নকশাল আন্দোলনের প্রসঙ্গ থাকায় সেন্সর বোর্ডের কোপে কলকাতার ইতিহাসের তথ্যচিত্র

 Untitled-696x436

শহর কলকাতার ক্রমবিবর্তনের ধাপটিকে যদি ক্যামেরাবন্দি করতেই হয়, তবে ১৯৪৬-এর দাঙ্গা, দেশভাগ এবং সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনকে কি বাদ দেওয়া যাবে?

অথচ এবার সেরকমই দাবি করছে দেশের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন, সংক্ষেপে বললে সেন্সর বোর্ড। বোর্ডের এমন দাবির মুখে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষুব্ধ পরিচালক অনির্বাণ দত্ত। কলকাতা আর তার ইতিহাস নিয়ে ক্যামেরাবন্দি করা ‘কালীক্ষেত্র’ নামের তথ্যচিত্রটির উপরেই এসে পড়েছে এই কাঁচির কোপ!

৫৬ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে পরিচালক ধরতে চেয়েছেন কলকাতার ইতিহাসের বদলে যাওয়া ছবিটাকে। যার শুরুটা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে। প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক- কলকাতার ইতিহাসের সবকটি স্তরকেই এ ভাবে ‘কালীক্ষেত্র’-এ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি। এবং সেই মতো তৈরিও করেছেন তথ্যচিত্রটি। তার পরেই সেন্সর বোর্ডের তরফ থেকে উঠেছে তীব্র আপত্তি।

“ছবিটায় সব মিলিয়ে ৫টি কাটের দাবি জানিয়েছে সেন্সর বোর্ড। যার সবকটাই অযৌক্তিক তো বটেই, এমনকী অদ্ভুতও। সেন্সর বোর্ড তো এবার রাজনীতিকেই বদলে দিতে চাইছে”, অভিযোগ জানিয়েছেন পরিচালক।

ঠিক কোন কোন জায়গা ছবি থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেন্সর বোর্ড?

১৯৪৬-এর দাঙ্গার দিনে মুসলিম লিগের একটি মিছিল দেখার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, ১৯৪৬-এর ক্যাবিনেট কমিশন নিয়ে জি ডি বিড়লার মহাত্মা গান্ধীকে লেখা চিঠির অংশ এবং নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি জায়গা যার একটিতে কাশীপুর বরানগর হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ এসেছে, জানা গিয়েছে পরিচালকের বিবৃতি থেকে। “নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষিতে যখনই সিপিআই (এম) আর কংগ্রেসের প্রসঙ্গ এসেছে, তখনই তা বাদ দেওয়ার হুকুম জারি হয়েছে”, বলছেন পরিচালক।

ছবিটি আপাতত এ ভাবেই পড়ে রয়েছে সেন্সর বোর্ডের নয়াদিল্লির দফতরে। বার বার যোগাযোগ করেও বোর্ডের তরফ থেকে শুধু ওই জায়গাগুলো বাদ দেওয়ার নির্দেশ ছাড়া আর কিছু জানা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে পরিচালক ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছেন সেন্সর বোর্ড প্রধান প্রসূন জোশীর সঙ্গেও। কিন্তু তিনিও বিষয়টি নিয়ে পরিচালকের এসএমএস এবং ফোন কলের প্রত্যুত্তর দেননি।

“আমাদের ফিল্ম সার্টিফিকেশন অ্যাপিলেট ট্রাইবুনালে যাওয়া ছাড়া আর গতি নেই”, উপায়ান্তর না দেখে বলছেন পরিচালক!

সূত্রঃ http://www.khaboronline.com/news/entertainment/documentary-on-kolkata-hits-cbfc-hurdles-for-showcasing-riots-naxalite-violence/

 

Advertisements

মুম্বই থেকে গ্রেফতার ৭ ‘মাওবাদী’

404_09_06_13_ATS_arrests_7_suspected_Maoists_in_Mumbai_H@@IGHT_510_W@@IDTH_680

মুম্বইয়ের কল্যাণ রেল স্টেশনের কাছ থেকে সন্দেহভাজন ৭ মাওবাদীকে গ্রেফতার করল মহারাষ্ট্রের ATS। TOI এ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ধৃতদের বাড়ি থেকে মাওবাদী সাহিত্য বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিস। কোন অস্ত্রের সন্ধান পায়নি পুলিস। পুলিসের দাবি মাওবাদীদের ওই দলটি শহরাঞ্চলের বস্তি এলাকায় মাওবাদী চিন্তাধারার প্রচার করছিল। পুলিসের দাবি গ্রেফতার হওয়া ৭জনের মধ্যে রয়েছেন তেলেঙ্গানার মাও নেতা অজয় দোসরি ওরফে ভেনুগোপাল। প্রশ্ন উঠছে শুধুমাত্র মাওবাদী সাহিত্য রাখার অভিযোগে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না বলে আগেই জানিয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট, তারপরও এরকম গ্রেফতার কেন?

সূত্রঃ satdin.in


মিঠুন চাকমা হত্যাকাণ্ড সেনা মদদে, অভিযোগ বামপন্থিদের

 h


ভারতের মাওবাদী সংগঠনের সদস্য বাংলাদেশে আটক!

IMG_২০১৬০৮২৪_২৩৪২২৭

ভারতের আসাম রাজ্যের মাওবাদী দলের সদস্য ও ৬৩ মামলার ফেরারি আসামি আমিনুর মাতব্বরকে বাংলাদেশের লালমনিরহাটের পাটগ্রামে আটক করা হয়েছে। এ সময় তার কাছ থেকে ৪৮ রাউন্ড গুলি ও একটি পিস্তল জব্দ করেছে পুলিশ। আমিনুরের সঙ্গে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে।

পাটগ্রাম থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ফিরোজ কবির জানান, আমিনুর মাতব্বর ওরফে জাকির মাতব্বর ওরফে পাগলা আটাং (২৬) ভারতের আসাম প্রদেশের কোকড়াঝাড় জেলার গোসাইগঞ্জ উপজেলার মাটিয়াপাড়া এলাকার মৃত বাবলু মাতব্বরের ছেলে। তাকে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার পশ্চিম জগতবেড় এলাকার সাহাজুল ইসলামের ছেলে আব্দুর রশিদের (৩২) বাড়ি থেকে বৃহস্পতিবার দিনগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে আটক করা হয়। বাড়ির মালিক আব্দুর রশিদকেও আটক করা হয়েছে। এ সময় আমিনুরের কাছ থেকে ইতালিতে তৈরি একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ৪৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

ফিরোজ কবির আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমিনুর মাতব্বর জানিয়েছে ভারতের জেলে আব্দুর রশিদের সঙ্গে তার পরিচয়। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে আমিনুর দুই থেকে আড়াই মাস আগে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার জগতবেড় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করে।  

পাটগ্রাম থানার ওসি অবনী শঙ্কর কর বলেন, ‘আটক দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এর বাইরে এখনই আর কিছু বলা যাচ্ছে না।’

সূত্রঃ banglatribune.com


শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদ এর উদ্যোগে ‘জাতীয় শহীদ দিবস’ পালিত

sdr

Screenshot_2018-01-03-22-43-20cof


মাওবাদী নেতা সিরাজ সিকদারকে নিয়ে খালেদা জিয়া’র টুইট

145810be23fd0367e7dba0cfe7b526cc-5a4cbaf5391a2

‘ক্ষমতার জন্য হত্যা’ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে টুইট করেছেন বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ছবি: খালেদা জিয়ার টুইটার থেকে নেওয়া

বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘ক্ষমতার জন্য হত্যা’ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে টুইটারে একটি বার্তা দিয়েছেন। আজ বুধবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটের দিকে তিনি টুইট বার্তাটি দেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতে টুইট বার্তাটি প্রেরণ করা হয়। এ ছাড়া টুইট বার্তায় সিরাজ শিকদারের ছবিও দেওয়া হয়।

টুইট বার্তায় খালেদা জিয়া বলেন, ‘রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য জানুয়ারি ২, ১৯৭৫ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা প্রকৌশলী সিরাজ শিকদার, যে বিচার আজও হয়নি।’

খালেদা জিয়া আরও বলেন, ‘শুধু ক্ষমতা স্থায়ী করতে ৭১-এর পর ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা শুরু করে শাসকগোষ্ঠী, কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। ক্ষমতার জন্য হত্যা বন্ধ হোক।’

উল্লেখ্য যে, প্রতি বছরই বিএনপি’র কোন না কোন নেতা ফায়দা লুটার উদ্দেশ্যে, ২রা জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হওয়া দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা প্রকৌশলী সিরাজ সিকদারকে স্মরণ করে। অথচ, খালেদা জিয়ার’র নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামাত জোট সরকার ২০০৪ সালের ২৬শে মার্চ র‍্যাব গঠন করে হাজার হাজার বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটানোর দায়ে অভিযুক্ত এবং এর মধ্যে বেশীর ভাগই হচ্ছে মাওবাদী ও অন্যান্য কমিউনিস্ট বিপ্লবীগণ।

সূত্রঃ http://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1400666/%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%87-%


নৈরাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদ -জোসেফ স্তালিন

88617610-b099-4d21-89a9-bb394cdfd93c---0

 

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ


আমরা সেই ধরনের লোক নই, যারা নৈরাজ্যবাদ শব্দটার উল্লেখ হলেই অবজ্ঞাভরে মুখ ফিরিয়ে এবং উন্নাসিকভাবে হাত নেড়ে বলে, ‘ও সম্পর্কে সময় নষ্ট করে কি হবে? ওটা তো আলোচনারই যোগ্য নয়!’ আমরা মনে করি এ রকম সস্তা সমালোচনা মর্যাদাহানিকর ও নিরর্থক।

