গৌরী লঙ্কেশ খুনে যোগ নেই মাওবাদীরঃ জানাল বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)

gauri1-14-1505371436

প্রবীণ সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের খুনের সঙ্গে এখনও পর্যন্ত কোনও মাওবাদী যোগ পাওয়া যায়নি বলে জানাল বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)।

৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মোটরবাইক আরোহী আততায়ীদের গুলিতে মারা যান গৌরী। পর দিনই খুনের তদন্ত করতে ২১ সদস্যের সিট গড়ে কর্নাটক সরকার। গৌরীর ভাই ইন্দ্রজিৎ শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, তাঁর দিদির খুনের পিছনে থাকতে পারে মাওবাদীদের হাত। কারণ কর্নাটক সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মাওবাদীদের মূলস্রোতে ফেরানোর গৌরীর চেষ্টাকে ভাল ভাবে নেয়নি মাওবাদীদের একাংশ। তার ফলেই এই হামলা হতে পারে বলে দাবি করেছিলেন ইন্দ্রজিৎ।

কিন্তু সিট সূত্রের খবর, তদন্তে নেমে এমন কোনও সূত্রই পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই নয়, কর্নাটকের যে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছিল, সেই দক্ষিণ কন্নড়, চিকমগালুরু এবং উদুপি থেকে পুলিশ দলকে ফিরে আসতে বলা হয়েছে। বেঙ্গালুরু পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘দিন দুয়েকের মধ্যে ওই এলাকা থেকে সব দলই ফিরে আসবে। গৌরী লঙ্কেশ ও মাওবাদী যোগ নিয়ে যত জনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব, সব বলা হয়েছে। এটা ঠিক, মাওবাদীদের কয়েক জনকে মূলস্রোতে ফেরানো নিয়ে একাংশের মধ্যে গৌরীকে নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। কিন্তু তাঁকে হত্যা করার মতো মনোভাব দেখা যায়নি।’’

গৌরী খুনের আততায়ীরা এখনও অধরা। তবে তদন্তে ক্রমশ হত্যা রহস্য আরও জটিল হচ্ছে। পুলিশের এক সূত্রের দাবি, জেরার মুখে এক সঙ্গীতশিল্পী তাদের জানিয়েছেন, এক ধর্মগুরু তাঁর সমর্থকদের গৌরীকে খুনের জন্য ওস্কাতেন। তবে কে তিনি, এখনই তা প্রকাশ করেনি পুলিশ।

এদিকে, কন্নড় সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের হত্য়াকাণ্ড নিয়ে এবার মুখ খুলল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওবাদী)। তারা জানিয়েছে, বহুদিন ধরেই সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোন শক্তি রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। অনেকেই এই বিষয়ে আঙুল তুলেছেন দেশের মাওবাদী সংগঠনগুলির দিকে। তবে মাওবাদীরা গোটা বিষয়টিকে নস্যাৎ করে দিয়ে ‘হিন্দু ফ্যাসিবাদীদের’ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ডে মাওবাদীদের তরফে সরাসরি সঙ্ঘ পরিবারের দিকে আঙুল তুলেছে। তারা জানিয়েছে, গোটা দল, বামপন্থী তথা গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা রাখা সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যুতে নিন্দা প্রকাশ করছে। মাওবাদীরা নিজেদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘হিন্দু ফ্যাসিবাদী সংগঠন তথা বিজেপি দ্বারা পরিবৃত সংঘপরিবারই এর নেপথ্যে রয়েছে।’ দলের তরফে জানানো হয়েছে, বামপন্থী মানসিকতা রাখা সকল মানুষের উচিত এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নামা। মাওবাদী সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, ” যবে থেকে ‘গুজরাত ফাইলস’ নামে বইটির অনুবাদ করেছেন লঙ্কেশ তবে থেকেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের চক্ষুশূল হয়ে গিয়েছেন তিনি। ” এছাড়াও নিজেদের বক্তব্যে , বিজেপি নেতা ডি এন যুবরাজের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে গৌরি লঙ্কেশের মৃত্যুর ঘটনার ব্যাখ্যা করেছে তারা। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও এদিন একহাত নেওয়া হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে।

Advertisements

সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন ছিল ?

su-ps67s

একেবারে গরীব মজুর মেহনতী, চাষাভূষা, যাদের চালচুলো নেই, হাজার বছরের কুসংস্কারের অন্ধকারে যাদের বাস, গতর খাটানোই জীবন, সুস্থ সুন্দর জীবন যাদের কাছে ভাগ্যের বঞ্চনা- সেই নীচুতলার মানুষদের আবার লেখাপড়া! পুরো দুনিয়ার সামনে যা ছিল অকল্পনীয়, তাই ইতিহাসে বাস্তব করে তুলেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।

