অত্যাচার-অবিচারে বস্তার আরও পিছনের দিকে হাঁটছে – লেখিকা নন্দিনী সুন্দরের সাক্ষাৎকার

nandini-kyab-621x414livemint

প্রশ্ন: আপনার বই ‘দ্য বার্নিং ফরেস্ট/ইন্ডিয়া’জ ওয়ার ইন বস্তার’-এ আপনি লিখেছেন, ‘যুদ্ধ আগেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, যদিও আমি তা আগে বুঝতে পারিনি।’ এখানে যুদ্ধ বলতে আপনি রাষ্ট্র বনাম মাওবাদীদের যুদ্ধের কথাই বলেছেন?

উত্তর: হ্যাঁ, ছত্তীসগঢ়, বস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধ বলতে আপাতদৃষ্টিতে মাওবাদী বনাম রাষ্ট্রই বোঝায়। এই যুদ্ধ, কম্বিং অপারেশন শুরু হয়েছিল সেই আশির দশক থেকে। তবে যুদ্ধটা এখন আর শুধু মাওবাদী ও রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাওবাদীদের প্রতি রাষ্ট্রের দমননীতি এখন কেবলমাত্র বস্তারের আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

প্রশ্ন: কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তো ‘স্পেশাল পুলিশ অফিসারস ইন অ্যান্টি নকশাল অপারেশন’ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।

উত্তর: হ্যাঁ, সুপ্রিম কোর্ট ব্যান করেছে। কিন্তু ছত্তীসগঢ় সরকার ক্রমাগত সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অমান্য করে চলেছে। এই আদেশের ফলস্বরূপ তারা ‘স্পেশাল পুলিশ অফিসারস’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আর্মড অক্সিলারি ফোর্সেস’ রেখেছে। সুপ্রিম কোর্ট যেখানে নিরস্ত্রীকরণের নীতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেখানে রাজ্য সরকার ক্রমাগত এই আর্মড অক্সিলারি ফোর্সকে আরও বেশি করে বন্দুক ও টাকার যোগান দিয়ে চলেছে।

প্রশ্ন: সালওয়া জুড়ুম আইনত নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। এর ফলে বস্তারের আদিবাসীরা কি একটু স্বস্তিতে নেই?

উত্তর: দেখুন, সালওয়া জুড়ুম শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৭-এর মধ্যেই টিমাপুরম, মোরপল্লি, টারমেটলা— এই গ্রামগুলি মিলিয়ে প্রায় ৩০০ ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধর্ষণ আর খুনের পরিসংখ্যান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। এর পর ২০০৯–এ অপারেশন গ্রিন হান্ট শুরুর পর থেকে আদিবাসীরা আরও চরম দুর্দশার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে থাকে। কত গ্রাম যে ‘নেই’ হয়ে গিয়েছে তার হিসেব রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে পাবেন না। ২০১১-তে সালওয়া জুড়ুম নিষিদ্ধ হয়। সেই বছরই জুলাই মাসে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে একটা অভিযানে বস্তারের প্রায় চারটি গ্রামই একেবারে ‘নেই’ হয়ে যায়।

প্রশ্ন: ২০১১-র পর চিত্রটা কি কিছুটা বদলেছে?

উত্তর: সালওয়া জুড়ুম আইনত বন্ধ হলেও আদিবাসীরা কোন স্বস্তি পায়নি। সালওয়া জুড়ুম-এর রূপ পরিবর্তন হয়েছে। পুলিশ ও কিছু রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী মিলে মাওবাদী দমনের জন্য কয়েকটা ফোরাম তৈরি করেছে। এগুলো হল অগ্নি, সামাজিক একতা মঞ্চ ইত্যাদি। এরা মাওবাদী দমনের নামে আদিবাসীদের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ আর ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া তো এখানে প্রতি দিনের ঘটনা। যে আদিবাসী মেয়েটা সকালে মহুয়া কুড়োতে যাচ্ছে, দুপুরে তার রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যাচ্ছে। খাঁকি পোশাক পরা সেই মৃতদেহ দেখিয়ে একদল উল্লাস করে বলছে, গেরিলা স্কোয়াডের কমান্ডার পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে নিহত হয়েছে। আবার পুলিশের সমর্থনে থাকা গ্রামবাসীরাও মাওবাদীদের অত্যাচারের শিকার হচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনার বইতে পরিসংখ্যানগত তথ্য ও গ্রামবাসীদের উপর হওয়া অত্যাচারের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে কি আপনার মনে হয় বস্তারের কথা সারা দেশে ও বিশ্বের দরবারে পৌঁছবে? বিচার পাবে অত্যাচারিত গ্রামবাসীরা?

উত্তর: আশা রাখছি। মানুষের কাছে পৌঁছে যাক এই আর্তকাহিনি। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, কল্যাণকামী রাষ্ট্র এগিয়ে আসুক। নৃতাত্ত্বিক ভাবে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল ও তার ভূমিপুত্রেরা বিচার পাক। তাদের নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হোক।

প্রশ্ন: আপনি প্রথম কবে বস্তারে এসেছিলেন?

উত্তর: আমি তখন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে অ্যানথ্রোপলজিতে পিএইচডি করছিলাম। আমার বিষয় ছিল: সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ অ্যান্ড কলোনিয়াল রিবেল। ১৯৯০ সালে আমি যখন এই অঞ্চল সম্বন্ধে পড়াশোনা করছিলাম সেই সময়ে আমার ধারণা ছিল, এখানে এই ধরনের কোনও লড়াই শুরু হয়নি। আমার এক সাংবাদিক বন্ধু মহম্মদ ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী কলা আমাকে এখানে আসতে অনুরোধ করে। ইকবাল আর কলার গল্পও কিছুটা সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। নাগপুরের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইকবাল বস্তারের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ও এক আদিবাসী মেয়ের প্রেমে পড়ে এখানেই সারাজীবন থেকে যায়। ইকবাল ও কলার এই পথ চলা মোটেই মসৃণ ছিল না। যাই হোক, আমি ওদের আমন্ত্রণেই প্রথম এখানে আসি ১৯৯০-তে। এরপর এই অঞ্চলের মানুষ, এখানকার জল-জঙ্গল, সব কিছুর সঙ্গেই কেমন একটা একাত্মতা অনুভব করতে থাকি। আর তখন থেকেই এখানে যাওয়া-আসা।

প্রশ্ন: ১৯৯০-এর বস্তার আর এখন এই ২০১৬-এ কি লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়েছে? শিল্পের কারণে কিছুটা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তো হয়েছেই। যেমন, সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। এর ফলে আদিবাসী জনজীবনে উন্নয়নের কিছুটা প্রভাব কি পড়েছে বলে আপনার মনে হয়?

উত্তর: আমার মনে হয়, বস্তার আরও পিছনের দিকে হেঁটে গিয়েছে। শুধু রাস্তা তৈরি হলেই তো আর জনজীবনের উন্নয়ন হয়েছে এমনটা বলা যায় না। আগে আদিবাসীদের হাট বসত। মানুষ মনের আনন্দে বেচাকেনা করত। এখন মানুষ সবসময়ে ভয়ে থাকে। তাদের তো দু’দিক থেকেই ভয়। যখন-তখন মাওবাদীরা পুলিশের চর সন্দেহে মেরে দিতে পারে। আর পুলিশি অত্যাচারের কাহিনি তো অবর্ণনীয়। আদিবাসী সুরক্ষার নামে বস্তারের প্রতি ২-৫ কিমির ভিতর বসেছে সিআরপিএফ-বিএসএফ-আইটিবিপি ক্যাম্প। এরা সারা ক্ষণ গ্রামবাসীদের উপর নজরদারি চালায়। মেয়েদের সুরক্ষা আরও অনিশ্চিত হয়েছে। যখন-তখন ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে। এদের অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। মেয়েদের স্কুলের কাছে ক্যাম্প বসলে ভয়ে মেয়েরা স্কুলে যেতে চাইছে না। স্কুল থেকে টেনে এনে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এতে কি আপনার মনে হয় উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও বস্তারের প্রত্যন্ত গ্রামে, জঙ্গলে আদিবাসীদের কাছে পৌঁছেছে?

সূত্রঃ http://www.anandabazar.com/national/oppression-and-injustice-dragging-bastar-backwards-nandini-sundar-dgtl-1.526764#


