সাহিত্যে নকশাল আন্দোলন

গত শতকের সত্তরের দশক ঠিক আর দশটা দশকের মতো ছিল না। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছিল। রাইফেল, রেডবুক দিকে দিকে মুক্তি আনছে— এই ছিল আহ্বান। তবে পশ্চিম বাংলার নকশালবাড়ি গ্রামে যা শুরু হয়েছিল, তার তুলনা মেলা ভার! ১৯৬৭ সালের ২৫ মে নকশালবাড়ি জেলায় কৃষকরা সংগঠিত হয়ে ভূস্বামী আর তাদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বারুদ যেন দিয়াশলাইয়ের আগুন পেল, দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে এ কমিউনিস্ট আন্দোলন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের এমন চেহারা এ উপমহাদেশে আগে কখনো দেখা যায়নি। আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) আর নায়কের নাম চারু মজুমদার। আন্দোলনের মতাদর্শ ছিল মাও সে তুংয়ের চিন্তাধারা। চীনের পিকিং রেডিও নকশালবাড়ির উত্থানকে ঘোষণা করল ‘ভারতের আকাশে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’। আর নকশালদের আহ্বান ছিল ‘সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন’। এ আহ্বান সফল হয়নি, দেয়ালে লেখাও মুছে গেছে বহু আগেই কিন্তু নকশাল আন্দোলনের স্মৃতি, রাজনীতি কিংবা ইতিহাস কোনোটাই এতটুকু বিস্মৃত হয়নি।

দিনক্ষণের হিসাবে এ বছর নকশাল আন্দোলনের ৫০তম বার্ষিকী। নকশাল আন্দোলন কারো কাছে ছিল বিপ্লবের যাত্রা, কারো কাছে সন্ত্রাস। যে যেভাবেই মূল্যায়ন করুন না কেন, সে সময়কে মুছে দেয়া অসম্ভব। হাজার হাজার তরুণ নিজের সার্টিফিকেট পুড়িয়ে দিয়ে, নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে সশস্ত্র লড়াইয়ে নেমে পড়েছিল। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে শহরের নিরাপদ গৃহ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা তখন গ্রামে কৃষকের পর্ণকুটিরে হাজির। বাদ যায়নি বিভাগের সেরা ফল করা ছাত্রটিও। নকশাল আন্দোলন একদিকে যেমন ভারতের রাজনৈতিক জীবনকে আলোড়িত করেছিল, তেমনি নাড়া দিয়েছিল সংস্কৃতি, সাহিত্যের জগেকও। এ আন্দোলন কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে অনেক কালজয়ী উপন্যাস, গল্প, নাটক, কবিতা, গান। এক্ষেত্রে ভারতের আরো অনেক ভাষার চেয়ে বাংলা ভাষার সৃষ্টিই মনে হয় অধিকতর সমৃদ্ধ। হবেইবা না কেন? নকশালবাড়ির জন্ম তো বাংলাতেই। মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা তো কালজয়ী সাহিত্য, যা অন্য অনেক ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে।

২৫ মে নকশালবাড়িতে সংঘর্ষের দিনই দিলীপ বাগচি রাজবংশীদের আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত কবিতায় জানিয়ে দিলেন নকশালবাড়ির আগমনী বার্তা, তার প্রেক্ষাপট, তার প্রতিজ্ঞা—

“ও নকশাল নকশাল নকশালবাড়ির মা

ও মা তোর বুগত্ অকেতা ঝরে

তোর খুনত্ আঙ্গা নিশান লঘ্যা

বাংলার চাষী জয়ধ্বনি করে।।

… ও মা তোর বুগত্ অকেতা ঝরে

সেই অকেতা হইতে জন্ম নিবে

জঙ্গাল সাঁওতাল বাংলার ঘরে ঘরে…”

অর্থাত্ শুরুর দিন থেকেই নকশালবাড়ির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এগোলো বাংলা কবিতা। কবিরা একদিকে যেমন শব্দে আগুন জ্বালিয়েছেন, তেমনি মাঠের লড়াইয়েও শামিল হয়েছিলেন। কবিরা খুন হয়েছেন, কারাগারে গিয়েছেন, নির্যাতন সয়েছেন। নকশাল আন্দোলনের কবিতায় স্থান পেয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক আহ্বান, মতবাদ, সশস্ত্র সংগ্রাম, কৃষক সংগ্রামের গাথা। ১৯৬৭ সালের জানুয়ারিতে দুর্গা মজুমদার সশস্ত্র বিপ্লবের মন্ত্র তুলে ধরেছেন তার ‘সশস্ত্র বিপ্লব’ কবিতায়। কবিতা যেন লড়াইয়ে নামার সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক! সারা জীবন ধূম উদ্গীরণের চেয়ে অন্তত একবারের জন্য হলেও জ্বলে ওঠবার আহ্বান।

“নতজানু হয়ে তিলে তিলে ক্ষয়ে বাঁচবার নাম

আমি রাখলাম

মরণের স্তব—

খুনের বদলে খুন না ঝরিয়ে মরবার নাম

আমি রাখলাম

শ্মশানের শব!

মারার তাগিদে আড়ালে গা-ঢেকে বাঁচবার নাম

আমি রাখলাম

সংগ্রামী গৌরব—

মরণের মুখে থুথু ছুড়ে দিয়ে মরবার নাম

আমি রাখলাম

সশস্ত্র বিপ্লব!!

এ কবিতা লেখার ঠিক ছ’মাস পর দুর্গা মজুমদার মহাভারতের রূপকে তার কবিতায় জানান দিলেন নকশালবাড়ির আগমনের। ১৯৬৭ সালের ১১ জুন লেখা সেই কবিতার নাম ‘গাণ্ডীবে টঙ্কারে দিল’।

“…তারপর একদিন সমুদ্রের তপ্ত স্রোতে বাষ্পের নিয়মে

আকাশের পূর্বকোণে লাল মেঘ জমে…

কৌরবেরা হতবাক, দালালেরা বস্ফািরিত নেত্র

গোগৃহের রণক্ষেত্র—

বিরাট কালের অজ্ঞাতবাসের বৃহন্নলা বেশ ছাড়ি

গাণ্ডীবে টঙ্কার দিল নকশালবাড়ী।”

এর পর কয়েক বছর নকশাল আন্দোলন ধনী, ভূস্বামীদের, পুলিশের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল। সাধারণ ঘরের তরুণরা ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে পড়লেন পার্টির সশস্ত্র আন্দোলনে। নকশাল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাধারণ মানুষের বিপ্লবী রূপান্তর। মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা যে বিপ্লবের জননী, সে গল্প এবার সত্য হয়ে দেখা দিল। দান-খয়রাত নয়, রাষ্ট্রে নিজের অধিকার নিয়ে মানুষের বাঁচতে চাওয়ার দাবি উঠেছিল। আর এ চেতনা মূর্ত হলো ১৯৭৪ সালে স্বপন চক্রবর্তীর লেখা ‘আমাদের গল্প’ কবিতায়—

“আমরা সাহায্য চাইনি

কারণ আমরা বদল চেয়েছি।

চেয়েছি ক্ষিদের মানসিক যন্ত্রণার বিরুদ্ধে

একটি সকাল, দুপুর, রাত সময়, কাল, অনন্ত সময়।

…কোনদিনই আমরা কমিউনিস্ট হতে চাইনি।

এখন সময়

মানুষের জন্যে আমাদের মানুষের মত হতে শেখাচ্ছে।

আমরা চাইনি ইজ্জত খুইয়ে ঘাড় হেঁট করে পেট ভরাতে।

আমরা বদল চেয়েছি

চেয়েছি ক্ষিদের যন্ত্রণার বিরুদ্ধে

একটি সকাল, দুপুর, রাত সময়, কাল, অনন্ত সময়।”

নকশাল আন্দোলনে কৃষকের জমি আর অধিকার আদায়ের স্বপ্ন বিধৃত হয়েছে দীপক আচার্যের ‘নক্শাল কোন সাল ইতিহাসে আনলে’ গানে—

“নক্শাল কি মশাল আশমানে জ্বলছে,

কিষাণের ক্ষোভে আজ হিমালয় টলছে,

অনেক দিনের পুরোনো সে জিজ্ঞাসা-

মিটবে কি কভু চাষীর জমির আশা?

লড়াইয়ের ঢেউয়ে ঢেউয়ে উত্তর উত্তাল-

 নক্শাল, নক্শাল, নক্শাল, নক্শাল!”

নকশাল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন গ্রামের গরিব, ভূমিহীন কৃষকরা। তাদের শতবছরের বঞ্চনার ক্ষোভে আগুন জ্বালিয়েছিল নকশালবাড়ি। এ আন্দোলনে যুক্ত বাংলা কিংবা বিহারের কৃষকরাও ছোট ছোট কবিতা রচনা করেছিলেন। বিহারের নীচু বর্ণের কৃষক ভিখারি রাম হিন্দি ভাষায় রচনা করেছিলেন এমন এক কবিতা –

‘দিনগুলো বন্ধ্যা,

খাওয়ার জন্য একটু ছাতু নেই ঘরে,

মাথার ওপর নেই কুঁড়েঘরের আশ্রয়ও।

আমাদের পায়ে জুতো নেই,

দিনগুলো বন্ধ্যা।’

নকশাল আন্দোলনে যুক্ত চারজন তরুণ কবি খুন হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে, জেলখানায় বন্দি অবস্থায়। এদের মধ্যে আছেন কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ, তিমিরবরণ সিংহ, অমিয় চট্টোপাধ্যায় ও মুরারি মুখোপাধ্যায়। তিমিরবরণ সিংহ ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নকশাল আন্দোলনে গ্রামে গিয়েছিলেন কৃষকদের সংগঠিত করতে। ১৯৭১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বহরমপুর জেলে নিহত হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে। অমিয় চট্টোপাধ্যায় বেহালা পৌরসভার কাউন্সিলর হয়েছিলেন। নকশাল আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পুরুলিয়ার গ্রামাঞ্চলে পার্টির কাজ শুরু করেন। গ্রামে কাজ করতেন ‘সাগর’ ছদ্মনামে। গ্রেফতার হয়ে ঠিকানা হয় জেলখানা এবং জেলের অভ্যন্তরেই তাকে হত্যা করা হয়।

কৃষকদের সরাসরি বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে মুরারি তার কবিতায় লিখেছিলেন—

‘হে কৃষক বিদ্রোহ কর

ঘোরতর বিদ্রোহ

তা’না হলে  ঘুচিবে না

তোমাদের এই দুগ্রহ।’

