বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ব্যালাড অব সোলজার/Ballad of a Soldier

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। রেড আর্মির এক সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রে। এদিকে শত্রুপক্ষ ধেয়ে আসছে তার দিকে। বয়সে নবীন। বুঝতে পারছে না কী করবে। এমন সময় কাছাকাছি এসে পড়ে বিরোধী শিবিরের ট্যাংক। ভয়ে দৌড়ে একটি বাংকারে ঢুকে যায়। সেখান থেকে সাহস করে একটি ট্যাংককে ধ্বংস করে। এরপর সে তাঁবুতে ফিরে এলে বাহিনীপ্রধান তাকে ডেকে পাঠান। ভয় পেয়ে যায়। ভেবেছিল যুদ্ধক্ষেত্রে স্থান পরিবর্তন করার জন্য তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল প্রধান তাকে ট্যাংক ধ্বংস করার জন্য সম্মান জানান। উনিশ বছর বয়সী নবীন সেনার মন পড়ে আছে বাড়িতে মায়ের কাছে। সে সম্মানের বদলে বাড়িতে মাকে দেখতে যাওয়ার ছুটির আবেদন জানায়। এরপর ছুটে চলে বাড়ির দিকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৫৯সালে তৈরি এই সোভিয়েত ছবির বিষয়বস্তু কিন্তু একেবারেই যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের সাথে মিশে আছে তরুণ জুটির ভালোবাসা, বিবাহিত জুটির ভালোবাসা, মা-ছেলের ভালোবাসা। যুদ্ধের ক্যানভাসে অসাধারণ ভালোবাসার সব গল্প বললেন পরিচালক গ্রিগরি চুখরাই। এই চমৎকার ছবিটির নাম ব্যালাড অব সোলজার/ Ballad of a Soldier ছবিতে আলিওশা ও শুরা চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভ্লাদিমির ইভাশভঝানা প্রখোরেঙ্কো।

চলচ্চিত্রটি দেখতে ক্লিক করুন এই লিংকেঃ https://www.youtube.com/watch?v=H2ZFe7XGwt8
Advertisements

কাশ্মীরে নিপীড়ন বন্ধের দাবি মাওবাদীদের

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সরকারি বাহিনীর নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানিয়েছে মাওবাদীদের একটি গ্রুপ। বৃহস্পতিবার ভিশাকা এজেন্সি এলাকায় তারা কাশ্মিরের পক্ষে ব্যানার নিয়ে হাজির হয় এবং স্লোগান দেয়। তারা জানায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ কাশ্মিরিদের জন্মগত অধিকার। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক নীতির কারণে তারা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। লাদাখ ও কাশ্মিরকে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে বিল পাস হয়। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত সেনা। জারি করা হয়েছে বিধিনিষেধ। কাশ্মিরের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রীসহ শত শত মানুষকে আটকের কথা জানা গেলেও মোট আটকের সংখ্যা বিষয়ে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি ভারত সরকার।

বৃহস্পতিবার মাদ্দিারুভু, বনগ্রাম, গোমাঙ্গি ও মাদগুলার অন্যান্য অঞ্চলের মাওবাদীরা ভিশাকা এজেন্সি এলাকায় এসে জড়ো হয়। এর আগে মাওবাদীরা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে, কাশ্মীরিদের ‘স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম’কে সমর্থন জানানোর জন্যে জনগনের প্রতি আহবান জানিয়েছিল। তারা জানায় সরকারের ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে দ্বিখণ্ডিত করে দেওয়ার নীতিকে সমালোচনা করা উচিত। মাওবাদীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মিরের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিতে চায়। তারা জানায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর পক্ষে কোনও যুক্তি না দিয়ে বলছেন পাকিস্তানে সন্ত্রাস রুখতে এই পদক্ষেপ। আগামী পাঁচবছরও এই নাটক চালিয়ে যাবেন তিনি।

ষাটের দশকের শেষ দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ী থেকে মাওবাদী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তবে নকশালপন্থী আন্দোলন সত্তরের দশকের প্রথমার্ধ্ব থেকেই গতি হারাতে শুরু করেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের ছত্তিশগড়ের জঙ্গলসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও মাওবাদী আন্দোলন জোরালো হতে শুরু করে।

সূত্রঃ https://timesofindia.indiatimes.com/city/visakhapatnam/maoists-put-up-banners-raising-kashmir-issue/articleshow/71103173.cms


তুরস্কের ইস্তাম্বুলে কমিউনিস্টদের সশস্ত্র হামলা

গত সপ্তাহে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বাণিজ্যিক জেলা সারিগাজিতে একটি ব্যাংক এবং স্থানীয় ডাক বিভাগের শাখায় বোমা ও আগুন ককটেল নিয়ে কমিউনিস্টরা আক্রমণ করে। কুর্দি জাতি ও তাদের সংগ্রামী আন্দোলনের উপর তুর্কি রাষ্ট্রের চলমান বর্বর হামলার প্রতিবাদে তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টি[TKP/ML (Communist Party of Turkey / Marxist-Leninist)] এবং তার সামরিক শাখা TIKKO (Liberation Army of the Workers and Peasants of Turkey)  এই আক্রমণ করেছে জানিয়ে এর দায় স্বীকার করেছে। এসময় তারা রাস্তায় একটি চিঠি ও ব্যানারও ঝুলিয়ে দেয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, যে কোন জাতিসত্ত্বার উপর ফ্যাসিবাদী হামলা হলে পার্টি চুপ করে বসে থাকবে না।

এই সশস্ত্র আক্রমণটি মূলত বহু বছর ধরে TKP/ML পার্টির মধ্যে চলা দুই লাইনের একটি সংগ্রামের ফসল। এর কয়েক্ মাস আগে TKP/M পার্টি তার ১ম কংগ্রেস সম্পন্ন করেছে। এই ১ম কংগ্রেসের লাইনের সামরিক গনলাইনকে উর্ধ্বে তুলে ধরে এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই প্রথম সশস্ত্র পদক্ষেপটি চালানো হয়েছে বলে পার্টি তার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশ হিসেবে TKP/ML TIKKO এর এই সশস্ত্র পদক্ষেপ তুরস্কের প্রতিক্রিয়াশীল আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং জার্মানির মতো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় ও শক্তিশালী বার্তা বহন করবে।

সূত্রঃ http://www.yenidemokrasi5.net/sarigazide-banka-ve-ptt-subelerine-duzenlenen-eylemleri-tkp-ml-ustlendi.html


বিগত ৮ বছর ধরে মাওবাদী আন্দোলন হোঁচট খাচ্ছেঃ গণপতি

 এই বছরের শুরুর দিকে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরে আসা ‘গণপতি ওরফে মুপ্পালা লক্ষ্মণ রাও’ মনে করেন, গত আট বছর ধরে “বিপ্লব আন্দোলন” হোঁচট খেয়ে চলছে। পার্টির মুখপত্র পিপলস মার্চকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে গণপতি বলেছেন, “… প্রতিবিপ্লবীদের আক্রমণ এবং আমাদের বিষয়গত ভুল ও দুর্বলতা গত আট বছর ধরে বিপ্লবী আন্দোলনের দুর্বল হওয়ার মূল কারণ।”

সত্তর বছর বয়সী গণপতি তার ‘অসুস্থতা ও বয়সের’ কথা উল্লেখ করে পার্টির পদ থেকে সরে গিয়ে পরবর্তি নতুন নেতৃত্বের জন্যে বাসবরাজকে সামনে নিয়ে আসার পথ করে দেন।।

গণপতি’র মতে, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি ৫.৫ লক্ষ পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে অপারেশন গ্রিন হান্ট ও সমাধানের মত আক্রমণাত্মক ঘটনাগুলির সময়ও পার্টির আন্দোলন সক্রিয় ছিল ঐ সমস্ত স্থানগুলোতে। এর ফলস্বরূপ, গণযুদ্ধের ভরকেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের অঞ্চল সঙ্কুচিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বিস্তৃত সমভূমি, গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামকে প্রসারিত করতে পারিনি।

“আমাদের বিষয়ভিত্তিক ভুল এবং দুর্বলতাগুলো সামনে আসায় আমরা নেতৃত্বের ক্যাডার এবং বিষয়ভিত্তিক শক্তিগুলি যথেষ্ট পরিমাণে হারিয়েছি। আন্দোলনের নতুন প্রোগ্রাম এবং কৌশলগুলি তৈরি করতে পারেনি। পার্টিতে অসর্বহারা প্রবণতা সংশোধন করার প্রচারণায় কিছু ত্রুটি ছিল এবং যার ফলে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করা যায়নি,” বলে তিনি জানান।

“মোদী চক্র” “জরুরী পরিস্থিতি মতো পরিস্থিতি প্রকাশ করছে” বলে উল্লেখ করে গণপতি বলেন, “আমাদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কাজ হচ্ছে এই ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে লক্ষ্যবস্তু করা, নিপীড়িত মানুষকে একত্রিত করা, আমাদের শ্রেণিবদ্ধ সংগঠনের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবিরাম আন্দোলন এবং প্রচারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা এবং সেই রাজনীতিকে পরাস্ত করার জন্য অন্যান্য সংস্থাগুলিকে সাথে নিয়ে একটি বিস্তৃত যুক্তফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তোলা। ”

সূত্রঃ https://indianexpress.com/article/india/maoist-movement-sliding-for-past-eight-years-ganapathi-5957702/?fbclid=IwAR3HRMorfBHGBE8gBeMAqF6r8FdqrLDJmLBxeiE3DOVBnRTzPFynx0u-zMo


শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টিঃ জোসেফ স্তালিন

শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টি

– জোসেফ স্তালিন


(পার্টির নিয়মাবলির প্রথম অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে)

‘রাশিয়া এক এবং অবিভাজ্য’ যখন লোকে জোর গলায় এ কথা বলতো সেদিন চলে গেছে। আজ একটি শিশুও জানে এক এবং অবিভাজ্য রাশিয়া বলে কিছু নেই, অনেক আগেই রাশিয়া ভাগ হয়ে গেছে- বুজোয়া ও শ্রমিক এই দুটি বিরোধী শ্রেণিতে। আজ আর এ কথাটি গোপন নেই যে, এই দুটি শ্রেণির সংঘর্ষকে কেন্দ্র করেই আমাদের বর্তমান জীবন অতিবাহিত হচ্ছে।

অবশ্য কিছুদিন আমাদের এসব লক্ষ্য করা কঠিন ছিল- কারণ সেদিন পর্যন্ত শুধু আলাদা আলাদা গোষ্ঠীগুলোই সংগ্রামের ময়দানে দেখতে পেয়েছি; কেননা বিভিন্ন শহর ও দেশের বিভিন্ন অংশে শুধু আলাদা আলাদা গোষ্ঠীগুলোই সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে এবং বুর্জোয়া ও শ্রমিকরা শ্রেণি হিসাবে সহজে স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ত না। কিন্তু এখন শহর ও জেলা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, শ্রমিক শ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠী হাতে হাত মিলিয়েছে, যুক্ত ধর্মঘট ও বিভোক্ষে ফেটে পড়েছে, আর আমাদের সামনে ভেসে উঠেছে বুর্জোয়া রাশিয়া ও শ্রমিক রাশিয়া এ দুইয়ের সংঘাতের অপরূপ দৃশ্যটি। দুইটি বিপুল সেনাবাহিনী- শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী ও বুর্জোয়া শ্রেণির বাহিনী- আজ সংগ্রামের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে এবং দুই বাহিনীর সংগ্রাম আমাদের সমগ্র সমাজ জীবনকে ছেয়ে ফেলেছে।

একটা সেনাবাহিনী যেমন নায়কবিহীনভাবে চলতে পারে না, প্রতিটি সেনাবাহিনীর যেমন একটি অগ্রবাহিনী থাকে যারা আগে এগিয়ে পথকে আলোময় করে রাখে, তেমনি এটাও স্পষ্ট যে, এই দুইটি সেনাবাহিনীরও দরকার নিজ নিজ উপযুক্ত নেতৃগোষ্ঠী; সাধারণভাবে যাকে বলা হয় পার্টি।

তাহলে ছবিটা দাঁড়াচ্ছে এই রকম: একদিকে লিবারেল পার্টির নেতৃত্বে বুর্জোয়া শ্রেণির বাহিনী; অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী; প্রত্যেকটি বাহিনীর তাদের পরিচালিত শ্রেণি সংগ্রামে নিজ নিজ পার্টির নেতৃত্বে চলছে।

এসবের উল্লেখ আমরা করছি শ্রমিক শ্রেণির পার্টিকে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করার এবং এভাবে পার্টির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে সামনে তুলে ধরার জন্যে।

উপরে এই বক্তব্য থেকে এ কথা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়ে উঠে যে নেতাদের সংগ্রামী গোষ্ঠী হিসাবে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি, প্রথমতঃ সভ্য সংখ্যার দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির তুলনায় অবশ্যই অনেক ছোট হবে। দ্বিতীয়তঃ উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি শ্রমিক শ্রেণি থেকে শ্রেয় হবেই, আর তৃতীয়তঃ পার্টি হবে একটি সুসংবদ্ধ সংগঠন।

যা বলা হল, আমাদের মতে তার প্রমাণের কোন দরকার পড়ে না। কারণ যতক্ষণ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকবে আর তার অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসাবে জনগণের দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা বহাল থাকবে ততদিন শ্রমিক শ্রেণি সামগ্রিকভাবে শ্রেণি চেতনার বাঞ্ছিত স্তরে উন্নীত হতে পারে না। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীকে সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্দীপ্ত করে তোলার জন্যে, তাকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলার সংগ্রামে নেতৃত্বদানের জন্যে তার একদল শ্রেণি সচেতন নেতা থাকবেনই। এটাও পরিষ্কার, যে পার্টি সংগ্রামী শ্রমিক শ্রেণিকে নেতৃত্বদানের পথ গ্রহণ করছে, তাকে আকস্মিকভাবে গড়ে ওঠা কতকগুলো ব্যক্তির সমষ্টিমাত্র হলে চলবে না; তাকে হতে হবে সুসংহত এবং কেন্দ্রীভূত একটা সংগঠন যাতে একটি মাত্র পরিকল্পনা অনুসারে তার কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারে।

সংক্ষেপে গুলোই হল আমাদের পার্টির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। 
এসব কথা মনে রেখে এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক; কাকে আমরা পার্টিসভ্য আখ্যা দেব? বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় পার্টির নিয়মাবলির প্রথম অনুচ্ছেদে ঠিক এই প্রশ্নটি নিয়েই আলোচনা করা হবে। 
অতএব এই প্রশ্নটি বিচার করা যাক।

রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সভ্য বলতে পারি অর্থাৎ একজন পার্টি সভ্যের কর্তব্য কি কি?