শিক্ষা নিয়ে আজ পর্যন্ত পুরো দুনিয়ার আলোচনার শেষ নেই। শিক্ষা কাকে বলে, শিক্ষিত লোক কে – তা নিয়েও সবার মত এক নয়। ধনী ও দরিদ্রে বিভক্ত এ সমাজে শিক্ষা ও শিক্ষার উদ্দেশ্য একই রকম থাকে না। ছোটবেলায় বড়জনেরা বলত ‘বড় হও, মানুষ হও বাবা’। এই মানুষ হওয়া বলতে কি বোঝায়? প্রকৃতির নিয়মে আমরা বেড়ে উঠি। এটাই কি বড় হওয়া? সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই ইংরেজরা শিক্ষার উদ্দেশ্য বলতে শিখিয়েছিল – লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে। আমাদের দেশে তো বটেই দুনিয়া জুড়েই আজ একথার পেছনে সবাই ছুটছে। মানে লেখাপড়া শেষ করে বড় হয়ে কেউ চাকরি করবে, অনেক টাকা আয় করবে, বাড়ি, গাড়ি ধনদৌলত বানাবে। তাহলে এটাই কি শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য? আজ শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেই আমরা এ চিত্রই পাবো। কারণ শিক্ষার এ দর্শনের পেছনে কাজ করছে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। পুঁজিবাদ এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের শ্রম শোষণ করে মুষ্টিমেয় মালিকশ্রেণি মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। পুঁজিপতিরা তাদের নিয়ম নীতি, আইন কানুন দিয়ে এ সমাজের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই মালিক এবং শ্রমিকে বিভক্ত এ সমাজে মালিকশ্রেণি ততটুকু শিক্ষা দেয় যতটুকু তাদের মুনাফার জন্য প্রয়োজন। তাই সকল মানুষের স্বার্থে মানবজাতির সঞ্চিত জ্ঞানকে সে কাজে লাগাতে পারে না। মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, কুসংস্কারমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক মন গড়ে তুলতে হয় সে ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয়, দুনিয়াজুড়ে পুঁজিবাদ আজ শিক্ষার মহত্তম উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে দিয়ে একে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করেছে। কেড়ে নিয়েছে শিক্ষার অধিকার। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র শুধু শিক্ষার অধিকার দেয়নি, কর্মে, সৃজনে, মননে সৃষ্টি করেছে একেবানে নতুন মানুষ। সেই শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা পুরো দুনিয়ার সামনে আজও শ্রেষ্ঠ আসন নিয়ে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

বিপ্লবের আগে: পেছন ফিরে দেখা
রাশিয়া ছিল সম্রাট জারের অধীন। শিল্প কারখানার দিক থেকে এটি ছিল অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশ। বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। জারের মন্ত্রী, আমলা, সেনাবাহিনী, সুবিধাভোগী গোষ্ঠী আর ধনী জমিদার- শিল্পপতি মিলে পুরো দেশের শ্রমজীবী মানুষের উপর শোষণ, লুণ্ঠণ, অত্যাচার চালাত। জারের ক্ষমতার আগ্রাসন ক্রমে আশেপাশের রাজ্যগুলোকে দখল করে নিল। সেগুলোকে প্রদেশ বানিয়ে দুর্বল জাতিগুলোকে বছরের পর বছর শাসন-শোষণ চালাত।

সোভিয়েত সরকার প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে সার্বজনীন শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তাই লক্ষ লক্ষ শিশু কখনোই স্কুুলে যায়নি। বেশিরভাগ কৃষক ছিল অজ্ঞ, মূর্খ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সংখ্যালঘু জাতিগুলোর অবস্থা আরও করুণ। রাশিয়ার ১৭৫ টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১২৪ টির কোনো লিখিত হরফ ছিল না। ইউক্রেনীয়, জর্জিয়ানরা সংবাদপত্র, বই, এমনকি আদালতে পর্যন্ত নিজেদের ভাষা ব্যবহার করতে পারত না। রাশিয়ান ভাষায় তাদের পড়ালেখা শিখতে হতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭৩ শতাংশ প্রাপ্ত বয়ষ্ক জনগণ ছিল অশিক্ষিত। কিছু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষিতের হার ৫ শতাংশেরও কম ছিল। (যেমন- কাজাকিস্তানে ২ শতাংশ, উজবেকিস্তানে ১ শতাংশ, তাজিকিস্তানে ০.৫ শতাংশ।)

জার আলোকজান্ডারের নির্দেশনা মন্ত্রী শিকভের একটি বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যাবে সে সময়ে শিক্ষা সর্ম্পকে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি — “জ্ঞান হলো লবনের মতো, যা জনগণের অবস্থা এবং চাহিদা অনুসারে অল্প পরিমাণে ব্যবহার এবং প্রদান করা হয়।… সকলকে এমনকি বেশিরভাগ মানুষকে শিক্ষিত করলে ভালোর চেয়ে অনিষ্ট হয় বেশি।” ফলে স্কুল-কলেজগুলো ছিল বড়লোকের সন্তানদের জন্য। স্কুল কলেজের পড়াশুনা ছিল ভয়ংকর চাপ, একঘেঁয়ে, আনন্দহীন। পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল যে, বাচ্চাদের আত্মহত্যার ঘটনা হর-হামেশায় ঘটত। মিস হেবে স্পাউলের ‘দি ইউথ অব রাশিয়া’ বইটির মতে, এই প্রবণতা এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল যে ছাত্রদের মধ্যে আত্মহত্যার কারণ উদ্ঘাটন করতে সরকারের Ministry of Public Instruction কে একটি কমিশন গঠন করতে হয়েছিল।

বিপ্লবের পর : নতুন যুগের কেতন
এই প্রেক্ষাপটে ১৯১৭ সালে শ্রমিকশ্রেণী ক্ষমতা দখল করল। শত শত বছরের গভীর অন্ধকার ভেদ করে আলোর দরজা খুলে গেল। পরিস্থিতি যত কঠিন হোক ,জনগণের দাবি পূরণের কাজ শুরু হলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার সরকার (তখনও বিপ্লব হয়নি) অংশ নেয়ার কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে বহু তরুণ-যুবককে এতিম, সম্বলহীন, গৃহহীন করে দেয়। আবার বিপ্লব পরবর্তী গৃহযুদ্ধ ও ১৯২১ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণে পরিস্থিতি আরও সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিপ্লবের আগেই কিশোরদের একটা অংশ বিভিন্ন অপরাধ চক্র গড়ে তুলে নানা আইনবিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনা করত। অনেকেই চুরি করে জীবিকা নির্বাহ করত এবং নিয়মিত খুন-খারাবি করে গ্রামে ও শহরে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করত। তারা বসবাস করত সুরিখানা ও নালা-নর্দমার ধারে। ফলে শারীরিক-মানসিকভাবে ছিল প্রচ- অসুস্থ। এই শিশুদের কেবল শিক্ষা নয়, নৈতিক মুক্তিরও প্রয়োজন ছিল। এসব শিশুদের স্কুলের আওতায় আনা আর বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার মহান ব্রত নিয়ে শুরু হয় বিপ্লবী সরকারের কাজ।

