সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৩য় পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবারবুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(তৃতীয় পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি ও PLGA এর একত্রীকরণের পর PLGA এর উন্নয়ন ও গেরিলা যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমরা একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গতি হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গণপতিঃ আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক। এই কারণে গত দশকে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এবং এখানে গতি হ্রাস পাওয়ার যে পর্যবেক্ষণ করেছেন সেটিও সঠিক যেহেতু ২০১১ সাল থেকে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি পরিস্থিতির একটি সার সংক্ষেপ করে এবং যাচাই করে দেখা যায় যে আমাদের আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে। গত দশ বছরে অগ্রগতির পথটা বন্ধুর ছিল এবং আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোন পরবর্তীতে দুবল হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে ঠিক তেমনি কেবল বিভিন্ন গেরিলা জোনগুলোই নয় বরং সারা দেশের বিপ্লবী আন্দোলন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি আইন। নিঃসন্দেহে, আমাদের মানসিক শক্তি গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটায়, এবিষয়ে কোন মতবিরোধ থাকার কথা নয়।

অবশ্য, ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন গেরিলা জোনে গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটেছে। একইভাবে, গেরিলা যুদ্ধের উত্থান পতনের ক্ষেত্রেও এই অবস্থাগুলো একটি ভিত্তি গঠন করে। এই বিষয়টা উপেক্ষা করলে আমাদের চলবে না। ২০১১ সাল থেকে বেশ কিছু রাজ্যের/গেরিলা জোনের মিলিটারি ফ্রন্টে গণ সংগ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে ও আন্দোলন প্রসারের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। এই সময়কালে বিপ্লবী গণ কমিটিগুলোকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে পার্টিকে সংহত করার মাধ্যমে কিছু গেরিলা জোনে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটেছিল। তারপরেও আমরা মন্দার মুখোমুখি হয়েছি। পার্টি এই মন্দার কারণগুলো চিহ্নিত করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমগ্র পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে তুলেছে এবং এটিকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা উচিৎ।

অপারেশন গ্রিন হান্টের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে এবং মোদি নেতৃত্বাধীন NDA সরকার ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ সব কিছুই প্রচণ্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে এবং পাল্টা লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে করতে হয়েছিল। জল, জঙ্গল, ভূমি, ইজ্জত ও অধিকারের জন্য সংগ্রামরত মানুষের সমর্থনে ও অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে সমাজের যে সকল গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ তীব্রভাবে সোচ্চার হয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে পার্টি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানায়। জনগণের লড়াকু শক্তিকে টেকসই করতে এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৯ সালের মধ্যভাগ থেকে এই বিপ্লব বিরোধী যুদ্ধের পাল্টা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বিপ্লবী বাহিনী ও বিপ্লব বিরোধী বাহিনীর শক্তির ফারাকটা ছিল বিশাল। শত্রুর প্লাটুন পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কোম্পানি পর্যায়ে গেরিলা বাহিনীকে মোতায়েন করা হত। ব্যাটেলিয়ন পর্যায়ে গেরিলা বাহিনী শত্রুর কোম্পানি পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে, শত্রুরা প্রতিটি গেরিলা জোনে হাজার হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ বাহিনী মোতায়েন করল। সুতরাং, বিপক্ষ বাহিনীর সাথে শক্তির ফারাকের দরুণ আমাদের গেরিলা যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে নতুন কিছু প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হল। আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্যই যে কেবল শত্রুরা এত বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করল তা নয়, বরং একই সাথে এই দশকে ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় এবং প্রায় সব গেরিলা জোনেই যে গুরুত্বপূর্ণ গণ আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলোকে দমন করার জন্যেও এই বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এভাবে, এই অধঃপতিত ব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে মাওবাদী আন্দোলন প্রকাশিত হল। আমাদের গতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে তাকে কেবল শত্রুর দমন নিধনের ফলাফল হিসেবে দেখলে হবে না পাশাপাশি একে আমাদের নিজেদের দুর্বলতার বিপর্যয় হিসেবেও দেখতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমরা আমাদের ভুলগুলো ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছি এবং পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোর বলশেভিকীকরণের কাজ হাতে নিয়েছি।