আমাদের পার্টি হল একটা সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি। তার অর্থ হল তার একটা নিজস্ব কর্মসূচি (আন্দোলনের আশু এবং চরম লক্ষ্য) রয়েছে, নিজস্ব রণকৌশল (সংগ্রামের কায়দা) রয়েছে এবং নিজস্ব সাংগঠনিক নীতি (সংগঠনের রূপ) রয়েছে। কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই আমাদের পার্টি গড়ে উঠেছে। এই ধ্যানধারণার ঐক্যই আমাদের পার্টিসভ্যদের একটি কেন্দ্রীভূত পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। ধ্যানধারণার এই ঐক্য যদি চুরমার হয়ে যায়, পার্টিও চুরমান হয়ে যায়। সুতরাং যিনি পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল, সংগঠনগত রীতিকে পুরোপুরি মেনে নেবেন তাকেই পার্টিসভ্য বলা চলবে। আমাদের পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণাকে যিনি ভালভাবে অধ্যায়ন করেছেন এবং পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন তিনিই পার্টিসভ্যের একজন এবং এভাবে শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর নেতাদের একজন হতে পারেন।

কিন্তু শুধু পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা গ্রহণ করাই কি একজন পার্টিসভ্যের পক্ষে যথেষ্ট? এরকম একজন লোককে কি শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর একজন যথার্থ নেতা বলে গণ্য করা চলে? নিশ্চয়ই না! প্রথমতঃ সকলেই জানেন যে, দুনিয়ার এমন অনেক বাক্যবাগীশ আছে যারা পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা বিনা প্রতিবাদেই ‘মেনে নেবে’- অথচ যাদের গলাবাজি ছাড়া আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। এরকম একজন বাক্যবাগীশকে পার্টির সভ্য পার্টির (অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর একজন নেতা) আখ্যা দেওয়ার অর্থ পার্টিকে নষ্ট করে দেওয়া। তাছাড়া আমাদের পার্টি একটা দার্শনিক সম্প্রদায় অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠীও নয়। আমাদের পার্টি কি একটা সংগ্রামী পার্টি নয়? আর সে জন্যই কি এটা স্বতঃসিদ্ধ নয় যে এর কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার নিরাসক্ত স্বীকৃতিতেই আমাদের পার্টি সন্তুষ্ট থাকতে পারে, পার্টি সভ্যরা যা স্বীকার করে নিয়েছেন তা তারা বাস্তবে প্রয়োগও করবেন, পার্টি নিঃসন্দেহে এই দাবিও আমাদের কাছে করবে। সুতরাং যিনিই আমাদের পার্টি সভ্য হতে ইচ্ছুক তিনি শুধু পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না, সেগুলো বাস্তব প্রয়োগ, কার্যক্ষেত্রে সেগুলোকে ব্যবহারও তাকে করতেই হবে।

কিন্তু একজন পার্টি সভ্যের পক্ষে পার্টির ধ্যানধারণার বাস্তব প্রয়োগ বলতে কী বোঝায়? কখন তিনি এইসব ধ্যানধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবেন? শুধু তখনই যখন তিনি লড়াই করবেন, যখন তিনি সমগ্র পার্টিকে নিয়ে শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলবেন। সংগ্রাম কি কখনও একক, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে চালানো সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়, বরং ঠিক উল্টো- জনগণ প্রথমে ঐক্যবদ্ধ হন, সংগঠিত হন তারপর তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তা যদি না করা হয়, সমস্ত সংগ্রামই হয় নিষ্ফল। তাহলে এটা পরিষ্কার যে, পার্টি সভ্যরা যদি একটা সুসংবদ্ধ সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ হন একমাত্র তখনই তারা সংগ্রাম করতে পারবেন এবং তার ফলে পার্টির ধ্যানধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেন। এটাও পরিষ্কার যে পার্টি সভ্যেরা যে সংগঠনে সংঘবদ্ধ হবেন তা যত সুসংবদ্ধ হবে, তারা তত ভাল লড়াই করতে পারবেন, পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণাকে তত বেশি পূর্ণতরভাবে তারা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবেন। আমাদের পার্টি কতকগুলো ব্যক্তিমাত্রেরই সমষ্টি, আমাদের পার্টি হল নেতাদের সংগঠন- একথা অকারণে বলা হয় না। এবং যেহেতু পার্টি হল নেতাদের সংগঠন, সেহেতু এটা স্পষ্ট যে একমাত্র তাদেরই এই পার্টির ও সংগঠনের সভ্য বলে গণ্য করা চলে। যারা এই সংগঠনে কাজ করেন এবং স্বভাবতঃই পার্টির ইচ্ছার সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে মিলিয়ে দেওয়াকে এবং পার্টির সঙ্গে একাত্বভাবে কাজ করাকে তাদের কর্তব্য বলে মনে করেন।

সুতরাং একজন পার্টিসভ্য হতে হলে পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে; আর তা প্রয়োগ করতে গেলে তার জন্য লড়াই করতে হবে; এইসব মতামতের জন্যে লড়াই করতে হলে একটা পার্টি সংগঠনের মধ্য থেকে এবং পার্টির সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করতে থাকতেই হবে। একমাত্র যখন আমরা একটানা একটা পার্টি সংগঠনে যোগ দেই এবং এইভাবে আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ পার্টিস্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দিই- শুধু তখনই আমরা পার্টিসভ্য হতে পারি আর তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীর প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে পারি।

যদি আমাদের পার্টি জনাকয়েক বাক্যবাগীশের একটা সমষ্টিমাত্র না হয়, এটা যদি নেতাদের এমন একটি সংগঠন হয় যা কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে উপরে লিখিত প্রতিটি কথাই স্বতঃসিদ্ধ হবে।

নিচের কথাগুলো লক্ষ্য করতে হবে। 
এযাবৎকাল আমাদের পার্টির ধরন-ধারণ ছিল অতিথিপরায়ণ কর্তা-শাষিত একটা পরিবারের মতো- সকল দরদীর জন্যই সেখানে ঠাঁই ছিল। কিন্তু এখন পার্টি হয়েছে একটা কেন্দ্রীভূত সংগঠন। গোষ্ঠী কর্তার শাসনের দিকটা খসে গিয়ে সব দিক থেকে তা হয়ে উঠেছে একটা দুর্গের মতো, যার দরজা একমাত্র যোগ্য ব্যক্তিদের জন্যই খোলা হয়। এটা আমাদের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরতন্ত্র যখন শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণি চেতনাকে ‘ট্রেড ইউনিয়নবাদ’, জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা প্রভৃতির মাধ্যমে কলূষিত করার চেষ্টা করছে, আবার অন্যদিক থেকে উদারনীতিবাগীশ বুদ্ধিজীবীর দল ক্রমাগত চেষ্টা করে চলেছে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যতাকে বিনষ্ট করতে এবং নিজেদের মাতব্বরি শ্রমিক শ্রেণির ওপর চাপিয়ে দিতে- তখন আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে এবং আমাদের ভুলবে চলবে না যে আমাদের পার্টি হল একটি দুর্গ; এই দুর্গের দরজা খোলা হবে কেবল তাদেরই জন্য যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছেন।

পার্টির সভ্যদের দুটি আবশ্যিক শর্ত আমরা নির্ধারণ করেছি (পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ এবং পার্টির একটি সংগঠনে থেকে কাজ করা)। এর সঙ্গে যদি তৃতীয় একটি শর্ত আমরা যুক্ত করি যে- একজন পার্টিসভ্যকে পাটিকে অর্থসাহায্য করতেই হবে- তাহলে পার্টিসভ্য আখ্যা লাভের প্রয়োজনীয় সমস্ত শর্তই আমরা পেয়ে যাব।

সুতরাং রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্য তিনিই হবেন যিনি এই পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ করেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেন এবং পার্টির কোন একটা সংগঠনে কাজ করেন।

এইভাবেই কমরেড লেনিন তাঁর রচিত পার্টির নিয়মাবলির খসড়ার প্রথম অনুচ্ছেদটি প্রস্তুত করেছিলেন।

আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন পার্টি একটি কেন্দ্রীভূত সংগঠন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির একটি সমষ্টিমাত্র নয়- এই ধারণা থেকেই এই সূত্রটির সম্পূর্ণ উদ্ভব ঘটেছে।

এখানেই আছে সূত্রটির সর্বময় শ্রেষ্ঠত্ব।

কিন্তু দেখা গেছে, কিছু কিছু কমরেড লেনিনের এই সূত্রকে ‘সঙ্কীর্ণ’ এবং ‘অসুবিধাজনক’ বলে বাতিল করে দেন এবং তাদের নিজস্ব একটি সূত্র এনে হাজির করেন যা নাকি ‘সঙ্কীর্ণ’ ও ‘অসুবিধাজনক’ নয়। আমরা মার্তভের সূত্রের কথাই বলছি এবং তা-ই এখন আমরা বিশ্লেষণ করব। 
মার্তভের সূত্র হল- ‘রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্য হলেন তিনি যিনি তার কর্মসূচিটি গ্রহণ করেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেন এবং তার কোন সংগঠনের নির্দেশ তাকে নিয়মিত ব্যক্তিগত সাহায্য করেন।’ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এই সূত্রটি পার্টি সভ্যপদের তৃতীয় আবশ্যিক শর্ত- পার্টি সংগঠনগুলির কোন একটিতে পার্টি সভ্যদের কাজ করার কর্তব্যের কথাটি বাদ দিয়েছেন। মনে হয় মার্তভ সুস্পষ্ট ও আবশ্যিক শর্তটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন এবং তার সূত্রে তিনি একটিও জায়গায় অস্পষ্ট, ভাসাভাসা ‘কোন সংগঠনের নির্দেশ অনুসারে ব্যক্তিগত সাহায্য’ কথাটি এনে উপস্থিত করেছেন। এ থেকে দেখা যাচ্ছে কোনও পার্টি সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও (নিশ্চয়ই বলা যায় একটা চমৎকার পার্টিই বটে!) এবং পার্টির ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার বাধ্য বাধকতা না রেখেও (নিশ্চয়ই বলা যায় চমৎকার পার্টি শৃঙ্খলা বটে!)- যে কেউ পার্টির সভ্য হতে পারবেন। বেশ তো, পার্টিইবা কি করে নিয়মিত নির্দেশ দেবে সেইসব লোকদের যারা পার্টির কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেই এবং ফলে পার্টি শৃঙ্খলার কাছে আদৌ কোন বাধ্যবধকতাও যাদের নেই।

এই প্রশ্নে মার্তভ রচিত পার্টির নিয়মাবলির খসড়া প্রথম অনুচ্ছেদ সম্পর্কিত সূত্রটি ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু সূত্রটিতে এই প্রশ্নটির সুদক্ষ জবাব দেওয়া হয়েছে। কারণ তাতে পার্টিসভ্য পদের তৃতীয় ও আবশ্যিক শর্ত হিসাবে পার্টি সংগঠনের মধ্যে থেকে কাজ করার কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে।

আমাদের যেটা করতে হবে তা হল মার্তভের সূত্র থেকে অস্পষ্ট ও অর্থহীন ‘একটি পার্টি সংগঠনের নির্দেশ অনুসারে নিয়মিত ব্যক্তিদের সাহায্যের’ কথাগুলি বাতিল করে দেওয়া। এই শর্তটি বাদ দিয়ে মার্তভের সূত্রে দু’টি মাত্র শর্তই অবশিষ্ট থাকে (কর্মসূচিকে গ্রহণ করা এবং আর্থিক সাহায্য করা) যা নিছক শর্ত হিসাবে নিতান্তই মূল্যহীন; কারণ যে কোন বাক্যবাগীশ লোকই পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ করে নিতে পারে এবং পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দিতে পারে; কিন্তু এসবের দ্বারা পার্টি সভ্যপদের সামান্যতম যোগ্যতাও তার অর্জিত হয় না।
বলতেই হয় সূত্রটা খুবই সুবিধাজনক!

আমরা বলি সাচ্চা পার্টিসভ্যর পার্টির কর্মসূচিকে শুধু মেনে নিয়েই নিশ্চিত হতে পারে না, যে কর্মসূচি তাঁরা গ্রহণ করলেন সেটা বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের চেষ্টা নিশ্চয়ই তাঁরা করবেন। মার্তভ জবাবে বলছেন: তোমরা ভীষণ কড়া; পার্টিকে আর্থিক সাহায্য করতে রাজি হলে পার্টির গৃহীত কর্মসূচির বাস্তব প্রয়োগ করাটা জরুরি কিছু নয়- ইত্যাদি। দেখে-শুনে মনে হয় মার্তভের কিছু বাক্যবাগীশ ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের’ জন্য দুঃখের অন্ত নেই। আর তাই তিনি পার্টির দ্বার তাদের জন্য বন্ধ করে দিতে চান না।

আমরা আরও বলছি- কর্মসূচিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে লড়াই করতে হবে এবং সংহতি ছাড়া লড়াই করা যেহেতু অসম্ভব তাই একজন সম্ভাব্য পার্টিসভ্যকে পার্টির কোন একটা সংগঠনে যোগ দিতেই হবে, পার্টির ইচ্ছার সঙ্গে নিজের ইচ্ছাকে মিলিয়ে দিতে হবে, শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামী বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে হবে অর্থাৎ তাকে একটা কেন্দ্রীভূত পার্টির সুসংগঠিত বাহিনীর মধ্যে স্থান করে নিতে হবে। মার্তব এর উত্তরে বলছেন, সভ্যদের সুসংহত বাহিনীতে সংগঠিত হবার খুব একটা কিছু প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই সংগঠনে সংঘবদ্ধ হবার; একক লড়াই-ই যথেষ্ট।

