মার্কিন কৃষি ও কৃষকদের দুরাবস্থা

merlin_136161087_3ec94552-746b-4c7f-a6bb-b6adc5262b18-articlelarge

একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার প্রতিপক্ষ পুঁজিবাদী চীন এবং অন্যান্য পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশের সাথে বাণিজ্যে ব্যাপক ঘাটতি মোকাবেলায় মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকে বের হয়ে এসে গ্রহন করে সংরক্ষণবাদ (Protectionism)। এ সময়ে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৭৫ বিলিয়ন (৩৭ হাজার ৫০০ কোটি) ডলার। যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাটতি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে চায়। বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিপক্ষ চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করে। যা কার্যত বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ ধারণ করতে চলেছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েই মাঠে নেমেছে। এই প্রতিযোগিতায় চীনকে বেকায়দায় ফেলার মার্কিন তৎপরতার নেতিবাচক প্রভাব চীনের অর্থনীতিতে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রও যে তা থেকে মুক্ত তা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রকেও পড়তে হচ্ছে একের পর এক সমস্যা ও বেকায়দায়। মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে একে অপরের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্কারোপ করার ক্ষেত্রে পরস্পর পরস্পরকে বেকায়দায় ফেলার কৌশল গ্রহণ করে অগ্রসর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চীন, মার্কিনের কৃষি পণ্য আমদানির উপর শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মত উন্নত তথা সাম্রাজ্যবাদী দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদন হয় মুনাফাকেন্দ্রিক প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প হিসেবে। এ সকল কৃষিশিল্পের মালিক আমাদের দেশের মত কৃষক নয় বরং সে দেশের বুর্জোয়া শ্রেণী তথা একচেটিয়া পুঁজিপতিরা। যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকি প্রদান একটি সাধারণ ব্যপার। ভর্তুকি নির্ভর উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করে বিক্রিত পণ্যের লাভ দিয়ে ভর্তুকি পরিশোধ ও লাভ দুটাই করে থাকে মালিক। এবারে বাণিজ্য যুদ্ধে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের উপর শুল্কারোপ করায় বোকায়দায় পড়ে মার্কিন কৃষকরা।

সদ্যসমাপ্ত মৌসুমে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের পাহাড়সম মজুদ কোথায় রাখবেন তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন মার্কিন কৃষকরা। অতিরিক্ত মজুদের কারণে দেশটির শস্য গুদামগুলোর ভাড়াও বেড়েছে। ফলে কৃষকদের তার নিজস্ব আবাদী জমিতে এ সকল শস্য নষ্ট হতে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। বাণিজ্যযুদ্ধ না হলে নিকটবর্তী সাইলো বা গুদামের কাছে ন্যায্যমূল্যে শস্য বিক্রি করতে পারতো। এই সাইলোগুলো আন্তর্জাতিক খাদ্যশস্য সংগ্রহকারী কোম্পানিগুলো পরিচালনা করে থাকে। চলতি মৌসুমে অধিক পরিমাণে খাদ্যশস্য কিনছে না এই সাইলোগুলো। তাদের বর্তমান খাদ্য মজুদ নিয়েও তারা পড়েছে বিপাকে। এই অবস্থায় বাড়তি শস্য মজুদে চাষীদের জন্য গুদাম ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে সাইলো ও গুদামের মালিকরা। মার্কিন কৃষকদের অভিমত, যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত বাণিজ্য যুদ্ধের করাণেই চীনে শস্য রফতানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। মার্কিন কৃষকদের এই সংকট মোকাবেলায় ট্রাম্প প্রশাসন ১৫ বিলিয়ন (১ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের উদ্ধার কর্মসূচী নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে এ পর্যায়ে ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহন করে। এতে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা লাঘব হলেও ক্ষতি থেকেই যাচ্ছে। বাণিজ্য যুদ্ধে বিশাল পরিমাণের মার্কিন কৃষিপণ্য রফতানির স্থবিরতা পরবর্তী মৌসুমের কৃষি উৎপাদনে কৃষককে নিরুৎসাহিত করবে। যা কৃষিশিল্পের সাথে সাথে ভোগ্যপণ্য উৎপাদন শিল্পে এবং ভারী শিল্পের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাণিজ্য যুদ্ধে চীনে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য রফতানি নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ায় চীনের বাজারে অন্যদের ঢোকার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ ভারতসহ বিভিন্ন দেশ কাজে লাগাতে সচেষ্ট। ভারত প্রতিবেশী চীনের বিশাল বাজারকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। চীনের কৃষিপণ্যের বাজারে ভারত ঢুকতে পারলে চীন-ভারত বাণিজ্য ঘাটতি কমার পাশাপশি দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে একধাপ অগ্রগতি ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভারতকে পক্ষে টানার এ প্রতিযোগিতাময় পরিস্থিতি অন্তত এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিকূলে যাওয়ার দিকটিকে সামনে আনছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা- ৩৮বর্ষ ॥ সংখ্যা ০৮ ॥ রবিবার ॥ ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বাংলা ॥ ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮

Advertisements

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা – ঊ চিয়াং

gettyimages-113695033

 

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

ঊ চিয়াং

 

অনলাইন প্রকাশলাল সংবাদ / lalshongbad.wordpress.com

                                                             

                         

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

(চীনা পত্রিকা ‘ষ্টাডি’তে প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ)

 

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে মজুর, ক্ষেতমজুর আর বুদ্ধিজীবি-এ দুয়ের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই। তবে বুদ্ধিজীবিদের কতকগুলো বিশেষত্ব একটু ভিন্ন ধরনের। তাই সারবস্তু (কণ্টেণ্ট) ও পদ্ধতি দু’দিক থেকেই সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা প্রশ্নে এদিক দিয়ে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। অতীতে যে সব কমরেড বুদ্ধিজীবি ছিলেন তাঁদের মধ্যেকার সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার সমস্যাই এই প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটা কি ?

এ বিষয়ে অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই। নিম্নলিখিত তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে বিষয়টা পরিষ্কার হতে পারে:

ক) বিভিন্ন বিপ্লবী পার্টি ও গ্রুপের পক্ষে তাদের চালিকা শক্তি (মোটিভ ফোর্স) হল সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা; যে সব কমরেড ঐ পার্টি বা গ্রুপে কাজ করেন তাঁদের পক্ষেও তাই। কোন মেশিন দিয়ে যদি কিছু উৎপাদন করতে হয় তো আগে তার বাষ্প, বিদ্যুৎ বা ঐ ধরনের কোন একটা চালিকা শক্তির দরকার। তেমনি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা বিপ্লবী পার্টির আর বিপ্লবী কমরেডদের উদ্দীপনা দেয়- তাঁদের এগিয়ে যাবার মত প্রেরণা যোগায়। এ না হলে অগ্রগতি শুধু বন্ধই হয়ে যায় না, এমন কি পশ্চাদগতি কিংবা ভাঙনও দেখা দেয়। ভুল-ত্রুটি শুধরে নিতে হলে, ভাল গুণগুলো আরও বাড়িয়ে তুলতে হলে, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ছাড়া পথ নেই। মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রে এই অস্ত্রটি যদি আমাদের হাতে থাকে তবে ‘‘শত্রুর কোন ঘাঁটিই আমাদের কাছে অজেয় নয়, কোন শত্রুই আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারে না।”

বাস্তবিক, বিপ্লবী কর্মতৎপরতায় এগিয়ে যাবার মত অনুপ্রেরণা আমরা পাই সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা থেকেই; বিপ্লবী পার্টি ও বিপ্লবীদের এগিয়ে যাবার সামর্থ্য কতখানি তা এর দ্বারাই নির্ধারিত হয়।

খ) বিপ্লবী পার্টি বা গ্রুপের উৎকর্ষ (কোয়ারিটি) কতখানি তা সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা থেকেই প্রকাশ পায়। প্রত্যেক বিপ্লবীর যোগ্যতার চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় এরই মারফৎ। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে পার্টি বা গ্রুপ কতখানি বুঝছে, কিভাবে কাজে লাগাচ্ছে, তা দেখেই বোঝা যায় সে পার্টি বা গ্রুপ সত্যিই বিপ্লবী কিনা। পার্টি বা তরুণ কমিউনিষ্ট লীগের কোন সভ্য বা মুক্তিফৌজের কোন সৈনিকের উৎকর্ষ যাচাই করতে হলেও ঐ সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে তাঁদের বোধ আর প্রয়োগ ক্ষমতা দিয়েই তা করতে হবে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আর কুওমিন্টাং এর দৃষ্টান্ত ধরুন। জমিদার, পুঁজিদার আর অত্যাচারীদের প্রতিনিধি হল- কুওমিন্টাং জনসাধারণকে শোষণ করে। আর কমিউনিষ্ট পার্টি হল সর্বহারা শ্রেণির প্রতিনিধি- এ পার্টি জনসাধারণকে পরিচালিত করে, তাদের মুক্তি এনে দেয়। পার্টি দু’টির আসল প্রভেদ এখানেই; আর এই মূল পার্থক্য থেকেই আসছে আর একটি বিশেষ পার্থক্য। কুওমিন্টাং-এর মতে অধঃপাতে গেছে যে পার্টি তার সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মারফৎ লোকের সামনে নিজের দোষ-ত্রুটি খুলে ধরার ইচ্ছে নেই, ক্ষমতা বা সাহসও নেই। চিয়াং কাইশেক কখনো কারো কাছে নিজের দোষ স্বীকার করেনি। যদি কখনো স্বীকার করে থাকে তো সে নেহাত ঘটনা চক্রে কিংবা প্রতারণার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমাদের কমিউনিষ্টরা, বিপ্লবী সৈনিকেরা জনগণের কাছে নিজেদের দোষের কথা খুলে ভয়ই তো পায়ই না, বরং আনন্দ পায়; আর ধরার সঙ্গে সঙ্গে অমনি নতুন নতুন উপায় ভেবে বের করে, যাতে দোষ-ত্রুটি দূর করা যায়। অন্য পার্টি অন্য মানুষ- যারা বিশেষ ছাঁচে ঢালাই করা নয় – তারা এ কাজ করতে পারে না।

সম্প্রতি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আর কমিউনিষ্ট পার্টি ইনফরমেশন ব্যুরো জাপানী কমিউনিষ্ট পার্টি’র এক নেতৃস্থানীয় কমরেডের সমালোচনা করেছিলেন। ঐ কমরেড দ্বিধাহীনভাবে সর্বজন-সমক্ষে আমাদের সমালোচনা গ্রহণ করেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন তাঁর দোষ। এ হলো একটা দৃষ্টান্ত যা বুর্জোয়া বা পাতিবুর্জোয়া রাজনৈতিক পার্টির পক্ষে করা অসম্ভব।

আমেরিকায় রিপাবলিকান আর ডেমোক্রেটিক নামে যে বুর্জোয়া পার্টি আছে তারা চিয়াং কাইশেককে ছ’ শ’ কোটি ডলার সাহায্য দিয়েও টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কিন্তু মাইনে করা চিয়াং কাইশেকের যখন পতন হল, তখন তাদের সাহস হলো না খোলাখুলি নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করার। তার বদলে তারা এক সরকারী ইস্তিহার বের করে বললো যে, সব দোষ অপদার্থ চিয়াং কাইশেকের আর নিজেদের কুৎসিত বীভৎসতা ঢাকার জন্যে তারা আবার লজ্জার মাথা খেয়ে মিথ্যে গল্প বানালো ‘সোভিয়েত হস্তক্ষেপের’।

দোষ স্বীকার করতে বা সংশোধন করতে অনিচ্ছার বিরুদ্ধে আমাদের পার্টি সর্বদা সংগ্রাম করেছে, সংগ্রাম করছে রাজনৈতিক জড়তার বিরুদ্ধে- চরম শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মত করেই। সর্বকালে ও সর্বদেশে আমাদের বিপ্লবী পার্টি প্রগতির দিকেই অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে এবং সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা প্রয়োগ করে।

সুতরাং বিপ্লবী কর্মধারার (প্র্যাকটিস) শ্রেষ্ঠ পরিচয় হল সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা।

গ) রোজ আমাদের যে সব জিনিস প্রয়োজন সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা তারই একটি। স্তালিন দেখিয়ে দিয়েছেন যে, পানি বাতাসের মতই এটা আমাদের প্রয়োজনে লাগে। পানি আর বাতাস ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ছাড়া বিপ্লবী পার্টি বা বিপ্লবী কমরেডরা বাঁচতে পারেন না।

এগিয়ে যাবার প্রেরণা জুগিয়ে দেয় সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা। বিভিন্ন বিপ্লবী গ্রুপ ও কমরেডদের মূল উৎকর্ষ-এর ভেতর দিয়েই প্রকাশিত হয়। এটা আবার জরুরী নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও বটে- এরই থেকে আসে অবাধ প্রগতির প্রেরণা, এরই থেকে শক্তি ও তেজ সংগ্রহ করে বিপ্লবী সংগঠনগুলো, সেগুলোর ক্ষমতা এতে বেড়ে চলে।

আমরা সত্যই বলতে পারি, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার সাহায্যে বিপ্লবী সংগঠন সুসংহত হয়, ব্যক্তিগতভাবে বিপ্লবীরা কর্মতৎপর হন এবং এর ফলে অতিরিক্ত শক্তির নিশ্চিত ভরসা পাওয়া যায়।

এ কথাটি অনেক কমরেড ঠিক মত বোঝেন না। তাঁরা ভাবেন, সমালোচনা, আত্ম-সমালোচনা এমন কিছু গুরুতর ব্যাপার নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়- ওটা শুধু অনুধাবন (স্টাডি) করার একটা পদ্ধতিমাত্র। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা হচ্ছে অপরকে আক্রমণ করার একটা বিশেষ পদ্ধতি- এমন কথাও কোন কোন কমরেড মনে করেন। আবার কেউ কেউ ভাবেন যে, এটা একটা ঐন্দ্রজালিক জিনিস যাতে সব দোষ ঢাকা পড়ে। এমন এক ধরনের কমরেড আছেন যাঁরা প্রায়ই আত্ম-সমালোচনা করেন- খোলাখুলি স্বীকৃতিতে তাঁরা ‘অদ্বিতীয়’ হলেও, তারপরও দোষ-ত্রুটিতে তাঁরা যে মহাপ্রভু সেই মহাপ্রভুই থেকে যান। কোন কোন কমরেড আবার অপরকে সমালোচনা করার বেলায় সবার আগে; কিন্তু নিজের দুর্বল জাযগায় ভুলেও হাত দেন না। লোকের চোখে ধূলো দিয়ে নিজেদের দোষ ঢাকার জন্যে তাঁরা এলোপাতাড়ি সমালোচনা করে চলেন।

কেউ কেউ ভাবেন, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা যেন বনের বাঘের মত ভয়ঙ্কর; সমালোচনার জন্যে মিটিং হবে শুনলেই তাঁদের ‘জ্বর এসে যায়’ এবং এইভাবেই তাঁরা পালাবার চেষ্টা করেন। আত্ম-সমালোচনা করতে হলেই এঁদের বুক কেঁপে উঠে, তার ঠেলা সামলাতে তাঁরা ভরসা পান না। কেউ কেউ আবার এ জিনিসটাকে জুজুর মত ভয় করেন; আর সব যেন ঠিকই চলছে, কেবল এটা নিয়েই যত গন্ডগোল। এরা ভুল করে মনে করেন যে, প্রকৃত সমালোচনা যেন “জনতার আদালতে বিচার”। কমরেডরা ভাবেন যে, অন্য লোকে তাঁদের দোষ-ত্রুটির কথা জানলে তাদের মর্যাদা নষ্ট হয়ে যাবে, ইজ্জত ধূলোয় লুটোবে। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার লক্ষ্য কি তা পরিষ্কার না বোঝার ফলেই এই সব ধারনার উদ্ভব হয়।

মোট কথা হল: সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা হচ্ছে বিপ্লবী আর প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যেকার বিপ্লবী আর প্রতি-বিপ্লবীদের মধ্যেকার একটি মূল পার্থক্য। আবার এর দ্বারাই কমরেডদের উৎকর্ষ ও প্রগতিশীলতা কতখানি তা-ও স্থির করা যায়।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে কেন ?

আমাদের মস্ত বড় জয় হয়েছে তা সবাই জানেন। পুরোনো সমাজ-টাকে উচ্ছেদ করে আমরা জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু তাই বলে পুরানো ব্যবস্থাটাকে আমরা একবারে লোপ পাইয়ে দিতে পেরেছি, একথা বলতে পারি কি? না। চীনদেশে সামন্তবাদ আর আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এখনো সমূলে উৎপাটিত হয়নি। উৎপাদনের পুরানো সম্বন্ধগুলো এখনো একেবারে দূর হয়নি: পুরানো ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা এখনো রয়েছে; হাজার হাজার বছর পুরানো সমাজের বিশেষ করে তার জঘন্য মতাদর্শের ধ্বংসাবশেষের প্রভাব আজও অনেক লোকের চেতনায় দেখতে পাওয়া যায়।

এই সব আদর্শগত শত্রুর হাত থেকে আমরা কখনই নিরাপদ নই। কারণ তারা অনবরত চেষ্টা করেছে যাতে আমাদের আক্রমণ করে মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারে।

পুরানো সমাজ থেকে যেসব বুদ্ধিজীবিরা এসেছেন, অতীতে তাঁরা বরাবর কিছুটা আরামের জীবনই যাপন করতেন-পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী শিক্ষা এবং প্রভাব তাঁদের ওপর অনবরত পড়ত। তার ফলে তাঁদের মতাদর্শে সবসময়ে অনেক ‘বংশগত’ দুর্বলতা প্রতিফলিত হয় এবং সেগুলো বারে বারে সামনে এসে দাঁড়ায়। তাই যে অ-সর্বহারা মতাদর্শগুলো আমাদের ওপর ‘অতর্কিত আক্রমণ’ চালায়, ‘অলক্ষিতে আমাদের মধ্যে ‘অনুপ্রবেশ’ করে সেগুলিকে পরাস্ত করার জন্যে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ব্যবহার করতেই হবে। শ্রেষ্ঠ গুণাবলীর বিকাশের জন্য সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা প্রয়োগ করতেই হবে।

মতাদর্শ ভ্রান্ত হওয়া সত্তে¡ও আমাদের বিপ্লবী কর্মীরা যদি তা উপেক্ষা করেন কিংবা সহ্য করেন, যদি তাঁরা অ-সর্বহারা লাইনে চলে কিংবা উদার নীতিবাদের প্রশ্রয় দেন- তাহলে ভ্রান্তি ঘটতেই থাকবে, ছোট ছোট ভুলগুলো মারাত্মক ভ্রান্তিতে পরিণত হবে, এখান ওখানকার আলাদা ভুলগুলো সর্বব্যাপী হয়ে দাঁড়াবে। এরকম ভ্রান্ত পদ্ধতিতে চলতে থাকলে কর্মীদের মধ্যেও অধঃপতনের আশঙ্কা দেখা দেবে।

কমরেড মাও সে তুং বলছেন: ‘বিপ্লব সাধারনভাবে আমরা যে জয়লাভ করেছি সে তো আমাদের ‘‘দশ হাজার লি দীর্ঘ অভিযানে, এ প্রথম কদম মাত্র” *এই মন্তব্যটার অর্থ নানান দিক থেকে ভেবে দেখা দরকার।

মতাদর্শের সংগ্রামের ব্যাপারে বলা যায়: কৃষককুল, পাতিবুর্জোয়া সম্প্রদায় আর জাতীয় পুঁজিদার শ্রেণী-এই তিন পক্ষকে পরিচালনা করে যে সর্বহারা শ্রেণী তাদের পক্ষে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা অপেক্ষাকৃত সহজই ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী মতাদর্শের সংগ্রাম-ঠিক ‘দীর্ঘ অভিযানের’ মতো।

মাহিনা ও সুখ-সুবিধার ব্যাপার নিয়ে কোনো কোনো কমরেড সম্প্রতি খুব মেতে উঠেছেন। মনে হবে ব্যাপারটা খুব সামান্য, মাত্র কয়েকজন লোকই এ নিয়ে মাথা ঘামায়। কিন্তু আসলে এটা হচ্ছে বুর্জোয়া মতাদর্শের চিহ্নাবশেষ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির যে ধারণা তারই জের। কমিউনিজমে লক্ষ্যে অগ্রসর হবার জন্যে আমাদের নয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নয়া গণতান্ত্রিক শিক্ষা ও প্রচার আমাদের ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হবে এবং পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এই সংগ্রামের অস্ত্র হচ্ছে সমালোচনা ও আাত্ম-সমালোচনা।

আমাদের বুদ্ধিজীবীদের বেশীর ভাগই অতীতকালে কোন প্রত্যক্ষ দৈহিক পরিশ্রমের কাজ করেননি। এই ঘটনা এবং তাঁদের লালন-পালনের পদ্ধতি আর পরিবেশের প্রভাবের ফলে- তাঁদের মধ্যে অনেক রকমের দুর্বলতা জন্মায়। আর সব থেকে বড় কথা, চীনদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শাসন কর্তারা ধোঁকা আর অত্যাচারের কৌশল চালাত, যত সব বিষাক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করত- যাতে তরুণ সম্প্রদায় তাদের যন্ত্রে পরিণত হয়- যাতে তারা দূষিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এরই ফলে কত শোচনীয় ঘটনা ঘটত- কত তরুণ ছাত্র ঘুরে ঘুরে বেড়াত নাচঘরে না হয় জুয়ার আড্ডায়, নয় তো বেশ্যালয় কিংবা এমনি আরও কোথাও; বিষের ধোঁয়ায় তাদের মন আচ্ছন্ন হত, তাদের আত্ম-সম্মানবোধ নষ্ট হয়ে যেত।

সস্তা রোমান্টিক উপন্যাস আর অশ্লীল সিনেমা ছবি দিয়ে আমাদের শহরগুলোকে ছেয়ে দিত- জাপানী সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল কুওমিন্টাং। তাই সেই পুরানো সমাজে তরুণ বুদ্ধিজীবীরা এক জীবন্মৃত অস্তিত্বের বোঝা বয়ে বেড়াত। এই অবস্থায় মতাদর্শের দিক থেকে অনেক রোগই তাদের মধ্যে সংক্রমিত হত।

আজ বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে আমরা প্রতিজ্ঞা নিয়েছি- এই সব দোষ দূর করব, পিছনে টানার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেব। এর জন্যে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে এটাই সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন।

জনগণের মুক্তিযুদ্ধের জয়লাভ এখন প্রায় সর্ম্পূণ হয়ে এসেছে।* শীঘ্রই সমগ্র চীনদেশ মুক্ত হবে, প্রতিক্রিয়াশীলরা ঝাড়ে বংশে দূর হবে। কিন্তু এত দীর্ঘকালব্যাপী সামন্তবাদ, তার ওপর শতাধিক বর্ষব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ (সেই আফিম যুদ্ধের সময় থেকে)- এর পর এই বিপুল জনসংখ্যা সম্পন্ন এমন প্রকাণ্ড দেশে কমিউনিজম গঠন করা খুব সহজ কাজ হবে না। এর জন্য অনেক বিপ্লবী, অনেক কর্মী লাগবে যাতে জনসাধরনকে শিক্ষিত, সংগঠিত ও পরিচালিত করা যায়: সকলে মিলে গঠনকর্ম নিষ্পন্ন করা যায়, শেষ করা যায় “দীর্ঘ অভিযান”।

বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের কর্মী গড়ে তুলতে হবে, তাদের শিক্ষা দিতে হবে। চালু স্কুল যা আছে তা তো আছেই; তাছাড়া রাজনৈতিক মতাদর্শের সাধারনভাবে উন্নতির জন্যে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মারফৎ শিক্ষা দিতে হবে।

বস্তুগত বা আত্মগত যেভাবেই দেখি না কেন, এই সব তথ্য থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা কত দরকার। বোঝাই যাচ্ছে যে, বিপ্লবী কাজকর্মের ফল পেতে হলে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা উপর গুরুত্ব আরোপ করতেই হবে।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে একটা জরুরী বিপ্লবী দায়িত্ব হিসেবে আমরা গ্রহণ করব- এই আমার প্রস্তাব।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ক্ষেত্রে বিচ্যুতি

১। এক রকম কমরেড আছেন তাঁর দোষ ঢাকবার চেষ্টা করেন; খোলাখুলি, সৎ আচরণ করতে চান না। দেখলেই বোঝা যায় যে, তাঁদের দোষের কমতি নেই- তবু তারা ভাবেন যে দোষ অতি সামান্য। এমন কি একটা দোষের কথাও হয়তো তারা স্বীকার করেন না। এরা ভাবেন যে, যতক্ষণ দোষ স্বীকার না করছি ততক্ষণ ধরে কে? চীনে একটা প্রবাধ আছে,“কোন কিছু যদি বাস্তবিক গোপন রাখতে চাও তো তেমন কাজ করোই না”। কিন্তু এই সব কমরেড মনে করেন, “গোপন রাখার উপায় হল মুখে তালাচাবি আঁটা। আর যদি কেউ জেনেও ফেলে তবু যতক্ষণ স্বীকার না করছি ততক্ষণ করবে কি?” এ সব হল অহংকারের কথা- তাঁর বদনামের ভয়। কিন্তু কমরেড, যদি আপনি স্বীকার না-ও করেন তবু বাস্তবিকই কি আপনি মনে করেন যে, কেউ জানতে পারবে না? চুপ করে থাকতে আপনার শুধু তিক্ততাই বাড়বে। দোষ স্বীকার করলে “মানহানিটা” কোন খানে?

কারই বা দোষ নেই? নিজের দোষ স্বীকার করে শোধরাবার সাহস যদি আপনার থাকে তো লোকে আপনার তারিফই করবে, আপনাকে ঘৃণা করবে না।

কেউ কেউ শাস্তির ভয় পান। ভাবেন, ছোট ছোট দোষে হয় তো কেউ নজর করবে না; কিন্তু বড় দোষে শাস্তি পেতে হবে।

এ ধরনের অসাধু, এড়িয়ে- চলার মনোবৃত্তিতে ইজ্জত তো থাকেই না, বরং গুরুতর ‘মানহানি’ ঘটে থাকে।

২। কোন কোন কমরেড অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখান। ভাবেন “চোখের বদলে চোখ চাই, দাঁতের বদলে দাঁত” এবং “প্রতিহিংসা বড় মধুর”। সমালোচনা-সভায় তাঁরা অনুগ্রহের বদলে অনুগ্রহ দেখান, আর করেন আক্রমণের বদলে আক্রমণ। “গতবার তুমি আমার বিরুদ্ধে কিছু বলনি সুতরাং এবার আমিও তোমার সম্পর্কে কিছু বলব না” কিংবা, “গত সপ্তায় আমার সমালোচনা করেছিলে! আচ্ছা এবার তোমায় এমন দেখে নেব যে তুমি জীবনে তা ভুলবে না।” তারপর যত রাজ্যের কুৎসা, বিদ্বেষ জুটিয়ে এনে তাক্ লাগানো হামলা চালান। “তিন রাজ্য” উপন্যাসে *চুকে লিয়াং ওয়াং লাংকে শাপান্ত করে বেমালুম খতমই করে ফেললেন। গালাগালি দিয়ে একেবারে ভূত না ভাগানো পর্যন্ত এঁদের শান্তি নেই।

৩। কোন কোন কমরেড আবার নিজেদের দোষগুলো খুব ওপর ওপর দেখেন- গুরুতর দোষগুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধু ছোটখাটো ত্রুটিরই উল্লেখ করেন। বড় দোষ ছোট করে দেখান, ছোট দোষ গ্রাহ্যেই আনেন না, কিংবা সমস্যার ভেতরই ঢুকতে চান না।

নিজেদের প্রতি এই তাঁদের মনোভাব। কিন্তু অন্যের বেলায় দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং সে দোষ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলাই তাঁদের রীতি। নিজের বেলায় খুব উদার আর অপরের বেলায় তাঁরা মহা কড়াঁ। এর নাম হচ্ছে-“তোমার বেলায় মার্ক্স, লেনিনবাদ-আর আমার বেলায় উদারনীতিবাদ।” নিজেদের দোষ সম্বন্ধে তাঁরা বলেন, ‘হঠাৎ হয়ে গেছে’, ‘ঝোকের মাথায় করে ফেলেছি’, ‘ও শুধু অসাবধনতার জন্যে’ ইত্যাদি। কিন্তু সে ভুলই যদি অপরে করে তখন এঁরা বলেন, ‘ওরা বদলাবে না’, ‘ওদের স্বভাবই ঐ রকম’, ‘গুরুতর ত্রুটি’, অমুক ‘বাদ’ নয় তো তমুক ‘বাদ’।

৪। কোন কোন কমরেড একটা খুঁটিনাটির ওপর সবটা জোর দিয়ে ভাবেন যে, তাতেই সবটা ধরা যাবে। তাঁরা “কায়া ভ্রমে ছায়াকেই পাকড়াও করেন”। আপাত রূপটাই তাঁরা খেয়াল করেন, আসল মর্ম বিস্মৃত হন। এ কমরেড, সে কমরেডের সামান্য কোন খুঁত ধরে তারই সাহায্যে তাকে একহাত নিতে চান। দোষ খুঁজে বেড়ানোই তাদের একাগ্র সাধনা। ‘অমুক দিন তুমি বড্ড জোরে কথা বলেছিলে’, ‘বেড়ানোর সময় তোমার জামার বোতাম খোলা ছিলো’- এমনি সব তুচ্ছ নালিশের তাঁরা ফিরিস্তি করে বেড়ান, দোষটা বড় হোক বা ছোট হোক তার আসল চেহারাটা কি সেটা ধর্তেব্যের মধ্যেই আনেন না। দোষটা ইচ্ছাকৃত বা আকস্মিক, স্বভাবগত না অন্যরকম, রাজনীতিগত না মতাদর্শগত তা তাঁদের দেখার দরকার হয় না, তখনকার অবস্থার কথাটাও চিন্তা করেন না। উন্মাদ সমালোচনা করে তাঁদের শিকারকে তাঁরা একেবারে কাঁদিয়ে ছাড়েন। কিন্তু ফল কিছুই হয় না’, ‘বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া’।

৫। অন্য কমরেডদের সমালোচনা করার সময় কেউ কেউ আবার শুধু গুণের কথাই তোলেন, দোষের কথা একেবারে এড়িয়ে যান। চারদিকে প্রশংসা-সৃষ্টি করাই তাদের কায়দা। তাদের মতে সবাই একেবারে চমৎকার- সবার সেরা এঁরা লোকের সুনজরে পড়ার জন্যেই প্রাণপাত করেন।

অনেক কমরেড আছেন তাঁরা অন্যের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনতেই শুধু ভালবাসেন- খোলাখুলি প্রশংসায় তাঁদের মন খুশী হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের ভুল-ত্রুটির কথা ওঠালেই এদের চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে- মাথা গরম হয়ে যায়। প্রশংসা করাই যেসব কমরেডের কায়দা তারা এদের কাছে খুবই পছন্দসই। এ ধরনের প্রশংসা যে শুধু ফাঁকা কথা তা তাদের মাথায় ঢোকে না।

৬। অন্যদের শুধু দোষের সমালোচনাই করলাম; কিন্তু তাদের কৃতিত্বের কথা উল্লেখই করলাম না-এ আর এক ধরনের বিচ্যুতি। এ বিচ্যুতিটা খুব গোঁড়া ধরনের। কোন কোন কমরেড ভাবেন যে, সমালোচনা মানেই হ’ল শুধু দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। তারা ভাবেন যে, সমালোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে যত পার দোষ খুঁজে বের করে কমরেডটিকে এমন অপদার্থ বলে প্রমাণ করে দিতে হবে যে, সে যেন ‘আর মুখ দেখাবার ঠাঁই না পায়’। “প্রশংসা! তাহলে আর সমালোচনা কি হল?”

একজন কমরেডকে জানি, যাকে অনেকেই পছন্দ করত না। এ নিয়ে মিটিং হবার আগে তারা একটা খাতা-পেন্সিল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আরম্ভ করল- কমরেডটির সম্বন্ধে কার কি সমালোচনা আছে জড়ো করতে। দোষের কথা শুনলেই তারা খাতায় টুকল; কিন্তু যদি কেউ কমরেডটির পক্ষে কিছু বলল, তা আর টুকল না- বলল, “ওকে প্রশংসা করেন কেন ? আমরা তো আর ওকে আদর্শ কমরেড বলে দেখাতে যাচ্ছিনে।” এইভাবে তারা আসামীর বিরুদ্ধে প্রায় দু’তিন শ’ ‘কসুর’ জোগাড় করে আনল।

কমরেডস, আপনারা ভেবে দেখুন এ ধরনের সমালোচনায় কি কোন কাজ হতে পারে ? যাকে সমালোচনা করা হ’ল তার কি কোন উপকার হতে পারে ?

৭। কোন কোন কমরেড শুধু নিজেকেই যাচাই করেন, নিজের সমালোচনা করেন; কিন্তু অন্যদের সমালোচনা করেন না। এ ধরনের কমরেডের নজর শুধু নিজের দিকে, অন্যদের দিকে তার খেয়ালই নেই। তার ভয় অপরকে শত্রু দাঁড় করানো ঠিক হবে না। অপরকে সমালোচনা করতে তিনি ভয় পান, ভাবেন তারা তাহলে তাকে ঘৃণা করবে, তার ওপর শোধ নেবে। তার মনে হয়, “কারই বা দোষ নেই ? আজ যদি ওর সমালোচনা করি তো কালই হয় তো ও শোধ নেবে।” “আপন সদর দরজার সামনেটা ঝাঁট দাও- অন্যের ছাদের জঞ্জাল আপনা-আপনিই দূর হবে এখন”- খুচিয়ে ঘা করার দরকার কি? এ হল তার মন্ত্র।

৮। কোন কোন কমরেড চান “পূর্ণ শান্তি”। নিজেদের সম্বন্ধে তারা যেমন ঢিলেঢালা, অপরের সম্বন্ধেও তেমনি। চীনে প্রবাদ আছে, “নদীর জলে আর কুয়োর জলে ঝগড়া নেই”। সমালোচনায় কাজ কি? আর নেহাতই যদি সমালোচনা করবে তো মৃদুভাবে করো-ঝগড়াঝাটি করো না- পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্বের পর্দায় সুর বেঁধে রাখ।”

এঁরা “অনাক্রমণ-চুক্তির” পক্ষপাতী। শুধু তাই নয়-এরা বিশ্বাস করেন যে, ‘আমাদের যুগেই শান্তি আসবে।’ সব বন্ধু-বান্ধব একসাথে সৌজন্যে আর শিষ্টাচারে, গড়ে তুলবে সুখী পরিবার। “আনন্দমুখর জমায়েত- কী সুন্দর, না! সমালোচনা করে মেজাজ বিগড়ে দিয়ে আমাদের কি লাভ?

৯। তারপর আছেন ‘প্রশান্তবাদীরা’ (ট্র্যাংকুইলিষ্টস) – মুশকিল এড়িয়ে যাওয়াই এঁদের চিরন্তন প্রচেষ্টা। “আপনার কথা ঠিক; কিন্তু উনি যা বলছেন তাও তো সত্যি।” “শ্বশুর বলেন, ভুলটা শাশুড়ির, আর শাশুড়ি বলেন শ্বশুরের- কিন্তু বৌ কি করে ভরসা করে বলে কে ঠিক!” এসব লোকে আবার বড় জিনিসগুলোকে সামান্য করে দেখান, আর ছোট জিনিস হ’লে উড়িয়ে দেন। “আমরা তো আর অচেনা মানুষ নই, তবে সবাই মাথা গরম করে কি দরকার ?”

১০। কমরেডদের সামনে সমালোচনা করে পেছনে টিপ্পনী কাটা কারও কারও অভ্যাস। মিটিংয়ে তাঁরা সমালোচনা করেন না, মিটিংয়ের পরে গাল-গল্পচ্ছলে তারা টিপ্পনী কাটেন। তারা মিটিংয়ে কথা কননি কেন? জিজ্ঞসা করলে জবাব দেন, “আমার কিছু বলার নেই ভেবেছ? যথেষ্ট বলতে পারি।” যার সঙ্গে দেখা হবে তার সঙ্গেই তারা গাল-গল্প চালান; কিন্তু যাকে সমালোচনা করতে চান শুধু তাকেই কিছুই বলেন না।

কথায় আছে, “ভালো লোক কখনো মুখের ওপর বলে দিতে ভয় পায় না।” কিন্তু এই কমরেডরা তা করতে বড়ই লজ্জা পান।

১১। নিজের পছন্দ-অপছন্দ দিয়েই কেউ বা নীতি স্থির করেন। যদি বন্ধু হয় তবে পরস্পরকে বাচাঁবেন, আড়াল করবেন। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, তাঁদের বন্ধুর বহু দোষ। তবু তারা ভাববেন, “আহা ওর সঙ্গে একসঙ্গে এসেছি”, “একসঙ্গে পড়েছি,” “ওর সঙ্গে জমে ভাল” সুতরাং এইসব ব্যক্তিগত কারণে তারা বন্ধুর সমালোচনা করবেন না, বরং তার দোষ ঢাকা দিতে চেষ্টা করবেন।

কিন্তু যে কমরেডকে তারা পছন্দ করেন না তার বেলায় একেবারে মারমুখো হয়ে এ বিশেষ বক্তৃতা ঝাড়বেন, বলবেন যে ওর সব ভুল। এর নাম “বন্ধু আমার এত ভাল যে তার সাতখুন মাফ আর শত্রু এত খারাপ যে তাকে টিকতে দেওয়াই চলতে পারে না।”

১২। কেউ কেউ আবার মিটিং এর আগেই চুক্তি করে ফেলেন-অনাক্রমণ চুক্তি ও গোপন শর্ত। “আমি প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে আপনি যদি আমার বিরুদ্ধে কোন কথা না তোলেন তবে আমিও আপনার বিরুদ্ধে সমালোচনা না করিতে বাধ্য থাকিব।” ফলে সবাই বেশ চুপচাপ থাকে।

১৩। কেউ কেউ আবার সাধারণ ‘শত্রুর’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্যে চুক্তি ও পরিকল্পনা তৈরি করেন, নিজেদের প্রত্যেকটি ‘অভিনেতা’র  ‘ভূমিকা’ নির্দিষ্ট করে দেন। তারপর একেবারে মুহুমুর্হু গোলাবর্ষণ। আসামীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত সমালোচনার অগ্নিবৃষ্টি।

১৪। কোন কোন কমরেড একগুয়ে, কিছুতেই দোষ স্বীকার করবেন না। কেউ সমালোচনা করলে তাঁরা সবই অস্বীকার করবেন। “শেষ পর্যন্ত অটল থেকো,” “ধীর থেকো,” “আত্মসর্মপণ কোরো না”- এই হল তাঁদের মন্ত্র। যা করতে পার কর, কিন্তু আমাকে কবুল করাতে পারবে না।”

১৫। কোন কোন কমরেড মনে মনে সমালোচনা ও দোষত্রুটি স্বীকার করেন, কিন্তু প্রকাশ্যে খোলাখুলি দোষ স্বীকার করতে রাজী হন না। তাঁরা ভাবেন, “আমি নিজে যখন নিজের দোষ বুঝছি, দোষ শোধরাতেও প্রস্তুত আছি, তখন তার বেশী আর কি দরকার? সকলের সামনে স্বীকারোক্তির প্রয়োজন কোথায়?” কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এই কমরেডদের যদি স্বীকার করার মত সাহস ও মনের জোর না থাকে তবে দোষ সংশোধনের মত দৃঢ়তা তাঁরা পাবেন কোথায় ?

এই সব ত্রুটি বিশ্লেষণ করলে তিনটি ভ্রান্ত মতাদর্শ ধরা পড়ে,যথা-আত্মবাদিতা (সাবজেক্টিভিজম), উদারনৈতিকতা (লিবারলিজম) এবং চক্রান্তকারিতা (ক্লিকিজম) সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে এই যে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি, এর কোনটাই সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গি নয়। এর কোনটিতেই নীতির বালাই নেই।

আত্মবাদিতা হচ্ছে অবস্তুবাদী মতাদর্শ। উদারনতৈক পুঁজিবাদী মতাদর্শেরই জের। আর সামন্তবাদী মতাদর্শের রেশ হচ্ছে চক্রান্তকারিতা। এগুলি সবই সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধী।

এ ধরনের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মোটেই সাচ্চা নয়, সোজা নয়-এ হচ্ছে তার হীন ধরনের রকমফের। এতে অহংকেই প্রথম স্থান দেওয়া হয়, সমষ্টির কথা আসে তারপর।

এর অর্থ হচ্ছে যে, সর্বহারা শ্রেণীর সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার মধ্যে প্রাচীন সামাজিক তত্ত্বের ভ্রান্ত মতাদর্শ অনুপ্রবেশ করেছে।

এর অর্থ হচ্ছে যে, বিভিন্ন বিপ্লবী কমরেডদের পরস্পর সম্পর্কগুলিকে ব্যক্তিগত সামাজিক সম্পর্কের স্তরে নামিয়ে আনা। এর মানে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে এমন ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে সেটা যেন সামাজিক মেলামেশারই পন্থা হয়ে দাঁড়ায়।

শ্রেণি শত্রুর বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম তার সঙ্গে আভ্যন্তরীণ মতাদর্শের সংগ্রাম গুলিয়ে যায় যদি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ভ্রান্ত পথে চলে। তার ফল হয় যে, চাষী যে দৃষ্টিতে জমিদারকে দেখে কিংবা জমিদার যে দৃষ্টিতে চাষীকে দেখে, আমরা নিজেদের কমরেডকেও সেই দৃষ্টিতে দেখতে আরম্ভ করি।

আর এক ভ্রান্ত ধরনের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা বিপ্লবী সমালোচনার মধ্যে গুণ্ডা-বদমায়েশদের পদ্ধতি সংক্রামিত করে, যেমন, প্রতারণা, হুমকি, মারমার কাটকাট (কাট এন্ড থ্রাষ্ট) সন্ত্রাস।

বিপ্লবী উদ্দেশ্যের চেয়ে নিজেদের স্বার্থের প্রতি কমরেডদের বেশী দৃষ্টি থাকে বলেই এই সব ত্রুটির উদ্ভব হয়।

বিপ্লবী সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার এই সব কদর্য অভ্যাসের পরিচয় দেওয়া মস্ত ভুল। এই সব নীচ মতাদর্শ বিশেষ করে চক্রান্তকারিতার মতাদর্শ বিপ্লবী বাহিনীতে সংক্রামিত করা কিছুতেই চলতে পারে না।

প্রকৃত সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তোলা

১। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনায় ষোল আনা সাধুতা দরকার। মান-অপমানের কথা ভুলে যান। সেই যে প্রাচীন বচন “ছাল থাকে সব গাছে, সব মানুষের মান আছে”- এ হচ্ছে সেই প্রাচীন সামাজিক সম্পর্কেরই দার্শনিকতা। কিন্তু সর্বহারা শ্রেণী হল সৎ, অকপট, তার ব্যবহার খোলাখুলি। তথ্যের মধ্যে থেকেই সর্বহারা শ্রেণী সত্যের অনুসন্ধান করে।

কমরেড মাও সেতুং শিখিয়েছেন যে “কুন্ঠা না করে, সকলের সামনে দাঁড়িয়েই আমাদের টিকি (টেলস) কেটে ফেলতে হবে।” অহংকার বড়াই এসব একেবারে বাদ দিতে হবে।

দোষ স্বীকার করা মানে এ নয় যে আপনি নিজেকে একবারে অপদার্থ বলে মেনে নিচ্ছেন। দোষ স্বীকার করে গ্রুপের কাছে তা প্রকাশ করলে লাভই হয়, কোন ক্ষতি হয় না। এতে মান খোয়াতে তো হয়ই না, বরং ইজ্জত বাড়ে, প্রভাব বাড়ে। খোলাখুলি দোষ স্বীকার করলে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়, তাই জনগণও খোলাখুলি কথাবার্তা খুব পছন্দ করে। যে কমরেড দোষ মানেন না, সাফাই দেবার চেষ্টা করেন, তর্কের চোটে দোষটাই উড়িয়ে দিতে চান- সে কমরেডের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে যে তিনি জনগণের কাছ থেকে আলাদা হয়ে পড়বেন। জনগণ তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হবে, তাঁর সম্পর্কে কোন ভরসা রাখতে পারেন না, তিনিও তাদের ওপর সমস্ত প্রভাব হারিয়ে ফেলবেন।

২। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে চটুল বা দায়িত্বহীন ভাব দেখালে চলবে না, গুরুত্ব আরোপ করে একে গ্রহণ করতে হবে। কমরেডরা যেন ‘মধ্যপন্থা’ বা দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ না করেন। প্রত্যেকে কমরেড তথা সমগ্র গ্রুপটির স্বার্থ আমাদের মনে রাখতে হবে, কারণ যে কমরেডের ত্রুটি আছে, যিনি দোষ করেন তিনি বিপ্লবী লক্ষ্যের পক্ষে ক্ষতিকর- তাঁর সম্বন্ধে তাই সকলকেই মাথা ঘামাতে হবে। “পরের দোষ নিয়ে আমার মাথা ব্যাথার কি দরকার”- এ মনোভাব ভুল। একজনের দোষে বিপ্লবী লক্ষ্যের ক্ষতি হয়, গ্রুপেরও ক্ষতি  হয়।

কমরেডদের আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে এবং  গ্রুপের সমালোচনায় কান দিতে হবে। নিজের দোষ আর পরের দোষ-এর মধ্যে তফাৎ করা কমরেডদেও উচিৎ নয়। অন্য কমরেডদের দোষ দেখে চোখ বুজে থাকলে সেই কমরেডদেরই সর্বনাশ করা হয়। আবার নিজের দোষ হাল্কা করে দেখার মানে মতাদর্শের দিক থেকে আত্মহত্যা করা।

দোষ সহ্য করা বা দোষের সাফাই দেওয়া মানে দোষ আরও বাড়ানো, গায়ে পড়ে দোষগুলিকে বাড়িয়ে তোলা।

৩। পথনির্দেশের নীতিটি কমরেডদের অটলভাবে ধরে রাখতে হবে, কোন্টা ভুল আর কোন্টা ঠিক তা বুঝে নিতে হবে, সমালোচনা করতে হবে পথনির্দেশের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশী মতো করলে চলবে না। পথনির্দেশক নীতিটা কি? শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক স্বার্থ আমাদের পথনির্দেশক নীতি, পার্টির নীতি, পর্টির বিভিন্ন লক্ষ্য ও পার্টির লাইন, জনসাধারণের কল্যাণ- এই আমাদের শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশক নীতি।

এই নীতি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরলে আমরা সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা থেকে লাভবান হতে পারি। শুধু এই পথেই আমাদের নানান সমস্যার সঠিক সমাধান পাওয়া যেতে পারে।

তুচ্ছ, দৈনন্দিন যে সব জিনিসের সঙ্গে নীতির সম্বন্ধ নেই, যেমন “অমুক দিনে চারবার দাঁত মাজে” ‘মেয়ে কমরেডদের চুল বাঁধার কায়দা’ “অমুক বড্ড জোরে হাসে,” এসব জিনিস গ্রুপের সমালোচনার যোগ্য নয়, এ সব জিনিসকে নীতির পর্যায়ে তোলার দরকার নেই।

৪। কোন কমরেড সমালোচনা করার সময় প্রথমে তাঁর সদ্-গুণের কথা বলে তারপর তার ভুলত্রুটির কথা বলা উচিৎ। এভাবে বললে তবেই আমরা তাঁকে সমালোচনা করার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারব, তবেই তিনি খুশী মনে আমদের সমালোচনা গ্রহণ করবেন, সমালোচনার উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে। কোন কমরেডের বেলায় যদি শুধু তাঁর দোষ নিয়েই পড়া যায়, তাঁর গুণগুলি নাকচ বা অস্বীকার করে দেওয়া হয়, দেখানো হয় যে কমরেডটি একদম বাজে তাহলে প্রথমতঃ সে কমরেডের পক্ষে কোন সমালোচনা মেনে নেওয়া মুশকিল হয়; দ্বিতীয়তঃ তাঁর মনে হয় যে তাঁর কোণ গুণ নেই, একেবারেই তিনি অপদার্থ- সুতরাং তিনি হতাশ বা নৈরাশ্যবাদী হয়ে পড়েন। অবশ্যি কোন কমরেডের সমালোচনা করার আগে প্রত্যেকবারই যে তার গুণের তালিকা দাখিল করতে হবে তা নয়। কথাটা হচ্ছে এই যে, কারও সমালোচনার সময় মনে রাখা দরকার যে তাঁর কতগুলি সদ্গুণও আছে।

যে সব কমরেডের অপেক্ষাকৃত বেশী দোষত্রুটি আছে শুধু তাঁদের ক্ষেত্রেই সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা যেন সীমাবদ্ধ না থাকে, এটা বুঝা দরকার। কোন কোন ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ভাল কমরেডের সমালোচনা প্রায় হয়ই না। এর একমাত্র ফল হচ্ছে সে কমরেডটি অহংকারী ও আত্মসন্তুষ্ট হয়ে দাঁড়াবেন। তিনি যাতে উন্নতির পথে এগিয়ে চলেন সেজন্য তাঁকে জাগিয়ে তুলতে হবে, মাঝে মাঝে সাবধান করতে হবে, এতে আমাদের অবহেলা করা চলবে না। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা এমনই জিনিস যে প্রত্যেককেই এতে অংশ নিতে হবে, এর কোন ব্যতিক্রম নেই।

৫। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা করার সময় কমরেডদের আবেগ বাদ দিয়ে বস্তুগত ভিত্তির (অবজেকটিভ) ওপর দাঁড়াতে হবে। তাঁদের সহৃদয়, যুক্তিপূর্ণ ও বিশ্লেষণপরায়ণ হতে হবে। এরাপাথারি গালা-গালির প্রয়োজন নাই। ‘টুপির মাপ ঠিক হলে তবেই মাথায় লাগবে- এই কথাটা খুব জুরুরী। কোন কোন কমরেডের আবেগের প্রাবল্য বড় বেশী, কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিয়ে তাঁরা একবারে “কথার ঝড় বইয়ে দেন”। নানান ধরনের ‘বাদ’-এর অপরাধে তারা আসামীকে অপরাধী সাব্যস্ত করেন। তথ্য সম্বন্ধে যদি যথেষ্ট জ্ঞান না থাকে, যদি শুধু আবেগই থাকে তো তার ফলে আসে আত্মগত বিচার আর সংকীর্ণচিত্ততা। পাতি-বুর্জোয়া পরিবেশ থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের দৃষ্টি প্রায়ই সংকীর্ণ হয়ে থাকে। কোন লোক বা কোন বিষয়ের সমালোচনা করতে গেলে ভুলটার জড় কোথায়, সেটা কিভাবে বেড়ে উঠল তা পরীক্ষা করা খুবই দরকার। কোন্টা দরকারী আর কোন্টা নয়, কোন্টা ইচ্ছাকৃত কোন্টা অনিচ্ছাকৃত, তা বুঝে নিতেই হবে। যদি তথ্য থেকে সত্য খুঁজে বার করি, বস্তুগতভাবে প্রতিটি প্রশ্ন বিচার ও বিশ্লেষণ করি, তবেই আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি যে আমাদের সমালোচনা বিনাশর্তে প্রফুল্ল মনে গৃহীত হবে।

সঙ্গে সঙ্গে কমরেডটিকে উন্নতির পথও দেখিয়ে দেওয়া উচিত। যতখানি সম্ভব তাঁর ভুল শোধরানোর পথ বাতলাতে হবে। কারণ সমালোচনা তো শুধু ধ্বংসই করে না, গঠনও করে। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে পাতি-বুর্জোয়া, বুর্জোয়া আর সামন্তবাদী মতাদর্শের জায়গায় সর্বহারা মতাদর্শ কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।

৬। রোগীর প্রতি ডাক্তারের মনোভাব যে রকম, কমরেডদের প্রতি আমাদের মনোভাবও সেই রকম হওয়া উচিত। সমালোচনা করতে হবে সহৃদয়ভাবে, এমনভাবে যাতে কমরেডটি তাঁর ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য পান। কোন অবাঞ্ছিত ব্যাপারের বা কোন কমরেডের সমালোচনার উদ্দেশ্য হল কমরেডটির দোষ সংশোধন করা, কাজের উন্নতি করা। কমরেডটি তো আমাদের শত্রু নন, শত্রু হল তাঁর ভ্রান্ত  মতাদর্শ। তারা মতাদর্শের এই ভ্রান্ত অংশটুকুই আমরা নষ্ট করতে চাই, তার গোটা মতাদর্শ তো আর নষ্ট করতে চাইনে! এই ভাবেই শুধু আমরা কমরেডটিকে তাঁর ত্রুটি সংশোধন করতে, সদ্গুণগুলি বাড়িয়ে তুলতে উৎসাহিত করতে পারি।

৭। আত্ম-সমালোচনার জন্যে কমরেডদের নির্ভীক মনোভাব দরকার। মতাদর্শের রণক্ষেত্রে চূড়ান্ত জয়ের জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে।

অপরকে সমালোচনা করতে গেলে যেমন সাহস চাই, নিজেকে করতে গেলেও তেমনি সাহস চাই। যখন সত্যই যুদ্ধ চলে, তখন অনেক কমরেড নির্ভয়ে শত্রুর সাথে সংঘর্ষে নামেন। প্রাণ দিতে, রক্ত ঢালতে তাঁদের দ্বিধা নেই। কিন্তু আত্ম-সমালোচনার অস্ত্র দিয়ে মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ে নামার যখন সময় আসে তখন তাঁরা ঘাবড়ে যান। অত্যন্ত প্রতিক‚ল অবস্থায়ও এঁরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, কিন্তু আত্ম-সমালোচনার সামান্য অসুবিধা তাদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে।

কোন কোন কমরেড সবসময়ই আগে দাঁড়াতে চান, অন্যদের তাঁরা অনবরত ডাক দেন প্রতিযোগিতার জন্য। কিন্তু আত্ম-সমালোচনার বেলায় পেছনে থাকাই তারা পছন্দ করেন। সব ময়লা ঝেড়ে-মুছে সাফ করার বদলে এরা নিজের জঞ্জাল ঘরের মধ্যে রেখে দিতে চান, লোকচক্ষু থেকে আড়াল করতে চান। জঞ্জাল চোরা গুদামে রাখলেই লাভ হবে এদের ধারনা। ঘরদোর, পোশাক-আশাক সব এঁরা ঝক্ঝকে তকতকে রাখতে চান, কিন্তু মতাদর্শের জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে সাফ করার ব্যাপারে এদের মাথা ব্যথা নেই।

কমরেডদের চেষ্টা করা দরকার যাতে মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রেও তাঁরা সবার আগে থাকতে পারেন।

৮। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ব্যাপারে- চরম লাইন নয় যা যথাযথ তা সেই লাইনেই নেওয়া উচিত। পাতি-বুর্জোয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে পাতি-বুর্জোয়া কৌশল প্রয়োগ করা ঠিক নয়। আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মনোভাবে যতক্ষণ ভুল থাকবে ততক্ষণ আমরা ভ্রান্ত মতাদর্শ নিঃশেষ করতে পারব না।

ব্যক্তিগত অন্ধ সংস্কারের ভিত্তিতে কমরেডদের সমালোচনা করা ঠিক নয়। এইভাবে যদি আমরা দোষ দিয়েই দোষের বিরুদ্ধে লড়তে যাই তবে তার ফলে শুধু গোলমালই বাড়বে, দোষের বোঝা বাড়তে থাকবে, কোন্টা ভুল আর কোন্টা ঠিক তার হদিস পাওয়া যাবে না। তাই দোষের সঙ্গে আপোষ করার মতবাদের যেমন আমরা বিরোধিতা করি, তেমনি চরম পন্থারও (এক্সষ্ট্রিমিজম) আমরা বিরোধী।

কমরেডরা কেউ কেউ ভাবেন “সংগ্রামের জ্ঞান”(সেন্স অব ষ্ট্রাগ্ল) দেখাবার জন্যে তাঁদের বুঝি হিংস্র মূর্তি ধরে লোককে ভয় দেখাতে হবে। কিন্তু আস্তিন গুটিয়ে দাঁত কিড়মিড় করা, চেঁচিয়ে শাপান্ত করা এ সব একদম ভুল। যাঁরা অনভিজ্ঞ তাঁরা এতে ভয় পেতে পারেন, কিন্তু তাঁরাও এমন হতভম্ব হয়ে যাবেন যে, আপনারা সমালোচনা ধরতেই পারবেন না। আর অভিজ্ঞ কমরেডরা এসব গ্রাহ্যই করবেন না, তাঁরা জানেন আপনি যতই “চেঁচান না কেন লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন না”।

নিশ্চয়ই সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ভিত্তি হতে হবে বিচার-বুদ্ধি; এর মধ্যে অবশ্যই বস্তু থাকা চাই, নিদের্শক নীতি থাকা চাই। সমালোচনা করার সময় গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতে হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু সাবধান! মতাদর্শের লড়াইয়ে ঘুঁষাঘুঁষি করে কাজ হয় না।

 

লেখাটির পিডিএফ সংগ্রহ করতে নীচে ক্লিক করুন –

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা


ভারতবর্ষে জমি-সম্পর্কের ইতিহাস প্রসঙ্গে -কার্ল মার্কস

karl-marx-wikimedia-commons

 লেখাটি পড়তে বা ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন

ভারতবর্ষে জমি-সম্পর্কের ইতিহাস প্রসঙ্গে


পুঁজিবাদ যেভাবে আমাদের মেরে ফেলছে -বেলেন ফার্নান্দেজ

maxresdefault

বেশ কয়েক বছর আমি আর আমার এক বন্ধু ভেনেজুয়েলায় ছিলাম। সেখানে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চিরশত্রু বলে পরিচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকগুলোতে আমার বিনা মূল্যে যে চিকিৎসাসেবা নিয়েছি, তা ভুলবার নয়। আমার দেশ আমেরিকায় আমি বিনা মূল্যে এমন উন্নত চিকিৎসাসেবা কল্পনাও করতে পারি না। এর কারণ হলো, পুঁজিবাদের ধ্বজাধারী আমেরিকা যুদ্ধ বাধানো এবং করপোরেট মুনাফা অর্জনের পেছনে এত বেশি সময় দেয় যে মৌলিক মানবাধিকার নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় সে পায় না। ভেনেজুয়েলার একটি ক্লিনিকের একজন নারী চিকিৎসক আমাকে বলছিলেন, বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ সেখানেই মার্কিন সেনাবাহিনীর দেখা পাওয়া যাবে। আর সেসব যুদ্ধবিধ্বস্ত জায়গায় কিউবার লোকও থাকে। তবে তারা সেনা নন, তাঁরা চিকিৎসক।

২০১৭ সালে জাতিসংঘের তীব্র দারিদ্র্য ও মানবাধিকার বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার  একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, চীন, সৌদি আরব, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স ও জাপান সম্মিলিতভাবে জাতীয় নিরাপত্তা খাতে যত অর্থ ব্যয় করে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী উন্নত বিশ্বের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ওই সময় বিশদ তথ্য দিয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি আমেরিকার সমাজব্যবস্থাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে অসম সমাজ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকায় অন্তত চার কোটি মানুষ দরিদ্র। সেখানে মৃত্যুহার বাড়ছে এবং সামাজিক অস্থিরতা ও নেশার কবলে পড়ে বহু পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, এই সবকিছুর পেছনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একটি বড় ভূমিকা রাখছে।

আমেরিকান সমাজে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। এই সমাজের একটি বিরাট অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। অর্থ আর মুনাফা অর্জনের সীমাহীন নেশা এখানকার মানুষের জীবনকে এতটাই অস্থির করে তুলছে যে বহু মানুষের পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই এই সমাজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর ২০১৮ সালের জরিপে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার এই অস্থির ও নির্বান্ধব জীবনকে মেনে নিতে না পারায় সমগ্র দেশের মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নব্য উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষ অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্রমাগত একা হয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক বন্ধন ছুটে যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই নিষ্ঠুর নিঃসঙ্গতা মানুষের জীবনে হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ ভোগবাদী জীবনের অস্থিরতার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিষণ্নতা থেকে আরোগ্যলাভের জন্য সেখানে ‘বিষমিশ্রিত’ বিশাল বিশাল ওষুধ কোম্পানি খোলা হচ্ছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলারের মুনাফা তুলে নিলেও দিন শেষে বিষণ্ন মানুষগুলোর জীবনে প্রাণখোলা হাসি–আনন্দ আসছে না।

মার্কিন পুঁজিবাদ শুধু যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বা আশপাশের দেশের মানুষের পারিবারিক বা সামাজিক বন্ধনের জন্য হুমকি, তা নয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ভোগবাদী সমাজ সম্প্রসারণের কারণে পণ্যের অতি ব্যবহার, অপব্যবহার ও বিষক্রিয়া বাড়ছে। এটি গোটা পৃথিবীকে এমন এক ধ্বংসের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব হবে না। ১৯৮৯ সালের আগে মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বলেছিলেন, অধিক ভোগ ও উৎপাদন প্রবণতার কারণে গ্রিনহাউস ইফেক্ট বা কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। পুঁজিবাদ যত বেশি বিকশিত হবে, এই ধারা তত বাড়তে থাকবে। ক্রমেই পৃথিবী ধ্বংসের দিকে যেতে থাকবে।

 এক্সট্রিম সিটিজ: দ্য পেরিল অ্যান্ড প্রমিজ অব আরবান লাইফ ইন দ্য এজ অব ক্লাইমেট চেঞ্জবইয়ের লেখক অ্যাশলে ডওসোন গত ডিসেম্বরে ভারসো বুকস ওয়েবসাইটে লেখা একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘উগ্র পুঁজিবাদ’ এবং ‘পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভকে অপরাধ সাব্যস্ত করার চেষ্টা’ দিয়ে গোটা বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। অ্যাশলে ডওসোন বলছেন, ট্রাম্প নিজেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। এ থেকে তিনি বের হতে পারবেন না। আমেরিকাও বের হতে পারবে না।

পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে এই ধনতান্ত্রিক অস্থির সমাজকে ভাঙতেই হবে। বিশ্বকে জাগতেই হবে।

সূত্রঃ আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত

বেলেন ফার্নান্দেজ- মার্কিন লেখক ও গবেষক

prothomalo.com


ভারতের মাওবাদীরা মোবাইলের ব্যবহার সম্পূর্ণ বাতিল করেছে

Maoist-surrendering

কেরালায় মাওবাদীদের বিরুদ্ধে চলমান অপারেশনে পুলিশ এক নতুন ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, মাওবাদীরা নিজ ক্যাডারদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্যে মোবাইলের ব্যবহার সম্পুর্ন বাতিল করেছে, এতে করে মাওবাদীদের অবস্থানগুলি চিহ্নিত করতে বা তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে।

কেরল পুলিশের কয়েকটি জেলার বিশেষ দলগুলি (ওয়াইনাদ, পালক্কাদ, কোজিকোড এবং মালাপ্পুরাম) একত্রিত হয়েও তারা সিপিআই (মাওবাদী) ক্যাডারদের বিস্তারিত সন্ধান করতে সক্ষম হয়নি, যদিও এসময় মাওবাদীরা জনসাধারণের মাঝে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান করেছিল।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনও ধরণের ট্র্যাকিং এড়াতে মাওবাদী বিদ্রোহীরা মোবাইল ফোনের বা অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগ ডিভাইসগুলি ব্যবহার করে বন্ধ করে দিয়েছে। এর বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে তারা মানব কুরিয়ার ব্যবহার করার মতো প্রচলিত যোগাযোগ পদ্ধতিগুলি ব্যবহারে আরও বেশি সক্রিয় হয়েছে”।

কানুর রেঞ্জের ইন্সপেক্টর জেনারেল বলরাম কুমার উপাধ্যায় বলেন, ওয়াইনাডের বন এলাকায় মাওবাদীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, “তারা জানে যে আমরা তাদের দমনে অঙ্গীকারবদ্ধ অপারেশন শক্তিশালী করেছি”।

আরেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ‘মাওবাদীরা তাদের সেল গুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য লংহ্যান্ড নোট ব্যবহার প্রথায় ফিরে গেছে। মাওবাদীদের কাছ থেকে জব্দ করা নথিপত্রের বিশদ বিশ্লেষণ করে মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বারা প্রদত্ত নির্দেশিকা পাওয়া গেছে’।

মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, মোবাইল ফোন বহন করা বা এর ব্যবহার করে কোন তথ্য ডাউনলোডের বিরুদ্ধে ক্যাডারদের সতর্ক করা করেছে। সকল গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা নিজেদের অবস্থান ট্র্যাকিং এড়াতে নিজ কর্মীদের খুব সতর্কতার সঙ্গে ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করতে বলা হয়েছে।

সূত্রঃ http://www.newindianexpress.com/states/kerala/2018/dec/28/maoists-shun-mobile-phones-to-prevent-tracking-by-agencies-1917478.html


জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতা-কর্মীদের জীবনাচরণ প্রসঙ্গে -কমরেড হেমন্ত সরকার

49135321_740783072966592_7648877497618006016_n

 প্রয়াত প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা হেমন্ত সরকার দক্ষ সংগঠকই শুধু ছিলেন না, তিনি অবসর সময়ে লেখালেখিও করতেন। তাঁর এই লেখাটি শ্রুতি লিখনের সাহায্যে লিখিত। ২৮শে ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে এই মূল্যবান রচনাটি প্রকাশিত হল।

সাধারন মানুষ সম্পর্কে ব্যাপক শিক্ষিত সুধীজনদের একটি বদ্ধমুল ধারণা বহু কাল ধরে চালু আছে। আর তা হল, এই সাধারণ মানুষ মূর্খ, অশিক্ষিত, অলস, জীবন-জগত, সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে ওরা কিছুই ভালো করে বোঝে না। ওদেরকে যে দিকে চালানো যায় সে দিকেই ছোটে। গত একশ’ বছরে লেখাপড়া জানা সাফ-কাপুড়ে অধিকাংশ শিক্ষিত ভদ্রলোকদের এই নাক উঁচু ধারণার উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে বাস্তবে দেখা যায় না। শাসক-শোষক গোষ্ঠীর নানা বর্ণের নানা রঙের প্রায় দেড় শতাধিক রাজনৈতিক দল এদেশে তাদের ঘুনে-ধরা সমাজ-রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্বে সদা তৎপর, সাধারণ মানুষ সম্পর্কে তাদের ধারণা ও আচার-আচরণ ঐ সুধীজনদের চেয়ে ভিন্ন নয়। সাধারণের সঙ্গে তাদের আচরণ সব সময়ই হয় প্রভুত্বমূলক। নিজেদেরকে তারা জনগণের মাস্টার ভাবে। জনগণের চিন্তা-চেতনা আর সৃষ্টিশীলতার ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা-বিশ্বাস-ভরসা এদের নেই (আর তার প্রয়োজনও করে না)। একমাত্র ভোটার হিসাবে এদের কাছে জনসাধারণের মূল্য অসীম, দেবতা-তুল্য!

এ হলো দেশের শিক্ষিত সুধীজনদের একাংশ আর শোষক-শাসক গোষ্ঠীর জনসাধারণের প্রতি মনোভাব। কিন্তু নিজেদেরকে যাঁরা জনগণের প্রকৃত বন্ধু মনে করেন, জনগণকে তাঁরা কিভাবে দেখবেন কি ধরণের আচরণ করবেন সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন। যাঁরা প্রগতিশীল তাঁরা সমাজ পরিবর্তনের ধারাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেন। সমাজের পরিবর্তন ঘটে কেন? শোষক ও শোষিতের মধ্যকার শ্রেণী সংগ্রাম সমাজকে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নেয় বলে প্রগতিপন্থীরা শোষিত শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং শ্রমজীবী মানুষের সৃষ্টিশীলতা, কর্মদক্ষতায় আস্থা স্থাপন আর ইতিহাসের নায়ক হিসাবে স্বীকার করা। একজন দু’জন করে সবাইকে শ্রমজীবী মাসুষের ভাবাদর্শে দীক্ষিত করা। সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর প্রতি প্রগতিধারার নেতা-কর্মীদের প্রাথমিক কাজ হবে নিজের পরিবারের সদস্যদের সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের আর্থিক বিষয়, কুশল ও সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে নিয়মিত আন্তরিকভাবে খোঁজ-খবর নেয়া। অর্থাৎ তাদের পরিবারের একজন হিসাবে নিজেকে ভাবা। এক সময় ছিল যখন প্রগতিশীল কর্মীদের মধ্যে কৃষক-শ্রমিকসহ ব্যাপক জনসাধারণের সঙ্গে মেলামেশার, তাদের সঙ্গে একাত্ম হবার বিপুল আগ্রহ লক্ষ্য করা যেত। দেখা যেত তাঁরা জনগণের মধ্যে শ্রেণীঘৃণা ও শ্রেণীস্বার্থের চেতনা জাগাবার জন্য বিশেষভাবে সচেষ্ট। জনগণের মধ্যে শ্রেণীচেতনা সৃষ্টি হবার ফলে তাদের কাছে শত্রু-মিত্র সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হত, সংঘশক্তির প্রয়োজন তারা অনুভব করত এবং জনসাধারণের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার জন্য এগিয়ে আসার আগ্রহও লক্ষ্য করা যেত। জনগণের আপনজন হবার জন্য কর্মীদের মধ্যে চলত নীরব প্রতিযোগিতা। জনগণ ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে গড়ে উঠত ত্যাগের মনোভাব। সে সময় জনগণের প্রতি নেতা-কর্মী-সংগঠনের মনোভাব ছিল পরম শ্রদ্ধার। জনগণের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ, কর্তব্যবোধ, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কর্মীদের নিবেদিতপ্রাণ করে তুলত। জনগণের সঙ্গে একাত্ম হবার জন্য এবং তাদের সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করে তোলার জন্য খাল-পুকুর খনন, রাস্তা-ঘাট সংস্কার, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, তাদের অক্ষর জ্ঞানদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেখা যেত।

জনগণের শ্রেণী সচেতন করার জন্য তাদের মধ্যে র্সংগঠন গড়ে তোলার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রায়ই শ্রমিক বস্তি আর সাধারণ ভূমিহীন, গরীব ও মাঝারি কৃষকদের বাড়িতে যেত ও থাকতে দেখা যেত। সে সময় তারা বাড়িতে সকল সদস্যের সঙ্গে সংসারের সব খুঁটি-নাটি অভাব-অভিযোগ, সমস্যা-সংকট সম্পর্কে আলোচনা করতেন। অভাব-অভিযোগের মৌলিক কারণ নিয়ে আলোচনা করতেন। সুন্দর মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে সকলের মন জয় করে নিতে চেষ্টা করতেন। এ সময় হিন্দু-মুসলমান পরিবারগুলোর মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা সৃষ্টির জন্য ধারাবাহিক আদর্শিক সংগ্রাম চলত। সহজভাবে সংগঠনের উদ্দেশ্য-আদর্শ ব্যাখ্যা করার ফলে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কি বলতে চায় এবং কি তাদের করণীয়- জনগণের কাছে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠত। সে সময় শ্রমিক বস্তিতে আর গ্রামে গ্রামে নিয়মিত গ্রুপ বৈঠক, পাড়া বৈঠক, গ্রাম বৈঠক হত। এ সব বৈঠক গণসংগ্রাম, গণআন্দোলন আর গণসংগঠন সম্পর্কে, দেশের ও বিশ্বের রাজনীতি সম্পর্কে শ্রমিক-কৃষকদের প্রশিক্ষণের কাজ করত। জনসাধারণের সঙ্গে এসব বৈঠকের ফলে নেতা-কর্মীরাও অর্জন করতেন জ্ঞান, অনুভব করতে পারতেন জনগণের মনোভাব ও সংগ্রামী উত্তাপ-যা উদ্দীপ্ত করে তুলত কর্মী ও জনগণ উভয়কেই।

প্রগতিশীল সংগঠনের কর্মী রিক্রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এ সময় সংগঠনে কর্মী রিক্রুট করা হত খুবই সতর্কভাবে ও বিচার-বিবেচনা করে। হুট করে কাউকে কর্মী হিসাবে গ্রহণ করা হত না। নতুন কর্মীর শ্রেণী অবস্থান, তার স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেওয়া হত এবং অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টিতে তাদের কাজ-কর্মের তদারক করা হত। একই সঙ্গে আদর্শ সংগ্রামী মনোভা, সংগঠন, সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা, জনগণ ও জনগণের শত্র“-মিত্র সম্পর্কে তাদের ধারণার স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তা যাচাই করা হত। কাজেই খেটে খাওয়া মানুষের জন্য শোষনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দর্শন যিনি গ্রহণ করবেন তাঁকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে অবশ্যই সমষ্টিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্ম-বর্ণ গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের ধারণার বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। তাকে অবশ্যই বিনয়ী ও সৎ মনোবৃত্তি রূপে গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক কর্মী পার্টি-সংগঠনকে একটি পরিবার হিসাবে দেখবেন। পার্টি-সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তাকে চোখের মণির মত রক্ষা করবেন। পার্টির সিদ্ধান্ত কার্যকরী করতে ব্যর্থ হলে অথবা কোন ভূল করলে সে জন্য সংগঠনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মনে করতে হবে দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য আমি জনগণের কাছে আসামী হয়ে গিয়েছি। শ্রমিকশ্রেণী ছাড়া অন্যান্য শ্রেণী থেকে আসা কর্মীদের সর্বাগ্রে শ্রেণীচ্যুত হওয়া ও সর্বহারা শ্রেণীর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী অর্জনের জন্য আত্মগত সংগ্রাম চালাতে হবে। অর্থাৎ তাকে সবার আগে লড়তে হবে নিজের অ-সর্বহারা শ্রেণী চরিত্রের বিরুদ্ধে। শোষকের বিরুদ্ধে শ্রেণী ঘৃণাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।

বর্তমান শ্রেণী বিভক্ত সমাজে শ্রেণীচ্যুত হওয়ার কাজটি একটি খুবই জরুরী সমস্যা। সমালোচনা-আত্মসমালোচনার যে হাতিয়ার মার্কসবাদীদের আছে তা সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করতে হবে। নিজের রূপান্তর ঘটাতে হবে। প্রতিটি মানুষের ত্র“টি-বিচ্যুতি আছে। পচা-গলা এ সমাজে জন্ম ও বেড়ে ওঠায় ত্র“টির পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে গভীরভাবে সমালোচনা-আত্মসমালোচনার অস্ত্রটিকে রপ্ত ও ব্যবহার করতে শিখতে হবে। প্রত্যেক কর্মীকে কোন না কোন কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত থাকা ও কমিটির বৈঠকে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে হবে। কোন কারণে উপস্থিত না হতে পারলে চিঠি লিখে বৈঠকের পূর্বেই সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেবার তাড়না অনুভব করতে হবে। প্রতি বৈঠকে লিখিত রিপোর্ট উপস্থিত করা জরুরী কর্তব্য। তবে কখনোই রিপোর্টে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা তথ্য উপস্থিত করা যাবে না। কমিটির সকল সদস্যকে আপন করে নিতে হবে। তাদের ভুল-ত্র“টি ধরা পড়লে গঠনমূলকভাবে সমালোচনা করে ত্র“টি শোধরাতে সাহায্য করতে হবে। সহকর্মীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। সহকর্মীদের রক্ষার জন্য জীবনও দিতে হতে পারে- এ মনোভাব মনে প্রাণে লালন করতে হবে। সহকর্মী যাতে কোন বিপদে না পড়ে সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রত্যেক সহকর্মীকে নিজের অঙ্গ মনে করতে হবে। মনে করতে হবে সে যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, অধঃপতিত হয় তাহলে যেন নিজেরই অঙ্গহানি ঘটছে।

প্রত্যেক কর্মীকে কৃষক-শ্রমিক ও অন্যান্য পেশার মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে পুংখানুপুংখভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তারা কি উদ্দেশ্যে নেতা-কর্মীদের প্রতি সদয় আচরণ করছে তা উপলব্ধি করতে হবে। অবশ্যই জনগণের প্রতি গভীর আস্থা রাখতে হবে। তবে তাদের সবার কথাকেই সরলভাবে বিশ্বাস করে সামাজিক দলাদলি আর কোন্দলে পার্টি সংগঠনকে জড়ানো চলবে না। জনগণের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি, জোর করে চাঁদা আদায় বা কোন সম্পদ হস্তগত করা নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। সামাজিক প্রতিপত্তি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি সুবিধা গড়ে তোলার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। মিথ্যা বলা যাবে না, কোন অন্যায় করা চলবে না। যদি তা করেও ফেলেন এবং তা বুঝতে পারার সাথে সাথে খোলাখুলি ভুল স্বীকার করা উচিত।

মাদকসেবী, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী, খুনী, মামলাবাজ, টাউট, দুর্ণীতিবাজ মাতব্বর ইত্যাদি লোকদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে এবং কৃষক-শ্রমিকদের সংকীর্ণ স্বার্থবোধ দ্বারা নিজেকে চালিত করা যাবে না। মনে রাখতে হবে সামন্ত প্রথায় তাদের জীবনে সংকীর্ণ স্বার্থপরতা ও নিজেদের শক্তির উপর আস্থা-বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। তাদের আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলায় সচেষ্ট হতে হবে।

সর্বোপরি সারাদিনের কাজের পর প্রতিদিন গভীরভাবে আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত। সারাদিন কয়টি কাজ বাস্তবায়িত হলো, কয়টি হয়নি, কোন কাজটি সঠিক হলো, কোনটি হয়নি, এজন্য কি করা প্রয়োজন ছিল-এভাবে নিজের দায়বদ্ধতার কাছে, রাজনৈতিক সচেতনতার কাছে জবাবদিহিতা বিশ্লেষণ করা। মনে রাখা প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে একজন নেতা বা কর্মী ধীরে ধীরে আত্মআবিষ্কার করা শেখে, তার উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল ক্ষমতা বেড়ে যায়, মধ্যবিত্ত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য- যেমন ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখা, আমলাতান্ত্রিকতা, নিজেকে জাহির করা, সংকীর্ণতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অপরের ছিদ্রান্বেষণ, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করা, সংগঠনকে কুক্ষিগত করা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত হন। এ ধরণের নেতা কর্মীদের দ্বারাই রাশিয়ার যুগান্তকারী বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল, বাংলাদেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করতে হলে শ্রমিক শ্রেণীর চিরকালীন আদর্শকেই অনুসরণ করতে হবে।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা’র ১৭ জানুয়ারী ১৯৯৯ রবিবার ১৮ বর্ষ ২১ সংখ্যা


আসামের মানুষ বাঙালিবিরোধী নয়, দাবি উলফার

AssamD

আসামের মানুষ বাঙালি বা বাংলাদেশের বিরোধী নয়—এমন দাবি করেছেন সংযুক্তি মুক্তি বাহিনী আসামের (উলফা) চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়ার। উলফার এই আলোচনাপন্থী নেতা আগরতলায় প্রথম আলোর কাছে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগও করেন।

জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন তালিকা (এনআরসি) আর নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে উত্তাল আসামের রাজনীতি। অভিযোগ, বাঙালিবিদ্বেষ থেকেই আসামের নাগরিকেরা ৪০ লাখেরও বেশি ভারতীয়র নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে চাইছে।

ত্রিপুরার সাবেক কট্টর সশস্ত্র সংগঠন অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্সের (এটিটিএফ) প্রধান সুপ্রিমো রঞ্জিত দেববর্মার ডাকে ত্রিপুরায় এসেছিলেন উলফার আলোচনাপন্থীদের নেতা অরবিন্দ। আগরতলা থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে এসরাই গ্রামে দুই নেতাই ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগ করেন।

উলফা চেয়ারম্যানের দাবি, ‘আমরা মোটেই বাঙালিবিদ্বেষী নই। আসামের নাগরিকেরা বরং বাঙালিদের বন্ধু বলে মনে করেন।’ একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, ‘আমাদের (আসামের নাগরিক ও বাঙালিদের) লড়াই লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ব্রিটিশ আমলেই শুরু হয়েছিল এই দ্বিজাতি তত্ত্ব। এখনো সেটাই অব্যাহত।’

একই সঙ্গে সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়ায় পাঁচ বাঙালি হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অরবিন্দ রাজখোয়ার। তিনি মনে করেন, এর পেছনে গভীর রহস্য রয়েছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওঁরা কিসের বাঙালি! গরিব মানুষ। খেতে পান না। নিজেদের মধ্যে কথাও বলেন আসামের ভাষায়। রাজনৈতিক লাভের প্রশ্নেই প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁদের। উলফা করেনি। তাহলে করল কে? কে খুন করল তাঁদের?’ তাঁর অভিযোগ, ভারত সরকার ঘটা করে তাঁদের আলোচনার টেবিলে ডেকে আনলেও শান্তি আলোচনা সঠিক পথে এগোচ্ছে না। প্রতারণা করা হচ্ছে। কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁদের এই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল ফের অশান্ত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন অরবিন্দ রাজখোয়ার।

এদিকে অরবিন্দের বক্তব্যকে সমর্থন করে সুপ্রিমো রঞ্জিত দেববর্মা বলেন, ত্রিপুরাতেও একই ছবি। আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে বলেও জানান তিনি।

অস্ত্র ছাড়লেও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাবেক দুই নেতা বলেন, নিজেরা সংঘবদ্ধ হয়ে দাবি আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাবেন। তবে আর অস্ত্র হাতে নয়, শান্তিপূর্ণভাবেই লড়াই করবেন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়।