নকশাল আন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জবাবে পাল্টা জবাব দেয়ার প্রত্যয়ে তরুণ কবি মুরারি মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘কলকাতা বদলা নিতে জানে’। কবিতা কি চিঠি— সবখানেই মুরারি ছিলেন সমাজ বদলের আকাঙ্ক্ষায় অস্থির। ‘কলকাতা বদলা নিতে জানে’ যেন সে সময়ের এক জীবন্ত দলিল। যুগের ক্রোধ যেন মুরারির কলমে ভাষা পেল। মুরারি বলছেন তার বন্ধু কাজল আর সমীরের রক্ত কলকাতাকে আরো উত্তাল করেছে; ভোটের রাজনীতিকে বিদায় দিয়ে রক্তাত্ত সংগ্রাম, প্রতিশোধের কথা বলেছেন। শহরের বাবুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। আহ্বান জানিয়েছেন বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার। আর শেষমেশ উচ্চারণ করেছেন নকশালবাদীদের নেতা চীনা বিপ্লবের নেতা মাও সে তুংয়ের নাম—

‘পূর্ব দিগন্তে রক্ত সূর্য মাও সে তুঙ

টুটল আঁধার, কোটি সেনানীর ভাঙলো ঘুম

আজ এই দিনে যোদ্ধার বেশে তোমায় পেলাম

কৃষকের কলকাতা লাল সেলাম।’

জেল থেকে মাকে লেখা মুরারির চিঠি যুগযুগান্তের বিপ্লবী তরুণের স্মারক। শ্রেণীবৈষম্য ভরা সমাজ যত দিন থাকবে, মুরারির চিঠিও তত দিন প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের কোনো বিপ্লবীর চিঠি তালাশ করলে সেখানেও পাওয়া যাবে মুরারির কথার প্রতিধ্বনি। মুরারি জেল থেকে মাকে লিখছেন, ‘যে সমাজে বড়লোক আরও বড়লোক হয় আর গরীবের কুঁড়ে ঘরে মাঝরাতে বৃষ্টির জলে ঘুম ভেঙে যায়, দেয়ালের মাটি ধসে পড়ে ঘুমন্ত মানুষের বুকে, সত্যি করে বলতো মা, সে সমাজকে বাঁচিয়ে রাখার কোন অর্থ আছে?’ অন্য একটি চিঠিতে লিখেছেন, ‘ওরা আমাদের জেলে পুরেছে, হত্যা করছে, আরও অনেক কিছু করার কুমতলব আঁটছে, কিন্তু মূর্খ ওরা। তুমিও বলো হাত দিয়ে সূর্যের আলো ঠেকানো যায়?’ জেলে বসেও মুরারির তেজ আর পার্টি আর বিপ্লবের ওপর আস্থা এতটুকু কমেনি, চিঠিতে আরো লিখেছেন— ‘আমরা জিতেছি, আমরা জিতবো, আমরা শত্রুর ঘুম কেড়ে নিতে পেরেছি। হত্যা করার একচেটিয়ে অধিকার আমরা ওদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি। এতদিন জোতদাররা কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে, আজ আমাদের পার্টির পরিচালনায় কৃষকরাই ওদের জমি থেকে উচ্ছেদ করছে, ওরা পালিয়ে যাচ্ছে, শহরে।’ গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার মৃত্যুর আগে এক মুহূর্তের জন্যও মুরারির চোখ থেকে মুছে যায়নি। মুরারিকে ১৯৭১ সালে হাজারীবাগ সেন্ট্রাল জেলে হত্যা করা হয়।

নকশাল আন্দোলনে যুক্ত তরুণদের দমাতে চালানো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিষয়টি অজানা নয়। তুলে নিয়ে হত্যা করা, কারাগারে খুন, গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে পিটিয়ে হত্যা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। রাষ্ট্রের সেই দানবীয় চেহারাও কবিদের কবিতায় মূর্ত হয়েছে। কবি কৃষ্ণ ধর লিখেছেন ‘একদিন সত্তর দশকে’ শিরোনামের কবিতা—

“শিকারকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে

অন্ধকারে মিলিয়ে যায় জল্লাদের গাড়ি

শহরের দেয়ালে দেয়ালে পরদিন দেখা যায় তারই কথা

সে নিদারুণ তৃষ্ণায় একবার জল চেয়েছিল

যে যন্ত্রণায় নীল হয়ে একবার ডেকেছিল মাকে

তবু স্বপ্নকে অক্ষত রেখেই সে

বধ্যভূমিতে গিয়েছিল

একদিন সত্তর দশকে।”

রাষ্ট্রীয় দমনের একটি ভয়ানক রূপ ছিল কম্বিং অপারেশন। কোনো একটি এলাকা ঘিরে ফেলে নির্বিবাদ গ্রেফতার, খুন, নির্যাতন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সালে পশ্চিম বাংলায় চলেছিল এ কম্বিং অপারেশন। এ অপারেশনের স্বরূপ উন্মোচন করে সমীর রায় লিখেছেন ‘নরমুণ্ড শিকারীরা পোস্টার সেঁটেছে’—

“আমি ভুলিনি, আমি ভুলিনি, আমি ভুলিনি

আমার গলার উপর পা রেখে, আমার মুখের রক্ত দিয়ে

নরমুণ্ড শিকারীরা কলকাতা শহরে পোস্টার সেঁটেছে-

‘বাঁচুন, বাঁচতে দিন, হিংস্রতা বর্জন করুন’।”

নকশাল আন্দোলনের কবিতার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, বিপ্লবের আহ্বান, রাজনৈতিক স্লোগান, পরিস্থিতির সরল বিবরণ। তাই সব কবিতা মানোত্তীর্ণ হতে পেরেছে এমনটা বলার সুযোগ নেই। নির্মল ঘোষ তার নকশালবাদী আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অনস্বীকার্য, নকশালপন্থী কাব্যচর্চায় আঙ্গিকের চেয়ে বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর এর ফলে বক্তব্যে বহুক্ষেত্রেই আবেগের প্রাধান্য দেখা গেল, যা শেষপর্যন্ত পাঠক মানসকে প্রায়শ প্রভাবিত বা প্রাণিত করতে সমর্থ হয়নি।’ তবে কবিতার শৈল্পিক মানের এ বিতর্কে অর্জুন গোস্বামী নকশালবাদী কবিতার পক্ষেই রায় দিয়েছেন, ‘এটা সত্তরের দশক। এই দশক প্রত্যক্ষ করেছে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিতশ্রেণীর লড়াই। এই দশকেই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রকে উপরে উপরে যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক না কেন আসলে তারা হলো কাগুজে বাঘ। স্বভাবতই এই দশকের মানুষের সচেতনতা অনেক বেশি। আমরা এমন কোন কবিতা পড়তে চাই না যাতে আছে হতাশা, আছে যন্ত্রণার গোঙানি। আমরা এমন কবিতা পড়তে চাই যাতে ধরা পড়বে শোষণের আসল স্বরূপ, যে কবিতা পড়ে অনুপ্রেরণা পাবেন লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ এবং যে কবিতা প্রকৃতই হবে শোষিতশ্রেণীর সংগ্রামী হাতিয়ার। আমাদের মধ্যে অনেকে বলেন কবিতা হলো এমন একটা জিনিস যা ঠিক স্লোগান নয়। আমাদের বক্তব্য হলো কবিতার বিষয় ও কবিতার আঙ্গিক এই দুটোর মধ্যে আগে বিষয়, পরে আঙ্গিক। বক্তব্যকে সাধারণের উপযোগী করে বলার জন্য কবিতা যদি কারুর কাছে স্লোগান বলে মনে হয় তবে সেই স্লোগানই হলো সত্তরের দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’

নকশাল আন্দোলনে সময়ে কবিতা শুধু বাংলা ভাষাতেই লেখা হয়নি বরং এ আন্দোলনের প্রভাবে আরো কয়েকটি ভাষার কবিরা। তেলেগু ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি চেরাবান্দা রাজু এমনই একজন। সক্রিয়ভাবে নকশাল তথা মাওবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আজীবন। কারাবাস, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ভোগ করেছেন। ১৯৭২ সালে নকশাল আন্দোলন যখন রাষ্ট্রীয় দমনে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, সে সময় তিনি লিখেছিলেন—

আমি উত্তাল ঢেউ ডিঙিয়ে

তীরে পৌঁছতে চেষ্টা করেছিলাম…

নৌকা সামনে এগিয়েছে,

কিন্তু সেই ঢেউ উপহাসের হাসি হেসে আমাকে বলেছে:

‘তুমি কী পাগল?

আমরা বয়ে চলছি

আমাদের হাজারটা চোখ আছে,

তুমি কীভাবে আমাদের পেছনে ফেলবে?’

আমি ফিরে গেলাম…

আজ,

নৌকার হালটা আর আমার হাতে নেই,

আজ আমিই বরং তার হাতের পুতুল।

তেলেগু কবিদের মধ্যে সুব্বারাও পাণিগ্রাহীও কবিতা লিখেছেন। মালয়লাম ভাষার কবি সচ্চিদানন্দন, শঙ্কর পিল্লা, অট্টর রবি ভার্মা রচনা করেন নকশালবাদী কবিতা। হিন্দি ভাষায়ও রচিত হয় কবিতা। হিন্দি কবিদের মধ্যে লিখেছেন— উগরাসেন সিং, হরিহর দিভেদী, ধুমল, গোরাখ পাণ্ডে প্রমুখ।

কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্পেও ধরা রয়েছে নকশাল আন্দোলন। কিছু রচিত হয়েছে আন্দোলন চলাকালে আবার কিছু পরবর্তীকালেও। গল্পগুলোয় রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও তরুণদের দুঃসাহসী রাজনীতির বিবরণ পাওয়া যায়। মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদী গল্পটি দিয়ে শুরু করা যাক। আদিবাসীরা বেশ ভালোভাবেই যুক্ত হয়েছিলেন নকশাল আন্দোলনে। আর আদিবাসীদের সংগ্রাম বাংলা ভাষায় মহাশ্বেতা দেবীর চেয়ে ভালো আর কেই বা লিখতে পেরেছেন! ঝাড়খন্ডের সাঁওতাল মেয়ে দ্রৌপদী পুলিশের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। সাতাশ বছরের দোপিদকে গ্রেফতারে সহায়তার জন্য নগদ একশ টাকা পুরস্কারও ঘোষিত হয়েছে। ঝাড়খানি জঙ্গলে সর্বাত্মক অপারেশন চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় দ্রৌপদিকে। এর পর তার ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন। গণধর্ষণের পর বিক্ষত দেহে ফেলে রাখা হয় তাকে। কিন্তু তাতেও তো মাথা নোয়ায় না দোপিদ। জ্ঞান ফিরে দোপিদ যখন সব বুঝতে পারে, তখন নিজের কাপড় নিজেই ছিঁড়ে ফেলে। সামরিক কর্তা নির্দেশ দেন দোপিদকে কাপড় পরাতে। দোপিদ তখন বলে ওঠে, “কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?