আমাদের প্রশ্ন হল আমাদের পার্টিটা তাহলে কি? কতকগুলো ব্যক্তির একটা আকস্মিক জনতা, না নেতাদের সুসংহত সংগঠন? আর যদি এটা নেতাদেরই সংগঠন হয় তাহলে যে এর অন্তর্ভুক্ত নয়, এবং যার ফলে এর শৃঙ্খলা মেনে চলার কোন বাধ্যবাধকতাও যার নেই এমন লোককে এর সভ্য বলা চলে? মার্তভ জবাবে বলছেন, পার্টি কোন সংগঠন নয়, বরং পার্টি হল একটা অসংগঠিত সংগঠন (চমৎকার কেন্দ্রানুগত্য সন্দেহ নেই!)। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, মার্তভের মতে পার্টি কোন কেন্দ্রীভূত সংগঠন নয়, পার্টির কর্মসূচি ইত্যাদি মেনে নিয়েছেন এমন ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাট ব্যক্তিবিশেষদের এবং আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের তা একটা সমষ্টিমাত্র। কিন্তু আমাদের পার্টি একটা কেন্দ্রীভূত সংগঠন না হলে- তা একটা দুর্গ হতে পারবে না- যে দুর্গের দুয়ার শুধু পরীক্ষিতদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

বাস্তবিকপক্ষে মার্তভের সূত্র থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাঁর কাছে পার্টি একটা দুর্গ নয়- বরং একটা ভোজসভা বিশেষ- যাতে প্রতিটি সমর্থকেরই প্রবেশাধিকার রয়েছে। খানিকটা জ্ঞান, খানিকটা সহানুভূতি, খানিকটা আর্থিক সাহায্য- তাহলেই হল আপনি পার্টিসভ্য বলে গণ্য হবার সম্পূর্ণ অধিকার পেয়ে গেলেন। আতঙ্কিত ‘পার্টিসভ্যদের’ উৎসাহ যোগানোর জন্য মার্তভ চেঁচিয়ে বললেন- শুনবেন না, কানে নেবেন না, সেই লোকেদের কথা যারা বলে, পার্টিসভ্যকে একটা পার্টি সংগঠনে থাকতেই হবে এবং পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে বিলিয়ে দিতে হবে। তিনি বললেন, প্রথমত: এমন শর্ত একজন মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়াই কঠিন, পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছা বিলিয়ে দেওয়া তামাশা নয়! আর দ্বিতীয়ত: আমার ব্যাখ্যায় আমি এর আগেই দেখিয়ে দিয়েছি- ঐ লোকগুলোর মতামত নিতান্তই ভ্রান্ত। কাজেই ভদ্রমহোদয়গণ- এই ভোজসভায়….. আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

দেখে মনে হচ্ছে মার্তভ পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে বিলিয়ে দিতে ঘৃণা বোধ করেন এমন কিছু অধ্যাপক এবং হাই স্কুলের ছাত্রদের জন্য উদ্বেগে আকুল হয়ে উঠেছেন, আর তারই জন্য আমাদের পার্টির দুর্গপ্রকারে ফাটল সৃষ্টি করে এইসব সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকদের চোরাগোপ্তা পথে পার্টিতে ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন। সুবিধাবাদকে দরজা খুলে দিচ্ছেন তিনি- আর সেটা করছেন এমন একটা সময়ে যখন শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রেণিসচেতনতার হাজার হাজার শত্রু আক্রমণ হেনে চলেছে!

কিন্তু এইটেই আসল কথা নয়। আসল কথা হল, মার্তভের এই সন্দেহজনক সূত্রটি পার্টির অভ্যন্তরেই অন্য দিকে থেকে সুবিধাবাদের উদ্ভব ঘটাতে সাহায্য করে।

আমরা জানি মার্তভের সূত্রে শুধু কর্মসূচি গ্রহণের কথাই আছে; রণকৌশল ও সংগঠনের ব্যাপারে একটি কথাও নেই। কিন্তু পার্টির পক্ষে সাংগঠনিক ও রণকৌশলগত ধ্যানধারণার দিক থেকে ঐক্য কর্মসূচিগত মতামতের ঐক্যের চেয়ে মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের তিনি বলতে পারেন যে কমরেড লেনিনের সূত্রেও তো এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। ঠিকই! কিন্তু কমরেড লেনিনের সূত্রে এ সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। এটা কি স্বতঃসিদ্ধ নয় যে, পার্টি সংগঠনে যে কাজ করে এবং স্বভাবতঃই পার্টির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যে লড়াই করে, পার্টি শৃঙ্খলাকে যে মাথা পেতে নেয়- সে পার্টির সাংগঠনিক নীতি এবং রণকৌশল ছাড়া অন্য কোন সাংগঠিক নীতি এবং রণকৌশল অনুসরণ করতেই পারে না? কিন্তু পার্টি কর্মসূচি মেনে নিয়েছেন, অথচ কোন পার্টি সংগঠনের যিনি অন্তর্ভুক্ত নন- এমন একজন পার্টিসভ্য সম্পর্কে আপনি কী বলবেন? কী নিশ্চয়তা আছে যে এই ধরণের একজন সভ্যের রণকৌশলগত এবং সাংগঠনিক মতামত পার্টির মতামতই হবে, অন্য কিছু হবে না? মার্তভের সূত্র ঠিক একথাটিই ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। মার্তভের সূত্রের ফলে আমরা পাব একটি ‘অদ্ভূত পার্টি’ যার ‘সভ্যরা’ একই কর্মসূচি মানে (এবং সে বিষয়ে কোন প্রশ্ন নেই!), অথচ সাংগঠনিক ও রণকৌশলগত ব্যাপারে একমত নয়। কী আশ্চর্য বৈচিত্র্য! একটি ভোজসভার সঙ্গে আমাদের পার্টির পার্থক্য রইল কোথায়?

আর একটি প্রশ্ন আমরা করতে চাই: দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেস আমাদের পার্টির হাতে ভাবাদর্শ ও কর্মগত কেন্দ্রিকতা তুলে দিয়েছিল আর মার্তভের সূত্রে যার পুরোপুরি বিরোধিতা রয়েছে- তারই বা আমরা কী করব? বেমালুম ছুড়ে ফেলে দেব? যদি বেছে নেওয়ার প্রশ্নই আসে তবে নিঃসন্দেহে মার্তভের সূত্রকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া অনেক বেশি সঠিক হবে।

কমরেড লেনিনের সূত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই উদ্ভট সূত্রটিই মার্তভ আমাদের উপহার দিয়েছেন।

আমার মত হচ্ছে দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসে মার্তভের সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- সেটি প্রচন্ড ভুল; এবং আমরা আশা করি যে তৃতীয় পার্টি কংগ্রেসে এই ভুল শুধরে নেবে এবং কমরেড লেনিনের সূত্রটি গ্রহণ করবে।

সংক্ষেপে পুনরুল্লেখ করা যাক: শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে। সব সৈন্যবাহিনীরই যেমন একটি অগ্রবাহিনী থাকা আবশ্যক, এই বাহিনীও চাই একটি অগ্রবাহিনী। সুতরাং সর্বহারার নেতাদের একটা দল- রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির আবির্ভাব ঘটেছে। একটি সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট অগ্রবাহিনী বলেই এই পার্টিকে প্রথমত: নিজস্ব কর্মসূচি, রণকৌশল আর সাংগঠনিক নীতিতে সুসজ্জিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত: একে হতে হবে একটি সুসংহত সংগঠন। রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্যপদ কাকে দেয়া যেতে পারে?- এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তরই পার্টি দেবে : যিনি পার্টির কর্মসূচি মেনে নেবেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেবেন আর পার্টির কোন একটি সংগঠনে কাজ করবেন- তাঁকেই। 
এই সুস্পষ্ট সূত্রটি কমরেড লেনিন তাঁর চমৎকার সূত্রটিতে ব্যক্ত করেছেন।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৮


সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির কর্মসূচির একটি খসড়া এবং ব্যাখ্যা: ভ.ই.লেনিন

সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির কর্মসূচির একটি খসড়া এবং ব্যাখ্যা

– ভ.ই.লেনিন

 

খসড়া কর্মসূচি:


(ক) ১। ক্রমাগত আরও দ্রুত রাশিয়ায় গড়ে উঠছে বড় বড় কলকারখানা, তাতে ছোট কারিগর আর কৃষকদের সর্বনাশ হচ্ছে, তারা নিঃস্ব শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে, ক্রমাগত বেশি সংখ্যায় মানুষ তাড়িত হচ্ছে শহরে, শিল্পযুক্ত গ্রামে এবং বসতিতে।

২। পুঁজিতন্ত্রের এই বৃদ্ধির অর্থ হলো মুষ্টিমেয় কারখানা মালিক বেনিয়া আর ভূস্বামীদের আর তাদের বিলাস ব্যসনের বিপুল বৃদ্ধি, শ্রমিকদের গরিবি এবং উৎপীড়নের ততোধিক দ্রুত বৃদ্ধি। বড় বড় কারখানায় উৎপাদনে আর যন্ত্রপাতিতে চালু করা উন্নতিগুলো সামাজিক শ্রমের উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি সহজতর করার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের ওপর পুঁজিপতিদের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, বেকারি বাড়াচ্ছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রকটিত করে তুলছে শ্রমিকদের অরক্ষিত অবস্থাটাকে।

৩। কিন্তু শ্রমের উপর পুঁজির উৎপীড়ন সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় কারখানা সৃষ্টি করছে শ্রমিকদের একটা বিশেষ শ্রেণি, যেটা পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে সমর্থ হয়ে উঠছে, কেননা তাদের জীবনযাত্রার অবস্থাই তাদের নিজেদের ক্ষুদে উৎপাদনের সঙ্গে তাদের সমস্ত সম্বন্ধ নষ্ট করে দিচ্ছে, আর শ্রমিকদের একই শ্রমের মাধ্যমে এবং এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় বদলি করার ভিতর দিয়ে তাদের সম্মিলিত করে মেহনতি মানুষের বড় বড় অংশকে একত্রে জুড়ে দিচ্ছে। শ্রমিকেরা পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করছে, আর তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে প্রবল ঐক্য কামনা। শ্রমিকদের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহগুলির মধ্য থেকে গড়ে উঠছে রুশি শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম।

৪। পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির এই সংগ্রাম হলো- যাদের চলে অপরের শ্রমের ওপর সেই সমস্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে এবং সমস্ত শোষণের বিরুদ্ধে। এর সমাপ্তি ঘটতে পারে একমাত্র যখন রাজনীতিক ক্ষমতা বর্তাবে শ্রমিক শ্রেণির হাতে, যখন সমগ্র ভূমি সাধিত্র, কারখানা, যন্ত্রপাতি আর খনি হস্তান্তরিত হবে সমগ্র সমাজের কাছে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সংগঠিত করার জন্যে, তাতে শ্রমিকরা যাকিছু উৎপন্ন করবে সেই সবই এবং উৎপাদনে সমস্ত উন্নতি অবশ্যই উপকৃত করবে মেহনতিদের।

৫। রুশ শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের প্রকৃতি আর লক্ষ্য অনুসারে সেটা সমস্ত দেশের শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক (সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক) আন্দোলনের অঙ্গ।

৬। মুক্তির জন্য রুশ শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামে প্রধান অন্তরায় হলো চূড়ান্ত স্বৈরতান্ত্রিক সরকার আর তার দায়িত্বহীন কর্মকর্তারা। ভূস্বামী আর পুঁজিপতিদের বিশেষ অধিকারের ভিত্তিতে এবং তাদের স্বার্থের প্রতি বশবর্তিতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে এই সরকার নিম্নতম শ্রেণিগুলিকে একেবারে সর্বঅধিকার বঞ্চিত করে রেখেছে এবং এইভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে শৃঙ্খলিত করে সমগ্র জনগণের বিকাশ ব্যহত করছে। এই কারণেই নিজ মুক্তির জন্য রুশ শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম থেকে অনিবার্যভাবেই দেখা দিচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম।

(খ) ১। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টি ঘোষণা করছে শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা বিকোশিত করে তাদের সংগঠনের উন্নতি ঘটিয়ে এবং সংগ্রামের উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে রুশ শ্রমিক শ্রেণির এই সংগ্রামের আনুকূল্য করাই এর উদ্দেশ্য।

২। নিজ মুক্তির জন্য রুশ শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম একটা রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাজনৈতিক মুক্তিলাভই তার প্রধান লক্ষ্য।

৩। এই কারণেই নিজেকে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন থেকে পৃথক করে না নিয়ে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে, বিশেষ অধিকারভোগী ভূসম্পত্তিবান অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে এবং ভূমিদাস প্রথার সমস্ত অবশেষ আর সামাজিক স্তর বিভেদ যা অবাধ প্রতিযোগিতার অন্তরায় তার বিরুদ্ধে প্রত্যেকটা সামাজিক আন্দোলন সমর্থন করবে।

৪। অন্যদিকে স্বৈরাচারী সরকার আর তার কর্মকর্তাদের অভিভাবকত্ব দিয়ে মেহনতি শ্রেণিগুলির ওপর মুরুব্বিয়ানার সমস্ত চেষ্টার বিরুদ্ধে পুঁজিতন্ত্রের বিকাশ মন্দিত করার এবং তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির বিকাশ মন্দিত করার সমস্ত চেষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাবে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি।

৫। শ্রমিকদের মুক্তির ব্যাপারটা হওয়া চাই শ্রমিক শ্রেণির নিজের-ই ঘটানো প্রক্রিয়া।

৬। রুশ জনগণের যা আবশ্যক সেটা নয় স্বৈরাচারী সরকার আর তার কর্মকর্তাদের সাহায্য, সেটা হল তার উৎপীড়ন থেকে মুক্তি।

(গ) এইসব বিবেচনাকে আরম্ভস্থল হিসাবে ধরে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি প্রথমত আর সর্বোপরি দাবি করছে;
১। একটা সংবিধান রচনার জন্য সমস্ত নাগরিকের প্রতিনিধিদের নিয়ে জেমস্কি সভা ডাকার দরকার।

২। রাশিয়ায় যারা ২১ বছর বয়সে পড়েছে তাদের ধর্ম কিংবা জাতি নির্বিশেষে সবার সর্বজনীন এবং প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার।

৩। সমাবেশ আর সংগঠনের স্বাধীনতা এবং ধর্মঘট করার অধিকার।

৪। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।

৫। সামাজিক স্তর বিভাগের বিলুপ্তি এবং আইনের কাছে সমস্ত নাগরিকের পূর্ণসমতা।

৬। ধর্মের স্বাধীনতা এবং সমস্ত জাতিসত্তার সমতা। জন্ম বিবাহ আর মৃত্যু নিবন্ধকরণের কাজ পুলিশ থেকে স্বতন্ত্র পৌর কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তরকরণ।

