই কেবল পার্টি PLGA কে একটি ক্ষমতাশালী অস্ত্রে পরিণত করতে পারবে এবং আন্দোলনের গণভিত্তিকে মজবুত করতে পারবে। আর এর মধ্য দিয়েই কেবল বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে আমরা সামনে এগোতে পারব। কিছু বাস্তব লক্ষ্য অর্জন করার জন্য আমরা এই প্রচারণাকে পরিকল্পতিভাবে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করার মাধ্যমে আমরা কিছু ফলাফল আশা করছি। এই প্রচারণা বিশ্ব প্রলেতারিয়েত দৃষ্টিভংগির মাধ্যমে পার্টিকে পুনরায় গঠন করবে এবং পার্টির অভ্যন্তরে বিশেষ করে নতুনদের ভেতরে একে প্রসারিত করবে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের অধ্যয়নকে বর্ধিত করে সমগ্র পার্টিকে এবিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এটি সম্ভব হবে। এর ফলে সমগ্র পার্টি, পার্টির প্রতিটি ইউনিট নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্য সম্পর্কে একটি পরিস্কার ধারণা পাবে এবং বর্তমান সংকট মুহূর্তে যেসমস্ত বাস্তব লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে হবে সেগুলো পরিস্কারভাবে বুঝতে সমর্থ হবে। এর মাধ্যমে মাও নির্দেশিত কাজ করার তিনটি কৌশল গভীরভাবে বোঝা সম্ভবপর হবে এবং এতে করে আমাদের কাজ করার ধরন উন্নত হবে। গোপন পার্টির গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কে এটি আমাদের ধারণা বৃদ্ধি করবে; যে সমস্যাগুলো দেখা দিচ্ছে সেগুলো দ্রুত সমাধান করতে সাহায্য করবে এবং গেরিলা যুদ্ধ সচল রাখার মূলনীতিগুলোর বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। পার্টির ভেতরে চলমান অপ্রলেতারিয়েত ধারাকে সংশোধন করে এরর বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর লক্ষ্যে পার্টির ভেতরে সচেতনতা ও সতর্কতা বৃদ্ধি করবে।

এর মাধ্যমে চিন্তা, কাজ ও শৃঙ্খলার ঐক্য মজবুত হবে ও বৃদ্ধি পাবে। ফলশ্রুতিতে, জনগণের সাথে দৃঢ়ভাবে সংহতি স্থাপন এবং তাদেরকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংগ্রামে সংগঠিত করার মাধ্যমে পার্টির গণভিত্তি শক্তিশালী হবে। কৃষি বিপ্লবে কৃষকদেরকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করে কৃষক ছাড়াও অন্যান্য জনগণ ও শহরের জনগণের মাঝে বিশেষ তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রেও এটি নেতৃত্ব দেবে। এর ফলে পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা বিষয়ে জানাবোঝা্র ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে ও সে অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করতে হবে; এভাবে সফলতার সাথে আন্দোলনের অগ্রগতি ঘটবে। আমরা আশা করছি এই প্রচারণা আমাদের কমরেডদেরকে দৃঢ় করে তুলবে যাতে করে বিপ্লবের পথ ধরে আসা কঠিনতম পরিস্থিতি ও ঝুঁকি মোকাবেলা করার মতো সচেতনতা তারা প্রদর্শন করতে পারে এবং প্রাণপণে শত্রুর সাথে লড়াই চালানোর লক্ষ্যে তাদের প্রস্তুতিকে তীব্রতর করতে পারে। আর সব শেষ যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তা হল, আমরা আশা করছি এর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বকে এবং আন্দোলনকে শত্রুর নিষ্ঠুরতম আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হব। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে এই প্রচারণার কেন্দ্রে রেখে এবং গভীরভাবে আঁকড়ে ধরার মধ্য দিয়ে এতক্ষণ যেসকল ফলাফলগুলোর কথা উল্লেখ করা হল সেগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৫ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(পঞ্চম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে “

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ সরকার দাবী করছে তাদের উন্নত আত্মসমর্পণ নীতিমালা মাওবাদীদের মাঝে সাড়া ফেলেছে এবং তারা আত্মসমর্পণ করছে। সত্যটা কী?