চারদিকে চেয়ে দ্রৌপদী রক্তমাখা থুথু ফেলতে সেনানায়কের সাদা বুশ শার্টটা বেছে নেয় এবং সেখানে থুথু ফেলে বলে, হেথা কেও পুরুষ নাই যে লাজ করব। কাপড় মোরে পরাতে দিব না। …দ্রৌপদী দুই মর্দিত স্তনে সেনানায়ককে ঠেলতে থাকে এবং এই প্রথম সেনানায়ক নিরস্ত্র টার্গেটের সামনে দাঁড়াতে ভয় পান, ভীষণ ভয়।”

দীপংকর চক্রবর্তীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পটি নকশাল রাজনীতির চিত্রায়ন। সে সময়ের রাজনীতির তাত্ত্বিক লড়াই, ঝোঁক সবই ধরা রয়েছে এ গল্পে। পুলিশের হাতে বুলু নামের এক তরুণ কর্মীর মৃত্যু খবরে কলকাতা ছুটে আসেন এক পরিচিত সিদ্ধার্থ। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সিদ্ধার্থ যে দেয়াল লেখাগুলো দেখতে থাকেন, তা দিয়ে লেখক আমাদের চোখের সামনে সে সময়ের রাজনীতিকে জীবন্ত করে তোলেন। কোথাও লেখা, ‘ভোট বয়কট করে নয়, ভোটের মাধ্যমেই আপনার রায় দিন।’ তার পাশেই নকশালদের লেখা, ‘তেইশ বছর ভোট দিয়ে আপনি কী পেয়েছেন? ভোট নয়, সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবই মুক্তির পথ।’ শেষের এ দেয়াল লেখা দেখতে দেখতে সিদ্ধার্থ বুঝলেন এটিই বুলুদের পার্টির পোস্টার, তবে অন্য সবার পোস্টার অক্ষত থাকলেও বুলুদেরটার ওপর আলকাতরা মারা হয়েছে। আরো একটি স্লোগান দীপংকর তুলে ধরেছেন, যা সে সময় পশ্চিম বাংলার রুশ ও চীনপন্থী নকশালদের মধ্যে তীব্র মতাদর্শিক বৈপরীত্যকে প্রকাশ করেছে— ‘জ্যোতিবাবুর বাড়ি তিন তলা— ওপরে ভাড়া, নীচে ভাড়া, সি. আর. পি দিচ্ছে পাহারা— জ্যোতিবাবু সর্বহারা!’ লেখক বুলুদের বলেছেন সূর্যসেনের উত্তরসূরি। বুলুর বাবা সন্তোষবাবু সিদ্ধার্থকে বলেন, ‘জানো সিদ্ধার্থ, যৌবনে আমিও বন্দুক হাতে লড়েছি চট্টগ্রামে, মাস্টারদার পাশে-দাঁড়িয়ে। আজ এই সব বুলু মন্টুদের দেখে গর্বে বুক ফুলে ওঠে, চোখে জল আসে। বিনয়-বাদল-দীনেশ আর বাঘা যতীনরা মরেন নি, এদের মধ্যে আমি দেখতে পাই তাঁদের, দেখতে পাই মাস্টারদা-লোকনাথ আর টেগরাকে।’ সন্তোষবাবু নিজে নির্বাচনপন্থীদের দলের কর্মী। কিন্তু বুলুদের আত্মত্যাগ তাকে ধাক্কা দেয়, নিজের পার্টির বিপ্লবী পরিচয় নিয়ে তার মনে সন্দেহ তৈরি হয়, ‘বুলুর মৃত্যু আমার চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা আবার বিপ্লবী! এরা কী জন্য লড়ছে বলো তো? কী আছে এদের সামনে? এদের তো পাবার কিছু নেই! কিন্তু দেবার জন্য আছে- জীবন! সবার মুক্তির জন্য এরা জীবন উত্সর্গ করছে।’ বুলুদের বাসা থেকে বেরিয়ে ফেরার পথে সিদ্ধার্থ দেখলেন একটি বাসের গায়ে মাও সে তুংয়ের ছোট একটা ছবি লাগানো। মূলত এ ঘটনা পাঠককে দেখিয়ে লেখক তার গল্পকে একটি নিরেট সরল রাজনৈতিক করে তুললেন। লেখক এবার সিদ্ধার্থের অনুভূতির বয়ানের সমর্থন জানালেন নকশাল আন্দোলনকে, “প্রচণ্ড আবেগে ও বিস্ময়ে আপ্লুত হয়ে পড়ল সিদ্ধার্থ। মাও সে তুংয়ের ছবিটার ওপর ক্রমান্বয়ে ভেসে উঠতে লাগল বুলু-রন্টু-বিচ্ছুদের মুখগুলো। ছবিটার তলায় খুদে খুদে অক্ষরে লেখা: ‘বলো, হাতদিয়ে রোখা যায় কি সূর্যের কিরণ? হত্যা করে রোখা যায় কি বিপ্লব?’ আপন মনেই মাথা নাড়ল সিদ্ধার্থ। না রোখা যায় না। ওরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।” দীপংকর চক্রবর্তী এ গল্প লিখেছেন সেই উত্তাল সময়ে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনীক পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল।

দীপংকর চক্রবর্তীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পটি ছোটগল্পের শিল্পমান সেভাবে অর্জন করতে পারেনি। গল্পটি নেহাতই রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন হয়েছে। তবে আন্দোলন চলাকালে উত্তাল সময়ে লেখক-সাহিত্যিকদের লেখাগুলো হয়তো এমন হওয়াটাই অনেকটা স্বাভাবিক ছিল। অর্থাত্ সাহিত্যের শিল্পমানের চেয়ে বক্তব্য, আবেগের প্রকাশই ছিল মুখ্য। নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত আরো অসংখ্য ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে— হাসান আজিজুল হকের আমরা অপেক্ষা করছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পলাতক ও অনুসরণকারী, বিমল করের নিগ্রহ, সমরেশ বসুর শহিদের মা, দেবেশ রায়ের কয়েদখানা, সুবিমল মিশ্রের মাংস বিনিময় হল, নবারুণ ভট্টাচার্যের খোঁচড়, জয়া মিত্রের স্বজন বিজন, বশীর আলহেলালের মোকাবিলা প্রভৃতি।

নকশাল আন্দোলন নিয়ে রচিত হয়েছে উপন্যাসও। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে আছে— স্বর্ণ মিত্রের গ্রামে চলো (১৯৭২), মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা (১৯৭৩) ও অপারেশন? বসাই টুডু (১৯৭৮), শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শ্যাওলা (১৯৭৭), শৈবাল মিত্রের অজ্ঞাতবাস (১৯৮০), জয়া মিত্রের হন্যমান, সমরেশ মজুমদারের কালবেলা প্রভৃতি।

স্বর্ণ মিত্রের গ্রামে চলো উপন্যাসটি নকশাল আন্দোলনে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অংশ নেয়ার বিবরণ। প্রেসিডেন্সির ছাত্র অনিরুদ্ধ বাগচী ওরফে রঘুর নকশাল হয়ে গ্রামে কৃষক সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার কাহিনী। নকশাল আন্দোলনে প্রেসিডেন্সির ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। স্বর্ণ মিত্র তার উপন্যাসে সেই ছবিটা দেখাতে চেয়েছেন, ‘…ভয়ঙ্করভাবে বদলে গেল কলেজের ইতিহাস। কলারের শেষ বোতাম আঁটা মেদিনীপুরের সেই লাজুক বোকা ছেলেটার পেছনেও আজ গোয়েন্দা পুলিশের কড়া নজর। …যে ছেলেটি মায়ের হাতের টিফিন বার করতে সংকোচ বোধ করতো, লজ্জা বোধ করতো তার সেই বহু দূরের কুঁড়ে চালাটির পরিচয় দিতে, আজ সেই ছেলেটিও বুক ফুলিয়ে চলে, মাথা উঁচু করে গরিব বংশের পরিচয় দেয়। কলেজে ঘুরে ঘুরে ছাত্রদের সংগঠিত করে। …প্রেসিডেন্সি কলেজের এমন যুগান্তকারী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো সারা বাংলাদেশে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছাত্রের দল নানা কলেজ থেকে বেরিয়ে এলো মধ্যবিত্ত জীবনের মায়া কাটিয়ে। কমরেড অচিন্ত্যর নেতৃত্বে তারা দল বেঁধে রওনা দিলো গোপীবল্লভপুর, ডেবড়া, বহরাগোড়া-বাংলা বিহার উড়িষ্যা সীমান্তের বিভিন্ন গ্রামে। সেই বিপ্লবী স্রোতেরই একটি বিন্দু রঘু।’ পুরো উপন্যাসে একজন শহুরে তরুণ গ্রামের এই কষ্টকর সংগ্রামে কীভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তার বিবরণ পাওয়া যায়। উঠে এসেছে কৃষকদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। মাঝে মাঝেই এসেছে পরিস্থিতি অনুযায়ী মাও সে তুংয়ের উক্তি।

নকশাল আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস বোধহয় মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা। অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান ব্রতী নকশাল আন্দোলনে জড়ায়, তারপর একদিন খুন হয়ে যায়। ‘সেই ব্রতী। মুক্তির দশকে এক হাজার তিরাশি জনের মৃত্যুর পরে চুরাশি নম্বরে ওর নাম।’ ব্রতীর মা সুজাতার জবানিতে উঠে আসে তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের গল্প। ব্রতীর থেতলানো মরদেহ ছুঁয়ে দেখেন সুজাতা। সেই দশকে খুন হয়ে যাওয়া অসংখ্য ব্রতীর মায়েদের যন্ত্রণা ধারণ করেছেন সুজাতা। ব্রতীর বাবা দিব্যনাথ নকশালদের ঘৃণা করেন। এমনকি ছেলের মুখাগ্নি পর্যন্ত করেননি। মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা ভণ্ডামিও উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। ব্রতীর অপরাধ? মহাশ্বেতা দেবী লিখছেন, ‘অপরাধের মধ্যে ব্রতী এই সমাজে, এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস হারিয়েছিল।’ ব্রতীর ঘর সার্চ করে পুলিশ উদ্ধার করে নকশালদের স্লোগানের খসড়া। সত্তরের দশকের অতি পরিচিত সব স্লোগান। ব্রতীর প্রেমিকা নন্দিনী পুলিশি হেফাজতে প্রায় অন্ধ হয়ে যায়, দীর্ঘদিন সলিটারি সেলে থেকে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

গল্প, কবিতা, উপন্যাসের বাইরে নকশাল আন্দোলন নাটক, গান, সিনেমাসহ আরো অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব রেখেছিল। সেসব নিয়ে যথেষ্ট আলোচনার সুযোগ এ লেখায় হচ্ছে না। তবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ নামের পথপ্রদর্শক বাংলা ব্যান্ডটির কথা সামান্য উল্লেখ করতে চাই। ব্যান্ডটির মূল উদ্যোক্তা বলা যায় গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে। মনিদা নামে পরিচিত গৌতম ছাত্রজীবনেই নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে গৌতম গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন, সইতে হয়েছে নির্যাতন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রশাসনের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তারপর ১৯৭৬ সালে জন্ম নেয় কিংবদন্তি বাংলা ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’।

