নৈরাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদ -জোসেফ স্তালিন

88617610-b099-4d21-89a9-bb394cdfd93c---0

 

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ


আমরা সেই ধরনের লোক নই, যারা নৈরাজ্যবাদ শব্দটার উল্লেখ হলেই অবজ্ঞাভরে মুখ ফিরিয়ে এবং উন্নাসিকভাবে হাত নেড়ে বলে, ‘ও সম্পর্কে সময় নষ্ট করে কি হবে? ওটা তো আলোচনারই যোগ্য নয়!’ আমরা মনে করি এ রকম সস্তা সমালোচনা মর্যাদাহানিকর ও নিরর্থক।

আমরা আবার সে ধরনের লোকও নই, যারা এই চিন্তা করে নিজেদের সান্ত¡না দেই যে নৈরাজ্যবাদীদের ‘পেছনে কোনো ব্যাপক জনসাধারণ নেই এবং সেজন্য তারা ততটা বিপজ্জনক নয়।’ আজ কার কত বেশি বা কম গণসমর্থন আছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো মতবাদের সারবস্তু। যদি নৈরাজ্যবাদীদের মতবাদ সত্য প্রকাশ করে, তাহলে বলা নিষ্প্রোয়জন যে, তা নিশ্চয়ই নিজের পথ নিজেই কেটে নেবে এবং তার চারিপাশে জনগণকে সমবেত করবে। কিন্তু যদি তা অযৌক্তিক ও মিথ্যা ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা বেশিদিন স্থায়ী হবে না এবং শূন্যে ঝুলতে থাকবে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদের অযৌক্তিতা অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, নৈরাজ্যবাদীরা মার্কসবাদের প্রকৃত শত্রু। তদনুযায়ী আমরা এই মত পোষণ করি যে, প্রকৃত শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রকৃত সংগ্রাম অবশ্যই চালাতে হবে। সুতরাং গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্যবাদীদের মতবাদ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা এবং সমস্ত দিক থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার মূল্য নির্ণয় করা প্রয়োজন।

কিন্তু নৈরাজ্যবাদকে সমালোচনা করা ছাড়াও আমাদের নিজেদের অবস্থান আমাদের অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে এবং এইভাবে মার্কস ও এঙ্গেলসের মতবাদের সাধারণ রূপরেখা সংক্ষেপে উপস্থিত করতে হবে। এটা আরও বেশি প্রয়োজন এই জন্য যে, কিছু কিছু নৈরাজ্যবাদী মার্কসবাদ সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করছে এবং পাঠকদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাহলে এখন আলোচ্য বিষয় নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাক।

“বিশ্বে সবকিছুই গতিশীল, জীবন বদলে যায়, উৎপাদনশীল শক্তিসমূহ বৃদ্ধি পায়, পুরানো সম্পর্কসমূহ ধসে পড়ে চিরন্তন গতিশীলতা, চিরন্তন ধ্বংস এবং সৃষ্টি- এটাই হলো জীবনের মর্ম।”- কার্ল মার্কস [দর্শনের দৈন্য]।

মার্কসবাদ শুধু সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব নয়, মার্কসবাদ একটি অখণ্ড বিশ্ববীক্ষা, একটি দার্শনিক প্রণালী, যা থেকে মার্কসের সর্বহারার সমাজতন্ত্র যুক্তিসঙ্গতভাবেই এসে পড়ে। এই দার্শনিক প্রণালীকে বলা হয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। সুতরাং মার্কসবাদকে ব্যাখ্যা করার অর্থ হলো দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে ব্যাখ্যা করা।

এই দার্শনিক প্রণালীকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বলে কেন? 
বলে এই জন্য যে, এর পদ্ধতি হলো দ্বন্দ্বমূলক এবং তত্ত্ব হলো বস্তুবাদী।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিটি কি? 
বস্তুবাদী তত্ত্বটি কি? 
বলা হয়, নিরন্তর জন্ম, বৃদ্ধি ও বিকাশের ধারাই জীবন। এটা সত্য, সামাজিক জীবন অবশ্যই অব্যয় এবং স্থানু একটা কিছু নয়, জীবন কখনও একই স্তরে থাকে না। শাশ্বত গতিশীলতায়, ধ্বংস ও সৃষ্টির এক শাশ্বত প্রক্রিয়ায় জীবনের প্রবাহ। সঙ্গত কারণেই মার্কস বলেছিলেন যে, চিরন্তন গতিশীলতা, এবং চিরন্তন ধ্বংস ও সৃষ্টিই হলো জীবনের ধর্ম। সুতরাং জীবনের মধ্যে সব সময়ে রয়েছে নতুন এবং পুরাতন, জয়মান ও ক্ষীয়মান, বিপ্লব এবং প্রতিক্রিয়া- এর মধ্যে প্রতিনিয়ত একটা কিছু মারা যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে সব সময়েই একটা কিছু জন্মাচ্ছে। 
দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি আমাদের বলে যে, জীবন বাস্তবিকপক্ষে যা জীবনকে সেই মতোই বিবেচনা করতে হবে। জীবন অবিরাম গতিশীল, এবং সেজন্য জীবনকে অবশ্যই তার গতিশীলতা, তার ধ্বংস ও সৃষ্টির মধ্যেই বিবেচনা করতে হবে। জীবন কোথায় যাচ্ছে, জীবন কী লয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং কী-ই বা জন্মলাভ করছে, কী ধ্বংস হচ্ছে এবং কী-ই বা সৃষ্টি হচ্ছে? সর্বপ্রথম এই প্রশ্নগুলিরই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা উচিত।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির এই হল প্রথম সিদ্ধান্ত। 
জীবনে যা জন্মাচ্ছে এবং দিনে পর দিন বেড়ে উঠছে তা অজেয়, তার অগ্রগতি প্রতিহত হতে পারে না, তার বিজয়লাভ অবশ্যম্ভাবী। অর্থাৎ উদাহরণ স্বরূপ, শ্রমিক শ্রেণি যদি জন্মগ্রহণ করে, দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, তাহলে তারা আজ দুর্বল এবং সংখ্যায় যত কমই হোক না কেন, তাতে কিছু এসে যায় না, পরিণামে তারা নিশ্চয়ই বিজয়ী হবে। পক্ষান্তরে, জীবনে যা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং কবরের দিকে এগিয়ে চলেছে, তা অবশ্যম্ভাবীরূপে পরাজয় বরণ করবে। অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ, আজ যদি বুর্জোয়াদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে এবং তারা প্রতিদিন পিছন থেকে আরও পিছনে যেতে থাকে, তাহলে তারা আজ যতই সবল এবং সংখ্যায় যত বেশিই হোক না কেন পরিণামে তারা অবশ্যই পরাজয় বরণ করবে এবং কবরে যাবে। এ থেকেই সুবিদিত দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির উদ্ভব: যা কিছু বাস্তবক্ষেত্রে বিদ্যমান, অর্থাৎ যা কিছু দিনের পর দিন বেড়ে উঠছে, তা যুক্তিসিদ্ধ।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির এই হলো দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত। 
গত শতাব্দীর আশির দশকে রাশিয়ার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এক বিরাট বিতর্ক উঠেছিল। নারদনিকেরা ঘোষণা করলো- প্রধান যে শক্তি রাশিয়াকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিতে পারে, তারা হলো গরিব কৃষকেরা। কেন?- মার্কসবাদীরা তাদের জিজ্ঞাসা করলো। নারদনিকরা জবাব দিল, এর কারণ কৃষক সমাজ সংখ্যায় সর্বাধিক এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা রাশিয়ার সমাজের দরিদ্রতম অংশ। এর জবাবে মার্কসবাদীরা বললো- একথা সত্য যে কৃষক সমাজ আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা অত্যন্ত গরিব, কিন্তু এটাই কী প্রশ্নঃ কৃষক সমাজ তো বহুদিন ধরেই সংখ্যাগরিষ্ঠ রয়েছে, কিন্তু এ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির সাহায্য ব্যতীত তারা মুক্তির সংগ্রামে কোন উদ্যোগ দেখায়নি। কেন? কারণ কৃষক সমাজ, শ্রেণি হিসাবে দিনের পর দিন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে এবং ভেঙে গিয়ে বুর্জোয়ায় ও শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণি, শ্রেণি হিসাবে দিনের পর দিন বাড়ছে এবং শক্তিলাভ করছে। এখানে দারিদ্র্যেরও চূড়ান্ত গুরুত্ব নেইঃ ভবঘুরেরা কৃষকদের তুলনায় অধিকতর গরিব, কিন্তু কেউ বলবে না যে তারা রাশিয়াকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিতে পারে। একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোঃ জীবনে কারা বেড়ে উঠছে এবং কারা ক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে। যেহেতু শ্রমিক শ্রেণি হলো একমাত্র শ্রেণি যা নিশ্চিত গতিতে বেড়ে উঠছে এবং শক্তি অর্জন করছে, আমাদের কর্তব্য হলো এদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো এবং রাশিয়ার বিপ্লবে একে প্রধান শক্তি হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া- মার্কসবাদীরা এইভাবেই জবাব দিয়েছিল। তাহলে আপনারা দেখছেন, মার্কসবাদীরা প্রশ্নটি দেখেছিল দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, পক্ষান্তরে নারদনিকরা তাকে দেখেছিল অধিবিদ্যক দৃষ্টিকোণ থেকে, কেননা তারা জীবনকে গণ্য করতো এমন একটা কিছু বলে যা অনড়, অব্যয় এবং চিরকালের মতো নির্দিষ্ট (এফ এঙ্গেলসের ‘ফিলসফি, পলিটিক্যাল ইকনোমিক সোস্যালিজম দেখুন)।

এইভাবেই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি সমাজজীবনের আন্দোলনকে দেখে থাকে। 
কিন্তু আন্দোলন আছে নানা রকমের। ডিসেম্বরের দিনগুলিতে সামাজিক আন্দোলন ঘটেছিল, যখন শ্রমিক শ্রেণি শিরদাঁড়া সোজা করে অস্ত্রশস্ত্রের ডিপো প্রচ- বেগে আক্রমণ করলো এবং প্রতিক্রিয়ার ওপর আক্রমণ চালালো। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলির আন্দোলন যখন শ্রমিক শ্রেণি শান্তিপূর্ণ বিকাশের অবস্থাতে বিচ্ছিন্ন ধর্মঘটে এবং ছোট ছোট ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল, তাকেও সামাজিক আন্দোলনই বলতে হবে। স্পষ্টতই আন্দোলন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এই জন্যই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি বলে আন্দোলনের দুটি রূপ আছেঃ বিকাশমূলক রূপ ও বিপ্লবমূলক। যখন অগ্রগতিশীল অংশসমূহ তাদের প্রাত্যহিক কার্যকলাপ স্বতঃস্ফূর্তভাবে চালিয়ে যেতে থাকে এবং পুরাতন ব্যবস্থার গৌণ, মাত্রাগত পরিবর্তন ঘটায়, তখন সে আন্দোলন হলো বিকাশমূলক। আন্দোলন বিপ্লবী হয়, যখন সেই একই অংশসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়, একটিমাত্র ধারণায় পরিপূর্ণভাবে অনুপ্রাণিত হয় এবং পুরানো ব্যবস্থা ও তার গুণগত বৈশিষ্ট্যগুলি সমূলে উৎপাটিত করার জন্য এবং একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য শত্রু শিবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে; বিপ্লব বিকাশের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণতা দান করে এবং তার পরবর্তী কর্মকা- সহজ করে।

প্রকৃতিতেও অনুরূপ প্রক্রিয়া ঘটে থাকে। বিজ্ঞানের ইতিহাস দেখিয়ে দেয় যে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি একটি খাঁটি পদ্ধতিঃ জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে সমাজবিজ্ঞান প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা এই ধারণারই অনুমোদন পাই যে, এই বিশ্বে কিছুই শাশ্বত নয়, প্রকৃতিতে প্রতিটি বস্তুই পরিবর্তিত হয়, প্রতিটি বস্তুই বিকশিত হয়। এজন্য প্রকৃতিতে প্রতিটি বস্তুকেই গতি এবং বিকাশের দৃষ্টিকোন থেকেই বিবেচনা করতে হবে। এবং এর অর্থ এই যে, দ্বন্দ্ববাদের মূলনীতি আজকের দিনেও সমস্ত বিজ্ঞানেই পরিব্যাপ্ত রয়েছে।

গতির বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে দ্বন্দ্ববাদী তত্ত্বের যে সিদ্ধান্ত- ছোট ছোট মাত্রাগত পরিবর্তন, শীঘ্রই হোক আর বিলম্বেই হোক, বড় বড় গুণগত পরিবর্তনে পরিণতি লাভ করে- এই সিদ্ধান্ত, এই নিয়ম সমানভাবে প্রকৃতির ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেনডিলিয়েভে উপাদানসমূহের পর্যাবৃত্ত প্রণালী সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির ইতিহাসে মাত্রাগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তনের উদ্ভব কত গুরুত্বপূর্ণ। জীববিদ্যায় নয়া লামার্কবাদী তত্ত্ব এই একই জিনিস দেখিয়েছে। এই তত্ত্বের কাছে নয়া ডারউইনবাদ নতি স্বীকার করছে। 
অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছুই বলবো না; এফ এঙ্গেলস তার এ্যান্টি ডুরিংএ তাদের ওপর পর্যাপ্ত আলোচনা করেছেন।

তাহলে আমরা এখন দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাথে পরিচিত। আমরা জানি যে এই পদ্ধতি অনুযায়ী বিশ্বজগৎ চিরন্তন গতিশীল, ধ্বংস এবং সৃষ্টির চিরন্তন প্রক্রিয়ায় চলমান এবং সেইজন্য প্রকৃতি ও সমাজের প্রতিটি ঘটনায়ই দেখতে হবে গতিময়তার দিক থেকে, দেখতে হবে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রক্রিয়ার দিক থেকে, নিশ্চল এবং গতিহীন কিছু বলে একে বিবেচনা করা চলবে না। আমরা আরও জানি এই গতির দুটি রূপ আছেঃ বিকাশমূলক রূপ এবং বিপ্লবী রূপ।

