ভারতের গণযুদ্ধে নারী: নারী গেরিলারা সামরিক দিক থেকে কতটা তৈরি?

maoist-activist

ভারতের গণযুদ্ধে নারী

নারী গেরিলারা সামরিক দিক থেকে কতটা তৈরি?

(ভারতের বিপ্লবী পত্রিকা পিপলস মার্চ, ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ’০৫ সংখা থেকে সংকলিত)

‘যুদ্ধের নারীসুলভ কোন রূপ নেই’ একটা রাশিয়ান অনুবাদের শিরোনামে এই কথাটা আছে।  কিন্তু চলমান জনযুদ্ধে নারী গেরিলাদের কার্যকলাপে দেখা যাচ্ছে মেয়েদের স্বভাবে যুদ্ধ জিনিসটা স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। এক ধরনের যুদ্ধ রয়েছে যা শুধু মেয়েরা চায় না এমন নয়, সারা বিশ্বের ব্যাপক মানুষই সেই যুদ্ধ চায় না। আবার এমন যুদ্ধ আছে যেটা অবধারিত।  সাধারণ জনগণের সবস্তরের মানুষই সেই যুদ্ধে নেমে পড়ে- অস্ত্র নিয়ে কিংবা বিনা অস্ত্রে।
প্রকৃত অর্থে, শারীরিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কারণে নারীদের প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ব্যাপক অর্থে তাঁরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে য্দ্ধু সংঘটিত করছে।  অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণির মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই লড়ছেন।  তাই যুদ্ধ ‘নারীসুলভ নয়’- এ কথা বলা চলে না। বরং বলা যেতে পারে, হয় এটা নারীর বিরুদ্ধে, নয়তো এটা নারীর জন্য বা দ্বারা পরিচালিত যুদ্ধ। ‘যুদ্ধ নারীসুলভ নয়’- এ ধারণাটা চুরমার করে দেয় নারী গেরিলাদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা।
এখানে অন্ধ্রপ্রদেশে যুদ্ধে নারী গেরিলাদের কার্যকলাপের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে জেলা কমিটি থেকে শুরু করে সাধারণ স্কোয়াড সদস্য সব মেয়েরাই আত্মবিশ্বাস ও আবেগের সুরে বর্ণনা দিতে থাকেন।
যুদ্ধ এলাকার সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল স্থানের বেশিরভাগ মহিলা কমরেডরাই বাহিনীতে যোগদানের ছয়মাসের মধ্যেই গ্রে হাউন্ড, এস.এস.এফ. কিংবা জেলা পুলিশের মোকাবিলার সম্মুখীন হয়েছেন। আর প্রাথমিক অভিজ্ঞতাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে কারণ এতে দ্বিধা মুছে গিয়ে তৈরি হয় আত্মবিশ্বাস।
জেলা কমিটি স্তরের (ডিসিএম) এক নারী কমরেডের অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করা যাক।
একদিন ক্যাম্পে আমি রান্নার দায়িত্বে ছিলাম। শত্রুরা হঠাৎ আমাদের তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল। আমি তো প্রথমে ধরে নিয়েছিলাম কোন দুর্ঘটনার কারণে গুলির আওয়াজ হয়েছে। পরে দেখি রান্নার জায়গার কাছে সাধারণ পোশাকে লোক ঝোপ-জঙ্গল ঠেলে বেরিয়ে আসছে। আমি ভেবেছিলাম ওরা বুঝি গ্রামের লোক। ওদের ডাকতে লাগলাম। কিন্তু ওরা তখন আমার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো- আরে, ওরা তাহলে শত্রু। গুলিগুলো আমার গা ঘেঁষে শিস কেটে বেরিয়ে যেতে লাগলো, ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। বজ্রাহতের মতো আমি তো সেঁটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। গায়ে গুলি লাগলে হয়তো আমি মরে যেতাম। আমাকে যে পাল্টা জবাব দিতে হবে এটা আমার খেয়ালই হয়নি। কম্যান্ডারের নির্দেশে আমার হুঁস ফিরে এলো। ছুটে একটা গাছের আড়াল নিলাম। একটা গুলি আমিও ছুঁড়লাম। সবাই পঞ্চাশ গজ মতো পিছিয়ে গেল। শত্রু এবং আমার কমরেডদের মাঝখানে আমি আটকা পড়লাম। পরে কমরেডদের গুলিবৃষ্টির আড়ালে আমি নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলাম।