গণপতিঃ আত্মসমর্পণ নীতিমালা বলতে তারা কী বোঝায়? আপাতদৃষ্টিতে তারা বোঝায় আরো অর্থ, আরো পুনর্বাসন প্যাকেজ। এগুলো জনসাধারণকে বোঝানোর জন্য। বেশি অর্থ বা ভালো পুনর্বাসনের কারণে আত্মসমর্পণ বৃদ্ধি পায়নি। এর দুটো কারণ আছে। অধিকারের জন্য লড়াইরত আদিবাসীদের ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের নৃশংসতম সরকারগুলোর মধ্যে একটি আর তারা যদি সিপিআই (মাওবাদী) এর অধীনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তাদের উপর যে পরিমাণ নিষ্ঠুরতার বোঝা চাপানো হয় তা ভাষায় বলে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদপন্থী নীতিমালা বিরোধী প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দিতে রাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের দমনমূলক পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে আর আত্মসমর্পণ নীতিমালাও তার মধ্যে একটি।

কেউ বিপ্লবী কার্যক্রমে জড়িত হোক আর না হোক, যেসব এলাকায় আন্দোলন চলছে সেসব এলাকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী রক্তপায়ী নেকড়ের মতো জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তবে এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু তারা, যারা প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত; তাদের উপর ভয়ংকর নির্যাতন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি ধ্বংস, মনস্তাত্বিক যুদ্ধ, হুমকি (পঙ্গু বা হত্যা করার হুমকি এবং বাস্তবে তা করা) ইত্যাদি সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করে তাদের অনেককে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হচ্ছে। গণ আত্মসমর্পণের পিছনে এটাই দায়ী আর পুলিশ একে গণমাধ্যমের সামনে উন্মত্ততার সাথে ও উদ্ধতভাবে তুলে ধরছে। তিন চতুর্থাংশের বেশী আত্মসমর্পণ এই শ্রেণীর। আর অন্য ধরনের আত্মসমর্পণ যারা করে তারা হল পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনের কিছু ব্যক্তি যারা শত্রুর কাছে নতজানু হচ্ছে। হ্যাঁ, সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের আত্মসমর্পণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে যাদের ভেতর নেতৃত্ব পর্যায়েরও (রাজ্য কমিটি, জেলা কমিটি ও এলাকা কমিটি পর্যায়ের) কয়েকজন রয়েছে।

শত্রু যখন নতুন ভাবে আক্রমণ চালায় এবং নিষ্ঠুর দমন পীড়ন যখন নজীরবিহীন পর্যায়ে চলে যায়, তখনই নতুন ধরনের আত্মবলিদানের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই ধরনের সময় যখন যায় তখন সবসময় কিছু দুর্বল উপাদান থাকে যারা আন্দোলন ত্যাগ করে চলে যায় কিংবা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এখনও তাই ঘটছে। সরকারের কথিত উন্নত আত্মসমর্পণ নীতিমালার কিছু প্রভাব হয়তো পড়েছে। কিন্তু তা খুবই নগন্য এবং এটা কখনো কারণ হতে পারে না। এই ধরনের আত্মসমর্পণের প্রথম কারণও হল শত্রুর নৃশংস হামলা। শুধু তাই না, আত্মসমর্পণের পরেও শ্রেণী ও পারিবারিক পটভূমি অনুযায়ী রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্নভাবে দেখছে। কিন্তু তাদের সকলকে জনগণের কাছে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে হাজির করার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে কোন ভিন্নতা নেই। তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে রাষ্ট্র সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে, তাদেরকে ভাড়াটে কর্মী হিসেবে ব্যবহার করছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আরো ভয়ংকর হামলায় তাদেরকে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করছে। সুতরাং, যারা সরলভাবে মনে করছে যে ‘মূলধারায়’ ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে, একটা ‘সুন্দর জীবন’ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য রাষ্ট্র আত্মসমর্পণ নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তাদের বোঝা উচিৎ যে ‘জনগণের উপর যুদ্ধ চালানোর’ একটি  অংশ ছাড়া আত্মসমর্পণ আর কিছুই নয়। এর লক্ষ্য হল আন্দোলনকে দুর্বল করে দিয়ে তাদেরকে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত করে যুদ্ধকে তীব্রতর করা।

আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় কারণ হল কিছু ব্যক্তি শত্রুর দমননীতির গতি প্রকৃতি এবং আন্দোলনের কিছু ক্ষণস্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি বুঝতে সক্ষম হচ্ছেনা; ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। কারো কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতাও আরেকটি কারণ। এই সমস্যাগুলোর সমাধান হল- সকল পর্যায়ের ক্যাডারদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিশ্রুতি গড়ে তুলতে হবে, শত্রুর মনস্তাত্বিক যুদ্ধের বিপরীতে আরো দুরূহ লড়াই চালাতে হবে এবং ক্যাডারদের বোঝাতে হবে আত্মসমর্পণ করার অর্থ নিজেদের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা, কাজেই এটা কোন সমাধান নয়। পার্টির বর্তমান বলশেভিকীকরণ প্রচারণায় এই বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে। আর যে বিষয়টি আমি জোর দিয়ে বলতে চাই তা হল অপারেশন গ্রিন হান্টের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে বিপ্লবী ক্যাডার ও জনগণের অতুলনীয় আত্মবলিদানের ঘটনা ঘটেছে কারণ প্রথমত, জনগণ তাদের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করেছে ও দ্বিতীয়ত, তারা উঁচু মাপের সচেতনতার মধ্য দিয়ে এই আত্মবলিদানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে।

মনস্তাত্বিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে শত্রুরা নিশ্চিতভাবেই কেবল আত্মসমর্পণকে সামনে তুলে ধরবে এবং আত্মত্যাগকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করবে। বিপ্লবী প্রচারণা যুদ্ধে এই বিষয়টিকে কার্যকরীভাবে আমাদের তুলে ধরতে হবে। যতদিন বিপ্লবী যুদ্ধ চলবে, ততদিন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলবে। সুতরাং, যতদিন পর্যন্ত এই বর্বর শাসন ব্যবস্থা উৎখাত না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত কিছু আত্মসমর্পণ ঘটবে আর কিছু সময়কালে এর সংখ্যা কম বেশী হতে পারে। সমগ্র পার্টি ও আন্দোলন চলমানরত সব এলাকায় বিপ্লবের স্বার্থে স্বেচ্ছায় আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়েই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ সহ সকল পর্যায়ের আত্মত্যাগের ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং যে কোন বিপ্লবের জন্য এগুলো অপরিহার্য।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৪র্থ পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

 

comrades-ka7g-621x414livemint

(চতুর্থ পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টির অধিকাংশ কার্যক্রম আদিবাসী এলাকায় সীমাবদ্ধ; এটি নিয়ে পার্টির শুভাকাঙ্ক্ষীরাও চিন্তিত। কেউ কেউ বলছেন যে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ কেবল এই ধরনের এলাকার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, গোটা ভারতের জন্য প্রযোজ্য নয়। এ বিষয়ে আপনার উত্তর কী? সারা দেশে আপনারা কীভাবে গণযুদ্ধকে ছড়িয়ে দেবেন?

গণপতিঃ ভারত একটি বৃহৎ আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্র যার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন বন্ধুর পথে এগুচ্ছে। এই বন্ধুর অবস্থার ফলে দেশ জুড়ে যুগপৎ সশস্ত্র বিপ্লবের লাইন বাতিল হয়ে যায়। আমাদেরকে অবশ্যই গ্রামাঞ্চলের পশ্চাৎপদ এলাকাগুলোতে নিজেদের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ যেখানে সামাজিক অসংগতিগুলো অনেক বেশী তীব্র, তুলনামূলকভাবে সেই সব অধিকতর পশ্চাৎপদ এলাকায় বিপ্লবী যুদ্ধকে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সুতরাং, বিপ্লবী আন্দোলন কেবল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ ধরেই অগ্রসর হতে পারে। উপরন্তু শাসক শ্রেণীর কাছে রয়েছে একটি শক্তিশালী দমনমূলক যন্ত্র আর তা হল একটি ক্ষমতাশালী কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র ও এর সাথে একটি সুপ্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত আধুনিক আর্মি।