সোভিয়েত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২১-এ বলা হয়েছে, ‘ইউএসএসআর- এর নাগরিকদের শিক্ষার অধিকার হবে সুরক্ষিত। সার্বজনীন, বাধ্যতামূলক, বুনায়াদী শিক্ষার দ্বারা এই অধিকার নিশ্চিত করা হবে। অবৈতনিক উচ্চশিক্ষাসহ ; উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর রাষ্ট্রীয় উপবৃত্তি প্রদান করা হবে। স্কুল শিক্ষা স্থানীয় মাতৃভাষার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। রাষ্ট্রীয় খামার, ট্রাক্টর স্টেশন এবং যৌথ খামারে পরিশ্রমী বা মেহনতিদের বৃত্তিগত, প্রযুক্তিগত ও কৃষি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অবৈতনিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।’

বিশাল জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার জন্য পরিপূরক প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জামের অভাব, তীব্র সংকট ছিল প্রয়োজনীয় শিক্ষক-বিল্ডিং-বইপত্রের। ফলে বহু বছর ধরে মস্কোর মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকার স্কুলগুলোতে বিভিন্ন শিফটে পড়াতে হতো। এছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পূর্বে শোষিত হওয়া উপজাতিদের মধ্যে থাকা প্রবল অন্ধবিশ্বাস ও অজ্ঞতা যেটি শিক্ষকদের পাঠদানে সরাসরি বাধাপ্রদান করত, তাকেও অতিক্রম করতে হয়েছিল।

সোভিয়েত শিক্ষাকাঠামো
শৈশব থেকে ৮ বছর পর্যন্ত: Creches (কর্মরত মায়েদের শিশুদের দেখাশোনার জন্য সাধারণ শিশুভবন), কিন্ডারগার্টেন, প্লেগ্রাউন্ড, নার্সেরি স্কুল। (এগুলো ঐচ্ছিক) * ৭ বছরের স্কুল শিক্ষা: সকলের জন্য ছিল বাধ্যতামূলক। ৮-১৫ বছর পর্যন্ত। * ১০ বছরের স্কুল শিক্ষা: ৮-১৮ বছর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ছিল। পরে সেটি ১৫ বছর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করে। * শিল্প কারখানায় শিক্ষা: ফ্যাক্টরি এবং ব্যবসায় শিক্ষা স্কুল। * পেশাগত শিক্ষা: পেশাগত শিক্ষার স্কুল ও একাডেমিসমূহ। * উচ্চশিক্ষা: বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল এবং বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটসমূহ। *প্রাপ্ত বয়স্কদের শিক্ষা: ক্লাব, বিভিন্ন সহযোগী কোর্স, সিনেমা ইত্যাদি

প্রাক-স্কুল শিক্ষা: জন্মের পর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিশুকে পুরো সমাজের সম্পদ গণ্য করা হত। শিশুদের জন্য এখানে চালু করা হয়েছিল শিশু সদন বা Creches ( ক্রেস)। বিভিন্ন কাজের এলাকা যেমন- ফ্যাক্টরি, যৌথখামার বা কতকগুলি বাসভবনকে কেন্দ্র করে শিশুভবনগুলো গড়ে উঠে। আমাদের জানা থাকা দরকার সোভিয়েত ইউনিয়নে সমস্ত নারী কাজের সুযোগ পেত। যেসব কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের ছেড়ে কাজে যেতে হয়, তারা যেন সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট সময় পান। সেকারণে শিশুভবনগুলো ছিল তাদের কর্মক্ষেত্রের কাছে। কেবল পিতামাতা নয়; বিভিন্ন ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা ও ট্রেড ইউনিয়নের কমিটিসমূহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই শিশুভবনগুলো সচল রাখতে সচেষ্ট থাকত। Mrs. Beatrice King-এর বর্ণনায় একটি আদর্শ শিশুসদনের সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা যায় —“কক্ষগুলো অনেক প্রশস্ত ও উঁচু যাতে প্রচুর আলো-বাতাস ঘরে আসতে পারে। প্রত্যেকটি রুমের একটি বারান্দা আছে যেখানে গ্রীষ্মে ও শীতে শিশুরা ঘুমায়। বিশাল রান্নাঘরে প্রধান খাবারগুলো প্রস্তুত করা হয়, ধোলাইখানাও আছে। ভ্রমণকালে আমি দেখেছি, শিশুভবনগুলোতে খেলার জন্য বিশাল মাঠ, ফুলের বাগান আছে। প্রত্যেক গ্রুপের (১২-১৫ জন) তত্ত্বাবধানের জন্য একজন যোগ্য ব্যক্তি নিযুক্ত থাকেন। শিশুভবনগুলো মা-বাবাকে যোগ্য করে তোলার জন্য আদর্শ প্রতিষ্ঠান।”