সংগঠন বাড়াতে শীর্ষনেতা গণপতির চিঠি‌

main-qimg-4ccdaf7940052d8dad7fba38d0091e4d-c

গ্রামে ছড়িয়ে পড়ুন। এবার সরাসরি সংগঠনকে মজবুত করার লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য মাঠে নামছে মাওবাদীরা। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কাজকর্ম থেকে কিছুটা আড়ালে থাকা যে আসলে কৌশল, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে প্রচার করা এক বার্তায়। এই মুহূর্তে ২৫ লক্ষ টাকা যাঁর মাথার দাম ঘোষণা করেছে ভারত সরকার‌, দলের সাধারণ সম্পাদক খোদ গণপতি এই বার্তা প্রচার করছেন। গোয়েন্দাদের কাছে সেই বার্তা এসে পৌঁছেছে। স্বভাবতই রাজ্যে রাজ্যে মাওবাদী প্রভাবিত অঞ্চলগুলিতে শুরু হয়েছে তল্লাশি। হঠাৎ শীর্ষনেতা গণপতির (‌মুপাল্লা লক্ষ্মণ রাও)‌ এই বার্তা যে নিছক কাগুজে প্রচার নয়, মানছেন গোয়েন্দাকর্তারা। তাঁদের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজ্যে যৌথবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে একসময় বহু শীর্ষনেতা থেকে শুরু করে কমান্ডার, স্কোয়াড নেতা, সমর্থক, সহমর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে গত ৫ বছরের কোনও ঘটনা না ঘটলেও মাওবাদীদের অস্তিত্ব মুছে গেছে এমন ধারণা যুক্তিযুক্ত নয়। পরিস্থিতির বিচারে বহু স্কোয়াড নেতা ও কর্মী অন্যান্য রাজ্যে আত্মগোপন করেছিলেন। এমনকী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগও বন্ধ ছিল। কিন্তু পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ড, বিহার, ছত্তিশগড়ে কাজকর্ম কমবেশি চালু ছিল। সম্প্রতি বিহারে নাশকতার মধ্য দিয়ে গোয়েন্দাদের একটি স্পষ্ট ছবি চোখে পড়ছে, তা হল নতুন করে সংগঠন সাজানোর কাজ তলায় তলায় জোরকদমে শুরু হয়ে গেছে। তার পরেই গণপতির এই বার্তা অর্থহীন নয়। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, পিপলস্‌ লিবারেশন গেরিলা আর্মি (‌পিএলজিএ)‌ রেভলিউশনারি পিপলস্‌ কমিটিজ (‌আরসিপিএস )‌ এবং রেভলিউশনারি মাস অর্গানাইজেশন (‌এমওএস)‌–‌গুলিকে চাঙ্গা করতে হবে। বার্তায় বলা হয়েছে, শহর অঞ্চলগুলিতে বিভিন্ন প্রকাশ্য সংগঠন গড়ে কাজ বাড়াতে হবে, জনসংযোগ বাড়াতে হবে। গণ‌সংগঠনের নেতৃত্বকে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হবে। ইস্যুভিত্তিক সাংগঠনিক প্রচার। এ ছাড়াও বলা হয়েছে, সুবিধেবাদী বামপন্থী কোনও দলের সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে প্রকৃত শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। এই মুহূর্তে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকজন আত্মগোপন করে আছেন। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজ্যের সম্পাদকরা যে বার্তা প্রচার করতেন লিখিতভাবে, তা আপাতত বন্ধ। কিন্তু গণপতির স্বাক্ষর করা এই বার্তায় গোয়েন্দারা ইতিমধ্যেই খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন। চিঠিতে গণপতি জানিয়েছেন, শত্রুপক্ষ এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই বিচিত্র ধরনের বাধার সৃষ্টি করবেই। তা প্রতিহত করতে হবে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চল ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলেও সংগঠনকে জোরদার করার কাজ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দারা চিন্তিত, চিঠিতে বলা হয়েছে যে অঞ্চলগুলিতে দখল রয়েছে, সেখানে প্রতিহত করার সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে হবে এবং গোপন বৈঠক যাতে কোনওভাবেই ব্যাহত না হয়, শত্রুপক্ষ চেষ্টা করলেও তা প্রতিহত করতে হবে। দলের বিভিন্ন অংশকে সহজভাবে প্রচারমূলক পত্রিকা ও লিফলেট ছাপানোর জন্য উদ্যোগী হতে হবে। এই বার্তা গোয়েন্দাদের হাতে আসার পরেই নজরদারি শুরু করেছেন। পরিচিত মুখ এবং পলাতক মাওবাদীদের যে তালিকা রয়েছে, সেগুলি ধরে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি চিন্তার, তা হল— দেশের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (‌এন আই এ)‌ গণপতির মাথার দাম ঘোষণা করলেও তাঁর বা অন্য শীর্ষনেতাদের অবস্থান কোথায়, তা এখনও খুঁজে পায়নি। মাথার দামের টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে শীর্ষনেতাদের সহজে ধরা যাবে, তা বোধহয় খুব সহজ নয়। ‌‌‌

 

সূত্রঃ http://www.aajkaal.in/enewspaper/bistaritakhabar/3/10185


ফিদেল ক্যাস্ট্রোর উপর একটি মূল্যায়ন- বিপ্লবী শ্রমিক এবং বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন

fidel-castro-ruz

কিউবার একনায়ক ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও তাঁর রাজনীতিঃ

কিউবা প্রজাতন্ত্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক হিসেবে পরিচিত ফিদেল ক্যাস্ট্রো গত ২৬ নভেম্বর শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন। বিশ্বজুড়েই ক্যাস্ত্রো ছিলেন জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ল্যাটিন আমেরিকার বিশাল দ্বীপদেশ কিউবার এই মানুষটির জনপ্রিয়তার মূল কারণ হচ্ছে সারা দুনিয়ার পয়লা নম্বরের শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান, সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি ও সশস্ত্র সংগ্রাম। বিপ্লবপূর্ব কিউবা ছিল সাম্রাজ্যবাদী সামন্তবাদী শাসন-শোষণ-লুন্ঠনের এক অভায়ারণ্য। মার্কিন মদদপুষ্ট সামরিক জান্তা বাতিস্তার প্রতি জনরোষ ছিল তীব্র। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য রাষ্ট্রের মত কিউবার জনগণের মধ্যে ছিল জাতীয় মুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী চেতনা এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি গভীর আগ্রহ। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন পদলেহী বাতিস্তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্যাস্ট্রোর অনমনীয় লড়াকু সংগ্রাম তাকে জাতীয় বীর হিসেবে কিউবান জনমনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। নিঃস্বার্থ, নির্লোভ, সৎ মনোভাবাপন্ন ক্যাস্ট্রোর শাসনামলে নানাবিধ গণমুখী সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কারণে অন্য বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলো থেকে কিউবাকে স্বতন্ত্রতা দিয়েছিল। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব ও বিশ্বরাজনীতির নানা পট পরিবর্তনের ফলে মার্কিনের নাকের ডগায় থেকেও মার্কিন বিরোধী ক্যাস্ট্রো একটানা ৫০ বছর কিউবার নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন।

৯০ বছর বয়সী ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদে বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক ও খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গ শোক প্রকাশ করেছেন। বুর্জোয়া বিশ্ব মিডিয়াও বেশ গুরুত্ব সহকারে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও তাঁর জীবননাশে মার্কিনের ষড়যন্ত্র-চক্রন্তের কথা কোন রাখঢাক ছাড়াই জোরেশোরে প্রচার করছে। ব্যক্তি ফিদেলকে নায়ক বানাতে তারাও উঠেপড়ে লেগেছে, যেন ইতিহাসের নায়ক জনগণ নয় ব্যক্তি। কিউবানদের কাছে ক্যাস্ট্রোর এ জনপ্রিয়তা গড়ে ওঠে মূলতঃ ১৯৫৯ সালে এক অভ্যুত্থানে মার্কিনীদের আস্থাভাজন দূর্নীতিপরায়ন বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটানোর মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা দখলের পর ফিদেল যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলেও তাঁর জাতীয়তাবাদী ভাবমানসের কারণে তিনি মার্কিন সরকারের আস্থাভাজন হতে ব্যর্থ হন। এরই মধ্যে ’৬০-এর দশকে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া খোলামেলাভাবে সমাজতন্ত্রের খোলসে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে হাজির হয়। মার্কিনের সাথে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারন করে। মার্কিনকে রুখতে ক্যাস্ট্রো সেই সময় সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতক সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভ চক্রের সাথে হাত মেলায়।
গত পাঁচ দশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান এবং কিউবাতে বিশেষতঃ কৃষি, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বেশকিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ তাকে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে। তাছাড়া স্নায়ু যুদ্ধকালে মার্কিনীদের হাজারো আস্ফালন, পারমাণবিক বোমার ভীতি, অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও ক্যাস্ট্রোর লৌহদৃঢ় মনোভাব তাকে একজন জাতীয় বীর হিসেবেই বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু মার্কিন বিরোধী ছিলেন বলেই তাঁকে সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী বিরোধী মূল্যায়ন করা যায় না, কমিউনিস্ট তো আরও পরের কথা। কার্যতঃ মাও মৃত্যু পরবর্তী চীন পুঁজিবাদী লাইন গ্রহন করার মধ্য দিয়ে আজকের পৃথিবীতে আর কোথাও কোন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নেই। বুর্জোয়াদের তৈরি রাষ্ট্রে ব্যক্তিমালিকানা টিকিয়ে রেখে কিছু সংস্কার বা উন্নয়ন মূলক কার্যকলাপকে আধুনিক জামানার ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভদের উত্তরসূরীরা সমাজতন্ত্র বলে চালাতে চায়। কার্যতঃ কিউবা কমিউনিস্ট পার্টির ছদ্মাবরনে সমাজতন্ত্রের নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। এক সময়ের রুশ সাম্রাজ্যবাদের ফেরিওয়ালা সংসদীয় গণতন্ত্রী বামরা আজ ক্যাস্ট্রোকেও মহান কমিউনিস্ট হিসেবে মূল্যায়ন করে। এসব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের কাছে শেখ মুজিবও সমাজতন্ত্রী ছিল। ক্যাস্ট্রোও এই রাজনৈতিক চেতনা থেকে মুক্ত ছিলেন না। আর তাই বাংলাদেশ সৃষ্টির পর শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাতকালে ক্যাস্ট্রো শেখ মুজিবকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করেছিলেন। যখন কিনা শেখ মুজিব তার নিজ দেশে হাজার হাজার কমিউনিস্ট বিপ্লবী, বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তি নিধনে বর্বরোচিত এক হোলি খেলায় মেতেছিল। এসব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা সংশোধনবাদের ভিতরেই বিপ্লব খুঁজে পায় আর প্রকৃত বিপ্লবকে তারা হঠকারী বলে বিষেদগার করে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি কিউবা বিপ্লবকালীন সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রের সাথে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার দ্বন্দ্বটি ছিল একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। ৬০-এর দশকে সেই সময়েই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে তীব্র মতাদর্শিক সংগ্রাম অর্থাৎ সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বিভক্ত করেছিল। সমাজতন্ত্রের পিতৃভূমি বলে পরিচিত লেনিন-স্ট্যালিনের রাশিয়া ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ চক্র সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ায় (সোভিয়েত ইউনিয়ন) পরিণত করেছিল। কমিউনিস্ট হিসেবে দাবীদার যে কেউ আন্তর্জাতিক এ মহাবিতর্ককে এড়িয়ে যেতে পারেনা। এ প্রশ্নে সঠিক অবস্থানের উপরই নির্ভর করে কে কমিউনিস্ট আর কে নয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনে ব্যক্তিগত সততা, ত্যাগ, আপোষহীনতা, লড়াকু মনোভাবের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সেটাই সব নয়, মূলগতভাবে নির্ভর করে মতাদর্শগত রাজনৈতিক লাইনের সঠিকতা বেঠিকতর উপর। সমাজ বিপ্লবের অগ্রসর বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে কার্যত: কমিউনিস্ট বিপ্লবী থাকা যায় না। পুঁজিবাদীযুগে মার্কসবাদকে অস্বীকার করে যেমন সমাজতন্ত্রী থাকা যায় না, সাম্রাজ্যবাদের যুগে লেনিনবাদকে না মানার অর্থ হল মার্কসবাদকেই খারিজ করা। তেমনি বর্তমানে মার্কসবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ মাওবাদকে (মা. লে. মা) স্বীকৃতি না দিলে বা অনুশীলন না করলে কমিউনিস্ট বিপ্লবী হওয়া যায় না। মতাদর্শের এই উপলব্ধির দুর্বলতাই অনেক আন্তরিক বিপ্লবীদেরকে দিকভ্রান্ত করে। সর্বহারা শ্রেণির মহান শিক্ষাগুরু মার্কস-লেনিন-মাও বিপ্লবী আন্দোলনে মতাদর্শ-লাইনগত দিককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। কমিউনিজমের এই বিজ্ঞানের আলোকে ইতিহাস, সময় ও ব্যক্তির মূল্যায়ন করতে হবে। ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষনের উপরই আগামী দিনের কমিউনিস্ট আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করে। অন্যথায় বিপ্লব ও সংস্কারবাদকে গুলিয়ে ফেলা হবে। ক্যাস্ট্রো সমাজতন্ত্রের নামে পার্টি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় একনায়কত্ব প্রয়োগ করলেও তিনি সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের বিজ্ঞান দ্বারা কখনো পরিচালিত হননি।