ডি.সি.এম. পর্যায়ের আর এক কমরেড জানালেন, প্রথম যখন শত্রুর দেখা পেলাম, কি করতে হবে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম না। যখন দেখি শত্রু আসছে তখন বুঝলাম গুলি ছুঁড়তে হবে। আমি সেন্ট্রির দায়িত্বে ছিলাম, দেখি শত্রুরা আমাদের ঘাঁটির দিকে এগোচ্ছে। ঘাঁটি একটু দূরে। ভাবলাম এই বেলা গিয়ে ওদের হুঁশিয়ার করে দিই। তাই আমার .৪১০ মাসকেট থেকে গুলি ছুঁড়লাম। পুলিশ ছুটে রাস্তার ওপারে গেল, আর গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো। ইতিমধ্যে কমরেডরা বেরিয়ে এলো, কভার নিয়ে গুলি চালাতে চালাতে ওরা এগোতে লাগলো। আমরা সবাই পশ্চাৎপসরণ করলাম।
প্লাটুনের এক সেকসান কম্যান্ডার বললেন, স্কোয়াডে আমি যোগদান করার চারমাসের পর গুলি চললো। পুলিশ খুব কাছে এসে এ.কে.৪৭ থেকে মুহুর্মুহু গুলি চালাতে লাগলো। ভাবলাম, আমি এখানেই শেষ । আমাদের স্কোয়াড ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। নির্দেশ দেবার কেউই নেই। কম্যান্ডার একা, দুটো গুলি ছুঁড়লেন। পুলিশ তাঁকে ধাওয়া করলো। বুলেটের আঘাতে পাথর ছিটকে উঠছে। আমার কাছে ৮মি.মি.-এর এক রাউন্ডের অস্ত্র। একটু ভাবলাম, কভার নিলাম, একটা গুলি ছুঁড়লাম। বন্দুকের বাঁট আর ব্যারেল বেঁকে গেছে, নলটা জ্যাম হয়ে গেছে। বুঝলাম পুলিশের হাতে আমি নিশ্চিতভাবেই ধরা পড়ছি। এবারে আমি কী করবো? মনে পড়লো ‘জং’-এ কি লেখা আছে (সি.পি.আই. (এম-এল) জনযুদ্ধের সামরিক পত্রিকা)। সেই অনুযায়ী আমার গ্রেনেডের পিন সরিয়ে নিজের শরীরের নিচে লুকিয়ে রেখে একটা বুবি ট্রাপ তৈরি করবো। এই সময়ে পুলিশের গুলিবর্ষণ বন্ধ হয়ে গেল। ওরা ম্যাগাজিন লোড করছে। সুযোগটা নিলাম নিজেকে রক্ষা করতে। এবার দিলাম ছুট।
এই দুই সিনিয়ার কমরেডের অভিজ্ঞতা বুঝিয়ে দেয় মহিলা সম্পর্কে বুর্জোয়া ধারণা কত ভ্রান্ত। কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কি রকম উপস্থিত বুদ্ধি দেখিয়েছেন। তাঁরা কেবল নিজেদের বাঁচালেন না, উল্টে শত্রুদের ঘোল খাইয়ে হটিয়েও দিলেন। এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁরা যত লাভ করলেন, যত রাজনৈতিক উপলব্ধি তাঁদের হতে লাগলো, তারা ক্রমশ নেতৃত্বের স্তরে পৌঁছাতে পারলেন। এই ধরনের গুলি বিনিময়ের সময় তারা কম্যান্ড করার শিক্ষাও শিখলেন।
সাধারণত মেয়েদেরকে কোন অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে দুর্বল ও ভীত বলে মনে করা হয়। হ্যাঁ, যতদিন তাঁরা বিশেষ একটা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বাঁধা ছিলেন, ততদিনই এই ধারণাটা ঠিক ছিল। যে মুহূর্তে তাঁরা সেই অর্গল ভেঙ্গে বেরিয়ে এলেন দেখা গেল কতখানি সাহস, উদ্যোগ আর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছাশক্তিতে ভরপুর তাঁরা। এখানে আরো কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া হচ্ছে-