একই সাথে, এই পরিস্থিতির পিছনে যে বাহ্যিক শর্তগুলো কাজ করেছে সেগুলোও আমাদেরকে দেখতে হবে। আগের ধাপে শত্রুর আক্রমণের পাল্টা মোকাবেলা হিসেবে আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলাম যেগুলো কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় শত্রুরা এই কৌশলগুলোর পাল্টা কিছু কৌশল গ্রহণ করে। ফলে নতুন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সুতরাং, আমাদেরকে আবারো কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হবে যেগুলো গেরিলা যুদ্ধে শত্রুর সর্বোচ্চ বাহিনীকে মোকাবেলা করতে আমাদেরকে সাহায্য করবে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। গেরিলা যুদ্ধ গড়ে তোলা ও অগ্রগতি ঘটানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল আমাদের গণভিত্তিকে মজবুত করা। আন্দোলনের উত্থান ও পতনের যে প্রক্রিয়া সেটি নতুন নতুন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটি বোঝার ক্ষেত্রে এবং পার্টি, PLGA ও জনগণকে এর জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পার্টির দিক থেকে কিছু গুরুতর ভুল হয়েছে। নতুন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে পার্টির ত্রুটির কারণে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে একটি শক্তিশালী শত্রুর সাথে লড়াইয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থার অবনতি ঘটেই থাকে।

এই কারণে মাও বলেছিলেন জয়-পরাজয়-জয়-পরাজয় ও সবশেষে জয় এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এগিয়ে যাবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ সবসময় একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও আংশিক সাফল্য ও কিছু বড় ধরনের সাফল্য ও অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে কিছু ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ও আংশিক ক্ষতি, পরাজয় ও কিছু বড় ধরনের ক্ষতি ও পশ্চাদপসরণ থাকে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি নিয়ম যে এটি আঁকাবাঁকা ভাবে চলে। কাজেই গেরিলা যুদ্ধের গতি হ্রাস হবার ঘটনাকে আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণ করার অর্থ এটাই দাঁড়ায়। আমাদের দেশের বিভিন্ন অংশে আন্দোলন যে বন্ধুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে সেটিকে মাথায় রেখে আমাদের কাজের স্থানগুলোর বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন অনুযায়ী আমাদেরকে হয় আত্মরক্ষার কৌশল অথবা আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুদ্ধের সামগ্রিক পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একে বিবেচনা করতে হবে।

শুধু বিভিন্ন অংশেই নয়, একটি গেরিলা জোনের ভিতরেও সেই নির্দিষ্ট গেরিলা জোনটির বিশেষত্ব অনুযায়ী আমাদেরকে আক্রমণাত্মক কিংবা আত্মরক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কিছু এলাকায় যদি অবস্থা একটু ভালও হয়, তাহলেও সামগ্রিকভাবে যে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদের করতে হচ্ছে তাকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। এবং আমরা সকলে জানি যে আত্মরক্ষার মধ্যে সবসময় আক্রমণ নিহিত থাকে এবং আক্রমণাত্মক না হয়ে কোন আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, সকল পর্যায়ের নেতৃত্বকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের পার্টিতে যে দুইটি বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে তা হল-

১। শত্রুর আপাত শক্তিমত্তা ও তীব্রতার প্রতি দৃষ্টি আরোপ করা এবং তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত না করা; নিজেদের শক্তিমত্তা, সুবিধা ও বিপ্লবী যুদ্ধে জনগণের প্রভাবশালী ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আরোপ না করা; শত্রুর বৃহৎ কৌশলকে না বুঝে কেবল শত্রুর ক্ষুদ্র কৌশলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা। এর ফলে কমরেডগণ আত্মরক্ষার নামে কাজ করার উদ্যম হারিয়ে ফেলে অক্রিয় হয়ে পড়বে এবং শেষে লড়াকু শক্তি হারিয়ে ফেলবে। এটি হল ডান বিচ্যুতি।