নকশাল আন্দোলনের একটি বিতর্কিত অধ্যায় ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গান্ধী, বিদ্যাসাগর প্রমুখের মূর্তি ভাংচুর। মূলত ১৯৭০-৭১ সালে কলকাতা শহর ও সংলগ্ন অঞ্চলে এ ভাংচুরের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছিল। নকশালপন্থীদের মূল্যায়নে সে সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ঔপনিবেশিক আর গান্ধী, বিদ্যাসাগররা শাসকদের সহায়ক। তাই সমাজ বদলাতে এসবের উচ্ছেদ ঘটাতে হবে। শশাঙ্ক লিখেছেন, ‘কৃষকের বিপ্লবী লড়াইয়ের অনুপ্রেরণায় পেটি বুর্জোয়া পরিবার থেকে আগত যুবকদের প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষা পদ্ধতির প্রতি আক্রমণ অসামান্য ও অকল্পনীয়। যতদূর জানি, পৃথিবীর কোন দেশের বিপ্লবের ইতিহাসে এর কোন নজীর নেই। পেটি বুর্জোয়া যুবক ও ছাত্ররাই এই প্রতিক্রিয়াশীল উপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার শিকার এবং তাঁরা যুবক বলেই এর বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক বিপ্লবী পতাকা তুলে ধরেছেন।’ তবে এ ভাংচুরের ঘটনা খোদ পার্টিতে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। সেদিকে নজর দেয়ার আগে এ অ্যাকশনের পেছনের প্রেক্ষাপটটি নিয়ে সামান্য কথা হতে পারে। বিভিন্ন মত আছে কিন্তু একটি মত বেশ আলোচিত, সেটি হচ্ছে আন্দোলনের প্রাথমিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। নকশাল আন্দোলন শুরু হতেই শহরের উচ্চশিক্ষিত তরুণরা গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে গাঁয়ের গরিব কৃষকদের সংগঠিত করতে যান। কিন্তু গ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জোরদার অভিযান শুরু হওয়ায় অনেক তরুণ শহরে ফিরে আসতে বাধ্য হন। নির্মল ঘোষ নগরে ফিরে আসা তরুণদের প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘শহরে আত্মগোপন করাও ছিল তাঁদের কাছে গ্রামের তুলনায় সহজ। তদুপরি শহরে পার্টির নির্দিষ্ট কার্যক্রম তাঁদের বিপ্লবী রোমান্টিকতাকে প্রয়োগের যথেষ্ট সুযোগ দেয়নি। তাই অধৈর্য হয়ে, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের কার্যক্রম স্থির করে নিলেন এবং গান্ধীর মূর্তি ভাঙার প্রয়াস, আমেরিকান ও সোভিয়েত সাহিত্যের বহ্নিউত্সব ইত্যাদি কার্যাবলীকে তাদের কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত করেন। এদের প্রাথমিক আক্রমণের লক্ষ্য ছিল আমেরিকা পরিচালিত শিক্ষাসংস্থাগুলি, যা অচিরেই পরিবর্তিত হয়েছিল সমস্ত শিক্ষায়তনের প্রতি আক্রমণে। সাধারণভাবে এরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হঠাত্ উপস্থিত হয়ে অফিসঘর তছনছ করেন, জাতীয় নেতাদের ছবি ভেঙেচুরে, পুলিশ আসবার আগেই স্থানত্যাগ করতেন।’ যহোক, চারু মজুমদার, সরোজ দত্ত এ ভাংচুরে পূর্ণ সমর্থন জানালেন। কিন্তু পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য সুশীতল রায়চৌধুরী ছদ্মনামে একটি বিবৃতি প্রচার করে এ মূর্তি ভাঙা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার বিরোধিতা করেন। তার বক্তব্য ছিল, যে বিপ্লবী রাজনীতির জন্য গান্ধী ও গান্ধীবাদ বাধাস্বরূপ, তাই তার মূর্তি ভাঙা যেতে পারে কিন্তু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরের রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর প্রমুখ বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের মূর্তিভাঙা অনুচিত। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্কারের জন্য অবশ্যই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে, কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র নষ্ট করা বা আসবাবপত্র ভাঙা বা প্রেসিডেন্সি কলেজের ল্যাবরেটরি নষ্ট করা অনুচিত। বলাই বাহুল্য, চারু মজুমদার এ মতকে পাত্তা দেননি। বরং তিনি বলেছেন, ‘যদি গভীর ঘৃণায় ছাত্রেরা আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাংচুর করে, তবে সে কাজে কোন বিপ্লবীরই বাধা দেয়া উচিত না।’

বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে সরোজ দত্ত বলেছিলেন, “বিদ্যাসাগরের দেড়শ বছর পূর্ণ হওয়ার ঘটনাকে মওকা হিসেবে গ্রহণ করে আজ বিদ্যাসাগরের পূজায় কেন এত আড়ম্বর হচ্ছে? ব্যারাকপুরে যখন মঙ্গল পাঁড়ের ফাঁসি হয় এবং সশস্ত্র বিদ্রোহ সারা বাংলায় জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দেয়, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ বিদ্যাসাগর কি তখন তার কলেজকে এই বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনানিবাসে পরিণত হতে দেয়নি? ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাঁড়ে যখন ফাঁসিতে উঠেছিল বিদ্যাসাগর কি তখন সংস্কৃত কলেজে বসে ব্রিটিশের জয়গান করে ‘বাংলার ইতিহাস’ রচনা করেনি? তাইতো আজ ছেলেরা গান্ধী ও বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গছে মঙ্গল পাঁড়ের মূর্তি গড়ার জন্য।”

নারায়ণ সান্যালের বিবরণীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার এক অজানা কথা উঠে আসে। “কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগর-মশায়ের মর্মরমূর্তির যেদিন মুণ্ডচ্ছেদ হয় তার মাসখানেকের মধ্যে সিপিএম (এম. এল) দলের এক নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্রনেতার সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়েছিল! ঘটনাচক্রে সে আমার নিকট আত্মীয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কট্টর নকশাল। আমার পেচকপ্রতিম বিরস মুখখানা দেখে সে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, ‘বিশ্বাস কর ছোটকাকু! মূর্তিটা যে ভেঙ্গেছে তাকে আমি চিনি। গত বছর হায়ার সেকেন্ডারিতে সে বাংলায় লেটার পেয়েছে। ওর সেই বাংলা প্রশ্নপত্রে প্রবন্ধ এসেছিল তোমার প্রিয় দেশবরেণ্য নেতা। ও লিখেছিল বিদ্যাসাগরের উপর।’

আমি জানতে চেয়েছিলুম, ‘তাহলে ও বিদ্যাসাগরের মূর্তিটা ভাঙল কেন?’ ‘…বিদ্যাসাগরের মূর্তি তো সে ভাঙেনি। ভেঙেছে একটা ফেটিশ! ষড়যন্ত্রী মশাইরা যে ফেটিশের গলায় প্রতিবছর ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর একটা করে গাঁথা ফুলের মালা দুলিয়ে দিয়ে বলেন, আগামীবার ভোটটা আমায় দেবেন কাইন্ডলি! দুঃখ কর না কাকু। সর্বহারার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হলে বিদ্যাসাগরের মূর্তি আবার বসাব’।”

সহায়ক গ্রন্থাবলি ঃ

নকশালবাদী আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য, নির্মল ঘোষ

নকশাল আন্দোলনের গল্প, সম্পাদনা: বিজিত ঘোষ

নকশালবাড়ি : তিরিশ বছর আগে এবং পরে, আজিজুল হক

মননে সৃজনে নকশালবাড়ী, সম্পাদক: প্রদীপ বসু

এবং অন্যকথা ষাণ্মাসিকের নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫০ বছর শীর্ষক সংখ্যা; সম্পাদক: বিশ্বজিত্ ঘোষ, জলধি হালদার

Thema Book of Naxalite Poetry, Sumanta Banerjee

লেখকঃ শানজিদ অর্ণব

সূত্রঃ  bonikbarta.net

Advertisements

মাওবাদী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে ৬০০টি স্থানে CCTV ইন্সটল করা হয়েছে

CCTV-Control-Room-570x350

অনূদিতঃ

বিশাখাপত্তনম: ভারতে মাওবাদী আন্দোলন এবং অবৈধ গাঁজা ব্যবসার ওপর কঠোর নজরদারি রাখতে, গ্রামীণ পুলিশ প্রায় ৬০০টি স্থান চিহ্নিত করে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাচ্ছে।  এসপি রাহুল দেব শর্মার মতে, ৬০০টি স্থানের মধ্যে প্রায় ২৫০টি মাওবাদী প্রভাবিত।  এসব সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো পুলিশ স্টেশনের ভেতরে ও বাইরেসহ অন্যান্য স্থানে বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল।  এর আগে গ্রামীণ পুলিশ সিসিটিভি’র অনুমোদনের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে সার্ভে করা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রেরণ করেছিল।

সূত্রঃ http://www.newindianexpress.com/states/andhra_pradesh/CCTVs-to-be-installed-at-600-places-to-control-maoist-movement/2016/07/17/article3532972.ece


ছত্তিসগড় ভিত্তিক নকশাল অঙ্গ সংগঠনের নেটওয়ার্ক দেশব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে

WP_20150201_16_56_20_Smart1

নিষিদ্ধ ঘোষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)’র ছত্তিসগড় ভিত্তিক একটি অঙ্গ সংগঠন  কলকাতা, মুম্বাই এবং দিল্লি মত মেট্রো এলাকার মধ্যে তাদের নেটওয়ার্ক দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে।  এই অঙ্গ সংগঠন ‘জল-জঙ্গল-জমিন’ বা পানি, বন ও ভূমি- উন্নয়নের নামে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার আহবান জানিয়ে সরকার বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করছে।  গোয়েন্দা ইউনিট সূত্র জানায়, একই আদর্শের নকশালদের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন নাগপুরেও খুবই সক্রিয়……

সূত্রঃ http://timesofindia.indiatimes.com/city/nagpur/Chhattisgarh-based-Naxal-front-spreads-nationwide-network/articleshow/53245229.cms


ভারতের গণযুদ্ধে নারী: নারী গেরিলারা সামরিক দিক থেকে কতটা তৈরি?

maoist-activist

ভারতের গণযুদ্ধে নারী

নারী গেরিলারা সামরিক দিক থেকে কতটা তৈরি?