কাজেই শত্রুর শাসনের দুর্বলতম সংযোগ রয়েছে যে সকল স্থানে সেখানে আমাদেরকে বিপ্লবী যুদ্ধ চালনা করতে হবে; উদাহরণস্বরূপ গ্রামাঞ্চলে। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং চীন, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ইত্যাদি দেশের ইতিহাস আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনের যথার্থতাকে প্রমাণ করে সন্দেহাতীতভাবে। এদেশে মুক্ত এলাকা ও লাল বাহিনী গঠন করা সম্ভব নয় এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এসব বিষয় নিয়ে যে তর্কবিতর্ক চালু আছে তা নতুন নয়। শাসক শ্রেণী ও বুদ্ধিজীবীরা, সংশোধনবাদী সংসদীয় ‘বাম’রা এবং ছদ্ম ML পার্টি; এরা সকলেই দীর্ঘদিন ধরে এ জাতীয় তর্ক বিতর্ক চালিয়ে আসছে। বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি যারা গণযুদ্ধে জড়িত, তাদের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করার উদ্দেশ্যে তারা এ ধরনের কথা বলে। উপরন্তু, যে সকল বাম দল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে প্রত্যাখান করেছে তারা তাদের দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে সমাজকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কিছুই করতে সমর্থ হয়নি।

মূলতঃ, তারা সবসময় এ ধরনের রূপান্তরের বিপক্ষে থেকে সংসদীয় ডোবায় নিমজ্জিত হয়ে আছে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের বিপক্ষে এই ভ্রান্ত বক্তব্যের একটি ভিন্ন ধরনের দাবী হল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ কেবল আদিবাসী এলাকাতেই প্রযোজ্য, দেশের বাকি এলাকাগুলোতে প্রযোজ্য নয়। এই বক্তব্যটিও অন্তঃসার শূন্য। শত্রুদের এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভারতীয় বিপ্লবের শুভাকাঙ্ক্ষীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথক করে দেখতে হবে। বিপ্লবের শুভাকাঙ্ক্ষীরা আন্দোলনের অধিকাংশ কার্যক্রমের আদিবাসী এলাকায় সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তিত। এটা সত্যি যে মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিশাল অরণ্য এলাকায় যে এলাকাগুলো আদিবাসী জনগণের বাসভূমি, সেখানে আজ আমাদের আন্দোলন তুলনামূলকভাবে বেশী শক্তিশালী। দণ্ডকারণ্য ও বিহার-ঝাড়খণ্ড জোনকে কেন্দ্রে রেখে গত এক দশকে আন্দোলন অগ্রসর হয়েছে। সমতলের বিভিন্ন এলাকায় কীভাবে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটানো যায় সে বিষয়ে পরিস্কার দৃষ্টিকোণ রয়েছে এবং ‘Strategy and Tactics of Indian Revolution’ নামে আমাদের যে দলিলটি রয়েছে তাতে কৌশলগত নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।

শহরে কাজের জন্য আমাদের একটি নীতিমালাও রয়েছে। তারপরেও গ্রামীণ সমতলে ও শহরাঞ্চলে আমাদের আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হল নির্দেশনা অনুযায়ী ক্যাডারদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি। এই দুটি এলাকার (গ্রাম ও শহর) বৃহৎ কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে এবং সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনগুলোকে বিশ্লেষণ করার জন্য সামাজিক তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফলশ্রুতিতে, আমরা অনেক নেতৃত্বকে হারিয়েছি যারা শত্রুর সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল এবং এই এলাকাগুলোতে আন্দোলনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। দেশের বিশাল সমতল কৃষি এলাকায় আমাদের ক্ষীণ উপস্থিতির পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল আমরা কৃষকদেরকে বিশেষত কৃষি শ্রমিক ও দরিদ্র কৃষকদেরকে গেরিলা যুদ্ধে বিশদভাবে সংগঠিত করতে পারিনি। একইসাথে, অরণ্য ঘেরা আদিবাসী এলাকার নব্য উদ্ভাবিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী সহ কৃষক শ্রেণীর বাইরে অন্যান্য শ্রেণীকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি ছিল; আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার এটিও একটি কারণ।