সূত্রঃ  https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=1815053465402099&id=1688800484694065Top of Form


চুয়াডাঙ্গায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য গ্রেফতার

chuadanga_map

চুয়াডাঙ্গায় একটি বিদেশি পিস্তলসহ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ বাজার এলাকা থেকে বোরহান উদ্দিন নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তার বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার বরিশখালী গ্রামে।

র‌্যাব-৬ এর ঝিনাইদহ ক্যাম্প কমান্ডার মেজর মনির আহমেদ বলেন, বোরহান উদ্দিন কোনো অপরাধ ঘটানোর জন্য সরোজগঞ্জ বাজার এলকায় অবস্থান করছেন খবর পেয়ে র‌্যাবের একটি টহল দল সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক  করে।

“তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচটি গুলি ও একটি ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়।”

তিনি চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য। অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত বলে র‌্যাব কর্মকর্তা জানান।

সূত্রঃ http://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/article1250379.bdnews

 


পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (মাওবাদী বলশেভিক রিঅর্গানাইজেশন মুভমেন্ট- MBRM) এর সংগঠক গ্রেফতার

7977_n

রাজবাড়ীতে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (মাওবাদী বলশেভিক রিঅর্গানাইজেশন মুভমেন্ট- MBRM) এর সংগঠক ইদ্রিস ব্যাপারী ওরফে ল্যাংড়া ইদ্রিসকে (৫৫) গ্রেফতার করেছে রাজবাড়ী ডিবি পুলিশ। তিনি জেলা সদরের পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের নবগ্রামের ফজেল ব্যাপারীর ছেলে।

গত মঙ্গলবার উপজেলার কুটি পাঁচুরিয়া এলাকা থেকে ডিবির ওসি ওবাইদুর রহমানের নেতৃত্বে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, ইদ্রিস ব্যাপারী ওরফে ল্যাংড়া ইদ্রিস চরমপন্থী এমবিআরএমের রাজবাড়ীর সংগঠক। তার বিরুদ্ধে রাজবাড়ী থানায় দু’টি হত্যা মামলাসহ তিনটি মামলা রয়েছে।

সূত্রঃ  https://rajbaribarta.com/2312

 


সিরাজ সিকদার রচনাঃ পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনের থিসিস

photo_of_siraj_sikder

 

পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন কর্তৃক রচনা ও প্রকাশ ৮ জানুয়ারি ১৯৬৮

পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন কর্তৃক পুনর্লিখিত পরিবর্ধিত পুনঃপ্রকাশ ১ ডিসেম্বর ১৯৬৮

কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বহারা পথ (www.sarbaharapath.com) এর অনলাইন প্রকাশনা ১৭ অক্টোবর ২০১২

ভূমিকা

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা আমরা কিভাবে প্রয়োগ করবো, আমাদের দেশের বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে? মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা হবে ‘তীর’ যা আমাদের নিক্ষেপ করতে হবে পূর্ববাংলার বিপ্লবকে লক্ষ্য করে। যারা আজ লক্ষ্যহীনভাবে তীর ছোঁড়েন, এলোপাথারী তীর ছোঁড়েন, তারা সহজেই বিপ্লবের ক্ষতি করতে পারেন। মার্কসবাদী নামধারী বহু ব্যক্তিই ‘এলোপাথারী’ তীর ছুড়ে সুবিধাবাদী ও প্রতিবিপ্লবী ভূমিকা পালন করছেন।

সভাপতি মাওসেতুঙ বলেছেন, অতীতের ভুলগুলো অবশ্যই প্রকাশ করে দিতে হবে। অতীতের খারাপ বস্তুকে বৈজ্ঞানিক মনোভাব দিয়ে বিশ্লেষণ করা ও সমালোচনা করা প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতের কাজ আরো সতর্কভাবে সম্পন্ন করা যায়। এটাই হচ্ছে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতের ভুল এড়ানোর অর্থ।

প্রাক স্বাধীনতাকালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি কেন ব্যর্থ হলো উপনিবেশবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব গ্রহণ করতে এবং উপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে?

স্বাধীনতা উত্তরকালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি কেন ব্যর্থ হলো উপনিবেশবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম পরিচালনা করে সমাজতন্ত্রের পথ তৈরি করতে? এ ব্যর্থতার কারণগুলো ক্ষমাহীন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে উদঘাটন করতে হবে। যাতে একই ভুল ভবিষ্যতে না হয় এবং মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তানুসারীরা সক্ষম হন তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে।

সারা দুনিয়ার সর্বহারা এক হও!

প্রাকস্বাধীনতা কাল

বৃটিশ শাসনামালে ভারতের সামাজিক বিকাশের জন্য নিন্মলিখিত মূল দ্বন্দ্বগুলো দায়ী ছিলঃ

১। ভারতীয় জনগণের সাথে বৃটিশ উপনিবেশবাদের জাতীয় দ্বন্দ্ব।

২। ভারতের বিশাল কৃষক জনগণের সাথে সামন্তবাদের দ্বন্দ্ব।

৩। ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব।

৪। ভারতের মুসলিম বুর্জোয়া, সামন্তগোষ্ঠী ও শ্রমিক-কৃষকের সাথে অমুসলিম বিশেষতঃ হিন্দু বুর্জোয়া, সামন্তগোষ্ঠী ও শ্রমিক-কৃষকের সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব।

ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণী (মুসলিম ও অমুসলিম বুর্জোয়া) নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থেই সর্বপ্রথম স্বাধীনতার দাবী করে। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাথমিক অবস্থায় ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম বিকশিত মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্ত গোষ্ঠী অখণ্ড স্বাধীন ভারতে অপেক্ষাকৃত বিপুলভাবে বিকশিত অমুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তগোষ্ঠী কর্তৃক বিলূপ্তির সম্ভাবনা দেখতে পায়। তারা নিজেদের বিকাশের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা দাবী করে। এভাবে শ্রেণীস্বার্থ তাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে তীব্রতর  করে তোলে। একটা পর্যায়ে এ দ্বন্দ্ব বৈরী রূপ নেয় এবং মুসলিম

বুর্জোয়া ও সামন্তগোষ্ঠী নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার জন্য মুসলিম লীগ গঠন করে এবং নিজেদের অবাধ বিকাশের জন্য পৃথক স্বাধীন ভূখন্ড পাকিস্তানের দাবী করে।

মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তগোষ্ঠী তাদের দাবীর পিছনে মুসলিম শ্রমিক-কৃষকদের সংঘবদ্ধ করার জন্য অবৈরি সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের সুযোগ নেয় এবং তাদের মাঝে জঘন্য সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র চালায়। অমুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তগোষ্ঠী অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার মানসে এবং ভারতের মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তগোষ্ঠীর পাকিস্তান আন্দোলন নস্যাত করার জন্য অমুসলিম শ্রমিক-কৃষকদের মাঝে জঘন্য সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র চালায় যাতে তারা অমুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়।

বৃটিশ উপনিবেশবাদীরাও ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত করে নিজেদের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র চালায়।

এ সকল কারণে বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দেয় এবং অবৈরী সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব বৈরী রূপ নেয়। শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণী ধর্মের ভিত্তিতে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের পিছনে ঐক্যবদ্ধ হয়।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দ্বিধাবিভক্তিতে বৃটিশ উপনিবেশবাদীদের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখার সুবিধা হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবী দেশপ্রেমিকদের অংশগ্রহণ এবং শ্রমিক-কৃষকদের চেতনার বিকাশ উপনিবেশবাদীদের বাধ্য করে তাদের সমর্থক ও সহযোগী বুর্জোয়া শ্রেণীর (মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস) নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে, যাতে তারা এ নয়া শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে এ উপমহাদেশকে আধা উপনিবেশে পরিণত করতে সক্ষম হয়। এভাবেই পাকিস্তান ও ভারতের সৃষ্টি হয়।

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অবিভক্ত ভারতকে মুক্ত করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ

প্রাক স্বাধীনতাকালে ভারতের সামাজিক অবস্থা ছিল উপনিবেশিক, সামন্তবাদী ও আধাসামন্তবাদী। উপনিবেশিক শক্তি সামন্তবাদকে জীবিত রেখে সামন্ত শ্রেণীর মাধ্যমে বিশাল কৃষকশ্রেণীকে শোষণ ও নিপীড়ন করতো। কাজেই উপনিবেশবাদ বিরোধী জাতীয় বিপ্লব এবং সামন্তবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লব অর্থাৎ জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব হওয়া উচিত ছিল এদেশের বিপ্লবের চরিত্র। এ জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব বুর্জোয়া শ্রেণী সম্পন্ন করতে অক্ষম। কাজেই ঐতিহাসিকভাবে সর্বহারা শ্রেণী ও তার পার্টির দায়িত্ব এ বিপ্লব সম্পন্ন করা। কাজেই এ বিপ্লব হওয়া উচিত ছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অথবা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, যার লক্ষ্য সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম। বিশ্ব বিপ্লবের ইহা একটি অংশ।

এ নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা ও সম্পন্ন করার জন্য সর্বহারা শ্রেণীর পার্টির নিম্নলিখিত শর্ত পালনের প্রয়োজন ছিলঃ

ক) সুশৃংখলিত, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বে সুসজ্জিত, আত্মসমালোচনার পদ্ধতি প্রয়োগকারী ও জনগণের সাথে সংযুক্ত এমন একটি পার্টি;

খ) এমন একটি পার্টির নেতৃত্বাধীন একটি সৈন্যবাহিনী;

গ) এমন একটি পার্টির নেতৃত্বে সমস্ত বিপ্লবী শ্রেণী ও বিপ্লবী দলের একটি যুক্তফ্রন্ট।

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি উপরোক্ত শর্ত পালনে ব্যর্থ হয়। ফলে বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা জাতীয় সংগ্রামের নেতৃত্ব গ্রহণ করে, নিজেদের শ্রেণীস্বার্থে অবৈরী সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে ধমের্র ভিত্তিতে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীকে নিজেদের পিছনে ঐক্যবদ্ধ করে এবং ভারতকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।

সভাপতি মাওসেতুঙ বলেছেন, বিপ্লবী পার্টি হচ্ছে জনসাধারণের পথ প্রদর্শক; বিপ্লবী পার্টি যখন তাদেরকে ভ্রান্ত পথে চালিত করে তখন কোন বিপ্লবই সার্থক হতে পারে না।