নৈরাজ্যবাদীরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে কিভাবে দেখে? 
প্রত্যেকেই জানে, হেগেল দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির স্রোষ্টা ছিলেন। মার্কস কেবল এই পদ্ধতিকে পরিশোধিত করে উন্নত করেছিলেন। নৈরাজ্যবাদীরা তা জানে; তারা এও জানে যে হেগেল ছিলেন রক্ষণশীল, এবং এই জন্য তারা তার সুযোগ নিয়ে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রবক্তা বলে গালিগালাজ করে; তার দিকে কাদা ছোড়ে এবং চরম উৎসাহ নিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, হেগেল হলেন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দার্শনিক; প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, হেগেল আমলাতান্ত্রিক নিয়মতান্ত্রিকতার চরম রূপের স্তুতিকার, তার ইতিহাসের দর্শন-এর সাধারণ ভাবধারা হল পুনঃপ্রতিষ্ঠার কালের দার্শনিক প্রবণতার বশবর্তী এবং তাকেই তা সাহায্য করে ইত্যাদি ইত্যাদি (ভি, চেরকেজিশভিলির প্রবন্ধ দেখুন)। সত্য বটে, এই প্রশ্নে তারা যা বলে, কেউ তার প্রতিবাদ করে না এবং প্রত্যেকেই স্বীকার করে যে, হেগেল বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাজতন্ত্রের একজন সমর্থক। এ সত্ত্বেও নৈরাজ্যবাদীরা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং অবিরাম এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে যে, হেগেল পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রবক্তা ছিলেন। কেন তারা তা করে? সম্ভবত এই সবের দ্বারা তারা হেগেলকে অপদস্ত করতে চায়, পাঠককে বোঝাতে চায় প্রতিক্রিয়াশীল হেগেলের পদ্ধতিটি অগ্রহণীয় ও অবৈজ্ঞানিক। তাই যদি হয়, যদি নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন যে তারা এইভাবে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে অপ্রমাণ করতে সক্ষম, তাহলে আমি বলবো যে, এইভাবে তারা তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই স্বপ্রমাণ করতে পারেন না। পাসক্যাল ও লাইবনিৎস বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু যে গাণিতিক পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করেছিলেন তা আজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসাবে স্বীকৃত; মেয়ার ও হেলমহোলৎসও বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে তাদের আবিষ্কার বিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করেছিল। লামার্ক ও ডারউইন বিপ্লবী ছিলেন না; কিন্তু তাদের বিবর্তনমূলক পদ্ধতি জীববিজ্ঞানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। হ্যাঁ এইভাবে নৈরাজ্যবাদী মশাইরা তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করতে পারছেন না।

আরও এগোনো যাক। নৈরাজ্যবাদীদের মতে দ্বন্দ্ববাদ হল অধিবিদ্যা এবং যেহেতু তারা বিজ্ঞানকে অধিবিদ্যা থেকে এবং দর্শনকে ঈশ্বরতত্ত্ব থেকে মুক্ত করতে চায়। সেইজন্য তারা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে অস্বীকার করে।

হায়, এই নৈরাজ্যবাদীরা! কথায় বলে নিজের পাপ অন্যের ঘাঁড়ে চাপিয়ে দাও। অধিবিদ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভিতর দিয়েই দ্বন্দ্ববাদ পূর্ণতা প্রাপ্ত হলো এবং প্রতিষ্ঠা অর্জন করলো; কিন্তু নৈরাজ্যবাদীদের মতে সেই দ্বন্দ্ববাদই হলো অধিবিদ্যা। নৈরাজ্যবাদীদের জনক প্রুঁধো বিশ্বাস করতেন যে, জগতে চিরকালের জন্য নির্ধারিত অপরিবর্তনীয় ন্যায় বিদ্যমান রয়েছে, এবং এরই প্রেক্ষিতে প্রুঁধোকে বলা হয়েছে অধিবিদ্যাবিদ। মার্কস দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাহায্যে প্রুঁধোর সাথে সংগ্রাম করেছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন, ‘যেহেতু পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তুই বদলায়, ন্যায় অবশ্যই বদলাবে এবং সেজন্য অপরিবর্তনীয় ন্যায় হলো অধিবিদ্যার অর্থহীন বুলি।’ [মার্কসের দর্শনের দারিদ্র্য]। কিন্তু তবুও অধিবিদ্যক প্রুঁধোর জর্জিয়ান শিষ্যেরা প্রমাণ করার চেষ্টায় লেগে যায় যে, বস্তুবাদ হলো অধিবিদ্যা এবং অধিবিদ্যা অজ্ঞেয় ও স্বয়ংসিদ্ধ সত্তা স্বীকার করে এবং পরিণামে নীরস ঈশ্বর তত্ত্বে পর্যবসিত হয়। প্রুঁধো এবং স্পেনসারের বিরুদ্ধে এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাহায্যে অধিবিদ্যা ও ঈশ্বরতত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। [লুডউইগ ফয়েরবাগ এবং এ্যান্টি ড্যুরিং দেখুন]। তিনি প্রমাণ করেছিলেন তারা কেমন হাস্যকরভাবে ধোঁয়াটে ছিলেন। কিন্তু আমাদের নৈরাজ্যবাদীরা প্রমাণ করতে সচেষ্ট যে প্রুঁধো এবং স্পেন্সার ছিলেন বৈজ্ঞানিক। পক্ষান্তরে মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন অধিবিদ্যাবিদ। দুটি জিনিসের একটা হয় নৈরাজ্যবাদী মশাইরা নিজেদের প্রতারিত করছে, না হয় অধিবিদ্যা কী তারা তা বোঝে না। সে যাই হোক কোনটার জন্যই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে দোষ দেওয়া যায় না।

নৈরাজ্যবাদী মশাইরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির বিরুদ্ধে আর কী কী অভিযোগ আনেন? তারা বলেন দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি হলো সূক্ষ্ম কথার জাল বোনা, কুতর্কের কৌশল, তর্কশাস্ত্রের এবং মানসিক ডিগবাজি। যার সাহায্যে সত্য এবং মিথ্যা দুই-ই সমান স্বাচ্ছন্দে প্রমাণ করা যায়।

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে যে, নৈরাজ্যবাদীদের উত্থাপিত অভিযোগের কিছু ভিত্তি আছে। অধিবিদ্যক পদ্ধতির অনুসরণকারীদের সম্পর্কে এঙ্গেলস কি বলেন মনোযোগ দিয়ে শুনুন: “…. তার বাণী হলো হ্যাঁ নিশ্চয়-ই হ্যাঁ, না নিশ্চয়ই না, কারণ যা কিছু এই দুইয়ের অতিরিক্ত তা-ই অশুদ্ধ থেকে আগত। তার পক্ষে একটা জিনিস হয় বিদ্যমান, নয় বিদ্যমান নয়। তেমনি কোন বস্তুর পক্ষে একই সময়ে সেই বস্তু এবং অন্য কোন বস্তু হওয়া অসম্ভব। ইতি এবং নেতি চূড়ান্তভাবে পরস্পরের ব্যতিরেকী।” [এ্যান্টি ড্যুরিং এর ভূমিকা]।

সে কি রকম? নৈরাজ্যবাদীরা চিৎকার করে বলে কোনো বস্তুর পক্ষে একই সময়ে ভাল এবং মন্দ হওয়া কি সম্ভব? এটা হলো কুতর্ক, কথার মারপ্যাচ, এটা দেখাচ্ছে যে, তুমি সত্য ও মিথ্যাকে সমান আয়েশে প্রমাণ করতে চাও।

আচ্ছা বিষয়টির মর্মে যাওয়া যাক। আজ আমরা গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র দাবি করছি। কিন্তু গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বুর্জোয়া ধনসম্পত্তিকে শক্তিশালী করে। আমরা কি বলতে পারি যে, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রে ভাল! না আমরা পারি না! কেন? যেহেতু আমরা যখন সামন্ততান্ত্রিক সম্পত্তিকে বিনষ্ট করছি সেই আজকের জন্য গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র ভাল, কিন্তু আগামীকাল যখন আমরা বুর্জোয়াদের সম্পত্তি বিনষ্ট করতে এগুবো, এগুবো সমাজতান্ত্রিক সম্পত্তি প্রতিষ্ঠা করতে তখন গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র আর ভাল থাকবে না। পক্ষান্তরে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং তাকে আমরা চূর্ণ করে ফেলে দেব। কিন্তু যেহেতু জীবন শাশ্বত গতিশীল এবং যেহেতু অতীতকে বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না এবং সেহেতু আমরা যুগপৎ সামন্ততান্ত্রিক শাসন এবং বুর্জোয়াদের সঙ্গে লড়াই করছি, সেহেতু আমরা বলি একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র যেখানে সামন্ততান্ত্রিক সম্পত্তিকে ধ্বংস করে, সেখানে তা ভাল এবং আমরা তাকে সমর্থন করি; কিন্তু যেখানে তা বুর্জোয়া সম্পত্তিকে শক্তিশালী করে সেখানে তা খারাপ এবং সেখানে আমরা তাকে সমালোচনা করি। এ থেকে আসে যে, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র একই সময়ে ভাল এবং উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব হতে পারে হ্যাঁ এবং না দুটোই। দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সঠিকতা প্রমাণে উক্ত কথাগুলো বলার সময়ে এই ধরনের বিষয়গুলিই এঙ্গেসের মনে ছিল। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা তা বুঝতে পারে না এবং তাদের কাছে এটা কুতর্ক মনে হয়। অবশ্য প্রকৃত বিষয়গুলি গ্রহণ করার বা প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা নৈরাজ্যবাদীদের আছে, তা করবার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের আছে। কিন্তু তারা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে টেনে আনছে কেন? দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি নৈরাজ্যবাদের মতো নয়; তা চোখ বন্ধ করে জীবনের দিকে তাকানো নয়; জীবনের স্পন্দনের ওপরে তার আঙ্গুল রয়েছে এবং তা খোলাখুলিভাবে বলে, যেহেতু জীবন পরিবর্তনশীল ও গতিময়, সেজন্য জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে দুটি ঝোঁক আছে ; একটি ইতিবাচক অন্যটি নেতিবাচক; প্রথমটিকে আমরা অবশ্যই রক্ষা করবো, দ্বিতীয়টিকে আমরা অবশ্যই বর্জন করবো। কী আজব লোক এই নৈরাজ্যবাদীরাঃ তারা প্রতিনিয়ত ন্যায় সম্বন্ধে বাণী দিচ্ছে কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির ওপর পুরো অন্যায় চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও এগোনো যাক। আমাদের নৈরাজ্যবাদীদের মতে দ্বন্দ্বমূলক বিকাশ হলো প্রলয়মূলক বিকাশ; যার দ্বারা প্রথমে অতীতকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয় এবং তারপর ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। কুভিয়ারের প্রলয় ঘটেছিল অজানা কারণে, মার্কস এবং এঙ্গেলসের প্রলয়ের কারণ দ্বন্দ্ববাদ। অন্য এক জায়গায় একই লেখক লিখেছেন, মার্কসবাদ ডারউইনের ওপর নির্ভর করে এবং বিনা সমালোচনায় তাকে গ্রহণ করে। 
পাঠক এই কথায় মনোযোগ দিন!

কুভিয়ার ডারউইনের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব বাতিল করেন। তিনি কেবলমাত্র প্রলয়কেই স্বীকার করেন এবং প্রলয় হলো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়, যার কারণ অজ্ঞাত। নৈরাজ্যবাদীরা বলে মার্কসবাদীরা ডারউইনের ওপর নির্ভর করে এবং বিনা সমালোচনায় তাকে গ্রহণ করে। অর্থাৎ মার্কসবাদ কুভিয়ারের প্রলয়কে স্বীকার করে না।

ইচ্ছা হলে একে নৈরাজ্যবাদ বলতে পারেন! কথায় বলে সার্জেন্টের স্ত্রী নিজেই নিজেকে বেত মেরেছিল। স্পষ্টতই ৬ নং নোভাতিতে এস এইস জি. কী বলেছিলেন ৮নং নোভাতিতে তিনি তা ভুলে বসে আছেন।

কোনটা সঠিক ৮নং না ৬নং? অথবা দুটিতেই মিথ্যা উক্তি করা হয়েছে?
প্রকৃত ঘটনার দিকে তাকানো যাক। মার্কস বলেন, বিকাশের একটা স্তরে সমাজের বস্তুগত উৎপাদিকা শক্তিগুলি তৎকালীন উৎপাদন সম্পর্ক সমূহের সঙ্গে অথবা আইনের ভাষায় বলতে গেলে সম্পত্তিগত সম্পর্কসমূহের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে- তখন শুরু হয় সামাজিক বিপ্লবের একটা যুগ। কিন্তু সমস্ত উৎপাদন শক্তিগুলির যতদূর সম্ভব বিকশিত হওয়ার সুযোগ আছে। ততদূর অবধি বিকশিত হবার আগে কোনো সমাজব্যবস্থা কখনো ধ্বংস হয় না। (কার্ল মার্কস- এ কনট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমির ভূমিকা)।

মার্কসের এই ধারণা যদি সমসাময়িক সামাজিক জীবনে প্রযুক্ত হয়, তাহলে আমরা দেখবো যে, একদিকে আজকের দিনের উৎপাদিকা শক্তিগুলিতে, যার চরিত্র হলো সামাজিক এবং অন্যদিকে উৎপাদিত বস্তুর আত্মসাতের রূপ, যার চরিত্র হলো ব্যক্তিগত এই দুইয়ের মধ্যে একটি মৌলিক সংঘাত রয়েছে। যা অবশ্যই পরিণতি লাভ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে। (এঙ্গেলসের এ্যান্টি ড্যুরিং দেখুন, তৃতীয় অংশ, তৃতীয় অধ্যায়)। তাহলে আপনারা দেখছেন মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে বিপ্লব (প্রলয়) কুভিয়ারের অজ্ঞাত কারণের জন্য সংঘটিত হয় না। সংঘটিত হয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কারণে, যাকে বলা হয় উৎপাদিকা শক্তিসমূহের বিকাশ। আপনারা দেখছেন মার্কস এঙ্গেলসের মতে বিপ্লব শুধু তখনই আসে যখন উৎপাদিকা শক্তিগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়, অপ্রত্যাশিতভাবে নয় যেমন কুভিয়ার ভাবছেন। স্পষ্টতই কুভিয়ারের প্রলয় এবং দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির মধ্যে কোন মিল নেই। পক্ষান্তরে ডারউইনবাদ শুধু কুভিয়ারের প্রলয়কেই অস্বীকার করে না, দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিকাশ- যার মধ্যে বিপ্লবও অন্তর্ভুক্ত তাকেও অস্বীকার করে। অন্যদিকে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিবর্তন ও বিপ্লব, পরিমাণগত ও গুণগত পরিবর্তন একই গতির দুটি আবশ্যিক রূপ। এটা বলাও ভুল যে মার্কসবাদ ডারউইনবাদকে বিনা সমালোচনায় গ্রহণ করে। তাহলে এর থেকে বোঝা যায় যে যেমন ৬ নম্বরে তেমনি ৮ নম্বরেও, উভয় ক্ষেত্রেই নোভাতি সঠিক।