৮ বছর পর্যন্ত প্রাক স্কুল শিক্ষার চালু ছিল। নার্সারি স্কুলগুলো শিশুসদনের ধারাবাহিকতায় এগুলো পরিচালিত হত। এখানে শিশু ভর্তির ব্যাপারটি ছিল ঐচ্ছিক। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে শিশুদের ভর্তির সংখ্যা ১৯২৮ সালে ছিল ৮ লক্ষ, ১৯৩৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ালো ১৫ লক্ষে এবং ১৯৪০ সালে তা আরও বেড়ে হলো ৩৫ লক্ষ। সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে প্রাক স্কুল বয়ষ্ক ছেলেমেয়েদের পদার্থবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, এবং এমনকি ভাষাতত্ত্বের মত বিজ্ঞানগুলোর বিষয়ে মৌলিক জ্ঞানদানের বিষয় আবিষ্কৃত হয়েছিল। এরকম শিক্ষা কার্যক্রম শিশুর স্মৃতিকে ভারাক্রান্ত না তার মনন শক্তির বিকাশ ঘটাত। বিশেষ করে খেলাধুলা, বিভিন্ন জিনিসপত্র, ছবি আর মডেলের মাধ্যমে এসব শিক্ষা দেয়া হত। এই শিক্ষাব্যবস্থায় বাবা মার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাবা-মা এবং স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রতি মাসে স্কুলের স্টাফদের সাথে Parents’ Council-এর একটি মিটিং হত। নিয়মিত স্কুলে আসার জন্য মা-বাবাকে উৎসাহ দেয়া হত, তেমনি শিক্ষকদের উৎসাহ দেয়া হত বাচ্চাদের বাসায় যাবার জন্য। বাচ্চারা বয়স অনুযায়ী কিছু পড়াশুনা আর প্রচুর খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমানোর সুযোগ পেত। প্রতিটি স্কুলে স্টাফ হিসেবে একজন ডাক্তার ও নার্স নিযুক্ত থাকতেন। ছোট বেলা থেকেই স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার নিয়ম-নীতিগুলো শেখানো হত। নানা কর্মকা- এমনকি খেলাধূলা পর্যন্ত এমনভাবে সাজানো হত যেন একটি শিশুর সামাজিক অভ্যাসগুলো উন্নত হয়, তারা আত্মনির্ভরশীল এবং দায়িত্ববান হয়ে গড়ে উঠে। উদাহরণ হিসেবে শিশুদের একটি জনপ্রিয় খেলা রঙ্গিন ইট সাজানোর কথা বলা যায়। এই ইটগুলো এত বড় যে শিশুদের একার পক্ষে নাড়ানো এবং কিছু তৈরি করা সম্ভব হত না। তাই ইট দিয়ে কিছু তৈরি করতে হলে তাকে অবশ্যই অন্য সাথীদের কাছে সাহায্য চাইতে হত। এই সহয়োগিতা আর মিলে মিশে থাকার মধ্যেই গড়ে উঠত ভবিষ্যতের মানুষ।

বাধ্যতামূলক স্কুলশিক্ষা
ক্রেশ ও কিন্ডারগার্টেন শেষ করে ছেলেমেয়েদের যেতে হতো স্কুলে। আট থেকে পনের বছর পর্যন্ত হলো বাধ্যতামুলক মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষা। পনেরো বছর পর্যন্ত স্কুলজীবন শেষ করে আগ্রহীরা আরও দু’বছর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত। বিপ্লব পরবর্তী স্কুল শিক্ষা নিয়ে লেনিন বলেছিলেন , “জীবনের ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, কেবলমাত্র স্কুলের গন্ডির মধ্যেই যা বন্দী তেমনি শিক্ষাদান, ট্রেনিং বা বিদ্যায় আমরা বিশ্বাস করি না… আমাদের স্কুল থেকে তরুণদের পাওয়া উচিত জ্ঞানের মূল সূত্রগুলি, স্বাধীনভাবে সাম্যবাদী মতবাদ গড়ে তোলার ক্ষমতা, এবং শিক্ষিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারা।” নতুন যুগের ছেলে মেয়েদের গড়ে তোলার জন্য লেনিনের মত ছিল ‘তরুণদের শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদনশীল শ্রমের মিলন ব্যতীত ভবিষ্যৎ সমাজের কল্পনা অসম্ভব।’

সোভিয়েত সমাজের উদ্দেশ্য ছিল নতুন মানুষ গড়ে তোলা। সোভিয়েত শিক্ষাবিদদের মতে, সততা, শ্রমশীলতা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃভূমি রক্ষার্থে আত্মোৎসর্গের মনোভাব- এই গুণাবলি নিয়ে কেউ জন্মায় না। তা অর্জিত হতে পারে সুশিক্ষার মাধ্যমে। বিপ্লবের আগে বহু বিজ্ঞানী প্রমাণ করতে চাইতেন, শিশুদের সবাই লেখাপড়া করতে, এমনকি প্রাথমিক স্কুলের পাঠ্যসূচি আয়ত্ত করতে সক্ষম নয়। কিন্তু ৩০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সর্বজনীন শিক্ষা চালুকরণের অভিজ্ঞতায় ‘ছেলে মেয়ে মানুষ করা প্রসঙ্গে’ বইতে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, এ ধারণা সর্ম্পূণ ভ্রান্ত। তাঁরা দেখিয়েছেন, কেবল কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রতিভাহীন লোক সাধারণত হয় না এবং সব মানুষই কোন না কোন নৈপুণ্যের অধিকারী। স্কুল এবং পরিবারের কর্তব্য হচ্ছে সেই নৈপুণ্যের আবিষ্কার ও বিকশিত করা।

মানুষ গড়া- সে হচ্ছে বহুমূখী এক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার দুটি দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ, অনুভূতি আর হৃদয় গড়ে তোলা এবং বুদ্ধির উন্মেষ ঘটানো। আর সর্বাঙ্গীন বিকশিত মানুষের অপরিহার্য গুণ হলো শ্রমশীলতা তৈরি করা। কিন্তু হিতোপদেশ দিয়েই এই শ্রমশীলতা বা মানবিক নৈতিকতা তৈরি করা যায় না। একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং ছাত্র শিক্ষক , বাবা-মা, স্কুলের পরিবেশ, রাষ্ট্রের অংশগ্রণের মাধ্যমে এ কাজটি করতে হয়। তাই বাইরে রাজনীতি, অর্থনীতির সাথে ও সময়ের সাথে সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থা একেবারে জড়ানো ছিল। শিক্ষা বলতে সেখানে শিল্প, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা, কাজ, খেলা, নৈতিক চরিত্র, আচার-আচরণ সবই বোঝাত। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, “কমল হীরের পাথরটি হল বিদ্যে আর তার ঠিকরে পড়া জ্যোতি হলো কালচার”। শিক্ষা আর সংস্কৃতির এই অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছিল সেখানে।