(ভারতের বিপ্লবী পত্রিকা পিপলস মার্চ, ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ’০৫ সংখা থেকে সংকলিত)

‘যুদ্ধের নারীসুলভ কোন রূপ নেই’ একটা রাশিয়ান অনুবাদের শিরোনামে এই কথাটা আছে।  কিন্তু চলমান জনযুদ্ধে নারী গেরিলাদের কার্যকলাপে দেখা যাচ্ছে মেয়েদের স্বভাবে যুদ্ধ জিনিসটা স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। এক ধরনের যুদ্ধ রয়েছে যা শুধু মেয়েরা চায় না এমন নয়, সারা বিশ্বের ব্যাপক মানুষই সেই যুদ্ধ চায় না। আবার এমন যুদ্ধ আছে যেটা অবধারিত।  সাধারণ জনগণের সবস্তরের মানুষই সেই যুদ্ধে নেমে পড়ে- অস্ত্র নিয়ে কিংবা বিনা অস্ত্রে।
প্রকৃত অর্থে, শারীরিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কারণে নারীদের প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ব্যাপক অর্থে তাঁরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে য্দ্ধু সংঘটিত করছে।  অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণির মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই লড়ছেন।  তাই যুদ্ধ ‘নারীসুলভ নয়’- এ কথা বলা চলে না। বরং বলা যেতে পারে, হয় এটা নারীর বিরুদ্ধে, নয়তো এটা নারীর জন্য বা দ্বারা পরিচালিত যুদ্ধ। ‘যুদ্ধ নারীসুলভ নয়’- এ ধারণাটা চুরমার করে দেয় নারী গেরিলাদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা।
এখানে অন্ধ্রপ্রদেশে যুদ্ধে নারী গেরিলাদের কার্যকলাপের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে জেলা কমিটি থেকে শুরু করে সাধারণ স্কোয়াড সদস্য সব মেয়েরাই আত্মবিশ্বাস ও আবেগের সুরে বর্ণনা দিতে থাকেন।
যুদ্ধ এলাকার সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল স্থানের বেশিরভাগ মহিলা কমরেডরাই বাহিনীতে যোগদানের ছয়মাসের মধ্যেই গ্রে হাউন্ড, এস.এস.এফ. কিংবা জেলা পুলিশের মোকাবিলার সম্মুখীন হয়েছেন। আর প্রাথমিক অভিজ্ঞতাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে কারণ এতে দ্বিধা মুছে গিয়ে তৈরি হয় আত্মবিশ্বাস।
জেলা কমিটি স্তরের (ডিসিএম) এক নারী কমরেডের অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করা যাক।
একদিন ক্যাম্পে আমি রান্নার দায়িত্বে ছিলাম। শত্রুরা হঠাৎ আমাদের তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল। আমি তো প্রথমে ধরে নিয়েছিলাম কোন দুর্ঘটনার কারণে গুলির আওয়াজ হয়েছে। পরে দেখি রান্নার জায়গার কাছে সাধারণ পোশাকে লোক ঝোপ-জঙ্গল ঠেলে বেরিয়ে আসছে। আমি ভেবেছিলাম ওরা বুঝি গ্রামের লোক। ওদের ডাকতে লাগলাম। কিন্তু ওরা তখন আমার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো- আরে, ওরা তাহলে শত্রু। গুলিগুলো আমার গা ঘেঁষে শিস কেটে বেরিয়ে যেতে লাগলো, ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। বজ্রাহতের মতো আমি তো সেঁটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। গায়ে গুলি লাগলে হয়তো আমি মরে যেতাম। আমাকে যে পাল্টা জবাব দিতে হবে এটা আমার খেয়ালই হয়নি। কম্যান্ডারের নির্দেশে আমার হুঁস ফিরে এলো। ছুটে একটা গাছের আড়াল নিলাম। একটা গুলি আমিও ছুঁড়লাম। সবাই পঞ্চাশ গজ মতো পিছিয়ে গেল। শত্রু এবং আমার কমরেডদের মাঝখানে আমি আটকা পড়লাম। পরে কমরেডদের গুলিবৃষ্টির আড়ালে আমি নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলাম।
ডি.সি.এম. পর্যায়ের আর এক কমরেড জানালেন, প্রথম যখন শত্রুর দেখা পেলাম, কি করতে হবে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম না। যখন দেখি শত্রু আসছে তখন বুঝলাম গুলি ছুঁড়তে হবে। আমি সেন্ট্রির দায়িত্বে ছিলাম, দেখি শত্রুরা আমাদের ঘাঁটির দিকে এগোচ্ছে। ঘাঁটি একটু দূরে। ভাবলাম এই বেলা গিয়ে ওদের হুঁশিয়ার করে দিই। তাই আমার .৪১০ মাসকেট থেকে গুলি ছুঁড়লাম। পুলিশ ছুটে রাস্তার ওপারে গেল, আর গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো। ইতিমধ্যে কমরেডরা বেরিয়ে এলো, কভার নিয়ে গুলি চালাতে চালাতে ওরা এগোতে লাগলো। আমরা সবাই পশ্চাৎপসরণ করলাম।
প্লাটুনের এক সেকসান কম্যান্ডার বললেন, স্কোয়াডে আমি যোগদান করার চারমাসের পর গুলি চললো। পুলিশ খুব কাছে এসে এ.কে.৪৭ থেকে মুহুর্মুহু গুলি চালাতে লাগলো। ভাবলাম, আমি এখানেই শেষ । আমাদের স্কোয়াড ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। নির্দেশ দেবার কেউই নেই। কম্যান্ডার একা, দুটো গুলি ছুঁড়লেন। পুলিশ তাঁকে ধাওয়া করলো। বুলেটের আঘাতে পাথর ছিটকে উঠছে। আমার কাছে ৮মি.মি.-এর এক রাউন্ডের অস্ত্র। একটু ভাবলাম, কভার নিলাম, একটা গুলি ছুঁড়লাম। বন্দুকের বাঁট আর ব্যারেল বেঁকে গেছে, নলটা জ্যাম হয়ে গেছে। বুঝলাম পুলিশের হাতে আমি নিশ্চিতভাবেই ধরা পড়ছি। এবারে আমি কী করবো? মনে পড়লো ‘জং’-এ কি লেখা আছে (সি.পি.আই. (এম-এল) জনযুদ্ধের সামরিক পত্রিকা)। সেই অনুযায়ী আমার গ্রেনেডের পিন সরিয়ে নিজের শরীরের নিচে লুকিয়ে রেখে একটা বুবি ট্রাপ তৈরি করবো। এই সময়ে পুলিশের গুলিবর্ষণ বন্ধ হয়ে গেল। ওরা ম্যাগাজিন লোড করছে। সুযোগটা নিলাম নিজেকে রক্ষা করতে। এবার দিলাম ছুট।
এই দুই সিনিয়ার কমরেডের অভিজ্ঞতা বুঝিয়ে দেয় মহিলা সম্পর্কে বুর্জোয়া ধারণা কত ভ্রান্ত। কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কি রকম উপস্থিত বুদ্ধি দেখিয়েছেন। তাঁরা কেবল নিজেদের বাঁচালেন না, উল্টে শত্রুদের ঘোল খাইয়ে হটিয়েও দিলেন। এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁরা যত লাভ করলেন, যত রাজনৈতিক উপলব্ধি তাঁদের হতে লাগলো, তারা ক্রমশ নেতৃত্বের স্তরে পৌঁছাতে পারলেন। এই ধরনের গুলি বিনিময়ের সময় তারা কম্যান্ড করার শিক্ষাও শিখলেন।
সাধারণত মেয়েদেরকে কোন অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে দুর্বল ও ভীত বলে মনে করা হয়। হ্যাঁ, যতদিন তাঁরা বিশেষ একটা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বাঁধা ছিলেন, ততদিনই এই ধারণাটা ঠিক ছিল। যে মুহূর্তে তাঁরা সেই অর্গল ভেঙ্গে বেরিয়ে এলেন দেখা গেল কতখানি সাহস, উদ্যোগ আর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছাশক্তিতে ভরপুর তাঁরা। এখানে আরো কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া হচ্ছে-
এই ঘটনার বিবরণ যিনি দিয়েছেন, পুলিশের গুলিবর্ষণের সময়ে তিনি তখন ঘুমোচ্ছিলেন।  তিনিই ডিফেন্স টিমের নেত্রী ছিলেন।  চট করে উঠে জুতো পরতে পরতে তিনি সকলকে হুঁশিয়ার করে দেন ‘কভার’ নেওয়ার জন্য। ডিফেন্স টিমের পাঁচ-ছ’পা এগিয়ে গেল, আর পুলিশও প্রবল গুলি বর্ষণ শুরু করলো। সেন্ট্রি এবং ডিফেন্স টিমের সমান্তরালে পজিশনে তারা কভারগুলোকে দখল করলো।  ডিফেন্স টিমও পজিশন নিয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো। এইভাবে গোটা বাহিনীটা নিরাপদে হটে গেল।
একটা ঘটনায় আমাদের তিনটি সংগঠক স্কোয়াড একত্র হয়েছিল। আমি ছিলাম ক্যাম্পের কম্যান্ডার। ঐ টেরেন ছিল পর্বতসঙ্কুল। আমার ডিউটি হস্তান্তরের সময়ে পুলিশ হঠাৎ করে এসে গুলি চালাতে শুরু করলো। চট করে আমি দৌড়ে পিছু হটলাম, ইতিমধ্যে প্রত্যেকেই কভার নিয়ে গুলি চালাতে লাগলো, আমিও যোগ দিলাম। একদল পুলিশ এসে পড়লো সেন্ট্রি আর আমাদের মাঝখানে। আর একদল অন্যদিক দিয়ে টিলার ওপর উঠে গেল। এদিকে সেন্ট্রির কাছে যে ক্যালেমার মাইন ছিল সেটা ফাটলো না। তাই উল্টো দিক থেকে গুলি চালাতে চালাতে তারা পিছু হটে গেলো। আমি এবার গুলি বর্ষণের দায়িত্ব নিলাম। প্রথমে নেতৃত্বদায়ী দলটির পশ্চাৎপসরণে সাহায্য করলাম। তারপর আমাদের দলটা পিছু হটে গেল। দ্রুত সবাই সরে গেল। একজন কমরেড আর আমি রয়ে গেলাম। আমাদের পিছুহটা চলতে চলতেই আর একজন পুলিশ একপাশ থেকে আক্রমণ চালালো। এবার আমরা দু’দিকেই গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে একটা বড় পাহাড়ের কভারে সরে যেতে লাগলাম।
এটা আরো একটা ঘটনা যাতে মহিলা কম্যান্ডার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পুরো দলটাকে বাঁচিয়েছেন।
অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি এবং বিপ্লবী উৎসাহের সাহায্যেই মহিলারা বস্তাপচা পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক সমাজের ধারণাটাকে উল্টে-পাল্টে দিচ্ছেন। এই ঘটনার পরে পুলিশের মন্তব্য হলো, ‘আমরা ভেবেছিলাম মেয়েরা রয়েছে, তাই সহজেই ওদের ধরা যাবে। তা সত্ত্বেও তারা সাহসের সাথেই আমাদের মোকাবিলা করলো’।
এই ঘটনার মহিলা স্কোয়াড কম্যান্ডার এবং আরো একজন কমরেড স্নান করছিলেন, তাঁরা যখন কাপড় ধুচ্ছিলেন একটা আওয়াজ তাঁরা শুনতে পেলেন। দ্বিতীয় কমরেডটি সবেমাত্র তাঁর পোশাকটা খুলতে যাবেন কম্যান্ডার তাঁকে বললেন কোত্থেকে শব্দটা আসছে দেখতে। জানতে চাওয়ার জবাব এলো গুলির শব্দে।
কম্যান্ডার জানাচ্ছেন, ঐ সময়ে আমি নিচে ঝর্ণার জলে ছিলাম। কাপড়-চোপড় ছিল উপরে গাছের ডালে। আমার কিট, পাউচ আর অস্ত্রও ছিল ওপরে। গুলি বর্ষণ সম্পর্কে আমি হুঁসিয়ারী দিলাম, আর ভাবতে লাগলাম কি করে আমার জিনিসপত্রগুলো নেব। প্রথমে আমার পাউচ আর অস্ত্রটা ম্যানেজ করলাম। অস্ত্রে গুলি ভরেই ছুঁড়তে শুরু করে দিলাম। এতে পুলিশ এক কদম পিছু হটে গেল। দেখলাম পিছু হটার কোন উপায়ই নেই আমাদের, কারণ ঝর্ণাটা বেশি গভীর আর পিচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে নামতে লাগলাম আর একটা করে গুলি ছুঁড়তে লাগলাম। ইতিমধ্যে আমার হাতে এসে লাগলো একটা গুলি, প্রচুর রক্তও পড়তে লাগলো। আমার অস্ত্রটা অন্য কমরেডের হাতে দিয়ে আমি পিছু হটে গেলাম।