৭। সরকারি কর্মকর্তাদের উপরওয়ালাদের কাছে অভিযোগ না করেই যে কোন কর্মকর্তাকে আদালতে অভিযুক্ত করার জন্য প্রত্যেকটি নাগরিকের অধিকার।

৮। ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র তুলে দেয়া এবং স্থানান্তরে যাওয়া আর আবাসের পূর্ণ স্বাধীনতা।

৯। বৃত্তি আর পেশার স্বাধীনতা, গিল্ডের বিলুপ্তি।

(ঘ) শ্রমিকদের জন্যে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি দাবি করছে: 
১। সমস্ত শিল্পে শিল্প আদালতের স্থাপনা, তাতে পুঁজিপতি আর শ্রমিকদের মধ্য থেকে সমান সংখ্যায় নির্বাচিত বিচারপতি।

২। আইন করে কর্মদিন ৮ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করা।

৩। আইন করে রাতে কাজ আর রাতের শিফট নিষিদ্ধকরণ, ১৫ বছরের কম বয়সের ছেলেমেয়েদের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা।

৪। জাতীয় ছুটির দিনগুলো আইনত নির্দিষ্টকরণ।

৫। রাশিয়ার সর্বত্র সমস্ত শিল্পে সরকারি কারখানাগুলিতে এবং বাড়িতে কর্মরত কারিগরদের ক্ষেত্রেও কারখানা আইন আর কারখানা পরিদর্শনের প্রয়োগ।

৬। কারখানা পরিদর্শকম-লী হওয়া চাই স্বতন্ত্র- অর্থমন্ত্রকের অধীন নয়। কারখানা আইন পালন নিশ্চিত করার কাজে শিল্প আদালতগুলোর সদস্যদের অধিকার হওয়া চাই কারখানা পরিদর্শকম-লীর সমান।

৭। সর্বত্র বস্তুশোধ প্রথার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ।

৮। উপযুক্ত হার বাঁধা, মাল বাতিল করা, জরিমানার সঞ্চিত টাকার খরচ এবং কারখানার মালিকানাধীন শ্রমিক বাসাবাড়ির ওপর শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধান। যে কোন কারণে (জরিমানা, বাতিল মাল ইত্যাদি) শ্রমিকদের মজুরি থেকে যাকিছু কেটে নেয়া হোক সেটা রুবলে মোট ১০ কোপেকের বেশি হতে পারবে না, এই মর্মে আইন।

৯। শ্রমিকদের জখমের জন্য মালিকদের দায়ী করার আইন প্রণয়ন। শ্রমিকদের ওপর দোষারোপ করতে হলে সেটা মালিকের প্রমাণ করা চাই।

১০। বিদ্যালয় চালানো এবং এবং শ্রমিকদের চিকিৎসার দায়িত্ব মালিকদের ওপর দেবার আইন।

কর্মসূচির ব্যাখ্যা

কর্মসূচিটি তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে সমস্ত নীতি উপস্থাপিত হয়েছে, যার থেকে এসেছে কর্মসূচির বাদবাকি ভাগগুলি। প্রথম ভাগে দেখান হয়েছে সমসাময়িক সমাজে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থান, মালিকদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের মর্ম আর তাৎপর্য এবং রাশিয়া রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতিক অবস্থান।

দ্বিতীয়ভাগে পার্টির লক্ষ্য বিবৃত হয়েছে, আর দেখান হয়েছে রাশিয়ায় অন্যান্য রাজনীতিক মতধারার সঙ্গে পার্টির সম্পর্ক। পার্টি এবং সমস্ত শ্রেণিসচেতন শ্রমিকের ক্রিয়াকলাপ কী হওয়া উচিত, আর রুশি সমাজে অন্যান্য শ্রেণির স্বার্থ আর প্রচেষ্টার প্রতি কী হবে তাদের মনোভাব, সেটা নিয়ে এই দ্বিতীয় ভাগ।

কার্যক্ষেত্রে পার্টির দাবি দাওয়া রয়েছে তৃতীয়ভাগে। এইভাগ তিনটে অংশে বিভক্ত। প্রথমাংশে আছে দেশজোড়া সংস্কারের দাবিদাওয়া। শ্রমিক শ্রেণির দাবিদাওয়া আর কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে দ্বিতীয়াংশে, তৃতীয়াংশে আছে কৃষকদের স্বার্থানুযায়ী দাবি দাওয়া। কর্মসূচির ব্যবহারিক ভাগে যাবার আগে, অংশগুলোর কিছু কিছু প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিম্নে দেয়া হলো।

(ক) ১। কর্মসূচিতে সর্বপ্রথমে আলোচনা করা হয়েছে বড় বড় কল-কারখানার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে, কেননা সমসাময়িক রাশিয়ায় যা জীবনযাত্রার পূরণ অবস্থাটাকে, বিশেষত মেহনতি শ্রেণিগুলির জীবনযাত্রার অবস্থাকে একেবারে বদলে দিচ্ছে তার মধ্যে এটাই প্রধান জিনিস। পুরনো অবস্থায় দেশের একরকম সমস্ত সম্পদই উৎপন্ন করত ক্ষুদে মালিকেরা, তারা ছিল জনসমষ্টির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। গ্রামে-গ্রামে মানুষের জীবন ছিল নিশ্চল, তাদের উৎপাদনের বেশির ভাগ হত হয় তাদের নিজেদের ব্যহারের জন্য, নইলে লাগোয়া গ্রামগুলির ছোট ছোট বাজারের জন্যে, কাছাকাছি অন্যান্য বাজারের সঙ্গে যেগুলোর বিশেষ কোন যোগাযোগ ছিল না। এই একই ক্ষুদে মালিকেরা খাটত ভূস্বামীদের জন্যে, ভূস্বামীরা প্রধানত নিজেদের পরিভোগের জন্যে তাদের উৎপন্ন করতে বাধ্য করতো। গৃহজাতদ্রব্য প্রোসেসিংয়ের জন্যে ভার দেওয়া হতো কারিগরদের হাতে, তারাও বাস করতো গ্রামে কিংবা কাজ পাওয়ার জন্যে যেত লাগোয়া এলাকাগুলোতে। কিন্তু কৃষকরা খালাস পাবার পরে মানুষের বিপুল অংশের এই জীবনযাত্রার অবস্থায় সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেল; কারিগরদের ক্ষুদে কারবারগুলোর জায়গায় আসতে থাকল বড় বড় কারখানা, সেগুলো বাড়তে থাকল অসাধারণ দ্রুত; সেগুলো ক্ষুদে মালিকদের উচ্ছেদ করে তাদের মজুরি শ্রমিকে পরিণত করলো, আর হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ শ্রমিককে একত্রে কাজ করতে বাধ্য করলো, তাতে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ মাল বিক্রি হল রাশিয়ার সর্বত্র।

কৃষক খালাস পাবার ফলে জনসমষ্টির নিশ্চলতা ভেঙে গেল, আর কৃষক যে অবস্থায় পড়ল তাতে তাদের দখলে রইলো যে ছোট্ট ছোট্ট জমির টুকরো তার থেকে তাদের আর জীবিকানির্বাহ হয় না। জনরাশিগুলি ঘর ছেড়ে বেরলো জীবিকার সন্ধানে, তারা চললো কারখানাগুলোর দিকে কিংবা রেলপথ নির্মাণে কাজের জন্যে, যেসব রেলপথ রাশিয়ার কোণগুলোকে সংযুক্ত করে এবং বড় কারখানাগুলোর উৎপন্ন দ্রব্য বয়ে নিয়ে যায় সর্বত্র। জনরাশিগুলি কাজে গেল শহরে-শহরে ,অংশগ্রহণ করল কারখানা আর ব্যবসা- বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের ঘরবাড়ি নির্মাণে, কারখানায়-কারখানায় জ্বালানি সরবরাহের কাজে এবং তাদের জন্যে কাঁচামাল প্রস্তুত করায়। তাছাড়া অনেক কাজ চালালো বাড়িতে, যেসব বেনিয়া আর কারখানা মালিক প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট দ্রুত সম্প্রসারিত করতে পারে নি তাদের জন্যে ঠিকা কাজ করতো তারা। অনুরূপ বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটলো কৃষিক্ষেত্রে; বিক্রির জন্যে শস্য উৎপাদন করতে থাকলো ভূস্বামীরা, ঘটনাস্থলে এসে পড়লো কৃষক আর বেনিয়াদের মধ্য বড় বড় খামারিরা, দশক-দশক কোটি পুদ শস্য বিক্রি হতে থাকলো বিদেশে। উৎপাদনের জন্য মজুরি শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দিল- লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি কৃষক নিজেদের ছোট্ট জমি-বন্দগুলো ছেড়ে বিক্রির জন্যে শস্য উৎপাদনে ব্যাপৃত নতুন মনিবদের জন্যে নিয়মিত মজুর কিংবা দিন-মজুর হয়ে খাটতে থাকলো। পুরণো জীবনযাত্রা প্রণালীতে এইসব পরিবর্তনই বর্ণিত হয়েছে কর্মসূচিতে, তাতে বলা হয়েছে, বড় বড় কল-কারখানা ছোট কারিগর আর কৃষকদের সর্বনাশ করে তাদের মজুরি শ্রমিকে পরিণত করছে। সর্বত্র ক্ষুদ্রায়তনের উৎপাদনের জায়গায় আসছে বৃহদায়তনের উৎপাদন, আর এই উৎপাদনে শ্রমিকদের বিপুল অংশ নিছক ঠিকা মজুর, যাদের মজুরি দিয়ে খাটায় পুঁজিপতিরা, যাদের আছে বিপুল পরিমাণ পুঁজি, যারা তৈরি করে প্রকান্ড-প্রকান্ড কর্মশালা, পাইকারী হারে কিনে ফেলে বিপুল পরিমাণ মালমশলা, আর একত্রে জড়ো করা মজুরদের ব্যাপক পরিসরে উৎপাদন থেকে তোলা মুনাফা দিয়ে পকেট ভর্তি করে। উৎপাদন হয়ে উঠেছে পুঁজিতান্ত্রিক, সেটা সমস্ত ক্ষুদে মালিকদের ওপর নির্মম নিষ্করুণ চাপ দিয়ে গ্রামে গ্রামে তাদের নিশ্চল জীবন ভেঙে দিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টহল দিতে বাধ্য করে মামুলী অদক্ষ মজুর হিসেবে, যারা শ্রমশক্তি বিক্রি করে পুঁজির কাছে, জনসমষ্টির ক্রমাগত বৃহত্তর অংশ গ্রামাঞ্চল আর কৃষি থেকে চিরকালের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে জড়ো হচ্ছে শহরে, কারখানায় আর শিল্পযুক্ত গ্রামে আর বসতিতে, সেখানে তারা একটা বিশেষ নিঃস্ব শ্রেণির মানুষ, মজুরি করা প্রলেতারিয়ান মজুরদের শ্রেণি, যাদের জীবিকানির্বাহ হয় কেবল শ্রমশক্তি বিক্রি করেই।

বড় বড় কল-কারখানা দেশের জীবনে যেসব প্রচ- পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে সেগুলো এই- ক্ষুদ্রায়তনের উৎপাদনের জায়গায় আসছে বৃহদায়তনের উৎপাদন, ক্ষুদে মালিকেরা মজুরি শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। তাহলে সমগ্র মেহনতি জনসমষ্টির পক্ষে এই পরিবর্তনের অর্থটা কী, আর এটা চলছে-ই বা কোথায়? কর্মসূচিতে পরে সে সম্বন্ধে বলা হয়েছে।

(ক) ২। ক্ষুদ্রের স্থলে বৃহদায়তন উৎপাদন আসার সঙ্গে সঙ্গে আসছে পৃথক-পৃথক, ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র আর্থিক সংগতির জায়গায় পুঁজি হিসেবে খাটান বিপুল পরিমাণ অর্থ, আর ক্ষুদ্র, নগণ্য লাভের জায়গায় আসছে লক্ষ লক্ষ মুদ্রার লাভ। এই কারণে পুঁজিতন্ত্রের বৃদ্ধির ফলে সর্বত্র ঘটছে বিলাস-ব্যসন আর সম্পদের বৃদ্ধি। রাশিয়ায় দেখা দিয়েছে ধনকুবের, কারখানা মালিক, রেলপথ মালিক, বেনিয়া আর ব্যাঙ্কারদের একটা গোটা শ্রেণি, শিল্পপতিদেরকে সুদে ধার- দেওয়া অর্থ-পুঁজি থেকে পাওয়া আয়ে যাদের চলে এমন একটা গোটা শ্রেণি দেখা দিয়েছে; ভূমি পুনরুদ্ধার বাবত কৃষকদের কাছ থেকে বেশ মোটা টাকা পেয়ে, কৃষকদের ভূমির প্রয়োজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশ মোটা টাকা পেয়ে, কৃষকদের ভূমির প্রয়োজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের কাছে ইজারা দেওয়া ভূমির দাম বাড়িয়ে এবং ভূমিসম্পত্তিতে বীট চিনি শোধনাগার আর ভাটিখানা স্থাপন করে বড় ভূস্বামীরা আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। এই সমস্ত বিলাস ব্যসন আর অমিতব্যয়িতা যে মাত্রায় বেড়ে উঠেছে তার কোন জুড়ি নেই; বড় বড় শহরের সদর রাস্তাগুলোয় সারি সারি রয়েছে তাদের রাজকীয় অট্টালিকা আর জাঁকাল প্রাসাদগুলো। কিন্তু পুঁজিতন্ত্রের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের অবস্থা সমানে আরও খারাপ হয়ে পড়েছে। কৃষক খালাস পাবার পরে কোন কোন জায়গায় রোজগার বাড়লেও সেটা খুবই সামান্য এবং বেশি কালের জন্য নয়, কেননা গ্রাম থেকে দলে দলে ভুখা মানুষ ভিড় করে এসে মজুরি হার নামিয়ে দিয়েছে, আর খাদ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য জীবনীয়ের দাম বেড়েই চলার ফলে বর্ধিত মজুরি দিয়েও শ্রমিকেরা জীবনধারনের উপকরণ পেয়েছে অপেক্ষাকৃত কম; কাজ পাওয়া ক্রমাগত বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর ধনীদের জাঁকাল অট্টালিকাগুলোর পাশাপাশি (কিংবা শহরের উপকণ্ঠে) গড়ে উঠেছে বস্তিগুলো, সেখানে শ্রমিকরা থাকতে বাধ্য হয়েছে তহখানায়, ঠাসাঠাসি করা স্যাঁতসেতে তাপ ছাড়া ঠান্ডা বসতস্থানে, এমনকি নতুন নতুন শিল্পায়তনের কাছে মাটি খুঁড়ে তৈরি আশ্রয়েও। পুঁজি বৃহত্তর হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটা শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, তাদের ফকির করে দিয়েছে, তাদের সমস্ত সময় কারখানায় কাজে লাগাতে বাধ্য হয়েছে, কাজ নিতে বাধ্য করেছে শ্রমিকদের স্ত্রী- ছেলেমেয়েদের। কাজেই, পুঁজিতন্ত্রের বৃদ্ধি প্রথম যে পরিবর্তনটার দিকে চলেছে সেটা হল এই; মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের সিন্ধুকে জমেছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ, আর জনগণের বিরাট অংশ ফকিরে পরিণত হচ্ছে।