এইসঙ্গে এইসব মিথ্যাবাদী সমালোকেরা আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বার বার বলতে থাকেঃ তোমরা পছন্দ কর আর নাই করো, আমাদের মিথ্যাগুলি তোমাদের সত্যের চেয়ে উৎকৃষ্টতম। সম্ভবত তাদেরও বিশ্বাস তারা যা-ই বলুক বা করুক না কেন সব কিছুই ক্ষমার্হ। 
আর একটি বিষয় আছে যার জন্য নৈরাজ্যবাদী মশাইরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে ক্ষমা করতে পারে নাঃ দ্বন্দ্ববাদ … নিজের থেকে বেরিয়ে বা লাফিয়ে যাওয়া অথবা লাফ দিয়ে নিজেকে টপকে যাওয়ার কোন সুযোগ দেয় না। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা এখানে আপনারা চূড়ান্তভাবে সঠিক, দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিতে সত্যই এ রকমের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কেন নেই? নিজের থেকে বেরিয়ে বা লাফিয়ে যাওয়া, কিংবা লাফ দিয়ে নিজেকে টপকে যাওয়া হলো বুনো ছাগলের কসরৎ, কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি তো সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য। এই হলো গোপন তত্ত্ব!… 
সাধারণভাবে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির প্রশ্নে নৈরাজ্যবাদীদের মত হচ্ছে এই।

স্পষ্টতই নৈরাজ্যবাদীরা মার্কস-এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি অনুধাবন করতে অক্ষম, তারা তাদের নিজস্ব দ্বন্দ্ববাদ সৃষ্টি করেছে এবং তার বিরুদ্ধে তারা এত নির্মমভাবে লড়াই করে চলেছে। এই দৃশ্য দেখে আমরা শুধু হাসতেই পারি, কারণ কেউ যখন দেখে যে একজন তার নিজেরই কল্পনার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে; নিজের আবিষ্কারকে চূর্ণ করছে আর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে জোর দিয়ে বলছে যে, সে তার প্রতিপক্ষকেই চূর্ণ করছে তখন কেউ না হেসে থাকতে পারে না।


“মানুষের চেতনা তার বাস্তব অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না, পক্ষান্তরে, তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে”- কার্ল মার্কস।

বস্তুবাদী তত্ত্বটা কি?
পৃথিবীতে সব জিনিসের পরিবর্তন ঘটে, পৃথিবীতে সব কিছুই গতিশীল, কিন্তু কীভাবে এই পরিবর্তনগুলি সংগঠিত হয়, এই গতিশীলতা কী রূপ পরিগ্রহ করে এটাই হলো প্রশ্ন। উদাহরণস্বরূপ আমরা জানি, এই পৃথিবী একদিন ছিল জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড, তারপরে তা ক্রমে ক্রমে ঠাণ্ডা হলো; তারপরে জীবজন্তুর রাজ্যের অভ্যুদয় হলো, বিকাশ ঘটলো, তারপরে আবির্ভাব ঘটল এক জাতের বানরের যা থেকে পরবর্তীকালে হল মানুষের উদ্ভব। কিন্তু এই বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল? কেউ কেউ বলে থাকে, প্রকৃতি ও তার বিকাশের পূর্বে ছিল বিশ্ব চৈতন্য যা পরবর্তীকালে এই বিকাশের ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল। ফলে বলতে গেলে প্রকৃতির ঘটনার বিকাশ এই চৈতন্যের বিকাশের বাইরেকার রূপ। এই লোকগুলিকে বলা হয় ভাববাদী, যারা পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রবণতায় বিভক্ত হয়ে পড়লো এবং বিভিন্ন ধারা অনুসরণ করলো। অন্যেরা বলে একেবারে গোড়া থেকেই এই জগতে পরস্পরের নেতিবাচক দুটি শক্তি আছে- ভাব এবং বস্তু এবং অনুরূপভাবে, ঘটনাসমূহও দুই শ্রেণিতে বিভক্ত, ভাবগত ও বস্তুগত, যারা প্রতিনিয়ত পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এইভাবে দেখা যায় প্রকৃতির ঘটনাসমূহের বিকাশ হলো ভাবগত ও বস্তুগত ব্যাপারের মধ্যে নিরন্তর সংগ্রাম। এই লোকগুলিকে বলা হয় দ্বৈতবাদী এবং ভাববাদীদের মতো তারাও বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত।

মার্কসের বস্তুবাদী তত্ত্ব, দ্বৈতবাদ ও ভাববাদ উভয়কেই চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য, ভাবগত ব্যাপার ও বস্তুগত ব্যাপার দুই-ই এই পৃথিবীতে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই না যে, তারা পরস্পরকে নিরাকরণ করে। বিপরীত পক্ষে, ভাবগত ও বস্তুগত দিক হল একই ব্যাপারের দুটি বিভিন্ন রূপ। তারা একত্রে বিকশিত হয়, তাদের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ রকম অবস্থাতে আমাদের মনে করার কোন যুক্তিই নেই যে, তারা পরস্পর পরস্পরকে নিরাকরণ করে। অতএব, দ্বৈতবাদ ভুল বলে প্রমাণিত হয়। এক ও অবিভাজ্য প্রকৃতি দুটি বিভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত- বস্তুগত ও ভাবগত- এইভাবেই প্রকৃতির বিকাশকে আমাদের গণ্য করতে হবে। এক ও অবিভাজ্য জীবন দুটি বিভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত- ভাবগত ও বস্তুগত- এইভাবেই জীবনের বিকাশকে আমাদের গণ্য করতে হবে।

এই হলো মার্কসের বস্তুবাদী তত্ত্বের অদ্বৈতবাদ।
সঙ্গে সঙ্গে মার্কস ভাববাদকেও প্রত্যাখ্যান করেন। এই ভাবা ভুল হবে যে, ভাবগত দিক এবং সাধারণভাবে চেতনা তার বিকাশের প্রকৃতি তথা সাধারণভাবে বস্তুগত দিকের পূর্ববর্তী। তথাকথিত বাহ্য প্রাণহীন প্রকৃতি জীবন্ত সত্তাসমূহে অস্তিত্বের পূর্বেই বিদ্যমান ছিল। প্রথম জীবন্ত বস্তু প্রোটোপ্লাজমÑ জীবকোষের মূল উপাদান- তার কোন চেতনা ছিল না। তার ছিল কেবলমাত্র উত্তেজনা ও সংবেদনার অঙ্কুর। পরবর্তীকালে ক্রমে ক্রমে প্রাণিদের সংবেদন শক্তি ধীরে ধীরে চেতনায় রূপান্তরিত হলো। বানর যদি চিরকাল চার হাত পায়ে হেঁটে বেড়াত, সে যদি কোনদিনই সোজা হয়ে না দাঁড়াত, তাহলে তার বংশধর মানুষ ফুসফুস ও স্বরতন্ত্রীসমূহ অবাধে ব্যবহার করতে পারতো না এবং সেইজন্য, কথাও বলতে সক্ষম হতো না; এবং তা বহুলাংশে তার চেতনার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতো। অর্থাৎ বানর যদি তার পেছনের পা দুটির ওপর ভর করে না হাঁটতে পারতো তাহলে তার বংশধর মানুষ চিরকাল নিচের দিকে তাকাতে বাধ্য হতো এবং শুধু সেখান থেকেই তার সব ধারণা লাভ করতো। এখন যেমন সে তাকায় তখন সে উপরে এবং তার চারপাশে তাকাতে পারতো না এবং সেজন্য যার মস্তিষ্ক একটি বানরের মস্তিষ্কের চেয়ে বেশি ধারণা অর্জন করতে পারতো না এবং তা তার চেতনার বিকাশকে বহু পরিমাণে পিছিয়ে দিতো। এর থেকে এটাই আসে যে চেতনাগত দিকের বিকাশ, ভাবের বিকাশ দেহের কাঠামো এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। এ থেকে আসে যে চেতনাগত দিকের বিকাশ ভাবের বিকাশের পূর্ববর্তী হলো বস্তুগত দিকের বিকাশ, সামাজিক অস্তিত্বের বিকাশ। স্পষ্টত প্রথমে বাইরের অবস্থা বদলায়, প্রথমে বস্তুর পরিবর্তন হয়- ভাবগত দিকের বিকাশ বস্তুগত দিকের বিকাশের পেছনে পড়ে থাকে। বস্তুগত দিককে, বাইরের পরিবেশকে সামাজিক অস্তিত্ব ইত্যাদিকে যদি আমরা বলি বিষয়বস্তু, তাহলে ভাবগত দিক চেতনা এবং এই রকমের ব্যাপারকে আমাদের বলতে হবে রূপ। এ থেকেই উদ্ভুত হয়েছিল সুবিদিত বস্তুবাদী তত্ত্ব; ক্রমবিকাশের গতিধারায় বিষয়বস্তু রূপের পুরোবর্তী থাকে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে।

সামাজিক জীবন সম্পর্কে একটি কথা বলতে হবে, সেখানেও বস্তুগত পরিবর্তন পূরোবর্তী, এখানেও রূপ বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে। এমনকি যখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা চিন্তা করাও হয়নি, তার আগে থেকেই ধনতন্ত্র বিদ্যমান ছিল এবং একটি ভীষণ শ্রেণি সংগ্রাম প্রচণ্ডভাবে চলছিল। সমাজতান্ত্রিক ধারণার উদ্ভবের অনেক আগেই উৎপাদনের প্রক্রিয়া একটি সামাজিক চরিত্র ধারণ করেছিল।

এখানেই মার্কস বলেন, ‘আমাদের চেতনা তার বাস্তব অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না; পক্ষান্তরে তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে।’ (এ কন্ট্রিবিউসন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনোমি- কার্ল মার্কস)। মার্কসের মতে অর্থনৈতিক বিকাশ হলো সামাজিক বিকাশের বস্তুগত ভিত্তি, তার বিষয়বস্তু, তার আইনগত রাজনৈতিক ও ধর্মগত দার্শনিক বিকাশ হলো এই বিষয়বস্তুর ভাবাদর্শগত রূপ, তার উপরিকাঠামো। সেইজন্য মার্কস বলেন, ‘অর্থনৈতিক ভিত্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সমগ্র বিরাট উপরিকাঠামো কম বেশি দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হয়।’ (ঐ)

সামাজিক জীবনেও প্রথমে উপরের বস্তুগত অবস্থা পরিবর্তিত হয় এবং তারপর মানুষের চিন্তা তাদের বিশ্ববিক্ষা বদলায়। বিষয়বস্তুর বিকাশ রূপের উদ্ভব ও বিকাশের পূর্ববর্তী। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, মার্কসের মতে রূপ ছাড়াই বিষয়বস্তু সম্ভব- যেমন এস-এইস জি. মনে করেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অসম্ভব; কিন্তু বিষয়টি হলো এই যে, যেহেতু একটি নির্দিষ্ট রূপ তার বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে, সেহেতু রূপটি কখনও এই বিষয়বস্তুর পুরোপুরি অনুরূপ হয় না; এবং নতুন বিষয়বস্তুটি প্রায়শঃই কিছুকালের জন্য পুরনো রূপে আবৃত থাকতে বাধ্য হয় এবং তার ফলে তাদের মধ্যে নতুন বিষয়বস্তু ও পুরাতন রূপের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ বর্তমান সময়ে উৎপন্ন বস্তুর আত্মসাতের ব্যক্তিগত চরিত্র উৎপাদনের সামাজিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এবং আজকের দিনের সামাজিক সংঘর্ষের এই হলো ভিত্তি। অন্যপক্ষে ভাব বাস্তব সত্তার একটি রূপ- এই প্রকৃতিগতভাবে ধারণার অর্থ এই নয় যে, তার চেতনা ও বিষয়বস্তু একই জিনিস। এই মত পোষণ করতেন কেবলমাত্র স্থূল বস্তুবাদীরা। তাদের তত্ত্বসমূহ মার্কসের বস্তুবাদকে মূলগতভাবে অস্বীকার করে। এবং এঙ্গেলস তার লুডউইগ ফয়েরবাখে এদের সঠিকভাবে বিদ্রুপ করেছিলেন। মার্কসের বস্তুবাদী চেতনা ও বাস্তব সত্তা মন এবং বস্তু, একই ব্যাপারের দুটি বিভিন্ন রূপ, যাকে মোটামুটিভাবে বলা হয় প্রকৃতি, সুতরাং তাদের পরস্পর পরস্পরকে নিরাকরণ করে না, কিন্তু তারা আবার এক ব্যাপারও নয়। একমাত্র বিষয় হলো এই যে, প্রকৃতি ও সমাজের বিকাশে চেতনা- অর্থাৎ যা আমাদের মাথার মধ্যে ঘটে একটি তদনুরূপ বস্তুগত পরিবর্তন- অর্থাৎ যা আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা নিরপেক্ষ। কোন নির্দিষ্ট বস্তুগত পরিবর্তনকে শীঘ্র কিংবা দেরিতে একটি অনুরূপ ভাবগত পরিবর্তন অনিবার্যভাবেই অনুসরণ করে। এই জন্যই আমরা বলি একটি ভাবগত পরিবর্তন হলো তদনুরূপ একটি বস্তুগত পরিবর্তনের রূপ।

সাধারণভাবে এই হলো মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের অদ্বৈতবাদ।
কেউ কেউ আমাদের বলবেনঃ প্রকৃতি ও সমাজের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এ সমস্ত প্রযুক্ত হলে, সেসব সত্য হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে নির্দিষ্ট বস্তু সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা এবং ভাব কীভাবে আমাদের মাথার মধ্যে জাগে? তথাকথিত বাইরের অবস্থাগুলি কী সত্যসত্যই বিদ্যমান, না এইসব বাইরের অবস্থা সম্বন্ধে আমাদের ধারণাগুলিই শুধু বিদ্যমান এবং যদি বাইরের অবস্থার অস্তিত্ব থাকেই, তাহলে কোন মাত্রা পর্যন্ত তারা প্রত্যক্ষ এবং পরিজ্ঞেয়?