এই ঘটনার বিবরণ যিনি দিয়েছেন, পুলিশের গুলিবর্ষণের সময়ে তিনি তখন ঘুমোচ্ছিলেন।  তিনিই ডিফেন্স টিমের নেত্রী ছিলেন।  চট করে উঠে জুতো পরতে পরতে তিনি সকলকে হুঁশিয়ার করে দেন ‘কভার’ নেওয়ার জন্য। ডিফেন্স টিমের পাঁচ-ছ’পা এগিয়ে গেল, আর পুলিশও প্রবল গুলি বর্ষণ শুরু করলো। সেন্ট্রি এবং ডিফেন্স টিমের সমান্তরালে পজিশনে তারা কভারগুলোকে দখল করলো।  ডিফেন্স টিমও পজিশন নিয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো। এইভাবে গোটা বাহিনীটা নিরাপদে হটে গেল।
একটা ঘটনায় আমাদের তিনটি সংগঠক স্কোয়াড একত্র হয়েছিল। আমি ছিলাম ক্যাম্পের কম্যান্ডার। ঐ টেরেন ছিল পর্বতসঙ্কুল। আমার ডিউটি হস্তান্তরের সময়ে পুলিশ হঠাৎ করে এসে গুলি চালাতে শুরু করলো। চট করে আমি দৌড়ে পিছু হটলাম, ইতিমধ্যে প্রত্যেকেই কভার নিয়ে গুলি চালাতে লাগলো, আমিও যোগ দিলাম। একদল পুলিশ এসে পড়লো সেন্ট্রি আর আমাদের মাঝখানে। আর একদল অন্যদিক দিয়ে টিলার ওপর উঠে গেল। এদিকে সেন্ট্রির কাছে যে ক্যালেমার মাইন ছিল সেটা ফাটলো না। তাই উল্টো দিক থেকে গুলি চালাতে চালাতে তারা পিছু হটে গেলো। আমি এবার গুলি বর্ষণের দায়িত্ব নিলাম। প্রথমে নেতৃত্বদায়ী দলটির পশ্চাৎপসরণে সাহায্য করলাম। তারপর আমাদের দলটা পিছু হটে গেল। দ্রুত সবাই সরে গেল। একজন কমরেড আর আমি রয়ে গেলাম। আমাদের পিছুহটা চলতে চলতেই আর একজন পুলিশ একপাশ থেকে আক্রমণ চালালো। এবার আমরা দু’দিকেই গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে একটা বড় পাহাড়ের কভারে সরে যেতে লাগলাম।
এটা আরো একটা ঘটনা যাতে মহিলা কম্যান্ডার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পুরো দলটাকে বাঁচিয়েছেন।
অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি এবং বিপ্লবী উৎসাহের সাহায্যেই মহিলারা বস্তাপচা পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক সমাজের ধারণাটাকে উল্টে-পাল্টে দিচ্ছেন। এই ঘটনার পরে পুলিশের মন্তব্য হলো, ‘আমরা ভেবেছিলাম মেয়েরা রয়েছে, তাই সহজেই ওদের ধরা যাবে। তা সত্ত্বেও তারা সাহসের সাথেই আমাদের মোকাবিলা করলো’।
এই ঘটনার মহিলা স্কোয়াড কম্যান্ডার এবং আরো একজন কমরেড স্নান করছিলেন, তাঁরা যখন কাপড় ধুচ্ছিলেন একটা আওয়াজ তাঁরা শুনতে পেলেন। দ্বিতীয় কমরেডটি সবেমাত্র তাঁর পোশাকটা খুলতে যাবেন কম্যান্ডার তাঁকে বললেন কোত্থেকে শব্দটা আসছে দেখতে। জানতে চাওয়ার জবাব এলো গুলির শব্দে।
কম্যান্ডার জানাচ্ছেন, ঐ সময়ে আমি নিচে ঝর্ণার জলে ছিলাম। কাপড়-চোপড় ছিল উপরে গাছের ডালে। আমার কিট, পাউচ আর অস্ত্রও ছিল ওপরে। গুলি বর্ষণ সম্পর্কে আমি হুঁসিয়ারী দিলাম, আর ভাবতে লাগলাম কি করে আমার জিনিসপত্রগুলো নেব। প্রথমে আমার পাউচ আর অস্ত্রটা ম্যানেজ করলাম। অস্ত্রে গুলি ভরেই ছুঁড়তে শুরু করে দিলাম। এতে পুলিশ এক কদম পিছু হটে গেল। দেখলাম পিছু হটার কোন উপায়ই নেই আমাদের, কারণ ঝর্ণাটা বেশি গভীর আর পিচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে নামতে লাগলাম আর একটা করে গুলি ছুঁড়তে লাগলাম। ইতিমধ্যে আমার হাতে এসে লাগলো একটা গুলি, প্রচুর রক্তও পড়তে লাগলো। আমার অস্ত্রটা অন্য কমরেডের হাতে দিয়ে আমি পিছু হটে গেলাম।