দ্বিতীয় পরিবর্তনটা হলো এই যে, ক্ষুদ্রের স্থলে বৃহদায়তন উৎপাদন আসার ফলে উৎপাদনে বহু উৎকর্ষ ঘটেছে। সর্বপ্রথমে প্রত্যেকটা ছোট কর্মশালায়, প্রত্যেকটা বিচ্ছিন্ন ছোট পরিবারে একা-একা পৃথক-পৃথকভাবে করা কাজের জায়গায় এসেছে এক কারখানায়, একজন ভূস্বামীর জন্যে, একজন ঠিকাদারের জন্যে একত্রে কাজ করা সমবেত মেহনতিদের কাজ। যৌথ শ্রম ব্যক্তি শ্রমের চেয়ে ফলপ্রদ (উৎপাদনকর), যৌথ শ্রম দিয়ে ঢের বেশি সহজে এবং দ্রুত পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়। কিন্তু এই সমস্ত উন্নতি উপভোগ করে একা পুঁজিপতিই, সে শ্রমিককে একরকম কিছুই দেয় না, এবং শ্রমিকদের সমবেত শ্রম থেকে উদ্ভূত সমস্ত লাভ আত্মসাৎ করে। পুঁজিপতি হয়ে ওঠে আরও শক্তিশালী, আর শ্রমিক হয়ে পড়ে আরও দুর্বল, কেননা সে কোন এক রকমের কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, অন্য কাজে বদলি হওয়া, বৃত্তি বদলান তার পক্ষে আরও কঠিন।

পুঁজিপতিরা যন্ত্রপাতি চালু করে, এ হলো উৎপাদনে আর একটা, ঢের বেশি গুরুত্বসম্পন্ন উৎকর্ষ। যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে শ্রমের ফলপ্রদতা বহুগুণ বেড়ে যায়; কিন্তু পুঁজিপতি এই সমস্ত সুবিধা কাজে লাগায় শ্রমিকের বিরুদ্ধে; যন্ত্রপাতিতে কায়িক শ্রম লাগে কম, এই ব্যাপারটার সুযোগ নিয়ে সে তাতে লাগায় নারী আর অপ্রাপ্তবয়স্কদের, আর তাদের পয়সা দেয় কম। যেখানে যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয় সেখানে শ্রমিক লাগে অনেক কম, এই ব্যাপারটার সুযোগ নিয়ে সে দলে-দলে শ্রমিককে কারখানা থেকে বরখাস্ত করে, আর তখন এই বেকারির সুযোগে শ্রমিককে আরও বেশি করে বাঁধে দাসত্ববন্ধনে, কর্মদিন বাড়ায়, শ্রমিককে রাতের বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত করে, শ্রমিককে করে তোলে নিছক যন্ত্রের লেজুড়। যন্ত্রপাতির সৃষ্টি করা এবং সর্বক্ষণ বেড়ে চলা বেকারি তখন শ্রমিককে একেবারেই অরক্ষিত করে ফেলে। তার দক্ষতার আর দাম থাকে না, তার জায়গায় সহজেই আনা যায় কোন মামুলি অদক্ষ মেহনতিকে যে চটপট যন্ত্রে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং অপেক্ষাকৃত কম মজুরিতে কাজটা ধরে সানন্দে। পুঁজিপতিদের উৎপীড়ন প্রতিরোধ করার যেকোন চেষ্টা হলে বরখাস্ত হতে হয়। একার চেষ্টায় শ্রমিক পুঁজির বিরুদ্ধে নিতান্তই অসহায়, আর যন্ত্র তাকে পিষে ফেলতে চায়।

(ক) ৩। পূর্ববর্তী বিষয়টার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমরা দেখিয়েছি, যে পুঁজিপতি যন্ত্র চালু করে তার বিরুদ্ধে শ্রমিক একার চেষ্টায় অসহায় এবং অরক্ষিত। আত্মরক্ষা করার জন্যে শ্রমিককে পুঁজিপতিকে প্রতিরোধ করতে যেমন করে হোক উপায় বের করতে হয়। আর এমন উপায় সে দেখতে পায় সেটা হল সংগঠন। একার চেষ্টায় অসহায় শ্রমিক তার কমরেডদের সঙ্গে সংগঠিত হলে একটা শক্তি হয়ে ওঠে এবং পুঁজিপতির বিরুদ্ধে লড়তে, তার হামলা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।

বৃহৎ পুঁজির বিরুদ্ধে সম্মুখীন শ্রমিকের পক্ষে সংগঠন তখন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু একই কারখানায় কাজ করলেও পরস্পরের অপরিচিত পাঁচ মিশালী লোকরাশিকে সংগঠিত করা কি সম্ভব? অবস্থা শ্রমিকদের ঐক্যের জন্যে প্রস্তুত করে এবং তাদের মধ্যে গড়ে তোলে সংগঠিত করার ক্ষমতা আর সামর্থ্য, সেটা কর্মসূচিতে নির্দেশ করা হয়েছে। এইসব অবস্থা নিম্নলিখিতরূপ ঃ ১) যাতে সংবৎসর ধরে নিয়মিত কাজ আবশ্যক এমন যন্ত্রসজ্জিত উৎপাদনের বৃহৎ কারখানা শ্রমিক এবং ভূমি আর তার নিজ খামারের মধ্যকার সম্বন্ধে একেবারে ভেঙে দিয়ে তাকে পুরাদস্তুর প্রলেতারিয়ানে পরিণত করে। একটুকরো জমিতে প্রত্যেকের নিজের জন্যে কৃষিকাজ করার অবস্থাটা মেহনতিদের পৃথক-পৃথক করে রাখত, আর তাতে আসত প্রত্যেকের একটা কিছু বিশেষ-নির্দিষ্ট স্বার্থ যা তার সহ- মেহনতিদের স্বার্থ থেকে পৃথক, সেইভাবে সেটা ছিল সংগঠনের পথে অন্তরায়। ভূমির সঙ্গে শ্রমিকের কাঁটান-ছিড়েন এইসব অন্তরায়কে নষ্ট করে।

২) এরপর শত-শত আর হাজার-হাজার শ্রমিকের যৌথ কাজ আপনাতেই শ্রমিকদের অভাব প্রয়োজনাদি নিয়ে যৌথ আলোচনা করতে, যৌথ ব্যবস্থা অবলম্বন করতে অভ্যস্ত করে এবং সমগ্র শ্রমিকম-লীর অবস্থান আর স্বার্থের অভিন্নতাটাকে তাদের দেখিয়ে দেয় স্পষ্ট করে। ৩) শেষে এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় শ্রমিকদের ক্রমাগত বদলির ফলে তারা বিভিন্ন কারখানার অবস্থাদি আর রেওয়াজের মধ্যে তুলনা করতে অভ্যস্ত হয় এবং সমস্ত কারখানায় শোষণের অভিন্ন প্রকৃতি সম্বন্ধে দৃঢ় প্রত্যয় হতে, পুঁজিপতিদের সঙ্গে সংঘাতে অন্যান্য শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা লাভ করতে তারা সক্ষম হয়। আর এইভাবে বেড়ে চলে শ্রমিকদের সংহতি। একত্রে মিলে এইসব অবস্থাদির কারণেই বড় বড় কল-কারখানা দেখা দেবার ফলে শ্রমিকদের সংগঠনের উদ্ভব ঘটে। রুশ শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্যের প্রকাশ ঘটে প্রধানত এবং সবচেয়ে ঘনঘন ধর্মঘটের মধ্যে (ইউনিয়ন কিংবা পারস্পরিক কল্যাণ সমিতি আকারের সংগঠন আমাদের শ্রমিকদের নাগালের বাইরে কেন, তার কারণ নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে)। কল-কারখানা যত আরও বড় হয়ে ওঠে ততই বেশি ঘনঘন, প্রবল এবং নাছোড় হয়ে ওঠে শ্রমিকদের ধর্মঘট; পুঁজিতন্ত্রের উৎপীড়ন যত বাড়ে ততই বেশি আবশ্যক হয় শ্রমিকদের যৌথ প্রতিরোধ। কর্মসূচিতে যা বলা হয়েছে শ্রমিকদের বিভিন্ন ধর্মঘট আর বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহই এখন রুশি কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বহু বিস্তুত ব্যাপার। কিন্তু পুঁজিতন্ত্রের আরও বৃদ্ধি এবং ধর্মঘটের পৌনঃপুনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো অপ্রতুল প্রতিপন্ন হচ্ছে। মালিকেরা সেগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ ব্যবস্থা অবলম্বন করে; তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে, শ্রমিক আনে অন্যান্য এলাকা থেকে এবং সাহায্য চায় রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকদের কাছে, তারা শ্রমিকদের প্রতিরোধ চূর্ণ করতে তাদের সাহায্য করে। প্রত্যেকটা পৃথক কারখানার একজন ব্যক্তি মালিক শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সম্মুখীন হবার বদলে এখন তাদের বিরুদ্ধে সম্মুখীন হচ্ছে গোটা পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তার সহায়ক সরকার। গোটা পুঁজিপতি শ্রেণি সংগ্রামে নামে গোটা শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে; ঐ শ্রেণি ধর্মঘটের বিরুদ্ধে অবলম্বন করার জন্যে সাধারণ ব্যবস্থা বের করে, শ্রমিক শ্রেণি বিরোধী আইন পাস করবার জন্য সরকারের ওপর চাপ দেয়, কারখানা তুলে নিয়ে যায় অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী এলাকায়, যারা বাড়িতে কাজ করে তাদের মধ্যে কাজ বিলি করে দেয় এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আরও হাজারটা কল-কৌশল আর ফন্দি-ফিকির খাটায়। কোন পৃথক কারখানার এমনকি কোন পৃথক শিল্পেরও শ্রমিকদের সংগঠন দেখা যায় গোটা পুঁজিপতি শ্রেণিকে রুখবার জন্যে যথেষ্ট নয়, গোটা শ্রমিক শ্রেণির যৌথ ক্রিয়াকলাপ হয়ে ওঠে একেবারেই অপরিহার্য। এইভাবে শ্রমিকদের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহের মধ্য থেকে গড়ে ওঠে গোটা শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম। মালিকদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম শ্রেণিসংগ্রামে পরিণত হয়। বশবর্তী অবস্থায় শ্রমিকদের রাখা এবং তাদের যথাসম্ভব কম মজুরি দেবার একই স্বার্থ দিয়ে মালিকেরা ঐক্যবদ্ধ। মালিকেরা এটাও দেখতে পায় যে, গোটা মালিক শ্রেণির যৌথ ক্রিয়াকলাপ, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রভাববিস্তার করাই তাদের স্বার্থ নিরাপদ রাখার একমাত্র উপায়। শ্রমিকেরাও তেমনি একই স্বার্থের সূত্রে বাঁধা- সেটা হল পুঁজির পেষণে চূর্ণ হওয়া রোধ করা, জীবন আর মানুষের মতো অস্তিত্বের অধিকার তুলে ধরা। আর শ্রমিকেরা তেমনি দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে যে, তাদেরও চাই ঐক্য, চাই গোটা শ্রেণির, শ্রমিক শ্রেণির যৌথ ক্রিয়াকলাপ, আর সেই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর তাদের প্রভাব খাটানো চাই।