এই বিষয়টি সম্পর্কে আমরা বলিঃ বাইরে অবস্থা যতখানি বিদ্যমান থেকে আমাদের অহং এর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, আমাদের ধারণা আমাদের অহংও ঠিক ততখানি বিদ্যমান। যে কেউই না ভেবে, না চিন্তে বলে যে, আমাদের ধারণা ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই, তাকেই সমস্ত বাইরের অবস্থা অস্বীকার করতে বাধ্য হতে হয় এবং সেই কারণেই, তার নিজের অহং ছাড়া অন্য সমস্ত লোকের অস্তিত্ব তাকে অস্বীকার করতেই হয়। এটা বিজ্ঞান এবং জীবন্ত বাস্তবের প্রধান প্রধান নীতিসমূহের মূলগতভাবে বিরোধী। হ্যাঁ, বাইরের অবস্থা সত্যই বিদ্যমান; এই অবস্থাগুলি আমাদের আগেও ছিল আমাদের পরেও থাকবে; এবং যত ঘন ঘন এবং যত প্রবলভাবে আমাদের চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তত সহজে তারা প্রত্যক্ষ ও পরিজ্ঞেয় হয়। বর্তমান সময়ে নির্দিষ্ট বস্তু সম্পর্কে কীভাবে বিভিন্ন ধারণা ও ভাব আমাদের মাথার মধ্যে জাগে, সে বিষয় সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে যে, প্রকৃতি ও সমাজের ইতিহাসে যা ঘটছে এখানে আমরা তারই সংক্ষিপ্ত পুনরাবৃত্তি পাই। এ ব্যাপারেও আমাদের বাইরের বস্তু আমাদের ধারণার পূর্ববর্তী; এ ব্যাপারেও আমাদের ধারণা অর্থাৎ রূপ বস্তুর পেছনে অর্থাৎ বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে। যখন আমি একটা গাছের দিকে তাকিয়ে গাছটিকে দেখতে পাই- তা কেবল দেখিয়ে দেয় যে, আমার মাথার মধ্যে একটি গাছের ধারণা জন্মাবার পূর্বেই গাছটির অস্তিত্ব ছিল; দেখিয়ে দেয় যে, এই গাছটিই আমার মাথার মধ্যে অনুরূপ ধারণা জাগিয়ে তুলেছিল।

মানব জাতির ব্যবহারিক কার্যকলাপে মার্কস ও এঙ্গেলসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদের গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়। যদি আমাদের বিশ্ববীক্ষা আমাদের অভ্যাস, আমাদের রীতি-নীতি বাইরের অবস্থার দ্বারা নির্ধারিত হয়, যদি আইনগত, রাজনীতিগত রূপের অনুপযোগিতা একটি অর্থনৈতিক বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে অর্থনৈতিক সম্পর্কসমূহে একটি মূলগত পরিবর্তন ঘটাতে আমরা অবশ্যই সাহায্য করবো যাতে এই পরিবর্তনের সাথে, জনসাধারণের অভ্যাসে, রীতিনীতিতে এবং তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি মূলগত পরিবর্তন ঘটানো যায়।

এই বিষয়ে কার্ল মার্কস বলেছিলেনঃ
“বস্তুবাদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের আন্তঃসংযোগ প্রত্যক্ষ করার জন্য খুব বিরাট একটা বিচারশক্তির দরকার হয় না। যদি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ থেকে মানুষ তার সমস্ত জ্ঞান, প্রত্যক্ষ ইত্যাদি গঠন করে… তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায় যে, অভিজ্ঞতা গোচর এই পৃথিবীকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সে এর ভিতর সত্যকারের যা মানবিক তার অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে, যাতে সে একজন মানুষ হিসাবে অভিজ্ঞতা অর্জনে অভ্যস্ত হয়। … বস্তুবাদী অর্থে মানুষ যদি স্বাধীন না হয়- অর্থাৎ এটা বা ওটা এড়িয়ে চলতে সমর্থ হবার নেতিবাচক শক্তির কারণে স্বাধীন নয়, সে স্বাধীন হয় তার প্রকৃত ব্যক্তিসত্তাকে স্বপ্রতিষ্ঠা করার ইতিবাচক ক্ষমতার কারণে, তাহলে অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি মানুষকে শান্তি দেওয়া উচিত নয়, বরং উচিত অপরাধের সমাজ বিরোধী প্রজনন ক্ষেত্রগুলিকে ধ্বংস করা … মানুষ যদি অবস্থার দ্বারা গঠিত হয়, তাহলে অবস্থাকেও অবশ্যই মানবিকভাবে গঠন করতে হবে। (লুডউইগ ফয়েরবাখ, পরিশিষ্ট দেখুন, অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি বস্তুবাদের ইতিহাস সম্পর্কে কার্ল মার্কস)।

বস্তুবাদ ও মানুষের ব্যবহারিক কার্যকলাপের ভিতর এই হলো সম্পর্ক।
মার্কস ও এঙ্গেলসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের অভিমত কি?
মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির উদ্ভব হেগেল থেকে আর তার বস্তুবাদী তত্ত্ব হলো ফয়েরবাখের তত্ত্বের আরও বিকাশ। নৈরাজ্যবাদীরা এটা ভালভাবেই জানে, এবং তারা মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে অপদস্থ করার জন্য হেগেল ও ফয়েরবাখের ত্রুটির সুবিধা গ্রহণ করার চেষ্টা করে। আমরা হেগেল সম্পর্কে আলোচনায় এর আগেই দেখিয়েছি যে, নৈরাজ্যবাদীদের এই সমস্ত চাতুরি তাদের নিজেদের তার্কিক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করে না। ফয়েরবাখ সম্পর্কেও ওই একই কথা বলতে হয়। উদাহরণস্বরূপ তারা জোরের সঙ্গে বলে, ‘ফয়েরবাখ ছিলেন একজন সর্বেশ্বরবাদী’, বলে যে তিনি মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ করেছিলেন, যে ফয়েরবাখের মতে, মানুষ যা খায় সে তাই….’ তারা অভিযোগ করেছে, এ থেকে মার্কস নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত টেনেছিলেনঃ সুতরাং প্রধান ও প্রাথমিক জিনিস হল অর্থনৈতিক অবস্থাসমূহ ইত্যাদি। সত্য বটে ফয়েরবাখের সর্বেশ্বরবাদ, মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ এবং তার একই রকমের অন্যান্য ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে কারও কোনো সন্দেহ নেই। পক্ষান্তরে মার্কস ও এঙ্গেলসই সর্বপ্রথম ফয়েরবাখের ভুলভ্রান্তি উদঘাটিত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও নৈরাজ্যবাদীরা আগেই উন্মোচিত ফয়েরবাখের ভুলভ্রান্তিকে পুনরায় উদঘাটিত করা প্রয়োজন মনে করে। কেন? খুব সম্ভবত এই জন্য যে, ফয়েরবাখকে গালাগালি করে তারা বস্তুবাদকে অপদস্থ করতে চায়, কারণ মার্কস ফয়েরবাখের কাছ থেকেই বস্তুবাদের তত্ত্বটি ধার করেছিলেন এবং তার পর তাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিকশিত করেছিলেন। ফয়েরবাখের কী একই সঙ্গে কিছু ঠিক কিছু ভুল ধারণা থাকতে পারে না? আমরা বলছি যে এই ধরনের চাতুরির দ্বারা নৈরাজ্যবাদীরা অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদকে এতটুকুও টলাতে পারবে না, তারা যা করতে পারবে তা হলো নিজেদের ব্যর্থতা প্রমাণ করা।
মার্কসের বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যেই মতের মিল নেই। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আমাদের যদি মিঃ চেরকেজিশভিলির বক্তব্য শুনতে হয় তাহলে মনে হবে মার্কস ও এঙ্গেলস অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদকে ঘৃণা করতেন; তার মতে, তাদের বস্তুবাদ হলো স্থূল এবং তা অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ নয়ঃ ‘প্রকৃতিবিদদের মহান বিজ্ঞান তার বিবর্তনের প্রণালী, রূপান্তরবাদ এবং অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ- যা এঙ্গেলস এত আন্তরিকভাবে ঘৃণা করতেন …. সে সব দ্বন্দ্ববাদকে পরিহার করেছে ইত্যাদি। সুতরাং এ থেকে এইটি আসে যে, চেরকেজিশভিলি কর্তৃক অনুমোদিত এবং এঙ্গেলস কর্তৃক ঘৃণিত প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ ছিল অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ। কিন্তু আর একজন নৈরাজ্যবাদী আমাদের বলছে যে, মার্কস ও এঙ্গেলসের বস্তুবাদ হলো অদ্বৈতবাদী এবং সেজন্যই তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মার্কসের ইতিহাসের ধারণা হেগেলের ধারণাতেই প্রত্যাবর্তন।

সাধারণভাবে পরম বিষয়মুখীতার অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ, এবং বিশেষভাবে মার্কসের অর্থনৈতিক অদ্বৈতবাদ প্রকৃতিগতভাবে অসম্ভব এবং তত্ত্বগতভাবে অযৌক্তিক। অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ হলো অক্ষমভাবে প্রচ্ছন্ন দ্বৈতবাদ এবং অধিবিদ্যা ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটি আপস। সুতরাং এ থেকে আসে যে অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ গ্রহণীয় নয়, কারণ মার্কস ও এঙ্গেলস একে ঘৃণা তো করতেনই না, বরং তারা নিজেরাই ছিলেন অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদী।

যদি মনে করেন একে নৈরাজ্যবাদ বলতে পারেন! তারা এখনও মার্কসের বস্তুবাদের সারমর্মই উপলব্ধি করতে পারেনি, তারা এখনও বোঝেনি যে, মার্কসের বস্তুবাদ অদ্বৈতবাদী কী না, এর গুণাগুণ সম্পর্কে তারা নিজেদের মধ্যেই একমত হতে পারেনি, কিন্তু তারা এর মাঝেই এই উদ্ধৃত দাবিতে আমাদের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে যে, আমরা সমালোচনা করে মার্কসের বস্তুবাদকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছি! এ থেকেই বোঝা যায় যে, তাদের সমালোচনার কী ভিত্তি থাকতে পারে।

আরও দেখা যাক। মনে হয় যে কিছু নৈরাজ্যবাদী এই সত্য সম্পর্কেও অজ্ঞ যে বিজ্ঞানশাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের বস্তুবাদ আছে, যারা পরস্পর থেকে বহু পরিমাণে পৃথকঃ উদাহরণস্বরূপ আছে স্থূল বস্তুবাদ (প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে এবং ইতিহাসে), যা ভাববাদী দিকের গুরুত্বকে এবং বস্তুবাদী দিকের ওপর এর ফলাফলকে অস্বীকার করে। কিন্তু আবার তথাকথিত অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদও আছে- যা বস্তুবাদী ও ভাববাদী দিকের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ককে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচার করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এসবের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলে এবং সেইসঙ্গে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জাহির করেঃ তোমরা পছন্দ কর আর নাই কর, আমরা মার্কস ও এঙ্গেলসের বস্তুবাদকে সমালোচনা করে উৎসন্ন করে দিচ্ছি। শুনুন তা হলেঃ ‘এঙ্গেলস ও কাউৎস্কির মতে, মার্কস অন্যান্য জিনিস ছাড়াও বস্তুবাদী ধারণা আবিষ্কার করে মানবজাতির বিরাট কল্যাণ করেছেন।’ এটা কি সত্য? আমরা তা মনে করি কী না, কেননা আমরা জানি ….যে সমস্ত ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক এই মতের অনুগামী যে, সমাজব্যবস্থা ভৌগলিক, আবহাওয়াগত, জাগতিক, মহাজাগতিক, নৃতাত্ত্বিক এবং জীবতাত্ত্বিক অবস্থাবলী দ্বারা গতিশীল- তারা সকলেই বস্তুবাদী’ (২নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। এইসব লোকের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা চলে! তাহলে এ থেকে আসে যে, এ্যারিস্টোটল ও মন্তেস্কুর বস্তুবাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য নেই মার্কস ও সেন্ট মাইমনের বস্তুবাদের মধ্যে। প্রতিপক্ষকে বুঝে তাকে সমালোচনা করে ভূমিস্যাৎ করে দেবার চমৎকার দৃষ্টান্তও বটে!