স্বাধীনতা উত্তর কাল

পূর্ববাংলার সামাজিক বিকাশের জন্য নিম্নলিখিত মূল দ্বন্দ্বগুলো বিদ্যমানঃ

১। পূর্ববাংলার জনগণের সাথে পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের জাতীয় দ্বন্দ্ব;

২। পূর্ববাংলার বিশাল কৃষক জনতার সাথে সামন্তবাদের দ্বন্দ্ব;

৩। পূর্ববাংলার জনগণের সাথে

ক) সাম্রাজ্যবাদ বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের;

খ) সংশোধনবাদ বিশেষতঃ সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের,

গ) ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের জাতীয় দ্বন্দ্ব;

৪। পূর্ববাংলার বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব।

দ্বন্দ্বসমূহের বিশ্লেষণ

প্রথমঃ পূর্ববাংলার জনগণের সাথে পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের জাতীয় দ্বন্দ্বঃ

মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তবাদের মাঝে পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, দিল্লী, লক্ষ্ণৌ, বোম্বাই প্রভৃতি স্থানের বৃটিশ সমর্থক বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা, বাঙালী বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীদের (যারা খুবই সংখ্যাল্প) চেয়ে বহুগুণ বিকশিত থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব কুক্ষিগত করে।

পূর্ববাংলার হিন্দু বুর্জোয়া শ্রেণী ও সামন্তবাদীরা মুসলিম বুর্জোয়া, সামন্তবাদী, কৃষক-শ্রমিকের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও ধর্মীয় নিপীড়ন চালাতো। বঙ্গভঙ্গ আইনের মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববাংলা একটি আলাদা প্রদেশ হলে অর্থনৈতিক শোষণ ও ধর্মীয় নিপীড়নের কিছুটা লাঘব হবে জেনে বাঙালী মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা তা সমর্থন করে। কিন্তু নিজ বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হবে বলে হিন্দু বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা এ বিভাগের বিরোধিতা করে; ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। কাজেই মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্ত শ্রেণীর বিকাশের দুটি বাঁধা ছিল, একটি হলো বৃটিশ উপনিবেশবাদ আর একটি হিন্দু বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ধর্মীয় নিপীড়ন। কাজেই স্বাধীনতা আন্দোলন কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত না হওয়ায় পূর্ববাংলার সৃষ্টি ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজন ছিল।

পূর্ববাংলার বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা পাকিস্তানের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেণী বিকাশ ঘটাতে সক্ষম মনে করে পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করে এবং মুসলিম শ্রমিক-কৃষকদের পাকিস্তান দাবীর পিছনে ঐক্যবদ্ধ করে। তারা পাকিস্তানে যোগ দেয় এবং এভাবে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের প্রদেশে পরিণত হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব অবাঙ্গালী বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীদের হাতে থাকায় বৃটিশ উপনিবেশবাদীরা রাষ্ট্র ক্ষমতা তাদের নিকট হস্তান্তর করে। কেন্দ্রীয় রাজধানী করাচীতে স্থাপন, বৃটিশ উপনিবেশবাদের সামরিক আমলা দ্বারা রাষ্ট্রযন্ত্রের উপাদান সশস্ত্র বাহিনী গঠন এবং বেসামরিক আমলা দ্বারা রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য অংশ চালু করা (এই সকল সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের অধিকাংশই বৃটিশ উপনিবেশবাদ সমর্থক অবাঙালী ছিল) প্রভৃতির মাধ্যমে এই অবাঙালী বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের একচ্ছত্র মালিকানা লাভ করে এবং নিজেদের শ্রেণী বিকাশের অবাধ সুযোগ পায়।

এ শাসক শ্রেণী পূর্ববাংলার স্বতন্ত্র জাতীয় ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য স্বায়ত্বশাসন কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রদানের পরিবর্তে একে অবাধ শোষণের জন্য প্রথম থেকেই প্রচেষ্টা চালিয়ে আসে। এ শাসকশ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতার মাধ্যমে পূর্ববাংলার পাট, চা, চামড়া প্রভৃতির অর্থ দ্বারা বিকাশ লাভ করে এবং এ বিকাশ ত্বরান্বিত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদ বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সিয়াটো, সেন্টো প্রভৃতি সামরিক চুক্তি ও বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক চুক্তি সম্পাদন করে। এভাবে পাকিস্তান আধা উপনিবেশে পরিণত হয়। সম্প্রতি এ শাসক শ্রেণী সংশোধনবাদ বিশেষতঃ সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে নানা প্রকার অর্থনৈতিক চুক্তি সম্পাদন করেছে।

পূর্ববাংলার পাট, চা, চামড়া, কাগজ প্রভৃতির অর্থ দ্বারা, সস্তা শ্রম শক্তি দ্বারা, প্রায় সাত কোটি মানুষের বাজার এবং সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্যে পাকিস্তানী বুর্জোয়া শ্রেণী একচেটিয়া পুঁজিপতিতে পরিণত হয়। তারা পূর্ববাংলাকে শাসন ও শোষণের একটি স্থায়ী ক্ষেত্রে পরিণত করে।

পূর্ববাংলাকে শাসন ও শোষণের একটি বিরাট বাঁধা হলো তার স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বা এবং ভাষা এ স্বাতন্ত্র্যের প্রধান উপাদান। জাতি হিসেবে পূর্ববাংলার স্বাতন্ত্র্য মুছে দেয়ার জন্য এ পাকিস্তানী শাসকশ্রেণী বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা প্রচলনের হীন প্রচেষ্টা চালায়। এ হীন প্রচেষ্টাকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়। বর্তমানেও এ শাসক শ্রেণী বাংলা ভাষা পরিবর্তনের হীন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

এ পাকিস্তানী বুর্জোয়া ও সামন্তবাদী শ্রেণীর বিকাশের জন্য ক্রমশঃ পূর্ববাংলার সম্পদ, সস্তা শ্রমশক্তি ও প্রায় সাত কোটি মানুষের বাজার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এভাবে বৃটিশ উপনিবেশবাদের প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হিসাবে কিছু কালের জন্য আধা উপনিবেশে পরিণত হলেও এখানে প্রথম থেকেই পাকিস্তানী বুর্জোয়া ও সামন্তবাদী শাসকগোষ্ঠীর জাতীয় নিপীড়ন ও শোষণ বিদ্যমান ছিল। এ শাসকশ্রেণী নিজেদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববাংলার ওপর জাতীয় নিপীড়ণ বৃদ্ধি করে এবং তাদের বিকাশ একচেটিয়া রূপ গ্রহণের পর্যায়ে এলে তারা শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য তাদের শাসন ব্যবস্থাকে ক্রমেই অধিকতর সমরবাদী করে এবং এভাবে পূর্ববাংলার ওপর জাতীয় নিপীড়ণ উপনিবেশিক শোষণের রূপ নেয় এবং পূর্ববাংলা পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসকশ্রেণীর উপনিবেশে পরিণত হয়। এ উপনিবেশিক শাসকশ্রেণী নিজেরাই সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের স্বার্থ রক্ষা করছে। এ কারণে পাকিস্তান নিজেই একটি আধা উপনিবেশিক ও আধা সামন্তবাদী দেশ।

এই পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসকশ্রেণী পূর্ববাংলার পাকিস্তানী দালাল বুর্জোয়াদের মাধ্যমে এবং গ্রামে সামন্তবাদকে জীবিত রেখে এদেশে শাসন ও শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এ উপনিবেশিক শোষণের ফলে পূর্ববাংলার মাঝারী ও ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশ ব্যাহত হয়েছে এবং গ্রামে সামন্তবাদী শোষণের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষতঃ বর্তমানে বিদেশী ঋণ পরিশোধের জন্য, বিদেশী ঋণ হ্রাসের ফলে কলকারখানার পুঁজি সংগ্রহের জন্য গ্রাম্য শোষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। কাজেই পূর্ববাংলার শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদে বুর্জোয়া ও মাঝারী বুর্জোয়া শ্রেণীর এক অংশ তথা সমগ্র পূর্ববাংলার জাতি এ শোষণে শোষিত। এ পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসক শ্রেণী অখণ্ড পাকিস্তান, ধর্মের ভিত্তিতে এক জাতি, তথাকথিত ইসলামী সংস্কৃতি, পূর্ববাংলা একটি প্রদেশ প্রভৃতি প্রচারের মাধ্যমে শোষণের উপনিবেশিক চরিত্র গোপন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন উপনিবেশিক শক্তি শোষণের উপনিবেশিক চরিত্র গোপন করার জন্য এক দেশ, এক জাতি প্রভৃতি প্রচারে প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু ইতিহাস তার ব্যর্থতা প্রমাণ করেছে। পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসকশ্রেণীর এই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হতে বাধ্য।

দ্বিতীয়ঃ পূর্ববাংলার বিশাল কৃষক জনতার সাথে সামন্তবাদের দ্বন্দ্বঃ

গ্রামে সরকারী কর্মচারী (পুলিশ, সার্কেল অফিসার), মৌলিক গণতন্ত্রী (বি.ডি), জমিদার, ধনীচাষী, অসৎ ভদ্রলোক (টাউট) ও মাঝারী চাষীর ওপরের স্তর গ্রামের ক্ষেতমজুর, গরীব চাষী ও মাঝারী চাষীর ব্যাপক অংশের ওপর সামন্তবাদী শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানী উপনিবেশিক শ্রেণী গ্রামের সামন্তবাদীদের জিইয়ে রেখেছে এবং তাদের বিকাশের সর্বময় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ শাসকশ্রেণী তাদের বিকাশের নিমিত্তে পুঁজি ও সস্তা শ্রমশক্তি সংগ্রহের জন্য সামন্তবাদী শোষণ তীব্রতর করছে।

গ্রামে সামন্তবাদী শোষণের প্রকাশ হলো ভূমিকর ও অন্যান্য খাজনা বৃদ্ধি, গ্রামে রেশন চালু না করা, বুনিয়াদী গণতন্ত্র সৃষ্টি করা, মৌলিক গণতন্ত্রীদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রদান করা, বর্গা, পত্তনি, ঠিকা ও সুদ ব্যবস্থার অবসান না করা, ঋণ প্রভৃতির মাধ্যমে চাষীদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ না করা, সেচ প্রকল্প কার্যকরী না করা, বিভিন্ন ধরণের ইজারাদারী প্রথা, পোকা ধ্বংসের ব্যবস্থা না করা, অবৈতনিক সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু না করা, বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা প্রভৃতি।

তৃতীয়ঃ ক) পূর্ববাংলার জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদ বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জাতীয় দ্বন্দ্বঃ