(ক) ৪। কারখানার শ্রমিক আর মালিকদের মধ্যে সংগ্রাম কীভাবে এবং কেন হয়ে ওঠে শ্রেণিসংগ্রাম- পুঁজিপতি শ্রেণি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণি প্রলেতারিয়ানদের সংগ্রাম তার ব্যাখ্যা আমরা দিয়েছি। প্রশ্ন ওঠে সমগ্র জনগণ এবং মেহনতি মানুষের পক্ষে এই সংগ্রামের তাৎপর্য কী? ১নং বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে যে সমসাময়িক অবস্থাদি সম্বন্ধে আমরা আগেই বলেছি তাতে মজুরি শ্রমিকদের দিয়ে করান উৎপাদন ক্ষুদে খামারকে উচ্ছেদ করে। মজুরি শ্রম দিয়ে যারা বেঁচে থাকে তাদের সংখ্যা বাড়ে দ্রুত আর কারখানার নিয়মিত শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ে শুধু তাই নয়, আরও বেশি বাড়ে সেই কৃষকদের সংখ্যা যাদেরও বাঁচার জন্যে মজুরি শ্রমিক হিসেবে কাজের খোঁজ করতে হয়। বর্তমানে মজুরি করা, পুঁজিপতির জন্যে খাটা ইতোমধ্যে হয়ে উঠেছে শ্রমের সবচেয়ে বহু বিস্তৃত ধরন। শিল্পের শুধু নয় কৃষিতেও জনসমষ্টির প্রধান অংশটা জুড়ে রয়েছে শ্রমের ওপর পুঁজির আধিপত্য। সমসাময়িক সমাজের যা অবলম্বনস্বরূপ সেই মজুরি শ্রমের ওপর শোষণটাকে এখন বড় বড় কল-কারখানা সর্বোচ্চ মাত্রায় বাড়িয়ে তুলছে। সমস্ত শিল্পে সমস্ত পুঁজিপতির ব্যবহৃত সমস্ত শোষণপ্রণালী, যেগুলো থেকে দুর্ভোগ ভোগে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণির মানুষের গোটা সমষ্টিটা, সেগুলোকে একেবারে কারখানার ভিতরে ঘনীভূত আর তীব্রতর করা হয়, করা হয় স্বাভাবিক ধারণানুযায়ী নিয়ম, আর সেগুলো প্রসারিত হয় শ্রমিকের শ্রম আর জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে, সেগুলো সৃষ্টি করে একটা গোটা রুটিন, একটা গোটা ব্যবস্থা যাতে করে পুঁজিপতি স্বল্প মজুরি দিয়ে শ্রমিককে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটায়। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে কথাটাকে স্পষ্ট করে তোলা যাক : সবসময় এবং সর্বত্র যে কেউ মজুরি করার কাজ করলে সে বিশ্রাম করে, কাছাকাছি পর্ব হলে সেই ছুটিতে যায় সেখানে। কারখানায় ব্যাপারটা একবারে অন্য রকম। কারখানার পরিচালকেরা কোন শ্রমিককে কাজে লাগালে তারা এই শ্রমিক নিয়ে বন্দোবস্ত করে মর্জিমাফিক- শ্রমিকটির অভ্যাস, তার রেওয়াজ জীবনযাত্রা প্রণালী, পরিবারে তার অবস্থান তার সাংস্কৃতিক চাহিদার দিকে একটুও নজর রাখে না। যখনই নিযুক্ত ব্যক্তির শ্রমের দরকার পড়ে তখনই কারখানা তাকে কাজে ঠেলে দেয়- তার গোটা জীবনটাকে কারখানার প্রয়োজন অনুসারে খাপ খাইয়ে নিতে, তার অবসর সময়টাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে বাধ্য করে, এবং সে শিফটে থাকলে তাকে রাত্রে এবং ছুটির দিনে কাজ করতে বাধ্য করে। কাজের সময়ের ব্যাপারে যত রকমের অনাচার কল্পনা করা যেতে পারে সবই কারখানা চালু করে দেয়, আর তারই সঙ্গে সঙ্গে চালু করে নিজ নিয়মাবলী, নিজ রেওয়াজ সেগুলো প্রত্যেকটি শ্রমিকের পক্ষে বাধ্যতামূলক। মজুরি খাটান শ্রমিক যতখানি শ্রম ঢালতে সক্ষম সবটা নিঙড়ে নিয়ে, সবচেয়ে চড়া বেগে সেটা নিঙড়ে নিয়ে পরে তাকে বের করে দেবার জন্যেই কারখানার সমস্ত হালচাল পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থিত! আর একটা দৃষ্টান্ত। যারা কোন কাজ নেয় তারা প্রত্যেকেই অবশ্য মালিকের অধীন হবার, হুকুমমতো সবকিছু করার কড়ার মেনে যায়। কিন্তু কেউ একটা অস্থায়ী কাজে মজুরি করতে গেলে সে কোনক্রমেই নিজ ইচ্ছা সমর্পণ করে না; মালিকের দাবি অন্যায় কিংবা মাত্রাতিরিক্ত মনে হলে সে তাকে ছেড়ে যায়। অন্যদিকে, কারখানা দাবি করে, শ্রমিককে তার ইচ্ছা সমর্পণ করতে হবে সম্পূর্ণতই; কারখানা তার চৌহদ্দির ভিতরে শৃঙ্খলা চালু করে, ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিককে কাজ শুরু কিংবা বন্ধ করতে বাধ্য করে; শ্রমিককে শাস্তি দেবার অধিকার নেয় নিজ হাতে, আর তার নিজেরই তৈরি করা নিয়মের প্রত্যেকটা লঙ্ঘনের জন্যে জরিমানা করে কিংবা পয়সা কেটে নেয়। শ্রমিক হয়ে পড়ে যন্ত্রপাতির বিশাল পুঞ্জের একটা উপাংশ। তাকে বাধ্য দাস্যাবদ্ধ আর নিজস্ব ইচ্ছাবর্জিত হতে হবে একেবারে যন্ত্রটারই মতো।

আরও একটা দৃষ্টান্ত। যে কেউ কোন কাজ নিলে মালিকের প্রতি তার অসন্তোষ ঘটে কখনও কখনও সে আদালতে কিংবা কোন সরকারি কর্মকর্তার কাছে মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। আদালত আর ঐ সরকারি কর্মকর্তা উভয়েই সাধারণত বিষয়টার নিষ্পত্তি করে মালিকের সপক্ষে, তাকে সমর্থন করে, কিন্তু মালিকের স্বার্থ এইভাবে তুলে ধরাটার ভিত্তি নয় কোন সাধারণ প্রনিয়ম কিংবা আইন, ভিত্তিটা হলো পৃথক-পৃথক কর্মকর্তার বশ্যতা, তারা বিভিন্ন সময়ে মালিককে রক্ষা করে কমবেশি মাত্রায় এবং তার সপক্ষে বিষয়টার অন্যায় নিষ্পত্তি করে, তার কারণ তারা হয় তার পরিচিত লোক, নইলে কাজের পরিবেশ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নয়, শ্রমিককে বুঝতে পারে না। এই রকমের প্রত্যেকটা পৃথক ঘটনা নির্ভর করে শ্রমিক আর মালিকের মধ্যে প্রত্যেকটা পৃথক বিরোধের ওপর। প্রত্যেকটি পৃথক কর্মকর্তার ওপর। অন্যদিকে, কারখানা এমন বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে একত্রে জড়ো করে উৎপীড়ন করে এত চড়া মাত্রায় যাতে প্রত্যেকটা পৃথক ব্যাপার নিয়ে বিচার বিবেচনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাধারণ প্রনিয়মাবলি বলবৎ করা হয়, শ্রমিক আর মালিকদের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়, যে আইন সবারই অবশ্যপালনীয়। এই আইনে মালিকের স্বার্থ তুলে ধরার পিছনে থাকে রাষ্ট্রের প্রাধিকার। পৃথক পৃথক কর্মকর্তার অবিচারের জায়গায় আসে আইনেরই অবিচার। যেমন নিম্নলিখিত বিভিন্ন ধরনের প্রনিয়ম দেখা যায় : শ্রমিক কাজে গরহাজির হলে তার মজুরি খোয়া যায় শুধু তাই নয় তদুপরি তাকে দিতে হয় জরিমানা, অথচ কাজ নেই বলে মালিক শ্রমিকদের ঘরে ফেরত পাঠালে তাকে কিছুই দিতে হয় না; শ্রমিক কড়া কথা বললে মালিক তাকে বরখাস্ত করতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের প্রতি অনুরূপ আচরণ করা হলে সে কাজ ছেড়ে যেতে পারে না; মালিক নিজ প্রাধিকার অনুসারে জরিমানা করতে পারে, মজুরি কেটে নিতে পারে কিংবা ওভারটাইম খাটাতে পারে, ইত্যাদি।

কারখানা কিভাবে শ্রমিকদের ওপর শোষণটাকে তীব্রতর করে তোলে এবং সেটাকে করে তোলে সর্বব্যাপী, সেটাকে নিয়ে তৈরি করে একটা গোটা তন্ত্র, তা আমরা দেখতে পাই এই সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে। ইচ্ছা অনিচ্ছা নির্বিশেষে শ্রমিককে এখন সম্পর্কে আসতে হয় ব্যক্তি মালিক, তার ইচ্ছা আর উৎপীড়নের সঙ্গে নয়, কিন্তু গোটা মালিক শ্রেণির কাছ থেকে সে যে স্বেচ্ছাচার উৎপীড়ন ভোগ করে সেটার সঙ্গে। শ্রমিক দেখতে পায়, কোন একজন পুঁজিপতি নয়, গোটা পুঁজিপতি শ্রেণিই তার উৎপীড়ক, কেননা শোষণ ব্যবস্থাটা সমস্ত প্রতিষ্ঠানে একই। ব্যক্তি পুঁজিপতি এই ব্যবস্থা থেকে অন্যদিকে যেতে পারেই না। যেমন, সে যদি কাজের সময় কমাতে মনস্ত করে তাহলে তার প্রতিবেশি আর একজন কারখানা মালিকের চেয়ে তার পণ্যদ্রব্যের খরচ পড়বে বেশি, অপর কারখানা মালিক তার নিযুক্ত লোকদের আরও বেশি সময় খাটায় একই মজুরিতে। নিজ অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে শ্রমিককে এখন মোকাবিলা করতে হয় সেই গোটা সমাজব্যবস্থাটার সঙ্গে যার লক্ষ্য হলো শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণ। কোন ব্যক্তি কর্মকর্তার কোন পৃথক অবিচার নয়, শ্রমিকের বিরুদ্ধে এখন সম্মুখীন হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অবিচার, যে কর্তৃপক্ষ গোটা পুঁজিপতি শ্রেণিটাকে নিজ রক্ষণাধীন করে এবং ওই শ্রেণির স্বার্থসেবী, কিন্তু সবারই অবশ্যপালনীয় আইন পাস করে। এইভাবে, মালিকদের বিরুদ্ধে কারখানা শ্রমিকদের সংগ্রাম অনিবার্যভাবেই গোটা পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে, শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে স্থাপিত গোটা সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে পরিণত হয়। এই কারণেই শ্রমিকদের সংগ্রামে আসে সামাজিক তাৎপর্য, যে সমস্ত শ্রেণির চলে অন্যান্যের শ্রমের ওপর তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত মেহনতি মানুষের একটা সংগ্রাম হয়ে ওঠে শ্রমিকদের সংগ্রামে। এই কারণেই শ্রমিকদের সংগ্রাম একটা নতুন যুগের সূচনা করছে রুশ ইতিহাসে, এ সংগ্রাম শ্রমিকদের মুক্তির উদয়কাল।

সমগ্র মেহনতি জনরাশির ওপর পুঁজিপতি শ্রেণির আধিপত্যের ভিত্তিটা কি? ভিত্তিটা হলো এই: সমস্ত কারখানা, মিল, খনি, যন্ত্রপাতি আর শ্রমের সাধিত্র পুঁজিপতিদের হাতে, তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি; তারা বিপুল পরিমাণ ভূমির মালিক (ইউরোপীয় রাশিয়ার সমস্ত ভূমির তৃতীয়াংশের বেশিটা ভূমিসম্পত্তি মালিকদের, সংখ্যায় তারা পাঁচ লক্ষও নয়) শ্রমিকরা কোন শ্রম সাধিত্র বা মালমশলার মালিক নয়, তাকেই তাদের শ্রমশক্তি বিক্রি করতে হয় পুঁজিপতিদের কাছে, এরা শ্রমিকদের দেয় শুধু যা যা জীবন ধারণের জন্য আবশ্যক, আর শ্রম দিয়ে উৎপন্ন সমস্ত উদ্বৃত্ত ফেলে নিজেদের পকেটে। এইভাবে এরা ব্যবহৃত শ্রম কাজের শুধু একাংশের পয়সা দেয়, বাদ বাকিটা আত্মসাৎ করে। শ্রমিক সমষ্টির সমবেত শ্রমে কিংবা উৎপাদনে উৎকর্ষ থেকে সম্পদের যত বৃদ্ধি ঘটে সবটাই যায় পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে, আর পুরুষানুক্রমে মেহনত করে যে শ্রমিকেরা তারা সম্পত্তিবিহীন প্রলেতারিয়ান হয়েই থেকে যায়। এই কারণে শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণ খতম করার উপায় আছে একটাই, সেটা হলো-শ্রম সাধিত্রে ব্যক্তিগত মালিকানার লোপ করা, সমস্ত কারখানা, মিল, খনি, আর সমস্ত বড় ভূমিসম্পত্তি ইত্যাদিও সমগ্র সমাজের হাতে তুলে দেয়া এবং সবাই একত্রে মিলে শ্রমিকদের নিজেদেরই পরিচালিত সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন চালান। একত্রে সবার শ্রম উৎপন্ন হবে সেটা লাগান হবে শ্রমিকদের নিজেদেরই প্রয়োজন মেটাতে, বিজ্ঞান আর শিল্পকলার যাবতীয় সাধনসাফল্য উপভোগ করতে তাদের সমস্ত সামর্থ্য আর সমান অধিকারের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্যে। এই কারণেই কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, শ্রমিক শ্রেণি আর পুঁজিপতিদের মধ্যে সংগ্রাম শেষ করতে পারে কেবল এই উপায়েই। তবে এটা হাসিল করতে হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা যাওয়া চাই পুঁজিপতি আর ভূস্বামীদের প্রভাবাধীন সরকারের হাত থেকে কিংবা সরাসরি পুঁজিপতিদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গড়া সরকারের হাত থেকে শ্রমিক শ্রেণির হাতে।

এটাই শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য, এটাই শ্রমিক শ্রেণির পূর্ণ মুক্তির শর্ত। শ্রেণিসচেতন, সংগঠিত শ্রমিকদের সচেষ্ট হওয়া চাই এই চূড়ান্ত লক্ষ্যের জন্য; তবে এখানে, রাশিয়ায় তাদের পথে এখনও রয়েছে প্রচন্ড বাধা-বিঘ্ন, সেগুলো মুক্তিসংগ্রামে তাদের ব্যাহত করছে।