কোন কোন নৈরাজ্যবাদী কোথাও হয়তো শুনেছেন যে মার্কসের বস্তুবাদ হলো একটি পৈটিকতত্ত্ব এবং তক্ষুণি তারা এই ধারণাকে ব্যাপকভাবে জন সাধারণ্যে প্রচার করতে লেগে গেলেন- সম্ভবত নোবাতি অফিসে কাগজের দাম শস্তা এবং কাজে খরচও বিশেষ পড়ে না। শুনুন তাহলে, ফয়েরবাখের মতে মানুষ যা খায়, সে তাই। এই সূত্র মার্কস ও এঙ্গেলসের ওপর ঐন্দ্রজালিক প্রভাব বিস্তার করলো। এবং নৈরাজ্যবাদীদের মতে, এ থেকে মার্কস এই সিদ্ধান্ত টানলেন যে, সুতরাং প্রধান ও প্রাথমিক জিনিস হলো অর্থনৈতিক অবস্থা উৎপাদন সম্পর্ক। এবং তার পরে নৈরাজ্যবাদীরা এগিয়ে এলেন দার্শনিক ভঙ্গিতে আমাদের শিক্ষা দিতেঃ এটা বলা ভুল হবে যে সমাজ জীবনে এই উদ্দেশ্য সাধনের একমাত্র উপায় হলো খাওয়া এবং অর্থনৈতিক উৎপাদন। ….অদ্বৈতবাদী মতানুযায়ী যদি ভাবাদর্শ প্রধানত নির্ধারিত হতো খাওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্বের দ্বারা- তাহলে কিছু পেটুক ব্যক্তিই প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি হতো। তাহলে দেখছেন মার্কসের বস্তুবাদকে সমালোচনা করা কত সহজ। রাস্তায় কোন স্কুল বালিকার কাছ থেকে মার্কস ও এঙ্গেলস সম্পর্কে চুটকি কথা শোনাই যথেষ্ট, যথেষ্ট রাস্তার সেই চুটকি কথাকে দার্শনিক আত্মবিশ্বাসে মুড়ে নোভাতির মতো সংবাদপত্রের পাতায় পুনরাবৃত্তি করা এবং মার্কসের সমালোচক হিসাবে হঠাৎ খ্যাতি অর্জন করা। কিন্তু ভদ্রলোকেরা একটা কথা বলুনঃ কোথায় কখন কোন দেশে মার্কসকে বলতে শুনেছেন যে খাওয়া ভাবাদর্শকে নির্ধারিত করে? আপনাদের অভিযোগের সমর্থনে মার্কসের রচনাবলী থেকে একটি মাত্র উদ্ধৃত করলেন না কেন? অর্থনৈতিক অবস্থা এবং খাওয়া কি একই জিনিস? এই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণার মধ্যে তালগোল পাকানোর জন্য বড় জোর একটি স্কুল বালিকাকে ক্ষমা করা যেতে পারে, কিন্তু এটা কেমন যে আপনারা, স্যোস্যাল ডেমোক্রাসির পরাভবকারীরা, বিজ্ঞানের নব জন্মদাতারা এত অসতর্কভাবে স্কুল বালিকার ভুলকে পুনরাবৃত্তি করছেন? বাস্তবিক পক্ষে খাওয়া কীভাবে সামাজিক ভাবাদর্শকে নির্ধারিত করতে পারে? আপনারা নিজেরাই যা বলেছেন, তা ভেবে দেখুনঃ খাওয়া, খাওয়ার ধরণ বদলায় না, এখন যেভাবে করা হয়, পুরাকালে ঠিক সেইভাবে মানুষ খেত, চিবোত এবং খাদ্য হজম করতো। কিন্তু ভাবাদর্শের রূপ সব সময় বদলায়, বিকশিত হয়। প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক, বুর্জোয়া এবং শ্রমিক শ্রেণির এইগুলি হলো ভাবাদর্শের রূপ। এটা কি কল্পনীয় যে যা, সাধারণভাবে বলতে গেলে, বদলায় না, তা, যা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে তাকে নির্ধারণ করতে পারে? সত্য, মার্কস বলেছেন যে অর্থনৈতিক অস্তিত্ব ভাবাদর্শকে নির্ধারণ করে- এবং তা উপলব্ধি করা সহজ, কিন্তু খাওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্ব কী একই জিনিস? আপনারা আপনাদের ব্যর্থতা মার্কসের স্বন্ধে আরোপ করাটা যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করলেন কেন?

আরও দেখা যাক আমাদের নৈরাজ্যবাদীদের মতে, মার্কসের বস্তুবাদ হলো সমান্তরালবাদ।… অথবা পুনরায়ঃ অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ হলো অক্ষমভাবে প্রচ্ছন্ন দ্বৈতবাদ এবং অধিবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের মধ্যে একটা আপোস।…’ মার্কস দ্বৈতবাদের মধ্যে পড়ে যায়, কেননা তিনি উৎপাদন সম্পর্ককে বস্তুগত হিসাবে এবং মানুষের প্রচেষ্টা এবং সঙ্কল্পকে একটি মায়া তথা কল্পনা হিসাবে চিত্রিত করেছেন, তা যদি থেকেও থাকে, তবুও তার কোনো গুরুত্ব নেই’। প্রথমতঃ, নির্বোধ সমান্তরালবাদের সঙ্গে মার্কসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদের কোন সম্পর্ক নেই। বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বস্তুগত দিক বিষয়বস্তু অবশ্যই ভাবগত দিক তথা তার রূপের পুরোবর্তী। কিন্তু সমান্তরালবাদ এই মতকে অস্বীকার করে এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে যে, বস্তুগত ও ভাবগত কোনোটিই কারো আগে আসে না; তারা যুগপৎ পাশাপাশি বিকশিত হয়। দ্বিতীয়ত, মার্কসের অদ্বৈতবাদ এবং দ্বৈতবাদের মধ্যে কী মিল থাকতে পারে যখন আমরা পুরোপুরি ভালভাবেই জানি (এবং অন্যান্য নৈরাজ্যবাদী মশাইরা একথা জানবেন যদি অবশ্য আপনারা মার্কসীয় সাহিত্য পড়েন) যে অদ্বৈতবাদ একটি মূলনীতি অর্থাৎ প্রকৃতি, যার একটি বস্তুগত ও একটি ভাবগত রূপ আছে, তা থেকে উদ্ধৃত তদ্বিপরীতে দ্বৈতবাদ দুটি মূলনীতি- বস্তুগত ও ভাবগত থেকে উদ্ভুত যারা, দ্বৈতবাদ অনুযায়ী পরস্পর পরস্পরে নিরাকরণ করে। তৃতীয়ত কে বলেছেন যে মানুষের প্রচেষ্টা ও সংকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়? আপনার জায়গাটা দেখিয়ে দেননা কেন, যেখানে মার্কস একথা বলেছেন? মার্কস কী তার এইটিনথ ব্রুমেয়ার অব লুই বোনাপার্ট, তার ক্লাস স্ট্রাগেলস ইন ফ্রান্স আর সিভিল ওয়ার ইন ফ্রান্স এবং অন্যান্য পুস্তিকায় প্রচেষ্টা ও সংকল্পের গুরুত্বের কথা বলছেন না? তবে কেন মার্কস সর্বহারা শ্রেণির সংকল্প ও প্রচেষ্টাকে সমাজতান্ত্রিক ধারায় বিকশিত করতে চেয়েছিলেন; যদি তিনি প্রচেষ্টা ও সঙ্কল্পের ওপর গুরুত্ব দিয়ে না থাকেন, তাহলে কেন তিনি তাদের মধ্যে প্রচার আন্দোলন চালিয়েছিলেন অথবা, এঙ্গেলস তার ১৮৯১-৯৪ এর সুবিদিত প্রবন্ধগুলিতে কী সম্পর্কে বলেছিলেন যদি প্রচেষ্টা ও সংকল্পের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে থাকেন? সত্য বটে মানুষের প্রচেষ্টা ও সংকল্প অর্থনৈতিক অবস্থাবলী থেকে তাদের বিষয়বস্তু অর্জন করে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকাশের ওপর তারা কোন প্রভাব বিস্তার করে না। সত্য সত্যই কী নৈরাজ্যবাদীদের পক্ষে এমন একটি সরল ধারণা বুঝতে পারা এতই কঠিন? এটা সঠিকই বলা হয় যে, সমালোচনার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা এক জিনিস আর কার্যক্ষেত্রে সমালোচনা করা অন্য জিনিস।

নৈরাজ্যবাদী মশাইরা আর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন ঃ ‘বিষয়বস্তু ছাড়া রূপ অকল্পনীয়…’, সুতরাং বলা যায় না যে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে… তারা সহঅবস্থান করে, তা না হলে অদ্বৈতবাদ হয়ে পড়ত একটি অসম্ভব ব্যাপার’ (১নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অকল্পনীয় সত্য, কিন্তু বিদ্যমান রূপ বিদ্যমান বিষয়বস্তুর সঙ্গে কখনও হুবহু একরূপ হয় না। নতুন বিষয়বস্তু কিছুদূর পর্যন্ত সব সময়ে পুরানো রূপে আবৃত থাকে। এর ফলে সব সময়ে পুরাতন রূপ এবং নতুন বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা সংঘর্ষ বাধে। ঠিক এই কারণেই বিপ্লব সংঘটিত হয়, এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটাও একটি যা মার্কসের বস্তুবাদের মূলনীতিকে প্রকাশ করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু নেই, এ কথাটা জেদের সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করছে।

এই হলো বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মত। আমরা আর কিছু বলবো না। এটা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়েছে যে নৈরাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের মার্কসকে উদ্ভাবন করেছে, নিজ নৈরাজ্যবাদী মশাইরা আর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন ঃ ‘বিষয়বস্তু ছাড়া রূপ অকল্পনীয়…’, সুতরাং বলা যায় না যে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে… তারা সহঅবস্থান করে, তা না হলে অদ্বৈতবাদ হয়ে পড়ত একটি অসম্ভব ব্যাপার’ (১নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অকল্পনীয় সত্য, কিন্তু বিদ্যমান রূপ বিদ্যমান বিষয়বস্তুর সঙ্গে কখনও হুবহু একরূপ হয় না। নতুন বিষয়বস্তু কিছুদূর পর্যন্ত সব সময়ে পুরানো রূপে আবৃত থাকে। এর ফলে সব সময়ে পুরাতন রূপ এবং নতুন বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা সংঘর্ষ বাধে। ঠিক এই কারণেই বিপ্লব সংঘটিত হয়, এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটাও একটি যা মার্কসের বস্তুবাদের মূলনীতিকে প্রকাশ করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু নেই, এ কথাটা জেদের সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করছে।

এই হলো বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মত। আমরা আর কিছু বলবো না। এটা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়েছে যে নৈরাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের মার্কসকে উদ্ভাবন করেছে, নিজেদের উদ্ভাবিত একটি বস্তুবাদী তত্ত্ব তার মুখে আরোপ করেছে এবং তারপরে সেই বস্তুবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কিন্তু তাদের একটি বুলেটও সত্যকার মার্কস ও সত্যকার বস্তুবাদকে আঘাত করতে পারবে না।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭

Advertisements

মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ -ভ.ই.লেনিন

jpg

সভ্য দুনিয়ার সর্বত্র বুর্জোয়া বিজ্ঞানের (সরকারি এবং উদারনীতিক উভয় প্রকার) পক্ষ থেকে মার্কসের মতবাদের প্রতি চূড়ান্ত শত্রুতা ও আক্রোশ দেখা যায়। মার্কসবাদকে তারা দেখে একধরনের `বিষাক্ত গোষ্ঠী’ হিসাবে। অবশ্যই অন্য কোন মনোভাব আশা করা বৃথা, কেননা শ্রেণি সংগ্রামের ওপর গড়ে ওঠা সমাজে `নিরপেক্ষ’ সমাজবিজ্ঞানের অস্তিত্ব অসম্ভব। সবরকমের সরকারি ও উদারনীতিক বিজ্ঞানেই কোন না কোনভাবে মজুরি-দাসত্বের সমর্থন করা হয়ে থাকে, আর সে মজুরি-দাসত্বের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন সংগ্রাম ঘোষণা করেছে মার্কসবাদ। পুঁজির মুনাফা কমিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো উচিত নয় কিÑ এই প্রশ্নে মিলমালিকদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা আর মজুরি-দাসত্বের সমাজে, বিজ্ঞানের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা সমান বাতুলতা।

কিন্তু এইটুকুই সব নয়। `গোষ্ঠীবাদ’ বলতে যদি বোঝায় একটা আত্মবদ্ধ শিলীভূত মতবাদ, যার উদয় হয়েছে বিশ্বসভ্যতা বিকাশের রাজপথ থেকে বহুদূরে, তবে দর্শন এবং সামাজিক বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে অতি পরিষ্কার করে দেখা যায় যে, মার্কসবাদের মধ্যে তেমন কোন কিছুই নেই। বরং মার্কসের সমগ্র প্রতিভাটাই এইখানে যে, মানব সমাজের অগ্রণী ভাবনায় যে সব জিজ্ঞাসা আগেই দেখা দিয়েছিল মার্কস তারই জবাব দিয়েছেন। তাঁর মতবাদের উদ্ভব হয়েছে দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং সমাজবাদের মহাচার্যেরা যে শিক্ষা দান করেছিলেন, তাই সরাসরি ও অব্যবহিত অনুবর্তন হিসেবে।

মার্কসের মতবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য। এ মতবাদ সুসম্পূর্ণ ও সুসমজ্ঞস্য; এর কাছ থেকে যে সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করা যায় তা কোন রকম কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়া অথবা বুর্জোয়া জোয়ালের কোনোরূপ সমর্থনের সঙ্গে আপস করে না। ঊনিশ শতকের জার্মান দর্শন, ইংরেজ অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসি সমাজবাদ রূপে মানবজাতির যা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী হল মার্কসবাদ। মার্কসবাদের এই তিনটি উৎস এবং সেই সঙ্গে তিনটি অঙ্গ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।


মার্কসবাদের দর্শন- বস্তুবাদ। ইউরোপের সমগ্র আধুনিক ইতিহাস থেকে এবং বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে, ফ্রান্সে যখন সবরকম মধ্যযুগীয় জঞ্জালের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠান ও ধ্যান-ধারণায় নিহিত সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রাম জ্বলে উঠেছিল, তখন থেকে বস্তুবাদই দেখা দিয়েছে একমাত্র সঙ্গতিপরায়ণ দর্শন হিসাবে, যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমস্ত সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্ত এবং কুসংস্কার, ভণ্ডামি প্রভৃতির শত্রু। গণতন্ত্রের শত্রুরা তাই বস্তুবাদকে `খণ্ডন করার’ জন্য, তাকে ধূলিসাৎ ও নিন্দিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এবং সমর্থন করেছে নানা ধরনের দার্শনিক ভাববাদ যা সর্বদাই পর্যবসিত হয় কোন না কোনভাবে ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ অথবা সমর্থনে।

মার্কস ও এঙ্গেলস অতি দৃঢ়তার সঙ্গে দার্শনিক বস্তুবাদকে সমর্থন করেছেন এবং এই ভিত্তি থেকে প্রত্যেকটি বিচ্যুতিই যে কী দারুণ ভুল তা বারবার ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন। তাঁদের এই মতামত সবচেয়ে পরিষ্কার করে এবং বিশদভাবে ব্যক্ত হয়েছে এঙ্গেলসের রচনা `ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ’ এবং `অ্যান্টি-দ্যুরিং’ বইতে। কমিউনিস্ট ইশতেহারের মতো এই বই দু’খানিও প্রত্যেকটি শ্রেণি সচেতন শ্রমিকদের কাছে নিত্যপাঠ্য।