আমাদের দেশে শিক্ষার সাথে জীবনের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দেশপ্রেম বা শ্রমের মর্যাদা নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা রচনা লেখার পরও একজন ছাত্র এগুলো শুধু পরীক্ষা পাসের বস্তু মনে করে। হৃদয়কে তা কখনো প্রভাবিত করে না। পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কৌশলে সমাজকে অবহেলা করে নিজেকে বড় হতে শেখায়, সবাইকে নিজ নিজ ভবিষ্যৎ আর ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শেখায়। সোভিয়েত শিক্ষা কাঠামো তোতা পাখির মত মুখস্ত শেখাতো না। কী শেখানো হচ্ছে , কেন শেখানো হচ্ছে, শেখার পর সমাজে তাদের কি অবস্থা হবে এবং কী তাদের ভবিষ্যৎ এসব তারা স্পষ্ট ছিল। তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীতে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ইতিহাস পড়ানো হত। বুর্জোয়া ইতিহাস যেখানে কিছু ঘটনার তারিখ, সম্রাট বা সম্রাজ্ঞী, যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি মিলে একটা জগাখিচুরি তৈরি করে, তাতে সমাজ পরিবর্তনের কোনো প্রকৃত ধারণা গড়ে উঠে না। সোভিয়েত স্কুলে প্রথম ক্লাস থেকে আরম্ভ হত ইতিহাসের পাঠ যেমন- এসিরিয়, ব্যাবিলন, ভারতবর্ষ, মিশর, চীন, গ্রীস ও প্রাচীন সভ্যতা এবং শতাব্দী ধরে কীভাবে সামন্তবাদের বৃদ্ধি হয়েছে। এক একটি দেশ ধরে তাদের বিশ্লেষণ করে দেখানো হত। এভাবে পড়া শেষ পর একজন ছাত্র পৃথিবীকে স্বচ্ছভাবে বুঝতে শিখত। সাধারণ জ্ঞানের সাথে ব্যবহারিক জ্ঞানও তাকে অর্জন করতে হত। প্রত্যেক স্কুলে সিনেমা যন্ত্র, স্লাইড শো, যন্ত্রপাতির চালু করেছিল। শিক্ষকেরা ইতিহাস, ভুগোল বা বিজ্ঞানের যেকোন শাখা সম্বন্ধীয় ফিল্মের সাহায্যে তাদের পাঠকে চিত্রিত করতেন। প্রত্যেক স্কুলে ছিল প্রাণি বিভাগ। যাতে শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষভাবে জীব জন্তুদের জন্ম, বৃদ্ধি, উৎপাদন ক্রিয়া প্রভৃতির সর্ম্পকে জানতে পারে।

সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ে তার মাতৃভাষায় ও সাহিত্যের প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী হতে শেখে। স্কুলের দেয়াল পত্রিকা, বিভিন্ন শিশু পত্রিকায় তারা নিয়মিত লেখক ও পাঠক। স্কুলের পড়াশোনার বাইরে, সোভিয়েত ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যক্তিগত আগ্রহ বা রুচি মাফিক তারা অন্য কাজে যুক্ত থাকে। তবে তা সবার জন্য বাধ্যতামুলক নয়। আগ্রহী ছাত্ররা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গ্রুপ তৈরি করে স্কুল ছুটির পর এসব কাজে সময় দেয়। যার নাটক ও সাহিত্য সম্বন্ধে আগ্রহ তারা সাহিত্য চক্রে, যারা সঙ্গীতজ্ঞ হতে ইচ্ছুক তারা শিল্পী চক্রে যোগ দেয়। যারা বিজ্ঞানে আগ্রহী তারা পদার্থ বা রসায়ন চক্রে যোগ দেয়। ইঞ্জিনিয়ারিং বা নির্মাণ কাজের জন্য টেকনিক্যাল বিষয় শিখার জন্য ব্যবস্থা ছিল। এইসব চক্র বিশেষ উৎসবে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের পরিবেশনা করে। (চলবে)

অনুশীলন আগষ্ট ২০১৭


গৌরী লঙ্কেশ হত্যার জন্য RSSকেই দায়ী করল মাওবাদীরা

gauri-696x437

গৌরী লঙ্কেশের খুনের নিন্দা করল মাওবাদীরা। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে সিপিআই মাওবাদীর তরফে দাবি করা হয়েছে গণতান্ত্রিক স্বরকে স্তব্ধ করার জন্যই বামপন্থী সাংবাদিক গৌরীকে হত্যা করেছে সংঘ পরিবারের লোকজন। গৌরীর ভাইকে চাপ দিয়ে হত্যার জন্য তাদেরকে কাঠগড়ায় দাড় করানোরও নিন্দা করেছে মাওবাদীরা। সেই সঙ্গে গৌরী লঙ্কেশ হত্যার পর মোদির নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।

সূত্রঃ satdin.in


১৭ই সেপ্টেম্বরঃ মহান শিক্ষা দিবস উদযাপন করবে ‘জাতীয় ছাত্রদল’

তারিখঃ ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৭, রবিবার

স্থানঃ ডাকসু(মধুর ক্যান্টিনের বিপরীত পার্শ্বে)
সময়ঃ সকাল ১১.৩০টা – দুপুর ১টা

আয়োজনেঃ জাতীয় ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় কমিটি


সিপিআই(মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটিতে বাস্তারের আদিবাসী তরুণ হিদমা

hidma-naxal-leader-crpf-attack-sukma-chhattisgarh-647_042517021335

বাস্তার থেকে প্রথম আদিবাসীকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দিল সিপিআই(মাওবাদী)। দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী PLGA এর সদস্য থেকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হওয়া হিদমা হলেন দ্বিতীয় আদিবাসী সদস্য। শুধু তাই নয়, তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। ৩৬ বছরের হিদমা সামরিক দিক থেকে দলে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেনই আগে এবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসায় নিরাপত্তা বাহিনীর মাথা ব্যথার বাড়তি কারণ হতে পারে বলে মনে করছে পর্যবেক্ষকদের একাংশ। আদিবাসীদের দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে মাওবাদীরা জায়গা দেয়না বলে সরকারি প্রচারে বেশ ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন তারা। সাম্প্রতিক সময় দেশজুড়ে মাওবাদী আন্দোলন বেশ কিছুটা ব্যাকফুটে, সেই সময় বাস্তার থেকে এক আদিবাসী তরুণকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আনা যথেষ্ট তাত্পর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন মাওবাদী সমর্থকরাও।