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একদিকে পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে পূর্ববাংলার বুর্জোয়াদের এক অংশের সাথে আঁতাত রাখছে এবং এদের মাধ্যমে পাকিস্তানী শাসকশ্রেণীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা পাকিস্তানী উপনিবেশবাদী ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের নিয়ে চীন বিরোধী কমিউনিস্ট বিরোধী ঐক্যজোট গঠনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীরা নিজস্ব শ্রেণী স্বার্থেই ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে বর্তমানে আঁতাত করতে পারছে না এবং নিজেদের শ্রেণী বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে সমাজতান্ত্রিক দেশ বিশেষতঃ চীনের সাথে বন্ধুত্ব করতে বাধ্য হচ্ছে।

অন্যদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পূর্ববাংলার উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের সুযোগ নিয়ে তাদের সমর্থক পূর্ববাংলার বুর্জোয়াদের সাহায্য ও সমর্থন করছে। সাম্রাজ্যবাদ সমর্থক এ দালাল বুর্জোয়ারা উপনিবেশিক শাসন বিরোধী আন্দোলন করছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এ আন্দোলনকে মূলধন করে দুইভাবে ব্যবহার করছে একদিকে পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে চীন বিরোধী পাক-ভারত যৌথ চুক্তি সম্পাদন করার জন্য; অন্যদিকে এই দালাল বুর্জোয়াদের দ্বারা পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করে চীন বিরোধী পূর্ববাংলা-ভারত যৌথ চুক্তি সম্পাদন ও পূর্ববাংলাকে প্রত্যক্ষ মার্কিন উপনিবেশে পরিণত করার জঘন্য ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। বর্তমানে মার্কিন সমর্থক পূর্ববাংলার দালাল বুর্জোয়ারা ছয় দফা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব করছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এদেশের সামন্তবাদীদের স্বার্থরক্ষাকারী ধর্মীয় পার্টিগুলোকে সাহায্য ও সমর্থন করছে। এরা সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র।

খ) পুর্ববাংলার জনগণের সাথে সংশোধনবাদ, বিশেষতঃ সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের জাতীয় দ্বন্দ্বঃ

পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের নিয়ে চীন বিরোধী, কমিউনিস্ট বিরোধী ঐক্যজোট প্রতিষ্ঠার জন্য তারা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম তারা সমর্থন করবে না। কারণ পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের সাথে আঁতাত রেখে পাকিস্তানসহ তার উপনিবেশকে শোষণ করাই তাদের লক্ষ্য। এই জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম নস্যাৎ করার জন্য তারা পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের সাহায্য করবে যাতে পূর্ববাংলাকে শোষণের একটি ভাগ তারা পায়।

প্রসঙ্গক্রমে বায়াফ্রা, বার্মা, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশের কথা উল্লেখযোগ্য। বায়াফ্রার জনগণ সংগ্রাম করছে জাতীয় অত্যাচার, নিপীড়ণের হাত থেকে মুক্তির জন্য। সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীরা নাইজেরীয় সামরিক সরকারকে অস্ত্র, অর্থ ও লোক সরবরাহ করে বায়াফ্রার জনগণের মুক্তি সংগ্রামকে ধ্বংস করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যাতে তারা সমগ্র নাইজেরীয়ায় সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে শোষণ চালাতে পারে। তারা বার্মার মুক্তি সংগ্রামকে দাবিয়ে রাখার, ভিয়েতনামের মহান সংগ্রামকে মুছে দেয়ার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে।

গ) পূর্ববাংলার জনগণের সাথে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের জাতীয় দ্বন্দ্বঃ

ভারতীয় বৃহৎ পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী সরকার সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমর্থন করবে না। কারণ তার উদ্দেশ্য হলো বুর্জোয়ার নেতৃত্বে স্বাধীন পূর্ববাংলাকে শোষণ করা এবং চীন বিরোধী, কমিউনিস্ট বিরোধী একটি মিত্র পাওয়া। কিন্তু সর্বহারার নেতৃত্বে মুক্ত পূর্ববাংলা সহায়ক হবে আসাম, পশ্চিমবাংলা, বিহার, ত্রিপুরা তথা সমগ্র ভারতের শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির। এ কারণে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ শ্রমিক-কৃষকের পূর্ববাংলা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বানচাল করার চেষ্টা করবে।

চতুর্থঃ পূর্ববাংলার বুর্জোয়াদের সাথে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্বঃ

পূর্ববাংলার বুর্জোয়া শ্রেণী শ্রমিকদের শোষণ করে এবং এদের মাঝে একটি অংশ পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের দালাল হয়ে পূর্ববাংলাকে শোষণ করছে, অপর অংশ সাম্রাজ্যবাদ বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। একটি অংশ সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ উভয়েরই বিরোধী, যারা সত্যিকার জাতীয় বুর্জোয়া। পূর্ববাংলার বুর্জোয়াদের প্রথম অংশ দেশদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক। দ্বিতীয়

অংশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল যারা ভারতের সাথে আঁতাত রেখে নিজস্ব শ্রেণী বিকাশের জন্য যতটুকু জাতীয় অধিকার প্রয়োজন তার জন্য সংগ্রাম করতে ইচ্ছুক। পূর্ববাংলার বুর্জোয়াদের ব্যাপক অংশ বর্তমানে এদের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ।  এদের নেতৃত্বে জাতীয় সংগ্রাম কখনো সম্পূর্ণ হতে পারে না। এদের সাথে জনগণের শত্রুতার সম্পর্ক ছাড়াও তারা যতক্ষণ পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করে, ততক্ষণ জনগণের সাথে একটা মিত্রতার সম্পর্কও রয়েছে। বুর্জোয়া শ্রেণীর তৃতীয় অংশ জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথে জনগণের শত্রুতার সম্পর্ক ছাড়াও তারা যতক্ষণ উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম করে ততক্ষণ একটা মিত্রতার সম্পর্কও রয়েছে।

বর্তমানে জাতীয় সংগ্রামের নেতৃত্ব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সমর্থক দালাল বুর্জোয়াদের হাতে। এ নেতৃত্বের অবসান তিন প্রকারে হওয়া সম্ভব। (ক) সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি দৃঢ়ভাবে জাতীয় পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে কৃষক-জনতাকে উপনিবেশবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্ভুদ্ধ করলে; (খ) উপনিবেশিক শক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিকট আত্মসমর্পন করে চীন বিরোধী, কমিউনিস্ট বিরোধী জোট স্থাপন করলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাহায্য ও সমর্থনে দালাল বুর্জোয়াদের জাতীয় সংগ্রাম ধ্বংস করতে সক্ষম হবে; (গ) উপনিবেশিক শাসকশ্রেণী সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়াদের সাথে আপোষে আসলে এই দালাল বুর্জোয়াদের আসল বিশ্বাসঘাতকতা ও গণবিরোধী চরিত্র প্রকাশ পাবে।

প্রধান দ্বন্দ্ব

উপরোক্ত দ্বন্দ্বগুলো ছাড়াও পূর্ববাংলার সমাজে আরো বহু দ্বন্দ্ব রয়েছে, কিন্তু এই চারটি মূল দ্বন্দ্ব। সভাপতি মাও বলেছেন, কোনো প্রক্রিয়াতে যদি কতকগুলো দ্বন্দ্ব থাকে তবে তাদের মধ্যে অবশ্যই একটা প্রধান দ্বন্দ্ব থাকবে যা নেতৃস্থানীয় ও নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণ করবে। অন্যগুলো গৌণ ও অধীনস্ত স্থান নিবে। তাই দুই বা দুয়ের অধিক দ্বন্দ্ব বিশিষ্ট কোন জটিল প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা করতে গেলে আমাদের অবশ্যই তার প্রধান দ্বন্দ্বকে খুঁজে পাবার জন্য সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এই প্রধান দ্বন্দ্বকে খুঁজে পাবার জন্য সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এই প্রধান দ্বন্দ্বকে আঁকড়ে ধরলে সব সমস্যাকেই সহজে মীমাংসা করা যায়।

পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ বিরোধী জাতীয় সংগ্রামে শ্রমিক-কৃষক, ক্ষুদে বুর্জোয়া, মাঝারী বুর্জোয়ার এক অংশ এবং দেশপ্রেমিক ধনী চাষী ও জমিদারদের অর্থাৎ সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব। কাজেই বর্তমান সামাজিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় পূর্ববাংলার জনগণের সাথে পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের জাতীয় দ্বন্দ্ব প্রধান দ্বন্দ্ব।

কিন্তু উপনিবেশবাদ বিরোধী জাতীয় সংগ্রাম একটা নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছলে পাকিস্তানী উপনিবেশিক শ্রেণীকে রক্ষার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েট সামজিক সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ একযোগে অথবা আলাদাভাবে নিজেদের সৈন্য দ্বারা পূর্ববাংলার জনগণের সংগ্রামকে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা চালাবে। এ অবস্থায় পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ গণসংগ্রাম বিরোধী প্রধান ভূমিকা থেকে গৌণ ভূমিকা গ্রহণ করবে। পক্ষান্তরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিংবা সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ অথবা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ পূর্ববাংলার গণবিরোধী সংগ্রামের গৌণ ভূমিকা থেকে ক্রমশঃ মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করবে। এভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিংবা সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ অথবা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের জাতীয় দ্বন্দ্ব প্রধান দ্বন্দ্বে পরিণত হবে। এই প্রধান দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে নতুন করে ঐক্যফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করে জনগণকে সঠিক মুক্তি সংগ্রামের পথে পরিচালিত করতে হবে।

পূর্ববাংলার বিপ্লব ও তার চরিত্র

পূর্ববাংলার বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা নিজেদের বিকাশের জন্য পাকিস্তানে যোগ দেয়। কিন্তু পাকিস্তানী উপনিবেশিক শ্রেণী পূর্ববাংলার বুর্জোয়া বিকাশের জন্য যে সুবিধা প্রয়োজন তা নিজেদের বিকাশে ব্যবহার করে। ফলে এদেশে বুর্জোয়া বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই বুর্জোয়া বিকাশের প্রয়োজনীয় অবস্থার সৃষ্টি অর্থাৎ সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদের অবসান প্রয়োজন।

সামন্তবাদের অবসান সম্ভব গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে এবং উপনিবেশিক শাসনের অবসান সম্ভব জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে। কাজেই পূর্ববাংলার বিপ্লব হবে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব।

বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের যুগে বুর্জোয়ারা এ বিপ্লব সম্পূর্ণ করতে পারে না। নিজেরাই কিছুদিন পরে সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের দালাল হয়ে যায়। এ বিপ্লব সম্পূর্ণ করার মত একটি শক্তিই রয়েছে তা হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণী ও তার পার্টি। সর্বহারার নেতৃত্বে পরিচালিত বিপ্লবের লক্ষ্য ধনতন্ত্র নয়, সমাজতন্ত্র। বিপ্লব সর্বহারার নেতৃত্বে পরিচালিত বলে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে পরিচিত হবে যা বিশ্ব বিপ্লবের একটি অংশ।