ঘটনাটা বীর নারী গেরিলাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। জনযুদ্ধে জনগণের স্বার্থে আত্মদানের সার্থকতা আমি বুঝতে পারছিলাম।
ঘটনাটা অবশ্য এখানেই শেষ হলো না। দলে দলে পুলিশের চিরুণি তল্লাসী চললো। গেরিলা দল কম্যান্ডারের প্রাথমিক চিকিৎসা সেরে মাঠের মধ্য দিয়ে সরে যাচ্ছিল।
কম্যান্ডারের কথায় ফিরে আসি আবার, আমরা ঠিকমতো কভার নিতে পারিনি। পুলিশ আমাদের দেখে ফেললো। গ্রামের একজন মহিলা পুলিশকে দেখতে পেয়ে আমাদের সাবধান করে দিল। আবার গুলি বিনিময় চললো। যদিও আমার হাতে বেশ যন্ত্রণা, তবুও দু’টো গুলি ছুঁড়লাম আমি। আরো গুলি হয়তো ছুঁড়তে পারতাম, কিন্তু আমার অস্ত্রটা জ্যাম হয়ে গেলো। তাই খুব জোরে দৌড়ে পিছু হটতে গিয়ে পড়ে গেলাম। পরে সবাই মিলে আমরা একটা ঝর্ণায় নেমে গেলাম। সবাই এভাবে পিছু হটে গেলাম।
একটা সংঘর্ষে একজন সিনিয়র কমরেড ও আরো তিনজন কমরেড শহীদ হয়ে গেলেন। তাতে প্লেটুনের সেকশন ডেপুটি কম্যান্ডারের বিবরণ হলোঃ
হঠাৎ করে গুলি বর্ষণ শুরু হলো- রীতিমতো মুহুর্মুহু! প্রথম গ্রুপের আমরা তিনজন একটা ব্যাচ হয়ে গিয়ে পাল্টা গুলি চালিয়ে জবাব দিতে লাগলাম। দ্রুত গুলি চালিয়ে গেলাম আমার রাইফেলের ম্যাগাজিন শেষ হওয়া পর্যন্ত। আমরা গুলি চালাচ্ছিলাম বলে পুলিশ নিচের পজিশন থেকে আর এক ইঞ্চিও এগোতে পারছিল না। দ্বিতীয় গ্রুপের কমরেডরা দ্রুত গুলি চলার ফলে হয় পড়ে গিয়েছিলেন কিংবা শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা একটু দূরে ছিলাম। দেখলাম আমাদের কমরেডদের বাঁচাতে পারবো না। তাছাড়া আমার ম্যাগাজিন খালি হয়ে গিয়েছিলো। তাই আমাদের পিছু হটতে হলো।
আর একটা ঘটনায় পুলিশ এক গ্রামবাসীকে স্কোয়াডের জন্য জল নিয়ে যেতে দেখলো। তাকে অনুসরণ করে পুলিশ আমাদের ডেরায় পৌঁছে গেল। তিনজন পুলিশ ‘হাই নীলিং পজিশনে’ থেকে মুহুর্মুহু গুলি চালাতে শুরু করলো। সেন্ট্রির কাছে এক কমরেড আহত হলো।
এই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে এক কমরেড বললেন, ‘আমার স্টেনগানটা ভরে গুলি ছুঁড়তে গেলাম। দেখি ওটা আটকে গেছে। পরে বুঝলাম ওর সেফটি পিনটা সরাতেই ভুলে গেছি। ওটা সরাতেই গুলি চালাতে পারলাম। ইতিমধ্যে অন্য সবাই ঘুমোচ্ছিল, আর সেন্ট্রিতে আমরা ছিলাম তিনজন। যাইহোক ঐভাবে গুলি চালিয়ে আমরা সবাই পিছু হটতে পারলাম। ঐ ঘটনায় একজন পুলিশ কনস্টেবল মারা গেল।’
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদেরকে পুরুষের লেজুড় বলেই মনে করে। এখানে একটা ঘটনা আছে, যেখানে নারী গেরিলাটি তাঁর স্বামীর মৃত্যুর দৃশ্য দেখেও জনযুদ্ধের লড়াই চালিয়ে গেলেন। স্কোয়াড যেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিল সেখানে পুলিশ হঠাৎ গুলিবর্ষণ আরম্ভ করলো। কম্যান্ডার নির্দেশ দিলেন ক্ল্যামার মাইন বিস্ফোরণ করার। মেয়েটি পারলেন না বিস্ফোরণ করতে। তিনি কম্যান্ডারকে জানাতে কম্যান্ডার মেয়েটিকে আবার চেষ্টা করতে বললেন। আবারো চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন নারী