ঘটনাটা বীর নারী গেরিলাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। জনযুদ্ধে জনগণের স্বার্থে আত্মদানের সার্থকতা আমি বুঝতে পারছিলাম।
ঘটনাটা অবশ্য এখানেই শেষ হলো না। দলে দলে পুলিশের চিরুণি তল্লাসী চললো। গেরিলা দল কম্যান্ডারের প্রাথমিক চিকিৎসা সেরে মাঠের মধ্য দিয়ে সরে যাচ্ছিল।
কম্যান্ডারের কথায় ফিরে আসি আবার, আমরা ঠিকমতো কভার নিতে পারিনি। পুলিশ আমাদের দেখে ফেললো। গ্রামের একজন মহিলা পুলিশকে দেখতে পেয়ে আমাদের সাবধান করে দিল। আবার গুলি বিনিময় চললো। যদিও আমার হাতে বেশ যন্ত্রণা, তবুও দু’টো গুলি ছুঁড়লাম আমি। আরো গুলি হয়তো ছুঁড়তে পারতাম, কিন্তু আমার অস্ত্রটা জ্যাম হয়ে গেলো। তাই খুব জোরে দৌড়ে পিছু হটতে গিয়ে পড়ে গেলাম। পরে সবাই মিলে আমরা একটা ঝর্ণায় নেমে গেলাম। সবাই এভাবে পিছু হটে গেলাম।
একটা সংঘর্ষে একজন সিনিয়র কমরেড ও আরো তিনজন কমরেড শহীদ হয়ে গেলেন। তাতে প্লেটুনের সেকশন ডেপুটি কম্যান্ডারের বিবরণ হলোঃ
হঠাৎ করে গুলি বর্ষণ শুরু হলো- রীতিমতো মুহুর্মুহু! প্রথম গ্রুপের আমরা তিনজন একটা ব্যাচ হয়ে গিয়ে পাল্টা গুলি চালিয়ে জবাব দিতে লাগলাম। দ্রুত গুলি চালিয়ে গেলাম আমার রাইফেলের ম্যাগাজিন শেষ হওয়া পর্যন্ত। আমরা গুলি চালাচ্ছিলাম বলে পুলিশ নিচের পজিশন থেকে আর এক ইঞ্চিও এগোতে পারছিল না। দ্বিতীয় গ্রুপের কমরেডরা দ্রুত গুলি চলার ফলে হয় পড়ে গিয়েছিলেন কিংবা শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা একটু দূরে ছিলাম। দেখলাম আমাদের কমরেডদের বাঁচাতে পারবো না। তাছাড়া আমার ম্যাগাজিন খালি হয়ে গিয়েছিলো। তাই আমাদের পিছু হটতে হলো।
আর একটা ঘটনায় পুলিশ এক গ্রামবাসীকে স্কোয়াডের জন্য জল নিয়ে যেতে দেখলো। তাকে অনুসরণ করে পুলিশ আমাদের ডেরায় পৌঁছে গেল। তিনজন পুলিশ ‘হাই নীলিং পজিশনে’ থেকে মুহুর্মুহু গুলি চালাতে শুরু করলো। সেন্ট্রির কাছে এক কমরেড আহত হলো।
এই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে এক কমরেড বললেন, ‘আমার স্টেনগানটা ভরে গুলি ছুঁড়তে গেলাম। দেখি ওটা আটকে গেছে। পরে বুঝলাম ওর সেফটি পিনটা সরাতেই ভুলে গেছি। ওটা সরাতেই গুলি চালাতে পারলাম। ইতিমধ্যে অন্য সবাই ঘুমোচ্ছিল, আর সেন্ট্রিতে আমরা ছিলাম তিনজন। যাইহোক ঐভাবে গুলি চালিয়ে আমরা সবাই পিছু হটতে পারলাম। ঐ ঘটনায় একজন পুলিশ কনস্টেবল মারা গেল।’
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদেরকে পুরুষের লেজুড় বলেই মনে করে। এখানে একটা ঘটনা আছে, যেখানে নারী গেরিলাটি তাঁর স্বামীর মৃত্যুর দৃশ্য দেখেও জনযুদ্ধের লড়াই চালিয়ে গেলেন। স্কোয়াড যেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিল সেখানে পুলিশ হঠাৎ গুলিবর্ষণ আরম্ভ করলো। কম্যান্ডার নির্দেশ দিলেন ক্ল্যামার মাইন বিস্ফোরণ করার। মেয়েটি পারলেন না বিস্ফোরণ করতে। তিনি কম্যান্ডারকে জানাতে কম্যান্ডার মেয়েটিকে আবার চেষ্টা করতে বললেন। আবারো চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন নারী
গেরিলাটি। ফলে মেয়েটিকে ফিরে আসতে নির্দেশ দেওয়া হলো। ফিরে আসার সময়ে মেয়েটি দেখতে পেলেন তাঁর স্বামীকে রক্তের বন্যায় পড়ে থাকতে। প্রচন্ড মানসিক আঘাতে তিনি স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন অজস্র ধারায় শত্রুর দিক থেকে গুলিবর্ষণ হচ্ছিল।  মেয়েটি নিচে পড়ে গেলেন।  পরে একজন কমরেডের সাহায্যে উঠে পিছু হটে গেলেন।
গেরিলাদের কাছে ম্যালেরিয়া রোগটা একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।  মেয়ে গেরিলাদের নিয়মিত শরীর খারাপের সাথে এটা একটা বাড়তি ঝামেলা।
একবার স্কোয়াড যখন গ্রামবাসীদের সাথে নাচ-গানে মেতে আছে পুলিশ তখন আচমকা আক্রমণ করলো। স্কোয়াড বেন্ডি পজিশনে এগিয়ে গেলো।  নারী কমরেডরা সাহসের সাথে মোকাবিলা করলেন, কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তাঁরা সফল হলেন।
নারী গেরিলারা শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতেই কেবল দক্ষ নয়, শত্রুকে আক্রমণ হানতেও তাঁরা ওস্তাদ হয়ে উঠেছেন। যেখানে মেয়েরা রেইডে অংশ নিয়েছেন এমন কতকগুলো ঘটনা দেওয়া হচ্ছে।  একজন নারী কমরেড রেইডের জন্য সার্ভে এবং অনুশীলনের আগে অন্যান্য কমরেডদের সাথে গভীর আলোচনা করলেন। মহিলাটির ছোট করে ছাঁটা চুল ও অন্যান্য কারণে সহসাথীরা ভাবলেন যদি সহজেই তাকে চিহ্নিত করে ফেলে শত্রুরা।  কিন্তু মহলাটির প্রচন্ড মনের জোর দেখে অন্যান্য কমরেডরা সেই ভাবনা দূরে রাখতে বাধ্য হলেন। তাঁকে এ্যাসল্ট এ্যাটাক টিমেই নেওয়া হলো। মেয়েটি রেইডের আগে তিনবার সার্ভে (রেকি) করলেন।
এবার মেয়েটির মুখ থেকে শোনা যাক, ‘আক্রমণের সময়ে আমরা অভাবনীয় পরিস্থিতির সামনে পড়লাম। বিল্ডিং-এর ভিতর পুলিশরা ঘুমোচ্ছিল আর পাঁচিলে কাঁচের টুকরো গাঁথা ছিল সর্বত্র। দুটো প্রবেশপথ। সেন্ট্রির বাঙ্কার ছিল অন্য পাশে। আমরা তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। একজন কমরেডকে পাঁচিল টপকে ওপারে পাঠালাম। সে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিল। আমার সবাই ভেতরে গেলাম। তিনটি মাইন নিয়ে আমরা তৈরি হলাম যদি শত্রু সজাগ হয়। যেখানে পুলিশগুলো ঘুমোচ্ছিল সেই ঘরে তিনটি মাইন লাগিয়ে বিস্ফোরণ ঘটালাম। বাড়িটা ধসে পড়লো হুড়মুড় করে। ১নং সেন্ট্রি পোস্টের কাছে যে জীপটা ছিল সেটাকে ধ্বংস করা হলো। বিল্ডিং-এর ভেতর থেকে পুলিশরা চেঁচাতে লাগলো। দু’জন পুলিশ খতম হয়েছে, আর দু’জন আহত। ১নং সেন্ট্রি তার এস.এল.আর. ফেলে পালালো। আমাদের ২নং সেন্ট্রি পোস্ট দখল নিতে একটু দেরি হওয়ায়, সে গুলি চালাতে লাগলো। ফলে বিল্ডিং-এর ভেতরকার অস্ত্র দখল নিতে পারলাম না আমরা।
কমরেড আরো বললেন, প্রথমদিকে প্রথমত আমার একটু দ্বিধা ছিল, আক্রমণের নেতৃত্ব আমি দিতে পারবো কিনা। এই অভিযান আমার আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। ন’জন মহিলা কমরেড এই গেরিলা এ্যাকশনে সামিল হয়েছিলেন।
একটি পুলিশ থানা রেইডে চল্লিশ জন গেরিলার মধ্যে মহিলা ছিলেন চৌদ্দজন। ‘এ’ এ্যাসাল্ট টিমে ছিলেন দু’জন নারী গেরিলা, আর ‘বি’ টিমে ছিলেন দু’জন।
“আমি ছিলাম ‘এ’ এ্যাসাল্ট টিমে, আমাদের দায়িত্ব ছিল নিচের তলা এবং এস.আই. রুমের সেন্ট্রিদের সাফ করা আর যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করা। আমরা থানায় ঢুকলাম। সেন্ট্রি গুলি ছুঁড়তেই আমরা তাকে খতম করলাম। একতলাটা দখল নিয়ে আমাদের মাইনগুলো ফাটাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেগুলো ফাটলো না। শেষ পর্যন্ত সেন্ট্রির কাছ থেকে মাইনগুলো নিয়ে সব একসাথে বিস্ফোরণ ঘটালাম। প্রচন্ড শব্দ! পুলিশের গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলো। থানার দখল নিয়ে যতগুলো অস্ত্র আমরা পারলাম সংগ্রহ করলাম। খবর পেলাম, অন্য এক দল পুলিশ বাহিনী ঐ স্থানে আসছে। আমাদের সমগ্র বাহিনী মোটর সাইকেল চেপে দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করলো। সমস্ত মহিলা কমরেডরা প্রচন্ড উৎসাহের সাথে ঐ অভিযানে দায়িত্ব পালন করলেন।”
ঐ মহিলা কমরেড একটা এ্যাম্বুশের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ওতে আটজনের মধ্যে মহিলা ছিলেন পাঁচজন। হঠাৎ করে ঐ অভিযানের সুযোগ হয়ে গেল। আগে থেকে পোঁতা মাইনগুলোকে যথাসময়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হলো। এবার পার্শ্বদেশ থেকে গুলি চালিয়ে শত্রুকে ঝাঁঝরা করা হলো। মহিলা কমরেডটি পার্শ্বদেশ থেকে আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
চলমান বিপ্লবী জনযুদ্ধে মহিলাদের অংশগ্রহণের কয়েকটিমাত্র দৃষ্টান্ত দেওয়া হলো। শুধুমাত্র বিপ্লবী উৎসাহ নয়, এখানে সামরিক যোগ্যতার পরিচয়ও রেখেছেন মহিলারা।
আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে নারীরা একরকম দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। কেবলমাত্র শ্রেণি সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত হলেই তাঁরা ক্ষমতার স্বাদ পাচ্ছেন। এই শক্তিটা কেবল অস্ত্রের খাতিরেই নয়। এটা হলো রাজনীতির শক্তি, বিপ্লবী রাজনীতি। পিতৃতান্ত্রিকতার সবরকম দিকগুলোর বিরুদ্ধে একনাগাড়ে সংগ্রাম চলছে- সেটা যত সূক্ষ্মই হোক, যত ক্ষীণভাবেই হোক। এতে মহিলারা আত্মপ্রত্যয়ের সাথে অন্যান্য পুরুষ কমরেডদের সাথে সমানতালে এগিয়ে আসছেন। এর বিপরীতে সংশোধনবাদীরা সুরক্ষার নাম করেই হোক কিংবা গতানুগতিক ধারার কাছে আত্মসমর্পণ করেই হোক মহিলাদেরকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছে। ভারতের গভীর সামন্ততান্ত্রিক সংস্কার ছিন্ন করে পুরুষদের সমানাধিকারে মহিলাদের বেরিয়ে আসতে উৎসাহ না দিলে পিতৃতান্ত্রিকতা বা পুরুষতান্ত্রিকতা কিছুতেই পুরোপুরি উৎখাত করা যাবে না। মহিলারা কীভাবে বিপ্লবের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারেন, এইসব সাক্ষাৎকার তার একটা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