(ক) ৫। সমস্ত ইউরোপীয় দেশের শ্রমিকেরা এবং আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিকেরাও এখন পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণির সংগঠন আর সংহতি কোন একটা দেশে কিংবা একটা জাতিসত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সারা পৃথিবীর শ্রমিকদের স্বার্থ আর লক্ষ্যের পূর্ণ অভিন্নতা (সংহতি) সশব্দে ঘোষণা করছে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক পার্টিগুলি তারা একত্রে মিলিত হয় বিভিন্ন যুক্ত কংগ্রেসে, সমস্ত দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির কাছে একই দাবিদাওয়া তুলে ধরে, তারা স্থাপন করেছে মুক্তির জন্যে সচেষ্ট সমগ্র সংগঠিত প্রলেতারিয়েতের একটা আন্তর্জাতিক উৎসব দিন (মে দিবস), এইভাবে সমস্ত জাতিসত্তা আর সমস্ত দেশের শ্রমিক শ্রেণিকে দৃঢ়সংলগ্ন করে তারা গড়ে তুলছে এক বিরাট শ্রমিক বাহিনী। শ্রমিকদের ওপর কর্তৃত্ব করে যে পুঁজিপতি শ্রেণি সেটা কর্তৃত্ব কোন একটা দেশে গন্ডিবদ্ধ রাখে না, এরই মধ্যে আসছে সমস্ত দেশের শ্রমিকদের ঐক্যের অপরিহার্যতা। বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠতর আর বিস্তৃততর হয়ে উঠেছে; এক দেশ থেকে অন্য দেশে পুঁজির চলাচল ঘটছে নিরন্তর। প্রকান্ড-প্রকান্ড যেসব ন্যাসরক্ষক পুঁজি একত্রে জড়ো করে ঋণ হিসাবে পুঁজিপতিদের মধ্যে বণ্টন করে সেই ব্যাঙ্কগুলো জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরু হয়ে পরে হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক, পুঁজি সমাহরণ করে সমস্ত দেশ থেকে এবং সেটাকে বণ্টন করে ইউরোপ আর আমেরিকার পুঁজিপতিদের মধ্যে। কোন এক দেশে নয়, একই সময়ে কয়েকটা দেশে বিভিন্ন পুঁজিতান্ত্রিক কারবার স্থাপনের জন্যে এখন সংগঠিত হচ্ছে প্রকান্ড প্রকান্ড জয়েন্ট স্টক কোম্পানি; দেখা দিচ্ছে পুঁজিপতিদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিমেল। পুঁজিতান্ত্রিক আধিপত্য আন্তর্জাতিক। তাই, আন্তর্জাতিক পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা যুক্তভাবে লড়লে একমাত্র তবেই মুক্তির জন্যে সমস্ত দেশের শ্রমিকদের সংগ্রাম সাফল্যমন্ডিত হতে পারে। এই কারণে পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রুশ শ্রমিকের হলো জার্মান শ্রমিক, পোলীয় শ্রমিক আর ফরাসি শ্রমিক, ঠিক যেমন তার শত্রু হলো রুশ, পোলীয় আর ফরাসি পুঁজিপতিরা। সাম্প্রতিক কালে বৈদেশিক পুঁজিপতিরা সাগ্রহে তাদের পুঁজি স্থানান্তর করেছে রাশিয়ায়, যেখানে তৈরি হয়েছে শাখা কারখানা; আর বিভিন্ন কোম্পানি পত্তন করেছে নতুন নতুন শিল্পায়তন চালাবার জন্যে। লোভাতুর হয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে এই নবীন দেশটার ওপর। যেখানে সরকার অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে বেশি পরিমাণে পুঁজির প্রতি প্রসন্ন, পুঁজির পা-চাটা, সেখানে তারা দেখে এমনসব শ্রমিক যারা পশ্চিমের চেয়ে কম সংগঠিত এবং লড়াইয়ে কম বড়, আর যেখানে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান অনেক নিচু এবং তারা দেখে মজুরিও অনেক কম, যাতে বৈদেশিক পুঁজিপতিরা তাদের দেশে যার জুড়ি মেলে না এমন পরিসরে বিপুল লাভ তুলে নিতে পারে। আন্তর্জাতিক পুঁজি ইতোমধ্যে রাশিয়ার দিকে হাত বাড়িয়েছে। রুশ শ্রমিকরা হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদ্দেশ্যে।

(খ) ১। এটাই কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সর্বপ্রধান উপাদান, কেননা শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য কী হবে পার্টির ক্রিয়কলাপ, শ্রেণিসচেতন শ্রমিকদের ক্রিয়াকলাপ, সেটা এতে নির্দেশ করা হয়েছে। বৃহদায়তন কারখানাগুলোর সৃষ্টি করা জীবনযাত্রার অবস্থা থেকে উদ্ভুত জন আন্দোলনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের জন্যে প্রচেষ্টা, মানুষের ওপর মানুষের যুগ যুগান্তরের শোষণ অবসানের প্রচেষ্টা সংযুক্ত করতে হবে কিভাবে সেটা এতে নির্দেশ করা হয়েছে।

শ্রমিকদের শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলাই হওয়া চাই পার্টির ক্রিয়াকলাপ। শ্রমিকদের সাহায্য করার কোন ফ্যাশনমাফিক উপায় বের করা নয়, পার্টির কাজ হলো শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া, তাতে জ্ঞানলোক দেওয়া, শ্রমিকরা নিজেরাই ইতোমধ্যে যে সংগ্রাম শুরু করেছে তাতে তাদের সহায়তা করা। শ্রমিকদের স্বার্থ তুলে ধরা এবং শ্রমিক শ্রেণির গোটা আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করাই পার্টির কাজ। শ্রমিকদের আন্দোলনে তাদের এই সহায়তা করাটা তাহলে কী হওয়া চাই?

কর্মসূচিতে বলা হয়েছে এই সহায়তা হওয়া চাই প্রথমত শ্রমিকদের শ্রেণিচেতনা গড়ে তোলা। মালিকদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম কীভাবে হয়ে ওঠে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রাম সে সম্পর্কে আমরা আগেই বলেছি।

শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা বলতে কী বুঝায় সেটা আমরা বিষয়টা সম্বন্ধে যা বলেছি তার থেকে বেরিয়ে আসে। বড় বড় কল-কারখানার সৃষ্টি করা পুঁজিপতি আর কারখানা মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানই শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন আর মুক্তি হাসিল করার একমাত্র উপায়। এই মর্মে তাদের উপলব্ধিই শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা। তাছাড়া যে কোন একটা দেশে সমস্ত শ্রমিকের স্বার্থ অভিন্ন, তারা সবাই মিলে একই শ্রেণি, যা সমাজের অন্যান্য শ্রেণি থেকে পৃথক,এই উপলব্ধি হলো শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা, শেষে শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা বলতে বুঝায় এই উপলব্ধি যে লক্ষ্যগুলি সাধনের উদ্দেশ্যে রাজকার্যে শ্রমিকদের প্রভাববিস্তারের জন্যে কাজ করতে হবে, ঠিক যেমনটা ভূস্বামী আর পুঁজিপতিরা করেছে এবং এখনও করে চলেছে।

এই সব কিছু সম্বন্ধে শ্রমিকদের উপলব্ধি ঘটে কোন উপায়ে? মালিকদের বিরুদ্ধে তারা যে সংগ্রাম চালাতে শুরু করে, যে সংগ্রাম বর্ধিত মাত্রায় বিকশিত হয়, তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং বড় বড় কল-কারখানা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যাতে আরও বেশি বেশি সংখ্যায় শ্রমিক জড়িত হয়, তারই থেকে নিরন্তর অভিজ্ঞতা পেয়ে তাদের এই উপলব্ধি ঘটে। এমন এক সময় ছিল যখন পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের বৈরিতা প্রকাশ পেত কেবল তাদের শোষকদের প্রতি ঝাপসা ঘৃণাবোধে। তাদের ওপর উৎপীড়ন আর দাসত্ব বন্ধন সম্বন্ধে ঝাঁপসা চেতনায় এবং পুঁজিপতিদের ওপর প্রতিহিংসা নেবার কামনায়। সংগ্রাম তখন প্রকাশ পেত শ্রমিকদের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহে, তাতে তারা ঘরবাড়ি ধ্বংস করতো, যন্ত্রপাতি ভেঙে চুরমার করতো, কারখানার পরিচালকদের ওপর হামলা চালাতো ইত্যাদি। সেটা ছিল শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের প্রথম, প্রারম্ভিক আকার, আর সেটা ছিল অবশ্যম্ভাবী, কেননা সব সময়ে সর্বত্র পুঁজিপতিদের প্রতি ঘৃণাই ছিল শ্রমিকদের মধ্যে আত্মরক্ষা কামনা জাগাবার দিকে প্রথম তাড়না। তবে, রুশ শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন বেড়ে এই প্রারম্ভিক আকার ছাড়িয়ে এসেছে ইতোমধ্যে। পুঁজিপতির প্রতি আবছা ঘৃণার বদলে শ্রমিকেরা ইতোমধ্যে শ্রমিক শ্রেণি আর পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের দ্বন্দ্ব বুঝতে শুরু করেছে। উৎপীড়ন সম্বন্ধে আবছা বোধের বদলে তারা পুঁজি যেসব উপায় উপকরণ দিয়ে তাদের উৎপীড়ন করে সেগুলোকে চিনতে শুরু করেছে, এবং বিভিন্ন ধরনের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, পুঁজিতান্ত্রিক উৎপীড়ন গন্ডিবদ্ধ করছে, পুঁজিপতিদের লালসা থেকে আত্মরক্ষা করছে। পুঁজিপতিদের ওপর প্রতিহিংসা নেবার বদলে এখন সুযোগ সুবিধার জন্যে লড়াই ধরছে, একটার পরে একটা দাবি নিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণির সম্মুখীন হতে শুরু করেছে, দাবি করছে কাজের উন্নততর পরিবেশ, মজুরি বৃদ্ধি আর খাটো কর্মকাল। শ্রমিক শ্রেণি যে অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করে তারই কোন বিশেষ দিকের ওপর শ্রমিকদের সমস্ত মনোযোগ আর সমস্ত প্রচেষ্টা কেন্দ্রীভূত হয় প্রত্যেকটা ধর্মঘটে। প্রত্যেকটা ধর্মঘট থেকে এইসব অবস্থা সম্বন্ধে আলোচনা ওঠে; সেগুলোর মূল্যায়ন করতে কোন বিশেষ ক্ষেত্রে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপীড়নটা কিসে এবং এই উৎপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোন উপায় লাগানো যেতে পারে সেটা বুঝতে প্রত্যেকটা ধর্মঘট শ্রমিকদের সহায়ক হয়। সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে প্রত্যেকটা ধর্মঘট। কোন ধর্মঘট সাফল্যমন্ডিত হলে অনুপ্রাণিত হয় তাদের সাথীদের সাফল্য কাজে লাগাবার জন্যে। সেটা সাফল্যমন্ডিত না হলে ব্যর্থতার কারণ সম্বন্ধে এবং সংগ্রামের উন্নততর প্রণালী সন্ধানের জন্যে আলোচনা দেখা দেয়। অত্যাবশ্যক প্রয়োজনগুলোর জন্যে দৃঢ় সংগ্রামে, সুযোগ সুবিধা আর জীবনযাত্রার অবস্থা, মজুরি এবং কর্মকালের উন্নতির জন্যে লড়াইয়ে শ্রমিকদের এই উত্তরণ যা এখন শুরু হয়ে গেছে সারা রাশিয়ায় তার অর্থ হলো বিপুল অগ্রগতি ঘটছে রুশি শ্রমিকদের আর সেই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি আর সমস্ত শ্রেণি সচেতন শ্রমিকের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হওয়া চাই প্রধানত এই সংগ্রামের ওপর, এটাকে অগ্রসর করাবার ওপর। শ্রমিকদের সবচেয়ে জরুরি যেসব প্রয়োজন মেটাবার জন্যে লড়া দরকার সেগুলো তাদের দেখিয়ে দেওয়া, শ্রমিকদের বিভিন্ন বর্গের অবস্থার অবনতি ঘটে বিশেষত যেসব কারণে সেগুলোর বিশ্লেষণ করা, যেসকল কারখানা আইন আর প্রনিয়ম লঙ্ঘনের ফলে (আর তার সঙ্গে পুঁজিপতিদের শঠ ফন্দি ফিকির মিলে) শ্রমিকেরা প্রায়ই হয়ে পড়ে দুমুখো ডাকাতির শিকার, সেইসব আইন প্রনিয়মের ব্যাখ্যা দেওয়া- এইগুলো হওয়া দরকার শ্রমিকদের প্রতি সহায়তা। এই সহায়তা হওয়া দরকার- শ্রমিকদের দাবিদাওয়াকে আরও যথাযথ এবং স্পষ্ট রূপে প্রকাশ করা এবং সেগুলোকে সাধারণ্যে হাজির করা, প্রতিরোধের সবচেয়ে উপযোগী সময়টার বাছন, সংগ্রামের প্রণালী নির্বাচন, দুই বিরুদ্ধ পক্ষের অবস্থান আর শক্তি নিয়ে আলোচনা, লড়াইয়ের আরও ভাল কায়দা বেছে নেয়া যেতে পারে কি না সেটা নিয়ে আলোচনা (কায়দাটা হয়তো হতে পারে কারখানা মালিকের কাছে চিঠি পাঠানো, কিংবা পরিস্থিতি অনুসারে যখন সরাসরি ধর্মঘট সংগ্রাম যুক্তিসঙ্গত নয়, পরিদর্শক কিংবা ডাক্তারের কাছে যাওয়া ইত্যাদি)।