গেরিলাটি। ফলে মেয়েটিকে ফিরে আসতে নির্দেশ দেওয়া হলো। ফিরে আসার সময়ে মেয়েটি দেখতে পেলেন তাঁর স্বামীকে রক্তের বন্যায় পড়ে থাকতে। প্রচন্ড মানসিক আঘাতে তিনি স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন অজস্র ধারায় শত্রুর দিক থেকে গুলিবর্ষণ হচ্ছিল।  মেয়েটি নিচে পড়ে গেলেন।  পরে একজন কমরেডের সাহায্যে উঠে পিছু হটে গেলেন।
গেরিলাদের কাছে ম্যালেরিয়া রোগটা একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।  মেয়ে গেরিলাদের নিয়মিত শরীর খারাপের সাথে এটা একটা বাড়তি ঝামেলা।
একবার স্কোয়াড যখন গ্রামবাসীদের সাথে নাচ-গানে মেতে আছে পুলিশ তখন আচমকা আক্রমণ করলো। স্কোয়াড বেন্ডি পজিশনে এগিয়ে গেলো।  নারী কমরেডরা সাহসের সাথে মোকাবিলা করলেন, কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তাঁরা সফল হলেন।
নারী গেরিলারা শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতেই কেবল দক্ষ নয়, শত্রুকে আক্রমণ হানতেও তাঁরা ওস্তাদ হয়ে উঠেছেন। যেখানে মেয়েরা রেইডে অংশ নিয়েছেন এমন কতকগুলো ঘটনা দেওয়া হচ্ছে।  একজন নারী কমরেড রেইডের জন্য সার্ভে এবং অনুশীলনের আগে অন্যান্য কমরেডদের সাথে গভীর আলোচনা করলেন। মহিলাটির ছোট করে ছাঁটা চুল ও অন্যান্য কারণে সহসাথীরা ভাবলেন যদি সহজেই তাকে চিহ্নিত করে ফেলে শত্রুরা।  কিন্তু মহলাটির প্রচন্ড মনের জোর দেখে অন্যান্য কমরেডরা সেই ভাবনা দূরে রাখতে বাধ্য হলেন। তাঁকে এ্যাসল্ট এ্যাটাক টিমেই নেওয়া হলো। মেয়েটি রেইডের আগে তিনবার সার্ভে (রেকি) করলেন।
এবার মেয়েটির মুখ থেকে শোনা যাক, ‘আক্রমণের সময়ে আমরা অভাবনীয় পরিস্থিতির সামনে পড়লাম। বিল্ডিং-এর ভিতর পুলিশরা ঘুমোচ্ছিল আর পাঁচিলে কাঁচের টুকরো গাঁথা ছিল সর্বত্র। দুটো প্রবেশপথ। সেন্ট্রির বাঙ্কার ছিল অন্য পাশে। আমরা তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। একজন কমরেডকে পাঁচিল টপকে ওপারে পাঠালাম। সে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিল। আমার সবাই ভেতরে গেলাম। তিনটি মাইন নিয়ে আমরা তৈরি হলাম যদি শত্রু সজাগ হয়। যেখানে পুলিশগুলো ঘুমোচ্ছিল সেই ঘরে তিনটি মাইন লাগিয়ে বিস্ফোরণ ঘটালাম। বাড়িটা ধসে পড়লো হুড়মুড় করে। ১নং সেন্ট্রি পোস্টের কাছে যে জীপটা ছিল সেটাকে ধ্বংস করা হলো। বিল্ডিং-এর ভেতর থেকে পুলিশরা চেঁচাতে লাগলো। দু’জন পুলিশ খতম হয়েছে, আর দু’জন আহত। ১নং সেন্ট্রি তার এস.এল.আর. ফেলে পালালো। আমাদের ২নং সেন্ট্রি পোস্ট দখল নিতে একটু দেরি হওয়ায়, সে গুলি চালাতে লাগলো। ফলে বিল্ডিং-এর ভেতরকার অস্ত্র দখল নিতে পারলাম না আমরা।
কমরেড আরো বললেন, প্রথমদিকে প্রথমত আমার একটু দ্বিধা ছিল, আক্রমণের নেতৃত্ব আমি দিতে পারবো কিনা। এই অভিযান আমার আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। ন’জন মহিলা কমরেড এই গেরিলা এ্যাকশনে সামিল হয়েছিলেন।