আমাদেরকে অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না যে এধরনের এলাকায় কাজ করার ফলে বিপ্লবী আন্দোলন প্রভূত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দুই পার্টির একত্রীকরণের পর গত দশক থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে যথাযথ শিক্ষার একটি চিত্র তৈরি করতে ও আমরা যেখানে বাধার সম্মুখে আছি সেখানে আন্দোলনকে পুনরায় গঠন করতে, যেখানে আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছি সেখানে শক্তির যোগান দিতে ও আমরা যে এলাকায় নেই সেখানে আন্দোলনকে সম্প্রসারণ করতেও সাহায্য করবে। কলিঙ্গনগর, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় গণমানুষের বিদ্রোহ ও তেলেঙ্গানায় পৃথক রাজ্য আন্দোলন ইত্যাদি থেকে আমাদেরকে অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে; এইসব আন্দোলন গ্রাম ও শহরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও দেশীয় দালালদের আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শোষণ ও নিপীড়নের দাসত্বের নীচে থাকা জনগণের একটা বড় অংশ বিশাল গ্রামাঞ্চল ও আদিবাসী এলাকার বাইরে অবস্থিত শহরাঞ্চলে বসবাস করে।

লড়াই ছাড়া সমস্যা সমাধানের আর কোন বিকল্প তাদের নেই। চলমান গণযুদ্ধ তাদের উপর প্রভাব রাখছে। সুতরাং, এই এলাকাগুলোর অবস্থা বিপ্লবী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল। বাস্তব অবস্থা ও বিভিন্ন শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের জনগণের চাহিদার কথা মনে রেখে আমাদেরকে সৃষ্টিশীলভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক-মিলিটারি লাইনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থেকে, সুবিশাল অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টিশীলতার সাথে কাজ করে, অতীতের ভুলগুলোকে সংশোধন করে, পরিবর্তিত অবস্থা ও শত্রুর কৌশলের সাথে সংগতিপূর্ণ সঠিক কৌশল কাজে লাগিয়ে এই এলাকাগুলোতে জনগণকে সংগঠিত করে শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা চমৎকার সব অবজেকটিভ কন্ডিশনগুলোর সদ্ব্যবহার করতে সমর্থ হব এবং গেরিলা যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। এভাবে, গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে।

(চলবে)


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৩য় পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবারবুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(তৃতীয় পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি ও PLGA এর একত্রীকরণের পর PLGA এর উন্নয়ন ও গেরিলা যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমরা একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গতি হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গণপতিঃ আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক। এই কারণে গত দশকে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এবং এখানে গতি হ্রাস পাওয়ার যে পর্যবেক্ষণ করেছেন সেটিও সঠিক যেহেতু ২০১১ সাল থেকে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি পরিস্থিতির একটি সার সংক্ষেপ করে এবং যাচাই করে দেখা যায় যে আমাদের আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে। গত দশ বছরে অগ্রগতির পথটা বন্ধুর ছিল এবং আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোন পরবর্তীতে দুবল হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে ঠিক তেমনি কেবল বিভিন্ন গেরিলা জোনগুলোই নয় বরং সারা দেশের বিপ্লবী আন্দোলন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি আইন। নিঃসন্দেহে, আমাদের মানসিক শক্তি গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটায়, এবিষয়ে কোন মতবিরোধ থাকার কথা নয়।

