৫০ বছর পরঃ কঙ্গোতে কমরেড চে গুয়েভারার ব্যর্থ বিপ্লবের গল্প

৫০ বছর আগে কঙ্গোতে ‘বিপ্লবী যুদ্ধের’ ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তার দিনলিপিতে মার্কসবাদী গেরিলা নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারা “এটি একটি ব্যর্থতার গল্প” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

১৯৬৫ সালের ২৪শে এপ্রিল এখনকার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর বিদ্রোহীদের সাথে যোগদান করতে চে আফ্রিকার কিউবার একদল যোদ্ধার সাথে গোপনে উপস্থিত হন।

তাদের লক্ষ্য ছিল আফ্রিকার কেন্দ্রবিন্দুকে নয়াঔপনিবেশিকতা ও ‘ইয়াংকি সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে প্রাচীর হিসেবে দাঁড় করানো।

কিউবার কমিউনিস্ট নেতা ওয়াশিংটনের চিরশত্রু ফিদেল কাস্ত্রো তাদেরকে সেখানে পাঠান। তারা তানজানিয়ার টাঙ্গানিকা হ্রদ পার হয়ে কপমগোর পূর্বাঞ্চলে নেমে হ্রদ তীরবর্তী বারাকা শহরেরর দিকে অগ্রসর হন।

1

কিউবান-আর্জেন্টাইন গেরিলা নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারাকে চিনতে পেরে কঙ্গোর আন্দ্রে শিন্দানোর মুখে হাসি । চে গুয়েভারার সাথে তার যখন দেখা হয় তখন তিনি ছিলেন ছোট বালক।

পূর্বাঞ্চলীয় পর্বতের বিদ্রোহীদের প্রাক্তন প্রধানের ছেলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার প্রধান পার্টির স্থানীয় শাখার নেতা আন্দ্রে শিবুন্দা চে কে স্মরণ করে বলেন “তিনি একজন বন্ধু হয়ে ও বিপ্লবকে ভালোবেসে এখানে এসেছিলেন”।

দক্ষিণ কিভু প্রদেশে সিম্বা (সোয়াহিলি ভাষায় ‘সিংহ’) বিদ্রোহীদের সাথে চে এর সাত মাস ব্যাপী এডভেঞ্চারের কথা বলতে গিয়ে শিবুন্দা বলেন আর্জেন্টিনায় জন্মগ্রহণকারী গেরিলা “আমাদের সাথে কিছুদিন জঙ্গলে কাটান কিন্তু তিনি দেখলেন যে আমাদের নেতাদের মধ্যে পরিপক্কতার অভাব রয়েছে আর তাই তিনি চলে যেতে মনস্থির করেন।”

2

গেরিলা নেতা চে গুয়েভারার ডায়েরি হাতে মেজর জেনারেল লুএনদেমা দুনিয়া

চে তার ‘আফ্রিকার স্বপ্নঃ কঙ্গোর বিপ্লবী যুদ্ধের ডায়েরি‘তে (The African Dream: The Diaries of the Revolutionary War in the Congo) লিখেছেন, “বারাকা শহরে এর অতীতের সমৃদ্ধশালী অবস্থার চিহ্ন চোখে পড়ে। সেখানে তুলা থেকে সুতা তৈরীর একটি কারখানাও ছিল, কিন্তু যুদ্ধ সবাইকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই সাথে ছোট কারখানাটিও বোমায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে”।

১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের কাছ থেকে দ্রুত স্বাধীনতা লাভের পাঁচ বছরের মধ্যে কঙ্গো পরপর কয়েকটি বিরোধে জড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে রয়েছে খনিজ সম্পদে পূর্ণ দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ কতঙ্গোর বিচ্ছিন্ন হবার ঘোষণা।

কঙ্গোর প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন কিন্তু ওয়াশিংটনে এক দুর্ভাগ্যজনক সফরের সময় তিনি নিজের ভাবমূর্তিকে ওয়াশিংটনের কাছে নিষ্প্রভ করে তোলেন।

এরপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সাহায্য চান যার ফলশ্রুতিতে তিনি শীতল যুদ্ধের এক প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন – যদিও এরপরেও তার বিভক্ত হয়ে যাওয়া দেশের অনেকের কাছেই তিনি শ্রদ্ধার আসনে ছিলেন–১৯৬১ সালের জানুয়ারী মাসে তিনি নিহত হন। তার হত্যাকাণ্ডের পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়টি এখনো বিতর্কিত।

3

গেরিলা নেতা চে গুয়েভারার সাথে সাক্ষাৎ করা কঙ্গোর নারী আন্না বিন্তি শাবানি

-‘সুসংগঠিত বিশৃংখলা‘-

কঙ্গোকে ওয়াশিংটনের প্রয়োজন ছিল। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যে এটম বোমাটি হিরোশিমায় ফেলেছিল সেটির ইউরেনিয়াম এসেছিল কঙ্গোর খনি থেকে।

এছাড়া কঙ্গো ছিল অস্ত্র শিল্পে ব্যবহৃত কোবাল্টের একটি অপরিহার্য উৎস্য যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য খনিজ সম্পদ ছিল সোভিয়েতের মাটিতে।

চে যখন এসে পৌঁছান, কঙ্গোর অপরিণত প্রজাতন্ত্র তখনো বিপর্যয়ের মধ্যে ছিল। কতঙ্গো প্রদেশ আবার ফিরে এসেছিল কিন্তু সিম্বারা যে বিদ্রোহ শুরু করেছিল তা আগের বছরে ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ বিদ্রোহে সিম্বারা লুমুম্বিস্টদের সাথে মাওবাদীদের যুক্ত করেছিল।

বিদ্রোহীরা দেশটির প্রায় এক তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছিল তবে কঙ্গোর মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের দুটি পকেটে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে তারা হেরে যায়- এমাসেই চে কঙ্গোতে এসে পৌঁছান।

চে বিদ্রোহী নেতা লরেন্ট-ডেজায়ার কাবিলা সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কাবিলা দেশের বাইরে সফরে ছিলেন। প্রাক্তন ফ্রেঞ্চ কঙ্গোর রাজধানী ব্রাজাভিলিতে কাবিলার সাথে কয়েক মাস আগে তার দেখা হয়েছিল।

কাবিলা যখন ৭ই জুলাই দেশে ফিরে আসেন তিনি মাত্র চারদিন থাকেন আর সেসময় দেশে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল যাকে চে বলেছেন ‘সুসংগঠিত বিশৃংখলা’।

4

টাঙ্গানুকা হ্রদ পেরোনোর সময় গেরিলা নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারা

চে লিখেছেন, “কঙ্গোর মানুষদের প্রধান সমস্যা হল তারা জানে না কীভাবে গুলি করতে হয়।”

চে সিম্বা বাহিনীতে বিপ্লবী উদ্দীপনার অভাব দেখতে পেয়েছিলেন এবং দেখলেন তারা বিভিন্ন যাদু বিদ্যার আচার অনুষ্ঠান পালন করে এই ভেবে যে এতে করে তারা অজেয় উঠবে। এসব দেখে ধীরে ধীরে তার ঘোর কেটে যাচ্ছিল।

বড় ধরনের যুদ্ধ দেখলে পালিয়ে যাওয়ারও একটা ঝোঁক ছিল তাদের মধ্যে। ওদের ক্যাম্পগুলো ছিল জঙ্গলের মধ্যে, ওখানে নারী, শিশু সবাই থাকত; ভীষণ জোরে বেখাপ্পা গান বাজত, ওখানে ওরা মদ পান করত, নাচত আর খাওয়া দাওয়া করত।

পরিস্থিতি কঠিন ছিল। প্রাক্তন বিদ্রোহী সদস্য টাবু আজিজু বলেন, “ক্যাম্পে আমরা একটা ভুট্টা দশজনের মধ্যে ভাগ করে খেতাম”।