আমরা আবার সে ধরনের লোকও নই, যারা এই চিন্তা করে নিজেদের সান্ত¡না দেই যে নৈরাজ্যবাদীদের ‘পেছনে কোনো ব্যাপক জনসাধারণ নেই এবং সেজন্য তারা ততটা বিপজ্জনক নয়।’ আজ কার কত বেশি বা কম গণসমর্থন আছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো মতবাদের সারবস্তু। যদি নৈরাজ্যবাদীদের মতবাদ সত্য প্রকাশ করে, তাহলে বলা নিষ্প্রোয়জন যে, তা নিশ্চয়ই নিজের পথ নিজেই কেটে নেবে এবং তার চারিপাশে জনগণকে সমবেত করবে। কিন্তু যদি তা অযৌক্তিক ও মিথ্যা ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা বেশিদিন স্থায়ী হবে না এবং শূন্যে ঝুলতে থাকবে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদের অযৌক্তিতা অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, নৈরাজ্যবাদীরা মার্কসবাদের প্রকৃত শত্রু। তদনুযায়ী আমরা এই মত পোষণ করি যে, প্রকৃত শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রকৃত সংগ্রাম অবশ্যই চালাতে হবে। সুতরাং গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্যবাদীদের মতবাদ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা এবং সমস্ত দিক থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার মূল্য নির্ণয় করা প্রয়োজন।

কিন্তু নৈরাজ্যবাদকে সমালোচনা করা ছাড়াও আমাদের নিজেদের অবস্থান আমাদের অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে এবং এইভাবে মার্কস ও এঙ্গেলসের মতবাদের সাধারণ রূপরেখা সংক্ষেপে উপস্থিত করতে হবে। এটা আরও বেশি প্রয়োজন এই জন্য যে, কিছু কিছু নৈরাজ্যবাদী মার্কসবাদ সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করছে এবং পাঠকদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাহলে এখন আলোচ্য বিষয় নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাক।

“বিশ্বে সবকিছুই গতিশীল, জীবন বদলে যায়, উৎপাদনশীল শক্তিসমূহ বৃদ্ধি পায়, পুরানো সম্পর্কসমূহ ধসে পড়ে চিরন্তন গতিশীলতা, চিরন্তন ধ্বংস এবং সৃষ্টি- এটাই হলো জীবনের মর্ম।”- কার্ল মার্কস [দর্শনের দৈন্য]।

মার্কসবাদ শুধু সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব নয়, মার্কসবাদ একটি অখণ্ড বিশ্ববীক্ষা, একটি দার্শনিক প্রণালী, যা থেকে মার্কসের সর্বহারার সমাজতন্ত্র যুক্তিসঙ্গতভাবেই এসে পড়ে। এই দার্শনিক প্রণালীকে বলা হয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। সুতরাং মার্কসবাদকে ব্যাখ্যা করার অর্থ হলো দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে ব্যাখ্যা করা।

এই দার্শনিক প্রণালীকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বলে কেন? 
বলে এই জন্য যে, এর পদ্ধতি হলো দ্বন্দ্বমূলক এবং তত্ত্ব হলো বস্তুবাদী।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিটি কি? 
বস্তুবাদী তত্ত্বটি কি? 
বলা হয়, নিরন্তর জন্ম, বৃদ্ধি ও বিকাশের ধারাই জীবন। এটা সত্য, সামাজিক জীবন অবশ্যই অব্যয় এবং স্থানু একটা কিছু নয়, জীবন কখনও একই স্তরে থাকে না। শাশ্বত গতিশীলতায়, ধ্বংস ও সৃষ্টির এক শাশ্বত প্রক্রিয়ায় জীবনের প্রবাহ। সঙ্গত কারণেই মার্কস বলেছিলেন যে, চিরন্তন গতিশীলতা, এবং চিরন্তন ধ্বংস ও সৃষ্টিই হলো জীবনের ধর্ম। সুতরাং জীবনের মধ্যে সব সময়ে রয়েছে নতুন এবং পুরাতন, জয়মান ও ক্ষীয়মান, বিপ্লব এবং প্রতিক্রিয়া- এর মধ্যে প্রতিনিয়ত একটা কিছু মারা যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে সব সময়েই একটা কিছু জন্মাচ্ছে। 
দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি আমাদের বলে যে, জীবন বাস্তবিকপক্ষে যা জীবনকে সেই মতোই বিবেচনা করতে হবে। জীবন অবিরাম গতিশীল, এবং সেজন্য জীবনকে অবশ্যই তার গতিশীলতা, তার ধ্বংস ও সৃষ্টির মধ্যেই বিবেচনা করতে হবে। জীবন কোথায় যাচ্ছে, জীবন কী লয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং কী-ই বা জন্মলাভ করছে, কী ধ্বংস হচ্ছে এবং কী-ই বা সৃষ্টি হচ্ছে? সর্বপ্রথম এই প্রশ্নগুলিরই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা উচিত।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির এই হল প্রথম সিদ্ধান্ত। 
জীবনে যা জন্মাচ্ছে এবং দিনে পর দিন বেড়ে উঠছে তা অজেয়, তার অগ্রগতি প্রতিহত হতে পারে না, তার বিজয়লাভ অবশ্যম্ভাবী। অর্থাৎ উদাহরণ স্বরূপ, শ্রমিক শ্রেণি যদি জন্মগ্রহণ করে, দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, তাহলে তারা আজ দুর্বল এবং সংখ্যায় যত কমই হোক না কেন, তাতে কিছু এসে যায় না, পরিণামে তারা নিশ্চয়ই বিজয়ী হবে। পক্ষান্তরে, জীবনে যা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং কবরের দিকে এগিয়ে চলেছে, তা অবশ্যম্ভাবীরূপে পরাজয় বরণ করবে। অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ, আজ যদি বুর্জোয়াদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে এবং তারা প্রতিদিন পিছন থেকে আরও পিছনে যেতে থাকে, তাহলে তারা আজ যতই সবল এবং সংখ্যায় যত বেশিই হোক না কেন পরিণামে তারা অবশ্যই পরাজয় বরণ করবে এবং কবরে যাবে। এ থেকেই সুবিদিত দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির উদ্ভব: যা কিছু বাস্তবক্ষেত্রে বিদ্যমান, অর্থাৎ যা কিছু দিনের পর দিন বেড়ে উঠছে, তা যুক্তিসিদ্ধ।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির এই হলো দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত। 
গত শতাব্দীর আশির দশকে রাশিয়ার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এক বিরাট বিতর্ক উঠেছিল। নারদনিকেরা ঘোষণা করলো- প্রধান যে শক্তি রাশিয়াকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিতে পারে, তারা হলো গরিব কৃষকেরা। কেন?- মার্কসবাদীরা তাদের জিজ্ঞাসা করলো। নারদনিকরা জবাব দিল, এর কারণ কৃষক সমাজ সংখ্যায় সর্বাধিক এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা রাশিয়ার সমাজের দরিদ্রতম অংশ। এর জবাবে মার্কসবাদীরা বললো- একথা সত্য যে কৃষক সমাজ আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা অত্যন্ত গরিব, কিন্তু এটাই কী প্রশ্নঃ কৃষক সমাজ তো বহুদিন ধরেই সংখ্যাগরিষ্ঠ রয়েছে, কিন্তু এ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির সাহায্য ব্যতীত তারা মুক্তির সংগ্রামে কোন উদ্যোগ দেখায়নি। কেন? কারণ কৃষক সমাজ, শ্রেণি হিসাবে দিনের পর দিন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে এবং ভেঙে গিয়ে বুর্জোয়ায় ও শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণি, শ্রেণি হিসাবে দিনের পর দিন বাড়ছে এবং শক্তিলাভ করছে। এখানে দারিদ্র্যেরও চূড়ান্ত গুরুত্ব নেইঃ ভবঘুরেরা কৃষকদের তুলনায় অধিকতর গরিব, কিন্তু কেউ বলবে না যে তারা রাশিয়াকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিতে পারে। একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোঃ জীবনে কারা বেড়ে উঠছে এবং কারা ক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে। যেহেতু শ্রমিক শ্রেণি হলো একমাত্র শ্রেণি যা নিশ্চিত গতিতে বেড়ে উঠছে এবং শক্তি অর্জন করছে, আমাদের কর্তব্য হলো এদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো এবং রাশিয়ার বিপ্লবে একে প্রধান শক্তি হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া- মার্কসবাদীরা এইভাবেই জবাব দিয়েছিল। তাহলে আপনারা দেখছেন, মার্কসবাদীরা প্রশ্নটি দেখেছিল দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, পক্ষান্তরে নারদনিকরা তাকে দেখেছিল অধিবিদ্যক দৃষ্টিকোণ থেকে, কেননা তারা জীবনকে গণ্য করতো এমন একটা কিছু বলে যা অনড়, অব্যয় এবং চিরকালের মতো নির্দিষ্ট (এফ এঙ্গেলসের ‘ফিলসফি, পলিটিক্যাল ইকনোমিক সোস্যালিজম দেখুন)।

এইভাবেই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি সমাজজীবনের আন্দোলনকে দেখে থাকে। 
কিন্তু আন্দোলন আছে নানা রকমের। ডিসেম্বরের দিনগুলিতে সামাজিক আন্দোলন ঘটেছিল, যখন শ্রমিক শ্রেণি শিরদাঁড়া সোজা করে অস্ত্রশস্ত্রের ডিপো প্রচ- বেগে আক্রমণ করলো এবং প্রতিক্রিয়ার ওপর আক্রমণ চালালো। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলির আন্দোলন যখন শ্রমিক শ্রেণি শান্তিপূর্ণ বিকাশের অবস্থাতে বিচ্ছিন্ন ধর্মঘটে এবং ছোট ছোট ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল, তাকেও সামাজিক আন্দোলনই বলতে হবে। স্পষ্টতই আন্দোলন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এই জন্যই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি বলে আন্দোলনের দুটি রূপ আছেঃ বিকাশমূলক রূপ ও বিপ্লবমূলক। যখন অগ্রগতিশীল অংশসমূহ তাদের প্রাত্যহিক কার্যকলাপ স্বতঃস্ফূর্তভাবে চালিয়ে যেতে থাকে এবং পুরাতন ব্যবস্থার গৌণ, মাত্রাগত পরিবর্তন ঘটায়, তখন সে আন্দোলন হলো বিকাশমূলক। আন্দোলন বিপ্লবী হয়, যখন সেই একই অংশসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়, একটিমাত্র ধারণায় পরিপূর্ণভাবে অনুপ্রাণিত হয় এবং পুরানো ব্যবস্থা ও তার গুণগত বৈশিষ্ট্যগুলি সমূলে উৎপাটিত করার জন্য এবং একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য শত্রু শিবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে; বিপ্লব বিকাশের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণতা দান করে এবং তার পরবর্তী কর্মকা- সহজ করে।

প্রকৃতিতেও অনুরূপ প্রক্রিয়া ঘটে থাকে। বিজ্ঞানের ইতিহাস দেখিয়ে দেয় যে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি একটি খাঁটি পদ্ধতিঃ জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে সমাজবিজ্ঞান প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা এই ধারণারই অনুমোদন পাই যে, এই বিশ্বে কিছুই শাশ্বত নয়, প্রকৃতিতে প্রতিটি বস্তুই পরিবর্তিত হয়, প্রতিটি বস্তুই বিকশিত হয়। এজন্য প্রকৃতিতে প্রতিটি বস্তুকেই গতি এবং বিকাশের দৃষ্টিকোন থেকেই বিবেচনা করতে হবে। এবং এর অর্থ এই যে, দ্বন্দ্ববাদের মূলনীতি আজকের দিনেও সমস্ত বিজ্ঞানেই পরিব্যাপ্ত রয়েছে।

গতির বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে দ্বন্দ্ববাদী তত্ত্বের যে সিদ্ধান্ত- ছোট ছোট মাত্রাগত পরিবর্তন, শীঘ্রই হোক আর বিলম্বেই হোক, বড় বড় গুণগত পরিবর্তনে পরিণতি লাভ করে- এই সিদ্ধান্ত, এই নিয়ম সমানভাবে প্রকৃতির ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেনডিলিয়েভে উপাদানসমূহের পর্যাবৃত্ত প্রণালী সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির ইতিহাসে মাত্রাগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তনের উদ্ভব কত গুরুত্বপূর্ণ। জীববিদ্যায় নয়া লামার্কবাদী তত্ত্ব এই একই জিনিস দেখিয়েছে। এই তত্ত্বের কাছে নয়া ডারউইনবাদ নতি স্বীকার করছে। 
অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছুই বলবো না; এফ এঙ্গেলস তার এ্যান্টি ডুরিংএ তাদের ওপর পর্যাপ্ত আলোচনা করেছেন।

তাহলে আমরা এখন দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাথে পরিচিত। আমরা জানি যে এই পদ্ধতি অনুযায়ী বিশ্বজগৎ চিরন্তন গতিশীল, ধ্বংস এবং সৃষ্টির চিরন্তন প্রক্রিয়ায় চলমান এবং সেইজন্য প্রকৃতি ও সমাজের প্রতিটি ঘটনায়ই দেখতে হবে গতিময়তার দিক থেকে, দেখতে হবে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রক্রিয়ার দিক থেকে, নিশ্চল এবং গতিহীন কিছু বলে একে বিবেচনা করা চলবে না। আমরা আরও জানি এই গতির দুটি রূপ আছেঃ বিকাশমূলক রূপ এবং বিপ্লবী রূপ।

নৈরাজ্যবাদীরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে কিভাবে দেখে? 
প্রত্যেকেই জানে, হেগেল দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির স্রোষ্টা ছিলেন। মার্কস কেবল এই পদ্ধতিকে পরিশোধিত করে উন্নত করেছিলেন। নৈরাজ্যবাদীরা তা জানে; তারা এও জানে যে হেগেল ছিলেন রক্ষণশীল, এবং এই জন্য তারা তার সুযোগ নিয়ে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রবক্তা বলে গালিগালাজ করে; তার দিকে কাদা ছোড়ে এবং চরম উৎসাহ নিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, হেগেল হলেন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দার্শনিক; প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, হেগেল আমলাতান্ত্রিক নিয়মতান্ত্রিকতার চরম রূপের স্তুতিকার, তার ইতিহাসের দর্শন-এর সাধারণ ভাবধারা হল পুনঃপ্রতিষ্ঠার কালের দার্শনিক প্রবণতার বশবর্তী এবং তাকেই তা সাহায্য করে ইত্যাদি ইত্যাদি (ভি, চেরকেজিশভিলির প্রবন্ধ দেখুন)। সত্য বটে, এই প্রশ্নে তারা যা বলে, কেউ তার প্রতিবাদ করে না এবং প্রত্যেকেই স্বীকার করে যে, হেগেল বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাজতন্ত্রের একজন সমর্থক। এ সত্ত্বেও নৈরাজ্যবাদীরা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং অবিরাম এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে যে, হেগেল পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রবক্তা ছিলেন। কেন তারা তা করে? সম্ভবত এই সবের দ্বারা তারা হেগেলকে অপদস্ত করতে চায়, পাঠককে বোঝাতে চায় প্রতিক্রিয়াশীল হেগেলের পদ্ধতিটি অগ্রহণীয় ও অবৈজ্ঞানিক। তাই যদি হয়, যদি নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন যে তারা এইভাবে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে অপ্রমাণ করতে সক্ষম, তাহলে আমি বলবো যে, এইভাবে তারা তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই স্বপ্রমাণ করতে পারেন না। পাসক্যাল ও লাইবনিৎস বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু যে গাণিতিক পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করেছিলেন তা আজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসাবে স্বীকৃত; মেয়ার ও হেলমহোলৎসও বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে তাদের আবিষ্কার বিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করেছিল। লামার্ক ও ডারউইন বিপ্লবী ছিলেন না; কিন্তু তাদের বিবর্তনমূলক পদ্ধতি জীববিজ্ঞানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। হ্যাঁ এইভাবে নৈরাজ্যবাদী মশাইরা তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করতে পারছেন না।

আরও এগোনো যাক। নৈরাজ্যবাদীদের মতে দ্বন্দ্ববাদ হল অধিবিদ্যা এবং যেহেতু তারা বিজ্ঞানকে অধিবিদ্যা থেকে এবং দর্শনকে ঈশ্বরতত্ত্ব থেকে মুক্ত করতে চায়। সেইজন্য তারা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে অস্বীকার করে।

হায়, এই নৈরাজ্যবাদীরা! কথায় বলে নিজের পাপ অন্যের ঘাঁড়ে চাপিয়ে দাও। অধিবিদ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভিতর দিয়েই দ্বন্দ্ববাদ পূর্ণতা প্রাপ্ত হলো এবং প্রতিষ্ঠা অর্জন করলো; কিন্তু নৈরাজ্যবাদীদের মতে সেই দ্বন্দ্ববাদই হলো অধিবিদ্যা। নৈরাজ্যবাদীদের জনক প্রুঁধো বিশ্বাস করতেন যে, জগতে চিরকালের জন্য নির্ধারিত অপরিবর্তনীয় ন্যায় বিদ্যমান রয়েছে, এবং এরই প্রেক্ষিতে প্রুঁধোকে বলা হয়েছে অধিবিদ্যাবিদ। মার্কস দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাহায্যে প্রুঁধোর সাথে সংগ্রাম করেছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন, ‘যেহেতু পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তুই বদলায়, ন্যায় অবশ্যই বদলাবে এবং সেজন্য অপরিবর্তনীয় ন্যায় হলো অধিবিদ্যার অর্থহীন বুলি।’ [মার্কসের দর্শনের দারিদ্র্য]। কিন্তু তবুও অধিবিদ্যক প্রুঁধোর জর্জিয়ান শিষ্যেরা প্রমাণ করার চেষ্টায় লেগে যায় যে, বস্তুবাদ হলো অধিবিদ্যা এবং অধিবিদ্যা অজ্ঞেয় ও স্বয়ংসিদ্ধ সত্তা স্বীকার করে এবং পরিণামে নীরস ঈশ্বর তত্ত্বে পর্যবসিত হয়। প্রুঁধো এবং স্পেনসারের বিরুদ্ধে এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাহায্যে অধিবিদ্যা ও ঈশ্বরতত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। [লুডউইগ ফয়েরবাগ এবং এ্যান্টি ড্যুরিং দেখুন]। তিনি প্রমাণ করেছিলেন তারা কেমন হাস্যকরভাবে ধোঁয়াটে ছিলেন। কিন্তু আমাদের নৈরাজ্যবাদীরা প্রমাণ করতে সচেষ্ট যে প্রুঁধো এবং স্পেন্সার ছিলেন বৈজ্ঞানিক। পক্ষান্তরে মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন অধিবিদ্যাবিদ। দুটি জিনিসের একটা হয় নৈরাজ্যবাদী মশাইরা নিজেদের প্রতারিত করছে, না হয় অধিবিদ্যা কী তারা তা বোঝে না। সে যাই হোক কোনটার জন্যই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে দোষ দেওয়া যায় না।

নৈরাজ্যবাদী মশাইরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির বিরুদ্ধে আর কী কী অভিযোগ আনেন? তারা বলেন দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি হলো সূক্ষ্ম কথার জাল বোনা, কুতর্কের কৌশল, তর্কশাস্ত্রের এবং মানসিক ডিগবাজি। যার সাহায্যে সত্য এবং মিথ্যা দুই-ই সমান স্বাচ্ছন্দে প্রমাণ করা যায়।

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে যে, নৈরাজ্যবাদীদের উত্থাপিত অভিযোগের কিছু ভিত্তি আছে। অধিবিদ্যক পদ্ধতির অনুসরণকারীদের সম্পর্কে এঙ্গেলস কি বলেন মনোযোগ দিয়ে শুনুন: “…. তার বাণী হলো হ্যাঁ নিশ্চয়-ই হ্যাঁ, না নিশ্চয়ই না, কারণ যা কিছু এই দুইয়ের অতিরিক্ত তা-ই অশুদ্ধ থেকে আগত। তার পক্ষে একটা জিনিস হয় বিদ্যমান, নয় বিদ্যমান নয়। তেমনি কোন বস্তুর পক্ষে একই সময়ে সেই বস্তু এবং অন্য কোন বস্তু হওয়া অসম্ভব। ইতি এবং নেতি চূড়ান্তভাবে পরস্পরের ব্যতিরেকী।” [এ্যান্টি ড্যুরিং এর ভূমিকা]।

সে কি রকম? নৈরাজ্যবাদীরা চিৎকার করে বলে কোনো বস্তুর পক্ষে একই সময়ে ভাল এবং মন্দ হওয়া কি সম্ভব? এটা হলো কুতর্ক, কথার মারপ্যাচ, এটা দেখাচ্ছে যে, তুমি সত্য ও মিথ্যাকে সমান আয়েশে প্রমাণ করতে চাও।

আচ্ছা বিষয়টির মর্মে যাওয়া যাক। আজ আমরা গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র দাবি করছি। কিন্তু গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বুর্জোয়া ধনসম্পত্তিকে শক্তিশালী করে। আমরা কি বলতে পারি যে, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রে ভাল! না আমরা পারি না! কেন? যেহেতু আমরা যখন সামন্ততান্ত্রিক সম্পত্তিকে বিনষ্ট করছি সেই আজকের জন্য গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র ভাল, কিন্তু আগামীকাল যখন আমরা বুর্জোয়াদের সম্পত্তি বিনষ্ট করতে এগুবো, এগুবো সমাজতান্ত্রিক সম্পত্তি প্রতিষ্ঠা করতে তখন গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র আর ভাল থাকবে না। পক্ষান্তরে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং তাকে আমরা চূর্ণ করে ফেলে দেব। কিন্তু যেহেতু জীবন শাশ্বত গতিশীল এবং যেহেতু অতীতকে বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না এবং সেহেতু আমরা যুগপৎ সামন্ততান্ত্রিক শাসন এবং বুর্জোয়াদের সঙ্গে লড়াই করছি, সেহেতু আমরা বলি একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র যেখানে সামন্ততান্ত্রিক সম্পত্তিকে ধ্বংস করে, সেখানে তা ভাল এবং আমরা তাকে সমর্থন করি; কিন্তু যেখানে তা বুর্জোয়া সম্পত্তিকে শক্তিশালী করে সেখানে তা খারাপ এবং সেখানে আমরা তাকে সমালোচনা করি। এ থেকে আসে যে, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র একই সময়ে ভাল এবং উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব হতে পারে হ্যাঁ এবং না দুটোই। দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সঠিকতা প্রমাণে উক্ত কথাগুলো বলার সময়ে এই ধরনের বিষয়গুলিই এঙ্গেসের মনে ছিল। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা তা বুঝতে পারে না এবং তাদের কাছে এটা কুতর্ক মনে হয়। অবশ্য প্রকৃত বিষয়গুলি গ্রহণ করার বা প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা নৈরাজ্যবাদীদের আছে, তা করবার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের আছে। কিন্তু তারা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে টেনে আনছে কেন? দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি নৈরাজ্যবাদের মতো নয়; তা চোখ বন্ধ করে জীবনের দিকে তাকানো নয়; জীবনের স্পন্দনের ওপরে তার আঙ্গুল রয়েছে এবং তা খোলাখুলিভাবে বলে, যেহেতু জীবন পরিবর্তনশীল ও গতিময়, সেজন্য জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে দুটি ঝোঁক আছে ; একটি ইতিবাচক অন্যটি নেতিবাচক; প্রথমটিকে আমরা অবশ্যই রক্ষা করবো, দ্বিতীয়টিকে আমরা অবশ্যই বর্জন করবো। কী আজব লোক এই নৈরাজ্যবাদীরাঃ তারা প্রতিনিয়ত ন্যায় সম্বন্ধে বাণী দিচ্ছে কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির ওপর পুরো অন্যায় চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও এগোনো যাক। আমাদের নৈরাজ্যবাদীদের মতে দ্বন্দ্বমূলক বিকাশ হলো প্রলয়মূলক বিকাশ; যার দ্বারা প্রথমে অতীতকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয় এবং তারপর ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। কুভিয়ারের প্রলয় ঘটেছিল অজানা কারণে, মার্কস এবং এঙ্গেলসের প্রলয়ের কারণ দ্বন্দ্ববাদ। অন্য এক জায়গায় একই লেখক লিখেছেন, মার্কসবাদ ডারউইনের ওপর নির্ভর করে এবং বিনা সমালোচনায় তাকে গ্রহণ করে। 
পাঠক এই কথায় মনোযোগ দিন!

কুভিয়ার ডারউইনের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব বাতিল করেন। তিনি কেবলমাত্র প্রলয়কেই স্বীকার করেন এবং প্রলয় হলো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়, যার কারণ অজ্ঞাত। নৈরাজ্যবাদীরা বলে মার্কসবাদীরা ডারউইনের ওপর নির্ভর করে এবং বিনা সমালোচনায় তাকে গ্রহণ করে। অর্থাৎ মার্কসবাদ কুভিয়ারের প্রলয়কে স্বীকার করে না।

ইচ্ছা হলে একে নৈরাজ্যবাদ বলতে পারেন! কথায় বলে সার্জেন্টের স্ত্রী নিজেই নিজেকে বেত মেরেছিল। স্পষ্টতই ৬ নং নোভাতিতে এস এইস জি. কী বলেছিলেন ৮নং নোভাতিতে তিনি তা ভুলে বসে আছেন।

কোনটা সঠিক ৮নং না ৬নং? অথবা দুটিতেই মিথ্যা উক্তি করা হয়েছে?
প্রকৃত ঘটনার দিকে তাকানো যাক। মার্কস বলেন, বিকাশের একটা স্তরে সমাজের বস্তুগত উৎপাদিকা শক্তিগুলি তৎকালীন উৎপাদন সম্পর্ক সমূহের সঙ্গে অথবা আইনের ভাষায় বলতে গেলে সম্পত্তিগত সম্পর্কসমূহের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে- তখন শুরু হয় সামাজিক বিপ্লবের একটা যুগ। কিন্তু সমস্ত উৎপাদন শক্তিগুলির যতদূর সম্ভব বিকশিত হওয়ার সুযোগ আছে। ততদূর অবধি বিকশিত হবার আগে কোনো সমাজব্যবস্থা কখনো ধ্বংস হয় না। (কার্ল মার্কস- এ কনট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমির ভূমিকা)।

মার্কসের এই ধারণা যদি সমসাময়িক সামাজিক জীবনে প্রযুক্ত হয়, তাহলে আমরা দেখবো যে, একদিকে আজকের দিনের উৎপাদিকা শক্তিগুলিতে, যার চরিত্র হলো সামাজিক এবং অন্যদিকে উৎপাদিত বস্তুর আত্মসাতের রূপ, যার চরিত্র হলো ব্যক্তিগত এই দুইয়ের মধ্যে একটি মৌলিক সংঘাত রয়েছে। যা অবশ্যই পরিণতি লাভ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে। (এঙ্গেলসের এ্যান্টি ড্যুরিং দেখুন, তৃতীয় অংশ, তৃতীয় অধ্যায়)। তাহলে আপনারা দেখছেন মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে বিপ্লব (প্রলয়) কুভিয়ারের অজ্ঞাত কারণের জন্য সংঘটিত হয় না। সংঘটিত হয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কারণে, যাকে বলা হয় উৎপাদিকা শক্তিসমূহের বিকাশ। আপনারা দেখছেন মার্কস এঙ্গেলসের মতে বিপ্লব শুধু তখনই আসে যখন উৎপাদিকা শক্তিগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়, অপ্রত্যাশিতভাবে নয় যেমন কুভিয়ার ভাবছেন। স্পষ্টতই কুভিয়ারের প্রলয় এবং দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির মধ্যে কোন মিল নেই। পক্ষান্তরে ডারউইনবাদ শুধু কুভিয়ারের প্রলয়কেই অস্বীকার করে না, দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিকাশ- যার মধ্যে বিপ্লবও অন্তর্ভুক্ত তাকেও অস্বীকার করে। অন্যদিকে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিবর্তন ও বিপ্লব, পরিমাণগত ও গুণগত পরিবর্তন একই গতির দুটি আবশ্যিক রূপ। এটা বলাও ভুল যে মার্কসবাদ ডারউইনবাদকে বিনা সমালোচনায় গ্রহণ করে। তাহলে এর থেকে বোঝা যায় যে যেমন ৬ নম্বরে তেমনি ৮ নম্বরেও, উভয় ক্ষেত্রেই নোভাতি সঠিক।