২। গেরিলা যুদ্ধে লড়াইয়ের দিকগুলোতে যে পরিবর্তন ঘটেছে তাকে না বোঝা এবং আত্মরক্ষা তথা নেতৃত্বকে রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার দুর্বলতা, জনগণের অক্রিয়তাকে বিবেচনায় না রেখে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করা। তারা শত্রুকে ক্ষুদ্র কৌশলগত দিক থেকে দেখে না, তারা শত্রুকে কেবল বৃহৎ কৌশল দ্বারা যাচাই করে। এটি একটি বাম বিচ্যুতি।

কাজেই, আমাদের গেরিলা যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি করতে হলে দেশের সামগ্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে সেগুলো জানার পাশাপাশি বিপ্লবী যুদ্ধে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো জানতে হবে এবং শত্রুর ও নিজেদের শক্তিমত্তার ও দুর্বলতার জায়গাগুলো জানতে হবে। এটি একটি অন্যতম প্রধান বিষয় যেটি আমরা বলশেভিকীকরণের মধ্য দিয়ে অর্জন করার চেষ্টা করছি। জয়লাভ করতে হলে গণভিত্তি বৃদ্ধি করা, জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা চালানো, গেরিলা যুদ্ধ ও গণযুদ্ধের সমস্ত কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় ভূমিকা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরী। কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিটি ও সকল পরিচালনা কমিটি বর্তমানে এই বিষয়টিকে বুঝে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে।

(চলবে)  


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (২য় পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-kA7G-621x414@LiveMint

(দ্বিতীয় পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ বর্তমান সময়ে পার্টি কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে? সেগুলো অতিক্রম করার কী কী সুযোগ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ বর্তমান সময়ে আমাদের আন্দোলন যে সব প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো উল্লেখ করছি। প্রথমত, আমাদের নেতৃত্বকে বিশেষ করে পার্টির কৌশলগত নেতৃত্বকে রক্ষা করা। নতুন পার্টি গঠনের পর কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ের পার্টি কমিটি পর্যন্ত সকল স্তরের অনেক নেতাকে আমরা হারিয়েছি। নেতৃত্বকে রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমাদেরকে কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই গোপন ও যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, ভুলগুলো সংশোধন করতে হবে, অনুশীলন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে, নতুন নেতৃত্বকে প্রস্তুত করতে হবে এবং বিপ্লবের সাফল্যের শর্ত হিসেবে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় একটি শক্তিশালী পার্টির প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সমগ্র পার্টির ভেতরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে ও শহর এলাকায় বিপ্লবী আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পার্টি যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এটি তার একটি কারণ। যে সমস্ত এলাকায় আমাদের পার্টি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করেছে কিন্তু পর্যায়ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে সে সমস্ত এলাকায় আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করা ও বিস্তৃত করা আমাদের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ। একইভাবে, নতুন এলাকাতেও আন্দোলন সম্প্রসারিত করতে হবে এবং গণযুদ্ধের ক্ষেত্রকে বর্ধিত করার লক্ষ্যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। এই আন্দোলনের অভিজ্ঞতার আলোকে অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করে বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য ক্রমবর্ধমান অনুকূল অবস্থাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। এভাবে আমরা অবশ্যই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

তৃতীয়ত, কেউ কেউ বলছেন ভারতের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে ভারত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এগুলো বলে বিপ্লবী ক্যাম্পে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে এধরনের ভুল দৃষ্টিভঙ্গিও তারা সামনে নিয়ে আসছেন। কিন্তু ভারতের মতো একটি আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্রে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধই একমাত্র সঠিক বিপ্লবী উপায় হিসেবে অনুশীলনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং, এ জাতীয় ভ্রান্ত ধারণার বিপক্ষে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং এগুলো প্রকাশ করতে হবে। একই সাথে আমাদেরকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলো গভীর ভাবে জানতে হবে ও সে অনুযায়ী আমাদের যুদ্ধ কৌশলে যথোচিত পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে।

চতুর্থত, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিবাদী শক্তি এখন কেন্দ্রের ক্ষমতায় এসেছে যারা সামন্তবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির দৃঢ় প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া দালালদের মদদপুষ্ট মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে আর তার সাথে বিভিন্ন স্থানে যুক্ত হয়েছে সঙ্ঘ পরিবার (The Sangh Parivar) উদ্ভাবিত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ।

ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি বিদেশী ও দেশীয় বড় বড় পুঁজিবাদী ভূস্বামীদের লোভ মেটাতে বিপজ্জনক গতিতে সাম্রাজ্যবাদপন্থী, দেশ বিক্রির নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে আরম্ভ করেছে এবং সেই সাথে হিন্দু ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বিভিন্ন রূপে এগিয়ে নিতে চাইছে। সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক শক্তিকে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন পথ দেখাবে। সংগ্রামের এই যুদ্ধক্ষেত্রে সমাজের আরো অনেক নতুন শ্রেণী, সামাজিক গোষ্ঠী থেকে জনগণ আসবে এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন নতুন সুযোগ তৈরী হবে।

পঞ্চমত, বিশ্বের বাস্তব পরিস্থিতি বিপ্লবের পক্ষে আরো বেশী অনুকূল হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব অর্থনীতি এখনো তীব্র সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং বিশ্বের সমস্ত মৌলিক অসঙ্গতিগুলো শাণিত হচ্ছে। ফলে, সাম্রাজ্যবাদ ও এর গৃহপালিত সমর্থকদের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবী জুড়ে বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় মুক্তি বাহিনীগুলো শক্তি লাভ করছে। মাওবাদী বাহিনীগুলোও শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিগুলোর আর কোন অস্তিত্ব নেই এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মানসিক শক্তি খুবই দুর্বল। এটিও আমাদের সামনে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

(চলবে)

 


সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (১ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছেলাল সংবাদ‘।

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার  বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে

c

comrades-kA7G-621x414@LiveMint

(প্রথম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

 

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন- 

মাওবাদী তথ্য বুলেটিন: পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে MIB এর পক্ষ থেকে আপনাকে ও আমাদের সকল কমরেডদের জানাচ্ছি বিপ্লবী শুভেচ্ছা।

গণপতিঃ ধন্যবাদ। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে MIB এর সকল কমরেডদের প্রতি বিপ্লবী শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

মাওবাদী তথ্য বুলেটিন: গত দশ বছরে পার্টির কী কী উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ ১৯২৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Communist Party of India) গঠিত হবার পর থেকে আমাদের দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় পার করেছে। এর মধ্যে গত দশকটি অনন্য সাধারণ, কারণ এ দশকে নকশালবাড়ির পর থেকে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে পরিচালিত দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু অভিনব ও নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী গত দশক। এই দশকের তাৎপর্য্যপূর্ণ ঘটনাগুলো হল-

-ভারতে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য একটি একক গাইডিং সেন্টারের সূচনা করা। পার্টি, আর্মি ও যুক্তফ্রন্ট(United Front) বিপ্লবের এই তিনটি ম্যাজিক অস্ত্র আগের থেকে আরো বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠছে; রাজনৈতিক ও সামরিক লাইন, যুক্তফ্রন্টের নীতিমালা ও অন্যান্য নীতিমালাকে ঐক্যবদ্ধ পার্টির দলিলপত্র হিসেবে সমৃদ্ধকরণ।

-কংগ্রেসের দলিলপত্র, নীতিমালার কাগজপত্র, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সার-সংক্ষেপ, আর্টিকেল ইত্যাদির সমন্বয় সাধন করা; মিলিটারি লাইনের আরো উন্নয়ন সাধন, গেরিলা যুদ্ধকৌশলের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে জনগণের বিশাল অংশগ্রহণ ঘটেছে যা এই লড়াইতে সত্যিকারের গণযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছে ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে যার ফলে শত্রুর নৃশংসতম বিপ্লব বিরোধী দমন অভিযান পরাভূত হয়েছে। জল, জঙ্গল, ভূমি, সম্মান ও অধিকার বিষয়গুলোতে জনগণের বড় অংশ বিশেষ করে কৃষকদের অংশগ্রহণে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিপ্লবী গণ কমিটি (Revolutionary People’’s Committees- RPCs) আকারে কৌশলগত যুক্ত ফ্রন্ট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধি ও সুপরিকল্পিত যুক্তফ্রন্ট গঠনে নতুন ও অধিকতর ভালো অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। শাসক শ্রেণীর গণ বিরোধী, দেশ বিক্রিকারী উন্নয়ন মডেলের বিপরীতে বিপ্লবী গণ কমিটি (RPCs) কর্তৃক উন্নয়নের বিকল্প মডেল স্বীকৃতি পেয়েছে যেটি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।

বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগিতায় গোটা দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদী ভারতীয় সরকার পরিচালিত নজিরবিহীন বর্বর দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় বিপ্লব টিকে আছে এবং ভারত তথা গোটা বিশ্বের মানুষের মাঝে বিপ্লবের আশাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে ও গণযুদ্ধের স্বপক্ষে লড়াইরত বিপ্লবী গণমানুষের জন্য ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অর্জিত হয়েছে।

সিপিআই (মাওবাদী) ও সিপিআই (এম-এল) নকশালবাড়ির একটি একক পার্টিতে একীভূত হবার ঘটনা আমাদের দেশে প্রকৃত বিপ্লবীদের মাঝে ঐক্যবদ্ধকরণের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। ভারতের গণযুদ্ধ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে যাকে ঘিরে মাওবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ঐক্য, আন্তর্জাতিক সংহতি ও সমর্থন আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। মহান নকশালবাড়ির সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের ফলে সূচিত এবং আমাদের পার্টির মহান প্রতিষ্ঠাতা নেতা কমরেড চারু মজুমদার ও কানহাই চট্টোপাধ্যায় প্রণীত নতুন মতাদর্শ, নতুন রাজনীতি, নতুন লাইন, নতুন পার্টি, নতুন আর্মি ও নতুন গণ ফ্রন্টের উপর ভিত্তি করে গত দশকের এই নতুন ও তাৎপর্য্যপূর্ণ উন্নয়নগুলো সাধিত হয়েছে।

এক দিকে শত্রুর নিরন্তর বর্বরোচিত দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে পাল্টা লড়াই চালিয়ে ও অন্যদিকে আন্দোলনের বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে পার্টির ভেতরে গজিয়ে উঠা ডান ও ‘বাম’ সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে তিক্ত সংগ্রাম চালিয়ে গত দশকের সকল উন্নয়নগুলো অর্জিত হয়েছে। ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য কমিউনিস্ট ও সাধারণ মানুষ উভয়ের গৌরবময় আত্মদান। তাদের আত্মদান ছাড়া গত দশকের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কোনটাই অর্জিত হত না। এই আত্মদানগুলোর মধ্য দিয়ে পার্টি একটি বিকল্প ধারার চিন্তা ও সংস্কৃতিকে সামনে তুলে এনেছে যেটি সর্বোচ্চ মানবীয় মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এ ধারা, শাসক শ্রেণী কর্তৃক জনসাধারণের মাঝে ধীরে ধীরে নষ্ট, অধঃপতিত ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ও সংস্কৃতির ধারা প্রবেশ করানোর যে প্রক্রিয়া, তার বিরোধী। এভাবে, এই আত্মদানগুলো সমাজের নির্যাতিত শ্রেণীকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য লড়াই করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

(চলবে)


জার্মানিতে গণযুদ্ধের জন্য সমর্থন

1

2

3

4

5

বার্লিন, হামবুর্গ এবং কলনের রাস্তায় আন্দোলন

বার্লিন, হামবুর্গ এবং কলনের রাস্তায় আন্দোলন

 

বার্লিনে সংহতি ইভেন্ট

বার্লিনে সংহতি ইভেন্ট