এ বিপ্লবের একটি চরিত্র হলো সশস্ত্র বিপ্লব। পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসক শ্রেণীর রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল উপাদান সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও আইন এবং এদের সাহায্যে উপনিবেশিক শাসক শ্রেণী পূর্ববাংলাকে শাসন ও শোষণ করছে। এ নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে হলে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক শ্রেণী ও স্তরকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক শ্রেণী ও স্তরের সমন্বয়ে নয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। সভাপতি মাও-এর ভাষায় বন্দুকের নলের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে হবে।

এ বিপ্লবের আর একটি চরিত্র হলো দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। এ বিপ্লবে দ্রুত বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণগুলো হচ্ছে পূর্ববাংলার শ্রমিক-কৃষক-জনগণের অনৈক্য অবস্থা, সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ও মাওসেতুঙ চিন্তানুসারী পার্টির অভাব, সংশোধনবাদী ও নয়া-সংশোধনবাদী পার্টি কর্তৃক জনগণকে বিপথে পরিচালনা, জনগণের মাঝে প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের প্রভাব।

পক্ষান্তরে উপনিবেশিক শক্তি একত্রিত, শাসনক্ষমতা সুদৃঢ়, বি.ডি. প্রথার মাধ্যমে গ্রাম পর্যন্ত তাদের শাসন ব্যবস্থা বিস্তৃত এবং সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ এবং সম্প্রসারণবাদ তাদের সাহায্য করবে। তাই বর্তমানে শক্তির ভারসাম্য পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের পক্ষে। এ অবস্থা পরিবর্তন করতে সুদীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন; কাজেই পূর্ববাংলার জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব দীর্ঘস্থায়ী দুরূহ যুদ্ধের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।

এ বিপ্লবের আর একটি চরিত্র হলো গ্রাম্য এলাকা দ্বারা শহর ঘেরাও এবং পরে শহর দখল। সভাপতি মাও বলেন, নিয়ম অনুসারে বিপ্লব আরম্ভ হয়, গড়ে ওঠে এবং জয়ী হয় ঐ সকল স্থানে যেখানে প্রতিবিপ্লবী শক্তিগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল। কাজেই গ্রাম্য এলাকায় গিয়ে কৃষকদের গেরিলা যুদ্ধের জন্য জাগ্রত করে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে গ্রাম্য এলাকা দখল করতে এবং ঘাঁটি এলাকা স্থাপন করতে হবে। শহরগুলো দখলকৃত গ্রাম্য এলাকা দ্বারা ঘেরাও করতে হবে এবং পরে শহর দখল করতে হবে।

এ বিপ্লবের আর একটি চরিত্র হলো ঐক্যফ্রন্ট গঠন।

জাতীয় পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে, জাতীয় সংগ্রামের ভিত্তিতে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা অপরিহার্য। [এখানে লিন পিয়াও সংক্রান্ত একটা বক্তব্য ছিল। কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালে প্রথম কেন্দ্রিয় কমিটির দশম অধিবেশনে পার্টির সংবিধান থেকে লিন পিয়াও সংক্রান্ত সমস্ত অধ্যায় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—সর্বহারা পথ]

শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে, সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ বিরোধী সকল দেশপ্রেমিক শ্রেণী ও স্তরকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। ঐক্যফ্রন্টের মাঝে সর্বহারা শ্রেণীর পার্টি অবশ্যই আদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক স্বাধীনতা রক্ষা করবে এবং স্বাধীনতা ও উদ্যোগ গ্রহণের নীতিতে অটল থাকবে এবং নিজেদের নেতৃত্বের ভূমিকার জন্য জিদ ধরবে।

কাজেই ঐক্যফ্রন্টে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্ব, স্বাধীনতা ও উদ্যোগ গ্রহণ থাকতে হবে, আর তা থাকার একটি মাত্র গ্যারান্টি হচ্ছে সর্বহারার পার্টির নেতৃত্বে একটি গণফৌজ। সভাপতি মাও বলেছেন, গণফৌজ না থাকলে জনগণের কিছুই থাকবে না। কাজেই ঐক্যফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে গণফৌজ।

জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাধারণ কর্মনীতি

১। সর্বহারার পার্টির নেতৃত্বে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও গেরিলা যুদ্ধের জন্য সর্বাপেক্ষা সুবিধাজনক এমন স্থানে অর্থাৎ জঙ্গলাকীর্ণ পার্বত্য গ্রামাঞ্চলে যেতে হবে।

২। গ্রাম্য মজুর, গরীব চাষী ও মাঝারী চাষীকে উজ্জীবিত করতে হবে সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী গেরিলা যুদ্ধে।

৩। কৃষি বিপ্লবঃ উপনিবেশবাদ সমর্থক জমিদার, ধনী চাষীদের জমি দখল করে তা ক্ষেতমজুর ও গরীব চাষীদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। সরকারী (পুলিশ, সার্কেল অফিসার) এবং বি.ডি.-দের মাঝে উপনিবেশবাদ সমর্থকদের ধ্বংস করতে হবে।

দেশপ্রেমিক জমিদার, ধনী চাষী ও অন্যান্যদের বর্গা বদলানো বাতিল, পত্তনি বদলানো বাতিল, বর্গা শোষণ ও পত্তনি শোষণ কমানো প্রভৃতি কার্যকরী করতে হবে। সুবিধাজনক অবস্থায় দৃঢ়ভাবে ভূমি সংস্কার করতে হবে।

৪। গেরিলা বাহিনী থেকে নিয়মিত বাহিনী সৃষ্টি ও ঘাঁটি এলাকা তৈরী করতে হবে।

৫। ঐক্যফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৬। গ্রাম্য এলাকা দখল করে তা দিয়ে শহর ঘেরাও ও শেষ পর্যন্ত শহর দখল করতে হবে।

৭। পাকিস্তানী উপনিবেশবাদ ও তার দালাল পূর্ববাংলার বুর্জোয়া, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, অন্য যে সকল বৈদেশিক শক্তি উপনিবেশিক শ্রেণীকে সমর্থন করে (যদি তাদের সম্পত্তি এ দেশে থেকে থাকে) এবং বৈদেশিক শক্তিসমূহের দালালদের (যখন তারা জাতীয় বিপ্লবের বিরোধিতা করে) সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

৮। দখলকৃত এলাকায় জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে হবে। এ সরকার গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের মাধ্যমে, সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক শ্রেণী ও স্তরের সহযোগিতায় শত্রুর ওপর একনায়কত্ব ও জনগণের মাঝে গণতন্ত্র কায়েম করবে।

৯। বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিকে স্বায়ত্বশাসন ও বিভিন্ন উপজাতিকে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন দেয়া হবে।

১০। সকল অবাঙালী দেশপ্রেমিক জনগণের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে।

১১। জনগণের ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করা হবে।

বিপ্লবী যুদ্ধের সাধারণ কর্মনীতি

১। নিয়মিত বাহিনী গড়ে না ওঠা পর্যন্ত গেরিলা যুদ্ধ বিপ্লবী যুদ্ধের প্রধান রূপ;

২। প্রধানতঃ চাষীদের নিয়ে গঠিত লালফৌজ প্রধান সংগঠন;

৩। গেরিলা যুদ্ধের গতিপথে নিয়মিত বাহিনী গড়ে উঠবে;

৪। দীর্ঘস্থায়ী দুরূহ যুদ্ধ চলবে।

প্রধান কাজঃ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ও মাওসেতুঙ চিন্তানুসারী সর্বহারার রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠা।

অনুপূরক কাজঃ (১) সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রামে কৃষকদেরকে গেরিলা যুদ্ধে উজ্জীবিত করা; (২) প্রধানতঃ চাষীদের নিয়ে গেরিলা বাহিনী করা ও গেরিলা যুদ্ধ করা; (৩) কৃষি বিপ্লব করা; (৪) নিয়মিত বাহিনী ও ঘাঁটি এলাকা তৈরী করা।

আন্তর্জাতিক বক্তব্য

বর্তমান বিশ্বের মূল দ্বন্দ্বগুলো নিম্নরূপঃ

১। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের দ্বন্দ্ব;

২। একদিকে সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব ও সংশোধনবাদীদের নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদের মাঝে দ্বন্দ্ব;

৩। সাম্রাজ্যবাদী ও সংশোধনবাদী দেশসমূহের শাসকশ্রেণীর সাথে নিজেদের দেশের জনগণের দ্বন্দ্ব;

৪। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত জনগণের দ্বন্দ্ব।

দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণঃ

১। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সংশোধনবাদের সাথে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের দ্বন্দ্বঃ

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বব্যাপী তাদের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখার পথে এবং বিশ্বকে নিজেদের শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে পুনর্বন্টনের পথে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহকে বিশেষতঃ সমাজতান্ত্রিক চীনকে প্রধান বাধা বলে মনে করে। কারণ, চীন সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তিতে সর্বদা সাম্রাজ্যবাদী ও সংশোধনবাদী শোষণের স্বরূপ তুলে ধরছে। এ শাসন ও শোষণের হাত থেকে মুক্তির একমাত্র পথ বিপ্লবের পতাকাকে চীন ঊর্ধে তুলে ধরছে। চীনের বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেণী বিশ্বের দেশ ও জাতিসমূহের শাসন ও শোষণ বিরোধী সংগ্রামকে নৈতিক সমর্থন দিচ্ছে ও বাস্তব সাহায্য করছে। চীন বিশ্বের শাসন ও শোষণ বিরোধী সংগ্রামকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

কাজেই সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ এ প্রতিবন্ধককে ধ্বংস করতে সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের অবস্থা বিপ্লবের পক্ষে, জনগণের পক্ষে, সমাজতন্ত্রের পক্ষে এবং সাম্রাজ্যবাদ, সংশোধনবাদ ও সকল প্রতিক্রিয়ার বিপক্ষে। বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য সমাজতন্ত্রের পক্ষে। কাজেই সাম্রাজ্যবাদীরা ও সংশোধনবাদীরা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দ্বন্দ্বের অবসান করতে অক্ষম। সভাপতি মাও বলেছেন, আজকের দিনে দুধরণের বাতাস প্রবাহিত, পূবালী বাতাস ও পশ্চিমী বাতাস। চীনে একটি প্রবাদ আছে, হয় পূবালী বাতাস পশ্চিমী বাতাসকে দাবিয়ে রাখে, না হয় পশ্চিমী বাতাস পূবালী বাতাসকে দাবিয়ে রাখে। আমাদের মতে বর্তমান পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পূবালী বাতাস পশ্চিমী বাতাসকে দাবিয়ে রাখছে। এর অর্থ এই যে, সমাজতান্ত্রিক শক্তি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ওপর অত্যধিক প্রাধান্য লাভ করেছে। একারণে সাম্রাজ্যবাদীরা ও সংশোধনবাদীরা বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ, ব্ল্যাকমেইল এবং আভ্যন্তরীণ দালালদের সাথে যোগাযোগ প্রভৃতির মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্রমপরিবর্তন ঘটিয়ে ধনতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে এবং সে অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