প্রাক্তন বিদ্রোহী ও খৃস্টেয় যাজক ফ্লরিবার্ট মিলিম্বা বলেন, “তারা আমাদেরকে বলেছিল যে সাদা লোকটি (চে) আমাদেরকে সাহায্য করবে ও আমাদের জন্য আরো অস্ত্র নিয়ে আসবে”। মিলিম্বা বলেন চে এর আগমন ‘অনেক আশা’ বয়ে এনেছিল।

শিবুন্দা স্মরণ করেন, যে বিশাল এলাকা জুড়ে কাবিলা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন   রাজনীতি ও সামরিক কৌশল শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে চে সেই পুরো এলাকা ভ্রমণ করেন।

5

চে গুয়েভারার নেতৃত্বাধীন গেরিলা দলের জন্য নৃত্য পরিবেশন করেছেন কঙ্গোর নারী টাবু আজিজা

বিপ্লবী আদর্শ‘-

৮০ বছর বয়সী জেনারেল লোয়েনদেমা দুনিয়া দক্ষিণ কিভুর রাজধানী বুকাভুর একটি কুঁড়েঘরে বসে স্মৃতিচারণ করছিলেন “আমি তখন ছিলাম একজন সাধারণ সৈনিক। চে আমাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন কীভাবে বিপ্লব করতে হয়। তিনি আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ও রাজনীতি শিক্ষা দিয়েছিলেন।”

তিনি বলেন, কিন্তু “যেদিন থেকে আমরা বিপ্লবী আদর্শকে পায়ে মাড়াতে শুরু করলাম…তারা চলে গেল”।

আরো ১০০ জন লোক বাড়িয়ে কিউবার সেনাবাহিনীতে বাড়তি শক্তি যুগিয়ে ফিদেল কাস্ত্রো কয়েকটি সংঘর্ষে জয়লাভ করেন, কিন্তু শিবুন্দা বলেন, সরকারের সেনাবাহিনী তখন অগ্রসর হচ্ছিল।

১৯৬৫ সালের অক্টোবরের দিকে চে কাস্ত্রোকে লেখেন, “এখানে আসলে অস্ত্রের অভাব নেই…এখানে প্রচুর সশস্ত্র লোক আছে, এখানে আসলে যেটির অভাব রয়েছে সেটি হল সৈনিক”।

শিবুন্দা আরো বলেন, “চে গুয়েভারা যখন চলে গেলেন, সেসময় ব্যাপক যুদ্ধ চলছিল, আমরা পরাজিত হয়ে প্রায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলাম।”

সেনা বাহিনীর আক্রমণ ও পশ্চিমা ভাড়াটে সৈনিকদের পরিচালিত বিমান হামলার মুখে বিদ্রোহী শক্তি একের পর এক পরাজিত হতে লাগল।

চে ও তার সঙ্গীরা ২১শে নভেম্বর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল ত্যাগ করে।

তিন দিন পর জেনারেল জোসেফ মবুতু ক্ষমতা দখল করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট জোসেফ মবুতু দেশে স্বজনপ্রীতি ও স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হন। তিনি প্রায় ৩২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

১৯৬৭ সালে চে বলিভিয়ায় নিহত হন। ১৯৯৭ সালের মে মাসে প্রতিবেশী রুয়ান্ডার সহায়তায় বিদ্রোহ ঘটিয়ে কাবিলা মবুতুকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন। অবশ্য তারাও পরাজিত হন এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়।

এখনো পর্যন্ত দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এ অঞ্চলের পিছু ছাড়েনি।

প্রাক্তন বিদ্রোহী আন্না বিন্তি শাবানি বলেন, “চে গুয়েভারাকে ফিরিয়ে আনুন। কঙ্গো আবার নিজের পায়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা তার আদর্শ অনুসরণ করে যাব”।

সুত্র

আফ্রিকার স্বপ্নঃ কঙ্গোর বিপ্লবী যুদ্ধের ডায়েরী‘/(The African Dream: The Diaries of the Revolutionary War in the Congo)