অষ্টাদশ শতাব্দির বস্তুবাদেই কিন্তু মার্কস থেমে যাননি, দর্শনকে তিনি অগ্রসর করে গেছেন। এ দর্শনকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন জার্মান চিরায়ত দর্শনের সম্পদ দিয়ে, বিশেষ করে হেগেলীয় তত্ত্ব দিয়ে, যা আবার পৌঁছিয়েছেন ফয়েরবাখের বস্তুবাদে। এই সব সম্পদের মধ্যে প্রধান হলো দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব, অর্থাৎ গভীরতম, পূর্ণতম, একদেশদর্শিতাবর্জিত বিকাশের তত্ত্ব, যে মনুষ্য জ্ঞানে আমরা পাই নিরন্তর বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন তার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। জরাজীর্ণ পুরনো ভাববাদের ‘নব নব’ প্রত্যাবর্তনসহ সমস্ত বুর্জোয়া দার্শনিক মতবাদ সত্ত্বেও, রেডিয়ম, ইলেক্ট্রন, মৌলিক পদার্থের রূপান্তর প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আধুনিকতম আবিষ্কার থেকে মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ চমৎকার হয়েছে।

দার্শনিক বস্তুবাদকে গভীরতর ও পরিবিকশিত করে মার্কস তাকে সম্পূর্ণতা দান করেন, প্রকৃতি-বিষয়ক জ্ঞানকে প্রসারিত করেন মানবসমাজের জ্ঞানে। বৈজ্ঞানিক চিন্তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। ইতিহাস ও রাজনীতি-বিষয়ক মতামতে যে বিশৃঙ্খলা ও খামখেয়াল এযাবৎ চলে আসছিল তার সমাপ্তি ঘটিয়ে এগিয়ে এল এক আশ্চর্য রকমের সর্বাঙ্গীণ ও সুসামঞ্জস্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা দেখালো কী করে উৎপাদন শক্তিগুলির বিকাশের পথে সমাজজীবন একটি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভব হয় উচ্চতর ব্যবস্থার- দৃষ্টান্তস্বরূপ, কী করে সামন্ততন্ত্র থেকে বিকশিত হয় পুঁজিবাদ।

মানুষের জ্ঞান যেমন মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক জগতের, অর্থাৎ বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন, তেমনি সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিফলনই হলো মানুষের সামাজিক জ্ঞান (অর্থাৎ বিভিন্ন দার্শনিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক প্রভৃতি মতামত ও তত্ত্ব)। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি হল অর্থনৈতিক বনিয়াদের উপরিকাঠামো। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখা যাবে যে আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক রূপ যাই হোক, তার কাজ প্রলেতারিয়েতের ওপর বুর্জোয়ার প্রভুত্ব সংহত করা।

মার্কসের দর্শন হল সুসম্পূর্ণ দার্শনিক বস্তুবাদ- তা থেকে মানবসমাজ, বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি, তার জ্ঞানাঞ্জনশলাকা লাভ করেছে।


অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হল বনিয়াদ, তার ওপরেই রাজনৈতিক উপরিকাঠামো দণ্ডায়মান- এ কথা উপলব্ধির পর মার্কস তাঁর সবখানি মনোযোগ ব্যয় করেন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পর্যালোচনায়। মার্কসের প্রধান রচনা `পুঁজি’তে আধুনিক, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পর্যালোচিত হয়েছে।

মার্কসের পূর্বে চিরায়ত অর্থশাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিকশিত দেশে-ইংল্যান্ডে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনুসন্ধান করে এ্যাডাম স্মিত ও ডেভিড রিকার্ডো মূল্যের শ্রম-তত্ত্বের সূত্রপাত করেন। মার্কস তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি এ তত্ত্বকে অমূল্যরূপে সুসিদ্ধ ও সুসঙ্গতরূপে বিকশিত করেন। তিনি দেখান যে, পণ্যের উৎপাদনে সামাজিকভাবে আবশ্যক যে শ্রম-সময় ব্যয় হয়েছে, তাই দিয়েই তার মূল্য নির্ধারিত হয়। 
বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা যেখানে দেখছিলেন দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের সম্পর্ক (এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের বিনিময়) মার্কস সেখানে উদ্ঘাটিত করলেন মানুষে মানুষে সম্পর্ক। পণ্য বিনিময়ের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে বাজারের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদকদের পারস্পরিক সম্পর্ক। মুদ্রা থেকে সূচিত হচ্ছে, সে সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, বিভিন্ন উৎপাদকদের সমস্ত অর্থনৈতিক জীবন বাঁধা পড়েছে অবিচ্ছিন্ন সমগ্রতায়। পুঁজির অর্থ এই সম্পর্কের আরও বিকাশ: মানুষের শ্রম-শক্তি পরিণত হচ্ছে পণ্যে। জমি, কারখানা, শ্রমের হাতিয়ারপাতির মালিকের কাছে মজুরি শ্রমিক তার শ্রম-শক্তি বিক্রি করে। শ্রম-দিনের একাংশ সে খাটে তার সপরিবার ভরণপোষণের খরচা তোলার জন্য (মজুরি), বাকি অংশটা সে খাটে বিনামজুরিতে এবং পুঁজিপতির জন্য উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে যা পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফা ও সম্পদের উৎস।

মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূলকথা হলো এই উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব। 
শ্রমিকদের মেহনতে গড়া এই পুঁজি শ্রমিকদের পিষ্ট করে, ক্ষুদে মালিকদের ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে বেকার বাহিনীর। শিল্পের ক্ষেত্রে বৃহদাকার উৎপাদনের জয়যাত্রা অবিলম্বেই চোখে পড়ে, কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা যাবে : বৃহদাকার পুঁজিবাদী কৃষির প্রাধান্য বাড়ছে, যন্ত্রপাতির নিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষকের অর্থনীতি এসে মুদ্রাপুঁজির ফাঁসে আটকে যাচ্ছে, তারপর নিজের পশ্চাৎপদ টেকনিকের বোঝা নিয়ে ভেঙ্গে পড়ছে ও ধ্বংস হচ্ছে। কৃষিতে ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনের যে ভাঙন তার রূপগুলো অন্যরকম, কিন্তু ভাঙনটা তর্কাতীত সত্য। 
ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনকে ধ্বংস করে পুঁজি শ্রমের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটায় এবং বৃহৎ পুঁজিপতি সঙ্ঘগুলির একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি করে। উৎপাদনটাও উত্তরোত্তর সামাজিক হতে থাকে- লক্ষ লক্ষ এবং কোটি কোটি মজুর বাঁধা পড়ে একটি প্রণালীবদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়- কিন্তু যৌথ শ্রমের ফল আত্মসাৎ করে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। বৃদ্ধি পায় উৎপাদনের নৈরাজ্য, সংকট, বাজারের জন্য ক্ষিপ্ত প্রতিযোগিতা, এবং জনসাধারণের ব্যাপক অংশের মধ্যে জীবনধারণের অনিশ্চয়তা। 
পুঁজির কাছে শ্রমিকদের পরাধীনতা বাড়িয়ে তুলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্মিলিত শ্রমের মহাশক্তি গড়ে তোলে।

পণ্য অর্থনীতির ভ্রƒণাবস্থা থেকে, সরল বিনিময় থেকে শুরু করে তার সর্বোচ্চ রূপ, বৃহদাকার উৎপাদনের রূপ পর্যন্ত মার্কস পুঁজিবাদের বিকাশ পর্যালোচনা করেছেন। 
এবং নতুন পুরনো সবরকম পুঁজিবাদী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে মার্কসের এই মতবাদের সঠিকতা বছরের পর বছর বেশি বেশি মজুরদের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। 
সারা দুনিয়ায় পুঁজিবাদের জয় হয়েছে। কিন্তু এ জয় শুধু পুঁজির ওপর শ্রমের বিজয়লাভের পূর্বাভাস।


সামন্ততন্ত্রের পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় `মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, মেহনতি মানুষদের ওপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হল এ মুক্তির অর্থ। যে পীড়নের প্রতিফলন ও প্রতিবাদস্বরূপ নানাবিধ সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অবিলম্বে দেখা দিতে শুরু করে। কিন্তু আদিম সমাজবাদ ছিল ইউটোপীয় সমাজবাদ। পুঁজিবাদী সমাজের তা সমালোচনা করেছে, নিন্দা করেছে, অভিশাপ দিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে তার বিলুপ্তির, উন্নততর এক ব্যবস্থার কল্পনায় মেতেছে, আর ধনীদের বোঝাতে চেয়েছে শোষণ নীতিবিগর্হিত কাজ।

কিন্তু সত্যিকারের উপায় দেখাতে ইউটোপীয় সমাজবাদ পারেনি। পুঁজিবাদের আমলে মজুরি-দাসত্বের সারমর্ম কী তা সে বোঝাতে পরেনি, পুঁজিবাদের বিকাশের নিয়মগুলি কী তাও সে আবিষ্কার করতে পারেনি, খুঁজে পায়নি কোন সামাজিক শক্তি নতুন সমাজের নির্মাতা হবার ক্ষমতা ধরে।

ইতিমধ্যে সামন্ততন্ত্র, ভূমিদাসত্বের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের সর্বত্র এবং বিশেষ করে ফ্রান্সে যে সব উত্তাল বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছিল, তা থেকে উত্তরোত্তর পরিষ্কার করে বেরিয়ে আসে যে শ্রেণিসমূহের সংগ্রামই হল সমস্ত বিকাশের ভিত্তি ও চালিকা শক্তি।

মরিয়া প্রতিবন্ধকতা ছাড়া সামন্ত শ্রেণির উপর রাজনৈতিক স্বাধীনতার একটি বিজয়লাভও সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাদী সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম বিনা কোন পুঁজিবাদী দেশই ন্যূনাধিক মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।

কিন্তু বিশ্ব ইতিহাস থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, এ থেকে সে সিদ্ধান্ত সর্বাগ্রে মার্কসই গ্রহণ করেছেন এবং সুসঙ্গতরূপে তাকে টেনে নিয়ে গেছেন, এই হল মার্কসীয় প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। সে সিদ্ধান্তটা হল শ্রেণি সংগ্রামের মতবাদ।

সবকিছু নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়ে ছিল এবং চিরকাল থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাজে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে যদি না তারা এ কথা বোঝে যে, যত অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোন না কোন শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে। এবং এই সব শ্রেণির প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটিই উপায় আছে; যে শক্তি পুরানোর উচ্ছেদ ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে- এবং নিজের সামাজিক অবস্থা হেতু যা তাকে করতে হবে- তেমন শক্তিকে আমাদের চারপাশের সমাজের মধ্যে থেকেই আবিষ্কার করে তাকে শিক্ষিত ও সংগ্রামের জন্যে সংগঠিত করে তোলা।

যে মানবিক দাসত্বের মধ্যে নিপীড়িত শ্রেণিগুলির সকলে এতদিন বাঁধা পড়ে ছিল তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ প্রলেতারিয়েত পেয়েছে একমাত্র মার্কসের দার্শনিক বস্তুবাদ থেকে। একমাত্র মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বেই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সাধারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের সত্যিকার অবস্থাটা কী।

আমেরিকা থেকে জাপান এবং সুইডেন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা- সারা দুনিয়া জুড়ে প্রলেতারিয়েতের স্বাধীন সংগঠনের সংখ্যা বাড়ছে। নিজেদের শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে আলোকপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত হয়ে উঠেছে প্রলেতারিয়েত; বুর্জোয়া সমাজের কুসংস্কার থেকে তারা মুক্ত হয়ে উঠেছে; ক্রমেই নিবিড় হয়ে জোট বাঁধছে, শিখছে কী করে নিজেদের সাফল্যের খতিয়ান করতে হয়; আপন শক্তিসমূহকে তারা পোক্ত করে তুলছে এবং বেড়ে উঠছে অপ্রতিহতভাবে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭

 


পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বরখাস্ত হওয়া ‘জামপান্না’ বিশ্বাসঘাতক –সিপিআই(মাওবাদী)

Maoist-Jampanna

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য, সিনিয়র নেতা জিনুগু নরসিমহ রেড্ডী ওরফে জামপান্না একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তেলেঙ্গানা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, এককথায় ‘শত্রু’র কাছে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার মিডিয়াতে দেয়া এক বিবৃতিতে মাওবাদী পার্টি, “পার্টি লাইনের সাথে মতাদর্শগত পার্থক্য” মত বিষয়কে আশ্রয় করে নিজের দুর্বলতাগুলি ঢাকার চেষ্টা করার অভিযোগে জামপান্নাকে অভিযুক্ত করেছে। বিবৃতিতে এটিও প্রকাশ করা হয় যে, তাকে ২ বছরের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং একটি রাজ্য কমিটিকে গাইড করার জন্যে দায়িত্ব দেয়া হয়, যা কার্যত তার পদাবনতি।

রেড্ডি, যিনি জামপান্না নামে বেশী পরিচিত, সিপিআই (মাওবাদী) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গোপন জীবন কাটিয়েছিলেন। তিন দিন আগে তার স্ত্রী হিঙ্গে রজিথা’কে নিয়ে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তার আত্মসমর্পণ, মাওবাদী আন্দোলনে ব্যাপকভাবে একটি বড় ধরনের হুমকি দিয়েছে, যা বর্তমানে দেশে একটি ‘কঠিন’ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বলে সাম্প্রতিক দলিলে দলটি স্বীকার করে। মাওবাদী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র অভয়ের নাম উল্লেখ করে তিন পৃষ্ঠার এই বিবৃতিটি দেয়া হয়।

বিস্তারিত বিবৃতিতে, সাধারণ সদস্য থেকে ২০০১ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য হওয়া জামপান্নাকে ‘গুরুতর দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিবাদ, আমলাতন্ত্র এবং মিথ্যা আত্মসম্মানের মত অ-সর্বহারা প্রবণতা’র বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১১ সালে তাকে উড়িষ্যাতে স্থানান্তর করা হয়েছিল এবং সেখানে তিনি ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যান। জামপান্না ‘আদর্শগত ও রাজনৈতিক দোদুল্যমানতার মধ্যে গভীর ভাবে ডুবে ছিল এবং অবশেষে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তার আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তার সহকর্মীদেরকে জানান। পার্টি বুঝতে পেরেছে, জামপান্না এর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বড় হয়ে উঠেছে এবং শেষ পর্যন্ত “বর্তমান কঠিন অবস্থা” মধ্যে তা প্রবল হয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় কমিটি বলেছে যে ‘শত্রুদের সন্ত্রাস’ (পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ) ভীতি তাকে এতটাই তাড়া করেছে যে তিনি শত্রুদের সম্ভাব্য আক্রমণের অজুহাতে দলীয় সভায় যোগ দিতে অস্বীকার করেন। ‘তিনি নিজের ভারবহন ও সঙ্গতি রক্ষা করতে পারছিলেন না’ এবং পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে অসমর্থ ছিলেন এবং নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন। এর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য, কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে তাকে বরখাস্ত করার জন্য দল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল(এই বছরের প্রথম দিকে)। বিবৃতিতে জানানো হয় যে, কেন্দ্রীয় কমিটির নিয়োগ দেয়া একটি রাজ্য কমিটির দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জামপান্না ।

পার্টি যখনি তার বরখাস্তের বিষয়টি উত্থাপন করে, তখনি তিনি ‘পার্টি লাইনের সাথে রাজনৈতিক পার্থক্য’ এর বিষয়টি উত্থাপন করে, এ অভিযোগেও তাকে অভিযুক্ত করেছে পার্টি। তিনি দলের মতাদর্শের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন যে, ভারত একটি আধা-সামন্তবাদী ও আধা-ঔপনিবেশিক দেশ এবং তর্ক করেন যে, এটি নিজেকে পুঁজিবাদী দেশে রূপান্তরিত করেছে। তিনি যুক্তি দেখান যে, পার্টির লাইনটি শর্ত অনুযায়ী পরিবর্তিত হওয়া উচিত এবং দেশে বিদ্যমান নতুন শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বিদ্রোহের রেখা’ অনুসরণ করা উচিত। তবে তিনি তার সহকর্মীদের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেননি এবং দলের কোনো ফোরামেও নয়। যখন তাকে এই বিষয়ে বলা হয়, “তিনি প্রস্তুত ছিলেন না, তখনই দল থেকে বেরিয়ে যান(আত্মসমর্পণ)”। মুখপাত্র অভয় বলেন, “এইসব রাজনৈতিক পার্থক্যগুলো কিছুই নয়, এসব তার অধঃপতনকে ঢাকতে আবরণ মাত্র”।

অভয় আরো উল্লেখ করেন যে, সিনিয়র ক্যাডারদের আত্মসমর্পণ করার মতো যে কোন ধরনের অস্থায়ী বাধাগুলি সত্ত্বেও তার দল বিপ্লবের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকবে।

সূত্রঃ https://telanganatoday.com/jampanna-surrendered-himself


কার্ল মার্কসের সমাধিস্থলে বক্তৃতা -ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

lead_960

১৪ই মার্চ, বেলা পৌনে তিনটেয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য তাঁকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল। আমরা ফিরে এসে দেখলাম যে তিনি তাঁর আরামকেদারায় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন- কিন্তু ঘুমিয়েছেন চিরকালের জন্য।

এই মানুষটির মৃত্যুতে ইউরোপ ও আমেরিকার জঙ্গি প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাস-বিজ্ঞান উভয়েরই অপূরণীয় ক্ষতি হল। এই মহান প্রাণের তিরোভাবে যে শূন্যতার সৃষ্টি হল তা অচিরেই অনুভূত হবে।

ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন তেমনি মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম, মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা এই সহজ সত্য যে, রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথম চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ, সুতরাং প্রাণধারণের আশু বাস্তব উপকরণের উৎপাদন এবং সেইহেতু কোনো নির্দিষ্ট জাতির বা নির্দিষ্ট যুগের অর্থনৈতিক বিকাশের মাত্রাই হলো সেই ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট জাতিটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের ধ্যান-ধারণা, শিল্পকলা, এমনকি তাদের ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত এবং সেই দিক থেকেই এগুলির ব্যাখ্যা করতে হবে, এতদিন যা করা হয়েছে সেভাবে উল্টো দিক থেকে নয়।

কিন্তু শুধু এই নয়। বর্তমান পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির এবং এই পদ্ধতি যে বুর্জোয়া সমাজ সৃষ্টি করেছে তার গতির বিশেষ নিয়মটিও মার্কস আবিষ্কার করেন। যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে এতদিন পর্যন্ত সব বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রী সমালোচক উভয়েরই অনুসন্ধান অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, তার ওপর সহসা আলোকপাত হল উদ্ধৃত্ত মূল্য আবিষ্কারের ফলে।

একজনের জীবদ্দশার পক্ষে এরকম দুটো আবিষ্কারই যথেষ্ট। এমনকি এরকম একটা আবিষ্কার করতে পারার সৌভাগ্য যাঁর হয়েছে তিনিও ধন্য। কিন্তু মার্কসের চর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে- এবং তিনি চর্চা করেছিলেন বহু বিষয় নিয়ে এবং কোনোটাই ওপর ওপর নয়- তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই, এমনকি গণিতশাস্ত্রও তিনি স্বাধীন আবিষ্কার করে গেছেন। 
এই হল বিজ্ঞানী মানুষটির রূপ। কিন্তু এটা তাঁর ব্যক্তিত্বের অর্ধেকও নয়। মার্কসের কাছে বিজ্ঞান ছিল এক ঐতিহাসিকভাবে গতিষ্ণু বিপ্লবী শক্তি। কোনো একটা তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের নতুন যে আবিষ্কার কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের কল্পনা করাও হয়তো তখনো পর্যন্ত অসম্ভব, তেমন আবিষ্কারকে মার্কস যতই স্বাগত জানান না কেন, তিনি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের আনন্দ পেতেন যখন কোনো আবিষ্কার শিল্পে এবং সাধারণভাবে ঐতিহাসিক বিকাশে একটা আশু বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যুৎশক্তির ক্ষেত্রে যেসব আবিষ্কার হয়েছে তার বিকাশ এবং সম্প্রতি মার্সেল দ্রেপ্রের আবিষ্কারগুলি তিনি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতেন।

কারণ মার্কস সবার আগে ছিলেন বিপ্লববাদী। তাঁর জীবনের আসল ব্রত ছিল পুঁজিবাদী সমাজ এবং এই সমাজ যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে তার উচ্ছেদে কোন না কোন উপায়ে অংশ নেওয়া, আধুনিক প্রলেতারিয়েতের মুক্তি সাধনের কাজে অংশ নেওয়া, একে তিনিই প্রথম তার নিজের অবস্থা ও প্রয়োজন সম্বন্ধে, তার মুক্তির শর্তাবলী সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছিলেন। তাঁর ধাতটাই ছিল সংগ্রামের। এবং যে আবেগ, যে অধ্যবসায় ও যতখানি সাফল্যের সঙ্গে তিনি সংগ্রাম করতেন তার তুলনা মেলা ভার। প্রথম Rheinische zeitung (1842), প্যারিসের vorwarts (1844) পত্রিকা, Deutsche Brusseler zeitung (1847), Neue Rheinische (1848-49), New york Tribune (1852-61) পত্রিকা এবং এছাড়া একরাশ সংগ্রামী পুস্তিকা, প্যারিস, ব্রাসেলস এবং লন্ডনের সংগঠনে তাঁর কাজ এবং শেষে, সর্বোপরি মহান শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন- এটা এমন একটা কীর্তি যে আর কোন কিছু না করলেও শুধু এইটুকুর জন্যই এর প্রতিষ্ঠাতা খুবই গর্ববোধ করতে পারতেন।

তাই, তাঁর কালের লোকেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রোশ ও কুৎসার পাত্র হয়েছেন মার্কস। স্বেচ্ছাতন্ত্রী এবং প্রজাতন্ত্রী দু’ধরনের সরকারই নিজ নিজ এলাকা থেকে তাঁকে নির্বাসিত করেছে। রক্ষণশীলই বা উগ্র-গণতান্ত্রিক সব বুর্জোয়ারাই পাল্লা দিয়ে তাঁর দুর্নাম রটনা করেছে। এসব কিছুই তিনি ঠিক মাকড়শার ঝুলের মতোই ঝেঁটিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন, উপেক্ষা করেছেন এবং যখন একান্ত প্রয়োজনবশে বাধ্য হয়েছেন একমাত্র তখনই এর জবাব দিয়েছেন। আর আজ সাইবেরিয়ার খনি থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত, ইউরোপ ও আমেরিকার সব অংশে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী সহকর্র্মীদের প্রীতির মধ্যে, শ্রদ্ধার মধ্যে, শোকের মধ্যে তাঁর মৃত্যু। আমি সাহস করে বলতে পারি যে মার্কসের বহু বিরোধী থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু তাঁর মেলা ভার।

যুুগে যুগে অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর নাম, অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর কাজ।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭

‘ভারতে অভ্যুত্থান’ -কার্ল মার্কস (লন্ডন ১৭ জুলাই ১৮৫৭)

maxresdefault

দিল্লি বিদ্রোহী সিপাহীদের হস্তগত ও মোগল বাদশাহ ঘোষিত হবার পর ৮ই জুন ঠিক এক মাস হলো। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে ভারতের এই প্রাচীন রাজধানী বিদ্রোহীরা দখলে রাখতে পারবে তেমন কোন ধারণা অবশ্যই অস্বাভাবিক। দিল্লি সুরক্ষিত কেবল একটি দেয়াল ও একটি সাধারণ পরিখা দিয়ে, আর দিল্লির চারিপাশে ও দিল্লিকে শাসনে রাখার মতো টিলা পাহাড়গুলি ইতিমধ্যেই ইংরেজদের দখলে, তারা দেয়াল না ভেঙেই জল সরবরাহ কেটে দেবার মতো সহজ পদ্ধতিতেই স্বল্প সময়ে দিল্লিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারে। তাছাড়া বিদ্রোহী সৈন্যদের যে একটা এলোমেলো দঙ্গল স্বীয় অফিসারদের খুন করে শৃঙ্খলার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ সেনাপত্য অর্পণ করার মতো কাউকে খুঁজে পায়নি, তারা নিশ্চয় এমন একটা দল, যাদের কাছ থেকে গুরুতর ও দীর্ঘায়ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আশা সবচেয়ে কম। বিভ্রান্তি আরও পাকিয়ে তোলার জন্য বাংলা প্রেসিডেন্সির সর্বাঞ্চল থেকে নতুন নতুন বিদ্রোহী বাহিনী এসে অবরুদ্ধ দিল্লি সৈন্যদের সংখ্যা দিন দিন বাড়াচ্ছে, যেন একটা স্থিরীকৃত পরিকল্পনা অনুসারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এই মৃত্যুদণ্ডিত নগরে। দেয়ালের বাইরে ৩০ ও ৩১ মে তারিখের যে দুটি অভিযানের ঝুঁকি নেয় বিদ্রোহীরা এবং গুরুতর ক্ষতিতে যা প্রতিহত করে, তার উদ্ভব যেন আত্মনির্ভরতা বা শক্তির মনোভাব থেকে নয়, বরং মরিয়াপনা থেকে। একমাত্র অবাক লাগে শুধু ব্রিটিশের আক্রমণগুলির ধীরতায়- কিছুটা পরিমাণে যদিও তা ব্যাখ্যা করা যায় ঋতুর ভয়াবহতা ও পরিবহন ব্যবস্থার অভাব দিয়ে। সর্বাধিনায়ক জেনারেল অ্যানসন ছাড়াও ফরাসি পত্রে বলা হয়েছে, মারাত্মক তাপের শিকার হয়েছে প্রায় ৪,০০০ ইউরোপীয় সৈন্য; এমনকী ইংরেজি পত্রিকাতেও স্বীকার করা হচ্ছে যে, দিল্লির সম্মুখভাগের যুদ্ধে দুর্ভোগ সইতে হয়েছে শত্রু সৈন্যের গুলি থেকে ততটা নয়, যতটা রোদ্দুরের জন্য। যানবাহনাদির স্বল্পতায় আম্বালাস্থিত প্রধান ব্রিটিশ সৈন্যদের দিল্লি চড়াও হতে লাগে প্রায় সাতাশ দিন, অর্থাৎ দিনে পথ হেঁটেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা হারে। আম্বালায় ভারি কামান না থাকায় এবং সেই কারণে নিকট অস্ত্রাগার যা শতদ্রুর অপর পারে ফিলাউরে অবস্থিত। সেখান থেকে দখলি কামান বাহিনী নিয়ে আসতে আরও দেরি হয়।

এসব সত্ত্বেও দিল্লির পতন সংবাদ যে কোন দিন আশা করা যায়; কিন্তু তারপর? ভারত সাম্রাজ্যের চিরাচরিত কেন্দ্রের ওপর বিদ্রোহীদের অবাধ দখলের এক মাসেই যদি বেঙ্গল আর্মির একেবারে ভেঙে পড়া, কলকাতা থেকে উত্তরে পাঞ্জাব ও পশ্চিমে রাজপুতানা পর্যন্ত বিদ্রোহ ও সৈন্যদল ত্যাগের ঘটনা ছড়ানো, ভারতের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত ব্রিটিশ কর্তৃত্বকে টলিয়ে দেওয়ার দিক থেকে বোধ করি প্রবলতম উত্তেজিতকর কাজ হয়ে থাকে, তাহলে দিল্লির পতনে সিপাহীদের মধ্যে নৈরাশ্য ছড়ালেও তাতেই বিদ্রোহ প্রশমিত, তার প্রসার রুদ্ধ কিংবা ব্রিটিশ শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে, একথা ভাবা সবচেয়ে বড়ো ভুল। ২৮,০০০ রাজপুত, ২৩,০০০ ব্রাহ্মণ, ১৩,০০০ মুসলমান, ৫,০০০ নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং বাকিটা ইউরোপীয় দিয়ে গড়া ৮০,০০০ সৈন্যের গোটা দেশীয় বেঙ্গল আর্মি থেকে বিদ্রোহ, দলত্যাগ ও বরখাস্তের দরুন ৩০,০০০ সৈন্যই অদৃশ্য হয়েছে, আর এ আর্মির বাকিটা থেকে কয়েকটা রেজিমেন্ট খোলাখুলিই ঘোষণা করেছে যে, তারা ব্রিটিশ কর্তৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ত ও সমর্থন থাকবে শুধু দেশীয় সৈন্যদের যে কাজে লাগানো হচ্ছে শুধু সেই কাজটি বাদে। দেশীয় রেজিমেন্টের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তারা কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করবে না, বরং সাহায্য করবে তাদের ‘ভাইয়া’দের। কলকাতা থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেকটা স্টেশনেই তার সত্যকার দৃষ্টান্ত মিলেছে। দেশীয় সিপাহীরা কিছুকাল নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে, কিন্তু সেই ধারণা হয় যে তাদের যথেষ্ট শক্তি আছে, অমনি বিদ্রোহ করে বসে। যে সব রেজিমেন্ট এখনো ঘোষণা করেনি এবং যে সব দেশীয় অধিবাসী এখনও বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মেলায়নি, তাদের বিশ্বস্ততা সম্বন্ধে কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখেননি The London Times-এর একজন ভারতস্থ সংবাদদাতা।