ছত্তিশগড়ের আদিবাসী যুবক মাদবি হিদমা উচ্চতায় ছোট, বুদ্ধিতে তীক্ষ্ম এই যুবকের নেতৃত্বে মাওবাদীরা সুকমায় সিআরপিএফের বিরুদ্ধে অপারেশন চালালে অতর্কিত ওই হামলায় নিহত হয় ২৫ জন জওয়ান। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এত বড় একটি হামলার কোনও আগাম খবর গোয়েন্দাদের কাছে ছিল না। এখানেই মাওবাদী কমান্ডার মাদবি হিদমার সাফল্য বলে মনে করছে গোয়েন্দারা।
গোয়েন্দাদের বক্তব্য, হিদমা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। সংবাদমাধ্যমে খুব একটা ছবিও প্রকাশিত হয়নি। শুধু জানা যায়, দক্ষিণ সুকমার পুর্বতী গ্রামে হিদমার জন্ম। সুকমা, দান্তেওয়াড়া এবং বিজপুর হল তাঁর অপারেশন ক্ষেত্র। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, গত ১১ মার্চ নিরাপত্তা রক্ষীদের উপর মাওবাদী হামলার অন্যতম মাথা ছিলেন এই হিদমা। ওই হামলায় ১২ জন নিরাপত্তা আধিকারিক নিহত হয়। স্থানীয় যুবক হিদমা বস্তার জঙ্গল নিজের হাতের তালুর মতো চেনেন। বেশ কয়েক বছর আগে এক সাংবাদিক তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেন, খুব চাপা স্বভাবের হিদমার চোখ দু’টি জ্বল জ্বল করে। ‘কথা কম, কাজ বেশি’ তত্ত্বে বিশ্বাসী হিদমার দেখা সহজে পাওয়া যায় না। অল্প বয়সে মাওবাদী হিসাবে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার পর শীর্ষে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগেনি হিদমার। তাঁর ঘনিষ্ঠ অনেকেই বলেন, হিদমার এই উন্নতির কারণ, তাঁর হিংস্র মনোভাব। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকলে ওই মাওবাদী কমান্ডারের চেহারা পালটে যেতে সময় লাগে না। এছাড়াও নেতৃত্বে দেওয়ার ক্ষমতা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের উপর হিদমার প্রভাব যথেষ্ট বেশি। তাই কখন, কোথায় হিদমা থাকেন, তার কোনও খবর পুলিশের কাছে থাকে না। আরও অনেক নবীন মাওবাদীর রোল মডেল হিদমা কোথাও সন্তোষ বা হিদমালু নামে পরিচিত। শুধু হিদমা নয়, ছত্তিশগড়ে মাওবাদী গতিবিধির খবর পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন এক পুলিশ আধিকারিক। তিনি বলেন, স্থানীয় গ্রামবাসীরা পুলিশকে বিন্দুমাত্র সাহায্য করেন না। তার কারণ, প্রথমত, মাওবাদীদের ভয়। আর দ্বিতীয়ত, মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতি। এছাড়া, মাওবাদী হিসাবে যারা পরিচিত, তাদের অধিকাংশই স্থানীয় বাসিন্দা। ফলে গ্রামবাসীদের সহানুভূতি সহজেই পায় তারা। অতর্কিতে হামলা চালানোর পর গভীর জঙ্গলে মিলিয়ে যায় মাওবাদীরা। তারপর তাদের খোঁজ মেলে না।

সূত্রঃ the hindu, satdin.in


সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার শিকার মিয়ানমারের শরণার্থীরা

bangladesh-myanmar-unrest-rohingya-refugee_a0e8bf90-92d2-11e7-afc5-62fc49bb3ae4

মিয়ানমারের গণতন্ত্র পন্থী নেত্রী(!) ও ন্যাশনাল লীগ ফর ডোমেক্রাসি নেত্রী অং সান সুকি তার দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে। অং সান সুকি এখন মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে কী হবে, তিনিই মিয়ানমারের অঘোষিত প্রেসিডেন্ট। তার সময়েই মিয়ানমারের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চলছে। এই নিপীড়ন নির্যাতনে বিচলিত হয়ে পড়েছে মার্কিনের নেতৃত্বে পরিচালিত পাশ্চাত্যের দেশগুলো ও তাদের গণমাধ্যম। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যতটা না উদ্বিগ্ন রোহিঙ্গাদের নিয়ে, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন অং সান সুকিকে নিয়ে। অং সান সুকিকে তারা নেতা বানালো, অথচ তিনিই আজ বিরোধীদের শিবিরে। পুঁজিবাদী চীন অং সান সুকিকে করায়ত্ত করে নিয়েছে। অতদিন যা পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা করতো, এখন সেই কৌশল পুঁজিবাদী চীন আয়ত্ত করে নিয়েছে। সত্যিই কী অং সান সুকি মার্কিনের দালাল থেকে চীনের দালালে পরিণত হলো?