অবশ্য, ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন গেরিলা জোনে গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটেছে। একইভাবে, গেরিলা যুদ্ধের উত্থান পতনের ক্ষেত্রেও এই অবস্থাগুলো একটি ভিত্তি গঠন করে। এই বিষয়টা উপেক্ষা করলে আমাদের চলবে না। ২০১১ সাল থেকে বেশ কিছু রাজ্যের/গেরিলা জোনের মিলিটারি ফ্রন্টে গণ সংগ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে ও আন্দোলন প্রসারের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। এই সময়কালে বিপ্লবী গণ কমিটিগুলোকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে পার্টিকে সংহত করার মাধ্যমে কিছু গেরিলা জোনে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটেছিল। তারপরেও আমরা মন্দার মুখোমুখি হয়েছি। পার্টি এই মন্দার কারণগুলো চিহ্নিত করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমগ্র পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে তুলেছে এবং এটিকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা উচিৎ।

অপারেশন গ্রিন হান্টের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে এবং মোদি নেতৃত্বাধীন NDA সরকার ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ সব কিছুই প্রচণ্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে এবং পাল্টা লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে করতে হয়েছিল। জল, জঙ্গল, ভূমি, ইজ্জত ও অধিকারের জন্য সংগ্রামরত মানুষের সমর্থনে ও অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে সমাজের যে সকল গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ তীব্রভাবে সোচ্চার হয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে পার্টি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানায়। জনগণের লড়াকু শক্তিকে টেকসই করতে এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৯ সালের মধ্যভাগ থেকে এই বিপ্লব বিরোধী যুদ্ধের পাল্টা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বিপ্লবী বাহিনী ও বিপ্লব বিরোধী বাহিনীর শক্তির ফারাকটা ছিল বিশাল। শত্রুর প্লাটুন পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কোম্পানি পর্যায়ে গেরিলা বাহিনীকে মোতায়েন করা হত। ব্যাটেলিয়ন পর্যায়ে গেরিলা বাহিনী শত্রুর কোম্পানি পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে, শত্রুরা প্রতিটি গেরিলা জোনে হাজার হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ বাহিনী মোতায়েন করল। সুতরাং, বিপক্ষ বাহিনীর সাথে শক্তির ফারাকের দরুণ আমাদের গেরিলা যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে নতুন কিছু প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হল। আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্যই যে কেবল শত্রুরা এত বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করল তা নয়, বরং একই সাথে এই দশকে ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় এবং প্রায় সব গেরিলা জোনেই যে গুরুত্বপূর্ণ গণ আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলোকে দমন করার জন্যেও এই বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এভাবে, এই অধঃপতিত ব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে মাওবাদী আন্দোলন প্রকাশিত হল। আমাদের গতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে তাকে কেবল শত্রুর দমন নিধনের ফলাফল হিসেবে দেখলে হবে না পাশাপাশি একে আমাদের নিজেদের দুর্বলতার বিপর্যয় হিসেবেও দেখতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমরা আমাদের ভুলগুলো ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছি এবং পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোর বলশেভিকীকরণের কাজ হাতে নিয়েছি।

একই সাথে, এই পরিস্থিতির পিছনে যে বাহ্যিক শর্তগুলো কাজ করেছে সেগুলোও আমাদেরকে দেখতে হবে। আগের ধাপে শত্রুর আক্রমণের পাল্টা মোকাবেলা হিসেবে আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলাম যেগুলো কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় শত্রুরা এই কৌশলগুলোর পাল্টা কিছু কৌশল গ্রহণ করে। ফলে নতুন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সুতরাং, আমাদেরকে আবারো কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হবে যেগুলো গেরিলা যুদ্ধে শত্রুর সর্বোচ্চ বাহিনীকে মোকাবেলা করতে আমাদেরকে সাহায্য করবে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। গেরিলা যুদ্ধ গড়ে তোলা ও অগ্রগতি ঘটানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল আমাদের গণভিত্তিকে মজবুত করা। আন্দোলনের উত্থান ও পতনের যে প্রক্রিয়া সেটি নতুন নতুন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটি বোঝার ক্ষেত্রে এবং পার্টি, PLGA ও জনগণকে এর জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পার্টির দিক থেকে কিছু গুরুতর ভুল হয়েছে। নতুন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে পার্টির ত্রুটির কারণে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে একটি শক্তিশালী শত্রুর সাথে লড়াইয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থার অবনতি ঘটেই থাকে।