তিনি বলেন, সব শাস্ত এ কথা পড়লে বুঝবেন, এখনও পর্যন্ত দেশীয় সৈন্যরা বিদ্রোহ করেনি; অধিবাসীদের অসন্তুষ্ট অংশ এখনো খোলাখুলি বিদ্রোহ করেনি; তারা হয় অতি দুর্বল, অথবা ভাবছে যে তারা দুর্বল, নয়তো অপেক্ষা করছে আরও উপযুক্ত একটা মুহূর্তের জন্যে। ঘোড়সওয়ার বা পদাতিক কোনো দেশীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের এর বিশ্বস্ততার পরিচয়ের কথা যখন পড়বেন তখন বুঝবেন যে, তার অর্থ তথা-প্রশংসিত রেজিমেন্টগুলির শুধু অর্ধেকটাই সত্যিই বিশ্বস্ত, বাকি অর্ধেকটা শুধু অভিনয় করছে যাতে বরং ইউরোপীয়দের অসতর্ক অবস্থায় পায়, নয়তো তাদের ওপর সন্দেহ না থাকার বিদ্রোহ ভাবাপন্ন সাথীদের যাতে আরও সহজে সাহায্য করতে পারে।

পাঞ্জাবে প্রকাশ্য বিদ্রোহ নিরোধ করা গেছে শুধু দেশীয় সৈন্যবাহিনী ভেঙে দিয়ে। অযোধ্যায় ইংরেজরা কেবল রেসিডেন্সি লক্ষ্ণৌ দখলে রাখতে পেরেছে বলা যায়, তাছাড়া সর্বত্রই দেশীয় রেজিমেন্টগুলি বিদ্রোহ করেছে, গুলিগোলা নিয়ে পালিয়েছে, সমস্ত বাংলো পুড়িয়ে ছাই করেছে, এবং যোগ দিয়েছে হাতিয়ার তুলে ধরা অধিবাসীদের সঙ্গে। প্রসঙ্গত ইংরেজ আর্মির আসল অবস্থা সবচেয়ে ভালো প্রকাশ পাচ্ছে এই ঘটনায় যে, পাঞ্জাব ও রাজপুতানা উভয় ক্ষেত্রেই ভ্রাম্যমান কোর স্থাপন করা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। তার অর্থ, বিক্ষিপ্ত সৈন্যদলগুলির মধ্যে যোগাযোগ বহাল রাখতে ইংরেজরা তাদের সিপাহী সৈন্য বা দেশীয় অধিবাসীদের ওপর ভরসা করতে পারছে না। উপদ্বীপীয় যুদ্ধকালে ফরাসিদের মতো তারা শুধু স্বীয় সৈন্যাধিকৃত ভূমিটুকু এবং তদধীন পরিপার্শ্বটুকু শাসনে রাখছে। আর তাদের আর্মির বিচ্ছিন্ন অঙ্গগুলির মধ্যে যোগাযোগের জন্য তারা নির্ভর করছে ভ্রাম্যমান কোর-এর ওপর-এ দলের কাজ এমনিতে অতি সঙ্গীন, তাতে যত বেশি জায়গা জুড়ে তা ছড়াবে, স্বভাবতই তত কমে যাবে তার প্রবলতা। ব্রিটিশ সৈন্যের বাস্তব অপ্রতুলতা আরও প্রমাণ হয় এই ঘটনায় যে, বিক্ষুব্ধ স্টেশনগুলি থেকে ধনসম্পদ সরাবার জন্য তারা বহনে সিপাহীদেরই লাগাতে বাধ্য হয়- সিপাহীরা বিনা ব্যতিক্রমে যাত্রাপথে বিদ্রোহ করে এবং ভার পাওয়া ধনসম্পদ নিয়ে ফেরার হয়। ইংল্যান্ড থেকে পাঠানো সৈন্যরা যেহেতু সর্বোত্তম ক্ষেত্রেও নভেম্বরের আগে পৌঁছাবে না এবং মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সি থেকে ইউরোপীয় সৈন্য টেনে আনা যেহেতু আরও বিপজ্জনক হবে- মাদ্রাজ সিপাহীদের ১০ নম্বর রেজিমেন্ট ইতোমধ্যেই বিক্ষোভের লক্ষণ দেখিয়েছে।

তাই বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে নিয়মিত কর সংগ্রহের ধারণা ত্যাগ করতে হবে ও ভাঙনের প্রক্রিয়াকে চলতে দিতেই হবে। যদি ধরে নেই যে বর্মীরা এ উপলক্ষে ফায়দা ওঠাবে না, গোয়ালিয়রের মহারাজা ইংরেজদের সমর্থন করেই যাবে এবং সর্বোৎকৃষ্ট ভারতীয় সৈন্য যার হাতে আছে সেই নেপালের সেই অধিপতি শান্তই থাকবে, বিক্ষুব্ধ পেশোয়ার অশান্ত পার্বত্য উপজাতিদের সঙ্গে যোগ দেবে না এবং পারস্যের শাহ হেরাত ছেড়ে যাওয়ার মতো মূর্খতা দেখাবে না, এমন কী তাহলেও গোটা বাংলা প্রেসিডেন্সিকে ফের জয় করতে হবে এবং গোটা ইঙ্গ ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে ফের গড়তে হবে। এই বৃহৎ ব্যাপারের খরচাটা সবই পড়বে ব্রিটিশ জনগণের ওপর। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় ঋণ মারফত প্রয়োজনীয় অর্থ তুলতে পারবে বলে লর্ড গ্রেনভিল লর্ড সভায় যে ধারণা দিয়েছেন তা কতো পাকা, তার বিচার হবে উত্তর পশ্চিম প্রদেশগুলির বিক্ষুব্ধ অবস্থায় বোম্বাইয়ের টাকার বাজারের প্রতিক্রিয়া থেকে। তৎক্ষণাৎ দেশীয় পুঁজিপতিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়, ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেয়া হয়, সরকারি সিকিউরিটি বিক্রয়ের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং শুধু বোম্বাইয়ে নয়, তার চারপাশেও প্রচুর পরিমাণে মজুদের হিড়িক লাগে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭

 


সিপিআই(মাওবাদী)’র গণসংগঠন অভিযোগে ‘মজদুর সংগঠন সমিতি’কে নিষিদ্ধ ঘোষনা

maxresdefault

গত ২২শে ডিসেম্বর ‘মজদুর সংগঠন সমিতি’ (MSS) কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঝাড়খণ্ড সরকার। সরকারের দাবী সংগঠনটি সিপিআই(মাওবাদী)’র গণসংগঠন। একই সাথে গিরিধি, ধানবাদ ও বোকারো জেলায় গণসংগঠনটির ইউনিট কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। সরকারের অভিযোগ ‘সংগঠনটি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, লেভি সংগ্রহ এবং জনগণকে সংগঠিত করা – এ সকল অবৈধ কার্যক্রম জড়িত’।

এদিকে, এই গণসংগঠনটি সম্পর্কে ফেসবুকের বিভিন্ন পোষ্ট থেকে জানা যাচ্ছে- ঝাড়খন্ড- খনিজ সম্পদে পরিপূরণ এক বিস্তির্ণ রাজ্য। আর তার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে ছোটবড়ো মাপের বহু কারখানা। সেই ঔপনিবেশিক ভারতে প্রথম গড় ওঠা দালাল পুঁজিপতিদের মুক্তাঞ্চল হলো ঝাড়খন্ড। ইস্পাত থেকে বক্সাইট, ইউরেনিয়াম থেকে কয়লা একই ভুখন্ডের মাটির নিচে জমা হয়ে আছে। এই সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠনের ইতিহাসও তার সঙ্গেই শুরু হচ্ছে। আর শুরু হচ্ছে বিস্তৃত জঙ্গল থেকে আদিবাসি মূলবাসি মানুষদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া। এক একটি ইস্পাত কম্পানিকে ধরে ভারতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির শোষন আরও মজবুত হয়েছে। ‘মজদুর সংগঠন সমিতি’ ঝাড়খন্ডের শ্রমজীবি মানুষ বিশেষ করে রাঁচী, বোকারো, গিরিডি, দুমকা সহ একাধিক শহরের শিল্পীয় সর্বহারাদের সংগঠিত করে, এবং শুধু তাদের অধিকার আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতে চলমান কৃষি বিপ্লবের নেতৃত্বে উন্নিত করে। শ্রমিকরা কৃষি বিপ্লবের প্রকৃত নেতা এই চেতনা গড়ে ওঠে ঝাড়খন্ডের হাজার হাজার শ্রমিকের। সামন্তবাদ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে MSS তার যথার্থ কর্তব্য পালন করে যাচ্ছিলো। 
গত একমাস ধরে তারা ঝাড়খন্ডের বিভিন্ন শহরে পালন করেছে নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ। প্রায় ৩০০০০ হাজার শ্রমিক গিরিডি শহর কয়েক ঘন্টার জন্য করে ফেলেছিলো বন্ধ।

ঝাড়খণ্ড সরকার এবং সামগ্রিক ভাবে এই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র আবার তার নিজের বানানো সাংবিধানিক নিয়মকে লঙ্ঘন করে MSS কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছে। মাওবাদীদের গণসংগঠনের তকমা দিয়ে এর আগে ১৬ টি বিভিন্ন সংগঠনকে ঝাড়খন্ড সরকার নিষিদ্ধ করেছে। এবার MSS। দেশ ব্যাপী একের পর এক জনবিরোধী নীতি গুলো যখন লাগু করছে হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র, তারই অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ।

সূত্রঃ  http://www.uniindia.com/jharkhand-govt-bans-mazdoor-sangathan-samiti-frontal-organisation-of-cpi-maoists/states/news/1084873.html#.Wj5eRj4kydI.facebook


ফিলিস্তিনি কিশোরী আহেদ তামিমি’র প্রতি সংহতি

ob_6d3cfc_free-ahed

এক ইসরাইলি সেনার গালে ঘুষি মেরে বীরের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন ১৬ বছরের ফিলিস্তিনি কিশোরী আহেদ তামিমি। কোকড়ানো ও সোনালি চুলের এই কিশোরী তাদের বাড়ির প্রবেশ পাথের কাছে দাঁড়ানো দুই ইসরাইলি সেনার দিকে হেঁটে এগিয়ে যান। সেনাদের কাছাকাছি গিয়ে নিজেদের বাড়ির আঙিনা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বলেন তিনি। কিন্তু ওই দুই সেনা তার কথায় কোনো কর্ণপাত না করে দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি ওই দুই সেনাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু সেনারা কোনো তোয়াক্কা না করায় এক সেনার গালে সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে দেন তিনি। ইসরাইলি দুই সেনাকে ফিলিস্তিনি কিশোরীর রুখে দাঁড়ানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপরই ফিলিস্তিনের নবী সালেহ গ্রামের ১৬ বছর বয়সী এই কিশোরী নতুন প্রজন্মের এক বীরপ্রতীক হিসেবে ফিলিস্তিনের কাছে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান।
এনবিসি নিউজ জানায়, গত শুক্রবার জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করার প্রতিবাদে পশ্চিম তীরে বিক্ষোভ করছিল ফিলিস্তিনিরা। এ সময় ফিলিস্তিনের বিখ্যাত কিশোরী অ্যাক্টিভিস্ট আহেদ তামিমির পরিবারের এক সদস্যকে মাথায় গুলি করে ইসরাইলি সেনারা। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে কিশোরী আহেদ তামিমি। এই দৃশ্য কেউ একজন মোবাইল ফোনের ক্যামেরা ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় ভিডিওটি। এই ভিডিওকে ঘিরে ফিলিস্তিনি কিশোরীর বিরুদ্ধে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে উসকানি দেয় ইহুদিবাদী সংবাদ মাধ্যমগুলো।
থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলি সেনারা মাসহ ওই কিশোরী আহেদ এবং তার ২১ বছর বয়সী চাচাতো বোন নুর নাজি আল তামিমিকে গ্রেফতার করে। মঙ্গলবার ভোরে ওই ফিলিস্তিনি কিশোরীর বাড়িতে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। আহেদের ব্যক্তিগত ল্যাপটপ, মোবাইল এবং বেশ কিছু ইলেক্ট্রনিক জিনিস জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় তামিমির পরিবারের লোকজনকে সেনারা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। এ ঘটনায় ফিলিস্তিনিরা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ ও নিন্দা জানান। তাদের কথা, দখলদার ইসরাইলি সেনাদের প্রতিরোধ করার অধিকার রয়েছে ফিলিস্তিনিদের। এদিকে দুই সেনার ওপর হামলার অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে ১০ দিনের সাজাও ঘোষণা করা হয়েছে। ইসরাইলের শিক্ষামন্ত্রী নাফতালি বেন্নেত মঙ্গলবার আর্মি রেডিওতে এক ঘোষণায় বলেন, ‘অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত দুই ফিলিস্তিনি কিশোরীকে জেলেই পচে মরতে হবে।’