সভাপতি মাওসেতুঙ কর্তৃক সূচীত ও পরিচালিত মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাম্রাজ্যবাদী, সংশোধনবাদী ও আভ্যন্তরীণ পুঁজিবাদী দালালদের চীনে ধনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার রঙীন স্বপ্নকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। এ সাংস্কৃতিক বিপ্লব পথ দেখিয়েছে কিভাবে বিপ্লবীরা সংশোধনবাদী দেশসমূহে পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণীকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সমাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে। কাজেই সমাজতন্ত্রী দেশসমূহের সাথে সাম্রাজ্যবাদী ও সংশোধনবাদী দেশসমূহের দ্বন্দ্ব বর্তমান। কিন্তু এ দ্বন্দ্ব প্রধান দ্বন্দ্ব নয়।

২। একদিকে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের নিজেদের মাঝে ও সংশোধনবাদী দেশ সমূহের নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব; অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী ও সংশোধনবাদী দেশসমূহের মাঝে দ্বন্দ্বঃ

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহকে কমিউনিজমের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সামরিক জোটে আবদ্ধ করছে এবং এভাবে তাদেরকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শোষণ করছে। একারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের দ্বন্দ্ব রয়েছে। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের শাসকশ্রেণীগুলোর মাঝে স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে।

সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ অন্যান্য সংশোধনবাদী দেশগুলোকে শাসন ও শোষণ করছে এবং যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন জোটে আবদ্ধ রেখেছে যাতে তার খপ্পর থেকে কেউ বেরুতে না পারে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ নিজেদের স্বার্থে সংগ্রাম ও সহযোগিতা করে। তারা নয়া-উপনিবেশিক ও উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের জন্য ক্রমশঃ পৃথিবীকে নিজেদের প্রভাবের এলাকা হিসেবে ভাগ করে নিচ্ছে। এ এলাকা বন্টনের বিষয় নিয়ে তাদের নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় আবার নিজেদের সাধারণ স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা সহযোগিতা করে।

কাজেই এ দ্বন্দ্ব বর্তমান। কিন্তু এটা প্রধান দ্বন্দ্ব নয়।

 ৩। সাম্রাজ্যবাদী ও সংশোধনবাদী দেশসমূহের শাসকশ্রেণীর সাথে নিজেদের দেশের জনগণের দ্বন্দ্বঃ

সাম্রাজ্যবাদী ও সংশোধনবাদী দেশসমূহের শাসকশ্রেণী নিজেদের দেশের আপামর জনসাধারণকে শোষণ করছে। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে শাসন ও শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং একারণে তাদেরকে বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করতে হয়েছে। এ সামরিক ব্যয়ভার আসে দেশের জনগণের কাছ থেকে, ফলে জনগণের ওপর শাসন ও শোষণ তীব্রতর হচ্ছে। কোনো কোনো সাম্রাজ্যবাদী ও সংশোধনবাদী দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু জাতির ওপর শাসন ও শোষণ অধিকভাবে চালানো হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আফ্রো-আমেরিকান (নিগ্রো)-দের ওপর জাতিগত শোষণ করছে। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ গুটিকয় বিশ্বাসঘাতক দালালদের সহায়তায় সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে শোষণ করছে।

কাজেই এ দ্বন্দ্ব বর্তমান; ইহা প্রধান দ্বন্দ্ব নয়।

৪। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে  সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত জনগণের দ্বন্দ্বঃ

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ শাসন ও শোষণ করছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশসমূহকে উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশে পরিণত করে। এ শোষণের ওপর নির্ভর করছে তাদের বিকাশ। এ কারণে আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো হচ্ছে পৃথিবীর গ্রামাঞ্চল। তাদের লুন্ঠন করে বেঁচে আছে পৃথিবীর শহরাঞ্চল ইউরোপ ও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো। এই গ্রামাঞ্চলে যেখানে ইউরোপ ও আমেরিকার মত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সুদৃঢ় নয় এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সেখানেই বিপ্লবের সূচনা করতে হবে এবং কালক্রমে সমগ্র গ্রামাঞ্চল দখল করে শহর অবরোধ করা এবং শেষে শহর দখল করা মাওসেতুঙ চিন্তানুসারী নীতি।

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশে বুর্জোয়ারা সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের প্রত্যক্ষ শাসন ও শোষণ থেকে নিজেদের দেশ ও জাতিগুলোকে মুক্ত করেছে। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রামের এটা একটা বিরাট বিজয়। কিন্তু এই বুর্জোয়া শ্রেণী, শ্রেণী বিকাশের স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন করে নিজ দেশকে নয়া-উপনিবেশে পরিণত করেছে। এ অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শর্ত তৈরী করা সর্বহারা শ্রেণীর ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

ভিয়েতনামের বীর জনগণের মহান মুক্তিযুদ্ধ যখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সম্পূর্ণ পরাজিত করার পর্যায়ে পৌঁছেছে তখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অধঃপতিত দোসর সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ শান্তি আলোচনার প্রহসনের ভেতর দিয়ে এ মহান মুক্তি সংগ্রামকে মুছে দেয়ার জঘন্য ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে।

তবু ভিয়েতনাম, লাউস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়, বার্মা, নক্সালবাড়ী, বিহার, কঙ্গো, মোজাম্বিক, এ্যাঙ্গোলা, আজানিয়া, প্যালেস্টাইন, বায়াফ্রা, রোডেশিয়া, নিউজিল্যান্ড, বলিভিয়া প্রভৃতি স্থানে সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বর্তমান বিশ্বপ্রতিক্রিয়ার কেন্দ্র। ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়ার জনগণের প্রধান শত্রু।

এ দ্বন্দ্ব বর্তমান এবং ইহাই প্রধান দ্বন্দ্ব।

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রধান বিপদ হলো সংশোধনবাদ ও নয়া-সংশোধনবাদ। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সংশোধনবাদ বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি দ্বারা কু-দেতা ঘটিয়ে ধনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে কয়েকটি সমাজতন্ত্রী দেশে। যে সকল কমিউনিস্ট পার্টির এখনো ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়নি সেগুলোর মাঝে বুর্জোয়া দালালদের সহায়তায় প্রতিবিপ্লবী কাজ পরিচালনা করছে এবং কোনো কোনো পার্টির ক্ষমতা এই দালালরা দখল করতে সক্ষম হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক দেশে ধনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তারা সাম্রাজ্যবাদের সাহায্যে আভ্যন্তরীণ বুর্জোয়া প্রতিনিধিদের দ্বারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জঘন্য চক্রান্ত করছে।

কোনো কোনো পার্টি সংশোধনবাদীদের এ চক্রান্তের খপ্পরে পড়ে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে স্বাধীন পথ অনুসরণ করছে ঘোষণা করে প্রকৃতপক্ষে সুবিধাবাদী পথ অনুসরণ করছে, সংশোধনবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা আর সংশোধনবাদের মাঝে কোন মাঝারী পথ নেই।

বর্তমান দুনিয়ায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও আলবেনিয়ার শ্রমিক পার্টি সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হয়ে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে চলেছে। সভাপতি মাওসেতুঙ দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, বর্তমান দুনিয়ার সর্বহারা শ্রেণীর মহান নেতা ও পরিচালক। [এখানে লিন পিয়াও সংক্রান্ত একটা বক্তব্য ছিল যা পরে বাদ দেওয়া হয়েছে—সর্বহারা পথ]।

সভাপতি মাওসেতুঙ প্রতিভার সঙ্গে, সৃজনশীলভাবে ও সামগ্রিকভাবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে উত্তরাধীকারসূত্রে লাভ করেছেন, রক্ষা করেছেন ও বিকাশ করেছেন,মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। মার্কস ও এঙ্গেলস মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতা। লেনিন মার্কসবাদকে সাম্রাজ্যবাদী যুগে সর্বহারা বিপ্লব পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান করেন, সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশের প্রতিষ্ঠা করেন। স্তালিন লেনিনবাদকে রক্ষা করেন ও সর্বহারা বিপ্লবের কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান করেন। সভাপতি মাওসেতুঙ সাম্রাজ্যবাদের সামগ্রিক ধ্বংসের যুগের মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে বিকাশ করেছেন। তিনি সমাধান করেছেন, কিভাবে সমাজতান্ত্রিক দেশে ধনতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ করা যায় এবং যে সকল দেশে ধনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানকার সর্বহারা বিপ্লবীরা কীভাবে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারে। তিনি প্রতিভার সঙ্গে দুনিয়ার প্রথম মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা ও পরিচালনা করেন। এভাবে তিনি মার্কসবাদকে এক সম্পূর্ণ নতুন স্তরে উন্নীত করেন, যে স্তর হলো মাওসেতুঙ চিন্তাধারার স্তর।

বিশাল সাগর পার হবার জন্য নির্ভর করি কর্ণধারের ওপর, বিপ্লব করার জন্য নির্ভর করি মাওসেতুঙ চিন্তাধারার ওপর। কাজেই বর্তমান যুগের বিপ্লবীদের চেনার উপায়—মাওসেতুঙ চিন্তাধারার অধ্যয়ন, অনুশীলন ও তার ভাল সৈনিক হওয়ার ওপর।

বর্তমান আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক নতুন ধরণের সংশোধনবাদ দেখা দিয়েছে। এরা মুখে মাওসেতুঙ-এর বুলি ঝাড়ে এবং কাজে তার বিরোধীতা করে; কথায় ও কাগজে মাওসেতুঙ চিন্তানুসারী ও অনুশীলনে সংশোধনবাদী পথ অনুসারী। মাওসেতুঙ চিন্তাধারার মুখোশ এঁটে জনগণকে ও বিপ্লবীদের ধোকা দেয়ার বুর্জোয়া দালালদের এ এক অভিনব কারসাজি ও ইহাই নয়া-সংশোধনবাদ।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিরাট পুনর্গঠন-পুনর্বিন্যাসের সময়। বিভিন্ন দেশে যেখানে সংশোধনবাদী ও নয়া সংশোধনবাদীরা নেতৃত্ব কুক্ষিগত করেছে, সেখানে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তানুসারীরা নুতন পার্টি সৃষ্টি করে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে জনগণকে বিপ্লবের পথে পরিচালনা করছে।

নয়া মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তানুসারী সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি গঠণের প্রয়োজনীয়তা