এইসঙ্গে এইসব মিথ্যাবাদী সমালোকেরা আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বার বার বলতে থাকেঃ তোমরা পছন্দ কর আর নাই করো, আমাদের মিথ্যাগুলি তোমাদের সত্যের চেয়ে উৎকৃষ্টতম। সম্ভবত তাদেরও বিশ্বাস তারা যা-ই বলুক বা করুক না কেন সব কিছুই ক্ষমার্হ। 
আর একটি বিষয় আছে যার জন্য নৈরাজ্যবাদী মশাইরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে ক্ষমা করতে পারে নাঃ দ্বন্দ্ববাদ … নিজের থেকে বেরিয়ে বা লাফিয়ে যাওয়া অথবা লাফ দিয়ে নিজেকে টপকে যাওয়ার কোন সুযোগ দেয় না। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা এখানে আপনারা চূড়ান্তভাবে সঠিক, দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিতে সত্যই এ রকমের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কেন নেই? নিজের থেকে বেরিয়ে বা লাফিয়ে যাওয়া, কিংবা লাফ দিয়ে নিজেকে টপকে যাওয়া হলো বুনো ছাগলের কসরৎ, কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি তো সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য। এই হলো গোপন তত্ত্ব!… 
সাধারণভাবে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির প্রশ্নে নৈরাজ্যবাদীদের মত হচ্ছে এই।

স্পষ্টতই নৈরাজ্যবাদীরা মার্কস-এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি অনুধাবন করতে অক্ষম, তারা তাদের নিজস্ব দ্বন্দ্ববাদ সৃষ্টি করেছে এবং তার বিরুদ্ধে তারা এত নির্মমভাবে লড়াই করে চলেছে। এই দৃশ্য দেখে আমরা শুধু হাসতেই পারি, কারণ কেউ যখন দেখে যে একজন তার নিজেরই কল্পনার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে; নিজের আবিষ্কারকে চূর্ণ করছে আর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে জোর দিয়ে বলছে যে, সে তার প্রতিপক্ষকেই চূর্ণ করছে তখন কেউ না হেসে থাকতে পারে না।


“মানুষের চেতনা তার বাস্তব অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না, পক্ষান্তরে, তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে”- কার্ল মার্কস।

বস্তুবাদী তত্ত্বটা কি?
পৃথিবীতে সব জিনিসের পরিবর্তন ঘটে, পৃথিবীতে সব কিছুই গতিশীল, কিন্তু কীভাবে এই পরিবর্তনগুলি সংগঠিত হয়, এই গতিশীলতা কী রূপ পরিগ্রহ করে এটাই হলো প্রশ্ন। উদাহরণস্বরূপ আমরা জানি, এই পৃথিবী একদিন ছিল জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড, তারপরে তা ক্রমে ক্রমে ঠাণ্ডা হলো; তারপরে জীবজন্তুর রাজ্যের অভ্যুদয় হলো, বিকাশ ঘটলো, তারপরে আবির্ভাব ঘটল এক জাতের বানরের যা থেকে পরবর্তীকালে হল মানুষের উদ্ভব। কিন্তু এই বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল? কেউ কেউ বলে থাকে, প্রকৃতি ও তার বিকাশের পূর্বে ছিল বিশ্ব চৈতন্য যা পরবর্তীকালে এই বিকাশের ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল। ফলে বলতে গেলে প্রকৃতির ঘটনার বিকাশ এই চৈতন্যের বিকাশের বাইরেকার রূপ। এই লোকগুলিকে বলা হয় ভাববাদী, যারা পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রবণতায় বিভক্ত হয়ে পড়লো এবং বিভিন্ন ধারা অনুসরণ করলো। অন্যেরা বলে একেবারে গোড়া থেকেই এই জগতে পরস্পরের নেতিবাচক দুটি শক্তি আছে- ভাব এবং বস্তু এবং অনুরূপভাবে, ঘটনাসমূহও দুই শ্রেণিতে বিভক্ত, ভাবগত ও বস্তুগত, যারা প্রতিনিয়ত পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এইভাবে দেখা যায় প্রকৃতির ঘটনাসমূহের বিকাশ হলো ভাবগত ও বস্তুগত ব্যাপারের মধ্যে নিরন্তর সংগ্রাম। এই লোকগুলিকে বলা হয় দ্বৈতবাদী এবং ভাববাদীদের মতো তারাও বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত।

মার্কসের বস্তুবাদী তত্ত্ব, দ্বৈতবাদ ও ভাববাদ উভয়কেই চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য, ভাবগত ব্যাপার ও বস্তুগত ব্যাপার দুই-ই এই পৃথিবীতে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই না যে, তারা পরস্পরকে নিরাকরণ করে। বিপরীত পক্ষে, ভাবগত ও বস্তুগত দিক হল একই ব্যাপারের দুটি বিভিন্ন রূপ। তারা একত্রে বিকশিত হয়, তাদের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ রকম অবস্থাতে আমাদের মনে করার কোন যুক্তিই নেই যে, তারা পরস্পর পরস্পরকে নিরাকরণ করে। অতএব, দ্বৈতবাদ ভুল বলে প্রমাণিত হয়। এক ও অবিভাজ্য প্রকৃতি দুটি বিভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত- বস্তুগত ও ভাবগত- এইভাবেই প্রকৃতির বিকাশকে আমাদের গণ্য করতে হবে। এক ও অবিভাজ্য জীবন দুটি বিভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত- ভাবগত ও বস্তুগত- এইভাবেই জীবনের বিকাশকে আমাদের গণ্য করতে হবে।

এই হলো মার্কসের বস্তুবাদী তত্ত্বের অদ্বৈতবাদ।
সঙ্গে সঙ্গে মার্কস ভাববাদকেও প্রত্যাখ্যান করেন। এই ভাবা ভুল হবে যে, ভাবগত দিক এবং সাধারণভাবে চেতনা তার বিকাশের প্রকৃতি তথা সাধারণভাবে বস্তুগত দিকের পূর্ববর্তী। তথাকথিত বাহ্য প্রাণহীন প্রকৃতি জীবন্ত সত্তাসমূহে অস্তিত্বের পূর্বেই বিদ্যমান ছিল। প্রথম জীবন্ত বস্তু প্রোটোপ্লাজমÑ জীবকোষের মূল উপাদান- তার কোন চেতনা ছিল না। তার ছিল কেবলমাত্র উত্তেজনা ও সংবেদনার অঙ্কুর। পরবর্তীকালে ক্রমে ক্রমে প্রাণিদের সংবেদন শক্তি ধীরে ধীরে চেতনায় রূপান্তরিত হলো। বানর যদি চিরকাল চার হাত পায়ে হেঁটে বেড়াত, সে যদি কোনদিনই সোজা হয়ে না দাঁড়াত, তাহলে তার বংশধর মানুষ ফুসফুস ও স্বরতন্ত্রীসমূহ অবাধে ব্যবহার করতে পারতো না এবং সেইজন্য, কথাও বলতে সক্ষম হতো না; এবং তা বহুলাংশে তার চেতনার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতো। অর্থাৎ বানর যদি তার পেছনের পা দুটির ওপর ভর করে না হাঁটতে পারতো তাহলে তার বংশধর মানুষ চিরকাল নিচের দিকে তাকাতে বাধ্য হতো এবং শুধু সেখান থেকেই তার সব ধারণা লাভ করতো। এখন যেমন সে তাকায় তখন সে উপরে এবং তার চারপাশে তাকাতে পারতো না এবং সেজন্য যার মস্তিষ্ক একটি বানরের মস্তিষ্কের চেয়ে বেশি ধারণা অর্জন করতে পারতো না এবং তা তার চেতনার বিকাশকে বহু পরিমাণে পিছিয়ে দিতো। এর থেকে এটাই আসে যে চেতনাগত দিকের বিকাশ, ভাবের বিকাশ দেহের কাঠামো এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। এ থেকে আসে যে চেতনাগত দিকের বিকাশ ভাবের বিকাশের পূর্ববর্তী হলো বস্তুগত দিকের বিকাশ, সামাজিক অস্তিত্বের বিকাশ। স্পষ্টত প্রথমে বাইরের অবস্থা বদলায়, প্রথমে বস্তুর পরিবর্তন হয়- ভাবগত দিকের বিকাশ বস্তুগত দিকের বিকাশের পেছনে পড়ে থাকে। বস্তুগত দিককে, বাইরের পরিবেশকে সামাজিক অস্তিত্ব ইত্যাদিকে যদি আমরা বলি বিষয়বস্তু, তাহলে ভাবগত দিক চেতনা এবং এই রকমের ব্যাপারকে আমাদের বলতে হবে রূপ। এ থেকেই উদ্ভুত হয়েছিল সুবিদিত বস্তুবাদী তত্ত্ব; ক্রমবিকাশের গতিধারায় বিষয়বস্তু রূপের পুরোবর্তী থাকে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে।

সামাজিক জীবন সম্পর্কে একটি কথা বলতে হবে, সেখানেও বস্তুগত পরিবর্তন পূরোবর্তী, এখানেও রূপ বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে। এমনকি যখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা চিন্তা করাও হয়নি, তার আগে থেকেই ধনতন্ত্র বিদ্যমান ছিল এবং একটি ভীষণ শ্রেণি সংগ্রাম প্রচণ্ডভাবে চলছিল। সমাজতান্ত্রিক ধারণার উদ্ভবের অনেক আগেই উৎপাদনের প্রক্রিয়া একটি সামাজিক চরিত্র ধারণ করেছিল।

এখানেই মার্কস বলেন, ‘আমাদের চেতনা তার বাস্তব অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না; পক্ষান্তরে তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে।’ (এ কন্ট্রিবিউসন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনোমি- কার্ল মার্কস)। মার্কসের মতে অর্থনৈতিক বিকাশ হলো সামাজিক বিকাশের বস্তুগত ভিত্তি, তার বিষয়বস্তু, তার আইনগত রাজনৈতিক ও ধর্মগত দার্শনিক বিকাশ হলো এই বিষয়বস্তুর ভাবাদর্শগত রূপ, তার উপরিকাঠামো। সেইজন্য মার্কস বলেন, ‘অর্থনৈতিক ভিত্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সমগ্র বিরাট উপরিকাঠামো কম বেশি দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হয়।’ (ঐ)

সামাজিক জীবনেও প্রথমে উপরের বস্তুগত অবস্থা পরিবর্তিত হয় এবং তারপর মানুষের চিন্তা তাদের বিশ্ববিক্ষা বদলায়। বিষয়বস্তুর বিকাশ রূপের উদ্ভব ও বিকাশের পূর্ববর্তী। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, মার্কসের মতে রূপ ছাড়াই বিষয়বস্তু সম্ভব- যেমন এস-এইস জি. মনে করেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অসম্ভব; কিন্তু বিষয়টি হলো এই যে, যেহেতু একটি নির্দিষ্ট রূপ তার বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে, সেহেতু রূপটি কখনও এই বিষয়বস্তুর পুরোপুরি অনুরূপ হয় না; এবং নতুন বিষয়বস্তুটি প্রায়শঃই কিছুকালের জন্য পুরনো রূপে আবৃত থাকতে বাধ্য হয় এবং তার ফলে তাদের মধ্যে নতুন বিষয়বস্তু ও পুরাতন রূপের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ বর্তমান সময়ে উৎপন্ন বস্তুর আত্মসাতের ব্যক্তিগত চরিত্র উৎপাদনের সামাজিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এবং আজকের দিনের সামাজিক সংঘর্ষের এই হলো ভিত্তি। অন্যপক্ষে ভাব বাস্তব সত্তার একটি রূপ- এই প্রকৃতিগতভাবে ধারণার অর্থ এই নয় যে, তার চেতনা ও বিষয়বস্তু একই জিনিস। এই মত পোষণ করতেন কেবলমাত্র স্থূল বস্তুবাদীরা। তাদের তত্ত্বসমূহ মার্কসের বস্তুবাদকে মূলগতভাবে অস্বীকার করে। এবং এঙ্গেলস তার লুডউইগ ফয়েরবাখে এদের সঠিকভাবে বিদ্রুপ করেছিলেন। মার্কসের বস্তুবাদী চেতনা ও বাস্তব সত্তা মন এবং বস্তু, একই ব্যাপারের দুটি বিভিন্ন রূপ, যাকে মোটামুটিভাবে বলা হয় প্রকৃতি, সুতরাং তাদের পরস্পর পরস্পরকে নিরাকরণ করে না, কিন্তু তারা আবার এক ব্যাপারও নয়। একমাত্র বিষয় হলো এই যে, প্রকৃতি ও সমাজের বিকাশে চেতনা- অর্থাৎ যা আমাদের মাথার মধ্যে ঘটে একটি তদনুরূপ বস্তুগত পরিবর্তন- অর্থাৎ যা আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা নিরপেক্ষ। কোন নির্দিষ্ট বস্তুগত পরিবর্তনকে শীঘ্র কিংবা দেরিতে একটি অনুরূপ ভাবগত পরিবর্তন অনিবার্যভাবেই অনুসরণ করে। এই জন্যই আমরা বলি একটি ভাবগত পরিবর্তন হলো তদনুরূপ একটি বস্তুগত পরিবর্তনের রূপ।

সাধারণভাবে এই হলো মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের অদ্বৈতবাদ।
কেউ কেউ আমাদের বলবেনঃ প্রকৃতি ও সমাজের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এ সমস্ত প্রযুক্ত হলে, সেসব সত্য হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে নির্দিষ্ট বস্তু সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা এবং ভাব কীভাবে আমাদের মাথার মধ্যে জাগে? তথাকথিত বাইরের অবস্থাগুলি কী সত্যসত্যই বিদ্যমান, না এইসব বাইরের অবস্থা সম্বন্ধে আমাদের ধারণাগুলিই শুধু বিদ্যমান এবং যদি বাইরের অবস্থার অস্তিত্ব থাকেই, তাহলে কোন মাত্রা পর্যন্ত তারা প্রত্যক্ষ এবং পরিজ্ঞেয়?

এই বিষয়টি সম্পর্কে আমরা বলিঃ বাইরে অবস্থা যতখানি বিদ্যমান থেকে আমাদের অহং এর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, আমাদের ধারণা আমাদের অহংও ঠিক ততখানি বিদ্যমান। যে কেউই না ভেবে, না চিন্তে বলে যে, আমাদের ধারণা ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই, তাকেই সমস্ত বাইরের অবস্থা অস্বীকার করতে বাধ্য হতে হয় এবং সেই কারণেই, তার নিজের অহং ছাড়া অন্য সমস্ত লোকের অস্তিত্ব তাকে অস্বীকার করতেই হয়। এটা বিজ্ঞান এবং জীবন্ত বাস্তবের প্রধান প্রধান নীতিসমূহের মূলগতভাবে বিরোধী। হ্যাঁ, বাইরের অবস্থা সত্যই বিদ্যমান; এই অবস্থাগুলি আমাদের আগেও ছিল আমাদের পরেও থাকবে; এবং যত ঘন ঘন এবং যত প্রবলভাবে আমাদের চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তত সহজে তারা প্রত্যক্ষ ও পরিজ্ঞেয় হয়। বর্তমান সময়ে নির্দিষ্ট বস্তু সম্পর্কে কীভাবে বিভিন্ন ধারণা ও ভাব আমাদের মাথার মধ্যে জাগে, সে বিষয় সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে যে, প্রকৃতি ও সমাজের ইতিহাসে যা ঘটছে এখানে আমরা তারই সংক্ষিপ্ত পুনরাবৃত্তি পাই। এ ব্যাপারেও আমাদের বাইরের বস্তু আমাদের ধারণার পূর্ববর্তী; এ ব্যাপারেও আমাদের ধারণা অর্থাৎ রূপ বস্তুর পেছনে অর্থাৎ বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে। যখন আমি একটা গাছের দিকে তাকিয়ে গাছটিকে দেখতে পাই- তা কেবল দেখিয়ে দেয় যে, আমার মাথার মধ্যে একটি গাছের ধারণা জন্মাবার পূর্বেই গাছটির অস্তিত্ব ছিল; দেখিয়ে দেয় যে, এই গাছটিই আমার মাথার মধ্যে অনুরূপ ধারণা জাগিয়ে তুলেছিল।

মানব জাতির ব্যবহারিক কার্যকলাপে মার্কস ও এঙ্গেলসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদের গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়। যদি আমাদের বিশ্ববীক্ষা আমাদের অভ্যাস, আমাদের রীতি-নীতি বাইরের অবস্থার দ্বারা নির্ধারিত হয়, যদি আইনগত, রাজনীতিগত রূপের অনুপযোগিতা একটি অর্থনৈতিক বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে অর্থনৈতিক সম্পর্কসমূহে একটি মূলগত পরিবর্তন ঘটাতে আমরা অবশ্যই সাহায্য করবো যাতে এই পরিবর্তনের সাথে, জনসাধারণের অভ্যাসে, রীতিনীতিতে এবং তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি মূলগত পরিবর্তন ঘটানো যায়।

এই বিষয়ে কার্ল মার্কস বলেছিলেনঃ
“বস্তুবাদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের আন্তঃসংযোগ প্রত্যক্ষ করার জন্য খুব বিরাট একটা বিচারশক্তির দরকার হয় না। যদি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ থেকে মানুষ তার সমস্ত জ্ঞান, প্রত্যক্ষ ইত্যাদি গঠন করে… তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায় যে, অভিজ্ঞতা গোচর এই পৃথিবীকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সে এর ভিতর সত্যকারের যা মানবিক তার অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে, যাতে সে একজন মানুষ হিসাবে অভিজ্ঞতা অর্জনে অভ্যস্ত হয়। … বস্তুবাদী অর্থে মানুষ যদি স্বাধীন না হয়- অর্থাৎ এটা বা ওটা এড়িয়ে চলতে সমর্থ হবার নেতিবাচক শক্তির কারণে স্বাধীন নয়, সে স্বাধীন হয় তার প্রকৃত ব্যক্তিসত্তাকে স্বপ্রতিষ্ঠা করার ইতিবাচক ক্ষমতার কারণে, তাহলে অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি মানুষকে শান্তি দেওয়া উচিত নয়, বরং উচিত অপরাধের সমাজ বিরোধী প্রজনন ক্ষেত্রগুলিকে ধ্বংস করা … মানুষ যদি অবস্থার দ্বারা গঠিত হয়, তাহলে অবস্থাকেও অবশ্যই মানবিকভাবে গঠন করতে হবে। (লুডউইগ ফয়েরবাখ, পরিশিষ্ট দেখুন, অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি বস্তুবাদের ইতিহাস সম্পর্কে কার্ল মার্কস)।

বস্তুবাদ ও মানুষের ব্যবহারিক কার্যকলাপের ভিতর এই হলো সম্পর্ক।
মার্কস ও এঙ্গেলসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের অভিমত কি?
মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির উদ্ভব হেগেল থেকে আর তার বস্তুবাদী তত্ত্ব হলো ফয়েরবাখের তত্ত্বের আরও বিকাশ। নৈরাজ্যবাদীরা এটা ভালভাবেই জানে, এবং তারা মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে অপদস্থ করার জন্য হেগেল ও ফয়েরবাখের ত্রুটির সুবিধা গ্রহণ করার চেষ্টা করে। আমরা হেগেল সম্পর্কে আলোচনায় এর আগেই দেখিয়েছি যে, নৈরাজ্যবাদীদের এই সমস্ত চাতুরি তাদের নিজেদের তার্কিক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করে না। ফয়েরবাখ সম্পর্কেও ওই একই কথা বলতে হয়। উদাহরণস্বরূপ তারা জোরের সঙ্গে বলে, ‘ফয়েরবাখ ছিলেন একজন সর্বেশ্বরবাদী’, বলে যে তিনি মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ করেছিলেন, যে ফয়েরবাখের মতে, মানুষ যা খায় সে তাই….’ তারা অভিযোগ করেছে, এ থেকে মার্কস নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত টেনেছিলেনঃ সুতরাং প্রধান ও প্রাথমিক জিনিস হল অর্থনৈতিক অবস্থাসমূহ ইত্যাদি। সত্য বটে ফয়েরবাখের সর্বেশ্বরবাদ, মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ এবং তার একই রকমের অন্যান্য ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে কারও কোনো সন্দেহ নেই। পক্ষান্তরে মার্কস ও এঙ্গেলসই সর্বপ্রথম ফয়েরবাখের ভুলভ্রান্তি উদঘাটিত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও নৈরাজ্যবাদীরা আগেই উন্মোচিত ফয়েরবাখের ভুলভ্রান্তিকে পুনরায় উদঘাটিত করা প্রয়োজন মনে করে। কেন? খুব সম্ভবত এই জন্য যে, ফয়েরবাখকে গালাগালি করে তারা বস্তুবাদকে অপদস্থ করতে চায়, কারণ মার্কস ফয়েরবাখের কাছ থেকেই বস্তুবাদের তত্ত্বটি ধার করেছিলেন এবং তার পর তাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিকশিত করেছিলেন। ফয়েরবাখের কী একই সঙ্গে কিছু ঠিক কিছু ভুল ধারণা থাকতে পারে না? আমরা বলছি যে এই ধরনের চাতুরির দ্বারা নৈরাজ্যবাদীরা অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদকে এতটুকুও টলাতে পারবে না, তারা যা করতে পারবে তা হলো নিজেদের ব্যর্থতা প্রমাণ করা।
মার্কসের বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যেই মতের মিল নেই। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আমাদের যদি মিঃ চেরকেজিশভিলির বক্তব্য শুনতে হয় তাহলে মনে হবে মার্কস ও এঙ্গেলস অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদকে ঘৃণা করতেন; তার মতে, তাদের বস্তুবাদ হলো স্থূল এবং তা অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ নয়ঃ ‘প্রকৃতিবিদদের মহান বিজ্ঞান তার বিবর্তনের প্রণালী, রূপান্তরবাদ এবং অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ- যা এঙ্গেলস এত আন্তরিকভাবে ঘৃণা করতেন …. সে সব দ্বন্দ্ববাদকে পরিহার করেছে ইত্যাদি। সুতরাং এ থেকে এইটি আসে যে, চেরকেজিশভিলি কর্তৃক অনুমোদিত এবং এঙ্গেলস কর্তৃক ঘৃণিত প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ ছিল অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ। কিন্তু আর একজন নৈরাজ্যবাদী আমাদের বলছে যে, মার্কস ও এঙ্গেলসের বস্তুবাদ হলো অদ্বৈতবাদী এবং সেজন্যই তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মার্কসের ইতিহাসের ধারণা হেগেলের ধারণাতেই প্রত্যাবর্তন।

সাধারণভাবে পরম বিষয়মুখীতার অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ, এবং বিশেষভাবে মার্কসের অর্থনৈতিক অদ্বৈতবাদ প্রকৃতিগতভাবে অসম্ভব এবং তত্ত্বগতভাবে অযৌক্তিক। অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ হলো অক্ষমভাবে প্রচ্ছন্ন দ্বৈতবাদ এবং অধিবিদ্যা ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটি আপস। সুতরাং এ থেকে আসে যে অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ গ্রহণীয় নয়, কারণ মার্কস ও এঙ্গেলস একে ঘৃণা তো করতেনই না, বরং তারা নিজেরাই ছিলেন অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদী।

যদি মনে করেন একে নৈরাজ্যবাদ বলতে পারেন! তারা এখনও মার্কসের বস্তুবাদের সারমর্মই উপলব্ধি করতে পারেনি, তারা এখনও বোঝেনি যে, মার্কসের বস্তুবাদ অদ্বৈতবাদী কী না, এর গুণাগুণ সম্পর্কে তারা নিজেদের মধ্যেই একমত হতে পারেনি, কিন্তু তারা এর মাঝেই এই উদ্ধৃত দাবিতে আমাদের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে যে, আমরা সমালোচনা করে মার্কসের বস্তুবাদকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছি! এ থেকেই বোঝা যায় যে, তাদের সমালোচনার কী ভিত্তি থাকতে পারে।

আরও দেখা যাক। মনে হয় যে কিছু নৈরাজ্যবাদী এই সত্য সম্পর্কেও অজ্ঞ যে বিজ্ঞানশাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের বস্তুবাদ আছে, যারা পরস্পর থেকে বহু পরিমাণে পৃথকঃ উদাহরণস্বরূপ আছে স্থূল বস্তুবাদ (প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে এবং ইতিহাসে), যা ভাববাদী দিকের গুরুত্বকে এবং বস্তুবাদী দিকের ওপর এর ফলাফলকে অস্বীকার করে। কিন্তু আবার তথাকথিত অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদও আছে- যা বস্তুবাদী ও ভাববাদী দিকের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ককে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচার করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এসবের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলে এবং সেইসঙ্গে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জাহির করেঃ তোমরা পছন্দ কর আর নাই কর, আমরা মার্কস ও এঙ্গেলসের বস্তুবাদকে সমালোচনা করে উৎসন্ন করে দিচ্ছি। শুনুন তা হলেঃ ‘এঙ্গেলস ও কাউৎস্কির মতে, মার্কস অন্যান্য জিনিস ছাড়াও বস্তুবাদী ধারণা আবিষ্কার করে মানবজাতির বিরাট কল্যাণ করেছেন।’ এটা কি সত্য? আমরা তা মনে করি কী না, কেননা আমরা জানি ….যে সমস্ত ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক এই মতের অনুগামী যে, সমাজব্যবস্থা ভৌগলিক, আবহাওয়াগত, জাগতিক, মহাজাগতিক, নৃতাত্ত্বিক এবং জীবতাত্ত্বিক অবস্থাবলী দ্বারা গতিশীল- তারা সকলেই বস্তুবাদী’ (২নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। এইসব লোকের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা চলে! তাহলে এ থেকে আসে যে, এ্যারিস্টোটল ও মন্তেস্কুর বস্তুবাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য নেই মার্কস ও সেন্ট মাইমনের বস্তুবাদের মধ্যে। প্রতিপক্ষকে বুঝে তাকে সমালোচনা করে ভূমিস্যাৎ করে দেবার চমৎকার দৃষ্টান্তও বটে!

কোন কোন নৈরাজ্যবাদী কোথাও হয়তো শুনেছেন যে মার্কসের বস্তুবাদ হলো একটি পৈটিকতত্ত্ব এবং তক্ষুণি তারা এই ধারণাকে ব্যাপকভাবে জন সাধারণ্যে প্রচার করতে লেগে গেলেন- সম্ভবত নোবাতি অফিসে কাগজের দাম শস্তা এবং কাজে খরচও বিশেষ পড়ে না। শুনুন তাহলে, ফয়েরবাখের মতে মানুষ যা খায়, সে তাই। এই সূত্র মার্কস ও এঙ্গেলসের ওপর ঐন্দ্রজালিক প্রভাব বিস্তার করলো। এবং নৈরাজ্যবাদীদের মতে, এ থেকে মার্কস এই সিদ্ধান্ত টানলেন যে, সুতরাং প্রধান ও প্রাথমিক জিনিস হলো অর্থনৈতিক অবস্থা উৎপাদন সম্পর্ক। এবং তার পরে নৈরাজ্যবাদীরা এগিয়ে এলেন দার্শনিক ভঙ্গিতে আমাদের শিক্ষা দিতেঃ এটা বলা ভুল হবে যে সমাজ জীবনে এই উদ্দেশ্য সাধনের একমাত্র উপায় হলো খাওয়া এবং অর্থনৈতিক উৎপাদন। ….অদ্বৈতবাদী মতানুযায়ী যদি ভাবাদর্শ প্রধানত নির্ধারিত হতো খাওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্বের দ্বারা- তাহলে কিছু পেটুক ব্যক্তিই প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি হতো। তাহলে দেখছেন মার্কসের বস্তুবাদকে সমালোচনা করা কত সহজ। রাস্তায় কোন স্কুল বালিকার কাছ থেকে মার্কস ও এঙ্গেলস সম্পর্কে চুটকি কথা শোনাই যথেষ্ট, যথেষ্ট রাস্তার সেই চুটকি কথাকে দার্শনিক আত্মবিশ্বাসে মুড়ে নোভাতির মতো সংবাদপত্রের পাতায় পুনরাবৃত্তি করা এবং মার্কসের সমালোচক হিসাবে হঠাৎ খ্যাতি অর্জন করা। কিন্তু ভদ্রলোকেরা একটা কথা বলুনঃ কোথায় কখন কোন দেশে মার্কসকে বলতে শুনেছেন যে খাওয়া ভাবাদর্শকে নির্ধারিত করে? আপনাদের অভিযোগের সমর্থনে মার্কসের রচনাবলী থেকে একটি মাত্র উদ্ধৃত করলেন না কেন? অর্থনৈতিক অবস্থা এবং খাওয়া কি একই জিনিস? এই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণার মধ্যে তালগোল পাকানোর জন্য বড় জোর একটি স্কুল বালিকাকে ক্ষমা করা যেতে পারে, কিন্তু এটা কেমন যে আপনারা, স্যোস্যাল ডেমোক্রাসির পরাভবকারীরা, বিজ্ঞানের নব জন্মদাতারা এত অসতর্কভাবে স্কুল বালিকার ভুলকে পুনরাবৃত্তি করছেন? বাস্তবিক পক্ষে খাওয়া কীভাবে সামাজিক ভাবাদর্শকে নির্ধারিত করতে পারে? আপনারা নিজেরাই যা বলেছেন, তা ভেবে দেখুনঃ খাওয়া, খাওয়ার ধরণ বদলায় না, এখন যেভাবে করা হয়, পুরাকালে ঠিক সেইভাবে মানুষ খেত, চিবোত এবং খাদ্য হজম করতো। কিন্তু ভাবাদর্শের রূপ সব সময় বদলায়, বিকশিত হয়। প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক, বুর্জোয়া এবং শ্রমিক শ্রেণির এইগুলি হলো ভাবাদর্শের রূপ। এটা কি কল্পনীয় যে যা, সাধারণভাবে বলতে গেলে, বদলায় না, তা, যা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে তাকে নির্ধারণ করতে পারে? সত্য, মার্কস বলেছেন যে অর্থনৈতিক অস্তিত্ব ভাবাদর্শকে নির্ধারণ করে- এবং তা উপলব্ধি করা সহজ, কিন্তু খাওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্ব কী একই জিনিস? আপনারা আপনাদের ব্যর্থতা মার্কসের স্বন্ধে আরোপ করাটা যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করলেন কেন?

আরও দেখা যাক আমাদের নৈরাজ্যবাদীদের মতে, মার্কসের বস্তুবাদ হলো সমান্তরালবাদ।… অথবা পুনরায়ঃ অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ হলো অক্ষমভাবে প্রচ্ছন্ন দ্বৈতবাদ এবং অধিবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের মধ্যে একটা আপোস।…’ মার্কস দ্বৈতবাদের মধ্যে পড়ে যায়, কেননা তিনি উৎপাদন সম্পর্ককে বস্তুগত হিসাবে এবং মানুষের প্রচেষ্টা এবং সঙ্কল্পকে একটি মায়া তথা কল্পনা হিসাবে চিত্রিত করেছেন, তা যদি থেকেও থাকে, তবুও তার কোনো গুরুত্ব নেই’। প্রথমতঃ, নির্বোধ সমান্তরালবাদের সঙ্গে মার্কসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদের কোন সম্পর্ক নেই। বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বস্তুগত দিক বিষয়বস্তু অবশ্যই ভাবগত দিক তথা তার রূপের পুরোবর্তী। কিন্তু সমান্তরালবাদ এই মতকে অস্বীকার করে এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে যে, বস্তুগত ও ভাবগত কোনোটিই কারো আগে আসে না; তারা যুগপৎ পাশাপাশি বিকশিত হয়। দ্বিতীয়ত, মার্কসের অদ্বৈতবাদ এবং দ্বৈতবাদের মধ্যে কী মিল থাকতে পারে যখন আমরা পুরোপুরি ভালভাবেই জানি (এবং অন্যান্য নৈরাজ্যবাদী মশাইরা একথা জানবেন যদি অবশ্য আপনারা মার্কসীয় সাহিত্য পড়েন) যে অদ্বৈতবাদ একটি মূলনীতি অর্থাৎ প্রকৃতি, যার একটি বস্তুগত ও একটি ভাবগত রূপ আছে, তা থেকে উদ্ধৃত তদ্বিপরীতে দ্বৈতবাদ দুটি মূলনীতি- বস্তুগত ও ভাবগত থেকে উদ্ভুত যারা, দ্বৈতবাদ অনুযায়ী পরস্পর পরস্পরে নিরাকরণ করে। তৃতীয়ত কে বলেছেন যে মানুষের প্রচেষ্টা ও সংকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়? আপনার জায়গাটা দেখিয়ে দেননা কেন, যেখানে মার্কস একথা বলেছেন? মার্কস কী তার এইটিনথ ব্রুমেয়ার অব লুই বোনাপার্ট, তার ক্লাস স্ট্রাগেলস ইন ফ্রান্স আর সিভিল ওয়ার ইন ফ্রান্স এবং অন্যান্য পুস্তিকায় প্রচেষ্টা ও সংকল্পের গুরুত্বের কথা বলছেন না? তবে কেন মার্কস সর্বহারা শ্রেণির সংকল্প ও প্রচেষ্টাকে সমাজতান্ত্রিক ধারায় বিকশিত করতে চেয়েছিলেন; যদি তিনি প্রচেষ্টা ও সঙ্কল্পের ওপর গুরুত্ব দিয়ে না থাকেন, তাহলে কেন তিনি তাদের মধ্যে প্রচার আন্দোলন চালিয়েছিলেন অথবা, এঙ্গেলস তার ১৮৯১-৯৪ এর সুবিদিত প্রবন্ধগুলিতে কী সম্পর্কে বলেছিলেন যদি প্রচেষ্টা ও সংকল্পের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে থাকেন? সত্য বটে মানুষের প্রচেষ্টা ও সংকল্প অর্থনৈতিক অবস্থাবলী থেকে তাদের বিষয়বস্তু অর্জন করে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকাশের ওপর তারা কোন প্রভাব বিস্তার করে না। সত্য সত্যই কী নৈরাজ্যবাদীদের পক্ষে এমন একটি সরল ধারণা বুঝতে পারা এতই কঠিন? এটা সঠিকই বলা হয় যে, সমালোচনার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা এক জিনিস আর কার্যক্ষেত্রে সমালোচনা করা অন্য জিনিস।

নৈরাজ্যবাদী মশাইরা আর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন ঃ ‘বিষয়বস্তু ছাড়া রূপ অকল্পনীয়…’, সুতরাং বলা যায় না যে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে… তারা সহঅবস্থান করে, তা না হলে অদ্বৈতবাদ হয়ে পড়ত একটি অসম্ভব ব্যাপার’ (১নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অকল্পনীয় সত্য, কিন্তু বিদ্যমান রূপ বিদ্যমান বিষয়বস্তুর সঙ্গে কখনও হুবহু একরূপ হয় না। নতুন বিষয়বস্তু কিছুদূর পর্যন্ত সব সময়ে পুরানো রূপে আবৃত থাকে। এর ফলে সব সময়ে পুরাতন রূপ এবং নতুন বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা সংঘর্ষ বাধে। ঠিক এই কারণেই বিপ্লব সংঘটিত হয়, এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটাও একটি যা মার্কসের বস্তুবাদের মূলনীতিকে প্রকাশ করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু নেই, এ কথাটা জেদের সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করছে।

এই হলো বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মত। আমরা আর কিছু বলবো না। এটা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়েছে যে নৈরাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের মার্কসকে উদ্ভাবন করেছে, নিজ নৈরাজ্যবাদী মশাইরা আর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন ঃ ‘বিষয়বস্তু ছাড়া রূপ অকল্পনীয়…’, সুতরাং বলা যায় না যে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে… তারা সহঅবস্থান করে, তা না হলে অদ্বৈতবাদ হয়ে পড়ত একটি অসম্ভব ব্যাপার’ (১নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অকল্পনীয় সত্য, কিন্তু বিদ্যমান রূপ বিদ্যমান বিষয়বস্তুর সঙ্গে কখনও হুবহু একরূপ হয় না। নতুন বিষয়বস্তু কিছুদূর পর্যন্ত সব সময়ে পুরানো রূপে আবৃত থাকে। এর ফলে সব সময়ে পুরাতন রূপ এবং নতুন বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা সংঘর্ষ বাধে। ঠিক এই কারণেই বিপ্লব সংঘটিত হয়, এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটাও একটি যা মার্কসের বস্তুবাদের মূলনীতিকে প্রকাশ করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু নেই, এ কথাটা জেদের সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করছে।

এই হলো বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মত। আমরা আর কিছু বলবো না। এটা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়েছে যে নৈরাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের মার্কসকে উদ্ভাবন করেছে, নিজেদের উদ্ভাবিত একটি বস্তুবাদী তত্ত্ব তার মুখে আরোপ করেছে এবং তারপরে সেই বস্তুবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কিন্তু তাদের একটি বুলেটও সত্যকার মার্কস ও সত্যকার বস্তুবাদকে আঘাত করতে পারবে না।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