সূত্রঃ দেশে দেশে বিপ্লবী নারী সংকলন, বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা


সালওয়া জুডুম প্রধান মহেন্দ্র কর্মাকে খতমের পর সিপিআই(মাওবাদী)-র অডিও বিবৃতি-

article-2330992-19FF989E000005DC-674_634x507

আজ ২৫শে মে ঐতিহাসিক নকশাল বাড়ী দিবস।  ২০১৩ সালের ২৫শে মে এই দিনেই ছত্তিসগড়ের সুকমা জেলার দরভা উপত্যকায় সালওয়া জুডুমের নেতা মহেন্দ্র কর্মা সহ ২৫ জন কংগ্রেস নেতা ও কর্মীকে খতম করে সিপিআই(মাওবাদী)।  এ ঘটনা নিয়ে সিপিআই (মাওবাদী)-এর দণ্ডকারণ্য স্পেশ্যাল জোনাল কমিটি অডিও ও প্রেস-বিবৃতি দিয়ে ‘বস্তারের নিপীড়িত মানুষের পরম শত্রু’ মহেন্দ্র কর্মা ও নন্দকুমার পটেল, তার পুত্র দীনেশ, প্রাক্তন ইউনিয়ন মন্ত্রী ভি সি শুক্লা-সহ অন্য কংগ্রেস নেতাদের হত্যা করার জন্য দলীয় কর্মীদের অভিনন্দন জানিয়েছে। দণ্ডকারণ্য স্পেশ্যাল জোনাল কমিটির মুখপাত্র গুড়সা উসেন্ডির সই করা ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল, মহেন্দ্র কর্মা এবং আরও কিছু ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ কংগ্রেস নেতাকে খতম করা।  তবে এই হামলায় কয়েকজন নিরীহ মানুষ এবং কংগ্রেস কর্মীর হতাহত হওয়ার ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে তাঁদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছে মাওবাদীরা।  ওই বিবৃতিতে রাজ্যপাল শেখর দত্ত, মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহ-সহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও পুলিশ অফিসারের নাম করে বলা হয়েছে, দণ্ডকারণ্যে বিপ্লবী আন্দোলন চুরমার করে দিতে তাঁরা উঠেপড়ে লেগেছেন।  তাঁরা নিজেদের ‘অপরাজেয়’ ভাবছেন।  মাওবাদীরা মন্তব্য করেছে, ‘জেড প্লাস’ শ্রেণির নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর বুলেটপ্রুফ গাড়ির জন্য মহেন্দ্র কর্মাও ভেবেছিলেন তিনি চিরকাল ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন।  ২৬ মে তারিখে জারি করা ওই বিবৃতিতে মাওবাদীরা দাবি করেছে, শনিবারের খতম অভিযানের মধ্য দিয়ে সালওয়া জুড়ুমের গুন্ডা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হাজার হাজার আদিবাসীর নৃশংস হত্যার বদলা নেওয়া হল। তাদের অভিযোগ, সালওয়া জুড়ুম চলার সময়ে অসংখ্য আদিবাসী রমণী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ‘পরিবর্তন যাত্রা’য় হামলা চালিয়ে ওই কাজের বদলা নেওয়া হল। মহেন্দ্র কর্মা না হয় মাওবাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু, কিন্তু নন্দকিশোর পটেলকে খতম করা হল কেন? কেনই বা বিদ্যাচরণ শুক্লর মতো প্রবীণ নেতাকে খতম করা হল? এ বিষয়ে হিন্দিতে লেখা চার পাতার দীর্ঘ প্রেস বিবৃতিতে তারও উত্তর দিয়েছে মাওবাদীরা। জানিয়েছে, নন্দকুমার রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীনই বস্তারে প্রথম আধা-সামরিক বাহিনী (সিআরপি) মোতায়েন করা হয়।  আর প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিদ্যাচরণ স্বরাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন দফতরের দায়িত্বে ছিলেন। ‘নিপীড়ণমূলক’ নানা কেন্দ্রীয় নীতি রূপায়ণ করেছেন তিনি।  বিবৃতির দীর্ঘ অংশ জুড়ে রয়েছে মহেন্দ্র কর্মার পারিবারিক ইতিহাস ও তাঁর ‘জনবিরোধী’ নানা কাজের খতিয়ান।  মাওবাদীরা দাবি করেছে, বস্তারের মানুষ দীর্ঘ দিন ধরেই ‘পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি’-র (পি এল জি এ) কাছে মহেন্দ্রকে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছিলেন।  কিন্তু এর আগে কয়েকবার ‘সামান্য ভুল’ আর অন্য কারণের জন্য তিনি বেঁচে গিয়েছেন।
মাওবাদীদের বিবৃতিতে স্পষ্ট, তারা ‘জনবিরোধী’ কাজের নিরিখে ছত্তীসগঢ়ে বিরোধী দল কংগ্রেস এবং শাসক দল বিজেপি-কে একাসনে বসাতে চায়।  তারা দাবি করেছে, ছত্তীসগঢ়ে বিপ্লবী আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে দু’টি দলের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

সিপিআই(মাওবাদী)-র অডিও বিবৃতিটি শুনুন –


ভারতঃ ২০১৫ সালে বস্তার ও বিহারে নকশাল সহিংসতার পরিসংখ্যান

back2.tif

২০১৫ সালে  ছত্তিসগড়ের বস্তার অঞ্চলে মাওবাদীদের আক্রমণে নিরাপত্তা বাহিনীর ৪৭ জন সদস্য নিহত হয়েছে, গুরুতর জখম হয়েছে ১১৫ জন, ৪৭ জন ব্যক্তিকে পুলিশের চর অভিযোগে খতম করেছে মাওবাদীরা। কথিত মাওবাদী নামে আত্মসমর্পণ করেছে ৩২৭জন! পক্ষান্তরে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন ৪৬ জন মাওবাদী, উদ্ধার করা হয়েছে  একটি একে -47, একটি SLR, একটি 303 বন্দুক এবং চারটি 9 মিমি পিস্তল সহ ১৬৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়- ছত্তিসগড় পুলিশের মাওবাদী দমন ইউনিট (Anti-Naxal Operation (ANO) unit) গত বুধবার এই পরিসংখ্যানটি প্রকাশ করেছে।

অপরদিকে বিহারে ২০১৫ সালে ৫২৭ জন মাওবাদীকে গ্রেফতার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। যদিও ২০১৫ ও ২০১৪ সালে মাওবাদীদের কোন প্রশিক্ষণ শিবির ধ্বংস করতে পারেনি নিরাপত্তা বাহিনী। এখানে গত কয়েক বছর ধরে বেশ কয়েকটি গ্রামে ” প্রতিষ্ঠা করেছে মাওবাদীরা।  ২৩টি মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় ৮৫টি নতুন থানা স্থাপন করেছে বিহার সরকার, এর মধ্যে নির্মাণাধীন ৪৩টি থানার কাজ ২০১৬ সালের মার্চের মধ্যে শেষ হবে বলে সুত্র জানাচ্ছে। এ ছাড়াও রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে সবচেয়ে বেশী মাওবাদী অধ্যুষিত ৬টি জেলায় আরো ৪০টি নতুন থানার অনুমোদন চেয়েছে।