সভাপতি মাও বলেছেন, যদি বিপ্লব করতে হয় তাহলে অবশ্যই একটি বিপ্লবী পার্টি থাকতে হবে। বিপ্লবী পার্টি ছাড়া, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বে ও বিপ্লবী রীতিতে গড়ে ওঠা একটি বিপ্লবী পার্টি ছাড়া, শ্রমিক শ্রেণী ও ব্যাপক জনসাধারণকে সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুরদের পরাজিত করতে নেতৃত্ব দান করা অসম্ভব। আমাদের দেশে গতানুগতিক যে মার্কসবাদী নামধারী পার্টি ছিল তা ‘মস্কোপন্থী’ ও ‘পিকিংপন্থী’ নামধারী দুই উপদলে বিভক্ত হয়, তাদেরকে, তাদের থেকে বেরিয়ে আসা অথবা বিতাড়িত এবং অন্যান্য বিচ্ছিন্ন দল ও উপদলগুলোকে এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা প্রয়োজন।

পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি নামধারী সংশোধনবাদী পার্টি

এই পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সকল মূল তত্ত্বকে সংশোধন করে প্রকৃতপক্ষে শোষক শ্রেণী অর্থাৎ উপনিবেশবাদী, সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল হয়ে পূর্ববাংলার শ্রমিক-কৃষকদের বিপথে পরিচালিত করছে। এই অধঃপতিত দলদ্রোহী গোষ্ঠী অর্থনীতিবাদ, বার্ণষ্টাইনবাদের অনুসারী। শ্রমিক-কৃষক জনগণকে বিভ্রান্ত করে শোষক শ্রেণীর স্বার্থসিদ্ধি এদের লক্ষ্য। এরা ‘মস্কোপন্থী’ নামে পরিচিত। এরা পূর্ববাংলার শ্রমিক-কৃষক জনগণের জাতীয় শত্রু।

পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি (মার্কসবাদী) নামধারী নয়া-সংশোধনবাদী পার্টি

এরা কথায় ও কাগজে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তানুসারী ও অনুশীলনে সংশোধনবাদী। অর্থাৎ এরা লাল পতাকা ওড়ায় লাল পতাকা বিরোধীতা করার জন্য। এরা পূর্ববাংলার ওপর পাকিস্তানী উপনিবেশিক শোষণ স্বীকার করেনা এবং জাতীয় সংগ্রাম না করায এরা পূর্ববাংলার জনগণের নিকট উপনিবেশিক সরকারের দালাল হিসেবে পরিচিত। জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সশস্ত্র প্রস্তুতি না নিয়ে তারা একদিকে উপনিবেশিক শাসকশ্রেণীর হাত শক্ত করছে এবং অন্যদিকে ব্যাপক জনগণকে উপনিবেশিক শোষণ বিরোধী সংগ্রামে লিপ্ত মার্কিনের দালাল বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে ঠেলে দিচ্ছে। ‘পিকিংপন্থী’ নাম ধরে তারা বিশ্ববিপ্লবের কেন্দ্রকে অবমাননা করছে। এরা নয়া-সংশোধনবাদী।

নতুন দল, উপদল ও বিচ্ছিন্ন বিপ্লবী

পূর্ববাংলায় বিপ্লবের ফুটন্ত অবস্থা হওয়ায় বর্তমান দেশীয় কমিউনিষ্ট আন্দোলনে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। মার্কসবাদী নামধারী পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিবিপ্লবী চরিত্র, দালালী ক্রমশঃ পার্টিকর্মী ও বিপ্লবীদের সামনে প্রকাশ হওয়ায় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তানুসারীরা দৃঢ়ভাবে বিদ্রোহ করছে। এ অবস্থায় কিছু সুযোগ সন্ধানী প্রতিক্রিয়াশীলচক্র ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে নেমেছে।

মোটামুটি অনুসন্ধানের ফলে তাদের নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়ঃ

নয়া-সংশোধনবাদী পার্টির আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে বিতাড়িত একটি চক্র নিজেদেরকে সঠিক মার্কসবাদী, নক্সালবাড়ী অনুসারী বলে জাহির করে। তবে এ গ্রুপটি সকল কর্মী ও জনসাধারণের নিকট উপনিবেশিক শক্তির দালাল বলে প্রকাশ্যভাবে পরিচিত।

অপর একটি গ্রুপ বর্তমানে নয়া-সংশোধনবাদীদের সাথে আঁতাত করছে। এরা অধঃপতিত ভাগ্যান্বেষী বুর্জোয়া গোষ্ঠীর একটি ভগ্নাংশ। সচেতন কর্মীদের গ্রুপটি একটি ঘোট বা সুবিধাবাদী, নেতৃত্বলোভী ও হীনমনা গ্রুপটি সুযোগসন্ধানী ও পদলোভী, মেরুদণ্ডহীনদের একটি প্রতিক্রিয়াশীল আঁতাত।

অন্য একটি উল্লেখযোগ্য দল মার্কসবাদী নামধারী পার্টির অভ্যন্তরে ভ্রূন-পার্টি সৃষ্টির দায়ে বিতাড়িত। বক্তব্যের দিক দিয়ে তারা নয়া সংশোধনবাদী পার্টি থেকে অভিন্ন। জাতীয় বক্তব্যে এর অস্পষ্ট, তত্ত্বগতভাবে দুর্বল।

আরেকটি গ্রুপ বিপ্লবী কমিউনিষ্ট আন্দোলনের নামে প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদেবুর্জোয়াদের একটি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এরা ধার করা বক্তব্য, এলোপাথারী মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার কথা বলে তাদের সত্যিকার ক্ষুদেবুর্জোয়া চরিত্র গোপন করার প্রয়াস পায়। এরা শিশু অবস্থায় পার্টির মাঝে কোন দ্বন্দ্ব থাকবে না বলে ষ্ট্যালিন ও মাওসেতুঙ কর্তৃক বহুপূর্বে ধিকৃত ভাববাদী ডেবরিন তত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছিল যাতে আন্দোলন কয়েকজন ক্ষুদেবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবির পকেটস্থ হয়। এ ছাড়া রুদ্ধদ্বার নীতি, মনগড়া মনোলিথিজম, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার ভিত্তিতে ঐক্যে আতংকবোধ কিন্তু সংশোধনবাদী, নয়া-সংশোধনবাদী ও প্রমাণিত দালালদের সাথে নীতিহীন সুবিধাবাদী পবিত্র আঁতাত রাখতে উৎসাহী, বহুকেন্দ্রের তত্ত্বে বিশ্বাস, বিপ্লবী যুবকদের হাতে পার্টির নেতৃত্ব থাকবে এই তত্ত্ব, সভাপতি মাওসেতুঙ-এর গেরিলা যুদ্ধের নীতির পাশে চে-র মার্কসবাদ বিরোধী গেরিলা যুদ্ধের তত্ত্বের স্থান প্রদান প্রভৃতি জঘন্য মার্কসবাদ বিরোধী ক্ষুদে বুর্জোয়া তত্ত্বে বিশ্বাসী। কিছু কিছু বিপ্লবী এদের খপ্পরে পড়লেও অচিরেই তারা এদের সঠিক রূপ আবিস্কার করে বেরিয়ে আসবে। সম্প্রতি তারা মার্কসবাদী নয়া-সংশোধনবাদী পার্টির অভ্যন্তরে ভ্রূণ পার্টির সৃষ্টির দায়ে বিতাড়িত যে পার্টির কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, সে পার্টিতে যোগ দিয়েছে।

এ ছাড়া জ্ঞাত ও অজ্ঞাতভাবে বহু বিপ্লবী বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। তারা কেউ সমঝোতা রেখে, কেউ সমঝোতাহীনভাবে কাজ করছেন, আবার কেউ এলোপাথারী তীর ছুঁড়ছেন।

কাজেই প্রতিটি বিপ্লবী যারা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তানুসারী ও সে অনুযায়ী অনুশীলনকারী তাদেরকে অবশ্যই সংশোধনবাদ, নয়া-সংশোধনবাদ ও অন্যান্য মার্কসবাদ বিরোধী আদর্শের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ন্যায়সংগত এ পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে। সভাপতি মাও বলেছেন, ধবংস ব্যতীত কোনো প্রকার গঠনকার্য সম্ভব নয়। ধ্বংস বলতে সমালোচনা ও বর্জন বুঝায় এবং ইহাই বিপ্লব। যুক্তি সহকারে সত্যবের করা তার সাথে জড়িত, যা হলো গঠনমূলক কাজ।

কাজেই প্রতিটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তানুসারীদের উচিত নিজেদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশব্যাপী সর্বহারা শ্রেণীর একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠা করা। সভাপতি মাও বলেছেন, সুশৃংখলিত, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বে সুসজ্জিত, আত্মসমালোচনার পদ্ধতি প্রয়োগকারী ও জনগণের সাথে যুক্ত এমন একটি পার্টি; এমন একটি পার্টির নেতৃত্বাধীন একটি সৈন্য বাহিনী; এমন একটি পার্টির নেতৃত্বে সকল বিপ্লবী শ্রেণী ও বিপ্লবী দলের একটি যুক্তফ্রন্ট এ তিনটি হচ্ছে আমাদের শত্রুকে পরাজিত করার প্রধান অস্ত্র।

এই বিপ্লবী তত্ত্বে ও বিপ্লবী রীতিতে সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠার জন্য, উপরের কর্মসূচী ও বক্তব্য বাস্তবায়ন করার জন্য একটি সক্রিয় সংগঠন পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন।

চেয়ারম্যান মাও দীর্ঘজীবী হোন!

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা জিন্দাবাদ! ■

 


ফিদেল ক্যাস্ত্রো’র মৃত্যুতে ফিলিপিন ও মণিপুরের মাওবাদী পার্টির শোক প্রকাশ

fidel-castro-800x445

গত শুক্রবার বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক কিউবা বিপ্লবের নায়ক কমরেড ফিদেল ক্যাস্ত্রো’র মৃত্যুতে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি, মণিপুর ও ফিলিপাইন কমিউনিস্ট পার্টির(সিপিপি) সমগ্র সদস্য এবং নেতৃত্ব গভীর ভাবে শোক প্রকাশ করেছে।

কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি, কিউবা প্রজাতন্ত্র এবং কিউবার জনগণকে তাদের এই মহান ক্ষতিতে ফিলিপিন ও মণিপুরের বিপ্লবী জনগণের পক্ষে, এক পৃথক বিবৃতিতে, এই দুই পার্টি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছে।

বিস্তারিতঃ http://www.redspark.nu/en/national-liberation-struggle/manipur/maoist-communist-party-manipur-pays-tribute-to-the-cuban-people-at-the-demise-of-comrade-fidel-castro/

http://www.redspark.nu/en/peoples-war/philippines/cpp-red-salute-to-comrade-fidel-castro/