আমরা বলেছি এমন সংগ্রামে রুশিদের উত্তরণ হলো তারা যে অগ্রগতি ঘটিয়েছে তারই নিদর্শন। এই সংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে তুলে ধরে (নিয়ে যায়) সিধে সদর রাস্তায়, এই সংগ্রাম ওই আন্দোলনের পরবর্তী সাফল্যের নিশ্চায়ক। মেহনতি মানুষের প্রধান অংশটা এই সংগ্রাম থেকে শেখে প্রথমত পুঁজিতান্ত্রিক শোষণের কায়দাগুলোকে একে একে চিনতে আর বিচার বিবেচনা করতে, এবং আইনের সঙ্গে নিজেদের জীবনযাত্রার অবস্থার সঙ্গে আর পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে সেগুলোকে তুলনা করতে, শোষণের বিভিন্ন ধরণ আর ঘটনা বিচার বিবেচনা করে শ্রমিকরা সমগ্রভাবে শোষণের তাৎপর্য আর মর্ম বুঝতে শেখে, বুঝতে শেখে শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণের ভিত্তিতে স্থাপিত সমাজব্যবস্থাকে। দ্বিতীয়ত এই সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের শক্তি পরখ করে, সংগঠিত হতে শেখে, সংগঠনের আবশ্যকতা আর তাৎপর্য বুঝতে শেখে। এই সংগ্রামের প্রসার এবং সংঘাতের ক্রমবর্ধমান পৌনঃপুনিকতার ফলে অনিবার্যভাবেই সংগ্রাম আরও প্রসারিত হয়, গড়ে ওঠে ঐক্যবোধ আর সংহতি বোধ- প্রথমে কোন একটা এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে, আর তারপরে গোটা দেশের শ্রমিকদের মধ্যে, সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে। তৃতীয়ত, এই সংগ্রাম বিকশিত করে শ্রমিকদের রাজনৈতিক চেতনা। মেহনতি মানুষের বিপুল অংশের জীবনযাত্রার অবস্থা তাদের এমন জায়গায় ফেলে দেয় যাতে রাষ্ট্র সংক্রান্ত প্রশ্নাবলী নিয়ে বিবেচনা করার অবসর অথবা সুযোগ তাদের থাকে না (থাকতে পারে না)। অন্যদিকে দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্যে কারখানা মালিকের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম শ্রমিকদের মধ্যে যে তাগিদ সৃষ্টি করে তাতে আপনা থেকে আর অনিবার্যভাবেই তাদের ভাবতে হয় রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে, রুশ রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়, আইন প্রনিয়ম জারি হয় কীভাবে, আর সেগুলো কার স্বার্থের সেবা করে, এইসব প্রশ্ন নিয়ে। কারখানায় প্রত্যেকটা সংঘাতের ফলে আইনকানুন আর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শ্রমিকদের বিরোধ বাধে, এটা অবশ্যম্ভাবী। শ্রমিকরা রাজনৈতিক বক্তৃতা প্রথমবার শোনে এই প্রসঙ্গে। সেটা প্রথমে আসে, ধরা যাক, কারখানা পরিদর্শকদের কাছ থেকে। তারা তাদের কাছে ব্যাখ্যা করে বলে তাদের ঠকাবার জন্যে কারখানা মালিকের খাটান ফিকিরটা কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত প্রতিনিয়মের যথাযথ অর্থের ভিত্তিতেই স্থাপিত- শ্রমিকদের ঠকাবার অবাধ সুযোগ দেয় ওই প্রনিয়ম, কিংবা তারা বলে কারখানা মালিকের উৎপীড়নকর ব্যবস্থা একেবারেই আইনসঙ্গত, কেননা সে শুধু নিজের অধিকার কাজে খাটাচ্ছে, অমুক কিংবা অমুক আইন বলবৎ করছে, যে আইন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত, ওই কর্তৃপক্ষ সেই আইন প্রতিপালিত করাবার ব্যবস্থা করে। পরিদর্শক মহাশয়েদের রাজনীতিক ব্যাখ্যাটাকে কখনও কখনও সম্পূরক বলে মন্ত্রীরা আরও বেশি উপকারী রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, মন্ত্রী শ্রমিকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শ্রমিকদের শ্রম থেকে অগাধ পয়সা করার জন্যে কারখানা মালিকদের প্রতি তাদের খৃষ্টীয় প্রেম অবশ্য কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের এইসব ব্যাখ্যা এবং এই কর্তৃপক্ষ কার ভালোর জন্য কাজ চালায় সেটা যাতে দেখা যায় এমনসব তথ্যাদির সঙ্গে শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সঙ্গে পরে আরও যুক্ত হয় কোন লিফলেট কিংবা সমাজতন্ত্রীদের দেওয়া অন্যান্য ব্যাখ্যা, তার ফলে এমন ধর্মঘট থেকে শ্রমিকেরা রাজনৈতিক শিক্ষা পায় পুরোপুরি। শ্রমিক শ্রেণির বিশেষ নির্দিষ্ট স্বার্থটাই শুধু নয়, রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির বিশেষ নির্দিষ্ট স্থানটাও তার বুঝতে শেখে। এইভাবে, শ্রমিকদের শ্রেণিসংগ্রামে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি যে সহায়তা করতে পারে সেটা হওয়া চাই: শ্রমিকদের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনগুলোর জন্য লড়াইয়ে সহায়তা করে তাদের শ্রেণিচেতনা বিকশিত করা।

দ্বিতীয় ধরনের সহায়তা হল শ্রমিকদের সংগঠন এগিয়ে নেওয়া, যা বিবৃত হয়েছে কর্মসূচিতে। একটু আগে যে সংগ্রামের কথা বর্ণিত হয়েছে তার থেকে এটা আসে যে, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়াটা অপরিহার্য। ধর্মঘটের ব্যাপারে সংগঠন অপরিহার্য হয়ে ওঠে যাতে ধর্মঘট বিপুল সাফল্যের সঙ্গে চালিত হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্যে, ধর্মঘটিদের সমর্থনে অর্থাদি সংগ্রহের জন্য, শ্রমিকদের পারস্পরিক কল্যাণ সমিতি স্থাপনের জন্য এবং তাদের মধ্যে লিফলেট, ঘোষণা, ইশতেহার, ইত্যাদি প্রচারের জন্য। শ্রমিকেরা যাতে পুলিশ আর সশস্ত্র পুলিসের নির্যাতন থেকে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয় সেজন্য ওদের কাছ থেকে শ্রমিকদের সমস্ত যোগাযোগ আর সমিতি গোপন রাখার জন্য এবং বই, পুস্তিকা, সংবাদপত্র ইত্যাদি পৌঁছে দেবার বন্দোবস্তের জন্য সংগঠন আবশ্যক আরও বেশি।এই সবকিছুতে সহায়তা করা হয় পার্টির দ্বিতীয় কাজ।

তৃতীয় কাজ হলো সংগ্রামের আদত লক্ষ্যগুলি নির্দেশ করা, অর্থাৎ শ্রমিকদের কাছে ব্যাখ্যাকারে বলা শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণটা, কিসে, তার ভিত্তিটা কী, ভূমি আর উৎপাদন সাধিত্রে ব্যক্তিগত মালিকানার ফলে মেহনতি জনগণের গরিবি ঘটে কীভাবে, পুঁজিপতিদের কাছে তারা শ্রম বিক্রি করতে এবং শ্রমিকদের জীবনধারনের জন্য যা আবশ্যক তার উপরি শ্রমিকদের শ্রম দিয়ে উৎপন্ন উদ্বৃত্তের সবটা অমনি দিতে তারা বাধ্য হয় কেন, তার উপরে আরও এটা ব্যাখ্যা করা কিভাবে এই শোষণ থেকে অনিবার্যভাবেই আসে শ্রমিক আর পুঁজিপতিদের মধ্যে শ্রেণি সংগ্রাম, এই সংগ্রামের পরিবেশ এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য কী- এককথায় কর্মসূচিতে যা বিবৃত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া।

(খ) ২। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম একটা রাজনৈতিক সংগ্রাম-এই কথাটায় কী বুঝায়? কথাটায় বুঝায় এই যে, রাজকার্যের ওপর রাষ্ট্রের প্রশাসনের ওপর, আইনসংক্রান্ত বিষয়াবলীর ওপর প্রভাব বিস্তার না করে শ্রমিক শ্রেণি নিজ মুক্তির জন্য লড়তে পারে না। রুশি পুঁজিপতিরা এমন প্রভাবের আবশ্যকতা বুঝেছে দীর্ঘকাল যাবত, আর আমরা দেখিয়েছি, পুলিশের আইন কানুনে হরেক রকমের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করার হাজারটা উপায় বের করতে পেরেছে কীভাবে, আর কীভাবে এই কর্তৃপক্ষ পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ সেবা করে। এইভাবে এর থেকে স্বভাবতই এটা বেরিয়ে আসে যে, শ্রমিক শ্রেণিও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত না করলে তার সংগ্রাম চালাতে পারে না, এমনকি নিজ হালতের কোন সুস্থিত উন্নতি ঘটাতেও পারে না।

আমরা আগেই বলেছি, পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম থেকে সরকারের সঙ্গে বিরোধ বাধা অবশ্যম্ভাবী, আর শ্রমিকরা যে কেবল সংগ্রাম আর যৌথ প্রতিরোধ দিয়েই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে পারে সেটা তাদের কাছে প্রমাণ করার জন্য সর্বতোভাবে সচেষ্ট রয়েছে সরকারই। রাশিয়ায় ১৮৮৫-১৮৮৬ সালের বড় বড় ধর্মঘট থেকে এটা দেখা গিয়েছিল বিশেষ স্পষ্টভাবে। সরকার অবিলম্বে শ্রমিকদের সম্বন্ধে প্রনিয়মাবলি রচনা করতে বসেছিল, কারখানায় চলিতকর্ম সম্বন্ধে নতুন নতুন আইন জারি করেছিল সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছিল শ্রমিকদের নাছোড় দাবিগুলো (যেমন, জরিমানা সীমাবদ্ধ করা এবং ঠিকমতো মজুরি দেবার ব্যবস্থা করে প্রনিয়ম চালু করা হয়েছিল); সেই একইভাবে এখনকার ধর্মঘটগুলো (১৮৯৬ সালে) আবার সরকারের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ ঘটিয়েছে, আর সরকার ইতোমধ্যে বুঝেছে কেবল গ্রেপ্তার আর নির্বাসনের ব্যাপারের মধ্যে থাকা চলে না, কারখানা মালিকদের সমুন্নত আচরণ নিয়ে নির্বোধ উপদেশামৃত শ্রমিকদের সেবন করান হাস্যকর (১৮৯৬ সালের বসন্তকালে কারখানা পরিদর্শকদের কাছে অর্থমন্ত্রী ভিত্তের সার্কুলার দ্রষ্টব্য)। সংগঠিত শ্রমিকেরা এমন শক্তি যা বিবেচনায় ধর্তব্য; এটা সরকার উপলব্ধি করেছে, তাই কারখানা আইনকানুন ইতোমধ্যে তার পর্যালোচনাধীন হয়েছে, কর্মকাল কমান এবং শ্রমিকদের অন্যান্য অপরিহার্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আলোচনার জন্যে সিনিয়র কারখানা পরিদর্শকদের সম্মেলন বসাচ্ছে সেন্ট পিটার্সবুর্গে।

এইভাবে দেখা যাচ্ছে পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম রাজনৈতিক সংগ্রাম হওয়াই অবশ্যম্ভাবী। প্রকৃতপক্ষে এই সংগ্রাম ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছে; রাজনৈতিক তাৎপর্যসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। তবে, শ্রমিকদের রাজনৈতিক অধিকার নেই একেবারেই, সে সম্বন্ধে আমরা আগেই বলেছি, আর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর শ্রমিকদের প্রকাশ্যে এবং সরাসরি প্রভাব খাটান অসম্ভব, সেটা শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন বিকশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি স্পষ্ট করে এবং প্রখরভাবে প্রকাশ পাচ্ছে এবং অনুভূত হচ্ছে। এই কারণে শ্রমিকদের সবচেয়ে জরুরি দাবি রাজকার্যের ওপর শ্রমিকদের প্রভাবের প্রধান লক্ষ্য হওয়া চাই রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন, অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় সমস্ত নাগরিকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, যা আইন দিয়ে নিশ্চিত, সমস্ত নাগরিকের অবাধে সমবেত হওয়া নিজেদের বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা করা, নিজেদের সমিতি আর পত্র পত্রিকা মারফত রাজকার্যের ওপর প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করার অধিকার। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন শ্রমিকদের চূড়ান্ত গুরুত্বসম্পন্ন কাজ হয়ে উঠেছে, তার কারণ সেটা না হলে রাজকার্যের ওপর শ্রমিকদের কোন প্রভাব থাকে না, থাকতে পারে না, তার ফলে শ্রমিকেরা অধিকারবিহীন, হীনাবস্থা, অস্পুট শ্রেণি হয়েই থেকে যায়। শ্রমিকেরা এখন লড়তে এবং একাট্টা হতে শুরু করেছে সবেমাত্র, এই এখনই আন্দোলন আরও বৃদ্ধি রোধ করার জন্য সরকার ইতোমধ্যেই তড়িঘড়ি শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা দিতে আসছে, তাহলে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, শ্রমিকেরা পুরোপুরি একাট্টা হয়ে গেলে এবং একই রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করতে পারবে, নিজেদের এবং সমগ্র রুশ জনগণের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে।

সমসাময়িক সমাজে এবং সমসাময়িক রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির স্থান কোথায়, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের লক্ষ্য কী, তা কর্মসূচির পূর্ববর্তী অংশগুলোতে নির্দেশ করা হয়েছে। সরকারের নিরঙ্কুশ শাসনের অধীনে রাশিয়া কোন প্রকাশ্য সক্রিয় কোন রাজনৈতিক পার্টি নেই, থাকতে পারেও না। কিন্তু যারা অন্যান্য শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এবং জনমত আর সরকারের ওপর প্রভাব খাটায় এমন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতধারা রয়েছে। কাজেই সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির মতাদর্শগত অবস্থান স্পষ্ট করবার জন্য রুশি সমাজের বাদবাকি রাজনৈতিক মত ধারাগুলির প্রতি এর মনোভাব এখন প্রকাশ করা আবশ্যক, যাতে শ্রমিকেরা স্থির করতে পারে কে তাদের মিত্র হতে পারে এবং সেটা কী পরিমাণে, আর কে তাদের শত্রু।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লববার্ষিকী ২০১৮


মাওবাদী ধরার নামে শিশু-হত্যা ভারতীয় বাহিনীর

মাওবাদী খোঁজার অভিযানে শিশুহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় ঝাড়খণ্ডের পুলিশ ও সিআরপিএফ। পালামৌ জেলার বাকোরিয়ায় এই বীভৎস ঘটনা গত শুক্রবারের। সেই বাকোরিয়া, যেখানে পুলিশ-আধা সেনার তথাকথিত মাওবাদী বিরোধী অভিযানে ১১ জন নিহত হয়েছিলেন। সেই গণহত্যা নিয়ে ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত চলছে। তার মধ্যেই বাবা-কে না-পাওয়ার পরিণামে উন্মত্ত বাহিনী তিন বছরের একটি শিশুকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠল। পালামৌর পুলিশ সুপার অজয় লিন্ডা সোমবার সংবাদমাধ্যমে এই অভিযোগ দায়েরের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, তদন্ত শুরু হয়েছে।

সন্তানহারা ববিতা দেবী অভিযোগে জানিয়েছেন, শুক্রবার গভীর রাতে পুলিশ-সিআরপিএফের একটি দল বাকোরিয়া গ্রামে তাঁদের বাড়িতে আসে। ববিতার স্বামী বিনোদ সিংয়ের খোঁজ করে। যৌথ বাহিনী দাবি করে, বিনোদ নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠন ঝাড়খণ্ড জনমুক্তি মোর্চার সদস্য। পুলিশ ও জওয়ানরা জোর করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে সব তছনছ করে। বিনোদকে না পেয়ে তিন বছরের মেয়েকে কেড়ে নিয়ে সজোরে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দেয়। মারা যায় দুধের শিশুটি। পুলিশ জানিয়েছে, মেয়েটির মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন মিলেছে ময়না-তদন্ত রিপোর্টে। পুলিশ ও সিআরপিএফের কারা সে রাতের অভিযানে ছিল, খোঁজ করা হচ্ছে। তবে কেউই এখনও ধরা পড়েনি। আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছেন ববিতারা। ঝাড়খণ্ড জনমুক্তি মোর্চা বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাকোরিয়ায় বিনোদ সিং বলে কেউই তাদের সদস্য নয়।

সূত্রঃ https://eisamay.indiatimes.com/nation/maoist-capture-of-child-killing-force/articleshow/70849750.cms?fbclid=IwAR2tJZWA24kVGeEAErN6OInHhy2GoMzrzmw_aDNAOYfcHe_FbGAWUiNtYXs