এই কারণে মাও বলেছিলেন জয়-পরাজয়-জয়-পরাজয় ও সবশেষে জয় এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এগিয়ে যাবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ সবসময় একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও আংশিক সাফল্য ও কিছু বড় ধরনের সাফল্য ও অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে কিছু ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ও আংশিক ক্ষতি, পরাজয় ও কিছু বড় ধরনের ক্ষতি ও পশ্চাদপসরণ থাকে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি নিয়ম যে এটি আঁকাবাঁকা ভাবে চলে। কাজেই গেরিলা যুদ্ধের গতি হ্রাস হবার ঘটনাকে আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণ করার অর্থ এটাই দাঁড়ায়। আমাদের দেশের বিভিন্ন অংশে আন্দোলন যে বন্ধুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে সেটিকে মাথায় রেখে আমাদের কাজের স্থানগুলোর বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন অনুযায়ী আমাদেরকে হয় আত্মরক্ষার কৌশল অথবা আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুদ্ধের সামগ্রিক পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একে বিবেচনা করতে হবে।

শুধু বিভিন্ন অংশেই নয়, একটি গেরিলা জোনের ভিতরেও সেই নির্দিষ্ট গেরিলা জোনটির বিশেষত্ব অনুযায়ী আমাদেরকে আক্রমণাত্মক কিংবা আত্মরক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কিছু এলাকায় যদি অবস্থা একটু ভালও হয়, তাহলেও সামগ্রিকভাবে যে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদের করতে হচ্ছে তাকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। এবং আমরা সকলে জানি যে আত্মরক্ষার মধ্যে সবসময় আক্রমণ নিহিত থাকে এবং আক্রমণাত্মক না হয়ে কোন আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, সকল পর্যায়ের নেতৃত্বকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের পার্টিতে যে দুইটি বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে তা হল-

১। শত্রুর আপাত শক্তিমত্তা ও তীব্রতার প্রতি দৃষ্টি আরোপ করা এবং তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত না করা; নিজেদের শক্তিমত্তা, সুবিধা ও বিপ্লবী যুদ্ধে জনগণের প্রভাবশালী ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আরোপ না করা; শত্রুর বৃহৎ কৌশলকে না বুঝে কেবল শত্রুর ক্ষুদ্র কৌশলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা। এর ফলে কমরেডগণ আত্মরক্ষার নামে কাজ করার উদ্যম হারিয়ে ফেলে অক্রিয় হয়ে পড়বে এবং শেষে লড়াকু শক্তি হারিয়ে ফেলবে। এটি হল ডান বিচ্যুতি।

২। গেরিলা যুদ্ধে লড়াইয়ের দিকগুলোতে যে পরিবর্তন ঘটেছে তাকে না বোঝা এবং আত্মরক্ষা তথা নেতৃত্বকে রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার দুর্বলতা, জনগণের অক্রিয়তাকে বিবেচনায় না রেখে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করা। তারা শত্রুকে ক্ষুদ্র কৌশলগত দিক থেকে দেখে না, তারা শত্রুকে কেবল বৃহৎ কৌশল দ্বারা যাচাই করে। এটি একটি বাম বিচ্যুতি।

কাজেই, আমাদের গেরিলা যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি করতে হলে দেশের সামগ্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে সেগুলো জানার পাশাপাশি বিপ্লবী যুদ্ধে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো জানতে হবে এবং শত্রুর ও নিজেদের শক্তিমত্তার ও দুর্বলতার জায়গাগুলো জানতে হবে। এটি একটি অন্যতম প্রধান বিষয় যেটি আমরা বলশেভিকীকরণের মধ্য দিয়ে অর্জন করার চেষ্টা করছি। জয়লাভ করতে হলে গণভিত্তি বৃদ্ধি করা, জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা চালানো, গেরিলা যুদ্ধ ও গণযুদ্ধের সমস্ত কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় ভূমিকা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরী। কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিটি ও সকল পরিচালনা কমিটি বর্তমানে এই বিষয়টিকে বুঝে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে।

(চলবে)