ভারতঃ “চলে যাও অথবা মর” -বস্তারের পুলিশদের সতর্ক করে দিল মাওবাদীরা

police_2388621f

কনস্টেবলকে অপহরণ ও খতমের দায়িত্ব স্বীকার করল মাওবাদীরা

ছত্তিসগড়ের বস্তার অঞ্চলের নিম্নস্তরের পুলিশদের চাকরী ছেড়ে দেয়ার অথবা “পিএলজিএ (People’s Liberation Guerrilla Army) এর গেরিলাদের হাতে মৃত্যুর” হুমকি দিয়েছে সিপিআই (মাওবাদী)।

মাওবাদীদের পশ্চিম বস্তার বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি মাধভী এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান,  অপহরণকৃত কনস্টেবল বীরা বসন্তকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে মাওবাদীরা । ৭ই এপ্রিল তাকে অপহরণ করা হয় ও দুই সপ্তাহ পর বিজাপুর জেলায় তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। নিরস্ত্র বীরা তার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করতে গ্রামে যাচ্ছিলেন। কনস্টেবল বীরার অপহরণ বিজাপুরের স্থানীয় অধিবাসী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের “নীরব প্রতিবাদের” দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার মুক্তির জন্য স্কুলের বাচ্চারা প্রতিবাদ র‍্যালীর আয়োজন করেছে।

বীরার মৃত্যুর জন্য রাজ্য সরকার ও বিজাপুর পুলিশকে দায়ী করে মাওবাদী নেতা দাবী করেছেন, তার মুক্তির জন্য জেলা পুলিশ কোনরকম সংলাপে বসেনি। “তার বদলে, আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ র‍্যালি আয়োজন করার জন্য পুলিশ স্থানীয় অধিবাসী ও স্কুলের বাচ্চাদেরকে চাপ দেয়। আমাদের পার্টির নীতিমালায় নিরস্ত্র পুলিশদের হত্যা করার কোন বিধান নেই। আমরা অনেক জওয়ানকে মুক্তি দিয়েছি যারা নিরস্ত্র ছিল। তবে আমরা তাদের ছেড়ে দিতে পারিনা যারা জেনেশুনে জনগণের উপর নিষ্ঠুরতা চালায়। মাধভী বলেন, বীরা ছিল সেই ধরনের একজন পুলিশ”।

তিনি আরো বলেন, “সে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে গণ আন্দোলনের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছিল এবং অসংখ্য সাজানো এনকাউন্টার ও বিজাপুরের আদিবাসীদের গ্রামে হামলার নেতৃত্বে সে ছিল। সে গ্রামবাসীদের থেকে অর্থও আদায় করত”।

“বীরা তার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করতে গ্রামে যাচ্ছিল”- পুলিশের এ দাবীকেও অস্বীকার করেছেন মাওবাদী নেতা। মাধভীর দাবী, “সে আওয়াপল্লী এলাকায় আমাদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করে বিজাপুরের এসপির অফিসের দিকে যাচ্ছিল। সে জানত সে কী করছিল এবং তার মত একজন গণশত্রুকে ছেড়ে দেয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল”।

মাওবাদী নেতা সতর্ক করে দিয়ে জানান, “বিরার এই খতম বস্তারের সকল নিম্নস্তরের পুলিশদের প্রতি একটি সতর্কতা হিসেবে কাজ করবে। কর্পোরেটদের জন্য যুদ্ধ করা বন্ধ কর, -যারা আদিবাসী ভূমি দখল করার জন্য এখানে এসেছে। পুলিশের চাকরী বাদ দিয়ে অন্য কোন চাকরী যোগাড় কর যদি বস্তারে থাকতে চাও। তা না হলে PLGA এর হাতে মৃত্যুর জন্য তৈরী হও”।

সূত্রঃ http://www.thehindu.com/news/national/other-states/quit-or-die-maoists-warn-policemen-in-bastar/article7151053.ece