গত ৯ অক্টোবর এক সমন্বিত হামলায় মিয়ানমারের নয় জন বর্ডার গার্ড ও পাঁচ জন সেনাবাহিনী সদস্য নিহত হয় রাখাইন রাজ্যের বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায়। এই হামলাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের পুলিশ, বিজিপি ও সেনাবাহিনী এক সমন্বিত অভিযানে নামে। সমন্বিত অভিযান নামে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর আভিয়ান শুরু করে। কে বা কারা হামলা চালিয়েছে তা না জেনেই অভিযান শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কারণ এই অঞ্চলে মাদকের চোরাচালানি ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অবস্থান রয়েছে। এই অভিযানে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের ৬৯ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে সরকারি বাহিনী স্বীকার করে নিয়েছে। তবে বেসরকারিভাবে বলা হচ্ছে অভিযানে শত শত রোহিঙ্গাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলেছে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে এ পর্যন্ত নয় জন রোহিঙ্গা গ্রামবাসী পুড়িয়ে মেরেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

গ্রামের পুরুষদের ধরে নিয়ে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। যে সমস্ত পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের আর কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে হেলিকপ্টার নিয়ে অভিযানে নামে সেনাবাহিনী। এই অভিযানে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করে ৩০ জন রোহিঙ্গা হত্যা করা হয়। মাহিলাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। তার পর বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে আশ্রয়হীন করা হচ্ছে। গৃহপালিত গবাধি পশুকে লুট করে নিয়ে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার পরিবারকে বাড়ি ঘর ছাড়া বাস্তচ্যুত করা হয়েছে। অনেকে বনে জঙ্গলে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। অনেকে নাফ নদীর তীরবর্তি প্যারাবন ও জঙ্গলে পালিয়ে, অর্ধাহারে অনাহারে থেকে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। রাখাইন বেসামরিক লোকেরা ধারলো অস্ত্র দিয়ে পালায়নরত লোকেদের ওপর হামলা চালিয়ে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এই অভিযানের সময়ে আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের ও গণমাধ্যম সাংবাদিকদের রাখাইন রাজ্যে ঢুকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে হামলা চালিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, বাড়ি ঘর লুটের পর আগুন জ্বালিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের পত্র পত্রিকার সূত্রে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় বাংলাদেশ জড়িত রয়েছে। উল্লেখ্য সীমান্ত অতিক্রম করে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। টেকনাফ সীমান্তের হোয়াইক্যং, উলুবনিয়া, বালুখালি, লম্বাবিল, কাঞ্জরপাড়া, খারাংখালী, ঝিমংখালী, উনচিপ্রাং, জাদিমুড়া, নয়াপাড়া, নাথমুড়াপাড়া, গুদামপাড়া, ফুলের ডেইল, হোয়াব্রাং, নাইখ্যংখালী, আনোয়ার প্রজেক্ট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। অনুপ্রবেশের পর রোহিঙ্গারা বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, অনিবন্ধিত লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প, নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প, সীমান্ত এলাকায় মানুষের বাড়ি ঘরে ও ঝোপঝাড়-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে নদীপথে সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য সীমান্তের নাফ নদীর মিয়ানমারের অংশে অবস্থান করছে। রাতের বেলায় তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। মিয়ানমারের স্থল ও জল সীমান্তে টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশ মোতায়েত করেও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ধরে পুশ ব্যাক করা হচ্ছে ও অনুপ্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে। তবুও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ হচ্ছে না।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক ইতিপূর্বে বাতিল করা হয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর ফলে নারী, শিশু, বয়স্কসহ সেখানকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। এসব লোক যাতে ভয়-ভীতি ছাড়া আবাসভূমিতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে রাখাইন রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে মিয়ানমারকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান চালিয়ে যাওয়ায় সেখানকার পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। রাখাইন রাজ্য থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের জন্য এ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মিয়ানমারের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় ও কনসুলার) কামরুল আহসান মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের হাতে একটি কূটনৈতিক পত্র তুলে দেন। রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করার ব্যাপারে মিয়ানমারের গণমাধ্যমের প্রবণতার সমালোচনা করা হয়। রাখাইন রাজ্যে বঞ্চনা ও সেনাবাহিনীর চলমান অভিযানের সময়ে মাত্রাতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ।

গত ১৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। চীন ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং অস্থায়ী সদস্যের মধ্যে জাপান, মিশর, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভেনেজুয়েলা ও সেনেগালের প্রতিনিধিরা অংশ নেয়। বৈঠকে সবাই অভিযোগ করেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তাদের অভিযানে নির্মমভাবে লোকজনকে হত্যার পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা বন্ধের সমালোচনা করে অবিলম্বে তা চালুর জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার রাখাইন রাজ্যে লোকজনের নিরাপত্তা ও মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে প্রাণের ভয়ে ঐ অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা লোকজনের সহায়তায় বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার অনুরোধ জানান হয়েছে।
মিয়ানমারের সমস্যাটি আজ থেকে শুরু হয়নি। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব আইন জারি হয়। এই আইনে বলা হয়েছে ১৮৫৩ সালের আগে তার পূর্ব পুরুষ মিয়ানমারের নাগরিক ছিল তা প্রমাণ করতে পারলে তাদেরকে সে দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই আইনের আওতায় মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার বিহীন। ফলে এত দিনের বসতবাড়ি, বিষয় সম্পত্তি সহ যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির অধিকারহারা হয়ে তারা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। তারা বিবাহ করার অধিকার, শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের, চলাফেরার অধিকারও হারায়। যারা এ যাবৎকাল মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে বসবাস করতো তারা সম্পত্তির অধিকার হারিয়ে হয়ে পড়ে বিষয় সম্পতিহীন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির পথকে বেছে নেয়। এরই সুযোগ গ্রহণ করে মিয়ানমারে তৎপর এনজিওগুলো। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দাতা সংস্থার এনজিওগুলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনতার মাঝে উগ্রবাদী তৎপরতাসহ নানা নেতিবাচক প্রবণতার বিস্তার ঘটাতে থাকে। সরকারের ভূমিকা ও এনজিওগুলোর কর্মকান্ডের ভিতর দিয়ে সংখালঘু মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এলিট শ্রেণি রাষ্ট্র বিরোধী, সরকার বিরোধী ভূমিকা অবতীর্ণ হয়ে পড়ে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনতার বড় ধরনের বিরোধের প্রকাশ ঘটে ১৯৯১ সালে। এ সময়ে রাখাইনদের সাথে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জাতিগত দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এই দাঙ্গায় মদত দানের ভূমিকা পালন করে পশ্চিমা সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলো। দাঙ্গা থেকে বাঁচতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায় বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী কক্সবাজারে তৎকালীন বিডিআর এর চেক পোস্ট দখল করে নেয়। এই সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের ও তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এনজিওদের বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। কিন্তু তৎকালীন সরকারের সাথে চীনের গভীর সম্পর্ক ও উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় চীন ভূমিকা নিতে রাজি হওযায় এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়।