একটি পুলিশ থানা রেইডে চল্লিশ জন গেরিলার মধ্যে মহিলা ছিলেন চৌদ্দজন। ‘এ’ এ্যাসাল্ট টিমে ছিলেন দু’জন নারী গেরিলা, আর ‘বি’ টিমে ছিলেন দু’জন।
“আমি ছিলাম ‘এ’ এ্যাসাল্ট টিমে, আমাদের দায়িত্ব ছিল নিচের তলা এবং এস.আই. রুমের সেন্ট্রিদের সাফ করা আর যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করা। আমরা থানায় ঢুকলাম। সেন্ট্রি গুলি ছুঁড়তেই আমরা তাকে খতম করলাম। একতলাটা দখল নিয়ে আমাদের মাইনগুলো ফাটাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেগুলো ফাটলো না। শেষ পর্যন্ত সেন্ট্রির কাছ থেকে মাইনগুলো নিয়ে সব একসাথে বিস্ফোরণ ঘটালাম। প্রচন্ড শব্দ! পুলিশের গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলো। থানার দখল নিয়ে যতগুলো অস্ত্র আমরা পারলাম সংগ্রহ করলাম। খবর পেলাম, অন্য এক দল পুলিশ বাহিনী ঐ স্থানে আসছে। আমাদের সমগ্র বাহিনী মোটর সাইকেল চেপে দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করলো। সমস্ত মহিলা কমরেডরা প্রচন্ড উৎসাহের সাথে ঐ অভিযানে দায়িত্ব পালন করলেন।”
ঐ মহিলা কমরেড একটা এ্যাম্বুশের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ওতে আটজনের মধ্যে মহিলা ছিলেন পাঁচজন। হঠাৎ করে ঐ অভিযানের সুযোগ হয়ে গেল। আগে থেকে পোঁতা মাইনগুলোকে যথাসময়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হলো। এবার পার্শ্বদেশ থেকে গুলি চালিয়ে শত্রুকে ঝাঁঝরা করা হলো। মহিলা কমরেডটি পার্শ্বদেশ থেকে আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
চলমান বিপ্লবী জনযুদ্ধে মহিলাদের অংশগ্রহণের কয়েকটিমাত্র দৃষ্টান্ত দেওয়া হলো। শুধুমাত্র বিপ্লবী উৎসাহ নয়, এখানে সামরিক যোগ্যতার পরিচয়ও রেখেছেন মহিলারা।
আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে নারীরা একরকম দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। কেবলমাত্র শ্রেণি সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত হলেই তাঁরা ক্ষমতার স্বাদ পাচ্ছেন। এই শক্তিটা কেবল অস্ত্রের খাতিরেই নয়। এটা হলো রাজনীতির শক্তি, বিপ্লবী রাজনীতি। পিতৃতান্ত্রিকতার সবরকম দিকগুলোর বিরুদ্ধে একনাগাড়ে সংগ্রাম চলছে- সেটা যত সূক্ষ্মই হোক, যত ক্ষীণভাবেই হোক। এতে মহিলারা আত্মপ্রত্যয়ের সাথে অন্যান্য পুরুষ কমরেডদের সাথে সমানতালে এগিয়ে আসছেন। এর বিপরীতে সংশোধনবাদীরা সুরক্ষার নাম করেই হোক কিংবা গতানুগতিক ধারার কাছে আত্মসমর্পণ করেই হোক মহিলাদেরকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছে। ভারতের গভীর সামন্ততান্ত্রিক সংস্কার ছিন্ন করে পুরুষদের সমানাধিকারে মহিলাদের বেরিয়ে আসতে উৎসাহ না দিলে পিতৃতান্ত্রিকতা বা পুরুষতান্ত্রিকতা কিছুতেই পুরোপুরি উৎখাত করা যাবে না। মহিলারা কীভাবে বিপ্লবের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারেন, এইসব সাক্ষাৎকার তার একটা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

সূত্রঃ দেশে দেশে বিপ্লবী নারী সংকলন, বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা