এক বিকলাঙ্গ ভারতীয় অধ্যাপকের ‘দেশবিরোধী যুদ্ধ’!

শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ তিনি। একটি হুইল চেয়ার তার নিত্য সঙ্গী। ভুগছেন জটিল হৃদরোগে। স্নান-খাওয়া থেকে শুরু করে শরীর-হাত-পা পরিষ্কার, সবকিছুই করতে হয় অন্যের সহায়তা নিয়ে। এমনকী, বাথরুমে যাওয়ার জন্যও কারও না কারও সাহায্য লাগে তার। সেই মানুষটিই কিনা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে!

এটি ৪৯ বছর বয়স্ক এক ভারতীয় অধ্যাপকের আখ্যান। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন তিনি। মঙ্গলবার নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকা ও জাতীয়তাবিরোধী কার্যকলাপে ইন্ধন জোগানোর অপরাধে আরও ৫ জনের সঙ্গে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিএন সাইবাবারও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারপতি সুরাকান্ত সিন্ধে তাদের বিরুদ্ধে মাওবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানান। তিনি ভারতবিরোধী যুদ্ধে রত বলেও রায় দেয় ভারতীয় আদালত। কেবল বিচারিক সাজা নয়, অধ্যাপক সাইবাবা রোষানলে পড়েছেন নিজের কর্মপ্রতিষ্ঠানেও। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাম লাল আনন্দ কলেজের অধ্যাপক সাইবাবার বেতন অর্ধেক করে দেন কলেজ-কর্তৃপক্ষ। ওই কলেজ-চত্বরে কয়েকবার লাঞ্ছনারও শিকার হন তিনি।

তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। তার পক্ষে অনলাইন  প্রচারণা শুরু করেছে তারা। সোচ্চার হয়েছেন বুকারজয়ী নন্দিত ভারতীয় লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট অরুন্ধতী রায়ও। গত বছর মে মাসে ওই শিক্ষকের মুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্রীয় রোষানলে পড়ার কথা জানিয়েছিলেন ন্যায় ও সমতার পক্ষের বলিষ্ঠ এই কণ্ঠস্বর।

হুইলচেয়ার-বন্দি  এই  অধ্যাপক সাইবাবাকে ২০১৪-র মে মাসে গ্রেফতার করা হয়। স্নান, খাওয়াদাওয়া, গা, হাত-পা পরিষ্কার করা, এমনকী, বাথরুমে যাওয়ার জন্যেও কারও না কারও সাহায্য লাগে অধ্যাপক সাইবাবার। জেলে থাকার সময় দেহরক্ষীরা যে ভাবে তাঁকে টানাহেঁচড়া করেছেন, তাতে ঘাড় থেকে তাঁর বাঁ কাঁধ পর্যন্ত স্নায়ু ছিঁড়ে যায়। অসাড় হয়ে যায় তাঁর বাঁ হাতটি। তাঁর ১৪ মাসের জেল-জীবনে বেশ কয়েক বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। জেলে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে জানালে গত বছরের জুনে তাঁর জামিন মঞ্জুর করে সুপ্রিম কোর্ট।

রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারপতি সুরাকান্ত সিন্ধে সাইবাবার বিরুদ্ধে মাওবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানান। অভিযুক্তরা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। একই অভিযোগে আরও ৫ জনের যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন হেম মিশ্র নামে নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। প্রশান্ত রাহি নামের একজন প্রাক্তন সাংবাদিকও রয়েছেন সাজাপ্রাপ্তদের তালিকায়। আদালত জানায়, দেশদ্রোহের অভিযোগে ইউএপিএ-র ১৩, ১৮, ২০, ৩৮ এবং ৩৯ নম্বর ধারায় সাজা হয়েছে সাইবাবা এবং তাঁর সহযোগীদের।

ভারাতীয় নিরাপত্তা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মাওবাদী নথিপত্র, হার্ড ডিস্ক ও পেন ড্রাইভ উদ্ধার হওয়ায় ২০১৩-এ গ্রেফতার হন হেম ও প্রশান্ত। সেই সূত্র ধরেই পরের বছর মে মাসে দিল্লি থেকে গ্রেফতার করা হয় দিল্লি ইউনিভার্সিটির রামলাল আনন্দ কলেজের অধ্যাপক সাইবাবাকে। যদিও পরে শারীরিক কারণে জামিন পেয়ে যান ওই অধ্যাপক।

অধ্যাপক সাইবাবার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাঁরা আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে বোম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চে আপিল করবেন।

সূত্র: এনডিটিভি, আউটলুক, ফার্স্ট পোস্ট, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বাংলা ট্রিবিউন


‘মাওবাদী সহানুভূতিশীল’ সাইবাবার স্থানান্তর ঝুঁকিপূর্ণঃ মহারাষ্ট্র সরকার

freesaibabaredstar

দেবেন্দ্র ফডনবিশ সরকার হুইলচেয়ারে আবদ্ধ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কথিত মাওবাদী সহানুভূতিশীল সাইবাবার  নাগপুর জেল থেকে গাদচিরোলিতে জেলায় স্থানান্তরের বিষয়ে বিরোধিতা করেছে, সরকারের ধারণা মাওবাদী অধ্যুষিত এই এলাকার মাওবাদীরা সাইবাবাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি সাইবাবার নির্জন কারাবাসের বিষয়ে মহারাষ্ট্র সরকারকে সাইবাবার জন্যে গাদচিরোলিতে বিকল্প আবাসনের কথা বলেন, কারণ নিষিদ্ধ নকশাল সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি মামলা সেখানে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

২০১৪ সালের মে মাসে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে গ্রেফতার হওয়া অধ্যাপক সাইবাবা নাগপুর জেলেই বন্দী আছেন। গাদচিরোলিতে তার মামলার কার্যক্রম জন্যে প্রতিবার তাঁকে ১৭০কিমি ভ্রমন করতে হয়।

শীর্ষ আদালতের আগে দেয়া এক হলফনামায় মহারাষ্ট্রের সরকার বলছে, ‘তাদের কাছে গোয়েন্দা তত্থ্য রয়েছে যে মাওবাদীরা সাইবাবাকে মুক্ত করতে একটি প্রচারণা শুরু করেছে। সাইবাবাকে যদি গাদচিরোলিতে কারাগারের বাইরে রাখা হয়, তবে মাওবাদীরা তাঁকে মুক্ত করতে পুলিশের উপর হামলা করতে পারে।’

এটা একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রেস নোটে উল্লেখ করা হয় যে সাইবাবার মুক্তির জন্য একটি দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি করতে ক্যাডারদের আহবান জানানো হয়।

একটি বেঞ্চ, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিশান্ত কাটনেসরকারকে বলেন, “আমরা চাই আপনারা(রাজ্য সরকার) তাঁকে আরামদায়ক অবস্থানে রাখবেন, আমাদের বলুন আপনারা তাকে কিভাবে স্বস্তিপূর্ণ রাখবেন, আপনারা তাঁকে নির্জন কারাবাসে রাখতে পারেননা।”

অনুবাদ সূত্রঃ hindustantimes