মিয়ানমারের সাথে চীনের গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক তথা সামগ্রিক সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। মিয়ানমারের সরকার মূলত চীনা সমর্থনপুষ্ট সরকার। চীন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিত্তুতে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। সিত্তুর সাথে চীনের মূল ভূখন্ডের সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। এই পথে চীনের সাথে রেল যোগাযোগ স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে। তাছাড়া এই পথে সম্প্রতি চীনের তেলের পাইপ লাইন নির্মাণের কাজও চলছে। চীন চাইছে যে কোন জরুরি অবস্থায় বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সাথে তার সমুদ্র পথে বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে। সেই হিসাবেই মিয়ানমারের সিত্তু বন্দরকে গড়ে তুলছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন জোট চাইছে এ কাজে বাধা সৃষ্টি করতে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে তৎপরতা চালাচ্ছে। তাই তো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাথে রাখাইন জনগোষ্ঠীর এই বিরোধ। এই বিরোধে রাখাইন সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের সরকার।

অং সান সুকি তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রাসিকে (এনএলডি) এ যাবত মদত দিয়ে এসেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার সমর্থনপুষ্ট পাশ্চাতের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো। সেই সাথে পাশ্চাত্যের সমর্থনপুষ্ট এনজিওগুলোও একই ভূমিকা নিয়ে আসছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্ররা আশা করেছিল অং সান সুকি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল তাদের পক্ষে ভূমিকা গ্রহণ করবেন। কিন্তু তা না হয়ে প্রতিপক্ষ শক্তির সাথে মিলে চলায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শেষ আশাও ব্যর্থ হতে চলেছে। এখানে উল্লেখ্য ক্ষমতায় যেতে অং সান সুকি চীনের সাথে আপোস সমঝোতা করেই রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন বলে প্রতিভাত হচ্ছে। তাই তো পাশ্চাত্যের সমর্থনপুষ্ট দালালরা আওয়াজ তুলেছে অং সান সুকির নোবেল প্রাইজ ফিরিয়ে নিতে। তাই তো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উগ্রপন্থীদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটানো।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে আজ চরম নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়ে অমানবিক জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। এর এক দিকে রয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, যারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে কাজে লাগিয়ে সে দেশের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলের পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তুলেছে। আর অন্য দিকে রয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন সম্প্রদায়, যাদের মদত দিয়ে চলেছে মিয়ানমার সরকার। আর মিয়ানমার সরকারের সাথে জড়িত রয়েছে চীনের ভূমিকা। চীন মিয়ানমারের রাখাইন অধ্যুষিত অঞ্চলে সংঘাত বৃদ্ধি পেয়ে তার জন্য কোন সমস্যা তৈরি হোক, বা তার পরিকল্পিত মেরিটাইম সিল্ক রোডে সমস্যা তৈরি হোক তা সে চায় না। তাই সে মিয়ানমারের সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। মিয়ানমারের রাখাইন ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্বের পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে বাজার ও প্রভাব বলয় বিস্তারের আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব। আর এই আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সে দেশের সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকারে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৬।।সংখ্যা-০৫, রোববার।। ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬।।


শান্তি আলোচনা নাকচ করে সশস্ত্র আন্দোলনে অনড় আলফা

ULFA-I

নিজের আধ্যাত্মিক বিষয়েই মগ্ন থাকুন৷ আমরা আমাদের স্বাধীনতার লড়াই জারি রাখব৷ খোলা চিঠি দিয়ে এমনই জানিয়ে দিল পরেশ বড়ুয়া নেতৃত্বাধীন আলফা (স্বাধীনতা) সংগঠন৷ অসমের জাতীয়তাবাদী এই সশস্ত্র  গোষ্ঠী আগেই ভারত সরকারের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া বাতিল করে দিয়েছে ৷ গোয়েন্দা সূত্রে খবর, চিন থেকেই উত্তর পূর্ব ভারতে আক্রমণের পরিকল্পনা চালাচ্ছেন সংগঠনের কমান্ডার ইন চিফ পরেশ বডুয়া৷

আলফা (স্বা.) সংগঠনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা নিয়েছেন আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী রবিশংকর৷ গুয়াহাটিতে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন৷ এরপরেই কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে আলফা৷ যদিও সংগঠনের শান্তিপন্থী নেতা অনুপ চেতিয়া সহ অন্যান্যদের দাবি, অদূর ভবিষ্যতে কড়া অবস্থান থেকে সরে আসবেন পরেশ বড়ুয়া৷ এদিকে খোলা চিঠি দিয়ে আলফা (স্বা.) দাবি, অসমের মাটিতে তাদের স্বাধীনতার সশস্ত্র আন্দোলন জারি থাকবে৷ ভারত সরকারের কোনওরকম পুনর্বাসন পরিকল্পনায় সংগঠনের সায় নেই৷ নিজেদের রক্ষা করতেই সশস্ত্র পথ বেছে নেওয়া হয়েছে৷ এমনই জানিয়েছে আলফা৷

সূত্রঃ https://www.kolkata24x7.com/ulfai-asks-ravi-shankar-to-stick-to-his-pretentious-religion-not-make-false-promises.html