অনুবাদ সূত্রঃ 

http://www.thehindu.com/news/national/other-states/140-people-killed-in-bastar-naxal-violence-in-2015/article8103681.ece

http://timesofindia.indiatimes.com/city/patna/527-Maoists-arrested-in-2015-in-Bihar/articleshow/50568562.cms


অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (শেষ পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

শেষ পর্ব:

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

naxal-45

পুলিশরা আদিবাসীদেরকে অত্যাচার করে বলে মাওবাদীরা অভিযোগ করে; পুলিশ এবং মাওবাদীদের মধ্যে তফাৎ কী জানতে চাইলে জয়লাল সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকাল, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলঃ “হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। এটা খারাপ”। তারপরই বলল, “এবিষয়ে হয়তো সিনিয়র নেতারা সিদ্ধান্ত নেবেন”।

বরাবর তর্কপ্রবণ হলেও তাদের মতাদর্শের ভিতরে যে ফাঁক আছে সেটা গেরিলারা অস্বীকার করে না। ওরা যখন বলে, “সব ধরনের সম্পত্তিই খারাপ, কাজের বিনিময়ে অর্থ মানুষকে খারাপ বানিয়ে ফেলে”, তখন আমি ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি বেতন পাই। আমি যদি আরো বেশি কাজ করি তাহলে বাড়তি অর্থ পাই। আপনাদের কি মনে হয় আমি খারাপ লোক? মাও যা বলেছেন তার সবকিছুই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে কেন?” ওরা বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে”।

চোখের সামনে যখন বিপ্লবের দেখা মিলছে না, এ অবস্থায় ওরা মৃত্যু ভয়কে কীভাবে জয় করে? নিজেদের ভূমি রক্ষা করা এবং ‘ইতিহাসে নাম লেখানোর’  আকাংক্ষাই তাদের মৃত্যুভয়কে জয় করতে সাহায্য করে।

নরেশ বলল, “গ্রামের কেউ যখন মারা যায়, তাকে শুধু স্থানীয় গ্রামবাসীরাই মনে রাখে। আমি যদি মারা যাই, পার্টি আমাকে নিয়ে পুস্তিকা লিখবে”।

ab2

মজার ব্যাপার হল সবার মৃত্যু সমান নয়। কয়েক বছর আগে বন্দুকযুদ্ধে কমরেড মঙ্গল নিহত হয়। মাওবাদীরা তার স্মরণে বালি বেরা গ্রামের বাইরে একটা স্মৃতিফলক নির্মাণ করে কিন্তু গ্রামবাসীরা ফলক থেকে তার নাম মুছে ফেলেছে।

মঙ্গলের বোন সিমরি কাছেই থাকেন; বললেন, “মঙ্গল যে এখানে থাকত পুলিশ সেটা জেনে যেতে পারে এই ভয়ে ওরা নামটা মুছে ফেলেছে”।

কোন এক দুর্বল মুহূর্তে ওরা প্রকাশ করল যে ওদের ভাগ্য মঙ্গলের থেকে কিছু আলাদা হবে না। পার্টির পুস্তিকাই যথেষ্ট না আর গ্রামবাসীরা ধীরে ধীরে শহরে চলে যাবে কিন্তু ওদের ফেরার কোন উপায় নেই। ওরা স্বীকার করে যে ওদের জীবদ্দশায় বিপ্লব সম্ভব না কিন্তু এই সংগ্রাম ছাড়া আর কোন বিকল্প দেখতে পায় না ওরা। একজন বলল, ” এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। আমি মারা যাব কিন্তু বিপ্লব ঘটবে”।

বাইরের পৃথিবী ওদের মতাদর্শ থেকে একেবারেই ভিন্ন ধারার মনে হয়। পার্টির সাথে এক দশক ধরে যে সব ক্যাডাররা আছে তারা ‘দীর্ঘকালীন লড়াইয়ের তাৎপর্য ও নয়া সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্বায়নের বিপদ’ সম্পর্কে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ চালাতে পারে; তারা এক রাতে বসে চিন্তা করছিল নয়া সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা কোথায়। ভাত আর পেঁপে দিয়ে রাতের খাবার সেরে আগুনের ধারে বসে এক মহিলা জানতে চাইলেন, “আমেরিকা কোথায়”?

যখন বলা হল ওরা এই গ্রহের যেখানে বসে আছে আমেরিকা ঠিক তার বিপরীতে, তখন মহিলাটি এবং তার সাথে অন্যান্যরাও ভীষণ অবাক হল।

গোন্ডি আদিবাসীদের একটা বড় অংশ পার্টিতে যোগদানের পর কখনো অরণ্য এলাকার বাইরে পা রাখেনি; ওরা কখনো বিদ্যুৎ দেখেনি, ফোনের সিগনাল কিংবা গাড়ি দেখেনি।

একজন ক্যাডার জানতে চাইল, “শহরে শুনেছি ফ্যান বলে একটা জিনিস আছে। এটা কিভাবে চলে”?

আরেকজন বিশ্বাসই করতে চায় না যে শহরে লোকেরা গ্যাসের চুলায় রান্না করে, লাকড়ির দরকার হয় না।

অন্য আরেকজন জানতে চায়, “Raipur kitna bada hai? Kitne ghar hain wahan? Gaadiyan? (রায়পুর কত বড়? কতগুলো ঘরবাড়ি ওখানে? কতগুলো গাড়ি?)”

ওরা জানে যে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই ওদের মৃত্যু হবে। অল্প বয়স্ক একজন বলল, “এখান থেকে বের হবার সাথে সাথেই আমাকে মেরে ফেলবে। বিপ্লবের পরেই শুধু আমরা বের হতে পারব”।

এক সন্ধ্যায়, একটা ছেলে ক্যাম্পে যোগ দিল, বয়স ১৫ বছরের বেশি হবে না।

সে নারায়ণপুর হোস্টেলে থেকে ক্লাস এইটে পড়ত; দিওয়ালি কাটাতে নিজ গ্রাম অবুঝমাদে এসেছে।

ওর বাবা ফসল কাটার জন্য ওকে থাকতে বলেছে, এরপর বড়দিনের ছুটি, তারপর আরো কয়েক মাস থেকে যেতে বলেছে। মাওবাদীরা ওর গ্রামে গিয়ে ওকে দলে ভেড়ানোর জন্য নিয়ে আসল।

এই এলাকার সবচেয়ে শিক্ষিত এই ছেলেটা; বাড়ি ফেরার জন্য সে অস্থির হয়ে উঠেছে কিন্তু ফিরতে পারছে না। ওকে বিপ্লবী রাজনীতি, মতাদর্শ ও কিছু কিছু যুদ্ধের অনুশীলনও শেখানো হচ্ছে। মনে হচ্ছে না যে সে আর কখনো তার পড়াশোনায় ফিরতে পারবে। আর যদি ফিরেও তাহলেও গেরিলা জীবনের দিনগুলো ওর অনুভূতিপ্রবণ মনকে সারা জীবন তাড়া করে ফিরবে।

ab

এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বস্তারের আদিবাসীর যা তার মৌলিক ডিএনএ কেই বদলে দিয়েছে। অরণ্যবাসী মুক্ত স্বাধীন আদিবাসী আজ সবকিছু নিয়েই সন্দিহান। পুলিশ, সাংবাদিক ও মাওবাদী- সবার জন্যই তথ্য সংগ্রহের প্রথম উৎস সে। এদের সবার মাঝখানে পড়ে তার জীবন একটা ছুরির ডগায় ঝুলছে। আর তাই সে শিখে নিয়েছে কী করে উভয় ক্যাম্পেই ছলচাতুরি করে চলতে হয়। পুলিশ ও মাওবাদী উভয়েই এটা জানে কিন্তু এটা মানতে তাদের দ্বিধা রয়েছে যে তাদের অধিকাংশ এ্যামবুশই এই আদিবাসীর বিশ্বাসঘাতকতার উপর নির্ভরশীল; হতে পারে এই আদিবাসী একজন পঞ্চায়েত প্রধান কিংবা কোন স্কুল শিক্ষক।

মাওবাদীরা আদিবাসীদেরকে বনরক্ষী ও পাটওয়ারীদের (ভূমি রাজস্ব আদায়কারী) জুলুম থেকে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানিয়েছে, ইতিহাস ও মতাদর্শের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। অরণ্যের ভিন্ন এক মহাবিশ্বে বিচরণকারী ব্যক্তিটির জীবনে ক্লাসিক্যাল মার্কসবাদী চেতনার প্রবেশ ঘটায় নিজের ভেতরে হঠাৎ ‘বিপ্লবের ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ অনুভব করল সে। নিজের পরিবার, ঈশ্বর ও ঘোটুল (গণ বাসস্থান) ত্যাগ করে ‘ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেতে’ সে যুক্ত হয়ে গেল এই সংগ্রামে।

শিল্প কারখানা ও সালওয়া জুডুম এর ফলে আদিবাসীদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ বিষয়ে দিস্তা দিস্তা লেখা হয়েছে কিন্তু মাওবাদীদের সাথে যোগদানের পর বস্তারের কী পরিমাণ আদিবাসীদের নির্মূল করা হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। মোটে দুইটা পাহাড় পরেই একজন ক্যাডারের পরিবার বাস করে কিন্তু সে দুই বছরে একবার মাত্র তাদের কাছে যেতে পারে খুব গোপনে।

আমি মাওবাদীদের জিজ্ঞাসা করলাম ছেলেটা চাইছে না তারপরেও কেন ওকে ওরা সাথে নিতে চাইছে। ওরা বলল, ও আমাদের সাথে থাকতে চায়। ছেলেটা বলল ভিন্ন কথা। সে যে এখানে আছে একথা যদি প্রকাশ হয় তাহলে তার স্কুলে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে; এটা ভেবে সে উদ্বিগ্ন। পুলিশ ওকে হয়রানি করবে। ওকে হয়তো গুপ্তচর হতে বাধ্য করা হবে আর সে বিশ্বাসঘাতকতার পথে পা বাড়াতে বাধ্য হবে। বস্তারের পুলিশ ব্যারাক আর গ্রামগুলোতে এই ধরনের গুপ্তচরের অভাব নেই। বিশ্বাসঘাতকতা এখন আদিবাসীদের টিকে থাকার পূর্বশর্ত। প্রতিটি স্থানে, একজন আদিবাসীর মৃত্যু হয় আর একজন গুপ্তচরের জন্ম হয়। রূপান্তর ঘটতে এখনো অনেক বাকি।

(সমাপ্ত)

প্রথম প্রকাশ– ৩ মে, ২০১৫

সূত্রঃ

http://indianexpress.com/article/india/india-others/days-and-nights-in-the-forest-23-days-with-the-maoists-in-chhattisgharh/